আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Saturday, 9 November 2019

ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধে শহিদ নবাব রাধারামের গল্প


(নিখিলভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের কোকড়াঝাড় শাখার মুখপত্র 'প্রান্তিক'-এ প্রকাশিত)


ক যে ছিল রাজা। তাঁর নাম ছিল রাধারাম। রাজ্যের নাম ছিল প্রতাপগড়।  রাজা বললেই আমাদের মনে হয় তিনি সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর ছিলেন। ঘোড়াশালে ঘোড়া থাকত, হাতিশালে হাতি। দাসদাসীতে পরিপূর্ণ তাঁর বিশাল রাজপ্রাসাদ। আর রাজা মানেই ভোগ বিলাসে পরিপূর্ণ এক সুখের জীবন। সেসব ঠাকুরমার ঝুলির গালগল্প।  আমাদের রাজার সেরকম কিছুই ছিল না। প্রতাপগড় রাজ্যটিও আহামরি কিছু ছিল না। তখনকার বাংলার শ্রীহট্টের একটি ছোট্ট অংশ প্রতাপগড়।এখনকার অসমের করিমগঞ্জ জেলার উত্তরের কিছুটা ছেড়ে প্রায় পুরোটা। সেখানেও নানা সময়ে ছোটবড় নানান রাজা রাজত্ব করছেন।  কোনো কালে বুঝি এখানে প্রতাপ সিংহ বলে কোনো এক রাজা ছিলেন। সেও গালগল্পই। তবে কিনা ত্রিপুরার রাজারা এখানে প্রায়ই শাসনের বিস্তার ঘটাতেন, তাদের মধ্যে এক রাজা ছিলেন প্রতাপ মাণিক্য  তাঁর আমলে মালিক প্রতাব বলেও এখানে এক সামন্তরাজা ছিলেন। মালিক প্রতাব মুসলমান ছিলেন। লোকে বলত রাজা। আর আমাদের রাধারাম হিন্দু। তাঁকে লোকে নবাব বলত। নবাব রাধারাম। গল্পের বাইরের গল্প এরকমই হয়।
            তখন ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি সিরাজদ্দৌলাকে পরাস্ত করে বাংলা দখল করেছে। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে মীরকাশিমের শেষ বিদ্রোহ বক্সারের যুদ্ধও হয়ে গেছে।  পরে সিলেট আসামের অংশ হলেও তখন তো ছিল সেই সুবেহ বাংলারই অংশ। কোম্পানি সেখানে শাসন বিস্তার করেছিল। ভূ-রাজস্ব লুণ্ঠনের সঙ্গে চুন-সুরকি আর হাতি চালানের ব্যাপক ব্যাবসাও শুরু করেছিল আর ছোটখাটো সামন্তরাজা -জনজাতি প্রধানদের বশ করে শাসন পাকা করছিল। সেসব যখন করছিল এখানে ওখানে প্রচুর বিদ্রোহ হয়েছিল। আমাদের নবাব রাধারামের সঙ্গেও হয়েছিল। প্রতাপগড়টা তো ছিল বাংলার প্রান্তে। অসম যখন এলো, তখন অসমেরও প্রান্তে। তাই নবাব রাধারামের গল্প সেখানকার লোকে গানে গল্পে মনে রাখলেও আমাদের বিদ্যালয় পুথিতে ঠাই পেল না। তায় প্রথম যিনি রাধারামের গল্প নিয়ে ইতিহাসের পুঁথি লিখলেন---সেই অচ্যুত চরণ তত্ত্বনিধি রাধারামকে পারলে প্রায় লুটেরাই বানালেন। কারণ তিনি ব্রিটিশ সরকারের কর্মচারী ছিলেন, আর ব্রিটিশকে ক্ষুণ্ণ করতে পারতেন না। তো, লুটেরার গল্প স্কুলে পড়িয়ে কে ছাত্রদের মাথা খাবে? খায় নি।  ঠাকুরমার ঝুলি জাতীয় কোনো কলকাতা শহুরে প্রকাশিত বইতেও তাঁর গল্প ছাপা হলো না। লোকেও না জেনেই রইল।  অথচ সেই একই সময়ে বা তারও আগে ফাঁসী হওয়া মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসির গল্প--- সারা দেশের লোকে জানে। সিরাজদ্দৌল্লার কথা তো দুনিয়া জানে।
            নবাব রাধারাম জন্মেই রাজা বা নবাব কোনোটাই ছিলেন না। তাঁর বাবা রাজারাম দত্ত এক সাধারণ সিলেটি মধ্যবিত্ত ছিলেন। ছেলে রাধারামের পায়ে এক অদ্ভুত রোগ ছিল। পা দুটি অস্বাভাবিক মোটা ছিল। এহেন রোগ থাকা লোককে লোকে বলত গোধা। এবং পরিবার পরিজন সেরকম লোককে ভয়ে বা ঘৃণাতে এড়িয়েও চলত। ভাগ্যিস এক সন্নেসী রাধারামের বাড়িতে এসেছিলেন। তখনকার পীর ফকির সন্নেসীরাই ছিলেন চিকিৎসক। সন্নেসীকে ভক্তিভরে খুব সেবাযত্ন করলে তিনি রাধারামের চিকিৎসা করে সারিয়ে তুললেন। রাধারাম সন্নেসীর সঙ্গ নিয়ে বাড়ি ছেড়ে তাঁর সঙ্গে চলে এলেন প্রতাপগড়ে। গুরুশিষ্য চরগোলার যেখানে এসে প্রথম রাত কাটিয়েছিলেন—সে জায়গাটিকে এখনো লোকে বলে ‘সন্ন্যাসী-পাট্টা’সেখানে রাধারামকে ছেড়ে গুরু চলে গেলেন ছাতা-চূড়া পাহাড়ে তপস্যার জন্যে। চরগোলার কথা এখন লোকে জানে ভালো। তখন পুরো এলাকাই ছিল ঘন জল জঙ্গলে পরিপূর্ণ।  যে কিছু লোক আশেপাশে ছিল তাদের দেবতা ছিলেন ‘সহিজা বাদশা’তিনি বা কে সেই নিয়ে আমাদের এখন মাথা না ঘামালেও চলবে। শুধু ভেবে রাখা ভালো, হয়তো এই সন্ন্যাসীর মতো কোনো মুসলমান পীর এখানে কোনো এককালে আখড়া বানিয়েছিলেন। সেরকম পীরেরাও রোগশোক থেকে লোককে মুক্ত করতে পারতেন বলে লোকে দেবতা বলে মেনে নিত। আর জলে জঙ্গলে বাঘের দেবতার সঙ্গে এক করে নিত। তার মানে লোকে বিশ্বাস করত--- ইনি বাঘ শেয়াল থেকেও জঙ্গলে তাদের রক্ষা করবেন। এই লোক হিন্দুও হতো, মুসলমানও হতো। লোকের মনে আজকের মতো ভেদবুদ্ধি ছিল না। তাই সন্ন্যাসী রাধারামকে বললেন, “‘যাঁর আমল তাঁহার দোহাই’ তুমি সহিজাকে বিশেষ ভক্তি করবে। তাতেই তোমার উন্নতি অনিবার্য।’ বোঝাই যায় গ্রামে বাড়িতে অবজ্ঞার শিকার রাধারামকে ভাগ্যের কাছে হার না মানবার জেদে পেয়ে গেছিল। সেই থেকে রাধারাম সহিজা বাদশার ভক্ত হলেন, এবং ওখানেই বাড়ি করে থেকে গেলেন।
 কিন্তু লোকজন নেই -- খাবেন কী , পরবেন কী? কাছেই প্রতাপগড়ের জমিদার গোলাম আলির বাড়ির কাছে দোকান দিলেন। সেই দোকানে জমিদার বাড়ির অনেক বাকি পড়ে গেল। ব্রিটিশ আমলের জমিদারও তো সেরকম। কোম্পানির দয়াতেই টিকে থাকেন।  সেই জমিদার টাকা দিতে পারলেন না, তাঁকে কিছু জমি দিয়ে দিলেন। টাকার তখনো চলও বিশেষ হয়নি, সেও সমস্যা ছিল। লোকে বিনিময় প্রথাতেই ভরসা করত। সেই জমিকেও নানা উপায়ে খাটিয়ে বুদ্ধিমান এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাধারাম এমন করলেন যে একসময় গোলাম আলির অধিকাংশ জমি নিজের দখলে নিয়ে নিলেন।  জমিদারের ছেলে গোলাম রাজা চৌধুরী এই দখলদারিকে স্বাভাবিক ভাবে নিলেন না। আগেকার দিন হলে তো যুদ্ধ হয়েই যেত। কিন্তু তখন কোম্পানি আমল। ফলে গোলাম রাজা মামলা করলেন কলকাতার আদালতে।  মামলা একেবারে রাধারামের বিপক্ষে গেল না। তিনি বেশ কিছু অংশের আইনি মালিক হলেন এবারেকতটা কী -- এতো সব বিস্তৃত ইতিহাসে  আমরা যাচ্ছিনা। গল্পের মজা থাকবে না।
শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত থেকে
গোলাম রাজার সঙ্গে রাধারামের মামলা দেখে কেউ ভেবে বসবেন না এ হিন্দু মুসলমানের কাজিয়া। সেইসব তখন ছিল না, গল্প যত এগুবে স্পষ্ট হবে। এ নিতান্তই রাজায় প্রজায় জমির বিবাদ। প্রজা রাধারাম এবারে রাজা হবার স্বপ্ন দেখছেন। মামলাতে বিজয়ী হলেও রাধারামের রাগ গেল না। রাগটা ব্রিটিশের কোম্পানির উপরেও চড়ল। কারণ, যতটা দখলে নিয়েছিলেন , সব জমি তাঁর থাকে নি। যদিও সেই জমিতেই তিনি বিশাল বাড়ি করেন পরে। লোকে সেই বাড়িকে পরেও বহুদিন ‘বড়বাড়ি’  বলে জেনে এসেছে। তিনি পাশের কুকি জনজাতি সর্দারদের সঙ্গে বোঝাপড়া করলেন। এতে তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি এতোই বাড়তে শুরু করল যে ক্রমেই নিজেকে নবাব বলে প্রচার দিতে শুরু করলেন। নবাবী বাড়াবার জন্যে তিনি তখনো স্বাধীন ত্রিপুরার রাজা মহারাজ দুর্গা মাণিক্যের সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন। এখন যারা অসমে বলে ‘অসমকে ত্রিপুরা হতে দেবে না’ তারা সেই সব ইতিহাসের গল্প খুব কমই জানেনপরে যে অংশটি অসমে আসবে, সেই অংশে ত্রিপুরা রাজার তখনো শাসন ছিল। তাঁর কিছু জমিজমা এখানে ছিল, সেই অংশের শাসন ভার দিয়ে দিলেন রাধারামকে। রাধারাম কোম্পানিকে কানাকড়ি রাজস্ব দিতেন না, ত্রিপুরার মহারাজকেও কিছুই দিতেন না। কিন্তু মহারাজের নাম ব্যবহার করাটা কুকিদের উপরে প্রভাব বিস্তারে তাঁকে সাহায্য করেছিল।  পরে যদি কোনো কুকি সর্দার বাগ মানেনও নি, রাধারাম এবং তার ছেলে রণমঙ্গল---যাকে আমাদের এই হঠাৎ নবাব  সেনাপতি পদ দিয়ে রেখেছিলেন--- যুদ্ধে পরাভূত করে তাদের বশ করতেন।  ক্রমে তাঁর রাজবাড়ির কাজকর্ম এবং প্রয়োজন বাড়তে থাকে।  তাঁর রাজ্যের সীমাও বিস্তৃত হয়। উত্তর সীমাটি ছিল এখনকার শনবিলের উত্তরপাড় বরাবর পুবে পশ্চিমে। পুবে এখনকার হাইলাকান্দি জেলা, পশ্চিমে পাথারিয়া পাহাড়, দক্ষিণে এখনকার মিজোরাম। বাড়ির চারপাশে তিনি বিচারালয়, সেনানিবাস, কয়েদখানা ইত্যাদি তৈরি করিয়ে ফেলেন। একটি দুর্গও করে ফেলেছিলেন। এখনো সেই ভাঙা জঙ্গলাকীর্ণ দুর্গটি আছে। লোকে ‘কেল্লাবাড়ি’ বলে চেনে।  তিনি ঠিক করলেন --- স্বজাতীয় কিছু লোক এনে বসাবেন। কিন্তু এই জলজঙ্গলে কে থাকতে আসে?  তবু একটি কাছাড়ি বাড়ি চালাবার মতো  কুশলরাম সরকার নামে এক ব্যক্তিকে  এনে প্রচুর জমি দিয়ে বসালেন। সেই বাড়িটি পরে নবাবের অফিস এবং সরকারের বাড়ি বলেও ‘সরকার বাড়ি’ বলেই লোকে চিনতে শুরু করে। না পেরে পরে বিভিন্ন জায়গা থেকে, দলিত হিন্দু মুসলমান মানুষকে নিয়ে এলেন কায়িক শ্রম করবার জন্যে। বোঝাই যায় এদের কাজ ছিল জঙ্গল কেটে চাষাবাদ করা,কারিগরি করা , মাছ ধরা ইত্যাদি। এদের মধ্যে বহু মুসলমান কিরানও ছিলেন। এদের কোনো মাইনে ছিল না। কেবল থাকো –খাও- কাজ করো -- চুক্তি।
