আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Showing posts with label Kebal Aboruddho Hoy Amader Poth. Show all posts
Showing posts with label Kebal Aboruddho Hoy Amader Poth. Show all posts

Tuesday, 21 April 2009

কেবল অবরুদ্ধ হয় আমাদের মতো ‘আমআদমির’ পথ


                                                                                                       
গেল জুলাই মাসের শেষের দিকে এক শুক্রবার সকালে মার্ঘেরিটা কলেজের অধ্যাপক দেব বরার সঙ্গে তিনসুকিয়া থেকে আসাম ট্রাঙ্ক রোড ধরে  মার্ঘেরিটা যাচ্ছিলাম তাঁরই গাড়িতে  করে  যারা এ পথে গেছেন তারা জানেন যে মাকুম পেরিয়ে অল্প এগুলে প্রায় সতের কিলোমিটার আর ডানে বাঁয়ে তাকাতে হয় না  লোকে বলেএটি বুঝি এশিয়ার ভেতরে সবচেয়ে দীর্ঘ সোজা পথ  হতেও পারে, নাও হতে পারে  আমাদের এই পোড়া দেশে সামান্য একটা সুযোগ পেলেই লোকে এমন গৌরব করে  কিন্তু পথটা যে দীর্ঘ এবং সচরাচর এমন চোখে পড়ে না, অসমেতো নয়ই --এ নিয়ে সন্দেহ করে লাভ নেই 
গ্রীষ্মের সকাল, হাল্কা মেঘও ছিল  ভ্রমণ বেশ সুখেরই ছিল  আমাদের যদি কোনো অসুখের কারণ ছিল তবে সে স্বয়ং ভ্রমণের কারণটাই  মার্ঘেরিটা কলেজেরকিছু আভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে সাত সকালে গিয়ে সে কলেজের পরিচালন সামিতির সভাপতি শক্তি মন্ত্রী শ্রী প্রদ্যুত বরদলৈকে  ধরতে হয়  ডুমডুমা থেকে এসেমাকুমে আমাদের জেলা শিক্ষক সংস্থার এক সহকর্মী যোগ দিয়েছেন  ডিগবয় থেকে যোগ দেবেন আরো একজন  তারপর চারজনে মিলে গিয়ে সভাপতিকে ধরব,এরকমই কথা  অতএব আমাদের কিছু উদ্বেগও ছিল, তাড়াও   ছিল  গাড়ি খুব জোরে চলছিল  সকাল বেলার খালি পথ  তার উপর ঐ যে লিখলাম --দীর্ঘসোজা পথ  সুতরাং জোরে গাড়ি চালাবার কোন অসুবিধে ছিল না
কিন্তু হঠাৎই গাড়িখানা জোর শব্দ করে কেঁপে উঠল টাল সামাল দেয়া মুস্কিল হচ্ছিল চোখ ফেলতেই দেখা গেলো মসৃণ পাকা পথের মাঝে মাঝেই বড় বড় গর্ত যেন কেউ  হঠাৎই মাঝখান থেকে টুকরো তুলে নিয়ে গেছে তাকিয়ে দেখি সামনে যত দূর চোখ যায় এমন অজস্র গর্ত রয়েছে অধ্যাপক বরাকে আমরা অন্য দুই যাত্রী বললাম বটে একটু দেখে পথ চলতে, কিন্তু আমি নিজে বেশ অবাক হলাম কেননা, জেলার কলেজগুলোর কাজে এ পথে আমি আরো অনেক এসছি বছরে চার পাঁচবার এ পথে আমাকে আসতেই হয় এর আগে এত গর্ত এ পথে দেখিনি   গেল দশ বছরে এ পথে কোনো মেরামতির শ্রমিককে দেখিনিদেখার প্রয়োজন আছে বলেও মনে হয় নি   গেল কমাসে এ অবনতি কী করে হল, আমার মাথাতে ঢুকলো না দেব বরাও কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারলেন না বললেন, পুরণা হলতো গাড়িওতো কম নচলে !
