আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Tuesday, 20 December 2011

কবি ঊর্ধেন্দু দাশের ঘরের ঠিকানা

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
টুকরো কথার চলচ্চিত্র
(১)
(২)
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
          
( গেল ২১শে নভেম্বর, ২০১১ থেকে ১২ ডিসেম্বর, ২০১১ অব্দি যাদব পুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ এবং একাডেমিক স্টাফ কলেজের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ১০ম উজ্জীবন পাঠমালাতে অংশ নিয়ে পরিবেশিত বক্তৃতা)




(লেখাটি গুয়াহাটির মাসিক কাগজ 'ব্যাতিক্রমের বইমেলা, জানুয়ারি,২০১৩' সংখ্যাতে ছাপা হলো, আয়তনের কথা ভেবে সম্পাদক শুরু থেকে এব্বং মাঝে মাঝেই কিছু অংশ ছেঁটে দিয়েছেন, তাতে তাত্বিক অংশটি বাদ পড়ে গেছে।)

      মিতাভ দেব চৌধুরী তাঁর ‘কবিরবাড়ি’ বইতে সন্দীপন চট্টপাধ্যায় সম্পর্কে বলতে গিয়ে একটা মজার গল্প বলেছেন। ১৯৮০-৮১ সালে সন্দীপনেরা কৃত্তিবাসের হয়ে বইমেলাতে স্টল দিতেন। ওদের স্টলে একটা পেল্লায় সাইজের ঘণ্টা থাকত। অমিতাভ গেছেন তাঁর দুই এক বন্ধুকে নিয়ে। তাঁর এক বন্ধু, যার বাবা আবার সন্দীপনের বন্ধু, জিজ্ঞেস করল, ‘কাকু, ঐ ঘণ্টাটা কেন?” সন্দীপন বললেন, “ কী জানোতো        জয় ,ওটা হলো মহাকালের ঘণ্টা। আমাদের স্টলের বইএর কাটতিতো এমনিতেই কম, কারণ আমরা এক বেগ শঙ্কর বেচিনা—তাই এখানকার বই বিক্রি হলেই এই ঘন্টাটা বাজিয়ে দেয়া হয়। মহাকালকে জানিয়ে দেয়া হয় বাংলা সাহিত্যের উন্নতি হচ্ছেকিচ্ছুক্ষণ পর সন্দীপনের আড্ডার ব্যস্ততার সুযোগে বন্ধুটি গিয়ে সেই ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন। সন্দীপন  দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কী হলো জয়? অম্লানবদনে জয়ের উত্তর, “না কাকু, মহাকালকে জানিয়ে দিলাম ,বাংলাসাহিত্যের ছুটি হয়ে গেছে।” 
         আমরা সবাই জানি এ কিন্তু গল্পমাত্র নয়। মহাকালের দখলদারি নিয়ে আধুনিক বিশ্বসাহিত্য তাঁর পুরোটা সময় জুড়ে লড়াইটা করে গেছে। বাংলা সাহিত্য তাঁর বাইরে নয়। এই যে বাংলাসাহিত্য এগিয়ে গেছে বা তার ছুটি হয়ে গেছে-এর কোন পক্ষেই দাঁড়াবার ইচ্ছে আমাদের নেই,কারণ মহাকালের ইচ্ছে আমরা কেউই খুব ভালো জানিনা। ওটা বিজ্ঞানের কাজ অথবা রাজনীতির। আমাদের প্রশ্ন হলো এই এগিয়ে যাওয়া, ছুটি হয়ে যাওয়া কিম্বা পিছিয়ে থাকার কথাগুলো শুনলে মনে হয় না যে ঘটনাগুলো ঘটছে একটা সরলরেখা ধরে? এই সরলরেখাটা কি তবে স্থান? আচ্ছা সন্দীপনের ...বা সন্দীপনের নাম ভুলে যান, তাঁর মতো যেকোনো লেখকের প্রার্থনাটা কি সত্যি সত্যি মহাকালের কাছে? আমরা সবাই জানি চেপে ধরলে উত্তর বেরুবে, আগামী দিনের সংবেদী পাঠকের কাছে অথবা কেউ আরো বড় করে বলবেন, সমাজের কাছে। তার মানে, কাল থেকে স্থানটাকে আমরা আলাদা করতেই পারছিনা। তার পরেও এটা ঠিক যে অধিকাংশ লেখক অবচেতনে স্থানটাকে একটা স্বতন্ত্র এবং যথাপ্রাপ্ত সত্তা বলে ধরে নেন। ওটা আছে ,  কালটা গুরুত্বপূর্ণ। যে ছুটে চলেছে।  তাই তাদের কাছে কালের পেছনে ছোটা এবং আধুনিক হয়ে ওঠাটা খুব গুরুত্বপুর্ণ । এবারে, যারা সমাজ টমাজের কথা খুব বলেন, তাঁরা কী রকম ভাবেন? সেদিন আমার এক  খুবই বিদ্বান এবং বহু ঝগড়াতে পরীক্ষিত  প্রিয় বন্ধু,  আমাকে জানাচ্ছিল, তার এই বিশ্বাস প্রবল হয়েছে যে শিল্পের সমস্ত নীতিনিয়ম মেনেও শিল্পের জন্যে শিল্প বলে কিছু হতেই পারে না। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এ নিয়ে তাঁর সংশয়ের কারণটাই বা কী? বাংলা ভাষাতে কি কেউ বলেছে কখনো, যে হতে পারে? সে জানালো যে না, সে আসলে সার্ত্রে পড়ছে। তাই অনুভবটা আমাকে জানিয়েছে। আপনারা লক্ষ্য করে দেখুন, উনিশ শতকের সেই বিলেতি তাত্বিক ওয়াল্টার পিটারের ভূত সেই সোভিয়েত বিপ্লবের পর থেকে বাংলা ভাষাতে কেমন টিকে আছেন। তাও  সেই ওঝাদের মধ্যে যারা দায়িত্ব নিয়েছিলেন ভূত তাড়াবেন বলে। অর্থাৎ পিটারের বিরোধী পক্ষই তাঁকে এই দেশে জীইয়ে রেখেছেন, কেননা সার্ত্রে, বা রমা রঁলা কিম্বা ঝধানভেদের মতো মহান ব্যক্তিত্বরা তাঁদের সেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন।  ফলত তাদেরো অস্তিত্বের একটা বড় অংশ বাস করছে সেই ওয়াল্টার পীটারের বা সার্ত্রের দেশে এবং কালে। যেটি হয়তো সার্ত্রের মতো মহান ব্যক্তিত্বের কাছেও কাঙ্খিত নয় কোনো ভাবেই।আমার সেই বন্ধুটিকে বলেছিলাম, ভাই, এই ভূত কিম্বা ভগবানের বিরুদ্ধে লড়াবার চাইতেও আরো বহু জটিল সমস্যাতে রয়েছে আমাদের অসমের শিল্প চর্চা। সেগুলো নিয়ে  ভাবা এবং কাজ করা উচিত। আমি নিশ্চিত, আমি তাঁকে কথাগুলো বোঝাতে পারিনি। কারণ একই রাজনৈতিক প্রদেশের একই সময়ের মানুষ হয়েও শিল্পচিন্তাতে দু’জনের দেশকাল আলাদা। তাহলে কি একই সময়ে আমরা একাধিক দেশ কালে বাস করি? সম্ভবত এরকম কিছু বহুত্বের সন্ধান পেয়ে  আজকাল  পোষ্টমডার্ণেরা এসে আমাদের আশ্বস্ত করছেন, এই বলে যে-- ভাই, পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা খুব বেড়ে গেছে। আগেও এটা সত্য ছিল, কিন্তু বোঝা যেত নাআজকাল বোঝা যাচ্ছে। সুতরাং আধুনিক যুগের  সমস্ত ধরণের মেটানেরেটিভগুলোর দিন চলে গেছে। এখন মাইক্রোনেরেটিভের যুগ। বলো, যে যা বলবার। 
          তাঁদের অনেক কথাই আমাদের প্রাণ ছুঁয়ে যায়। কেননা তাঁরা ক্ষমতার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, যেমন বলা হতো বা হয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। কিন্তু অসম তথা পূর্বোত্তরের এক প্রত্যন্ত শহর ডিব্রুগড়ে বসে যে কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাস গোটা জীবন জুড়ে এই প্রার্থনা জানিয়ে গেছেন, “...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো/স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি/ হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ.../তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—/সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে /তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়;/হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল/ ফুলের মশাল!” তাঁর সেই প্রার্থনার কী হবে? এই কবির শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে আমার মতো ভক্ত পাঠকের বাস । আমিতো আতঙ্কিত হয়ে যাই। যে মাটির কথা তিনি লিখেছেন সেটি কি সত্যি সামান্য? মাইক্রোনেরেটিভ?
       আমরা আসছি এই কবির কথাতে। কিন্তু তাঁর আগে স্থানকালের ব্যাপারটা  আরেকটু একটু বুঝে নিতে চাই। সবটা পারব বলে দাবি করাটাই হবে দম্ভ মাত্র কারণ যাকে আমরা বুঝতে চাইব সেইতো আমাদের সমগ্র চেতনা বিশ্বকেও নিয়ন্ত্রণ করছে।    আমরা যা বুঝি, আধু্নিকতার সময়ের ধারণাটি মূলত সরলরৈখিক। স্থানের ধারণাটি বৃত্তাকার। আজকাল ‘কেন্দ্র-প্রান্তে’র কথা বলাটা খুব ফ্যাসন হয়ে গেছে।  এই সময় একটা কেন্দ্র থেকে আলোর রেখার মতো  পরিধি বা প্রান্তের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আমাদের চেতনবিশ্বকে গ্রাস করে ফেলে। স্পষ্টতই উত্তর গোলার্ধ্বের ঔপনিবেশিক এবং তাদের উপনিবেশের ধ্বজাবাহীদের স্বার্থের সঙ্গে এই ধারণাটি মাপে মাপে খাপ খেয়ে বসে যায়। উত্তর আধুনিকতা দিয়ে আমাদের কথা স্পষ্ট হবে না। বরং তাঁর আগের কলের জন্যে আধুনিকতাবাদের নিজেরই তৈরি    একটি শব্দ ‘মধ্যযুগ’কে  আপনারা স্মরণ করুন! কী ঔদ্ধত্য নিয়ে আমরা এই ভারতবর্ষেও যুগটির ‘বর্বরতা আর অন্ধকারে’র সন্ধান করে ফিরি এখনো। সেই সময়ের উত্তরাধিকার বাহক এক কবির কথাগুলো দেখুন,  “ কানাই তুমি খেইড় খেলাও কেনে?/রঙ্গের রঙিলা তুমি খেইড় খেলাও কেনে?/এই কথাটা হাসন রাজার উঠে মনে মনে/......কানাইয়ে যে করে রঙ্গ, রাধিকা হইতেছে ডঙ্গ...উড়িয়া যাইব ভোমরার পতঙ্গ, খেলা অইব ভঙ্গ...হাসনরাজায় জিজ্ঞাস করে কানাই কোন জন,ভাবনা চিন্তা কইরা দেখি কানাই যে হাছন...” কথাগুলো প্রাণখুলে গান করে গাইবার জন্যে কিন্তু তাঁকে কেউ এই দেশে মন্দিরে বা মসজিদে আগুনে পুড়িয়ে মারেনি, এই কথাটা মনে রাখতে হবে। আরো মনে রাখতে হবে যে বাংলা কবিতার আধুনিকতার জনকেরা যখন এলিয়ট নিয়ে মেতে উঠেছিলেন  কবি রবীন্দ্রনাথ  তখন  এই হাছন রাজার গান নিয়েই বেরিয়েছিলেন বিশ্ববিজয় করতে আর বলছিলেন জীবন   একটা 'লীলা' মাত্র হাছন রাজার ‘খেইড়’। আর এই তিনপক্ষই কিন্তু বাস করছিলেন একই দেশে, একই সময়ে। বিশ শতকের শুরুর সেটি বাংলাদেশ।   এবারে,  কানাইর  সেই খেলাটি কেমন  যেটি আবার ভেঙ্গেও যাবে, অথচ হাছনের মনে হবে যে তিনিই কানাই--- আমরা কয়েকটা ছবিতে খানিকটা  ধারণা দিতে পারি এর চেয়ে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে  আপনাদের উইন্ডো মিডিয়া প্লেয়ারে ওডিও সিডি  চালিয়ে, রেনডম ভিস্যুয়েলাইজন চালিয়ে দিলে।   


         স্থানকালের এবং তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আমাদের চেতন বিশ্বের মানে, হাছন রাজার  এর চেয়ে ভালো সম্পূর্ণ এক বহু মাত্রিক ধারণা দেয়া আমার সাধ্যির বাইরে। কিন্তু যেটুকু দেয়া গেল তাতে অন্তত একটা কথা স্পষ্ট, যে যারা বলেন গ্রান্ডন্যারেটিভ আর সম্ভব নয়, এবার মাইক্রোন্যারেটিভের পালা  তারাও আসলে আমাদের আধুনিকতার কাছে আত্মসমর্পণের কথাই বলেন। এবং সেই কেন্দ্র প্রান্তিকতার ধারণা দিয়েই আমাদের বিবশ করে ফেলবার খেলাটি খেলেন। আপনারা লক্ষ্য করে দেখুন বিশৃঙ্খলা আর শৃঙ্খলার কেমন একটা দ্বান্দ্বিক লীলা চলছে ঠিক যেন যেন রাধা আর শ্যামের মতো। আমি জানিনা, ‘ভাব’ শব্দটির ব্যবহার করে রাধাশ্যামের সেই লীলার দিকে আমাদের চোখ ফেরাতে চাইছেন কিনা  বাংলাদেশের নাস্তিক, মার্ক্সবাদী ভাবুক কবি ফারহাদ মজহার। ব্যাপারটা নিয়ে আমি ভাবছি। কোথাওতো ওদের আর আমাদের অভিমানগুলো মেলে।  ঊর্ধ্বেন্দু দা আমাদের অসমের সেই কবি যিনি জীবনজুড়ে এই বিবশতার বিরুদ্ধে লিখে নেবার স্বপ্ন দেখেছেন সেই মহাআখ্যান যেটি  আধুনিকতাকে প্রত্যাহ্বানের মুখে ঠেলে দেবে।  উচ্চারণ করেছেন, “ ......ভরা দুপুরের রোদে, দ্বিধার দুয়ারে দাঁড়িয়েছে তৃতীয় বিশ্বের /পাথুরে মানুষ।তার ঘরে বাইরে, তর্জনী তুলে ,দুই মেফিস্টোফিলিসঃ /একজন বন্ধক চাইছে তার মেধা, অন্যজন নিরঙ্কুশ তাহার বিবেক---/ দুদিকে মৃত্যুর হাত। হেলিওট্রপিক আঁচে চকিতে ঝলসে ওঠে গ্রানিটের তৃতীয় নয়ন--” (তৃতীয় বিশ্ব) মুষ্ঠিবদ্ধ হাত নয় কিন্তু, ‘গ্রানিটের তৃতীয় নয়ন’ কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।  দ্বিধার দুয়ারে  উঠে দাঁড়ালো  যে মানুষ তাঁকে এই কথা বলবার লোক প্রচুর পাওয়া যাবে, পথে নামলেই পথ চেনা হবে।  বটে। কিন্তু সেতো যথাপ্রাপ্ত দুটো চোখের কাজ মাত্র। সে পথে অনুগমন করা যেতে পারে, চাই কি মেধা আর বিবেককে বন্ধকও রাখা যেতে পারে নিজের অজান্তেই।   ঠিকানাটা কি  জেনে নিতে হবে না?  এতো শুধু ঠিকানাই ঠিক করে দেয় মানুষ তাকাবে কোন দিকে, কত দিকে । কতদূর অব্দি, কতটা সীমানা  ডিঙোবে  তাঁর চোখ । তারই নাম তৃতীয় নয়ন। অথবা বিশ্ববীক্ষা।  তাই খুব স্পষ্টভাবেই কাজটা করে নেন ঊর্ধ্বেন্দু। আমরা পুরোটাই তুলব। আমরা বাংলার রূপসী রূপ দেখেছি বাংলা কবিতাতে। অসমের অসমী রূপ দেখিনিতো এতোটা সুন্দর এর আগে। লোভ সামলানো মুস্কিল আছে। কবিতাটি সনেট।  নাম “ঘরে ফেরার দিন”
          দোপাটির গোছ খুলে অঢেল চুলের রাশ কবরীর প্রান্তে ছড়িয়ে,
          জলের ঝালর –ঘেরা চোখের তারার হাসি থরো-থরো ওষ্ঠে ঝরিয়ে,
          শিমূল-ঝরার দিনে পাহাড়তলির ঘন আলতায় পা-দুটি ডুবিয়ে
          সম্রাজ্ঞীর মহিমায় ভাস্বর তোমার ছবি কতকাল ভুলতে পারিনি!---

