আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Sunday, 12 July 2009

Letter to the Editor Samayik Asom




সুচরিতেষু,
চিন্ময়,
সম্পাদক, সাময়িক অসম ,
পরপর দুটো সংখ্যা সাময়িক অসম ( জানুয়ারি-মার্চ,০৯ ও এপ্রিল-জুন,০৯) আমার হাতে এসে পড়ল । আর দুটো আমি মন দিয়ে উৎসাহ ভরে পড়েছি । আমাদের এখানে বন্ধুদের মধ্যে এর প্রচার ঘটাবার চেষ্টা করে যাচ্ছি । আমি নিজে ভালো লেখক নই । কিন্তু ভালো লেখক গড়ে তুলতে হলে কেমন পরিবেশ চাই এ নিয়ে আমার দীর্ঘ দিনের কিছু ভাবনা আছে । নানা জায়গায় অল্পসল্প অপ্রিয় হবার ঝুঁকি নিয়ে লিখেওছি । সে ভাবনার সমর্থণ পেয়েই আপনার কাগজের প্রতি আমার টান জন্মেছে । এবং প্রতিনিয়ত এর দীর্ঘায়ু কামনা করে চলেছি।
পশ্চিম বাংলা থেকে আমরা যে প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার শ্লোগান ( এনিয়ে একদারুণ লেখা পড়ুন  এখানে) পেয়েছিলাম এবং দীর্ঘদিন তাঁর মোহে জড়িয়েছিলাম তাতে ওদের কি ক্ষতি হয়েছিল জানিনা, আমাদের বড্ড ক্ষতি হয়ে গেছিল ।  আমাদের আসলে নিজেদের জন্যে নিজস্ব ধরণের প্রতিষ্ঠানের দরকার ছিল । অন্যথা , বাংলাতে যা লেখা হয় কলকাতাতেই হয় এই ধারণার থেকে বেরুনো যাচ্ছিল না। এই ধরণার থেকে লোকে যদি না বেরুতে পারে তবে লিখে কী লাভ বলুন? আর অসমের বাংলা লেখকের লেখা যদি এখানকার বাঙালি লোকে পড়বার অভ্যেস না গড়ে তোলে , তবে এখানকার আলোহাওয়া থেকে বিচ্ছিন্নতার সমস্যাও ঘোচবার উপায় দেখিনা । লোকে জানবে কি করে যে, গুয়াহাটির সবুজ পাহাড়ের ভিড়ে/ খাস খবরের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে / শিল্পময় বিভিন্ন শোক ও আলো।
এখানকার রচনার এই যে আলাদা ধরণ ধারণ তা কলকাতার বাংলা সাহিত্য যতই ভালো আর উন্নত হোক, দিতে পারবে কেন? আর আমাদের লেখকেরাই বা কলকাতার কৃপা লাভের জন্যে ভিক্ষার ঝুলি হাতে দোয়ারে দোয়ারে ঘুরবেন কেন? ওরাতো জানে না যে আমাদেরো নিজেদের বহু ভালো লেখক আছেন ! এইতো আপনারা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার ছাপলেন। খুব ভালো। কিন্তু এতেও এই স্বীকারোক্তি আছে যে অসমের সম্পর্কে তাঁর বিশেষ কোনো ধারণা নেই। নিরুপমা বরগোঁহাই নামে এক লেখিকা ! সেদিন ব্যতিক্রমের নিমন্ত্রণে জয় গোস্বামী এলেন। তিনিও বললেন, বিজিত ভট্টাচার্য আর বীরেন রক্ষিত ছাড়া আর কারো সম্পর্কে বিশেষ ধারণা নেই। হর্ষ দত্ত এসেও একই কথা শোনালেন ! তিনিতো অবাক হয়ে গেলেন এই দেখে যে শিলচরে এতো বাংলা কাগজ হয়। এতো লোকে লেখে! দেখুন দশা! অথচ আমরা ফী বছর দেশ কাগজকে কোটি টাকার ব্যবসা দিই । কী অবহেলা ! কী অবজ্ঞা ! আমি বলছি না এটি তারা ইচ্ছে করে করেন। কিন্তু কলকাতার এক ব্যামো আছে, সে কলকাতার বাইরে তাকালে সোজা বিলেতে গিয়ে তার চোখ পড়ে । অন্য কোথাও নয় ! আজকাল অবশ্যে কিছু দৃষ্টি পাল্টাচ্ছে। শুনেছি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এখানকার বাংলা সাহিত্য তাদের পাঠ্যক্রমে ঢোকাবে । কিন্তু এতো যৎ সামান্য !
