আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Showing posts with label বাংলা লিপি. Show all posts
Showing posts with label বাংলা লিপি. Show all posts

Sunday, 20 August 2017

Script Identity Region: ‘ সিলেট নাগরি’ লিপি এবং সাহিত্য অধ্যয়নের একটি নাগরিক প্রয়াস


নুসন্ধানের যাত্রাটি শুরু হয়েছিল দশক তিন আগেই। তারই ফলশ্রুতিতে ২০০৬তে ‘সিলেটি নাগরির পহেলা কেতাব।  ও দইখুরার রাগ’ নামে বইটি সম্পাদনা করে বের করেন  অধ্যাপিকা অনুরাধা চন্দ। কিন্তু যাত্রাটি ওখানে থামে নি। ফলে ২০০৮ এর ডিসেম্বরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সিলেটি নাগরি’ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজিত হয়। তাতে যে গবেষণা নিবন্ধগুলো পড়া হয়---সেগুলোকেই দুই মলাটে বেঁধে আবার নিজের সম্পাদনাতে প্রকাশ করেন অনুরাধা চন্দ ২০১৩তে। তারও হয়ে গেছে বছর পাঁচেক। দুই বইয়েরই প্রকাশনার সঙ্গে জড়িয়েছিল দে’জ।  সঙ্গে প্রথমটির সহযোগী প্রকাশক যেমন ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব কালচারাল টেক্সট অ্যান্ড রেকর্ডস তেমনি দ্বিতীয়টির সহযোগী প্রকাশক ‘মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইন্সটিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ, কলকাতা। দ্বিতীয়টির নাম ‘স্ক্রিপ্ট আইডেন্টিটি রিজিওন: এ স্টাডি ইন সিলেট নাগরি’ (Script Identity Region: A Study in Sylhet Nāgari)। আমরা মূলত এই দ্বিতীয়টির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতেই কী বোর্ড চাপছি।  
সিলেট নাগরি নিয়ে সিলেটিদের বিচিত্র রকম গৌরব বোধ রয়েছে, রয়েছে কৌতূহলও। সম্প্রতি লিপি-ভাষাকে একাকার করে নিয়ে স্বতন্ত্র সিলেটি ভাষার দাবি আসামেও শোনা গেছে। সিলেটে বিলেতে তো দাবিটি বেশ পুরোনো হয়েই গেছে। কিন্তু সেই পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদের উনিশ শতকের শুরুর দিনগুলো থেকে এখানে ওখানে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রয়াস বাদ দিলে এভাবে সমবেত বিদ্যায়তনিক গবেষণার বিষয় হয়েছে এই প্রথম।ভূমিকাতে সম্পাদিকার এমনটাই দাবি। আমাদেরও অনুসন্ধান বলে অন্তত ভারতে বাংলাদেশে দাবিটি সত্য। যদিও বিলেতে Sylheti Translation And Research’ (STAR) বলে একটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়ে কাজ করছে। সিলেটি নাগরিকে আন্তর্জালের ব্যবহারোপযোগী করবার জন্যে ইউনিকোডে নিয়ে আসবার জন্যেও তাঁরা কাজ করছেন।  কিন্তু বিশেষ ভাষাবৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক গবেষণাদি যে তারা করেছেন আমাদের মনে হয় নি। তবে  ২০১৬তে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রেরও আয়োজন করেছিলেন তারা---উদ্দেশ্য সিলেটিকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দেয়া। তার বিস্তৃত এখনো আমাদের জানবার সুবিধে হয় নি  সেটি এরকম দ্বিতীয় প্রয়াস। আমরা প্রথম প্রয়াসটি নিয়েই আপাতত লিখছি।
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ১
সিলেট নাগরীর কথা গ্রিয়ার্সন তাঁর মহাগ্রন্থে খুব ছোট করে হলেও প্রথম আলোচনা করেছিলেন। লিখেছিলেন, লিপিটির নাম  দেবনাগরীনিম্নশ্রেণির মুসলমানেরা স্বাক্ষর দিতে গিয়ে এই লিপি ব্যবহার করেনআর সম্প্রতি এই লিপিতে বাংলা পুথি’  ছাপা হচ্ছে। পরের উল্লেখটি আছে,বি সি এ্যালেন সম্পাদিত ‘Assam District Gazatteers’এর দ্বিতীয় খণ্ডে।ওতেও মোটামুটি গ্রিয়ার্সনেরই প্রতিধ্বনি এর কিছু পরে পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ এই নিয়ে প্রথম বিস্তৃত এক নিবন্ধ লেখেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকার ১৩১৫ বাংলাতে। সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকাতে তিনি নানা সময়ে যে কটি প্রবন্ধ লেখেন তার মধ্যে প্রথমটির নামেই সিলেট নাগরী’ কথাটি তাত্ত্বিকভাবে প্রথম মেলেবছরখানিকের মধ্যে প্রকাশিত অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধির শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ বইতেও অতিসামান্যই আছে।এর পরে শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষদ পত্রিকাতেও লিপিটি নিয়ে অনেকেই আলোচনা শুরু করেন।তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন মোহম্মদ আশরফ হোসেন সাহিত্যরত্ন।এর পরেই সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের। অডিবিল-এর ভূমিকা অংশের পরিশিষ্টে বাংলার অন্যান্য লিপির সঙ্গে সিলেট নাগরী’ নিয়েও তিনি বেশ কিছু পঙক্তি ব্যয় করেছেন।লিপি পরিচয় দিতে গিয়ে সুনীতিকুমার লিখলেন,‘a kind of modified Dēva-nāgari,called ‘Silēt Nāgari’ ভাষাবিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রায় সমস্ত তাত্ত্বিক আলোচনাতে এর পরে সিলেট নাগরী’ কথাটি চালু হয়ে গেল। সুকুমার সেনও তাই লিখলেন। কিন্তু লিপিনামটি পুথি লিখিয়েদেরই দেয়া বলেই মনে হয়। পহেলা কেতাবের  ১৩৩৬এর সংস্করণের সম্পাদক তথা সংশোধক মহাম্মদ আব্দুল লতিফের পদে আছে,“ছিলেটি নাগরী পুথি পহেলা কিতাব নাম...
উনিশ শতকের মাঝামাঝি ১৮৬০ থেকে ৭০ কোনো এক সময় মুন্সী আব্দুল করিম এই লিপির হরফ কাটিয়ে প্রথম তাঁর প্রতিষ্ঠিত সিলেটের ইসলামীয়া প্রেস’ থেকে বই ছাপানো শুরু করেন। পরে পরে কলকাতা এবং সিলেটে আরো কতকগুলো প্রেসে সিলেটি নাগরী বইপত্র ছাপা শুরু হয়।পদ্মনাথ ভট্টাচার্য ছাড়াও পরবর্তী কালে শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি,মুর্তাজা আলিও সিলেটি নাগরীতে স্বরব্যঞ্জন মিলিয়ে ৩২টি হরফের কথাই লিখেছিলেন,কিন্তু তারপরেও এই বর্ণমালাতে সংশোধন হয়েছে।অনুরাধা চন্দ লিখছেন,“মনে হয় শুরুতে এই বর্ণমালা দ্বৈতস্বর ও যুক্তব্যঞ্জন বর্জিত ছিল।তবে কালক্রমে বেশ কয়েকটি যুক্তব্যঞ্জন সংযোজিত হয়। পদ্মনাথ যে পহেলা কেতাব ব্যবহার করেছেন তাতে ষোলোটি সংযুক্ত বর্ণ রাখা ছিলঅনুরাধা চন্দের ব্যবহৃত পহেলা কেতাব’ পুস্তিকায় একুশটি সংযুক্ত বর্ণ রয়েছে।পদ্মনাথ এই লিপির বর্ণনা প্রসঙ্গে হসন্ত চিহ্নটির অভাব লক্ষ্য করেছেন,‘যদি হসন্ত চিহ্নটি পরিগৃহীত হইত,তাহা হইলে সমপদ’ যে সম্পদ’ তাহা অনায়াসেই বুঝিতে পারা যাইত।’ হসন্ত চিহ্নের ব্যবহার না থাকাতেই যে দইখুরার পদে প্রেমের মালা’ হয়েছে পেরমের মালা লিপির সীমাবদ্ধতাতেই শব্দটি পেরম’ হয়েছে,যা কিনা মান বাংলা বা সিলেটি কোনো শব্দই নয়। যাই হোকলিপিটি এখন কম্প্যুটারে এবং আন্তর্জালে ব্যবহার উপযোগী করে ইউনিকোড কনসর্টিয়াম’ (The Unicode Consortium) স্বীকৃতি দিয়েছে। সেখানে একক বর্ণসংখ্যা মোটের উপর একই আছে।হলন্ত চিহ্ন,এবং অনুস্বারের জন্যে স্বতন্ত্র সংকেতের ব্যবস্থা রাখাতে যুগ্মব্যঞ্জনের স্বতন্ত্র সংকেতের দরকার পড়বার কথা নয়।তার বিপরীতে চারটি পদ্যচিহ্ন’-এর জন্যে সংকেত রয়েছে।সম্ভবত পর্বাঙ্গ,পর্ব,চরণ,স্তবক ভেদ দেখাবার জন্যে।ইতিমধ্যে কিছু ইউনিকোড ফন্ট তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেগুলো খুব ব্যবহারবান্ধব নয় এখনো। আমরা অতিকষ্টে এই কটি বর্ণ টাইপ করে দেখাচ্ছি... i a i e o k p c t g j 
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ২
একক বর্ণ হিসেবে পাঁচটি স্বর এবং সাতাশটি ব্যঞ্জনের সংখ্যাতে এই অব্দি আর কোনো হেরফের হয় নি।সংখ্যা বোঝাবার জন্যে স্বতন্ত্র কোনো সিলেটি নাগরী চিহ্ন নেই।বাংলা সংখ্যা-সংকেত দিয়েই শুরু থেকেই কাজ চালানো হচ্ছে।  অনুরাধা চন্দের কথাতে,“ ...সিলেটি কথ্যভাষার উচ্চারণ ও ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই বর্ণমালা গড়ে উঠেছে।একটি ধ্বনির জন্য একটি বর্ণ,এই নিয়মটি তত্ত্ব হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে হয়। কথাগুলো অন্যত্র তপোধীর ভট্টাচার্যও লিখেছিলেন। সিলেটিতে স্বরস্বনিম বলতে সত্যিই পাঁচটির বেশি নেই। ব্যঞ্জন স্বনিম বলতে আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করেও ত্রিশটির বেশি মেলা কঠিন।এবং অনেকেই যেভাবে ,,’ আদি সিলেটি বর্ণমালা তালিকাতে বাদ দিয়ে দেন,আমরা অনুসন্ধান করে দেখেছি সেগুলো বাদ দেবার কোনো কারণ নেই। সিলেটি নাগরী বর্ণমালাতেও এগুলো দিব্বি শোভা পাচ্ছে। এই বিষয়গুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ।বাংলা কিংবা দেবনাগরী যে বর্ণমালা থেকেই লিপিটি এসে থাকুকসংস্কৃতানুসরণ না করে স্বাভাবিক উচ্চারণরীতি অনুসরণ করেছিলেন বলেই কিছু বিভ্রান্তি এই লিপির স্রষ্টারা এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন বলেই মনে হয়।আরবি লিপি শৈলীরও কিছু প্রভাব অবশ্যই পড়েছে,সিলেটি নাগরী পুথিকে তাই পেছন থেকে পড়তে হয়।কিন্তু আরবি বর্ণমালা সংখ্যা দিয়েও এই লিপির স্রষ্টারা বিভ্রান্ত হয়েছেন এমনটা দেখি না।
লিপিটির দেবনাগরী উৎস নিয়ে অধিকাংশেরই কোনো দ্বিমত নেই।শুধু মুর্তাজা আলি মনে করতেন দেবনাগরীর সঙ্গে  বাংলা-কাইথির কাছেও সিলেটি নাগরী ঋণী। কোনটি বাংলা আর কোনটি দেবনাগরী থেকে এসেছে এই নিয়ে  শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি এবং মুর্তাজা আলির বক্তব্যের একটি তুলনামূলক অধ্যয়ন করে অধ্যাপক উষারঞ্জন ভট্টাচার্য মোটের উপরে মুর্তজা আলির পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন।নাগরীর ফ,র বর্ণগুলো কাইথির থেকে এসছেএবং ভ বর্ণের সঙ্গে কাইথি ভ-এর মিল রয়েছে বলে মুর্তজা লিখেছিলেন। ’-এর সঙ্গে না হোককাইথি ,’-এর কথাটি খুব একটা ভুল নয় বলে আমাদেরও অভিমত।আমরা ইউনিকোড হরফগুলো পরীক্ষা করে দেখেছি।
 কিন্তু দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হুসেন চৌধুরী বলে এক গবেষক আরবি লিপি শৈলীর প্রভাবে সরাসরি বাংলা থেকেই হরফগুলো এসেছে বলে দাবি করেছেন। এই দাবিটিকে খারিজ করেছেন অনুরাধা চন্দ ‘পহেলা কিতাবে’
আরবি লিপির প্রভাবটি সামান্য ঘোরালো।অনুরাধা চন্দ লিখছেন,“আরব ও পারস্যে জের’,‘জবর’,‘পেশ’ এই তিনটি স্বরচিহ্ন সামান্য অদলবদল করে নানা ধ্বনির প্রকাশ করা যায়।সিলেট নাগরী লিপিতেও আমরা এই রীতি দেখতে পাই।সামান্য পরিবর্তিত একই অক্ষর দিয়ে ভিন্ন ধ্বনির প্রকাশ সম্ভব।তিনি প,,,,,ধ এই ক্রমে সিলেটি নাগরী হরফগুলোর নজির দিয়েছেন।তিন-চার শতকের দরবারী ভাষা ফারসির প্রসারের ফলে সিলেটি ভাষাবৈচিত্র্যে আরবি -ফারসির উচ্চারণগত প্রভাব বেশ ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। ফারসি লিখতে আরবি লিপির প্রচলনও ছিল। ফলে সিলেট নাগরিতে আরবির প্রভাব কিছুই পড়বে নাসেসব হবার নয়।  কিন্তু হরফে সরাসরি আরবির চিহ্নমাত্র নেই। এমনি বই ছাপবার বেলা পেছন থেকে সামনের দিকে পৃষ্ঠা এগোলেওপঙক্তিগুলো কিন্তু বাংলা বা ব্রাহ্মিপরিবারের লিপির মতোই বামদিক থেকে ডানেই এগিয়েছে। অনুরাধা চন্দ তাঁর পহেলা কেতাব’ সেভাবেই সম্পাদনা করে ছেপেছেন।
এই যে আরবি পরম্পরার সবটা নিলেন না,সেখানে একটি আন্তসংগ্রামের সংকেতও অবশ্যই মেলে। যে কথা রিচার্ড ঈটন বাংলাতে কেন আরবি লিপি চলল না,বোঝাতে গিয়ে লিখেছিলেন।নিছক ইসলাম প্রীতির জন্যেই নাগরীপুথির লেখকেরাও বাংলা লিপি বেছে নেন নি,যদি এমনতর হত তবে আরবি লিপির আরো ঘনিষ্ঠ অনুসরণ দেখা যেতে পারত।এই প্রসঙ্গে মনে করতে পারি,যে হিন্দুদের মধ্যে যেমন রীতি ছিল সংস্কৃত ছাড়া ধর্মগ্রন্থাদি চর্চা করা যাবে না,করলে রৌরব নরক বাস হবে,মুসলমানদের মধ্যেও ছিল,আল্লাহ আরবিতে কোরান দিয়েছেন।অন্য লিপি বা ভাষার ব্যবহার মানেই তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধাচরণ করা।তবু যারা ভারতে হিন্দুস্তানির থেকে উর্দুর উদ্ভব করিয়েছিলেন,তারা সেই ইসলামী সংস্কৃতির সংস্কার করেই করেছিলেন।ভারতেই প্রথম অন্য কোনো ভাষাতে কোরান অনুবাদ হয়,আর সেটি উর্দুতে।তাও উর্দুর জন্যে তারা আরবি লিপি মেনে নিয়ে আপস একটা করেছিলেন।বাংলাতে কেউ কেউ চেষ্টা করেছিলেন।কিন্তু বাংলার মুসলমান সেই লিপিও মানেন নি।অধিকাংশই বাংলা লিপি আর বাংলা ভাষা মেনে নিলেন বলেই বাঙালি আজ এতো বিশাল এক জনগোষ্ঠী।সিলেটি নাগরী লিপি ছিল তার মাঝামাঝি একটি ব্যবস্থা।প্রধানত যে লিপিকে নির্ভর করে সিলেটি নাগরী এল সেটি দেবনাগরী।লিপিটি উত্তর ভারতেও তখনো আজকের মতো জনপ্রিয় ছিল না।সংস্কৃতের সর্বমান্য লিপিও ছিল না।এখনো সংস্কৃত লিখতে বাংলা-অসমিয়া লিপি দেদার ব্যবহৃত হয়। প্রত্যন্ত এলাকার নিরক্ষর বহু মানুষের কাছে বাংলা লিপি পরিচিতও ছিল না। মোগল আমলে রাজকার্যেও ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছিল ফার্সির ব্যবহার।আজ যেমন হয় প্রধানত ইংরেজি এবং হিন্দি। ফলে এক প্রজন্মের ব্যবধানে আজকের আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছেও বাংলা লিপির পরিচয় আর সেভাবে নেই।সুতরাং বাঙালি হয়ে কেন বাংলা লিপি জানবে না,এই প্রশ্ন শুধু উন্নাসিক সমাজবিচ্ছিন্ন আধুনিক মধ্যবিত্ত মনেই জাগতে পারে।তাদের কাছে সেদিন বাংলা লিপি শেখা যা,দেবনাগরী শেখাও তাই ছিল।তবু,তারা করলেন কি,জ্ঞান পিপাসার প্রাবল্যে দেবনাগরী-বাংলা যেটুকু বুঝলেন,তাই ভেঙেচুরে অনেক সংক্ষিপ্ত আর সরল একটি বর্ণমালা গড়ে ফেললেন।বর্ণ সংখ্যা রাখলেন ততটাই যতটা উচ্চারণ অনুমোদন করে। তাঁরা ভাষাবিজ্ঞান জানতেন না,কিন্তু এই সরল সত্য বুঝতেন। সেকালে আজকের মতো মান-উচ্চারণরীতি গড়ে তুলবার কোনো উপায় ছিল না। রেডিও,টিভি,রেকর্ড,ক্যাসেট বা কম্প্যুটার কিছুই তো ছিল না।ফলে তাঁরা বাধ্য ছিলেন  অনুসরণ করতে সিলেটি উচ্চারণ।কিন্তু যে ভাষাতে কাব্য করলেন সেটি সেকালের সাহিত্যের মান সাধু বাংলা...মহম্মদ আব্দুল লতিফের এই চরণগুলো পড়লে দুই একটি রাবীন্দ্রিক ক্রিয়াপদও দুর্লভ হয় না,“তার পর আরজ করি করিনু তামাম।।/ ছিলেটি নাগরী পুথি পহেলা কিতাব নাম  কলকাতাকে কেন্দ্রকরে মূলত উত্তরভারতীয় প্রব্রজিত মুসলমানদের প্রভাবে যে ‘দোআশলা’ বাংলা গড়ে উঠেছিল, সুকুমার সেন যাকে লিখেছেন ‘ইসলামী বাংলা’ বলে, সেই ভাষাও সিলেটি নাগরি সাহিত্যে ছাপা জমানাতে দুর্লভ নয়।
