আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Showing posts with label Nationalism. Show all posts
Showing posts with label Nationalism. Show all posts

Wednesday, 16 April 2014

আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান, সমাজভাষা বিজ্ঞান এবং রবীন্দ্রনাথ



( ২৮, ২৯ জুন,২০১১ গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় আলোচনাচক্রে পাঠ করবার জন্যে) 
          পাণিনির ব্যাকরণকে আজকাল গোটা বিশ্ব দাবি করে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের, এমন কি চমস্কি প্রবর্তিত রূপান্তরমুলক সৃজনমূলক ভাষাবিজ্ঞানেরও আদিগ্রন্থ। এটি যেমন আমাদের পক্ষে গৌরবের তেমনি এ আমাদের এক সর্বনাশেরও কারণ। আমরা জানি, এর পর ভারতে যতগুলো ব্যাকরণ লেখা হয়েছে সেগুলো ওই পাণিনি ব্যাকরণেরই টীকাভাষ্য। দার্শনিক মতপ্রস্থান অনুযায়ী কেউ কেউ টীকাভাষ্যের বয়ানে, গ্রহণ বর্জনে রকমফের ঘটিয়েছেন কিন্তু মূলগত ভাবে সেগুলো পানিনি ব্যাকরণেরই উত্তরভাষ্য বলা চলে। পালি-প্রাকৃত ভাষারও ব্যাকরণ যে কয়টি লেখা হয়েছে সেগুলোতেও তার ব্যত্যয় হয়নি। এমন কি প্রথম যে প্রাকৃত ব্যাকরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে সেই হেমচন্দ্রের ‘সিদ্ধহেম শব্দানুশাসনে’ও তাই আর সেটি রচিত হচ্ছে প্রাকৃতের বয়স সহস্রাব্দ পার করাবার পর খ্রীষ্টীয় একাদশ দ্বাদশ শতকে। ততদিনে প্রত্ন বাংলাও   দেখা দিচ্ছে , চর্যাপদের কবিতাগুলো লেখা হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বাংলা ব্যাকরণ বা অভিধানের জন্যে যে আমা

বাংলা শব্দতত্ত্ব

দের ১৭৩৪ খৃস্টাব্দে  পোর্তুগীজ পাদ্রি মনোএল দ্য আসসুম্পসাউ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে তাতে অবাক হবার কিছু নেই।
          মনোএলের ‘ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেনগল্লা, ই পোর্তুগিজঃ দিভিদিদো এম দুয়াস পার্তেস’ নামে বইটি ১৭৪৩এ পোর্তুগালের রাজধানী থেকে ছেপে বেরোয়। পাণিনির দেশে এইটিই ছিল বাংলা ভাষার ভাষাচিন্তা সংক্রান্ত প্রথম বই। আজকের পরিচিত মান বাংলাভাষাতেও লেখা নয় বইটি। বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার অদূরে বর্তমানে গাজীপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত, তৎকালীন ভাওয়াল পরগণার বাংলা ভাষার  উপর ভিত্তি করেই মনোএল লিখেছিলেন এই বই। কিন্তু পরে যেটি বাংলা লেখার ভাষা সাধুভাষা হিসেবে গড়ে উঠবে তার প্রবণতাও এর মধ্যে দেখা যাচ্ছিল। যে সাধুভাষার দীর্ঘ  ক্রিয়াপদগুলো মূলতই ছিল পূর্ববাংলার উপভাষাগুলোর থেকে নেয়া। কিন্তু সেই ভাষাকেই শ্রীরামপুর মিশনের সময় থেকে  সংস্কৃত শব্দবহুল প্রায় সংস্কৃত করে ফেলবার এতো বেশি আয়োজন হলো যে বঙ্কিম থেকে রবীন্দ্রনাথের যুগ অব্দি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের এক প্রস্তুতির বেলা আমাদের কাটাতে হলো। মনোএলের পর মাঝের এই প্রায় দেড় শতকে এই বাংলা ভাষাতে দেশি বিদেশি পণ্ডিতেরা অজস্র ব্যকরণ এবং অভিধান লিখেছেন। কিন্তু সেগুলো ছিল হয় ইংরেজি নতুবা সংস্কৃত ব্যাকরণ এবং অভিধানের ছাঁচে ঢালা। এর বাইরে ভাষাতত্ব নিয়ে আমাদের ভাবনা এগুলোই না।  কারণ, কৃত্তিবাস থেকে ভারত চন্দ্রের এক দীর্ঘ সময় কাল পার করে এলেও ঔপনিবেশিক সূত্রে পাওয়া ইংরেজি আমাদের সম্পদ বাড়ালো যেমন, বিপদেও তেমনি জড়ালো অনেক বেশি, অনেক জটিল করে। আমরা আবার নতুন করে অবিশ্বাস করতে শুরু করলাম যে বাংলাভাষা দিয়ে ভদ্র সমাজে দুটো কাজের কাজ চালানো যেতে পারে। সেই অবিশ্বাস বর্জনের কাজটা বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমেরা কিছুদূর এগিয়ে দিলেন। কিন্তু যাকে বলে কোমরে কাছা বেঁধে নেমে পড়া সে কাজটা প্রথম করলেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার প্রথম ভাষাবিজ্ঞানী

   আমরা বিদ্যালয় শিক্ষকরা অন্তত সবাই জানি  সাধুভাষাকে ‘সুয়োরানী’ অবিধা দিয়ে বিশ শতকের শুরুতে প্রতিস্থাপিত করেছিলেন যে দুই বিশাল ব্যক্তিত্ব তাঁদের অন্যতম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অনেকের ধারণা মূল কাজটি করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী। রবীন্দ্রনাথের মতো বিশাল ব্যক্তিত্বকে সঙ্গে নিয়ে আসলে তিনি তাঁর কাজটাকে সহজ করে নিয়েছিলেন।তাতে মিথ্যে কিছু নেই। কিন্তু, তাতে এই ধারণা হয় যে সাহিত্যে অদ্বিতীয়মেধার পুরুষ হলেও ভাষার উপর সেই জোর বোধহয় রবীন্দ্রনাথের ছিল না। সত্য হলো, ভারতবর্ষে ভারতীয়ের মধ্যে  আধুনিক ভাষাতত্বের  সূচনাটাই হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের হাতে। বাংলা ১৩০০ সনে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ স্থাপিত হলে পরের বছর থেকে নিয়মিত বেরোতে থাকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা । বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক উন্নতি এর উদ্দেশ্য ছিল বটে, কিন্তু ভাষার ক্ষেত্রে এর লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল  সংস্কৃত এবং ইংরেজি শাসিত প্রথাগত বাংলা ব্যাকরণের অনুশাসন থেকে বাংলাকে মুক্ত করা। রমেশচন্দ্র দত্ত এর প্রথম সভাপতি ছিলেন। নবীন চন্দ্র সেন এবং রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রথম সহ-সভাপতি । সংগঠকদের কেউই প্রথাগত ভাবে ভাষাত্বাত্বিক ছিলেন না। তবু এই পত্রিকাতেই যে সব লেখা বেরোতে থাকে তাতেই পরবর্তী বাংলা ভাষা চিন্তার গতিপথ নির্ণীত হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর যেভাবে তাতে ‘উপসর্গের অর্থ বিচার’,  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেভাবে ‘বাংলা উচ্চারণ’, ‘বাংলা কৃৎ এবং তদ্ধিত প্রত্যয়’ বিচার করতে শুরু করেন  তাতে এখনো স্কুলপাঠ্য বইয়ের প্রচ্ছদে নাম দেখা যায় এমন বহু ব্যাকরণবিদকে লজ্জা দেবার পক্ষে যথেষ্ট। রবীন্দ্রনাথের ‘শব্দতত্বে’র নিবন্ধগুলো সেখানেই প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হবার আগে এগুলো সভ্যদের মাসিক অধিবেশনে  পড়া এবং আলোচনা করা হতো।   বাংলা প্রত্যয় সম্পর্কিত আলোচনাতে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সঙ্গে মিলে তিনিও বেশ কিছু প্রাদেশিক শব্দ সংগ্রহ করে সেগুলোর বিশ্লেষণ করেছিলেন। ১২ আশ্বিন, ১৩০৮ এর পঞ্চম অধিবেশনে তাঁর পঠিত সেই নিবন্ধ   শুনে পুরাতন পন্থীদের বৈয়াকরণিক এবং রবীন্দ্রবিরোধী পক্ষের ভাষাচিন্তাবিদ সতীশ চন্দ্র বিদ্যাভূষণও বলেছিলেন, “ শাস্ত্রী মহাশয় এবং রবীন্দ্রবাবু বাংলাভাষার প্রকৃতি নির্ণয়ে যেরূপ পরিশ্রম করিতেছেন, তাহাতে তাঁহাদিগকে বাংলাভাষার পাণিনি বলিলেই হয়। ১ এই পাণিনিদ্বয়ের একজন হরপ্রসাদ শাস্ত্রীযে দশক দুই পরে ‘চর্যাপদ’  আবিষ্কার করে বাংলাভাষা চর্চার খোলনলচে পালটে দেবেন এটা সম্ভব করেছিল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের এহেন উদ্যোগ। ‘চর্যাপদ’ কালিক ভাষাচিন্তার থেকে বাঙালি ভাষা চিন্তকদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে যায় কালানুক্রমিক এবং ঐতিহাসিক ভাষাতত্বের দিকে আর সম্ভব করে সুনীতিকুমারের মতো আশ্চর্য প্রতিভার আবির্ভাব। সেই সুনীতি কুমারও রবীন্দ্রনাথ এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের কথা বলতে গিয়ে তাঁর প্রথম বিখ্যাত গ্রন্থের (ODBL) মুখবন্ধেই লিখেছেন, “ ...But the first Bengali with a scientific insight in to attack the problems of the language was the poet Rabindranath Tagore…” সুনীতি কুমার আজীবন বহুবার রবীন্দ্রনাথের কাছে তাঁর ঋণ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।ঐ মুখবন্ধেই তিনি আরো লিখেছেন, “...it is flattering for the votaries of Philology to find in one who is the greatest writer in the language, and a great poet and seer for all time, a keen philologist as well, distinguished alike by an assiduous  enquiry into the facts of the language and by a scholarly appreciation of the methods and findings of the modern western philologist. The work of Rabindranath in the shape of a few essays (now collected in one volume) on Bengali phonetics, Bengali onomatopoetics, and on the Bengali noun, and other topics, the earliest of which appeared in the early nineties, and some fresh papers appeared only several years ago. These papers may be said to have shown to the Bengali enquiring into the problems of his language the proper lines of approaching them.”     তাঁর অনুগামী সুকুমার সেন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লিখেছেন, “ ভাষাবিজ্ঞানের সূত্র ধরিয়াই রবীন্দ্রনাথ আধুনিক বাঙ্গালাভাষার উচ্চারণরীতির এবং ব্যাকরণের কোনো জটিল সমস্যার বিশ্লেষণ ও সমাধান করিয়াছিলেন। ...এই প্রবন্ধগুলির কথা মনে রাখিলে রবীন্দ্রনাথকে বাঙ্গালী ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রথম বলিতেই হয়।” ২

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ , কালিক ভাষাবিজ্ঞান  এবং রবীন্দ্রনাথ
          মনোএলের বইটি অবশ্যি, ধর্মীয় আবহের বাইরে তেমন প্রচারে মুখ দেখেনি। প্রথম যে ব্যাকরণের নাম আমরা বেশ ঘটা করে জানি সেটি  ১৭৭৮এ প্রকাশিত ন্যাথনিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেডের ‘ এ গ্রামার অফ দি বেঙ্গল ল্যাংগুয়েজ’ । এর খ্যাতি জড়িয়ে আছে এর মূদ্রণ ইতিহাসের সঙ্গে। পঞ্চানন কর্মকার এর জন্যেই ধাতুতে প্রথম বাংলা হরফ ঢালাই করে প্রথম একটা আদর্শ দাঁড় করিয়েছিলেন। এর পরের বই ১৭৯৯ এবং ১৮০২তে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হেনরি পিটস ফরস্টারের ‘এ ভোকাবুলারি, ইন টু পার্টস , ইংলিশ অ্যাণ্ড বোংগালি অ্যাণ্ড ভাইস ভার্সা।’ এই শেষের বই দুটি পরে বাংলা ব্যাকরণ এবং অভিধানের এক ঐতিহ্য তৈরি করে।  প্রচুর বাঙালিও সমগ্র উনিশ শতক জুড়ে ব্যাকরণ এবং অভিধান রচনা করতে থাকেন। কিন্তু ভাষাতত্বের চর্চা এর বাইরে বেরোয় নি। নিতান্তই ব্যবহারিক প্রয়োজনে এগুলো লেখা হতো। আদর্শ হিসেবে বিদেশিরাই মূলত ইংরেজি ব্যাকরণ আর পাণিনিভাষ্যকে মান্য হিসেবে নিয়ে নিয়েছিলেন। বাঙালিরাও এর বাইরে বেরোবার দরকার বোধ করেননি। এ সময়ে ভাষাটাকেই তাঁরা প্রায় সংস্কৃততুল্য করে ফেলছিলেন। এনিয়ে বঙ্কিমই প্রথম কলম ধরেছিলেন তাঁর ‘বাঙ্গলা ভাষা’ প্রবন্ধে। তাঁর এই কথাগুলো স্মরণ করুন, “...সংস্কৃত প্রিয়তা এবং সংস্কৃতানুকারিতা হেতু বাঙ্গালা সাহিত্য অত্যন্ত নীরস, শ্রীহীন, দুর্বল এবং বাঙ্গালা সমাজে অপরিচিত হইয়া রহিল...।” সমস্ত মহত্ব নিয়েও পাণিনি ব্যাকরণ তার দরকারেই এক অনুশাসনিক ধারা গড়ে তুলেছিল। তেমনি ইংরেজিতে জনসনের অভিধানও এক রক্ষণশীল অনুশাসনিক ধারা গড়ে তুলেছিল আঠারো শতেকের মাঝামাঝি সময় থেকেই (১৯৫৫)। এর সঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসনের রাজনৈতিক সূত্রও অনেকে জুড়ে থাকেন।  অনুশাসনিক ধারাকে প্রত্যহ্বান জানালো যে ‘অক্সফোর্ড অভিধান’ তার কাজ শুরু হয়েছিল মাত্র উনিশ শতকের শেষে ১৮৮৪তে , আর শেষ হয় ১৯২৮এ।
            
           আঠারো শতকের শেষের দিকে ভারতের রাজধানী শহর কলকাতাতে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠার সভাতে উইলিয়াম জোনসের বক্তৃতাতে যদিও কালানুক্রমিক ভাষাতত্বের সূচনা হয়েছিল এই ধারা এরপরে দীর্ঘদিন কেবল ইউরোপেই সমৃদ্ধ হয়। এর কিছু উড়ো উড়ো খবর বরং বাঙালিদের মধ্যে এই বিশ্বাসকে দৃঢ় করছিল যে ‘সংস্কৃত বাংলা ভাষার জননী’ । ঐ উনিশ শতকের শেষের দিকে জন বীমস, জ্যুল ব্লক, গ্রিয়ার্সন আর হ্যর্নলের কাজগুলোর মধ্য দিয়েই শুধু বাঙালি প্রথম এর সঙ্গে পরিচিত হয়। রবীন্দ্রনাথ এদের আদি পুরুষ। সুনীতি কুমার এরপর পূর্ণ প্রথম পুরুষ।
           ফার্দিনান্দ দ্য সস্যুরেরCourse in General Linguistics(১৯১৬)  বইটি তখনো বেরোয় নি । কালিক ভাষাবিজ্ঞানের সঙ্গে পৃথিবী তখনো পরিচিত হয় নি। সুনীতিকুমারের ভাষা অধ্যয়ন এরপরে ভারতে এক দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের ঐতিহ্যের সূচনা করবে। ভাবতে অবাক লাগে রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সহকর্মীরা তখনি কালিক ভাষা অধ্যয়নের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের স্বাক্ষর রাখবেন। অথচ দুই ধারার মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না। আগেকার বৈয়াকরণিক আর আভিধানিকদের গভীর বিশ্বাস ছিল যে সংস্কৃতই বাংলার জননী, আর সংস্কৃত ব্যাকরণই এর আদর্শ।  শ্রীনাথ সেন যেমন লিখছেন তাঁর ‘প্রাকৃত ব্যাকরণ এবং অভিধানে’, “ বাঙ্গলা ভাষা সংস্কৃত ব্যাকরণের দ্বারা প্রশমিত হইতে পারে এবং তাহা হইলেই ইহার কল্যাণ” তিনি আরো স্পষ্ট করেই লিখছেন, বাংলা ব্যাকরণ,” সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুষঙ্গী হইতে পারে, স্বতন্ত্র ব্যাকরণ হইতে পারে না।” সুতরাং দ্বিজেন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথ দুই ভাই এবং সাহিত্য পরিষদের অপরাপর বিদ্বজ্জনেরা সেই কাজগুলোই করলেন যেগুলো করলে বাংলাকে বাংলা বলে দাঁড় করানো যায়। কেরি যেখানে লিখেছিলেন বাংলার তিন চতুর্থাংশ শব্দ সংস্কৃত, সেখানে ‘বাংলা ভাষা পরিচয়ে’ গিয়ে  রবীন্দ্রনাথ লিখে ফেললেন, “বানানের ছদ্মবেশ ঘুচিয়ে দিলেই দেখা যাবে, বাংলায় তৎসম শব্দ নেই বললেই হয়।”ব্যাকরণের প্রচলিত উপাত্তগুলোকেই ধরে ধরে তাঁরা সমালোচনা শুরু করলেন, আর দেখিয়ে গেলেন সংস্কৃতের থেকে বাংলার তফাৎটা কোথায়। এই করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে দেখা গেল অসমিয়া-ওড়িয়া সহ আশেপাশের বেশকিছু  ভাষা নিয়েও তুলনামূলক আলোচনাও করে নিতে।  হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘চর্যাপদে’র আবিষ্কারটাও মোটেও আকস্মিক ছিল না। তাও ছিল বাংলার ‘বাঙ্গালি’ত্ব আবিষ্কার প্রয়াসের অংশ মাত্র। সুনীতিকুমার যে এর পরে বাল গঙ্গাধর তিলকের সংস্কৃতের ‘পাঁচ হাজার বছরের’ বয়সের দাবির অযাথার্থ্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মাগধি অপভ্রংশ বলে বাংলার এক অকৃত্রিম জননী আবিষ্কার করে ফেললেন   তাও ঐ সময়ের দাবিই ছিল। উল্লেখ করা ভালো যে, সুনীতি কুমার যদিও তাঁর গবেষণার কর্ম করেছিলেন লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর আগে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি পেয়ে বাংলা ধ্বনিতত্ব নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাঁর তখনকার গবেষণা পত্রের বিচারক ছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। 
আধুনিক ভাষা অধ্যয়নে রাবীন্দ্রিক  ধারা এবং  পরবর্তী বন্ধুর পথ
          সুনীতি কুমার যদিও শুধু বাংলাতেই নয় গোটা ভারতেই আধুনিক ভাষাতত্ব চর্চার যুগান্তর নিয়ে এলেন, কিন্তু এলেন মুলত তাঁর ইংরিজেতে লেখা বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থটি দিয়ে। ফলে তাঁর পদ্ধতি এবং ভাষামাধ্যম দুটোরই গভীর প্রভাব পড়ল ভাষাতাত্বিকদের উপর। ভারতীয় উপ মহাদেশে অধিকাংশ ভাষাচর্চা এখনো হয় ইংরেজিতেই। আর দীর্ঘদিন তাঁরা মূলত বুঁদ হয়ে রইলেন কালানুক্রমিক ভাষাতত্বের চর্চাতে। রবীন্দ্রনাথ যে ধারার সূচনা করেছিলেন সেই পথে ঘুরে গেলেন অতি অল্পই। কালিক ভাষাতত্বের চর্চা শুরু হলো বাংলাদেশে মুহম্মদ আব্দুল হাই সম্পাদিত ‘সাহিত্য’পত্রিকা (১৯৫৭) এবং ‘বাংলা একাডেমী পত্রিকা’কে (১৯৫৭) কেন্দ্র করে। হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, “পরের দশকগুলোতে দেখা যায় কলকাতার মুক্তি ঘটেনি, কিন্তু ঢাকা এগিয়ে গেছে, আয়ত্ত্ব করেছে আধুনিক ভাষাতত্বের প্রণালী পদ্ধতি...”   ৩এই কথাকে সমর্থণ করছেন রামেশ্বর শ্ব। লিখছেন, “বাংলাদেশে মুহম্মদ শহীদুল্লাহের পরে আধুনিক কালে যেসব গবেষণা হয়েছে তা  অধিকাংশই বর্ণনামূলক (Descriptive) বা রূপান্তরমূলক সৃজনমূলক ( Transformational Generative) ব্যাকরণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, ঐতিহাসিক ভাষাতত্বের চর্চা বিশেষ চোখে পড়ে না।”৪ হুমায়ুন আজাদ আক্ষেপ করে লিখেছেন, “ সুনীতি কুমার, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ও সুকুমার সেন বাঙলা ভাষা ও শব্দের ইতিহাস অনেকটা আলোকিত করেন; এবং এমন একটি ধারণার সৃষ্টি হয় বাঙলা ভাষাঞ্চলে যে ভাষার বিবর্তন বর্ণনাই ভাষাতত্ব। এ সময়ে বাঙলা ভাষা সম্পর্কে বর্ণনামূলক কাজ বিশেষ হয় নি, যা হয়েছে তার ওপরও অপ্রতিরোধ্য প্রভাব ফেলেছে ইতিহাস। আমাদের কালানুক্রমিক ভাষাতাত্বিকেরা যখন বাঙলা ভাষার ব্যাকরণ লিখেছেন, তখন তাঁরা স’রে যেতে পারেন নি প্রথাগত পথ থেকেঃ তাঁরা অনুসরণ করেছেন প্রথাগত ইংরেজি ও সংস্কৃত ব্যাকরণপ্রণেতাদেরঃ এবং কালানুক্রমিক উপাত্তের সাহায্য নিয়েছেন সমকালীন বাঙলা ভাষা ব্যাখ্যা –বর্ণনায়।” ৫
             শহীদুল্লাহের সমালোচনাতে হুমায়ুন আজাদ বেশ কঠোরই । লিখেছেন, তিনি এবং সমকালীন অন্যেরা তাঁদের ব্যাকরণে, “ ধ্বনিপ্রকরণ পরিচ্ছেদে মিশিয়ে দিয়েছেন সংস্কৃত ও কালানুক্রমিক ধ্বনিতত্ব, এবং দিয়েছেন বাঙালা ধ্বনিশৃঙ্খলার এলোমেলো বিবরণ।”৬ আমাদের এখনকার প্রচলিত একটি ব্যাকরণ থেকে উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে। ঠাকুর ভ্রাতৃদ্বয় এবং তাদের সহকর্মীরা কতটা এগিয়ে ছিলেন সময়ের থেকে। আমাদের হাতে ছিল রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাক্তন বাংলা বিভাগীয় প্রধান ড০ নির্মল দাসের বই ‘ভাষাবীথি’। বইটি অসম মাধ্যমিক শিক্ষা  পরিষদের অনুমোদিত ব্যাকরণ বই। এর উপসর্গের  সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি শুরুতেই লিখছেন , “ যে ‘অব্যয়’ শব্দ ধাতুর আগে বসে ধাতুর সঙ্গে মিশে ধাতুকে অবলম্বন করে অর্থযুক্ত শব্দের সৃষ্টি করে ঐ সব  অব্যয়কে বলা হয়ে থাকে উপসর্গ।”  তিনিই লিখেছেন, “ সংস্কৃত ভাষায় বৈয়াকরণেরা এই সঙ্গা নির্দেশ করে গেছেন...” অতএব, বাংলা ভাষাতেও “খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে ‘আসমুদ্র’ শব্দের ‘আ’ হলো শুদ্ধ অব্যয়, উপসর্গ নয়।” ( পৃঃ  ১৫৬) এবারে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ উপসর্গের অর্থ বিচারে’ সংস্কৃত বা ইংরেজি কোনো সংজ্ঞার ধারে কাছেও যান নি। সোজা লিখেছেন, বাংলা ‘নি’ উপসর্গে হাড়ে হাড়ে অনুপ্রবিষ্ট অর্থ বোঝায়, ‘আ’ উপসর্গে তার বিপরীতে বোঝায় ‘উপর উপর সংলগ্ন হওয়া”। ‘নি’র ইংরেজি অর্থ দিয়েছেন, ‘inhere’, ‘আ’এর adhere’। এবং তাঁর মতে  ‘আসমুদ্র পৃথিবী’ কথার অর্থ—‘যে পৃথিবীর অন্তভাগ সমুদ্রের সঙ্গে সহিত সংলগ্ন’৭   এবারে এই সহজ ছাত্র বোধ্য ব্যাখ্যাতে পাণিনি পতঞ্জলিদের অনুমোদন রয়েছে কিনা তার ধারে কাছেও তিনি যান নি। এই প্রবন্ধের বিরোধীতা করে লিখেছিলেন রাজেন্দ্র চন্দ্র শাস্ত্রী। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বড়দাদার সমর্থণে কলম ধরে লিখেছিলেন, “ শ্রীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় তাঁহার প্রবন্ধে ব্যাপ্তিসাধন প্রণালী দ্বারা (generalization) উপসর্গের বিচিত্র ভিন্ন অর্থের মধ্য হইতে আশ্চর্য নৈপুন্য সহকারে এক মূল অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করিয়াছেন। এ সম্বন্ধে এই প্রথম চেষ্টা।”৮ ‘আ’ উপসর্গ সম্পর্কে তিনি লেখেন, “ আ উপসর্গের অর্থ নিকট সংলগ্নতা; ইংরেজি উপসর্গ a( aback, asleep, জর্মান an ( ankommen অর্থাৎ আগমন), লাটিন ad, ইংরেজি অব্যয় at সংস্কৃত আ উপসর্গের প্রতিরূপ” এই অব্দি সব ঠিকই আছে। কিন্তু এর পরেই লিখছেন, “ এই নৈকট্য অর্থ সংস্কৃত ভাষায় স্থিতি এবং গতি অনুসারে আ এবং অভি এই দুই উপসর্গে বিভক্ত হইয়াছে। যাহা নৈকট্য প্রাপ্ত হইয়াছে তাহা আ এবং যাহা নৈকট্যের চেষ্টা করিতেছে তাহা অভি উপসর্গের দ্বারা ব্যক্ত হয়।” এবারে এই প্রণালীতে সংস্কৃত ব্যাকরণে আলোচনা হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন , “জানি না... কথা এই যে তাহারা যাহা স্থির করিয়াছেন তাহা প্রত্যক্ষ না থাকায় তাঁহাদের কথা আমরা মানিয়া লইতে পারি, পরখ করিয়া লইতে পারি না।”
ভাষাবিজ্ঞানের রবীন্দ্রনাথের কাজ
          
