আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Showing posts with label ব্যক্তিগত. Show all posts
Showing posts with label ব্যক্তিগত. Show all posts

Saturday, 20 February 2021

একটি অসম্পূর্ণ রচনার ভূমিকা





 

 



 ঈশ্বর কি চাইলেই ষোড়শ শতকে রবীন্দ্রনাথকে পাঠাতে পারতেন? কিছু কিছু লেখক শিল্পী আছেন, বড়ই আত্মকেন্দ্রিকভাবেন, তাঁদের প্রতিভা জন্মসূত্রে প্রাপ্ত। ঈশ্বর প্রদত্ত। যারা ঈশ্বরে আস্থা রাখেন না, তাঁরাও ভাবেন, নিজেরা শ্রম করে যে প্রতিভা তৈরি করেন, তার কৃতিত্ব চারপাশের প্রকৃতি পরিবেশকে দেবেনই কেন? হিমালয়ে সাধনা করে সিদ্ধি লাভের প্রাচীন বিশ্বাসে আস্থা না রাখলেও তাঁদের বিশ্বাস অনেকটা এরকমই। ভাবেন, আড্ডা বিহীন , বন্ধু বিহীন---দিন রাত ঘরে বসে লিখলে পড়লেই তাঁরা ভাষার নিবেদিত প্রাণ সেবক হয়ে উঠতে পারেন। সম্ভবত জীবনানন্দের মতো প্রতিভার থেকে তাঁরা কিছু প্রেরণা নিয়েও থাকেন। কিন্তু কখনোই সম্ভবত প্রশ্ন করেন না, জীবনানন্দের যে প্রত্যয় ছিল 'আবার আসিব ফিরে' তার কী হলো? তিনি কি এলেন? তিনি কি সতেরো শতকে আসতে পারতেন? রাধা কিম্বা শ্যামার গান না গেয়ে বনলতা সেনের বাড়ি পৌছুতে পারতেন? সেই স্থান-কালকে মর্যাদা না দিতে শেখা দম্ভ মাত্র।

 সেই স্থানের কালের কিছু পরিচর্যাও চাই। সেই দম্ভ থেকে তাঁরা আওড়ান শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত কবিতা পঙক্তি "এক দশকে সঙ্ঘ ভেঙে যায়'" এরা তাই সঙ্ঘের থেকে দূরেই থাকেন। যে সঙ্ঘগুলো তৈরি হয় তাঁদের মেধাকে সারপানি যোগাবার স্থান-কালের পরিচর্যা করবার জন্যে। বাংলাতে একটি কথা আছে , উলটো বুঝলি রাম। এরা সেই গোত্রের। নইলে শঙ্খ ঘোষ কি আর সঙ্ঘ করেন না? এই মুহূর্তে তিনিই বাংলা সাহিত্যের সব চাইতে বড় সঙ্ঘীআচ্ছা, কেমন হত যদি রবীন্দ্রনাথ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের নেতৃত্ব না গ্রহণ করতেন? চর্যাপদটা কি আপনি এসে আকাশ থেকে দেখা দিত? সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের ওডিবিএল---কি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার থেকে আপনি প্রসবিত হত? ঈশ্বর বর দিলেন, তথাস্তু ! আর সব হয়ে যেত? সোজা পরিসংখ্যাতে যান, যেখানে সঙ্ঘ বেশি---সেখানেই মেধাও বেশি। আগাছাও বেশি। কিন্তু সেই একই কথা। আগাছা দেখে যে বটগাছের মাটিতে ঝুরি নামে না, সে তার আয়ুর হিসেবটাও ভালো জানে না... পশ্চিম বাংলা বাংলাদেশে অসংখ্য সেরকম সঙ্ঘ আছে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের উত্তর সুরী বাংলা আকাদেমির প্রাতিষ্ঠানিকতাও আছে। সেই তালিকা দীর্ঘ করি না। ত্রিপুরাতে প্রচুর বাংলা ছোট কাগজ আছে, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সম্পাদিত। আছে দৈনিক কাগজ। টিভি, রেডিও আছে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও কম না যেখানে বাংলা পঠন পাঠন হয় পূর্বোত্তরের বাকি রাজ্য থেকে তুলনাতে অনেক বেশি। বই মেলাও বসে একাধিক শহরে, যেখানে বাংলা বই পত্রের ভিড়টাই থাকে বেশি। এরই সব কিছুকেই নানা প্রকৃতির সঙ্ঘ বলেই নাম দিতে পারি। বাকি রাজ্যগুলোর কথা ভাবুন তো। সেখানে দুই চারজন লেখক- লেখিকা পত্র-পত্রিকা পেতে পারেন। সেই দেখে কেবল, ঈশ্বরের সেবাদাসেরা তুষ্ট থাকতে পারেন বৃহত্তর সাহিত্য সমাজের তাতে কী? প্রতিজন লেখককে প্রশ্ন করলেই জবাব মিলবে, তাঁরা সুখে নেই।