আমরা যে বইটি নিয়ে কথা বলব সেটি দ্বিভাষিক। ভারত বাংলাদেশের ষোলজন গবেষকের রচনা এতে ঠাঁই পেয়েছে। আসাম তথা বরাক উপত্যকারও একাধিক গবেষক রয়েছেন। সম্পাদিকার একটি স্বতন্ত্র রচনা ছাড়াও সূচনা এবং সমাপ্তি রচনা দুটিও সুখপাঠ্য গবেষণা নিবন্ধই। পাঠকের জন্যেও এতো সুপরিকল্পিত দিশানির্দেশ যে আমরা এর সমালোচনা লিখতে গিয়ে ভাবছিলাম , এর পরে আর আমাদের লিখবার কী থাকে?  তিনি নিছক সম্পাদনা করেন নি, বিষয়টি নিয়ে ভারতে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ক্ষেত্র অনুসন্ধান করে বেড়িয়েছেন। বহু পুথি নিজে সংগ্রহও করেছেন, পাঠও শুনেছেন। লেখকদের অনেকেই তাঁর সঙ্গে পথ হেঁটেছেন, সঙ্গ দিয়েছেন। তার বাইরেও রয়েছেন  অনেকেই। আসামে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অধ্যাপক অমলেন্দু ভট্টাচার্য, আবদুল মুসাব্বির ভুঁইয়া, আবিদ রাজা মজুমদার, সামসুল হক বড়ভূঁইয়া, তুষার কান্তি নাথ, সঞ্জীব দেব লস্কর এবং পার্থপ্রতিম দাস। এছাড়াও বিজয় কুমার ধর, অধ্যাপক আবুল হুসেন মজুমদার, মুজ্জামিল আলি লস্কর এবং সর্বোপরি অধ্যাপক সুজিত চৌধুরী এবং সদ্য প্রয়াত কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যও নানা সময়ে নানা ভাবে তাঁকে ঋদ্ধ করেছেন। কালিকার থেকেই দইখুরার রাগের নিজের সংগ্রহের প্রথম পুথিটি তিনি পান।
তিনটি ভাগে বইটি পরিকল্পিত। প্রথম ভাগে ‘এলাকা এবং মানুষ’ চিনিয়েছেন, চিনিয়েছেন তার ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি। ছটি ইংরেজি নিবন্ধের লেখক যথাক্রমে সুচন্দ্রা ঘোষ, রিলা মুখার্জি, হরপ্রসাদ রায়, সঞ্জীব দেব লস্কর, স্বপ্না ভট্টাচার্য(চক্রবর্তী), সুদেষ্ণা পুরকায়স্থ। দুটি বাংলা নিবন্ধের লেখক অমলেন্দু ভট্টাচার্য এবং তুষার কান্তি নাথ। দ্বিতীয় ভাগে ‘লিপি এবং ভাষা’। সেই সঙ্গে কারা লিপিটি গড়ে তুলেন, লেখেন এবং পড়েন ---তাদের কথা। এই ভাগে দুটি ইংরেজি নিবন্ধের লেখক আবদুল মুসাব্বির ভুঁইয়া, এবং মীনা দান। তিনটি বাংলা নিবন্ধের লেখক আবিদ রাজা মজুমদার, সাদিয়া চৌধুরী পরাগ এবং সামসুল হক বড়ভুঁইয়া । তৃতীয় বিভাগটিতে কথা হয়েছে ‘লিপি এবং সাহিত্য’ নিয়ে। সেই সঙ্গে সেই সঙ্গে তিনটি নিবন্ধ জানিয়েছে সেই বৃত্তান্ত কী ভাবে একটি নবগঠিত সম্প্রদায় এই লিপি, সাহিত্য এবং তার অন্তর্নিহিত দর্শনে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তুলছেন। অথবা উল্টো করে লিখলে ---পরিচিতি গড়ে তুলবার স্বার্থে একটি লিপি এবং সাহিত্যেরও বিকাশ ঘটাচ্ছেন। এই পর্বের তিনটি মূল্যবান প্রবন্ধের দুটি ইংরেজিতে লিখেছেন স্বপন মজুমদার এবং সম্পাদিকা অনুরাধা চন্দ স্বয়ং এবং একটি বাংলা প্রবন্ধের লেখক নন্দলাল শর্মা।
প্রথমভাগে লিপি বা সাহিত্যের কথা বিশেষ নেই। কিন্তু যে পরিবেশে সেই কথা ও কাহিনি তৈরি হয়েছে সেটি এখানে ‘নির্মিত’ হয়েছে। ছবির ক্যানভাস যেমন। অধিকাংশই চেনা কথা। শুরুর লেখিকা সুচন্দ্রা ঘোষ। তাঁর ইংরেজি নিবন্ধের তিনি মেঘনা উপত্যকার পুব দিককার ভূগোল এবং রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন।  কিন্তু সেই সঙ্গে প্রতিবেশী বঙ্গ বা বৃহত্তর বাংলা, আরাকান এবং কামরূপের সঙ্গে সম্পর্কটিও ছুঁয়ে গেছেন। সেই সঙ্গে শ্রীহট্টের নিজস্ব পরিচিতি গড়ে উঠবার আমাদের অনেকটা চেনা কথাই শুনিয়েছেন তাম্রফলক, মুদ্রার সাক্ষ্য সহ।  যে কারণে তাঁর লেখাটি শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ—সেটি এই যে--- দ্বাদশ –ত্রয়োদশ শতক অব্দি ইতিহাস পরিক্রমা করে তাঁর সিদ্ধান্ত এই অব্দি নথিপত্রের প্রাথমিক পাঠ বলে গাঙ্গেয় উপত্যকার থেকে ভিন্ন কোনো নতুন বা স্বতন্ত্র লিপি শৈলী মেঘনা উপত্যকাতে দেখা দেয় নি।
 রিলা মুখার্জির ইংরেজি নিবন্ধটিতে কিছু ভিন্ন স্বর এর জন্যেই রয়েছে যে সুরমা-মেঘনা নদী পথ, নৌ বাণিজ্যের ইতিহাসটি তিনি বুঝবার চেষ্টা করেছেন। ‘space’, ‘place’ , ‘region’ এমন কয়টি প্রতিশব্দকে এমনভাবে ব্যবহার করে তাঁর নিবন্ধটিকে সাজিয়েছেন যে যথেচ্ছ বাংলা অনুবাদে ব্যঞ্জনাটি ধরা কঠিন। কিন্তু তাঁর ভাষাতে বললে, একটি ‘স্পেসে’র ‘প্লেসে’ রূপান্তরের কাহিনি তিনি বলে গেছেন। কামরূপের সময় থেকেই চীনের সঙ্গে সংযোগ আদির কথা তিনি উল্লেখ করে দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে চন্দ্ররাজাদের পশ্চিমভাগ ফলক সম্পর্কে দু’টি তথ্যের উল্লেখ করছেন। এক, এতে পাঁচ-ছ লাইন নাগরি লিপি ব্যবহৃত হয়েছে,যেখানে আমরা জেনে এসেছি অন্যান্য অধিকাংশ তাম্রফলকাদিতেই সংস্কৃতের জন্যেও কুটিল-প্রত্ন বাংলা, বাংলা আদি লিপিই ব্যবহৃত হচ্ছে।  দুই, রাজধানী বিক্রমপুরে কামপুচীয় নাগরিকের আসবার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। ভাটেরা ফলকের প্রত্ন বাংলা লিপির সঙ্গে তিনি কাম্পুচিয়াতে পাওয়া একটি খেমের ফলকের মিলের কথা উল্লেখ করছেন। ঐ সময়ে একটি ছায়াচ্ছন্ন প্রান্তীয় এলাকার থেকে সিলেট একটি বৃহত্তর অঞ্চলের অংশ হিসেবে থাকবার ফলে এই সব হচ্ছে। ভারতমহাসাগরীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা (IOTS), মালদ্বীপের সহস্রাব্দ প্রাচীন কড়ি অর্থনীতির উত্থান এবং মোঘল আমলের পরে থেকে পতন, এবং ষষ্ঠ-সপ্তদশ শতকে যখন প্রতিবেশী ত্রিপুরা, জয়ন্তিয়া, মণিপুর, কোচ বিহারাদিতেও যখন রূপার মুদ্রা প্রচলিত তখন সিলেটে কড়ির ব্যবহারের এক চিত্তাকর্ষক বর্ণনা তিনি দিচ্ছেন। জাতীয় ইতিহাসের ছায়াতে প্রান্তীয় ইতিহাসের স্বাতন্ত্র্য ঢাকা পড়ে যায় এই সতর্কবাণীতেই তাঁর নিবন্ধ শেষ হয়েছে।
 হরপ্রসাদ রায়ের ইংরেজিতে তৃতীয় নিবন্ধটি চারদিক থেকে সিলেটে তথা পূর্বোত্তরে আর্য, বিস্তৃতভাবে অনার্য নৃগোষ্ঠীগুলোর প্রব্রজনের একটি ঐতিহাসিক রূপরেখা আঁকবার চেষ্টা করেছেন। কোথাও কোথাও পুরাণে ইতিহাসে গুলিয়েছেন বলেও আমাদের মনে হচ্ছে। পাণ্ডবদের নাগাপাহাড় বিজয়ের গল্পকে কোনো প্রশ্ন করছেন না।
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ৩
 সঞ্জীব দেবলস্করের চতুর্থ নিবন্ধটিও ইংরেজিতে এবং বিষয়টির গভীরে গিয়ে বিচিত্র প্রব্রজন থেকে একটি জনগোষ্ঠী গড়ে উঠবার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটটি ব্যাখ্যা করছে। যেমন শাহজালাল এবং তাঁর সঙ্গীদের দ্বারা এখানে দ্বিতীয় কৃষি বিপ্লবটি হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন, এবং জনজাতিরা শুধু ইসলামই গ্রহণ করেন নি, তাঁরা ভাষাও গ্রহণ করছেন অর্থাৎ বাঙালি হচ্ছেন। জনপ্রিয় ইতিহাসের কথাতে এই ভাষান্তরের কথাটি বিশেষ গুরুত্ব পেতে দেখা যায় না।   কাছাড়ের বড়খলা-সোনাই এলাকাতে  ক্ষেত্র অনুসন্ধানের উপর ভিত্তি করে তিনি ‘কাছাড়ি’ এবং ‘নাগামৌলবি’দের নজির দিয়েছেন, যারা কাছাড়ি বা নাগাও নন, মৌলবিও নন। তবে শুধু কৃষি বিস্তারই নয়, ডিমাছা রাজদরবারের দণ্ডবিধির নজির দিয়ে তিনি এখানে  প্রচলিত বর্ণবিদ্বেষকেও সহজ ধর্মান্তরণের একটি কারণ বলে মনে করেন। কিন্তু সেই ইসলাম ছিলনা কেতাবি শরিয়তি ইসলাম, ছিল হিন্দু বৌদ্ধ ঐতিহ্য সমন্বিত মারিফতি ইসলাম। ফলে যে ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য বিশেষ করে সঙ্গীতের ধারার উদ্ভব হল, সেই পরিবেশেই সিলেটি নাগরি লিপি এবং সাহিত্যও  দেখা দিল।  
স্বপ্না ভট্টাচার্যের পঞ্চম প্রবন্ধের পরিসর চেনা গণ্ডির বাইরে-- আরাকান। সেখানে নৃগোষ্ঠীগুলো এবং তাদের মধ্যেকার  বৌদ্ধমতধারাগুলোর উদ্ভব এবং বিকাশ নিয়ে তাঁর দাবি ‘Some observation’ তুলে ধরেছেন। ভারে এবং ব্যাপ্তিতে প্রবন্ধটি এই সংকলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ। সেই প্রাচীন কাল থেকে সাম্প্রতিক ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু বাংলা ভাষা সাহিত্যের ছাত্রদের জন্যে আমরা সংক্ষেপে যেটি বলতে পারি ‘আরাকানের রাজসভা’তে মুসলমান সুফি কবিদের হাতে বাংলা সাহিত্য দেখা দেবার আর্থ-রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটটি স্পষ্ট করেছেন। উত্তর এবং মধ্য মায়ান্মার থেকে এলাকাটির বিচ্ছিন্নতা এক উদার  বৌদ্ধ ধর্মীয় পরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। ফলে হিন্দু এবং ইসলামী ঐতিহ্যও সহজেই সেখানকার সমাজের এবং ধর্মের ভেতরে এবং প্রতিবেশে সহজেই জায়গা করে নিতে পেরেছে। ‘হিন্দু’ বলতে আমরা  ব্রাহ্মণ্য, যৌগিক, তান্ত্রিক সব ঐতিহ্যেরই কথা বলছি। আরাকান বুঝতে গেলে  বাংলা এবং পূর্বোত্তর ভারতকে বুঝতেই হয়। আরাকানের শাসকদের কাছে একদিকে মধ্যদেশের বর্মণ রাজাদের চাপ, আর দিকে মোঘলের চাপ সইতে হচ্ছিল। মোঘলদের বিরুদ্ধে বাংলার সুলতানদের সঙ্গে একসময় ঘনিষ্ঠ আঁতাত গড়ে উঠে। একসময় আরাকানের বৌদ্ধ রাজারা নিজেদের মুসলমান নামও রাখতেন, মুদ্রাতে ইসলামী কালিমাও ব্যবহার করতেন। রিচার্ড ঈটন ভারতে , বিশেষ করে বাংলাতে ইসলামে ধর্মান্তরণের যে inclusion, identification এবং displacement-এর তত্ত্ব উপস্থিত করেছেন, তার প্রথম এবং দ্বিতীয় স্তরটি আরাকানের রাজসভার সেকালীন সাংস্কৃতিক আবহেও স্পষ্ট। ফলে রাজনৈতিক ভাবে মোঘল এবং ধর্মীয় দিক থেকে শরিয়তি ইসলাম বিরোধী বহু সুফি আরাকানে গিয়ে স্থায়ী বাসা করেন। রাজসভাতে কাজ নিয়ে, সাহিত্যও করেন অনেকে। আলাওল যে জায়সীর ‘পদ্মাবতী’ অনুবাদ করেছিলেন---সেটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি লেখিকা স্পষ্ট করবার চেষ্টা করেছেন। জায়সী নিজে সুফি ছিলেন, এবং মোঘল বিরোধী শাসকদের পৃষ্ঠপোষণা পেয়েছেন। তাই রাজপুত রাজা রতনসিং তাঁর গল্পে মহিমান্বিত, সুলতান আলাউদ্দিন প্রতিনায়ক এবং শরিয়তি ইসলামের প্রতীক। শ্রীলঙ্কার রাজকুমারী পদ্মিনী বৌদ্ধ ধর্মাদর্শের প্রতীক। তাঁর চরিত্রটি বার্তা লেখিকার মতে, বৌদ্ধ মধ্যপথই সবচাইতে কাঙ্ক্ষিত। জায়সির পদ্মাবতী ঐতিহাসিক চরিত্র কি না, কাহিনির সিঙ্ঘালা আদৌ শ্রীলঙ্কা কি  বর্তমান হারিয়ানার একটি এলাকা সেই সব তর্ক আছে। আমরা সেদিকে যাচ্ছি না। যেটি গুরুত্বপূর্ণ---সে হলো আরাকানে যখন এই কাব্য অনুদিত হচ্ছে তখন আসলে কবি এবং পৃষ্ঠপোষক রাজার উত্তরভারতীয় শাসকদের এবং শরিয়তি ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষোভের অভিব্যক্তি ঘটছে। সেন রাজাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের তাড়ায় বহু বৈষ্ণবও আরাকানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ফলে সেই বৈষ্ণবদের মধ্যে প্রচলিত ব্রজবুলি শৈলীর আশ্রয় নিলেন আলাওল। আমরা আলাওলের কথা লিখলাম, তিনি দৌলত কাজি, মাগনঠাকুর সহ আরো অনেকের অনেক কথাই লিখেছেন। আঠারো শতকের শেষের দিকে একদিকে মোঘল এবং আর দিকে বর্মণ রাজা বডোপায়ার কাছে আরাকান তার স্বাধীনতা হারায়। আরাকান থেকে মহামুনির প্রতিচ্ছবি নিয়ে চলে যান বর্মণ রাজা, সেই সঙ্গে যায় আরাকানের গৌরবের দিন। ঈটন কথিত displacement প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে এর পরে। সেই নিয়ে তিনি বিস্তৃত লেখেন নি এখানে। তবে বর্তমান রাখাইন-রোহিঙ্গিয়া সংঘাতের পশ্চাদভূমির অনেকটাই ইঙ্গিত মেলে। সেই নিয়ে লেখিকার স্বতন্ত্র অধ্যয়নও রয়েছে। তাঁকে এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বললেই চলে। আরাকানের ইতিহাস সন্ধান করতে গিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত এই পুরো এলাকাতে বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে ইসলামী ঐতিহ্যের থেকে আলাদা করা কঠিন। এমন কি মহামুনি ঐতিহ্যের সন্ধানে তিনি আসামের হাজো অব্দি পৌঁছেছেন যেটি কি না এখনো হিন্দু-বৌদ্ধ-ইসলামী তীর্থ বলে বিবেচিত হয়। ফলে তিনি গোটা পূর্বোত্তর ভারতে এবং বাংলার সমাজে ‘হারানো’ বা ‘লুকোনো’ বৌদ্ধধর্মাদর্শে নিয়ে আরো বিস্তৃত অধ্যয়নের প্রয়োজনের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর নিবন্ধের কথা লিখতে গিয়ে ভূমিকাতে অনুরাধা চন্দ মনে করিয়ে দিয়েছেন নবীবংশের লেখক সৈয়দ সুলতান, যিনি আরাকানের রাজসভাসদ ছিলেন, সিলেটের তরফ পরগণার থেকেই গিয়েছেন। এবং সিলেট হয়েই সুফি ধর্মাদর্শ চট্টগ্রামের পথ ধরে আরাকান অব্দি গিয়েছে। সুফি দর্শনের পথটি মিথিলা,গৌড় , সিলেট হয়েই আরাকান অব্দি এগিয়েছিল সেসব কথা তথ্য দিয়ে সুকুমার সেন সহ অনেকেই কিন্তু লিখে গেছেন।
