আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Monday, 20 August 2012

গফুর মিঞার প্রার্থণা

                "হিন্দুস্থান হিন্দুর দেশ। সুতরাং এ দেশকে অধীনতার শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিবার দায়িত্ব একা হিন্দুরই। মুসলমান মুখ ফিরাইয়া আছে তুরস্ক ও আরবের দিকে,—এ দেশে চিত্ত তাহার নাই। যাহা নাই তাহার জন্য আক্ষেপ করিয়াই বা লাভ কি, এবং তাহাদের বিমুখ কর্ণের পিছু পিছু ভারতের জলবায়ু ও খানিকটা মাটির দোহাই পাড়িয়াই বা কি হইবে! আজ এই কথাটাই একান্ত করিয়া বুঝিবার প্রয়োজন হইয়াছে যে, এ কাজ শুধু হিন্দুর,—আর কাহারও নয়। " --এই কথা যিনি লিখেছিলেন , তিনি কে ?তিনি কি মৌলবাদী? তিনি রেডিক্যাল? তাঁর বিরুদ্ধে যারা দিনের পর দিন নীরব রইলেন তারা কারা ? রেডিক্যাল? তাঁর এব্ং তাঁর মতো শতাধিক লোকের বিরুদ্ধে দ্বিজাতি তত্বের প্রবক্তা হবার অভিযোগ উঠল না কেন? এই ভদ্রলোক কি রাজনীতির লোক? তিনি কি অন্যের দ্বারা বিভ্রান্ত? ......হ্যা, আছে র‍্যাডিক্যাল দু'পক্ষেই । কিন্তু স্থান কাল পাত্র নিরপেক্ষ ভাবে দু'পক্ষই সমান ক্ষমতা ভোগ করে না।আমি যে উদ্ধৃতি দিয়েছি এটা আর কারো নয়! অবিশ্বাস্য হলেও এটা সত্যি যে এটা সেই মহান লেখকের যিনি 'মহেশ'এর মতো গল্প লিখেছিলেন। যখন তিনি গল্প লেখেন তখনতো সত্য তাঁর কাছে ধরা পড়ে। তিনি দেখান কী করে গাঁয়ের বর্ণহিন্দু বামুন এবং জমিদার -জোট ধর্ম এবং শাস্ত্রকে ব্যবহার করে শ্রেণি শোষণকে বৈধতা দিচ্ছে। এবং গফুর মিঞার মতো মহেশ নামের অবলা গো-জীবটির পালক পিতার ঘাড়েই গো-হত্যার দায় চাপিয়ে তাকে ভিটে ছাড়া করেছিল। অর্থাৎ, ধর্ম শুধু এদের কাছে এক বিশ্বাস নয়, শোষনের সামাজিকভাবে শক্তিশালী এক হাতিয়ার। আমার মতে দেশের সাম্প্রদায়িকতার অন্তর্বস্তুকে বুঝতে হলে এই গল্পটিকেই আমাদের বারে বারে পড়া উচিত। অথচ, সেই শরৎ চন্দ্র যখন বক্তৃতা করেন,( তাও হিন্দু সঙ্ঘের সভাতে গিয়ে) তখন তিনি সত্যের থেকে দূরে সরে যান এবং গফুর মিঞাকে যারা গ্রাম ছাড়া করেছিল ঠিক তাদের প্রতিভূ হয়ে তিনি মুসলমান বিদ্বেষ উগরে দেন। এরকম বিদ্বেষ ভরা গল্প প্রবন্ধ লিখে গেছেন, বক্তৃতা দিয়ে গেছেন আমাদের দেশের নামজাদা সব 'মহান' সাহিত্যিকেরা, ইতিহাসবেত্ত্বারা। ভাবুন টডের 'রাজস্থান' নামের এক ইতিবৃত্তের বই ধরে শুরু হয়েছিল মুসলমান খলনায়ক বানিয়ে বাংলা কাব্য উপন্যাস নাটকের ইতিহাস। সেগুলোই পড়ে পড়ে বিশ্বাস করে করে আমরা বড় হয়েছি। আমাদের মুসলমান সহপাঠিরা সেগুলোই পড়ে পড়ে মন খারাপ করে করে বিনা প্রতিবাদে হজম করে করে বড় হয়েছেন। এই সব শিখে শিখে বড় হয়েই আমরা সাংবাদিক হচ্ছি, লেখক হচ্ছি, বৌদ্ধিক সমস্ত প্রতিষ্ঠান দখল করেছি। সেই আমরা কি নিত্যদিন ছড়াই না সাম্প্রদায়িকতা? এগুলো কি শুধু রাজনীতির লোকের কাজ? রাজনীতির লোকের গায়ে দায় চাপিয়ে আমরা যারা আধিপত্যের রাজনীতির সমস্ত সামাজিক সুখ ভোগ করি তারা নিজের পাপ আড়াল করি। আজ দেশে এমন অবস্থা হয়েছে যে গফুর মিঞাদের নিত্যদিন যে সামাজিক অত্যচার হয় , কোত্থাও যদি তারা তার প্রতিবাদ করেন, গরুর মিঞার মতো মহেশের ঘাড়ে লাঙলের কোপ বসিয়েও দেন আমরা সেই অধিকারও তাদের থেকে কেড়ে নিতে ব্যস্ত। কল্পনা করুন, আজ লালার যে দুটো ছেলে মারা গেল ( আতিকুর রহমান এবং সইবুর রহমান) , সব্বাই আশা করবেন 'শান্তি'র স্বার্থে এই হত্যার যেন কোনো প্রতিবাদ না হয়। অথচ এই ঘটনাই যদি উলটো হতো, দেশ জুড়ে একে জেহাদী ষড়যন্ত্র বলে প্রচার দেয়া হতো। অনুসন্ধান করে দেখুন, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে, দক্ষিণ পূব এশিয়ার দেশে, মধ্যেপ্রাচ্যে, আফ্রিকাতে, আমেরিকাতে, লাতিন আমেরিকাতে অনুপ্রবেশকারী এক সমস্যা। এরাই সবচে দলিত পীড়িত অসংগঠিত সস্তা শ্রমিক দেশে দেশে। এদের মেয়েরাই সব চে সস্তা বেশ্যা ( দেশের পতিতা পল্লীতে সন্ধান পাবেন 'বাংলাদেশী' বেশ্যাদের) । কিন্তু আজ আমরা যারা মানবতাবাদী বলে দাবি করি, যারা দাবি করি নিজেরা অসাম্প্রদায়িক তাদেরও ভয়ে ভয়ে ভয়ে মেনে নিতে হচ্ছে , হ্যা দেশে অনুপ্রবেশকারী আছে বটে। আর তাদের না তাড়ালে দেশে শান্তি নামছে না! আমরা বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েছি, শরণার্থীদের নাগরিত্বের প্রমাণ দিতে হবে বাড়ি ফিরবার আগে!
              এখনো 'মহেশে'রা  মরছে নীরবে আর নক্ষত্রখচিত কালো আকাশে মুখ ফিরিয়ে  গফুর মিঞা প্রার্থণা জানাচ্ছে, "আল্লা ! আমাকে যত খুশি সাজা দিয়ো, কিন্তু মহেশ আমার তেষ্টা নিয়ে মরেচে। তার চ'রে খাবার এতটুকু জমি কেউ রাখেনি। যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয়নি, তার কসুর তুমি যেন কখনো মাপ ক'রো না।" আমিনার হাত ধরে বেরিয়ে যাবে যে গফুর মিঞা তার জন্যে কোনো 'ফুলবেড়ের চটকল'ও আমরা আর নিরাপদ রাখিনি! 
* সম্পর্কিত সংযোগ 

Saturday, 18 August 2012

চর অঞ্চলের বাস্তব চিত্র এবং বিদেশী সমস্যার মূল্যায়ন


মূল অসমিয়াঃ পরাগ কুমার দাস
বাংলা অনুবাদঃ সুশান্ত কর

[এই লেখাটি আমি পড়বার সুবিধে পাই গুয়াহাটির 'পৃথিবী প্রকাশন' প্রকাশিত  এপ্রিল ২০১০এর বই 'চর-চাপরির জনজীবনঃ সংঘাত আরু সৌরভ'-এ। ড০ হীরেন গোঁহাই থেকে শুরু করে অসমের বহু          বিদ্বজ্জনের নির্বাচিত লেখা নিয়ে প্রকাশিত এই বইটি সম্পাদনা করেন শহীদুল ইসলাম এবং টুনুজ্যোতি গগৈ। প্রয়াত সাংবাদিক, চিন্তক এবং সমাজ কর্মী পরাগ কুমার দাসের এই লেখাটিও সেখানেই আছে। পৃঃ৬০। কিন্তু প্রবন্ধটি প্রকাশের সন তারিখ বা উৎসের উল্লেখ করা হয় নি। কিন্তু দুটো সূত্র থেকে আমরা অনুমান করতে পারি, অসম চুক্তির বছর দুই তিনেকের মধ্যেই এই প্রবন্ধ লেখেন লেখক। প্রথম সূত্র প্রবন্ধটি নিজে। যে কোনো পাঠক অনুমান করতে পারবেন। দ্বিতীয় সূত্র ড হীরেন গোঁহাইর প্রবন্ধ, যেটি আসলে ১৯৮৯তে দেয়া এক বক্তৃতা। সেখানে সপ্রসংশ উল্লেখ আছে পরাগ কুমার দাসের এই প্রবন্ধের। সঙ্গে এই তথ্য যে প্রবন্ধটি মূলে বেরিয়েছিল  জনপ্রিয় অসমিয়া পাক্ষিক 'প্রান্তিকে'। আমরা এই প্রবন্ধ অনুবাদ করবার কারণ এই নয় যে এর প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ  একমত। তাঁর এই সরল স্বীকারোক্তিতেই প্রবন্ধটি লেখার উদ্দেশ্য স্পষ্টঃ "এ কথা এখন আর আমাদের কারোরই অজানা নয় যে এই রাজ্যের জনসাংখ্যিক প্রক্রিয়াটি ক্রমান্বয়ে যে জটিল রূপ নিচ্ছে তা আমাদের জাতীয় অভিলাষগুলোকে ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ করে আনছেআগামীর দিনগুলোতে যদি আমরা ভাষিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অক্ষুন্ন রাখতে চাই তবে পমুয়া মুসলমানদের সঙ্গে হাত মেলাতেই হবে; আর যদি ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই তবে বাঙালি হিন্দুদের কাছে টেনে নিতে হবে... উভয় পক্ষকে ছেড়ে দিয়ে খুব বেশি দিন আমরা টিকে থাকতে পারব না। এবং ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শস্বরূপ অসমিয়া জাতি নিশ্চয় সবসময় ধর্মের থেকে ভাষার উপরেই বেশি গুরুত্ব দেবে। যদি তাই হয়, তবে গেল কয়েক বছরে যে সব ভুল আমরা করে এসছি , সেগুলো হৃদয়ঙ্গম করতে হবে; নতুন পুরোনো সমস্ত প্রব্রজনকারীদের এক পর্যায়ে ফেলে বিবেচনা করবার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে; আর তার চেয়েও বড় কথাএই অসমিয়াএলাকাগুলোতে সম্প্রীতির বাণী নিয়ে আমাদের আবার যেতে হবে।"--- এমন সহজ স্বীকারোক্তি খুব কম লেখক করেন। এটি যেমন আমাদের মুগ্ধ করেছে। তেমনি এটিও স্পষ্ট করেছে যে তাঁর আর আমাদের উদ্দেশ্য এক হতে পারে না। কিন্তু এটি স্বীকার করতে বাধা নেই যে বহু বাঙালি হিন্দু এদের বাঙালি হিসেবে দেখার ইচ্ছে পোষন করলেও এদের আঁতের কথা বের করে আনতে এমন অভিযান প্রায় কেউ করেন নি। প্রেম কি আর হয় মুখের কথায়! প্রয়াত পরাগ কুমার দাসের প্রতি তাই আমরা সমস্ত শ্রদ্ধা রেখেই  এই লেখাটি বাঙালি পাঠকের জন্যে এগিয়ে দিলাম। অনুবাদক]

 ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
মূল অসমীয়া লেখাটি ছবিতে দেখুনঃ 





@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@

          ( এই নিবন্ধ লিখতে গিয়ে আমরা বরপেটা জেলার  ‘বিদেশী-অধ্যুষিত অঞ্চল’ রূপে খ্যাত বিভিন্ন ভেতরের চর অঞ্চল পরিভ্রমণ করেছিলাম। ব্রহ্মপুত্রের উত্তর পাড়ের ‘চেঙা’র কাছের ‘খংরাই’ হয়ে ঢোকে পায়ে হেঁটে বেশ কয়েক মেইল জুড়ে বিস্তৃত ‘বিদেশী অধ্যুষিত অঞ্চল’ ভ্রমণ করে, তাদের সঙ্গে থেকে, প্রকৃত অবস্থা অধ্যয়ন করেছিলাম। এবং শেষে নগরবেরা হয়ে দক্ষিণ পাড় হয়ে বেরিতে এসছিলাম। বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা যেসব জটিল সত্য তুলে ধরেছি, বা সিদ্ধান্ত করেছি, তার সঙ্গে এইসব এলাকা সম্পর্কে এতো দিন ধরে সচরাচর যেসব ধারণা করে এসছি তার যথেষ্ট পার্থক্য আছে। আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে এদিক ওদিক থেকে শুনে আহরণ করা পরোক্ষ অভিজ্ঞতার যথেষ্ট অমিল থাকতে পারে। চর  অঞ্চলের বিষয়ে ‘প্রত্যক্ষ’ অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তারা উপযুক্ত প্রমাণ সহ আমাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে মতামত দিলে আমাদের এই প্রচেষ্টার প্রতি সহযোগ হিসেবে বিবেচিত হবে।ঃলেখক)
*****************************************
লাল রঙের জেলাটি বরপেটা
  ইলিম উদ্দিন দেওয়ান চর অঞ্চলে বড় হওয়া ‘নয়া-অসমিয়া।’ ১৯৬৪ সন থেকে তিনি অসম সাহিত্য সভার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে  জড়িত । ইতিমধ্যে তিনি অসমিয়াতে আঠাশখানা বই লিখেছেন। দু’পুরুষ ধরে অসমের বাসিন্দা শ্রী দেওয়ানের বিরুদ্ধে গেলবার ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ‘বিদেশী’ বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি যে ১৯৭১ সনের পরে অসমে আসেন নি, সে কথা প্রমাণ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ১৯৬০এর ভাষা আন্দোলনের সময় চর অঞ্চলের উদ্যোগী তরুণ মঃ আবু তালেব ক’জন সহকর্মী নিয়ে স্থানীয় মাতব্বর মৌজাদারদের বিরুদ্ধে গিয়েও সেসব অঞ্চলে অসমিয়া ভাষার পক্ষে সভা-সমিতি করেছিলেন। সেই তালেবকে গেলবার স্থানীয় ‘অসমীয়া’রা বিদেশী বলে অভিযুক্ত করলে তিনি শুনানীতে হাজির হতে অস্বীকার করেন। অসমে কয়েক পুরুষ ধরে থেকে নিজের ভাষা সংস্কৃতি ত্যাগ করে অসমেই বিলীন হবার পরেও সেই মানুষটির বিদেশী বলে অভিযুক্ত হবার বেদনা আমরা হয়তো গুয়াহাটিতে থেকে উপলব্ধি করতে পারব না। চেনিমারী চরের মানুষ ১৯৭৮সনে কামরূপ সাহিত্য পরিষদের নবম অধিবেশন গাঁটের ধন খরচ করে ধুম ধাম করে আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু গেল বছর সে অঞ্চলের প্রত্যকে ভোটারের বিরুদ্ধে ‘বিদেশী’ বলে অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তিন পুরুষ ধরে অসমেরর বাসিন্দা খংরার যুবক মীর সেলিম উল্লাহ যখন চর অঞ্চল থেকে গেছে বলেই গুয়াহাটির ছাত্রাবাসে অত্যাচারিত হয়ে বাড়ি ফিরে গেল, ওর পরিবারের লোকেরা তখন ভাবতে বাধ্য হন—নিজস্ব সমস্ত ছেড়ে ‘অসমিয়া’ হয়ে আমরা কি কোনো ভুল করেছি? রক্তে –মাংসে অসমিয়া হয়ে পড়া এই লোকগুলোকে যে কোনো বাহানাতে এমনি অত্যাচার অপমান করে ইচ্ছাকৃতভাবে আমরা আজ ওদের মূল স্রোতের থেকে সরিয়ে রেখেছি। চর অঞ্চলে বিদেশি নেই, সেটি আমরা বলতে চাইছি না; তাই বলে অসমিয়া জাতি গঠন সম্পর্কে সামান্য জ্ঞানও নেই যাদের সেই উদ্ধত একাংশ এসব অঞ্চলের পুরোনো বাসিন্দাদের উপরেও যে মানসিক অত্যাচার আরম্ভ করেছে, তাতে সমস্যা একটা সমাধান করার বদলে তাকে আরো জটিল করে তুলেছে। আর তার ফলে লাভবান হচ্ছে অসমিয়া বিরোধী শক্তিগুলো। নিরাপত্তা চেয়ে এই নয়া-অসমিয়া মানুষগুলো এখন কেউ না কারো শরণাপন্ন হতে বাধ্য হচ্ছেন, আর সেরকম সুবিধের সন্ধানে থাকে যারা সেই সব সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তিগুলো এখন সেসব অঞ্চলে সুন্দর সংগঠন করা শুরু করে দিয়েছে। গেল নির্বাচনে অসম বিরোধী কিছু সাম্প্রদায়িক শক্তি ‘অসমিয়া’ অঞ্চলগুলোতেও অভূতপূর্ব সফলতা লাভ করার মূলে ছিল ছবছর ধরে করা আমাদের কিছু ভুল। সেই ভুলগুলো যদি এখন না শোধরাই তবে অচিরেই এমন এক দিন আসবে যে বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত হবার পরেও অসমে ‘বিদেশী’ সংখ্যা বেড়ে যাবে আর ‘অসমিয়া’র সংখ্যা কমে আসবে।
     ছবছরের জাতীয় আন্দোলনের শুরুর পর্যায়কে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে এখন এই সত্যটি চোখে পড়বে যে সেই অভূতপূর্ব জনজাগরণের মূলে কিন্তু শুধু বিদেশী নাগরিকের সমস্যা ছিল না; স্বাধীনতাউত্তর কালে নতুন দিল্লীর অবহেলা এবং শাসনরূপী শোষণে আর্থসামাজিকভাবে জর্জরিত হয়ে স্থিতাবস্থার পরিবর্তন চেয়েও অসমের জনগণ রাজপথে বেরিয়ে এসছিলেন। তেমনি রাজ্যে ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া জনসংখ্যার মূলে যে বিদেশী নাগরিকের প্রব্রজনের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের থেকে অবাধ গতিতে হওয়া প্রব্রজনের কথাও অসমের জনগণ উপলব্ধি করেছিলেন; আর তাই শুরুতে ‘বিদেশী’র বদলে ‘বহিরাগত’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু পরে আন্দোলনটিকে সংবিধানের গণ্ডীর ভেতরে আনতে গিয়েই বিদেশী সমস্যার উপরে অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হলো এবং অন্যান্য সমস্যা চাপা পড়ে গেল। বিদেশি নাগরিকের সংখ্যার কোনো সরকারী তথ্য-পাতি না থাকার ফলে আমরা অবৈধ প্রব্রজনকারীর আনুমানিক হিসেব ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে গেলাম এবং ফলস্বরূপে, বহু স্থায়ী বাসিন্দাকেও আমরা বিদেশীর সারিতে ফেলে দিলাম। একবার আন্দোলন শুরু হবার পরে যেহেতু আর পেছনে ফেরার প্রশ্নই উঠে না, ফলে চক্রবৃদ্ধি হারে সেই ভুলগুলো বেড়েই গেল। নতুন –পুরোনো প্রব্রজনকারী সবাইকে একই পর্যায়ে নিয়ে যাবার ফলে তাদেরকে একজোট হতে বাধ্য করে বহুক্ষেত্রে বিদেশী সমস্যার গভীরতা আমরা নিজেরাই বাড়িয়ে তুললাম।
     আমরা যদিও শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে সম্প্রদায় বিশেষকে চিহ্নিত করে সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করবার পৃষ্ঠপোষকতা করি না, এতো দিনে যে ভুলগুলো করে এসছি তার পরিপ্রেক্ষিতে এখন এদিকটা একেবারে এড়িয়ে গেলে বাস্তবতার থেকে সরে আসার মতো হবে। স্বাধীনতার পর থেকে পমুয়া মুসলমান মানুষের নিরক্ষরতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় মাতব্বরদের অর্থের প্রলোভন দিয়ে হাত করে কংগেস যে দীর্ঘদিনের ভোট-বেঙ্কের রাজনীতি খেলে আসছিল, তাতে অসমের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন। এই ভোট বেঙ্কের সাহায্যে এক একটা সরকার অসমের মানুষের সমর্থণ নাপেয়েও রাজধানীতে টিকে থেকেছিল; আর ফলস্বরূপে, মূল স্রোতের মানুষেরা প্রচলিত প্রক্রিয়াটির বিরুদ্ধে সফলতার সঙ্গে রাজনীতি করার কথা ভাবতেই পারছিলেন না। সেজন্যেই রাজনৈতিক ভাবে অনিষ্টকর এই ভোট বেঙ্কগুলো ভাঙবার জন্যে অনেকেই বিদেশী সমস্যার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হলো, তাকে ব্যবহার করতে চাইছিল এবং সেজন্যেই বাস্তব ক্ষেত্রে অসম্ভব বলে জেনেও বিদেশী বহিষ্কারের জন্যে ১৯৫১ সনকে সময়সীমা বলে দাবি করতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করেন নি।