অসমে অসমিয়া মেধাজীবীদের মান ও পরিমাণ দেখুন, আর দেখুন তাঁদের অসম সাহিত্য সভা থেকে শুরু করে কত কী আছে? গুয়াহাটি শহরে দুটি বই মেলা হয়। বাংলা বই কম হলেও থাকে। কিন্তু সেগুলো কেনেন পড়েন, বাঙালিরা কম, অসমিয়ারা বেশি। কিছু বাংলা প্রকাশনাও থাকে, বাংলার থেকে। ত্রিপুরা থেকে অক্ষর কখনো থাকে। থাকে ব্যতিক্রম আর বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজ, গুয়াহাটি। এই মাত্র। স্বাভাবিকভাবেই এইবারে ৭ জানুয়ারি বাংলা কাগজ বার্তালিপি সংবাদ শিরোনামে জানিয়েছিল "প্রথম সপ্তাহেই সাড়ে চার কোটির ব্যবসা গুয়াহাটি বই মেলায়--- বাংলা বইয়ের বিক্রি নেই, ঠাই নেই মঞ্চেও।' ঈশ্বর প্রদত্ত মেধাবীদের মনে কি কোনো প্রশ্ন আছে, না আছে লজ্জা? তাঁরা কাদের জন্যে লেখেন? লজ্জা তো নেইই। এক অধ্যাপক, এখন দৈনিকের উত্তর-সম্পাদকীয় লিখে বিখ্যাত, এককালে একটি খ্যাতনামা বাংলা ছোট-কাগজ করতেন, রীতিমত কুৎসা ছড়ালেন-- সেই তাদের বিরুদ্ধে যারা এই অবজ্ঞা উপেক্ষার মধ্যেও বই মেলাতে অসম তথা পূর্বোত্তরের বই পত্রের আসর ধরে রাখলেন। যে প্রকাশক ও সংগঠনগুলোর নাম করলাম---দেড় দশকের বেশি সময় ধরে এরা  উত্তর-পূর্ব বাংলা লিটিল ম্যাগাজিন সম্মেলনের আয়োজনেও জড়িয়ে আছেন বিশেষ করে এই   বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজ, গুয়াহাটি গুয়াহাটি কেন্দ্রিক আরো বেশ কিছু সংগঠন রয়েছে কারো কারো নামের আগেবিশ্বশব্দটিও আছে কিন্তু ব্যাপ্তি কারোরই গুয়াহাটির বাইরে নেই না প্রত্যক্ষ না পরোক্ষ কাজকর্মও নেই বরাক উপত্যকাতে আছে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন একে অসম সাহিত্য সভার বরাকের বাংলার প্রতিকল্প ভাবা যেতে পারে এমন তো প্রায় সব ভাষাগোষ্ঠীরই রয়েছে অসমে আছেবরাক নন্দিনী সাহিত্য পাঠচক্র’—যেটি একটি বাংলাদেশি সংগঠনের ভাবাদর্শগত বিস্তার যদিও , একে  সারা অসম লেখিকা সমারোহের বরাকের বাঙালির মধ্যেকার প্রতিকল্প ভাবা যেতে পারে আছে গণতান্ত্রিক লেখক সংস্থা ইত্যাদি আরো বহু সংগঠন ও পত্রিকা কিন্তু গোটা অসম তথা পূর্বোত্তরকে এক মঞ্চে নিয়ে আসা তো বাস্তবে যাচ্ছে না সেই চেষ্টাটাই হয় এই পূর্বোত্তরীয় লিটিল ম্যাগাজিন সম্মেলনে


কোনো স্থায়ী সংগঠন নেই বহুবার প্রস্তাব উঠেছে সম্ভব হয় নি নিয়মিত হয়ও না সম্মেলন সম্ভব হয় না একটা অনুরোধ থাকে আগেকার সম্মেলন সেই অনুরোধ জানায় কোনো না কোনো সংগঠন বা পত্রিকাকে তাঁরা গ্রহণ করেও কখনো করে উঠতে পারেন না করলেও সংগঠিত করতে নানা জনের দক্ষতার মাত্রাভেদও ঘটে তখন এই সংগঠনবিহীন সংগঠকের ভূমিকাটি পালন করেন গুয়াহাটির এই বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজের কর্মকর্তারাএই যেমন তিনসুকিয়া সম্মেলনে কথা ছিল, ঠিক পরের বছরে সম্মেলন আয়োজিত হবে আগরতলাতেমূল দায়িত্ব নেবেমুখাবয়বপারলেন নাপরের বছরেই ২০১৮তে ২২, ২৩ ২৪ ডিসেম্বরে আয়োজ়ন করে ফেললেন গুয়াহাটির সাউথ পয়েন্ট স্কুলেসেই সম্মেলনে ঠিক হল, পরের সম্মেলন হবে শিলচরেসবাইকে নিয়ে উদ্যোগটা নেবেমানবী’, ‘বরাকনন্দিনীপারলেন নাকা বিরোধী আন্দোলন এলকোভিড এলএইবারে এগিয়ে এল ত্রিপুরাপ্রাথমিক সিদ্ধান্তটা হলো কীভাবে? কারা সে সম্ভব করলেন?  বাপরে ! ঠিক এরই জন্যে এদের বিরুদ্ধে গোষ্ঠীবাজির অভিযোগ তুলাটা কেউ কেউ পবিত্র কর্ম বলে মনে করেন যেন বড় অন্যায় করে ফেলছেন, তাঁরা তাঁদেরই জন্যে অসম তথা পূর্বোত্তরের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বারোটা না বেজে আর যায় না