          শিমূল ঝরার দিন অতঃপর পৃথিবীতে বারবার এসে, চলে গ্যাছে—
          নির্জন বনস্থলী, ঝরনার সিম্ফনি, বলাকার ডানায় কেঁপেছে;
          অরণ্যের চন্দ্রাতপে সূর্যের আলপনা-গায়ে দেহাতিরা ঘরে ফিরে গ্যাছে—
          নাহর ছায়ায় হেঁটে কখন বিকেল এলঃ তুমি আর ফিরেও ডাকোনি।–

          আমার উঠোন জুড়ে আমার সতর্কপদ বিকেলের রোদের ক্রমণ,--
          চৈত্রের বিবর্ণদিন ; বিশীর্ণ প্রপাত ঘিরে ঝরঝর জলের পতন;
          অদূরে বিচিত্র-সাজ পার্বতী-রমণীর ভারনত শিলাবতরণ—
          মেঘে মেঘে বেলা যায়, আমার অপূর্ণ ঘট ভরা তবু হয়েতো ওঠেনি!_

          সম্মুখে আঁধার রাত, দুর্গম চড়াই –পথ হেঁটে তবে তোমার সীমানা—
          মা, তুমি নিশ্চিত জেনো, সোনালী সূর্যোদয়ে পৌঁছবো ঘরের ঠিকানা।
       
          কবিতাটা নানা ভাবেই পড়া যায়। এই মা ভারত হতেই বা আপত্তি কী? কিন্তু তিনি যেন কোথাও পূর্বোত্তর বা অসমের কথাই মনে করিয়ে দিতে চাইছেন। সে কেবল কতকগুলো জল ঝরনা আর পার্বতী-রমণীর কথাতেই নয়, নাহর , পাহাড়তলির মতো বিশুদ্ধ অসমীয়া তদ্ভব শব্দ দিয়েও। নিখাদ তৎসম শব্দের পাশে  এমন বিশুদ্ধ অসমীয়া তদ্ভব বা দেশি শব্দের ব্যবহার তাঁর আরো প্রচুর কবিতাতেই পাওয়া যাবে, তেমনি পাওয়া যাবে ‘আচানক’, ‘আচাভূয়া’র মতো সিলেটি বা অন্যান্য উপভাষার বাংলা শব্দ বাক্য, এমনকি ‘বাঞ্চোৎ’এর মতো অপাংক্তেয় শব্দও কেবল কি সেই দেশের সমাজ আর প্রকৃতির সৌন্দর্য? কী আশ্চর্য কৌশলে তার সংকটের বয়ানও নির্মাণ করছেন , অথচ  কোনো বিদ্বেষ নেই। আছে অভিমান , "তুমি আর ফিরেও ডাকোনি!--”
এখানে একটা কথা বলে নেয়া ভালো, এই একটি কবিতা ছাড়া আর কোথাও তাঁর কবিতাতে দেশ ‘মা’ হয়ে ধরা দেয়নি, দিয়েছে প্রেয়সী হয়ে। হয়তো বা কোনো কোনো কবিতাতে তার নামটি ‘যশোধরা’।  একাধিক কবিতাতে এসছে নামটি, ‘পিছু ডাকে’ কিম্বা,’ কথা তো থাকেই’ কবিতাগুলোতে যেমন। এই নিয়ে তর্ক উঠতেই পারে, কিন্তু আমাদেরতো এমনটি ভেবে নিয়ে কোনো বেগ পেতে হয় নি। তাঁর অগ্রজ কবি অমলেন্দু গুহের একটি বিখ্যাত কবিতা আছে, ‘লুইত পারের গাঁথা।’ এটি অসমীয়া ভাষাতেও একটি বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা। বাংলা ভাষাতে বোধহয় আর কোনো কবিতা নেই যেটি দুটো ভারতীয় ভাষাতেই লেখা হয়েছে এবং দুই ভাষাতেই সুপরিচিত এবং বিখ্যাত কবিতা। মানে ‘অসমের বাংলা কবিতা পাঠকের কাছে খ্যাতি’ কথাটার যদি কোনো মানে কিম্বা মর্যাদা থাকে তবেতো বটেই।অসমীয়াতে কবিতাটির নাম ‘লুইতপারর গীত’ সেই একটি দীর্ঘ কবিতাতে কবি ধরবার প্রয়াস নিয়েছেন অসমের প্রকৃতি, ভূগোল, সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি হাসি, কান্নার সবটাই। এবারে তাঁর এই কবিতাকে মনে রেখে ঊর্ধ্বেন্দু দাও একটি কবিতা লিখেছেন, ‘সীমান্তের গাঁথা’।  খ্রিষ্টীয় দিনপঞ্জির হিসেবে দুটো কবিতার সময়ের ব্যবধান কয়েক দশকের। এই সময়ে অসমও ভেঙ্গে খাটো হয়েছে অনেক । এবারে অমলেন্দু স্বপ্ন দেখছেন, “জীবনের ডালে ডালে সাতভাই চম্পারা রয়েছি সজাগ/ পারুলের চোখে পরি মেখে দিক শান্তির পরাগ!” এবারে এই সাত ভাই চম্পাকে আজকের মতো সাতটি স্বতন্ত্র প্রদেশ বলে ভাববার কোনো কারণ নেই। অনেকগুলোই কিন্তু জেলা মাত্র। তাদের ঐক্যসূত্রটি রূপকথার ‘পারুল’ , অসমীয়া কবিতাতে সে হয়েছে, “তেজিমলা ভনীটি’। ঊর্ধ্বেন্দু লিখছেন , “মরমিয়া সখি, তোকে বলে রাখি আজ,/ আবার চিকুরে গুঁজবো কপৌ, ফুলে ফুলে তোকে করে ফুলরানি/ ভালো করে দেখে নেব চাঁদের পরাগ-ঝরা রাতে তোর রূপ যৌবনখানি।“ ইতিমধ্যে কিন্তু লুইতের জলে বয়ে,  গেছে বহু বহু জাতি-ধর্ম আর শ্রেণি বিদ্বেষের রক্ত। তার পরেও যিনি এই প্রেমের কথা বলবেন তাঁকে আমাদের বুঝে নিতে হবে বৈকি। ‘বোন’ ভাবার মধ্যে একটা বাধ্যবাধকতা রয়েছে, ‘মরমীয়া সখি’র সঙ্গে সম্পর্কটি একেবারেই স্বেচ্ছানির্বাচন। আমরা মনে রাখতে বলব অমলেন্দু গুহের জন্ম কিন্তু ১৯২৪শে ইম্ফল শহরে। অমলেন্দু গৌরবের সঙ্গেই বলেন ‘মই অসমীয়া মই মৈমনচিঙিয়া।’
    
            মজা হচ্ছে, কলকাতার বাংলা ভাষাতে যখন একদল কবি লিখছিলেন “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য”, তখন অসমের বাংলা কবিতাতে তাঁদেরই রাজনৈতিক সহযাত্রীরা  শোনাচ্ছিলেন,চিকুরে কপৌ ফুল গোঁজার, শিমূল ঝরার গল্প আর ঝরণার সিম্ফনি। ঘটনাটা ঘটছিল রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্বিশেষেই।    এটা কি ঠিক পিছিয়ে যাওয়া ? এমনটাই কিন্তু মনে করতেন সত্তর আশির বাম ঘরানার অনেক কবি লেখকেরা , যারা ‘কলকাতা’ নামের ঔপনিবেশিক নির্মাণটির দিকে নির্দেশের জন্যে তাকিয়ে থাকতেন। নিজেদের পূর্বসূরীর দিকে ভুলেও তাকাতেন না।  সম্ভবত অমিতাভ দেব চৌধুরীরই ‘তৃতীয় নয়নে’ই প্রথম ধরা পড়ে যে অসমের এই ঝরনার সিম্ফনিগুলো ছিল একেবারেই রাজনৈতিক নির্মাণ। অমিতাভ তাঁর ‘কবির বাড়ি’ বইতে প্রকাশিত দুটি প্রবন্ধে এবং অন্যত্র এর সুচিন্তিত ব্যাখ্যা করেছেন। মনে করিয়ে দিয়েছেন ১৮৭৪ থেকে শুরু করে সিলেট তথা পূব বাংলার এবং অসমের রাজনৈতিক ভূগোলের বারবার যে পরিবর্তনগুলো হচ্ছিল এবং ইতিহাসের বিপর্যয়গুলো ঘটছিল, সেই সঙ্গে কলকাতা নামের বাংলাবিশ্বের কেন্দ্রটির যে চরম ঔদাসীন্য দেখা যাচ্ছিল তাতেই এরকম ঘটনা সম্ভব হচ্ছিলতিনি লিখছেন, “ গোটা বাংলা সাহিত্যের   নিরিখেই তাঁদের এই প্রতিবেশ- চেতনা প্রায় নজির বিহীন, যেখানে প্রকৃতির কবি রূপান্তরিত হয়ে পড়েছেন ভূগোল সচেতনার কবিতে।” (ঘর হারানো ও ঘরে ফেরার দোটানায় বরাক উপত্যকার বাংলা সাহিত্য) একে তিনি স্পষ্টই কলকাতার মূলস্রোত থেকে বেশি তাৎপর্যময় ‘নন্দন-প্রস্থান’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। স্মৃতির ‘বাংলাদেশ’ কিম্বা স্বপ্নের ‘কলকাতা’তে ভ্রমণ অনেকেই করেছেন, কিন্তু ঊর্ধ্বেন্দু দাশের মতো কবি যেন শুরু থেকেই জেনে গেছেন, “এই বাস্তবের পৃথিবীর শিশিরবিন্দুগুলিকে ভালো না বেসে, তার থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে কবি যদি শুধু ঘুরে বেড়ান এক অতৃপ্ত মানসলোকে কিম্বা স্মৃতি পৃথিবীতে---তাঁর এই পর্যটনতো, পুরাণের ভাষায় বললে, গণেশের সেই মাতৃপ্রদক্ষিণ, যা আসলে কার্তিকের প্রকৃত ভ্রমণটিকে দাবিয়ে রাখার বানানো এক নিপুন কথার ফাঁদ।” ( অমিতাভ দেব চৌধুরী, অসমের বাংলা কবিতা চর্চা, অগ্রবীজ, ৪র্থ বর্ষ,১ম সংখ্যা, পৃঃ২৫১)
             আশ্চর্য এই যে ১৯৪২এ বাংলাদেশে জন্মানো কবি উর্ধ্বেন্দুর কবিতাতে কোত্থাও কোনো স্মৃতি মেদুরতা নেই। লিখছেন, “ এখানে অনেক কিছু পাব বলে আমি এই প্রথম-ঊষার শিরোদেশে/ কত পিছুটান ছেড়ে, স্মৃতির বিষাদ ভুলে,কতবার এসেছি যে ছুটে!--/ এখানে অরণ্য ছায়ে, মেঘমৌলি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে,অন্য এক জীবনের ডাক আমাকে ঘিরেছে কত, আমাকে শুনিয়ে গেছে কত শত প্রত্যাশার গান---”  এটি খড়কুটো কবিতার ৯ নম্বর স্তবক। এতেই আছে, ৩ নম্বর স্তবকে সুরমা নদীর কথা, “ ‘ এই নদীটির নাম কী করে সুরমা হলো ভাবি’---এই বলে/ নাবাল প্রান্তর হতে হিমে ভেজা এক ফালি তৃণের সলিতা তুলে নিয়ে/ আনমনে মুছে দিল প্রগাড় সুরমার টান;...” এই একই কবিতাতে স্তবকের পর স্তবকে তিনি নির্মাণ করছেন, অসমের আর সব নদী লুইত, মধুমতী, ভরলির গাঁথা। বাংলাদেশ তাঁর কবিতাতে এসছে যখন           “ রূপসী বাংলার বুকে পরোয়ানা হয়ে গ্যাছে জারিঃ/ মানুষের অধিকারে বেঁচে থাকা চলবে না আর---/......এখন ওপারে চলছে বোঝাপড়া, মুক্তি আর দাসত্বের মাঝে।--- সোনালী সূর্যের দীপ্তি ম্লান করে ওড়ে জয়-বাংলার পতাকা/... বিস্মিত শতাব্দী মূক, ইতিহাস ত্রস্ত, শুনে অশ্রুত এ বিপ্লব- কাহিনি।”  ( এখন ওপারে জ্বলছে) । লক্ষ্য করুন ‘রূপসী বাংলা’র থেকে তিনি যেন সজ্ঞানেই পশ্চিম ভাগটি ছেঁটে দিয়েছেন। এই পশ্চিমভাগের নির্মাণেইতো আর পুরো পশ্চিমটি নেই, সে মূলত নগর ‘কলকাতা’। অজস্রবার এসছে এই নগর তাঁর কবিতাতে , কিন্তু এক প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিপক্ষ রূপে যে কিনা অসম তথা পূর্বোত্তরের বাঙালি ভূবনের সমস্ত স্বপ্নকে ব্যর্থ করার, কিনে নেবার ফাঁদ পেতেছে। “রানুদি ও সাতটি কৃতঘ্ন বছর” কবিতাটিতে রাণুদি এসছিল কলকাতাতে পায়ের নিচে মাটি পাবে বলে। “ সময়ের ছকবাঁধা ঘোরে রানুদির জীবন-ঘড়িতে—তারই সাথে পার্ক-স্ট্রিট, ডালহৌসি,বিডন-স্কোয়ার/ ট্যুশন, চাকরি আর ঘরে ফেরা নিয়ে ব্যস্ত রানুদির সমস্ত সময়/ তারপর রাত্তির নামে হিজিবিজি ছোপ এঁকে কলকাতার মুখেঃ রানুদি চঞ্চল হয় অসতর্ক মুহূর্তে, কখনো---/হোজাইয়ের বাড়ির কথা, মা-বোন-ভায়ের মুখ অস্পষ্ট ভাসে, ঘুমন্ত স্মৃতির দোরে হানা দ্যায় হিসেবি বাতাস...” কবিতাটি একটি গল্প। এমন অজস্র গল্প তিনি কবিতাতে লিখেছেন। এবং ছোট গল্পের মতোই শেষের দিকে তার মোচড়টি থাকে। একটা কেরানির চাকরি জুটিয়েছিল রানুদি।সেখানে অফিসার শূর তাকে স্বপ্ন দেখালো আই এ পাশ করতে সে আরো উঁচুতে উঠতে পারত। রাতের কলেজে পড়ে গ্র্যাজুয়েট হলো রানুদি। এবারে অফিসার শূরের প্রস্তাব “ হয় কলকাতা ছাড়ো, নতুবা পটের বিবি হও... কিন্তু অসমের বোকা মেয়েটি নিতান্ত মূঢ়তায় / পি শূরকে জুতো মেরে হঠাৎ-ই ইস্তফা দিল কেরানি-জীবনে।” তারপর যা হলো, রানুদি হিসেব করতে বসে “কোথায় হারালো তার সাত-সাতটি কৃতঘ্ন বছর!---” হিসেব মেলেনা, যদি মিলত “ শেষ হতো রানুদির নিরন্তর অন্বেষণ তবে---”
         তাঁর কাব্য ভাষাতে কলকাতার থেকে তিনি সমস্তটাই নিয়েছেন, সেখানে কোনো দ্বিধা দ্বন্দ্ব নেই। গুয়াহাটির ‘নাইন্থ কলাম’ সম্প্রতি তাঁর ‘নির্বাচিত কবিতা’ ছেপে বের করেছে। সেখানে ভূমিকাতে বাসব রায় সঠিক ভাবেই চিহ্নিত করেছেন তাঁর  কবিতা তৎসম শব্দবহুল, এবং এর জন্যের বাসব রায়ের মনে হয়েছে, হয়তো এজন্যেই একালে বহুপঠিত নন তিনি। কিন্তু এও স্বীকার করেছেন তাঁকে না পড়লে কবিতা প্রেমীরই ক্ষতি। হয়েছে এই যে বাংলা সাহিত্যের তথাকথিত পঞ্চপ্রধানের  এবং তাঁর সময়ের সুনীল, শক্তিদের   যা কিছু সম্বল তাঁর কাছে নেবার মনে হয়েছিল তিনি নিয়েছেন, আয়ত্ত করেছেন। কারণ তা নইলে শুরুতেই তাঁকে এই অভিযোগের মুখে পড়তে হতো যে তিনি ‘স্বপ্নের কলকাতা’র বাংলা সাহিত্যের কোনো খবরই রাখেন না, অথবা মান বাংলা ভাষার উপর সেরকম দখল তাঁর নেই। কারণ এর পরে তিনি যে কাজটা করবেন, তাতে এমন অভিযোগের মুখে তাঁকে পড়তে হতোই। এই সমস্যাটা তাঁর পূর্বসুরী দুই কবি অমলেন্দু গুহ বা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কবিতাই বলে দেয়, তাদের হবার ছিল না। তাঁর এই কাজটি হলো, আগেই বললাম, কলকাতা তাঁর কবিতাতে শুরু থেকেই একটা প্রতিপক্ষ। এরই সঙ্গে সম্পর্কিত তিনি কলকাতার এই প্রতিজন কবিকে প্রধান কবিকে যেন পুণর্নিমাণের করছেন। যেমন ‘এই দীর্ঘ চলে যাওয়া’ কবিতার পংক্তিগুলো। ‘বনলতা সেনে’র সেই হাজার বছর ধরে পথ হাঁটার কথাগুলো স্মরণ করুন। উর্ধ্বেন্দু লিখছেন, “...এমনি সামূদ্র স্বন হয়তো উচ্ছ্রিত হত/ মালয়, পারস্য, কিম্বা মিশরের শ্বেত উপকূলে,/ হয়তো এমনই মেঘ মালিনীর তন্দ্রাহর ডাকে/ হাজারো অর্ণবপোত বাণিজ্যবায়ুর টানে/ ভেসে  যেতে, পাড়ি দিত একদা অকূলে।--...” এর খানিকটা পরেই আছে, “ দেখেছি দিনান্তে স্নিগ্ধ ,প্রণতি মূদ্রায় স্থির, সন্ধ্যাপ্রদীপ হাতে যে বধুটি মাগে রোজই স্বামীর অক্ষয় পরমায়ু,/অথবা কল্যাণ যাচে যে নারীটির প্রিয়জন, সন্তান ও সন্ততির তরে,/রজনী প্রভাত না হতেই /কীর্ণ হাহাকারে তার কেঁপে    বসন্তের চকিত বাতাস,--/স্তিমিত কুসুম যায় মুহূর্তে ঝরে।--...” এর পাশে বনলতা সেন দাঁড়ায় কী করে আর কোনখানে?  তাই বলে কি নিতান্তই সাংসারিক ভার শূন্য প্রেমের কবিতা তিনি লেখেন নি? খুব লিখেছেন।  “ যেমন মৃত্তিকা ছেনে শিল্পীর তন্ময় হাত গড়ে তোলে মানস প্রতিমা,/ যেমন পুরুষ স্পর্শ অনুস্বরে ভেঙ্গে দেয় কিশোরীর  বেলোয়ারি ঘুম---/... যেমন খরার শেষে অমোঘ বৃষ্টির ঠোঁট নেমে আসে পাহাড়ের পাণ্ডূর ললাটে,/তরল তৃষ্ণার তোড়ে বেসামাল ছুটে আসে টিরাপের পারভাঙা ঢেউ/...তেমনি তোমার বুকেঃ অনশ্বর অই দুটি বুক,--/  স্বেদ ও শ্রোণিতে আর্দ্র স্তন-ওষ্ঠ-বাহুমূল,/ শ্রোণিযুগে থরো-থরো হিমগলা সূর্যের প্রপাত--/......যশোধরা, তুমিও যে অনুক্ষণ আমাকে ভেঙ্গেছ--/ অনুবিশ্ব আমাকে গড়েছ!...” এবারে এই ‘যশোধরা’টি , আগে যেমন লিখেছি তাঁর প্রেয়সীই না স্বদেশ, স্বপ্রদেশ—এই প্রশ্নতো সংগত কারণেই ওঠে।
তাঁর একটি কবিতা আছে, শুধু কবিতার জন্য নামেই প্রকাশ কাকে নিয়ে পড়েছেন তিনি। তিনিও লিখেছেন, “শুধু কবিতার জন্য বেঁচে থাকা চলতে পারে শতেক জীবন” কিন্তু তার পরেই যখন লেখেন, “  কবিতার জন্যে মায়ের হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে, প্রেমিকার পদতলে/ দেওয়া যেতে পারে উপহার।---তখন তার মানেটাই অন্য দাঁড়ায়। সুনীলের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতা পুনর্নিমাণ হচ্ছে এই ভাবে, “...আর আমি, মুহুর্মুহু ভাষা –ধর্ম-প্রজাতির বেজন্মা ঘূর্ণির চোরাটানে/ তেত্রিশ বছর আজ ছিন্নমূল, বিপর্যস্ত, ধ্বস্ত, বানভাসি।---”। কবিতার নাম ‘ক্ষমা নেই’ এর শুরুটাই এরকম ‘কবি-ভবনের পোষা কাকাতুয়া, তুমিও কি শেষে/ পরবশ্যতার মানে নিপাতনে আমাক শেখাবে?—আমিতো আজন্ম রুদ্ধ, পদাহত,মূক, পরাধীন...”    
   
 বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কিছু প্রবাদপ্রতীম বাক্যকে তিনি তুলে নিয়েছেন তাঁর কিছু কবিতার নামে যেমন ‘কেউ কেউ কবি’ বা ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছো?”  ‘কেউ কেউ কবি’তে তিনি প্রশ্ন তুলছেন “তুমি তো স্বয়মাগতা,-- তবুও তোমাকে কোনো চড়াদর স্বৈরিণী ভেবে/ কালপুরুষের চোখে ফুটে ওঠে মৃত্যুর অমোঘ ইশারা!/...” দীর্ঘ কবিতার একেবারে শেষে লিখছেন, “যখন কবিতা, তুমি বালিয়াড়ি ভেঙ্গে             ভেঙ্গে ,স্মৃতির অতীতে দাও পাড়ি ,তখন একাকী আমি জেগে রই, নাক্ষত্রিক বোধের ভিতর।--/ সকলেই কবি নয়। মেধার অলকে বেঁধে হৃয়ের সংহত শর/ আমি তো কবিতা লিখিঃ তাই বলে আমিও কি কবি?----”  আমাদের আনখশির কাঁপিয়ে তুলে এই শেষ অতি সরল বাক্যটি। সত্যিই কি এই প্রশ্নের জবার দেবার কোনো যোগ্যতা রয়েছে ‘স্বপ্নের কলকাতা’ নির্ভর বাংলা কবিতাবিশ্বের? আমরা এই ‘কবিতাবিশ্বে’র ব্যবহারটি  সচেতনভাবেই এখানে করছি।  আমাদের স্বপক্ষে রয়েছে তাঁর ‘কালাপাহাড়’ কবিতাটি। অন্য যেকোনোভাবেই কবিতাটি পড়া যেতে পারে। কিন্তু যখন লেখেন, “আমি একাধিকবার পারিপার্শিক পৃথিবীর হাতে/ গভীরভাবে নিগৃহীত হয়ে, তোমার কাছে ছুটে গিয়েছি...” আর ‘তুমি অবলীলায় গভীরতর অন্ধকারে তলিয়ে নিয়েছ!” তখন আমাদের শুরুতেই এই কলকাতা বা পশ্চিমবাংলা ছাড়া আর কারো  কথাই মনে পড়ে না সেখানে তিনি যেন সমস্ত পূর্বোত্তরের হয়ে ‘নন্দন প্রস্থানে’র প্রথম বাক্যটি উচ্চারণ করে আজ থেকে চার দশক আগেই লিখছেন, “ আজ উত্তর পঁচিশের নিস্তরঙ্গ জীবন বৃত্তে  দাঁড়িয়ে, আমি/ আমার চৈতন্যের বিশাল বোধিদ্রুমের মূলে/ নিষ্ঠুর   কুঠার হানবঃ খান খান ভেঙ্গে ফেলব,তোমার চোখে দেখা আমার  ক্রীতদাস সত্তাকে;...” অবশ্যি, এই ‘তোমার চোখ’কে ‘বিলেতের চোখ’ বলে ভাবতেও অসুবিধে কিছু নেই। কিন্তু সত্যিকি কিছু তফাৎ রয়েছে এই দুইএতে ? দুটোই কি অস্ত সূর্যের পশ্চিমা চোখ নয়, সামনে যার এখন ‘তমসা’ কেবল? যাদের চোখে আমাদের মুখচ্ছবি ভেসে উঠে না কিছুতেই। ভালোবাসাবাসির কথা হবে কী করে? অতি সম্প্রতি রণজিৎ দাশের একটি কবিতা পড়লাম। ‘বোধি’ ‘অগ্রবীজ’ কাগজে । জলপাইগুড়ি বা পুরুলিয়ার ‘তিনজন হার্ড-কোর কলকাতা বিদ্বেষি কবি বন্ধুর সঙ্গে’ কোনো এক মফস্বল শহরে আড্ডা দেবার গল্প শুনিয়ে রণজিৎ শেষে লিখলেন, “ শুদ্ধতম রাম-এর আসরে , মফসসল শহরের নিঃসীম নৈরাশ্যময় অন্ধকারে/ বুক ভরে শ্বাস নিতে চাই, আকাশের তারা দেখতে চাই।” আপনাদের জানা থাকতে পারে এই রণজিৎ কিন্তু শিলচরে জাতক, চার দশক ধরে কলকাতা প্রবাসী। উচ্চারণ কি তাই কোথাও মিলে যাচ্ছে? ‘মফসসল’ শব্দটি কলকাতার নির্মাণ। ঊর্ধ্বেন্দুর শহর ডিব্রুগড়কে অসমে কেউ ‘মফসসল’ বলে অপমান করে না। একটি মাত্র নগরকে কেন্দ্র করে সমস্ত উচ্ছ্বাস আর উল্লাসে মেতে উঠার প্রদেশও নয় অসম।  তাই তাঁকে ‘হার্ড-কোর কলকাতা বিদ্বেষি’ বলেও চিহ্নিত করা যাবে না। কবিতাটির শেষে ঊর্ধ্বেন্দুর ধ্রুপদী নাগরিক উচ্চারণ,  “আমার অমিত-প্রেমের উৎসে বসে,তোমাকে এবার, আমি অনন্ত-তৃষার বিলোল মৃগ-তৃষ্ণিকার গান শোনাব। ...” আমরা বুঝতে পারছি এই সব সারকামট্যান্সিয়েল এ্যাভিডেন্সে কাজ বেশিদূর এগুবে না, আমাদের এবার সরাসরি এ্যাভিডেন্স চাই। 
     তাঁর ‘জাহাজডুবির পূর্ব সংকেত’এর বেশি সোচ্চারে আর কোন কবিতাই বা নিজেকে ‘এ্যাভিডেন্স’ বলে দাঁড় করাতে পারে? যদিও রয়েছে আরো অনেক। “নিজের ত্রিসীমানা ছাড়ালেই বাঁশবন, পচা ডোবা, টিম টিম কেরোসিন আলো,/ অনন্ত ডুবোমাঠে উপুড় আকাশ, ঝিঁঝিঁ, রাতভোর শেয়ালের প্রহর –ঘোষণা;--/ উলুঝুলু কবি, তুমি ভুলেও কখনো যেন কলকাতা ছেড়ো না।...” এর পর এক দীর্ঘ ‘নেই’র তালিকা আছে, আমরা কিছু কিছু তুলে দিচ্ছি, “ ওখানে টিউব নেই.....বইমেলা, থিয়েটার, ফিল্মক্লাবও নেই, কুলীন কাগজ নেই,... কফিভবনের ভিড়ে তুখোড় দাদারা নেই, স্তাবক চামচারা নেই,...দালাল প্রতিভা নেই,...ফরেইন মিশন নেই,...শহিদ মিনার নেই, ফিচারের মজা নেই,...মাস্তানি-বিপ্লব নেই, মহান পুলিশ নেই, শৈল্পিক নির্লিপ্তি নেই, বিশুদ্ধ পাতাল নেই... যশোকামী কবি, তুমি ভেবে দেখো মফসসলে কত কিছু নেই।...ওখানে বাঙালি যারা, নিতান্ত ছাগল—কেউই বাংলা জানে না; এই কলকাতা হতে/ নেহাত কাগজ পত্র কিছু রোজই উড়ে গিয়ে এখনো ওদের মোটামুটি মানুষ রেখেছে; /পদ্যের ব্যাপারে ওরা নির্ঘাত পিছিয়ে আছে একশ বছর, আর / অমন রবীন্দ্রনাথ, তেনাকেও মিনিমাম তিনজোড়া লাথির ঘায়ে যারা অনায়াসে/ ধুলোয় লুটালো,--- ঘোর মধ্যরাতে কলকাতা শাসন করে, রমণী দমন করে, যারা/ শুধু কবিতার জন্য ভুবন পেরিয়ে এসে, শিল্পকে পেঁদিয়ে করল তুরুপের তাস—সেসব বিশ্রুত কীর্তি, তুলকালাম প্রতিভার নাম এরা স্বপ্নেও শোনেনি।.../ এসব জেনে ও বুঝে, হুঁশিয়ার কবি, তুমি ভুলেও কখনো কলকাতা ছেড়ো না;--/ কলকাতার কবি মানে রাজকবি, জমিদার---তামাম মফসসলে ছড়ানো রয়েছে এনাদের /হাজারো মহাল.../সম্প্রতি মহালে বেশ হামলা চলছে, দ্রুত অসন্তোষ বাড়ছে নির্বিরোধ প্রজাদেরও মনেঃ/ কাগুজে বাঘের খুব উপদ্রব; কয়েকটি চাইছে অটোনমি, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীভবন।--/ এইসব দুর্বিনীত,বিচ্ছিন্নতাকামীদের পিছনে নির্ঘাত আছে বিদেশি শক্তির উস্কানি...” ইত্যাদি, ইত্যাদি এবং ইত্যাদি।
      
            তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসটি মার্ক্সবাদে। তাঁর অগ্রজ কবি অমলেন্দুর একটি কবিতা আছে ‘কমরেড গাঙুলি’। সেখানে এই বাঙালি কমরেডটি সেই ‘স্বপ্নের কলকাতা’ থেকে অবতার পুরুষের মতো পা দেবেন অসমের মাটিতে। “কালভোরে  পৌঁছুবেন প্রতিনিধি কমরেড গাঙুলি/ একটি দুরন্ত ট্রেনে রাতের কুয়াশা চিরে চিরে চিরে/ নাহরের ডালে ডালে আধফোটা কচি কুঁড়িগুলি /মনে হয়  ফুটবে অচিরে/...” রেললাইনের মতো এমন সরল রৈখিক বৈপ্লবিক রোমান্টিকতাও নেই র্ধ্বেন্দু দাশের কবিতাতে। ‘কমরেড গাঙ্গুলিকে’ই যেন তিনি উল্টো প্রত্যয় থেকে  বলেন, “ ট্র্যাফিক –আইল্যান্ড-জোড়া নিয়ন-স্রোতের তোড়ে জলপরী সাজার এমন নিপাট  সাধ!...এখন তোমার মুখে মাও-সে-তুঙ/ ঘোর বেমানান।--/ সীমান্তের চাল-পাচার—জলের সমান দামে শিশুক্রয়—মূদ্রাস্ফীতি—পে কমিটি—কৃত্রিম অভাব---/ সাত্বিক সংগ্রামী নেতা  জে-পির বিশ্রুত কীর্তিঃ কালোবাজারির দেশে গান্ধীবাদী বিপ্লব ঘোষণা...।” কবিতার নাম ‘নিজস্ব শব্দের বৃত্তে’। একে ঠিক দুই কবির দুই দলীয় বিশ্বাস বলে ভেবে লাভ নেই। এটি হয়তো সত্য। কিন্তু অমলেন্দু যখন লিখছেন তখন কমিউনিষ্ট পার্টি একটাই। উর্ধ্বেন্দু যখন লিখছেন, তখন সি পি আই (এম এল) দলটিও বহুধা বিভক্ত। এই দুই কবিতা পাশাপাশি পড়লে বরং স্পষ্ট হয়, পশ্চিমের অস্ত সূর্য বিপ্লবী মনেও কেমন ‘তমসা’ ছড়ায়, উদয়ের সূর্যের জন্যেও সে এই পথেই তাকিয়ে থাকে, আর আহ্বান জানায়, “দ্রুততম হোক ট্রেন, বায়ুবেগে কাটুক প্রহর, এসো চলে কমরেড গাঙুলি!”    সেই গাঙুলির দিকেই তাকিয়ে উর্ধ্বেন্দুর উচ্চারণ, যেন বা, “ তুমুল চিৎকার তুলে বলতে চাইঃ নিয়ে যাও যা কিছু দিয়েছো।” ‘কলকাতা ৭১’এ এই উচ্চারণতো আরো বেশিই স্পষ্ট, “চৈতন্যের উদীচিতে সূর্য ডোবে কলকাতা, তোমার--/ ত্রিতাপ শান্তির জল ঝরাও আপন চিতানলে” এ ঠিক কোনো সংকীর্ণতা নয়, বোজাইতো যাচ্ছে এই ‘কলকাতা’ কোনো নগর মাত্র নয়, ঔপনিবেশিকতার নির্মিত প্রতিমূর্তি সে।  এও কোনো  কবিতার প্রশ্ন নয় যে এভাবে তিনি  কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধিতে গিয়ে পৌঁছুতে পেরেছিলেন কিনা এতো হবারই নয়, যতদিন সেই চিকুরে কপৌ গুঁজে দেবার মরমীয়া সখির সঙ্গে দেখা তাঁর হয়ে উঠবে না। তাঁকেও তো শুনতে হয়েছে,  “নকশাল বন্ধুর শেষ ঝাঁঝালো বয়েৎটুকু ---‘শালা, তুই দালাল হবিনে।” ( ধুলো) কিন্তু যে প্রশ্নে তিনি নিরন্তর সতর্ক থেকেছেন তা হলো, “আলটপকা হাওয়া এসে তুমুল কাঁপিয়ে তোলে একজীবনের ভিত, আরোপিত সমস্ত নির্মাণ।--”(ঐ)  আর তাই রুশ তাত্বিক ঝধানভ থেকে শুরু করে কলকাতার সরোজ দত্তেরা যে  নন্দন তত্ব্ব গড়ে তুলে শিল্পীর পিঠে চাবুক চালাচ্ছিলেন, সে চাবুকের ছিলা ধরে ফেলে তাঁর উন্নত বুক উচ্চারণ, “ বিচ্ছিন্নতা কাকে বলে? শিল্প কি কখনো ঠিক জীবনের আঁচ থেকে /জলের উচ্ছ্বাস কিম্বা মাটির অমোঘ টান থেকে/ আদৌ বিচ্ছিন্ন রাখতে পেরেছে নিজেকে?---/ দেখো,-- ধান্দাবাজ কিছু ঘোড়েল মানুষ চেরা-তুলির আঁচড়ে, কোনোদিন/তোমারই বুকের ’পরে লিখে দিলঃ এ কবিকে চিনে রাখো এই লোকটা পলাতক শব্দের জনক।’ অতএব কবি,  তুমি এই দেশের মানুষ-মাটি-নিসর্গের বুক থেকে একান্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে?---/ বিচ্ছিন্নতা এতোই সহজ?” ( সমূদ্র জেনে গ্যাছে)

        ঊর্ধ্বেন্দু দাকে যে কবিতা দুটোর জন্যে পূর্বোত্তরের এবং তার বাইরের বাংলাকবিতা বিশ্ব  একডাকে চেনে, সেগুলোর কথা আমরা বলিইনি। তার একটি ‘জার্নালঃ ১৯৮০’; লিখেছিলেন যখন 'মেঘালয়-মণিপুর-অসমের ত্রস্ত জনপদ’ গুলো জ্বলতে শুরু করেছিল। আর অন্যটি ‘সাকিন আসাম,১৯৮৩’; লিখেছিলেন যখন নেলি গোহপুরে সেই রক্তধুয়া দিনগুলোতে, “ আশি বছরের পোড়া রূপের দেমাক নিয়ে শুয়ে আছে আমার নানিমা,/.../ রক্তাক্ত পাঁকে দেখো মুখ গুঁজে পড়ে আছে আমার হানিফ চাচা’ বলে কাঁদতে কাঁদতে ঊর্ধ্বেন্দুর দুই চোখ থেকে রক্ত ঝরছে, অথচ তৃতীয় নয়ন দেখছে, “হাজার বছর ধরে যদিও এপথ দিয়ে শোনা গ্যাছে/ কল্লোলিত জীবনের গান।”
     ঊর্ধ্বেন্দুর নিজের কল্লোলিত জীবনের গানকে শোনা অবশ্যই যায়, আরো নানা ভাবে নানা দিক থেকে। আমরা তার কোনো একটি দিকে অবগাহন করে নিজের স্নানটা  সেরে নিলাম মাত্র। তাতে এই বোধতো জাগেই যে, তিনি আমাদের মহাকবি। তাঁকে আমাদের পড়তে হবে আরো বহুবহু দিন, যতদিন আমাদেরো ‘ঘরের ঠিকানা’তে পৌঁছুনো না হয়। আর ‘কলকাতা’র দিকে তাকিয়ে সগৌরবে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে জাগে, তোমাদের কি আছেন কবি জীবনানন্দ দাশ? তা বেশ! তিনি আমাদেরো বাড়ি গেছেন।  ঘুরছেন,ফিরছেন,  আলাপ জমিয়েছেন।  সেখানে আছেন আমাদের    কবি শ্রী  ঊর্ধ্বেন্দু দা!   
  
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~০০০০০~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

( ঊর্ধ্বেন্দু দাশের কবিতা গ্রন্থ পেতে আগ্রহীরা যোগাযোগ করতে পারেনঃ





Tuesday, 1 November 2011

।।রোমান হরফে বাংলা লেখার পুরাকথা । ।



(লেখাটি 'প্রজ্ঞান' নবম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ২০১১তে বেরিয়েছিল। এছাড়াই দৈনিক সংবাদ লহরির রবিবাসর পত্রিকারে ১৭ মার্চ, ২০১৩ থেকে পর পর ছ'টি সখ্যাতে ধারাবাহিক বেরোয়।) 


চিনা - জাপানিরা যা পারে আমরা না পারব কেন ?


              ‘এখন কম্পিউটারের যুগ । সুতরাং ইংরেজি নইলে চলবে না’ –এই কুসংস্কারের শুরু দুই দশক আগে । নব্বুইর দশকে । নতুন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনই বলুন আর দুষ্কৃতীই বলুন এটি এসছে বিশ্বায়নের হাত ধরেবিশ্বায়ন, কেবল টিভি, মোবাইল, ইণ্টারনেট এবং ইংরেজি ভাষাকে যেন এক সূত্রে গাঁথা হলো নতুন করে। শব্দগুলোর নতুন চিহ্নায়িত হয়ে গেল বিজ্ঞান, আধুনিকতা এবং আভিজাত্য। বিশ শতকের প্রায় পুরোটাই বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা তাঁর কালের আরো লেখক বুদ্ধিজীবিদের ইংরেজিতে লিখে বড়লোক হবার দুস্বপ্নের গল্প পড়ে হাসতে হাসতে আমরা যারা মানুষ হয়েছিলাম, শতাব্দী পার করতে না করতেই সেই আমরাই আমাদের ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পাঠালাম সেই ইংরেজি মাধ্যমেরই স্কুলগুলোতেই।
         বিজ্ঞান আর আধুনিকতাটা আড়ম্বর মাত্র, আঁতের কথাটা হলো আভিজাত্য। আর আভিজাত্যের সঙ্গে দিনবদলের কোনো সংযোগ নেই। পরিবর্তনের রথের চাকাকে ততটাই সে এগুতে দেয় যতটা তার আভিজাত্যের সঙ্গে মানায় ভালো । এর বেশি তার কোনো কৌতুহল নেই, নেই কোনো সংশয়। তার উপর দেশটা যদি হয় দেবতা মানা আধা সামন্তবাদী ভারতবর্ষ তবেতো আর কোনো কথাই নেই। সেই কম্পিউটারে ইংরেজি ভাষাতে রাশি বিচার করা হয় বিজ্ঞাপন দিলেও হুমড়ি খেয়ে পড়বার লোকের অভাব হয় নি কোনো কালে, হবেও না অচিরে। কেউ এই সামান্য প্রশ্নটাও করবে না যে, আচ্ছা! পৃথিবী গ্রহটা আমাদের ভাগ্যে ভালো মন্দ কোনো প্রভাব ফেলে না কেন? এর কোনো প্রতিকার-বিকার কিছু নেই কেন? কিম্বা নিদেন পক্ষে এই প্রশ্নটাও নয় যে জ্যোতিষশাস্ত্র কি আকাশে রাহু কেতুর সন্ধান নিতে কোনো গ্রহটহ পাঠালো আকাশে, যে ঐ বিধঘুটে রাহুকেতুর কীর্তিকলাপের খবর নিতে কম্পিউটারের দ্বারস্থ হতে হবে! অথচ বিজ্ঞানের গোড়ার কথাটাই হলো কৌতুহল।
          সম্প্রতি জাপান ঘুরে এলেন অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের তরুণ অধ্যাপক হিমাদ্রি শেখর দাস। এসেই দৈনিক যুগশঙ্খে এক দারুণ ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন, 'জাপান যাত্রার ডায়েরি' লেখাটা বিশুদ্ধ বাংলা ভাষাতে বাংলা হরফে ইন্টারনেটে তাঁর ব্লগেও আছে। দেখুনঃhttp://himsekhar.blogspot.com তাতে লিখেছেন,এখানে আসার পর থেকে ভাষা নিয়ে একটা সমস্যা ছিল । জাপানের খুব কম মানুষই ইংরেজি বুঝতে পারেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ভাষা আমাদের কাছে আবেগ বিনিময়ের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাড়ায়নি ইশারায় উভয় পক্ষই জেনে গেছি নিজেদের বক্তব্যের বিষয় বা প্রয়োজনীয়তার কথা । রাস্তায় হোক কিংবা ট্রেনেই হোক যখনই প্রয়োজন পড়েছে সাহায্যের জন্য সবাই প্রস্তুত । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও সেই অর্থে ইংরেজিতে দক্ষ নয় ওদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম জাপানে সবকাজই জাপানী ভাষাতেই হয় । পি এচ ডি থিসিসও এর ব্যতিক্রম নয় । নিজ ভাষার প্রতি এতটাই তাদের সম্মান ও ভালবাসা । বিশেষ কোন প্রয়োজন না পড়লে অন্য ভাষা শিখতে তার আগ্রহী হয়ে ওঠেনা । ইউরোপীয় ভাষাচর্চা না করার দরুণ সভ্যতার অগ্রগতির পথযাত্রায় খুব একটা অসুবিধে হয়েছে, দেখে তা মনে হলনাআমরা এমন আরো অজস্র নজির দিয়ে দেখাতে পারি আমাদের ইংরেজি প্রীতিটা আসলে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক প্রভুদের প্রতি চাপা প্রেমের নজিরও বটে। বাকি এর পক্ষে যত্ত সব যুক্তি সবই, এক্কেবারে ফালতু। বিলেতিদের উপনিবেশ ছিল না, এমন যে কোনো দেশেই ইংরেজি যে একটা ভাষা এই সত্যই জানে খুব কম লোকে। ইংরেজির থেকে জনপ্রিয় ইউরোপীয় ভাষা আসলে স্পেনিশ, তাও ঐ উপনিবেশের ফল। আর কিচ্ছু না! চিনা জাপানি লিপি আমাদের থেকে শতগুণে জটিল। কী মনে হয়, হিমাদ্রি যে জাপানিদের কথা লিখলেন তারা কেউ কম্পিউটার ব্যবহার করেন না! আর করলে কি সেখানে জাপানি চলে না! টিভির বাণিজ্য সংবাদে , বিশেষ করে বিবিসি বা সিএনএন যে কেউ জাপানের ষ্টক মার্কেটের কাজকর্মের ছবি দেখে নিলেই জবাব স্পষ্ট পেয়ে যাবেন। সেই একই ছবি দেখা যাবে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হতে চলা চিন দেশেও। চিনা-জাপানিরা যা পারে আমরা না পারব কেন?
     