কিন্তু ভোটবেঙ্কগুলোই যদি আমরা ভাঙতে চাইছিলাম, তবে তার জন্যে অন্য সব ফলপ্রসূ পথও আমাদের হাতে ছিল। পমুয়া মুসলমানদের মধ্যে এখন তুলনামূলকভাবে একাংশ শিক্ষিত লোক বেরিয়ে আসার ফলে আগেকার মাতব্বরী প্রথাও ক্রমান্বয়ে লোপ পেতে শুরু করেছে। উপযুক্ত সংগঠন করে এই নতুন শিক্ষিত অংশতির মধ্যে ঢোকে যেতে পারলে অনিষ্টকর ভোট বেঙ্কগুলো ধ্বংস করবার সঙ্গে সঙ্গে নতুন অনুপ্রবেশ সম্ভাবনার বিরুদ্ধে এদের buffer হিসেবে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু সে না করে অবিবেচকের মতো চিন্তাভাবনা কিছু নিয়ে ভোট বেঙ্ক ভাঙতে গিয়ে এখন এদের আমরা রাজনৈতিক দিক থেকেতো বটেই তারউপর সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক থেকেও মূলস্রোতের থেকে সরিয়ে দিলাম। এ কথা এখন আর আমাদের কারোরই অজানা নয় যে এই রাজ্যের জনসাংখ্যিক প্রক্রিয়াটি ক্রমান্বয়ে যে জটিল রূপ নিচ্ছে তা আমাদের জাতীয় অভিলাষগুলোকে ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ করে আনছে—আগামীর দিনগুলোতে যদি আমরা ভাষিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অক্ষুন্ন রাখতে চাই তবে পমুয়া মুসলমানদের সঙ্গে হাত মেলাতেই হবে; আর যদি ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই তবে বাঙালি হিন্দুদের কাছে টেনে নিতে হবে... উভয় পক্ষকে ছেড়ে দিয়ে খুব বেশি দিন আমরা টিকে থাকতে পারব না। এবং ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শস্বরূপ অসমিয়া জাতি নিশ্চয় সবসময় ধর্মের থেকে ভাষার উপরেই বেশি গুরুত্ব দেবে। যদি তাই হয়, তবে গেল কয়েক বছরে যে সব ভুল আমরা করে এসছি , সেগুলো হৃদয়ঙ্গম করতে হবে; নতুন পুরোনো সমস্ত প্রব্রজনকারীদের এক পর্যায়ে ফেলে বিবেচনা করবার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে; আর তার চেয়েও বড় কথা—এই ‘অসমিয়া’ এলাকাগুলোতে সম্প্রীতির বাণী নিয়ে আমাদের আবার যেতে হবে। সেভাবে, এই বিদেশী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নতুন করে অবৈধ প্রব্রজনকারী আসছেন তাদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করতে হলেও পুরোনো মানুষগুলোকে বিশ্বাসে নিতে হবে। তাদের সাহায্য না হলে বাইরের থেকে গিয়ে, সাধারণ মানুষের কথাতো দূর, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীও সেই সব দুর্গম জায়গাগুলোর থেকে ক’জন বিদেশী ধরে আনতে পারবে, তা সন্দেহের বিষয়।
     চর অঞ্চলের সম্পর্কে সচরাচর যেসব বিভীষিকাময় কথা আমরা শুনে আসছি, সেগুলো নিজের চোখে দেখব বলে আমরা বরপেটা জেলার অন্তর্গত ‘বিদেশী অধ্যুষিত অঞ্চল’রূপে খ্যাত কতকগুলো চরে ভ্রমণ করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তার আগে আমরা হাউলি অব্দি বিভিন্ন  জায়গাতে গিয়ে স্থানীয় ছাত্র সংস্থার নেতাদের থেকে চর অঞ্চলের সম্পর্কে তাদের মতামত নিয়েছিলাম। এইসব অঞ্চলে, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদীর মাঝের চরগুলোতে বাইরের লোকের আগে কখনো কোনো যাতায়াত ছিল না। তারউপর গেল আন্দোলনের সময় যে ভুলবোঝাবুঝি হলো তারপর থেকে , ছাত্র সংস্থার ছেলেদের কথাতো দূর, অন্য মানুষের যাওয়াটাও প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। ফলে এদের সম্পর্কে আমরা অন্যের মুখে শুনে আসা কথার বিবরণই পাচ্ছিলাম। আমরা একেবারে ভেতরের চর অঞ্চলে রাতে থাকবার মতো করে যাচ্ছি শুনে বহু শুভাকাঙ্খী আমাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে সঙ্গে পুলিশ নিয়ে যেতে বা অন্তত স্থানীয় থানাতে খবর দিয়ে যেতে বলছিলেন। কিন্তু, অসমের ভেতরের কোনো অঞ্চলে পুলিশের সাহায্য নিয়ে যাবার কথা আমাদের মনঃপুত হল না, আর মনে মনে সামান্য ভয় পেয়েওছিলাম যদিও, শেষে আমরা একা যাবারই সিদ্ধান্ত নিলাম। চেঙা হয়ে প্রথমে আমরা খংরা গেলাম। ( আমাদের আগে বলা হয়েছিল যে এখান থেকেই শুরু হয়েছে ‘বিদেষী অধ্যুষিত অঞ্চল’)সে অঞ্চলের স্থানীয় শিক্ষক মীর সাহিদ উল্লাহ মশাই আমাদের খানিকটা ভেতরের গাঁয়ে এগিয়ে দেবার দায়িত্ব নিলেন। তাঁর সঙ্গে আমরা বাঁধের উপর দিয়ে এবং ধানের মাঠের মধ্যি দিয়ে পায়ে হেঁটে ( এসব অঞ্চলে পথঘাট  বলে কিছু নেই) চেনিমারী চাপরির দিকে এগিয়ে গেলাম। ভেতরের অঞ্চলে বাঁধের কাছে কাছে নতুন কিছু বস্তি দেখে সেগুলো নতুন করে আসা বাংলাদেশীদের ঘর হবে বলে ভেবে খবর নিতে গেলাম। ওদের মধ্যে একজন   শিঙরিদিয়ার গাঁওবুড়া শ্রীসাহেব আলিকে  পেলাম। শিঙরিদিয়া চর ক’বছর আগে ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙনে ধ্বসে যাবার ফলে এই বাসিন্দাদের সঙ্গে তিনিও এসে বাঁধের কাছে অস্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেছেন। আগের চরটি এখন আবার উঠছে; সরকার যদি জমি সমঝে দেয় তবে তারা আবার পুরোনো গাঁইয়ে ফিরে যাবেন। অন্য মানুষেরাও কত পুরোনো জানবার জন্যে আমরা ইচ্ছে করেই অসমিয়াতে কথা বলে দেখলাম—বিশুদ্ধ অসমিয়াতে তাঁরা আমাদের কথার উত্তর দিলেন। বাইরের থেকে দেখলে কিন্তু এই বস্তিগুলোকে নতুন আসা বাংলাদেশীর ঘর বলেই মনে হয়।
     চেনিমারি চাপরিতে প্রথমে আমরা আজাদ মেমোরিয়াল হাইস্কুলে গেলাম।ছেলে মেয়েরা ওখানে বিশুদ্ধ অসমিয়াতে কথা বলছেন। ১৯৬২তে স্থাপিত এই স্কুলে ক’বছর আগে কামরূপ সাহিত্য পরিষদের অধিবেশন হয়েছিল; এখন এসব জায়গাতে যেতে মূল স্রোতের ‘অসমিয়া’ মানুষের ভয় করে। আমাদের উপস্থিতিতে তাঁরা যদিও কিছুটা ইতস্ততঃ বোধ করছিলেন, একেবারেই সহজ হয়ে বসে মনের কথাগুলো একদিক থেকে বলে গেলেন।
     ঃআমাদের বাবারা যখন এখানে এসছিলেন, চেঙা-বহরির অসমিয়ারাই খের-বাঁশ  দিয়ে সাহায্য করেছিল, খেত কৃষি করতে পরামর্শ দিয়েছিল। এখন ওদেরই ছেলে সন্তানেরা আমাদের বিদেশী বলে, তাড়াতে চায়।–( আমার বাবাহঁত যেথানে ইয়াক গেলি আহিছিল, চেঙা-বহরির অসমীয়াগিলানে খের-বাঁহ দি সহায় করিছিল, খেতি-বাতি করিবলৈ পরামর্শ দিছিল। এতিয়া তাহুনর ছলিগিলানেই আমাক বিদেশী বুলি কয়। খেদি দিবা খোজে।--- বরপেটা অঞ্চলের অসমিয়া এভাবেই লিখেছিলেন লেখক। তথ্যটি জরুরি ভেবে মুলের নমুনা উল্লেখ করলাম—অনুবাদক) –গ্রামের একজন মাঝবয়েসী মানুষ এভাবেই আমাদের সামনে দুঃখ করলেন।
     কাছের ‘অসমিয়া’ গ্রামগুলোর সঙ্গে আগে এদের আসা যাওয়া ছিল, সদ্ভাবের সম্পর্ক একটা ছিল। আজকাল সেগুলো নেই। ১৮৮৩ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ চেঙা গ্রামের লোকেদের জন্যে চেনিমারির মানুষ খের –বাঁশ ইত্যাদি নিয়ে গেছিলেন। চেঙার মানুষ কিন্তু ‘বিদেশী’র সাহায্য গ্রহণ করবে না বলে সেগুলো ফিরে পাঠালেন। “আমাদের নিজস্ব সমস্ত কিছু ত্যাগ করে অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতি গ্রহণ করে তিনপুরুষ ধরে অসমে লীন হবার পরেও আগে আমরা ছিলাম ‘নয়া-অসমিয়া’, আর এখন হলাম গিয়ে ‘বিদেশী’পুরুষানুক্রমে আমরা যতটাই আপনাদের কাছে আসতে চাইছি, ততই আপনারা আমাদের দূরে ঠেলে দিয়েছেন”—আজাদ মেমোরিয়াল হাইস্কুলের শিক্ষক আবু সৈয়দ এই বলে আমাদের সামনে খেদ প্রকাশ করলেন।
চেনিমারির থেকে আমরা একটা নৌকা নিয়ে ভেতরের চরগুলোতে গেলাম। এসব অঞ্চলে পূর্ববাংলার পমুয়া মুসলমানদের বাইরে অন্য মানুষ একেবারেই পাওয়া যাবে না। ১৮৪৭ সনে অসমে ‘পাইনা জাহাজ’ ( বাষ্পচালিত জাহাজ) চলাচল আরম্ভ হবার পর থেকেই পূর্ববঙ্গের বহু ভূমিহীন কৃষক এসে ব্রহ্মপুত্র নদীর পাড়ে পাড়ে বাস করতে শুরু করেন। ১৮৯২ সনে আসাম বেঙ্গল রেল লাইন স্থাপিত হবার পর রেলে করেও এমন বহু মানুষ অসমে এসছিলেন। স্থানীয় মানুষ তখন  মেলেরিয়ার প্রকোপ আর বন্য জন্তুর থেকে প্রাণে বাঁচতে কাছের  বন অরণ্য পরিষ্কার করে এদের বসতি স্থাপন করতে উৎসাহই যুগিয়েছিলেন। ১৯১২ এবং ১৯৪৩ সনে পূর্ববঙ্গের আকাল এবং ভূমিকম্পের সময় অসমে আসা এমন লোকের সংখ্যা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল।  তার পর থেকেই শাসকীয় দলটি সস্তার ভোট বেঙ্কের আশাতে এদের আসতে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছিল এরা মূলত কৃষিজীবি হবার ফলেই এই প্রব্রজনের ফলে মধ্যবিত্ত চাকরিমুখী অসমিয়া শ্রেণিটির স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত বাঁধে নি। সেভাবে ওরা যেসব অঞ্চলে বসবাস করতে আরম্ভ করেছিলেন, আমদের কৃষিজীবি শ্রেণিটিও তেমন জায়গাগুলোতে খেত কৃষি করবার কথা ভাবতেই পারে নি। এমনকি এখনও পমুয়া মুসলমানেরা যেসব চর-চাপরিতে দুর্বহ জীবন যাপন করছেন, সেসব অঞ্চল থেকে ওদের তাড়িয়ে দেবার পরে সেখানে গিয়ে সেই পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে বসবাস করবার জন্যে মূল স্রোতের ক’জন মানুষ বেরোবেন সেও এক বড় প্রশ্ন!  