আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Wednesday, 23 October 2013

দুই মহান ধর্মগুরু হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ এবং মতুয়া ধর্মান্দোলন নিয়ে একটি প্রাথমিক পাঠ



         
                                                                    
    
        জীবে দয়া নামে রুচি মানুষেতে নিষ্ঠা।/ ইহা ছাড়া আর যত সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা।।”—কথাটি হরিচাঁদ ঠাকুরের। শুনে যে কারোরই মনে হবে এতো বিবেকানন্দের সেই বিখ্যাত ‘জীবে প্রেম করে যেই জন...’ কথাটির প্রতিধ্বনি। বিবেকানন্দের কথাগুলো যখন ছেপে বেরুচ্ছে এই কথাগুলোও একই সময়ে ছেপে বেরিয়েছে। আছে তারকচন্দ্র সরকারের লেখা ‘শ্রী শ্রী হরিলীলামৃত’ বইতে। যে গুরু হরিচাঁদের জীবনী বইটি, তিনি নিজে কথাটি বলুন বা নাই বলুন, কথাটি তাঁর নামেই চলে। বইটি ছেপে বেরিয়েছে ১৯১৬তে। ‘মতুয়া ধর্মাবলম্বী’দের বাইরে বাকি ভারতীয়তো দূরই, সাধারণ বাঙালি যে হরিচাঁদের এই কথাগুলো জানেন না বিশেষ, তাতে একটা কথাতো স্পষ্ট হয়েই যায় বিবেকানন্দ যতই ভারতবাসীকে ধমকে দিয়ে বলুন, “হে ভারত, ... এই দাসসুলভ দুর্বলতা, এই ঘৃণিত জঘন্য নিষ্ঠুরতা-এইমাত্র সম্বলে তুমি উচ্চাধিকার লাভ করিবে?” যতই আহ্বান জানান , “বলমূর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই,...” আমরা এর জন্যে বিবেকান্দকে মহীয়ান করে মধ্যবিত্তের নায়ক বানিয়ে দিলাম, ‘ভারতবর্ষ’কে নিয়ে গৌরব করতেও শিখলাম, যাদের তিনি ভাই বলে কাছে টেনে নিতে বললেন, তাদের আদৌ কাছে টেনে নিলাম না। হ্যাঁ, কেউ হয়তো ছায়া মাড়ালাম, ছোঁয়াটা খেলাম, বিপদে আপদে সহায় সম্বল নিয়ে পাশেও দাঁড়ালাম আর গর্ব করে ‘জাত মানিনা’ বলে প্রচারও করে গেলাম। কিন্তু হরিচাঁদ, গুরুচাঁদের মতো কেউ যখন সত্যি কেউ সমস্ত কাপুরুষতা দূর করে মনুষ্যত্ব্ব অর্জনের জন্যে মাথাতুলে দাঁড়াতে চাইলেন বাকিদের থেকে পেলেন শুধু প্রবল উপেক্ষা । ভারতীয় জাতীয়তার আদর্শে তাঁদের নায়কের সম্মান জুটল না। স্কুল কলেজের মহাপুরুষের জীবনীতেও তাঁরা রইলেন ব্রাত্য। অথচ উনিশ শতকে কলকাতা শহরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবিধেভোগীরা যখন বিচিত্র ধর্মসংস্কার আন্দোলন গড়ে তুলছিলেন, বাকি বাংলাদেশে সুবিধে বঞ্চিত হিন্দু দলিত এবং মুসলমান প্রজারাও ওয়াহাবী, তারিখ এ মুহম্মদীয়া ,ফারায়েজি, বলাহাড়ি, কর্তাভজা, মতুয়া ইত্যাদি নানা নামে বিচিত্র সব ধর্মসংস্কার আন্দোলন গড়ে তুলছিলেন যেগুলো অচিরেই এক একটি রাজনৈতিক আন্দোলনেরও চেহারা নিচ্ছিল। এগুলোর মধ্যে মতুয়া একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ধর্মসংস্কার আন্দোলন যা এখনো ভারতবর্ষে এবং বাংলাদেশে সজীব এবং সক্রিয়।
      
অবিভক্ত বাংলাদেশের পূববাংলা অংশে সবচে বড় জনগোষ্ঠীটির নাম নমশূদ্র। অনেকে বলেন, পূব বাংলার ধর্মান্তরিত মুসলমানদেরও অধিকাংশ আদতে এই নমশূদ্র জনগোষ্ঠীরই ছিলেন। শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে গোটা বাংলাতে এরা দ্বিতীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠী ছিলেন। বাখরগঞ্জ, ফরিদপুর, ঢাকা, ময়মন সিংহ, যশোর, আর খুলনা এই ক’টি জেলাতেই ৭৫শতাংশ নমশূদ্র মানুষ বাস করতেন । এছাড়াও অন্যান্য জেলাতে , মায়, সিলেটেও নমশূদ্র বসতি নিতান্ত ফেলনা ছিল না। ১৯১১র আদমসুমারিতেই প্রথম বহু সংগ্রামের পর এদের প্রচলিত জাতিনাম ‘চণ্ডাল’ মুছে যায়। এর আগে অব্দি এরা এই নামেই পরিচিত ছিলেন। এবং বাকি বাঙালি হিন্দুরা এদের অস্পৃশ্য বলে মনে করতেন, বা এখনো মনে করে থাকেন । স্মার্তকার রঘুনন্দনের নির্দেশে এদের সঙ্গে বিবাহাদিতো দূর, পংক্তিভোজনও এড়িয়ে চলত উঁচুবর্ণের বাঙালি। ১৯১১র আদমসুমারি অব্দি দেখা গেছে নমশূদ্রদের ৭৮ শতাংশ মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। এবং এই কৃষিজীবিদের মাত্র ১.১৫ শতাংশ মানুষ নিজেরা খাজনা পেতেন। তারমানে মোটের উপরে এরা শ্রেণি এবং বর্ণ দু’দিক থেকেই ছিলেন দলিত। যে জমিদারদের অধীনে প্রজা হয়ে থাকতেন তাদের অধিকাংশই বর্ণহিন্দু, সামান্য কিছু সৈয়দ মুসলমান । শেখর বন্দ্যোপাধায় লিখেছেন, “ বাংলার কৃষিসমাজে বড় যে বিভেদ তা হলো ‘খাজনাভোগী’ এবং ‘খাজনা প্রদানকারী’দের মধ্যে, এই এই ক্ষেত্রে তা নিখুঁতভাবে মিলে গিয়েছিল জাতিভেদের সঙ্গে। এই বিভেদ ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলত নানাধরণের অত্যাচারের ফলে। তারমধ্যে ছিল মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ, বেআইনী কর আদায়, খাজনার বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি সহজ নগদ খাজনার বদলে উঁচুহারে খাজনা আদায় করা।” এর মধ্যেও একটি ছোট গোষ্ঠী নিশ্চয়ই নানা ছোটখাটো ব্যবসা এবং মহাজনী কারবার ইত্যাদি করে সামাজিক মর্যাদার উপরের স্তরে উঠেছিলেন। “তবে ১৯১১সালে এই বর্ধিষ্ণু গোষ্ঠী গোটা নমশূদ্র জাতির জনসংখ্যার ২ শতাংশেরও কম ছিলেন” এই শ্রেণিটি সংখ্যার দিক থেকেও কম ছিলেন, বাকি মহাজন শ্রেণি বন্ধুদের থেকেও অতি দুর্বল ছিলেন। সবচে’ বড় কথা “...সামাজিক মর্যাদার দিক দিয়ে ছিলেন এতো নিচের দিকে , যে তাঁরাও উঁচুজাতের ভদ্রলোকের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম ভাবতে পারতেন না।” তখনকার নানা ধরণের কৃষক বিদ্রোহ এবং ধর্মসংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে এদের পরিচয় ঘটছিল। কিন্তু বিশ শতকের গোড়াতে যাদের নেতৃত্বে বাংলাভাগের বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে উঠছিল এবং সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ রূপ পাচ্ছিল, শ্রেণি এবং বর্ণ দু’দিককার স্বার্থেই এরা তার সঙ্গে কোন ধরণের আত্মীয়তা খোঁজে পান নিফলে কলকাতা কেন্দ্রিক যেসব ধর্মসংস্কার আন্দোলন সেগুলোর প্রতিও কোনদিনই এরা আকর্ষণ বোধ করেন নি। বিবেকানন্দ , অরবিন্দ এদের নেতা হয়ে উঠতে পারেন নি কিছুতেই, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশব সেনদের তো প্রশ্নই উঠে না।
           চাইলেই যে অন্ত্যজ জাতবর্ণের শ্রেণিগতভাবে উপরের লোকেরা বর্ণগতভাবে উপরের লোকজনের কাছাকাছি আসতে পারেন না, এর নজির দিতে গিয়ে শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ১৮৭২-৭৩, এই সময়ে এক বিশিষ্ট নমশূদ্র গ্রামীণ নেতার মায়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে উঁচুজাতের লোকেরা আসতে অস্বীকার করেন। তার প্রতিবাদে ফরিদপুর –বাখরগঞ্জ এলাকার সমস্ত নমশূদ্ররা এই উঁচুজাতের সঙ্গে সমস্ত সামাজিক , অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছেদ করেন। এই লড়াই প্রায় ছ’মাস চলে। এই লড়াইএর সফলতা কিম্বা বিফলতাই তাঁদের উদ্বুদ্ধ করে নতুন ধর্মসম্প্রদায়ে নিজেদের সংগঠিত করতে। যার নাম ‘মতুয়া।’ এই ধর্মীয় লড়াই এক সময়ে এর প্রবর্তকের পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে আরো এগিয়ে যায় এবং ক্রমেই এক স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ পেতে থাকে। সেই রূপ পূর্ণতা পায় ১৯১২তে Bengal Namasudra Association গঠনের মধ্যি দিয়ে। যা ক্রমে গিয়ে নানা বাঁকে এবং ফাঁকে আম্বেদকারের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় দলিত আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়েছিল। এবং এখনো জড়িয়ে আছে। সেই ইতিবৃত্ত অন্য। আপাতত শুধু একটি তথ্যের উল্লেখ করব যে ১৯১১র আদমসুমারির পরে ১৯৩৬ অব্দি এই ‘শূদ্র’ শব্দটি বাদ দেবার জন্যেও অনেকে লড়েছিলেন। সফল হয়েছিলেন বলে কোন তথ্য আমাদের হাতে নেই। শেখর অবশ্যি ফরিদপুর জেলার গ্রামীণ নেতার নাম করেন নি। নাম করেননি গুরুচাঁদের বাবা হরিচাঁদের। মতুয়া ধর্মের প্রবর্তক তিনিই । এবং সে আরো আগের ঘটনা। সুতরাং শেখর ঠিক কার মায়ের শ্রাদ্ধের ঘটনা লিখেছেন আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি।
               ১৮১২সনের ১১ মার্চ এখনকার বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার ওঢ়াকান্দির পাশে সাফলিডাঙ্গা গ্রামে জন্ম নেন হরিচাঁদ ঠাকুর। তাঁর বাবার নাম ছিল যশোবন্ত ঠাকুর, মা অন্নপূর্ণা। পাঁচ সন্তানের তিনি দ্বিতীয়। তিনি ‘হরিনামে মুক্তি’ কথাটা বাকি বৈষ্ণবদের মতো প্রচার করলেন বটে কিন্তু সেই মুক্তিতত্ত্ব বাকি সহজিয়া বৈষ্ণবদের থেকেও সহজ। ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণব’দের থেকে একেবারেই ভিন্ন। তাই এর নামও ভিন্ন। হরিনামে মাতোয়ারা—এমন এক ধারণার থেকে ধর্মসম্প্রদায়টির নাম হলো ‘মতুয়া’বর্ণগত ভাবে এঁরা মূলত বাঙালি দলিত নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের লোক, যদিও মতুয়া ধর্মে অন্যান্য বর্ণের লোকেরাও অনেকে দীক্ষা নিয়েছিলেন । মতুয়া ধর্মের মূল কথাগুলো বোঝা খুব কঠিন নয়। বৌদ্ধধর্মের অষ্টাঙ্গিক মার্গের আদলে হরিচাঁদেরও ছিল দ্বাদশ আজ্ঞাঃ ১) সদা সত্য কথা বলা ২) পরস্ত্রীকে মাতৃজ্ঞান করা ৩) পিতা মাতাকে ভক্তি করা ৪) জগতকে প্রেমদান করা। ৫) পবিত্র চরিত্র ব্যাক্তির প্রতি জাতিভেদ না করা ৬) কারো ধর্ম নিন্দা না করা ৭) বাহ্য অঙ্গে সাধু সাজ ত্যাগ করা ৮) শ্রীহরি মন্দির প্রতিষ্ঠা করা। ৯) ষড় রিপুর থেকে সাবধান থাকা ১০) হাতে কাজ মুখে নাম করা। ১১) দৈনিক প্রার্থনা করা।১২) ঈশ্বরে আত্ম দান করা সম্প্রতি এই ধর্মনিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে , তর্ক বিতর্কও হচ্ছে ‘মতুয়া’ সমাজের বাইরেও, ভেতরেতো বটেই। কিন্তু হরিচাঁদের জীবৎকালে লিখিতভাবে কোন ধর্মাদেশ দাঁড় করাবার চেষ্টা ছিল না। তারক সরকারের ‘শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত’ বইটি লেখা হলেও প্রকাশের অনুমতি দেন নি হরিচাঁদ । বস্তুত পছন্দও করেন নি। সুতরাং তাঁর ধর্মমত ছড়িয়েছিল লোকের মুখে মুখে, স্মৃতিতে, গানে, কীর্তন আসরে। বৈদিক অবতারতত্ত্ব, পাপ পুণ্য, স্বর্গ নরক, আচার বিচার কিছুতেই আস্থা রাখতেন না তারা। এমনকি যে ‘হরি’নামের কথা বলা হচ্ছে তিনিও বৈষ্ণব হরির থেকে ভিন্নঅনেকের মতে মতুয়া ধর্ম আসলে বাংলাদেশের প্রাক-বৈদিক বৌদ্ধধর্মের পুনরুত্থিত, পুণর্নির্মিত রূপ। একত্রে অনেকে মিলে নাম করলে প্রেমবোধ জাগে তাই এই নাম নেয়া। শ্রী শ্রী হরিলীলামৃতে’ও আছে, “বুদ্ধের কামনা তাহা পরিপূর্ণ জন্য/ যশোবন্ত গৃহে হরি হৈল অবতীর্ণ।”