      সেই হীনমন্যতার বিরুদ্ধেই এই লেখা। কী করে বাংলা লিখতে পড়তে হয় কম্পিউটারে তা নয়, আপাতত আমরা চাইব যারা নেটে রোমান হরফে বাংলা লেখার অভ্যেস ধরে রেখেছেন তাদের আধুনিকতার ভ্রান্তিটাকে ধরিয়ে দেয়া। আজ যখন ইউনিকোড এসে গেছে,নেটে বাংলা লিখবার জন্যে অভ্রের মতো এতো সুন্দর ব্যবহার বান্ধব কীবোর্ড রয়েছে, রয়েছে অজস্র বাংলা ফন্ট, যখন জি-মেইল, ফেসবুক নিজেই আপনি বাংলাতে লিখবার মতো ব্যবস্থা করে দিয়েছে, যখন ফায়ারফক্সের মতো বহুভাষিক ব্রাউজার এসে গেছে,যখন অপেরা ব্যবহার করে মোবাইলেও বাংলা লিখতে পারেন, যখন উবুণ্টু লিনাক্স, মাইক্রোসফট সেভেনে আপনি পুরো কম্পিউটারকেই বাংলাতে সাজিয়ে নিতে পারেন, যখন কম্পিউটারের আপনার সৃষ্টিশীল লেখাগুলো লিখতে পারেন, সম্পাদনা করতে পারেন, প্রকাশ করে দূরদেশের পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন, এমন কি আপনার পড়ার টেবিল থেকেও ভালো আস্তানাতে তাকে সংরক্ষিত করতে পারেন নেটে/ ব্লগে, তখনও যারা রোমান হরফের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন তাদের রোমান হরফ প্রীতির বিরুদ্ধে, তাদের আভিজাত্যসুলভ অজ্ঞতার বিরুদ্ধে বর্তমান নিবন্ধ।

যথাপ্রাপ্ত অবস্থার কাছে যারা দাসত্ব করতে চান নিঃ
          পোর্তুগীজ পাদ্রি মনোএল দ্য আসসুম্পসাউর কৃপার শাস্ত্রের অর্থ ভেদ(Crepar Xaxtrer Orth, Bhed)আধুনিক বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য গ্রন্থ। লিখেছিলেন ১৭৩৫এ। ঐ একই সময়ে তিনি (১৭৩৪-৪২) আরো একটি বই লেখেন - ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেনগল্লা, ই পোর্তুগিজঃ দিভিদিদো এম দুয়াস পার্তেসদুটো বইই ১৭৪৩এ পোর্তুগালের রাজধানী থেকে ছেপে বেরোয়। বাংলা ভাষাতে এ দুটিই প্রথম ছাপা বই। এবং দ্বিতীয়টি বাংলা ভাষাচিন্তারও প্রথম বই। বাংলাভাষা নিয়ে আমরা নিজেরা এর আগে বৌদ্ধিক প্রয়াসের চিহ্নই রাখিনি । আজকের পরিচিত মান বাংলাভাষাতে লেখা নয় বইদুটো । বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার অদূরে বর্তমানে গাজীপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত, তৎকালীন ভাওয়াল পরগণার বাংলা ভাষার উপর ভিত্তি করেই মনোএল লিখেছিলেন এদুটো বই। কিন্তু লিখবার জন্যে যে হরফের ব্যবহার করেছিলেন , সেটি বাংলা ছিল না। ছিল রোমান। তাঁর কাছে রোমানে লেখাটা ছিল এক বাধ্যবাধকতা । কারণ ছাপা বইয়ের জন্যে উপযোগী যে প্রায়োগিক হরফের দরকার ছিল সেটি কী হবে, কেমন হবে-- তা স্থির করতে আমাদের অপেক্ষা করত হয়েছিল আরো চার দশক। ১৭৭৮ সালে প্রকাশিত ইংরেজিতে লেখা নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডেরA Grammar of the Bengal Language’ বইতেই বাংলা হরফ প্রথম ব্যবহৃত হয়। চার্লস উইলকিন্সনস এবং তার সহকারী পঞ্চানন কর্মকার গুটেনবার্গের উদ্ভাবিত মূদ্রণ প্রযুক্তিটিকে বাংলার উপযোগী করে তুলেন এবং প্রথমবারের মত প্রয়োগসম্ভব করেন। ধাতুর ব্লকে ঢালাই করা একই আকৃতি একই হরফের জন্য একাধিক পাতাতে ব্যবহার করা যায় বলে বাংলা ছাপা হরফে একটা স্থায়ী, বৈষম্যহীন রূপ এসেছিল।
           হ্যালহাডের বইয়ের নামটা দেখুন Bengaliনয় কিন্তু, ‘Bengal Language’এই সেদিন অব্দি সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, মুহম্মদ শহীদুল্লার মতো বিশাল মাপের ভাষা ব্যক্তিত্বরাও বাংলাকথাটা ব্যবহার করতেন না, লিখতেন বাঙ্গালা আমরা যাকে বাংলা ভাষা এবং লিপি বলে আজকাল জানি তার ইতিবৃত্ত বহু প্রাচীন হলেও এর নাম বাংলাছিল না, আর সবাই লিখবার বেলা ঐ এক হরফ ব্যবহার করতেন না। জায়গায় জায়গায় ঐ লিপির বৈচিত্র যেমন ছিল, তেমনি আরবি, সিলেটি নাগরি,মায়ানমারের মন-খেমের ইত্যাদি লিপিতেও বাংলা লেখা হতো। পঞ্চানন কর্মকারেরা যে ব্রাহ্মি-কুটিল হয়ে আসা যে লিপিটিকে ছাপা বইতে তুলে ধরেন সেটিই ক্রমে বিকশিত হয়ে আজকের বাংলা হরফ বা বর্ণমালার চেহারা নিয়েছে বা নিচ্ছে ।
            হ্যালহেডের বইতে বাংলা হরফের প্রয়োগ হলেও তার ব্যাপক প্রচলন হতে লেগেছিল আরো শিকি শতাব্দি। তাঁরা শুরু করেছিলেন মাত্র । পঞ্চানন কর্মকার কোনো পূর্বনজির ছাড়াই যেটুকু কাজ করেছিলেন তা ছিল প্রশংসনীয়। কিন্তু সম্ভবত তিনি বা উইল্কিন্সন প্রযুক্তিটাকে ভালো বুঝতেন না । তাই এর পরের শিকি শতাব্দী এমন কি বিখ্যাত শ্রীরামপুর মিশনের শুরুর দিনগুলোতেও বাংলা বইপত্তর ছাপা হতো রোমান হরফে । কেউ কেউ এই রোমান হরফকেই একটা স্থায়ী রূপ দেবার প্রয়াস তখন থেকেই করছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা এবং তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের জনক স্যর উইলিয়াম জোনস ১৭৮৮তে একবার এরকম প্রস্তাব দিয়েছিলেন। চার্লস ট্রিবিল্যান, পার্শ্ব, টামাস প্রমুখ অনেক সাহেব তাঁর সমর্থণে তখন দাঁড়িয়েওছিলেন । কিন্তু পাশাপাশি অন্যদের হাতে তখন আজকের বাংলা হরফের বিকাশের কাজও চলছিল।তখন অব্দি বাংলা হরফে যে পরিবর্তনগুলো এসছিল সেগুলো ছিল মূলত এরকমঃ হরফটি ছিল দুরকমই -এর পেটে দাগ কেটে এবং নিচে বিন্দু দিয়ে । নিচে বিন্দু দেয়া অর্থাৎ এর আগে অসমিয়া এবং মৈথেলীতে অন্তস্থ-ৱ লিখতে ব্যবহৃত হতো। পেটকাটা ব অর্থাৎ ৰ এখন অসমিয়াতে প্রচলিত হলেও বাংলায় আর নেই।
     
        এখনকার বাংলা বেশ কিছু হরফের নীচে ফুটকি বা বিন্দু দেয়া হয়। এই ফুটকিগুলো সে যুগে প্রচলিত ছিল না । র-কে পেটকাটা ব দিয়ে নির্দেশ করা হয়। য়-এর নিচে কোন বিন্দু ছিল না; এটি শব্দে অবস্থানভেদে অন্যরকম করে উচ্চারিত হত। আবার ড় এবং ঢ়-এরও কোন অস্তিত্ব ছিল না। ড এবং ঢ শব্দের মাঝে বসলে ড় এবং ঢ়-এর মতো উচ্চারিত হত। ত+উ ব্যঞ্জন-স্বর সমবায়টি 'ত্ত' দিয়ে প্রকাশ করা হত। আজও কোন কোন আধুনিক বাংলা যুক্তাক্ষরে, যেমন স+ত+উ = স্তু (যেমন- বস্তু) এবং ন+ত+উ = ন্তু (যেমন- কিন্তু) --- এই দুইটি যুক্তাক্ষরের ত+উ অংশে এর ফসিল দেখতে পাওয়া যায়। তখন যে কয়টি বাংলা বই ছাপা হয়েছিল সেগুলোতে বইয়ের একটি পাতা প্রথমে হাতে লেখা হত। তারপর সেই পুরো পাতার একটি প্রতিলিপি কাঠে বা ধাতুতে খোদাই করে নেওয়া হত। শেষে এই কাঠ বা ধাতুর ফলকে কালি লাগিয়ে একই পাতার অনেক কপি ছাপানো হত। একই লোকের হাতের লেখাতে যে বৈচিত্র্য থাকতে পারে, সেগুলো ঐ ছাপাতে আর শুধরানো যেত না। (http://bn.wikipedia.org/wiki/বাংলাহরফ)
           শ্রীরামপুর মিশন থেকে আঠারো শতকে তিনখানা মাত্র আইনের বইয়ের সংবাদ মেলে যেগুলো বাংলা হরফে ছাপা হয়েছিল। ১৮০০তে বাইবেলের অনুবাদ দিয়ে বাংলা হরফে বই ছাপার ইতিহাসের শুরু । ততদিনে পঞ্চানন কর্মকারকেও সেখানে চাকরি দিয়ে বহাল করেছেন উইলিয়াম কেরি । পঞ্চানন কর্মকার বেশিদিন জীবিত ছিলেননা । ১৮০৪এ তিনি মারা গেলে তাঁর কাজকে এগিয়ে নিয়ে গেছিলেন তাঁর মেয়ের জামাই মনোহর মিস্ত্রি, ও মনোহরের ছেলে কৃষ্ণচন্দ্র মিস্ত্রি । বাঙালির লেখা প্রথম বাংলা হরফে ছাপা বই রামরাম বসুর প্রতাপাদিত্যচরিত্র। শ্রীরামপুর মিশনের প্রয়াসগুলোর সমকালেই খুব শীঘ্রই আরো অনেকে অনেকে বাংলা প্রকাশনার জগতে চলে আসেন। আমরা রাজা রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের বই পত্রিকার জগতে আত্মপ্রকাশের কথাগুলো জানি। এরা ছাড়াও ছিলেন আরো অনেকে । ততদিনে মুদ্রণযন্ত্রের সঙ্গে ঢালাই করা বাংলা হরফও বাজারে এসে গেছে । এবং এগুলোর মধ্যে বাজারের টানেই একটা সামঞ্জস্যও আসতে শুরু করে । তখন যে পরিবর্তনগুলো হয় তার মধ্যে অন্যতম ছিলঃ অনুস্বরের নিচের দাগটি ছিল না। ছিল কেবল গোল চিহ্নটি । ব্যঞ্জনের খাড়া দাগের সাথে য-ফলা মিলে বাঁকিয়ে কমলার কোয়ার মত একটা চেহারা ছিল। এগুলি আজও কখনো কখনো দেখতে পাওয়া যায় অনেকটা স্য-তে যেমন। কিন্তু এখানে নিচে জুড়ে যায়নি । তখন নিচের দিকে জুড়ে যেত।
                   'তু' যুক্তাক্ষরটি বর্তমান চেহারা পায়। অর্থাৎ ত-এর নিচে ু বসিয়ে। স্থ (স+থ) যুক্তবর্ণটি হ্যালহেডের সময়ে, অর্থাৎ ১৮শ শতকে স-এর নিচে পরিষ্কার থ লিখে দেখানো হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে এটি স-এর নিচে ছোট হ-এর মত অক্ষর বসিয়ে নির্দেশ করা হয়। হ্যালহেড এমন অনেক যুক্তাক্ষরেই পরের ব্যঞ্জনকে অক্ষত রেখেছিলেন। সেগুলো আর না থাকাতে যুক্তাক্ষরগুলো অস্বচ্ছ রূপ ধারণ করে। এখনও এই অস্বচ্ছ রূপই ব্যবহার করা হয় । এরকম আরও বহু যুক্তাক্ষরের অস্বচ্ছ রূপ ১৯শ শতকের শুরুর এই পর্বে নির্দিষ্ট হয়ে যায়
           পেট কাটা ব অর্থাৎ ৰ এই সময় বাংলা বর্ণমালা থেকে বিদেয় নেয়। ১৮শ শতকের মাঝামাঝিতে এই পর্বের শেষে এসে বর্তমান নিচে বিন্দু দেয়া রূপটিই সর্বত্র চালু হয়ে যায় । (ঐ) এর পরের বাংলা গদ্যের বিকাশের ইতিবৃত্তটা আমরা মোটামোটি সবাই জানি যারাই টুকটাক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ঘাটিয়েছি। বাংলা গদ্যের বা সাহিত্যের বিকাশের ইতিহাসে ছাপা যন্ত্রের ভূমিকার কথাটাও আমরা পড়েছি কিন্তু যেটি কম জানি তাহলো, আড়ালে আবডালে থেকে ছাপা যন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা হরফ তথা বর্ণমালার বিকাশের কঠিন জটিল ইতিবৃত্তের কথা। ভাষাটাকে ভালোবেসে যারা তাকে ছাপা বইতে প্রকাশের যোগ্য করে তুলবার শ্রম স্বীকার করেছিলেন তাদের ত্যাগ আর তিতিক্ষার কথা । ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ের কথা আমরা সব্বাই জানি, অনেকে ছেলেবেলা ঐ বই থেকেই বাংলা বর্ণমালা শিখেছি। কিন্তু যেটি জানি না, তা এই যে বর্ণপরিচয়ের লেখক বিশুদ্ধ অধ্যাপক বিদ্যাসাগর নন। সংস্কৃত কলেজের চাকরি ছেড়ে জীবিকার জন্যে তিনি এক ছাপাখানা খুলেছিলেন। মূলত সেখানেই তাঁর বর্ণমালা সংক্রান্ত ভাবনাগুলো বিকশিত হয়। সংস্কৃতের এই অধ্যাপকের উদ্দেশ্য ছিল সংস্কৃতের অধীনতার থেকে বাংলাকে মুক্ত করা । তিনি যে বদলগুলো নিয়ে আসেন সেগুলো ছিল এরকমঃ নিচে ফুটকি দিয়ে নতুন "য়" বর্ণটি ব্যবহারের প্রস্তাব করেছিলেন। একইভাবে ড ও ঢ-এর নীচে ফুটকি দিয়ে ড় ও ঢ় হরফ দুইটির প্রচলন করেছিলেন। এর আগে এগুলো বাংলাবর্ণমালাতে ছিল না । তিনি বাদ দিয়েছিলেন, দীর্ঘ-ৠ ও দীর্ঘ-ৡ বর্ণটিরও ব্যবহার না থাকলেও কেন যে তিনি রেখে দিলেন সেটি স্পষ্ট নয়। এছাড়া সংস্কৃত স্বরবর্ণমালার অন্তর্গত অনুস্বার (ং), বিসর্গ (ঃ), এবং চন্দ্রবিন্দু (ঁ) যেহেতু প্রকৃতপক্ষে ব্যঞ্জনবর্ণ সেহেতু বিদ্যাসাগর এই বর্ণগুলিকে ব্যঞ্জনবর্ণমালার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু এগুলোর স্বতন্ত্র ব্যবহার নেই বলে আজ অব্দি কোনো বাংলা অভিধানই বিদ্যাসাগরপ্রণীত এই বর্ণক্রমটি গ্রহণ করেনি।
           