এদের এবং আমাদের নিজেদের দেশের লোকের চোখ না পাল্টালে আমাদের লিখে কোন লাভ নেই । ভালো লেখক নিজ গুণে পাঠক টানে বাজে কথা । পাঠক টানার জন্যে গুণাতিরিক্ত আরো বহু কারক কাজ করে । আমিও এক কাগজ করি , যেখানে অসমিয়া-বাংলা হিন্দি ছাপি । আমি জানি । আমি যদি আপনাদের লেখা কোনো অসমিয়া বন্ধুকে অনুবাদ করতে দিই স্পষ্টই বলবে, এতে সাহিত্য তেমন নেই ! অন্যদিকে সেদিন লক্ষ্মীনন্দন বরার প্রান্তিকে যে আত্ম জীবনী বেরুচ্ছে তাতে পড়লাম একবার তাঁকে যখন মহাশ্বেতা দেবী জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী লেখেন ? তাঁর জবাব দেবার ইচ্ছে হয় নি । কারণ তিনি জানেন, এঁও লোকে আমার লিখা নপঢ়ে !
এ রকম জায়গায় ব্যতিক্রম নামে সৌমেন ভারতীয়াদের কাগজ , বা অন্যদেশ নামে অঞ্জলি সেনগুপ্তের কাগজ আমদের আশার আলো দেখায় । বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, হবে , আমাদেরও হবে, দিন আসছে !
আপনাদের কাগজতো লিটিল ম্যাগ। কলকাতার কিছু কিছু লিটিল ম্যাগ আছে কিনে পড়তে গেলে রীতি মতো বড়লোক হতে হয় । তাদের মুখে আবার কী সব আদর্শ টাদর্শের কথা শুনলে গা গুলিয়ে আসে! ভাগ্যিস ( দুর্ভাগ্যও হতে পারে, আমরা এমনিতেও গরিব কিনা ) আমাদের সেরকম বড়লোকের লিটিল ম্যাগ নেই। কিন্তু ওদের ভাবশিষ্য আছেন অনেক । যারা মনে করেন লিটিল ম্যাগের উচিত নয় বিজ্ঞাপন-টন নেয়া । লিটিল ম্যাগ হওয়া উচিত বিধবার মতো নিরাভরণ-নিরলংকার ! এরা কবিতা কেন ছন্দ অলংকার বাদ দিয়ে আর গদ্য কেন যতি চিহ্ন বাদ দিয়ে লেখেন না জানি না! আপনারা সেরকম আদর্শের মুখে ছাই দিয়েছেন দেখে ভাল্লাগল ।
আপনি এক জন ভালো কবি ও গল্পকার হবার সঙ্গে সঙ্গে একজন ভালো চিত্রকরও। বোধহয় তাই আপনি সে মোহ ছাড়তে পারেন নি । কিন্তু তাতে ভীষণ লাভ হয়েছে । আপনার , দীপ্তেন্দুর ,বিকাশের বা শৈলেন্দ্রের চিত্রগুলো দেখে মনে হয়--- আপনারা সাহিত্যের নামে টিউশ্যন পড়াবার ঘর আলগা করে রাখেন নি। রীতিমত অতিথি আপ্যায়নে আপনারা আন্তরিক । তাই আপনাদের ঘরে লোক সমাগম হবে । আপনাদের শ্রী ও স্বাস্থ্য দিনে দিনে বাড়বে এই বিশ্বাস করতে মন যায় । আপনারা কলকাতার কাগজগুলোকে রীতিমতো প্রত্যাহ্বান জানিয়ে বসে আছেন দেখে আপনাদের সঙ্গ নিতে বুকে সাহস হয় । এই যে প্রত্যাহ্বান লিখলামএ কিন্তু বিরোধিতা নয় । এ হলো সমান হয়ে উঠবার অত্যাগ্রহ । সমান না হলে দোস্তি জমে না ভালো । আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানো যায় না । এক পক্ষকে সবসময়েই দাসত্ব করতে হয় ।