ক্ষমতা এবং প্রতাপ যত বাড়ছিল রাধারামের দম্ভও পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল। তিনি যে খুব প্রজানুরাগী নবাব হচ্ছিলেন এমনও না। অচ্যুত চরণ তাঁর কিছু স্বেচ্ছাচার এবং নিষ্ঠুরতারও বর্ণনা দিয়েছেন। এই যেমন, কেউ তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করলেই তিনি কুকি সর্দারদের লাগিয়ে তাঁকে হত্যা করে ফেলতেন। অচ্যুত চরণ লিখেছেন, ‘বন্য কুকি’। সেখানেই পক্ষপাত স্পষ্ট। কুকি সহ দক্ষিণ অসমের তাবৎ জনজাতিদের তখন ব্রিটিশের এবং দশসনা ব্যবস্থা এবং চুনাপাথর আর হাতি চালানের  বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবার সঙ্গত কারণ আছে—সেগুলো ‘বন্য’ লিখবার সময় লেখক বিবেচনাতে রাখেন নি। এমন একটি গল্পও লিখেছেন,  নবাব রাধারাম শিকার করতে নৌকা নিয়ে শণবিলে বেড়াতে যেতেন। একবার নৌকার নিচ দিয়ে একটি বড় মাছ যাচ্ছিল। মাঝি নবাবের অনুমতি না নিয়েই সেই মাছকে বর্শা দিয়ে মেরে ফেললে নবাব খুশি হন নি। মাঝিকে মাছের মতো নৌকার নিচে যেতে বলেন। মাঝি গেলে তাকে মাছ মারবার মতোই বর্শা বিদ্ধ করে মেরে ফেলেন।  এমন  আরো বহু কাহিনি রয়েছে নিশ্চয়। কিন্তু লিখেছেন অচ্যুত চরণ। দোষ দায় দিয়ে লাভ নেই। রাধারামের কাহিনিও তিনিই প্রথম লিখে জানবার ব্যবস্থা করে দেন। তাঁর দুই খণ্ডে ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ ব্রিটিশ ভারতে যে কটি ইতিহাস কোনো বাঙালি বা ভারতীয়ের হাতে রচনা শুরু হয় তারই অন্যতম। তবু, বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়ার তো আজ কোনো মানে নেই।   সিরাজদ্দৌলার যেমন মীরজাফর, নবাব রাধারামের তেমনি এক সহচর ছিলেন কানুরাম দে তাঁকে ‘চৌধুরী’ বলে অচ্যুত চরণ লিখলেও অধ্যাপক কামালুদ্দিন তথ্যসহকারে দেখিয়েছেন, জমিদার হলেই চৌধুরী উপাধি মেলে। কানুরাম জমিদার ছিলেন না। হয়তো পরে পুরস্কার স্বরূপ জমিদারি পেয়ে থাকবেন। বড়জোর রাধারামের নায়েব গোমস্তা জাতীয় কেউ ছিলেন। কানুরাম অচ্যুত চরণের প্রপিতামহ বৈষ্ণব শান্তরামকে প্রতিবেশী জফরগড় পরগণার মৈনা গ্রামে এনে বসতি করতে দেন। ফলে পক্ষপাত তো কিছু স্বাভাবিক। কানুরাম প্রথম জীবনে রাধারামের বন্ধুই ছিলেন। প্রতিবেশী জফরগড়ের জমিদার ওলি মোহাম্মদ তাঁকে আপন সন্তানের মতো দেখতেন। ওলি মোহম্মদের বদান্যতায় কোম্পানির প্রথম দশসনা বন্দোবস্তের সময় নিজেও একটি তালুকের ব্যবস্থা করেন।
রাধারামের উন্নতিতে বন্ধু কানুরামেরও বেশ যোগদান ছিল। কিন্তু কানুরাম তাঁকে প্রজাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবার পরামর্শ যেমন দিতেন ব্রিটিশের সঙ্গেও সদ্ভাব রাখবার পরামর্শ দিতেন। রাধারাম এগুলো কানেও তুলতেন না। গোলাম রাজার সঙ্গে রাধারামের বিবাদ ছিলই। নইলে তিনি নবাবী বিস্তারে মন দেবেন কেন?  একরাতে রাধারাম বহু কুকিদের সঙ্গে নিয়ে গোলাম রাজার বাড়ি আক্রমণ করেন। অনেকে মারা যান, ধন সম্পদও হাতছাড়া হয়। কানুরামের সাহায্যে গোলাম রাজা পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন। কিন্তু এ নিছক ডাকাতি ছিল না। রাধারাম বা কুকিরা যে আসলে ব্রিটিশের শাসন মেনে নিতে চাইছিলেন না---তা বোঝা যায় এর পরেই এরা চরগোলা থানা আক্রমণ করেন। সম্ভবত গোলাম রাজার পক্ষে কোম্পানির যোগদান ঠেকাতে। এই সব ঘটনা ঘটছে ১৭৮৬তে।  এই করে তিনি নিজের বিপদও বাড়িয়ে দিলেন। থানা আক্রমণকে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রমাণ হিসেবে হাজির করে গোলাম রাজা  সরকারের কাছে গিয়ে নালিশ করলেন। সিলেটের রেসিডেন্ট এবং কালেক্টর লিণ্ডসে সাহেব রাধারামকে দমনের জন্যে শনবিল দিয়ে গোলা-বারুদ, বন্দুক-কামান দিয়ে একদল সৈন্য পাঠান। এই লিণ্ডসে নিজে একজন চুনাপাথর এবং হাতি চালানের কারবারীও ছিলেন। শনবিল হচ্ছে গোটা সিলেটের এক ভয়াবহ বিশাল বিল। সাগর সমান ঢেউ তার জলে।  প্রাণ থাকতে সহজে লোকে এই বিলে নৌকা নামাত না। প্রবাদ ছিল, ‘শনবিলে নড়ে চড়ে, রাতায় পরান মারে’। সেই বিলেই তুমুল যুদ্ধ হল। দুই পক্ষেই প্রচুর গুলিগোলাআর তিরধনুক চলল। কিন্তু নৌ যুদ্ধে রাধারামের সেনা ততদিনে বেশ পাকা হয়ে উঠেছে। সেনা সমেত তিনি বেশ কিছু কোম্পানি নৌকা ডুবিয়ে দিলেন।  প্রথম ধাক্কাতে হার মেনে কোম্পানি আরেক দফা সৈন্য পাঠায়। সেবারে যে যুদ্ধ হলো তাঁর বর্ণনা অচ্যুত চরণ সেকালীন সাহিত্যিক গদ্যে বেশ রসিয়ে লিখেছেন, “ ভীষণ বাত্যায় শণবিল রুদ্রমূর্ত্তী ধারণ করিল, ধবল ফেণরাশি বিকীর্ণ করিয়া, সাগরোর্ম্মির ন্যায় বিশাল তরঙ্গমালা বিস্তার করিয়া, গভীর গর্জ্জনে সৈন্য-কোলাহল ডুবাইয়া দিয়া, সৈন্যপূর্ণ নৌকাগুলি মুহূর্ত্ত মধ্যে কুক্ষিগত করিল! গবর্ণমেণ্ট দেখিলেন যে রাধারামকে দমন করিতে একটু বিশেষ আয়োজন আবশ্যক; যেমন ভাবিতেছিলেন, ব্যাপার তদ্রূপ সহজ নহে।” প্রথম শনবিল যুদ্ধে এভাবে রাধারামের জয় হলো।
যুদ্ধে জয় হলে রাধারাম বন্ধু কানুরামকে বলেন, “ঘরের ইন্দুর বান্ধ কাটিতেছে।” একই বাক্যের উল্লেখ কামালুদ্দীন আহমেদের ‘করিমগঞ্জের ইতিহাসে’ও আছে। কিন্তু কথাটি যে কোত্থেকে নিলেন তার উল্লেখ নেই। সম্ভবত কোনো প্রচলিত পুস্তক থেকে। মোদ্দা কথা কানুরামের বিশ্বাসঘাতকতাতে সংশয় হলো। রাধারাম ঠিক করলেন কানুরামকে শাস্তি দিতে হবে। অর্থাৎ হত্যা করতে হবে। ইতিমধ্যে আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। কিছু ‘ব্যভিচারী’ স্ত্রীপুরুষ প্রজাকে জোড়ায় জোড়ায় বেঁধে গুলি করে মেরে শাস্তি দিচ্ছিলেন রাধারাম। শেষ স্ত্রীলোকটি সহিজা বাদশার দোহাই দিয়েছিল। সেই দোহাই অস্বীকার করেই রাধারাম সেই স্ত্রীলোককে হত্যা করেন। গল্পটি সত্যও হতে পারে, মিথ্যেও হতে পারে। মিথ্যে এর জন্যে যে তাতে অহঙ্কার আর ক্ষমতার লোভে সহিজা বাদশার দোহাই অবজ্ঞার জন্যেই রাধারামের পতন শুরু হয় এমন একটি গল্পের সহজ যুক্তি দাঁড় করানো যায়। ইতিহাসের গভীরে যারা ঢোকেন না, তাঁদের কে বোঝাবে কে যে সেই সময় ব্রিটিশ কোম্পানিকে বেশিদিন ঠেকাবার ক্ষমতা প্রতাপগড়ের এই ছোট্ট নবাবের এমনিতেই ছিল না। সহিজা বাদশার দোহাই মানলেও। যাই হোক, পরে রাধারামের অনুতাপ হলো । মহিলাটিকে মারলেন বলে নয়, বাদশার দোহাই অস্বীকার করলেন বলে। তিনি ঠিক করলেন ঘটা করে কালীপুজো করে পাপ স্খালন করবেন, এবং সেখানে কানুরামকেই বলি দেবেন। কানুরাম এসবের কিছুই টের পান নি। তাঁকে ঘটা করে নিমন্ত্রণ করলে তিনি দুই মুসলমান সর্দার এবং বিজয় নামে এক ক্রীতদাসকে সঙ্গে নিয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আসেন।  বুদ্ধিমান বিজয় ষড়যন্ত্রটি টের পায়। সে কানুরামকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে সতর্ক করে দেয়। বিজয় বলবান ছিল। কানুরামকে পিঠে এক কাপড়ে বেঁধে সে জঙ্গলের পথে অদৃশ্য হয়ে যায়। এসে প্রতাপগড়ের জমিদারদের বাড়ি পৌঁছায়।  রাধারামের সেনা বহু সন্ধানেও তাঁকে আর পায় নি। এই কালীপুজোর গল্পটি অধ্যাপক কামালুদ্দীন আহমেদ নিঃসংশয়ে স্বীকার করতে চান নি।
পরদিন কানুরাম সব কথা সরকারের কানে তুললেন।  কানুরাম রাধারামের হাড়ির খবর জানতেন। তিনি সব পথ বাৎলে দিলে এবারে ব্রিটিশ সেনার অভিযান সফল হলো। ব্রিটিশ সেনার বন্দুকের সামনে কুকি সেনার তির-বল্লম টিকল না। রাধারাম পালালেন ছদ্মবেশে। তাঁর সেনাপতি অর্থাৎ ছেলে রণমঙ্গল আগেই মারা গেছিলেন। অন্য তিন ছেলেরাও পালায়। সেনারাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। বড় ছেলে জয়মঙ্গল কিছু দিন পাখি শিকারির বেশে ঘুরে বেড়ালেও অচিরেই ধরা পড়েন। রাধারামকে কোম্পানি সেনা সিদ্ধেশ্বর বারুণী মেলাতে ধরে। লোহার খাঁচাতে পুরে সিলেট পাঠায়। অধ্যাপক কামালুদ্দীন আহমেদ লিখেছেন, পথেই রাধারাম আত্মহত্যা করেন। অর্থাৎ তাঁকে শাস্তি দেবার অধিকার তিনি বিদেশী ব্রিটিশ সরকারকে দেন নি। এভাবেই  এক স্বাধীন চেতা নবাব পরাজয় বরণ করেও বিজয়ীর মতো শহীদের মৃত্যু বরণ করেন। সব রাজার গল্পের শেষটা সুখের হয় না। নবাব রাধারামেরও হয় নি। সমস্যা এই যে, ইংরেজ আমলের সুবিধেভোগী মধ্যবিত্তলোকে তাঁর এই শহিদী মৃত্যুকেও স্মরণে রাখে নি। চাইলেই তিনি ব্রিটিশের অধীনতা স্বীকার করে নবাবীকে নিষ্কণ্টক করতে পারতেন। যেমন তাঁরই ছেলে জয়মঙ্গল করেছিলেন।
নবাব রাধারাম যে দলিত-জনজাতি প্রজাদের বসিয়েছিলেন, তাদের স্বপ্ন লোকগানে ভাষা পেয়েছিলে এরকম,        “কান্দেরে চরগোলার লোক দেশদেশান্তর/ জয়মঙ্গল আসিবে যবে চরগোলা নগর/ ডোমচাড়ালে মিলাইয়া বানাইয়া দিমু ঘর।”  রাধারামের মৃত্যুর পরে জয়মঙ্গল বহুদিন কোম্পানির কারাগারে কাটান। তখন প্রতাপগড়ের সেই জমিদার চৌধুরীরা রাধারামের তাবৎ সম্পত্তি দখলে নিয়ে গেলে কারাগার থেকেই জয়মঙ্গল বার্তা পাঠান, ‘প্রতাপগড়ের মাটি প্রতাপগড়েই থাকিবে’ তাতে জমিদার গোলাম রাজা চৌধুরী ভয়ে জমি ছেড়ে দেন। সেকালের প্রায় সমস্ত পরাস্ত নবাব রাজাদের উত্তরপুরুষের মতো জয়মঙ্গলও কালে কোম্পানির বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে নিজেকে মুক্ত করেন, এবং ব্রিটিশের সেবক হিসেবে জমিদারি চালাতে শুরু করেন। প্রতাপগড়ের হাতি চালানে তিনি সাহেবদের সহযোগী হয়েছিলেন। কুকিদের প্রতিও বাবার মতো তাঁর কোনো বন্ধুত্ব ছিল না। বরং কুকি বিদ্রোহ দমনে তিনি ব্রিটিশের সহযোগিতাই করেছিলেন। যে পরাজয় তাঁর বাবা স্বীকার করেন নি, তিনি তা করেছিলেন। এবং  ব্রিটিশ শাসনকে পাকা করবার সঙ্গে সঙ্গে নিজের জমিদারিকেও নিষ্কণ্টক করেছিলেন।



