আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Showing posts with label সীমান্ত সংঘাত. Show all posts
Showing posts with label সীমান্ত সংঘাত. Show all posts

Wednesday, 14 November 2012

দেশভাগ, ১৯৫০এর গণহত্যা এবং আমার মামার বাড়ির গল্প

করিমগঞ্জের বর্তমান বাড়িতে শিবমন্দির এবং বিগ্রহ
    দেশভাগ যাদের স্থানান্তরিত করেছিল আমরা অনেকেইতো তাদের উত্তরপ্রজন্ম। তাই, আমাকে যখন বলা হলো তেমন স্থানান্তরিত কাউকে নিয়ে লিখতে হবে, ভাবলাম কেনই বা আমার নিজের পরিবারকে নিয়েই নয়। কিন্তু দেশভাগের পরেওতো আমাদের স্থানান্তরণ ঘটেই চলেছে। ফলে আমিতো আর থাকিনা আমার পরিরারের সঙ্গে। একটা প্রশ্নমালা তৈরি করে পাঠিয়েছিলাম আমার বাবা এবং বড় মামার কাছে। ইচ্ছে ছিল পরিবারের নারী পক্ষদের থেকেও কিছু স্মৃতিকথা বের করে আনা। কিন্তু সে সম্ভব হয় নি। দুজনেই যদিও বা সমবয়সী ( আটাত্তর) প্রায় আমার বাবা শারীরিক ভাবে ইতিমধ্যে এতো দুর্বল যে নিজে থেকে বেশি কিছু লিখতে পারেন না, মামা কিছু নিজে লিখেছেন, বাকিটা শুনে শুনে লিখে দিয়েছে আমার মামাতুতো দাদা প্রবাল কান্তি সেন।সে নিজে করিমগঞ্জের ‘সেবা’ কাগজের সহসম্পাদক । যেভাবে পেয়েছি তাই মনে হলো অনেক।সাধুবাংলাতেই লিখেছেন। আমরা হুবহু বয়ানে তাই আগে তুলে দিই, পরে নিজের কথা লিখছি।
একটি  সাক্ষাৎকারঃ   
    নামঃ গোপিকা রঞ্জন সেন।জন্ম তারিখঃ ১৬-০১-১৯৩৪। জন্মস্থানঃনিজ কুরুয়া, থানা ঃ বালাগঞ্জ, জিলাঃশ্রীহট্ট।পিতার নামঃ ৺হরমোহন সেন।পূর্ব পাকিস্তানে থাকা কালীন আপনার পেশাঃ ছাত্র। পূর্ব-পাকিস্তানে থাকা কালীন পিতা/মাতার পেশাঃ গৃহস্থি।দেশভাগের আগে ও পরে আপনার ধর্মঃ হিন্দু।পূর্বপাকিস্তানে আপনার ঠিকানাঃ ঐ। মাতার নাম ও তাঁর পৈত্রিক ঠিকানাঃ ৺নীরদা বালা সেন; গ্রামঃ কেয়ামপুর, সদর সিলেট। মামার নামঃ ৺অধর চন্দ্র দেব।ভারতে আপনার ঠিকানাঃ করিমগঞ্জ। ( ঘাট লাইন, রায়নগর )প্রথম ঠিকানাতে অতিবাহিত সময়ঃ অদ্যাবধি প্রথম ঠিকানাতে আছি। পূর্ব পাকিস্তানে ফেলে আসা সম্পত্তি (ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনও সম্পত্তি বা বস্তু থাকলে তার বিষয়েও লিখুন) ঃ বসত বাড়ী এবং ধানক্ষেতের জমি। ভারত সরকার কর্তৃক বণ্টিত সম্পদঃ (X )।ভারতে আপনার আগমনের বিস্তৃত বৃত্তান্তঃ আলাদা ভাবে যুক্ত।   আপনার সঙ্গে আর ক’জন বা ক’টি পরিবার যাত্রা শুরু করেঃ আমাদের পরিবার একক ভাবেই আসিয়াছি। পূর্বপাকিস্তানে থেকে যাওয়া আপনার কোনো আত্মীয়ের নাম ও ঠিকানাঃ মামাতুতো ভাইয়েরা বর্তমানে বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব বাড়িতেই আছে, কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়া আপনার আত্মীয়দের দেশভাগ –পূর্ব অবস্থা (আর্থিক-সামাজিক)ঃ সম্পন্ন পরিবার। তাদের বর্তমান পরিস্থিতিঃ জানা নাই। আপনার পরিবারের কোনো সদস্য বা কোনো আত্মীয় কি দেশভাগের সময় বা যাত্রাকালে নিহত হয়েছিলেন? সেক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট বর্ণনা করুনঃ না। আপনার পরিচিত অন্য কেউ কি দেশভাগের সময় নিহত হয়েছিলেন? সেক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট বর্ণনা করুন।: না। আপনাদের সাথে কি কোনো সশস্ত্র প্রতিরক্ষা সহচর ছিল (মিলিটারি, পুলিশ বা অন্য কেউ) ? থাকলে নাম ও পদবীঃ না। ভারতে তৎকালীন প্রবেশ স্থলঃ সুতারকান্দি বর্ডার।
             দেশভাগের কথা জানার পর আপনার ব্যক্তিগত কী অনুভূতি হয়েছিল? ঃ দুঃখজনক। সামগ্রিকভাবে দেশভাগ সম্পর্কে আপনার অনুভূতি কী? দেশভাগ কি অনিবার্য ছিল?: দেশভাগ অনিবার্য্য ছিল না, দেশভাগের ফলে লক্ষ লক্ষ হিন্দু পরিবার স্থায়ী বাড়িঘর ত্যাগ করিয়া নিঃস্ব ও উদবাস্তু হইয়াছে। অনেকে প্রাণ হারাইয়াছে। শত শত হিন্দু রমনীরা ধর্ষিতা হইয়াছে। আপনার মতে কি ভারত , পাকিস্তান, এবং বাংলাদেশ আলাদা আলাদা রাষ্ট্র হিসাবে বর্তমানে ভালো আছে? ঃ না।দেশভাগের পর আপনার সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা কি আগের চেয়ে ভালো হয়েছে?ঃ আমরা সংগ্রাম করিয়া জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করিতেছি।  আপনার বন্ধু বান্ধবী, পরিবার-পরিজন বা অন্য কারো সাথে কি আপনি পুনর্মিলিত হতে চান বা তাদের বর্তমান অবস্থা জানতে চান? ঠিকানা বা কোন তথ্য দিতে পারেন? ঃমামাতুতো ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করার ইচ্ছা অবশ্যই আছে। আপনার কি বর্তমান বাংলাদেশ সরকার থেকে কিছু চাইবার আছে? বিশেষ করে অর্পিত সম্পত্তি আইন উঠে যাবার পর?: আমাদের ফেলে আসা সম্পত্তি উদ্ধারের ব্যাপারে সাহায্য করার যদি কোন সুযোগ থাকে। (সম্পত্তির দলিলাদি আমাদের নিকট আছে।)