সম্প্রতি সেই প্রাক্তন ছোটকাগজের সম্পাদক লিখলেন, সম্মেলনগুলোতে বুঝি মদ মাংস আর আড্ডা  ছাড়া আর কিছু হয় না লেখকেরা জুটবে আর মদ মাংস হবে না---শুনলে যে ঘোড়ায়ও হাসব---এই কথা তাঁর জানা না থাকবার কথা নয় শুরুর দিকে তিনিও এই সম্মেলনের আয়োজনে সক্রিয় রইতেন ২০১২র গুয়াহাটি সম্মেলন অব্দি তো অবশ্যই কিন্তু তাঁর তো জেদটাই হচ্ছে তিনি মাইকেলকে মদ্যপ সাজিয়ে ছাড়বেন অথচ, হয় বহু কিছুই একমাত্র সম্মেলন যেখানে বছর দুই তিন পরে হলেও পূর্বোত্তরের সব পাঠকেরা না হলেও লেখকেরা পরস্পরের বই পত্রপত্রিকার হাতে নিয়ে দেখতে পারেন কিনতে পারেন ব্যাগ ভরে নিতে পারেনবিনিময় করতে পারেন ভাব

 পূর্বোত্তরে এমন কোনো বই মেলা নেই, যেখানে তা সম্ভব হয়ে উঠে অসম প্রকাশন পরিষদও তা সম্ভব করে না, যার গুণগানে কেউ কেউ ব্যস্ত থাকেন এমন কোনো বই পত্রিকার বাজার নেই---যেখানে তা সম্ভব হয়ে উঠে আর হয়ে উঠতে পারেন পরস্পরের বন্ধুনা, আমাদের কোনো পাতিরাম নেইধ্যানবিন্দু নেইনেই কলেজ স্ট্রিট  না, আমাদের অক্ষর, আমাদের জ্ঞান বিচিত্রা, আমাদের আবাহন, আমাদের বাতায়ন, আমাদের ব্যতিক্রম তা চেয়েও সম্ভব করতে পারে নি বহু আগে সঞ্জয় চক্রবর্তী লিখেছিলেন,...গঙ্গাপারের পথিক, বলতে পারো সঠিক/কোথায় আমার সাকিন!/চিত্ত কোথায় ভয়শূন্য, উচ্চ কোথায় শির,/কোন ভুবনে থাকব বলো হয়ে সুস্থির।/যদি এরকম হতো, আমার নিজের মতো/গুছিয়ে নেয়া  যেত রাজ্যপাট/তাহলে দুয়ারে দুয়ারে আর মাথাকোটা কেন,/বালাই ষাট.../ তারও আগে লিখেছিলেন কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ --..ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,/স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---/তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শস্য,/ নাভিমূলে মহাবোধি অরণ্যের বীজ.../তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যস্ত শাসন!—/সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; /হেমশস্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল  ফুলের মশাল!”,


 

এই সব কবিতা পঙক্তি পড়ে পাঠক তো বটেই বহু কবিও বাহ বাহ!’ ধ্বনিতে বলে উঠেন, আমাদের গৌরব এই কবিরা কিন্তু এর মর্ম অনুভব করেন না বহু  কবি লেখক সম্পাদকও যারা করেন,  তারাই আয়োজন করেন এহেন সভার,সম্মেলনের তাঁরা অনেকেই লেখক- সম্পাদক বটে, কিন্তু সবাই নন কিন্তু খুব কি জরুরি যিনি সৃজনে মননে দক্ষ, তিনি সংগঠনেও দক্ষ হবেন? স্বাভাবিকভাবেই যারাই ভাষাকে ভালোবাসেন, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসেন, সংগঠনটা বোঝেন, অনুদান গোটাতে পারেন, তাঁদের সবাই এগিয়ে এলেই শুধু সম্ভব হয় এহেন কর্ম আয়োজন কিন্তু আমাদের ঈশ্বর প্রদত্ত মেধাবীদের সেখানেও হাজারটা অভিযোগ প্রমাণ করে, তাঁরা নিজেদেরই বোঝেন কেবল, বৃহত্তর সমাজ বোঝেন না বোঝেন না, ঊর্ধ্বেন্দু দাশের এই আহ্বানের মর্ম কী?--- “তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যস্ত শাসন!--”

 

 

 তর্ক বহু কিছুই উঠতে পারে ভাব বিনিময় হয়টা কীসে? কাউকে তো বলতেই দেওয়া হয় না শুনতে তো আর কম লোক থাকে, বাইরে আড্ডা বসায় ডাকে কতজন লোককে? সবই তোগোষ্ঠীর লোক এমন বহু কিছু সব প্রশ্নের জবাব দেবারও প্রবৃত্তি জন্মায় না আমার এমন অভিজ্ঞতাও আছে, তিনসুকিয়া সম্মেলনের আগেই সংবাদে কেন তাঁর আসবার খবর নেই বলে গুয়াহাটিরগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র বোঝাচ্ছিলেন, তাঁরাই যখন পরে গুয়াহাটিতে এক অনুষ্ঠানে তাঁর বই প্রকাশের সভা করলেন, তখন তিনি আহ্লাদে গদগদ সব লেখকদের নিয়ে বেশি বলতে নেই কেউ কেউ শালীনতার মাত্রাও ছাড়ান চাই কি, আপনাকে ফোনেও ধমকি দিতে পারেন কারণ সেই---ঈশ্বর প্রদত্ত মেধা নিয়ে জন্মেছেন বলে এই বিশ্বাসও প্রবল যাকে তাকে যখন তখন অভিশাপও দিতে পারেন যদিও ব্যাস-বাল্মিকী কাউকে অভিশাপ কিছু দিয়েছেন বলে আমাদের কাছে খবর নেই