  বিদ্যাসাগর ণ-ন এবং শ-ষ-স-এর মধ্যে উচ্চারণের সমতা সম্ভবত লক্ষ্য করলেও এর কোন সংস্কার করেন নি। বাংলা হরফের স্বচ্ছতা ও সমতা নিয়ে আসার জন্যও তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি য-ফলাকে ব্যাঞ্জনের সাথে জুড়ে দিয়ে কমলার কোয়ার মতো না লিখে আলাদা করে লেখার ধারা চালু করেন। ফলে সর্বত্র য-ফলার আকার একই রূপ পেয়ে গেল। ঋ-কার ব্যঞ্জনের নিচে নানান চেহারাতে বসত। বিদ্যসাগরই প্রথম ব্যঞ্জনের নিচে পরিস্কারভাবে ৃ চিহ্নটি বসিয়ে লেখা চালু করেন। একইভাবে হ্রস্ব-উ কারের জন্য ু লেখা চালু করেন।
            কিন্তু বিদ্যাসাগরের সংস্কারগুলি সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। অনেকগুলি অস্বচ্ছ যুক্তব্যঞ্জনের চিহ্ন অস্বচ্ছই থেকে গিয়েছিল। যেমন - তু ত-এর নিচে উ-কার দিয়ে লেখা হলেও ন্তু, স্তু যুক্তাক্ষরগুলিতে পুরনো অস্বচ্ছ রূপটিই থেকে গেল। ছাপাখানাতে ইংরেজি ধাতুঢালাই হরফগুলো একটি ডালায় দুই খোপে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সাজানো থাকত। কিন্তু বাংলায় এ নিয়ে তেমন কোন চিন্তা হয় নি । বিদ্যাসাগরই প্রথম বাংলা হরফের জন্য ডালার একটি নকশা এবং কোন হরফের পর কোন হরফ বসবে তার নিয়ম স্থির করে দেন। তাঁর এই নকশাই ক্রমে সমস্ত হরফ ব্যবহারকারী বাংলা ছাপাখানাতে গৃহীত হয়। বাংলা মুদ্রণশিল্পে প্রতিষ্ঠিত হয় সমতা ।
            বিদ্যাসাগর বাংলা মুদ্রণশিল্পকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। মূলত তার বেঁধে দেয়া নিয়মনীতি অনুসারেই পরবর্তী একশো বছর, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাংলা হরফ মুদ্রিত হয়। সময়ের সাথে বিদ্যাসাগরীয় হরফের সামান্য কিছু পরিমার্জনের চেষ্টাও করা হয়েছে । বিদ্যাসাগর নিজে বর্ণপরিচয়-এর ৬০তম সংস্করণ থেকে শব্দের শেষে অন্তর্নিহিত ও উচ্চারণযুক্ত ব্যঞ্জন, যেমন- 'বিগত', 'কত' শব্দের শেষের ত-টা, যেন ৎ-এর মত উচ্চারণ না হয়, সেজন্য এগুলোর উপর তারাচিহ্ন দেয়া প্রবর্তন করেন। বিশ শতকে অনেক লেখক একই কাজে ঊর্ধ্বকমা (') ব্যবহার করেছেন,রবীন্দ্ররচনাবলীর জন্যে এই নীতি নির্ধারিত হয়েছিল। প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশ একে লিখেছেন ইলেক চিহ্ন । যেমন- একশ', ইত্যাদি। তবে এই সংস্কারটিও সর্বজনগৃহীত হয়নি । ( ঐ)
            আমরা বানান নিয়ে খুবই স্পর্শকাতর অনেক সময়। কিন্তু এই ভাবনা সাধারণত কারো মাথাতেই আসে না যে বানানের কিম্বা বর্ণমালার শুদ্ধি/ অশুদ্ধি কোনোটাই নিয়ন্ত্রণের দায়ভার কোনো মাষ্টারমশাইর হাতে নেইতো বটেই। নেই কোনো একক ভাষাতাত্বিকেরও হাতে । থাকলে সুনীতি চট্টপাধ্যায়েরা যেমন লিখতেন বাঙ্গালাআমরাও তাই লিখতাম। কিন্তু আমরা লিখি বাংলা’ –রবীন্দ্রনাথ এটা শুরু করেছিলেন। এবং রবীন্দ্রনাথের লিপি তথা বানান সংস্কার ভাবনার সঙ্গে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আন্দোলনের যেমন একটা ভূমিকা ছিল তেমনি ছিল বিশ্বভারতী যখন তাঁর রচনাবলী ছাপার স্বত্ব পায় তখন তাদেরকেও এক বানান নীতি দাঁড় করাতে হয়। সেই নীতিই ক্রমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এবং বাংলাদেশ বাংলা একাডেমীকেও বানান তথা বর্ণমালা বিধি তৈরিতে প্রভাবিত করে।কিন্তু এই প্রতিটি সংস্কার প্রয়াসের পেছনে রয়েছে ছাপাযন্ত্রের বিবর্তনের চাপা পড়া ইতিকথা আনন্দবাজার পত্রিকাকেও আমরা যে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলা লিপি এবং বানান রীতিকে শাসন করতে দেখি তা এরই জন্যে । যথাপ্রাপ্ত অবস্থার কাছে যারা দাসত্ব করতে চান নি বা পারেন নি তাদের সৃজনী হাতেই এগিয়ে গেছে বাংলা লিপি, বর্ণমালা, বানান রীতি এবং ভাষা । যারা হতাশ হয়েছেন তাঁরা রোমান হরফে ফিরে যেতে চেয়েছেন; দাসত্ব যারা করে গেছেন তাদের হাতেই হয়েছে ভাষাটির যত বিড়ম্বনা। সেই দাসত্বের সবটা নয় কেবল যন্ত্রের কাছে । সাম্রায্যবাদী এবং উগ্রজাতীয়তাবাদী স্বার্থও এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ।