Sunday, 19 May 2019

বাঙালি বিদ্বেষের রাজনীতি: প্রসঙ্গ ১৯৬০-এর রক্তাক্ত সংঘর্ষ



মূল অসমিয়া : দয়াসাগর কলিতা
বাংলা অনুবাদ: সুশান্ত কর

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রাসঙ্গিক বই
সমের জাতীয়তাবাদের উত্থান, সংঘাত এবং এর সঙ্গে জড়িত বহু আনুষঙ্গিক বিষয়ের এখনো সম্পূর্ণ পুঙ্খানুপুঙ্খ বৈজ্ঞানিক এবং তথ্যপূর্ণ বিশ্লেষণ হয় নি। অঙ্গুলিমেয় দুই একটি গবেষণামূলক বিশ্লেষণের বাইরে বাকিগুলো আবেগ-সর্বস্ব গুণানুকীর্তন মাত্র। আহোম রাজত্বের শেষের দিকে ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধ আর তার ঠিক পরেই শুরু হওয়া আতঙ্ক আর যন্ত্রণাময় মানের দিনের অবসান ঘটিয়ে ১৮২৬-শে ঐতিহাসিক ইয়াণ্ডাবু সন্ধি অনুসারে ব্রিটিশ অসম দখল করে।  অতি আবেগপ্রবণ অসমিয়ারা ব্রিটিশের মধ্যে শ্রীহরির প্রচ্ছায়া দেখতে পেলেও অচিরেই তাদের সেই ভুল ভেঙে গেছিল। স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘকাল শাসন করবে বলে ব্রিটিশ দক্ষ শিকারির মতো জাল বিস্তার করে গেল। ১৯৩৬-এ বাংলা ভাষাকে অসমের সরকারি ভাষা বলে চাপিয়ে দিল। অনিবার্যভাবে অসমে অনন্তকাল জোড়া এক ভাষিক সংঘর্ষের শুরু হলো। বাঙালিরা অসমিয়াদের বহু আগেই ইংরেজি শিক্ষার আলো পেয়েছিলেন, কেননা ১৮০০ খ্রিস্টাব্দেই কলকাতাতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই বিশাল সংখ্যাতে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাতে শিক্ষিত বাঙালি লোকজনকে ব্রিটিশ কেরানি-মহরির চাকরিতে নিয়োগ করল। ১৮২৬-এ অসম দখল করাবার পরে অসমেও তাদের নিয়োগ করা হল। ফলে অসমিয়া অভিজাতরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে এই বাঙালিদের কুমন্ত্রণাতেই ব্রিটিশ অসমিয়াদের উপরে বাংলা ভাষা চাপিয়ে দিয়েছিল। এখনও অসমিয়া মধ্যবিত্তরা এই ধারণা মন থেকে পুরো উপড়ে ফেলতে পারেন নি। পারবেই বা কী করে? স্বয়ং সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া বলে ফেললেন যে,“অসমে ইংরেজ রাজার রাজকার্য চালানো যন্ত্রের কেরানিরা বাঙালি ছিলেন। তাঁরা ছল পেয়ে যন্ত্রের কানে মন্ত্র দিলেন যে অসমিয়ার বদলে বাংলা চালাতে হবে।লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার থেকে আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ব্রিটিশের সাহিত্যিক পেনশনভোগী পদ্মনাথ গোহাঞিবরুয়া ব্রিটিশ ভক্তিতে গদগদ হয়ে বলে ফেললেন অসম সাহিত্য সভার প্রথম অধিবেশনেই সভাপতির আসন থেকে বলে ফেললেন,“ এই অবস্থাতে ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে ইয়াণ্ডাবু সন্ধি অনুসারে ব্রিটিশরাজ মানের শাসনের অবসান ঘটিয়ে যখন অসম উদ্ধারকরলেন তখনই অসমিয়া সাহিত্য চেতনা পেয়েছিল যদিও শরীর টান করে উঠে দাঁড়াতে পারেনি। তবু ব্রিটিশরাজ দয়া করে অসমিয়া সাহিত্যকে সজীব আর সতেজ করে রাখতে যত্নের কোনো ত্রুটি রাখেন নি; গভর্নমেন্ট বিবিধ ব্যবস্থা করে এর উন্নতি সাধন করেছিলেন, একে রাজভাষা করে শ্রীবৃদ্ধি করবার পথও সুগম করে দিলেন। কিন্তু তখনই একদল স্বার্থপর অসম প্রবাসী বাঙালি অসমিয়া ভাষা এবং সাহিত্যের উন্নতির পথ রুদ্ধ করে দাঁড়ালেন। এরা সরকারি চাকরি প্রত্যাশী। ফলে অসমিয়া ভাষা যদি সরকারি ভাষা হিসেবে টিকে থাকতে শুরু করে তবে তাদের স্বার্থে ঘা পড়ে এবং ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যায়। সে জন্যে, অসমিয়া ভাষার স্বতন্ত্র সাহিত্য নেই, এ বাংলা ভাষার অপভ্রংশ মাত্র ইত্যাদি মিছে বুদ্ধি দিয়ে এরা সেকালের ব্রিটিশ রাজকর্মচারীদের বোকা বানিয়ে অসমিয়ার জায়গাতে বাংলাকে রাজ্য ভাষা করিয়ে নিলেন। পাঠশালাতেও বাংলা সাহিত্যের অগ্রাধিকার আদায় করিয়ে নিলেন। ফলে মাত্র দশ বছর ব্রিটিশরাজের সমাদর পাবার পরে ১৯৩৬এ আবার এই ভাষা অনাদৃত হতে শুরু করল। তখন থেকে ১৮৭১ অব্দি তাই রইল। ১৮৭১-এ বাংলাদেশের ছোটলাট মহাত্মা স্যর জর্জ ক্যাম্বেল সাহেব বাহাদুর দয়া করে বাংলা ভাষার জায়গাতে আবার অসমিয়া ভাষাকে রাজভাষা (Court Language) করে আদালত এবং বিদ্যালয়গুলোতে যতদিন না জায়গা করে দিয়েছেন---এই ৩৫ বছর কাল অসমে বাংলা ভাষা একাধিপত্য করে। তার চাপে অসমিয়া সাহিত্যকে অস্তিত্ব হারিয়ে বসতে হয়।ক্যাম্বলের কৃপা লাভের পরেও  বাংলা সাহিত্যের বেদখলে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার করতে অসমিয়া সাহিত্যের বেশ কিছু সময় লেগেছিল। ১৯০৩-এ অসমের ভূতপূর্ব চিফ কমিশনার এবং পরে ‘পূর্ববঙ্গ এবং আসাম’ প্রদেশের ছোটলাট মহাত্মা স্যর বেমফিল্ড ফুলার বাহাদুরের কৃপাতেই  সেই কাজ সম্পন্ন  হয়। তার আগে অব্দি ৩২টি বছর অসমিয়া এবং বাংলা ভাষার মধ্যে অস্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে প্রবল তর্কযুদ্ধের মধ্যে দিয়েই দিনগুলো অতিবাহিত হয়”
            ব্রিটিশভক্ত পদ্মনাথ ব্রিটিশকে ধুয়া তুলসিপাতা সাজাতে গিয়ে বাঙালিদের যা পারেন গালি দিয়েছেন। ব্রিটিশ আধিকারিকদের সম্পর্কে লিখেছেন ‘মহাত্মা’,‘বাহাদুর’,‘কৃপাকরে’,‘দয়া করে’ ইত্যাদি শব্দে তাদের মহিমামণ্ডিত করতে সামান্যও কৃপণতা করেন নি।
            লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া যদিও বাঙালিদের নিয়ে যৎপরোনাস্তি ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিলেন, অসমিয়া ভাষার দুর্যোগের জন্যে ব্রিটিশদেরও সমালোচনার কাঠগড়াতে দাঁড় করাতে কুণ্ঠাবোধ করেন নি। কারণ, তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী হেমচন্দ্র বা পদ্মনাথের মতো অটল আনুগত্যে তাঁর দরকার পড়েনি। তিনি এভাবে লিখেছিলেন,“ গভর্নমেন্ট চিরকাল যুদ্ধ করে এসেছিলেন অসমিয়া ভাষাকে ঠেলে বাংলা ভাষাকে অসমের ভাষা করতে। আজও পারলে গভর্নমেন্ট অসমিয়া ভাষার গোঁড়ায় বড় কুঠার মেরে অসমে বাংলা ভাষা বপন করেন... অসমের কমিশনার কর্নেল হপকিনশন থেকে চিফ কমিশনার ওয়ার্ড সাহেব পর্যন্ত অসম গভর্নমেন্টের বড় বড় আমলারা সময় বুঝে অসমিয়া ভাষার খুঁত ধরবার কোনো ত্রুটি করেন নি।”
                অসমীয়া ভাষার দুর্যোগের জন্যে বাঙালিদের যা ইচ্ছে গালি যারা পেড়েছিলেন তাঁদের মধ্যে হেমচন্দ্র গোস্বামীও অগ্রণী ছিলেন। তাঁর ঠোঁটকাটা কথা,“তখন অসম এবং বাংলাদেশের মধ্যে যাতায়াত এতো সুচল ছিল না; সেই জন্যেই কোনো ভালো বাঙালি অসমে কাজ করতে যেতেন না। দেশে যারা খাবার পেতেন না—স্বার্থপর—ঢাকা, রংপুর আদি অঞ্চলে কুলার বাতাসে উড়ে যাওয়া তুষের মতো অদরকারি বাঙালিই সেখানে কাজ করতে যেত। অসমিয়া ভাষা আদালতের ভাষা থাকলে এরা কাজ করতে অসুবিধে পেতেন। সে জন্যেই এরা হাকিমদের বোঝাতে শুরু করল যে অসমিয়া একটি স্বতন্ত্রভাষা নয়, এ বাংলারই কাঁচা অবস্থা মাত্র; আর অসমিয়াতে কঠিন কঠিন ভাব কিছুই প্রকাশ করা যায় না। ইংরেজ বিদেশী কী জানে; প্রথম গিয়ে অসমে ঢুকেছে মাত্র; সেখানকার মানুষের রীতিনীতি, আচার ব্যবহার, কথা-বার্তার বিষয়ে কিছুই জানে না। তারউপর বাঙালিকে অসমিয়ার থেকে বেশি শিক্ষিত বলে জানে, কেরানি কাজের জন্যে ঘুরে ফেরা এই বাঙালিদের কথাতেই ভরসা করে অসমিয়া ভাষাকে ১৮৩৬ সনে আদালত থেকে অসমিয়া ভাষাকে বাদ দিয়ে তার জায়গাতে বাংলা ভাষাকে বসালো”  প্রবল বাঙালি বিদ্বেষী হেমচন্দ্র গোস্বামীও কিন্তু ইংরেজ সরকারের গুণকীর্তন করতে সামান্যও কৃপণতা দেখান নি। উদাহরণস্বরূপ ‘ইংরেজ বিদেশী কী জানে’ ‘উদার ইংরেজের আশাবহ রাজনীতির শীতল ছায়াতে অসমিয়া মানুষজনের মুখে আবার রস এলো’, ‘মহামতি ইংরাজ’ ইত্যাদি গুণকীর্তনে তাঁর লেখা ভারাক্রান্ত।
            এই সব প্রাতঃস্মরণীয় অসমিয়া সাহিত্যিকেরা যত পারেন বাঙালিদের গালি দিলেও শুরু থেকেই অসমে বাংলা ভাষা চর্চার একটি অন্যতম ধারা চলে আসছিল। মণিরাম দেওয়ান লিখেছিলেন ‘বুরঞ্জি বিবেকরত্ন’, হলীরাম ঢেকিয়াল ফুকন লিখেছিলেন, ‘আসাম বুরঞ্জি’ বাংলাভাষাতে। আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আইন ও ব্যবস্থা’ বাংলা ভাষাতে লিখেছিলেন। এমন কি ভাষার ওঝা স্বয়ং হেমচন্দ্র বরুয়া নিজের নাম বাংলাতে অনুবাদ করে ‘সোণার চাঁদ ডেকাবরুয়া’ করে নিয়ে এই ছদ্মনামে বাংলাভাষাতে লেখালেখি করেছিলেন। লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া ‘শ্রীযুক্ত রঙ্গলাল চট্টোপাধ্যায়’ ছদ্মনামে বাংলাতে লেখালেখি করেছেন। এমন কি আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন মিলস সাহেবকে একটি ছোট্ট নোটে স্পষ্ট করে লিখে দিয়েছিলেন, “ অসমিয়া ভাষা চালাতে বলে আমরা এই পরামর্শ দিতে চাই না যে বিদ্যালয়গুলো থেকে বাংলাভাষা একেবারে উঠে যাক” । ভাষার ওঝা হেমচন্দ্র বরুয়া তাঁর ‘আত্মজীবন চরিত্র’ বইতে এভাবে লিখেছেন, “ সেসময় অসমে বাংলা ভাষার বড় আদর ছিল; মাতৃভাষাকে সবাই ঘৃণা করতেন। স্কুলে বাংলা, কাছাড়িতে বাংলা, ছেলেদের কথাবার্তাতে বাংলা, তাদের চিঠিপত্রেও বাংলাই চলেছিল। সবাই বাঙালিনীদের সঙ্গিনী করে নিয়েছিলেন। অবশ্য আমিও এর নিয়মের বাইরে ছিলাম না। বাংলা ভাষা আমার প্রাণাধিক আত্মীয় ছিল...।”
                ফলে দেখা যাচ্ছে যে প্রায় সমস্ত প্রাতঃস্মরণীয় অসমিয়া সাহিত্যসেবীদের মনে বাংলা ভাষাকে নিয়ে একটি দোদুল্যমান অবস্থা একটা চলছিল। একটি কথা উল্লেখ করা ভালো যে হেমচন্দ্র গোস্বামী এবং পদ্মনাথ গোঁহাঞিবরুয়ার ব্রিটিশের থেকে সম্মান এবং সুবিধে পেয়েছিলেন বা পাবার মোহ রেখে বারে বারে ব্রিটিশকে হাবাগোবা এবং অসম হিতৈষী সাজিয়ে বাঙালি আমলাদের যা নয় তা বলে ভর্ৎসনা করেছিলেন।  হেমচন্দ্র গোস্বামী খুলাখুলি অসমিয়াদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, “যদিও বিদ্যালয়ে আদালতে অসমিয়ার বদলে বাংলা ভাষার প্রবেশে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি কিছু হয়েছিল, তবুও সত্যি কথা বলতে কি আমরা সেজন্যে ইংরেজের শাসন-প্রণালীকে দোষ দিতে পারি না।”  এই কথাগুলোই প্রমাণ করে ব্রিটিশের প্রতি তাঁর ভক্তি কতটা অচলা ছিল।
        অসমিয়া ভাষাকে পুনঃস্থাপিত করা এবং এর আবারো বৃদ্ধি-ঋদ্ধির জন্যে যে ভাষিক জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলা হয়েছিল, সেই জাতীয়তাবাদই কালে গিয়ে উগ্রজাতীয়তাবাদের রূপ নিল। আসলে শুরু থেকেই এর গোঁড়ায় জল ঢালা হয়েছিল। পদ্মনাথ গোহাঞিবরুয়া, হেমচন্দ্র গোস্বামীদের কাজেকর্মে এর আভাস রয়েইছে। তাঁদের দিনে সৃষ্ট ভাষিক জাতীয়তাবাদ অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরী, নীলমণি ফুকনদের দিনে পূর্ণ উগ্রজাতীয়তাবাদের রূপ নিল। অসমিয়া জাতীয়তাবাদের অন্যতম কাণ্ডারি অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরী প্রথম দিকে বিরাট বাঙালি-প্রেমী ছিলেন। পরে হয়ে গেলেন বিখ্যাত উগ্রজাতীয়তাবাদী। ঘনঘন তাঁর ‘কেরিয়ারগ্রাফ’ উঠানামা করত, তিনি ছিলেন বর্ণাঢ্য ব্যক্তি। তাঁর রাজনৈতিক জীবন আরম্ভ হয়েছিল অসম উপত্যকার আয়ুক্ত স্যর বেম্পফিল্ড ফুলারকে হত্যা করবার জন্যে বোমা পোতে রেখে। সেসময় তিনি রাজনৈতিকভাবে তো বটেই, ব্যক্তিগতভাবেও প্রবল বাঙালি প্রেমী। এক বাঙালি ষোড়শীর প্রেমে তাঁর তখন হাবুডুবু অবস্থা। কিন্তু ব্যর্থ বোমার পরিণতিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটিশের ভলান্টিয়ার হবারও অনুমতি চান।  অম্বিকাগিরির মতে দেশের শত্রু হলো তিনপ্রকার--- কমিউনিস্ট, পাকিস্তানিস্ট মানে মুসলিম, আর বাঙালিস্ট মানে বাঙালিরা। একসময়ের প্রাণাধিক প্রিয় আত্মীয়রা পরে তাঁর চোখের বালি হয়ে গেলেন। তাঁর এই উগ্রজাতীয়তাবাদী উন্মাদনার নজির এরকম:
            ১) একবার তেজপুরের জনাকয় বাঙালি মেয়ে কিছু একটা দুষ্টামি করল। অম্বিকাগিরি তার বিরুদ্ধে ‘বাঙালির অসমিয়া বিদ্বেষের প্রতিরোধ দিবস’ পালন করেন।
            ২) একবার গুয়াহাটি উচ্চন্যায়ালয়ের এক অধিবক্তা বাংলাতে প্রচারপত্র লিখেছেন বলে অম্বিকাগিরি আক্রামক হয়ে উঠলেন। অতি উত্তেজনাতে প্রচারপত্রটি পড়তেও ভুলে গেলেন। সেটি ছিল পাকিস্তানের পক্ষে একটি ইস্তাহার।
            ৩) একবার গুয়াহাটির দুই দুষ্ট ছেলে দুটি এক বাড়িতে একটি শকুনের শব ফেলে দিল। তাই শুনেই ‘অসমিয়া জাতি গেল একেবারে!’ বলে পথেই চীৎকার দিতে দিতে বিলাপ শুরু করলেন। বেরিয়েছিলেন বাড়ি থেকে মাছ কিনবেন বলে। রঘুনাথ চৌধুরী কোনোভাবে তাঁকে ক্ষান্ত করে মাছের বাজারে পাঠালেন।

     
(c) ছবিসূত্র
      
 এখানে বলা দরকার যে উগ্রজাতীয়তাবাদী অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরী এবং উগ্রজাতীয়তাবাদী নীলমণি ফুকনের মধ্যে বিরাট পার্থক্য ছিল। অম্বিকাগিরির ছিল অভাবী জীবন,বিপরীতে নীলমণি ছিলেন ধনাঢ্য। নীলমণির উপর বিষ্টুরাম বরুয়া, শিবপ্রসাদ বরুয়ার মতো প্রখ্যাত চা-মালিকের কৃপা দৃষ্টি ছিল। নীলমণি ফুকনের বিষয়ে অতুল চন্দ্র হাজরিকা লিখেছেন এইভাবে,“ ১৯২১ সনে মহাত্মা গান্ধির অসহযোগ আন্দোলনের আগুনে তিনি খড় জোগান ধরেন নি। তিনি তখন অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলনেরও সমর্থক ছিলেন না। সে সময়ে তিনি দুই একটি দেশের অহিতকর কাজও করেছিলেন। সেসময় দাদার মন পুরোনো পুথিতে ছিল না, অসমিয়া সাহিত্যেও ছিল না। তাঁর শরীরে তখন ইংরেজ চা চাষির ধনঞ্জয় বাতাস লেগেছে।”এই উক্তির সমর্থনে ডহীরেন গোঁহাইর একটি মন্তব্য এরকম, “নীলমণি ফুকনের মতো বুদ্ধিজীবীরা প্রথমে স্বাধীনতা আন্দোলনের দুর্ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন।চা উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত পুঁজিপতি শ্রেণির প্রতিনিধি রূপেই নীলমণি ফুকন সেরকম করেছিলেন।” নীলমণি ফুকনের উগ্রজাতীয়তাবাদী মনোভাবের উদাহরণ তাঁর সম্পাদিত ‘দৈনিক বাতরি’ কাগজের সম্পাদকীয়গুলো থেকেই পেতে পারি। কাগজটির এক অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন শিবপ্রসাদ বরুয়া। কাগজটি ব্রিটিশ চা মালিকদের অকুণ্ঠ সমর্থন পাচ্ছিল। শিবপ্রসাদ বরুয়াও আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলেন যে এটি ব্রিটিশের উষ্ম সমাদর সমর্থন পাবে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বহু বাগিচার ছাপার কাজ এই ‘বাতরি প্রেস’কেই দেওয়া হতো। তাবৎ চা মালিকেরা এর নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। কাগজটির এককালের সম্পাদক লক্ষ্মীনাথ ফুকনের মতে ‘দৈনিক বাতরি’ গান্ধির ‘অসহযোগ’ এবং তিলকের ‘দায়িত্বশীল সহযোগ’ দুটিরই বিরোধিতা করেছিল। ‘দৈনিক বাতরি’র সম্পাদকীয় লিখে লিখে নীলমণি ফুকন প্রথম ‘অসম অসমিয়ার জন্যে’—এই  তত্ত্ব প্রচার করেন। পরে তিনি ‘বৃহৎ অসম অসমিয়ার’ বলে ধ্বনি দিতে শুরু করেন। এই বৃহৎ অসমের ভেতরে সমগ্র উত্তরপূর্বাঞ্চল সহ ব্রহ্মদেশকেও টেনে নিয়েছিলেন। তাঁর এই ধারণাটি পরবর্তী কালে ক্ষতিকারক বলে বিবেচিত হল।
আরেকটি সম্পাদকীয়তে কর্তৃত্বের সুরে নীলমণি ফুকন অসমের পাহাড়ি জেলাগুলোতে অসমিয়া লিপি প্রচলনের ফরমান জারি করেছিলেন।  গারো পাহাড়ের ভাষা তাঁর মতে অসমিয়া ছাড়া কিছুই হতে পারে না বলে তিনি মত ব্যক্ত করেন, আর লেখেন রেভারেন্ড জেমস জয়মোহন নিকলস রায় যদি অসমিয়া জানতেন তবেই অসমিয়ারা তাঁকে আপন মানুষ বলে গ্রহণ করে নিতেন। তিনি চাইছিলেন অসমিয়া ভাষার জয়জয়কার হবে পাহাড়ে সমতলে। জনজাতি তথা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর  উপর এমন উগ্রজাতীয়তাবাদী লম্ফঝম্পের প্রতিক্রিয়া কী হবার ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