এই পর্বে দুই বাংলা নিবন্ধের প্রথমটি লিখেছেন অমলেন্দু ভট্টাচার্য , দ্বিতীয়টি তুষার কান্তি নাথ। অমলেন্দু দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে। সাধারণত দাবি করা হয়ে থাকে হিউয়েনসাং যে ‘সিলিচটল’এর কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি আসলে সিলেট। অমলেন্দুর দাবি, এটি শিলচর হতেও পারে। এহ বাহ্য। মনু সংহিতার মতো আর্যব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্য  থেকে শুরু করে বৈষ্ণব , শৈব, সুফি ঐতিহ্যের শেকড় থেকে ফসল তাঁর জিজ্ঞাসার বিষয় হয়েছে। সিলেটের রঘুনন্দনের স্মৃতি নয়, বরাক-সুরমা উপত্যকাতে অনুসৃত হয় প্রাচীনতর মনুস্মৃতি। সৈয়দ শাহনূর রচিত সিলেটি নাগরি সাহিত্য ‘সাতকন্যার বাখান’এর নজির দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন নারীর স্বভাব এবং প্রকৃতি বর্ণনাতে কবি মনুস্মৃতি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। ‘বাদসার থান’, ‘ ডরাই ঠাকুরাণী’ , ‘খলকুমারী’ ‘ঘোড়ামুখী’ ‘পাতা খাউরি’ ইত্যাদি লৌকিক দেবদেবীর উৎস, পূজাপদ্ধতি, এবং উপাসক সম্প্রদায় নিয়ে সমস্ত জিজ্ঞাসার শেষে যে ছবিটি তিনি তুলে ধরেন, সেও বাকিদেরই মতো লোকসংস্কৃতির ‘সমন্বয়ী রূপ’। যদিও ‘সমন্বয়ী রূপ’ বলা চলে কি না সেই নিয়ে কিন্তু ঈটন প্রশ্ন তুলেছেন। ভেদবুদ্ধিই যেখানে নেই, সেখানে সমন্বয় বা কিসের?
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ৪
 তুষার কান্তি নাথ ‘দেবী রণচণ্ডী’র উৎস এবং বিবর্তনের সন্ধানে আবারও সেই সমগ্র পূর্বোত্তর ভারত, বাংলাদেশের সঙ্গে উত্তরপূর্ব এশিয়ার সমাজ-সংস্কৃতি-ইতিহাসের দিকে তাকিয়েছেন। তাঁর দাবি, মোঙ্গলীয় ঐতিহ্যের থেকে আসা একটি দৈবধারণার উপরে আর্যব্রাহ্মণ্য প্রলেপ দিয়ে ‘দেবী রণচণ্ডী’ কে গড়ে তুলা হয়েছে।  একটি কৌতূহলী প্রবন্ধের তাঁর নিবন্ধটি শেষ হয়েছে। কাছাড়ি রাজসভার অন্যতম সাহিত্যকৃতি ভুবনেশ্বর বাচস্পতির ‘শ্রীনারদীয় রসামৃত’ রাজপরিবারের উপাস্য ‘দেবী রণচণ্ডী’ কোনো উল্লেখ কিংবা বন্দনা কিছুই নেই। কেন? 
এই পর্বের শেষ নিবন্ধটি আবার ইংরেজিতে। ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ বইটির লেখক অচ্যুতচরণ চৌধুরী ইতিহাসকে কেমন রূপ দিচ্ছেন---সেটাই ধরিয়ে দিলেন সুদেষ্ণা পুরকায়স্থ। অচ্যুতচরণ পেশাদার ঐতিহাসিক ছিলেন না, তবু তাঁর ইতিহাসটি হয়ে উঠেছিল সেকালের মানে ‘যৌক্তিক এবং বৈজ্ঞানিক’ ইতিহাস গুলোর অন্যতম। যে কারকগুলো এটা সম্ভব করেছে---লেখিকা একে একে চিহ্নিত করবার চেষ্টা করেছেন। অনেকেই তখন একে পশ্চিমা পদ্ধতির, বিশেষ করে পশ্চিমা স্থানীয় ইতিহাসের আদল অনুসরণ করেছে বলে প্রশংসাও করেছেন। লেখিকা দেখিয়েছে, সেসব ছিল। কিন্তু স্থানীয় তথ্যের সন্ধান এবং যাচাই সমস্যা তাঁকে স্থানীয় পদ্ধতি গড়ে তুলেই সমাধান করতে হয়েছিল। নির্ভর করতে হয়েছিল বংশপঞ্জি, লোকশ্রুতি ইত্যাদির উপরে। প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে দাঁড়িয়েও সেকালের এক ঐতিহাসিক কীভাবে বিদ্যাচর্চার রাজধানী কলকাতা যাবার হাতছানি এড়িয়েও গ্রামের বাড়ি থেকে অসাধ্য সাধন করেছেন সেই গল্প এখনো বহু স্থানীয় ইতিহাসবিদদের প্রেরণার স্থল হতে পারে।
দ্বিতীয় পর্বে যেখানে  আলোচনা সিলেটি নাগরিতে প্রবেশ করেছে। এই পর্বের প্রথম লেখাটিই অধ্যাপক আবদুল মুসাব্বির ভূঁইয়ার, যার বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিষয়টিই ছিল ‘সিলেটি নাগরি’---তাঁর মতে ‘জালালাবাদী নাগরি’। যদিও তাঁর পড়াবার বিষয় আরবি ভাষা এবং সাহিত্য। সিলেটি নাগরি লিপির উদ্ভব এবং বিকাশের একটি সামগ্রিক ইতিহাসের ছবি তিনি তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন। গ্রিয়ার্সন থেকে শুরু করে পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ হয়ে সুনীতি কুমার, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি, আহমেদ হাসান দাবি প্রমুখ যারাই সিলেটি নাগরি লিপি এবং সাহিত্য নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন তাঁদের অধ্যয়নের সঙ্গেও সংক্ষিপ্ত পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।  প্রায় সঠিকভাবেই লিখেছেন, সরাসরি বাংলা বা দেবনাগরি থেকে এই লিপি আসে নি। এই দুই লিপির থেকেই সে উপকরণ নিয়েছে, সেই সঙ্গে আরবি –পার্শি ধ্বনিতত্ত্বের প্রভাবেও প্রভাবিত হয়েছে। কিন্তু  শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি সিলেটি নাগরি লিপির উদ্ভবের কারক হিসেবে শাহজালাল এবং তাঁর শিষ্যদের ধর্মপ্রচারের কাজ এবং কালকে জুড়তে চেয়েছিলেন। সুনীতি কুমারও বুঝি সেরকমই দাবি করেছেন এবং কালও মোটামুটি চতুর্দশ শতক বলে সুনির্দিষ্ট করেছিলেন। আমরা তলিয়ে দেখেছি, সুনীতি কুমার আদৌ সেরকম দাবি করেন নি। শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি দাবিটি সঠিক করেন নি বলে উষারঞ্জন ভট্টাচার্য অন্যত্র লিখেছেন। অন্যদিকে আহমেদ হাসান দানি সিলেটি নাগরি লিপির উদ্ভবের সঙ্গে বহু পরের আফগান শাসকদের ভাষানীতি এবং সংস্কৃতির সঙ্গে জুড়তে চান। এই তর্কে আবদুল মুসাব্বির ভূঁইয়ার স্থিতি শিবপ্রসন্ন লাহিড়ির পক্ষে। সিলেটি লিপিতে লেখা সাহিত্যের ভাষাকে তিনি বলেন ‘সিলেটি বাংলা’।  সম্পাদিকা অনুরাধা চন্দকে দেখলাম, ‘সিলেটি বাংলা’র দাবিকে মেনে নিতে। গ্রন্থশেষে সম্পাদকীয় মন্তব্যে । ‘সিলেটি’র দাবিটি একেবারে নিরর্থক নয় এর জন্যে যে সিলেটি ছাপটি প্রবল। কিন্তু সিলেটে বাংলা লিপিতে বা  প্রতিবেশী  এলাকার সাহিত্য তুলনা করলে দেখা যাবে প্রাক-ঔপনিবেশিক কালে সারা বাংলাতেই এমনটা হয়েছে, যাকে ‘উপভাষা’ বলি তার ছাপও পড়েছে, আবার  সাধারণ একটি মান বাংলা গড়ে তুলবার প্রবণতাও দেখিয়েছে সাহিত্যের ভাষা। ‘পহেলা কেতাবে’র ছোট্ট নমুনা আমরা দেখালামই। একটি পদের নজির দিতে পারি --- যেটি সিলেটি দেখাবে, সম্ভবত শোনাবেও... “...শুতিলে না আইসে নিদ্রা বসিলে পোড়ে হিয়া/বিষ খাই মরি যাইমু কালার বালাই লৈয়া/প্রতাপ আদিত্যে বলে বিড়ম্বনা আশে/মিছা ভুলি রহিলুম এ ভব-মায়া রসে। এখন এই রচয়িতা প্রতাপাদিত্য কিন্তু যশোরের রাজা হওয়াই সম্ভব। কিংবা এই সুবিখ্যাত বৈষ্ণব পদ পড়ামাত্র মনে হবে হবিগঞ্জের কারো লেখা, “দেইখ্যা আইলাম তারে---/সই দেইখ্যা আইলাম তারে।/এক অঙ্গে এত রূপ নয়ানে না ধরে।।/বান্ধ্যাচে বিনোদ চূড়া নব গুঞ্জা-দিয়া।/উপরে ময়ুরের পাখা বামে হেলাইয়া---” পদটি কিন্তু, সবাই জানি, জ্ঞানদাসের লেখা। সুতরাং মুহম্মদ আবুল বশর যে লিখেছিলেন,লিপি আছে ভাষা নেই--- তা বোধহয় বিশ্বলোকে একটাই,আর তা সিলেটি নাগরী লিপি” আবিদ রাজা মজুমদার তাঁর নিবন্ধে কথাটির উল্লেখ করেছেন। নন্দলাল শর্মা কিন্তু লিখেছেন, এই লিপিতে বাংলা ভিন্ন অন্যান্য ভাষার পুথিও কিছু লেখা হয়েছে। আর ‘বাংলা’ পুথির লিপ্যন্তর তো হয়েইছে।
এই পর্বের দ্বিতীয় রচনাটি ইংরেজিতে। অনুরাধা চন্দের ইতিপূর্বে সম্পাদিত ‘সিলেট নাগরির পহেলা কিতাব ও দৈ খুরার রাগ’ বইটির উপর ভিত্তি করে মীনা দানের ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। অত্যন্ত সুব্যবস্থাপিত কিন্তু সংক্ষিপ্ত আলোচনা। সাধারণত ভাষাবিজ্ঞানের সামগ্রিক ছবি এতো সংক্ষেপে আলোচনা করাই কঠিন। যেখানে লেখিকাকে স্বনিম এবং উপস্বনের তফাৎ অব্দি বুঝিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। ভাষাবিজ্ঞানের চেনা ক্রমকে পালটে তিনি বাক্যতাত্ত্বিক, রূপতাত্ত্বিক আলোচনা সেরে ধ্বনি তত্ত্বে এসেছেন। ভাষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টির থেকে তিনি লিখছেন, স্বল্পশিক্ষিত নিম্নতর শ্রেণির মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না এই লিপি কাঠামোকে গড়ে তোলা। প্রথমত প্রতিবেশী লিপিগুলোর সঙ্গে কোনো রকম বিভ্রান্তি এড়াতে এরা নতুন বর্ণ গড়েছেন। তাঁরা জানতেন একটি বাংলা ভাষাবৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করছেন, ফলে মনে হয়েছে আরবি ফারসির বদলে দেবনাগরি বর্ণবিন্যাসকে আশ্রয় করলেই ভাষার প্রয়োজনটি মিটবে ভালো। উচ্চারণ অনুসারে লিপি গড়তে গিয়ে ধ্বনি প্রতি একটিই হরফ রেখেছেন। উদাহরণ স্বরূপ শিষধ্বনির জন্যে বাংলাতে যেখানে তিনটি  বর্ণ রয়েছে, সিলেটি নাগরিতে রয়েছে একটি মাত্র। ফলে বর্ণমালাটি রপ্ত করা নিশ্চয় সহজ হচ্ছিল। যদিও যুক্তাক্ষর নিয়ে তিনি বিশেষ কথা বলেন নি। আশা করেছেন, আরো যেসব শতাধিক পুথি বা বই উদ্ধার করা গেছে সেগুলোর একটি তুলনামূলক আলোচনা ভাষা এবং লিপি সম্পর্কে আরো সব নতুন দিক খুলে দেবে। 
আবিদ রাজা মজুমদার নিজেও ভাষাতাত্ত্বিক, সম্পাদিকার কাজের সহকর্মী । প্রচুর ক্ষেত্র অনুসন্ধানে সঙ্গ দিয়েছেন। মূলত এর উপরে ভিত্তি করেই বরাক উপত্যকাতেই যারা এখনো নাগরি পুঁথি পাঠ করেন সেরকম জনাকয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছেন। যেমন হাইলাকান্দির ফরাস উদ্দীন চৌধুরী, বাঁশকান্দির শেখ ফরিজ আলী, শেখফকির আলী প্রমুখ। পুঁথি কারা পড়েন, কীভাবে পড়েন সেইসব কথাই লিখেছেন তিনি। সেই সঙ্গে এসেছে বরাক উপত্যকার ভূগোল,ইতিহাস এবং জনগোষ্ঠীগত বৈচিত্র্যের উৎস কথা।
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ৫
সাদিয়া চৌধুরী পরাগের পরবর্তী বাংলা প্রবন্ধটিও একই পথে হেঁটেছে। তিনি মূলত তাঁর বাংলাদেশের বাড়ির মহিলাদের মধ্যে নাগরি পুথি পড়ার কথা স্মৃতি থেকে লিখেছেন। প্রথম ভাগে তিনি অত্যন্ত সংক্ষেপে নাগরি সাহিত্যের উদয় এবং বিলয়ের কারকগুলো বলবার চেষ্টা করেছেন । শাহজালাল এবং তাঁর অনুগামীদের দ্বারা ভাষায় ভাবনায় পরিবর্তনের একটি প্রেক্ষাপটের কথা স্বীকার করেও গোলাম কাদিরের সাক্ষ্যে আস্থা জানিয়ে তাঁরও বক্তব্য মোঘলদের দ্বারা পরাস্ত আফগানেরাই এই লিপির উদ্ভব এবং বিকাশ ঘটান। ঔপনিবেশিক আমলে বাংলাকে বিধর্মীদের ভাষা বলে প্রচারকে মোকাবেলা করতেই সিলেটে সিলেটি নাগরি সাহিত্যের প্রচার প্রসার বাড়ে। উর্দু-আরবি ফার্সি শব্দপ্রয়োগ হলেও, সিলেটি ভাষারীতির মিশ্রণ ঘটলেও ভাষা এগুলোর বাংলাই। এবং বিষয়ে আসয়েও কেবলই ইসলামী বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, রামায়ণ, মহাভারতের কাহিনি, পদ্মাপুরাণ ইত্যাদি সহ ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়েও পুথি লেখা হয়েছে।  শিক্ষাদীক্ষাতে কোণঠাসা মুসলমান সমাজের কাছে এই সাহিত্য একটি বিকল্প নিয়ে এসেও হাজির হয়। পাকিস্তান আমলের বাংলা ভাষা আন্দোলন যে ঐক্য গড়ে তুলে তাতে সিলেটি নাগরি সাহিত্যের সেই উচ্ছ্বাস স্তিমিত হতে শুরু করে, এবং মুক্তি যুদ্ধের পরে আর স্বাতন্ত্র্য টিকিয়ে রাখবার দরকারটাই নেই হয়ে যায়। তাছাড়া জমিদারি প্রথার অবলুপ্তি, সর্বজনীন শিক্ষা বিশেষ করে নারীদের ব্যাপকভাবে শিক্ষাতে নিয়ে আসাতেও এই সাহিত্যের পাঠক কমে যায়। সাহিত্যের পাঠক এখন আবার বেড়েছে কি না, আমাদেরও জানা নেই । কিন্তু বাংলাদেশ থেকে মূলত  বিলেত প্রবাসী কিছু সিলেটির উদ্যোগে আন্তর্জাল জমানাতে যে নতুনকরে লিপি এবং সাহিত্যকে পুনর্জীবিত করবার প্রয়াস চলছে, সেই সংবাদ সম্ভবত তাঁর কাছে পৌঁছোয় নি। বস্তুত সংকলন সম্পাদিকার কাছেও পৌঁছোয় নি।  
সামসুল হক বড়ভূঁইয়ার  রচনাটি আবিদ রাজা মজুমদারের পরিপূরক বললেই হয়। তিনি ক্ষেত্র অনুসন্ধানে সোনাই এলাকায় যাদের কাছে পুথি দেখেছেন সেরকম জনাকয়েক ব্যক্তির এবং সংগৃহীত পুথির নামোল্লেখ করেছেন। এখনো কোথাও কোথাও কিছু পুথি পড়া হয় বলে জানিয়েছেন। বিশেষ করে মহরম মাসে ‘জংগনামা’ গান এবং নাচের প্রচলন আছে বলে জানিয়েছেন। 
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ৬
তৃতীয় পর্বে সিলেটি নাগরি সাহিত্যের সামাজিক তথা ঐতিহাসিক তাগিদটিকে  বুঝবার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রথম নিবন্ধটি লিখেছেন স্বপন মজুমদার। তিনি প্রাকৃতিক তথা অকৃত্রিম এবং কৃত্রিম ভাষা তথা লিপির তফাৎটিকে বুঝবার চেষ্টা করেছেন। কখনো একটি পুরো ভাষাই গড়ে তুলা হয় কৃত্রিম ভাবে যেমন আস্পারেন্তো। আবার ভারতে যখন বহু প্রান্তিক ছোটখাটো জনজাতিদের ভাষাতে লেখালেখি সম্ভব করে তুলতে রোমান লিপির ব্যবহার করা বা করানো হয়---তখন লিপিটি হয়ে যায় কৃত্রিম। সিলেটি নাগরি সেরকম এক কৃত্রিম লিপি। সেই কৃত্রিমতা কখনো প্রতাপের নিজের দরকারে ঘটতে পারে, কখনো বা তাকে প্রতিহত করতে। যখন একদল মানুষে ভেবেছেন স্বাভাবিক বাংলা ভাষা এবং লিপিতে নিজেদের কথা বলবার স্বাভাবিক অধিকার পাচ্ছেন না তখনই এই লিপির দরকার মনে করছেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি চর্যার ‘সান্ধ্যভাষা’র কথাও এনেছেন। যেখানে  বাইরের এবং ভেতরের বার্তা ভিন্ন। ‘সান্ধ্যভাষা’তে অবশ্য শুধু ব্যবহারিক ভাষারই কথা বোঝায় না,কাব্যভাষাকেও বোঝায়—যেখানে শব্দের আভিধানিক এবং ব্যঞ্জনার্থ ভিন্ন---সেই কথাটি মনে হল না তিনি মনে রেখেছেন। তাতে অবশ্য সমস্যা বিশেষ হয় না। ঐতিহ্যের দিক থেকে তিনি চর্যার সাহিত্য এবং সিলেটি নাগরি সাহিত্যকে একই গোত্রের মনে করছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ নিছক কোনো সাম্প্রদায়িক প্রেরণাতে লিপিটির উদ্ভব হয় নি, হয়েছে সংগ্রামী প্রেরণার থেকে। বাংলা ভাষা এবং লিপিতে অশিক্ষার ফল এই লিপি তাও নয়। এমনকি উনিশ শতকে ছাপা সাহিত্যে জোয়ার আসবার পেছনে  খৃষ্টান মিশনারিদের প্রতিরোধ করবার তাগিদও কাজ করেছে, যে মিশনারিদের পেছনে কিনা শাসকদেরও প্রশ্রয় ছিল মূলত তিনটি বই ‘পহেলা কিতাব’, ‘আহকামে চরকা’ এবং ‘চরকাফাজিলত’এর উপর ভিত্তি করে তাঁর বক্তব্য তিনি দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ব্রাহ্মি লিপি বৌদ্ধদের হাত ধরেই এই অঞ্চলে এসে থাকবে। তাঁর লেখাতে দেবনাগরি এবং নেওয়ারির দুই বিকল্প নামও তাঁর লেখাতে পাচ্ছি –যথাক্রমে দেশনাগরি এবং নাগরি। সিলেটি নাগরিতে এই দুইয়েরও প্রভাব থেকে থাকবে। আমরা জানি দেবনাগরি , নেওয়ারি বাংলা বা সিলেটি নাগরি সবই ব্রাহ্মিরই দ্বিতীয় সহস্রাব্দের বিচিত্র রূপান্তর। আর ব্রাহ্মিই সরাসরি এসেছিল, বা বৌদ্ধদেরই হাতে করে এসেছিল---সেরকম বক্তব্য সামান্য সমস্যাসঙ্কুল। কিন্তু একটি নতুন প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। ‘ব্রাহ্মি’ সম্পর্কে এই অভিমতকে দেখা যাচ্ছে সম্পাদিকাও তাঁর সমাপ্তি মন্তব্যতে অস্বীকার করছেন না। কিন্তু দুজনের কেউই কোনো তথ্য দেন নি। আমরা কিন্তু ব্রাহ্মিকে সরাসরি এই এলাকাতে আসবার নজির বিশেষ পাইনি, এলেও সেটি প্রথম সহস্রাব্দের প্রথমদিকেই আসা সম্ভব ছিল। ব্রাহ্মি গুপ্ত স্তর পার করে একদিকে দেবনাগরি, অন্যদিকে কুটিল-কামরূপী স্তর পার করে বাংলা-অসমিয়া লিপিস্তর অব্দি এসেছে। এবং সিলেটে সর্বপ্রাচীন যে লিপিটি মিলেছে সেই নিধনপুর ফলকের লিপি কিন্তু কুটিল-কামরূপী। ফলে সেই সময় বা তারপরে আবার বৌদ্ধদের হাত ধরে ব্রাহ্মির চলে আসাটি সত্য হলেও ইতিহাসকে আরো বহু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাবে।  রিলা মুখার্জি চন্দ্ররাজাদের ফলকে দুই একছত্র নাগরি লিপির যে কথাটি লিখেছিলেন, সেটি বরং সত্য হওয়াই সম্ভব। আনুষঙ্গিক আরো বহু নজির যেমন আছে, তেমনি এই সময়টাই  প্রত্নরূপ ছেড়ে একদিকে নাগরি আর দিকে বাংলা-অসমিয়া লিপির জন্মক্ষণ।