দাসত্বের ডাকে , যারা হতাশ হয়েছেন তাঁরা রোমান হরফে ফিরে যেতে চেয়েছে ন
         বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়যখন বাংলাদেশের পাঠশালাগুলোকে শাসন করছে, বঙ্কিম যখন বঙ্গদর্শনেসজোরে বাঙালিকে তার ইতিহাস লিখতে উদ্বুদ্ধ করছেন তখন আবার ঐ রোমান হরফকে ফিরিয়ে আনাবার এক প্রয়াস শুরু হয়েছিল দেশজুড়ে। নেতৃত্বে অবশ্যই সাম্রাজ্যের স্বার্থরক্ষক বিলেতিরা । সম্প্রতি হুমায়ুন আজাদ তাঁর দুখণ্ডের বিশাল সংকলন বাংলা ভাষাতে উনিশ শতকের এক অজ্ঞাতনামা লেখকের লেখা উদ্ধার করেছেন। বাঙ্গালা বর্ণমালা সংস্কার লেখকের নাম না জানাটা বাংলা ভাষাতত্বের ইতিহাসে এক দারুণ ক্ষতি । কবেকার লেখক-- সেই তথ্যেরও কোনো সন্ধান দেননি হুমায়ুন আজাদ। তবে ১৮৬৪র আগে নয়, কেননা তখনকার Asiatic society Journal থেকে নেয়া ঋণ স্বীকারোক্তি আছে প্রবন্ধের শেষে। এই লেখকের বাংলা বর্ণ সংস্কারে তাঁর অনেক প্রস্তাব পরের সময়ে গৃহীত হয়েছে, আবার অনেকগুলো হয়ও নি। যেমন তিনি লিখেছিলেন, ছাড়া আর সব স্বরবর্ণগুলো তুলে দিয়ে তাদের -কার চিহ্নগুলো রেখে দিতে। অর্থাৎ া,ি,,,,,,,,ৌ এইও চিহ্নগুলো থাকবে আ,, ঈ ইত্যাদি নয়। এখন পড়তে গিয়ে আমাদের হাসি পাবে । কিন্তু তিনি তখন বাংলা হরফ উঠিয়ে দিয়ে রোমান প্রচলনের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন এটা আমাদের মনে রাখতে হবে । তাঁর সেই প্রবন্ধেই দেশজুড়া সেই রোমান বলবৎ করবার সাহেবী প্রয়াসের সংবাদ আছে সেদিক থেকে তাঁকে বাংলাভাষা এবং লিপির স্বার্থে প্রথম লড়াকুর সম্মান দেয়া যেতেই পারে । সুতরাং বাংলাতে যে হরফ সংখ্যা কমিয়ে এনে জটিলতা কমানো যেতেই পারে এটি তাঁকে দেখাতে হয়েছিল। হুমায়ুন আজাদ তাঁর প্রবন্ধ সম্পর্কে লিখেছেন, “একজন দক্ষ মূদ্রাকরের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান প্রকাশ পেয়েছে প্রবন্ধটিতে।সংস্কার প্রস্তাব সম্পর্কে ভদ্রলোক লিখেছেন, “আমাদের বর্ণমালা সংস্কারের প্রধান উদ্দেশ্য মুদ্রাঙ্কনের সৌলভ্যসাধন। অর্থাৎ ভাষার উচ্চারণের কোনো হানি না হয় অথচ মুদ্রাঙ্কনের সৌলভ্য হয় ইহাই আমাদের অভিপ্রেত।
          তিনি শুরুতেই দুটো প্রচলিত প্রবাদের উল্লেখ করেছেন। শুনলে হাসি পায় বটে । কিন্তু বাংলা হরফ নিয়ে বাস্তব সমস্যার দিকেও চোখ টেনে নিয়েও যায়। প্রথমটি হচ্ছে, “দধীতিকার রঘুনাথ শিরোমণি যখন গুরু মহাশয়ের পাঠশালায়, , খ শিখিতে আরম্ভ করেন তখন গুরু মহাশয়ের শ্রীমুখ হইতে সমুদয় ব্যঞ্জণবর্ণের একবার উচ্চারণ শ্রবণ করিবামাত্র রঘুনাথ বর্ণমালার সংস্কারে প্রবৃত্ত হইলেন। বলিয়া উঠিলেন হ্যাঁগো, দুটা দুটা তিনটা রাখিবার প্রয়োজন কি?” দ্বিতীয়টি, “ বঙ্গদেশীয় কোন কলেজের প্রিন্সিপাল সাহেব একদিন কলেজের পন্ডিতকে স্বীয় কামরায় ডাকাইয়া বলিলেন ওএল পণ্ডিট টোমাডের বর্ণমালার টৃটীয় এবং চটুর্ঠ বর্গের কিছু ভিন্নটা ডেকাইটে পার? আমি ট অনেক পরিশ্রম করিয়া ডেকিয়াছি ডুইরই একরূপ উচ্চারণ।
          রঘুনাথ শিরোমনির মতো প্রশ্ন পরেও অনেক বিদগ্ধজনেরা করেছেন । কিন্তু জন্মেই, আর কোনো ভাষাতাত্বিক জ্ঞান ছাড়া কেউ মালার থেকে বর্ণ ছিঁড়ে ফেলবার প্রস্তাব দিলে কতটা গ্রহণ করা যাবে সেই প্রশ্নে আপাতত আমাদের আগ্রহ নেই। কিন্তু সাহেব প্রিন্সিপাল যদি বাংলা ধ্বনি তথা বর্ণের সংস্কারের প্রস্তাব দেন তবে কী বিপত্তি হতে পারে আমরা আঁচ করতেই পারি । রোমান হরফে বাংলা তথা ভারতীয় ভাষাগুলো লেখার প্রস্তাবের একটা বড় কারণই ছিল-- এতে বিদেশিদের বাংলা শিখতে সহজ হবে। চাকরি পেতে কিম্বা পদোন্নতির জন্যে সাহেবদের এ দেশের ভাষাতে পরীক্ষা দিতে হতো । সেই স্বার্থেই অধ্যাপক ড্রু নামে এক সাহেব রোমান লিপির প্রস্তাব দেন । রোমান হরফের পক্ষে অধ্যাপক ড্রু সাহেবের প্রথম যুক্তিটি যা ছিল,তা আজো অনেকে দেন-- রোমান বর্ণামালার অক্ষর অতি অল্প। এবং সবগুলোই আলাদা আলাদা । সংযুক্ত বর্ণ নেই। ঊর্দুর মতো এতো বিন্দুও নেই। এতে ইউরোপের এতো এতো ভাষা লেখা হচ্ছে । ভারতীয় ভাষাই যাবে না কেন? দ্বিতীয় যুক্তি হচ্ছে, রোমান হরফে ছাপার খরচ কম পড়ে । সুতরাং এতে ভারতীয় বই ছেপে জ্ঞানের প্রচার প্রসার সহজ হবে । তাছাড়া অশিক্ষিত অল্পশিক্ষিত মুদ্রকেরা ভারতীয় হরফগুলোর বৈচিত্রের জন্যে একের জায়গায় অন্য বসিয়ে বিড়ম্বনার এক শেষ করে । তৃতীয় যুক্তিটি হলো, আদালতে সেসব হস্তলিপি চলে তাকে বলে ভাঙ্গা বা সিকস্তা। সেগুলো এতো কদর্য যে অন্য কেউ পড়তেই পারেনা । হাকিম দূরে থাক মুহুরিরাও পড়তে পায় না । ফলে অনেক অবিচার হয়ে থাকে । রোমান হরফে সেসব অসুবিধে হবে না । চতুর্থ যুক্তি হচ্ছে, বৈজ্ঞানিক পরিভাষাগুলো যদি রোমান হরফে রোমান নামে না থেকে অনুবাদ হয়ে যায় তবে মূল পদার্থজ্ঞান তলিয়ে যাবে। রোমান হরফে ওষুধের নাম লেখা থাকলে কম্পাউণ্ডারদের বড় সুবিধে হয়। পঞ্চম যুক্তিটি একেবারে মোক্ষম। ভাষাবিদেরা ঠিক করেছেন রোমান বর্ণমালা প্রাচ্য বর্ণমালার সগোত্র তথা একই বংশজাত । সুতরাং রোমান বর্ণমালাতে প্রাচ্যভাষাগুলো লেখা হলে ভাষার বিশুদ্ধতা মার যাবে না কিছুতেই ।বোঝাই যাচ্ছে এতে সেই শতাব্দি প্রাচীন উইলিয়াম জোনসের ভূত ভর করেছে
            অধ্যাপক ড্রুর প্রস্তাবগুলোও নতুন ছিলনা কিছুতেই। আমরা আগেই লিখেছি স্যর উইলিয়াম জোনসের কথা । কিন্তু তখন বাংলা হরফে ছাপার কাজ শুরুই করা যায়নি । অঙ্কুর মেলছিল মাত্র । তবু জোনসদের সেই প্রয়াস ব্যর্থ করে দেয় শ্রীরামপুর মিশন এবং পরবর্তী উদ্যোগগুলো।যদিও জোনসের সেই যুগান্তকারী আবিষ্কার যে, সংস্কৃত এবং লাতিন সহ ইউরোপীয় ভাষাগুলো এক মূল উৎস থেকে এসছে-- আধুনিক তুলনামূলক ভাষাতত্বের দ্বার খুলে দেয়, সেই সঙ্গে কিন্তু বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত করে ফেলবার এক হুজুগে উদ্যোগও শুরু করিয়ে দেয়। এবং সেটি হয়েছিল উইলিয়াম কেরির হাত ধরেই। সেই হুজুগ থেমেছিল এসে রবীন্দ্রনাথ, সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ে। সে যাই হোক, কিন্তু ড্রু সাহেবের উদ্যোগ এক শতাব্দি পরে গোটা দেশেই তখন আবার নতুন করে বেশ সাড়া ফেলেছিল। পাঞ্জাবে উর্দূ ভাষাতে এটি ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। লাহোরে রোমান উর্দুনামে একটি সংগঠনও শুরু হয়েছিল এবং তাঁরা একখানা মাসিক কাগজও শুরু করেছিলেন।
           অধ্যাপক ড্রুর পক্ষে কলম ধরেছিলেন জর্জ কাম্বেল নামে এক ভদ্রলোক। তাঁর যুক্তিগুলো দারুণ ছিল। সমস্ত দুর্বলতা জেনেও এক্কেবারে গায়ের জোরে চাপাতে চাইছিলেন তিনি । লিখছিলেন, “ প্রায়ই ভাষার উচ্চারণ অনুসারে তদীয় বর্ণমালার প্রবৃত্তি হইয়াছে। প্রত্যেক ভাষার উচ্চারণ ভিন্নপ্রকার, সুতরাং ইহা দৃষ্ট হয় যে, এক ভাষার বর্ণমালা অপর ভাষায় ব্যবহার করিলে একপ্রকার অসামঞ্জস্য উৎপন্ন হয়। ইহার উদাহরণ-ইংরেজি ভাষায় রোমান বর্ণমালার ব্যবহার। ইংরেজি উচ্চারণের সহিত বর্ণবিন্যাসের কিছু মাত্র সম্বন্ধ নাই(পৃঃ৬১২,অজ্ঞাতনাম; বাংলা ভাষা ১ম খন্ড, সম্পাঃ হুমায়ুন আজাদ।) একেবারেই সেই বার্নার্ডশের উচ্চারণ। বার্নার্ডশ বুঝি একবার লিখেছিলেন, In English you can as well write the word “fish’ as GHOTI; take the pronunciation of ‘gh’ from ‘cough’, ‘o’ from the word ‘women’ and ‘ti’ from the word ‘nation’” কিন্তু তারপরেও সেই বর্ণমালাই ভারতীয় ভাষাগুলোর জন্যে ব্যবহার করবার পরামর্শ দিতে চান জর্জ কাম্বলে। কেন ? কারণটি একেবারেই স্পষ্ট । ভাষাগুলোর প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই, “ যতদিন ভাষার রূপ শুদ্ধ থাকে, ততদিন তাহাদিগকে নিজ নিজ বর্ণমালা দ্বারা প্রকাশ করা উচিত, কিন্তু এক্ষণে ভারতবর্ষে যে সকল ভাষা প্রচলিত, তাহাদের মধ্যে একটিরও রূপ বিশুদ্ধ নাই। এখনকার বাঙ্গালা ভাষায় শতকরা ৫টা হিন্দি, দশটা ঊর্দ্দূ এবং পঞ্চাশটা ইংরেজি কথা ব্যবহৃত হয়; হিন্দি, ঊর্দ্দূ প্রভৃতি অপরাপর ভাষারও এইরূপ খিচুড়ী হইয়াছেএরূপ স্থলে ইহাদের সকলের নিমিত্ত একটী রোমান বর্ণমালা ব্যবহার করা অনুচিত নহে।( পৃঃ ৬১৩;ঐ)
           নামোল্লেখ না করে আরো এক সাহেবের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে এরকম , “...এক্ষণে সামান্য কেরাণী বাবুর স্ত্রী তাঁহার স্বামীকে বলেন, “এখন কি অফিস যাবার টাইম হয় নি?” ইহাতে অনুমান হইতেছে যে যেরূপ আঙ্গলোসাকসন (Anglo-Saxon) ভাষা নরম্যান (Norman ) ভাষার সহিত মিলিত হইয়া ইংরেজি ভাষায় পরিণত হইয়াছে , ক্রমশঃ এদেশী ভাষা সকলের পরিণামও সেইরূপ হইবে। এমন স্থলে রোমান বর্ণমালা ব্যবহারের যে উৎকৃষ্ট ফল, তাহা বলা বাহুল্য।এতো স্পষ্ট ইংরেজি উগ্রজাতীয়তাবাদ এবং আগ্রাসন ধান্ধা । শেষপর্যন্ত উৎকৃষ্ট ফলটি হলো সমস্ত ভারতীয় ভাষার অস্তিত্ব বিলোপ, যেমনটি তারা করতে সফল হয়েছিল আমেরিকা অষ্ট্রেলিয়ায়। এক ব্যক্তিতো আরো এগিয়ে গেছেন। স্পষ্টই স্বপ্ন দেখছেন যে এদেশে বিলেতি শাসন পাকা হচ্ছে, এবং আমাদের উচিত রাজার ভাষা এবং হরফ অনুরসরণ করে সেই শাসনের অনুগত হওয়া, “ যাঁহারা রোমান বর্ণমালা ব্যবহারের প্রতিবাদ করেন, তাঁহাদের যুক্তিসকল সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। তাঁহারা বলেন, সপ্ততি বা ততোধিক বর্ণমালার পরিবর্ত্তে একটি পঠনোপযোগী বর্ণমালা সংস্থাপন করা সম্ভাবিত নহে। কিন্তু এতাদৃশ বর্ণমালার অভাবে তাঁহারা অনেকস্থলে ইংরেজির ব্যবহার করেন, যাহার তাৎপর্য্য সুস্পষ্ট অক্ষরে লিখিত দেশী ভাষায় প্রকাশ করিলে নিঃসন্দেহে অনেক উপযোগী হইত। প্রতিবাদীরা বলেন, কতকগুলি ইউরোপীয়দিগের সুবিধার নিমিত্ত ভারতবর্ষের চিরসমাদৃত বর্ণমালাস্থলে রোমান বর্ণমালার ব্যবহার উচিত নহে। সত্য,...এ পর্যন্ত তিনি যুক্তিতে টিকছেন না । নিজেই লিখছেন দেশী ভাষায় প্রকাশ করিলে...উপযোগী হইত।কিন্তু এর পরেই সেই মোক্ষম যুক্তি, “... বিবেচনা কর ইউরোপীয়েরা যখন ভারতবর্ষ শাসন করিতেছেন, তখন তাঁহাদের যে অত্রত্য প্রচলিত এবং অপ্রচলিত ভাষা সমূহে ব্যুৎপত্তি লাভ করা উচিত, এ বিষয়ে বোধহয় কাহারও দ্বিধা নাই। এবং এই প্রতিজ্ঞা সিদ্ধ হইলে ইহার অনুমান স্বরূপ ইহাও স্থির বুঝিতে হইবে যে, যাহাতে ইউরোপীয়গণ সহজে ভারতবর্ষীয় ভাষা সকল অভ্যাস করিতে পারেন, প্রত্যেক হিতৈষী ব্যক্তির তাদৃশ উপায় উদ্ভাবন করা উচিত।শুধু ভাষাই নয়, ভারতীয় ধর্মসংস্কৃতির প্রতি প্রবল ঘৃণা থেকেও যে এমন অদ্ভূৎ প্রস্তাব এসছিল তাও গোপন ছিল না। এক সাহেব লিখছেন, “ আমরা ফারসী তুর্কী প্রভৃতি যে সকল মুসলমান রাজ্যের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করি, সেই সকল স্থানের লোকদিগকে অসভ্য, অশিক্ষিত, নিরুৎসাহী, দুর্ব্বল এবং ধর্মনীতিশূন্য দেখিতে পাই। অর্থাৎ খৃষ্টানদিগের সহিত তুলনা করিলে মুসলমানেরা অনেক হীন বলিয়া বোধ হয়। খৃষ্টানদিগের মধ্যে যে এতাদৃশ সভ্যতাদির উন্নতি হইয়াছে ইহার কারণ কেবল মুদ্রাযন্ত্র যে পর্যন্ত মুসলমানদিগের মধ্যে মুদ্রাযন্ত্র প্রচলিত না হইবে, ততদিন তাহাদের উন্নতিও হইবে না; আর রোমান অক্ষরের ব্যবহার ব্যতীত মুদ্রাযন্ত্রের প্রচলিত হওয়া না হওয়া তুল্য।বাংলাতে এদের প্রচার তেমন আমল না পেলেও পাঞ্জাবে বুঝি তা ‘‘ ...দুর্ভিক্ষ বা এপিডেমিকের ন্যায় দেখিতে দেখিতে দেশময় বিস্তৃত হইয়া পড়ে।(পৃঃ৬১৪, অজ্ঞাতনাম) আর সত্যি তাই, ‘রোমান ঊর্দুনামের সেই সভাটির অস্তিত্ব আজ এই একুশ শতকেও রয়েছে বহাল তবিয়তে। এবং দিনে দিনে এর স্বাস্থ্য বাড়ছে বই কমছে না ।
           তাই প্রতিবাদটাও পাঞ্জাবেই ব্যাপক হয়েছিল। লাহোর গভর্ণমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ ড লাইটনার এবং আরো দুএকজন ইংরেজই এর বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। কিছু উর্দু লেখকও ছিলেন প্রতিবাদকারীদের মধ্যে কিন্তু আপাতত আমরা তাঁদের কথা তুলব না । কারণ সেখানে উর্দু ভাষা প্রসঙ্গ টেনে লেখাকে দীর্ঘ করে যেতে হবে, নতুবা কিছু বোঝানো যাবে না। লাইটনার মোটেও মানেন নি যে ভারতীয় বর্ণমালার থেকে রোমান বর্ণমালা শেখা এবং পড়া খুব সহজ হবে । তিনি বিলেতিদের ফরাসী সহ অন্যান্য ভাষা শিক্ষার প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তুলেছেন, “ কয়জন ইংরেজ রীতিমত শিক্ষকের নিকট অধ্যয়ন না করিয়া কেবল পুস্তক পাঠ করিয়া সেই সকল ভাষার বুৎপত্তি লাভ করিয়াছেন?” সুতরাং অধ্যাপক ড্রুর সৌলভ্যের যুক্তি ধোপে টেকে না, একদিককার সাশ্রয় অন্যদিকে চলে যাবে। ভারতীয় ভাষা এবং বর্ণমালার প্রতি ভারতীয়দের ভালোবাসার জন্যেও তারা তা ছাড়তে রাজি হবেন না, আর তিনি নিজেও মনে করেন,দেশীয় লোকেরা স্বদেশ প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতিকে অনেক উৎকৃষ্ট বোধ করেন, বাস্তবিকও তাহা উৎকৃষ্ট।তাঁর মতে রোমান হরফে ভারতীয় ভাষাগুলোকে প্রকাশ করা যাবে না । যদি যেতেই হয় তবে নতুন কতকগুলো বিশেষ সংকেত সংযোগকরতে হবে । আর তা করলে সেই বর্ণমালা আর পরিচিত রোমান বর্ণমালা থাকবে না । রোমান হরফে এমন কি ইংরেজি পড়াটাও খুব সহজ নয়। বহুকালের অভ্যাসের ফলেই শুধু ইংরেজরা নিজেদের ভাষা শুদ্ধ করে পড়তে পারেন। নতুবা light কে তারা নির্ঘাৎ লাইঘটপড়তেন। যে অভ্যেসের ফলে তারা লাইটপড়েন, “ সেইরূপ অভ্যাস করিলে তাঁহারা সিকস্তা পাঠ করিতেও সমর্থ হইবেন।দেশীয়রা রোমান হরফে শুধু একটাই কারণে আগ্রহ দেখাতে পারে বলে তিনি মনে করেন, “ইহাদ্বারা ইংরেজী লেখা সহজ হইয়া যাইবেআর ইংরেজী শিখলে কেরানি হওয়া সহজ হয়ে যায়, “কেননা দেশীলোকেরা কেবল চাকরী পাইবার প্রত্যাশায় স্কুলে বা কলেজে শিখিতে প্রবিষ্ট হয়।কিন্তু তিনি আবার মনে করেন তখনি কেরানির সংখ্যা এতো বেড়ে গেছে যে সাত আট টাকা মাইনেতে ভালো কেরানি পাওয়া যায়, এদের সংখ্যা আরো বাড়ানো মানে শুধু শুধু এই শিক্ষিতদের অসন্তোষ ডেকে আনা। তার মানে আমরা যেটুকু বুঝেছি , তারা লেখাপড়াতো শিখবেন কিন্তু চাকরি পাবেন না। বিলেতিদের ভারতীয় ভাষা শেখা দরকার। তাই বলে পুরো শিক্ষানীতিটাকেই তাদের অনুকুলে ঢেলে সাজানোটা কাঙ্খিত হতে পারে না । দেশের পরাধীনতার মানেটাও তিনি বুঝতেন। প্রশাসক যেমন ইচ্ছে আইন করতে পারেন, “এখানকার লোক নির্বাক। রাজপ্রদর্শিত শিক্ষা পদ্ধতি সম্পূর্ণ অনুপযোগী হইলেও ইহারা তাহার প্রতিকূল একটী কথা কহিতে পারে না ।সাহেবের ইচ্ছেতে এদেশের হরফ পাল্টাবার প্রস্তাবের সঙ্গের ক্ষমতার রাজনীতিটাকে এই অধ্যাপক অত্যন্ত সহজ এক উদাহরণ দিয়ে তুলে ধরেছিলেন। কিছু ব্রিটিশ আমলা ঠিক করলেন যে আগে দেশীয় শব্দগুলো রোমান হরফে লিখবার সময় যেখানে যেখানে u’ ব্যবহার করা হতো তা ভুল ছিল, হওয়া উচিত ছিল a’ ব্যস, আর যায় কোথায়! সর্বত্র u’ হটিয়ে a’র প্রয়োগ শুরু হলে । ফলে Mussulman হয়ে দাঁড়ালো Massalman! লাইটনার অবশ্যি একা ছিলেন না, তখনই তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে কলম ধরেছিলেন আরো বেশ কিছু সাহেব বিদ্বজ্জন। এদের মধ্যে ছিলেন রেভারেণ্ড জেমস লঙ, ডফ, পার্সন ইত্যাদি। এদের মধ্যে প্রথম দুজন জীবনের প্রথমটা দীর্ঘদিন রোমান হরফে বাংলা সহ ভারতীয় ভাষাতে কাজ করে করে হতাশ হয়ে নিজেদের মত পাল্টেছিলেন।
          সেই প্রয়াস ওখানে থেমে গেলে ভাববার কিছু ছিলনা। আমাদের যেটি অবাক করে তা, এই যে স্বয়ং ভাষাচার্য সুনীতি চট্টোপাধ্যায় মতো ব্যক্তিত্বও যখন ভাষাতত্বের বাইরে গিয়ে শ্রেণিরাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন তখন এই রোমান হরফের প্রেমে পড়েছিলেন। প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন তিনি তাঁর প্রথম ইংরেজিতে লেখা গবেষণা গ্রন্থ অডিবিএল-এ, তখন অব্দি তাঁর বাংলা লেখালেখির সংখ্যা ছিলনা খুব একটা বেশি। তাঁর যুক্তিটির পেছনেও প্রথম কারণটি ছিল তাঁর জানা একটি সত্য যে বাংলা লিপি আর বাংলা ভাষা এক নয়। আমরা আগেই লিখেছি, পঞ্চানন কর্মকারের আগেও কোনোদিন এক লিপিতে বাংলা লেখা হয় নি। তিনি লিখেছেন, The use of these various characters is a relic of the past, and the prestige of the native alphabet of Bengali has never been seriously assailed. The language has become intimately associated with it, and Bengali speakers, like people everywhere, consider the alphabet as part of their language.” (page 235; ODBL; Rupa & Co;1993) তাঁর প্রস্তাবের দ্বিতীয় কারণটিই ছিল যেমন সমস্ত মধ্যবিত্ত ভেবে থাকেন, While admitting and appreciating all the arguments in favour of the Indian system of writing, I remain a believer in the Roman Script for all Indian Languages, because of the simplicity of the symbols of which is consists, because of its true alphabetical nature is not subordinating the vowels, because of its manifold advantages in teaching, and in printing, and because of its wide use in the civilized world. The Roman alphabet, modified, supplemented and arranged according to the scientific scheme of the Indian one, would be a desideratum for India.” (ঐ) শুরুতে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে রোমান হরফ বৈজ্ঞানিক এবং বিদ্যায়তনিক ব্যবহারের জন্যে থাকবে। অন্তত পরের পঞ্চাশ বছর যে থাকবে এ নিয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। তারপরেও যদি একে ছাড়তেই হয়, তবে, I would strongly advocate the unity of our country in the matter of script through that truly national script of all India—The Deva-nagari, as the next best thing.” (ঐ) এই দেবনাগরীর প্রস্তাব থেকে বোঝা যায় , তিনি গোটা দেশের জাতীয় ঐক্য নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেনএমন চিন্তাতে তিনি একক ছিলেন। হিন্দিকে যারা রাষ্ট্রভাষা করবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন সুনীতি চট্টোপাধ্যায় তাঁদের অন্যতম ছিলেন।যদিও স্বাধীনতার পর তাঁর সেই হিন্দি মোহতে ভাটা পড়ে, হিন্দি উগ্রজাতীয়তাবাদ তাঁকে আশাহত করে ফেলে। বাংলা ভাষা নিয়ে উপমহাদেশে সবচেবেশি রাজনীতি হয়েছে যে দেশে সেই বাংলাদেশের ভাষাবিদ অধ্যাপক মোফাজ্জ্বল হায়দার চৌধুরী লিখেছেন, “ মনে রাখা দরকার যে , ভাষা বা বানান সংস্কার এ সব প্রশ্নে উত্তেজনাকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। এগুলি রাজনৈতিক বিষয় নয়ভাষা বিজ্ঞানের ও কিছুটা সামাজিক অর্থনৈতিক (Sociao-economic) সমস্যা।তখন সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের মতো ভারতীয় ভাষাতত্বের আদিগুরু কেন এই ফাঁদে জড়ালেন ভাবলে আমাদের অবাক হতেই হয়। অথচ তিনি ছিলেন ১৯০৩এ রবীন্দ্রনাথ , রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদআন্দোলনের এক অত্যুজ্ব্বল পরিণাম। যে আন্দোলনের মূল প্রয়াসই ছিল ইংরেজি এবং মূলত সংস্কৃতের দাসত্ব থেকে বাংলাকে মুক্ত এবং স্বাধীন ভাষা হিসেবে দাঁড় করানো। ছাপার সমস্যার উল্লেখ সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ও লিখছেন, কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি যখন লেখেন, because of its manifold advantages in ... the civilized world” তখন বোঝা যায় তিনি সেই তাঁর মধ্যবিত্ত শ্রেণি মোহ থেকে কথাগুলো লিখছেন। অন্যথা তিনি দরকারে বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের প্রস্তাব দিতেন, যেটি তিনি পরে দিয়েও ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বইপত্তর ছাপতে গিয়ে। কারণ যেকোনো লেখার পাঠোদ্ধার এবং , ছাপা যন্ত্রে যেকোনো ভাষার হরফ সজ্জা চিরদিনই একটা সমস্যা ছিল। ইংরেজিতেও। লাইটনার এবং বার্নার্ডশর দেয়া নজির থেকে আমরা তা আগে দেখিয়েওছি ।
          সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের পরামর্শ ভারতে সর্বত্র সরকারি ভাবে গৃহীত হয় নি। বাংলা, হিন্দির মতো বড়ো বড়ো ভাষাতে না হবার বাস্তব কারণ আমরা অনুমান করতে পারি। কিন্তু বহু ছোটছোট, বিশেষ করে জনজাতিদের ভাষাতে তা অনুসৃত হতে আমরা আজো দেখছি হামেশাই। পাঞ্জাবিতে যেমন গুরুমুখি, দেবনাগরি, নাস্তালিক তিনটি লিপিই ব্যবহৃত হয়, তেমনি কোঙ্কনিতেও কণ্ণড়, দেবনাগরির সঙ্গে রোমান লিপিও ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশভাগের পর বাংলাদেশে কিন্তু কেবল ঐ উর্দুর বিরুদ্ধেই লড়তে হয় নি । বাংলাকে উর্দুর মতো পার্শি বা নাস্তালিক লিপিতে লিখবার প্রস্তাবতো ছিলই, সেরকম অভ্যেসও ছিল কারো কারো কয়েক শতাব্দীর কিন্তু নতুন ছিল রোমান লিপিতে লিখবার প্রস্তাব। ১৯৫৭তে আয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেই পাকিস্তানের সমস্ত ভাষার জন্যে রোমান লিপির ফরমান জারি করেন । তিনি যে শিক্ষা কমিশন বসিয়েছিলেন তারা ১৯৫৯এ জমা দেয়া তাদের প্রতিবেদনেও তার সমর্থণ যুগিয়েছিল। দুই ড কুদরৎ-ই খোদা এবং অধ্যক্ষ সুফিয়ানের মতো দুই একজন বাঙালি ভাষাবিদও সেই প্রস্তাবে সমর্থণ যুগিয়েছিলেন। আয়ুব খানের উদ্দেশ্য ছিল গায়ের জোরে পাকিস্তানের জাতীয় ঐক্যরক্ষা করা । কিন্তু ভাষাতাত্বিকদের তরফে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হয় ফেরদাউস খান তার একটা তালিকা ধরে আলোচনা করেছিলেন। সেগুলো ছিল এরকম। কিন্তু শুরুতে বলে নিই এর প্রথমটি শুনে আবেগিক হবার কিছু নেই। এটি মিথ্যেও নয় , আর সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ও সে জন্যেই এটিকে ধরে রাখবার পক্ষে খুব একটা প্রবল যুক্তি পান নি। ১) বাংলা আমাদের জাতীয় লিপি নয়। ২) বর্তমান বাংলা হরফের অনেক দোষ ত্রুটি রয়েছে; যেমন অতিরিক্ত অক্ষর সংখ্যা, দীর্ঘস্বর, তিন , দুই , দুই , দুই , যুক্তাক্ষর ইত্যাদি। এই হরফ সমূদ্রের মধ্যে শিশুর উৎসাহ তলিয়ে যায়। ৩) রোমান হরফে অক্ষর-সংখ্যা কম হবে এবং নতুন শিক্ষার্থীর পক্ষে সহজ হবে। এতে অতি অল্প সময়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণ সম্ভব হবে । রোমান গ্রহণের ফলে তুরষ্কে নব জাগরণ দেখা দিয়েছিল। ৪) টাইপ রাইটিঙে সুবিধে হবে। ৫) রোমান হরফে লিখন-দ্রুতি ও পঠন- দ্রুতি বাংলার চেয়ে বেশী। ৬) আমাদের পক্ষে ইংরেজী শেখা সহজ হবে। ৭) বিদেশীদের পক্ষে বাংলা শেখা সহজ হবে। ( পৃঃ ৬৯৪,হরফ সমস্যা, ফেরদাউস খান,বাংলা ভাষা ১ম খন্ড, সম্পাঃ হুমায়ুন আজাদ।)
          এই প্রতিটি যুক্তিকে এই লেখক বিস্তৃত নজির দিয়ে দিয়ে খণ্ডন করেছেন। সে বিবরণ অন্যত্র দেয়া যাবে । আপাতত আমরা যা লিখতে চাই, প্রথমে অবিভক্ত বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের উত্থান, পরে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন এবং ৭১এর মুক্তি যুদ্ধের পরে ভাবা গেছিল যে সেই উৎপাত দমে গেল বোধহয়। বাংলা ভাষা, লিপি, বর্ণমালা, এবং বানানে একটা স্থৈর্য এবং ধৈর্য এলো বোধহয়। কিন্তু শতাব্দীর শেষে বিশ্বায়ন আর সেই সঙ্গে কম্পিউটার এসে সেই শোয়ানো ভূতকে আবার জাগিয়ে দিল। বিশেষ করে ভারতে । বাংলাদেশে বোধহয় মাত্র দুই দশকের স্বাধীনতার আবেগকে দাবিয়ে দেয়া সম্ভব ছিলনা নব্বুই দশকের বিশ্বায়েনের তাই সেদেশেই বাংলার ব্যবহারে অনাগ্রহী লোকের কথা তেমন জানি নে । যোগাযোগতো আছে প্রচুর। ‘অভ্রের মতো ব্যবহার বান্ধব কীবোর্ডও সেদেশেই তৈরি। এমন সুন্দর একটিও নেই ভারতে, কোনো ভাষাতেই। সমস্যাটা বোধকরি ভারতেই প্রবল,বিশেষ করে আমাদের এই পূর্বোত্তরে। কম্পিউটার ব্যক্তির ঘরের ভেতর, উরুর উপর থাকে বলেইতো আর সে মুদ্রণ যন্ত্রের মতো বিচ্ছিন্ন নয়; তারে/বেতারে সে সংযুক্ত হয়ে আছে বিশ্বের অগণন সহযন্ত্রের সঙ্গে। সেই সংযুক্তিরই নাম ইন্টারনেট বা আন্তর্জাল। সেখানেও আজ বাংলা কেন, পৃথিবীর প্রায় সব ভাষা লেখা এবং পড়াই যায়। সেগুলো আজ বাঙালি হয়েই গেছে, দিনে দিনে আরো হবে। তা এমন যে পুরোনো ছাপাবই/ পত্রিকার যুগকেও সে ছাড়িয়ে যাচ্ছে আর যাবে অকল্পনীয় দ্রুতিতে। বহু হারিয়ে যেতে বসা ভাষা সরব হয়ে উঠেছে কম্পিউটারে, নেটে, মোবাইলে। আমাদের গভীর বিশ্বাস, সেই দিন দূরে নেই যখন কম্পিঊটারের জন্যেই ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোর ভেতরে বাতি জ্বলবে আবার।