         তথ্যগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করলাম এই সংকেত দিতে যে কেন আমাদের দৃষ্টি রবীন্দ্রনাথ থেকে ঘুরে গেল। কথাগুলো স্পষ্ট হবে যদি রবীন্দ্রনাথের কাজের পরিচয় তুলে ধরা যায়। ‘শব্দতত্বে’ রচনাগুলো আগেই লিখেছি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সূচনালগ্নে লেখা। কতকটি তার আগেই লেখা, কতকটি তারপরে। ১২৯২ থেকে ১৩১১ এই প্রায় দুদশক ধরে লেখা হয়ে ১৩১৫তে ( ইং ১৯০৯) বই হিসেবে বেরোয়। লেখাগুলো বেরিয়েছিল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা ছাড়াও বালক, সাধনা, ভারতী পত্রিকাতে। তার রচনা তালিকাটি এরকমঃ ১) বাংলা উচ্চারণ, (১২৯২) ২) স্বরবর্ণ ও, ৩) স্বরবর্ণ এ, ৪) টা টো টে, (১২৯৯)৫) বীমসের বাংলা ব্যাকরণ, ৬) বাংলা বহুবচন, ৭) সম্বন্ধে কার, (১৩০৫) ৮) বাংলা শব্দদ্বৈত, ৯) ধ্বন্যাত্মক শব্দ, (১৩০৭)১০) বাংলা কৃৎ ও তদ্ধিত, (১৩০৮) ১১) ভাষার ইঙ্গিত (১৩১১) আরো কিছু লেখা গ্রন্থবদ্ধ হবার সময় বাদ পড়লেও, ১২৫তম জন্মজয়ন্তীতে বিশ্বভারতীর প্রকাশিত সুলভ সংস্করণের সৌজন্যে আমাদের দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ১৩০৫ এ লেখা ‘ভাষা বিচ্ছেদ’এর মতো প্রবন্ধও রয়েছে যেখানে তিনি অসমিয়া ওড়িয়াকে স্বতন্ত্র ভাষা বলে দাঁড় করাবার প্রয়াসে আক্ষেপ প্রকাশ করছেন। এছাড়াও আছে, ১) একটি প্রশ্ন (১২৯২), ২) সংজ্ঞাবিচার, (১২৯২), ৩) ‘নিছনি’ (১২৯৯), ৪) ‘পঁহু’  ( ১২৯৯), ৫) প্রত্যুত্তর, পঁহু প্রসঙ্গ ১ ( (১২৯৯) এবং ২ (১২৯৯)  ৬) উপসর্গ সমালোচনা  (১৩০৬), ৭) প্রাকৃত ও সংস্কৃত (১৩০৮), ৮) বাংলা ব্যাকরণ (১৩০৮),  ৯) বিবিধ  (১৩০৫-১৩১২) , ১০) বাংলা ক্রিয়াপদের তালিকা (১৩০৮) । অবশ্যি রবীন্দ্রনাথের জীবৎকালেই ১৩১৫র পরের কালের ভাষাবিষয়ক লেখাগুলো নিয়ে ১৩৪২ এ ‘শব্দতত্বে’র দ্বিতীয় সংস্করণ বেরোয়, আমাদের আলোচ্য রচনাবলীতে কোনো কারণবশত সেগুলো অন্তর্ভূক্ত হয় নি। তৃতীয় আরেকটি বৃহৎ সংস্করণ বেরিয়েছে ১৩৯১ সনে। সম্পাদকেরা এর বিন্যাসব্যবস্থাপনার জন্যে সুকুমার সেনের উপদেশ শিরোধার্য করেছিলেন। সেটিও আমাদের দেখা হয় নি।
         তেইশটি অধ্যায়ে সম্পূর্ণ ‘বাংলাভাষা পরিচয়’ একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। ১৯৩৮এ এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছেপে বের করে। ততোদিনে ভাষাচার্য রূপে স্বীকৃত সুনীতি কুমার চট্টপাধ্যায়কে উৎসর্গ করেন এটি  বইটি নিজেই একটা অসামান্য ব্যাকরণ বলে বিবেচিত হতে পারত। কিন্তু সেটি, প্রণালীবদ্ধ ছিলনা। বিজনবিহারী ভট্টাচার্য তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন এই বইটিকে ভাষাবিজ্ঞানের ভূমিকা হিসেবে নিয়ে যেন তিনি সেই পথে কাজ আরম্ভ করেন। উত্তরে তিনি লেখেন, “...মানুষের মূর্তির ব্যাখ্যা করবার ভার যে নিয়েছে তাকে তুমি মানুষের শরীরবিজ্ঞানের উপদেষ্টার মঞ্চে দাঁড় করাতে চাও...” ৯  । এই বইতে দেখা মিলবে ভারতের প্রথম সমাজ ভাষাবিজ্ঞানীরও বটে। কিন্তু তাতে আমরা পরে আসব।
           বস্তুত দুটি নয়, ‘ছন্দ’ নিয়ে তিনটি বইতে এবং আরো বেশকিছু প্রবন্ধ এবং চিঠি পত্রে ছড়িয়ে আছে তাঁর ভাষা চিন্তা। ‘ছন্দ’ সম্পর্কেও প্রবোধ চন্দ্র সেন এবং অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের সশ্রদ্ধ উক্তিগুলো আমরা জানি। অমূল্যধন বরং তিনি কেন ‘পদ্ধতিগত ভাবে পূর্ণাঙ্গ’  আলোচনাতে হাত দিলেন না তাই নিয়ে আক্ষেপই করেছেন। কিন্তু যেটুকু করেছিলেন তাই ছিল তাঁদের পথের দিশা। আমরা বর্তমান আলোচনাতে ‘ছন্দ’প্রসঙ্গ টানব না পরিসরের কথা ভেবে।
 অনুশাসনিক ব্যাকরণ -অভিধানের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ
       ‘শব্দতত্ব’ থেকে আমরা বাংলা প্রত্যয় সংক্রান্ত প্রবন্ধটিকে আপাপত তুলে নেব। এর এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। ড০নির্মল দাস পূর্বোক্ত ‘ভাষাবীথি’ তে লিখেছেন, “ যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি ক্রিয়ামূল অর্থাৎ ধাতুর উত্তর এবং শব্দমূল অর্থাৎ প্রতিপাদিকের উত্তর যুক্ত করে নতুন শব্দ গঠন করা হয় তাঁকে বলে প্রত্যয়।” এই উত্তরগুলো কিন্তু ছাত্রদের কাছে অনুচ্চারিতই রয়ে গেল ‘ধাতু, প্রতিপাদিক’ শব্দগুলোর মানে কী। সেগুলোকে নাহয় পারিভাষিক শব্দবলে ছেড়েই দেয়া গেল, তাই বলে ‘উত্তর’ কথাটার অর্থতো ছাত্ররা একটাই জানে যে জিনিসটা লেখা খুবই কঠিন, নোট না দেখে কিছুই বলা যাবে না। ওদিকে আজ কিন্তু অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন ‘প্রত্যয়’ না বলে ‘পরসর্গ’ বলা যাবে না কেন, কেন উপসর্গকে বলা যাবে না, পুরোসর্গ? তাই বোধহয় রবীন্দ্রনাথ বাংলা উচ্চারণ নিয়ে আলোচনাতে  বিলেতে তাঁর সংগৃহীত শব্দাবলী হারিয়ে যাওয়ার গল্প শোনাতে গিয়ে এক জায়গাতে লিখছেন, “ ...বুড়ার খেলা বুড়ার পুতুলের জায়গা ছেলের খেলা ছেলের পুতুল অধিকার করিয়া বসিল। প্রত্যেক বৈয়াকরণের ঘরে এমনই একটি করিয়া মেয়ে থাকে যদি, পৃথিবী হইতে সে যদি তদ্ধিত প্রত্যয় ঘুচাইয়া তাহার স্থানে এইরূপ ঘোরতর পৌত্তলিকতা প্রচার করিতে পারে, তবে শিশুদের পক্ষে পৃথিবী অনেকটা নিষ্কণ্টক হইয়া যায়।” প্রত্যয় নিয়ে এ রসিকতা মাত্র ছিল না। তা বোঝা যাবে তাঁর ‘বাংলা কৃৎ ও তদ্ধিত’ প্রবন্ধটি পড়লে।
     এর আগে রবীন্দ্রনাথ ‘আইঢাই, আঁকুবাকু, আনচান, ইলিবিলি’ ইত্যাদি বিশেষণ এবং ক্রিয়াবিশেষণগূলো বাংলা অভিধানে কেন স্থান পায়নি আক্ষেপ জানিয়ে একটি দীর্ঘপ্রবন্ধ লেখেন, সেগুলোর উপর আলোচনা করেন। প্রবন্ধটির নাম ‘ধন্যাত্মক শব্দ’। শব্দগুলো নিজেই তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। শেষে পরিষদের অন্যদেরকেও বিশুদ্ধ বাংলা শব্দসংগ্রহে নেমে পড়বার আহ্বান জানালে ব্যাপক সাড়া মেলে। এই কাজে তাঁর ঘনিষ্ট সহযোগী ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। শব্দগুলো সংগ্রহ হতে থাকলে এগুলো ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ শ্রেণিবিন্যাসের সমস্যা উঠে আসে। স্বভাবতই ব্যাকরণ বিতর্কও দেখা দেয়। তাতে অন্যদের মধ্যে দুটো দুর্মূল্য প্রবন্ধ লেখেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এবং রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী। হুমায়ুন আজাদ প্রথমজন সম্পর্কে লিখেছেন, “শাস্ত্রী একটু বেশি পরিমাণেই ছিলেন বাংলাপন্থী—রবীন্দ্রনাথ ও রামেন্দ্রসুন্দরে যে ভারসাম্য ও গভীরতা বিদ্যমান, তা নেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বাংলাভাষাবোধে, কিন্তু তিনি প্রথাগত বাংলা ব্যাকরণের ত্রুটিগুলো , অন্তত বাহ্যিক ত্রুটিগুলো, বেশ ভালোভাবেই শনাক্ত করেছিলেন।” ১০ রামেন্দ্রসুন্দর সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, “রামেন্দ্রসুন্দর এ –প্রবন্ধে ( বাঙ্গলা ব্যাকরণ) ব্যাকরণ সম্পর্কে এমন কিছু ধারণা ব্যক্ত করেন, যা পাশ্চাত্যেও উন্মেষিত হয় কয়েক দশক পরে—সাংগঠনিক ও রূপান্তরমুলক সৃষ্টিশীল ভাষাতাত্বিকদের রচনায়। তিনি যে ব্যাকরণের কথা বলেন, তা প্রথাগত –আনুশাসনিক নয়, তা বর্ণনামূলক। তাঁর মতে, ‘ভাষার গঠনপ্রণালীতে কতকগুলি নিয়ম আছে। শব্দের গঠনে পদের গঠনে ও বাক্যের গঠনে এইরূপ নিয়ম আবিষ্কারই ব্যাকরণের উদ্দেশ্য।”১১ । কিন্তু এঁরা কেউই পূর্ণাঙ্গ বই লিখে রেখে গেলেন না। এই যে ‘নিয়ম আবিষ্কারই ব্যাকরণের উদ্দেশ্য’ -- এর প্রেরণা কিন্তু পরিষদের মাসিক অধিবেশনগুলো। এই অধিবেশনগুলোতে তর্কবিতর্কের পরিণামে পঞ্চম অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রত্যয় নিয়ে প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  এই প্রবন্ধে তাঁর সহযোগী ছিলেন, ব্যোমকেশ মুস্তফী। মুস্তফীর আলাদা প্রবন্ধটিও রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধের পরিশিষ্টরূপে পরিষদের পত্রিকাতে ছাপা হয়েছিল।
        যদিও তিনি সারা বাংলার শব্দসংগ্রহেই নেমেছিলেন, এবং সেকালেই ভাবতেন “বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন অংশে যতগুলি উপভাষা প্রচলিত আছে তাহারই তুলনাগত ব্যাকরণই যথার্থ বাংলার বৈজ্ঞানিক ব্যাকরণ।” ১২ তবু এই প্রবন্ধের আলোচিত শব্দগুলোর বানানে কলকাতার উচ্চারণ অনুসরণ করেছিলেন। কারণ তখন , “ বাংলাদেশের অপরাপর বিভাগের উচ্চারণকে প্রাদেশিক বলিয়া গণ্য করাই সংগত।”১৩ এতেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে পরে তিনি কলকাতার ভাষাকেই  মানভাষাতে চালু করবার দিকে এগুবেন। তখনো কিন্তু প্রমথ চৌধুরী তাঁর সঙ্গ নেন নি। ইতিমধ্যে শতাধিক বাংলা অভিধান বেরিয়ে গেলেও শুরুতেই তিনি লিখছেন, “ আজ পর্যন্ত বাংলা অভিধান বাহির হয় নাই।” ইঙ্গিতটা এখানেও স্পষ্ট। পরিভাষার সমস্যা নিয়ে বলতে গিয়ে লিখছেন, “ সংস্কৃত ব্যাকরণের পরিভাষা বাংলা ব্যাকরণে প্রয়োগ করা কীরূপ বিপজ্জনক তাহা মহামহোপাধ্যায় শাস্ত্রীমহাশয় ইতিপূর্বে ব্যাখ্যা করিয়াছেন।” নতুন পরিভাষা নির্মাণে নিজের অক্ষমতার কথা জানিয়েও শুরু করছেন এই বলে, “সংস্কৃত ব্যাকরণে যাকে ণিজন্ত ধাতু বলে বাংলায় তাহাকে ণিজন্ত বলিতে গেলে অসংগত হয়; কারণ সংস্কৃত ভাষায় ণিচ প্রত্যয় দ্বারা ণিজন্ত ধাতু সিদ্ধ হয়, বাংলায় ণিচ প্রত্যয়ের কোনো অর্থ নাই।”১৪ তিনি একে নৈমিত্তিক ধাতু নাম দিচ্ছেন। এবং সেরকম প্রত্যয়যুক্ত শব্দকে সোজা ‘অন’ প্রত্যয়ের শ্রেণিতে  মাতন, কাঁদন, গড়ন, ইত্যাদি শব্দের তালিকা তৈরি করছেন পরে। অথচ ‘ভাষাবীথি’র লেখক এযুগে দাঁড়িয়েও দিব্ব্যি এমন শব্দ  বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছেন এরকম, পঠ-ণিচ+অন=পঠন, ধৃ-ণিচ+অন= ধারণ। ১৫ তাঁর অধি-আপি+(ণিচ)+অন=অধ্যাপনকেতো বাংলা বলে চেনাই মুস্কিল।  এগুলোকে তিনি অবশ্যই বাংলা ব্যাকরণে সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয়ের তালিকাতে দেখাচ্ছেন। এই নিয়ে তখনি রবীন্দ্রনাথ লিখছেন বাংলা প্রত্যয়গুলোর মধ্যে, “কোনগুলি প্রকৃত বাংলা ও কোনগুলি সংস্কৃত, তাহা লইয়া তর্ক উঠিতে পারে। সংস্কৃত হইতে উদ্ভূত হইলেই যে তাহাদের সংস্কৃত বলিতে হইবে, এ কথা মানি না। সংস্কৃত ইন প্রত্যয় বাংলায় ই প্রত্যয় হইয়াছে, সেইজন্য তাহা সংস্কৃত পূর্বপুরুষের প্রথা রক্ষা করে না। দাগি (দাগযুক্ত ) শব্দ কোনো অবস্থাতেই দাগিন হয় না।  বাংলা অন্ত প্রত্যয় সংস্কৃত শতৃ প্রত্যয় হইতে উৎপন্ন, কিন্তু তাহা শতৃ প্রত্যয়ের অনুশাসন লঙ্ঘন করিয়া একবচনে জিয়ন্ত ফুটন্ত ইত্যাদিরূপ ধারণ করিতে লেশমাত্র লজ্জিত হয় না।”১৬  এবারে ‘ভাষাবীথি’র লেখক কী কাণ্ড ঘটিয়েছেন দেখা যাক। তিনি মহ+শতৃ=মহৎ, জাগৃ+শতৃ= জাগৃৎ এমন নজির দিয়ে এইটুকুন লিখেছেন, এগুলোর বাংলাতে স্বাধীন ব্যবহার নেই, সমাসবদ্ধ হয়ে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তার পরেই বিড়ম্বনা। দুটো বাক্যে শব্দগুলোর নজির টেনেছেন –১) সাধু ব্যক্তি সর্বদা মহৎ ব্যবহার করেন; ২) তুমিতো জাগ্রৎ-অবস্থায় স্বপ্ন দেখিতেছ। এর কোনোটিতেই সমাস নেই। আর হলন্ত ‘জাগ্রৎ’ যে কী বস্তু বোঝাতে শিক্ষকেরও ঘাম ঝরে যাবে এটি নিশ্চিত, ছাত্র কী ছার! রবীন্দ্রনাথ সরাসরিই বাংলা ‘ৎ’ প্রত্যয়ের উল্লেখ টেনে মানৎ, বসৎ থেকে শুরু করে সুড়ুৎ,  ফুড়ুৎ এমন সব শব্দকেও ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আমরা আশা করতেই পারি ছাত্রদের সেগুলো দিলে তারা ‘পটাৎ’ করে হজম করে নিয়ে সুবোধ বালক হয়ে দেখিয়ে দিত ।
রবীন্দ্রনাথের মতে , “হিন্দি পারসি প্রভৃতি হইতে বাংলায় যে সকল প্রত্যয়ের আমদানি হইয়াছে , সে সম্বন্ধেও আমার ঐ একই বক্তব্য। সই প্রত্যয় সম্ভবত..হিন্দি বা পার্শি ; কিন্তু বাংলা শব্দের সহিত তাহা মিশ্রিত হইয়া ট্যাঁকসই, প্রমাণসই, প্রভৃতি শব্দ সৃজন করিয়াছে। ওয়ান প্রত্যয় সেরূপ নহে দারোয়ান, পালোয়ান শব্দ আমরা হিন্দি হইতে পাইয়াছি,প্রত্যয়টি পাই নাই। অর্থাৎ যেসকল প্রত্যয় সংস্কৃত অথবা বিদেশীয় শব্দসহযোগে বাংলায় আসিয়াছে, বাংলার সহিত কোনো প্রকার আদানপ্রদান করিতেছে না, তাহাকে আমরা বাংলা প্রত্যয়রূপে স্বীকার করিতে পারি না।” আমরা জানি যেকোনো প্রচলিত বাংলা ব্যাকরণেই ‘ওয়ান’ প্রত্যয়টির উল্লেখ স্বতন্ত্ররূপেই রয়েছে। আমাদের উল্লেখ করা ‘ভাষাবীথি’ও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু ‘ওলা’ বা ‘ওয়ালা’ প্রত্যয়ের উল্লেখ রবীন্দ্রনাথ নিজেই করছেন , কারণ এগুলো কাপড়ওয়ালা, ছাতাওয়ালা, রিক্সাওয়ালা-র মতো বিশুদ্ধ বাংলা শব্দ তৈরি করছে।  তেমনি আছে ‘গির’ থেকে ‘গিরি’, ‘দার’ ইত্যাদি প্রত্যয়। আমরা আগে উল্লেখ করা ‘ৎ’ এর মতো ‘ট্ট’ (ভরট্ট), ‘অং, আং, ইং’ ( ভড়ং, বড়ং, খোলাং) ‘অঙ্গ, আঙ্গ, অঙ্গিয়া’ ( সুড়ুঙ্গি, বিরিঙ্গি)  এমন আরো কিছু প্রত্যয়ের কথা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ যেগুলোর সন্ধান ‘ভাষাবীথি’র মতো ব্যাকরণে অনুসন্ধান করাটাই বৃথা।
           প্রবন্ধটি সম্পুর্ণ নয় নিজেই বারে বারে উল্লেখ করেছেন।  কিছু কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন যেগুলোর নিয়ম বের করতে হবে। যদিও কলকাতার উচ্চারণ অনুসারে বানান বুঝবার চেষ্টা করবেন লিখেছেন নিজের প্রবন্ধেই ‘বড়াং’-এর মতো প্রাদেশিক শব্দের উল্লেখ করেছেন । এবং অন্যদের প্রাদেশিক শব্দ সংগ্রহ করে কাজ সারতে বলছেন। এও বলছেন তাঁরা আগষ্ট ফ্রেডরিখ হ্যর্নলের লেখা Comparative Grammar of Gaudian Language থেকে যথেষ্ট সাহায্য পাবেন। তার মানে বইটি তাঁকেও ভাবতে সাহায্য করেছে।
এই প্রবন্ধ দারুণ আলোড়ন তুলেছিল পরিষদের ভেতরে । এটি  এবং সঙ্গে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর প্রবন্ধের বিরোধিতা করে শরচ্চন্দ্র শাস্ত্রী ভারতীতে ‘নতুন বাংলা ব্যাকরণ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। মোটের উপর রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমস্ত সিদ্ধান্তের তিনি প্রতিবাদ করেন। তাঁর অবস্থানটা বোঝা যাবে এই উল্লেখ থেকে, “রবীন্দ্রবাবু দীর্ঘ ঈকারের প্রতি একান্ত অপ্রসন্ন। তিনি উহার নির্বাসন দণ্ড ব্যবস্থা করিয়া কালাপানি পার করিয়া দিয়াছেন। তাঁহার সূত্র অনুসারে পাঁচী বামনী প্রভৃতি একাদশটি স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ দীর্ঘ ঈকারের কারাগৃহ হইতে মুক্তিলাভ করিয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিয়াছে। আর কলুনী প্রভৃতিরও ঐ অবস্থা। ঠাকুরাণী, নাপতিনী, জেলেনি প্রভৃতিকে আর দীর্ঘ ঈকারের গুরুভার বহন করিতে হইবে না। আর সেই চিরকালের সংস্কৃত ‘মালিনী’ নূতন আইন অনুসারে  হ্রস্ব হইয়া মালিনি হইয়া বসিয়াছেন।” ১৭ এবারে, আমরা জানি এই শব্দগুলোর অনেকগুলোই এখন ঈ-কার বাদ দিয়েই প্রচলিত।  এই প্রবন্ধই রবীন্দ্রনাথকে উদ্বুদ্ধ করে ‘বাংলা ব্যাকরণ’ প্রবন্ধটি লিখতে। রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধটি পড়লে জানা যাবে শরচ্চন্দ্রের প্রবন্ধের মধ্যে বিশুদ্ধ জোয়াচুরি রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধটি পরিষদের কাগজে ছাপা হবার আগেই এর প্রতিবাদে লেখা প্রবন্ধ ছেপে বেরিয়ে গেছিল। ছাপাখানা থেকে লেখাটির এক প্রুফ সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়ে কাজটা করে ফেলাতে তিনি বেশ রুষ্ট হয়েই লিখেছেন, “ আমার সাক্ষী হাজির হয় নাই, এই অবকাশে বাদের পূর্বেই প্রতিবাদকে পাঠক সভায় উপস্থিত করিয়া একতরফা মীমাংসার চেষ্টা করাকে ঠিক ধর্মযুদ্ধ বলে না।” বোঝা যাচ্ছে তিনি এবারে অনুশাসনিক ব্যাকরণের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামছেন। শরচ্চন্দ্রের প্রবন্ধের ভেতরেও সততার অভাব ছিল। তিনি লিখছেন, “...দুই মহানুভব বাঙ্গালা ব্যাকরণ প্রণয়নে বদ্ধকর, উভয়েই ক্ষমতাশালী। ইঁহাদের সহায় ও সামর্থ্য যথেষ্ট। ইচ্ছা করিলে ইঁহারা কোনো প্রবল স্রোতকেও ফিরাইয়া অন্য দিগগগামী করিতে পারেন। তবে ঐরূপ কার্য্যে অগ্রসর হইবার পূর্বে বিচার করা কর্ত্তব্য বাঙ্গালা ভাষাকে সংস্কৃতের সাহচর্য্য হইতে বিচ্যুত করায় লাভ ও ক্ষতি কতদূর। ...। ইঁহারা ‘বিসমিল্লায় গলদ’ প্রভৃতি যে সকল ভাষা বলাইতে ইচ্ছুক উহা একান্তই অশ্রদ্ধেয়।” ১৮এই ‘ব্যাকরণ প্রণয়নে বদ্ধকর’ কথাগুলো রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধে কোথাও নেই, বরং তিনি শুধু ভাবনাগুলোকে উস্কে দিচ্ছেন কিম্বা তাঁর লেখাতে ভুল থাকতে পারে--- এই কথাগুলো তাঁর প্রবন্ধে যেমন বারে বারে রয়েছে শরচ্চন্দ্রও শুরুতেই এই কথাগুলো উল্লেখ করেছেন। তার পরেও এভাবেই খোঁচা দিয়ে শেষ করছেন।  আর ‘ইচ্ছা করিলে ইঁহারা কোনো প্রবল স্রোতকেও ফিরাইয়া অন্য দিগগগামী করিতে পারেন।” এই কথাগুলো উঠে আসছে শরচ্চন্দ্রের নিজের ব্যাকরণ দর্শন থেকে। রবীন্দ্রনাথ যার গোড়া মেরে বিরোধিতা করছেন, লিখছেন, “ যে কথাগুলো লইয়া আমি আলোচনা করিয়াছিলাম, তাহাদিগকে বাংলায় রাখা বা বাংলা হইতে খারিজ করিয়া দেওয়া আমার বা আর কাহারও সাধ্যই নহে তাহারা আছে, এবং কাহারো কথায় তাহারা নিজের স্থান ছাড়িবে না। জগতে যেকোনো জিনিসই আছে, তাহা ছোট হোউক আর বড়ো হউক, কুৎসিত হউক আর সুশ্রী হউক, প্রাদেশিক হউক আর নাগরিক হউক, তাহার তত্বনির্ণয় বিজ্ঞানের কাজ। শরীরতত্ব কেবল উত্তমাঙ্গেরই বিচার করে এমন নহে, পদাঙ্গুলিকেও অবজ্ঞা করে না। বিজ্ঞানের ঘৃণা নাই, পক্ষপাত নাই।”১৯  এই প্রবন্ধটি নিয়ে যখন পরিষদের অধিবেশনে আলোচনা হয় তার কার্যবিবরণীতে মেলে সেখানে রবীন্দ্রনাথ আরো বলছেন, “ আমিই ব্যাকরণ লিখিতেছি বা লিখিব এরূপ দুরভিসন্ধি আমার? আমি কতকগুলো শব্দ সংগ্রহ করিয়া দিয়াছি, ভবিষ্যৎ ব্যাকরণের কার্যের জন্য উপকরণ সংগ্রহ করিয়া দিয়াছি বলিয়াই কি আমার এতোটা অপরাধ হইয়াছে। যাঁহারা এই সকল শব্দকে slang বলিয়া ঘৃণা করেন আর ভাষার মধ্যে আমিই এই সকল slang আমদানি করিতেছি বলিয়া আমার উপর খড়্গহস্ত হইয়া উঠিতেছেন, তাঁহাদের একটা কথা বলিবার আছে, আমি আমদানি করিতেছি এটা কী রকম কথা। পিতৃপিতামহাদি হইতে এই সকল শব্দ কি আমরা পাই নাই।” ২০এই প্রসঙ্গে আমাদের সাম্প্রতিক অসমে ‘অসমিয়া জাতীয় অভিধান’ নিয়ে তর্ক এবং তাদেরও ঠিক এরকম অবস্থানের কথা  সবার মনে পড়বে। মূলপ্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ এই প্রসঙ্গে আরো লিখছেন, “বাংলা বলিয়া একটা ভাষা আছে, তাহার গুরুত্ব মাধুর্য ওজন করা ব্যাকরণের কাজ নহে।   সেই ভাষার নিয়ম বাহির করিয়া লিপিবদ্ধ করাই তাঁহার কাজ। সে-ভাষা যে ইচ্ছা ব্যবহার করুক বা না করুক তিনি উদাসীন কাহারও প্রতি তাঁহার কোনো আদেশ নাই, অনুশাসন নাই। জীবতত্ববিৎ কুকুরের বিষয়েও লেখেন, শেয়ালের বিষয়েও লেখেন। কোনো পণ্ডিত যদি  তাঁহাকে ভর্ৎসনা করিতে আসেন যে শিয়ালের কথাটা এতো আনুপূর্বিক লিখিতে বসিয়াছ, শেষকালে যদি লোকে শেয়াল পুষিতে আরম্ভ করে!—তবে জীবতত্ববিদ তাহার কোনো উত্তর না দিয়া তাঁহার শেয়াল সম্বন্ধীয় পরিচ্ছেদটা শেষ করিতেই প্রবৃত্ত হন।”২১ ব্যাকরণের কাজ সম্পর্কে তিনি মোক্ষম কথা এই প্রবন্ধে যা লিখেছেন আসলে তা ভাষাবিজ্ঞানের মূল কথাতো বটেই, ভাষাগুলোর স্বাতন্ত্র্য কিসে চিহ্নিত হয় সে সম্পর্কেও গোড়ার কথা এটিই। তিনি লিখছেন, “বস্তুত প্রত্যেক ভাষার নিজের একটা ছাঁচ আছে। উপকরণ যেখান হইতেই সে সংগ্রহ করুক, নিজের ছাঁচে ঢালিয়া সে তাহাকে আপনার সুবিধামত বানাইয়া লয়। সেই ছাঁচটাই তাহার প্রকৃতিগত, সেই ছাঁচেই তাহার পরিচয়। উর্দুভাষায় পারসি আরবি কথা ঢের আছে, কিন্তু সে কেবল আপনার ছাঁচেই চতুর ভাষাতত্ত্ববিদের কাছে হিন্দির বৈমাত্র সহোদর বলিয়া ধরা পড়িয়া গেছে। আমাদের বাঙালি কেহ যদি মাথায় হ্যাট, পায়ে বুট, গলায় কলার এবং সর্বাঙ্গে বিলাতি পোশাক পরেন, তবু তাঁহার রঙে এবং দেহের ছাঁচে কুললক্ষণ প্রকাশ হইয়া পড়ে। ভাষার সেই প্রকৃতিগত ছাঁচটা বাহির করাই ব্যাকরণকারের কাজ। বাংলায় সংস্কৃতশব্দ ক’টা আছে, তাহার তালিকা করিয়া বাংলাকে চেনা যায় না, কিন্তু কোন্‌ বিশেষ ছাঁচে পড়িয়া সে বিশেষরূপে বাংলা হইয়া উঠিয়াছে, তাহা সংস্কৃত ও অন্য ভাষার আমদানিকে কী ছাঁচে ঢালিয়া আপনার করিয়া লয়, তাহাই নির্ণয় করিবার জন্য বাংলা ব্যাকরণ।” ২২ আলতাফ চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে আরবি পার্শি শব্দকে বাংলাতে চালু করবার প্রসঙ্গেও তিনি ঐ ছাঁচের কথা তুলেছেন। শব্দের আমদানিকে কিন্তু স্বাগত জানিয়েছেন বিরোধীতা করেন নি। লিখেছেন, “ভাষার মূল প্রকৃতির মধ্যে একটা বিধান আছে যার দ্বারা নূতন শব্দের যাচাই হতে থাকে, গায়ের জোরে এই বিধান না মানলে জারজ শব্দ কিছুতেই জাতে ওঠে না।” এই ছাঁচের পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি অনেক নজির টেনেছেন, সেই প্রসঙ্গেই বাংলাতে সম্প্রদান কারক যদি থাকে তবে সন্তাড়ণ কারক কেন থাকবে না, দ্বিববচন কেন থাকবে না এই বহুচেনা প্রশ্নগুলোও এখানেই তুলছেন। আমরা সেগুলো আর টানব না। বরং চলে যাব ‘বাংলা ভাষা পরিচয়ে’।
  বাংলা ভাষা পরিচয়ঃ ভাষার ভূগোলে পায়ে চলা পথের ভ্রমণকারী
  