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ৭
স্বপন মজুমদারে ভাবনকেই আরো গভীরে নিয়ে গেছে সম্পাদিকা অনুরাধা চন্দের ইংরেজি লেখাটি, যার  শিরোনামের বাংলা ভাবার্থ দাঁড়ায় ‘সত্যিকার মুসলমান হয়ে উঠা: সিলেটি নাগরি অভিজ্ঞতা’। স্বপন মজুমদার যদি এই তথ্য জানিয়েছেন যে সুফিরা মধ্য এশিয়াতেই বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনের সংস্পর্শে এসেছেন, অনুরাধা তবে এই তথ্যও জানিয়েছেন কামরূপের যোগ দর্শনের বই ‘অমৃতকুণ্ড’ আরবি ফার্সিতে অনূদিত সুফিদের দ্বারাই মধ্য এশিয়া অব্দি ছড়িয়ে পড়ছে...এমন আরো বহু গ্রন্থ পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে সুফিদের দ্বারা অনূদিত হচ্ছে এবং ইসলামী বিশ্ববীক্ষার ভেতরে গ্রহণ করে মানানই করা হচ্ছে। সুসংগঠিত হিন্দু বা ইসলাম ধর্মের প্রতাপের বাইরে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম, সহজিয়া বৈষ্ণব এবং নাথ ধর্মের সঙ্গে সুফি দর্শনের বিচিত্র রসায়নের ইতিবৃত্ত তিনি বর্ণনা করছেন। চারটি পাঠ তিনি নিয়েছেন ‘পহেলা কেতাব’, ‘রাধাপিয়ারি’ , ‘মুফিদুল মুমিন’ এবং ‘মুফিদুল আওয়াম’ । এর মধ্যে দ্বিতীয়টি ছাপা নয়। এর চারপুথিই যদিও প্রায় একই সময়কার--- ‘সত্যিকার মুসলমান’ হবার কাহিনি কেমন পালটে যাচ্ছে তার চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। নাগরি লিপি তর্কের বাইরেও সামাজিক ইতিহাসের পাঠ হিসেবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা।  প্রথমটিতে শরিয়তি ইসলামকে বিরোধিতা করা হচ্ছে। দ্বিতীয়টিতে সংশয় ‘ চিনিতে না পাইলাম আমি কুনু জন দানা’। তৃতীয়টিতে শরিয়তি পথকে স্বীকার করে নিয়েও মারিফতিকে বর্জন করা হয় নি, কিন্তু চতুর্থটিতে   একদিকে  সুফি সাধুদের সরাসরি ‘শয়তানের খলিফা’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ইসলামের বিবর্তনটি স্পষ্ট ধরা পড়ে। রিচার্ড  ঈটন কিন্তু অনুরাধা চন্দের পড়া রয়েছে। আমরা যে ঈটনের অন্তর্ভুক্তি, পরিচিতকরণ এবং প্রতিস্থাপনের তত্ত্বটির কথা লিখে এসেছি অনুরাধার নিবন্ধটি কিন্তু সেই তত্ত্বকেই আরো পোক্ত করে। তিনি কেন বা সেই তত্ত্বের উল্লেখ করলেন না, আমাদের কৌতূহল জাগে। দু’জনের বক্তব্য খুবই কাছাকাছি। কিন্তু উল্লেখ না করবার ফল হয়েছে এই যে  এককালিক ভিন্নস্বরের  পাঠ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখিকা লিখছেন, ভালো বা সত্যিকার মুসলমানের ধারণাকে কোনো এক সংজ্ঞার মধ্যে ধরা যাচ্ছে না। মুসলমান সমাজকেও পরিচিতিতে বেঁধে ফেলা যাচ্ছে না।এটি সত্য বটে --- কিন্তু একে কালক্রমিক বিবর্তন বলে ধরে নিতেও অসুবিধে নেই। যদি আমরা মনে রাখি যে পঞ্জিকার কাল এবং সামাজিক বিভিন্ন স্তরের কালের ধারণা ভিন্ন হতে বাধ্য। একই কালে বহু কাল সহবাস করতেই পারে, আর সেটিই হয়েছে। দইখুরা আর তাঁর ‘রাগে’র প্রথম সম্পাদকের কালতো স্পষ্টতই ভিন্ন, চিন্তাপ্রস্থানও দুই বিপরীত মেরুর। নন্দলাল শর্মা এর পরে শিতালং শাহের যে পরিচয় দিয়েছেন তাতেও প্রথম দুই স্তর একই ব্যক্তিতে অস্পষ্ট থাকে নি। অনুরাধার আলোচিত শেষ দুই গ্রন্থে যে ইসলাম ধরা দিয়েছে তাকে তিনিও ‘Modernity’ বলছেন। যথার্থই বলেছেনএইসব ধর্মীয় সরলরৈখিক অবস্থানকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলাটাই আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসার অভাবটিকে ভালো চেনায়। এগুলোতে মেয়েদের মাঠে কাজ করতে মানা করা হচ্ছে, এবং পর্দাপ্রথা অনুসরণ করতে বলা হচ্ছে। ঠিক সেই সময় যখন বর্ণহিন্দুদের মধ্যে মেয়েদের পর্দার বাইরে বের করে আনবার সামাজিক সংগ্রাম চলছে। আমরা যদি মনে রাখি বর্ণহিন্দুরা ছিলেন মূলত জমিদার, এবং মুসলমান মূলত তাদের রায়ত তথা কেউ কেউ জোতদার---তবে ধর্মের বাইরে বেরিয়ে এই বৈপরীত্যের একটি আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক কারকের সন্ধান মেলা খুব অসুবিধে হবার কথা নয়। বস্তুত কালান্তরের বিপরীতে ‘সামাজিক স্থানান্তর’এর একটি ভাবনাতেও পেয়ে বসে।
শেষ তথা পরের  বাংলা রচনাটি শিতালং  শাহ ও তাঁর গান নিয়ে নন্দলাল শর্মার লেখা। এর প্রথম ভাগে তিনি স্বাভাবিক ভাবেই সিলেটের, সিলেটি নাগরি লিপি এবং সাহিত্যের, সাধারণ ভাবে ‘মরমী’ দর্শন এবং সাহিত্যের বিকাশ এবং পরিবেশের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করে শিতালং শ শাহকে নিয়ে লিখবার পরিবেশটি গড়েছেন। শেষভাগেই শিতালং  শাহের জীবন, সাধনা এবং গান নিয়ে বিস্তৃত লিখেছেন। বাউল সুফিদের অনেকেই নিজেদের গানের লেখা বা ছাপারূপ দেবার বিরোধী ছিলেন। শিতালং  শাহও তাই। সুতরাং সেই অর্থে তাঁকে লেখক বলা যাবে না।মূলত গোলাম কাদিরের অভিমতের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরও অভিমত সিলেটি নাগরি লিপি সপ্তদশ শতকের আগেকার নয়। তাঁর অভিমত এই লিপিতে সিলেটি তথা বাংলা  ছাড়াও অন্যান্য ভাষার সাহিত্যও কিছু কিছু মেলে। যদিও বা  এই লিপিতে প্রেমকথা, শাস্ত্রাচার এমন কি উনিশ বিশ শতকে সমকালীন সমাজবাস্তবতা নিয়েও  কিছু পুথি মেলে তবু বিশেষ ভাবে ফকিরদের দ্বারাই এই সাহিত্য ‘শাসিত’ বলে একে ‘ফকিরি লিপি’ও মনে করা যেতে পারে। তিনি সিলেটে অধ্যাপনা করেন। ‘সাধক কবি ফকির শিতালং  শাহ’ নামে একটি সংকলনগ্রন্থেরও সম্পাদনা করেছেন।  সুতরাং তিনি যখন লেখেন এখন আর কাছাড় ছাড়া কোথাও বিশেষ এই সাহিত্য গান করে পড়া হয় না---তখন তথ্যটি নজরে না পড়ে থাকে না। শিতালং  শাহ ১৮০০ খৃষ্টাব্দে করিমগঞ্জের শ্রীগৌরীর কাছে কিত্তা শিলচর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর সুফিতত্ত্বশ্রয়ী এবং ইসলামী দুই ধরণের  গানই মেলে। ‘রাগ শিতালঙ্গী’ নামে তার গানগুলো কাছাড় সিলেটে এক সময় বেশ জনপ্রিয় ছিল।সুফিগানগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই বৈষ্ণবীও ছাপটিও স্পষ্ট। লেখক যদিও শিতালঙের সুফিগানগুলোকে ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের গান’ বলে লিখেছেন, আমাদের মনে হয় এগুলোই প্রথম পর্যায়ের। শরিয়তি এবং মারিফতি পথের দ্বন্দ্ব একটি তাঁর মধ্যে কাজ করেছিল। যে দ্বন্দ্বটি কিনা সময়ের দ্বন্দ্ব বলে অনুরাধা চন্দ স্পষ্ট করেছেন চারজন গীতিকবির পাঠ নিয়ে আলোচনাতে। বিয়ের আগে  তিনি ভুবন পাহাড়ে বহুদিন থেকে সাধনা করবার সংবাদ পাচ্ছি। সেই সাধনার পথ শরিয়তি হতে পারে না। অনুরাগীদের থেকে সংগৃহীত গানের কালক্রম অবশ্য নির্ণয় করা কঠিন। কিন্তু মারা যাবার পরে তাঁর মাজার কেন্দ্রিক কোনো অনুষ্ঠানাদি যাতে না হয় সেই নির্দেশিকা দিয়ে গেছিলেন দেখে মনে হয়, ক্রমেই তিনি মারিফতি পথ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। সেই নির্দেশ এতোই প্রভাবী ছিল যে বহুদিন তাঁর মাজার অরক্ষিত ছিল, পরে সাধারণ দেয়ালে ঘিরে দিলেও উরুস বা সেরকম কোনো অনুষ্ঠানাদি হয় না। নন্দলাল শর্মা শিতালং  শাহের বেশ কিছু গানের কলি উদ্ধার করে দিয়েছেন  । তাতে একটি বিষয় বেশ বোঝা যায়, ইসলামী গানগুলোর কোনো কোনোটিতে সমকালীন সামাজিক দ্বন্দ্ব বেশ স্পষ্ট। সেদিক থেকে এগুলোতে একটি ‘আধুনিকতা’র ছাপ আছে। যেমন “ বিদদা শিকখা লেখাপড়া ছআলেতে ধুম/ শও কথা নেক আমল হইতেছে গুম/... ফরকন্দাজ মাঝে গেল উঠিয়া শরম/ মাতাপিতারে করে বেহদ্দ ছিতম”। অন্যদিকে শৈল্পিক রুচিতে সুফিগানগুলোই উতরে গেছে বলে মনে হয়। এই যেমন একটি গানের দু’চারটি চরণ এরকম: “ জালাই মমের বাতি পুশাইলাম সারা রাতি গ/ ফুল বিছানাএ আতর ছিটাই ইনতেজার বেদনি।।/ হরেক রংএ জনতর বাজে হরেক কুঠাএ গুপি শাজে গ/ খালি গিরদক কুলে লইআ পুশাইলাম রজনি।” লেখকের দাবি সিলেটি নাগরী সাহিত্যেই নয়, “বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও শিতালং শাহ একজন কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব।’
রাধারমণ, হাছন রাজা,লালন ফকিরের গানের পাশাপাশি অতিসাম্প্রতিক আবদুল করিমের গানও যেখানে আমরা আবাল্য শুনে বড় হয়েছি , সেখানে করিমগঞ্জ তথা আসামের কবি শিতালং শাহের গান কেন আধুনিক গীতিমাধ্যমগুলোতে আর সেরকম শোনা যায় না সেটি আমাদের ভাবতে বসায়। শুধু ‘দোহার’ বাংলা বেণ্ড একটি গান ‘শুয়া উড়িল’কে সম্প্রতি আবার বেশ নাগরিক স্রোতাদের মধ্যে নিয়ে এসেছে, এর বাইরে আমরা বহু সন্ধানেও পাই নি।
‘স্ক্রিপ্ট আইডেন্টিটি রিজিওন’-এর মতো বই সাধারণত জনপ্রিয় হয় না। আর জনপ্রিয় না হবার সমস্যা হচ্ছে আগ্রহী জিজ্ঞাসু মনও সহজে এসবের সন্ধান পান না। আমাদের আলোচনা যদি বইটি সম্পর্কে সামান্য পরিচিতি বাড়াতে সাহায্য করে, সেই সঙ্গে পড়বার আগ্রহ এই ভেবেই শ্রম স্বীকার করা।
সিলেটি নাগরি নিয়ে দুটি ধারণাকে আমাদের অন্ধবিশ্বাস বলেই মনে হয়েছে। এক, লিপিটি শাহজালাল বা তাঁর সঙ্গী আউলিয়াদের দ্বারা প্রচলিত। বা তাঁরও আগে প্রচলিত ছিল। তাঁরা একে জনপ্রিয় করেছেন। দুই, সিলেটি লিপি আলাদা তাই ভাষা আলাদা। এই বই এবং অন্যত্র অনুসন্ধান করেও এই দুই সিদ্ধান্তের পক্ষে আমরা কোনো যুক্তি পাই নি। সেই চতুর্দশ শতকে বাংলাদেশে আর কোনো লিপিতে সেরকম সাহিত্যের সন্ধান মিলছে না, মিলবে কেবলই সিলেটি নাগরিতে--- যুক্তি হিসেবেও খুব সবল নয়। যারা এমন দাবি করছেন তারা বাকি বাংলার ইতিহাস নিয়ে বেশি ভাবতে আগ্রহী বলে আমরা দেখিনি। এই বইতেও না, অন্যত্রও না।  আর লিপি জনপ্রিয় করবার জন্যে সিলেটি বা বাঙালি তায় মুসলমান এক বিশাল জনসম্প্রদায়ের দরকার। যেটি মোঘল আমলের আগে সিলেট কাছাড় অঞ্চলে হয় নি। মোঘলেরাও বাংলা ভাষাকে সেরকম প্রশ্রয় দেন নি। ফলে বাংলা আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে। আরাকানে, কাছাড়ে, কোচ-কামতাপুরে, ত্রিপুরাতে। তার বাইরের লোকজন একটি ‘সান্ধ্যভাষা’র উপকরণ  হিসেবে সিলেটি নাগরির আশ্রয় নিচ্ছেন -- যে প্রক্রিয়াটির কথা স্বপন মজুমদার এই বইতেই ব্যাখ্যা করছেন, সেসব অনেক বিশ্বাস এবং গ্রহণযোগ্য।
দ্বিতীয়ত সিলেটি নাগরি অনেকটা বৈষ্ণবপদের ‘ব্রজবুলি’ ভাষার মতো। যে ভাষাতে কথা বলবার আদৌ কোনো জনসম্প্রদায় নেই। এমন কি সব বৈষ্ণবেরাও সেই ভাষা ব্যবহার করতেন না। সিলেটি নাগরি সেরকম মূলত ‘সুফি’, ‘বৈষ্ণব’ গানে ব্যবহৃত লিপি। বাকি যা কিছু বিষয় বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে  সবই উনিশ শতকের ষাটের দশক থেকে বিশ শতকের ষাটের দশক অব্দি এক শতকের ছাপা গ্রন্থের বাজারের স্বার্থে। এই শতকে সিলেটিরা বাংলা লিপি ব্যবহার করেছেন তার চে’ বহু বেশি। আর লিপি আলাদা হলেই যদি ভাষাকে আলাদা হতে হয়, তবে বাংলা লিপি বলে যেটিকে জানি সেটিকে সংস্কৃত ভাষাই বা কেন বলা যাবে না? বাঙালি তো এই লিপিতেই সংস্কৃত চর্চা করে।আরবি, রোমান, সিলেটি নাগরি সহ বাংলার প্রায় নটি লিপি ছিল, সিলেটি তার মধ্যে একটি। আর ছাপাখানার মুখ দেখেছে রোমান, বাংলা এবং সিলেটি নাগরি লিপি। এই তিনটি। সেই গৌরব তার প্রাপ্য। সম্প্রতি আন্তর্জালে ইউনিকোডেও এসেছে এই লিপি। তাই বলে সাহিত্যিক অন্তর্বস্তুর কোনো ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ছাড়াই, লিপির ইতিহাসের কোনো অনুসন্ধান ছাড়াই দাবি করা হবে সিলেটি ভাষার লিপি  সিলেটি---সেসব আমাদের অন্ধ বিশ্বাস বলে মেনে নিতে অসুবিধে থাকবার কথা নয়।
অনুরাধা চন্দ এবং সহযোগীদের প্রয়াস সেই সব বিশ্বাসের ভিত নড়বড়ে করে দিয়ে নাগরি সাহিত্যের দিকে নজর ফেরাবে বলে আশা করা চলে। তবে পরবর্তী কোনো প্রয়াসে যেন আন্তর্জাল প্রয়াসগুলোও অন্তর্ভুক্ত হয়। বিলেত থেকে যে প্রয়াসগুলো হচ্ছে তার ব্যাপ্তি বহু ব্যাপক। বিলেতের অধিকাংশ বাঙালিই কিন্তু সিলেটি। সুতরাং তাদের বাস্তবতা বোঝাও আমাদের কাজ। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় এমনি এমনি তাদের প্রয়াসে যুক্ত হয় নি। তাদেরই প্রেরণাতে বাংলাদেশে ইতিমধ্যে আবারও নতুন প্রকাশনা সংস্থা গড়ে উঠছে, যারা সিলেটি নাগরি বই পত্র প্রকাশ করছেন। সেলিম মুস্তফার ‘উৎস প্রকাশন’ সেরকম একটি। সুতরাং নন্দলাল শর্মা লিখতে পারেন পুথি পড়া সংস্কৃতি বাংলাদেশে নেই,কাছাড়ে আছে। পুথি ছাপানো সংস্কৃতি কিন্তু বাংলাদেশে দিব্বি আছে। সেগুলো আন্তর্জালেও সুলভ। স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের নতুন নজরে তাকাবার কাজ ফুরোচ্ছে না।
                                                   ------ ---- ----