          ১৮৩৩ নাগাদ প্রায় একুশ বছর বয়সে হরিচাঁদ স্থানীয় জমিদার এবং ব্রাহ্মণ্যশাসকদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে জন্মগ্রাম ছেড়ে ওড়াকান্দি চলে আসেন। জমিদারদের দরিদ্র কৃষক লুণ্ঠনের ব্যাপারটিতো তিনি জানতেনই। কিন্তু এখানে এসেই তিনি উপলব্ধি করেন কলকাতার জমিদারদের বিলাসবৈভবের রহস্য। মাত্র তিনমাসের খোরাকি দিয়ে এরা গোটা বছর কৃষকের ঘাম ঝরিয়ে নিত। বেগার খাটাতো। এমনকি দাসের বাজারে কেনাবেচাও করে দিত গরীব চাষাদের। ১৮৪৬ নাগাদ এই দাসব্যবসা বন্ধ করে ফেলা ছিল মতুয়াদের প্রথম বড় সাফল্য। ‘শাস্তিবিক্রি’ নামে একটি অদ্ভূৎ প্রথা চালু ছিল বাংলাদেশে বাবু জমিদারেররা খুন-রাহাজানির মামলাতে জড়ালে দলিত অন্ত্যজ লোকেদের লোভ কিম্বা ভয় দেখিয়ে নিজের কাঁধে দায় নিয়ে বাবুদের বাঁচিয়ে দিতে বাধ্য করা হতো। হরিচাঁদের নেতৃত্বে এই কুপ্রথা এবং সেই সঙ্গে নরবলির বিরুদ্ধে প্রচার আন্দোলন শুরু হয়। লেখাই বাহুল্য যে নরবলির শিকার হতেন এই নমশূদ্রদের মতো দলিতেরাই। ফলে আশপাশের বিভিন্ন জেলাতে মতুয়াদের কথা ছড়িয়ে পড়ে।
    
      ধর্ম থেকে রাজনীতিকে আলাদা করবার ব্যাপারটি একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং তা এর জন্যেই যে সামন্তসমাজে দু’টিকে আলাদা করে দেখাই কঠিন । যে মধ্যবিত্তরা শরৎচন্দের ‘মহেশ’ গল্পটি পড়েছেন তারা দেখেছেন কীভাবে জমিদারের জমির লোভের প্রকাশ ব্রাহ্মণের শাস্ত্রের দোহাই হয়ে প্রকাশ পায়। তাই একুশশতকের কিছু শহুরে মধ্যবিত্ত যখন নির্বিচারের এই সব দলিতদের রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে ধর্মের বিচ্ছেদ আশা করেন, তখন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আসলেই তারা সামন্তপ্রভুদের স্বার্থকে সুরক্ষা দেন তখনকারতো বটেই এখনো, বহু দলিত-আদিবাসী আন্দোলন থেকে তাই রাজনৈতিক কর্মসূচী এবং ধর্মের বিকাশকে স্বতন্ত্র করে দেখা এক কঠিন কাজ। লালন ফকিরকেও জমিদার শাসনের বিরুদ্ধে লাঠি নিতে হয়ে ছিল , তাও আবার যে সে নয়-- একেবারে বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের বিরুদ্ধে। লালন ফকিরের গানগুলোতে সহজিয়া দেহতত্ত্ব আবিষ্কার করে আজকের বহু মধ্যবিত্ত মুগ্ধতার মধ্যে কিছু সত্য নিশ্চয় আছে, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’ –র মতো গানের মধ্যে জাতবর্ণ বিরোধিতার তত্ত্বকে সম্প্রসারিত করে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ সন্ধানের মধ্যেও মিথ্যা কিছু নেই। কিন্তু এর মধ্যে আটকে থাকাটি হচ্ছে এক চূড়ান্ত মধ্যবিত্ত ভণ্ডামীকেউ ব্যক্তিগতভাবে জাত না মানাবার দাবি করলেই জাত সংসার থেকে বিদেয় নেয় না। কথা হলো তার বিরুদ্ধে কোন সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হচ্ছে কিনা। চাইলেই সেই প্রতিরোধের বাস্তবতা সর্বত্র নাও থাকতে পারে, তখন গ্রামীণ কৃষক সমাজে দেখা দেন লালনের মতো ব্যক্তিত্ব তিনি প্রতিবাদী, কিন্তু নিষ্ক্রিয় প্রতিবাদী। উল্টোদিক থেকে এমন প্রতিরোধ গড়ে উঠার সম্ভাবনা মাত্রকে নিরাকরণ করবার প্রয়াস চিরদিনই ছিল উচ্চবর্ণের দিক থেকে। দলিতদের উত্থান বিবেকানন্দকেও বিচলিত করছিল, কিন্তু তাঁর সমস্যা ছিল অন্যদিক থেকে। এগুলোকে তিনি সর্বভারতীয় জাতীয়তা নির্মাণের বাধা হিসেবে দেখছিলেন। তাই একদিকে যেমন উঁচু বর্ণের লোকদের ডেকে বলছেন, বলো চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই! অন্যদিক থেকে এই প্রশ্নও করছেন ব্রাহ্মণদের প্রতিষ্ঠা দেখে এতো ঈর্ষান্বিত হবার কি আছে? সংস্কৃত গ্রন্থাদি পড়ে তাদের টেক্কা দিলেই হলো। তিনি আশা করছেন, মৎসজীবির কাছে গিয়ে কেউ বেদান্ত ব্যাখ্যা করলেই সবার ভেতরে একই ঈশ্বর দেখে মৎসজীবি মুগ্ধ হয়ে যাবে।কিন্তু এই কথাটি যে মৎসজীবির থেকে বেদান্তবাদী পণ্ডিত এবং তাঁদের অনুগামী শাসকশ্রেণির লোকেদের বেশি করে বোঝা দরকার, এবং না বুঝলে তার বিরুদ্ধে রীতিমত সংগঠিত প্রতিবাদটি দরকার এই সত্য বিবেকানন্দ বুঝতে চেয়েছেন বলে মনে হয় না। বরং এমন প্রতিবাদে কোন লাভ হবার নয় বলেই তিনি মত ব্যক্ত করেছেন, বৃটিশভারত বর্ণব্যবস্থাটিকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলেছে বলে প্রশংসাও করছেন। যখন কিনা, বিনয় ঘোষের মতো মার্ক্সবাদী সমাজবিজ্ঞানীরা ১৯৭৮এ এসেও বৃটিশ ভারতে জাতবর্ণব্যবস্থা বিলীন হয়ে যাবে বলে স্বয়ং কার্ল মার্ক্সের অনুমানকেও নাকচ করে এক নতুন অধ্যায় জুড়ছেন তাঁর তিন দশক আগের লেখা ‘বাংলার নবজাগৃতি’ গ্রন্থে । হরিচাঁদ এবং তাঁর পরে গুরুচাঁদ সেই সংগঠিত প্রতিবাদের পথ ধরেছিলেন বলেই তাদের ধর্ম রাজনীতির চেহারা নিচ্ছিল, রাজনীতি ধর্মের। সেই প্রতিবাদের পথ ধরেছিলেন বলেই, বাকি বাঙালি সমাজ তাদের সম্পর্কে লালন করেছে এক আশ্চর্য নীরবতার নীতি।
           সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন বলেই, হরিচাঁদ কাউকে সন্ন্যাস নিতে বা তীর্থে যেতে মানা করেন। ‘শ্রী শ্রী হরিলীলামৃতে’ লেখা হচ্ছে, “সংসারে থেকে যার হয় ভাবোদয়। সেই সে পরম সাধু জানিবে নিশ্চয়।” সংসার এবং মানুষের বাইরে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করে বলা হচ্ছে, “যে যাহারে ভক্তি করে সে তার ঈশ্বর/ভক্তিযোগে সেই তার স্বয়ং অবতার” কিম্বা, “বিশ্বভরে এই নীতি দেখি পরস্পর/যে যাহারে উদ্ধার করে সে তাহার ঈশ্বরসুতরাং কোন দীক্ষাও নেই, নেই গুরু গোঁসাই, “দীক্ষা নাই করিবে না তীর্থ পর্যটন।/ মুক্তি স্পৃহাশূণ্য নাই সাধন ভজন।।” গুরু গোঁসাই সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে হরিচাঁদের উক্তি, “ কোথায় ব্রাহ্মণ দেখো কোথায় বৈষ্ণব।/ স্বার্থবশে অর্থলোভী যত ভণ্ড সব।।” গুরু গোঁসাইদের শাস্ত্রানুশাসনকে অমান্য করে তাঁর চরম অবস্থান, “ কুক্কুরের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ পেলে খাই।/ বেদাবিধি শৌচাচার নাহি মানি তাই।।” এগুলো শুধু ব্রাহ্মণেরাই সহ্য করবেন না এমনতো নয়, গোটা সামন্তসমাজের শাসন মানিয়ে নেবার প্রাথমিক সর্ত এগুলো। স্বাভাবিক ভাবেই নিন্দা, অপপ্রচার, লাঠিয়াল দিয়ে পেটানো, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া, পুকুরে বিষ দেয়া, জোরে মাঠের ধান কেটে নিয়ে চলে যাওয়া এবং সর্বোপরি সামাজিক বয়কট হলো মতুয়াদের শায়েস্তা করবার জন্যে সামন্তশ্রেণির হাতিয়ার। বিপরীতে বাধ্য হয়ে লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তুলতে হয়েছিল মতুয়াদের। এর সঙ্গে ছিল নীলকর সাহেব এবং নায়েব গোমস্তাদের অত্যাচার। একবারতো এমন কিছু নায়েব এবং সাহেবদের নীলের কড়াইতে ফেলে সেদ্ধ করে ফেলেন এই লাঠিয়ালরা। সংকটে দীর্ণ মতুয়াদের বিয়ে শ্রাদ্ধে ব্যয় কমাতে নির্দেশ দিলেন হরিচাঁদ, “ বিবাহ শ্রাদ্ধেতে সবে কর ব্যয় হ্রাস।/ শক্তির চালনা, সবে রাখো বারমাস।।” উৎপাদন ব্যবস্থার উপর চাষীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়েও ভেবেছিলেন তিনি, “মন দিয়ে কৃষি কর, পূজ মাটি মায়।/ মনে রেখো বেঁচে আছ মাটির কৃপায়।।” চাষাদের আত্মমর্যাদাবোধ এবং আত্মনির্ভরশীলতা বাড়াতে বছরে তিনবার ফসল ফলাতে উদ্বুদ্ধ করলেন, “ সর্বকার্য হতে শ্রেষ্ঠ কৃষি কার্য হয়।/ ত্রিফলা না করা আমাদের ভাল নয়।।” উদবৃত্ত অর্থকে ব্যবসায়ে খাটিয়ে ধনলাভে উৎসাহিত করতে নিজে শিখে অন্যকে শেখাতে শুরু করলেন, দরকারে অনেককে টাকা ধার দিতেও শুরু করলেন, “ নিজহাতে ব্যবসা করেন হরিচাঁদ/বাণিজ্য প্রণালী শিক্ষা সবে কৈল দান।।”
       