তার ঠিক দুদিন পরের রোববার  সকালে আমি আবার শিলচরের বাড়ি যাবো বলে তিনসুকিয়া থেকে বাসে চেপেছি বছর দেড়েক যাই নি বাড়ি থেকে ছোট ভাইয়ের জরুরি তলব, একবার দিন দুইএর জন্যেও যেতে হবে সাধারণতঃ আমি ট্রেনেই যাই একা গেলেও , আর সপরিবারে গেলেতো কথাই নেই কিন্তু মাস কয় আগে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় পাহাড় লাইনে উগ্রপন্থীর গুলিতে এক ট্রেন ড্রাইভার এবং কিছু নির্মাণ শ্রমিক মারা যাওয়াতে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে এই খুলবে , ওই খুলবে করছে কিন্তু ঠিক কবে খুলবে কেউ জানে না ট্রেনে গুয়াহাটি অব্দিও যাওয়া যেত, কিন্তু সে রয়েছে বিকেলে রোববারটার সদ্ব্যবহার করতে না পারলে সামান্য ছুটিতে কুলোবে না সুতরাং বাসে যাওয়াই ঠিক হলো একা পুরুষ মানুষ, অসুবিধে হবার কথা নয়
          কিন্তু গ্রীষ্মের দিনের বাসে গুয়াহাটি যাত্রার আগের এক এক ভয়ানক অভিজ্ঞতা আমার   রয়েছে মনে হয় বুঝি বা আগুনের চুল্লিতে বসে যাচ্ছি তাই জীবনে প্রথমবার ঠিক করলাম, নাক চোখ বন্ধ ভলবো বাসেই গুয়াহাটি অব্দি যাবো অন্ততঃ আগুন থেকে গাটা বাঁচানো যাবে বাকি পথটা রাতে পার করব , তাই যা হোক একটা কিছু পেলেও চলবে    শুনেছিলাম ভলবো খুব জোরে চলে এবং ভালো চলে অতএব তাড়াতাড়ি গুয়াহাটি পৌঁছে শিলচরের পথে ভাল গাড়িতে ভাল আসন পাওয়া যাবে এই আশাতে একেবারে পেছনের সিটে বসেই গুয়াহাটি যাত্রা করা গেল সাড়ে আটটার গাড়ি সাড়ে নটায় ছাড়ল তবুও যেহেতু এ গাড়ি জোরে চলে বলে শুনেছি সুতরাং এই আশাতে বুক বাঁধলাম   যে  নিশ্চয় সন্ধ্যের আগে গিয়ে পৌঁছুবে   কিন্তু বাবুর যত বড় নাম তত বড় চাল এক আধটু গিয়েই নানা বাহানা ধরে থেমে যেতে শুরু করল   কাজিরঙা পার কারে নগাঁওতে ঢুকে বেশ ভালই বাহানা পাওয়া গেল জাতীয় মহাসড়কের কাজ হচ্ছে তাই রাস্তা ভাঙা এবং এবড়ো থেবড়ো গাড়ি তখন সত্যি কাজিরাঙার হাতির চালে চলতে শুরু করল গরম কালের সন্ধ্যে হয়ে এলো, গাড়ি তখনো নগাঁও ছাড়েনি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির ভেতরেও আমার তখন ভ্যাপসা এক গরমে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা গেল দশ বছরে সাধারণ বাসে করে এর থেকে শতগুণ ভাল যাত্রা কারে বহুবার এপথে যাতায়াত করেছি পথের কাজের ধরণ দেখে কেবল এই সুখে সব সহ্য করে গেলাম যে এই পথ তৈরি হয়ে গেলে শিলচর অব্দি যাবে , তখন বেশ প্রাণের সুখে পায়ের উপর পা তুলে বাপের বাড়ি যাওয়া যাবে ( ছেলেরা বুঝি বাপের বাড়ি যায় না ? ওসব সেকেলে কথা ক্লিসে কথা একুশ শতকের ছেলেরা কেউ বাপের বাড়িতে বাস করতে পায় না )    
রাত আটটাতে যখন গুয়াহাটি পৌছুনো গেল , তখন শিলচরের একটাও ভালো-মন্দ কোনো গাড়ি নেই করিমগঞ্জ হাইলাকান্দিরো নেই একটা, কোনো ভাগ্যের বলে, আগরতলা যাবার গাড়ি আছে তার শেষ কোণে  একটা আসন খালি আছে যারা এমন অবস্থাতে পড়েন তারা জানেন যে তখন আর খবর নিয়ে দেখার মন মানসিকতা থাকে নাখবর নিলে হয়তো দেখা যেত অন্য কোথাও আরো ভালো গাড়ির ভাল আসনও রয়েছে , কিন্তু না থাকলে এও যেতে পারে হাতের থেকে অগত্যা . . . .