এসব কারণেই এই পুরো প্রব্রজন প্রক্রিয়াটাই বহুদিন অব্দি আমাদের চোখে শীতল রূপেই থেকে গেল। সেভাবেই, ভাষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও  এই পুরোনো প্রব্রজনকারীরা আমাদের জন্যে ভয়ের কারণ হবার বদলে আশীর্বাদস্বরূপ হয়ে পড়েছিল। নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি ছেড়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতি আপন করে নেবার ফলে ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে এসছিল যে অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতি, সে প্রসার লাভের জন্যে এক মাধ্যম খুঁজে পেয়েছিল। পমুয়া মুসলমানেরা এভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতি গ্রহণ করার মূল কারণ আছিল দুটা—অর্থনৈতিক আরু ধর্মীয়।  এই মানুষগুলোকে নিয়ে কেউ কেউ অসমে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক চক্রান্ত চালাচ্ছে যদিও , অসমে আসার এদের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক।  বাংলাদেশে বাস্তবের সঙ্গে হার মেনে বেঁচে থাকার তাড়নাতে যেহেতু এরা অসমে এসছিলেন এদের কাছে অন্য কোনো রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক  অভিলাষ একেবারে অর্থহীন ছিল; আর সেজন্যেই , অসমে নিজের স্থিতি সবল করবার জন্যেই এরা প্রচলিত সাংস্কৃতিক জীবন ধারাতে মিশে যাবার জন্যে অহোপুরুষার্থ করেছিলেন। অন্যদিকে ইসলাম ধর্মের মতে,  ‘হাব্বুলবতারে মিনাল ইমান।” অর্থাৎ দেশপ্রেম ইমানের ( ধর্মবিশ্বাস) অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।  সে বিচারে এই ধর্মের লোকেরা যে জায়গাতে যায়, যেখানে বসবাস করে, যে জায়গার জল-বায়ু গ্রহণ করে, , সে জায়গার  স্থানীয় ভাষা-সংস্কৃতি সম্পূর্ণ গ্রহণ করে ফেলার উপর ইসলাম গুরুত্ব অর্পন করে।  এই সব কারণে, এই পমুয়া মুসলমানেরা ভাষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অন্ততঃ বাঙালি হিন্দুদের মতো অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতির জন্যে এতোটা ভয়ের কারণ হলো না। আমরা   যেসব এলাকা ভ্রমণ করেছি সেসব চর অঞ্চলে একটাও বাংলা মাধ্যম্যের স্কুল পাই নি। একেবারে ভেতরের ‘বিদেশী অধ্যুষিত অঞ্চল’ বলে খ্যাত চরগুলোতেও আমরা এমন কি ত্রিশ চল্লিশ বছরের পুরোনো অসমিয়া মাধ্যমের স্কুল পেয়েছি। এই মানুষেরা বাড়িতে বাংলা –অসমিয়া মেশানো ভাষাতে কথা বলেন যদিও, বাইরে কলকল করে অসমিয়া কথা বলেন, বোঝেন।
চেনিমারি চাপরি থেকে আমরা নৌকো করে কয়েক ঘণ্টা গিয়ে মাজর চর পেলাম । এটি আগে এক স্থায়ী গ্রাম ছিল। লোকগুলোর ম্যাদী পাট্টাও ছিল। পরে ব্রহ্মপুত্র পুরোনো গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে গেল এবং একি জায়গাতে বছর পনেরো আগে এই চরটি আবার উঠেছে। চরগুলো সাধারণত পনের –বিশ বছরের মতো  স্থায়ী হয়ে থাকে। আমরা অবশ্য ষাট বছরের পুরোনো চরও দেখেছি। ভেতরে গেলে এগুলোকে চর বলে মনেই হয় না; নদীর পাড়ের যেকোনো অসমিয়া গ্রামের মতো সুপারি গাছ, বাড়ি ঘর, ধানের মাঠ,  ভেঙ্গে পড়া স্কুল ঘর দুই একটাও দেখা যায়। ১৯৫০ সনের প্রবল ভূমিকম্পের পর থেকেই ব্রহ্মপুত্র নদী অস্বাভাবিক ভাবে গতি পাল্টাবার ফলে দুপাড়ের অনেক স্থায়ী গ্রাম নদীর বুকে মিলিয়ে গেছে।  এভাবে ভূমিহীন হয়েছে যারা তাদের সম্পন্ন অংশটি অন্য জায়গাতে জমি নিয়ে বসবাস করতে শুরু করে এবং অন্য অংশটি নতুন চর ওঠা অব্দি অপেক্ষা করে রইলেন। নতুন চর উঠলেই তাদের মধ্য মাটি নিয়ে কাড়াকারি শুরু হয়যে জায়গাতে চর উঠল, সেখানে যদি আগে স্থায়ী গ্রাম ছিল তবে পুরোনো ম্যাদী পাট্টা যাদের ছিল তাদের মধ্যে এবং নতুন দখলদারদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, পরিবারের মানুষের মধ্যেই কাটাকাটি হয়। চরগুলো দেখতে প্রকাণ্ড যদিও সেখানে খেতের উপযোগী মাটি একেবারেই কম থাকে। কখনো বা আবার চাষাবাদ করা জমির উপর দিয়ে নদী বালি ফেলে সেগুলো একেবারেই নষ্ট করে দেয়। কোথাও যদি সামান্য একটুকরো বালিচর দেখা দেয় তারা তারউপরেই ক্ষুধার্ত দৃষ্টি রাখেন—যদি আগামী বছর নদী তার উপর একটু পলি ফেলেই রেখে যায়! বর্ষাতে এদের দুর্দশার অন্ত থাকে না। নদী প্রায় সমস্ত অঞ্চল ডুবিয়ে দেবার ফলে উঁচু জায়গা দেখে চাং বেঁধে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাতে হয় এদের। জল শুকোবার সঙ্গে সঙ্গে আবার চাষের উপযোগী জমির সন্ধানে সংগ্রাম আরম্ভ হয়।  জলে ধ্বসে যাওয়া চরের বাসিন্দাদের কখনো বা মাটির খুঁজে  নৌকো করে সদলবলে অন্য জায়গাতে যেতে হয়—নতুন জায়গার ‘অসমিয়া’ মানুষের জন্যে এরা নতুন মুখ হয়ে পড়ে।
এই অঞ্চলগুলোতে পুরোনো মাতব্বরী প্রথা এবং শাসকদলটির রাজনৈতিক শোষণ প্রক্রিয়ার মূলে ছিল ভয়াবহ ভূমি সমস্যা। কোনো জায়গাতে নতুন চর একটা উঠলেই যে জমির টুকরোটার জন্যে নিয়মিত বার্ষিক খাজনা দিয়ে যেতে পারে জমির টুকরো তার হইয়ে যায়। ফলে, তুলনামূলক ভাবে যারা সমৃদ্ধ তারা কিছু ধনের বিনিময়ে একদিক থেকে জমি গ্রাস করে যাচ্ছিল। আর অন্য দরিদ্র ভূমিহীনেরা তাদের অনুগ্রহে ‘উপরি পাওনা’ দিয়ে সেই জমিগুলোতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। কে কত জমি দখল করে নিয়মিত খাজনা দিয়ে নিজের দখলে আনতে পারে, তার উপর মাতব্বরী খেতাব নির্ভর করে; এবং সাধারণ মানুষকে অনুগ্রহ লাভের জন্যে এদের কথামতেই ওঠবস করতে হয়।  ফলে শাসকদলগুলো অর্থের প্রলোভনে এই মাতব্বরদের হাত করেই এক একতা সুরক্ষিত ভোট বেঙ্কের অধিকারী হয়ে পড়ে। মাতব্বরেরা যাতে কারোরই প্ররোচনাতে বিদ্রোহাচরণ না করতে পারে,  তারও ব্যবস্থা করে রেখেছিল ভূমি বন্দোবস্তির নিয়ম কানুনের মধ্যি দিয়ে। এসব অঞ্চলে কোনো জমিতে ম্যাদী পাট্টা দেয়া হয় না; জমিগুলো বছরের পর বছর ধরে খাস পাট্টার নিয়মে চলে আসছে—জমির মালিক প্রত্যেক বছরে খাজনা দিয়ে একবছরের জন্যে পাট্টা নবীকরণ করে নিতে হয়। সত্তর বছর অব্দি একই জমির টুকরোতে বার্ষিক খাজনা দেয়া মানুষের সঙ্গেও দেখা হলো---এরাও দেখি সেই খাস পাট্টার ভিত্তিতেই এখনো দখলী স্বত্ব লাভ করছেন; আগামী বছর হয়তো সরকার সেই জমি তাদের নামে নবীকরণ নাও করতে পারে। এসব কারণে এই মানুষগুলো শাসনে থাকা দলতিকে অসন্তুষ্ট করতে পারে না।
এই কৃষিজীবি মানুষের জমির প্রতি এক অদ্ভূৎমোহ; জমির জন্যে ভাইয়েদের মধ্যে মার-কাট লেগে থাকাটা নিত্তনৈমত্তিক ঘটনাকখনো বা এমন কি, নদীতে জমি ধ্বসিয়ে নিয়ে যাবার পরেও মালিক সেই অস্থাবর জমির উপরও খাজনা দিয়েই বছরে বছরে পাট্টার নবীকরণ করে থাকে এই আশাতে যে কখনো যদি আগের জায়গাতেই নতুন করে চর পড়ে। পূব মহচরা চরের বাসিন্দা মহঃ জহরুদ্দীন এখনো তাঁর দশ বিঘা জমি নদীর বুকে থাকা স্বত্বেও তার জন্যে খাজনা দিয়ে আসছেন। ‘আপনিএখানে আসতে  মাইল কয়েক বালির উপর হেঁটে এসছেন , আমাদের লোকের ওই বালিরে উপরেও চোখ—কখনো যদি নদী তার উপর মাটি ফেলে দিয়ে যায়। চাষের জমি বেশি নেই বলে আমাদের লোকেরা শেষের দিনগুলোতে খাবে বলে সেই বালির উপরে খেসারি ডাল কিছু ছড়িয়ে রেখে দেয়। আমাদের নিজেদেরই গোটা বছর চাষ করবার জন্যে জমি বেশি নেই। সামান্য জমি নিয়েই আমাদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। আর আপনারা বলেন বাইরের থেকে মানুষ এনে আমরা এখানে বসাই। আমাদের এক বেলা খেয়ে উঠে পরের বেলার কথা ভাবতে হয়; বাইরের থেকে লোক এসে আমাদের জমির ভাগ নিতে চাইলে আমরাইতো প্রথম বাঁধা দেব।” –আণ্ডাভাঙা চরের যুবক আবুল কালাম আমাদের কথার মধ্যে আবেগের সঙ্গে এই কথাগুলো বলে গেল। প্রায় সত্তর হাজার মানুষের বসতি এই বিস্তৃত চর অঞ্চলটিতে সরকারী কার্যালয় বলতে কিছু নেই। সরকারের স্থায়ী উন্নয়নমূলক কাজ বলতে শুধু জনস্বাস্থ্য বিভাগের দমকল ক’টি। কাছুমারা চরের মহঃ শহীদ আলির ভাষাতে, এসব অঞ্চলে নিয়মিত সরকারী লোক একজনি আসেন—তিনি হচ্ছেন খাজনার তাগাদা দেবার লোক মৌজাদারের প্যাদা। কাছুমারা, খোলাবান্ধা, মহচরা ইত্যাদি চরের পুরোনো বাসিন্দারা আগে নগরবেরার বাজারে জিনিসপত্র কেনাবেচা করতেন। ১৯৭৯ সন থেকে নগরবেরার স্থানীয় মানুষ সেই বাজারটি চর অঞ্চলের মানুষকে