    পুত্র গুরুচাঁদকে উত্তর দায়িত্ব সমঝে দিয়ে ১৮৭৮এ হরিচাঁদ মারা যান। গুরুচাঁদের জন্ম ওড়াকান্দিতে ১৮৪৪এ তিনি মারা যান ১৯৩৭এ বাবা-ছেলের জীবৎ কাল ১২৫ বছর থেকে হরিচাঁদের ছেলেবেলার প্রথম একুশ বছর বাদ দিলেও বলা চলে উনিশ-বিশ শতকের একশত বছর জুড়ে মতুয়া ধর্মান্দোলন ছিল বাংলার অন্যতম প্রধান ধর্ম সংস্কার আন্দোলন। যদি ব্রাহ্ম ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের কথা মনে রাখি, তবে এতো দীর্ঘ নির্বিরোধ জীবন সেই ধর্মের ছিল না। এতো বিশাল সামাজিক সমর্থনও ছিল না ব্রাহ্মধর্মের তারপরেও ব্রাহ্মদের চিনি, মতুয়াদের না
            দায়িত্ব নিয়েই গুরুচাঁদ শিক্ষা বিস্তারে মন দিলেন। নিজের বাড়িতে পাঠশালা খুলে শুরু করলেন। তাঁর সম্পর্কে জানবার নির্ভরযোগ্য প্রথমবইটি লেখেন মহানন্দ হালদার, নাম শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিত’ এটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৩এগুরুচাঁদ সবাইকে নির্দেশ দিলেন, “সবাকারে বলি আমি যদি মানো মোরে।/ অবিদ্বান পুত্র যেন নাহি থাকে ঘরে।।” এই শিক্ষান্দোলনের পাশে তিনি বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষকে কাছে টেনে নেন। “নম সাহা তেলি মালি আর কুম্ভকার।/ কাপালি মাহিষ্য দাস চামার কামার। পোদ আসে তাঁতি আসে আসে মালাকার।/ কতই মুসলমান আসে ঠিক নাহি তার।।” মেয়েদের জন্যেও সমানে আলাদা উদ্যোগ নেন, “ নারী শিক্ষার তরে প্রভু আপন আলয় শান্তি সত্যভামা নামে স্কুল গড়ি দেয়।।” রবীন্দ্রনাথ যেমন শ্রীনিকেতনের প্রথম দিককার দিন গুলোতে বৃটিশ কৃষিবিজ্ঞানী এবং সমাজসেবি লিওনার্ড এলমহার্ষ্টকে নিয়ে এসছিলেন, গুরুচাঁদ তেমনি এক অস্ট্রেলিয় মিশনারি ডাঃ সি.এস.মিডকে সঙ্গে পেয়ে যানদরিদ্র অন্ত্যজদের মধ্যে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ছড়াবার ব্যাপারে এই ভদ্রলোক ছিলেন আন্তরিক। তাঁর বিরুদ্ধে খৃষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করবার অপপ্রচার ছিল, কিন্তু স্বপক্ষে সাক্ষী বেশি নেই। বরং ১৯০৬ থেকে গুরুচাঁদের সঙ্গে আলাপ এবং বন্ধুত্বের পরে থেকে সেই সম্পর্ক ছিল অটুট। শুধু তাই নয়, ১৯০৮এ ওড়াকান্দিতে এই দু’জনের প্রচেষ্টাতে যে উচ্চ ইংরাজি স্কুল যাত্রা শুরু করে শতাব্দ প্রাচীন সেই স্কুলের নাম ‘ওড়াকান্দি মিড হাইস্কুল’ রেখে মতুয়ারা তাঁকে স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের ব্যাপারে মিড অভিজ্ঞ মানুষ, তার উপর সরকারি মহলে তাঁর খাতির ছিল। গুরুচাঁদ বুঝেছিলেন তিনি যে কাজ করতে যাচ্ছেন তাতে দু’টোরই সমান দরকার। তাঁর সেই বোধে ত্রুটি ছিল না, ঘটনাক্রম তা প্রমাণ করেছে। নারী-পুরুষদের জন্যে আলাদা স্বাস্থ্যকেন্দ্রও গড়ে উঠতে শুরু করল ওড়াকান্দি এবং আশপাশের এলাকাতে। একই সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বে চলে বাল্য বিবাহ, বহু বিবাহ বিরোধী প্রচার আন্দোলন। তখন থেকেই নমশূদ্র শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের জন্যে সরাকারি চাকরিতে ভাগীদারির দাবি উঠতে থাকলে অনেকেই মনুর বিধান শুনিয়ে আটকে দিচ্ছিলেন। ১৯০৭এ সরকার প্রথম আইন করে অন্ত্যজ এবং মুসলমানদের জন্যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে গুরুচাঁদ ঠাকুরের ছেলে শশীভূষণ ঠাকুর সাবরেজিস্টার পদে যোগ দিতে পারেন । এর আগে নানা ভাবে চেষ্টা করেও তিনি কোন চাকরি পেতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। ১৯০৮এ কুমুদ বিহারি মল্লিক ডেপুটি রেজিস্টার পরে এবং তারিনী বল সরকারি ডাক্তার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন।
          ‘চণ্ডাল’রা সরকারি চাকরিতে আসছেন, পঞ্চায়েত পুরসভাতে যোগ দেবার সম্ভাবনা বাড়ছে এই ব্যাপারটি উঁচু বর্ণের লোকেরা ভালোভাবে নিচ্ছিলেন না। স্বাভাবিক ভাবেই মনুর বিধান ডিঙিয়ে সাহেবদের প্রশ্রয়ে অন্ত্যজ বর্ণের মানুষের ব্রাহ্মণ , ক্ষত্রিয় মর্যাদাতে উন্নীত হবার আকাঙ্খা দাবিও বাড়তে থাকে। জয়া চ্যাটার্জী লিখেছেন, ১৯১১তে আদমশুমারি কর্তৃপক্ষের কাছে এমন দাবি জানিয়ে এতো সব জনগোষ্ঠী স্মারকপত্র জমা দেন যে সব মিলিয়ে এগুলো ওজনে দাঁড়িয়েছিল এক মণের বেশি। নমঃশূদ্ররা তখন নিজেদের কায়স্থ বলে দাবি করলে কায়স্থরা সেটির বিরোধিতা করেন। তাতে কায়স্থদের সামাজিক ভাবে বয়কট করেন নমঃশূদ্ররা। গোয়ালারা নিজেদের বৈশ্য বলে দাবি করলে সভ্রান্ত হিন্দুরা অনেকে গোয়ালাদের ছেড়ে মুসলমানদের থেকে দুধ কিনে খেতে শুরু করেন। ১০ ডাঃ মিডকে পাশে নিয়ে তখন অন্তত চণ্ডাল’দের জন্যে ‘নমঃশূদ্র’ নামটি আদায় করে নিতে সমর্থ হন গুরুচাঁদ।
          যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল একেবারেই ধর্মসংস্কার এবং কৃষকবিদ্রোহের রূপে সেটি তখন রীতিমত আইনী রাজনৈতিক সংগ্রামের দিকে এগুতে শুরু করে। গুরুচাঁদ অনুভব করেন, “ যে জাতির দল নেই/সেই জাতির বল নেই/ যে জাতির রাজা নেই/ সে জাতি তাজা নেই।” তাঁর আহ্বান, “বিদ্যা যদি পাও কাহারে ডরাও/ কার দ্বারে চাও ভিক্ষা।/ রাজশক্তি পাবে বেদনা ঘুচিবে/ কালে হবে সে পরীক্ষা।” সে রাজনীতি গুরুচাঁদের মৃত্যু অব্দি পরিচালিত হয়েছিল একেবারেই কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জাতীয় আন্দোলনের বিরুদ্ধে। বরং ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে শুরু থেকেই তাদের ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল এরই ধারাবাহিকতাতে কম্যুনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন তেভাগা আন্দোলনেরও বড় সমর্থন ভিত্তিটিই ছিলেন এই নমশূদ্ররা বাকি বড় অংশটি রাজবংশী কৃষক।
         ১৯৩৭ গুরুচাঁদের মৃত্যুর আগে পরে মতুয়া ধর্মান্দোলনের যেমন নানা মতভেদ দেখা দিতে শুরু করে তেমনি রাজনৈতিক মত এবং পথও নানা শাখাতে বিভাজিত হয়ে যায়। যে বিভাজন এখনো সমানে সক্রিয়। কিন্তু তারপরেও এটা ঠিক যে গুরুচাঁদের এই উদ্যোগের ফলেই ১৯৩৭এর নির্বাচনে বাংলা থেকে ৩২জন প্রতিনিধি নানা পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর থেকে নির্বাচিত হলে তাঁর মধ্যে ১২জনই ছিলেন নমশূদ্র সম্প্রদায়ের। তাঁদের মধ্যে কয়েকটি নাম ইতিহাস প্রসিদ্ধ—যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, বিরাট চন্দ্র মণ্ডল, প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর প্রমুখ। আম্বেদকারের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় দলিত আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়েছিলেন অনেকে। তাদেরই সমর্থনে আম্বেদকর গণপরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১১ স্বাধীনতার আগের শেষ দশকে যে বিচিত্র রাজনৈতিক ডামাডোলে বাংলাদেশ প্রবেশ করে, তাতে নমশূদ্র সমাজের আগেকার ঐক্য রাখাটাও কঠিন ছিল। তার উপরে শিক্ষিত শ্রেণিটির সংখ্যা বাড়তে থাকাতে তাঁদের অনেকে সাংবিধানিক রাজনীতিতে বেশি করে জড়াতে গিয়ে বাকি কৃষকজনতার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সেই নেতৃত্বের কেউ মুসলিম লীগ, কেউ জাতীয় কংগ্রেস এবং অনেকে হিন্দু মহাসভারও ঘনিষ্ট হয়ে পড়েন। বিশেষ করে গুরুচাঁদের পৌত্র প্রমথ ঠাকুরর ভূমিকা তখন থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে। সেটি হতে পারে অধ্যয়নের এক স্বতন্ত্র অধ্যায়। কিন্তু যে দুর্বিপাকের কথাটি না বললেই নয়, তা এই যে হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের সঙ্গে যাওয়া বড় অংশটি আশা করেছিলেন বাখরগঞ্জ, ফরিদপুর, খুলনা ইত্যাদি পূব বাংলার নমশূদ্র অধ্যুষিত জেলাগুলো পশ্চিম বাংলাতে চলে যাবে। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রথমে শরৎ বসু, ফজলুল হকের প্রস্তাবিত ‘অখণ্ড বাংলা’র প্রস্তাবের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন । পরে মুসলিম লীগ এবং পাকিস্তানের প্রস্তাবের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন । দু’পক্ষই প্রবঞ্চিত হয়েছিলেন। পাকিস্তানে প্রবঞ্চিত হয়ে পঞ্চাশের গণহত্যার পরে লিয়াকৎ আলি খানের মন্ত্রীসভার থেকে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের পদত্যাগ এবং ভারতে চলে আসা মাঝেমধ্যে বেশ চর্চিত হয়। বস্তুত দু’দেশের শাসক শ্রেণিই বাধ্য করে নমশূদ্রদের বড় অংশকে উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে চলে আসতে এবং বাকি বর্ণহিন্দুরা যখন ভারতে নিজের ব্যবস্থা যা হোক একটা করে নিতে সমর্থ হয়েছেন নমশূদ্রদের কিন্তু বাসাবাটির সন্ধানে ছড়িয়ে পড়তে হয়েছে সাগরে আন্দামান থেকে পাহাড়ে উত্তরাখণ্ড অব্দি গোটা ভারতে। অসমেও এসছেন বিশাল সংখ্যক নমশূদ্র মানুষ। সিলেট ভাগের সময়েই এই নমশূদ্রদের অবস্থান ছিল দ্বিধাজড়িত। অনেকেই সিলেট ভাগের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। এক দশক আগেও ১৯৩৭-৩৮এ সিলেটের হবিগঞ্জ মহকুমাতে শিমুলঘর গ্রামে বর্ণহিন্দুদের উপস্থিতিতে শুধুমাত্র জুতো পরবার অধিকার আদায়ের জন্যে এক বড়সড় লড়াইতে নামতে হয়েছিল নমশূদ্রদের। যা পরে হিংসাত্মক রূপ নিয়েছিল। ১২ সিলেট গণভোটের সময়ে তাৎক্ষণিক ভাবে পংক্তিভোজনে বসে সেই দলিতদের মন জয় করতে নেমেছিলেন বর্ণহিন্দু নেতৃত্ব। সিলেট ভাগের দায় যারা এক তরফা অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদীদের উপরে চাপান তাঁরা নিজেদের এই দায়কে নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি করেন না। এখনো জল জমির অধিকারের সঙ্গে নাগরিক অধিকার, সংরক্ষণ এবং ভাষা সংস্কৃতির জন্যে নমশূদ্রদের লড়ে যেতে হচ্ছে শুধু অসমেই নয়, গোটা ভারতেই অসমে ডি-ভোটার তাদেরকেই বেশি হতে হয়। মরিচঝাঁপির কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে নমশূদ্রদেরই। দেশভাগ এবং বাংলার সবচে’ বড় দলিত জনগোষ্ঠী এই নমশূদ্রদের দেশময় ছড়িয়ে পড়া একটি অন্যতম কারণ যে দেশভাগের আগে বাঙালি সমাজে গড়ে উঠা দলিত আন্দোলন পরবর্তী দশকগুলোতে বেশ চাপা পড়ে গেছিল।
        