দৈনিক বাতরি তেজপুরে একটি বাংলা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোরতর বিরোধিতা করে এই যুক্তি দিয়েছিল যে অসমিয়া কৃষকের ঘামে অর্জিত রাজকোষের ধনে সেরকম বিদ্যালয় খোলার সামর্থ্য অসমের নেই। কিন্তু বাঙালিরা যেই বললেন, তাঁরা নিজেদের অর্থেই বিদ্যালয় খুলবেন দৈনিক বাতরি আসল মূর্তিতে দেখা দিল। ঘোষণা দিল, ব্যয় যেই করুক, নীতিগত কারণেই অসমে বাংলা ভাষার বিদ্যালয় হতে পারে না। অর্থাৎ দৈনিক বাতরি বাংলাকে সরকারি ভাষা করা এবং কিছু বিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানোটাকে একাকার করে ফেলেছিল। অসমিয়াকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেবার বেলা নিশ্চয়ই দ্বিমতের অবকাশ নেই, কিন্তু সেই স্বীকৃতি অন্য ভাষার বিদ্যালয় পর্যায়ে প্রচলনের অধিকার নিজে থেকে নাকচ করে না। অথচ দৈনিক বাতরি তেজপুরে সেই বিদ্যালয় খুলার বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণাতে ক্ষান্ত না হয়ে আনন্দচন্দ্র আগরওয়ালাকেও ‘বদন’ ঘোষণা করে।  মজার ব্যাপার হলো নীলমণি ফুকনেরই মতো আনন্দচন্দ্র আগরওয়ালাও অসম সাহিত্য সভার সভাপতি ছিলেন। তিনি যখন গোয়ালপাড়ার পুলিশ অধীক্ষক ছিলেন তখনই অসম সাহিত্য সভার ধুবড়ি অধিবেশনে অসমিয়া ভাষা বলবত করতে ব্যাপক পুলিশী বন্দোবস্তও করেছিলেন। ১০
কাগজটি দুর্গাপূজার বিপরীতে বিহুকে জাতীয় উৎসব করবার প্রস্তাব সঠিকভাবেই তুলে ধরেছিল কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি মৃৎশিল্পীরা প্রতিমা তৈরি করে  দুটো পয়সা রোজগার করে, বাঙালির যাত্রা পার্টি আর যাত্রার সঙ্গে কিছু ছোট দোকানি দুটো পয়সা রোজগার করে দুর্গাপুজোর দিনগুলোতে---সেগুলো বন্ধ করা।এই ছোট দোকানদার, কুমার,শিল্পীদের যারা বিদেশী বলছিল, তারা কিন্তু মাড়োয়ারি পাইকার এবং সাত সাগর তের নদী পার করে আসা সাদা সাহেবদের বিদেশী বলে আখ্যা দিচ্ছিল না। বরং এরা ঘোষণা করেছিল মাড়োয়ারির সঙ্গে অসমিয়ার কোনো বিরোধ নেই, অসমিয়ার একমাত্র শত্রুই বাঙালি।  দেখা যাবে যে বাঙালির বিপক্ষে সেই তখন থেকেই এক বিরূপ মনোভাব তথা জনমত গড়ে উঠছিল। কিন্তু এই মনোভাবের স্ফুলিঙ্গই মাঝে মধ্যেই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে শুরু করল।
১৯৪৭এর ৩ অক্টোবর অসমের প্রধানমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ সাংবাদিকদের সামনে জানিয়েছিলেন, “Assamese would be the official and state language. Assamese would be the medium of instruction in school.” ১৯৪৭ এর ১০ নভেম্বর শিলচর গেছিলেন আগরতলার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা করতে। স্থানীয় মানুষের দেওয়া স্মারকপত্রের উত্তরে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “Assamese as a state language would be made compulsory.” ১১ এর থেকে বোঝা যায় যে রাজ্যভাষা সরকারি ভাষা নিয়ে সরকারের কোনো অস্পষ্টতা ছিল না। তিনি কিন্তু দ্বিতীয় ভাষা বা অন্য একটি ভাষার কথাও বলেন নি।  এতেই ইঙ্গিত মিলছিল সমগ্র বৃহৎ অসমে অসমিয়া ভাষাকে সর্বাধিনায়ক সাজাবার আয়োজন হচ্ছিল। এরকম বাতাবরণেই ১৯৪৭এই অসমিয়া বাঙালি সংঘাত শুরু হয়ে গেল। এরই অংশ হিসেবে বাঙালি বিরোধী চিঠিপত্র প্রকাশ, সভা আয়োজন, সরকারি নির্দেশে কখনো কখনো শারীরিক নিগ্রহও শুরু হলো। ১৯৪৭এর ২৩ আগস্ট তারিখে গুয়াহাটিতে জাতীয় মহাসভা শীর্ষক একটি বিশাল জনসভা আয়োজিত হয়। সেই সভাতেই ‘বাঙালি খেদা’র প্রস্তাব নেওয়া হয়।
১৯৪৭এর ৫ নভেম্বর অসমের প্রথম আইন সভা বসে। এই সভাতে সেই সময়ের অসমের গভর্নর আকবর হাইদরি এক জাতি বিদ্বেষপূর্ণ ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি অসমিয়াদের মালিক আখ্যা দিয়ে বাঙালিদের ‘Stranger’ আখ্যা দেন। তাঁর ভাষণের অংশবিশেষ এরকম,“The native of Assam are now masters of their own house. They have a government which is both responsible and responsive of them... the Bengalee has no longer the power, even if he had the will, to impose any thing on peoples of these Hills and valleys which constitute Assam.” ১২
১৯৪৮এ আইন সভাতে গোপীনাথ বরদলৈ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন এভাবে, “ It is not the intention of the Government to make Assam a bilingual state and for the sake of homogeneity of province ...All non-Assamese to adopt Assamese language. ”
১৯৪৮এর মে মাসে গুয়াহাটিতে আবার বাঙালিদের উপর ব্যাপক হামলা শুরু হয়। এই সংঘর্ষে কলকাতার সংবাদ পত্রের স্থানীয় কার্যালয়,ঘর দুয়ার,ক্ষুদ্র ব্যবসা, এমন কি পথচারী পর্যন্ত আক্রান্ত হয়। বহু সম্পত্তি লুণ্ঠিত হয়। পরিস্থিতির এতো অবনতি হয় যে সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হয়। সরকারি তথ্যমতেই একজনের মৃত্যু হয়কিন্তু বেসরকারি মতে মৃতের সংখ্যা আরো বেশি। উল্লেখ যোগ্য কথাটি হলো এই সংঘর্ষে কোনো বাঙালি মুসলমানের আক্রান্ত হবার খবর নেই। সংঘর্ষে কেবল বাঙালি হিন্দুকে উদ্দেশ্য করে নেওয়া হয়েছিল। ফলে এই ঘটনা ভবিষ্যতের হিন্দু-মুসলমান বিভেদের গোঁড়ায় জল ঢেলেছিল বলে ভাবার যুক্তি আছে।
এর পরে ১৯৫০এ ভয়ঙ্কর রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ শুরু হয়।এই সংঘর্ষের মূল কেন্দ্র ছিল পশ্চিমবঙ্গ এবং পুবপাকিস্তান অর্থাৎ এখনকার বাংলাদেশ। অসমের করিমগঞ্জ, গোয়ালপাড়া, বরপেটা ইত্যাদি অঞ্চলে ব্যাপক সংঘর্ষ হয় এবং বহু মানুষ আক্রান্ত হন। ফলে বহু মুসলমানকে অসম ত্যাগ করতে হয়তাঁদের অধিকাংশই কোচবিহার এবং পুব বাংলার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী লোকসভাতে বিবৃতি দিয়ে জানান, এই সংঘর্ষে ‘Tribal Folk’ জড়িত। পরে নেহরু লিয়াকত চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া অধিকাংশ মুসলমানই অসমে ফিরে আসেন। বিভিন্ন সূত্র মতে ১৯৫০এর এই সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে ৫০,০০০ এর বেশি মানুষ মারা গেছিলেন।
১৯৫৪তে ‘রাজ্যপুনর্গঠন আয়োগ’ অসমে আসে। এই সময়ে গোয়ালপাড়া জেলার বাঙালিরা চেয়েছিলেন গোয়ালপাড়াকে পশ্চিম বাংলার সঙ্গে জুড়ে দিতে। এই অজুহাতে ১৯৫৫তে গোয়ালপাড়া, ধুবড়ি, বিলাসীপাড়া, বিজনি, বরপেটা, ফকিরাগ্রাম ইত্যাদি অঞ্চলে অসমিয়া বাঙালি সংঘাত শুরু হয়ে যায়। সেই সময়ের বিভিন্ন সংবাদপত্রে যা সব সংবাদ মেলে তাতে বোঝা যায় মুসলমানদের বড় অংশই বাঙালি হিন্দুর উচ্ছেদে হাত লাগিয়েছিলেন।  সেই সংঘর্ষের ফলে বহু মানুষ অসম ছেড়ে পশ্চিম বাংলাতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। সেই বছরেই ২১ এপ্রিলে রাতে প্রায় জনা তিরিশেক মানুষ গুহায়াটির পান বাজারের আনন্দবাজার পত্রিকার কার্যালয় ভেঙে চুরমার করে। ১৯৫৫ -র অসমিয়া বাঙালি সংঘর্ষটি প্রকৃতার্থে প্রথম সুসংগঠিত সংঘর্ষ যাকে ‘বাঙালি খেদা আন্দোলন’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল।
১৯৫৫র পরে অসমিয়া বাঙালি সংঘর্ষের চূড়ান্ত পর্যায় হলো ১৯৬০এর ভাষা আন্দোলন। প্রকৃতার্থে সমস্ত অসমিয়া এই আন্দোলনটিকে অসমিয়া ভাষা সাহিত্য রক্ষার শেষ শরাইঘাটের যুদ্ধের মতো ধরে নিয়ে নির্বিচারে বাঙালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু অবধারিতভাবে জাতি রক্ষার জন্যে বেরিয়ে আসা মানুষজন অধিকাংশ সময়েই উৎপীড়নকারীতে পরিণত হয়েছিলেন।

১৯৬০-এর সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা:
এই কথা উল্লেখ করতে হবে যে ১৯৬০-এর ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বর্তমান অব্দি উল্লেখযোগ্য কোনো ধরণের গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ হয় নি। ১৯৫৫র ‘রাজ্য পুনর্গঠন প্রস্তাব’ উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি রাজ্যেই রাজ্যভাষা স্বীকৃতির প্রশ্নটিও উত্থাপিত হয়। অসমও এর ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু অসমে ‘একাংশ অসম বিরোধী’ মানুষ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেতারা ‘অসমিয়া ভাষা গাধার ভাষা’ বলে স্লোগান দিয়ে বহু অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠানে অসমিয়াতে লেখা নাম ফলকগুলো ভেঙে ফেলে। এদিকে ১৯৬০-এর ৪ জুলাই পুলিশ রাজপথে সমবেত আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। কটন মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের কাছে সহপাঠীর সঙ্গে কথা বলছিলেন রঞ্জিত বরপূজারী। তাঁর গায়ে গুলি লাগে। তিনি সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সে বছরেই ৮ জুলাই নগাঁও শহরের কাছে ডিমরুগুরি নরোত্তম গ্রামের মফিজুদ্দিন হাজরিকা নিহত হন। মতিউল্লাহ হাজরিকার ছেলে মফিজুদ্দিনকে নগাঁওর শঙ্কর মিশন পথের নর্মাল স্কুলের সামনের পথটিতে অজ্ঞাতপরিচয় অস্ত্রধারী গুলি করে হত্যা করে। ১৯৬০-এর ১০ অক্টোবরে মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা অসম বিধান সভাতে ভাষা সম্পর্কিত বিধেয়ক উত্থাপন করেন। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করিমগঞ্জ কেন্দ্রের বিধায়ক রমেন্দ্র মোহন দাস এর বিরোধিতা করেন। প্রতিবাদের মধ্যেই ২৪ অক্টোবরে বিধান সভাতে বিধেয়কটি গৃহীত হয়। এর প্রতিক্রিয়াতে ১৯৬১-র ৫ ফেব্রুয়ারিতে রথীন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ‘কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হল। তাঁরা ১৯শে মে তে সম্পূর্ণ হরতাল আহ্বান করলেন। রথীন্দ্র সেন , বিধূভূষণ চৌধুরী সহ বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হল। এরই মধ্যে ১৯শে মে দিনেই ভাষা আন্দোলনের অন্যতম করুণ ঘটনাটি সংগঠিত হয়। তারাপুর রেলস্টেশনের কাছে পুলিশের গ্রেপ্তার করা ৯ জন ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতেই পুলিশ গুলি করে। এবং সেখানেই ৯ জন মারা যান। ২জনের পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয়।  অন্যদিকে শিলিগুড়ি রেলস্টেশনে উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেলের জনসম্পর্করক্ষী আধিকারিক সূর্য বরাকে কিছু দুর্বৃত্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডটি এতোই নৃশংস ছিল যে তাঁর মৃতদেহই খুঁজে পাওয়া যায় নি।