পরপর দুটো সংখ্যাতেই ( জানুয়ারি-মার্চ,০৯ ও এপ্রিল-জুন,০৯) দেখলাম আপনারা গুয়াহাটির সাহিত্য চর্চার স্বাস্থ্য দেখে বেশ উৎফুল্ল ! এই সংবাদ নিশ্চয়ই সুখের । কিন্তু সেই সঙ্গে যে আক্ষেপ , ...চার পাঁচজন কবি, তিন চার জন প্রবন্ধকার, এবং এক-দুজন গল্প লেখকের বাইরে যে সমস্ত কাজ হচ্ছে , তার সবটুকুই সাহিত্য নন্দন শূণ্য এবং ফাঁকিদীপ্ত । এই বাস্তবতাকেও অস্বীকার করি কী করে ? কিন্তু যখন দেখি আপনাদের আশা গুয়াহাটির বাংলা সাহিত্যের বুকে জেগে উঠবে সেই আকাঙ্খিত সোনালি সূর্য। তখন কিন্তু মনে হয় কলকাতার ব্যমো থেকে আপনারাও বেরুতে পারছেন না । এ কি বাঙালির ব্যামো ? হতে পারে । কোনো অসমিয়া কাগজ এমন স্বপ্ন দেখবে না । সে যা দেখে অসম তথা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাকে নিয়ে দেখে । হিন্দি কাগজও দেখবে না এমন স্বপ্ন। সে যা দেখে সারা ভারতের প্রেক্ষাপটে দেখে । বিলাতি কাগজ পড়ে পড়ে কলকাতা নিজেকে প্যারিস-লণ্ডনের সমগোত্রীয় করবার নেশাতে বাকি বাংলাকে ভুলে ছিল , আজো ভুলে থাকে । আমরাও কলকাতাকে দেখে দেখে , শিলচর-গুয়াহাটি-আগরতলা করতে শিখেছি । তবেই দেখুন ! আমার নিবাস যে তিনসুকিয়াতে, তার দশা ফেরাবার ভার কে নেবে ? এখানে একবার এক সভাতে শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতা পড়তে গিয়ে আমার পা কেঁপেছিল । কেন জানেন ? লোকে যদি জিজ্ঞেস করে , কে সে হরিদাস পাল ? এখানে সঞ্চয়িতার বাইরে রবীন্দ্রনাথ পড়তে গেলেও লোকে তেড়ে আসতে পারে । বলবে, এ রবীন্দ্রনাথে নেই । হাসবেন না ! আমার একবার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আমার মেয়ে এক ছড়ার আসরে , সুকুমারের বাবুরাম সাপুড়ে পড়ে আসবার পর রীতিমটো হৈ হল্লা ! এতো ছড়া নয় ! আমি তাই আপনাদের কাগজের সঙ্গে এখানকার সাহিত্যের লোকের পরিচয় ঘটানোটা ব্রত হিসেবেই নিয়েছি।
তা হে সম্পাদক, এমন দেশে আপনার চারদিকে তৃণভূমি দেখে অনুগ্রহ করে আক্ষেপ করবেন না! আপনি সৌভাগ্যবান, যে এদেশে তৃণও জন্মায় ! যে দেশে তৃণ না জন্মাতে পারে সে দেশে বটবৃক্ষ দেখেছেন কখনো ? সুতরাং তৃণদেখেও উৎফুল্লিত হোন, প্রার্থণা করুন যেন এ দেশ সবুজ শ্যামল হয়ে উঠে বাংলা ভাষার তৃণে । কলকাতাতেও এমন তৃণ আছে অগণন । তাতেইও ওখানে কিছু বটবৃক্ষের দেখা মেলে । সেই তৃণে সার জল দেবার আপনার যে প্রস্তাব তা অতি উত্তম । শুধু অনুরোধ, একটু ভালোবেসে দেবেন , কলকাতার জীবনানন্দকে ( সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।) এই পোড়া দেশে নাইবা টেনে আনলেন ! আমিও একআধটু লিখি, কিন্তু যেখানে এই ভালোবাসা না দেখি সেখানে পা মাড়াইনা ! নিজেও খুব ভালো লেখক নইতো ! এ চিঠিতেও মন্দ কিছু লিখে থাকলেও নিজ গুণে ক্ষমা করে নেবেন । ইচ্ছে ছিল , লেখাগুলো নিয়েও কিছু কথা বলব, কিন্তু ইতিমধ্যে আপনার বিরক্তি উদ্রেক করবার মতো অনেক লিখে দীর্ঘ করে ফেলেছিসে কথা পরে হবে খন

সুশান্ত কর ,
তিনসুকিয়া
Post a Comment

Google+ Badge