ভাগ্যিস, এর চাল ভাল ছিলো আগরতলা যাবার তাড়াতেই বোধহয় সে ভোর রাতেই কাছাড় সীমান্তে ঢুকে গেল পেছনের আসনে বসেও সুখস্বপ্নে আমার তেমন কোনো ব্যঘ্যাত ঘটেছিল বলে মনে পড়ে না   কাছাড় সীমান্ত জোর ধাক্কা দিয়ে সে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিল রাতাছড়ার পাহাড় থেকে নেমেই ভাঙা রাস্তা, ভাঙা সেতু মেরামতির কাজ চলছে কালাইন পার করেও একই দশা আর আগরতলার গাড়ি বদরপুর ঘাটের যে জায়গাটাতে আমাকে নামিয়ে দিল , সেতো নরক কুণ্ড ধানের মাঠও এর থেকে মসৃণ থাকে কপালে পেছনের আসন এবারেও লেখা ছিলএকটা জীপ গাড়ি পাওয়া গেল, তাতেকোনো এক বিখ্যাত ময়রার দোকানের ( নামোল্লেখ করে বেচারাকে নাহয় বিপদে নাই ফললাম, গরীব মানুষ ) মিষ্টি নিয়ে আসছিল সামনে আরো যাত্রী ছিল, আমাকে পেছনে ঠেসে দিল
একের পর এক ভাঙা বাঁক আর ভাঙা সেতু মায়,   ঐ সেদিন গড়ে তোলা বহু অপেক্ষা আর স্বপ্নের কাঠাখালের বাইপাস অব্দি কুড়িতে ( থুড়ি, বছরে ) বুড়ি হয়ে ভাঙা দাঁতগুলো বের করে মুখ ভেঙাচ্ছিল শিলচর অব্দি পুরো পথের  প্রায় সর্বত্র মেরামতির কাজ চলছে সেই সত্তরের দশকের শুরুর সময় ছেলে বেলা থেকে দেখে আসছি, কাজ চলছে এই আশাতে দিন গুণেছি যে একদিন এ কাজ শেষ হবে আর আমাদের যাত্রা সুখের হবেবন্ধ হবে হাড়-মাস এক করা দুলুনি আর ধুলো-কাঁদার অত্যাচার সে দিনটি আজ জীবনের অর্ধেকটা পার করে এসেও এসে পৌঁছোয় নি একটা সেতু ঠিক হয়তো পাঁচ বছর আগের সেতু মেরামত বা পুণর্নির্মান করবার সময় এসেই পড়ে এক বুক হতাশা নিয়ে  শিলচর পৌঁছে ভাবলাম, যাক ! শেষ অব্দি বাঁচা গেল   ওমা ! একী ! এ যে চেনাই যায় না! হাড় কঙ্কাল বেরিয়ে গেছে বললেও যে কম বলা হয় ! রাঙিরখাড়ি অব্দি যে পথের উপর দিয়ে আমার রিক্সা এগিয়ে গেল, আমার রিক্সাচালাকের প্রতি দয়াই হলো এই নরকের উপর দিয়ে রিক্সা চালাবার আগের জন্মের (?) পাপের শাস্তি ভোগ করেই তাকে পেটের ভাত জোগাড় করতে হয় চিত্তরঞ্জন এ্যাভিন্যুর রামকৃষ্ণ সরণির সামনে গিয়ে সে যখন আমাকে নামিয়ে দিল যে কটা খুচরো টাকা ছিল তার হাতে দিয়ে পাপ স্খলন করা গেল সে টাকা ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছিল বললাম , রেখে দাও তোমার বেশ কষ্ট হয়েছে সে বোধহয় একে আমার বাড়ি ফেরার আনন্দের বকশিশ হেসেবেই নিয়ে নিল   
 তিনসুকিয়া থেকে ডিগবয়ের পথে গেল দশ বছরে যদি বা কখনো নির্মাণ শ্রমিকেরা কাজ করেছে তবে তার পরিমাণ এতো কম যে আমার কখনো চোখে পড়ে নি যদিও তিনসুকিয়া শহরে চোখে পড়েছে অনেকবার এ টি রোড বাদ দিলে এই শহরের পথঘাট এতো জঘন্য এবং নোংরা যে শিলচর শহর নিয়ে আমার এক আলাদা গৌরবের জায়গা তৈরি হয়েছিল গেল দশ বছরে বস্তুত শিলচরের বহু মানুষ যারা গুয়াহাটির বাইরে অসমের আর অন্য শহর তেমন দেখেন নি তারা জানেনই না যে প্রাকৃতিক বিচারে এ শহর অসমের সুন্দর দুতিনটি  শহরের একটি    চামড়াগোদাম, ফাটক বাজার বাদ দিলে শিলচরের পথঘাটও  কি সত্যি এতো বিচ্ছিরি ছিল ? আমার মনে পড়ে না কিন্তু জাতীয় সড়কের অগুণতি সেতুগুলোর