         ‘শব্দতত্ত্বে’র প্রায় চারদশক পর ১৯৩৮এ ‘বাংলা ভাষা পরিচয়ে’র লেখার ভাষাটাই একেবারে পালটে গেছে। শব্দতত্ত্বে যে কলকাতা এবং তার আশেপাশের উচ্চারণকে আশ্রয় করে শব্দ বিশ্লেষণ করবেন বলে লিখেছিলেন, সেটি ততদিনে তাঁর লেখার ভাষা হয়ে উঠেছে। কেন উঠেছে আর ওঠা উচিত তাই নিয়ে এই গ্রন্থের অনেকগুলো পৃষ্ঠাও তিনি ব্যয় করছেন। আমরা আগেই লিখেছি, খানিক প্রণালী বদ্ধ হলে এই বইটিই আধুনিক যুগের সেরা ব্যাকরণ হয়ে উঠতে পারত।  তা হয় নি বটে, কিন্তু বাংলাতে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের আদি বইগুলোর একটি এই বইটিও বটে ।  ভূমিকাতে তিনি লিখেছেন, সুনীতিকুমারের সঙ্গে আমার তফাৎ এই—তিনি যেন ভাষা সম্বন্ধে ভূগোল বিজ্ঞানী, আমি যেন পায়ে চলা পথের ভ্রমণকারী।” এই কথাটি এই বইয়ের রচনাশৈলী সম্পর্কেও সত্য । সামান্য ভাষাতত্বে আগ্রহ রাখেন এমন যেকোনো পাঠক এটি সুখপাঠ্য ভ্রমণকাহিনির মতোই পড়ে ফেলতে পারেন। আমাদের ভাষাতত্বের নিরস পাঠ্যক্রমে একে জায়গা দিলে মরুদ্যানের বাতাসে শ্বাস নিয়ে দু’দণ্ড জিরোনো যেত। ‘শব্দতত্বে’র থেকে এটি সুশৃঙ্খল আর সমৃদ্ধ। যদিও এতে অধ্যায়গুলো আলাদা আলাদা নামে চিহ্নিত নয় তবু  এদের আলাদা করে চেনা যায়, ভাষা কী, ভাষার কাজ কী, সাহিত্যে ভাষার কাজ কী, মাতৃভাষাই বা কি বাংলা ভাষা কাকে বলে, এর উৎপত্তির রহস্য কী, এর প্রাদেশিক স্বরূপ, চলিত এবং সাধু ভাষা এইসব সমস্যার সঙ্গে তিনি ছুঁয়ে গেছেন কারক, প্রত্যয়, পদ, ক্রিয়া, কাল ইদ্যাদি নানা ব্যাকরণিক বিষয়।  স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর সুনীতিকুমার  যুগে এখানে তিনি কালানুক্রমিক ভাষাতত্বের দিকে বেশ ঝুঁকেছেন বটে কিন্তু মূল ঝোঁক সেই কালিক ভাষাবিদ্যার দিকেই। কিন্তু তুলনামূলক ভাষাতত্বকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলও না, যানও নি। কিন্তু যেজন্যে এই বইটির গুরুত্ব তা এই যে  এটিতেই তিনি একজন পাকা সমাজ ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে দেখা দিচ্ছেন। বিশেষ করে যখন চলিত সাধুর তর্কে অনেকগুলো অধ্যায় ব্যয় করেন। বস্তুত এই বইতে তিনি মূলত বাংলা চলিত ভাষার তত্ব প্রতিষ্ঠার কাজই করেছেন।  অথচ সেই তাত্বিকের শৈলীটি সাহিত্যিকের । তিনি লিখছেন, “... সীমাসরহদ্দ নিয়ে মামলা করে না চলতি ভাষা। স্বদেশী বিদেশী হালকা ভারী সব শব্দই ঘেষাঘেষি করতে পারে তার আঙিনায়। সাধুভাষায় তাদের পাসপোর্ট মেলা শক্ত।”২৩ আমরা এই চেনা তর্ক নিয়ে বেশি এগুবো না। বরং পা রাখব, মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা, ভাষা জাতীয়তাবাদ  তর্কে রবীন্দ্রনাথ কী লিখছেন।
মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা, ভাষা জাতীয়তাবাদ  তর্কে রবীন্দ্রনাথ
          এই অভিযোগ করা হয়েই থাকে, তিনি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ‘হিন্দি’র সমর্থণ করেছিলেন। হিন্দিরা অনেকসময় এই তথ্যকেই ব্যবহার করেন নিজেদের গৌরবচিহ্ন হিসেবে। কিন্তু সব পক্ষই ব্যবহার করেন এই ‘বাংলাভাষা পরিচয়ে’র অষ্টম অধ্যায়ে লেখা তাঁর এক মন্তব্য , “... হিন্দুস্থানিকে ভারতের রাষ্ট্রীয় ব্যবহারের জন্যে এক ভাষা বলে গণ্য করা যেতে পারে। তার মানে, বিশেষ কাজের প্রয়োজনে কোনা বিশেষ ভাষাকে কৃত্রিম উপায়ে স্বীকার করা চলে, যেমন আমরা ইংরেজি ভাষাকে স্বীকার করেছি।” ২৪এই দাবি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে, জাতীয় সংহতির সঙ্গে, জাতিরাষ্ট্রের ধারণার সংগে খুব খাপ খায়। কিন্তু যে রবীন্দ্রনাথকে আমরা জানি , চিনি--- তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে খুব খাপ খায় কি? তিনিতো জাতীয়তাবাদের বিরোধী ছিলেন বলেই বেশ খ্যাতি –কুখ্যাতি দুটোই আছে। এর জন্যে ক্ষুব্ধ ভারতীয় স্বদেশিরা  ১৯১৬তে সানফ্রান্সিকোর এর হোটেলে তাঁকে হত্যা করবার ষড়যন্ত্র করেওছিল, যার থেকে তিনি অল্পের জন্যে বেঁচে । ২৫ অভিযোগ জানাবার কিম্বা গৌরব করবার –দুটো পক্ষই এই নিয়ে তখন আর বিশেষ ভাবেন না। আর ভাবলেও বড় বিড়ম্বনা, যারা তাঁকে আন্তর্জাতিকতাবাদী বলে ভাবেন তাঁরা তাঁকে একেবারে বিশ্বমানব টানব বানিয়ে ছাড়েন, যেন দেশ, জাতি , ধর্ম নিয়ে তাঁর কোনো ভাবনাই ছিল না। একটি বহুল প্রচলিত মত তাঁকে নিয়ে রয়েছে যে ইনি বড্ড স্ববিরোধী ছিলেন। ভারসাম্য বলে কোনো বস্তুই ছিল না , এই ভদ্রলোকের। এই এক কথা, অন্যত্র অন্য কথা লিখে গেছেন -- বলে গেছেন। তাঁর কোনো এক কথাতে ভরসা করা বড় বিপজ্জনক। তাই, তাঁর সাহিত্য শিল্প নিয়ে যতই মাতামাতি হোক, তাঁর রাজনীতি দর্শন নিয়ে  আগ্রহ দেখা যায় খুবই কম, অন্তত যারা  আধুনিকতা নিয়ে স্পর্শকাতর  তাদের কাছে। আমরা ধারাবাহিক ভাবে তাঁর রাজনীতি আর দর্শন নিয়ে লেখাগুলো পড়ে দেখেছি ।  তিনি সর্বত্র ঐ ‘পায়ে চলা ভ্রমণকারী’র কাহিনির মতোই সমস্ত গদ্যগুলো লিখে গিয়ে  নিজেই এই বিভ্রান্তির সুযোগ করেদিয়ে গেছেন। তবু, ছোটখাটো অন্যমনস্কতাগুলোকে বাদ দিলে তাঁর মধ্যে এক ধারাবাহিক উত্তরণ রয়েছে। যেমন শিল্প বা সাহিত্যের ব্যাখ্যাতে, তেমনি ধর্মের ব্যাখ্যাতে, দেশ এবং সমাজের স্বরূপ ব্যাখ্যাতে, একটি শব্দ ‘সামঞ্জস্য’, তিনি বহুবার ব্যবহার করেছেন। এহেন ব্যক্তির চিন্তাতে কোনো ‘সামঞ্জস্য’ নেই শুধু তিনিই বলতে পারেন যিনি তাঁর চিন্তার দ্বান্দ্বিকতাকে বিষয়ের স্থানকালের প্রেক্ষাপটে  না পড়তে পারেন। ‘জীবন স্মৃতি’র একেবারে শেষের দিকে ‘চিত্রা’ কাব্যে যে ‘জীবনদেবতা’ ধারণার শুরু তার উল্লেখ করে বলা কথাগুলো একবার  লক্ষ্য করা যাক, “জীবনে এখন ঘরের ও পরের, অন্তরের ও বাহিরের মেলামেলির দিন ক্রমে ঘনিষ্ঠ হইয়া আসিতেছে। এখন হইতে জীবনের যাত্রা ক্রমশই ডাঙার পথ বাহিয়া লোকালয়ের ভিতর দিয়া যে-সমস্ত ভালোমন্দ সুখদুঃখের বন্ধুরতার মধ্যে গিয়া উত্তীর্ণ হইবে, তাহাকে কেবলমাত্র ছবির মতো করিয়া হালকা করিয়া দেখা আর চলে না। এখানে কত ভাঙাগড়া, কত জয়পরাজয়, কত সংঘাত ও সম্মিলন। এই-সমস্ত বাধা বিরোধ ও বক্রতার ভিতর দিয়া আনন্দময় নৈপুণ্যের সহিত আমার জীবনদেবতা যে-একটি অন্তরতম অভিপ্রায়কে বিকাশের দিকে লইয়া চলিয়াছেন তাহাকে উদ্‌ঘাটিত করিয়া দেখাইবার শক্তি আমার নাই।” মুস্কিল হলো, এই শক্তি আমাদেরো অতি অল্প আছে। তাই সেই ‘জীবনদেবতা’কে নেহাতই ঔপনিষদিক ব্রহ্ম ভেবে আমরা হাঁফ ছেড়ে বেঁচে গেলাম। সেই দৃষ্টি নিয়ে হয় প্রশংসা নতুবা নিন্দে করে গেলাম। দ্বন্দ্বই প্রকৃতির বিকাশের মূল—এই দার্শনিক সত্যকে কিম্বা তথ্যকে আমরা তাঁর ‘বিকাশের দিকে লইয়া চলিয়াছেন’  কথাটার মধ্যে পড়তে একেবারেই ব্যর্থ হলাম। 
          ‘বাংলা ভাষা পরিচয়ে’ হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করবার পক্ষে তাঁর মন্তব্যটি নিতান্তই শিথিল । হয়তো, এই নিয়ে তখনো তাঁর ভাবনা স্থির হয়ে উঠতে পারে নি, তাই আপাতত তর্ক এড়াতে চাইছিলেন। কিন্তু সমর্থণ যে করতে পারছেন না, পুরো অধ্যায়টা মন দিয়ে পড়লেই বোঝা যায়। তাঁর পুরো কথাটি ছিল , “বাংলাভাষা ভারতবর্ষের প্রায় পাঁচ কোটি লোকের ভাষা। হিন্দি বা হিন্দুস্থানি যাদের যথার্থ ঘরের ভাষা, শিক্ষা-করা ভাষা নয়, সুনীতিকুমার দেখিয়েছেন, তাদের সংখ্যা চার কোটি বারো লক্ষের কাছাকাছি। এর উপরে আছে আট কোটি আটাশি লক্ষ লোক যারা তাদের খাঁটি মাতৃভাষা বর্জন করে সাহিত্যে সভাসমিতিতে ইস্কুলে আদালতে হিন্দুস্থানির শরণাপন্ন হয়। তাই ...” এর পরেই সেই আগে উদ্ধৃত কথাগুলো রয়েছে। তার পরেই আবার  রয়েছে, “কিন্তু ভাষার একটা অকৃত্রিম প্রয়োজন আছে; সে প্রয়োজন কোনো কাজ চালাবার জন্যে নয়, আত্মপ্রকাশের জন্যে। রাষ্ট্রিক কাজের সুবিধা করা চাই বই-কি, কিন্তু তার চেয়ে বড়ো কাজ দেশের চিত্তকে সরস সফল ও সমুজ্জ্বল করা। সে কাজ আপন ভাষা নইলে হয় না। দেউড়িতে একটা সরকারি প্রদীপ জ্বালানো চলে, কিন্তু একমাত্র তারই তেল জোগাবার খাতিরে ঘরে ঘরে প্রদীপ নেবানো চলে না।”  ছোট এই অধ্যায়টি শেষ হচ্ছেই আমাদের চেনা রাবীন্দ্রিক উক্তি দিয়ে, “... ভারতবর্ষেও ভিন্ন ভিন্ন ভাষার উৎকর্ষ-সাধনে দ্বিধা করলে চলবে না। মধ্যযুগে য়ুরোপে সংস্কৃতির এক ভাষা ছিল লাটিন। সেই ঐক্যের বেড়া ভেদ করেই য়ুরোপের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা যেদিন আপন আপন শক্তি নিয়ে প্রকাশ পেলে সেই দিন য়ুরোপের বড়োদিন। আমাদের দেশেও সেই বড়োদিনের অপেক্ষা করব— সব ভাষা একাকার করার দ্বারা নয়, সব ভাষার আপন আপন বিশেষ পরিণতির দ্বারা।” বোঝাই যাচ্ছে তখনি যে সরকারি প্রদীপের দরকারে ঘরে ঘরে বাতি নেভানোর খেলা চলছিল, ভাষাগুলোকে একাকার করবার রাজনীতি চলছিল তার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের আসলে  ক্ষোভের উদ্গীরণ ঘটেছে এই অধ্যায়ে এসে। স্পষ্টতই তার এই ক্ষোভ হিন্দির একাধিপত্যের বিরুদ্ধে , কিন্তু একা বাংলার পক্ষেও নয়। ভারতের সব ভাষার হয়ে লিখছেন উগ্রজাতিয়তাবাদ বিরোধী রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ভাবনাগুলোর দ্বান্দ্বিক উত্তরণের ভালো নজির পাওয়া যাবে এরা আগের সপ্তম এবং অষ্টম অধ্যায় পাশাপাশি পড়লেও। সাতের  অধ্যায়ে দেখা যাবে তিনি জাতীয়তার ভাবনার পশ্চিমি উৎসের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। জানাচ্ছেন ‘মাতৃভাষা’, ‘মাতৃভূমি’ ধারণাগুলোই দেশীও নয়। তার পরেও জাতীয়তার পক্ষে মধুর বাক্য চয়ন করছেন আর লিখছেন, বেদের যুগে,“ ... শোচনীয় আত্মবিচ্ছেদ ও বহির্বিপ্লবের সময়ে ভারতবর্ষে একটিমাত্র ঐক্যের মহাকর্ষশক্তি ছিল, সে তার সংস্কৃতভাষা।”২৬ খানিক পরে আবার লিখছেন, “বাংলাদেশের ইতিহাস খণ্ডতার ইতিহাস। পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ রাঢ় বারেন্দ্রের ভাগ কেবল ভূগোলের ভাগ নয়; অন্তরের ভাগও ছিল তার সঙ্গে জড়িয়ে, সমাজেরও মিল ছিল না। তবু এর মধ্যে যে ঐক্যের ধারা চলে এসেছে সে ভাষার ঐক্য নিয়ে।” কিন্তু পরের অধ্যায়ে যেই তাঁকে হিন্দির একাধিপত্যের বিরোধীতা করতে হবে তখন তাঁর মনে পড়ছে, “এই প্রসঙ্গে য়ুরোপের দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। সেখানে দেশে দেশে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, অথচ এক সংস্কৃতির ঐক্য সমস্ত মহাদেশে।” এর মধ্যে তাঁর সুবিধেবাদ, স্ববিরোধীতা খুঁজে পাওয়া খুবই সহজ। কিন্তু সে হবে ঐ একদেশদর্শীর কাজ। ভাষাকে ঐক্যের একটা আধার বলে তিনি মেনে নিচ্ছেন বটে, কিন্তু একমাত্র আধার বলে যারা জোরের সঙ্গে দাবি করেন রবীন্দ্রনাথের অবস্থান তাঁদের বিরুদ্ধে মাত্র। অন্যত্র বহু লেখাতে দেখা যাবে সম্প্রদায়গত ধর্মকেও  ঐক্যের আধার হতে পারার বাস্তবতাকে তিনি একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। কাশি হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে যখন তিনি ঠিক শতবর্ষ আগে সেই ২৯ অক্টোবর, ১৯১১তে রিপন কলেজে বক্তৃতা করছেন তখন শুরুতেই  মুসলমানদের জন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবকে সমর্থণ জানিয়ে বলছেন, “ আমার নিশ্চয় বিশ্বাস , নিজেদের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রভৃতি উদ্‌যোগ লইয়া মুসলমানেরা যে উৎসাহিত হইয়া উঠিয়াছে তাহার মধ্যে প্রতিযোগিতার ভাব যদি কিছু থাকে তবে সেটা স্থায়ী ও সত্য পদার্থ নহে । ইহার মধ্যে সত্য পদার্থ নিজেদের স্বাতন্ত্র্য উপলব্ধি । মুসলমান নিজের প্রকৃতিতেই মহৎ হইয়া উঠিবে এই ইচ্ছাই মুসলমানের সত্য ইচ্ছা।”২৭ হিন্দুমুসলমানে ঐক্যের তিনি যে সূত্র ওই বক্তৃতাতে দিয়েছেন, তা আজকেও বহু অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিও উচ্চারণ করতে  দ্বিধাবোধ করবেন, “আজ আমাদের দেশে মুসলমান স্বতন্ত্র থাকিয়া নিজের উন্নতিসাধনের চেষ্টা করিতেছে । তাহা আমাদের পক্ষে যতই অপ্রিয় এবং তাহাতে আপাতত আমাদের যতই অসুবিধা হউক , একদিন পরস্পরের যথার্থ মিলনসাধনের ইহাই প্রকৃত উপায় । ধনী না হইলে দান করা কষ্টকর ; মানুষ যখন আপনাকে বড়ো করে তখনই আপনাকে ত্যাগ করিতে পারে । যত দিন তাহার অভাব ও ক্ষুদ্রতা ততদিনই তাহার ঈর্ষা ও বিরোধ । ততদিন যদি সে আর কাহারও সঙ্গে মেলে তবে দায়ে পড়িয়া মেলে — সে মিলন কৃত্রিম মিলন । ছোটো বলিয়া আত্মলোপ করাটা অকল্যাণ , বড়ো হইয়া আত্মবিসর্জন করাটাই শ্রেয়।” ২৮
অসমিয়া ভাষা এবং রবীন্দ্রনাথ
     
      এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ে অসমিয়া ভাষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অবস্থানের কথা। ভাষাটিকে তিনি একসময় বাংলার উপভাষা বলেই মনে করতেন। কিন্তু সে ঐ উনিশ  শতকের শেষের কথা। বাংলা ১৩০৫, ইংরেজি ১৮৯৮। এখনকার রবীন্দ্ররচনাবলীতে ‘শব্দতত্বে’র পরিশিষ্টে একটি উটকো প্রবন্ধের সন্ধান মেলে, ‘ভাষাবিচ্ছেদ।’ সেটি শুরুতে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থবদ্ধও করেননি। কিন্তু একে উটকো বলবার কারণ তা নয়।  বইটির আর সব প্রবন্ধকেই বিশুদ্ধ ভাষাবিজ্ঞানের শাখাতে ফেলে শ্রেণিবদ্ধ করা চলে, এই একটিকেই সমাজভাষাবিজ্ঞানের সারিতে ফেলে সাজাতে হবে।  ততদিনে তিনি নাথান ব্রাউনের অসমিয়া ব্যাকরণ পড়ে ফেলেছেন। যেটি কিনা প্রথম দাবি করে যে অসমিয়া বাংলার উপভাষা নয়। ফ্রেডরিখ হ্যর্নলের গৌড়ীয় ভাষার ব্যাকরণও পড়ে ফেলেছেন। আমরা নজির দিয়ে দীর্ঘ করব না, শুধু বলব, ঠিক যে যে যুক্তিতে ১৯১৩ থেকে বেনুধর রাজখোয়ার Notes on Sylheti Dialects বেরোবার পর থেকে সিলেটি উপভাষাকে বহু অসমিয়া ভাষাতাত্বিক অসমিয়ার উপভাষা বলে দাবি করে আসছেন রবীন্দ্রনাথ ঠিক ঐ একই যুক্তিতে সেই প্রবন্ধে ওড়িয়া আর অসমিয়াকে বাংলার উপভাষা বলে দাবি করছেন। চাঁটগেয়ে, সিলেটি উপভাষাগুলো যে মান বাংলার থেকে অসমিয়ারই খুবই কাছের ভাষা তা বেনুধর রাজখোয়ার একযুগ আগে রবীন্দ্রনাথই প্রথম চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। তফাৎ হলো, ঐ যুক্তিগুলো ব্যবহার করে একদল যখন বাংলার উপভাষাগুলোকে অসমিয়ার বলে দাবি করে আসছেন রবীন্দ্রনাথ তখন  পুরো অসমিয়া ভাষাটাকেই বলছেন বাংলার উপভাষা মাত্র। এবং কেউ কেউ একে আলাদা করে ফেলতে চাইছে বলে বেশ উষ্মাই প্রকাশ করে লিখছেন এরা নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনবেন, না পাবেন ভালো চাকরি, না পারবেন ভালো সাহিত্যের ঐতিহ্য তৈরি করতে। চারদশক পরে যিনি লিখবেন, “য়ুরোপের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা যেদিন আপন আপন শক্তি নিয়ে প্রকাশ পেলে সেই দিন য়ুরোপের বড়োদিন। ” ‘ভাষাবিচ্ছেদে’ তাঁরই যুক্তি, “বৃটিশ দ্বীপে স্কটল্যাণ্ড, অয়র্ল্যাণ্ড ও ওয়েল্‌সের স্থানীয় ভাষা ইংরেজি সাধুভাষা হইতে একেবারেই স্বতন্ত্র। তাহাদিগকে ইংরেজির উপভাষাও বলা যায় না। উক্ত ভাষাসকলের প্রাচীন সাহিত্যও স্বল্পবিস্তৃত নহে। কিন্তু ইংরেজের বল জয়ী হওয়ায় প্রবল ইংরেজিভাষাই বৃটিশ দ্বীপের সাধুভাষারূপে গণ্য হইয়াছে। এই ভাষার ঐক্যে বৃটিশজাতি যে উন্নতি ও বললাভ করিয়াছে, ভাষা পৃথক থাকিলে তাহা কদাচ সম্ভবপর হইত না।” ভাষাবিচ্ছেদ বুদ্ধির জন্যে তিনি বৃটিশ সাহেবের নিন্দে করছেন, ঐক্যের বুদ্ধিটা আবার সেই বিলেত থেকে নিতেই পরামর্শ দিচ্ছেন। এই রবীন্দ্রনাথ একেবারেই উগ্রজাতীয়তাবাদী। এই সত্য উচ্চারণ করতে আমাদের কোনো দ্বিধা থাকাই উচিত নয়। পরবর্তী যে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় আমরা ইতিমধ্যে দিয়ে এসছি তাঁকে দিয়েই এই উনিশ শতকীয় রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর পরিবেশকে  খণ্ডন করা যায়। আমাদের শুধু  মনে রাখতে হবে,  ‘প্রত্যেক ভাষার নিজের একটা ছাঁচ আছে’ এই কথাটা যে প্রবন্ধে  প্রথম তাঁর উপলব্ধিতে আসছে সেই ‘বাংলা ব্যাকরণ’ লিখতে তখনো তাঁর  তিন বছর বাকি। সেটি লেখা হয় বাংলা ১৩০৮এ। তাছাড়া অসমিয়ারা নিজেরাই এর আগে ভাষাটির অবস্থান ঠিক করে উঠতে পারেন নি, তাঁরা বাংলাতে লিখতেন , বাংলাতে পড়তেন। বিশ্বাসই করতেন না, অসমিয়াতে সাহিত্য চর্চা হতে পারে। ঠিক বঙ্কিমের আগের বাঙালিদের মতো।  ড০ প্রফুল্ল চন্দ্র মহন্ত তাঁর ‘অসমিয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির ইতিহাসে’ হেমচন্দ্র বরুয়ার একটি উক্তি তুলে দিয়েছেন, “উল্লিখিত সময়ত অসমত বঙ্গালী, ভাষাৰ বৰ আদৰ আছিল, মাতৃভাষাক সকলোৱে ঘিনাইছিল—ইস্কুলত বঙ্গালী, কাছাৰীত বঙ্গালী, ডেকাবিলাকৰ আলাপত বঙ্গালী আৰু তেওঁলোকৰ চিঠিতো বঙ্গালী ভাষাহে চলিছিল। সকলোৱেই বঙ্গিনী বঙ্গীয়াক সঙ্গিনী কৰি লইছিল, অবশ্যে ময়ো এই নিয়মৰ বাহিৰ নাছিলো, বঙ্গ ভাষা মোৰ বুকুর কুটুম আছিল।” ২৯ ।শুধু তাই নয়, ভাটি অসমের ভাষাকে উজানের অসমিয়ারাই অসমিয়া বলে জাতে তুলতে চাইতেন না। ‘সাহিত্য সভার কথা’ বইতে  শরৎচন্দ্র গোস্বামী লিখেছেন, “ অসমীয়া ভাষাৰ সঙ্কীর্ণতা ইমান বাঢ়িছিল যে শিবসাগৰত নোকোৱা শব্দ এটা ব্যবহাৰ কৰিলেই ভাষা চুৱা হ'ল বুলি কিছুমান উজনীয়া লোকে আটাহ পাৰি ফুৰিছিল। কামৰূপীয়া বা গোয়ালপৰীয়া মাত কথাতো বঙলুৱাই। যি বিশিষ্ট ভাষাৰ বহির্ভূত। এনে সংকীর্ণতাৰ ফলত নামনি অসমৰ অনেকেই অসমীয়া লিখিবলৈ ভয় কৰিছিল। … এনে অবস্থাত কামৰূপত তেতিয়াও কেইজনমান ক্ষমতাসম্পন্ন লোক আছিল, যে ভাবিছিল যে কামৰূপীয়া মানুহে উজনীয়াৰ ইমানবিলাক অত্যাচাৰ আৰু অবিচাৰ ( ভাষা বিষয়ত) সহ্য কৰাত কৰি তেওঁলোকে বঙালী ভাষাকে গ্রহণ কৰা ভাল।”৩০ সুতরাং রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তার আদিযুগের অবস্থানকে এই বাস্তবতার থেকেও বিবেচনা করতে হবে। ‘ভাষাবিচ্ছেদ’ তিনি যে শ্রাবণে লিখছেন তার দুমাস আগে জ্যেষ্ঠ মাসে লিখছেন,  ‘বাংলা বহুবচন’।  সেখানে আবার উত্তর ভারতীয় প্রায় সমস্ত আর্য ভাষার সঙ্গে ওড়িয়া এবং অসমিয়াকে স্বতন্ত্র ভাষা বিবেচনা করেই এক তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। এবং আমাদের ধারণা কোনো ভারতীয়ের হাতে অসমিয়া ভাষার তুলনামূলক অধ্যয়ন এটিই প্রথম। দুমাস পরে তবে সেই অসমিয়া –ওড়িয়াকে বাংলার উপভাষা বলছেন কেন? এর উত্তর একটাই হতে পারে, সময় কখনো এরৈখিক নয়, অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে তাঁর টানা যাত্রা নয়। তাকে স্থানের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে কিছুতেই বোঝা যাবে না। নেশন, জাতীয়তাবাদ নিয়ে তাঁর জিজ্ঞাসাগুলো তখনই দানা বাঁধছিল। কিন্তু সে তীব্রতা পায় ১৯০৫এর বাংলা ভাগ বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে। স্বদেশিরা যখন আন্দোলনের ব্যর্থতার দায় মুসলমান সহ অন্যদের উপর চাপাচ্ছেন আর বাঙালিকে ভাগ করবার দায় চাপাচ্ছেন বিলেতিদের উপর, তিনি তখন বাঙালির নিজের ভেতেরেই বিভেদের কারণ অনুসন্ধানে নেমেছেন এবং জাতীয়তাবাদের স্বরূপ উন্মোচন করছেন। তাঁর তখনকার বহু মূল্যবান মন্তব্যের মধ্যে এই কথাগুলোও আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক , “ আসল কথা আমাদের দুর্ভাগ্য দেশে ভেদ জন্মাইয়া দেওয়া কিছুই শক্ত নহে, মিলন ঘটাইয়া তোলাই কঠিন। বেহারিগণ বাঙালির প্রতিবেশী এবং বাঙালি অনেকদিন হইতেই বেহারিগণের সঙ্গে কারবার করিতেছে, কিন্তু বাঙালির সঙ্গে বেহারির সৌহার্দ্য নাই সেকথা বেহারবাসী বাঙালিমাত্রেই জানেন। শিক্ষিত উড়িয়াগণ বাঙালি হইতে নিজেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বলিয়া দাঁড় করাইতে উৎসুক এবং আসামিদেরও সেইরূপ অবস্থা। অতএব উড়িষ্যা আসাম বেহার ও বাংলা জড়াইয়া আমরা যে দেশকে বহুদিন বাংলাদেশ বলিয়া জানিয়া আসিয়াছি তাহার সমস্ত অধিবাসী আপনাদিগকে বাঙালি বলিয়া কখনো স্বীকার করে নাই, এবং বাঙালিও বেহারি উড়িয়া এবং আসামিকে আপন করিয়া লইতে কখনো চেষ্টামাত্র করে নাই,  বরঞ্চ তাহাদিগকে নিজেদের অপেক্ষা হীন মনে করিয়া অবজ্ঞা দ্বারা পীড়িত করিয়াছে।”৩১ এই স্বর্ণাক্ষরগুলো আজকের অসমেও আমাদের আধার পথের আলো হতেই পারে, এই নিয়ে কি আর কোনো সংশয় থাকা উচিত?  