          মতুয়া ধর্মান্দোলনে এখন অনেক বিভাজনঅনেকেই হতাশ হয়ে সরাসরি আম্বেদকরের শুরু করা নববৌদ্ধ ধর্মান্দোলনের দিকে ঝুঁকছেন। মতুয়াদের বড় দুই ভাগের একটি শ্রীশ্রী হরি-গুরুচাঁদ মতুয়া মিশনেঅধীনে পরিচালিত হয় এর প্রধান কেন্দ্রটি এখনো বাংলাদেশের ওড়াকান্দিতেই রয়েছে। গুরুচাঁদের পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৌত্র শ্রীপতিপ্রসন্ন ঠাকুর পরম্পরা হয়ে মিশনের নেতৃত্ব এখন রয়েছে পদ্মনাভ ঠাকুরের হাতে। ১৩ শ্রীপতি প্রসন্নের সঙ্গে বিবাদ বাঁধে অপর পৌত্র প্রমথ রঞ্জন ঠাকুরের। তিনি গুরুচাঁদের মৃত্যুর পরে প্রথমে রামদিয়াতে চলে এসে ১৯৪০এ মতুয়া মহাসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রধান কেন্দ্র এখন রয়েছে পশ্চিম বাংলার উত্তর চব্বিশ পরগণার ঠাকুর নগরে। নেতৃত্বে রয়েছেন প্রমথ রঞ্জনের স্ত্রী বীনাপাণি দেবী, যাকে মতুয়ারা ‘বড়মা’ বলে সম্মান করে থাকেন। দু’টো সংগঠনেরই এখন দেশে বিদেশে প্রচুর শাখা রয়েছে।
          ওড়াকান্দির মিশন গুরুচাঁদের জীবিতাবস্থাতেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি কতটা তাঁর ইচ্ছেতে এবং কতটা তাঁর পুত্র-পৌত্রেরা চাপ দিয়ে করিয়ে নিয়েছিলেন সেই নিয়ে সন্দেহ আছে। মিশনের সাইটেই অসীম কুমার রায়ের একটি দলিলে লেখা আছে, “শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর প্রস্তাবটি শুনে বলেন এটি করার সময় এখনও হয়নি১৪ ভারতের মতুয়া সঙ্ঘের কাজকর্ম বড়মার অনুগামীদের রাজনৈতিক সারশূন্য ‘উৎসবপ্রীতি’ নিয়ে মতুয়ারাই নানাভাবে প্রশ্ন তুলে থাকেন । বাংলাদেশের মিশনের কাজকর্ম দেখলেও মনে হয় না তাঁরা হরিচাঁদ গুরুচাঁদের আদর্শে আর ততটা টিকে আছেন। মতুয়াদের ব্রাহ্মণ্য ‘সনাতন’ ধর্মের একটি অংশে পরিণত করবার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পূর্ণ করেছেন। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদকে ‘ভগবান’ তুল্য মনে করছেন, ছেলের দেহে বাবার অলৈকিক নিবাসের তত্ত্বে বিশ্বাস ছড়াচ্ছেন, গুরুচাঁদকে ‘শিব’ বলে প্রচার করছেন –এইসবের পরে আর আমরা উপরে মতুয়া হরিচাঁদের যে দ্বাদশ আজ্ঞার কথা জেনে এলাম সেগুলোর কোন মানে থাকে না। মিশন নিয়ে গুরুচাঁদের উপরে পারিবারিক চাপ সৃষ্টির কথা আমরা অহেতুক বলিনি। দেখা যাচ্ছে, সমস্ত ব্রাহ্মণ্য পরম্পরার বিরোধী ব্যক্তিত্ব গুরুচাঁদের বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন করছেন তাঁর পুত্র পৌত্রেরা এবং সঙ্গে জুটছেন সমাজের প্রভাবশালী ভক্তেরা। অর্থাৎ নিজের পরিবার এবং সমাজের ভেতরেও ব্রাহ্মণ্য অভ্যাসের বিরুদ্ধে তাঁকে লড়তে হচ্ছে নিজের আদর্শকে দাঁড় করাতে গিয়ে। যে দুর্গাপুজা হতো মূলত উঁচু বর্ণের জমিদার জোতদার সরকারি আমলাদের বাড়িতে, সেই পুজো নিজের বাড়িতে করে সামাজিক মর্যাদা বাড়াবার কথা ভাবছেন নতুন আমলাতন্ত্রের শরিক হতে উন্মুখ ছেলেরা। উঁচু বর্ণের বাড়ির পুজোতে অন্ত্যজদের প্রবেশ জুটত না, সুতরাং নিজেরা পুজো করে জবাব দেবেন এই ছিল ইচ্ছে। তার উপর শশীভূষণের চার মেয়ের পরে এক ছেলে প্রমথ রঞ্জন জন্মান।সেই আনন্দে তিনি বাড়িতে দুর্গাপুজোর অনুমতি চাইলে প্রথমে গুরুচাঁদ তা দেন নি। ছেলে অনশন শুরু করলে এবং আরো নানাজনকে দিয়ে চাপে ফেললে বাবা অনুমতি দেন এবং ১৯০২তে প্রথম ওড়াকান্দির বাড়িতে দুর্গা পুজো হয়। কল্পতরু ভট্টাচার্য বলে এক ব্রাহ্মণ এসে সেই পুজোর দায়িত্বও নিয়ে নেন। তিনি বুঝি চণ্ডীর আদেশ পেয়েছেন স্বপ্নে। ১৫ এই কথা আবার সগৌরবে লেখেন ‘শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত’ প্রণেতা তারকচন্দ্র সরকার। এই ঘটনা দেখায় কোন পথে ব্রাহ্মণ্যবাদ আপসে নামে প্রতিবাদী একটি পন্থার সঙ্গে। ডাঃ মিডের সঙ্গে আলাপের পরে ক’বছর আবার বন্ধ থাকে এই পুজো। কিন্তু আবার পারিবারিক চাপ বাড়ে , “দশভূজা পূজা মোরা করি পুনরায়। , দেবী পূজা হলে তাতে সর্বশক্তি হয়। ” গুরুচাঁদ , “ প্রভু বলে এই কার্য আমি না করিব।/ মরণের ভয়ে শেষে দেবতা ডাকিব।।” কিন্তু চাপের কাছে তাঁকে নতি স্বীকার করতে হয়। ১৯১৪ থেকে আবার পুজো চালু হয়। পুজোর তিনদিন তিনি বাড়িতে থাকতেন না, পুজোর কোন অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন না।
            বস্তুর সরলরৈখিক কোন আন্দোলন হতেও পারে না। সেই বৌদ্ধ ধর্মের দিন থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী সমস্ত ধর্মান্দোলন প্রয়াসেই ভারতে দেখা গেছে তাকে ভেতর থেকেও ব্রাহ্মণ্য ধারার সঙ্গে লড়তে হয়েছে। এবং শেষ অব্দি ব্রাহ্মণ্যধারা তাকে গ্রাস করেছে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মান্দোলনেও দেখা গেছে নিত্যানন্দ পত্নী জাহ্নবা দেবী রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তির প্রতিষ্ঠা করে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ‘স্বকীয়া-বৈধী’ অভিমতের কাছে আত্মসমর্পণ করলে পরে তাঁর আত্মজ রামচন্দ্র সরে দাঁড়ান মায়ের থেকে। মায়ের গুরু পরম্পরার উত্তরাধিকার বহন করেন সৎ-পুত্র বীরভদ্র। মতুয়া ধর্মে এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল হরিচাঁদের জীবিতাবস্থাতেই। যে ‘শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত’ গ্রন্থটিকে এখন বহু মতুয়া তাঁদের আদি ধর্মগ্রন্থ বলে শ্রদ্ধার সঙ্গে পাঠ এবং অনুসরণ করে থাকেন, সেটি লিখতে মানা করেছিলেন স্বয়ং হরিচাঁদই। কথাটি এই গ্রন্থেই আছে। তারক চন্দ্র সরকারকে কবি নিযুক্ত করে এই গ্রন্থটির পরিকল্পনা আসলে করেছিলেন অন্য দুই ধর্মগুরু মৃত্যঞ্জয় বিশ্বাস এবং দশরথ বিশ্বাস। তাঁরা যখন নিজেরাই খানিক লিখে হরিচাঁদকে পড়িয়ে অনুমোদন আনতে যান, তিনি মানা করে বলেন, “...লীলাগীতি লেখা এবে উচিৎ না হয়।।/ ক্ষান্ত কর লেখালেখি বাহ্য সমাচার।/ অন্তরের মাঝে রাখো আসন আমার।।” একজন যথার্থ বৌদ্ধ-বাউল সহজীয়া পরম্পরার গুরুর মতো নির্দেশ ছিল। জেদ ধরেলে হরিচাঁদ উষ্মা প্রকাশ করেন এই ভাষাতে, “ মহাপ্রভু বলে জান এ কর্ম্মে পুরস্কার।/ কুষ্ঠ ব্যাধি হবে চেষ্টা করিলে আবার।।” এই ঘটনাতে মৃত্যুঞ্জয়-দশরথ জুটি ভয় পান নি, বইটির অষ্টম সংস্করণের ভূমিকাতে আছে মৃত্যঞ্জয় বুঝি এই অভিশাপকে সাদরে গ্রহণ করেন, “সেতো আমার জীবনের লীলাগীতি লেখার পরম পুরস্কার।” ১৬ কিন্তু কবি তারক চন্দ্র সরকার ভয় পেয়ে গেছিলেন। তিনি আধখানা লেখা পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে রাখেনপরে যখন শেষ করেন তখন এক ব্রাহ্মণ্য গল্প জুড়ে দেন, সেই পাণ্ডুলিপি বুঝি সরিয়ে ফেলেছিলেন দেবী সরস্বতী হরিচাঁদের মৃত্যুর পরে আবার সেই সরস্বতী স্বপ্নে এসে তাঁকে পাণ্ডুলিপি ফেরত দিয়ে যান, সেই সঙ্গে গ্রন্থ শেষ করবার জন্যে হরিচাঁদের ইচ্ছে জানিয়ে যান। তাতেও ‘মূঢ়মতি’ তারক খুব উৎসাহ দেখান না লেখা শেষ করতে। শেষে মৃত্যুঞ্জয়-দশরথদের সহযোগী গোলক গোঁসাই এসে জানান, “ স্বপনেতে কেহ যদি পুঁথি করে দান/ সেজন পণ্ডিত হয় পুরাণে প্রমাণ।” আরো জানান, তারকনাথের প্রতি ব্রাহ্মণদের সমর্থন আছে, “ ইতিনায় ভট্টাচার্য পাড়া হয় গান।/ সুকবি বলে তোরে দিয়াছে আখ্যান।” এতো সবেও যখন তারকনাথ সাহসী হন না, তখন গোলক গোঁসাই এক ভোর রাতে রীতিমত নৃসিংহ রূপে এসে তারকনাথের বুকে নখ ঢুকিয়ে শাসিয়ে দিলেন, “ ...বলে তোরে নখে চিরি করি খান খান।/ নৈলে ‘শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত’ পুঁথি আন।।” বোঝা যায়, ইতিমধ্যে মতুয়া ধর্মের জনপ্রিয়তাকে মূলধন করে যারা আখের গোছাতে চাইছিলেন তাঁরা এর রাজনৈতিক সারবস্তুকে বিসর্জন দিয়ে একেবারেই ব্রাহ্মণ্যধারার গুরু হয়ে বসতে উদ্গ্রীব ছিলেন । তাঁরাই প্রবল চাপে এই গ্রন্থ লেখান। আজ অনেক মতুয়া ধর্মাবলম্বী বুদ্ধিজীবিরা একে ‘স্বগোষ্ঠীর প্রতি অমার্জনীয় অপরাধ বলে’ মনে করছেন। এবং নতুন করে ভাবছেন। ১৭ এতো গেল ভেতর থেকে ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী’ চাপের কথা।
          
বড়মাঃবীণাপাণি দেবী
  কিন্তু বাইরে থেকে যে চাপ ছিল, সেটি আরো ভীষণ এবং আরো লজ্জার। হরিচাঁদের জীবিতাবস্থাতে বইটি ছাপার মুখ দেখেনি। তিনি মারা যান ১৯১৪তে। ১৯১৬তে বইটি ছাপান তাঁর কবিয়াল শিষ্য হরিবর সরকার। সম্প্রতি ২০১০এ ডা: মণীন্দ্রনাথ বিশ্বাসহরি-গুরুচাঁদ চেতনামঞ্চের উদ্যোগে’ হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত’ নামে একটি বই লিখে বের করেছেন সেখানে জানা যাচ্ছে, ‘শ্রীশ্রী হরিলীলামৃতপ্রকাশে গুরুচাঁদেরও আপত্তি ছিল, ছেলে শশীভূষণ ঠাকুরের চাপে সম্মতি দেন। “গুরুচাঁদ সম্মুখেতে আনা হলপুঁথি ।/শশীবাবু প্রতি পাতা দেখে পাতি পাতি ।।/গুরুচাঁদে পড়ে পড়ে শুনাল এ গ্রন্থ ।/গ্রন্থের বন্দনা থেকে একেবারে অন্ত ।।/পড়া শুনে গুরুচাঁদ ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস ।/কিছু কিছু ভাব তত্ত্বে হইল হতাশ ।।... লেখা যায় যাহা ইচ্ছা সাদা কাগজেতে ।/কালি লেখা কাগজেতে লেখে কিবা মতে ।।/সেই মত ভুল তত্ত্ব শেখে যদি জাতি ।/কোনদিনও কাটিবে না এ আঁধার রাতি ।।/ঠিক তত্ত্ব বুঝানো তো হবে বড় দায় ।/আমি সারা হই ভেবে সেই আশঙ্কায়।।” বইটিতে হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের ‘মতুয়া’ তত্ত্ব ছিল না তা নয়, কিন্তু আদিঅন্ত ‘বৈদিক অলীক গল্পে’র মিশেল রয়েছে। তার উপর সমস্যা হলো তখন অব্দি যদিও ‘নমশূদ্র সুরিৎ’ এর মতো বহু সাময়িক কাগজ বেরুচ্ছে নানা কেন্দ্র থেকে, তারকচন্দ্রের মতো সম্মানিত কবি ছিলেন না সমাজে । সুতরাং ভবিষ্যত লেখকেরা এর থেকে সত্যিকার কাঠামো একটা দাঁড় করিয়ে দেবেন এই আশাতে গুরুচাঁদ সম্মতি দিয়ে দেন। বাপ-ছেলেতে কথা হয় এরকমঃ “শশী বলে গ্রন্থে বাবা ধোঁয়া যদি রয় ।/গুরুচাঁদ বলে অগ্নি খুঁজিবে নিশ্চয় ।।/শশী বলে থাকে থাক কিছু জল অংশ ।/গুরুচাঁদ বলে ছেঁকে খাবে রাজহংস।।১৮ বইটির প্রকাশিকা অনিতা বিশ্বাস তারক চন্দ্রের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা নিয়েই লিখছেন, প্রবল দারিদ্র্যে তাঁর শৈশব কেটেছে। কবিয়াল পরিবারে জন্মেছেন। বৈদিক কথিকা পাঠ আর গান করেই তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। তার উপর নবদ্বীপের বৈষ্ণবদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা জন্মেছিল। হরিচাঁদের সঙ্গে পরিচয়ের পরেই তাঁর মধ্যে যে বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব শুরু হয় তার ছাপ রয়েছে বইটির পাতায় পাতায়। এই দ্বন্দ্বের জন্যেই বইটি লিখতে তাঁর এতো দ্বিধা ছিল। কিন্তু মূল পাণ্ডুলিপির উপরে কলম চালাতে হয়েছিল সম্পাদক হরিবর সরকারকেও। শ্রীগোপাল বলে এক ভক্ত টাকার যোগান ধরলে হরিবর সরকার কলকাতার প্রেসে প্রেসে ঘোরেন বইটি ছাপাবার জন্যে। কিন্তু কেউই রাজি হয় না। অনেকে এর ‘বেদ-ব্রাহ্মণ সম্মত’ সংস্কার করে আনতে পরামর্শ দেন। “কোলকাতা প্রতি প্রেসে করে অনুরোধ ।/সর্বস্থানে পান তিনি সম প্রতিরোধ ।।/প্রচারে বৈদিক শাস্ত্র ছিল যে সমিতি ।/বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষা সপ্তসতী স্মৃতি ।।/ইহাদের ছাড়পত্র আগে প্রয়োজন ।/তবেই করিবে প্রেস এ গ্রন্থ মুদ্রণ ।।” সমিতিটির নাম লেখেননি ডাঃ মনীন্দ্রনাথ বিশ্বাস । কিন্তু তাঁরা অনুমতি দেন নি, “...নিষেধাজ্ঞা জারি করে গ্রন্থ ছাপিবারে ।।/চিহ্নিত করিল গ্রন্থে বহু জায়গার ।/বলে আগে এই সকলি কর সংস্কার ।।/বৌদ্ধতত্ত্ব বুদ্ধকথা না থাকে পুঁথিতে ।/অবৈদিক ভাবধারা হইবে মুছিতে ।।” বিবেকানন্দ বলছিলেন, শূদ্রদের সংস্কৃত অধ্যয়নে মানা করেছে কে! তাঁর মৃত্যুর পরেও ‘নবজাগৃত’ মহানগর কলকাতার ছাপাখানাগুলোর বাস্তবে ছিল এমনি অবস্থান। বিপাকে পড়ে হরিবর গেলেন শ্রীগোপালের সঙ্গে শলা করতে। আম ছাড়া আমসত্ব কী করে তৈরি করবেন তিনি? শ্রীগোপাল টাকা দিতে পারেন, কিন্তু তাঁরও অবদমিত সামাজিক অবস্থান বোঝা যায়, এই উক্তিতে, “পড়িয়াছি হেন ফাঁদে উপায় তো নাই ।।/কিছু কিছু জায়গায় কর সংস্কার ।/দৃষ্টিমাত্রে দৃষ্ট হয় হেন দরকার ।।/স্থুলের ভাবভঙ্গি রাখিও বৈদিক ।/সূক্ষ্মভাবে ঠিক রেখো অবৈদিক দিক ।।/ভাবীকালে সত্য ঠিক খুঁজিবে পাঠক ।/জাতি মাঝে জন্ম লবে তাত্ত্বিক রচক ।।” ১৯ সুতরাং যা দাঁড়ালো, “...লীলামৃতে বহুস্থান সংস্কার করে।।/অলীকের গল্প যাহা গ্রন্থে দেখা দিল /পরিস্থিতি চাপে সব প্রক্ষিপ্ত হইল।।এতো সব করবার পরেও যে প্রেস এক বইটি ছেপেছিল তার ম্যানেজার তাঁদের থেকে কুড়ি টাকা ঘুস নিয়েছিল। সত্যি সত্যি শ্রীগোপাল এই সূক্ষ্মভাবে ‘অবৈদিক দিক’ ঠিক রাখার কথাগুলোই বলেছিলেন কিনা, আজ আর আমাদের জানবার উপায় নেই। কিন্তু একুশ শতকে এসেও যখন একজন নবীন ‘তাত্ত্বিক রচকে’র কলমে এই কথাগুলো পড়ি, তখন মনেতো হয়ই আমাদের ‘অন্ধকার মধ্যযুগে’র বিরুদ্ধে যত ধিক্কার , ‘আলোকিত আধুনিকতা’ নিয়ে যত বড়াই কিম্বা তাত্ত্বিক কচকচানি সবই আসলে পশ্চিমা আদলে নিজেদের স্বার্থে নির্মিত এক কৃত্রিম আখ্যান। যে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রয়োজন হাজার বছর আগেকার বৌদ্ধ কবিদের চর্যাপদের ভাষাকে ‘সান্ধ্যভাষা’ করে ফেলতে বাধ্য করেছিল, তার থেকে স্থানে এবং কালে খুব বেশি একটা এগোইনি আমরা। বাংলার তথা ভারতের ‘নবজাগরণে’র দর্প আমাদের মানায় না।