ব্যবহার করতে মানা করাতে শুরুতে মানুষের দুর্দশার অন্ত ছিল না। পরে উপায় না পেয়ে তারা চর অঞ্চলের ভেতরে মহচরাতে বাজার একটা বসালেন। বহরির মতো জায়গাগুলো থেকে বাঙালি ব্যবসায়ীরতা সাপ্তাহিক বাজারের দিন নৌকো করে সেখানে এসে কেনাবেচা করে চলে যায়। বাজারে স্থানীয় মানুষের চায়ের দোকান আছে। কিন্তু বাইরে থেকে একদিনের জন্যে আসেন এই যে ব্যবসায়ীরা তারা স্থানীয় মানুষের দোকানে চা খেয়ে তাদের দুটো পয়সা লাভ করতে দেন না। নৌকা করে আসতে সঙ্গে করে  নিজেদের চায়ের দোকানী নিয়ে আসেন। এমন কি বাজারের দিন চা-জলপানের জন্যে যে টাকা পয়সা ব্যয় হয় সেগুলোও তারা এভাবেই ফিরিয়ে নিয়ে যান। পুরো অঞ্চলে মানুষগুলোর সুবিধের জন্যে একটি মাত্র ডাক্তার খানা আছে। ১৯৮২ সনের বন্যাতে ডাক্তারখানা ভেঙ্গে নিয়ে যাবার পর আজ চারবছর ধরে সরকার নতুন একটা ঘর তৈরি করে দিল না। পশু চিকিৎসা কেন্দ্রের ছোট্ট ঘর একটাতে  এতো দিন ধরে ডাক্তারখানাটি চলছে। রাস্তা-ঘাট বলতে এসব অঞ্চলে কিছুই নেই—বিস্তৃত বালির উপর বহু মাইল জোড়া রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে আর নৌকো করে একটা চর থেকে অন্য চরে যেতে হয়বরপেটা শহরের থেকে এই চরগুলোর দূরত্ব প্রায় পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার। কিন্তু কিছু কিছু  চর থেকে বরপেটা যেতেই দু’দিন লাগে।
পমুয়া মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষার প্রভাব অত্যন্ত কম হবার জন্যে এবং তাদের সমাজে বহুবিবাহ প্রথা এখনো গ্রহণযোগ্য হবার জন্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক ভাবে বেশি। ভেতরের চরগুলোতে একেকজন মানুষের এগার-বারোটা করে সন্তান থাকাটা এখনো স্বাভাবিক বলেই ভেবে নেন। সেজন্যেই, অসমের অন্য অঞ্চল থেকে এসব অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বহু বেশি। ফলে, মূল স্রোতের জন্যে রাজনৈতিকভাবে অনিষ্টকারী বলে বিবেচিত হওয়া ভোট বেঙ্কগুলোও ক্রমান্বয়ে একই হারে বেড়েই চলেছে।
ভোটার তালিকার বৃদ্ধির হার এবং নতুন করে ভোটার তালিকাতে নাম যাদের ঢুকেছে তাদের নাগরিকত্ব পরীক্ষা করবার জন্যে গেলবার শতকরা প্রায় নব্বুই ভাগ ভোটারের বিরুদ্ধে বিদেশী বলে অভিযোগ ছিল এমন চারটা চরে আমরা গেছিলাম—মহচরা, পূব মহচরা,  শিমূলবাড়ি এবং কাছুমারা। এই ক’টি অঞ্চলে পুরোনো বাসিন্দাদের থেকে আমরা নতুন এবং পুরোনো ভোটারের তালিকা সংগ্রহ করে বৃদ্ধির হার পরীক্ষা করে দেখেছিলাম। এই কয়েকটি শহরে  ১৯৭০-৭১ সন থেকে ১৯৮৫ সন অব্দি ভোটারের শতকরা বৃদ্ধির হার বড় বেশি অস্বাভাবিক নয়।  যেসব ভোটারের  নাম ১৯৮৫ সনের ভোটার তালিকাতে আছে, অথচ ১৯৭০-৭১ সনের তালিকাতে নেই, তাদের নামও আলাদা করে বের করে পরীক্ষা করে দেখেছিলাম । এই শ্রেণিতে অধিকাংশের বয়স ৩৫ থেকে কম। অর্থাৎ ১৯৭০-৭১ এ বয়স  ২১ বছরের কম হবার জন্যে ভোটার তালিকাতে এদের নাম ঢোকেনি।  ৩৫ বছরের নিচের এই ভোটারদের পরিবারের কারো  নাম ( মা বা বাবা) ১৯৭০-৭১এর ভোটার তালিকাতে  আছে না নেই, সেটিও আমরা পরীক্ষা করে দেখেছিলামমুরব্বীদের স্থানীয় বাজারে বসিয়ে নিয়ে আমরা ভোটার তালিকাগুলো একদিক থেকে পরীক্ষা করেছিলাম। তারা আমাদের সবরকম ভাবে সাহায্য করেছিলেন। আমাদের লোকে যেখানে ঢুকতে ভয় করে, সেই ‘বিদেশি অধ্যুষিত অঞ্চল’ রূপে খ্যাত জায়গাতে এভাবে পুলিশের সাহায্য না নিয়ে  আমরা ভোটার তালিকা পরীক্ষা করে এসছি --এই কথাটা এখনো অনেকেই নিশ্চয় অবিশ্বাস্য ঠেকবে। ৩৫ বছরের যাদের নাম ১৯৮৫ সনের ভোটার তালিকাতে আছে, অথচ ১৯৭০-৭১ সনের তালিকাতে নেই, তাদের কেসগুলোও আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে পরীক্ষা করেছিলাম। মহচরার দাবু শেখের নাম ১৯৮৫ সনের ভোটার তালিকাতে (ক্রমিক নম্বর ৩৯০) আছে,  কিন্তু ১৯৭০-৭১ সনের তালিকাতে তাঁর নাম পেলাম না। পুরোনো তালিকা পরীক্ষা করে দেখা গেল যে ১৯৫৫ সনের ভোটার তালিকাতে কিন্তু ( ক্রমিক নং ৬৬) তাঁর নাম আছে। পূব মহচরার রমজান আলির নাম ১৯৮৫ সনের ভোটার তালিকাতে আছে, কিন্তু আগের কোনো ভোটার তালিকাতে নেই। পরে পরীক্ষা করে দেখা গেল যে তাঁর নাম সরভোগ সমষ্টির ভোটার তালিকাতে ছিল। এরকম অনেক ব্যক্তিকে আমরা পেলাম যাদের নাম ১৯৭০-৭১ সনের বা তার আগের ভোটার তালিকাতে আছে, কিন্তু ১৯৮৫র ভোটার তালিকাতে নেই। কাছুমারা চরের বাসিন্দা সুতকা ফকিরের ( বয়স ৫২ বছর, বাবার নাম জাবেদ) নাম ১৯৭৭সনের ভোটার তালিকা ( ক্রমিক নং ৩২৬) এবং ১৯৮৫ সনের ভোটার তালিকাতে ( ক্রমিক নং ৬৪৯) আছে, কিন্তু তাঁর স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের নাম গেলবার ঘরে ঘরে গিয়ে প্রস্তুত করা তালিকাতে ছিল যদিও শুনানির পর তালিকার থেকে এদের নাম বাদ পড়ে। সুতকা ফকির আমাদের দেখান, নথি-পত্রে মঙলদৈ নির্বাচনী কার্যালয়ের মুখ্য সহায়ক ২৫-১০-৮৫ তারিখে দেয়া প্রমাণ পত্রে ৭২ নং মঙলদৈ বিধানসভা সমষ্টির ১৯৬৬সনের তালিকাতে সুতকা ফকির এবং তাঁর স্ত্রী নূরজাহানের নাম আছে বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর হাতে রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জীতে নাম থাকার প্রমাণ পত্রও আছে। শুনানিতে এসব নথিপত্র  দাখিল করা সত্বেও তাদের নাম বাদ দেয়া হলো। পূব মহচরার বাসিন্দা মছিমুদ্দিন এবং তাঁর স্ত্রী রাবেয়া খাতুনের নাম ১৯৭০ সনের ভোটার তালিকাতে ছিল ( ক্রমিক নং ২৬২ এবং ২৬৪) গেলবার ঘরে ঘরে গিয়ে যে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয় তাতেও তাঁর নাম ছিল ( ক্রমিক নং ২১৫ এবং ২১৭)কিন্তু, ১৯৮৫ সনের মূল ভোটার তালিকাতে তাদের নাম উঠেনি। সংযোজন ২-অতে যা দেখলাম তার আরেকটা উল্লেখ করবার মতো দিক হচ্ছে যে তিনটা চরেই ১৯৭০ সন থেকে ১৯৮৫ সন অব্দি বেড়ে যাওয়া ভোটার সংখ্যার থেকে ১৯৮৫ সনের ৩৫ বছরের নিচের ভোটার সংখ্যা ( অর্থাৎ স্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়া ভোটারের সংখ্যা) অধিক। এর সম্ভাব্য কারণ, দুটো হতে পারেঃ ১৯৭০ সনের ভোটার তালিকাতে থাকা কিছু লোক হয়তো নদীতে মাটি ধ্বসিয়ে নিয়ে যাবার পর অন্য জায়গাতে  উঠে গেছেন, এবং অথবা কিছু প্রকৃত নাগরিকের নামও ভোটার তালিকার থেকে বাদ পড়ে গেছে।
গেলবার ভোটারের তালিকা সংশোধনের সময় আমরা এসব  জায়গাতে ঢুকে পুরোনো মানুষদের বিশ্বাসে নিয়ে অনায়াসেই নতুন করে আসা মানুষ কেউ যদিওবা আছেন , শনাক্ত করে বের করতে পারতাম। কিন্তু তা না করে, হয়তো দূরের থেকেই  আমরা একদিক থেকে সবার নামে বিদেশী বলে অভিযোগ এনে নতুন-পুরোনো প্রব্রজনকারী সবাইকে একত্রিত হতে বাধ্য করলাম। বিদেশীর বিরুদ্ধে অভিযোগ  তোলবার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও যেন ছোট ছোট স্কুল ছাত্রদের উপর অর্পন করা হলো এবং তারাই যেন সমস্ত বিষয়টিকে ফূর্তী হিসাবে নিয়ে একদিক থেকে সবার নামে অভিযোগ দিয়ে গেল। কিন্তু তেমন কিছু অবিবেচকী কাজে সমগ্র জাতিগঠন প্রক্রিয়াটিকের উপরেই কেমন সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে, সে কথা বুঝিয়ে দিতে জানাবোঝা কোনো মানুষ বেরুলো না। শুধু বাগবর সমষ্টিতে বিদেশী বলে পঞ্চাশ হাজারের থেকে অধিক ভোটার তালিকার থেকে বাদ গেল। এরা এখনো বিভিন্ন পর্যায়ে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করেছেন। ভেতরের চর অঞ্চলে আছেন এমন সম্ভাব্য বিদেশীকে শনাক্ত করতে হলে সরকার কিম্বা জনগণ দুই পক্ষকেই এসব অঞ্চলের পুরোনো বাসিন্দাদের বিশ্বাসে নিতেই হবে; এর অন্যথা হলে বিদেশী শনাক্তকরণ দূরের কথা , বরং পুরোনো মানুষগুলোকেও বিপর্যস্ত করে জাতি-গঠন প্রক্রিয়াটির উপর দীর্ঘম্যাদী ঋণাত্মক প্রভাব ফেলবার মতো হবে। তিন কিলোমিটার ব্যাসার্ধের বাইরে থেকেও বিদেশীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারার জন্যে ১৯৮৩ সনের অবৈধ প্রব্রজন আইনটি সংশোধনের জন্যে যে প্রস্তাব আনা হয়েছে, সেটি দিয়ে মাইল কয় দূরের বহরিবাসী মানুষের কথাতো বাদই, গুয়াহাটির মানুষও এমন কি বাড়িতে বসে  আণ্ডাভাঙ্গা চর বা কাছুমারা চরের বাসিন্দার বিরুদ্ধে নাগরিকত্বের অভিযোগ আনতে পারবেন।