তথ্য সূত্রঃ
১) পৃঃ ৮১৯,রবীন্দ্ররচনাবলী, ৬ষ্ঠ খন্ড, ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ, বিশ্বভারতী
২)  পৃঃ ৪১৫, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস , সুকুমার সেন, চতুর্থ খণ্ড,  আনন্দ প্রকাশনী।
৩) পৃঃ ১০১, অবতরণিকাঃবাঙলা ভাষাতত্ব, বাংলা ভাষা , প্রথম খন্ড, সম্পাদক হুমায়ুন আজাদ,আগামী প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭, ঢাকা।
৪) পৃঃ ৭০৯, রামেশ্বর শ্ব, সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলাভাষা, পুস্তক বিপনি, ১৩৯৯ ।
৫) পৃঃ ২১, অবতরণিকাঃবাঙলা ভাষাতত্ব, বাংলা ভাষা , প্রথম খন্ড, সম্পাদক—হুমায়ুন আজাদ, আগামী প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭, ঢাকা।
৬) পৃঃ ৪২, অবতরণিকাঃবাঙলা ভাষাতত্ব, বাংলা ভাষা , প্রথম খন্ড, সম্পাদক—হুমায়ুন আজাদ, আগামী প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭, ঢাকা।
৭) পৃঃ ৩২৬, উপসর্গের অর্থবিচার, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর,  বাংলা ভাষা , প্রথম খন্ড, সম্পাদক—হুমায়ুন আজাদ, আগামী প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭, ঢাকা
৮)  পৃঃ ৭৪৪,উপসর্গ সমালোচনা, রবীন্দ্ররচনাবলী, ৬ষ্ঠ খন্ড, ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ, বিশ্বভারতী  
৯) পৃঃ ৬২৩, রবীন্দ্ররচনাবলী, ১৩শ খন্ড, ঐ)
১০) পৃঃ ৪০, অবতরণিকাঃবাঙলা ভাষাতত্ব, বাংলা ভাষা , প্রথম খন্ড, সম্পাদক—হুমায়ুন আজাদ, আগামী প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭, ঢাকা। 
১১) ঐ ।
১২) পৃঃ ৬৬২,  ছাত্রদের প্রতিসম্ভাষণ, আত্মশক্তি,রবীন্দ্ররচনাবলী, ২য় খন্ড, ঐ। 
১৩)  পৃঃ ৬৩৩, বাংলা কৃৎ ও তদ্ধিত, রবীন্দ্ররচনাবলী, ৬ষ্ঠ খন্ড, ঐ ।
১৪) পৃঃ ৬৩৪, ঐ ।
১৫)   পৃঃ ১৩০,ভাষাবীথি, ড০ নির্মল দাশ, অরিয়েন্টাল বুক কোম্পানী প্রাইভেট লিমিটেড, পানবাজার গুয়াহাটি, ফেব্রুয়ারী, ২০০১।
১৬)  পৃঃ ৬৩৪,বাংলা কৃৎ ও তদ্ধিত, রবীন্দ্ররচনাবলী, ৬ষ্ঠ খন্ড, ঐ
১৭) পৃঃ ১৬৯, নূতন বাংলা ব্যাকরণ, শরচ্চন্দ্র শাস্ত্রী, বাংলা ভাষা , প্রথম খন্ড, সম্পাদক—হুমায়ুন আজাদ, ঐ) 
১৮) ঐ ।
১৯)  পৃঃ ৭৫০, বাংলা ব্যাকরণ, শব্দতত্ত্ব, রবীন্দ্ররচনাবলী, ৬ষ্ঠ খন্ড,ঐ।
২০)  পৃঃ ৮২০,গ্রন্থপরিচয়, রবীন্দ্ররচনাবলী, ৬ষ্ঠ খন্ড, ঐ ।  
২১) পৃঃ ৭৫৬, বাংলা ব্যাকরণ, শব্দতত্ত্ব, ঐ ।
২২) পৃঃ ৭৫১, ঐ 
২৩) পৃঃ ৫৮৫, রবীন্দ্ররচনাবলী, ১৩শ খন্ড, ঐ
২৪) পৃঃ ৫৮৩, রবীন্দ্ররচনাবলী, ১৩শ খন্ড,ঐ।
২৫)http://www.newworldencyclopedia.org/entry/Rabindranath_Tagore#Political_views
২৬) পৃঃ ৫৮২, রবীন্দ্ররচনাবলী, ১৩শ খন্ড, ঐ ।
২৭) পৃঃ ৬০৬, পরিচয়, হিন্দুবিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্ররচনাবলী, ৯ম খন্ড,ঐ।
২৮) ঐ ।
২৯)  পৃঃ১৮৮, অসমীয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণিৰ ইতিহাস,ড০ প্রফুল্ল চন্দ্র মহন্ত, লৱার্স বুক স্টল, গুৱাহাটি, ২০০৯
৩০) পৃঃ ১৫০-৫১; 'সাহিত্য সভাৰ কথা'; শৰৎ চন্দ্র গোস্বামী ৰচনাৱলী; পৃঃ ২৪৮, অসমীয়া জাতি গঠন প্রক্রিয়া আৰু জাতীয় জনগোষ্ঠীগত অনুষ্ঠান সমূহ-তে উদ্ধৃত।
৩১)  পৃঃ ৭১৪, সদুপায়, সমূহ, রবীন্দ্ররচনাবলী, ৫ম খন্ড, ঐ ।
অন্যান্য গ্রন্থঃ
১) Origine and development of Bengali language, Suniti Kumar Chatterji; Rupa & Co, Culcatta,

Saturday, 7 September 2013

অসমিয়া ভাষা, সিলেটি উপভাষা এবং অসমে ভাষাচর্চার রূপরেখা

                 এই ভিডিও শুনতে সাইডবারের ভিডিও বন্ধ করুন)            

              (লেখাটি  বাঙ্গালনামাতে বেরুলো । এলেখার দ্বিতীয় অংশ রয়েছে এখানে। এছাড়াও আছে  দুই কিস্তিতে এখানে এবং এখানে  বাংলামেইল ডট কম-এ)       
                                                   

          ।। সিলেটি  উপভাষা   এবং  বরাক  উপত্যকার   ভয়  ।। 
              বাংলার উপভাষা সিলেটি নিয়ে অসমের বাঙালি যত না চর্চা করেছে বিদগ্ধ অসমিয়া পন্ডিতেরা তার চেয়ে বেশি আলোচনা করেছেন। সেপ্টেম্বর ২০১০এ প্রকাশিত 'বাঙ্গালনামা'র দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যাতে প্রকাশিত 'প্রসঙ্গ সিলেটি ভাষা' লেখাতে সঞ্জীব দেব লস্কর লিখেছেন, “ইতিমধ্যে সিলেট মদনমোহন কলেজের প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ প্রণব সিংহ, বরাক উপত্যকার জন্মজিৎ রায়, আবুল হোসেন মজুমদার, ঊষারঞ্জন ভট্টাচার্য কিছু কাজ করেছেন, একটি সম্পূর্ণ অভিধান, বলা চলে কোষগ্রন্থই রচনা করেছেন জগন্নাথ চক্রবর্তী, আর আবিদরাজা মজুমদারের আরেকটি অভিধানও প্রকাশের পথে। বর্তমান লেখকের এ দিকে মোটেই কোনো বিশেষ পাঠ বা অনুধ্যানই নেই।” সঞ্জীব যাদের নাম করেছেন তাদের মধ্যে প্রণব সিংহের সঙ্গে বর্তমান লেখকের পরিচয় নেই। বাকিরা প্রত্যেকেই গবেষক-অধ্যাপক তথা শিক্ষক এবং বহু গ্রন্থের লেখক বটে।  উষা রঞ্জন অনুবাদ সাহিত্যে সাহিত্য একাদেমি পুরস্কারও পেয়েছেন এবং বর্তমান লেখকের শিক্ষক।   কিন্তু সম্ভবত কেউই  পূর্ণকালীন ভাষা গবেষক নন। কেবল মাত্র সম্প্রতি প্রকাশিত জগন্নাত চক্রবর্তীর অভিধান দেখায় গুণগত ভাবে  প্রয়াসগুলো যাই হোক না কেন, পরিমাণগত দিক থেকে তাঁর ভাষা অধ্যয়ন বেশ  সুগভীর এবং আন্তরিক। যদিও তিনি 'বরাক বাংলা' বলতে ঠিক কোনটিকে বোঝাতে চেয়েছেন সেই প্রশ্নটি অস্পষ্ট থেকেই গেছে। সঞ্জীব বরাক উপত্যকার  বিদগ্ধ লেখক । তাঁর কথাতে  নির্ভর করতে পারি ।
      