গ্রন্থসূত্রঃ

১) শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়; উন্নয়ন, বিভাজন ও জাতিঃ বাংলায় নমশূদ্র আন্দোলন, ১৮৭২-১৯৪৭; জাতি,বর্ণ ও বাঙালি সমাজ; সম্পাদনাঃ শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিজিত দাশগুপ্ত; পৃঃ১২৭।
২) শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়; ঐ;পৃঃ ১২৯।
৩) ঐ ।
৪) ঐ।
৫) অনিতা বিশ্বাস, প্রকাশিকার কথা;"হরিচাঁদতত্ত্বামৃত";ডা: মণীন্দ্রনাথবিশ্বাস; পৃঃXIII;
৬) সমুদ্র বিশ্বাস; গ্রামবাংলার জাগরণে মতুয়া আন্দোলন; চেতনা লহর; এপ্রিল-ডিসেম্বর, ২০১৩ যুগ্মসংখ্যা, সম্পাদক, অনন্ত আচার্য, কলকাতা, পৃঃ ১৩৭ ।
৭) The Future Of India; ; Lectures from Colombo to Almora; Complete-Works ; Volume 3/
৮) Vedanta In Its Application ToIndian Life ;ঐ।
৯) সমুদ্র বিশ্বাস; গ্রামবাংলার জাগরণে মতুয়া আন্দোলন; চেতনা লহর;ঐ; পৃঃ ১৩৯।
১০) জয়া চ্যাটার্জী;হিন্দু ঐক্য এবং মুসলমান স্বেচ্ছাচার, বাংলা ভাগ হলো; দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড; ঢাকা; পৃঃ ২২৬
১১ ) সমুদ্র বিশ্বাস;ঐ; পৃঃ ১৪১;
১২) শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়; ঐ;পৃঃ ১৪০)
১৩) শ্রীশ্রী হরি-গুরুচাঁদ মতুয়া মিশন;
১৪) শ্রীশ্রী হরি-গুরুচাঁদ মতুয়া মিশনের সঠিক ইতিহাস;ঐ।
১৫) সমুদ্র বিশ্বাস ; ঐ ; পৃঃ ১৩৩ ।
১৬) দুলাল কৃষ্ণ বিশ্বাস; ‘শ্রী শ্রী হরিলীলামৃত’ এক ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক প্রয়াসঃ প্রসঙ্গ হরিচাঁদ ঠাকুরের নিষেধাজ্ঞা।;চেতনা লহর, এপ্রিল-ডিসেম্বর, ২০১৩; সম্পাদকঃঅনন্ত আচার্য; কলকাতা; পৃঃ ৮৯
১৭) ঐ; ১০৮।
১৮) হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত;ডা: মণীন্দ্রনাথ বিশ্বাস;পৃঃ ২৪০-৪১; 
১৯)ঐ;পৃঃ২৪২-৪৫; 
                                                                                                                                            

Sunday, 6 October 2013

হীরুদার লাঙল এবং জমি-জিরেতের কথা...

(লেখাটি প্যাপিরাস ই-পত্রিকার , ২০১৩র শারদ সংখ্যা এবং তিনসুকিয়ার ছোট কাগজ 'উজানে' প্রকাশ পেয়েছে। --সুশান্ত  কর)

                     “তুই আমার মাটি কেটে চলে যাওয়া অবাধ লাঙল,
                      নেহাই চিকন লোহার ফাল”
এ সেই খ্যাতনামা কবির কবিতা যিনি লিখেছিলেন,
                  “মৃত্যুও তো এক শিল্প
                  জীবনের কঠিন পাথরে কাটা নির্লোভ ভাস্কর্য”

  
দ্বিতীয়টি বহুবার শুনেছেন অসমের মানুষ যারা কবিতা পড়েন তাঁরাও। যারা পড়েন না তাঁরাও। কেননা তাঁর কবিতা দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছে বহুবার বহুভাবে। অবশ্যই অসমিয়া ভাষাতে। তিনি হীরেন ভট্টাচার্য। কিছুতেই ভাববেন না কবিতা দু’টো আমরা অনুবাদ করলাম বলে। প্রথমটি কবির নিজের লেখা, আর দ্বিতীয়টি রমানাথ ভট্টাচার্যের অনুবাদ। রমানাথ ভট্টাচার্য অসমের সেই প্রবাদপ্রতীম শিক্ষক-গবেষক পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদের ভাইপোর দিকের পৌত্র, অসমের বাংলাভাষার অন্যতম প্রধান কবি । ১৯৯২তে ‘আধুনিক অসমীয়া কবিতা’ নামে একটি অনুবাদ সংকলন বের করেছিলেন। বিশ শতকের শেষার্দ্ধের সমস্ত অসমিয়া কবিদের বাংলা ভাষার পাঠকদের সঙ্গে বোধকরি এক সুপরিকল্পিত উপায়ে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ইনি । এর আগেও এঁরা অপরিচিত ছিলেন তা নয়। নিশ্চয়ই ছিলেন। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ভাবে। এমন একত্র উপস্থাপন এর আগে হয়েছিল বলে আমরা জানি না। সেই সংকলনে হীরেন ভট্টাচার্যেরও একাধিক বিখ্যাত কবিতা ঠাঁই পেয়েছিল । তার মধ্যে ‘জোনাকি মনে’র এই কবিতাও ছিল। রমানাথ এখন মুম্বাই প্রবাসী । সেখানে তাঁর  স্থাপিত রমানাথ ভট্টাচাৰ্য ফাউণ্ডেশন ২০১১তে হীরেন ভট্টাচার্যের জীবৎকালেই ‘পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কারে’ তাঁকে সম্মানিত করেছিল। সেই সংকলনে রমানাথ বেশ কিছু কথা লিখেছিলেন কবির সম্পর্কে। তারমধ্যে এই কথাটি আসলেই হীরেন ভট্টাচার্যের কবিতার পরিচয় সার, “ তাঁর কবিতা সঙ্গীত ধর্মী, চিত্রপ্রধান; গদ্যভঙ্গীমায় তিনি কথা বলেন, সুন্দর চিত্রকল্প তিনি ব্যবহার করেন।” যে পরিভাষাগুলো ব্যবহার করে এই বাক্য লেখা সেগুলো ইউরোকেন্দ্রিক আধুনিকতার যুগে খুব চলত। বাংলা কবিতা আলোচনাতে এই সব পরিভাষা এখন স্কুলবই ছাড়া আর তেমন বিশেষ কোথাও চলে না। বিশেষ করে ‘চিত্রকল্প’ শব্দটি—ইউরোপের ইমেজিস্ট কাব্য আন্দোলন থেকে আমদানি। বুঝে না বুঝে এককালে সমালোচকেরা খুব ব্যবহার করতেন। অথচ  যদিও সমার্থক নয় ‘চিত্রকাব্য’, কথাটি ভারতীয় অলঙ্কার শাস্ত্রে অপরিচিত ছিলনা কোনদিনই। সে যাক, দেখা যাবে সত্যি এই ছবি আর গানের প্রতি এক আশ্চর্য আকর্ষণ আছে হীরেন ভট্টাচার্যের। উপরের দ্বিতীয় কবিতাতে সে ইঙ্গিত স্পষ্টই আছে। তার একটি অসমিয়া কবিতাতে আছে,
             “কবিতা এটা আরম্ভ করা টান।
             পোনপটীয়াকৈ একোয়েই উজু বাটেরে
            মোর কলমলৈ নাহে।
          সুরে মোক আগতেই ধরা দিয়ে।...” ( র’দত তিরেবিরাই)
 
প্যাপিরাসে চলে আসুন
কবিতাটির শুরুতেই একটি অতিবাক্য আছে তৃতীয় বন্ধনীতে-- [মই এতিয়াও গান শুনি ৰৈ যাওঁ।] গান তিনি গুনগুনাতেন। গান লিখতেনও। অসমীয়াতে বেশ কিছু গানের সংকলন আছে, আকাশবাণীতে শিল্পীরা সেই ১৯৬৯ থেকেই তাঁর গান গেয়ে আসছেন। বাংলাতে তাঁর তৃতীয় বইটি গানের। একুশটি গান, আশা করেছেন কেউ সুর দেবেন আর গাইবেন। নাম ‘বৃষ্টি পড়ে অঝোরে’। এই বইয়ের প্রতিটি গানের ( আমাদের মতে কবিতাই) সঙ্গে রবীন বর এঁকে দিয়েছেন আশ্চর্য সব  জল রঙের সাদাকালো ছবি—এতেই বোঝা যায় ছবির প্রতি যে তাঁর প্রবল আকর্ষণ। । তিনি নিজেই রঙে রেখাতে আঁকতে পারতেন। জানেন তিনি আঁকা। হয়তো বিনয়বশত নিজে সেটি করেন নি। কিন্তু করেছেন শব্দের সেই একই কাজ শব্দের পরে শব্দ জুড়ে । এই যেমন শেষ কবিতাটিঃ
              গান সেধেছি
             জলে বাতাসে, পাল গুটিয়ে, হাল থামিয়ে
             সারাটা দিন, সারাটা রাত।
             বুকে কান্না, মুখে হাসি---
             থামেনা আমার হাতের মুঠোর কাঁচা বাঁশের বাঁশি
             বুকের ভেতর দিচ্ছে দোলা, শব্দমালার জমি-জিরেত
            আসুক ঝড়-বৃষ্টি—
           বুক চিতিয়ে আড়ে বহরে দিচ্ছি পাড়ি
           আড়া-খাঁড়া একরোখা নদী
           ঝমঝম যেন চলে দেমাকে রাতের রেলগাড়ি।
           নৌকা আমার এগুই-পিছোই
           গান সেধেছি বুক নিংড়ে
           সুর বেঁধেছি আঁচা-আঁচি কথার একবজ্ঞা একাবলি।
           গান যে আমার গাঁ –গঞ্জের এগারো ভাটির ভাটিয়ালি...।
বহু অসমিয়া –বাঙালি কবিকে নিশ্চয়ই মনে পড়বে এই কবিতা পড়ে। কিন্তু এমন ছবি আঁকাটি তাদের কবিতার সাধারণ ধর্ম নয়। তারচেয়েও বড় কথা এগুলো ঠিক স্থিরচিত্র নয়। যখন রবীন বরের আঁকা স্থির ছবিটি দেখছিলাম, তখনই মনে হলো এই কবিতার গতিময়তাকে স্থির ছবিতে ধরা কঠিন। যদিও ভালো স্থির ছবিমাত্রেরই একটি গতি আছে, সে দ্রষ্টা মনকে দুলিয়ে ছাড়ে ‘রাতের রেলগাড়ি’র মতো। অতএব রবীন বরের ছবিতেও আছে, কিন্তু এগুলো বলে অন্য কথা। নিয়ে যায় অন্যদিকে। এগুলো বাড়তি প্রাপ্তি। কবিতার পাশে অলঙ্করণ হিসেবেও মন্দ নয়, কিন্তু কবিতাকে ধরিয়ে দেয় না বড়ো। বা সম্প্রসারিতও করে না। এই কবিতাটির সঙ্গেই যে ছবি আছে, মনে হয় যেন ঝড়ে বিধ্বস্ত জাগাজ ঘাটার ছবি সে। বাঁশি যদি বা বাজেও তবে সে বিপদ সংকেত। অথচ কবিতাতে ঝড়ের কথা থাকলেও ভাবটি বিপরীত। আর যেটি লিখছিলাম, এর সবটাকে ধরা কঠিন স্থির ছবিতে। সেটি চলচ্চিত্রে সম্ভব। পাশাপাশি দু’টো ছবি ‘বুক চিতিয়ে আড়ে বহরে দিচ্ছি পাড়ি’ কেমন সে পাড়ি? না, ‘ঝমঝম যেন চলে দেমাকে রাতের রেলগাড়ি’ এসব উপমা-উৎপ্রেক্ষা অন্য কবিদের কবিতাতেও দুর্লভ তেমনও নয়। কিন্তু সে আস্ত কবিতাজুড়ে নয়, এই যেমন হীরেন গোঁহাঞির একটি কবিতার টুকরোতেই বোঝা যাবে , উৎপ্রেক্ষা আছে, কিন্তু ছবি নেই,
        “ হঠাৎ অচেনা লাগে ঘুর্ণিজলের ধ্বনিঃ ভালো খাওয়া হয়েছে দাসের বিয়েতে
        আবার সাহা কিনেছে কি মাটি সস্তায়
        তোষামোদের
       কতনা নতুন অজুহাত!” (উত্তর রবীন্দ্র; আধুনিক অসমীয়া কবিতা; পৃঃ৮৮) ।
 