 


খবর এও তো নেই, যে কেউ যদি বলেছেন তাঁর শহরে বাংলা ছোট কাগজের সম্মেলন করবেন--- এই সম্মেলনের কেউ আটকেছেন খবর এও নেই, যে কেউ যদি ভুলে বাদ পড়ে গিয়ে ডাক না পেয়ে রবাহূত গিয়ে সম্মেলনে ভিড়েছেন, তবে তাঁকে একটি আসন , মঞ্চে একটা মাইক আর শোবার বিছানা জোটানো হয় নিতিনি পূর্বোত্তরের বাইরের হলে তো খানিক বেশিই পেয়েছেন তাঁদের অনেকেই কিন্তু রবাহূত হয়েই আসেন বিশেষ করে উত্তর বাংলার সম্পাদকেরা প্রাতিষ্ঠানিক বই মেলাগুলোর ঠিক বিপরীত অভিজ্ঞতা তাঁদের এখানে হয় খবর এও নেই যে সভা মঞ্চের বাইরে  কোনো লেখক সম্পাদকে আড্ডাতে বসে আনকোরা নতুন কোনো কাগজের স্বপ্ন দেখা শুরু করলে--- তাকে সামাজিক বয়কট করা হয়েছে খবর এও নেই যে কোনো তরুণ তরুণী সম্পাদিকা আর লেখক প্রেমে পড়ে গেলে  তা নিষিদ্ধ করে কোনো বিধান দেওয়া হয়েছে... এই সবই তো দুই সম্মেলনের মাঝের সময়ে বহু ফসল ফলায় না যদি ফলাবে, খামোখা কি লোকে নিজের গাঁটের পয়সা খরচা করে এক গাদা বই পত্র পত্রিকা কাঁধে পীঠে করে দিন দুই বা তিনের রেলপথের যাত্রা শীতের রাতে মাঝের কোনো স্টেশনে বিরতি দিয়ে এমনি করে? অধিকাংশই তার যেমন এসেছিল, সেরকমই ফিরেও যায় বিক্রিবাটা হয়ও না তুমি আমার, আর আমি তোমার-- করে আর কতটা কেনাকাটা করা যায়, দান দক্ষিণাই হয়ে উঠে কতটা? তবু যে লোকে যায়, ছুটে যায়---শিলিগুড়ি থেকে শিলচরে, আগরতলা থেকে তিনসুকিয়া--- প্রাণে প্রাণ মেলাবার টানে যায় মনে মন দেবার টানে যায় যে না যায় তাঁকে প্রশ্ন করে, মন, তুই এতো ছোট কেনে?

ছোট, কেননা তাঁর কাগজ ছোট-- ছোট কাগজের এও এক সমস্যা এর প্রতিশ্রুতি হচ্ছে, কাগজে ছোট হবে, কথাতে বড় হবে হয় তাঁর উলটো ঘাসের মতো মাথা উঁচু করতে ভয় পায় যদি বটের মতো ডাল ভেঙে পড়ে! কিন্তু কী আর করা যাবে, যেখানে বট জন্মায়, সেখানে ঘাস আগে থেকেই জন্মায় একে তুচ্ছ করা যাবে না, এর ফাঁক দিয়েই আকাশে বেরিয়ে যেতে হবে আর গিয়ে সেই তৃণভূমিকে ছায়াও দিতে হবে সেখানে কোনো জাত-বিচার চাইলেও কেউ করতে পারে না