Tuesday, 1 November 2011

।।রোমান হরফে বাংলা লেখার পুরাকথা । ।



(লেখাটি 'প্রজ্ঞান' নবম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ২০১১তে বেরিয়েছিল। এছাড়াই দৈনিক সংবাদ লহরির রবিবাসর পত্রিকারে ১৭ মার্চ, ২০১৩ থেকে পর পর ছ'টি সখ্যাতে ধারাবাহিক বেরোয়।) 


চিনা - জাপানিরা যা পারে আমরা না পারব কেন ?


              ‘এখন কম্পিউটারের যুগ । সুতরাং ইংরেজি নইলে চলবে না’ –এই কুসংস্কারের শুরু দুই দশক আগে । নব্বুইর দশকে । নতুন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনই বলুন আর দুষ্কৃতীই বলুন এটি এসছে বিশ্বায়নের হাত ধরেবিশ্বায়ন, কেবল টিভি, মোবাইল, ইণ্টারনেট এবং ইংরেজি ভাষাকে যেন এক সূত্রে গাঁথা হলো নতুন করে। শব্দগুলোর নতুন চিহ্নায়িত হয়ে গেল বিজ্ঞান, আধুনিকতা এবং আভিজাত্য। বিশ শতকের প্রায় পুরোটাই বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা তাঁর কালের আরো লেখক বুদ্ধিজীবিদের ইংরেজিতে লিখে বড়লোক হবার দুস্বপ্নের গল্প পড়ে হাসতে হাসতে আমরা যারা মানুষ হয়েছিলাম, শতাব্দী পার করতে না করতেই সেই আমরাই আমাদের ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পাঠালাম সেই ইংরেজি মাধ্যমেরই স্কুলগুলোতেই।
         বিজ্ঞান আর আধুনিকতাটা আড়ম্বর মাত্র, আঁতের কথাটা হলো আভিজাত্য। আর আভিজাত্যের সঙ্গে দিনবদলের কোনো সংযোগ নেই। পরিবর্তনের রথের চাকাকে ততটাই সে এগুতে দেয় যতটা তার আভিজাত্যের সঙ্গে মানায় ভালো । এর বেশি তার কোনো কৌতুহল নেই, নেই কোনো সংশয়। তার উপর দেশটা যদি হয় দেবতা মানা আধা সামন্তবাদী ভারতবর্ষ তবেতো আর কোনো কথাই নেই। সেই কম্পিউটারে ইংরেজি ভাষাতে রাশি বিচার করা হয় বিজ্ঞাপন দিলেও হুমড়ি খেয়ে পড়বার লোকের অভাব হয় নি কোনো কালে, হবেও না অচিরে। কেউ এই সামান্য প্রশ্নটাও করবে না যে, আচ্ছা! পৃথিবী গ্রহটা আমাদের ভাগ্যে ভালো মন্দ কোনো প্রভাব ফেলে না কেন? এর কোনো প্রতিকার-বিকার কিছু নেই কেন? কিম্বা নিদেন পক্ষে এই প্রশ্নটাও নয় যে জ্যোতিষশাস্ত্র কি আকাশে রাহু কেতুর সন্ধান নিতে কোনো গ্রহটহ পাঠালো আকাশে, যে ঐ বিধঘুটে রাহুকেতুর কীর্তিকলাপের খবর নিতে কম্পিউটারের দ্বারস্থ হতে হবে! অথচ বিজ্ঞানের গোড়ার কথাটাই হলো কৌতুহল।
          সম্প্রতি জাপান ঘুরে এলেন অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের তরুণ অধ্যাপক হিমাদ্রি শেখর দাস। এসেই দৈনিক যুগশঙ্খে এক দারুণ ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন, 'জাপান যাত্রার ডায়েরি' লেখাটা বিশুদ্ধ বাংলা ভাষাতে বাংলা হরফে ইন্টারনেটে তাঁর ব্লগেও আছে। দেখুনঃhttp://himsekhar.blogspot.com তাতে লিখেছেন,এখানে আসার পর থেকে ভাষা নিয়ে একটা সমস্যা ছিল । জাপানের খুব কম মানুষই ইংরেজি বুঝতে পারেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ভাষা আমাদের কাছে আবেগ বিনিময়ের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাড়ায়নি ইশারায় উভয় পক্ষই জেনে গেছি নিজেদের বক্তব্যের বিষয় বা প্রয়োজনীয়তার কথা । রাস্তায় হোক কিংবা ট্রেনেই হোক যখনই প্রয়োজন পড়েছে সাহায্যের জন্য সবাই প্রস্তুত । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও সেই অর্থে ইংরেজিতে দক্ষ নয় ওদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম জাপানে সবকাজই জাপানী ভাষাতেই হয় । পি এচ ডি থিসিসও এর ব্যতিক্রম নয় । নিজ ভাষার প্রতি এতটাই তাদের সম্মান ও ভালবাসা । বিশেষ কোন প্রয়োজন না পড়লে অন্য ভাষা শিখতে তার আগ্রহী হয়ে ওঠেনা । ইউরোপীয় ভাষাচর্চা না করার দরুণ সভ্যতার অগ্রগতির পথযাত্রায় খুব একটা অসুবিধে হয়েছে, দেখে তা মনে হলনাআমরা এমন আরো অজস্র নজির দিয়ে দেখাতে পারি আমাদের ইংরেজি প্রীতিটা আসলে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক প্রভুদের প্রতি চাপা প্রেমের নজিরও বটে। বাকি এর পক্ষে যত্ত সব যুক্তি সবই, এক্কেবারে ফালতু। বিলেতিদের উপনিবেশ ছিল না, এমন যে কোনো দেশেই ইংরেজি যে একটা ভাষা এই সত্যই জানে খুব কম লোকে। ইংরেজির থেকে জনপ্রিয় ইউরোপীয় ভাষা আসলে স্পেনিশ, তাও ঐ উপনিবেশের ফল। আর কিচ্ছু না! চিনা জাপানি লিপি আমাদের থেকে শতগুণে জটিল। কী মনে হয়, হিমাদ্রি যে জাপানিদের কথা লিখলেন তারা কেউ কম্পিউটার ব্যবহার করেন না! আর করলে কি সেখানে জাপানি চলে না! টিভির বাণিজ্য সংবাদে , বিশেষ করে বিবিসি বা সিএনএন যে কেউ জাপানের ষ্টক মার্কেটের কাজকর্মের ছবি দেখে নিলেই জবাব স্পষ্ট পেয়ে যাবেন। সেই একই ছবি দেখা যাবে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হতে চলা চিন দেশেও। চিনা-জাপানিরা যা পারে আমরা না পারব কেন?
     
      সেই হীনমন্যতার বিরুদ্ধেই এই লেখা। কী করে বাংলা লিখতে পড়তে হয় কম্পিউটারে তা নয়, আপাতত আমরা চাইব যারা নেটে রোমান হরফে বাংলা লেখার অভ্যেস ধরে রেখেছেন তাদের আধুনিকতার ভ্রান্তিটাকে ধরিয়ে দেয়া। আজ যখন ইউনিকোড এসে গেছে,নেটে বাংলা লিখবার জন্যে অভ্রের মতো এতো সুন্দর ব্যবহার বান্ধব কীবোর্ড রয়েছে, রয়েছে অজস্র বাংলা ফন্ট, যখন জি-মেইল, ফেসবুক নিজেই আপনি বাংলাতে লিখবার মতো ব্যবস্থা করে দিয়েছে, যখন ফায়ারফক্সের মতো বহুভাষিক ব্রাউজার এসে গেছে,যখন অপেরা ব্যবহার করে মোবাইলেও বাংলা লিখতে পারেন, যখন উবুণ্টু লিনাক্স, মাইক্রোসফট সেভেনে আপনি পুরো কম্পিউটারকেই বাংলাতে সাজিয়ে নিতে পারেন, যখন কম্পিউটারের আপনার সৃষ্টিশীল লেখাগুলো লিখতে পারেন, সম্পাদনা করতে পারেন, প্রকাশ করে দূরদেশের পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন, এমন কি আপনার পড়ার টেবিল থেকেও ভালো আস্তানাতে তাকে সংরক্ষিত করতে পারেন নেটে/ ব্লগে, তখনও যারা রোমান হরফের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন তাদের রোমান হরফ প্রীতির বিরুদ্ধে, তাদের আভিজাত্যসুলভ অজ্ঞতার বিরুদ্ধে বর্তমান নিবন্ধ।

যথাপ্রাপ্ত অবস্থার কাছে যারা দাসত্ব করতে চান নিঃ
          পোর্তুগীজ পাদ্রি মনোএল দ্য আসসুম্পসাউর কৃপার শাস্ত্রের অর্থ ভেদ(Crepar Xaxtrer Orth, Bhed)আধুনিক বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য গ্রন্থ। লিখেছিলেন ১৭৩৫এ। ঐ একই সময়ে তিনি (১৭৩৪-৪২) আরো একটি বই লেখেন - ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেনগল্লা, ই পোর্তুগিজঃ দিভিদিদো এম দুয়াস পার্তেসদুটো বইই ১৭৪৩এ পোর্তুগালের রাজধানী থেকে ছেপে বেরোয়। বাংলা ভাষাতে এ দুটিই প্রথম ছাপা বই। এবং দ্বিতীয়টি বাংলা ভাষাচিন্তারও প্রথম বই। বাংলাভাষা নিয়ে আমরা নিজেরা এর আগে বৌদ্ধিক প্রয়াসের চিহ্নই রাখিনি । আজকের পরিচিত মান বাংলাভাষাতে লেখা নয় বইদুটো । বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার অদূরে বর্তমানে গাজীপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত, তৎকালীন ভাওয়াল পরগণার বাংলা ভাষার উপর ভিত্তি করেই মনোএল লিখেছিলেন এদুটো বই। কিন্তু লিখবার জন্যে যে হরফের ব্যবহার করেছিলেন , সেটি বাংলা ছিল না। ছিল রোমান। তাঁর কাছে রোমানে লেখাটা ছিল এক বাধ্যবাধকতা । কারণ ছাপা বইয়ের জন্যে উপযোগী যে প্রায়োগিক হরফের দরকার ছিল সেটি কী হবে, কেমন হবে-- তা স্থির করতে আমাদের অপেক্ষা করত হয়েছিল আরো চার দশক। ১৭৭৮ সালে প্রকাশিত ইংরেজিতে লেখা নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডেরA Grammar of the Bengal Language’ বইতেই বাংলা হরফ প্রথম ব্যবহৃত হয়। চার্লস উইলকিন্সনস এবং তার সহকারী পঞ্চানন কর্মকার গুটেনবার্গের উদ্ভাবিত মূদ্রণ প্রযুক্তিটিকে বাংলার উপযোগী করে তুলেন এবং প্রথমবারের মত প্রয়োগসম্ভব করেন। ধাতুর ব্লকে ঢালাই করা একই আকৃতি একই হরফের জন্য একাধিক পাতাতে ব্যবহার করা যায় বলে বাংলা ছাপা হরফে একটা স্থায়ী, বৈষম্যহীন রূপ এসেছিল।
           হ্যালহাডের বইয়ের নামটা দেখুন Bengaliনয় কিন্তু, ‘Bengal Language’এই সেদিন অব্দি সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, মুহম্মদ শহীদুল্লার মতো বিশাল মাপের ভাষা ব্যক্তিত্বরাও বাংলাকথাটা ব্যবহার করতেন না, লিখতেন বাঙ্গালা আমরা যাকে বাংলা ভাষা এবং লিপি বলে আজকাল জানি তার ইতিবৃত্ত বহু প্রাচীন হলেও এর নাম বাংলাছিল না, আর সবাই লিখবার বেলা ঐ এক হরফ ব্যবহার করতেন না। জায়গায় জায়গায় ঐ লিপির বৈচিত্র যেমন ছিল, তেমনি আরবি, সিলেটি নাগরি,মায়ানমারের মন-খেমের ইত্যাদি লিপিতেও বাংলা লেখা হতো। পঞ্চানন কর্মকারেরা যে ব্রাহ্মি-কুটিল হয়ে আসা যে লিপিটিকে ছাপা বইতে তুলে ধরেন সেটিই ক্রমে বিকশিত হয়ে আজকের বাংলা হরফ বা বর্ণমালার চেহারা নিয়েছে বা নিচ্ছে ।
            হ্যালহেডের বইতে বাংলা হরফের প্রয়োগ হলেও তার ব্যাপক প্রচলন হতে লেগেছিল আরো শিকি শতাব্দি। তাঁরা শুরু করেছিলেন মাত্র । পঞ্চানন কর্মকার কোনো পূর্বনজির ছাড়াই যেটুকু কাজ করেছিলেন তা ছিল প্রশংসনীয়। কিন্তু সম্ভবত তিনি বা উইল্কিন্সন প্রযুক্তিটাকে ভালো বুঝতেন না । তাই এর পরের শিকি শতাব্দী এমন কি বিখ্যাত শ্রীরামপুর মিশনের শুরুর দিনগুলোতেও বাংলা বইপত্তর ছাপা হতো রোমান হরফে । কেউ কেউ এই রোমান হরফকেই একটা স্থায়ী রূপ দেবার প্রয়াস তখন থেকেই করছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা এবং তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের জনক স্যর উইলিয়াম জোনস ১৭৮৮তে একবার এরকম প্রস্তাব দিয়েছিলেন। চার্লস ট্রিবিল্যান, পার্শ্ব, টামাস প্রমুখ অনেক সাহেব তাঁর সমর্থণে তখন দাঁড়িয়েওছিলেন । কিন্তু পাশাপাশি অন্যদের হাতে তখন আজকের বাংলা হরফের বিকাশের কাজও চলছিল।তখন অব্দি বাংলা হরফে যে পরিবর্তনগুলো এসছিল সেগুলো ছিল মূলত এরকমঃ হরফটি ছিল দুরকমই -এর পেটে দাগ কেটে এবং নিচে বিন্দু দিয়ে । নিচে বিন্দু দেয়া অর্থাৎ এর আগে অসমিয়া এবং মৈথেলীতে অন্তস্থ-ৱ লিখতে ব্যবহৃত হতো। পেটকাটা ব অর্থাৎ ৰ এখন অসমিয়াতে প্রচলিত হলেও বাংলায় আর নেই।
     