রঞ্জিত বরপূজারী ছাত্রাবাস
ঘটনার ক্রমিক বিশ্লেষণ
‘দেশ-বাণী’ নামের বাংলা সাপ্তাহিকের সম্পাদক বিশ্বপ্রসাদ বসুর উপরে গুয়াহাটিতে আক্রমণটিই ছিল ১৯৬০এর সংঘর্ষের প্রথম ঘটনাতাঁর অপরাধ ছিল বাংলাভাষাকে অসমের দ্বিতীয় রাজ্যভাষা হিসেবে ঘোষণা করবার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
১৯৬০এর ২০ মে তারিখে গুয়াহাটি তেল শোধনাগারের বাঙালি ম্যানেজার এবং কর্মচারীদের উপরে আক্রমণ করা হয়। অসমিয়াদের ক্ষোভ ছিল যে শোধনাগারে অসমিয়াদের যথেষ্ট চাকরি দেওয়া হয় নি। কিন্তু ইন্ডিয়ান অয়েল রিফাইনারির চেয়ারম্যান ফিরোজ গান্ধি গুয়াহাটি এসে বিবৃতি দেন যে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যে। শোধনাগারের ৬৬.৭ জনই অসমিয়া। উচ্চ কারিগরিজ্ঞান প্রাপ্ত বহু মানুষকে এখানে নিযুক্তি দেওয়া হয়েছে। তিনি ডেকা উপাধির এক মহিলা কর্মচারীরও নজির দিয়েছিলেন। ১৪
এর পরে শিমলুগুড়ি, ডিব্রুগড়, নগাঁও ইত্যাদি অঞ্চলে ব্যাপক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাগুলোতে প্রায়ই রেলস্টেশনগুলোকে লক্ষ্য করে নেওয়া হলো। ইট পাথর,লাঠি সোটা নিয়ে রেলযাত্রীদের উপরে আক্রমণ নামানো হলো। শিবসাগর, মরিয়নি, তিনসুকিয়া ইত্যাদি জায়গাতে রেলপথ অবরোধ করে ট্রেন থামিয়ে বাঙালি যাত্রীদের শনাক্ত করে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হল। ১৯৬০এর ৫ জুন ডিব্রুগড়ে বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের লক্ষ্য করে দুষ্কৃতিকারীরা শিলাবৃষ্টি করল। অন্যদিকে শহরের বাঙালি ব্যবসায়ীদের দোকানপাটে লুঠপাট চালানো হলো। ১৫
১৯৬০-এর জুলাই মাসে কামরূপ, জাগীরোড, চাপরমুখ, যমুনামুখ,হোজাই, যোগীজান ইত্যাদি অঞ্চলে সংঘর্ষ সংঘটিত হল। এই অঞ্চলগুলোর রেলস্টেশনে ব্যাপক আক্রমণ হলো। অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত আক্রমণকারীরা রেলের সুরক্ষাকর্মীদেরও খুব বাজে ভাবে মারপিট করল।১৬ ১৯৬০-এর ২ জুলাইতে তখনকার অসমের রাজধানী শিলঙেও ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। প্রায় ১৪ জন ছুরিকাহত হন। ১৭
এর দু’দিন পরে অর্থাৎ ৪ জুলাইতে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটে। সেদিন কটন কলেজের পাশেই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ শুরু হয়। বহু দোকানপাটে আগুন দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্যে পুলিশ গুলি চালায়।  কটনের ছাত্রাবাসের বারান্দাতে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছিলেন শিবসাগরের ছাত্র রঞ্জিত বরপূজারী। তাঁর গায়ে এসে গুলি লাগলে তিনি সেখানেই মারা যান। সঙ্গে আরো ৭জন ছাত্র বাজে ভাবে আহত হলেন। আহতরা ছিলেন অমিত ভট্টাচার্য, নেত্রধর দাস, তিলক হাজরিকা, ভূপেন্দ্র নাথ শর্মা, রুদ্র গোঁহাই, অমর হাজরিকা।১৮
রঞ্জিত বরপূজারীর মৃত্যুতে ক্রুদ্ধ জনতা জেলাশাসকের বাংলো ঘেরাও করে, এবং কেউ একজন জেলা শাসক পি এল সোমকে ছুরিতে আঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থাতে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৯ রঞ্জিত বরপূজারির মৃত্যু সংঘাতময় পরিবেশকে নয়া মাত্রা দিল। পুরো অসমে ছড়িয়ে পড়ল সংঘাতের আগুন। পুরো অসমে বাঙালিদের আক্রমণ করা শুরু হলো। গুয়াহাটির নারাঙ্গি রেলস্টেশনে আক্রমণ হলে দুই ব্যক্তি মারা যান। স্টেশনমাস্টারকে কে বা কারা অপহরণ করে নিয়ে গেল। তাঁর সম্পর্কে পরে আর কিছুই জানা গেল না। এই ঘটনার দিনেই রাতে গুয়াহাটির পলাশবাড়িতে যুগান্তর এবং অমৃতবাজার পত্রিকার এজেন্টকে ছুরিতে আঘাত করে মেরে ফেলা হলো।
৫ জুলাই দুর্বৃত্তের দল পাণ্ডুতে এক রেলের ডাক্তারকে হত্যা করে তাঁর স্ত্রীকেও বাজে ভাবে অত্যাচার করে। সেদিনই গোরেশ্বরে  পাঁচ বন্দুকধারী দুর্বৃত্তের দল ১৩টি বাঙালি গ্রামে গুলিবর্ষণ করে। ৩০০০ বাড়িতে আগুন দেয়। সেই ঘটনাতে ২৫-৩০জন মানুষ আহতও হন।
সেদিনই পলাশবাড়ি থানার বাঙালি অসি-কে খুন করা হয়। সেই এলাকার চিকিৎসালয়ের কম্পাউন্ডারকে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নারাঙ্গির বাঙালি রেলকর্মচারীদের উপরে আক্রমণ হয় ৫ জুলাই। দিন ১০টায়। দুই বাঙালি লোক তৎক্ষণাৎ মারা পড়েন। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় খাদি বোর্ডের এক বাঙালি এবং আরেক বিহারি কর্মচারীকে নির্মমভাবে মারপিট করা হয়। ২০
 ৬ জুলাই তেজপুরে দু’জন বাঙালিকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা হয়। একজনের নাম গোপাল দে। কিছু বিদ্যালয়েও আগুন দেওয়া হয়। সেদিনই দুপুরে নগাঁও জেলার যমুনামুখে কানাইলাল অধিকারীর বাড়িতে শ’পাঁচেক লোকে গিয়ে আক্রমণ করে। সে সময় কানাইলাল অধিকারী বাড়ি ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী কুসুম বালা শাশুড়ি-মা আর ছোট্ট দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে কোনোক্রমে পাশের জঙ্গলে পালিয়ে যান।  কিন্তু দুঃখের কথাটি এই কানাইলাল অধিকারী আর বাড়িতে ঘুরে এলেন না কোনোদিন। ২১
নগাঁওর নিজ কামপুর বস্তির বৃন্দাবন রায় চা বিক্রি করে সংসার চালাতেন। ৫ জুলাই ভোর বেলা বেরিয়ে যান। কিন্তু সন্ধ্যা হতেই তাঁর মৃতদেহটি পথের পাশে পড়ে থাকতে লোকেরা দেখতে পায়। ২২
৭ জুলাই বরপেটার থেকে মাইল পাঁচেক দূরের একটি গ্রামে ৬০টি বাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তেরা। ফলে এক নারী পুরুষ জন চারেক মারা পড়েন। অন্যদিকে সেদিনই নগাঁও তিনসুকিয়াতে সব মিলিয়ে ৩৪জনের মতো বাঙালি মানুষ ছুরিকাহত হন। সেদিনই কলিয়াবরের উদীয়মান যুবক, আর সি পি আই-র যুব নেতা, নগাঁও মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ‘অসম রাজ্যিক ভাষা’ ছাত্র কর্ম পরিষদের নগাঁও জেলা সমিতির যুগ্ম সম্পাদক শিশির নাগকে হত্যা করা হয়। তিনদিন পরে তাঁর মৃতদেহ মেলে কলং নদীতে। বন্দুকের গুলিতেও নগাঁওতে সেদিন দু’জন মারা যাবার সংবাদ আমরা পেয়েছি।
৭ জুলাই রাতে উত্তর কামরূপের বাঙালি বসতি প্রধান এলাকাগুলোতে ভয়ানক সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ৮ জুলাই ভোরে পুলিশ সেইসব এলাকা থেকে ৫টি মৃতদেহ উদ্ধার করে।
৯ জুলাই বালিজান বাগানে প্রায় ৫০০ মানুষ দা, কুঠার, লাঠি নিয়ে চা-বাগানের বাঙালি কর্মচারীদের আক্রমণ করে। এই আক্রমণে ৪জন মারা যান, ৩৫ জন আহত হন।
৯ জুলাই রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ নাজিরার লাওখোয়া বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পরেশ চন্দ্র চক্রবর্তীর বাড়িতে বহু লোক জড়ো হয়ে আক্রমণ করে। তাঁর বাড়িটা পেট্রল ঢেলে জ্বালিয়ে দিতে উদ্যত হয়। তাঁর ছেলে হারুল চক্রবর্তী বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসবার চেষ্টা করতে লোকেরা তাঁকে ধরে বেঁধে জ্বলন্ত আগুনে ছুঁড়ে ফেলে। বাড়ির বাকিরা বেড়া ভেঙে পালাতে সমর্থ হনতাঁরা কজন আক্রমণকারীকে চিনতে পেরেছিলেন। নথি অনুসারে তারা হলেন কনক শর্মা, রত্নেশ্বর ডেকা (এম ভি স্কুলের সভাপতি), ভবেশ্বর হাজরিকা (সম্পাদক),প্রেম ডেকা,ধীরেশ ডেকা,যোগেন ডেকা,হরেন হাজরিকা,উমেশ ডেকা,উপেন্দ্র ডেকা, যোগেন্দ্র ডেকা, রামেশ্বর ডেকা। ২৩
৯জুলাই, ১৯৬০-এর রাত নটায় গুয়াহাটির নোয়াখালি কলোনির সংবাদ পত্রের হকার হরিরঞ্জন দত্তের বাড়িতে শ’পাঁচেক লোকে আক্রমণ করে। তখন তাঁর স্ত্রী মুকুল রানি দত্ত বাড়িতে ছিলেন। মুকুলরানি এবং তাঁর ছেলে কোনোক্রমে যদিও পালাতে পেরেছিলেন হরিরঞ্জন দত্ত চিরদিনের জন্যে নিখোঁজ হয়ে যান। ২৪
১০ জুলাই,১৯৬০-এ নগাঁওর কামাখ্যা রেস্তোরার মালিক বীরেন্দ্র কুমার দেবকে ডেগারে আক্রমণ করা হয়। তিনি যদিও আহত হয়েও একটি পাথরের আড়ালে লুকিয়ে প্রাণ রক্ষা করতে পারেন।
১১ জুলাই,১৯৬০-এ শিবসাগর,গোলাঘাট,যোরহাটে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। গোলাঘাট মহকুমাতে একজন মারা পড়েন, ৩৮ জন আহত হন। লিচুবাড়িতে ২জন নিহত হন,আহত হন ৮ জন।
সেদিনই শিবসাগর জেলার রাজমাই বাগানে শিলচরের সুরেন্দ্র কুমার নন্দীর বড় ছেলে তথা কেন্দ্রীয় আবগারি বিভাগের কর্মচারী সত্যব্রত নন্দীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ২৫
১২ জুলাই ১৯৬০-এ শিবসাগর,লক্ষিমপুর,যোরহাটেও আরেক প্রস্ত বাঙালি খেদা হলো। এর ফলে নকসারি স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার গুরুতরভাবে আহত হন। ওদিকে শিবসাগর কলেজের ব্যায়াম শিক্ষকও ছুরিকাহত হন। ১৩ জুলাইতে ডিব্রুগড় থেকে ৩০ মাইল দূরের একটি চাবাগানে,এক বাঙালি আবগারি ইন্সপেক্টরকে হত্যা করা হয়,ডিগবয়তে একটি চাবাগানের কর্মচারী পরিবারের চারজনকেই হত্যা করা হয়। ২৬
            ১৪ জুলাই গুয়াহাটি থেকে ২৬ কিমি. দূরের খুমতাই চা বাগানের চিকিৎসক ডাঃ ঘটক এবং গুদাম সহকারী গোপাল ভট্টাচার্যকে ছুরিতে আক্রমণ করা হয়। ১৭ আগস্টে ধুবড়িতে হত্যা করা হয় সরোজ দাসগুপ্ত নামের এক ব্যক্তিকে।
এরই মধ্যে উত্তরপুব সীমান্ত রেলের জনসম্পর্করক্ষী আধিকারিক সূর্য বরাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কাজের জন্যে তিনি রেলে করে কলকাতা যাচ্ছিলেন। তাঁকে শিলিগুড়ি রেলস্টেশনে হত্যা করা হয়। শিলিগুড়িতে সেরকমই ৮ জুলাইতে হরেশ্বর গোস্বামীকে সপরিবারে অপদস্থ করা হয়। তিনি পরে অসম বিধান সভার অধ্যক্ষ হয়েছিলেন।
১৯১৬-র ১৯শে মে শিলচর রেলস্টেশনের কাছে ১১জন বাঙালি আন্দোলনকারীকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। তাঁরা হলেন কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, তরণী মোহন দেবনাথ, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, কুমুদ রঞ্জন দাস, সত্যেন্দ্র দেব, সুনীল সরকার, কানাই লাল নিয়োগী, সুকমল পুরকায়স্থ। ২৭
তার কিছুদিন পরেই ১৯ জুন তারিখে কাছাড় জেলার হাইলাকান্দিতে অসমিয়া ভাষার সমর্থক ১১জন মুসলমান মানুষকেও পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। তাঁরা হলেন সিকন্দর আলি, মজফর আলি, মাহমুদ আলি, আমির হুসেইন, মতিউর রহমান, নেজামৎ আলি, সিদ্দেক আলি, সুরমান আলি, রহমান আলি, মফুর আলি, মুরমিয়া আলি। ২৮
এখানে কয়েকটি মুখ্য ঘটনাই উল্লেখ করলাম আমরা, যেগুলো ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। সমগ্র অসমে এমন অগণন ঘটনা ঘটেছিল, যাতে করে পুরো রাজ্য এক উত্তপ্ত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছিল। সেই সমস্ত ঘটনারই পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ যদিও দরকার, স্থানাভাবে তার থেকে বিরত থাকছি।

ভাষা এবং জাতি রক্ষার জন্যে নারী নির্যাতন!
আগেকার ঘটনাগুলো বাদ দিয়ে শুধু যদি ১৯৬০-এর ঘটনাপ্রবাহই বিশ্লেষণ করা যায়, তবে দেখব মাত্র এক বছরে অসমিয়া জাতি এবং ভাষা রক্ষার জন্যে অসংখ্য নারীর উপরে অত্যাচার চলেছিল,তাদের বলাৎকার করা হয়েছিল,হত্যা করা হয়েছিল। এগুলো কারো মনে সাজানো হালকা পক্ষপাত দুষ্ট অভিযোগ নয়। এগুলো সরকারি এবং অন্যান্য নথিপত্রে লিপিবদ্ধ মহাভিযোগ। কিছু উদাহরণ এরকম:
১) ১৯৬০-এর জুন মাসে রেলস্টেশনগুলোতে বাঙালি খেদা আরম্ভ হয়। রেলগাড়িগুলো দাঁড় করিয়ে বাঙালি যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়।বাঙালি মেয়ে,মহিলার গলা,গালে হাত দিয়ে শ্লীলতাহানির মতো ঘটনা সহজ হয়ে দাঁড়ায়। এহেন নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে ২৯ জুনে করিমগঞ্জের ব্যাঙ্ক ভবনে একটি সভাতে হাজারের অধিক মহিলা সমবেত হন। সেই সভাতে সভানেত্রীত্ব করেন সুনীতিবালা দাস। তাঁরা সরকারকে এই বলে প্রশ্ন করেন,“চলিহা মন্ত্রীসভা নারীর উপর এমন অত্যাচারে নীরব কেন?”
২) ৫ জুলাই পাণ্ডু রেল কলোনিতে এক ডাক্তারকে হত্যা করে তাঁর স্ত্রীকে ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। দুর্বৃত্তের দল তাঁর স্তন ধারালো অস্ত্রে কেটে দেয়। ২৯
৩) ৫ জুলাই রঙিয়ার কাছে রেল দাঁড় করিয়ে তিনজন বাঙালি তরুণীকে নামিয়ে দেয় দুর্বৃত্তের দল। তাঁদের আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যায় নি। ৩০

৪) নগাঁও জেলার রহা থানার শিমুলতলা গ্রামের বাসিন্দা বিনেন্দ্র বিশ্বাসের বাড়িতে বিকেল ৩টাতে ৫০জনের একটি দল প্রবেশ করে বিনেন্দ্রকে মারপিট করতে শুরু করে। আরো কিছু লোক রান্নাঘরে ঢুকে তাঁর স্ত্রী সারদাবালা বিশ্বাসকে প্রাণে মারবার হুমকি দিয়ে শ্লীলতাহানি করে। সেই সময় তিনি চারমাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।এই অত্যাচারের ফলে তাঁর গর্ভপাত হলো। নথিতে উল্লেখ আছে সেই ঘটনার দোষীরা হল রমেন, পুতুল, কাশীরাম ডেকা। ৩১
৫)  ৬ জুলাই বরপেটা শহরের এক সোনারির বাড়িতে জোর করে ঢোকে ১০ জনের একটি দুর্বৃত্তের দল। সোনারির ১৯ বছরের বিবাহিত কন্যাকে কেড়ে নিয়ে যায় পাশের একটি ঘরে। সেখানে পাশবিক অত্যাচার চালিয়ে পরে হত্যা করে। ৩০
৬) সেই রাতেই প্রায় ১১টাতে প্রায় ১৫০ জন লোকের একটি দল প্রবেশ করে নগাঁওর পুরণিগুদামের বাসিন্দা অধর চন্দ্র ব্যানার্জির বাড়িতে। তাঁকে হত্যা করে। তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীরানি দেবীকে ধর্ষণ করে হত্যা করে। তাঁর দুই বছরের শিশু কন্যাকেও এরা রেহাই দেয় নি। ধর্ষণ করে হত্যা করে। ৩২
৭) ১০ জুলাইতে তিতাবর থানার জোনাকি বস্তিতে কেতকী রঞ্জন মালাকারের বাড়িতে অনেক আক্রমণকারী প্রবেশ করে। তাঁর ভাই সুশীল চন্দ্র মালাকারের পাঁচমাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বিছানাতে শুয়ে ছিলেন। আক্রমণকারীরা তাঁকে বিছানা থেকে টেনে এনে বাজে ভাবে আতিশয্য চালায়। ফলে সেই রাতেই তাঁর গর্ভপাত হয়। নথিতে উল্লেখ আছে দোষীদের নাম—মনেশ্বর দাস, পিয়ন দাস, নুর দাস, বেবাই দাস, ধর্মেশ্বর দাস। ৩৩
৮) ১৩ জুলাই বিকেলে রহার শিমুলগুড়ির বাসিন্দা রাধারাম বিশ্বাসের বাড়িতে কিছু লোকে আক্রমণ করে,তাঁকে মারধর করে। কিছু লোকে ভেতরে গিয়ে তাঁর স্ত্রীর শাড়ি খুলে মেখলার মতো পরিয়ে দেয়। রাধারাম বিশ্বাসের বাড়ি ভেঙেচুরে চলে যায়।পরদিন ১৪ জুলাই শান্তিরক্ষা সভা হয়সেই সভাতে রাধারাম বিশ্বাসকে নিমন্ত্রণ করা হয়। তিনি যখন সভাতে ছিলেন, বাড়ি ছিলেন না, চারজন আক্রমণকারী আবার আসে। রাধারামের স্ত্রীকে ধর্ষণ করে। তিনি পরে যাদের শনাক্ত করেছিলেন—তারা হলেন পুতুল বরদলৈ, কাশীরাম ডেকা, রাজেন যোগী, পাতং মিকির। ৩৪
উপরে কয়েকটি ঘটনা উদাহরণ হিসেবেই উল্লেখ করা হলো শুধু। এরকম ঘটনা অসমের আকাশ বাতাস তিমিরাচ্ছন্ন করে ফেলল, কলঙ্কিত হলো জাতি রক্ষার প্রয়াস।

স্লোগান এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
ঐ সময়ের সংঘর্ষগুলোতে অসমিয়াপক্ষের দেওয়া স্লোগানগুলো  বিশেষ অর্থ বহন করে। সহজশ্রব্য স্লোগানগুলো ছিল এরকম, ‘বাঙালি তাড়াও’ (বঙালী খেদা), ‘বাঙালিকে মার’, ‘বাঙালি যদি অসম থেকে বেরিয়ে না যায় তবে প্রাণ দিক’, ‘জল দেব না, প্রস্রাব করে দেব’ ইত্যাদি। কিন্তু অবাক করা দুটি স্লোগান ছিল ‘বাঙালি মেয়েকে বিয়ে কর’, ‘বাঙালি মেয়েকে বিয়ে করব’। ভাষা রক্ষার নামে এ কেমনধারা স্লোগান সে সকরুণভাবে দুর্বোধ্য। এমন মানসিকতার ফলে অসংখ্য তরুণী,মহিলা শারীরিকভাবে অপদস্থ হলো। ওদিকে অসমিয়া পোশাক ‘মেখেলা –চাদর’ জোরজবরদস্তি বাঙালি মহিলাদের পরাবার মতো ঘটনাও ঘটেছিল। এরকম ঘটনা বেশি করে ঘটেছিল নগাঁও জেলাতে। আগেই উল্লেখ করেছি যে ১৩ জুলাই , ১৯৬০-এ শিমলুগুড়ি এলাকার বাসিন্দা রাধারাম বিশ্বাসের বাড়িতে অনেক লোক ঢুকে স্বামী-স্ত্রীকে মারধর তো করেই, তাঁর স্ত্রীর শাড়ি খুলে মেখেলার মতো পরিয়ে দিয়ে,পরে তাঁকে ধর্ষণ করে। সেই ঘটনার পরে ১৫ জুলাই একটি শান্তি রক্ষা সভা বসে। সেই সভাতে তাদেরকেও নিয়ে যাওয়া হয়। সভাতে অসমিয়া বাঙালি দুপক্ষের মানুষই অংশ নেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই সভাতে বাঙালি মহিলাদের জোর করে মেখেলার মতো করে শাড়ি পরতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সমস্ত বাঙালিদের ‘আমরা অসমিয়া!’ ‘বাংলা ভাষা নিপাত যাক’ বলে স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়। যে বাঙালি মহিলারা অসমিয়া বলতে পারছিলেন না, তাদের নির্দয় ভাবে প্রহার করা হলো এবং ডেগার দেখিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হলো। ৩৫