১৯৪৭ ইংরেজীতে দেশভাগ এবং আমাদের ভারতে আগমনের বৃত্তান্তঃ
     আমাদের বাড়ি শ্রীহট্ট জিলার সদর মহকুমায় ছিল। শ্রীহট্ট জিলার ৫টি মহকুমা ছিল। যথাক্রমে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলবীবাজার, সদর সিলেট এবং করিমগঞ্জ। দেশভাগের পরে ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা  চিহ্নিত করার সময় সম্পূর্ণ শ্রীহট্ট জিলাকে পূর্ব্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। করিমগঞ্জ মহকুমার মাত্র ২টি থানা ভারতের সংগে যুক্ত রহিয়াছে।
    দেশভাগের আগে বর্ত্তমান বাংলাদেশে (পূর্ব্ব পাকিস্তান) হিন্দু-মুসলমান শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করিয়া আসিয়াছেন। দেশভাগের আগে পূর্ব্বপাকিস্তানের ( বর্ত্তমান বাংলাদেশ) সংগে রেল, বাস এবং রেল, বাস এবং জলপথে ভারতের সংগে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল।পূর্বপাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে আমি একজন ভূক্তভোগি হিসাবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এখানে তুলিয়া ধরিতেছি।
     ১৯৫০ ইং ( ১৩৫৭ বাংলা) ফাল্গুন মাসের শেষের দিকে ( তারিখ মনে নাই) আমি এবং আমাদের গ্রামের একটি ছেলে ( আমরা দুইজনই তখন স্কুলের ছাত্র) করিমগঞ্জ যাওয়ার উদ্দেশ্যে By train  শ্রীহট্ট হইতে কোলাউড়া নামক রেল জংশনে আসি। এখান হইতে পৃথক ট্রেইনে করিমগঞ্জ যাইতে হইবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা কোলাউড়া জংশনে পৌঁছিয়া করিমগঞ্জ যাওয়ার কোনো Train পাই নাই। Train না থাকার কারণে হিন্দুমুসলমান বহুযাত্রী কোলাউড়া জংশনে আটক পড়িয়া যান।
    সন্ধ্যার পরে একজন মুসলমান ব্যক্তি মাইক যোগে ঘোষনা করিতে লাগিল, মুসলমা যাত্রিরা কেহ যেন ঐ দিন করিমগঞ্জ না যান। আমি ঐ ঘোষক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করিলাম কেন এই ঘোষণা? সে আমাকে বলিল এই ঘোষণা শুধু মুসলমান যাত্রিদের জন্য।
    আমরা প্লেটফর্মে হাটাহাটি করিতেছি, এমন সময় আমাদের পরিচিত জনৈক মুসলমান কলেজ ছাত্রের সংগে দেখা হইল। তাহাকে আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম করিমগঞ্জ যাওয়ার Train বন্ধ কেন ? সে তখন আমাদিগকে একটু দূরে নিয়া গিয়া প্রকৃত ঘটনা আমাদিগকে বলিল। সকালে একটি Train কোলাউড়া হইয়া করিমগঞ্জ গিয়াছে। ভৈরব নামক স্থানের একটি সেতুর উপর উক্ত Train দাঁড় করাইয়া নৃশংসভাবে অনেক হিন্দু যাত্রিকে খুন করা হইয়াছে এবং মৃতদের লাস নদীতে ফেলিয়া দেওয়া হইয়াছে। Train এর প্রতিটি কামরা রক্তে লাল ছিল। ঐ Train করিমগঞ্জ পৌছার পর Train এর কামরাগুলিতে রক্ত দেখিয়া করিমগঞ্জের মানুষ উত্তেজিত হইয়াছে। এবং সেখানে কিছু গোলমাল হইয়াছে। Train টিকে সেখানে আটক রাখা হইয়াছে। ঐ Train  ফেরৎ না আসায় এখান হইতে কোন Train করিমগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করিতেছে না। একই কারণে করিমগঞ্জ না যাওয়ার জন্যে মুসলমান যাত্রিদের নিষেধ করা হইতেছে।
     উক্ত ছাত্রটি আমাদিগকে আরো জানাইল যে, সরকারের সমর্থণে সমগ্র পূর্ব্বপাকিস্তান ব্যাপিয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাইবার একটি পরিকল্পনা রচনা করা হইয়াছে। ভৈরব নামক স্থানে একটি সেতুর উপর Train আটক  করিয়া  যে হিন্দু নিধন যজ্ঞ হইয়াছে তাহা উক্ত পরিকল্পনারই অঙ্গ এবং দাঙ্গা যে সমগ্র দেশ ব্যাপিয়া ছড়াইয়া পড়িবে এই ঘটনা তাহারই ইঙ্গিত বহন করিতেছে।
     আমরা করিমগঞ্জ যাইবার চেষ্টা না করিয়া নিজনিজ বাড়িতে ফিরিয়া যাইবার জন্য সে আমাদিগকে অনুরোধ করিল।আমাদের বাড়ি শ্রীহট্ট শহর হইতে ১০ মাইল দক্ষিণে। আমরা যদি রাতের Train এ বাড়ীতে যাইতে হয় তা হইলে বাড়ীতে পৌছিতে অনেক রাত হইয়া যাইবে। তাই আমরা বাড়ীতে না যাইয়া কোলাউড়া হইতে ২ ঘণ্টার রাস্তা মঙ্গলো বাজারের পাশে আমাদের আত্মীয় বাড়ীতে যাওয়াই যাওয়াই স্থির করি এবং যথাসময়ে Train এ উঠি। উক্ত Train মঙ্গলো বাজার ষ্টেশনে রাত ১১- ৩০ মিনিটে পৌছে। আমরা Train হইতে নামিয়া যাই এবং নির্দ্দিষ্ট সময়ে Train খানা উক্ত ষ্টেশন ছাড়িয়া যায়। ষ্টেশন হইতে আমাদের আত্মীয় বাড়ী পায়ে হাটিয়া যাইতে আধা ঘণ্টা সময় লাগিবে। Train হইতে নামিয়া যাইবার সময় একজন লোক আমাদের Ticket চাহিয়া নিয়া গেল আমরা আত্মীয় বাড়ি যাওয়ার রাস্তা ধরিয়া হাটিতে আড়ম্ভ করিয়াছি এমন  সময় ৮/১০জন লোক লাঠি ছুরি লইয়া আমাদিগকে ঘেরাও করিয়া মারামারি আরম্ভ করিল এবং আমাদের সংগে সমস্ত জিনিস পত্র লুটপাট করিয়া লইল। এই ফাঁকে প্রাণ বাঁচাইবার জন্য আমরা দৌড়াইতে আরম্ভ করিলাম তাহারা আমাদের পিছনে ধাওয়া করিল বটে কিন্তু আমাদিগকে ধরিতে পারে নাই। আমরা রাত প্রায় ১ ঘটিকার সময় আত্মীয় বাড়ী পৌছিয়াছি।
     আমরা সেখানে গিয়া জানিলাম তাহাদের আশেপাশে বাজারে দোকানগুলো ঐদিনই লুটপাট করা হইয়াছে এবং তাহারাও আতঙ্কের মধ্যে রহিয়াছেন। আমরা পরদিন ভোরে একজন মুসলমান লোককে সংগে নিয়া মুসলমান পোষাক পরিধান করিয়া ‘ছনখাইড়’ নামক একটি গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলাম। সেখানে পৌছিয়া জানিলাম যে আগের দিন তাহাদের আশে পাশের বাজারগুলোও লোটপাট হইয়াছে। ঐদিনই সকাল ১০ ঘটিকায় প্রায় ৫০০০ লোক উক্ত ছনখাইড় গ্রাম আক্রমণ করিয়াছে। সকল জিনিষ পত্র লোটপাট করিয়া নিয়া গিয়াছে। এই গ্রামে প্রায় ৫০০ পরিবার হিন্দুর বাস ছিল। গ্রামের মেয়েরা জঙ্গলে যাইয়া লুকাইয়া থাকায় তাহাদের ইজ্জত রক্ষা পাইয়াছে।
    আমরা সেখান হইতে মুসলমান পোষাকে একজন লোক সংগে নিয়া আমাদের বাড়ীতে পৌঁছাই। বাড়ি পৌঁছিয়া জানিলাম আমাদের গ্রাম সহ আশেপাশের অন্যান্য গ্রামগুলাও আক্রান্ত হইয়াছে। দেশের অন্যান্য অংশ হইতেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সংবাদ আসিতে লাগিল।
    করিম গঞ্জ বাজারে আমার বাবার একটি ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। তাই আমি আমার মা ও ভাই বোনকে নিয়া করিমগঞ্জ চলিয়া আসি। আসার সময় সুতারকান্দি বর্ডারে আমার মায়ের সোনা গহনা যাহা ছিল সব তাহারা রাখিয়া দেয়।আমাদের গ্রামের তথা দেশের অন্যান্য অংশের লোকজন বাড়িঘর ত্যাগ করিয়া বিভিন্ন সীমান্ত দিয়া ভারতে প্রবেশ করে। ভারতে আসিয়া অধিকাংশ লোকই আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নেয়। করিমগঞ্জ আশ্রয় শিবির হইতে অনেক লোককে দোহালিয়া নামক জায়গায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পুনর্বাসন দেওয়া হইয়ছিল। সেখানে মেলেরিয় রোগে আক্রান্ত হইয়া অনেক লোক মারা গিয়াছিল।
     এখানে একটি কথা উল্লেখ করা আবশ্যক, দাঙ্গার সময়ে পূর্ব্ব পাকিস্তানের সরকার হইতে হিন্দুদের কোন রকম নিরাপত্তা দেওইয়া হয় নাই। বরং হিন্দুদের পক্ষ থেকে থানায় সাহায্য প্রার্থণা করিতে গিয়া গালাগালি শুনিতে  হইয়াছে।
আমাদের ভারতে আগমন এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমি এখানে তুলিয়া ধরিলাম, তাহা আমার জ্ঞান বিশ্বাস মতে সম্পূর্ণ সত্য!
                                            শ্রী গোপিকা রঞ্জন সেন
                                             ০২-০৭-১২
 