হীরেন ভট্টাচার্যের কবিতা এই দাস-সাহাদের উল্লেখ না করেই নিজের কথা ব্যক্ত করে। এক দু’টি কবিতাজুড়ে ছবি আঁকার প্রয়াস হয়তো অনেকের কবিতাতেই মিলবেও কিন্তু তাঁর সমগ্র কাব্যদুনিয়াটিই এই। প্রথম জীবনে তিনি একটি কাগজ করতেন ‘চিত্রবন’ নামে, পরে এই নামে একটি ছাপাখানাও চালিয়েছিলেন নিজের বাড়িতেই।

             আর কবিতার সেই ছবির বিষয়ের সন্ধানে নাগরিক কবি হয়েও গ্রামে গঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন খুব। বৃদ্ধ বয়সেও মৃত্যুর আগে অব্দি এই স্বভাব ছিল তাঁর অটুট। লোকে তাই তাঁকে ‘হীরুদা’ বললে চেনে বেশি, মূল নামে অচেনা ঠেকে অনেক সময়---এমন কপাল আর কোন কবির হয়েছে বলে জানি না। তাঁর এই ‘মোর দেশ’ কবিতাতে ঠিকই লিখেছিলেন তিনি,
            “ দেশে-দেশে মোর বন্ধু আছে। এনে বহু দেশর অরঙে-দরঙে
              মই ঘুরিছো। বহু বন্ধুর সতে হাতে হাতে হাত ধরি ফুরিছোঁ
             কেতিয়াবা সাগর পারত, কেতিয়াবা খেজুর তলত, নতুবা
             পাহারতলিত খন্তেক জিরাইছোঁ। বন্ধুর সতে প্রাণ খুলি প্রাণর
          কথা পাতিছোঁ। তার পিছত আকৌ আরম্ভ করিছোঁ নতুন যাত্রা।” (পৃঃ১৭; হীরেন ভট্টাচার্যর কবিতা) বাংলাতে তিনি লিখেছেন,
           “ আমার ছেলেবেলার খেলা আমার সঙ্গ ছাড়েনি
          ভরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আরেকবার জলের তল ছুঁয়ে আসতে চায়...” ( ১৩ নং কবিতা, জোনাকি 
    
পংক্তিমালা, শিকড় থেকে পাতা অব্দি, পৃঃ৫৭) , তো এই নদী, জল, নৌকা, দোতারা, আকাশ, প্রজাপতি, মেঘ, রৌদ্র, শরৎ , শ্রাবণ, ঘাস, গাছ, পাখি, ধান, লাঙল এগুলো ছাড়া তাঁর কবিতাই নেই। সম্ভবত তাই, তাঁর কবিতার পাঠক তাঁকে ‘সুগন্ধী পখিলা’র কবি নামে চেনে, চেনে ‘প্রেম’ কিম্বা ‘রোদালী’র কবি বলে। ১৯৬৮-তে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতা বইয়ের নাম ‘রৌদ্ৰ কামনা’ আর ১৯৭২এ প্রকাশিত দ্বিতীয় বইটির নাম ‘মোর দেশ মোর প্ৰেমর কবিতা’। ‘সুগন্ধী পখিলা’ নামে সবচাইতে খ্যাতনামা বইটি আসলে চতুর্থ প্রকাশনা। বেরিয়েছিল ১৯৮১তে। বাকি বইগুলোর নাম দেখুন, বিভিন্ন দিনর কবিতা (১৯৭৪),শইচর পথার মানুহ (১৯৯১), ভালপোয়ার বোকা-মাটি (১৯৯৫), ভালপোয়ার দিকচৌ বাটেরে (২০০০)। সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন,বাংলা বই এর নামগুলো ‘জোনাকি মন ও অন্যান্য’, ‘শস্যের মাঠ মানুষ’। আমাদের এখনো সে দুটো পড়বার সুযোগ ঘটেনি, অনুমান করতে পারি সেখানে ২০০১সনের আগেকার লেখা অসমিয়া কবিতার বাংলা রূপান্তর রয়েছে। আমরা যে শেষ দুটো বই তুলে নিয়েছি, তার একটির কথাতো লিখলামই, অন্যটি কবিতার বই। বলেছেন,নিজের কবিতার নিজে অনুবাদ করেছেন। কবি যখন করেন, তখন কি আর অনুবাদ থাকে? আমরা এই প্রশ্নের মীমাংসা করব পরে। কাজটি তিনি করেছিলেন আগেই, কিন্তু প্রকাশ করেছেন গানের বইটির পরে ২০১১তে। নাম ‘শিকড় থেকে পাতা অব্দি। গানের বইটির বিষয় সেই বৃষ্টিই। বাঁশের ঝাড়ে, গাঁ –গঞ্জে, নদীর পাড়ে, কচি ঘাসে ‘গান যে আমার গাঁ –গঞ্জের এগারো ভাটির ভাটিয়ালি...।’ সেদিক থেকে বৈচিত্র আছে কবিতা বইটির। আমরা সেটিকে বরং খানিক নিবিড় পাঠে বুঝে নেবার চেষ্টা করব। কিন্তু যেহেতু কবি মানুষটিকে বুঝে নিতে হবে, তাই অন্যান্য অসমিয়া কবিতার আশ্রয়ও কিছু নিতে হবে। ২০০১এ অসম উপত্যকা পুরস্কার নিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “কবিতার বাহিরে কবির আন চিনাকি নাই। কবির জীবন-পঞ্জী পাঠকর বাবে অর্থহীন।” কথাটি মিথ্যে নয়। আমরাও তাই করব, কবিতা দিয়েই বুঝে নেব তাঁকে। কিন্তু সমালোচকের কাজ চলেনা, জীবনকে একেবারে না ছুঁলে।

            
১৯৩২এ যোরহাটে জন্মেছিলেন তিনি । ফলে চল্লিশের দশকে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, বিষ্ণু রাভাদের নেতৃত্বে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের যে ডামাডোল শুরু হয়, তিনি তার থেকে দূরে ছিলেন না মোটেও। এদের দেখেছেন, শুনেছেন, এক সঙ্গে কাজও করেছেন। ষাটের দশকে প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘের অসম শাখার তিনি উপসভাপতিও হয়েছিলেন। তার মানে তখনকার বহু কবি সাহিত্যিক শিল্পীর মতো শিল্পী জীবনের শুরুতেই তিনি সাম্যবাদী আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পরে যদিও তিনিও এই সঙ্ঘগুলোর সংস্পর্শ তখনকার অন্য অনেকের মতো ছেড়েছিলেন, নাগরিক প্রতিষ্ঠানের অলিতে গলিতে তাঁকে দেখা যায় নি তেমন। গেলেও সে হাঁসের জলে সাঁতার কাটার মতোন, তাঁর “অন্তর্জলি কান্নার জলে/ সাঁতার কাটছে এক ঝাঁক বুনো হাঁস/ তাদের ডানায়-পাখায় ঝলমলে রোদ। স্মৃতি নাড়া দিলে ঝরে পড়ে তরতাজা শব্দ--” (বৃষ্টি পড়ে অঝোরে; পৃঃ২১) তাঁর বিপরীত রাজনৈতিক বিশ্বাসের লোকেরা , বিশেষ করে উগ্র-জাতীয়তাবাদীরা অনেকেই তাঁর কবিতাতে দেয়াল লিখেছে, পোষ্টার সেঁটেছে। সেগুলোও তিনি ভালো নজরে নেন নি , কোনদিন। নাগরিক জীবনের কালো ধোঁয়ার কথা লিখেছেন তাঁর কবিতায়, কিন্তু সে শুরুর দিকে যেমন কিছু কবিতাতে মেলে, জীবন যত এগিয়েছে মেলেনা আর। এই যেমন ১৯৬১তে লেখা ‘নাগরিক’ কবিতাতে তাঁর উচ্চারণ ,
                “ কলঘরর ক’লা ধোঁয়াই
               এদিন আকাশত বিজুলি জ্বলাব,
               রাস্তার কাষর এইজাক ল’রাই
              জীবনর বাটে-বাটে ফুল ফুলাব,
              ব্যাধিগ্রস্ত এই নগরে এদিন
             আকাশলৈ মুর তুলি ক’বঃ বতাহ ইমান কোমল।” (পৃঃ ১৬) সেই বহল আকাশ, কোমল বাতাসে তাঁর আজন্ম মোহ। ‘আহিনের লেণ্ডস্কেপ’ কবিতাতে ( ১৯৬৫)
               ‘শেষ হৈ গ’ল
             লুব্ধ আকাশর হিংস্র উৎসব...’
 এর কয়েক পংক্তি পরে যখন লেখেন
            ‘র’দালির ভাঁজে ভাঁজে
             অপার বিস্ময়।
            আবেগত ভাগি পরে
           শব্দের তন্ময়।’ (পৃঃ ২৮ ঐ) –তখন স্পষ্ট বোঝা যায়, এই কবিতা কেবল আশ্বিনের কবিতা নয়, আরো বেশি কিছু। আর তাঁর প্রতিটি শব্দের উৎসভূমির ইঙ্গিততো বটেই। ‘মোর এই শব্দবোর’ কবিতাতে তিনি আরো স্পষ্ট করে লিখছেন
        “...মোর কোন নিজস্ব আবিষ্কার নাই,
        মোর ভিতরত এটা যেন খেতিয়ক, মই শব্দবোর জিভাত দি চাঁও,
        কার কি সোয়াদ, হাতর তলুয়াত লৈ চাও,
        কিমান তপত,
        মই জানো শব্দ মানুহর মহৎ সৃষ্টির তেজঃদীপ্ত সন্তান,
        মই সাধারণ কবি,
        কান্ধ সলনি করি বৈ অনা মোর এই শব্দবোরত
     

মানুহর নিদারুণ অভিজ্ঞতা, বুরঞ্জীর নিঠুর আঁচোর।.” এর সঙ্গে মিলিয়ে পড়ুন আমাদের আগে উদ্ধৃত গানের পংক্তি “বুকের ভেতর দিচ্ছে দোলা, শব্দমালার জমি-জিরেত” –তার সঙ্গে মেলান একেবারে শুরুর দু’লাইনের কবিতাটি। একটি সংযোগ সূত্র মিলবে যেগুলো নিতান্তই কবি হীরেন ভট্টচার্যকে চেনায় আর কাউকে নয়। ‘খেতিয়ক’ শব্দটির নানান মানে হতেই পারে। এক, তিনি মাটির খুব কাছাকাছি গ্রামীণ জীবনের কবি। কিন্তু এহ বাহ্য। এখানে তিনি সঙ্গে করে এও জানিয়ে দিচ্ছেন ‘মই সাধারণ কবি’ এই সবিনয় উচ্চারণের পরেও, চাষার মতোই কী অসাধারণ যত্নে তিনি শব্দগুলোকে তুলে আনেন। আর যখন কাঁধে ফসল নিয়ে ফেরেন, তখন চাষার ফসল নিয়ে ফেরার কথা যেমন মনে পড়ে, গোটা বর্ষা ঝড় জল তুফানের সঙ্গে তার অন্যন্য সংগ্রামের কথাও মনে পড়ে। একই সঙ্গে মনে পড়ে অসমিয়া কবিতার উত্তরাধিকার তাঁর নিজের কাঁধে আসা অব্দি কত ‘বুরঞ্জীর নিঠুর আঁচোর’ সেই কবিতাগুলোকে সইতে হয়েছে , অথবা তাঁর কোন একক কবিতার পেছনে আছে শব্দ নিয়ে কাটাকুটি যন্ত্রণার কত গোপন ইতিবৃত্ত। এই যে , যা লেখা হলো, তার বাইরে পাঠক মনে নানা অর্থের দোলা দিয়ে যাওয়া ---এই ব্যাপারটি আমাদের কবিরা জানতেন। ক্যামেরা যেমন ছবি তোলে, এমন বিশদবিবরণ সহ (ডিটেলিং) ‘চিত্রকাব্য’ তাঁরা ধর্মসাহিত্যের যুগেও খুব একটা লিখতেন না। মীরা যখন গান করেন ‘মেরেতো গিরিধারি গোপাল দোসরা না কোই’—তখনো এটা সত্য। কিম্বা চর্যার এই কবিতাটাই দেখুন,
             “...ছুটন্ত সেই হরিণের আর যায় না দেখা খুর–
    ভুসুকুর এই তত্ত্ব মূঢ়ের বুঝতে অনেক দূর।” ( অনুবাদঃ সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ)-- একটা তত্ত্ব আছে কবিতাটিতে, আমরা সবাই জানি সে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু যারা সে তত্ত্ব বুঝতে যাবে তাদের মূঢ় বলে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন কবি ভুসুকু। আমাদের মতে ভালোই করেছেন , তাতে কবিতার স্বাদ নিতে আমাদের সুবিধেই হয়েছে। বিশেষ করে হরিণের সেই না দেখা খুরের কথাটার ব্যঞ্জনা অনুভব করবার চেষ্টা করুন— অতুলনীয়! অথচ আমরা যে ছেলেবেলা পড়েছিলাম,
           “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?
           কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে”—এগুলো বরং আমাদের কাব্য পরম্পরাতে বিলেতি দান। বিশেষ করে টেনিসন-ব্রাউনিঙ-ম্যাথু আর্নল্ড শাসিত ভিক্টোরীয় যুগের ইংরেজি কবিতার । কবিতা হিসেবে আহামরি কিছু নয়। এগুলো নতুন যুগের নীতি কথা। কথা হিসেবে ভালো, কিন্তু কবিতা হিসেবে মোটেও নয়। যারা লিখেছিলেন, পশ্চিমা শিক্ষার ফলে তাঁরাও তারা বিশ্বাস করতেন , আমাদের সমস্ত প্রাচীন সাহিত্য ধর্মীয় নীতিকথাতে পরিপূর্ণ, এখন কবিতাকে দেশীয় জাতীয়তাবোধের কথাতে পরিপূর্ণ হতে হবে। আদর্শ নাগরিক গড়ে তুলতে হবে, পাঠককে চরিত্রবান করে তুলবার দায় কবিকে নিতে হবে। অথচ, এটা ঘটনা ছিল যে যেগুলোকে আমাদের ধর্মীয় নীতিকথার বালাই বলে মনে করা হতো সেগুলোর অনেকটিতেই পরস্ত্রী লুলোপ শিব ঠাকুরকে বৌ পার্বতীর মারের চোটে অনেক সময় কাপড় ছেড়েও পালাতে হতো। তারমানে ইচ্ছে করলে, আপনি ‘নারীবাদ’ও সেখানে পেতে পারেন। কিন্তু সে কথা গুরুত্ব্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো সেগুলো সাহিত্য রসে এবং গুণে পরিপূর্ণ ছিল। বরং নজরুল যখন শ্যামাসঙ্গীত লিখলেন, সেগুলোতে অনেক নীতিকথা ছিল। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেও সেই পরম্পরারই ছাপ মিলবে। তাঁকে ‘বিদ্রোহী’ কবি আখ্যা দেয়ার মধ্যেও কিন্তু এই কবিতা বহির্ভূত ভাবনাটিই ঠাই পেয়েছিল। ঠিক তেমনি তখন বাংলাতে অনেক ‘দুঃখবাদী’, ‘দেহবাদী’ ইত্যাদি কবিও দেখা দিয়েছিলেন। অথচ, এই অভিধাগুলো আসলেই এইসব কবিদের ছেটে ছোটো করেছিল। তাদের পরিচয়ের সবটা এতে ধরা পড়ত না। ব্যাপারটি অসমিয়া কবিতাতেও মিলবে। কেননা, বাংলা কবিতার পরম্পরার সঙ্গে তাঁরা পরিচিত ছিলেন খুব । আর না থাকলেও পশ্চিমী চিন্তার প্রভাবটিতো আছেই। কবিতার সেই একই ভাবনাস্রোত বহু ‘বামপন্থী-প্রগতিশীল’ কবিকেও কবি হতে দেয় নি। তাঁরা নিজেরা দেশ ,সমাজ নিয়ে যেমন যেমন ভেবেছেন, আশা করেছেন তাদের পাঠকও ঠিকঠাক তেমন তেমন ভাববেন—এবং তাঁদের চেতনার উত্তরণ হবে। রাবীন্দ্রিক পরিভাষা ধরে বলতে পারি, রূপের তথ্যটাকেই সব ভেবে নিতেন, ‘অরূপে’র সত্য অব্দি পৌঁছুতেন না। হীরেন ভট্টাচার্য সেই আবহাওয়াতেই শুরু করেছিলেন। সুতরাং তাঁর মধ্যে সেরকম ভাবনা ছিল না নয়, কিন্তু কেমন বেরিয়ে এসছিলেন, তার নজির ‘সাংকেতিক ধ্বনি’ কবিতাটি,
                “চহরীয়া বাহবার কী মূল্য গাঁয়ে –ভূঁয়ে যদি নোতোলে গির্জনি?
                নিপুণ কবির স্বাক্ষরবাহী কবিতা যেতিয়া
                 নষ্ট শস্যর মনোজ্ঞ বিজ্ঞাপন,
                নিষ্ঠাবান বিব্রত হোয়াটো স্বাভাবিক,
                মোর শরীরর তন্নতন্নত বিয়োগ গ্লানি,
                নিয়তি মই নেমানো, আতংকিত তেজ মোর
                একো- একো রাতি সমুদ্রর দরে গর্জি উঠে, ধ্যানকেন্দ্রী মুহূর্তর
                ক’ত সেই সাংকেতিক ধ্বনি?” (পৃঃ১০২, হীরেন ভট্টাচার্যর কবিতা)