Wednesday, 7 February 2018

গুহাচিত্র বনাম ফেসবুক স্টেটাস


(ছবি ঋণঃ আনন্দবাজার পত্রিকা)
কটা কাল ছিল মানুষ গুহাতে ছবি এঁকে নিজের 'স্টেটাস' জানাতেন। সেগুলো স্থানে ভ্রমণ করতে পারত না। কিন্তু কালে ভ্রমণ করে একাল অব্দি এসে পৌঁছেছে। সভ্যতার ইতিহাস পাঠ তাই এখনো সহজ হয়ে আছে। আজকাল লোকে ফেসবুকে, টুইটারে স্টেটাস লেখেন। সেগুলো দ্রুত স্থান ভ্রমণ করে। তারপরে তলিয়ে যায়। হোয়াটস এপে হলে যাকে পাঠানো হলো, তিনি পর মুহূর্তে 'ডিলিট' করে দেন। এই হচ্ছে, এর সর্বোচ্চ সম্মান। তার মানে গুহাচিত্রের বিপরীতে এই সব কালভ্রমণ করতে একেবারেই অক্ষম। চিরকালীন' বলে শব্দটি এখানে একেবারেই বেমানান।
          সম্প্রতি দেখলাম, কেউ  কেউ স্টেটাস দিয়ে জানাচ্ছেন দেখলাম ফেসবুকে আর ভালো লাগছে না। যারা জানাচ্ছেন , তারা যে ফেসবুকের চমকে ধরা কে সরা জ্ঞান করছিলেন , তাও দেখছিলাম। ভালো যদি নাই লেগে থাকেসে আমাদের কাছে সুসংবাদ। আন্তর্জালে আমার উপস্থিতি এই ফেব্রুয়ারিতে এক দশক পার করেছে। আন্তর্জালে বাংলা লেখালেখি ভারতেই যারা শুরু করেছিলেনখুব অতিশয়োক্তি হবে নাতাদের প্রথম দিককার মানুষ আমি। তখন পূর্বোত্তরে কেউ লিখতেনই না। গোটা ভারতে যে কজন হাতগুণা লিখতেনআমরা বলতে গেলে পরস্পরকে চিনতাম। ফেসবুক থাকলেও সেরকম জনপ্রিয় ছিল না। তখন ব্লগ ছিলছিল ই-মেল গ্রুপঅর্কুট , ইত্যাদি। অসমিয়াতেও কেউ লিখতেন না। ২০১০এ ফেসবুক পোষ্ট করলেই ই-মেলে চলে যাচ্ছেদেখে ব্যবহারকারী হুহু করে বাড়তে শুরু করে। আমরা সেই সময় অসমিয়ার প্রচারে প্রসারেও কাজ করি যেমনপূর্বোত্তরে বাংলা লেখালেখি নিয়েও কাজ শুরু করি। রোমানে বাংলা--অসমিয়া লিখিয়েদের থেকে কত গালি অপমান যে সইতে হয়েছে বোঝাই কী করে! এক বন্ধু প্রায় বাজিই ধরেছিলেন আন্তর্জালে বুঝি বাংলা লেখাই যায় না। তাঁকে যখন শিলচরে গিয়ে প্রায় জোরে ধরেই বাংলা লেখা দেখাইশেখাই---ফিরতে না ফিরতে দেখি তিনি ফেসবুকে গ্রুপ খুলে বসেছেনবাংলাতে। ফেসবুকের এতোই চমক। অথচতিনি কবি। আশা করেছিলামনিজের একখানা ব্লগ করবেন। যেভাবে নিজের খাতাতে স্থায়ীভাবে লিখে রাখেনসেভাবেই ব্লগে লিখে রাখবেন। যেভাবে নিজের সম্পাদিত কাগজ করবেনসেভাবেই ব্লগ সম্পাদনা করবেন। কিন্তু সেগুলোতে তো এতো এতো গরম গরম লাইকআর বাহবা মেলে না। ফলে সমস্যা হলো। তারা লাইকের মোহে বুঁদ রইলেন। এবং রাতারাতি কেউকেটা বিখ্যাত হয়ে গেলেন (বলে ভেবে নিলেন)। গোঁদের উপরে বিষফোড়ার মতো এলো স্মার্টফোন। বাংলা লেখালেখি সে আরো সহজ করে তুলল। এখন আর বলতে হলো না। বা হয় না।