আমাদের  সংযোজনঃ
    আমার মামারা তিন ভাই, সবচে’ ছোট আমার মা। গোপিকা রঞ্জন আমার বড় মামা। এর পর থেকে মামা বলেই উল্লেখ করব। সম্ভবত তাঁদের দেশ ছাড়বার বছরে আমার মায়ের বয়েস তিন ছিল। যদিও কোনো একক সাক্ষাৎকার বা স্মৃতিকথা কোনো পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না তবু বেশ কিছু আগ্রহব্যঞ্জক তথ্য এখানে পাওয়া যাচ্ছে। যে হাঙ্গামা শুরু হয়েছিল প্রায় তিনমাস আগে ডিসেম্বর ১৯৪৯ থেকে তার সম্পর্কে তিনি কিছুই প্রায় জানতেন না কোলাউড়া স্টেশনে আসবার আগে অব্দি। মুসলমান যাত্রীদের করিমগঞ্জ যেতে মানা করা হচ্ছে শুনে কোন ভয় শংকারও কারণ দেখেন নি। সম্পন্ন গৃহস্থ মানে ধনী কৃষকের ঘরের সন্তান তিনি, করিমগঞ্জে আগে থেকেই আছে পৈত্রিক ব্যবসা। বাবা ওখানেই আছেন। যেতে আসতে কোনো সীমান্ত চৌকি ছিল বা ভিসা পাসপোর্ট দিতে হতো এমন সংবাদ নেই। যিনি ঘোষণা করছেন তাকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করছেন কারণ। পরে যার থেকে জানলেন তিনি কলেজে পড়া ছাত্র মাত্র নয়। দেশের খবরাখবর রাখেন এবং খবরের ভেতরের খবর রাখবার যোগ্যতাও রাখেন। রাষ্ট্র নিজে এটা সংগঠিত করছে এটা বোঝেন এবং বোঝাতে পারেন। তিনি মুসলমান। কিন্তু বক্তা এবং স্রোতার পরস্পরের মধ্যে নিজেদের পরিচিতি নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। নেই সংশয়। অথচ সেদিনই সামান্য দূরে ভৈরব সেতুতে কয়েক শত হিন্দু যাত্রীদের উপর আক্রমণ নেমেছে। তিনি তাদেরকেও বাড়ি ফিরে যাবার পরামর্শ দেন। আত্মীয় বাড়ি যাবার পথেও আক্রান্ত হলেন, গিয়েও জানলেন আশেপাশের বাজারে সেদিন হামলা হয়ে গেছে তারপরেও পরদিন সকালে মুসলমান সঙ্গীকে নিয়ে ছনখাইড় পথ ধরতে অসুবিধে হয় নি। ছনখাইড়ে গিয়ে শুনলেন সেখানেও আগুন জ্বলেছে। মেয়েরা জঙ্গলে গিয়ে প্রাণ বাঁছিয়েছে। সেখান থেকেও বাড়ি যাবার নিরাপত্তা পাওয়া গেল আরেক মুসলমান সঙ্গীর থেকে। রাষ্ট্র কী আচরণ করত এসব তাঁর শোনা কথার থেকে কিছু জানা যাচ্ছে। এসব হামলা থেকে বাঁচাবার কোন উদ্যোগই ছিল না। বরং পুলিশে নালিশ করলে গালিগালাজ শুনতে হতো হিন্দুদের। তাদের প্রত্যক্ষ বাজে অভিজ্ঞতাটি এই যে যখন একেবারে চলে আসছিলেন তখন সুতারকান্দি সীমান্তে তাঁর মায়ের সোনা গহনা ‘তাহারা’ রাখিয়া দেয়। আমরা অনুমান করতে পারি ওদিককার সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর কথা বলা হচ্ছে। একেবারে নিরাশ্রয় তারা হলেন না কিন্তু । এ যেন  ওবাড়ি থেকে এবাড়ি চলে আসা। ওবাড়িতে শুধু আর যাবেন না। করিমগঞ্জে ব্যবসা না থাকলে চলে আসতেন কি? জানি না।   সবটাইতো আর নিরাপত্তাহীনতার গল্প নয়। সেই মুসলমান কলেজ পড়ুয়া ছাত্রটি থেকে শুরু করে বাড়ির পথের মুসলমান সঙ্গীদের আশ্বাস বলে এক বাস্তবতাও ছিল তো? সম্ভবত সেগুলো অনেককে আটকেও রেখেছিল।যেমন তাঁর মামাদের।তাঁরা কিন্তু চলে আসেন নি।
             আমি আমার পরিবারের কথা কিছু জানি। আমার বাবা সে অর্থে কোনকালেই বাংলাদেশ থেকে চলে আসেন নি। ১৯৬৪ নাগাদ নাগাল্যাণ্ড সরকারের চাকরি নিয়ে তুয়েনসাং জেলার সামাতুরে চলে যান। সেখানে থাকতেই দেশের বাড়িতে তাঁর বাবা মারা গেলে দূরত্বের জন্যে তিনি আসতে পারেন নি। পরের বছর এসছিলেন। পরের বছর যখন করিমগঞ্জে গিয়ে বিয়ে করেন তখনো দেশের বাড়ি হাত ছাড়া হয় নি। কিন্তু সেখানে গেছেন বলে শুনিনি। কারণ ওখানে মহিলা বলে কেউ নেই। তাঁর মা গত হয়েছিলেন বাবার আগেই। ততদিনে তাঁর বড় তিন বোনেদেরও বিয়ে হয়ে গেছে এবং তাদের পরিবার এসে গেছেন অসমে। ছোট দুই ভাই ছিলেন ,তারাও জীবিকার সন্ধানে শিলচরে এবং গুয়াহাটিতে তখন। বাড়িটি আছেই। সেই বাড়ি নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখান নি বাবা—এই অভিমান পরে অনেক শুনেছি মেজো কাকার কাছে। ১৯৫২ থেকে পাসপোর্ট ব্যবস্থা চালু হলেও মনে হয় না খুব কড়াকড়ি ছিল। আমাদের পরিবারের কারো কোন পাসপোর্ট ছিল না। তার দরকার আছে বলেও মনে হয় না কেউ ভাবতেন। শুধু ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই সমস্ত যোগাযোগ তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল সে দেশের সঙ্গে। এই তাদের দেশভাগ।
    