--- ---
টীকাঃ ১) পমুয়াঃ অসমিয়া অর্থ ‘পামত থাকি খেতি করা খেতিয়ক’ ‘পাম’ শব্দটি ফার্ম থেকে আসা সম্ভব। সেখান থেকে পূর্ববঙ্গের ময়ময়মন সিংহমূলের মুসলমানদের আরেকটি পরিচয়’ পমুয়া মুসলমান’
২) ছাত্র সংস্থাঃ সারা অসম ছাত্র সংস্থা( আসু)র স্থানীয় শাখা।
৩) চাপরিঃ ছোট জনবসতি পূর্ণ চর।
৪) গাওঁবুড়াঃ জনতার স্বেচ্ছা নির্বাচিত পরম্পরাগত গ্রামপ্রধান।

Thursday, 2 August 2012

বডোল্যান্ডের জনগোষ্ঠীগত সংঘাত সম্পর্কে

                 গেল বারো বছরে অসমে সরকারী হিসেবে ৪২৪ জন লোক মারা গেছেন, ৫০,৭০০০ লোক গৃহহারা হয়েছেন। গোষ্ঠীগত সংঘর্ষে। এদের সিংহভাগ মুসলমান। মুসলমান মরলেই বলা হয়, এসব অনুপ্রবেশকারীর কাণ্ড। তাই যদি হয় তবে কি এটা ভালো নয়, তারা আসুন দলে দলে বাংলাদেশ থেকে আর স্বধর্মীয়-স্বজাতীয়দের মেরে কেটে তাড়িয়ে দিন, সংখ্যা কমে যাবে অনুপ্রবেশকারীর? এক কালে অসমের সমস্ত উগ্রপন্থী দলগুলো সম্পর্কে জনপ্রিয় অভিযোগ ছিল এরা আই এস আই-র সহযোগী। এখন যখন এরা আত্মসমর্পণ করে আলোচনার টেবিলে এসছেন, সব্বাই হিন্দুত্ববাদীদের বন্ধু হয়ে গেছেন। একজন গান ধরলে অন্যজন দোহার দিচ্ছেন। আর সেই সব মুসলমান উগ্রপন্থীর দল গেল কোথায়! যাদের কথা, এই সেদিনও ঘন ঘন শোনা যেত? তারা যে কেউ আত্মসমর্পণ করল না, ধরাও পড়ল না আলোচনার টেবিলেও এলেন না। অথচ , কৈ বিএলটি, এন ডি এফ বি, আলফা কেউতো বলে না আমাদের ধরে এনেছো, মুসলমান উগ্রপন্থীদের ছেড়ে দিলে যে! বাংলাদেশ সরকার এদের ধরিয়ে দিলে বলে কাগজে কাগজে কত প্রশংসা প্রশস্তি! কিন্তু কেউতো জিজ্ঞেস করেনা, ও মেডাম হাসিনা, আপনি দেখি মুসলমান উগ্রপন্থীদের বেশ লুকিয়ে রেখেছেন! বলবে কি, বলবার মুরোদ থাকলে তবে তো! ঝুলির বেড়াল যে বেরিয়ে যাচ্ছে। এবারে তাই কেউ মুসলমান উগ্রপন্থীর নাম না নেয়াটাই নিরাপদ ভাবছেন। পারেও বটে হিন্দুত্ববাদীরা। এমনি হয়, এদের আখ্যান নির্মাণ!

             লেখার শুরুতেই একটা কথা স্পষ্ট করে দিতে চাই। অসমের বডোল্যান্ডের বর্তমান সংঘাতটা মোটেও হিন্দু মুসলমান লড়াই নয়। বডো পক্ষে হিন্দু-খৃষ্টান দুইই আছেন। কিন্তু গোটা পূর্বোত্তরেই জনজাতিআধিপত্যের রাজনীতি যারা করেন তাদের অন্য অনেক লক্ষ্য থাকলেও মুসলমান এক প্রিয় টার্গেট। বন্ধুদের মনে থাকবে বছর কয় আগে অরুণাচল থেকে প্রবল বাংলাদেশীবিতাড়ন শুরু হয়েছিল। পরে অসম সরকার-ই বলেছে, এরা সবাই ভাটি অসমের মুসলমানশ্রমিক। বডোল্যান্ডে আপাতত দৃশ্যত এটা বডো-মুসলমান এই দুই পরিচিতির সংঘাত। এতে কোনো পক্ষেই ধর্মবিশ্বাসের কিছু করবার নেই। এটা হয়তো অনেকেই জানেন নাযে প্রাক্তন বি এল টি হচ্ছে হিন্দু (ব্রহ্ম) পক্ষ, আর এন ডি এফ বি হচ্ছে মোটা দাগে খৃষ্টান পক্ষ। ২০০৮এর উদালগুড়ি দাঙ্গাতেও দেখা গেছিল, একদিকে মুসলমান-অন্যদিকে সমস্ত হিন্দু। যদিও অন্তর্বস্তুতে সেটিও ছিল বডো শাসকের তরফে নির্জাতিকরণের কৌশল। কিন্তু তখন বিটিএডি হয়েছে মাত্র । রাজ্য দাবির লড়াই থাকলেও আজকের মতো জোরালো হয় নি। ওদিকে কিছুদিন আগেই উজান অসমে আরেকবার ‘অনুপ্রবেশ’-এর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অসম আন্দোলন শুরু করেছিল কিছু জাতীয় ছাত্র সংগঠন। সুতরাং এক তরফা মুসলমান বিরোধী (এভাবে অবশ্য এরা বলেন না, বলেন ‘অনুপ্রবেশকারী মুসলমান’) একটা আবেগ তৈরির প্রয়াস রাজ্য জুড়েই সফল হয়েছিল। তাতে বাঙালি হিন্দু পক্ষও যোগ দিয়েছিলেন।

                  কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরো আলাদা। এখন বাকি সমস্ত হিন্দু নীরব। বিজেপি ছাড়া।  হ্যা, তাঁরা শান্তি শান্তি করছেন। এটাতো করতেই হবে। কিন্তু সেগুলো আমসুর (মুসলমান) মতো সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে। বাদ দিয়ে নয়।উদালগুড়ি দাঙ্গার সময় আমসু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল। এখন আবসুর মতো সংগঠনও আমসুকেই বেশি কাছে টানছে। এই দাঙ্গার উত্তেজনা মোটেও বাকি অসমে ছড়ায় নি।শিবসাগরে মানুষ উত্তেজিত রেকিবুদ্দীন হত্যা এবং সেনার হাতে দুই ছাত্রীর অপমান নিয়ে। সেখানে হিন্দু মুসলমান একজোট হয়ে বিশাল লড়াই লড়ছেন। এটা কেন হচ্ছে? সোজা কথা হচ্ছে, এখন বাকি হিন্দুরা দেখছেন এই মুসলমানেরাই বডোল্যান্ড আটকাবেন। বাঙালি হিন্দু সংগঠনগুলোও। আমসুর সঙ্গে এরাও আছেন অনাবডো মঞ্চে। অসমিয়ারাও। আর ঠিক তাই তরুণ গগৈ যখন বলছেন এই দাঙ্গাতে বাংলাদেশীদের মদত নেই তখন মূল স্রোতের অসমীয়া কাগজ সমালোচনা করছে, এটা তেমন দেখিনি। এই সব কথা যদি কারো তাত্ত্বিক মনে হয় আমার কিছু করবার নেই।

               মুসলমান তবে মার খাচ্ছে কেন?  বা কারো কারো যেমন দাবি মুসলমানেরাও পালটা মারছেন, এটা হচ্ছে কেন? আমি মনে করিয়ে দিই, ৯০ দশকে সাঁওতালেরাও মার খেয়েছিলেন। খেয়ে কোবরা মিলিটেণ্ট ইত্যাদি সংগঠন গড়ে পালটা জবাব দিয়েছিলেন। তাই ওদের গায়ে সরাসরি হাত তোলবার সাহস আর হয় না। কোচেরাও মার খেতে পারতেন, কিন্তু তাঁরাও পৃথক কামতাপুরের দাবিতে পশ্চিম বাংলা অব্দিসংগঠন গড়ে তোলেছেন। তৃতীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠীটি হচ্ছেন মুসলমান যারা সোজা অসমের অখণ্ডতার পক্ষে দাঁড়িয়ে অনাবডো আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মুসলমানের এইভূমিকা যদি একবার ঐতিহাসিক ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় তবে যে রাজ্যদাবীর লড়াই দুর্বল হবে তাই নয়, অসম তথা পূর্বোত্তরের রাজনীতির অনেক কিছুই পাল্টেযাবে। তাই এদেরকে শিক্ষা দেবার আয়োজন। মুসলমান জনতার মনে ভীতি ঢুকিয়ে দেওয়া।ভাবা গেছিল এতে আগের মতোই দেশজোড়া হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিক এবং প্রচারমাধ্যমের সমর্থন পাওয়া যাবে। তা গেছেও,অনেকটা। কিন্তু খেলা বিগড়ে গেছেঅসমেই। আপাতত, এই সংঘাত থেমে যাবে। কিন্তু মনে হয় না, অসমের রাজনীতি আরআগের মতো থাকবে। এবারে সেণ্টার স্টেজে মুসলমান! হয় মেনে নাও, নতুবাবডোল্যান্ড হারিয়ে বসো। যা হবে অসমীয়াদের পক্ষে এক মরণ আঘাত।