        এখনকার বাংলা বেশ কিছু হরফের নীচে ফুটকি বা বিন্দু দেয়া হয়। এই ফুটকিগুলো সে যুগে প্রচলিত ছিল না । র-কে পেটকাটা ব দিয়ে নির্দেশ করা হয়। য়-এর নিচে কোন বিন্দু ছিল না; এটি শব্দে অবস্থানভেদে অন্যরকম করে উচ্চারিত হত। আবার ড় এবং ঢ়-এরও কোন অস্তিত্ব ছিল না। ড এবং ঢ শব্দের মাঝে বসলে ড় এবং ঢ়-এর মতো উচ্চারিত হত। ত+উ ব্যঞ্জন-স্বর সমবায়টি 'ত্ত' দিয়ে প্রকাশ করা হত। আজও কোন কোন আধুনিক বাংলা যুক্তাক্ষরে, যেমন স+ত+উ = স্তু (যেমন- বস্তু) এবং ন+ত+উ = ন্তু (যেমন- কিন্তু) --- এই দুইটি যুক্তাক্ষরের ত+উ অংশে এর ফসিল দেখতে পাওয়া যায়। তখন যে কয়টি বাংলা বই ছাপা হয়েছিল সেগুলোতে বইয়ের একটি পাতা প্রথমে হাতে লেখা হত। তারপর সেই পুরো পাতার একটি প্রতিলিপি কাঠে বা ধাতুতে খোদাই করে নেওয়া হত। শেষে এই কাঠ বা ধাতুর ফলকে কালি লাগিয়ে একই পাতার অনেক কপি ছাপানো হত। একই লোকের হাতের লেখাতে যে বৈচিত্র্য থাকতে পারে, সেগুলো ঐ ছাপাতে আর শুধরানো যেত না। (http://bn.wikipedia.org/wiki/বাংলাহরফ)
           শ্রীরামপুর মিশন থেকে আঠারো শতকে তিনখানা মাত্র আইনের বইয়ের সংবাদ মেলে যেগুলো বাংলা হরফে ছাপা হয়েছিল। ১৮০০তে বাইবেলের অনুবাদ দিয়ে বাংলা হরফে বই ছাপার ইতিহাসের শুরু । ততদিনে পঞ্চানন কর্মকারকেও সেখানে চাকরি দিয়ে বহাল করেছেন উইলিয়াম কেরি । পঞ্চানন কর্মকার বেশিদিন জীবিত ছিলেননা । ১৮০৪এ তিনি মারা গেলে তাঁর কাজকে এগিয়ে নিয়ে গেছিলেন তাঁর মেয়ের জামাই মনোহর মিস্ত্রি, ও মনোহরের ছেলে কৃষ্ণচন্দ্র মিস্ত্রি । বাঙালির লেখা প্রথম বাংলা হরফে ছাপা বই রামরাম বসুর প্রতাপাদিত্যচরিত্র। শ্রীরামপুর মিশনের প্রয়াসগুলোর সমকালেই খুব শীঘ্রই আরো অনেকে অনেকে বাংলা প্রকাশনার জগতে চলে আসেন। আমরা রাজা রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের বই পত্রিকার জগতে আত্মপ্রকাশের কথাগুলো জানি। এরা ছাড়াও ছিলেন আরো অনেকে । ততদিনে মুদ্রণযন্ত্রের সঙ্গে ঢালাই করা বাংলা হরফও বাজারে এসে গেছে । এবং এগুলোর মধ্যে বাজারের টানেই একটা সামঞ্জস্যও আসতে শুরু করে । তখন যে পরিবর্তনগুলো হয় তার মধ্যে অন্যতম ছিলঃ অনুস্বরের নিচের দাগটি ছিল না। ছিল কেবল গোল চিহ্নটি । ব্যঞ্জনের খাড়া দাগের সাথে য-ফলা মিলে বাঁকিয়ে কমলার কোয়ার মত একটা চেহারা ছিল। এগুলি আজও কখনো কখনো দেখতে পাওয়া যায় অনেকটা স্য-তে যেমন। কিন্তু এখানে নিচে জুড়ে যায়নি । তখন নিচের দিকে জুড়ে যেত।
                   'তু' যুক্তাক্ষরটি বর্তমান চেহারা পায়। অর্থাৎ ত-এর নিচে ু বসিয়ে। স্থ (স+থ) যুক্তবর্ণটি হ্যালহেডের সময়ে, অর্থাৎ ১৮শ শতকে স-এর নিচে পরিষ্কার থ লিখে দেখানো হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে এটি স-এর নিচে ছোট হ-এর মত অক্ষর বসিয়ে নির্দেশ করা হয়। হ্যালহেড এমন অনেক যুক্তাক্ষরেই পরের ব্যঞ্জনকে অক্ষত রেখেছিলেন। সেগুলো আর না থাকাতে যুক্তাক্ষরগুলো অস্বচ্ছ রূপ ধারণ করে। এখনও এই অস্বচ্ছ রূপই ব্যবহার করা হয় । এরকম আরও বহু যুক্তাক্ষরের অস্বচ্ছ রূপ ১৯শ শতকের শুরুর এই পর্বে নির্দিষ্ট হয়ে যায়
           পেট কাটা ব অর্থাৎ ৰ এই সময় বাংলা বর্ণমালা থেকে বিদেয় নেয়। ১৮শ শতকের মাঝামাঝিতে এই পর্বের শেষে এসে বর্তমান নিচে বিন্দু দেয়া রূপটিই সর্বত্র চালু হয়ে যায় । (ঐ) এর পরের বাংলা গদ্যের বিকাশের ইতিবৃত্তটা আমরা মোটামোটি সবাই জানি যারাই টুকটাক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ঘাটিয়েছি। বাংলা গদ্যের বা সাহিত্যের বিকাশের ইতিহাসে ছাপা যন্ত্রের ভূমিকার কথাটাও আমরা পড়েছি কিন্তু যেটি কম জানি তাহলো, আড়ালে আবডালে থেকে ছাপা যন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা হরফ তথা বর্ণমালার বিকাশের কঠিন জটিল ইতিবৃত্তের কথা। ভাষাটাকে ভালোবেসে যারা তাকে ছাপা বইতে প্রকাশের যোগ্য করে তুলবার শ্রম স্বীকার করেছিলেন তাদের ত্যাগ আর তিতিক্ষার কথা । ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ের কথা আমরা সব্বাই জানি, অনেকে ছেলেবেলা ঐ বই থেকেই বাংলা বর্ণমালা শিখেছি। কিন্তু যেটি জানি না, তা এই যে বর্ণপরিচয়ের লেখক বিশুদ্ধ অধ্যাপক বিদ্যাসাগর নন। সংস্কৃত কলেজের চাকরি ছেড়ে জীবিকার জন্যে তিনি এক ছাপাখানা খুলেছিলেন। মূলত সেখানেই তাঁর বর্ণমালা সংক্রান্ত ভাবনাগুলো বিকশিত হয়। সংস্কৃতের এই অধ্যাপকের উদ্দেশ্য ছিল সংস্কৃতের অধীনতার থেকে বাংলাকে মুক্ত করা । তিনি যে বদলগুলো নিয়ে আসেন সেগুলো ছিল এরকমঃ নিচে ফুটকি দিয়ে নতুন "য়" বর্ণটি ব্যবহারের প্রস্তাব করেছিলেন। একইভাবে ড ও ঢ-এর নীচে ফুটকি দিয়ে ড় ও ঢ় হরফ দুইটির প্রচলন করেছিলেন। এর আগে এগুলো বাংলাবর্ণমালাতে ছিল না । তিনি বাদ দিয়েছিলেন, দীর্ঘ-ৠ ও দীর্ঘ-ৡ বর্ণটিরও ব্যবহার না থাকলেও কেন যে তিনি রেখে দিলেন সেটি স্পষ্ট নয়। এছাড়া সংস্কৃত স্বরবর্ণমালার অন্তর্গত অনুস্বার (ং), বিসর্গ (ঃ), এবং চন্দ্রবিন্দু (ঁ) যেহেতু প্রকৃতপক্ষে ব্যঞ্জনবর্ণ সেহেতু বিদ্যাসাগর এই বর্ণগুলিকে ব্যঞ্জনবর্ণমালার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু এগুলোর স্বতন্ত্র ব্যবহার নেই বলে আজ অব্দি কোনো বাংলা অভিধানই বিদ্যাসাগরপ্রণীত এই বর্ণক্রমটি গ্রহণ করেনি।
           
  বিদ্যাসাগর ণ-ন এবং শ-ষ-স-এর মধ্যে উচ্চারণের সমতা সম্ভবত লক্ষ্য করলেও এর কোন সংস্কার করেন নি। বাংলা হরফের স্বচ্ছতা ও সমতা নিয়ে আসার জন্যও তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি য-ফলাকে ব্যাঞ্জনের সাথে জুড়ে দিয়ে কমলার কোয়ার মতো না লিখে আলাদা করে লেখার ধারা চালু করেন। ফলে সর্বত্র য-ফলার আকার একই রূপ পেয়ে গেল। ঋ-কার ব্যঞ্জনের নিচে নানান চেহারাতে বসত। বিদ্যসাগরই প্রথম ব্যঞ্জনের নিচে পরিস্কারভাবে ৃ চিহ্নটি বসিয়ে লেখা চালু করেন। একইভাবে হ্রস্ব-উ কারের জন্য ু লেখা চালু করেন।
            কিন্তু বিদ্যাসাগরের সংস্কারগুলি সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। অনেকগুলি অস্বচ্ছ যুক্তব্যঞ্জনের চিহ্ন অস্বচ্ছই থেকে গিয়েছিল। যেমন - তু ত-এর নিচে উ-কার দিয়ে লেখা হলেও ন্তু, স্তু যুক্তাক্ষরগুলিতে পুরনো অস্বচ্ছ রূপটিই থেকে গেল। ছাপাখানাতে ইংরেজি ধাতুঢালাই হরফগুলো একটি ডালায় দুই খোপে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সাজানো থাকত। কিন্তু বাংলায় এ নিয়ে তেমন কোন চিন্তা হয় নি । বিদ্যাসাগরই প্রথম বাংলা হরফের জন্য ডালার একটি নকশা এবং কোন হরফের পর কোন হরফ বসবে তার নিয়ম স্থির করে দেন। তাঁর এই নকশাই ক্রমে সমস্ত হরফ ব্যবহারকারী বাংলা ছাপাখানাতে গৃহীত হয়। বাংলা মুদ্রণশিল্পে প্রতিষ্ঠিত হয় সমতা ।
            বিদ্যাসাগর বাংলা মুদ্রণশিল্পকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। মূলত তার বেঁধে দেয়া নিয়মনীতি অনুসারেই পরবর্তী একশো বছর, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাংলা হরফ মুদ্রিত হয়। সময়ের সাথে বিদ্যাসাগরীয় হরফের সামান্য কিছু পরিমার্জনের চেষ্টাও করা হয়েছে । বিদ্যাসাগর নিজে বর্ণপরিচয়-এর ৬০তম সংস্করণ থেকে শব্দের শেষে অন্তর্নিহিত ও উচ্চারণযুক্ত ব্যঞ্জন, যেমন- 'বিগত', 'কত' শব্দের শেষের ত-টা, যেন ৎ-এর মত উচ্চারণ না হয়, সেজন্য এগুলোর উপর তারাচিহ্ন দেয়া প্রবর্তন করেন। বিশ শতকে অনেক লেখক একই কাজে ঊর্ধ্বকমা (') ব্যবহার করেছেন,রবীন্দ্ররচনাবলীর জন্যে এই নীতি নির্ধারিত হয়েছিল। প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশ একে লিখেছেন ইলেক চিহ্ন । যেমন- একশ', ইত্যাদি। তবে এই সংস্কারটিও সর্বজনগৃহীত হয়নি । ( ঐ)
            আমরা বানান নিয়ে খুবই স্পর্শকাতর অনেক সময়। কিন্তু এই ভাবনা সাধারণত কারো মাথাতেই আসে না যে বানানের কিম্বা বর্ণমালার শুদ্ধি/ অশুদ্ধি কোনোটাই নিয়ন্ত্রণের দায়ভার কোনো মাষ্টারমশাইর হাতে নেইতো বটেই। নেই কোনো একক ভাষাতাত্বিকেরও হাতে । থাকলে সুনীতি চট্টপাধ্যায়েরা যেমন লিখতেন বাঙ্গালাআমরাও তাই লিখতাম। কিন্তু আমরা লিখি বাংলা’ –রবীন্দ্রনাথ এটা শুরু করেছিলেন। এবং রবীন্দ্রনাথের লিপি তথা বানান সংস্কার ভাবনার সঙ্গে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আন্দোলনের যেমন একটা ভূমিকা ছিল তেমনি ছিল বিশ্বভারতী যখন তাঁর রচনাবলী ছাপার স্বত্ব পায় তখন তাদেরকেও এক বানান নীতি দাঁড় করাতে হয়। সেই নীতিই ক্রমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এবং বাংলাদেশ বাংলা একাডেমীকেও বানান তথা বর্ণমালা বিধি তৈরিতে প্রভাবিত করে।কিন্তু এই প্রতিটি সংস্কার প্রয়াসের পেছনে রয়েছে ছাপাযন্ত্রের বিবর্তনের চাপা পড়া ইতিকথা আনন্দবাজার পত্রিকাকেও আমরা যে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলা লিপি এবং বানান রীতিকে শাসন করতে দেখি তা এরই জন্যে । যথাপ্রাপ্ত অবস্থার কাছে যারা দাসত্ব করতে চান নি বা পারেন নি তাদের সৃজনী হাতেই এগিয়ে গেছে বাংলা লিপি, বর্ণমালা, বানান রীতি এবং ভাষা । যারা হতাশ হয়েছেন তাঁরা রোমান হরফে ফিরে যেতে চেয়েছেন; দাসত্ব যারা করে গেছেন তাদের হাতেই হয়েছে ভাষাটির যত বিড়ম্বনা। সেই দাসত্বের সবটা নয় কেবল যন্ত্রের কাছে । সাম্রায্যবাদী এবং উগ্রজাতীয়তাবাদী স্বার্থও এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ।