শহিদকে নিয়ে করা রাজনীতি
এটি অপ্রিয় হলেও সত্য যে এই আন্দোলনের শেষে একদল সুবিধাবাদী মানুষ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে পড়ে। যারা ত্যাগ করেছিলেন তাদের ধীরে ধীরে পুরো প্রক্রিয়ার থেকে বের করে দেওয়া হয়। এর আড়ালে অনেক রাজনৈতিক লাভালাভের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। একদিকে রঞ্জিত বরপূজারি এবং সূর্য বরার মৃত্যুকে মহীয়ান করে তুলা হলো। কিন্তু অন্যদিকে মফিজুদ্দিন হাজরিকা এবং শিশির নাগকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হলো। অসমিয়া ভাষার জন্যে রাজপথে বেরিয়ে এসে গুলি খেয়ে মারা গেছিলেন মফিজুদ্দিন।কিন্তু তাঁকে প্রকৃত শহিদের মর্যাদা দেওয়া তো দূরের কথা,তাঁর মৃত্যুদিনটিকে সরকারি বা বেসরকারিভাবে লিপিবদ্ধও করা হলো না। আনুমানিকভাবে ১৯৬০-এর ৮ জুলাই দিনটিকে তাঁর মৃত্যুদিন হিসেবে ধরা হয়। স্বীকৃতির নামে তাঁর পরিবার ১৯৮৭-র ১০ ডিসেম্বরে সারা অসম ছাত্র সংস্থার তরফে কেশব মোহন্ত এবং অতুল বরা স্বাক্ষরিত একটি মানপত্র লাভ করেন। সেই মাত্র। এ পরম পরিতাপের কথা যে অসমিয়া জাতির জন্যে বেরিয়ে এসে বুক পেতে গুলি খেয়ে এই শহিদ প্রতিদান হিসেবে কিছু তো পানই নি,একটি সামান্য মানপত্র পেতেও ২৭ বছর লেগেছিল।
মফিজুদ্দিনের মতোই অসমিয়া জাতির জন্যে সকরুণভাবে মৃত্যু বরণ করেছিলেন নগাঁওর তরুণ শিশির নাগ। ১৯৬০-এর সংঘর্ষের দিনগুলোতে অসমিয়া বাঙালি সম্প্রীতির স্বার্থে শিশির নাগ প্রাণমন দিয়ে শ্রম স্বীকার করেছিলেন। নিজে বাঙালি তরুণ হয়েও অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যভাষা করবার জন্যে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছিলেন। হোজাইতে অনুষ্ঠিত হবার ছিল ‘বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন’-এর বার্ষিক অধিবেশন। শিশির নাগ গণ আন্দোলনের নেতা হিসেবে ১৯৬০-এ নগাঁও মহাবিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সংস্থার অধিবেশনে প্রতিনিধি সভাতে ভাষণ দিয়ে সেটি নিষিদ্ধ করবার দাবি জানিয়েছিলেন। ১৯৬০-এর ২৮, ২৯ মে-তে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দিতে অনুষ্ঠিত ‘রাজ্যিক শরণার্থী সম্মেলন’ এবং জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া শহরে অনুষ্ঠিত বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সর্বভারতীয় সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অসমিয়াকে অসমে রাজ্যভাষা করবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ১৯৬০-এর ৭ জুলাই হাটবর এবং আমবাগানে অসমিয়া বাঙালি উভয় সম্প্রদায় সমবেত হয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল। শিশির নাগ কজন সতীর্থকে নিয়ে কলিয়াবর যাবার জন্যে যাত্রা করেন। কিন্তু পুরণিগুদামেই জনাকয় তরুণ গাড়ি আটকে জোরকরে তার থেকে শিশির নাগকে বের করে হত্যা করে। সেই ঘটনার চারবছর পরে প্রত্যক্ষদর্শী এবং শিশির নাগের বড় ভাই দ্বিবেশ নাগের তৎপরতাতে মূল হত্যাকারী আতাউল হককে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত আতাউলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। ১৯৬৪-র ৭ জুলাইতে নগাঁও জেলা সাংবাদিক সংস্থা শিশির নাগের মৃত্যুদিবসে ‘সম্প্রীতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। ১৯৯৭তে অসম সাহিত্য সভার বিলাসীপাড়া অধিবেশন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে নগাঁও শহরে তাঁর সম্মানে একটি ‘স্মৃতি সৌধ’ নির্মাণের। আজ অব্দি সেই প্রস্তাব কার্যকরী হয় নি। অসমিয়া ভাষার স্বার্থে আত্মীয়জনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেও শিশির নাগের জুটে নি কিছুই। তাঁর বলিষ্ঠ ত্যাগকে বিস্মৃতির আঁধারে ঠেলে দেওয়া হলো। এমন কি আসু যে ৮৫৫জন শহিদের তালিকা প্রস্তুত করেছে, তাতেও তাঁর ঠাই হয় নি। সাহিত্য সভাও নিজে গ্রহণ করা প্রস্তাব নিজে অবহেলা করে শহিদের প্রতি অবজ্ঞার নজির স্থাপনের বাইরে আর কিছু করবার সময় বের করতে পারে নি। হাইলাকান্দিতে অসমিয়া ভাষার জন্যে বেরিয়ে গিয়ে যে ১১জন মুসলমান মৃত্যুর মুখে পড়েছিলেন, তাঁদের সম্মান জানানো তো দূরেই থাক, ঘটনাটি লিখতেও লেখকেরা কৃপণতার পরিচয় দিলেন। কেবল মাত্র দেবেশ্বর শর্মা তাঁর আত্মজীবনী ‘হেরাই যোয়া দিনবোর’-এর বাইরে আর কোথাও তাঁদের নাম বা ঘটনার সম্পর্কে সবিশেষ কিছু মেলে না। এ বড় দুর্ভাগ্যের কথা। ১১ জন প্রাণ দেবার পরেও এতো দিনেও আমরা তিলেক মাত্র শ্রদ্ধা বা সম্মান প্রদর্শন করতে পারি নি। এটি এক অবাক করা চরম লজ্জাজনক কথা।  

অসম সাহিত্য সভার ভূমিকা :
অসমিয়া জাতির,ভাষার উন্নতি এবং সংরক্ষণের জন্যে অসম সাহিত্য সভা সেই ১৯১৭ থেকেই পদক্ষেপ নিয়ে আসছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে এসেছে। এ কথা স্বীকার করেও বলতে হবে যে পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়ার থেকে শুরু করে অসম সাহিত্য সভার সভাপতি এবং কর্মকর্তারা বাঙালিদের প্রতি অযথা অসহিষ্ণু মনোভাব বহন করে এসেছেন। এ নিয়ে ভূমিকাতে আমরা আলোচনা করেছি।অনেক সভাপতির বরাক উপত্যকার প্রতিও বড় অসন্তোষজনক ছিল। উদাহরণস্বরূপে ধুবড়ি অধিবেশনের সভাপতি বেণুধর রাজখোয়ার কথা স্মরণে না আনলে ভুল করা হবে। তিনি সেই অধিবেশনে বাঙালিদের উদ্দেশ্যে বেশ কটু কথা উচ্চারণ করেছিলেন।এক বাঙালি ভদ্রলোক এর প্রতিবাদে কিছু বলতে উঠলে তিনি তাঁকে বসিয়ে দিলেন। ফলে স্থানীয় লোকজন সভা ছেড়ে চলে গেলেন। পরদিনও তিনি একই কাজ করলেন। বাঙালিরা বুঝি নিজেদের জাপানিদের সঙ্গে তুলনা করেন। এই ধারণাকে বিদ্রূপ করে তিনি বললেন বাঙালি আর জাপানি দুই জাতিই মাছ খায় বলেই এক হতে পারে না। তাই যদি হবে, তবে বেড়ালে এবং বাঙালি দুইই মাছ খায় বলে বাঙালির উচিত বেড়াল হওয়া।৩৬  অসম সাহিত্য সভার দু’জন সভাপতির মুখে এমন কথা নিশ্চয় শোভা পায় না।
অসমিয়া ভাষার উন্নতির জন্যে সভার নেওয়া পদক্ষেপগুলো গিয়ে ১৯৬০-এ অসম রাজ্যভাষা আইনের রূপে শীর্ষবিন্দুতে উপনীত হয়। ১৯৫০এর মার্চে প্রথম প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়েছিল, এবং সেই বছর ১৬ জুলাই রাজ্যজুড়ে রাজ্যভাষা দিবস পালিত হয়। ভারত সরকারের সরকারি ভাষা আয়োগকে ১৯৫৫ সনে একটি স্মারকপত্র দেয় সভা,তাতে ১৯৬০-এর চরম সময় সীমা বেঁধে দিয়েছিল। এই নিয়ে নানা সময়ে মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহার উপরেও চাপ দিয়ে এসেছিল। ১৯৫৯-এর ১২ সেপ্টেম্বর দিনটি ভাষা দিবস হিসেবে পালন করে সভা। ‘রাজ্যিক ভাষা অসমিয়া’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে মন্ত্রীসভার সদস্য,অধ্যক্ষ,উপাধ্যক্ষ,বিধায়কদের মধ্যে বিতরণ করেছিল। সঙ্গে ‘Assam State Language’ নামের ইংরেজিতে একখানা বই ছাপার পরিকল্পনাও নিয়েছিল। ১৯ জুলাই ১৯৬০-এ এক প্রতিনিধি দল গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর সঙ্গেও দেখা করেন। ১৯৬০-এর ৪ এবং ৫ অক্টোবর একটি সর্বদলীয় সভা করেও সভা অসমিয়াকে সরকারি ভাষা করবার দাবি জোরালো করে।
দেখা যাচ্ছে,অসম সাহিত্য সভা ১৯৬০-এর ভাষা আন্দোলনের মূল হাল ধরেছিল।প্রচুর স্মারকপত্র,লেখালেখি ইত্যাদিতে দাবিটিকে সবল করেছিল,আর সফলও হয়েছিল। সভার দেওয়া স্মারকপত্র,পুস্তিকার পাতায় পাতায় এর প্রমাণ বর্তমান। কিন্তু অসম সাহিত্য সভা সমালোচনার থেকেও রক্ষা পেতে পারে না। ভাষার নামে এতো যে রক্তাক্ত সংঘর্ষ হলো, অসংখ্য নারী নির্যাতিতা হলেন,সভা নীরব দর্শক হয়ে থাকবার বাইরে কিছুই করল না। করবার ছিল বহু কিছুই। যে অনুষ্ঠান সমগ্র আন্দোলনকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল সেই সংগঠন মানুষজনকে নিয়ন্ত্রণ করে সংঘর্ষময় পরিস্থিতি উপশম ঘটাতে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত। কিন্তু হায়, এখানেই ব্যর্থ হলো অসম সাহিত্য সভা।
একটি কথা উল্লেখ করতে হবে যে সাহিত্যসভার কতকগুলো উগ্রজাতীয়তাবাদী কার্যকলাপ জনজাতিদেরও অসমিয়া সমাজ তথা সাংস্কৃতিক জীবন থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে উসকে দেয়। এই নিয়ে আমরা অসংখ্য নজির উপস্থাপন করতে পারি যদিও মাত্র একটি উদাহরণই যথেষ্ট। এই নিয়ে ১৯৬০-৬১-র সভার সভাপতি ত্রৈলোক্যনাথ গোস্বামী লিখেছেন এভাবে, ১৯৬০-এ তিনি অসম সাহিত্য সভার এক প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে নীলমণি ফুকন,যতীন গোস্বামীদের সঙ্গে শিলং গেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল অসমিয়া ভাষা প্রচার করাশিলঙে প্রথমে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চলিহার সঙ্গে দেখা করেন। বিমলাপ্রসাদ তাঁদের বলেন,অসমিয়া ভাষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনজাতি নেতৃত্বকে আস্থাতে নিয়ে আসতে। সেই কথাতে তাঁরা ‘সর্বদলীয় পার্বত্য সম্মেলনে’র নেতা ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসন সাংমার সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন। সাংমার বাড়িতে যা ঘটল এর পরে, সেই নিয়ে ত্রৈলোক্যনাথ গোস্বামী এভাবে লিখেছেন,“সাংমার বাড়িতে বেশ ক’জন পার্বত্য নেতা আলোচনাতে ব্যস্ত ছিলেন। আমরা গিয়ে পৌঁছোনোতে আলোচনা বন্ধ হলো। উইলিয়ামসন সাংমা আমাদের যাবার কারণ জিজ্ঞেস করাতে আমাদের মাঝের নীলমণি ফুকন বলতে শুরু করলেন। কিন্তু তাঁর কথা শেষ না হতেই উইলিয়ামসন গর্জে উঠলেন। বিধানসভার সদস্য হবার পরে পরেই একবার নীলমণি ফুকন বিধানসভাতেই বলেছিলেন, অসম রাজ্যটাই অসমিয়া। সেই কথাকে নিয়েই উইলিয়ামসন নীলমণি ফুকনকে আক্রমণ করে বললেন, অসমিয়া জাতির একজন নেতাই যদি এমন মনোভাব পোষণ করেন তবে পার্বত্যজাতির মানুষজন তাঁদের কী করে বিশ্বাস করেন? নীলমণি ফুকনও পালটে ধরেন। ফলে যে উদ্দেশ্যে পার্বত্য নেতাদের দেখা করে কথা বলতে গিয়েছিলাম তার প্রতি কোনো সহানুভূতিই পেলাম না।”

১৯৬০-এর সংঘর্ষ কি কংগ্রেসের অন্তর্কোন্দলের ফলশ্রুতি ছিল?
পুরো আন্দোলনকে হিংসাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যেতে কংগ্রেসের দলীয় সংঘাতের যে বিরাট অবদান ছিল সে কথা নানা উৎসের থেকে প্রমাণিত হয়েছে। তার কারণ ছিল প্রতাপী কংগ্রেসি নেতা দেবেশ্বর শর্মাকে মন্ত্রীসভার থেকে অপসারণ। পি এস পি চেষ্টা করেছিল কংগ্রেসকে অপদস্থ করতে এবং তাতে বহু কংগ্রেসিরও হাত ছিল। ৩৭
অসমের বহু কংগ্রেসি নেতা প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুকে জানিয়েছিলেন যে দেবেশ্বর শর্মাকে মন্ত্রীসভার থেকে সরাবার জন্যে তাঁর সমর্থকেরা চলিহা মন্ত্রীসভাকে বিপদে ফেলতে এই সংঘর্ষের নাটক রচনা করেছিলেন। ওদিকে জহরলাল নেহরুও সব দিক বিবেচনা করে দেবেশ্বর শর্মার বিরুদ্ধে সংসদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। এক সূত্রে মেলে, “Mr Nehru said he had heard some such thing that the person who was at that time the Education Minister had introduced him. He had since left the Government or was asked to leave. No doubt he was a somewhat disgruntled person and no doubt these things were encouraged by some persons who were opposed to the Chaliha Ministry” ৩৮
আসল সংকট দেখা দিয়েছিল ১৯৫৯ সনে যখন দেবকান্ত বরুয়া নগাঁওতে নির্বাচনে হেরেছিলেন। দেবকান্তপন্থীরা ভাবলেন যে দেবেশ্বর শর্মার  উসকানিতেই তিনি নির্বাচনে হেরেছেন। বিতর্ক শুরু হলে দেবেশ্বর শর্মাকে মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দিতে হয়। এই ঘটনার পরেই সংঘর্ষ শুরু হয়। ফলে দেবকান্ত বরুয়াপন্থীরা আবারও দাবি করলেন যে, দেবেশ্বর শর্মাকে যেহেতু মন্ত্রীসভার থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, তাই শোধ তুলতে চলিহা মন্ত্রীসভাকে অস্থির করতে তাঁরা এই রক্তাক্ত সংঘর্ষের সূত্রপাত করেছিলেন। তিনি নিজেই এই নিয়ে এভাবে লিখেছেন, “The same persons are trying to utilise the unfortunate language disturbance to bring me to disrepute.The local people know that I have done my best to avert the troubles, to ameliorate the condition of the distressed,and the service I have rendered towards rehabilitating the sufferers.Inspiration to certain newspapers in Calcutta have been provided, presumably, from the same newspapers in Assam, who have knowledge of my activities, will not subscribe to such views.
I consider the language disturbance with violence and destruction of property as both inhuman and anti national and I strongly resent any insinuation against me as encouraging their fiendish acts.” ৩৯
সে সময়ের সংঘর্ষগুলোতে অনেক অসমিয়া সরকারি কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমন কি উপায়ুক্ত, পুলিশ আধিকারিকেরাও জড়িত হয়েছিলেন।অভিযোগ উঠেছিল যে পুলিশ আধিকারিকেরা বিভিন্নভাবে আক্রমণকারীদের সহায় করেছিলেন। এই কর্মচারীদের উপরেও কংগ্রেসের দলীয় কোন্দলের প্রভাব পড়েছিলশোণিতপুর জেলার উপায়ুক্তের কার্যালয়ের কর্মচারী দুর্গেশ্বর শর্মা এবং আনন্দ হাজরিকা সম্পর্কে আন্দোলনে সরাসরি ভাগ নেবার বদনাম ছিল। তারা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াচ্ছিলেন যে চলিহা মন্ত্রীসভা অকর্মণ্য। দেবেশ্বর শর্মারাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তাই তাঁকেই অসমের মুখ্যমন্ত্রী মনোনীত করা চাই।” ৪০
সেই সময়কার মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চলিহার ভূমিকাও ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যায় যে রাজ্যভাষা প্রশ্নটিকে নিয়ে তিনি দ্বিধান্বিত ছিলেন। তিনি জানতেন যে অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র রাজ্যভাষা করলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সংশয় নেমে আসতে পারে। এমনটি করলে গোটা রাজ্যের বাঙালি, জনজাতি তথা অভিবাসী মানুষজন ক্ষেপে যাবেন। উল্লেখযোগ্য কথা হলো, তাঁর গৃহ-সমষ্টি শিবসাগর জেলার আমগুড়িতে পরাজিত হবার পর তাঁকে বরাক-উপত্যকার বদরপুর থেকে নির্বাচিত হতে হয়েছিল। সেই দরকারে তিনি বরাক-উপত্যকার বাঙালি মুসলমানদের নেতা মইনুল হক চৌধুরীর আশীর্বাদ লাভ করেছিলেন। তাই তিনি অবশ্যই ভেবেছিলেন যে অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যভাষা করতে গেলে যে সমষ্টি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই বদরপুরকেও হারাতে হবে। তবু অসম সাহিত্য সভার প্রবল চাপের ফলে অসম রাজ্যভাষা আইন প্রণয়ন করতে বিমলাপ্রসাদ চলিহা বাধ্য হলেন।