কথা আগেই লিখেছি, এদের পুনর্নির্মাণ আর মেরামতি দেখতে দেখতে আমার প্রজন্মের বার্ধক্যের দুয়ারে এসে হানা দেয়া প্রায়ই ভেবেছি কেন্দ্র-রাজ্যের সরকারের বৈষম্য যদ্দিন চলবে এ দুর্দশার থেকে মুক্তি নেই কিন্তু এবারই প্রথম, বোধহয় দিন দুই আগে তিনসুকিয়া- মার্ঘেরিটা পথের ঐ অভিজ্ঞতা  আমার    হয়েছে বলেই , আমার মনে দেখা দিল  এক প্রশ্ন , সত্যিই কি সে রকম কোনো বৈষম্য রয়েছে ? তাহলে এতো মেরামতি আর পুনর্নির্মাণের  টাকাগুলো আসে কোত্থেকে ? দেয় কারা ? বছরের পর বছর ধরে এতগুলো টাকার অপচয় যারা ভালোবাসে তারা কারা ? এ আমাদের নিজেদের কেউ নয় তো ? যিনি আমাদের  ভালোবাসার এ উপত্যকার অসাংবিধানিক মুখ্যমন্ত্রীর আসন দখলে রেখেছেন , যিনি ভারি শিল্প দপ্তরের মন্ত্রী হলেও এ উপত্যকাতে একটা মাছের পুকুর খোঁড়া হলেও নিজে দিল্লী থেকে এনেছেন বলে ঘটা করে  ঘোষণা করেন এ তারই কোনো কারসাজি নয়তো ? এতো বৈষম্যের রাজত্বেও কেন্দ্রের সরকারে তার মত ক্ষমতাশালী মন্ত্রী অসম থেকে আর একজনকেও দেখা যায় না কেন এও কোনো গোপন বোঝাপড়ার পরিণাম নয়তো ?
অন্ততঃ , ব্রডগেজের কাজে যে উপত্যকার মাড়োয়াড়ি পরিবহণ ব্যবসায়ী চক্রটি কোটি কোটি টাকা ঢেলে বাগড়া দিয়ে আসছে সেতো উপত্যকার ঐ সেদিন জন্ম নেয়া শিশুটিও জেনে গেছে তার পরেও আমরা ওদের সায়েস্তা না করে দিসপুরের বঞ্চনার গান গেয়ে আমাদের উপত্যকারঅসাংবিধানিক মুখ্যমন্ত্রীর শাসনকাল দীর্ঘায়িত করে যাচ্ছি কেন ? তিনিই  কৃপা করবেন, আমাদের মুক্তি দেবেন এই আশাতে বুক বেঁধে রেখেছি কেন ? আমি জানি না আমি বুঝি না যেমন বুঝি না এ উপত্যকার ইতিহাসকে এ উপত্যকার জন্মেই বুঝি অসমিয়া জাতিবিদ্বেষের বিষ লেগেছে সিলেটের অর্ধেকটা ওপারে ঠেলে দিয়ে অসমিয়া জাতীয়তাবাদ বাঙালিদের কোমর ভেঙে রেখেছে আমার মনে প্রায়ই এ  জিজ্ঞাসা কাজ করে , যে তোমাদের কে সেধেছিল রে বাবা অসমে এসে ঢুকতে পারলে না, পুরোটাকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে ? ফাঁকি , মস্ত ফাঁকি এ উপত্যকার সর্বত্র ঃ  এর ইতিহাসে, রাজনীতিতে, সমাজনীতিতে,  ধর্মে  এবং দর্শণে
দিন তিনেক পর আমি যেদিন আবারো তিনসুকিয়া ফেরার  দুঃসহ অভিযানের পরিকল্পনা করছি তার আগের দিন, ভাগ্যিস, জানা গেল যে পরদিন সকালে ট্রেন চলতে শুরু করবে সকাল বেলার প্রথম ট্রেন বদরপুর থেকে ছাড়বে এক বুক অবিশ্বাস নিয়ে বাসে চেপে সক্কাল বেলা বদরপুর ষ্টেশনে এসে দেখা গেলো সত্যি একটা ট্রেন ছাড়ার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে এ ট্রেন হাফলং অব্দি যাবে ওদিকে লামডিং থেকে যে ট্রেন আসবে, হাফলঙে আবার তাতে চড়ে  লামডিং গিয়ে পৌঁছুতে হবে দেখা গেলো , আমার মতো অবিশ্বাসীর সংখ্যা নেহাত কম নয় সেদিন যাত্রী খুবই কম ছিল তাতে বেশ শুয়ে বসেই যাত্রা করা গেল জাটিঙ্গা অব্দি গিয়ে জানা গেল হাফলঙে গাড়ি পাল্টাবার ল্যাঠাও আর নেই, এ গাড়িই সোজা লামডিং যাবেসুতরাং হাফলং ষ্টেশনের ভাতগুলোও বেশ ভালই হজম হলো বালি কিম্বা মাটি যাই মেশানো থাক, মনে হলো অমৃত !