দাসত্বের ডাকে , যারা হতাশ হয়েছেন তাঁরা রোমান হরফে ফিরে যেতে চেয়েছে ন
         বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়যখন বাংলাদেশের পাঠশালাগুলোকে শাসন করছে, বঙ্কিম যখন বঙ্গদর্শনেসজোরে বাঙালিকে তার ইতিহাস লিখতে উদ্বুদ্ধ করছেন তখন আবার ঐ রোমান হরফকে ফিরিয়ে আনাবার এক প্রয়াস শুরু হয়েছিল দেশজুড়ে। নেতৃত্বে অবশ্যই সাম্রাজ্যের স্বার্থরক্ষক বিলেতিরা । সম্প্রতি হুমায়ুন আজাদ তাঁর দুখণ্ডের বিশাল সংকলন বাংলা ভাষাতে উনিশ শতকের এক অজ্ঞাতনামা লেখকের লেখা উদ্ধার করেছেন। বাঙ্গালা বর্ণমালা সংস্কার লেখকের নাম না জানাটা বাংলা ভাষাতত্বের ইতিহাসে এক দারুণ ক্ষতি । কবেকার লেখক-- সেই তথ্যেরও কোনো সন্ধান দেননি হুমায়ুন আজাদ। তবে ১৮৬৪র আগে নয়, কেননা তখনকার Asiatic society Journal থেকে নেয়া ঋণ স্বীকারোক্তি আছে প্রবন্ধের শেষে। এই লেখকের বাংলা বর্ণ সংস্কারে তাঁর অনেক প্রস্তাব পরের সময়ে গৃহীত হয়েছে, আবার অনেকগুলো হয়ও নি। যেমন তিনি লিখেছিলেন, ছাড়া আর সব স্বরবর্ণগুলো তুলে দিয়ে তাদের -কার চিহ্নগুলো রেখে দিতে। অর্থাৎ া,ি,,,,,,,,ৌ এইও চিহ্নগুলো থাকবে আ,, ঈ ইত্যাদি নয়। এখন পড়তে গিয়ে আমাদের হাসি পাবে । কিন্তু তিনি তখন বাংলা হরফ উঠিয়ে দিয়ে রোমান প্রচলনের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন এটা আমাদের মনে রাখতে হবে । তাঁর সেই প্রবন্ধেই দেশজুড়া সেই রোমান বলবৎ করবার সাহেবী প্রয়াসের সংবাদ আছে সেদিক থেকে তাঁকে বাংলাভাষা এবং লিপির স্বার্থে প্রথম লড়াকুর সম্মান দেয়া যেতেই পারে । সুতরাং বাংলাতে যে হরফ সংখ্যা কমিয়ে এনে জটিলতা কমানো যেতেই পারে এটি তাঁকে দেখাতে হয়েছিল। হুমায়ুন আজাদ তাঁর প্রবন্ধ সম্পর্কে লিখেছেন, “একজন দক্ষ মূদ্রাকরের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান প্রকাশ পেয়েছে প্রবন্ধটিতে।সংস্কার প্রস্তাব সম্পর্কে ভদ্রলোক লিখেছেন, “আমাদের বর্ণমালা সংস্কারের প্রধান উদ্দেশ্য মুদ্রাঙ্কনের সৌলভ্যসাধন। অর্থাৎ ভাষার উচ্চারণের কোনো হানি না হয় অথচ মুদ্রাঙ্কনের সৌলভ্য হয় ইহাই আমাদের অভিপ্রেত।
          তিনি শুরুতেই দুটো প্রচলিত প্রবাদের উল্লেখ করেছেন। শুনলে হাসি পায় বটে । কিন্তু বাংলা হরফ নিয়ে বাস্তব সমস্যার দিকেও চোখ টেনে নিয়েও যায়। প্রথমটি হচ্ছে, “দধীতিকার রঘুনাথ শিরোমণি যখন গুরু মহাশয়ের পাঠশালায়, , খ শিখিতে আরম্ভ করেন তখন গুরু মহাশয়ের শ্রীমুখ হইতে সমুদয় ব্যঞ্জণবর্ণের একবার উচ্চারণ শ্রবণ করিবামাত্র রঘুনাথ বর্ণমালার সংস্কারে প্রবৃত্ত হইলেন। বলিয়া উঠিলেন হ্যাঁগো, দুটা দুটা তিনটা রাখিবার প্রয়োজন কি?” দ্বিতীয়টি, “ বঙ্গদেশীয় কোন কলেজের প্রিন্সিপাল সাহেব একদিন কলেজের পন্ডিতকে স্বীয় কামরায় ডাকাইয়া বলিলেন ওএল পণ্ডিট টোমাডের বর্ণমালার টৃটীয় এবং চটুর্ঠ বর্গের কিছু ভিন্নটা ডেকাইটে পার? আমি ট অনেক পরিশ্রম করিয়া ডেকিয়াছি ডুইরই একরূপ উচ্চারণ।
          রঘুনাথ শিরোমনির মতো প্রশ্ন পরেও অনেক বিদগ্ধজনেরা করেছেন । কিন্তু জন্মেই, আর কোনো ভাষাতাত্বিক জ্ঞান ছাড়া কেউ মালার থেকে বর্ণ ছিঁড়ে ফেলবার প্রস্তাব দিলে কতটা গ্রহণ করা যাবে সেই প্রশ্নে আপাতত আমাদের আগ্রহ নেই। কিন্তু সাহেব প্রিন্সিপাল যদি বাংলা ধ্বনি তথা বর্ণের সংস্কারের প্রস্তাব দেন তবে কী বিপত্তি হতে পারে আমরা আঁচ করতেই পারি । রোমান হরফে বাংলা তথা ভারতীয় ভাষাগুলো লেখার প্রস্তাবের একটা বড় কারণই ছিল-- এতে বিদেশিদের বাংলা শিখতে সহজ হবে। চাকরি পেতে কিম্বা পদোন্নতির জন্যে সাহেবদের এ দেশের ভাষাতে পরীক্ষা দিতে হতো । সেই স্বার্থেই অধ্যাপক ড্রু নামে এক সাহেব রোমান লিপির প্রস্তাব দেন । রোমান হরফের পক্ষে অধ্যাপক ড্রু সাহেবের প্রথম যুক্তিটি যা ছিল,তা আজো অনেকে দেন-- রোমান বর্ণামালার অক্ষর অতি অল্প। এবং সবগুলোই আলাদা আলাদা । সংযুক্ত বর্ণ নেই। ঊর্দুর মতো এতো বিন্দুও নেই। এতে ইউরোপের এতো এতো ভাষা লেখা হচ্ছে । ভারতীয় ভাষাই যাবে না কেন? দ্বিতীয় যুক্তি হচ্ছে, রোমান হরফে ছাপার খরচ কম পড়ে । সুতরাং এতে ভারতীয় বই ছেপে জ্ঞানের প্রচার প্রসার সহজ হবে । তাছাড়া অশিক্ষিত অল্পশিক্ষিত মুদ্রকেরা ভারতীয় হরফগুলোর বৈচিত্রের জন্যে একের জায়গায় অন্য বসিয়ে বিড়ম্বনার এক শেষ করে । তৃতীয় যুক্তিটি হলো, আদালতে সেসব হস্তলিপি চলে তাকে বলে ভাঙ্গা বা সিকস্তা। সেগুলো এতো কদর্য যে অন্য কেউ পড়তেই পারেনা । হাকিম দূরে থাক মুহুরিরাও পড়তে পায় না । ফলে অনেক অবিচার হয়ে থাকে । রোমান হরফে সেসব অসুবিধে হবে না । চতুর্থ যুক্তি হচ্ছে, বৈজ্ঞানিক পরিভাষাগুলো যদি রোমান হরফে রোমান নামে না থেকে অনুবাদ হয়ে যায় তবে মূল পদার্থজ্ঞান তলিয়ে যাবে। রোমান হরফে ওষুধের নাম লেখা থাকলে কম্পাউণ্ডারদের বড় সুবিধে হয়। পঞ্চম যুক্তিটি একেবারে মোক্ষম। ভাষাবিদেরা ঠিক করেছেন রোমান বর্ণমালা প্রাচ্য বর্ণমালার সগোত্র তথা একই বংশজাত । সুতরাং রোমান বর্ণমালাতে প্রাচ্যভাষাগুলো লেখা হলে ভাষার বিশুদ্ধতা মার যাবে না কিছুতেই ।বোঝাই যাচ্ছে এতে সেই শতাব্দি প্রাচীন উইলিয়াম জোনসের ভূত ভর করেছে
            অধ্যাপক ড্রুর প্রস্তাবগুলোও নতুন ছিলনা কিছুতেই। আমরা আগেই লিখেছি স্যর উইলিয়াম জোনসের কথা । কিন্তু তখন বাংলা হরফে ছাপার কাজ শুরুই করা যায়নি । অঙ্কুর মেলছিল মাত্র । তবু জোনসদের সেই প্রয়াস ব্যর্থ করে দেয় শ্রীরামপুর মিশন এবং পরবর্তী উদ্যোগগুলো।যদিও জোনসের সেই যুগান্তকারী আবিষ্কার যে, সংস্কৃত এবং লাতিন সহ ইউরোপীয় ভাষাগুলো এক মূল উৎস থেকে এসছে-- আধুনিক তুলনামূলক ভাষাতত্বের দ্বার খুলে দেয়, সেই সঙ্গে কিন্তু বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত করে ফেলবার এক হুজুগে উদ্যোগও শুরু করিয়ে দেয়। এবং সেটি হয়েছিল উইলিয়াম কেরির হাত ধরেই। সেই হুজুগ থেমেছিল এসে রবীন্দ্রনাথ, সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ে। সে যাই হোক, কিন্তু ড্রু সাহেবের উদ্যোগ এক শতাব্দি পরে গোটা দেশেই তখন আবার নতুন করে বেশ সাড়া ফেলেছিল। পাঞ্জাবে উর্দূ ভাষাতে এটি ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। লাহোরে রোমান উর্দুনামে একটি সংগঠনও শুরু হয়েছিল এবং তাঁরা একখানা মাসিক কাগজও শুরু করেছিলেন।
           অধ্যাপক ড্রুর পক্ষে কলম ধরেছিলেন জর্জ কাম্বেল নামে এক ভদ্রলোক। তাঁর যুক্তিগুলো দারুণ ছিল। সমস্ত দুর্বলতা জেনেও এক্কেবারে গায়ের জোরে চাপাতে চাইছিলেন তিনি । লিখছিলেন, “ প্রায়ই ভাষার উচ্চারণ অনুসারে তদীয় বর্ণমালার প্রবৃত্তি হইয়াছে। প্রত্যেক ভাষার উচ্চারণ ভিন্নপ্রকার, সুতরাং ইহা দৃষ্ট হয় যে, এক ভাষার বর্ণমালা অপর ভাষায় ব্যবহার করিলে একপ্রকার অসামঞ্জস্য উৎপন্ন হয়। ইহার উদাহরণ-ইংরেজি ভাষায় রোমান বর্ণমালার ব্যবহার। ইংরেজি উচ্চারণের সহিত বর্ণবিন্যাসের কিছু মাত্র সম্বন্ধ নাই(পৃঃ৬১২,অজ্ঞাতনাম; বাংলা ভাষা ১ম খন্ড, সম্পাঃ হুমায়ুন আজাদ।) একেবারেই সেই বার্নার্ডশের উচ্চারণ। বার্নার্ডশ বুঝি একবার লিখেছিলেন, In English you can as well write the word “fish’ as GHOTI; take the pronunciation of ‘gh’ from ‘cough’, ‘o’ from the word ‘women’ and ‘ti’ from the word ‘nation’” কিন্তু তারপরেও সেই বর্ণমালাই ভারতীয় ভাষাগুলোর জন্যে ব্যবহার করবার পরামর্শ দিতে চান জর্জ কাম্বলে। কেন ? কারণটি একেবারেই স্পষ্ট । ভাষাগুলোর প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই, “ যতদিন ভাষার রূপ শুদ্ধ থাকে, ততদিন তাহাদিগকে নিজ নিজ বর্ণমালা দ্বারা প্রকাশ করা উচিত, কিন্তু এক্ষণে ভারতবর্ষে যে সকল ভাষা প্রচলিত, তাহাদের মধ্যে একটিরও রূপ বিশুদ্ধ নাই। এখনকার বাঙ্গালা ভাষায় শতকরা ৫টা হিন্দি, দশটা ঊর্দ্দূ এবং পঞ্চাশটা ইংরেজি কথা ব্যবহৃত হয়; হিন্দি, ঊর্দ্দূ প্রভৃতি অপরাপর ভাষারও এইরূপ খিচুড়ী হইয়াছেএরূপ স্থলে ইহাদের সকলের নিমিত্ত একটী রোমান বর্ণমালা ব্যবহার করা অনুচিত নহে।( পৃঃ ৬১৩;ঐ)
           নামোল্লেখ না করে আরো এক সাহেবের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে এরকম , “...এক্ষণে সামান্য কেরাণী বাবুর স্ত্রী তাঁহার স্বামীকে বলেন, “এখন কি অফিস যাবার টাইম হয় নি?” ইহাতে অনুমান হইতেছে যে যেরূপ আঙ্গলোসাকসন (Anglo-Saxon) ভাষা নরম্যান (Norman ) ভাষার সহিত মিলিত হইয়া ইংরেজি ভাষায় পরিণত হইয়াছে , ক্রমশঃ এদেশী ভাষা সকলের পরিণামও সেইরূপ হইবে। এমন স্থলে রোমান বর্ণমালা ব্যবহারের যে উৎকৃষ্ট ফল, তাহা বলা বাহুল্য।এতো স্পষ্ট ইংরেজি উগ্রজাতীয়তাবাদ এবং আগ্রাসন ধান্ধা । শেষপর্যন্ত উৎকৃষ্ট ফলটি হলো সমস্ত ভারতীয় ভাষার অস্তিত্ব বিলোপ, যেমনটি তারা করতে সফল হয়েছিল আমেরিকা অষ্ট্রেলিয়ায়। এক ব্যক্তিতো আরো এগিয়ে গেছেন। স্পষ্টই স্বপ্ন দেখছেন যে এদেশে বিলেতি শাসন পাকা হচ্ছে, এবং আমাদের উচিত রাজার ভাষা এবং হরফ অনুরসরণ করে সেই শাসনের অনুগত হওয়া, “ যাঁহারা রোমান বর্ণমালা ব্যবহারের প্রতিবাদ করেন, তাঁহাদের যুক্তিসকল সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। তাঁহারা বলেন, সপ্ততি বা ততোধিক বর্ণমালার পরিবর্ত্তে একটি পঠনোপযোগী বর্ণমালা সংস্থাপন করা সম্ভাবিত নহে। কিন্তু এতাদৃশ বর্ণমালার অভাবে তাঁহারা অনেকস্থলে ইংরেজির ব্যবহার করেন, যাহার তাৎপর্য্য সুস্পষ্ট অক্ষরে লিখিত দেশী ভাষায় প্রকাশ করিলে নিঃসন্দেহে অনেক উপযোগী হইত। প্রতিবাদীরা বলেন, কতকগুলি ইউরোপীয়দিগের সুবিধার নিমিত্ত ভারতবর্ষের চিরসমাদৃত বর্ণমালাস্থলে রোমান বর্ণমালার ব্যবহার উচিত নহে। সত্য,...এ পর্যন্ত তিনি যুক্তিতে টিকছেন না । নিজেই লিখছেন দেশী ভাষায় প্রকাশ করিলে...উপযোগী হইত।কিন্তু এর পরেই সেই মোক্ষম যুক্তি, “... বিবেচনা কর ইউরোপীয়েরা যখন ভারতবর্ষ শাসন করিতেছেন, তখন তাঁহাদের যে অত্রত্য প্রচলিত এবং অপ্রচলিত ভাষা সমূহে ব্যুৎপত্তি লাভ করা উচিত, এ বিষয়ে বোধহয় কাহারও দ্বিধা নাই। এবং এই প্রতিজ্ঞা সিদ্ধ হইলে ইহার অনুমান স্বরূপ ইহাও স্থির বুঝিতে হইবে যে, যাহাতে ইউরোপীয়গণ সহজে ভারতবর্ষীয় ভাষা সকল অভ্যাস করিতে পারেন, প্রত্যেক হিতৈষী ব্যক্তির তাদৃশ উপায় উদ্ভাবন করা উচিত।শুধু ভাষাই নয়, ভারতীয় ধর্মসংস্কৃতির প্রতি প্রবল ঘৃণা থেকেও যে এমন অদ্ভূৎ প্রস্তাব এসছিল তাও গোপন ছিল না। এক সাহেব লিখছেন, “ আমরা ফারসী তুর্কী প্রভৃতি যে সকল মুসলমান রাজ্যের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করি, সেই সকল স্থানের লোকদিগকে অসভ্য, অশিক্ষিত, নিরুৎসাহী, দুর্ব্বল এবং ধর্মনীতিশূন্য দেখিতে পাই। অর্থাৎ খৃষ্টানদিগের সহিত তুলনা করিলে মুসলমানেরা অনেক হীন বলিয়া বোধ হয়। খৃষ্টানদিগের মধ্যে যে এতাদৃশ সভ্যতাদির উন্নতি হইয়াছে ইহার কারণ কেবল মুদ্রাযন্ত্র যে পর্যন্ত মুসলমানদিগের মধ্যে মুদ্রাযন্ত্র প্রচলিত না হইবে, ততদিন তাহাদের উন্নতিও হইবে না; আর রোমান অক্ষরের ব্যবহার ব্যতীত মুদ্রাযন্ত্রের প্রচলিত হওয়া না হওয়া তুল্য।বাংলাতে এদের প্রচার তেমন আমল না পেলেও পাঞ্জাবে বুঝি তা ‘‘ ...দুর্ভিক্ষ বা এপিডেমিকের ন্যায় দেখিতে দেখিতে দেশময় বিস্তৃত হইয়া পড়ে।(পৃঃ৬১৪, অজ্ঞাতনাম) আর সত্যি তাই, ‘রোমান ঊর্দুনামের সেই সভাটির অস্তিত্ব আজ এই একুশ শতকেও রয়েছে বহাল তবিয়তে। এবং দিনে দিনে এর স্বাস্থ্য বাড়ছে বই কমছে না ।
           তাই প্রতিবাদটাও পাঞ্জাবেই ব্যাপক হয়েছিল। লাহোর গভর্ণমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ ড লাইটনার এবং আরো দুএকজন ইংরেজই এর বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। কিছু উর্দু লেখকও ছিলেন প্রতিবাদকারীদের মধ্যে কিন্তু আপাতত আমরা তাঁদের কথা তুলব না । কারণ সেখানে উর্দু ভাষা প্রসঙ্গ টেনে লেখাকে দীর্ঘ করে যেতে হবে, নতুবা কিছু বোঝানো যাবে না। লাইটনার মোটেও মানেন নি যে ভারতীয় বর্ণমালার থেকে রোমান বর্ণমালা শেখা এবং পড়া খুব সহজ হবে । তিনি বিলেতিদের ফরাসী সহ অন্যান্য ভাষা শিক্ষার প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তুলেছেন, “ কয়জন ইংরেজ রীতিমত শিক্ষকের নিকট অধ্যয়ন না করিয়া কেবল পুস্তক পাঠ করিয়া সেই সকল ভাষার বুৎপত্তি লাভ করিয়াছেন?” সুতরাং অধ্যাপক ড্রুর সৌলভ্যের যুক্তি ধোপে টেকে না, একদিককার সাশ্রয় অন্যদিকে চলে যাবে। ভারতীয় ভাষা এবং বর্ণমালার প্রতি ভারতীয়দের ভালোবাসার জন্যেও তারা তা ছাড়তে রাজি হবেন না, আর তিনি নিজেও মনে করেন,দেশীয় লোকেরা স্বদেশ প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতিকে অনেক উৎকৃষ্ট বোধ করেন, বাস্তবিকও তাহা উৎকৃষ্ট।তাঁর মতে রোমান হরফে ভারতীয় ভাষাগুলোকে প্রকাশ করা যাবে না । যদি যেতেই হয় তবে নতুন কতকগুলো বিশেষ সংকেত সংযোগকরতে হবে । আর তা করলে সেই বর্ণমালা আর পরিচিত রোমান বর্ণমালা থাকবে না । রোমান হরফে এমন কি ইংরেজি পড়াটাও খুব সহজ নয়। বহুকালের অভ্যাসের ফলেই শুধু ইংরেজরা নিজেদের ভাষা শুদ্ধ করে পড়তে পারেন। নতুবা light কে তারা নির্ঘাৎ লাইঘটপড়তেন। যে অভ্যেসের ফলে তারা লাইটপড়েন, “ সেইরূপ অভ্যাস করিলে তাঁহারা সিকস্তা পাঠ করিতেও সমর্থ হইবেন।দেশীয়রা রোমান হরফে শুধু একটাই কারণে আগ্রহ দেখাতে পারে বলে তিনি মনে করেন, “ইহাদ্বারা ইংরেজী লেখা সহজ হইয়া যাইবেআর ইংরেজী শিখলে কেরানি হওয়া সহজ হয়ে যায়, “কেননা দেশীলোকেরা কেবল চাকরী পাইবার প্রত্যাশায় স্কুলে বা কলেজে শিখিতে প্রবিষ্ট হয়।কিন্তু তিনি আবার মনে করেন তখনি কেরানির সংখ্যা এতো বেড়ে গেছে যে সাত আট টাকা মাইনেতে ভালো কেরানি পাওয়া যায়, এদের সংখ্যা আরো বাড়ানো মানে শুধু শুধু এই শিক্ষিতদের অসন্তোষ ডেকে আনা। তার মানে আমরা যেটুকু বুঝেছি , তারা লেখাপড়াতো শিখবেন কিন্তু চাকরি পাবেন না। বিলেতিদের ভারতীয় ভাষা শেখা দরকার। তাই বলে পুরো শিক্ষানীতিটাকেই তাদের অনুকুলে ঢেলে সাজানোটা কাঙ্খিত হতে পারে না । দেশের পরাধীনতার মানেটাও তিনি বুঝতেন। প্রশাসক যেমন ইচ্ছে আইন করতে পারেন, “এখানকার লোক নির্বাক। রাজপ্রদর্শিত শিক্ষা পদ্ধতি সম্পূর্ণ অনুপযোগী হইলেও ইহারা তাহার প্রতিকূল একটী কথা কহিতে পারে না ।সাহেবের ইচ্ছেতে এদেশের হরফ পাল্টাবার প্রস্তাবের সঙ্গের ক্ষমতার রাজনীতিটাকে এই অধ্যাপক অত্যন্ত সহজ এক উদাহরণ দিয়ে তুলে ধরেছিলেন। কিছু ব্রিটিশ আমলা ঠিক করলেন যে আগে দেশীয় শব্দগুলো রোমান হরফে লিখবার সময় যেখানে যেখানে u’ ব্যবহার করা হতো তা ভুল ছিল, হওয়া উচিত ছিল a’ ব্যস, আর যায় কোথায়! সর্বত্র u’ হটিয়ে a’র প্রয়োগ শুরু হলে । ফলে Mussulman হয়ে দাঁড়ালো Massalman! লাইটনার অবশ্যি একা ছিলেন না, তখনই তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে কলম ধরেছিলেন আরো বেশ কিছু সাহেব বিদ্বজ্জন। এদের মধ্যে ছিলেন রেভারেণ্ড জেমস লঙ, ডফ, পার্সন ইত্যাদি। এদের মধ্যে প্রথম দুজন জীবনের প্রথমটা দীর্ঘদিন রোমান হরফে বাংলা সহ ভারতীয় ভাষাতে কাজ করে করে হতাশ হয়ে নিজেদের মত পাল্টেছিলেন।
          সেই প্রয়াস ওখানে থেমে গেলে ভাববার কিছু ছিলনা। আমাদের যেটি অবাক করে তা, এই যে স্বয়ং ভাষাচার্য সুনীতি চট্টোপাধ্যায় মতো ব্যক্তিত্বও যখন ভাষাতত্বের বাইরে গিয়ে শ্রেণিরাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন তখন এই রোমান হরফের প্রেমে পড়েছিলেন। প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন তিনি তাঁর প্রথম ইংরেজিতে লেখা গবেষণা গ্রন্থ অডিবিএল-এ, তখন অব্দি তাঁর বাংলা লেখালেখির সংখ্যা ছিলনা খুব একটা বেশি। তাঁর যুক্তিটির পেছনেও প্রথম কারণটি ছিল তাঁর জানা একটি সত্য যে বাংলা লিপি আর বাংলা ভাষা এক নয়। আমরা আগেই লিখেছি, পঞ্চানন কর্মকারের আগেও কোনোদিন এক লিপিতে বাংলা লেখা হয় নি। তিনি লিখেছেন, The use of these various characters is a relic of the past, and the prestige of the native alphabet of Bengali has never been seriously assailed. The language has become intimately associated with it, and Bengali speakers, like people everywhere, consider the alphabet as part of their language.” (page 235; ODBL; Rupa & Co;1993) তাঁর প্রস্তাবের দ্বিতীয় কারণটিই ছিল যেমন সমস্ত মধ্যবিত্ত ভেবে থাকেন, While admitting and appreciating all the arguments in favour of the Indian system of writing, I remain a believer in the Roman Script for all Indian Languages, because of the simplicity of the symbols of which is consists, because of its true alphabetical nature is not subordinating the vowels, because of its manifold advantages in teaching, and in printing, and because of its wide use in the civilized world. The Roman alphabet, modified, supplemented and arranged according to the scientific scheme of the Indian one, would be a desideratum for India.” (ঐ) শুরুতে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে রোমান হরফ বৈজ্ঞানিক এবং বিদ্যায়তনিক ব্যবহারের জন্যে থাকবে। অন্তত পরের পঞ্চাশ বছর যে থাকবে এ নিয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। তারপরেও যদি একে ছাড়তেই হয়, তবে, I would strongly advocate the unity of our country in the matter of script through that truly national script of all India—The Deva-nagari, as the next best thing.” (ঐ) এই দেবনাগরীর প্রস্তাব থেকে বোঝা যায় , তিনি গোটা দেশের জাতীয় ঐক্য নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেনএমন চিন্তাতে তিনি একক ছিলেন। হিন্দিকে যারা রাষ্ট্রভাষা করবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন সুনীতি চট্টোপাধ্যায় তাঁদের অন্যতম ছিলেন।যদিও স্বাধীনতার পর তাঁর সেই হিন্দি মোহতে ভাটা পড়ে, হিন্দি উগ্রজাতীয়তাবাদ তাঁকে আশাহত করে ফেলে। বাংলা ভাষা নিয়ে উপমহাদেশে সবচেবেশি রাজনীতি হয়েছে যে দেশে সেই বাংলাদেশের ভাষাবিদ অধ্যাপক মোফাজ্জ্বল হায়দার চৌধুরী লিখেছেন, “ মনে রাখা দরকার যে , ভাষা বা বানান সংস্কার এ সব প্রশ্নে উত্তেজনাকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। এগুলি রাজনৈতিক বিষয় নয়ভাষা বিজ্ঞানের ও কিছুটা সামাজিক অর্থনৈতিক (Sociao-economic) সমস্যা।তখন সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের মতো ভারতীয় ভাষাতত্বের আদিগুরু কেন এই ফাঁদে জড়ালেন ভাবলে আমাদের অবাক হতেই হয়। অথচ তিনি ছিলেন ১৯০৩এ রবীন্দ্রনাথ , রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদআন্দোলনের এক অত্যুজ্ব্বল পরিণাম। যে আন্দোলনের মূল প্রয়াসই ছিল ইংরেজি এবং মূলত সংস্কৃতের দাসত্ব থেকে বাংলাকে মুক্ত এবং স্বাধীন ভাষা হিসেবে দাঁড় করানো। ছাপার সমস্যার উল্লেখ সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ও লিখছেন, কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি যখন লেখেন, because of its manifold advantages in ... the civilized world” তখন বোঝা যায় তিনি সেই তাঁর মধ্যবিত্ত শ্রেণি মোহ থেকে কথাগুলো লিখছেন। অন্যথা তিনি দরকারে বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের প্রস্তাব দিতেন, যেটি তিনি পরে দিয়েও ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বইপত্তর ছাপতে গিয়ে। কারণ যেকোনো লেখার পাঠোদ্ধার এবং , ছাপা যন্ত্রে যেকোনো ভাষার হরফ সজ্জা চিরদিনই একটা সমস্যা ছিল। ইংরেজিতেও। লাইটনার এবং বার্নার্ডশর দেয়া নজির থেকে আমরা তা আগে দেখিয়েওছি ।
          সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের পরামর্শ ভারতে সর্বত্র সরকারি ভাবে গৃহীত হয় নি। বাংলা, হিন্দির মতো বড়ো বড়ো ভাষাতে না হবার বাস্তব কারণ আমরা অনুমান করতে পারি। কিন্তু বহু ছোটছোট, বিশেষ করে জনজাতিদের ভাষাতে তা অনুসৃত হতে আমরা আজো দেখছি হামেশাই। পাঞ্জাবিতে যেমন গুরুমুখি, দেবনাগরি, নাস্তালিক তিনটি লিপিই ব্যবহৃত হয়, তেমনি কোঙ্কনিতেও কণ্ণড়, দেবনাগরির সঙ্গে রোমান লিপিও ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশভাগের পর বাংলাদেশে কিন্তু কেবল ঐ উর্দুর বিরুদ্ধেই লড়তে হয় নি । বাংলাকে উর্দুর মতো পার্শি বা নাস্তালিক লিপিতে লিখবার প্রস্তাবতো ছিলই, সেরকম অভ্যেসও ছিল কারো কারো কয়েক শতাব্দীর কিন্তু নতুন ছিল রোমান লিপিতে লিখবার প্রস্তাব। ১৯৫৭তে আয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেই পাকিস্তানের সমস্ত ভাষার জন্যে রোমান লিপির ফরমান জারি করেন । তিনি যে শিক্ষা কমিশন বসিয়েছিলেন তারা ১৯৫৯এ জমা দেয়া তাদের প্রতিবেদনেও তার সমর্থণ যুগিয়েছিল। দুই ড কুদরৎ-ই খোদা এবং অধ্যক্ষ সুফিয়ানের মতো দুই একজন বাঙালি ভাষাবিদও সেই প্রস্তাবে সমর্থণ যুগিয়েছিলেন। আয়ুব খানের উদ্দেশ্য ছিল গায়ের জোরে পাকিস্তানের জাতীয় ঐক্যরক্ষা করা । কিন্তু ভাষাতাত্বিকদের তরফে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হয় ফেরদাউস খান তার একটা তালিকা ধরে আলোচনা করেছিলেন। সেগুলো ছিল এরকম। কিন্তু শুরুতে বলে নিই এর প্রথমটি শুনে আবেগিক হবার কিছু নেই। এটি মিথ্যেও নয় , আর সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ও সে জন্যেই এটিকে ধরে রাখবার পক্ষে খুব একটা প্রবল যুক্তি পান নি। ১) বাংলা আমাদের জাতীয় লিপি নয়। ২) বর্তমান বাংলা হরফের অনেক দোষ ত্রুটি রয়েছে; যেমন অতিরিক্ত অক্ষর সংখ্যা, দীর্ঘস্বর, তিন , দুই , দুই , দুই , যুক্তাক্ষর ইত্যাদি। এই হরফ সমূদ্রের মধ্যে শিশুর উৎসাহ তলিয়ে যায়। ৩) রোমান হরফে অক্ষর-সংখ্যা কম হবে এবং নতুন শিক্ষার্থীর পক্ষে সহজ হবে। এতে অতি অল্প সময়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণ সম্ভব হবে । রোমান গ্রহণের ফলে তুরষ্কে নব জাগরণ দেখা দিয়েছিল। ৪) টাইপ রাইটিঙে সুবিধে হবে। ৫) রোমান হরফে লিখন-দ্রুতি ও পঠন- দ্রুতি বাংলার চেয়ে বেশী। ৬) আমাদের পক্ষে ইংরেজী শেখা সহজ হবে। ৭) বিদেশীদের পক্ষে বাংলা শেখা সহজ হবে। ( পৃঃ ৬৯৪,হরফ সমস্যা, ফেরদাউস খান,বাংলা ভাষা ১ম খন্ড, সম্পাঃ হুমায়ুন আজাদ।)
          এই প্রতিটি যুক্তিকে এই লেখক বিস্তৃত নজির দিয়ে দিয়ে খণ্ডন করেছেন। সে বিবরণ অন্যত্র দেয়া যাবে । আপাতত আমরা যা লিখতে চাই, প্রথমে অবিভক্ত বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের উত্থান, পরে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন এবং ৭১এর মুক্তি যুদ্ধের পরে ভাবা গেছিল যে সেই উৎপাত দমে গেল বোধহয়। বাংলা ভাষা, লিপি, বর্ণমালা, এবং বানানে একটা স্থৈর্য এবং ধৈর্য এলো বোধহয়। কিন্তু শতাব্দীর শেষে বিশ্বায়ন আর সেই সঙ্গে কম্পিউটার এসে সেই শোয়ানো ভূতকে আবার জাগিয়ে দিল। বিশেষ করে ভারতে । বাংলাদেশে বোধহয় মাত্র দুই দশকের স্বাধীনতার আবেগকে দাবিয়ে দেয়া সম্ভব ছিলনা নব্বুই দশকের বিশ্বায়েনের তাই সেদেশেই বাংলার ব্যবহারে অনাগ্রহী লোকের কথা তেমন জানি নে । যোগাযোগতো আছে প্রচুর। ‘অভ্রের মতো ব্যবহার বান্ধব কীবোর্ডও সেদেশেই তৈরি। এমন সুন্দর একটিও নেই ভারতে, কোনো ভাষাতেই। সমস্যাটা বোধকরি ভারতেই প্রবল,বিশেষ করে আমাদের এই পূর্বোত্তরে। কম্পিউটার ব্যক্তির ঘরের ভেতর, উরুর উপর থাকে বলেইতো আর সে মুদ্রণ যন্ত্রের মতো বিচ্ছিন্ন নয়; তারে/বেতারে সে সংযুক্ত হয়ে আছে বিশ্বের অগণন সহযন্ত্রের সঙ্গে। সেই সংযুক্তিরই নাম ইন্টারনেট বা আন্তর্জাল। সেখানেও আজ বাংলা কেন, পৃথিবীর প্রায় সব ভাষা লেখা এবং পড়াই যায়। সেগুলো আজ বাঙালি হয়েই গেছে, দিনে দিনে আরো হবে। তা এমন যে পুরোনো ছাপাবই/ পত্রিকার যুগকেও সে ছাড়িয়ে যাচ্ছে আর যাবে অকল্পনীয় দ্রুতিতে। বহু হারিয়ে যেতে বসা ভাষা সরব হয়ে উঠেছে কম্পিউটারে, নেটে, মোবাইলে। আমাদের গভীর বিশ্বাস, সেই দিন দূরে নেই যখন কম্পিঊটারের জন্যেই ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোর ভেতরে বাতি জ্বলবে আবার।