কী  হয়েছিল  তবে  ১৯৫০ এ ঃ
    দেশভাগের তিন বছর পর এই হাঙ্গামা কেন? মুসলমানের দেশে হিন্দুকে মারা হবে--- এ আর বিচিত্র কী কথা! –এভাবে কেউ কেউ ভাবতে পারেন। কিন্তু এ আসলে অতিসরলী করণ হয়ে যাবে। আসলে এটি ছিল ১৯৭১এর মুক্তি যুদ্ধের গর্ভযন্ত্রণা।দু’বছর পরেই কিন্তু ১৯৫২র ভাষা আন্দোলন এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি। এটা আমাদের বোঝা ভালো। ১৯৪৯এর ডিসেম্বরে কমিউনিষ্ট দমনের অভিযান দিয়ে শুরু হয়েছিল ঘটনাক্রমের। খুলনা জেলার বাগেরহাট মহকুমাতে কালশিরা গ্রামে কমিউনিষ্ট সন্দেহে পুলিশ ধরতে যায় জয়দেব ব্রহ্মকে। তাঁকে না পেয়ে তাঁর স্ত্রীকে ধর্ষণ করবার চেষ্টা করে। তিনি চেঁচালে প্রতিবেশি লোকেরা এসে মেরে পুলিশ তাড়িয়ে দেয়। একজন পুলিশ মারাও গেছিল। তারই প্রতিশোধ নিয়ে পরদিন জেলার পুলিশ সুপার সশস্ত্র পুলিশ এবং আনসার বাহিনী  ( ভারতের হোমগার্ডের মতো অনেকটা) নিয়ে এসে কালশিরা এবং পাশের হিন্দু গ্রামগুলোতে আক্রমণ নামান। সাধারণ মুসলমান গুণ্ডাদের উস্কে রেখেছিলেন লুটপাট এবং ঘরে আগুন দিতে। সেই শুরু। সেই মাসেই প্রায় হাজার ত্রিশেক লোক খুলনা ছেড়ে ভারতে চলে আসেন। জানুয়ারিতে পুলিশ একই রকম তেভাগা আন্দোলনের ঘাটি রাজশাহী জেলার নাচোলে  সাওঁতালদের উপর আক্রমণ নামায়। বিখ্যাত নেত্রী ইলা মিত্রকে তখনই পুলিশ থানাতে নিয়ে গিয়ে অমানবিক অত্যাচার এবং ধর্ষণ করে। ইলা মিত্র চিকিৎসার জন্যে এবং মামলা এড়াতে ১৯৫৪এর জুনে  কলকাতা  চলে এসে থেকে গেলেও অত্যাচারিত  সাঁওতালরা চলে এসছিলেন পাকাপাকি  সেরকম খবর নেই। হয়। ১০ ফেব্রুয়ারিতে প্রাদশিক বিধান সভাতে কংগ্রেস সদস্যরা কালশিরা এবং নাচোলের ঘটনা নিয়ে আলোচনার দাবি জানালে অধ্যক্ষ অনুমতি দেননি। প্রতিবাদে কংগ্রেস সদস্যরা বেরিয়ে আসেন। সেদিনই ঢাকাতে আক্রমণ নামে।  বিমান বন্দরে পলায়নরত যাত্রীদেরকে হত্যা করা বরিশাল , ময়মন সিংহ, নোয়াখালিতেও আক্রমণ নামে।  বরিশালে যে আক্রমণ নামে সেটিই বোধকরি ভয়াবহ ছিল। প্রায় ছ’লাখের উপর মানুষ শুধু সেই জেলা থেকেই পালিয়ে ভারতে এসছিলেন। নোয়াখালিতে আক্রান্ত অধিকাংশই ত্রিপুরাতে প্রবেশ করেছিলেন। সব মিলিয়ে দশলাখের বেশি মানুষ সেবারে গোটা দেশ ছেড়ে ভারতে এসছিলেন।
            আমার মামা যে ভৈরব সেতুর কথা উল্লেখ করেছেন সেটির সরকারি নাম ছিল এণ্ডারসন ব্রীজ। সেটি কিন্তু সিলেটের  নয় । এখনকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব বাজার জংশনকে যুক্ত করে মেঘনা নদীর উপর  এই সেতু প্রায় এক কিলোমিটার থেকেও বেশি দীর্ঘ।  সিলেট জেলা থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে এর অবস্থান।  অসম বেঙ্গল রেলওয়ে অসমের চাবাগানগুলোর সুবেধের জন্যে  ১৮৯১তে  চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রেল বসিয়ে ক্রমে কোমিল্লা কোলাউড়া হয়ে লামডিং অব্দি টেনে এনেছিল যে লাইন এই সেতু কিন্তু সেই  লাইনে পড়ে না। আখাউড়া থেকে এর একটা শাখা চলে গেছিল ঢাকা ময়মনসিংহকেও যুক্ত করে। সেই লাইনেই ১৯৩৭এ ঐ সেতু তৈরি হয়। উদ্বোধনের তারিখটি এখন বেশ আগ্রহোদ্দীপক মনে হবে। ৬ ডিসেম্বর। সুতরাং ঠিক ঐ রেলই রক্তধোয়া হয়ে করিমগঞ্জ পৌঁছেছিল কিনা নিশ্চিত জানি না।  সম্ভবত ঢাকা থেকে আখাউড়া হয়ে আসছিল সেই ট্রেন। এখনো ঢাকা সিলেটের রেলপথ এটাই। 
              যাইহোক, সিলেটে তখন দু’শোর উপর গ্রাম আক্রান্ত হয়েছিল। ৫০০র উপর ছোটবড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। মণিপুরিরাও ব্যাপক আক্রমণের স্বীকার হয়েছিলেন। এই মণিপুরি বা সাঁওতাল বা গারো বা হাজং যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন তাঁরা কেউ কেউ যদিও বা সাময়িক ভাবে সীমান্তের এপারে এসছিলেন পাকাপাকি থেকে গেছিলেন এমন সংবাদ কিন্তু নেই। আর থাকলেও শরণার্থী সংক্রান্ত রাজনৈতিক বয়ানে কিন্তু তারা ভারতে একেবারেই অনুপস্থিত।
             সুতরাং যতটা বলা হয় যে মুসলমানরা ক্ষেপে গিয়ে হিন্দুদের দেশছাড়া করিয়েছিল—এগুলো এতো সরল বাক্য নয়। মুসলমানরা বাঁচিয়েও ছিল, প্রতিরোধও করেছিল। তার প্রথম কারণতো অবহমান সামাজিক ঐক্য। যেমন আমার মামাদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। এর রাজনৈতিক কারণও ছিল। সেও অনেকগুলো। ৮ অক্টোবর ১৯৫০এ আইন এবং শ্রমমন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল তাঁর পদত্যাগ পত্রে১ বাঙালি এবং অবাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিরোধ , নিজামুদ্দিন এবং শোহরাবর্দী গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ, ইন্দো-পাক বাণিজ্যিক সম্পর্কের জটিলতার থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেওয়া এবং দুই বাংলা এক করার লড়াই প্রবল হয়ে উঠার আশঙ্কা ইত্যাদির থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে এই হাঙ্গামা বলে উল্লেখ করেছেন। এগুলো হয়তো সব ঠিকই। কিন্তু এরমধ্যেই ইতিমধ্যে যে এক বাঙালি জাতীয়তাবাদ দানা বাঁধছিল তার ইঙ্গিত আছে। আর তেভাগা আন্দোলনের ভয়তো ছিলই। যার বৌদ্ধিক নেতৃত্ব অবশ্যই ইলা মিত্রের,রণেন মিত্রের মতো বাঙালি বর্ণহিন্দুদের হাতে ছিল। যে লড়াইতে অচিরেই মুসলমানরা যোগ দিতে পারতেন বৃহৎ সংখ্যাতে,আর দিয়েওছিলেন অনেকে। কেননা “বাঙ্গালী মুসলনমান সে সময়ে দেশের সম্পদের মাত্র ৩ শতাংশের অধিকারী ছিলেন, যখন স্টেট টেন্যান্সি এক্ট ১৯৫১ জারি করা হয় তখনও দেশের ১৫ শতাংশ সম্পদ ও ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রন করতে উচ্চবর্ণের হিন্দু ও মারোয়ারী সম্প্রদায় ।”২  বস্তুত ব্যাপক মুসলমান কৃষক জনতার সঙ্গে বর্ণহিন্দু জমিদার, জোতদার ,ধনীকৃষকদের সংঘাত কাজে লাগিয়ে মুসলমান জনতাকে নমসূদ্র সহ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া হিন্দু জনগোষ্টীর বিরুদ্ধেও লেলিয়ে দিতে চাইছিল। যে জনগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মুসলমানের দ্বন্দ্ব ছিল অবৈরি। তাই যোগেন মণ্ডলের মতো নেতা পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সেই দ্বন্দ্বকে বৈরি দ্বন্দ্বে পরিণত করে ফেলতে চেয়েছিল এবং অনেকটাই পেরেছিল পাকিস্তান নামের নয়াউপনিবেশের  শাসক শ্রেণি। যার গাঁটছড়া তখনো বাঁধা ছিল ব্রিটিশের সঙ্গে, এবং মুখিয়ে ছিল আমেরিকা সহ অন্যান্য পশ্চিমী দেশগুলোর দিকে, যেমন ছিল ভারতীয় শাসকদেরও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রায্যবাদ তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশেই সামন্তশেণী এবং দেশীয় পুঁজিপতিদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে শাসন চালিয়ে যেতে সমর্থ হয় ,কিন্তু পরোক্ষে। পুঁজিবাদী উৎপাদনের সমস্ত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে, সেই সঙ্গে বহাল রাখে উদ্বৃত্ত আহরণের সমস্ত অর্থনীতি বহির্ভূত উপায়সমূহ। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণও সেই স্বার্থেই দরকার পড়ে। পাকিস্তানের কাছে এই উপায়গুলোর একটি ছিল ঊর্দু জাতীয়তাবাদ। এমনিতে ভারত থেকে আলগা হবার পরেই ভারতীয় বর্ণহিন্দুদের সঙ্গে যে বিবাদ তার কার্যকারিতা ফুরিয়ে যাবার কথা ছিল। জিন্না তাই একবার পাকিস্তানে ধর্ম-জাতির নির্বিশেষে কোন বৈষম্য রাখা হবে না বলে ঘোষণা করেন। হয়তো তিনি তা মনের একদিক থেকে চেয়েওছিলেন। কিন্তু অচিরেই তিনি উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র স্বীকৃত ভাষা বলে ঘোষণা দিয়ে বসেন।স্বাধীনতার বছরেই পরের মার্চ মাসে তিনি ঢাকাতে এসে এই ঘোষণা দেন। তার আগের মাসেই পাকিস্তান সংসদে কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান সংসদে দাবি তুলেছিলেন ইংরেজি উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সেখানে সেটি নাকচ হয়ে গেলেও ঢাকাতে ছাত্ররা পথে নামে। অনেকের সঙ্গে গ্রেপ্তার বরণ করেন নবীন ছাত্র নেতা শেখ মুজিবর রহমান। যিনি পরে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেবেন। সে বছরের জুন মাসে তিনি মৌলানা ভাসানীর সঙ্গে মিলে গড় তোলেন আওয়ামী লীগ। দুই পাকিস্তানের সবচে’বড় জনগোষ্ঠী ছিল তখন বাঙালিরা।  সুতরাং তারা না আলাদা হয়ে যায়, অখণ্ড বাংলার স্বপ্নকে সাকার করবার জন্যে মাঠে নামে এমন এক ভয় জিন্না এবং পরবর্তী শাসকদের কুরে কুরে খাচ্ছিল। সেই সঙ্গে শুধু নাচোল বা তেভাগাই নয় চীন বিপ্লবের ভূতও তাড়া করে ফিরছিল দ্বিখণ্ডিত ভারতের শাসকদের। এগুলো আটকাতে গেলে হিন্দু আর মুসলমানে বিরোধটা চাগিয়ে দিতে হয়। তবে পশ্চিম বাংলাতেও আর কেউ অখণ্ডবাংলার স্বপ্ন দেখার সাহস করে না। ইতিমধ্যে দু’টুকরো সিলেট নিয়ে হয়তো তিনি ভাবেন নি। হয়তো ভেবেছিলেন সিলেটের স্থানীয় পাকিস্তানপন্থীরা, যারা বর্ণহিন্দু আধিপত্যের থেকে মুক্তি চাইছিলেন আর সিলেটি হিন্দুরা তখনো দেশ ছাড়ার নাম নিচ্ছিলেন না। এতোসব কথা আমার মামারা জানতেন না। তাই যেদিন ভৈরবের পুলে গণহত্যা হয় সেদিনও তারা বেরিয়েছিলেন করিমগঞ্জ আসবেন বলে, সেখানে তাদের পৈত্রিক ব্যবসা আছে আগে থেকেই। আর যে ব্যক্তি মুসলমানদের করিমগঞ্জ যেতে মানা করছিল তাঁকে গিয়ে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞেস করতে পেরেছিলেন, কারণটা কী?

তথ্যসূত্রঃ

১) আইন এবং শ্রমমন্ত্রীর যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের পদত্যাগ পত্র;মুক্তমনা ইয়াহুগ্রুপ.
২)বাংলা বিভাজন ভবিষ্যত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের সূচনা করেছিলো হয়তো- ০৩/রাসেল পারভেজ;আমারব্লগ ডট কম.
গ্রন্থসূত্রঃ
১) দেশভাগ –স্মৃতি আর স্তব্ধতা; সম্পাদনা সেমন্তী ঘোষ;গাঙচিল; কলকাতা৭০০১১১।
২)বাংলায় মুসলমানের আটশ বছর;জাহিরুল হাসান;পূর্বা;কলকাতা-৯।

Thursday, 2 August 2012

বডোল্যান্ডের জনগোষ্ঠীগত সংঘাত সম্পর্কে

                 গেল বারো বছরে অসমে সরকারী হিসেবে ৪২৪ জন লোক মারা গেছেন, ৫০,৭০০০ লোক গৃহহারা হয়েছেন। গোষ্ঠীগত সংঘর্ষে। এদের সিংহভাগ মুসলমান। মুসলমান মরলেই বলা হয়, এসব অনুপ্রবেশকারীর কাণ্ড। তাই যদি হয় তবে কি এটা ভালো নয়, তারা আসুন দলে দলে বাংলাদেশ থেকে আর স্বধর্মীয়-স্বজাতীয়দের মেরে কেটে তাড়িয়ে দিন, সংখ্যা কমে যাবে অনুপ্রবেশকারীর? এক কালে অসমের সমস্ত উগ্রপন্থী দলগুলো সম্পর্কে জনপ্রিয় অভিযোগ ছিল এরা আই এস আই-র সহযোগী। এখন যখন এরা আত্মসমর্পণ করে আলোচনার টেবিলে এসছেন, সব্বাই হিন্দুত্ববাদীদের বন্ধু হয়ে গেছেন। একজন গান ধরলে অন্যজন দোহার দিচ্ছেন। আর সেই সব মুসলমান উগ্রপন্থীর দল গেল কোথায়! যাদের কথা, এই সেদিনও ঘন ঘন শোনা যেত? তারা যে কেউ আত্মসমর্পণ করল না, ধরাও পড়ল না আলোচনার টেবিলেও এলেন না। অথচ , কৈ বিএলটি, এন ডি এফ বি, আলফা কেউতো বলে না আমাদের ধরে এনেছো, মুসলমান উগ্রপন্থীদের ছেড়ে দিলে যে! বাংলাদেশ সরকার এদের ধরিয়ে দিলে বলে কাগজে কাগজে কত প্রশংসা প্রশস্তি! কিন্তু কেউতো জিজ্ঞেস করেনা, ও মেডাম হাসিনা, আপনি দেখি মুসলমান উগ্রপন্থীদের বেশ লুকিয়ে রেখেছেন! বলবে কি, বলবার মুরোদ থাকলে তবে তো! ঝুলির বেড়াল যে বেরিয়ে যাচ্ছে। এবারে তাই কেউ মুসলমান উগ্রপন্থীর নাম না নেয়াটাই নিরাপদ ভাবছেন। পারেও বটে হিন্দুত্ববাদীরা। এমনি হয়, এদের আখ্যান নির্মাণ!