লামডিং থেকে প্রকাশিত কাগজ 'সৃজনে' প্রকাশিত এই লেখা
               সঞ্জীব সঙ্গতকারণেই “...এ সময়ের কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে”  অভিযোগ জানিয়ে লিখেছেন,  “... এ উপভাষাকে একটা ভাষার স্খলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেও প্রয়াসী।” তিনি বেশ উৎসাহ ভরে লিখেছেন ,”... এখন শিল্প সংস্কৃতির রাজধানী কলিকাতায় জিন্স পরা ইলেকট্রনিক যন্ত্র হাতে নাগরিক ব্যান্ডের শিল্পীরা           (দোহারঃ লেখক) দুনিয়ার যত বাঙাল কবির পদ গেয়ে আসর জমিয়ে রাখছে। সিলেটি হাসন রাজাকে তো কবিগুরু অনেক আগেই জগৎ সভায় প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন। ...আমাদের ভাষাপৃথিবীর এই যে বিস্তৃতির সূচনা, এটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে বিভিন্ন ঔপভাষিক অঞ্চলের বাঙালিদের সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন।” কিন্তু এর পরেই  লিখলেন, “এ অবস্থায় বরাক উপত্যকার বাঙালিরা সিলেটি ভাষা, অর্থাৎ উপভাষা নিয়ে অতি উৎসাহী হলে, এদের ভাষিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে সদা সচেষ্ট এক শ্রেণির অসমিয়া নেতৃত্ব একটা বিশেষ মওকা পেয়ে যেতে পারেন।” এই শেষোক্ত মন্তব্য একটি ধোঁয়াসা তৈরি করে ।  এটি বরাক উপত্যকার  বিদ্যায়তনিক মহলে একটি প্রতিষ্ঠিত অভিমত। এক গড়ে তোলা চিহ্ন বিশেষ। এই ভয়ের স্পষ্ট কারণ হলো সিলেটি আর অসমিয়ার মধ্যেকার মিলগুলো খুবই চোখে পড়বার মতো । তাতে করে সুনীতি চট্টপাধ্যায়ের ছাত্র বাণীকান্ত কাকতি বাদে প্রায় সমস্ত অসমিয়া ভাষাতাত্বিক সিলেটিকে অসমিয়া বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করেন। এই তালিকাতে শেষতম সংযোজন ড০ উপেন রাভা হাকাচাম ।
                  অসমিয়ারা উপভাষাটিকে দখল করে নেবেন এই ভয়ে সিলেটি নিয়ে বেশি চর্চা না করবার, নাটকে, গল্পের সংলাপে সিলেটি ব্যবহার না করবার, রেডিও, টিভিতে সিলেটি ব্যবহার না করবার পরামর্শ বরাক উপত্যকার বেশ খ্যাতনামা বিদগ্ধজনেরা দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসছেন। তাদের মধ্যে অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য, 'সাহিত্য' সম্পাদক বিজিত ভট্টাচার্যও রয়েছেন।  যে চিহ্নায়নের প্রতাপেই অসম তথা বরাক উপত্যকাতেই , শুধু যে এই উপভাষা  নিয়ে  তাই নয়, সামগ্রিক ভাবেই ভাষা নিয়ে বাংলাতে অধ্যয়ন হয়েছে অতি অল্প। ১৯শের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কতটা সঠিক ভাবে কে লিখলেন তাই নিয়ে সেখানে রীতিমত প্রতিযোগিতা  চলে, হয় না শুধু ভাষা নিয়ে কোনো অধ্যয়নের প্রয়াস। অথচ, গোটা পূর্বোত্তরের অঙ্গ হিসেবে বরাক উপত্যকাও  যেহেতু এক বহু ভাষিক অঞ্চল ভাষা গবেষণার পক্ষে অঞ্চলটি প্রায় অনাবিষ্কৃত সোনার খনি। এই অভিমতটি অনেকটা এরকম -- নিজের সুন্দরী বৌকে বেশি লোক দেখিয়ে বেড়ানোর দরকার নেই , কেননা প্রতিবেশি মাতব্বরের  চোখ রয়েছে তার উপর !!! সুতরাং বোরখা চাপাও, ঘোমটা চড়াও। আড়াল করো, পর্দা টানো ! রক্ষণশীলতা আর বলে কাকে ! 
                  এই যে সঞ্জীব লিখলেন, “এক শ্রেণির অসমিয়া নেতৃত্ব একটা বিশেষ মওকা পেয়ে যেতে পারেন।” চিহ্নায়নের এমন প্রক্রিয়াতে তাঁরা যে  অসমিয়া ভাষাতাত্বিকদের  এমন মওকা  দিয়েই  বসে আছেন, এই সত্যও মনে হয় না বরাকের অনেকে জানেন। কারণ জানতে গেলেও চর্চা করবার উৎসাহ চাই। বরাক উপত্যকার ভাষাচর্চা করেন এমন এক বন্ধুর সঙ্গে সাম্প্রতিক এক আলোচনাতে তাঁকে যখন জানালাম যে অসমিয়াতে এক জাতীয় অভিধান লেখা হয়েছে আর সেটি গোটা অসমে বেশ হৈচৈ ফেলে দিয়েছে, তাঁর সদম্ভ উক্তি ছিল, “ধুস! অসমীয়াতে কি কেউ ভাষা তাত্বিক রয়েছে!” অথচ এই জাতীয় অভিধানের  তার তুল্য কাজ সত্যি বাংলাতে হয় নি , আর সম্ভবত হওয়া সম্ভবও নয়। এরা মুল ভাষার সঙ্গে অসমিয়ার সমস্ত উপভাষাকে এক জায়গাতে এনে জড়ো করে ফেলেছেন এই অভিধানে । প্রথম খন্ড বেরিয়েছে, আরো তিনটি বেরুচ্ছে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে  অন্যত্র অন্য সময়ে লেখা যাবে । বর্তমান লেখকের ধারণা সিলেটে যারা সিলেটিকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন তারাও ভাষাটি নিয়ে বেশ গভীরে গিয়ে কিছু কাজ করছেন। দেশে না পারুন বিলেতে তারা স্কুলে কলেজেও ভাষাটাকে শেখাবার কাজ করে ফেলছেন। সঞ্জীব “এদের পেছনে কিছু সন্দেহজনক চক্রও সক্রিয়” থাকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অথচ সঠিক অবস্থান হতো, এই প্রবণতার সমাজতাত্বিক কারণ অনুসন্ধান করা। সংশয়বাদ নতুন চিন্তার পথ খুলে দেয় বটে, কিন্তু অনেক সময় তা নতুন  চিন্তার পথ রুদ্ধও করে।  বিশেষ করে যদি সেই সংশয় পথচ্যুত হয়। কোনো 'চক্র' নিয়ে সন্দেহটা চরিত্রগত দিক থেকে ভাষাতাত্বিক নয়, রাজনৈতিক। এমন বৈদগ্ধ যেমন নিজের দৌর্বল্যকে প্রকাশ করে , তেমনি যার সঙ্গে মিতালি করে নিজের পথ করে নেয়াটা  খুবই সহজ তাকেই ঠেলে দেয় অহেতুক শত্রু পক্ষে। একটা অবৈরি দ্বন্দ্বকে করে রাখে বৈরি।
     কিছু অসমিয়া ভাষাতাত্বিক সিলেটিকে অসমিয়া বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করেন যদি এইমাত্র অপরাধে কেউ বলে উঠেন যে , “ধুস....স.....!” তবে রবীন্দ্রনাথ নিয়েও বলতে হয়,“ধুস! রবীন্দ্রনাথ ভাষাতত্বের কিছু বুঝতেনই না!” তিনি এক`বার লিখেছিলেন ,   “সেইজন্য বলিতেছিলাম, আসাম ও উড়িষ্যায় বাংলা যদি লিখন পঠনের ভাষা হয় তবে তাহা যেমন বাংলাসাহিত্যের পক্ষে শুভজনক হইবে তেমনিই সেই দেশের পক্ষেও। কিন্তু ইংরেজের কৃত্রিম উৎসাহে বাংলার এই দুই উপকণ্ঠবিভাগের একদল শিক্ষিত যুবক বাংলাপ্রচলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহধ্বজা তুলিয়া স্থানীয় ভাষার জয়কীর্তন করিতেছেন।” এই পর্যন্ত মনে হবে রবীন্দ্রনাথ নির্ভেজাল বাংলার পক্ষে বলছেন, আর কারো বিরুদ্ধে নয়। তার পরেই লিখছেন, “এ কথা আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, দেশীয় ভাষা আমাদের রাজভাষা নহে, যে-ভাষার সাহায্যে বিদ্যালয়ের উপাধি বা মোটা বেতন লাভের আশা নাই। অতএব দেশীয় সাহিত্যের একমাত্র ভরসা তাহার প্রজাসংখ্যা, তাহার লেখক ও পাঠক-সাধারণের ব্যাপ্তি। খণ্ড বিচ্ছিন্ন দেশে কখনোই মহৎ সাহিত্য জন্মিতে পারে না । তাহা সংকীর্ণ গ্রাম্য প্রাদেশিক আকার ধারণ করে । তাহা ঘোরো এবং আটপৌরে হইয়া উঠে, তাহা মানব-রাজদরবারের উপযুক্ত নয়।” (পৃঃ ৭৪১, ভাষাবিচ্ছেদ;পরিশিষ্ট,শব্দতত্ব; রবীন্দ্ররচনাবলী, ৬ষ্ঠ খন্ড;১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বিশ্বভারতী প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ) ।  অর্থাৎ তিনি অসমিয়া ওড়িয়ার মত ভাষাকে সাহিত্য চর্চার ভাষা বলেই ভাবছেন না । রচনাটি অবশ্যি পরে পরিত্যক্ত হয়ে 'শব্দতত্বে'র পরিশিষ্টে যুক্ত হয়েছে। আমার সেই পূর্বোক্ত বন্ধুটি এই একুশ শতকে এসেও রবীন্দ্রনাথের ফেলে আসা চিন্তার থেকে  বেশি এগুতে পারেন নি । দুটো ভাষার মধ্যে মিল দেখে যদি, অসমিয়ারা বলতে শুরু করে যে সিলেটি অসমিয়ারই উপভাষা তবে ওই একই যুক্তিতে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দাবিটিও দিব্বি দাঁড়িয়ে যায়। আর অসমিয়া হয়ে যায় বাংলা ভাষা, বাংলা হয়ে যায় হিন্দি, হিন্দি হয়ে যায় উর্দু! উর্দু হয়ে যায় পার্শি।  এমন হালকা যুক্তি, এক করে না। সাময়িক ভাবে ভয়ে আতঙ্কে  একাকার  করে রাখতে পারে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এই যুক্তিগুলো যে কেমন প্রবল বিভেদের বীজ বপন করে তা আমরা অসম , বাংলাদেশ, পশ্চিম বাংলা তথা উপমহাদেশের রাজনীতিতে বহুবার দেখেছি , আগামীদিনগুলোতেও  আরো অনেক দেখতে পাব। তার চে' কি ভালো নয় এই সন্ধিচুক্তিতে সই করা যে , “ভাই, কার ভাষাটি যে কি, তা  ঠিক করবে শুধু সেই যে ঐ ভাষাটিতে কথা বলে। অন্যে নয়।” 
    একালের এক বিদগ্ধ বাঙালি ভাষাবিদ পবিত্র সরকার এক জায়গাতে লিখেছেন , “যারা মনে করে, যে ভাষাটা বলছি সেটা বাংলা, সেটা আমার পরিচয়, তারাই বাঙালি।” কিন্তু এর পরেই তিনিও উল্টো সুরে গেয়েছেন , “কেউ কেউ 'বাংলা' নামটা জানেন না, কিন্তু তাঁদের ভাষা যদি পন্ডিতের বিচারে ব্যাপক বাংলার অন্তর্গত হয়, তাঁরাও বাঙালি।” ( বাঙালি কে?; ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ) এই 'পণ্ডিতে'র কর্তৃত্বের দরকারটা তাঁর মতো বাম শিবিরের ভাষাবিদেরও  পড়ে, কেননা  তাঁকেও যে রাজবংশীদের বাংলাভাষা বৃত্তের থেকে আলাদা হয়ে যাবার প্রবণতাকে 'শিক্ষবিস্তারের অসম্পূর্ণতার প্রমাণ' বলে অন্যত্র দেখাতে হবে! ( ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ;ঐ) এমন ,'শিক্ষবিস্তারের অসম্পূর্ণতার প্রমাণ' নিয়ে যাদের কাজকারবার তারাই শুধু দুটোভাষার ঐক্যের সূত্রগুলোকে দিয়ে অনৈক্যের মহিরুহ  বপন করতে পারেন। এই যে অসমিয়া, বাংলা,হিন্দি,উর্দু কিম্বা  পার্শি ---এগুলোর আলাদা ভাষানাম হবার কারণটাইতো   এই  যে ওদের মধ্যে প্রচুর মিল থাকা সত্বেও  কিছু অমিল রয়েছে যেগুলো নির্ধারক। এদের কেবল গঠন নয়, ভূগোল ইতিহাস এবং ব্যবহারকারীদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস   নির্ধারণ করে ওরা স্বতন্ত্র নামে পরিচিত হবে না  একই নামে।  'অসমীয়া আরু তিব্বত বর্মীয় ভাষা' বইতে উপেন রাভা হাকাচাম লিখেছেন, “ ভাষা-বিজ্ঞানর সহজ-সূত্রতে সীমাবদ্ধ না থাকি দুটা ভাষার আংশিক সাদৃশ্য দেখিলেই ইটো ভাষা যে সিটোতকৈ অধিক সমৃদ্ধশালী তাক জাহির করার প্রবণতাই নির্মোহ আলোচনার ব্যাঘাত ঘটাইছে।” এই একই  কথাতো  কেবল ভাষাগত গঠন দেখিয়ে দুটো ভাষার  এক নামে চিহ্ণিত করে ফেলবার প্রয়াস যারা করেন তাদের বেলাও খাটে। এমন প্রয়াস কেবল ভাষাতত্বেরই বিরোধী নয়, এই প্রয়াস রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক এবং ভৌগলিক ইতিহাসেরও  বিরোধী বটে।
     সিলেটি  তথা পূব বাংলার ভাষাগুলো যে অসমিয়ার  বেশ ঘনিষ্ট ভাষা এমন চিন্তার পথিকৃত কিন্তু স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ । সুনীতি চট্টপাধ্যায়তো সরাসরি লিখেই ফেলেছেন, “ The Bengali Dialects of the Extream east and south-east (Sylhet, Chittagong) are certainly more removed from Standard Bengali than is Assamese.” ( OBDL;পৃঃ১০৮) । ভাষা রাজনীতি ছেড়ে  ভাষা দুটোর  তুলনামূলক  ভাষাতাত্বিক অধ্যয়ন করলে কিন্তু  অনেক অনুন্মোচিত তত্ব আর তথ্য বেরিয়ে আসবার সম্ভাবনা এখনো প্রবল।  শুধু অসমিয়াই কেন, চাকমা, হাজং, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি,রাহবংশী ইত্যাদি ভাষার সঙ্গেও তুলনামূলক আলোচনা হতেই পারে। যদিও এই শেষোক্তভাষাগুলোকে বাংলা বলে চালিয়ে দেবার, 'শিক্ষবিস্তারের অসম্পূর্ণতার প্রমাণ' উপস্থিত করবার   ব্যামো থেকে আমরা নিজেরাই এখনো বেরুতে পারিনি । আমাদের যত রাগ সেই অসমিয়াদের বিরুদ্ধে যারা সিলেটিকে অসমিয়া বলে দাবি করেন। সেই দাবির চেহারা কেমন আমাদের বর্তমান প্রবন্ধে তারই এক রূপ রেখা তুলে ধরব।
 ।। 'অসমিয়া   কে ?  ঃ  অসমিয়া ' সংজ্ঞার  সমস্যা ।।  
                  সেই ১৯১৩ সনে বেণুধর রাজখোয়া তাঁর Notes on the Sylhetee Dialect বইতে সিলেটিকে অসমীয়া বলে দাবি করা শুরু করেছেন। তাতে শেষতম সংযোজন ড০ উপেন রাভা হাকাচাম। তিনসুকিয়া মহাবিদ্যালয়ে ২০০৯ সনে অসমের ভাষা উপভাষাগুলো সম্পর্কে এক বক্তৃতা দিতে এসছিলেন  ড০  হাকাচাম । সেখানে তিনি এমন দাবিও করেছিলেন যে বহু প্রকৃত অসমিয়াও অসমে তত খিলঞ্জিয়া নন সিলেটিরা যতটা খিলঞ্জিয়া , যতটা প্রাচীন। কথাটা তিনি ময়মনসিংহ মূলের মুসলমানদের সম্পর্কেও বলেছিলেন, যাদের সাধারণভাবে প্রায় সব্বাইকে বাংলাদেশি বলে ভেবে নেয়া হয়। তিনি তাই যাকে তাকে বিদেশি, 'খিলঞ্জিয়া নহয়' বলে প্রত্যাখান করবার প্রবণতার বিরোধীতা করেছিলেন এমন একটি সভাতে যেখানে সিলেটি শ্রোতা দু' একজন যদিও বা ছিলেন ,ময়মনসিংহ মূলীয় একজনও ছিলেন না। কাউকে খুশি করবার কোনো প্রয়োজন ছিল না। বরং কেউ কেউ এমন উক্তিতে বিরক্ত হলেও হতে পারতেন। কেউ যে হলেন না, তার কারণ 'যিনি খিলঞ্জিয়া তিনিই অসমিয়া' এমন এক ভাব অসমে বহুল প্রচলিত রয়েছে।
             'কে অসমিয়া?' ( অসমিয়া কোন?) এই নিয়ে গেল ক'বছরে অসমের আলো-হাওয়া রৌদ্র বেশ সরগরম। অনেকে অনেক কথা বলেছেন, এখনো কেউ কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেন নি। এই বিতর্কে দুটো প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে । একদল রয়েছেন যারা মনে করেন, যার মাতৃভাষা অসমিয়া, যিনি শয়নে স্বপনে অসমিয়া ভাষা -সংস্কৃতি তথা জাতির উন্নতির জন্যে ভাবেন এবং কাজ করেন তিনিই অসমিয়া। অন্য প্রবণতাটি অল্প শিথিল। এই দ্বিতীয় দল মনে করেন মাতৃভাষা অসমিয়া   হতেই হবে এমন কোনো কথা নেই । কিন্তু  অসমের মাটিকে যিনি আপনার করে নিয়েছেন অসমের  ভাষা সংস্কৃতি সম্পদের প্রতি যার ভাব ভালোবাসা আছে তিনিই, যিনি আর কোনো রাজ্য বা দেশকে   তার নিজের রাজ্য বলে ভাবেন না তিনিই অসমিয়া।  যে বক্তৃতার কথা লিখলাম সেখানে ড০ হাকাচামও স্পষ্টতই বলেছেন , তিনি অসমিয়া বটে , কিন্তু অসমিয়া তাঁর মাতৃভাষা নয়। ধাতৃভাষা । তাঁর মাতৃভাষা রাভা ।  কিন্তু মুস্কিল হলো, এই দুই প্রবণতার মধ্যেকার জলবিভাজন রেখাটি প্রায়ই অস্পষ্ট। তাছাড়া, যেখানে ভারতের অধিকাংশ লোকই দেশপ্রেমের কোনো পরীক্ষা না দিয়েই , অথবা অনেক সময় তেমন কোনো পরীক্ষাতে ব্যর্থ হলেও ভারতীয় থেকে যান, সেখানে একজন  ব্যক্তি যার মাতৃভাষা অসমীয়া নয় তাকে যদি সারাক্ষণ অসম প্রেমের পরীক্ষার মধ্যি দিয়ে জীবন যাপন করতে হয় তবে জীবন যে কত স্পর্শকাতর আর দুর্বিষহ হয় সে প্রশ্নের উত্তর কখনো কোনো অন্যভাষীদের থেকে জানতে চাইলে জানা যেত। কিন্তু, সেটি চায় বা কে!
    এমন এক জটিল সামাজিক স্থিতিতেই উপেন রাভাকেও লিখতে হয়েছে এটি তাঁর বই পড়লেই বোঝা যায়। তাই তিনিও 'অসমীয়া' অবিধার ওই দুই প্রবণতাতেই যাতায়াত করেছেন। 'অসমীয়া আরু অসমর ভাষা-উপভাষা' বইএর মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন, “ইয়াত আলোচিত ভাষার সমলরাজি দরাচলতে উপভাষা (আঞ্চলিক), স্থানীয় উপভাষা নে নৃগোষ্ঠীয় উপভাষা--ইয়াক চিহ্ণিত আরু নামকরণ করাটো অতিশয় স্পর্শকাতর বিষয়।” বর্তমান লেখককেও তেমনি সামাজিক স্থিতির কথা মনে রেখেই   এই প্রবন্ধ লিখে যেতে হচ্ছে । তাঁর এই স্বীকারোক্তি কিম্বা সঞ্জীবের পূর্বোক্ত সংশয় এটিও প্রমাণ করে   যে ভারত তথা অসমে  নিরাসক্ত নিরপেক্ষ সমাজবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্যে সামাজিক পরিবেশ এখনো তেমন অনুকুল নয়।  