bhaarat ki pragatike liye roman lipi!” এবং ভারতের বিড়ম্বনা !

          মজা হলো, যারা কৌতুহল নিয়ে সেই সংবাদ রাখেন না, রাখলেও অভ্যেসটা করেন না, লেখেন রোমানে বাংলা, পড়েন রোমানে বাংলা বা ইংরেজি, সেরকম চিন্তাবিদ-শিক্ষাবিদেরাই ভাষণ দিয়ে বেড়ান , “গেল! বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতিকে খেলো কম্পিউটার! তারা যে কোনো প্রগতিশীল নতুন প্রজন্ম নন,আড়াইশ বছরের রক্ষণশীলতার ধারাবাহিক ঐতিহ্যকেই বহন করে চলেছেন, আশা করছি , এ পর্যন্ত এসে আমরা সেই মতটি দাঁড় করাতে পেরেছি। সেই আদ্দিকালের গুটেনবার্গীয় ছাপা যন্ত্রের যুগে , গেল শতকের টাইপ রাইটার মেশিনের যুগে তাদের পূর্বসুসী রক্ষণশীলেরা ছিলেন প্রবলভাবে সক্রিয়। ভাষা এবং লিপির পথ রেখেছিলেন তারা আটকে । শুধু কি তাই! কম্পিউটারের দৌলতে সাংস্কৃতিক অধঃপতনেও তাঁরা খুব খুব চিন্তিত। তাঁরা কি জানেন তাদের দ্বিশতাব্দী আগের পূর্বপুরুষেরা সেই একই অধঃপতনের ভয়ে ছাপা বই ছুঁয়েও দেখতেন না। ভাবতেন এতে তাদের জাত যাবে! কোথাকার জলে, কোন জাতের লোক ছাপার কালি তৈরি করেছে কে জানে! তাই বহু বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদে বেচারা জাত না মানা বেয়াড়া প্রকাশককে লিখে দিতে হতো, “ আমাদের মূদ্রণালয়ের কালি গঙ্গাজলে শুদ্ধ করিয়া লওয়া হইয়াছে! বই পড়লে যে জাত যায়, সেই কথাটা ম্ভবত তাঁরা ভাঙা ইংরেজিতেও বলতেন। কারণ সেখানে ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার ছিলনা অথচ বিলেতিদের প্রিয় হবার সুযোগ ছিল অপার, অঢেল।
     
      ভাষাকে বিপন্ন করছে কম্পিউটার নয়, নেটও নয় । করছে ব্যবহারকারীদের রক্ষণশীল অভিজাত্যবোধ । অনেক সময় তাঁরা নিজেরাও জানেন না কোন পথে বিপদ ডেকে আনতে পারেন তাঁরা । সেই উনিশ শতকের রোমান উর্দুদল এখনো রয়েছেন। সমগ্র আরব বিশ্ব তথা মধ্যএশিয়া এখন নেটে তাদের লিপি ব্যবহার করেন। মিশরের বিপ্লবীরা তাদের বিপ্লবের বার্তা পাঠান আরবি লিপিতে । মিশরের ৬ এপ্রিল আন্দোলনের ফেসবুক গ্রুপ যে কেউ খুলে দেখতে পারেন। অথচ ভারতীয় উপমহাদেশের রোমান উর্দুদের এই অবিশ্বাস যায় না যে, আরবি-পার্সি তথা নাস্তালিক লিপিতে আজ আর কোনো কাজ করা যায়। "Roman Urdu is strongly opposed by the traditional Arabic script lovers. Despite this opposition it is still used by most on the internet and computers due to limitations of most technologies as they do not have the Urdu script. Although, this script is under development and thus the net users are using the Roman script in their own ways. Popular websites like Jang Group have devised their own schemes for Roman Urdu. This is of great advantage for those who are not able to read the Arabic script. MSN, Yahoo and some desi-chat-rooms are working as laboratories for the evolving new script and language (Roman Urdu)."এই বক্তব্য পাকিস্তানের উর্দু চিন্তাবিদ এবং সাংবাদিক হাবিব সুলেমানির (http://en.wikipedia.org/wiki/Roman_Urdu) এক্কেবারেই তরল যুক্তি। আসল কথা হলো এদের সঙ্গে এখন জড়িয়ে গেছে খৃষ্টীয় ধর্মীয় আবেগ। ভারতেও ১৯৮৪ থেকে মুম্বাইতে কাজ করে যাচ্ছে রোমান লিপি পরিষদ(http://www.mngogate.com/e04.htm) মধুকর এন গোগাতে এর প্রতিষ্ঠাতা। যুক্তিগুলো নতুন কিছু নয়, স্লোগান আছে bhaarat ki pragatike liye roman lipi!’ এই স্লোগানটাই আমরা শুরুতে লিখতে গিয়ে ভুল করে ফেলেছিলাম। লিখেছিলাম progoti’;ভারত লিখতে গিয়ে লিখে ফেলেছিলাম,bharat’--যেমন লিখতে অভ্যস্ত আরকি। পরে দেখি যে না, তাতে আরো একটা a’ বসবে। নইলে ভারতের সমূহ বিড়ম্বনা! ওমন বিড়ম্বিত ভারতের বিড়ম্বিত সংগঠনের সদস্য হয়তো বেশি নেই, কিন্তু অনুগত শিষ্য যে রয়েছেন প্রচুর সংখ্যাতে এবং মার্কিনি দয়াতে তারা দিনে দিনে বাড়ছেন, সেটিতো নিশ্চিত। ভাষার বিপদ তাদের হাতেই। তাদের দীক্ষান্তর ঘটিয়ে দিতে যদি এই লেখা সামান্যও সফল হয় তবেই আমাদের শ্রম সার্থক। শুনেছি সাঁইবাবা দীক্ষা দেবার আগে শূন্য থেকে ফুল বেলপাতা কী সব কীসব নিয়ে আসতেন। তাতে তাঁর উপর আস্থা বাড়ত। আমরা সেরকম কিছু পারব না । তবু নেটে বিশুদ্ধ বাংলা হরফে , বাংলা ভাষাতে লেখা যায় বলে অবিশ্বাস যদি যেতেই না চায়, তবে ঘুরে আসতে পারেন আমার ব্লগঃ http://ishankonerkotha.blohspot.com. এই লেখা সেখানেও পেয়ে যাবেন।