             লেখার শুরুতেই একটা কথা স্পষ্ট করে দিতে চাই। অসমের বডোল্যান্ডের বর্তমান সংঘাতটা মোটেও হিন্দু মুসলমান লড়াই নয়। বডো পক্ষে হিন্দু-খৃষ্টান দুইই আছেন। কিন্তু গোটা পূর্বোত্তরেই জনজাতিআধিপত্যের রাজনীতি যারা করেন তাদের অন্য অনেক লক্ষ্য থাকলেও মুসলমান এক প্রিয় টার্গেট। বন্ধুদের মনে থাকবে বছর কয় আগে অরুণাচল থেকে প্রবল বাংলাদেশীবিতাড়ন শুরু হয়েছিল। পরে অসম সরকার-ই বলেছে, এরা সবাই ভাটি অসমের মুসলমানশ্রমিক। বডোল্যান্ডে আপাতত দৃশ্যত এটা বডো-মুসলমান এই দুই পরিচিতির সংঘাত। এতে কোনো পক্ষেই ধর্মবিশ্বাসের কিছু করবার নেই। এটা হয়তো অনেকেই জানেন নাযে প্রাক্তন বি এল টি হচ্ছে হিন্দু (ব্রহ্ম) পক্ষ, আর এন ডি এফ বি হচ্ছে মোটা দাগে খৃষ্টান পক্ষ। ২০০৮এর উদালগুড়ি দাঙ্গাতেও দেখা গেছিল, একদিকে মুসলমান-অন্যদিকে সমস্ত হিন্দু। যদিও অন্তর্বস্তুতে সেটিও ছিল বডো শাসকের তরফে নির্জাতিকরণের কৌশল। কিন্তু তখন বিটিএডি হয়েছে মাত্র । রাজ্য দাবির লড়াই থাকলেও আজকের মতো জোরালো হয় নি। ওদিকে কিছুদিন আগেই উজান অসমে আরেকবার ‘অনুপ্রবেশ’-এর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অসম আন্দোলন শুরু করেছিল কিছু জাতীয় ছাত্র সংগঠন। সুতরাং এক তরফা মুসলমান বিরোধী (এভাবে অবশ্য এরা বলেন না, বলেন ‘অনুপ্রবেশকারী মুসলমান’) একটা আবেগ তৈরির প্রয়াস রাজ্য জুড়েই সফল হয়েছিল। তাতে বাঙালি হিন্দু পক্ষও যোগ দিয়েছিলেন।

                  কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরো আলাদা। এখন বাকি সমস্ত হিন্দু নীরব। বিজেপি ছাড়া।  হ্যা, তাঁরা শান্তি শান্তি করছেন। এটাতো করতেই হবে। কিন্তু সেগুলো আমসুর (মুসলমান) মতো সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে। বাদ দিয়ে নয়।উদালগুড়ি দাঙ্গার সময় আমসু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল। এখন আবসুর মতো সংগঠনও আমসুকেই বেশি কাছে টানছে। এই দাঙ্গার উত্তেজনা মোটেও বাকি অসমে ছড়ায় নি।শিবসাগরে মানুষ উত্তেজিত রেকিবুদ্দীন হত্যা এবং সেনার হাতে দুই ছাত্রীর অপমান নিয়ে। সেখানে হিন্দু মুসলমান একজোট হয়ে বিশাল লড়াই লড়ছেন। এটা কেন হচ্ছে? সোজা কথা হচ্ছে, এখন বাকি হিন্দুরা দেখছেন এই মুসলমানেরাই বডোল্যান্ড আটকাবেন। বাঙালি হিন্দু সংগঠনগুলোও। আমসুর সঙ্গে এরাও আছেন অনাবডো মঞ্চে। অসমিয়ারাও। আর ঠিক তাই তরুণ গগৈ যখন বলছেন এই দাঙ্গাতে বাংলাদেশীদের মদত নেই তখন মূল স্রোতের অসমীয়া কাগজ সমালোচনা করছে, এটা তেমন দেখিনি। এই সব কথা যদি কারো তাত্ত্বিক মনে হয় আমার কিছু করবার নেই।

               মুসলমান তবে মার খাচ্ছে কেন?  বা কারো কারো যেমন দাবি মুসলমানেরাও পালটা মারছেন, এটা হচ্ছে কেন? আমি মনে করিয়ে দিই, ৯০ দশকে সাঁওতালেরাও মার খেয়েছিলেন। খেয়ে কোবরা মিলিটেণ্ট ইত্যাদি সংগঠন গড়ে পালটা জবাব দিয়েছিলেন। তাই ওদের গায়ে সরাসরি হাত তোলবার সাহস আর হয় না। কোচেরাও মার খেতে পারতেন, কিন্তু তাঁরাও পৃথক কামতাপুরের দাবিতে পশ্চিম বাংলা অব্দিসংগঠন গড়ে তোলেছেন। তৃতীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠীটি হচ্ছেন মুসলমান যারা সোজা অসমের অখণ্ডতার পক্ষে দাঁড়িয়ে অনাবডো আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মুসলমানের এইভূমিকা যদি একবার ঐতিহাসিক ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় তবে যে রাজ্যদাবীর লড়াই দুর্বল হবে তাই নয়, অসম তথা পূর্বোত্তরের রাজনীতির অনেক কিছুই পাল্টেযাবে। তাই এদেরকে শিক্ষা দেবার আয়োজন। মুসলমান জনতার মনে ভীতি ঢুকিয়ে দেওয়া।ভাবা গেছিল এতে আগের মতোই দেশজোড়া হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিক এবং প্রচারমাধ্যমের সমর্থন পাওয়া যাবে। তা গেছেও,অনেকটা। কিন্তু খেলা বিগড়ে গেছেঅসমেই। আপাতত, এই সংঘাত থেমে যাবে। কিন্তু মনে হয় না, অসমের রাজনীতি আরআগের মতো থাকবে। এবারে সেণ্টার স্টেজে মুসলমান! হয় মেনে নাও, নতুবাবডোল্যান্ড হারিয়ে বসো। যা হবে অসমীয়াদের পক্ষে এক মরণ আঘাত।

                 এবারে এই বডো, কোচ, সাঁওতাল, বাঙালি হিন্দু ( সাধারণভাবে বর্ণহিন্দু বাদ, কেননা তারা কলকাতায় ফ্লাট কিনে রেখেছেন অনেকেই) সবাই নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর লোক।তবে তারা এই মারামারি করছেন এটা কি ভালো হচ্ছে? নিশ্চয়ই হচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে বডোল্যান্ড লড়াইকে সমর্থন দেবেন না অন্যেরা, এটাওতো স্পষ্ট।কামতাপুরে্র পক্ষেও দাঁড়ানো মুস্কিল। কারণ জায়গা প্রায় একই। ওদিকে বাকিদের ভোটের রাজনীতিতে সামান্য প্রভাব থাকলেও, বডোদের আকাঙ্খাকে অনেকটাই স্বীকৃতি দিয়ে যে শাসক শ্রেণির ছোট সহযোগী করে ফেলা হয়েছে এটাতো স্পষ্ট। তবে বাকিদের তুষ্ট করবার উপায় কী? না করলেতো লড়াই চলবেই। হিন্দু বাঙালিরাও যতটা নিরাপদে গুয়াহাটি থাকতে পারেন তত নিরাপদে নেই বডোল্যান্ডে। নিশ্চয় সেগুলো দীর্ঘদিনের বডোদের প্রতি বাঙালি বর্ণহিন্দুদের করা অবজ্ঞার প্রতিক্রিয়া।কিন্তু সে প্রতিক্রিয়া বড়ো সুখের নয়। নিত্যদিন দাবী ধমকি হুমকির মুখে থাকতে হচ্ছে। যদিও বাঙালি হিন্দু ছোট জনগোষ্ঠী বলে এখনই সম্প্রদায় হিসেবে আক্রান্ত নন। তেমনি অবস্থা অসমিয়া মধ্যবিত্তদের-ও। অসমিয়া ভাষা আক্রান্ত হচ্ছে । অসম সাহিত্য সভা নীরব থাকছে। শান্তি শান্তি আর মিলন মিলন বলে কোনো স্থায়ী সমাধান বেরুবে না। বডোল্যান্ড মেঘালয় নয়। মেঘালয়ে গারো খাসি সংখ্যাগুরু ছিলেন। বডোল্যান্ডে অবস্থা অন্যরকম। এখানে অনাবডোরাই সংখ্যাতে বেশি। সুতরাং সংঘাত রাজ্য হলেও থামবে এটা অনাবডোরা মেনে নিতে পারছেন না।তাই গড়ে উঠেছে অনাবডো সুরক্ষা মঞ্চ। রাজ্য দাবীর একতরফা বিরোধিতার মধ্যেও এর সমাধান নেই। সমাধান করতে গেলে সব জনগোষ্ঠীকে একটা সমঝোতাতে আসতে হবে, সেই সমঝোতা হলো মুখের কথাতে নয়, সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সহ সমস্ত কিছুতে ছোট বড় সমস্ত জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং আকাঙ্খাকেমর্যাদা দিতে হবে। তার জন্যে গ্রাম অব্দি আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন, সংরক্ষণ, কোচেদের আর আদিবাসীদের জনজাতির মর্যাদাকে স্বীকার করে নিতে হবে। আর সেটিযদি সত্যি করাই যায় তবে আর অসম থেকে বেরিয়ে যাবারো দরকার থাকবে না কারো।হ্যাঁ, অনুপ্রবেশ সমস্যারও চিরদিনের জন্যে সমাধানের জন্যে সবাইকে আন্তরিক হতে হবে, একে বাহানাবাজির জন্যে ব্যবহার চিরতরে বন্ধ করতে হবে। আজই দেখলাম, বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার স্বার্থে বাংলাদেশও এই নিয়ে ভারতের সঙ্গে কথা বলতে রাজী হয়ে গেছে। এখনি সবার মুখোশ খসে পড়বে এই নিয়ে।