                            ড০ উপেন রাভা হাকাচাম কেবল অসমেরই নন, তীব্বত বর্মীয় ভাষাগোষ্ঠীর উপর তিনি এখন গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চলেই একজন খ্যাতনামা এবং নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ।   গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসমিয়া বিভাগের অধ্যাপক ড০  হাকাচাম তিব্বত বর্মী ভাষা এবং ভাষাতত্ব পড়িয়ে থাকেন। বাংলাতে ভোট বর্মী বা অষ্ট্রিক মূলীয় ভাষাগোষ্ঠীদের নিয়ে বিস্তৃত অধ্যয়ন এখনো দুর্লভ। অসমীয়াদের মধ্যে ড০ প্রমোদ চন্দ্র ভট্টাচার্য  A Descriptive Analysis of the Bodo Langauage নিয়ে সেই ১৯৬৫তে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেছিলেন। সেটি বই হিসেবে বেরোয় ১৯৭৭এ। তিনি এর পরেও কিছু কিছু কাজ করলেও ঠিক দুই দশক পর ১৯৯৭তে লেখা হলো আরেকটি দিকদর্শক  বই ‘Rabha and Assamese Languages: A Comparative Studies’ ড০ উপেন রাভা হাকাচামের পি এইচডি গবেষণা পত্র।  তাঁর পরে তিনি রাভা, অসমিয়া এবং ইংরেজি ভাষাতে এই পথে নিরলস কাজ করে চলেছেন। তার মধ্যে অসমিয়াতে লেখা দু’টো বই আমাদের বর্তমান নিবন্ধের জন্যে বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য। একটি ‘অসমীয়া আরু অসমর তিব্বত-বর্মীয় ভাষা’ এবং দ্বিতীয়টি ‘অসমীয়া আরু অসমর ভাষা উপভাষা।’ এই দুটিতেই তিনি অসমের প্রায় সমস্ত ভাষাগুলোকে ছুঁয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন। শুধু হিন্দি এবং বাংলা ছাড়া ।  সম্ভবত এটি ধরে নিয়েছেন যে এ দুটো অসমের বাইরের ভাষা ।  কিন্তু হিসেব মেলে না যখন দেখি, নেপালি আর সাদরি ভাষার সঙ্গে বইগুলোতে সিলেটি আর ময়মন সিংহের বাংলা উপভাষা দিব্বি জায়গা করে নিয়েছে। কারণটি বোঝা যায় যদি, ভেবে নিই আসলে তিনি অসমে প্রচলিত ভাষাগুলো নয় ঠিক সেই ভাষাগুলো নিয়েই অধ্যয়ন করেছেন যেগুলোকে কোনো না কোনো ভাবে অসমিয়া ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে এনে ফেলে দেয়া যায়।  সিলেটিকেও অসমিয়ার একটি উপভাষা বলতে বলতে থেমে গেছেন। জোর দিয়ে বলতে যে পারছেন না, তাই নিয়ে তাঁর আক্ষেপও অস্পষ্ট নয়। কেন আর কেমনতর আক্ষেপ সে নিয়ে আমরা যথা স্থানে লিখব। কিন্তু এই তথ্য জানিয়ে দেয়া ভালো যে এই দুট বইএর প্রথমটিতে ২৭৬ থেকে ৩০০ অব্দি ২৫ পৃষ্ঠা এবং দ্বিতীয়টিতে ১০ থেকে ১৩ অব্দি ৩ পৃষ্ঠা তিনি সিলেটির জন্যে বরাদ্দ করেছেন। আলাদা করে লিখলে শুধু এইগুলো নিয়েই একটি ছোট্ট কিন্তু মূল্যবান পুস্তক হয়ে যেতে পারে । 
        যে মুখবন্ধের কথা আমরা লিখছিলাম সেখানেই তিনি খানিক পরে লিখছেন , “সেইদরে হাজং, মৈমনসিঙীয়া,চিলটীয়া (কাছারী), দেহান, রাজবংশী আদি বাংলা বা অসমীয়ার একোটা উপভাষা হিচাপেহে বিবেচিত হৈ আহিছে যদিও বর্তমান স্বতন্ত্র ভাষা হিচাপে স্বীকৃতি প্রদানর ক্ষেত্রত সেই সেই ভাষা-ভাষীর মাজত রাজনৈতিক আরু বিদ্যায়তনিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাইছে।” তথ্য হিসেবে কথাগুলো মোটের উপর সঠিক। শুধু, 'দেহান' রাজবংশীরই একটি উপভাষা হলেও এখনো তাদের মধ্যে ভাটি অসমের  রাজবংশীর মতো অসমিয়ার থেকে বেরুবার তাগিদ নেই। আর 'সিলেটি'দের অতিক্ষুদ্র এক বাংলাদেশি অংশই এখনো ওই স্বাতন্ত্র্যের দাবিদার। মৈমনসিংহমুলীয়দের যারা অসমিয়া বলে এককালে লিখিয়েছিলেন তাদের মধ্যে এখন বাংলা মূলে ফিরে আসবার প্রবণতা বাড়ছে । হাজং এবং রাজবংশীদের দাবিটা বোধহয় বিশুদ্ধ, কিন্তু স্বীকৃতি মিলছে না ।
    সিলেটি উপভাষা নিয়ে তিনি এই বইএর  পঞ্চম অধ্যায়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন।  সে অধ্যায়ের নাম “ অসমীয়ার জাতিগত/ সামাজিক শ্রেণিগত উপভাষা” এর উপ-অধ্যায় বিভাজনও বেশ চিত্তাকর্ষক ।  ১) চাহ জনগোষ্ঠীর কথিত ভাষাঃসাদরি বা বাগানীয়া ;২) অভিবাসী মুসলমানর কথিত ভাষা (ভাটিয়া) আরু বাংলার মৈমন সিং উপভাষা;৩) নেপালী সকলরর কথিত অসমীয়া আরু অসমর নেপালী ভাষা; ৪) বরাক উপত্যকার চিলেটিয়া (কাছারী) উপভাষা; ৫) কাছারর দেহান বা ধেয়ান উপভাষা।
              মুখবন্ধেও  তিনি অসমের বেশ কিছু সামাজিক শ্রেণি উপভাষার নাম করেছেন , “নেপালী সকলর নেপালী- অসমীয়া, অভিবাসী সম্প্রদায়র উজানী (দেশী) আরু ভাটিয়া (ময়মন সিঙীয়া) অসমীয়া, কাছারর বাঙালীসকলর চিলেটীয়া (কাছারীয়) অসমীয়া, অভিজাত আরু শিক্ষিত বাঙালী পরিয়ালর ঔপনিবেশিক অসমীয়া (ব্রিটিছর দিনত মফচলীয় আমোলাপট্টিত আরু সম্প্রতি রেলোয়ে কলনিত এনে ভাষার নমুনা পোয়া যায়) ,নগর-মহানগর কেন্দ্রিক মাড়োয়ারী  সম্প্রদায়র হিন্দী মিশ্রিত বজরুয়া অসমীয়া (broken Assamese), কুলি-নাপিত-ধোবা-রিক্সাওয়ালা আদি বৃত্তিজীবি লোকর দেশোয়ালী অসমীয়া  ইত্যাদি  এই শ্রেণীর অসমীয়ারূপে অতি সম্প্রতি বহুভাষিক অসমীয়া মাতৃভাষী চাকরিজীবি ,ব্যবসায়, গৃহীণী আরু ছাত্র-ছাত্রীকো প্রভাবান্বিত করি 'চলতি অসমীয়া' বা 'জনপ্রিয় অসমীয়া ভাষা'র প্রচলনত ইন্ধন যোগাইছে।” এর থেকে স্পষ্ট তিনি 'চিলেটীয়া অসমীয়াদে'র 'অসমীয়া মাতৃভাষী'দের সঙ্গে একাকার করছেন না। বরং সিলেটিকে অসমের ভাষা অর্থেই অসমিয়া বলছেন। তাহলে এই ভাষাগুলোকে তিনি উপভাষা কেন বলছেন এই প্রশ্ন উঠতেই পারে । এই প্রশ্নও অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে যে মূল অধ্যায়ে তিনি মারোয়াড়ি বা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার রেল ওয়ে কলোনির বাংলাকে নিয়ে আলোচনা করতে উৎসাহ দেখালেন না কেন? শুধু তিনিই নন, প্রায় কোনো অসমিয়া ভাষাবিদকেই এদের নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করতে দেখা যাবে না।
      সাদরি ভাষাকে যে তাদের ভাষাবিশেষজ্ঞরা স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে দাবি করেন সেটি তিনি মূল অধ্যায়ে বেশ সম্মানের সঙ্গেই উল্লেখ করেছেন , “সাদরি ভাষার বিশেষজ্ঞসকলর মতে ই এটা স্বতন্ত্র আরু পূর্ণাঙ্গ ভাষা , ই কারো মিশ্রিত ভাষা নহয়।” সাদরিকেই সুকুমার সেন প্রমুখ অনেকেই  বাংলার ঝাড়খন্ডি উপভাষা বলবার ভুল করেছিলেন । উপেন রাভা হাকাচামও কিন্তু   লিখেছেন, '...সেইবাবে বহুতে সাদরিক বাংলার ভগ্নীভাষা বুলিহে ক'ব বিচারে......সামাজিক আরু রাজনৈতিক কারণত বাংলা ভাষাই যিমান দ্রুতবেগত বিকাশ আরু বিবর্তন লাভ করিবলৈ সক্ষম হৈছে; তার বিপরীতে সাদরি ভাষার এটা বিশেষ সময়লৈকে বিকাশর ধারা আছিল তেনেই স্তিমিত। সেই কারণে বাংলার ভগ্নীভাষা হোয়া সত্বেও দুয়োটার মাজত দূরত্ব বাঢ়ি গৈছে...।” অসমে এর উপর অসমিয়ার ব্যাপক প্রভাব পড়বার বিষয়ে তিনি এর পর বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। এতে ভাষাতাত্বিক দিক থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যেত যে এখানে সাদরির আরো এক বা একাধিক উপভাষা গড়ে উঠেছে। কিন্তু, সিদ্ধান্ত ভাষাতাত্বিক না হয়ে হয়ে পড়ে ভাষারাজনৈতিক। তিনি এর পরে লেখেন, “...যেতিয়ারে পরা অসমর চাহ-বাগিচাসমূহত শিক্ষার মাধ্যম হিচাপে অসমীয়া ভাষা সাহিত্যর পঠন-পাঠন হ'বলৈ ধরিলে, আনকি বহু প্রাক্তন চাহ-বনুয়াই ঘাই অসমীয়া জনজীবনর লগত মিলি জীবন নির্বাহ করার ( বৈবাহিক আরু সামাজিক ভাবেও) পরিবেশ রচনা করিলে তেতিয়াই অসমীয়ার এই স্থানীয় উপভাষা বা মান্য অসমীয়াই তেওঁলোকরো মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করিবলৈ ধরিলে।” একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র ভাষার একাংশ কালে গিয়ে  আরেকটি স্বাধীন স্বতন্ত্র ভাষার উপভাষা হয়ে উঠতে পারে কিনা সেই ভাষাতাত্বিক প্রশ্ন তোলাই রইল। তাঁর কিন্তু বিশ্বাস, স্বাধীন স্বতন্ত্র অসমিয়া ভাষার একাংশ সিলেটি ভাষাটিও কালক্রমে বাংলার উপভাষা হয়ে পড়েছে । কীভাবে---- সে কথাটি আমরা পরে আবার পাড়ব। কিন্তু , এমন এক সিদ্ধান্ত যা একেবারেই ভাষাবিজ্ঞানের বিষয় তাই নিয়ে  নিয়ে আলোচনা করবার কোনো মুক্ত পরিবেশ আছে কিনা সেই প্রশ্ন কিন্তু আমাদের মনে তীব্রভাবেই রয়েছে । প্রশ্নটি তুলতে চাইলেই সঞ্জীবের মতো বলে দেয়া হতে পারে,আর সেটি অসমিয়া হতে চাওয়া বা হয়ে  যাওয়া সাদরিরাও  বলতে পারেন, “এদের পেছনে কিছু সন্দেহজনক চক্রও সক্রিয়, যারা অসম আর অসমীয়াকে ভাগ করতে চায়। ” এই কথাও আমাদের মনে রাখা ভালো যে সাদরিকে বাংলার কিম্বা হিন্দির  উপভাষা বলে চালিয়ে দেবার মতো লোকের অভাবও কিন্তু এই অসমেও কম নেই। বরাক উপত্যকাতে এদের হিন্দিভাষী বলে চালিয়ে দিয়েই ভোটের রাজনীতিটি হয়ে থাকে। ১৫ জন  ভাষা শহিদের উপত্যকাতে  কেউ এখনো এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবার সাহস করে উঠতে পারেন নি।
              মৌখিক ভাবে দুই উপত্যকাতেই  সাদরি 'চা-জনজাতির' বা 'বাগানীয়া' ভাষা হিসেবেই অত্যন্ত অপমান জনক ভাবে পরিচিত। সাধারণ লোকে এদের 'কুলি', 'লেবার'ও বলে থাকেন, তা ব্যক্তিটি যদি কলেজ অধ্যাপক হন তবুও। উপেন রাভাও 'বাগানীয়া' শব্দটি ব্যবহার করেছেন।তাই,  সাদরি ভাষার একাংশ  অসমে নিজেদের ঝাড়খন্ডি জনজাতি হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই লড়ছেন। সাদরিতে আজকাল রেডিও টিভিতে স্বতন্ত্র অনুষ্ঠান হয়েই থাকে ।  অদূর ভবিষ্যতে তারাও সেই প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলো তুলতেই পারেন। অবশ্যি এই প্রবণতাও দেখবার মতো যে অসমিয়ার এক উপভাষা বলে প্রচারিত হওয়া সত্বেও সাদরিতে অসমে যত গান, চলচ্চিত্র ইত্যাদি তৈরি হয়েছে সম্ভবত বাংলাকেও সেখানে পেছনে ফেলে দিয়েছে। 'চামেলি মেমসাহেবের' মতো সাদরি -অসমিয়া মিশ্রিত ধ্রুপদী ছায়াছবি অসমেই তৈরি হয়ে ভারত বিজয় করতে সমর্থ হয়েছিল। পরে এর বাংলা ও হিন্দি সংস্করণও বেরিয়ে দর্শক মন মোহিত করেছিল।
                  এতো কথা আমরা লিখলাম এই কথা স্পষ্ট করতে যে , বিবাদটি নেহাতই অসমিয়া বনাম সিলেটি বাংলার নয়। বিবাদটি ভাষা বিজ্ঞান বনাম ভাষারাজনীতিরও বটে ।  এই বিবাদ  ভাষা নিরপেক্ষভাবে 'জাতীয়তাবাদে'র ধারণার আভ্যন্তরীণ বিসঙ্গতিরও পরিণাম বটে, শুধু মাত্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদের নয়। শুধু সিলেটি-অসমিয়ার তুলনা করে কিম্বা না করে বিষয়ের সমগ্রতাকে বোঝা যায় না মোটেও।  আমি জানি না, ড০ হাকাচাম বর্তমান লেখকের অনুরোধ মনে রেখেছেন কি না। তাঁকে একান্ত আলাপে অনুরোধ জানিয়েছিলাম, তীব্বত-বর্মী ভাষাগুলোর গবেষক হিসেবে তাঁর উচিৎ কেবল বর্তমান অসম কিম্বা পূর্বোত্তর ভারত নয় প্রাচীন কামরূপ এবং তার সংলগ্ন এলাকা তথা বর্তমান বাংলাদেশের  দিকেও  দৃষ্টি দেয়া। তাতে, এ অঞ্চলের ভাষাগুলোর আরো অনেক অনেক নতুন দিক সামনে চলে আসবে। যে কথা তাঁকে বলিনি তা এই যে , ঢাকা কিম্বা চট্টগ্রামের উপভাষাগুলোর সঙ্গেও অসমীয়া ভাষার মিল খুব একটা কম পাওয়া যাবে না।  সেগুলোরও অধ্যয়ন করলে হয়তো 'সিলেটি'রা কেন নিজেদের   অসমিয়া বলে না এই নিয়ে তাঁর আর কোনো আক্ষেপ  থাকবে না। সিলেটি যদি অসমিয়া হয়, তবে সমগ্র পুব বাংলার ভাষাকেও তাই হতে হয় বৈকি । কেননা সেই সমস্ত উপভাষা /স/ কে /হ/ উচ্চারণ করে আর বর্গীয় সমস্ত অঘোষ অল্পপ্রাণকে মহাপ্রাণপ্রায় করে ফেলে। পুব বাঙালিরা বিশুদ্ধ বাংলা /ক,ত,চ,ট,প/ উচ্চারণ করতেই পারে না। আর চাটগেঁয়েরা অসমিয়াদের মতোই নঞার্থক অব্যয় ক্রিয়াপদের আগে  ---'নাযাও', 'নাখাও' ইত্যাদি শব্দে যেমন----উপসর্গের মত ব্যবহার করেন। এখন, যদি এই তর্ক করি যে সিলেটিরা অসমে থাকেন বলেই অসমিয়া, আর অন্যেরা যেহেতু অসমে থাকেননা , তাই তাদের ভাষাগুলোর সঙ্গে অসমিয়ার মিল আশি শতাংশ থাকলেও  সেগুলোকে অসমিয়া বলে যাবে না তবে স্পষ্টতই সে তর্ক ভাষাবিজ্ঞানের সীমার থেকে বেরিয়ে পড়ে। উপেন রাভার নিজের জনগোষ্ঠঈ 'রাভা'রা এই যুক্তিতে অসমে হয়ে পড়েন অসমিয়া, বাংলাদেশ আর পশ্চিম বঙ্গে বাঙালি। আর তাই সিলেটি বনাম অসমিয়ার আলোচনা সেই ১৯১৩র বেণুধর রাজখোয়ার ' Notes on the Sylhetee Dialect'  বইএর বাইরে যায়ই না। সব্বাই ঐ ওখান থেকেই শুরু করেন।  ড০ হাকাচামও তাই করেছেন।
।।  সিলেটি   বনাম  কাছাড়ি   উপভাষা ।।
                   সিলেটি ভাষা এবং তার ভাষা এলাকার সম্পর্কে শুরুর তথ্যগুলো  উপেন রাভা গ্রীয়ার্সন আর সুনীতি চট্টপাধ্যায় থেকে নিয়েছেন। গ্রিয়ার্সনেই উল্লেখ আছে এর এক স্থানীয় বৈচিত্র 'কাছাড়ি' বলেও পরিচিত , ওখানকার  লোকেরা ওই নামেই ওকে চেনে।  সঞ্জীব 'বাঙ্গালনামা'তে প্রকাশিত প্রবন্ধে লিখেছেন, “এর মধ্যে আবার কাছাড়ের সিলেটি উপভাষার সঙ্গে সদর সিলেটের ভাষার কিছু পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্য মূলতঃ উচ্চারণগত। " ' তুই কিতা কররে 'আর  'তুইন  কিতা করিতরে' এই দুই বাক্যের পার্থক্য কেবল উচ্চারণের নয় রূপতত্বেরও বটে।সঞ্জীবের মতো  উপেন রাভা এ কে বৈশ্যের Case Marker in Sylheti' প্রবন্ধের  উল্লেখ করে পাদটীকাতে লিখেছেন , “স্থানীয়    লোকে ইয়াক অকল ছিলটি  (Sileti) বুলিয়ে চিনাকি দিয়ে।”  কেন  অমনটি লিখলেন এটি আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় । সত্য হলো,শুধু মাত্র সিলেটিরাই 'কাছাড়ি'র অস্তিত্বকেও অস্বীকার করবার চেষ্টা করেন। এতে দুটো বাঘকে এক সঙ্গে শিকার করা যায়।    'কাছাড়ি'কে আলাদা করে নিয়ে যাবার অসমিয়াদের প্রয়াসকে রোখা যায়, সিলেটিদের সংখ্যা বাড়িয়ে ফেলে সামাজিক আধিপত্য সুরক্ষিত করা যায়। আসল রাজনীতিতো সেই আধিপত্যেরই, তাই না? 
                     অনেকে 'কাছাড়ে'র সংস্কৃত উৎসের সন্ধান করবার চেষ্টা নানা সময় করেছেন ,কাছাড়ি' শব্দটি  কিন্তু স্পষ্টতই বডো কাছাড়িদের সঙ্গে সম্পৃক্ত । সেটি যে স্থানীয় ভাবে প্রচলিত নাম এই তথ্যের উল্লেখ  উপেন রাভার  পক্ষে সুবিধে জনক হতো।  এই সুবিধের কথাটি   পাদটীকাতে  তাঁর দাবিটি থেকেও স্পষ্ট, যেখানে তিনি জানাচ্ছেন, শব্দটি প্রথমে ভোলানাথ  তিওয়ারী ব্যবহার করেন । পরে  ড০ উপেন্দ্র নাথ গোস্বামী তাঁর 'অসমিয়া ভাষা আরু উপভাষা' এবং ড০ প্রমোদ চন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর ' অসমর অবিভক্ত কাছাড় জিলার ভাষা উপভাষা' 'বইতে 'কাছাড়ি' নামটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন।  সিলেটি অসমিয়া বিতর্কে এই কাছাড়ি প্রসঙ্গও আরেক চিত্তাকর্ষক বিষয়। ১৯৮৮তে হাইলাকান্দিতে অনুষ্ঠিত অসম সাহিত্য সভার অধিবেশনে এই কাছাড়িকেই 'বরাকি'ভাষা নাম দিয়ে এই চেষ্টা হয়েছিল যদি ওই টুকরোকে অন্তত অসমিয়ার অনুগত ভাষা করে ফেলা যায়। জগন্নাথ চক্রবর্তী এই উপভাষাকেই  'বরাক বাংলা' নাম দিয়ে তাঁর অভিধান লিখেছেন বলে আমাদের ধারণা। অভিধানে এর সংজ্ঞাটি অনেকটাই অস্পষ্ট। তিনি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন, তখন তাঁর এক আত্মীয় এসে তাঁর মুখে 'গ্রাম্য বাংলা' শুনে ভর্ৎসনা করেছেন বলে এক সংবাদ তিনি দিয়ে রেখেছেন। ঐটেই আসলে 'কাছাড়ি' বাংলা।  বরাক উপত্যকাতে বাস করে অভ্যস্থ এমন যে কেউ শুনলেই বোঝেন কে কাছাড়িতে আর কে সিলেটিতে কথা বলছেন।গ্রীয়ার্সনও উল্লেখ করেছেন, স্থানীয় সিলেটিরা একে 'মুসলমানি' বাংলাও বলে থাকেন ,এটা না জেনেই যে এই ভাষাতে  ওখানকার   প্রাচীন   হিন্দুরাও, যারা মূলত গ্রামে থাকেন,  কথা বলেন।  এই প্রাচীনদের বাসভুমি ও ভাষাঞ্চলকে  সঠিক ভাবেই জগন্নাথ  বরাক উপত্যকার মূল ভাষাঞ্চলের বাংলা বলছেন। সিলেটিকে তিনি অন্য নব্য আগন্তুকদের সঙ্গে আগন্তুক ভাষাঞ্চলের বাংলা বলে স্বতন্ত্র করেছেন। 
                    গ্রিয়ার্সন মাগধী প্রাকৃতের চারটি ঔপভাষিক বৈচিত্রের কথা লিখে গেছেন। তার মধ্যে 'কামরূপী' প্রাকৃতের মধ্যে পূর্বী শাখাতে রয়েছে অসমিয়া, পশ্চিমা শাখাতে রয়েছে  উত্তর বাংলার  কোচ বিহার জলপাইগুড়ির  বাংলা ভাষা , রাজবংশী সহ। সিলেটি 'বঙ্গ-প্রাকৃতে'র পূর্বী শাখার অংশ। পরে কী করে এই সিলেটি 'কামরূপী' উপভাষার অঙ্গ হয়ে গেল এটিও আমাদের কাছে বেশ ধোঁয়াসা। সুকুমার সেনও এমন ঔপভাষিক বিভাজন টেনেছেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যথার্থ ভৌগলিক ভাষা জরিপ তখনো হয় নি। এমন কিছু তথ্য সূত্র থেকে উপেন রাভা হাকাচাম এও দাবি করেছেন যে , “ অসমিয়ার গোয়ালপরীয়া বা রাজবংশী উপভাষার সৈতে বিশেষ সম্পর্ক থকা দেহান বা ধেয়ান উপভাষারো বিশেষ বরঙণি নথকা  নহয়।” চিলারায়ের সেনা বাহিনীর সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র নদী, বড়াইল পাহাড় অতিক্রম করে গিয়ে কোচ সেনাদের পরিবারেদের কেউ কেউ  ওখানে থেকে গিয়ে 'ধ্যানী' হয়ে গেছিলেন। এই ঘটনা ঘটেছে মাত্র এই সেদিন সতেরো  শতকে।  তাদের থেকে বাংলা কিছু শব্দ বাক্যের ঋণ নিয়েছে বটে। তাই বলে সেই ঋণ  প্রাচীনতর  বাসিন্দা কাছাড়ি -সিলেটিদের ভাষাকেই গড়ে তুলবে এ একটু কষ্ট কল্পনা বলেই আমাদের মনে হয়। অথচ তিনি দাবি করেছেন, “সেইবাবেই এই উপভাষাটোত প্রচলিত আরু কামরূপী উপভাষা বা অসমীয়া মান্যরূপত  প্রচলিত প্রায় শতকরা ৭৫টা শব্দই সজাতীয় (cognate) বুলি শব্দর সংখ্যানুপাতিক বিচারত ধরা পরে।” তিনি কোনো সংখ্যানুপাতিক বিচার করেন নি। এই কথাগুলো  তিনি নিয়েছেন  ড০ উপেন্দ্র নাথ গোস্বামী এবং ড০ প্রমোদ চন্দ্র ভট্টাচার্যের উপরোক্ত দুটি গ্রন্থের থেকে। আমাদের এই সংখ্যাতাত্বিক বিচার নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। এটি সঠিক হবার সম্ভাবনাই বেশি।   শতাংশের পরিমাণটা আর একটু বেশি হলেও আমাদের আনন্দিত বই আতঙ্কিত হবার কোনো কারণ দেখি না। বরং বড়াইল পাহাড় , বরাক সুরমা নদী অতিক্রম করে সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে  তিব্বত -বর্মী জনগোষ্ঠীগুলোর প্রব্রজনের সঙ্গে প্রাচীন কামরূপের সঙ্গে সম্পর্কিত করে এই সাদৃশ্যের সন্ধান করলে আরো অনেক পাকা ভিতের উপর তাঁর যুক্তি দাঁড়িয়ে যেত। বর্তমান মেঘালয়ের পশ্চিম পাশে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকা জুড়ে রঙপুর, দিনাজপুর, ময়মন সিংহ, জয়ন্তিয়া ইত্যাদি এলাকা যেখানে এখনো বড়ো, গারো, রাভা, রাজবংশীরা ব্যাপক সংখ্যাতে বাস করেন সেগুলোকে উপেন রাভা তাঁর অধ্যয়ন থেকে একেবারেই বাদ দিয়েছেন।    তিনি কাছাড়ি বা সিলেটিদেরকে বাংলাদেশের ওই জেলা বা মহকুমাগুলোর থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন করে বুঝবার চেষ্টা করেছেন।  বস্তুত প্রায় সমস্ত অসমিয়া ভাষাতাত্বিকেরা এই ভুল গুলো করে আসছেন বলে আমাদের মনে হয়। এমন কি অবিভক্ত সিলেটের দক্ষিণ এবং পশ্চিম ভাগের হবিগঞ্জ , সুনাম গঞ্জের ভাষাকেও তাঁরা কেউ হিসেবে নেন নি। কেন, এটি বোঝা খুব কঠিন নয়। যে বেনুধর রাজখোয়ার নোটকে তাঁরা 'বেদ'তুল্য মর্যাদাতে তুলে রেখেছেন সেই বেনুধর রাজখোয়া সিলেট মহকুমার প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন। সেই সময়ে ঐ নোটটি লিখেছিলেন। তিনিও সমগ্র জেলাকে অধ্যয়ন করেন নি।  অথচ হবিগঞ্জি, সুনামগঞ্জি উপভাষাগুলোও সে সময়ের অসমের ভেতরের সিলেটের ভাষা ছিল। 