ভালোই তো হলোতাই নাভাবের আদান প্রদান খুব দ্রুত হতে শুরু করল। ভাবের তুফান ছুটল। সেই তুফানে বহু বাড়ি ঘর সংসার উড়েও গেল। তুফান সব সময়েই ভালো। তার মানে বর্ষা এলো। এবারে চাষাবাদ হবেফসল ফলবে। কিন্তু তুফানের আগে পরে বানও ডাকে। বানের তোড়ে সব ভেসে মিশে একাকারও হয়ে যায়। আর তৈরি করে দলা দলা আবর্জনা। সেই সব আবর্জনা দেখে যদি ঘেন্নাতে কেউ কেউ চলেই যানবাংলা ভাষার পক্ষে তবে সেই সব সুসংবাদ। কিন্তু আমরা যাই না কেনকারণপালাবার মধ্যে সুখ নেই। আবর্জনার পুণর্ব্যবস্থাপনার  মধ্যে রয়েছে যেটুকু। খুব কম লোকে তাতে হাত দিচ্ছেন। সেই কম লোকেই আগামীর দিশা দেখাবেন বলে আমার বিশ্বাস। এই যেমন একটিই মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়একটিই মাত্র কলেজ কলকাতার সরসুনা কলেজ আন্তর্জালের বিশাল জগতের রহস্য নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছেনআলো দেখাচ্ছেন--- ভাবা যায় কি সেই সব কাজের একটি অংশ হলো রবীন্দ্রনাথের নানা পাঠের আন্তর্জাল উপস্থিতি। ফেসবুকের মহাপুরুষ--নারীরা সেসব সম্ভবত দেখেনও নিকল্পনাও করতে পারেন না। বাংলা ওয়েবজিনওয়েবপত্রিকাক্রমেই বাড়ছে। এমন কি পূর্বোত্তরেও। ঈশানের পুঞ্জমেঘকাঠের নৌকার বয়সতো হচ্ছেই। (জনপ্রিয় নয় যদিওঅনেকে ঘেন্নাও করেন। সেসব ভালো)। বেশ কিছু ইউনিকোড পত্রিকা এখন আসাম ত্রিপুরার থেকে বেরোচ্ছে। রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, বিশ্বরাজ ভট্টাচার্যে মতো তরুণ কবিরা এখন ব্লগজিনে মজেছেন। একা একাই আলোর মশাল হাতে তুলে নিয়েছেন। খুব কম। তাতেই আশা জাগছে। রাতের আকাশের আঁধার কণাদের সংখ্যাই তো বেশি। অগুনতি তারারাও রয়েছে বটে। দেখা গেলে বোঝা যায় আকাশ পরিষ্কার। সুতরাং তাদেরও ফেলা যাবে না। কিন্তু আলো করে তো একা চাঁদ। আমাদের এই নবীন চাঁদদের অভিনন্দন... তাঁদের পক্ষ বদল ঘটুক। রাহু-কেতুর ভোগে না পড়লেই হলো। আমাদের জন্যে সেই সুসংবাদ। ফেসবুকে অনেকেই প্রশংসা প্রশস্তি করেনআসলে নিজেরা বিনিময়ে তোল্লা পাবেন বলে। কিন্তু এই তরুণেরা জানেনআমাদের প্রশস্তি নির্ভেজাল। কেবলই ভাষা এবং ভাবের সমবেত স্বার্থে। 
          আজ সকালে প্রবীণ কথাশিল্পী মিথিলেশ ভট্টাচার্য আমাকে ফোন করেছিলেন। আন্তর্জালের 'আবর্জনানিয়ে নিজের উষ্মা জানাতে। আমিও সমবেদনা জানালাম। কিন্তু সঙ্গে করে মনে হলোআমাদের এই সব শুক্লপক্ষ সংবাদও এই প্রবীণদের কাছে পৌঁছানো চাই। তাঁরা আন্তর্জালে আসবেন না। তাঁদের সসম্মানে অন্যরকম করে নিয়ে আসা চাই। আমাদের দৈনিক কাগজের আত্মপ্রতিষ্ঠাকামী 'অসভ্যসম্পাদক যখন সাহিত্যের পাতাতে রাশিফল ছেপে যাচ্ছেআর ভগীরথ মিশ্রআবুল বাসারঅমর মিত্রদের 'জয়পতাকাআমাদের দেখিয়ে বিদ্রূপ করে যাচ্ছেতখন আমাদের অনুপস্থিত পূর্বসূরিদের সসম্মান উপস্থিতি সম্ভব করাটা হোক আমাদের পরবর্তী রণকৌশল। সেই কাজ একা কারো দ্বারা সম্ভব নয়। সমবেত 'ভাবান্দোলনে'র দ্বারা সেসব সম্ভব। আমাদের 'রিফিউজি লতাজীবনের অন্ত পড়ুক। তৃণ গজাক , তার ফাঁকে ফাঁকে মহীরুহ অঙ্কুর মেলুক।