                 এবারে এই বডো, কোচ, সাঁওতাল, বাঙালি হিন্দু ( সাধারণভাবে বর্ণহিন্দু বাদ, কেননা তারা কলকাতায় ফ্লাট কিনে রেখেছেন অনেকেই) সবাই নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর লোক।তবে তারা এই মারামারি করছেন এটা কি ভালো হচ্ছে? নিশ্চয়ই হচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে বডোল্যান্ড লড়াইকে সমর্থন দেবেন না অন্যেরা, এটাওতো স্পষ্ট।কামতাপুরে্র পক্ষেও দাঁড়ানো মুস্কিল। কারণ জায়গা প্রায় একই। ওদিকে বাকিদের ভোটের রাজনীতিতে সামান্য প্রভাব থাকলেও, বডোদের আকাঙ্খাকে অনেকটাই স্বীকৃতি দিয়ে যে শাসক শ্রেণির ছোট সহযোগী করে ফেলা হয়েছে এটাতো স্পষ্ট। তবে বাকিদের তুষ্ট করবার উপায় কী? না করলেতো লড়াই চলবেই। হিন্দু বাঙালিরাও যতটা নিরাপদে গুয়াহাটি থাকতে পারেন তত নিরাপদে নেই বডোল্যান্ডে। নিশ্চয় সেগুলো দীর্ঘদিনের বডোদের প্রতি বাঙালি বর্ণহিন্দুদের করা অবজ্ঞার প্রতিক্রিয়া।কিন্তু সে প্রতিক্রিয়া বড়ো সুখের নয়। নিত্যদিন দাবী ধমকি হুমকির মুখে থাকতে হচ্ছে। যদিও বাঙালি হিন্দু ছোট জনগোষ্ঠী বলে এখনই সম্প্রদায় হিসেবে আক্রান্ত নন। তেমনি অবস্থা অসমিয়া মধ্যবিত্তদের-ও। অসমিয়া ভাষা আক্রান্ত হচ্ছে । অসম সাহিত্য সভা নীরব থাকছে। শান্তি শান্তি আর মিলন মিলন বলে কোনো স্থায়ী সমাধান বেরুবে না। বডোল্যান্ড মেঘালয় নয়। মেঘালয়ে গারো খাসি সংখ্যাগুরু ছিলেন। বডোল্যান্ডে অবস্থা অন্যরকম। এখানে অনাবডোরাই সংখ্যাতে বেশি। সুতরাং সংঘাত রাজ্য হলেও থামবে এটা অনাবডোরা মেনে নিতে পারছেন না।তাই গড়ে উঠেছে অনাবডো সুরক্ষা মঞ্চ। রাজ্য দাবীর একতরফা বিরোধিতার মধ্যেও এর সমাধান নেই। সমাধান করতে গেলে সব জনগোষ্ঠীকে একটা সমঝোতাতে আসতে হবে, সেই সমঝোতা হলো মুখের কথাতে নয়, সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সহ সমস্ত কিছুতে ছোট বড় সমস্ত জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং আকাঙ্খাকেমর্যাদা দিতে হবে। তার জন্যে গ্রাম অব্দি আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন, সংরক্ষণ, কোচেদের আর আদিবাসীদের জনজাতির মর্যাদাকে স্বীকার করে নিতে হবে। আর সেটিযদি সত্যি করাই যায় তবে আর অসম থেকে বেরিয়ে যাবারো দরকার থাকবে না কারো।হ্যাঁ, অনুপ্রবেশ সমস্যারও চিরদিনের জন্যে সমাধানের জন্যে সবাইকে আন্তরিক হতে হবে, একে বাহানাবাজির জন্যে ব্যবহার চিরতরে বন্ধ করতে হবে। আজই দেখলাম, বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার স্বার্থে বাংলাদেশও এই নিয়ে ভারতের সঙ্গে কথা বলতে রাজী হয়ে গেছে। এখনি সবার মুখোশ খসে পড়বে এই নিয়ে।

               অনেকেই বলছেন, অনুপ্রবেশ একটা সমস্যা।কিন্তু ১৯৮৫তে অসম চুক্তির পরেও এতো বছরে এইসমস্যাটা টিকে আছে কেন জবাব দিলে পারেন। মাঝে কিন্তু ক্ষমতাতে অগপ-বিজেপি ছিল। কংগ্রেস নিজেই সেই চুক্তি করেছিল। আসলে ওটা এক বাহানা, টিকিয়ে রেখে বাহানাবাজি করতে সব্বাই ভালোবাসে। মুসলমানেরাই এখন দাবী করেন বাংলাদেশ সীমান্ত সিল করো, নাগরিক পঞ্জী চালু করো, কে শোনে কার কথা।

                 গেল কয়েক সপ্তাহের অসমের যেকোন কাগজ খুললেই দেখা যেত বডোল্যান্ডে রাজ্যদাবি এবং তার বিরোধীদের মধ্যে ছোট খাটো সংঘাত হয়েই চলেছে। এগুলো এরই ধারাবাহিকতা। এবারে,  অনেকে বলছেন , এহচ্ছে জি এস রোড কাণ্ড থেকে চোখ ঘুরিয়ে দেবার ফন্দি। যদি মেনেও নেই, তাহলেও প্রশ্ন এতো বড়ো সংঘাতকে অসমিয়া মধ্যবিত্ত যে এই ঘুরিয়ে দেবার ফন্দি হিসেবে দেখছেন বা তরুণ গগৈ আর হেমন্ত বিশ্বের রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে এই আশ্চর্য ঘটনাও গেল কয়েক দশকের অসমের রাজনীতিতে ঘটে নি। মুসলমান তথা বাংলাদেশি গালি দেবার এতো সুবর্ণ সুযোগ প্রচার মাধ্যম বা হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি এর আগেএভাবে ছেড়ে দেয় নি! এমনকি ৩০ অক্টোবর, ২০০৮ এ যখন রঞ্জন দৈমারীর এন ডি এফবি তিন শহরে বোমা ফাটিয়ে প্রচুর লোক মেরেছিল তখনও গোটা অসমে প্রতিবাদের ঢেউউঠেছিল প্রথমে এই বিশ্বাস থেকে যে কাজগুলো বাংলাদেশি সন্ত্রাসবাদীদের কাজ।পরে যখন ধরা পড়ল যে এটা এন ডি এফ বির কাজ তখন সবাই চুপ। হ্যাঁ, রঞ্জনদৈমারিকে তাই আত্মসমপর্ণের পর এখনো সরকার অরবিন্দ রাজখোয়াদের মতো খোলা হাওয়াতে ঘুরে বেড়াবার অনুমতি দেয় নি। কারণ দিলে অসমিয়া মধ্যবিত্ত এটা মেনেনেবে না।

                        যদি কারো কারো এই দাবি মেনেও নিই  যে মুসলমানেরাও সমানে মারছেন, তারপরেও তর্ক আছে, প্রশাসনিক নীরবতা, যার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবও বলেছেন সেই নীরবতা বা ব্যর্থতা কার পক্ষে কাজ করেছে? কার হাতে আছে? মুসলমান পক্ষে? বিটিএডিপ্রশাসনের ভূমিকা কী? তারা কি প্রশাসনে প্রভাব খাটাতে ব্যর্থ? প্রাক্তন বিএলটি আর এনডি এফ বি কি অস্ত্রগুলো জমা দিয়ে দিয়েছে? তাহলে সমানে সমানে লড়াই হলো কী করে? আপনাদের কি মনে হচ্ছে আমি এক পেশে কথা বলছি? না , নানা দিক থেকে সত্যকে বের করে আনবার প্রয়াস করছি? হ্যাঁ, মুসলমানেরা প্রতিরোধ করেছেন, এটা সত্য। সাম্প্রতিক ছোট খুনোখুনি নিয়ে আমসুর অসম বন্ধের ডাক আগুনে ঘি দিয়েছিল। কিন্তু পালিয়েছেন তার চেয়ে অনেক বেশি। যত শরণার্থী শিবির হয়েছে তার অধিকাংশই মুসলমান।

                          আরেকটি মজার তথ্য দিই, পূর্বোত্তরে যেহেতু সামন্তীয় সমাজ জাঁকিয়ে বসবার আগেই আধুনিকপুঁজিবাদী সমাজ চেপে বসেছে, জনজাতিরা  কৃষি জমি থেকে বেরুলেই আরকায়িক শ্রম করতে চান না। এদের মধ্যে ধোপা,নাপিত, মুটে, মিস্ত্রি এগুলো নেই।এই কাজগুলো করেন হয় এই সব মুসলমান, নতুবা ঝাড়খণ্ডী আদিবাসি, নতুবা বিহারি হরিজন। আর এই প্রত্যেকটা জনগোষ্ঠীই অত্যন্ত সস্তা দরে শ্রম দেন। শ্রমের জন্যে এদের ডাক পড়ে, আবার সময় হলে মেরেকেটে তাড়িয়েও দেয়া হয়।কেন তাড়ানো হয় কেন? দুটো কারণ, তাতে এইসব শ্রমিকদের দর কষাকষির ক্ষমতা কমে যায়। এতো ভয়ে ভয়ে থাকে যে ৫০০ টাকার কাজ করিয়ে আপনি ১০০ টাকাও কখনো বা ধরিয়ে দিতে পারেন। রিক্সাওয়ালাকে, 'যা বেটা! বাংলাদেশী!' বলে আপনি টাকা না দিয়েও চলে যেতে পারেন। আর দুই হলো, এঁরা স্থায়ী হয়ে গেলে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে দেবেন এবং আধিপত্যকামী জনগোষ্ঠীর স্বার্থব্যহত করবেন এই ভয় লেগেই থাকে। এহলো অর্থনীতি আর রাজনীতির সংঘাত। বিশ্বহিন্দু পরিষদের মন্দিরগুলো তৈরি করতেও তথাকথিত বাংলাদেশী শ্রমিকেরই ডাক পড়ে - এই হলো মজা! বডোল্যান্ড থেকে প্রচুর মুসলমান আগকার দাঙ্গাগুলোর সময়ে চলে গেছিলেন। অসমের অন্যত্র। কয়েক হাজার এখনো শরণার্থী শিবিরে রয়েছেন।কিন্তু বডোল্যান্ড টেরিটরিয়েল এরিয়া হবার পর অনেক পরিকাঠামোর কাজ হচ্ছে।তাতে বডো যুবকেরা মাঠ ছেড়ে ঠিকাদারিতে হাত দিচ্ছেন। শ্রমিক হিসেবে মুসলমানফিরে আসছেন।মুসলমান আরো আসছেন এদের ফাঁকা ধানের মাঠে চাষাবাদ করতে। সঞ্জীব বরুয়ার একটা বই পড়েছিলাম অনেক আগে। তিনি লিখেছিলেন এই 'অনুপ্রবেশকারী' চাষারা গোটা পূর্বোত্তরে এক নতুন কৃষি বিপ্লব নিয়ে এসছেন। পাহাড়েও ঝুমচাষের জায়গাতে এরাই গিয়ে ভূমি শ্রমিক হয়ে স্থায়ী চাষাবাদের প্রচলন করছেন।সুতরাং একাংশ বডো রাজনীতিবিদ এই মুসলমানকেতাড়ালেন বটে, অন্য অংশ দু'দিন পরেই আবার এদের ডেকেও আনবেন। মুসলমানের হাতথেকে অসমের গ্রামীণ অর্থনীতির, এমনকি, আধুনিক উন্নয়ন কামী অর্থনীতিরও কোনো সহজ মুক্তি নেই। কারণ শ্রমের এরাই মূলত মালিক। কোনো ভট্টাচার্য, চক্রবর্তী, কর, ধর, বরঠাকুর, গগৈ, ব্রহ্ম, বসুমাতারি কায়িক শ্রম করে না তেমন!হ্যাঁ, করতেন, ধান চাষ ছাড়াও কিছু কিছু তাঁত শিল্পের কাজতো ছিলই । কিন্তু সেগুলোও এখন কলের কাপড় নিয়ে গেছে। আর ছিল পুরোনো ধরণের ঘর বানাবার শ্রম।আজকাল আর সি সি-র যুগে আসাম টাইপ ঘর-ই উড়ে গেছে, অন্য জনজাতীয় ঘরবাড়ির আর কি বা কথা! আর সি সি পাকা ঘর? মুসলমান ছাড়া কে বানাবে? আমি জানি না।