               অনেকেই বলছেন, অনুপ্রবেশ একটা সমস্যা।কিন্তু ১৯৮৫তে অসম চুক্তির পরেও এতো বছরে এইসমস্যাটা টিকে আছে কেন জবাব দিলে পারেন। মাঝে কিন্তু ক্ষমতাতে অগপ-বিজেপি ছিল। কংগ্রেস নিজেই সেই চুক্তি করেছিল। আসলে ওটা এক বাহানা, টিকিয়ে রেখে বাহানাবাজি করতে সব্বাই ভালোবাসে। মুসলমানেরাই এখন দাবী করেন বাংলাদেশ সীমান্ত সিল করো, নাগরিক পঞ্জী চালু করো, কে শোনে কার কথা।

                 গেল কয়েক সপ্তাহের অসমের যেকোন কাগজ খুললেই দেখা যেত বডোল্যান্ডে রাজ্যদাবি এবং তার বিরোধীদের মধ্যে ছোট খাটো সংঘাত হয়েই চলেছে। এগুলো এরই ধারাবাহিকতা। এবারে,  অনেকে বলছেন , এহচ্ছে জি এস রোড কাণ্ড থেকে চোখ ঘুরিয়ে দেবার ফন্দি। যদি মেনেও নেই, তাহলেও প্রশ্ন এতো বড়ো সংঘাতকে অসমিয়া মধ্যবিত্ত যে এই ঘুরিয়ে দেবার ফন্দি হিসেবে দেখছেন বা তরুণ গগৈ আর হেমন্ত বিশ্বের রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে এই আশ্চর্য ঘটনাও গেল কয়েক দশকের অসমের রাজনীতিতে ঘটে নি। মুসলমান তথা বাংলাদেশি গালি দেবার এতো সুবর্ণ সুযোগ প্রচার মাধ্যম বা হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি এর আগেএভাবে ছেড়ে দেয় নি! এমনকি ৩০ অক্টোবর, ২০০৮ এ যখন রঞ্জন দৈমারীর এন ডি এফবি তিন শহরে বোমা ফাটিয়ে প্রচুর লোক মেরেছিল তখনও গোটা অসমে প্রতিবাদের ঢেউউঠেছিল প্রথমে এই বিশ্বাস থেকে যে কাজগুলো বাংলাদেশি সন্ত্রাসবাদীদের কাজ।পরে যখন ধরা পড়ল যে এটা এন ডি এফ বির কাজ তখন সবাই চুপ। হ্যাঁ, রঞ্জনদৈমারিকে তাই আত্মসমপর্ণের পর এখনো সরকার অরবিন্দ রাজখোয়াদের মতো খোলা হাওয়াতে ঘুরে বেড়াবার অনুমতি দেয় নি। কারণ দিলে অসমিয়া মধ্যবিত্ত এটা মেনেনেবে না।

                        যদি কারো কারো এই দাবি মেনেও নিই  যে মুসলমানেরাও সমানে মারছেন, তারপরেও তর্ক আছে, প্রশাসনিক নীরবতা, যার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবও বলেছেন সেই নীরবতা বা ব্যর্থতা কার পক্ষে কাজ করেছে? কার হাতে আছে? মুসলমান পক্ষে? বিটিএডিপ্রশাসনের ভূমিকা কী? তারা কি প্রশাসনে প্রভাব খাটাতে ব্যর্থ? প্রাক্তন বিএলটি আর এনডি এফ বি কি অস্ত্রগুলো জমা দিয়ে দিয়েছে? তাহলে সমানে সমানে লড়াই হলো কী করে? আপনাদের কি মনে হচ্ছে আমি এক পেশে কথা বলছি? না , নানা দিক থেকে সত্যকে বের করে আনবার প্রয়াস করছি? হ্যাঁ, মুসলমানেরা প্রতিরোধ করেছেন, এটা সত্য। সাম্প্রতিক ছোট খুনোখুনি নিয়ে আমসুর অসম বন্ধের ডাক আগুনে ঘি দিয়েছিল। কিন্তু পালিয়েছেন তার চেয়ে অনেক বেশি। যত শরণার্থী শিবির হয়েছে তার অধিকাংশই মুসলমান।

                          আরেকটি মজার তথ্য দিই, পূর্বোত্তরে যেহেতু সামন্তীয় সমাজ জাঁকিয়ে বসবার আগেই আধুনিকপুঁজিবাদী সমাজ চেপে বসেছে, জনজাতিরা  কৃষি জমি থেকে বেরুলেই আরকায়িক শ্রম করতে চান না। এদের মধ্যে ধোপা,নাপিত, মুটে, মিস্ত্রি এগুলো নেই।এই কাজগুলো করেন হয় এই সব মুসলমান, নতুবা ঝাড়খণ্ডী আদিবাসি, নতুবা বিহারি হরিজন। আর এই প্রত্যেকটা জনগোষ্ঠীই অত্যন্ত সস্তা দরে শ্রম দেন। শ্রমের জন্যে এদের ডাক পড়ে, আবার সময় হলে মেরেকেটে তাড়িয়েও দেয়া হয়।কেন তাড়ানো হয় কেন? দুটো কারণ, তাতে এইসব শ্রমিকদের দর কষাকষির ক্ষমতা কমে যায়। এতো ভয়ে ভয়ে থাকে যে ৫০০ টাকার কাজ করিয়ে আপনি ১০০ টাকাও কখনো বা ধরিয়ে দিতে পারেন। রিক্সাওয়ালাকে, 'যা বেটা! বাংলাদেশী!' বলে আপনি টাকা না দিয়েও চলে যেতে পারেন। আর দুই হলো, এঁরা স্থায়ী হয়ে গেলে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে দেবেন এবং আধিপত্যকামী জনগোষ্ঠীর স্বার্থব্যহত করবেন এই ভয় লেগেই থাকে। এহলো অর্থনীতি আর রাজনীতির সংঘাত। বিশ্বহিন্দু পরিষদের মন্দিরগুলো তৈরি করতেও তথাকথিত বাংলাদেশী শ্রমিকেরই ডাক পড়ে - এই হলো মজা! বডোল্যান্ড থেকে প্রচুর মুসলমান আগকার দাঙ্গাগুলোর সময়ে চলে গেছিলেন। অসমের অন্যত্র। কয়েক হাজার এখনো শরণার্থী শিবিরে রয়েছেন।কিন্তু বডোল্যান্ড টেরিটরিয়েল এরিয়া হবার পর অনেক পরিকাঠামোর কাজ হচ্ছে।তাতে বডো যুবকেরা মাঠ ছেড়ে ঠিকাদারিতে হাত দিচ্ছেন। শ্রমিক হিসেবে মুসলমানফিরে আসছেন।মুসলমান আরো আসছেন এদের ফাঁকা ধানের মাঠে চাষাবাদ করতে। সঞ্জীব বরুয়ার একটা বই পড়েছিলাম অনেক আগে। তিনি লিখেছিলেন এই 'অনুপ্রবেশকারী' চাষারা গোটা পূর্বোত্তরে এক নতুন কৃষি বিপ্লব নিয়ে এসছেন। পাহাড়েও ঝুমচাষের জায়গাতে এরাই গিয়ে ভূমি শ্রমিক হয়ে স্থায়ী চাষাবাদের প্রচলন করছেন।সুতরাং একাংশ বডো রাজনীতিবিদ এই মুসলমানকেতাড়ালেন বটে, অন্য অংশ দু'দিন পরেই আবার এদের ডেকেও আনবেন। মুসলমানের হাতথেকে অসমের গ্রামীণ অর্থনীতির, এমনকি, আধুনিক উন্নয়ন কামী অর্থনীতিরও কোনো সহজ মুক্তি নেই। কারণ শ্রমের এরাই মূলত মালিক। কোনো ভট্টাচার্য, চক্রবর্তী, কর, ধর, বরঠাকুর, গগৈ, ব্রহ্ম, বসুমাতারি কায়িক শ্রম করে না তেমন!হ্যাঁ, করতেন, ধান চাষ ছাড়াও কিছু কিছু তাঁত শিল্পের কাজতো ছিলই । কিন্তু সেগুলোও এখন কলের কাপড় নিয়ে গেছে। আর ছিল পুরোনো ধরণের ঘর বানাবার শ্রম।আজকাল আর সি সি-র যুগে আসাম টাইপ ঘর-ই উড়ে গেছে, অন্য জনজাতীয় ঘরবাড়ির আর কি বা কথা! আর সি সি পাকা ঘর? মুসলমান ছাড়া কে বানাবে? আমি জানি না।