   
যে ভাবনাবৃত্তের কথা বলছিলাম তার বাইরে গিয়ে সেই পশ্চিমেও বিশ শতকের শুরুতে শুরু হয়েছিল ‘সিম্বলিস্ট’, ‘ইমেজিস্ট’ , ইত্যাদি কাব্য আন্দোলন—আমাদের কবিরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাংলা কবিতাতে রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারটি আলাদা। তিনি দেশীয় কবিতার পরম্পরাকে খুব ভালো জানতেন, বুঝতেন। ফলে বিদেশী পরম্পরার সঙ্গে পরিচিত হলেও সেই ঝড়ে স্বয়ং উড়ে যান নি। কিন্তু অন্য অনেকে গেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের বেশি বয়সে যারা নিজেদের আধুনিক বলে ঘোষণা করছিলেন তারা তো বটেই। তাদের থেকে সরে দাঁড়ালেন আবার জীবনানন্দ। সম্ভবত তাই জীবনানন্দকে এসে লিখতে হয়েছিল, “সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি” । রবীন্দ্রনাথের ‘মানুষমাত্রেই শিল্পী’ কথাটির বিপরীত উচ্চারণ-- এই কথাটি অবশ্যি বাংলা তথা ভারতীয় পরম্পরাতে এক বিপরীত আভিজাত্যবোধের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু কবিতার স্বরূপ নিয়ে ভাবতে সবাইকে বাধ্যও করেছে। আমরা যেগুলোকে কবিতা বলে চিনি, অধিকাংশই আসলে ‘নষ্ট শস্যর মনোজ্ঞ বিজ্ঞাপন’— এই সত্যটি অনেকেই উপলব্ধি করতে শুরু করেন। কবি জীবনানন্দের এবং তাঁর সমকালীনদের সঙ্গে অসমিয়া কবিদের পরিচয় ঘটেছিল অচিরেই। সুতরাং হীরেন ভট্টাচার্য অপরিচিত ছিলেন এমন নয়। অনেক সমালোচক লিখেও দিতে পারেন তাঁর কবিতা পড়ে যে তিনি ‘ইমেজিস্ট বা সিম্বলিস্ট বা পরাবাস্তববাদী’ কাব্য আন্দোলনে প্রভাবিত হয়েছিলেন। আমরা সেরকম বলতে চাইনা। তিনি আড্ডা দিতে ভালোবাসলেও বক্তৃতাতে খুব কম কথা বলতেন, এবং আমরা যেগুলো পড়েছি সেগুলোতে এই সব পশ্চিমা ‘আধুনিক কবিতা’র পরিভাষা খুব পাইনি। মনে হয়, গ্রামে গঞ্জে ঘুরে বিহু সহ আমজনতার কাব্য পরম্পরার সঙ্গে তাঁর যে পরিচয় ঘটেছিল তাতে তিনি সেই সব পোষাকী পরিভাষার দরকারও বিশেষ বোধ করেন নি। সম্ভবত তাই তাঁর সুবিখ্যাত উচ্চারণ,
             “ গুণগুণনিতে
             কঁপে গছর ছাঁ, পাতর আগর র’দ
             একেটা ফুটতে
             মোর বুকুত উবুরি খায়
             অবোধ দিন
            এতিয়াও যার পোষাকী নাম দিয়া হোয়া নাই!
           ...কবিতা মূলত স্বাধীন, স্মৃতি তার সুগন্ধি পখিলা!” ২০০১এ অসম উপত্যকা সাহিত্য পুরস্কার নিতে গিয়ে তিনি বলছেনও, “ সকলো সৃষ্টির উৎস হৈছে লোকজীবন। লোক-জীবনর অভিজ্ঞতাই কবিতাক প্রাণবন্ত করে। ঐতিহ্য আমার কেবল অতীততেই নহয়। বর্তমানরো আধার।ঐতিহ্যর রূপ আরু রূপান্তরেই হৈছে কবিতার আধার...” ১৯৮৬তে অসম সাহিত্য সভার ৫২তম অধিবেশনে কবি সম্মেলনের সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি যখন বলছেন, “কবিতার শব্দ কেবল শব্দই নহয়, ই ধ্বনিও।” তখন সোজা আমাদের মনে পড়ে পুরোনো ভারতীয় অলঙ্কার শাস্ত্রের ধ্বনিবাদের কথা। তিনি আরো বলছেন, “কবিকণ্ঠর এটা শব্দ যেতিয়া প্রতিধ্বনি হৈ আমার কাষলৈ উভতি আহে সি জানো সেই পুরণি অবয়বেই ? শব্দর এই বাঢ়ি অহা কারণেই হৈছে কবির নিপুণতার চিনাকি। কিন্তু শব্দই জানো কবিতা? শব্দর অর্থই জানো কবিতা? শব্দর আভিধানিক অর্থই যদি কবিতার অভ্যন্তর প্রবেশর সঁচার-কাঠি হ’লহেঁতেন, তেনেহ’লে আজির কবিতার দুরুহতার বহু অভিযোগর অবকাশ নেথাকিলহেঁতেন। কবিয়ে জীবন পাত করে তেনে শব্দ সন্ধানত যার আবাহনী ক্রিয়াই আনি দিব পারে নতুন মাত্রা। ‘
           কবিতা জীবনর অন্য বিষয় কুশল, অন্য প্রত্যাশা
           শব্দ সংঘ ভাঙি তিরবির বন তুলসীর
       উজারি লুকুয়া সুগন্ধি দীঘল উপত্যকা।’” এর পরেই তিনি লিখছেন মোক্ষম কথাগুলো যা একজন নীতিবাগীশ থেকে কবিকে আলাদা করে, “ ...রোমাণ্টিক যুগতো কবিক কোয়া হৈছিল দ্রষ্টা-শিক্ষক। কবিতা আছিল কবির বাণী। সময় সলনি হোয়ার সতে কবি সম্পর্কে অভিধাও সলনি হৈছে। কবিও আন দহজনর দরে দোষে-গুণে মানুহ। আবেগ অনুভূতি একমাত্র কবিরেই আছে এই কথা জানো ন-দি ক’ব পারি? কবির আটাইতকৈ ডাঙর গুনটো হৈছে নিজর সৃজনশীল, মননশীল বিচিত্র ভাবনার বাহন স্বরূপে শব্দ ব্যবহার করার ক্ষমতা। এই প্রখর শব্দবোধেই কবিক আন মানুহর পরা পৃথক করিছে। কবিতা কবির শ্রাব্য কল্পনা। পাঠেই কবিতার জীবন। শব্দর শিল্প কবিতা ছপার আখরতেও আবদ্ধ নহয়। ই যে কণ্ঠরো শিল্প!...কবির পাঠে বর্ণক উন্মোচন করে শব্দলৈ, শব্দক ধ্বনিলৈ, আরু ধ্বনির অনুরণনে কবিতাক লৈ যায় জীবনর বোধি-মূললৈ।” বোঝা যাচ্ছে তিনি যদিও ধ্বনি বলতে শব্দের কানের শোনার দিককে বোঝাচ্ছেন, আসলে শব্দের আভিধানিক অর্থকে ছাড়িয়ে গিয়ে যে নতুন মাত্রা, নতুন ব্যাঞ্জনার্থের দিকে ইঙ্গিত করে কবিতা –তিনি সেদিকেও আমাদের বোধকে নিয়ে যেতে চাইছিলেন। অর্থাৎ অনুরণনটি শুধু শব্দ ধ্বনির নয়, অর্থেরও হয়ে থাকে। সেজন্যেই একটি কবিতাতে তিনি লিখেছিলেন,
           “...শব্দও কবিতার কাষলৈ আহোঁতে
          খুলি থৈ আহে
          তার পোছাকী কাপোর” ( সাহিত্য উৎসবর তিনিদিন; হীরেন ভট্টাচার্যর কবিতা; পৃঃ১৭১) ‘ধ্বনি’ বলতে সেই অর্থের অনুরণনকেই বোঝাতেন আমাদের প্রাচীন সাহিত্যশাস্ত্রীরা। তাঁরা বলতেন, ‘কাব্যস্যাত্মা ধ্বনি’ । ধ্বনিই কাব্যের আত্মা। এই ধ্বনি আছে বলেই এই কথাও সত্য, ‘পাঠেই কবিতার জীবন।’ ছবি সম্পর্কে এই রবীন্দ্রোক্তি সত্য ‘চোখের ছবিতে মন আপনার ছবি জুড়িয়া দেয় তবেই সে ছবি মানুষের কাছে সম্পূর্ণ হইয়া ওঠে ।’ (ছবির অঙ্গ, পরিচয়, রবীন্দ্ররচনাবলী) এবং গান সম্পর্কে সত্য তাঁর এই উচ্চারণ, “একাকী গায়কের নহে তো গান, মিলিতে হবে দুই জনে —/গাহিবে একজন খুলিয়া গলা , আরেক জন গাবে মনে” (গানভঙ্গ,কাহিনী, রবীন্দ্ররচনাবলী)

         এবারে আমাদের মনে হচ্ছে আমরা হীরেন ভট্টাচার্যের বাংলা কবিতার যেগুলো আমাদের হাতে আছে সেগুলো বুঝবার কিছু সূত্র হাতে পেয়ে গেলাম। আমরা এই কবিতাটি দিয়েই শুরু করি।
                “ মাথা নত করে ছুঁয়ে এসো মানুষ-মাটি
                  স্পর্শ করো প্রতিজন সৎ কবির কবিতা, অকুতোভয় ভালোবাসা
                  গ্রহণ করো মানুষ সম্পর্কীয় সুগভীর পাঠ, মাতৃভাষার দীপ্ত বর্ণমালা
                 পরিণত ভালোবাসার গানে ভরিয়ে দে শব্দ প্রতিমার ঘর
          প্রদক্ষিণ করো মানুষ মাটি।” (প্রদক্ষিণ করো মানুষ মাটি, শেকড় থেকে পাতা অব্দি, পৃঃ৮৭) একেবারেই সহজ কথা, সহজ বক্তব্য। বামপন্থী প্রগতিশীলেরা যেমন ভাবতেন, সেই কথাগুলোই আছে। তারপরেও দেখুন তিনি কেমন নামঘর বা মন্দির পরিক্রমা করা ভক্তদলের একটা ছবি এঁকে ফেলছেন। ছবি যে ‘ধ্বনি’টি তোলে তার গুনে কেউ ভাবতেই পারেন, বোধকরি চেনা ‘ভকতে’র ‘ভক্তি’কে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। আর দল ভাবতেই পারেন , কবির ভক্তির বিষয়কে পালটে দিয়েছে এই কবিতা। সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছে কবিতা নির্মাণের ব্যাকরণ। একেই বলে লোক উৎস থেকে পাওয়া ঐতিহ্যের নবনির্মাণ। এমন আরো আছে, গাছের বড়ো হয়ে উঠা আর পাখির কলকাকলি শুনুন,
               “ শিকড়টা আড়ালে আড়ালে অনেক দূর গিয়ে পৌঁছোল। পাথুরে মাটিও
               সহজে পেরিয়ে গেল। কিংবদন্তির দরজায় কড়ানাড়া দিয়ে এখন আমার বুকে
               ছটফটিয়ে আছে স্মৃতি।আমার গায়ে গা রেখে মেলে দিয়েছে ঝিমোনো ডানা।
               নদী- দহ আন্দোলিত প্রকৃতি শব্দমালার কোনো নির্জন বিছানায় হারানো শব্দ খুঁজে
               আড়াআড়ি শুয়ে আছে আমার ভিতরে বয়ে চলা ভাষার দ্রাঘিমা;
                ভালোবাসার দেশ-দেশান্তর...” (কবিতার অভিঘাত, পৃঃ৪৩)