বাঙালি মাত্রেই ধোয়া তুলসি পাতা ছিলেন না:
প্রাসঙ্গিক বই
অসমিয়া বাঙালিদের মধ্যে এই দ্বন্দ্বের মধ্যে শুধুই অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদের সমালোচনা করে বাঙালিদের ধোয়া তুলসিপাতা বলে ছেড়ে দিলেও আলোচনাটি পুরোপুরি পক্ষপাত দুষ্ট হবে। একাংশ অসমিয়ার মতো, একাংশ বাঙালি বুদ্ধিজীবীও উগ্রজাতীয়তাবাদের জন্যে বেশ জনপ্রিয়। এদের প্ররোচনাতে শিলঙে ‘অসমিয়া ভাষা গাধার ভাষা’ বলে স্লোগান দেওয়া হয়েছিল।
বিখ্যাত বাঙালি পণ্ডিত নীরদ সি. চৌধুরী অসম বিদ্বেষী মনোভাবের জন্যে কুখ্যাত ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Continent of Circe’ বইতে এই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।  তিনি আবার অসমে অসমিয়া বাঙালির সংঘাত নে দেখে দেখেছেন বাঙালির সঙ্গে মোঙ্গলীয় আহোমদের। এ তাঁর আর্য অহমিকার নিদর্শন। তিনি লিখেছেন,“In Assam, there existed and still existed and still exist a good enmity between the Bengali settlers there and descendants of the Mongoliod Ahom Conquerors,Kinderd of the Shans of Burma,who invaded the country in the thirteenth century.In 1960 it burst out in open rioting in Brahmaputra valley. The Behaviours of the contemporary Ahoms was in striking contrast with that of the older Mongolians the hills... ৪১  তিনি সরকারের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন,“ Government which was predominates by Ahom.” তার উপরে তাঁর অন্যতম কুটিল কথাটি হলো, “ The mongoloid Ahoms only demons-trated the general law afresh.They had accepted Hindu Culture from Bengal and none but a madman will say that their language is not a dialectal offshoot of Bengali. Even the war cry is corrupt Bengali. But in recent years they have developed a very strong sense of an Assamese collective personality with they have also acquired a violent hatred for the Bengals, who brought them into the Hindu civilization, if not civilization itself. Had they remained the primitives that they were when they came like the Garos,Nagas,Khasis or Kukis, there certainly would not have been massacres among us Indians Cannibalism, in manner of speaking, is the product, not of, the savage state but of the civilized... ৪২
তাঁর এই বক্তব্য থেকে দুটি কথা অনুমান করতে পারি। প্রথমত তিনি আর্যদম্ভে টইটম্বুর। দ্বিতীয়ত অসম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার একটি বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছিলেন। এর থেকেও ভয়ঙ্কর কথাটি হলো,রঞ্জিত বরপূজারীর মৃত্যুর পরে মরণোত্তর প্রতিবেদন দিতে গিয়ে কলকাতার ডাক্তার মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই নিয়ে বরেণ্য সাহিত্যিক ড মহেন্দ্র বরা বিস্তৃত লিখেছেন। তাঁর ভাষাতে, “... সেদিন ড মেধি (ড জগদীশ মেধি) আমাদের বললেন, ‘কলকাতার ফরেনসিক এক্সপার্ট বলতে চাইছেন,রঞ্জিত বরপূজারীর মাথাতে বুঝি গুলি লাগাটাই সন্দেহজনক। কারণ মাথার ভেতরে তিনি বুলেট পান নি। মাথার পেছনের উঠোনো অংশে গুলি লেগে বেরিয়ে গেলে মাথার ভেতরে বুলেট পাবার সম্ভাবনা থাকে কি থাকে না? ছ্যাঁচড়ে গিয়ে গুলিটি ভেতরে না ঢুকেও চলে যেতে পারত কি না?’ তার পরে জিজ্ঞেস করব,‘ রঞ্জিত বরপূজারির মাথাটি পেছন থেকে যে ফোলা ছিলনা, সেরকম কোনো প্রমাণ কি তাঁর হাতে রয়েছে?’” ড মহেন্দ্র বরা লিখেছেন, ড জগদীশ মেধি মহেন্দ্র শালৈর হাতে মিউজিয়াম থেকে গুলি লাগা গোটা কয়েক মাথার খুলি আনালেন এবং সেগুলোর সহায় নিয়ে কলকাতার সেই বিশেষজ্ঞকে জেরা করা শুরু করলেন। ড মহেন্দ্র বরা কথাগুলো লিখেছেন এভাবে, “... খুলিগুলো টেবিলের উপরে সার বেঁধে রেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি স্বীকার করেন যে এভাবে মাথার পেছনদিকে কাত করে গুলি লাগলে, সেই গুলি ছ্যাঁচড়ে কোথাও গিয়ে পড়তে পারে?’ তিনি কথাগুলো স্বীকার করলে ড মেধি আবার প্রশ্ন করলেন, ‘অসমিয়া মানুষের মাথার পেছনদিক এভাবে উঠোনো থাকে না বলে দাবি করবার মতো কোনো যুক্তি কি আছে তাঁর কাছে? স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, রঞ্জিত বরপূজারি অসমিয়া ছিলেন।’ সেদিন এহেন জেরার পাল্লাতে পড়ে বিশেষজ্ঞ বড় নাস্তানাবুদ হয়েছিলেন। এরই মাছে অধিবক্তা জয় চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার পেশাগত যোগ্যতা কী?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘ এম বি বি এস।’ জয় চৌধুরী বললেন, ‘তাতেই ফরেনসিক রিপোর্ট! বেশ তো অভিনয়!’ কিন্তু নৌকো রাজার, কাদাতেও ছোটে।”
এখানে উল্লেখ করা উচিত হবে যে কলকাতার বিশেষজ্ঞ রিপোর্ট দিয়েছিলেন এই বলে যে রঞ্জিত বরপূজারি লোহার বেড়া ঝাঁপ দিয়ে পার করতে গেলে বেড়ার খুটার চোখা আগাতে তাঁর মাথা খোঁচা খায়। পরে পাকা মেঝেতে হোঁচট খেয়ে পড়েই তিনি মারা গেছিলেন। ৪৫  মহেন্দ্র বরা তাঁর ঘনিষ্ঠ ডাক্তার অক্ষয় দত্তের উপরে কিছু দুর্বৃত্ত শিলপুখুরির কাছে আক্রমণ করবার কথা লিখেছেন। অন্যদিকে সেই ঘটনার খানিক পরেই শিলপুখুরির গায়ে লেগে থাকা পশ্চিমদিকের রেলপাড়াতে কয়েক ঘর অসমিয়া মানুষের বাড়িতে হামলা হয়। তিনি আরো লিখেছেন, ১৯৬০-এর ঐ সময়টিতে প্রশাসনের কিছু ভেতরের আমলা এবং পুলিশের লোকে মিলে অসম বিরোধী এক চক্রান্ত শুরু করেছিলেন। এরই অংশীদার ছিলেন পুলিশ অধীক্ষক পাব্বি, যাঁর আদেশে ছাত্রদের উপর গুলি চলেছিল। পাব্বি প্রায়ই কটন কলেজের শিক্ষক এবং ছাত্রদের ভয় দেখাতেন। তিনি ছাত্রাবাসের অধীক্ষক ড হরিপ্রসন্ন দাসকে বলেছিলেন, দরকারে ৫০ জন ছাত্রকে গুলি করে ছাত্রদের শিক্ষা দিয়ে তিনি পিছিয়ে যাবেন না। ৮ জুলাই, ১৯৬০-এ তিনি ২নং ছাত্রাবাসের সামনের ছোট্ট একটি ঘরে সামান্য আগুনের রহস্য সন্ধানের নামে ১৫ জনের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুলিশ সঙ্গে নিয়ে ছাত্রাবাসের দক্ষিণ এবং পশ্চিমের রাজপথে ছাত্রদের সার বেঁধে দাঁড় করান। খানিক পরেই লোহার বেড়ার খোঁটাতে বন্দুকের নল রেখে ছাত্রদের দিকে গুলি চালালেন। ফলে রঞ্জিত বরপূজারীর করুণ মৃত্যু হয়, এবং  আরো নয়জন ছাত্র আহত হয়।
উল্লেখযোগ্য একটি কথা হলো,গুলি চালনার সময় কাছের টেলিফোন ভবনের উঠোনে একদল মানুষ জড়ো হয়েছিল, যারা গুলি চলতে দেখে বিকট উল্লাস ব্যক্ত করছিল।সন্দেহ করবার কারণ আছে, যে এদেরই কেউ কেউ সামনের বাড়িতে আগুন দিয়ে ষড়যন্ত্রকে কার্যকরী রূপ দিয়েছিল। তাদের কেউ পুলিশকে ফোন করে জানিয়েছিল,চারদিকে আগুন জ্বলছে বলে। ৪৬
রঞ্জিত বরপূজারীর হত্যার বিরুদ্ধে সবল স্থিতি নিয়ে লেখালেখি করবার জন্যে সাহিত্যিক মহেন্দ্র বরাকে কটন কলেজের চাকরি ছাড়তে হয়েছিল।

‘ইতিহাসে সকীয়াই’ গ্রন্থের লেখককে সাহিত্য সভার পুরস্কার:
অসমিয়া সাহিত্যের দুটি বিখ্যাত উসকানিমূলক সাহিত্য হলো ‘মাটি কার’ এবং ‘ইতিহাসে সকীয়ায়’ (ইতিহাসের হুশিয়ারি)। এই দুই বইয়েরই স্রষ্টা হিতেশ ডেকা। প্রথমটি ১৯৫০-এর সংঘর্ষের উপরে ভিত্তি করে এবং দ্বিতীয়টি ১৯৬০-এর ভাষা আন্দোলনের উপরে ভিত্তি করে লেখা। ১৯৬০-এর আগে পরে হিতেশ ডেকার এইসব কাজকর্ম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা আরম্ভ হয়েছিল। ‘মাটিকার’-এ হিতেশ ডেকা সাঁওতাল আদিবাসীদের ঢাল হিসেবে নিয়ে ব্যাপকভাবে ‘পমুয়া’ হত্যাতে উসকানি দিয়েছিলেন।অন্যদিকে ‘ইতিহাসে সকীয়াই’ উপন্যাসে ভয়ঙ্করভাবে বাঙালির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানিতে ভরা। এই উপন্যাসে অসমিয়া,হিন্দু বাঙালি,পমুয়া মুসলমান এবং জনজাতিদের অদ্ভুত সংযোজন ঘটিয়ে জাতি-ধর্ম সাম্প্রদায়িকতার পটভূমি তৈরি করা হয়েছিল। উপন্যাসে মইনুল হক চৌধুরীকে অনাহক চৌধুরী,নিকলস রায়কে নিউকেলাস,উইলিয়ামসন সাংমাকে আলেকজেণ্ডার সাংমা নামে চিত্রায়িত করা হয়েছে। দেখেই বোঝা যায় নামগুলো তাচ্ছিল্যসূচক। কিছু সময়ের জন্যে না হয় ধরেই নিলাম, কিছু বাঙালি অসম বিরোধী ষড়যন্ত্র করেছিলেন। কিন্তু জনগোষ্ঠীয় জনতার কী বা দোষ ছিল? মণিপুরি, খাসি,নাগা ইত্যাদি জনজাতি মানুষের উপর অসমিয়া ভাষা চাপিয়ে দিয়ে যারা চাইছিলেন তাঁরা তাদের উন্নয়ন –উত্তরণের প্রশ্নে সাধারণত নীরব ছিলেন। খাসি,মণিপুরি ইত্যাদি মানুষজন অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যভাষা হিসেবে চাইতেন কি চাইতেন না  --এর সঙ্গে দীর্ঘ সব ঐতিহাসিক প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। এই প্রশ্নগুলো অনুন্নয়ন,বঞ্চনা, শোষণ,জাতিভেদ,ধর্মীয় ইত্যাদি বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। এই সমস্ত কিছু লুকিয়ে রেখে তিনি পার্বত্য মানুষজনকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে অসমিয়াদের বিপক্ষে ‘ভিলেইন’ সাজাতে গিয়ে ভয়ঙ্কর অনিষ্ট সাধন করলেন।  
এই উপন্যাসের দুই চারটি সংলাপের নজির দিলেই পাঠক বুঝতে পারবেন। শিলং শহরে মি.মুখার্জি এবং মি.নিউকেলাসের মধ্যে গোপন সভা চলছে। মি.নিউকেলাস ব্যগ্র হয়ে জিজ্ঞেস করছেন,
“বুদ্ধি মি.মুখার্জি? বলুন আমরা কী করতে পারি?
জবাবে মি.মুখার্জি বললেন---গুয়াহাটি সিভিল হাসপাতালের এক খাসিয়া নার্সকে অসমিয়া গুণ্ডা অপহরণ করে অত্যাচার করেছে বলে মিথ্যে খবর একটি তুলে দিতে পারলেই পুরো শিলং গরম হয়ে উঠবে আর খাসিয়ারা প্রতিশোধ নেবার জন্যে শিলঙের অসমিয়াদের যেখানে পাবে সেখানেই ধরে পিটবে। এই ফন্দিটি বেশ কাজে আসবে কিন্তু।
নিউকেলাস জবাব দিলেন,সাব্বাস বুদ্ধি আপনার। আমরা আজকেই আলোচনা করে গুয়াহাটিতে লোক পাঠাব। আপনি বেশ ভালো পরামর্শ দিলেন। ধন্যবাদ মুখার্জিবাবু।” ৪৭
এমনই হিতেশ ডেকার নিম্নরুচির উসকানিমূলক সাহিত্যের নমুনা। কিন্তু অবাক হবার বিষয় এই যে এই হিতেশ ডেকাকেই অসম সাহিত্য সভা ১৯৯৫-র অধিবেশনে সভাপতির আসন দিয়ে পুরস্কৃত করে।
রেভা. জে. জে. এম. নিকলস রায় অসমের সমতলের মানুষের থেকে উদার মানসিকতা এবং আন্তর্জাতিক ধ্যান-ধারণা আশা করেন বলে জানালে রামধেনুর সম্পাদক (১৯৫১-৫২) কীর্তিনাথ হাজরিকা রামধেনুর পৃষ্ঠাতে ‘উত্তরপুব সীমান্তর নীহারিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে ‘ব্রুটাস তুমিও’ বলে বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়েছিলেন। কীর্তিনাথ হাজরিকাও অসম সাহিত্য সভার সভাপতি হয়েছিলেন।

১৯৬০-এ অম্বিকাগিরি অসমিয়া মানুষের হাতে আক্রান্ত হলেন :
অমলেন্দু গুহ,দেবব্রত শর্মারা যেমন অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরীকে বিশ্লেষণ করেছেন,তেমনি অন্যরকম করে মহেন্দ্র বরা, রমেশ কলিতারাও করেছেন। মহেন্দ্র বরা লিখেছেন যে তিনি অম্বিকাগিরিকে বহুদিন খুব কাছে থেকে পেয়েছিলেন। তিনি চরমভাবে অসম প্রেমী ছিলেন। ফলে ধীরে ধীরে তাঁর মনে উগ্রজাতীয়তাবাদ পাখা মেলে। তিনি অস্থির এবং আবেগিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই নিয়ে আমরা আগেই আলোচনা করেছি। তিনি যুক্তিগত আলোচনার থেকে অস্থির আলোচনাকে গুরুত্ব দেওয়াতেই হয়তো রঘুনাথ চৌধুরী তাঁকে ‘উন্মাদ’ বলে আখ্যা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।অন্যদিকে অম্বিকাগিরিকে কঠোর সমালোচনা করলেও দেবব্রত শর্মার মতো গবেষক কিন্তু তাঁকে নীলমণি ফুকনের মতো উগ্রজাতীয়তাবাদের সঙ্গে একই সারিতে রাখতে চান নি। এর পেছনে ক্ষমতার কথাটি জড়িয়ে আছে। প্রায়ই বাঙালিদের যেমন খুশি গালি দিলেও অম্বিকাগিরি কিন্তু ১৯৬০-এ অসমিয়া কিছু মানুষের রোষে পড়েছিলেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন মহেন্দ্র বরা। তিনি লিখেছেন, ১৯৬০-এর ৭ জুলাই একদল উন্মত্ত অসমিয়া মানুষ অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরীর বাড়ি ঘিরে ধরে আক্রমণ করতে উদ্যত হলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল অম্বিকাগিরি দুটি বাঙালি পরিবারকে তাঁর বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন। তৎক্ষণাৎ মহেন্দ্র বরা অম্বিকাগিরির বাড়িতে এলেন।  দেখলাম প্রায় শ তিনেক লোক দল বেঁধে চেঁচাচ্ছে,“বাঙালিদের বের করে দিন,নইলে বাড়ি জ্বালিয়ে দেব।” কেউ একজন বললেন,‘দেখলেন? ইনিই আবার আমাদের বড় বড় বক্তৃতা করে এগুলো শেখালেন। আর এখন নিজেই দুই ঘর বাঙালিকে নিজের বাড়িতে ঢুকিয়ে রেখেছেন। তাদের বের করে না দিলে বাড়িটাকেই জ্বালিয়ে দেব।” অম্বিকাগিরি বললেন,”দেখো বাবা। এরা আমার আশ্রয় চেয়ে এসেছেন। তার উপর একটি মেয়ের জ্বর। আমি তাঁদের কী করে বা নিরাশ করি?” মহেন্দ্র বরা দলটির ভেতরে জনাকয় ছাত্রকে দেখতে পেলেন। জন দুই জোর করে ঘরে ঢুকতে চাইলে অম্বিকাগিরি বললেন, “সেসব হবে না। আপনাদের আমার মৃতদেহের উপর দিয়ে গিয়ে আমার আশ্রিত পরিবার দু’টিকে ছুতে পারবেন।” তখন মহেন্দ্র বরা সাহস করে অম্বিকাগিরির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,“অম্বিকাগিরির শরীরে হাত দেবার আগে আমার শবদেহের উপর দিয়ে পার হয়ে যেতে হবে।” ঠিক সেই সময় একটি পুলিশের গাড়ি এল, আর মহেন্দ্র বরা গাড়িটি থামালেন। তারপর দারোগা ভদ্রলোক অনেক বুদ্ধি-কৌশল করে লোকগুলোকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন। ঠিক সেই সময় মহেন্দ্র বরা চেনেন,এমন একজন বললেন,“ওদের পুলিশের সঙ্গে পাঠাবার আগে একবার আমাদের সামনে বের করে দিন। আমরা কথা দিচ্ছি, মেয়েদের গায়ে হাত দেব না।” অম্বিকাগিরির দিকে বাঁকা করে তাকিয়ে বলল,“ দেরি করবেন না। করলে আপনারই ক্ষতি হবে।” পুলিশ অনেক কষ্টে মানুষগুলোকে বের করে নিয়ে গেল। যাবার পথে উন্মাদ মানুষগুলো তাদের গায়ে দুই ঘা দেবার চেষ্টাও করেছিল। হায়! অসমিয়া মানুষজন এতোই জিঘাংসু? এতোই উন্মত্ত? প্রশ্নটি হলো, এহেন উন্মাদনার সারিতে নিয়ে যেতে অম্বিকাগিরি ‘বাঙালিয়ে দেশ খেলো’ বলে যে ভাষণগুলো দিচ্ছিলেন তার কি কিছুই অবদান ছিল না? সত্যি বলতে কি সে দিন উগ্রজাতীয়তবাদের পথিক অম্বিকাগিরি মানবতাবাদী অম্বিকাগিরি কাছে হার মেনেছিল।