Wednesday, 18 January 2017

বিমলের অমল কথা




হুদিন দেখা হয় নি, কথা হয় নি বিমলের সঙ্গে। শিলচরে গেলেও দেখা হয়েছে বলে মনে পড়ে না। এই মাত্র মাস কয় আগে ফেসবুকে একদিন সে নিজেই টোকা দিয়েছিল। আশা করেছিলাম, পুরোনো স্মৃতি ঝালাই করা যাবে আবার। ও মা! দিন কয় পরেই শুনি কি না, সে নেই! কঠিন অসুখ তাকে নিয়ে গেছে অকালেই।
            শুনলাম, সে বুঝি খুব টেনশনে থাকত। তাতেই বেঁধেছে বিপদ। কিন্তু বাইরে থেকে কোনোদিনই বোঝা যেতো না। একটা হাসি লেগেই থাকত এই সপ্রতিভ যুবকের মুখে। দেখা হলেই রঙ্গ রসিকতা ছাড়া কথা না হয়ে ছিল এমন দিন মনে পড়ে না। তখন সোনার কাছাড়। সোনার কাছাড় পরিবারের প্রতি আমার আবাল্য সম্পর্ক ছিল। সে বাড়ির লোকজনের কেউ আমার সহপাঠী বন্ধু, তো কেউ আমার প্রতিবেশী। ফলে যাতায়াত ছিলই। সারা শহর ঘুরে দিনে কিম্বা রাতে সোনার কাছাড়ে আড্ডা দেয়াটা একসময় আমার নিয়মে পরিণত হয়ে গেছিল। বিশেষ করে  কবি সাংবাদিক বিজয় ভট্টাচার্য সেখানে যোগ দেবার পরে বেড়েছিল। পরে পরে যারা যোগ দিলেন তাদের মধ্যে দুই ‘দাসে’র একজন এই বিমল কান্তি দাস, অন্যজন পীযুষ কান্তি দাস। দু’জনেই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে গেছে শহরে জীবন গড়বার স্বপ্ন নিয়ে। বিমল তাপাঙ থেকে এসে প্রথমে পলিটেকনিকে, পীযুষ জালালপুর থেকে এসে গুরুচরণ কলেজে আমার সহপাঠী। দু’জনেই কবিতা লিখত। এবং দু’জনেই সামাজিক বিভিন্ন সংগ্রামে শরিক। এবং সোনার কাছাড়ে সাংবাদিকতা দিয়ে জীবনের শুরু সেই সোনার কাছাড়ে। অন্য সাংবাদিকদের থেকে এই দুই কবির সঙ্গে আড্ডা জমে উঠত বেশ ঘনিষ্ঠ। নিজেও কবিতা লিখতাম কিনা।  সম্পর্ক সেখানে থেমে থাকে নি। দু’জনের সঙ্গেই নানা সামাজিক কাজেও এক সঙ্গে জড়াবার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। চাতলাতে গড়ে উঠেছিল অসমের সংযুক্ত  বিপ্লবী আন্দোলন পরিষদ তথা আর্মকার ভগ্নি সংগঠন তপশীলি জাতি সংরক্ষণ সুরক্ষা পরিষদ। সে সংগঠনের কিছু যোগাযোগ বিমলের সৌজন্যে পাওয়া গেছিল। যতদূর মনে পড়ে দুই এক সভাতেও সে গেছিল, আমাদের সঙ্গে। কিন্তু এহ বাহ্য। সে সাহিত্য করত, বিভিন্ন সাহিত্য অনুষ্ঠানে , আসরে দেখাদেখি আড্ডা হতো। সোনার কাছাড়ে কাজ করত। সেখানেও  গেলে ও থাকলে বসতেই হতো। আর একটা সময় দীর্ঘদিন সে আমাকে টেনে বসিয়ে রাখত। সে কারণটি অন্য। পীযুষের তখন এক ‘মাধবীলতা’ ছিল। মহিলাটি কবিতা লিখত। সুতরাং দেখাদেখি হলে আপডেট দিয়ে রাখত। দেখাদেখি একদিন দেখি, বিমলও মনের কথা বলে ফেলেছে। সেই মহিলার অমন কালিদাসী নাম পড়ে নি বটে, কিন্তু বিমলের টেনশনের শেষ ছিল না। সেই টেনশন সে আমার সঙ্গে ভাগ করে নিত। আর কারো সঙ্গে করত কিনা জানি না, কিন্তু একদিন চেপে ধরে বলে আমাকে ওর সঙ্গে সিনেমা যেতেই হবে । গোপীনাথ হলে। যেতেই হবে, কেন না ওর ‘মাধবীলতা’কে নিয়ে সোজা সিনেমা দেখতে যাবার সাহস গোটাতে পারছিল না বেচারা । যদি কারো নজরে পড়ে যায়। ফলে এই ‘নজরকাঁটা’টিকে সঙ্গে নিয়ে পরিচিতজনকে বিভ্রান্ত করবার ব্যবস্থা করা, আর কি। সেই ভালোবাসার দিনগুলোর ফসলই মনে হয়, তার কবিতার বই, “ভালোবাসার একশত সনেট।”
    