                ২৭ জুলাইর আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়তে পড়লাম প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র সচিব ‎"পিল্লাইয়ের কথায়, “স্বশাসিত পরিষদে বড়ো-রাই বিশেষ সুবিধা, রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করে। তবে ওঁরা সকলকে নিয়েই চলার চেষ্টা করেন। কারণ ওঁরা জানেন যে, ওঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নন। মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪০% বড়ো জনগোষ্ঠীভুক্ত।বড়ো-রা ছাড়া ওখানে বাঙালি, নেপালি, সাঁওতাল, ছোট ছোট আদিবাসী গোষ্ঠীও রয়েছে।”

"পিল্লাইএর এই বক্তব্যের মধ্যে সত্যও আছে ফাঁকিও আছে।( আনন্দবাজার সম্পাদকীয়ঃ) ৪০%বডো এটা সত্য, এই অর্থে সত্য যে এরাই সংখ্যালঘু। শতাংশের হিসেব তার চে'ও কম হবে। এরা রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করেন এটাও সত্য। 'তবে ওরা সকলকে নিয়ে চলার চেষ্টা করেন' এটা মিথ্যে। মিলিয়ে চলা মানে -ধমকে ঠাণ্ডা রেখে। আর নতুবা এরকম নৃতাত্ত্বিক সাফাই অভিযান চালিয়ে।

              বাংলাদেশে যে বাঙালি মুসলমান শাসনে আছেন তাদেরই সবচে’ দরিদ্র অংশটি এক কালে অসমে এসছিলেন ময়মনসিংহ থেকে চাষাবাদের জন্যে। তখন অবশ্যি গোটা বাংলাদেশেই মুসলমান মূলত কৃষক ছিলেন। সেই থেকেই এরা এখানে কেবল কৃষকই থেকে যান নি, এদের বিরুদ্ধে মায়ানমারের রোহিঙিয়ার মতো প্রচার দিয়ে সবচে অস্পৃশ্য এক শ্রেণি করে রাখা হয়েছে।দেশভাগের আগে থেকেই একাংশ প্রচার চালাচ্ছিলেন এরা থাকতে অসমীয়ার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। ৭৯ থেকে ৮৫ অসম আন্দোলনেরও মূল বিষয় ছিল এই। বলা হয়, এরাপ্রতিনিয়ত বাংলাদেশ থেকে আসছেন। এরা ইসলামীস্তান বানাবেন ইত্যাদি হাজারো অপপ্রচার আছে। আজ অব্দি যত বাংলাদেশি আইনত বের করা গেছে তার সংখ্যা ১০০০ ছাড়াবে না। খরচ কিন্তু কয়েক হাজার কোটি টাকা।মোদ্দা কথা এই সব প্রচার দিয়ে এদের সস্তা শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার খুব সহজ হয়। আইনত এদের ভোটাধিকার থাকলেও সামাজিক অধিকার এদের প্রায় শূন্য। বাংলাদেশের আদিবাসিদের মতোই। কেবল রাষ্ট্র নয় বর্ণহিন্দু অপপ্রচার এবং সেই প্রচারে প্রভাবিত জনজাতিদেরকেও ভয় করে বাস করতে হয় এদের।

            জনজাতিদের অবস্থাও যে খুব ভালো তা নয়। এরাও অতিদরিদ্র। ইতিহাসের দীর্ঘ পর্যায় জুড়ে এরা যেমন বাংলাদেশে, উত্তরবাংলাতে তেমনি অসমে বা পূর্বোত্তরেও নানা ভাবে বঞ্চিত। কিন্তু এখানে ‘কিন্তু’ আছে। এখানে হাজার রকমের জনজাতি বাস করেন। এদেরই মধ্যে আপাত সংখ্যাতেবেশি যারা তাদের সঙ্গে আপোস করে শাসনের সহযোগী করে নেবার চাল চিরদিনই চালিয়ে গেছে ভারতীয় বা স্থানীয় বর্ণহিন্দু শাসক শ্রেণি। তাই ইতিমধ্যে গড়েউঠা বহু জনজাতীয় রাজ্যেই ছোট জনজাতীয়দের দাবিয়ে রাখার কাজ বড়ো জনজাতীয়রাই করেন। যেমন কোচেদের জনজাতি বলে কোনো স্বীকৃতি নেই। এই দাবী জানালে বডোরাই এর বিরোধিতা করেন। বডোদের স্বশাসন দিয়ে তাদের শাসনের সহযোগী করে ফেলা হয়েছে। যেমন গোর্খাল্যাণ্ডে গোর্খাদের সহযোগী করে লেপচা ভুটিয়াদের দাবিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সমস্ত জনজাতীয় এবং সংখ্যালঘু ঐক্য যাতে না গড়ে উঠে এটা ভারতীয় শাসক শ্রেণি সুকৌশলে সুনিশ্চিত করে। বাঙালি-বিহারি-মারাঠি-গুজরাটি-অসমিয়া বর্ণহিন্দু শ্রেণিটি এই সুকৌশল খুবপছন্দ করেন। গোটা পূর্বোত্তরে প্রায় সমস্ত জাতি জনজাতিদের উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ছিল বা আছে। ব্যতিক্রম কেবল বাঙালি হিন্দু-মুসলমান। কিন্তু মুসলমানের বিরুদ্ধে টানা প্রচার আছে এরা আই এস আই-এর হয়ে কাজ করে, উগ্রপন্থীদের মদত দেয় ইত্যাদি। এগুলো মিথ্যাচারীদের প্রচার মাত্র। মাঝে মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাও এই সব প্রচারে তথ্য যোগায়। কিন্তু আজ অব্দি এদের বডো ডিমাছা মণিপুরি নাগা উগ্রপন্থীদের মতো সংগঠিত রূপে দেখা যায় নি। গেলে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে অন্য অনেক সংগঠনকে যখন ভারত সরকার আলোচনার টেবিলে নিয়ে এলো তাদেরও আনতে পারত। আর পারে নি বলে বাংলাদশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারত সরকার কোনো অভিযোগ জানিয়েছে বলেও জানা যায় নি। অথচ ওদিকে ওদেশের সঙ্গে ঘনঘনই তো ভারত এবং অসম সরকারের কথা হচ্ছে।  মুসলমানেরা যাদের থেকে মার খান তাদের কেন মদত দিতে যাবেন? কিন্তু কেবল বিজেপি নয়, বহু বামেরাও এই প্রচারে সিদ্ধহস্ত। প্রচার মাধ্যমের কথা তো বলেই লাভ নেই। অসমেআলফা এন ডি এফ বি- যখন গোলাগুলি ইত্যাদি করত তখন বহু হিন্দু বাঙালি 'ভদ্রলোক'ও বলে বেড়াতো এগুলো মুসলমানের কাজ। অথচ এই সব অমুসলমান উগ্রপন্থীদের হাতেকিছু বাঙালি হিন্দু কেন অসমিয়া সহ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অনেকেও মারা গেছেন বাযান। এন ডি এফ বি আর বি এল টি নিজেদের মধ্যেও প্রচুর মারামারি করেছে। তবুআমাদের কিছু বন্ধু শেষ অব্দি মুসলমানের দোষ দেখবেন ই! এতে তো বোঝাযায় এরা সমস্যার গভীরে যেতে মোটেও আগ্রহী নয়। মুসলমান এদের প্রচারকে পুষ্টকরে গেলেই এরা তাত্ত্বিক সন্তুষ্টি লাভ করেন। এই ভাবেই দৃশ্যত সংঘাত থেমে গেলেও সংঘাতের কারকগুলো টিকেই থাকে। শান্তির আলাপ যখন চলে আড়ালে তখন পরবর্তী সংঘাতের মশাল তখন তৈরি হতেই থাকে।

                     অসমীয়াদের মধ্যেও অনেক বিবেকবান বুদ্ধিজীবি আছেন, যারা সত্য উচ্চারণ করছেন। আনন্দবাজার উপরের সম্পাদকীয়তে তেমনি এক প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে, “সেন্টার ফর নর্থ-ইস্ট স্টাডিজ অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ-এর প্রধানসঞ্জয়হাজরিকার যুক্তি, “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে যাঁদের দিকে আঙুল তোলাহচ্ছে, তাঁরা অনেক দিন ধরেই ওখানে বসবাস করছেন।তাঁদের এখন অনুপ্রবেশকারী বলে দেওয়াটা আসলে বিষয়টাকে বিপথে চালিত করার চেষ্টা।” এটাই সত্য কথা।

            কিছু অতি বুদ্ধিমান বাঙালি হিন্দু, যারা স্বপ্ন দেখেন,  দ্বিজাতিতত্ত্বের আধারে দেশ ভাগ হয়েছে তাই কোনো মুসলমানের অধিকার নেই ভারতে থাকবার। বিজেপির অনুপ্রবেশকারী বিরোধী আওয়াজে সঙ্গ দিলেই এরা চলে যাবেন অসম ছেড়ে আর হিন্দু বাঙালিরা সুখে  স্বর্গবাস করবেন তাদের সে স্বপ্ন দিবাস্বপ্ন মাত্র। অসমিয়ারা কোনদিনই চাইবেন না, সমস্ত পূর্ববঙ্গমূলের মুসলমান অসম ছেড়ে চলে যান। কারণ, তারা নিজেদের মাতৃভাষা অসমিয়া বলে সেই ষাটের দশকে লিখিয়ে অসমিয়াকে সংখ্যাতে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছেন। কোনো বুদ্ধিমান অসমিয়া চাইবেন না, তাঁরা চলে গিয়ে অসমিয়া সংখ্যাটা কমিয়ে আনুন। তাই আসুর মতো সংগঠন যারা লড়াইটা শুরু করেছিল, ১৯৫১কে ভিত্তি বর্ষ করে অসম থেকে বিদেশি তাড়াতে হবে, তারাও চুক্তি করবার সময় ১৯৭১এর ১৬ মার্চ যেদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হয় সেই দিনটিকে ভিত্তি বর্ষ হিসেবে মেনে নেয়। তার আগেকার মুসলমানদের আসুও স্বদেশী বলে আইনত স্বীকার করে নিয়েছে। তার পরের অনুপ্রবেশকারীরা অসম ছেড়ে চলে যাক এটা আজ সব্বাই দাবি করে, বাংলাদেশ সীমান্ত সীল করবার দাবিও পুরোনো কিছু নয়।  কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নি এর পরের ২৫ বছরেও। কেন হয় নি জিজ্ঞেস করলে এরা বলবে, কেন , কংগ্রেসের মুসলমান তোষণ নীতির জন্যে। ভোটব্যাঙ্করাজনীতির জন্যে। অথচ দু’বার অগপ, এবং কেন্দ্রে বিজেপি একবার সরকারে ছিল কিন্তু। কিচ্ছুটি করতে পারে নি।

             কেন? এতোদিন এরা বলতেন, আই এম ডি টি আইন আছে বলে। সেই আইন বাতিলও হলো আজ অনেক বছর হলো। তার পরেও যে কাজের কাজ কিছু হয় নি। হবে বলেও মনে হয় না। কারণ হলে রাজনীতির এই রং চিরদিনের জন্যে বিদায় নেবে। অনেকেই আছেন, অসমের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবেন। তাই মাঝে মধ্যে সন্দেহ হয়, অসমের মাটিতে অনুপ্রবেশকারী সত্যি সত্যি আছেন তো?

LinkWithin

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...

Google+ Badge