                ২৭ জুলাইর আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়তে পড়লাম প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র সচিব ‎"পিল্লাইয়ের কথায়, “স্বশাসিত পরিষদে বড়ো-রাই বিশেষ সুবিধা, রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করে। তবে ওঁরা সকলকে নিয়েই চলার চেষ্টা করেন। কারণ ওঁরা জানেন যে, ওঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নন। মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪০% বড়ো জনগোষ্ঠীভুক্ত।বড়ো-রা ছাড়া ওখানে বাঙালি, নেপালি, সাঁওতাল, ছোট ছোট আদিবাসী গোষ্ঠীও রয়েছে।”

"পিল্লাইএর এই বক্তব্যের মধ্যে সত্যও আছে ফাঁকিও আছে।( আনন্দবাজার সম্পাদকীয়ঃ) ৪০%বডো এটা সত্য, এই অর্থে সত্য যে এরাই সংখ্যালঘু। শতাংশের হিসেব তার চে'ও কম হবে। এরা রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করেন এটাও সত্য। 'তবে ওরা সকলকে নিয়ে চলার চেষ্টা করেন' এটা মিথ্যে। মিলিয়ে চলা মানে -ধমকে ঠাণ্ডা রেখে। আর নতুবা এরকম নৃতাত্ত্বিক সাফাই অভিযান চালিয়ে।

              বাংলাদেশে যে বাঙালি মুসলমান শাসনে আছেন তাদেরই সবচে’ দরিদ্র অংশটি এক কালে অসমে এসছিলেন ময়মনসিংহ থেকে চাষাবাদের জন্যে। তখন অবশ্যি গোটা বাংলাদেশেই মুসলমান মূলত কৃষক ছিলেন। সেই থেকেই এরা এখানে কেবল কৃষকই থেকে যান নি, এদের বিরুদ্ধে মায়ানমারের রোহিঙিয়ার মতো প্রচার দিয়ে সবচে অস্পৃশ্য এক শ্রেণি করে রাখা হয়েছে।দেশভাগের আগে থেকেই একাংশ প্রচার চালাচ্ছিলেন এরা থাকতে অসমীয়ার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। ৭৯ থেকে ৮৫ অসম আন্দোলনেরও মূল বিষয় ছিল এই। বলা হয়, এরাপ্রতিনিয়ত বাংলাদেশ থেকে আসছেন। এরা ইসলামীস্তান বানাবেন ইত্যাদি হাজারো অপপ্রচার আছে। আজ অব্দি যত বাংলাদেশি আইনত বের করা গেছে তার সংখ্যা ১০০০ ছাড়াবে না। খরচ কিন্তু কয়েক হাজার কোটি টাকা।মোদ্দা কথা এই সব প্রচার দিয়ে এদের সস্তা শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার খুব সহজ হয়। আইনত এদের ভোটাধিকার থাকলেও সামাজিক অধিকার এদের প্রায় শূন্য। বাংলাদেশের আদিবাসিদের মতোই। কেবল রাষ্ট্র নয় বর্ণহিন্দু অপপ্রচার এবং সেই প্রচারে প্রভাবিত জনজাতিদেরকেও ভয় করে বাস করতে হয় এদের।

            জনজাতিদের অবস্থাও যে খুব ভালো তা নয়। এরাও অতিদরিদ্র। ইতিহাসের দীর্ঘ পর্যায় জুড়ে এরা যেমন বাংলাদেশে, উত্তরবাংলাতে তেমনি অসমে বা পূর্বোত্তরেও নানা ভাবে বঞ্চিত। কিন্তু এখানে ‘কিন্তু’ আছে। এখানে হাজার রকমের জনজাতি বাস করেন। এদেরই মধ্যে আপাত সংখ্যাতেবেশি যারা তাদের সঙ্গে আপোস করে শাসনের সহযোগী করে নেবার চাল চিরদিনই চালিয়ে গেছে ভারতীয় বা স্থানীয় বর্ণহিন্দু শাসক শ্রেণি। তাই ইতিমধ্যে গড়েউঠা বহু জনজাতীয় রাজ্যেই ছোট জনজাতীয়দের দাবিয়ে রাখার কাজ বড়ো জনজাতীয়রাই করেন। যেমন কোচেদের জনজাতি বলে কোনো স্বীকৃতি নেই। এই দাবী জানালে বডোরাই এর বিরোধিতা করেন। বডোদের স্বশাসন দিয়ে তাদের শাসনের সহযোগী করে ফেলা হয়েছে। যেমন গোর্খাল্যাণ্ডে গোর্খাদের সহযোগী করে লেপচা ভুটিয়াদের দাবিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সমস্ত জনজাতীয় এবং সংখ্যালঘু ঐক্য যাতে না গড়ে উঠে এটা ভারতীয় শাসক শ্রেণি সুকৌশলে সুনিশ্চিত করে। বাঙালি-বিহারি-মারাঠি-গুজরাটি-অসমিয়া বর্ণহিন্দু শ্রেণিটি এই সুকৌশল খুবপছন্দ করেন। গোটা পূর্বোত্তরে প্রায় সমস্ত জাতি জনজাতিদের উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ছিল বা আছে। ব্যতিক্রম কেবল বাঙালি হিন্দু-মুসলমান। কিন্তু মুসলমানের বিরুদ্ধে টানা প্রচার আছে এরা আই এস আই-এর হয়ে কাজ করে, উগ্রপন্থীদের মদত দেয় ইত্যাদি। এগুলো মিথ্যাচারীদের প্রচার মাত্র। মাঝে মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাও এই সব প্রচারে তথ্য যোগায়। কিন্তু আজ অব্দি এদের বডো ডিমাছা মণিপুরি নাগা উগ্রপন্থীদের মতো সংগঠিত রূপে দেখা যায় নি। গেলে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে অন্য অনেক সংগঠনকে যখন ভারত সরকার আলোচনার টেবিলে নিয়ে এলো তাদেরও আনতে পারত। আর পারে নি বলে বাংলাদশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারত সরকার কোনো অভিযোগ জানিয়েছে বলেও জানা যায় নি। অথচ ওদিকে ওদেশের সঙ্গে ঘনঘনই তো ভারত এবং অসম সরকারের কথা হচ্ছে।  মুসলমানেরা যাদের থেকে মার খান তাদের কেন মদত দিতে যাবেন? কিন্তু কেবল বিজেপি নয়, বহু বামেরাও এই প্রচারে সিদ্ধহস্ত। প্রচার মাধ্যমের কথা তো বলেই লাভ নেই। অসমেআলফা এন ডি এফ বি- যখন গোলাগুলি ইত্যাদি করত তখন বহু হিন্দু বাঙালি 'ভদ্রলোক'ও বলে বেড়াতো এগুলো মুসলমানের কাজ। অথচ এই সব অমুসলমান উগ্রপন্থীদের হাতেকিছু বাঙালি হিন্দু কেন অসমিয়া সহ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অনেকেও মারা গেছেন বাযান। এন ডি এফ বি আর বি এল টি নিজেদের মধ্যেও প্রচুর মারামারি করেছে। তবুআমাদের কিছু বন্ধু শেষ অব্দি মুসলমানের দোষ দেখবেন ই! এতে তো বোঝাযায় এরা সমস্যার গভীরে যেতে মোটেও আগ্রহী নয়। মুসলমান এদের প্রচারকে পুষ্টকরে গেলেই এরা তাত্ত্বিক সন্তুষ্টি লাভ করেন। এই ভাবেই দৃশ্যত সংঘাত থেমে গেলেও সংঘাতের কারকগুলো টিকেই থাকে। শান্তির আলাপ যখন চলে আড়ালে তখন পরবর্তী সংঘাতের মশাল তখন তৈরি হতেই থাকে।

                     অসমীয়াদের মধ্যেও অনেক বিবেকবান বুদ্ধিজীবি আছেন, যারা সত্য উচ্চারণ করছেন। আনন্দবাজার উপরের সম্পাদকীয়তে তেমনি এক প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে, “সেন্টার ফর নর্থ-ইস্ট স্টাডিজ অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ-এর প্রধানসঞ্জয়হাজরিকার যুক্তি, “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে যাঁদের দিকে আঙুল তোলাহচ্ছে, তাঁরা অনেক দিন ধরেই ওখানে বসবাস করছেন।তাঁদের এখন অনুপ্রবেশকারী বলে দেওয়াটা আসলে বিষয়টাকে বিপথে চালিত করার চেষ্টা।” এটাই সত্য কথা।