 রাত দশটা নাগাদ যখন লামডিং পৌঁছুলো গাড়ি , ওদিককার কামরূপ এক্সপ্রেস আসতে তখনো আধঘণ্টাখানিক বাকি বেশ আয়েস করে হাতমুখ ধুয়ে খাবার দাবার সেরে যখন  গাড়ির জন্যে দাঁড়াতে গেছি শুনি ঘোষণা হচ্ছে , কামরূপ আসতে ঘণ্টাখানিক দেরি হবে এ আর এমন কি কথা ? শিলচরের কিছু সাহিত্যের কাগজ কিনে নিয়ে এসছিলামতাই পড়ে দিব্যি এক  ঘণ্টা পার করে দিলাম গাড়ি আসার তখনো কোনো সাড়াটি নেই গিয়ে অনুসন্ধানের কক্ষে জিজ্ঞেস করতে জানা গেল আরো ঘণ্টা খানিক সময় নেবে এই করে বসে বসে আর তন্দ্রাতে ঢুলে ঢুলে   সারা রাত পেরিয়ে গেল গাড়ি এলো না এলো আক্ষরিক অর্থে সাত সকালে এমনটা এ পথে সচরাচর হয় না রাজ্যের ভেতরে সবচাইতে ভালো বাস পথ থাকা সত্বেও আমি  গুয়াহাটি গেলে ট্রেনেই  যাতায়াত করি , সুতরাং জানি যে সেদিনের কামরূপের এই অস্বাভাবিক বিলম্ব যাত্রাটা ব্যতিক্রম, নিয়ম নয় সুতরাং তেমন আর ক্ষোভ পোষে রাখলাম না জানি বিকেলের আগে বাড়ি পৌঁছে যাবো তাই গেলাম রোদ ঢাকা পড়েছিল মেঘে , তাই ট্রেনেই বেশ ভালো ঘুমও দিলাম
 প্রায় বছর দেড় পর বাড়ি গেছিলাম একা তাই কথা দিয়ে এসছিলাম , ডিসেম্বরের শেষে যখন মেয়ের পরীক্ষা শেষ হবে স্ত্রী-কন্যা নিয়ে আবার বাড়ি যাব মাস খানিকের জন্যে রেখে আসব মেয়ের আমার গ্রীষ্মের ছুটিতে মামার বাড়ি যাওয়াও হয় না,  আম কাঠালের স্বাদ নেয়াও হয়ে উঠেনা ওকে স্বপ্ন দেখালাম শীতের জাটিঙার কমলা খাওয়াব যিশু খৃষ্টের সঙ্গে একই দিনে জন্মেছে সে , সমস্ত বন্ধুদের জানিয়ে রেখেছে ( মনের দুঃখে কিনা , জানি না ) এবারের জন্মদিনে সে তাদের নিমন্ত্রণ করতে পারছে  না এবারে সে বাড়ি যাবে বরং এবারে সে ছমাস আগে থেকেই ওর সমস্ত তুতো ভাইবোনদের ফোনে নিমন্ত্রণ করে রেখেছে এবারে সে বাড়ি আসছে সবাই যেন ওর জন্মদিনে আসতে ভুল না করে বসে   এক আধটু হিসেব করতেও শিখেছে ওর বাবাকে বলে রেখেছে , এবারেতো আর তুমি আমার জন্মদিন করতে যাচ্ছো না করবে ঠাম্মা তোমার তাই খরচ কম হবে এবারে তাই উপহারটা দিতে হবে বেশ বড় দেখে   