bhaarat ki pragatike liye roman lipi!” এবং ভারতের বিড়ম্বনা !

          মজা হলো, যারা কৌতুহল নিয়ে সেই সংবাদ রাখেন না, রাখলেও অভ্যেসটা করেন না, লেখেন রোমানে বাংলা, পড়েন রোমানে বাংলা বা ইংরেজি, সেরকম চিন্তাবিদ-শিক্ষাবিদেরাই ভাষণ দিয়ে বেড়ান , “গেল! বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতিকে খেলো কম্পিউটার! তারা যে কোনো প্রগতিশীল নতুন প্রজন্ম নন,আড়াইশ বছরের রক্ষণশীলতার ধারাবাহিক ঐতিহ্যকেই বহন করে চলেছেন, আশা করছি , এ পর্যন্ত এসে আমরা সেই মতটি দাঁড় করাতে পেরেছি। সেই আদ্দিকালের গুটেনবার্গীয় ছাপা যন্ত্রের যুগে , গেল শতকের টাইপ রাইটার মেশিনের যুগে তাদের পূর্বসুসী রক্ষণশীলেরা ছিলেন প্রবলভাবে সক্রিয়। ভাষা এবং লিপির পথ রেখেছিলেন তারা আটকে । শুধু কি তাই! কম্পিউটারের দৌলতে সাংস্কৃতিক অধঃপতনেও তাঁরা খুব খুব চিন্তিত। তাঁরা কি জানেন তাদের দ্বিশতাব্দী আগের পূর্বপুরুষেরা সেই একই অধঃপতনের ভয়ে ছাপা বই ছুঁয়েও দেখতেন না। ভাবতেন এতে তাদের জাত যাবে! কোথাকার জলে, কোন জাতের লোক ছাপার কালি তৈরি করেছে কে জানে! তাই বহু বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদে বেচারা জাত না মানা বেয়াড়া প্রকাশককে লিখে দিতে হতো, “ আমাদের মূদ্রণালয়ের কালি গঙ্গাজলে শুদ্ধ করিয়া লওয়া হইয়াছে! বই পড়লে যে জাত যায়, সেই কথাটা ম্ভবত তাঁরা ভাঙা ইংরেজিতেও বলতেন। কারণ সেখানে ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার ছিলনা অথচ বিলেতিদের প্রিয় হবার সুযোগ ছিল অপার, অঢেল।
     
      ভাষাকে বিপন্ন করছে কম্পিউটার নয়, নেটও নয় । করছে ব্যবহারকারীদের রক্ষণশীল অভিজাত্যবোধ । অনেক সময় তাঁরা নিজেরাও জানেন না কোন পথে বিপদ ডেকে আনতে পারেন তাঁরা । সেই উনিশ শতকের রোমান উর্দুদল এখনো রয়েছেন। সমগ্র আরব বিশ্ব তথা মধ্যএশিয়া এখন নেটে তাদের লিপি ব্যবহার করেন। মিশরের বিপ্লবীরা তাদের বিপ্লবের বার্তা পাঠান আরবি লিপিতে । মিশরের ৬ এপ্রিল আন্দোলনের ফেসবুক গ্রুপ যে কেউ খুলে দেখতে পারেন। অথচ ভারতীয় উপমহাদেশের রোমান উর্দুদের এই অবিশ্বাস যায় না যে, আরবি-পার্সি তথা নাস্তালিক লিপিতে আজ আর কোনো কাজ করা যায়। "Roman Urdu is strongly opposed by the traditional Arabic script lovers. Despite this opposition it is still used by most on the internet and computers due to limitations of most technologies as they do not have the Urdu script. Although, this script is under development and thus the net users are using the Roman script in their own ways. Popular websites like Jang Group have devised their own schemes for Roman Urdu. This is of great advantage for those who are not able to read the Arabic script. MSN, Yahoo and some desi-chat-rooms are working as laboratories for the evolving new script and language (Roman Urdu)."এই বক্তব্য পাকিস্তানের উর্দু চিন্তাবিদ এবং সাংবাদিক হাবিব সুলেমানির (http://en.wikipedia.org/wiki/Roman_Urdu) এক্কেবারেই তরল যুক্তি। আসল কথা হলো এদের সঙ্গে এখন জড়িয়ে গেছে খৃষ্টীয় ধর্মীয় আবেগ। ভারতেও ১৯৮৪ থেকে মুম্বাইতে কাজ করে যাচ্ছে রোমান লিপি পরিষদ(http://www.mngogate.com/e04.htm) মধুকর এন গোগাতে এর প্রতিষ্ঠাতা। যুক্তিগুলো নতুন কিছু নয়, স্লোগান আছে bhaarat ki pragatike liye roman lipi!’ এই স্লোগানটাই আমরা শুরুতে লিখতে গিয়ে ভুল করে ফেলেছিলাম। লিখেছিলাম progoti’;ভারত লিখতে গিয়ে লিখে ফেলেছিলাম,bharat’--যেমন লিখতে অভ্যস্ত আরকি। পরে দেখি যে না, তাতে আরো একটা a’ বসবে। নইলে ভারতের সমূহ বিড়ম্বনা! ওমন বিড়ম্বিত ভারতের বিড়ম্বিত সংগঠনের সদস্য হয়তো বেশি নেই, কিন্তু অনুগত শিষ্য যে রয়েছেন প্রচুর সংখ্যাতে এবং মার্কিনি দয়াতে তারা দিনে দিনে বাড়ছেন, সেটিতো নিশ্চিত। ভাষার বিপদ তাদের হাতেই। তাদের দীক্ষান্তর ঘটিয়ে দিতে যদি এই লেখা সামান্যও সফল হয় তবেই আমাদের শ্রম সার্থক। শুনেছি সাঁইবাবা দীক্ষা দেবার আগে শূন্য থেকে ফুল বেলপাতা কী সব কীসব নিয়ে আসতেন। তাতে তাঁর উপর আস্থা বাড়ত। আমরা সেরকম কিছু পারব না । তবু নেটে বিশুদ্ধ বাংলা হরফে , বাংলা ভাষাতে লেখা যায় বলে অবিশ্বাস যদি যেতেই না চায়, তবে ঘুরে আসতে পারেন আমার ব্লগঃ http://ishankonerkotha.blohspot.com. এই লেখা সেখানেও পেয়ে যাবেন।