১৯৬০-এর সংঘর্ষ-কালীন ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ এবং শরণার্থীর সমস্যা :
এই তথ্যগুলো আমরা নিয়েছি অসম রাজ্যিক মহাফেজখানার ১৯৬০-এর ‘Correspondence Relating to Language Riots,1960’ শীর্ষক নথির থেকে। এই সময়ে লুটপাট, ঘরজ্বালানো ইত্যাদি বহু অপ্রীতিকর কার্যকলাপের জন্যে রাজ্যের বহু মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছিলেন।  তাই তাঁদের পুনর্সংস্থাপনের জন্যে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। সেজন্যে সরকার প্রত্যেক আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিশ্চয়তার আধারে ১০০০ টাকা করে ঋণ দেবার ব্যবস্থা করেছিল। সঙ্গে ঋণ আদায়ের নিশ্চয়তার জন্যে সমমূল্যের স্থাবর সম্পত্তিকে বিবেচনাতে নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে যাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের দরকারি সামগ্রী কেনার জন্যে ঋণের সঙ্গে আরো ৫০টাকা সাহায্য মূল্য হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। নথিটিতে সংশ্লিষ্ট সচিব আক্রান্ত জেলাগুলোতে পাঠাবার পুনঃসংস্থাপন অনুদান এবং ঋণের একটি তালিকা দিয়েছেন। তালিকাটি এই:
জেলা                  পুনঃসংস্থাপন অনুদান            পুনঃসংস্থাপন ঋণ
১)   কামরূপ                     ১,২৫,০০০.০০ টাকা             ১২,৫০,০০০.০০ টাকা
২)   দরং                             ২৫,০০০.০০ টাকা              ২,৫০,০০০.০০ টাকা 
৩)   নগাঁও                           ৫০,০০০.০০ টাকা              ৫,০০,০০০.০০ টাকা      
৪)   শিবসাগর                       ২৫,০০০.০০ টাকা              ২,৫০,০০০.০০ টাকা      
৫)   লখিমপুর                       ৩০,০০০.০০ টাকা              ৩,০০,০০০.০০ টাকা      
৬)   গোয়ালপাড়া                   ৩০,০০০.০০ টাকা              ৩,০০,০০০.০০ টাকা   
-----------------------------------------------------------------------------
                 মোট             ২,৮৫,০০০.০০ টাকা             ২৮,৫০,০০০.০০ টাকা
  
       এখানে একটি কথা স্পষ্ট করা ভালো যে তালিকাতে উল্লেখ করা জেলাগুলো ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সেকালীন অবিভক্ত জেলা। যেমন তালিকার শিবসাগর জেলার মানে হচ্ছে এখনকার শিবসাগর, যোরহাট এবং গোলাঘাট। এখন মূল কথাটি হলো তালিকাতে উল্লেখিত অনুদান এবং ঋণের পরিমাণ দিয়ে জেলাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির তীব্রতার বিষয়ে সহজে অনুমান করতে পারি। সেই অনুসারে সবচাইতে বেশি অনুদান এবং ঋণ প্রদান করতে হয়েছিল কামরূপ জেলাতে। এই জেলাতে ঋণ –অনুদান মিলিয়ে মোট পরিমাণ ছিল তেরো লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকা। তার মানে এই জেলাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেরকম দ্বিতীয়
স্থানে রয়েছে নগাঁও। সেই জেলার জন্যে নির্ধারিত ঋণ এবং অনুদান ছিল মোট পাঁচ লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। তৃতীয় স্থানে রয়েছে লখিমপুর এবং গোয়ালপাড়া জেলা। ঋণ এবং অনুদান মিলিয়ে এই দুই জেলার প্রতিটির জন্যে ধার্য হয়েছিল তিন লাখ ত্রিশ হাজার করে। অন্যদিকে চতুর্থ স্থানে রয়েছে শিবসাগর এবং দরং জেলা। এই দুই জেলার জন্যে ধার্য হয়েছিল সব মিলিয়ে দুই লাখ পঁচাত্তর হাজার করে। পারিসাংখ্যিক গণনার দ্বারা বিশ্লেষণ করতে পারি যে কেবল কামরূপ জেলাতেই নগাঁও বাদ দিয়ে দরং, শিবসাগর, লখিমপুর, গোয়ালপাড়া জেলার সর্বমোট ধার্য টাকার চেয়েও বেশি টাকা ধরা হয়েছিল। এই দিয়েই বোঝা যায় কী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সেই জেলাতে হয়েছিল। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে সব মিলিয়ে ৩১,৩৫,০০০ টাকা ঋণ এবং অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। সচিব সংশ্লিষ্ট সব জেলা উপায়ুক্তদের প্রকৃত আক্রান্তদের শনাক্ত করতে এবং ১৯৬০-এর ১লা আগস্টের মধ্যে প্রদত্ত সমস্ত ঋণ ও অনুদানের তথ্য সংগ্রহ করে রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
            এই পুরো ঘটনাতে চার হাজার তিনশ বিরাশী (৪,৩৮২) জন লোককে গ্রেপ্তার করা হয়। তারই তিন হাজার তিনশত বিরানব্বই জন লোককে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। আমাদের উল্লেখিত নথিটি যখন তৈরি হচ্ছিল তখনো নয়শত নব্বুই (৯৯০) লোক আটকাধীন হয়েছিলেন।


উপসংহার        :
১৯৬০-এর ভাষা আন্দোলন থেকে আজ ৫৯ বছরে অসম কী পেল, কী হারালো সেসব পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করবার সময় এসে গেছে। বৃহৎ অসম ভেঙে চুরমার হলো,তার পরেও উগ্রজাতীয়তাবাদের পরিণাম হিসেবে অসম দেখতে পেল বীভৎস সব গণহত্যা।জাতি এবং সম্প্রদায়,ভাই ভাই,ধর্মে ধর্মে অনেক দ্বন্দ্ব সংঘাত দেখল। এই সবই কি আগেকার বপন করা বিষবৃক্ষের ফল নয়?  ইতিহাস সাক্ষী একটি জাতি বা একটি ভাষাকে হত্যা-নিপীড়ন, হিংসাত্মক আগ্রাসন দিয়ে মহীয়ান করা যায় না। মহীয়ান করা যায় শুধু ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে। ইংরেজি ভাষা আজকের দুনিয়াতে সবচাইতে উন্নত এবং সবাই সম্মানে গ্রহণ করে নেওয়া ভাষা। ইংরেজি ভাষার এই রূপ পাবার মূলে কেবল এই কারণই নেই যে সেক্সপীয়র তাঁর মহান সৃষ্টিগুলো ইংরেজিতে লিখলেন আর পুরো বিশ্বে ইংরেজরা উপনিবেশ বিস্তার করলেন। এর অন্য আরো বহু কারণ রয়েছে। তাই সব বাঙালিকে অসম থেকে তাড়িয়ে দিলেই অসমিয়া ভাষাটি মহান হয়ে যাবে, আর হয়ে যাবে সুরক্ষিত—এমন ভাবাটি ভ্রান্ত ধারণার বাইরে কিছুই নয়। এখনো অসমে ভাষাকে নিয়ে রাজনীতি চলছেই চলছে। এতো রক্তক্ষয়ী আন্দোলন হলো, তারপরেও আজকের অসমিয়া মধ্যবিত্ত নিজের ভাষাকে পিঠ দেখাচ্ছেন কেন? অপ্রিয় সত্য এই যে আজকের মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিজেদের ছেলেমেয়েদের জীবন অসমিয়া মাধ্যমে সুরক্ষিত নয় বলেই ভাবেন। সেসময়ের আন্দোলনকারীদের উত্তরসূরিদের কজনার সন্তান অসমিয়া মাধ্যমে পড়াশুনা করেন তাও আজ বিচার করবার বিষয়। একটি ভাষা তো আর শুধু ভাষা নয়, একটি জাতির উত্তরণের মাপকাঠি। গেল ৫০ বছরে অসমিয়া ভাষাকে বিশ্বমুখী করবার জন্যে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো? এই সমস্ত প্রশ্নের জবাব অসম সাহিত্য সভাকে দিতে হবে। আপাত দৃষ্টিতে ১৯৬০-এর সেই ভয়াবহ আন্দোলন উগ্রজাতীয়তাবাদ, সুবিধাবাদ,আর ঘৃণার রাজনীতি ছাড়া দেয়নি কিছুইবৃহৎ অসম ভেঙে যাবার পরেও, বাকি অসমে জাতি ধর্মকে নিয়ে অশান্তি তো আছেই,উন্নয়ন,বেকার সমস্যা,বন্যা,কৃষি ইত্যাদি সমস্যাগুলোও চাপা পড়ে রইল। এগুলোর জায়গা নিল ঘনান্ধকার ক্ষমতালোভী রাজনীতি। নতুন প্রজন্ম কামনা করে অসম সাহিত্য সভার মতো অনুষ্ঠানগুলো অসমিয়া জাতি ও ভাষার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করুক। কিন্তু কামনা করে না কোনো জাতীয় অনুষ্ঠান দাদাগিরি করুক, করুক মাস্টারি। অসমিয়া ভাষাকে যদি বিশ্ব দরবারে যেতে হয় তবে তাকে অন্যকে আদরে কাছে টেনে নেবার গুণ অর্জন করতে হবে। বন্ধুত্ব আর ভ্রাতৃত্ববোধের বন্ধনরশিকে দীর্ঘ করে যেতে হবে।আমরা জানি না, বুঝিও না যে অন্য ভাষিক সম্প্রদায়ের নারীদের ধর্ষণ করলে,ছেলে-মেয়েকে হত্যা করলে অসমিয়া ভাষা বিশ্বের কোন শিখরে বা গিয়ে পৌঁছুবে। উগ্রজাতীয়তাবাদের প্রথম সর্ত হলো বলেই ‘কল্পনাপ্রসূত শত্রু’ সৃষ্টি করে আমরা মহীয়ান হবো বলে ভাবার দিন গেছে। ‘বাঙালি বিদ্বেষ আর অসমিয়া ভাষার সংকট’ বিতর্কটি এতোই বৃহৎ যে এক প্রবন্ধে তা লিখে শেষ হবার মতো বিষয় নয়। কিন্তু পাঠক জেনে সুখী হবেন যে অসমের ইতিহাস সম্পর্কে যোরহাটের মলৌআলির জাতীয়ভবনে ‘অসমের সম্পূর্ণ জাতীয় ইতিহাস’ নামে একটি বৃহৎ প্রকল্প চলছে। ১৯৬০-এর রক্তাক্ত পরিস্থিতি এবং ভাষার রাজনীতি সম্পর্কে প্রায় ১০ জন জাতীয় ইতিহাস কর্মী ভারত থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তথ্য আহরণে ব্যস্ত আছেন। খুব শীঘ্রই ১৯৬০-এর ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আরো বিস্তৃত বিবরণ আপনারা বই আকারে পড়তে পাবেন।

পাদটীকা :
১) পদ্মনাথ গোহাঞিবরুয়ার রচনাবলী, ১৯৮৭, গুয়াহাটী, অসম প্রকাশন পরিষদ, পৃঃ ৮৮৪-৮৮৫
২) বর্মণ, শিবনাথ আৰু প্রসেঞ্জিৎ চৌধুরী; বাস্তব নে বিভ্রম—অসমত বাংলা ভাষা প্রবর্তনৰ ঐতিহাসিক উৎস সন্ধান,  ১৯৮৬, ডিব্রুগড়, স্টুডেন্টস এম্পোরিয়াম, পৃষ্ঠা ২৮
৩) শর্মা, বেণুধর (সম্পা.), হেমচন্দ্র গোস্বামীর রচনাবলী, ১৯৭২, যোরহাট, অসম সাহিত্য সভা, পৃষ্ঠা ১২৬
৪) গোস্বামী, যতীন্দ্রনাথ; হেমচন্দ্র বরুয়া রচনাবলী, গুয়াহাটী, হেমকোষ প্রকাশন, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৫৫
৫) শর্মা, দেবব্রত; অসমীয়া জাতি গঠন প্রক্রিয়া আরু জাতীয় জনগোষ্ঠীগত অনুষ্ঠান সমূহ (১৮৭৩-১৯৬০), ২০১০, যোরহাট, একলব্য প্রকাশন, পৃষ্ঠা ১৭১
৬) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৭১।
৭) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৭৪।
৮) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৭৪।
৯) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৭৫।
১০) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৭৬।
১১) বিশ্বাস, সুকুমার; আসামে ভাষা আন্দোলন ও বাঙালী প্রসঙ্গ, ১৯৪৭-১৯৭১, ২০১৭, কলকাতা, পারুল; পৃষ্ঠা ১।
১২) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ২।
১৩) NMML Papers : Brief Details of Disturbances, Submitted by A.K.Nag, General Secretary, Cachar Journalist Association, 23-08-60, Silchar.
১৪) বিশ্বাস, সুকুমার; পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৩১।
১৫) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৩৩।
১৬) NMML Papers; ibid. Page 329
১৭) বিশ্বাস, সুকুমার; পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৩৭।
১৮) Home Confidential (1960): Commission of enquiry into the police firing at Guwahati. File no—PLAC 359/60/pt-iii.
১৯) বিশ্বাস, সুকুমার; পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৩৭।
২০) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৪১।
২১) NMML Papers; ibid. Page 389.
২২) ibid.
২৩) ibid. Pg 386
২৪) ibid. Pg. 389.
২৫) বিশ্বাস, সুকুমার; পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৪৮।
২৬) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৫২।
২৭) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ৪৪৫-৪৫৬।
২৮) শর্মা, দেবেশ্বর; হেরাই যোয়া দিনবোর; যোরহাট, ১৯৯১; জনমভূমি প্রেস; পৃষ্ঠা ৫২-৫২১
২৯) বিশ্বাস, সুকুমার; পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৪০।
৩০) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৪১।
৩১) NMML Papers; ibid. Page 387.
৩২) ibid.
৩৩) ibid.
৩৪) ibid. Pg. 389.
৩৫) ibid. Pg. 387.
৩৬) শর্মা, দেবব্রত; পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ২৫১।
৩৭) বিশ্বাস, সুকুমার; পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৫০।
              ৩৮) NMML Papers; ibid. Pg. 338.
                ৩৯)ibid. Pg.  339.
৪০) Assam Commissioner (1960): State Language issue. Complaints against Government Servants who took part in the Disturbances. File No C.416/60/pt.ii
৪১) Choudhury, Nirad Ch; The Continent of Circe, 1987. Bombay; Jaico Publishing House; pg. 36.
                ৪২) ibid. Pg. 37.
                ৪৩) কলিতা, রমেশ চন্দ্র; তত্ত্ব তথ্য ইতিহাস আরু বিতর্ক; ২০১৪, গুয়াহাটি; আখর প্রকাশ; পৃষ্ঠা ২২৪।
                ৪৪) বরা, মহেন্দ্র; উপলা নদীর দরে, ২০০৫, ধেমাজি, কিরণ প্রকাশন; পৃষ্ঠা ২৪৭-২৪৮।
                ৪৫) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ২৪২।
                ৪৬) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ২৪২।
৪৭) পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ২৪২।
৪৮) হিতেশ ডেকার রচনাবলী; দ্বিতীয় খণ্ড, ২০০৫; গুয়াহাটি; চন্দ্র প্রকাশ; পৃষ্ঠা ৬৫-৬৬।
৪৯) শর্মা, দেবব্রত; পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ১৮৫।
৫০) বরা, মহেন্দ্র;পূর্বোক্ত; পৃষ্ঠা ২৪৮-২৫০।
৫১) Assam State Archive: Correspondence Relating to Laguage Riots, 1960.