            কিছু অতি বুদ্ধিমান বাঙালি হিন্দু, যারা স্বপ্ন দেখেন,  দ্বিজাতিতত্ত্বের আধারে দেশ ভাগ হয়েছে তাই কোনো মুসলমানের অধিকার নেই ভারতে থাকবার। বিজেপির অনুপ্রবেশকারী বিরোধী আওয়াজে সঙ্গ দিলেই এরা চলে যাবেন অসম ছেড়ে আর হিন্দু বাঙালিরা সুখে  স্বর্গবাস করবেন তাদের সে স্বপ্ন দিবাস্বপ্ন মাত্র। অসমিয়ারা কোনদিনই চাইবেন না, সমস্ত পূর্ববঙ্গমূলের মুসলমান অসম ছেড়ে চলে যান। কারণ, তারা নিজেদের মাতৃভাষা অসমিয়া বলে সেই ষাটের দশকে লিখিয়ে অসমিয়াকে সংখ্যাতে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছেন। কোনো বুদ্ধিমান অসমিয়া চাইবেন না, তাঁরা চলে গিয়ে অসমিয়া সংখ্যাটা কমিয়ে আনুন। তাই আসুর মতো সংগঠন যারা লড়াইটা শুরু করেছিল, ১৯৫১কে ভিত্তি বর্ষ করে অসম থেকে বিদেশি তাড়াতে হবে, তারাও চুক্তি করবার সময় ১৯৭১এর ১৬ মার্চ যেদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হয় সেই দিনটিকে ভিত্তি বর্ষ হিসেবে মেনে নেয়। তার আগেকার মুসলমানদের আসুও স্বদেশী বলে আইনত স্বীকার করে নিয়েছে। তার পরের অনুপ্রবেশকারীরা অসম ছেড়ে চলে যাক এটা আজ সব্বাই দাবি করে, বাংলাদেশ সীমান্ত সীল করবার দাবিও পুরোনো কিছু নয়।  কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নি এর পরের ২৫ বছরেও। কেন হয় নি জিজ্ঞেস করলে এরা বলবে, কেন , কংগ্রেসের মুসলমান তোষণ নীতির জন্যে। ভোটব্যাঙ্করাজনীতির জন্যে। অথচ দু’বার অগপ, এবং কেন্দ্রে বিজেপি একবার সরকারে ছিল কিন্তু। কিচ্ছুটি করতে পারে নি।

             কেন? এতোদিন এরা বলতেন, আই এম ডি টি আইন আছে বলে। সেই আইন বাতিলও হলো আজ অনেক বছর হলো। তার পরেও যে কাজের কাজ কিছু হয় নি। হবে বলেও মনে হয় না। কারণ হলে রাজনীতির এই রং চিরদিনের জন্যে বিদায় নেবে। অনেকেই আছেন, অসমের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবেন। তাই মাঝে মধ্যে সন্দেহ হয়, অসমের মাটিতে অনুপ্রবেশকারী সত্যি সত্যি আছেন তো?

Thursday, 26 January 2012

বাংলাদেশে ভারত বিরোধী যে ক্ষোভ তা কেবল দুই দেশের লড়াই নয়, এক রকম শ্রেণি সংগ্রামও বটে।

                ভারতীয় রাজনীতিতে যেমন একদিকে প্রবল মার্কিন প্রীতি অন্যদিকে দুর্বল মার্কিন বিরোধিতার লড়াই চলছে, বাংলাদেশ সহ সমস্ত ভারতীয় উপমহাদেশগুলোর ছোট দেশে ভারত প্রেম এবং ভারত বিরোধীতা রাজনীতির এক বাস্তবতা। একে অস্বীকার করা যাবে না। ভারতবর্ষ সীমান্ত দিয়ে সাধারণ মানুষের, চোরাকারবারিদের, সন্দেহভাজন সন্ত্রাসবাদীদের অনুপ্রেবেশ নিয়েই আতঙ্কে থাকে। তাই কাঁটাতারের বেড়া। সীমান্তে অত্যচার খুন ইত্যাদি। কিন্তু কাঁটাতারের বাইরেও ভারতে বাংলাদেশের আরো বহু ব্যাপারেরই আইনত বা আইন বহির্ভূত ভাবে প্রবেশ নিষেধ। আইন বহির্ভূত ভাবে বলছি মানে, আম-ভারতীয়ের বাংলাদেশের বহু পণ্যের প্রতি এক সাধারণ অবজ্ঞা বোধ। যেমন ভারতে বাংলাদেশের বা পাকিস্তানের টিভি চেনেলগুলোর প্রবেশ অবাধ নয়, সাহিত্য সঙ্গীতের বা চলচ্চিত্রের সেরকম বাজার নেই। এটা সক্রিয় কোনো প্রতিরোধের জন্যে সব সময় হয় তার জন্যে নয়, এর পেছনে এক সাধারণ অবজ্ঞা বোধও কাজ করে। তার কিছু বাস্তব কারণ আছে, বাকিটা অবজ্ঞা এবং অজ্ঞতা। এই যেমন বাংলাদেশের মাটিতে ক'দিন আগে 'আনন্দ বাজারে'র কপি পুড়তে দেখে অনেক ভারতীয় নিশ্চয় ক্ষুব্ধ হয়েছি। কিন্তু এই প্রশ্ন করেছি কি ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের কোনো কাগজ পুড়িয়ে দেবার জন্যেও পাচ্ছি না কেন? অথচ এই লেখাতে কত কত ভারতীয় পণ্যের বয়কটের ডাক দেয়া হয়েছে দেখুন। তার মানে ভারতীয় পণ্য আইনী উপায়েই কী ব্যাপক ভাবে বাংলাদেশের বাজারে অনুপ্রবেশ করেছে । তার মানে, ভারতীয় পণ্য উৎপাদকদের কাছে বাংলাদেশ একটা ক্রেতা সমাবেশ মাত্র। এর কিছু পণ্য নিশ্চয়ই সেদেশেই তৈরিও হয়, যেমন ভারতে তৈরি হয় বহু মার্কিনি বা জার্মান বা কোরীয় পণ্য। এবারে উৎপাদন কেন্দ্র তখনি স্থানান্তরিত হয় যখন সহজে ও সস্তায় জমি মেলে, মেলে কাঁচামাল, এবং অতি অবশ্যই সস্তা শ্রম। 
           সস্তা শ্রমের বাজার আর ক্রেতার বাইরের উদ্বৃত্ত জনতাকে বাজার গরুছাগলের বেশি কোনো মূল্য দেয় না। তারা থাকলেই কি না থাকলেই কি? সীমান্ত তারাই অতিক্রম করে। পুঁজি যেদিকে ঘনীভূত হয় উদ্বৃত্ত জনতা সেদিকেই যাত্রা করে এক মায়াময় স্বপ্নের সন্ধানে। তাই কাঁটাতারের পক্ষে বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে তেমন সমর্থণ ভিত্তি থাকবে না, একে পার করে যাওয়াটাকে কেউ তেমন অপরাধ হিসেবে দেখবেনও না, এটা খুবই স্বাভাবিক। পৃথিবী জুড়ে তৃতীয় বিশ্বের মানুষের তাই আজ একটাই স্বপ্নের দেশ ,তার নাম আমেরিকা। সেখানেতো রীতিমতো 'নো বর্ডার আন্দোলন' জোরদার। তাই, বাংলাদেশে ভারত বিরোধী যে ক্ষোভ তা কেবল দুই দেশের লড়াই নয়, এক রকম শ্রেণি সংগ্রামও বটে।এবং ভারতের দিক থেকে তাদের লড়াইকে আমাদের বিরোধিতা করাটা অনেকটা শাসক শ্রেণির পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলবার মতো। 
            ভারতের বাজার বাংলাদেশে টিকে আছে বাংলাদেশেরই মধ্যবিত্তদের এক বড় এবং ক্ষমতাশালী পক্ষের সমর্থণে। তাই ভারত বিরোধী জিগির আসলে দেশটির ভেতরের শ্রেণিদ্বন্দ্বকেও প্রকাশ করে। জরুরি নয় যে , এর সবটাই সর্বৈব ভারত বিদ্বেষ। এবং আমাদের ভারতীয়দের এসব কথাবার্তা শুনলেই গা পুড়িয়ে তেড়ে যেতে হবে। কিন্তু মুস্কিল হলো মধ্যবিত্ত মুখে যতটা গর্জায় তত বর্ষায় না। এবং অনেক সময়েই সে তার গণভিত্তিকে ধরে রাখবার বা গড়ে তুলবার জন্যে মুখেই জগৎ মারে। এবং দিশাহীন বকুনি ঝাড়ে। স্মরণ করুন, 'ঘরেবাইরে'র সন্দীপ বিদেশি সিগারেট খেত। এবং তাদের প্রয়াসের ফলে মুসলমান প্রজা বিপন্ন হয়। ওই উদ্বৃত্ত জনতার স্বাধিকার রক্ষার লড়াই, সস্তা শ্রমিকের এবং বিপন্ন কৃষকের স্বাধিকার রক্ষার লড়াই এবং ভারতে তাদের শ্রেণি মিত্রদের সঙ্গে আঁতাত গড়বার কথা মাথায় রেখে যখন কেউ কথা বলবেন তখন তাদের বয়ানটাই আলাদা হবে। এবং হবে অনেক বেশি কার্যকরী। এই হুজুগে মধ্যবিত্ত জানেনই না, যেমন আমেরিকাতে বহু মানুষ ইরাক, আফগানিস্তান, পালেস্টাইন, ভারত, পাকিস্তানের হয়ে লড়াই করেন, তেমনি ভারতে বহু বহু মানুষ আছেন যারা নিত্যদিন উপমহাদেশে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। মধ্যবিত্ত দামী কাগজে পড়ে অরুন্ধতী রায়ের কথা জানেন। কিন্তু সেরকম মানুষ১২৫ কোটির ভারতে ওই একজন আছেন--শুনলেই আমার ভীষণ হাসি পায়। পেটে খিল ধরে।