                     রংপুর থেকে সিলেট -- এই সমগ্র এলাকার ঠিক মাঝখানটিতে এখনো বাস করেন খাসিয়ারা যাদের ভাষাটিতো অস্ট্রিক বটেই, শারীরিক গঠনেও অস্ট্রিক মিশেল ব্যাপক। বরাক নদীর তীরে বদরপুরের  সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দির, যেখানে  প্রতি বসন্তে বারুণী মেলা বসে এবং ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে কামাখ্যা মন্দির, যেখানে প্রতি বর্ষাতে অম্বুবাচি মেলা বসে ---ওই দুটোই আদতে অস্ট্রিক নরগোষ্ঠীর তীর্থভূমি ছিল এই উল্লেখ বহু ঐতিহাসিক করে গেছেন।  তাদের মধ্যে বাণিকান্ত কাকতিও রয়েছেন। তাঁর মতে কামরূপ একটি অষ্ট্রিক মূলীয় শব্দ। দুটোই  কিন্তু এখন বাঙালিদের প্রধান তীর্থ ক্ষেত্র। অসমীয়াদেরও বটে। কিন্তু বৈষ্ণব ধর্মের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের পর  অসমীয়াদের মধ্যে কামাখ্যার গুরুত্ব সত্রগুলোর তুলনাতে কমে  গেছে। বর্তমান উত্তর কাছাড়ের জেলা সদরের নাম হাফলং, আর  ওদিকে মেঘালয় সিলেট সীমান্তে তেমনি এক শৈলশহরের নাম জাফলং। প্রথমটির মূল বাসিন্দারা এখন যদিও ডিমাসা কাছাড়িরা, দ্বিতীয়টির মূল বাসিন্দার কিন্তু সেই খাসিয়ারা। কোথাওতো এই দুই নরগোষ্ঠীর ইতিহাস এসে মিলে গেছে, নতুবা দুইপ্রান্তের দুই শহরের নামে এতো সুন্দর সাদৃশ্য হবে কেন?   নীহার রঞ্জন যেমন  বাঙালিদের বেলা  বডো মিশ্রণ প্রায় নেই বলে বলেছিলেন, বাণীকান্ত কাকতি অসমিয়াদের ক্ষেত্রেও ওই একই কথা লিখে গেছেন--- সেই তথ্যের উল্লেখ উপেন রাভা নিজেই করেছেন। তার মানে অসমিয়া -সিলেটিদের মধ্যে অস্ট্রিক মিশেলটাকেও অস্বীকার করা একেবারেই যাবে না। এই সমস্ত উপকরণই যে সমগ্র পূব বাংলার লোকেদের অসমিয়াদের ঘনিষ্ঠ করেছে সেদিকে দৃষ্টি দিলে লাভ বই ক্ষতিটা কোথায় বোঝা আপাত দৃষ্টিতে কঠিন হলেও, এই অনুমান আমরা করতেই পারি যে এতে না বাঙালিরা না অসমিয়াকেই বাংলা বলে ফেলবার 'মওকা' পেয়ে যান এই আতঙ্ক কোথাও না কোথাওতো রয়েইছে। মেঘালয়ের পুবে শুধু বড়াইলের দিকে চোখ না ফেলে পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্রের যে অংশটি বাংলাদেশের মধ্যি দিয়ে গেছে সেদিকে দৃষ্টি দিলে ড০উপেন রাভা দেখবেন ওখানে রাভা, বডো, গারোদের ভাষার স্বতন্ত্র স্বীকৃতি নেই। সত্যিই ওখানে তাদের বাঙালির অংশ করে ফেলবার দুষ্প্রয়াস চলছে! অসমে সিলেটি কেন অসমিয়া হলো না সেই আক্ষেপ না করে বাংলাদেশে 'রাভা' কেন বাংলা হতে যাবে, --- সেই প্রশ্নটি তোলা তাঁর পক্ষে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়বদ্ধতার কাজ হবে, নয় কি? ভাষা তত্বের দিক থেকেও প্রশ্নটি বেশ সঙ্গতিপূর্ণ। 
                   অসমিয়া সিলেটির সাদৃশ্য দেখাতে গিয়ে এর পরেই উপেন রাভা হাকাচাম বেণুধর রাজখোয়ার উল্লেখ করেছেন। বেণুধর রাজখোয়ার নোটে পাওয়া যায় , “সিলেট অঞ্চলতো অসমর দরে প্রাতঃস্নান করি মেজি জ্বলাই চুঙা-পিঠা আরু অন্যান্য পিঠা-পনারে মাঘবিহু উদযাপন করা,পথারত নরাবিলাক রৈ যোয়াকৈ মুঠি বান্ধি (গুরির পরা কাটি আঁটি বন্ধার বিপরীতে) ধান দোয়া-চপোয়া করা, আই-বাইসকলর নাম গোয়া (সংকীর্তন) আদি দেখা পোয়া যায়। বিভিন্ন জাতি , বৃত্তি, খেল, ফৈদর বা বিষয়বোরর লগত জড়িত উপাধি (শর্মা, দাস, ডোম-পাটনি;” --এ পর্যন্ত বিশেষ  কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু , “ চিলেটর প্রাচীন নাম গোর ( গৌড়)র লগত অসমীয়া মুসলমানসকলক সূচোয়া গরিয়া শব্দর সাদৃশ্যতা--ফা প্রত্যয়ান্ত রাজবংশীয় লোকর নামর সমাহার (সুধর্মফা, জনকফা, রত্নফা); সাধারণ লোকর নামকরণত রাম শব্দর সমাহার (জয়রাম, কালীরাম, কানাইরাম, লখাইরাম, ধনীরাম, লবরাম); অসমীয়ারে বিশ্লেষণ করিব পরা স্থান নামর প্রাধান্য (বুঢ়া গোঁহাই বা বুড়া গোয়াইনর লগত জড়িত গোয়াইন ঘাট, কোঁয়রর লগত জড়িত কুয়রগড়, হাজারিকীয়া বা হাজরিকার লগত জড়িত হাজারকী অঞ্চল, বরুয়ার লগত জড়িত বরুয়া (পাহার), অসম বা আসামর লগত জড়িত আসামপাড়া, আসামপুর আদি স্থান, বগা বা বোকা আরু পানীর লগত জড়িত বগাপানী ইত্যাদি স্থাননাম) অসমীয়ার সৈতেহে তুলনীয়, বাংলা বা অইন ভাষা গোষ্ঠীর লগত নহয়।” অসমিয়া মুসলমানদের একাংশ গৌড়ের নবাব হুসেন শাহের আমলে গৌড় বাংলা থেকে এসছিলেন বলে তাদের 'গরিয়া মুসলমান' বলা হয়ে থাকে বটে। এখন, এই 'গরিয়া'দের দেখিয়ে যদি কাউকে অসমীয়া বলে দাবি করা যায় তবে সে গৌড়বাংলার সমস্ত মানুষকে। খামোখা সিলেটিদের নিয়ে এই অযৌক্তিক টানাটানি কেন ? শুধু এই মাত্র তথ্যই প্রমাণ যে বেণুধর রাজখোয়ার 'নোটস' খুব একটা নির্ভর যোগ্য গ্রন্থ হতে পারে না। কোনো সিলেটি বইটি পড়ে সন্তুষ্ট হয়ে অসমিয়া হতে চাইবেন, এই সম্ভাবনা দূর অস্ত। সিলেট ইতিহাসের কোনো এক কালে খুব অল্প সময়, গৌড় গোবিন্দের রাজ্যের অধীনে ছিল বটে কিন্তু এর প্রাচীন নাম সমতট, হারিলেক,বঙ্গ এমন কি সরাসরি কামরূপ  ছিল বললেও সহ্য করা যায়, গৌড় ছিল না কখনোই! রাম শব্দের সমাহার দেখিয়ে অসমিয়াদের সঙ্গে আত্মীয়তা দাঁড়ায় না কিছুতেই। গেল বছরের নোবেল জয়ী রসায়নবিদ বেঙ্কটরমন রামকৃষ্ণন থেকে শুরু করে শাক্ত বাঙালিদের পরম আদরের রামকৃষ্ণ পরমহংস অব্দি সবার সম্পর্কে তবে বলতে হয়, তাদের নামের সম্পর্ক অসমিয়া ভাষার সঙ্গে 'অইন ভাষা গোষ্ঠীর লগত নহয়।' আসাম পাড়া , আসাম পুর স্থাননাম থাকা এমন কোনো অসম্ভব নয়, এরকম ব্রহ্মপুত্র এলাকাতে 'বঙালি পাড়া', 'বঙালমারা' ইত্যাদি স্থান নাম প্রচুর রয়েছে।  সুধর্মফা, জনকফা, রত্নফা ইত্যাদি ফা-প্রত্যয়ান্ত নাম সিলেটিদের মধ্যে কখনো কেউ শুনেনি। এ তিনি কোথায় পেলেন অনুসন্ধান করতে হবে। তেমনি করতে হবে   কুয়রগড় বলে কোনো স্থান নাম আদৌ আছে কি না।'গোয়াইন ঘাট' আছে মেঘালয় সীমান্তে। কিন্ত এটি দ্রুত উচ্চারণে য়-শ্রুতির নিদর্শন বলেই মনে হচ্ছে। 'গোয়াইন' ব্যাপক প্রচলিত শব্দ নয়। মেঘালয় সীমান্তের এই স্থান নামে গারো বা খাসিয়া উচ্চারণের প্রভাব থাকাও অসম্ভব নয়। সিলেটিরা /স/ কে /হ/ উচ্চারণ করে বটে কিন্তু শব্দের মাঝে থাকলে স্পষ্ট /শ/ উচ্চারণ করে--- 'গোঁসাই' , বাঁশকান্দি। আদিতেও সর্বত্র /শ/ ধ্বনিটি বাদ দেয় না-- সুনামগঞ্জ , সুরমানদী। 'কুয়র' সিলেটিতে প্রচলিত শব্দ নয় বলেই জানি। 'হাজার' একটি বিশুদ্ধ বাংলা শব্দ। (হাজার বছর ধরে পথ হাঁটিতেছি...; বনলতা সেন; জীবনানন্দ দাস।)  অসমিয়া শব্দটি     'হেজার' ।   তার থেকেই অসমিয়া  উপাধি “ হাজারিকীয়া বা হাজরিকা” চন্দ্রকান্ত অভিধান অনুযায়ী এই উপাধির ইতিহাস হলো , “আহোম রজার দিনর এহেজার কাঁরীর ওপরত থকা বিষয়ার উপাধি ।”  এই থেকে বুঝি বুঝতে হবে, সিলেটের 'হাজরকী' অঞ্চল নামটি অসম থেকে গেছে! হাজার শব্দটিতো  অসমীয়া বাংলা দুই ভাষাতেই  এসছে ফারসী থেকে। বাংলাদেশের বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলার এক স্থাননামও  হাজরকি। সেই বগুড়া জেলার সঙ্গে তবে অসমের কোনো সম্পর্ক নেই কেন? কাছাড়ের মুসলমানদের মধ্যেও 'হাজারি' উপাধি রয়েছে। ভুঁইয়া, বড়ভূঁইয়া, লস্কর, বড় লস্কর ইত্যাদির মতো এই উপাধিও কাছাড়ি রাজাদের আমলে প্রচলিত হওয়া সম্ভব।অসমিয়া  'বড়ুয়া' উপাধিটি আহোম রাজাদের দেয়া। বাংলাদেশে এদিক থেকে শব্দটি যায়নি। বরং আহোম রাজারাও বৌদ্ধ ঐতিহ্য থেকে শব্দটি পাওয়া সম্ভব।  সিলেটি নয়, বরং চাটগেঁয়ে বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে বড়ুয়া বহুল প্রচলিত উপাধি। বাঙালি দিব্যেন্দু বড়ুয়া  একজন বিশ্ব দাবা চ্যম্পিয়ন। সুকুমার বড়ুয়া, বেণীমাধব বড়ুয়া বাংলাদেশের খ্যাতনামা লেখক। চিত্রপরিচালক প্রমথেশ বড়ুয়াকে বাঙালি বাঙালি বলেই চেনে। গোয়ালপাড়ার গৌরিপুরের এই রাজা যদিও বর্তমান অসমের লোক ছিলেন, তাঁর পৈত্রিক উপাধিটি আহোম রাজাদের থেকে পাবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।    চট্টগ্রামের দিকে এগুলে 'বড়ুয়া'শব্দযোগে আরো বহু স্থান নাম পাওয়া যাবে। সিলেট কাছাড়ে এক ধরণের মোটা শক্ত বাঁশের নাম 'বড়ুয়া', বরো ধানকেও অনেকে 'বড়ুয়া' ধান বলে। সংস্কৃতে শ্রেষ্ঠ অর্থে 'বর' অথবা 'বুদ্ধ' দুটো শব্দ থেকেই 'বড়ুয়া' এসে থাকতে পারে। উপেন রাভা প্রথমটির দিকে ইঙ্গিত করেন ।( অসমীয়া আরু অসমর তীব্বত -বর্মীয় ভাষা, পৃঃ৯৬) সিলেটি আর অসমিয়া উচ্চারণটি অবশ্যি একই । সিলেটিরাও 'বরুয়া' উচ্চারণ করেন। সম্ভবত পুব বাংলার কোনো উপভাষার মানুষই 'বড়ুয়া' লিখলেও উচ্চারণ করতে পারেন না। তার মানে 'বড়ুয়া' উপাধিটিকেও  যদি আত্মীয়তা করতেই হয় তবে শুধু অসমিয়া সিলেটিতে কেন, গোটা পুব বাঙালিদের সঙ্গেই করবে।      'বোকা' (কাদা) আর 'বগা' (সাদা) শব্দদুটোর অসমিয়া অর্থও এক নয়। 'বগাপানি' যেমন অসমেও আছে, তেমনি আছে মেঘালয়েও। মেঘালয় পাহাড় থেকে বয়ে যাওয়া এক উপনদীর নাম 'বগানদী'। 'বগা' শব্দটির সঙ্গে খাসিয়া ভাষার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কিনা সেটি দেখা যেতে পারে। উপেন রাভা নিজেইতো দেখছি তাঁর বইতে 'বগা' শব্দের এক মালয় উৎসের সংবাদ দিচ্ছেন। বক, বিওগ। ( অসমীয়া আরু অসমর তীব্বত -বর্মীয় ভাষা, পৃঃ৬৭)  মালয়েশিয়ার ভাষা মালয় একটি অস্ট্রিক ভাষা। সংস্কৃতে শব্দটি 'বলক্ষ', আহোমে পুক, রাভাতে বকা, গারোতে  গিপক, লেপচাতে আ-বক (ঐ) । অবশ্যি এগুলো তাঁর মতে বিতর্কিত তথ্য। অর্থাৎ, আর্য ভাষা থেকে তিব্বত বর্মী ভাষাগুলোতে গেছে না, উল্টোটা হয়েছে এ নিয়ে সংশয় থেকে গেছে। বাংলা  'বক' পাখি নামের উৎসও এই মালয় কিম্বা ভোট বর্মী শব্দ কিনা  এও ভাবা যেতে পারে। এই পাখি নাম থেকেও রঙ নামটি আসতেই পারে, পুরুষ 'বক' পাখিকে সিলেটিতে বলে ,  'বগা', ( কাছাড়িতে)  'বগুড়া' ।  ('ফান্দো পড়িয়া বগায় কান্দে রে !') অসমিয়াতে পাখি নামটি 'বগ' এবং 'বগলি' । কিন্তু সবচে বিশ্বাসযোগ্য উৎসের সন্ধান চট্টগ্রামের বান্দরবানের কাছে বাংলাদেশের সবচে' উঁচু উষ্ণ প্রস্রবণ বগাকাইন বা বগা লেক অব্দি গিয়ে পৌঁছুনো যেতে পারে। বগালেকের পাশে  বম, মুরং বা ম্রো, তঞ্চংগ্যা এবং ত্রিপুরা  ইত্যাদি  ভোট বর্মী জনজাতীয়রা বাস করেন। স্থানীয় জনজাতীয় উপকথা অনুযায়ী, অনেক  আগে ওখানে পাহাড়ের গুহায় একটি ড্রাগন বাস করতো। বম ভাষায় ড্রাগনকে বলে 'বগা' । ড্রাগন-দেবতাকে তুষ্ট করতে স্থানীয়রা গবাদী পশু উৎসর্গ করতেন। কিন্তু একবার কিছু লোকে মিলে  এই ড্রাগন দেবতাকে হত্যা করলে চূড়াটি জলমগ্ন হ্রদে পরিণত হয় এবং গ্রামগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে। ভূতাত্বিকদের মতে ওখানে হয় কখনো কোনো আগ্নেয়গিরি ছিল , নতুবা প্রকাণ্ড উল্কাপাত হয়েছিল।  তাতেই ঐ হ্রদ তৈরি হয়েছে। উপকথার আগুন উদগীরণকারী ড্রাগন বা বগার থেকে নাম পড়েছে 'বগা হ্রদ'  । এই হ্রদের থেকেও একটি ছোট্ট ঝরণা নিচে নেমে গেছে তার নাম 'বগাছড়া'। এর থেকে এটি বেশ স্পষ্টই বোঝা যায় তিব্বত বর্মী ভাষাগুলো থেকেই 'বগা' শব্দটি বাংলাতে এসে থাকবে । অসমিয়াতেও সেখান থেকেই এসে থাকবে। সিলেটির থেকে এর প্রচলন অসমিয়াতে বেশি। চাটগেঁয়ে বাংলাতে আছে কি না, আমরা জানি না।
                  জগন্নাথ চক্রবর্তী তাঁর অভিধানে 'বগা','বগুড়া' শব্দের সংস্কৃত 'বক' উৎসের উল্লেখ করেছেন। '-ড়া'টি তাঁর মতে স্বার্থিক প্রত্যয়।  অভিধানটিতে তিনি 'বরাক বাংলা' শব্দগুলোর কুকিচিন বা ভোট বর্মী উৎস নিয়ে আশ্চর্য রকম নীরব। যেগুলোর মূল খুঁজে পান নি 'অজ্ঞাত মূল' বলে থেমে গেছেন। কিন্তু সংস্কৃত উৎস পেলে তিনি ভীষণ রকম সরব। সম্ভবত এই উদ্দেশ্যে যে তাতে উপভাষাটির একটি সম্মান আদায় করে নিতে পারবেন। এতে করে তিনি তাঁর পুরো শ্রমটিকেই এক সীমাতে বেঁধে দিয়েছেন ।   উপেন রাভা হাকাচামও  এর পরে বাংলা-সিলেটি এবং অসমীয়ার এক দীর্ঘ তুলনা মূলক আলোচনা করেছেন। কিন্তু, কী মুস্কিল ! সিলেটি বলে তিনি যে শব্দ বাক্য গুলো তুলে দিয়েছেন তার সঙ্গে সম্প্রতি শারদীয়া আনন্দবাজারে' প্রকাশিত সমরেশ মজুমদারের গল্প 'ছায়া শরীরে'র সিলেটির মিল আছে। অর্থাৎ সেগুলোও বেশির ভাগ সময়ে সিলেটি নয়। তার চে'ও মজা হলো,  বাংলা বলে তিনি যে শব্দবাক্যের উল্লেখ করেছেন সেগুলোও অতি বিশুদ্ধ বাংলা। অর্থাৎ 'সাধু বাংলা' নামের কৃত্রিম ভাষাটি। ওই ভাষাতে কেউ কথা বলে না। অবশ্যি তিনি যে এটি ইচ্ছে করে করেছেন তা নাও হতে পারে। গ্রীয়ার্সনের বিশাল গ্রন্থেও এই ত্রুটি ছিল। তাঁকে যে সিলেটিরা উপকরণ গুটিয়েছিলেন তাঁরা সেই দলের লোক যাদের সম্পর্কে  সঞ্জীব লিখেছেন, “যারা সিলেটি বলেন অথচ শিষ্ট সমাজে এটা গোপন রাখতে চেষ্টা করেন।”     গ্রীয়ার্সনের তুলে দেয়া একটা গল্পে অমন অদ্ভূত মজাদার সিলেটি বাক্য প্রচুর আছে , “... আর সে তাহারে হূয়র রাখিতে বন্ধে পাঠাইল” যেকোনো সিলেটিরও এমন বাক্য শুনে পেটে খিল ধরবে।  এই ত্রুটি না বুঝেই উপেন রাভা ভেবেছেন , “যিহর দ্বারাই ই যে অসমীয়ারহে অতি ঘনিষ্ট তাক প্রমাণ করিব পরা যায়।” তাঁর এই দাবিটি মিথ্যে নয়, কিন্তু 'অসমীয়া' শব্দের পরে যুক্ত '-হে' প্রত্যয়টি অর্থবহ। বেণুধর রাজখোয়ার মতো আসলে তিনিও বলতে চাইছেন , “বাংলা বা অইন ভাষা গোষ্ঠীর লগত নহয়।”  আমরাও এর পরের অধ্যায়ে তাঁকে অনুসরণ করেই সেই চেষ্টাই করব।  কিন্তু সিলেটিকে সিলেটি আর বাংলাকে বাংলা করে নিয়ে। অসমিয়াকে আমরা সেভাবেই রাখব যেভাবে তাঁর গ্রন্থে পাব। কিন্তু সে আলোচনা সম্ভবত নিরস হবে। কেননা , সেখানে থাকবে যত ধ্বনিতত্ব, রূপতত্ব, শব্দতত্ব আর বাক্যতত্বের কথা। আমরা চেষ্টা করব 'শুষ্ক কাষ্ঠ'কে 'নিরস তরুবর' করে তুলতে।
গ্রন্থ সূত্রঃ
২) অসমীয়া আরু অসমর তিব্বত-বর্মীয় ভাষা ;ড০ উপেন  রাভা  হাকাচাম   ।
৩)অসমীয়া আরু অসমর ভাষা উপভাষা।ঃ  ঐ।
 ৪)ভাষার ইতিবৃত্ত; সুকুমার সেন।
৫)বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক বাংলা ভাষার অভিধান ও ভাষাতত্ব; জগন্নাথ চক্রবর্তী।
৬)ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ; পবিত্র সরকার।
৭)সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলাভাষা; রামেশ্বর শ'
৮ ) ভাষাতত্ব; অতীন্দ্র মজুমদার
৯)বাঙালির ইতিহাস-আদি পর্ব; নীহার রঞ্জন রায়।
১০)কাছাড়ের ইতিবৃত্ত; উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ।
১১)The Origin and Development of the Bengali Language; Suniti Kumar Chatterji.
১৩)শব্দতত্ব ; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।