তেমনি আছে,

           “... আমি কাগজ-কলম হাতে নিয়ে বসলাম, যদি একটিও কুড়োতে পারি;
           মানুষের বুকে এতো ঢেউ, এতো সর্বজনীন মানুষের বুক---
          শব্দবান মাটির দিকে চেয়ে আমি মাথা নিচু করে রইলাম। ( মানুষের বুকের ঢেউ; অংশ; পৃঃ ৪৫) এই শব্দবান মাটির দিকে তাকানোর কথাই আরেকটি কবিতাতে আছে এরকম,
         “ আমি এক দৃষ্টে ভাষার শেকড়টায় তাকিয়ে ছিলাম। কেউ আমাকে
        সুঠাম গাছটা আঙুল তুলে দেখালো।” (ভাষাবন্ধন, পৃঃ৬৭) স্মরণ করুন বইটির নাম ‘শেকড় থেকে পাতা’। একটা কবিতার আরম্ভ কেমন করে হয়?
        “ একটা দীর্ঘ কবিতার আবেগময় আরম্ভ যেন--
         আমার রক্তে সজীব হয়ে উঠেছে একটা শুকনো মাঠ--
        তার চারদিকে গজিয়ে উঠছে নলখাগরার চারা
        আমি তোর কোলে মাথা রেখে স্বপ্ন দেখছি
        আমার উঠনটার চিকন ছায়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে
        কোনো আমলকী বনের
        একজোড়া চিতল হরিণ
        আর হাসি-খুশি রোদের সরষেখেতটাতে
        গুনগুনিয়ে আছে আঁঠালো একঝাঁক জিরোনো মৌ। ...( একটা দীর্ঘ কবিতার আরম্ভ; পৃঃ ৩১) কখনো বা সেই কবিতা লেখা হয়েও উঠে না,
         “ আমার শরীর জুড়ে ব্যাকুলতা, গাছগাছালির সবুজ
         বীজের চারা জন্যে রাখা ধানমুঠো হাতেই ভিজে উঠেছে
        ছিটিয়ে দিলেই শেকড় ধরবে
        মাঠে নতুন জল আসার শব্দ শুনছি , ঢল ভেঙ্গে আসছে
        জল ভেঙ্গে আসছে শস্যমুখর দিন
        আমার রক্তে কান্নাজলের আলতো গন্ধ
        হেলে পড়েছে ধানের চারা...( ঢল ভেঙে আসছে, পৃঃ ৪০) এবারে এই কবিতাকে ইচ্ছে করলেই যে কেউ কবি, কবিতার সঙ্গে অসম্পর্কিত করে পড়তে পারেন। কেউ এতে ফী-বছরের বানের যন্ত্রণার সন্ধানও করতে পারেন, বা অন্যকিছু। আমরা আসলে তাঁর কবি সত্ত্বার স্বরূপ ধরতে গিয়ে এভাবে পড়ছি। সঙ্গে যে কথাটি অবশ্যই বলে দিতে চাই, কবিতা তার লেখাতে অবশ্যই কখনো ধান, কখনো সরষে, কখনো বা অগুল্ম বৃক্ষ, কখনো বাঁশঝাড়, আর বুকের ভেতরেই তিনি লালন করেন সেইসব ফসলের জমি-জিরেত , অথবা যেমন দাবি করেন বাস্তব জমিজিরেত থেকেই সংগ্রহ করেন ‘শব্দমালা’ যেখানে ‘স্মৃতি’ হয়ে বেড়ায় কখনো সুগন্ধি পখিলা, কখনো বা গুনগুন করে মৌ, কখনো আলোর শিশির ছড়ায় জোনাকিরা। এরা যেমন বীজ ছড়ায়, ফসল ফলায়, সবুজ করে মাটি। ‘মাটির মাতৃভাষা সবুজ’ একটি কবিতার প্রথম সারি (মাটির মাতৃভাষা, পৃঃ ৭৬)। কবি নিজেকে অধিকাংশ সময়ে ‘খেতিয়ক’ বা চাষা বলে কল্পনা করছেন, সে বলুন বা নাই বলুন বোঝাই যায়, কখনোবা ইচ্ছে করেন লাঙল হয়ে উঠবার। একেবারে শুরুতে উদ্ধৃত কবিতার মর্ম কথাটিতো এই। একটি কবিতার নামেই তো ইচ্ছে জানালেন, ‘আমাকে লাঙলের ফলা করে গড়ে নে’ (পৃঃ৩৪) এমনকি শিল্পী প্রতিমা পাণ্ডে বড়ুয়াকে নিয়ে যখন লিখছেন, কী লিখছেন?
               “ তুই গান গুটিয়ে চলে গেলি”
গান নয়তো যেন ধান! এরপরে লিখছেন,
              “ তোর দোতারাখানা সেভাবেই
                অগোছালো হয়ে পড়ে আছে
                উঠোনটাতে”
দোতারা নয়তো যেন লাঙল।
              “ছেঁড়া তার দুটো দুধারা চোখের জল”
 আশ্চর্য সুন্দর পংক্তি। কিন্তু এখানে থামলে চলবে কেন! শেষ পংক্তিটি,
              “ উজিয়ে বয়ে চলেছে মাটির সুরে” ।

স্মরণ করুন , রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরি’ কবিতাটি। মনে পড়বেই। কিন্তু কিছুতেই দুটো কবিতা এক নয়। প্রতিমা পাণ্ডের গান এখনো বাজে, সেই গান পড়ে থাকা দোতারার চোখের জল। তাও আবার ‘উজিয়ে’ চলেছে! তার মনে সে চলেছে আরেক নতুন সৃষ্টিমুখের দিকে। বাঙালি আঁকিয়ে সুশীল সাহা ঘোড়া আঁকবার জন্যে বিখ্যাত। চিত্রশিল্পী তিনি । কিন্তু যা বলবার বলেন এই ‘ঘোড়া’তেই । যারা বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদে হিরণ মিত্রের আঁকা দেখেছেন ভালো করে , জানেন কীভাবে তাঁকে চেনা যায়। বক্ররেখার বিচিত্র গতির ভেতরে বা বাইরে কোথাও একটা অমসৃণ চতুর্ভুজ থাকবেই। কবি হীরেন ভট্টাচার্যকে চিনতে গেলে আপনি ধান –লাঙল-জমিজিরেতের কথা পাবেনই পাবেন। এরপরে সে আপনার ইচ্ছে আপনি এসবের কীই বা অর্থ করবেন। কিন্তু কোন এক বা দু’টি শব্দের অর্থ করে নেবার আগে আমাদের অনুরোধ থাকবে, সমগ্র কবিতাটি যে ছবি রচনা করে সেটি একবার দেখে নিতে। ভুল করলে কিন্তু পথ হারিয়ে ফেলবার সমূহ সম্ভাবনা।

            সেই ছবি রচনাতে তিনি প্রায় ভুল করেনই না। ছবির যে সৌষম্যের জোরে রবীন্দ্রকথিত ‘রূপের মধ্যে অরূপে’র প্রকাশ ঘটে, যাকে আমরা আগে ‘ধ্বনি’ বলেছি, সেই সৌষম্যগুণটি তাঁর আয়ত্বে বলেই তাঁর ‘জোনাকি পংক্তিমালা’র খুদে কবিতাগুলোও পাঠক পেয়েছে বিশাল। অসম উপত্যকা পুরস্কার নিতে গিয়ে তিনি হিন্দি কবি অরুণ কমলের একটি আশ্চর্য পংক্তি উদ্ধার করেছিলেন, ‘সারা লোহা উন লোগোঁকা, অপনি কেবল ধার’ । কথাটা একই --‘ধার’ আর ‘সুষমা’। একটি কবিতাতে তিনি কেন যে লিখেছেন, ‘মোর অক্ষরবৃত্ত চাকত গঢ়া শব্দ-গাঁঠনি’ ( শব্দরূপ; হীরেন ভট্টাচার্যর কবিতা, পৃঃ২৩৪) –এ আমাদের কাছে এক প্রশ্ন। ‘অক্ষরবৃত্ত’ একটি ছন্দের নাম। তিনি সেই ছন্দে লেখেননি, এখানে শব্দটির অন্য মানে। লিখেছেন তিনি গদ্যে, কবিতাতেই তার স্বাক্ষর আছে, “ক’তো গদ্যর উজ্জ্বলতা নাই/ বর ফিকা হৈ গৈছে মোর কবিতা।” ( বীজ; ঐ; পৃঃ১৮৮) এমনকি আমরা যে বাংলা গানের বইটির কথা লিখলাম এবং একটি গান তুলেও দিলাম, সেখানেও দেখুন পনেরোটি পংক্তির মধ্যে অন্ত্যমিল আছে শুধু তিনজোড়া। সবগুলোই এরকম। ফলে যিনি শিল্পী নন, গানের মাস্টর মাত্র—তিনি সাহসই করবেন না এইসব গানে সুর বসাতে। হ্যা, কিছু কিছু জায়গাতে অসমিয়া শব্দগঠন থেকে গেছে বাংলাতে । এই যেমন ‘গর্জেথাকা শ্রাবণের আকাশখানা’ ( শ্রাবণের খেতজমিতে একদিন), বা ‘পাতল জিভে নুনের মহার্ঘ স্বাদ দিয়েছিস’ ( ধান যখন গা-ভারী হয়), ‘পাতল মেঘের আড়ালে ঢু মেরেছে চাঁদ’ (অন্য এক গান) ‘স্পর্শ করো প্রতিজন সৎ কবির কবিতা’ ( প্রদক্ষিণ করো মানুষ-মাটি) । এই নিয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। ভূমিকাতে ‘অনুবাদে মাতৃভাষার গন্ধ খানিকটা লেগে থাকতে পারে’ লিখে মার্জনাও চেয়ে রেখেছেন, যদিও অরুণ সেন সেই কবিতাগুলো দেখেও দিয়েছেন। দুই- একটি কবিতাতেতো এমন ভুল এক নতুন মানেই এনে দিয়েছে ।যেমন আমাদের উদ্ধৃত গানটিতে, ‘নৌকা আমার এগুই-পিছোই” । ক্রিয়াপদ দু’টিতে অসমিয়া প্রথম পুরুষে জায়গাতে বাংলাতে জুড়ে গেছে উত্তমপুরুষের বিভক্তি। হওয়া উচিত ছিল—এগোয়, পিছোয়।  কিম্বা  ‘ভাষাই শুশ্রূষা করে মানুষের মন’ বাংলাতে কর্তৃকারকের ‘ভাষা’ এখানে শূন্য বিভক্তি  হবার কথা, অসমিয়াতেও ‘এ’ বা ‘ই’ বিভক্তি যুক্ত হয়। কিন্তু এখানে ই যুক্ত হয়ে বাংলাতে নিশ্চিতির অর্থ এনে দিয়েছে। তার মানে ভাষা ছাড়া আর কেউ করেনা মানুষের মনের শুশ্রূষা।  আমাদের যাদের অমলেন্দু গুহ, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ঊর্ধ্বেন্দু দাশ, রবীন্দ্র সরকার  হয়ে হালের সঞ্জয় চক্রবর্তী, অভিজিৎ চক্রবর্তীদের কবিতা পড়বার অভ্যেস আছে আমরা জানি এখানকার বাংলাতে এমন অনেক শব্দ বা বাক্যগঠনরীতি আমরা মেনে নিয়েছি। ভাষাকে এমন গ্রহণ সমৃদ্ধ করে, যে ভাষা করতে পারে না সে দুর্বল। তবে কিনা, যেকোন ভাষার শক্তিশালী কবিরা এই গ্রহণ বর্জনের কাজটি করেন সচেতনভাবে, ভাষার ধর্ম জেনে এবং মেনে।  দুর্বলেরা করেন অচেতনভাবে— সংশয় দেখা দেয়  তিনি ধর্মটিকে চেনেন কি না। হীরেন ভট্টাচার্য বাঙালি কবি নন, তিনি দুর্বল কবিও নন---তাঁর ক্ষেত্রে এই সূত্র খাটবে না। বস্তুত ধর্তব্যের মধ্যে নেবার বিষয়ই নয় তাঁর এই ব্যাকরণের ত্রুটি। আমরা চোখ উপর দিয়ে নিয়ে চলে যেতে পারি। যা পাওয়া গেল তার তুলনাতে এগুলো নিতান্তই তুচ্ছ। বরং আমাদের বিস্মিত করেছে একজন অসমিয়া কবি বাংলা কবিতা লিখতে বসে, ফলবানের সঙ্গে মিল রেখে  ‘শব্দবান’ বলে একটি নতুন শব্দ সত্যি তৈরি করে জুড়ে দিলেন বাংলা ভাষাতে! পংক্তিটি পড়ে এসছি আমরা,  ‘শব্দবান মাটির দিকে চেয়ে আমি মাথা নিচু করে রইলাম।’ এর আগে আমরা যদি  শব্দটি পেয়েছি, তবে ‘বন্যা’র সঙ্গে তুলনাতে রূপক হিসেবে। অথবা পেয়েছি তীর অর্থে শব্দবাণ। এ আমাদের অবাক না করে পারে না।

             আমরা যে বাংলা কবিতা-বইকে ধরিয়ে দিলাম, সেটি তিনি  লিখেছেন  জীবনের একেবারে শেষ ভাগে ২০০১ থেকে ১০ এই দশ বছরে। দুই একটি বাদে সবগুলো কবিতারই মূল অসমিয়া রূপ রয়েছে ‘হীরেন ভট্টাচার্যের কবিতাঃ ১৯৫৭-২০১০’ সংগ্রহে।    ‘বৃষ্টি পড়ে অঝোরের’র একুশটি গান সে বইতে পাইনি। এগুলো স্বাধীন রচনা। নিচে কোন সন তারিখের উল্লেখ করেন নি, তবে ভূমিকাতে জানিয়েছেন এগুলো অনুবাদগুলো সারবার  পরে লেখা।  আমরা আশা করব কোন সুরশিল্পী  সুর দেবেন আর দেখতে পাবো কোনদিন এই গানগুলো  “ উজিয়ে বয়ে চলেছে মাটির সুরে” ।







Google+ Badge