 আমি যখন দিন গুনছি কবে আমার বাড়ি যাবার পথ ভাল হবে আমার ছোট্ট মেয়েটি তখন দিন গুনছে কবে তার সপ্তম জন্মদিনটি কাছে আসবে কিন্তু বাতাসে তখন  ধীরে ধীরে মৃত্যুর ঢিবি ঢিবি পায়ের শব্দ শোনা যেতে শুরু করল তাকে বরণ করা শুরু হলো বাংলাদেশি তাড়াবার নাম করে নিম্ন অসমের নির্মাণ শ্রমিকদের লাঠিপেটা আর জুতোর মালা পরিয়ে তারপর দরং-ওদাগুড়িতে সত্যি মানুষ মরল, ঘর পুড়ল , ধর্ষিতা হলো ত্রিশ অক্টোবর ইতিহাসের সবচে বড় বোমাতে কাঁপালো রাজ্য তার রেশ না ফুরোতেই মুম্বাই  
বাড়ি আসার সব স্বপ্ন কেমন যেন আবছা হয়ে যেতে শুরু করল বারুদের ধোঁয়ায় তবু আশা ছিল, মানুষ বাঁচা ছেড়ে দিলেতো আর সন্ত্রাস হেরে যাবে না আমার বাড়ি যাওয়া নিশ্চয় এর জন্যে আটকাবে না কিন্তু ডিসেম্বর আসতেই ২ তারিখে ডিফুতে ট্রেনে বোমা ফুটল ৬ তারিখে আবারো ফুটলো এক মাছের বাজারে এখানে ওখানে প্রায় রোজই বোমা উদ্ধার করল পুলিশ দুএক জন হিন্দিভাষীকে গুলি করেও মারল উগ্রপন্থীরা  লামডিং-শিলচর পথে রাতের ট্রেন বাতিল করে দেয় কর্তৃপক্ষনতুন বছরেরে উৎসবে মেতে উঠে ব্যক্তিগত পরিবহন মহলের অন্দরমহল
 মুম্বাইর বোমা কাণ্ডে তাজ-ওবেরয়ে যারা মারা গেছেন বা বিপন্ন হয়েছেন তারা তখনো এতো প্রবল প্রতাপে আর ক্ষমতাতে টিভির পর্দা, খবরের কাগাজের পৃষ্ঠা দখল করে রেখেছেন যে ছত্রপতি শিবাজী স্টেশনে মারা যাওয়া গরীব-গুরোবদের খবরই কেউ নেয় নি , কেউ জানায় নি  আর আমরাতো অসমের মতো এক ফেলনা রাজ্যের ফেলনা মানুষ  আমরা না খবর হই, না খবর তৈরি  করি আমরা দেবতুল্য  সন্তোষ কিম্বা সমুজ্জ্বলের মতো অসাংবিধানিক  মুখ্যমন্ত্রীদের অনুগ্রহের কৃপাতে পথ চেয়ে রই তাতে তাদেরও রাজত্ব নিরাপদ থাকে ; নিরাপদ থাকে সাংবিধানিক সরকার প্রধানদের সাম্রাজ্যমসৃণ হয় তাদের পথ  চলা কেবল অবরুদ্ধ হয় আমাদের মতো আমআদমির পথ
১৫ ডিসেম্বর, ০৮ আমার মেয়ের স্কুলের ছুটি হওয়া অব্দি অপেক্ষা করিতার পর সে রাতেই বাড়িতে ফোন করি বৃদ্ধ আর অসুস্থ বাবা ফোন তুলেন তাঁকে বলি, আমাকে বলতেই হয়,  বাবা, আমি এবারো বাড়ি আসছি না !!! কারণটা তাঁকে বলতে হয় না, তিনি তার আগেই কণ্ঠ ম্লান করে বলেন, হ্যাঁ, এখন না আসাটাই ভালো হবে; ভালো থাকিস যদিও তিনিও জানেন, ভালোই জানেন, আমরা ভালো নেই এভাবে ভালো থাকে না কেউ!!
লেখা শেষ ঃ ১২-০১-২০০৯,সোমবার, বেলা ১০টা পাঠাবো দৈনিক জনকণ্ঠে ( শিলচর)