                 তার উপরে ‘কৈবর্ত’ হবার একটা চাপতো ছিলই। অনেকে স্বীকার করবেন না। অস্বস্তি বোধ করবেন। কিন্তু এটা থাকে। এমন একটি জনগোষ্ঠী যাদের অধিকাংশই দরিদ্র মৎস্যজীবী। যেসব গ্রামে থাকেন, সেখানে স্কুল, হাসপাতাল, বিদ্যুৎতো দূর একটা ভালো পথও থাকে না। যারা সেই জীবিকা কিম্বা গ্রাম থেকে বেরুলেন, শহরে এসে তাদের অধিকাংশই অসংগঠিত শ্রমে জড়িয়ে পড়েন। অসংগঠিত শ্রম মানেই কিন্তু জীবনের অনিশ্চয়তা। বিমলের মতো কেউ কেউ কখনো  বা এই পলিটেকনিক অব্দি পড়তে পারেন। কিন্তু স্থায়ী চাকরি জোটাতে পারেন না। সাংবাদিকতাতে এসেও তো বিমলের সঙ্গ ছাড়ে নি সেই অনিশ্চয়তা। নাগরিক জীবনে নিজেকে খাপ খাওয়াতে গিয়ে শেকড়ে আর মগডালেও একটা দ্বন্দ্ব বাঁধে। তাই বোধ করি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনেও জড়িয়েছিল। তার মধ্যে একদিকে যেমন ছিল বরাক উপত্যকা কৈবর্ত সমাজ উন্নয়ন সমিতি সংস্থার মতো সামাজিক সংগঠন , অন্যদিকে আবার মহকুমা মাদক দ্রব্য নিবারণী সমিতিও ছিল। বিশেষ কোনো কাজের সংগঠন হয় না এই দ্বিতীয় ধরণের সংগঠনগুলো। শুধু একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠার অনুভব  এনে দেয়। তাতে যা হয়--- লক্ষ্যচ্যুতি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। অর্থাৎ শুধু নিজের পিছিয়ে পড়া সমাজ কিম্বা শুধুই  কবিতার জন্যে জীবন নিবেদন করলে যিনি আশ্চর্য প্রতিভার সাক্ষর রাখলেও রাখতে পারতেন, তা আর পেরে উঠেন না। অবশ্য কৈবর্ত সমাজের সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা পরে কী ছিল সে আর আমরা বিস্তৃত জানি না।  জানবার সুযোগ ছিল না। ছিল কবিতা নিয়ে জানবার, কেন জানা হলো না---সেই কথাই লিখলাম এতোক্ষণ।    কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে তার প্রতিষ্ঠা ছিল প্রশ্নাতীত। সাংবাদিকদের কাগজ পাল্টাতে হয়, সেও পালটেছিল। কিন্তু কাজের অভাব হয়েছিল, বলেতো মনে হয় না । সাংবাদিকতার কাজে শুনেছি  ভাষা এবং বানানের প্রশ্নে সে ছিল আপস বিহীন।  মৃত্যুকালেও সেই ছিল দৈনিক যুগশঙ্খের সাংবাদিক।
               আশা ছিল, এবারে আবার আন্তর্জালে পুরোনো সম্পর্কেই ঝালাই পালাই হবে। আন্তর্জালে আমাদের পূর্বোত্তরের লেখকদের আড্ডা ‘ঈশানের পুঞ্জমেঘে’ সক্রিয় হবে সে। সমৃদ্ধ করবে, সমৃদ্ধ হবে। সেরকম কিছু হবার আগেই চলে গেলো। ‘প্রতাপ’ কাগজের সম্পাদক কবি শৈলেন দাস সরল মনেই ব্যক্ত করেন নিজের জীবন যুদ্ধের কথা। ‘কৈবর্ত’ হয়ে নাগরিক বুধ-মণ্ডলে নিজের জায়গা খোঁজে নেবার চাপ এবং তাপের কথা। তিনি বিমল কান্তি দাসের স্মৃতিকে হারিয়ে যেতে না দিতে পণ করেছেন। প্রতাপের বিশেষ সংখ্যা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জেনে ভালো লাগল এই ভেবে যে বিমলের জীবন সংগ্রাম এবং ভাষা-সাহিত্য-সমাজের কাজের কথা যদি কোনো ভাবে এই সমাজকে সাহস এবং প্রেরণা যোগায় তবে তার শরিক হওয়া আমাদের দায়। আমাদের কর্তব্য। কোনো চাপ কিম্বা তাপ—আর কোনো বিমলকে না অকালে নিয়ে চলে যায়—সেই পথে যদি ‘প্রতাপ’ কাঁটা বিছিয়ে দিতে পারে, সেই বা কম কিসে। আমরা তাই ‘প্রতাপে’র সহযাত্রী। 
              এক সময় বিয়েও করে ফেলে। সংসারে সুখ দেখে ভালো লাগছিল। কিন্তু সোনার কাছাড় সরে পড়াতে সেই আড্ডাটি অনিয়মিত হতে শুরু করে। নিবেদিতা লেনের সেই প্রাচীন  লেটার প্রেস সংস্কৃতির থেকে  শ্যামাপ্রসাদ রোডের নবীন অফসেট সংস্কৃতিতে তাল মেলানো কঠিন হলো। আমাদের সঙ্ঘ ভেঙ্গে গেলো। তার পরেও দেখা হয় নি নয়। যখনি দেখা হতো, হতো সেই প্রাণোচ্ছল তরতাজা যুবকের সঙ্গে। লড়াই করে উঠে আসা তরুণ, সম্ভবত মৃত্যুকালেও তার আয় এবং উপায় বিশেষ কিছু ছিল না। ফলে সাধারণ ছন্দ অলংকার আয়ত্ত করেও কবিতার কর্ষণ করতে হলে যে নীরবতার দরকার পড়ে, মনে হয় না বিশেষ জুটিয়ে উঠতে পেরেছিল। নতুন লিখতেই শোনাতো প্রচুর সেই সব ব্যক্তিগত আড্ডাতে। দৈনিক কাগজে, ছোট কাগজে বেরুলেও পড়া হতো, আর সাহিত্য আসরগুলোতে তো বটেই।  কিন্তু, এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ওর কবিতাতে জোরালো একটা বক্তব্য রাখবার চেষ্টা সবসময়েই করত, কিন্তু রসঘন হয়ে উঠতে পারত বলে মনে হয় নি।  তাই মনেও থাকে নি বিশেষ। মাঝে মধ্যে গানও লিখবার চেষ্টা করত। কেউ কোথাও গেয়েছে কিনা, নিজের এই দেড় দশকের প্রবাস জীবনে জানা হয়ে উঠে নি। আরেকটা সমস্যা বরাক উপত্যকার কিছু লেখক লেখিকাকে নিয়ে রয়েছে, তাদের অনেকেরই লেখালেখি বড়াইল অতিক্রম করে আসে না খুব একটা। এই নিয়ে তাদের নিজেদের উদ্যোগও নজরে আসে না। ফলে যোগাযোগের একটা অভাব থেকেই যায়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে শহর শিলচর অব্দি পৌঁছুতে পারলে অনেকেই যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এর বাইরে যে বিশাল বাংলা কবিতার গলি ঘুঁজি আছে সেদিকে নজর দিয়ে সেখানকার আলো –হাওয়া-রোদ্দুরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল করবার দরকার এবং উৎসাহ দুইই অনেকে হারিয়ে বসেন।