আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Showing posts with label Personal. Show all posts
Showing posts with label Personal. Show all posts

Tuesday, 19 October 2010

সেবারের সেই পুজো এবং পনঙ্কু


From My Google Blog
From My Google Blog
                                                            (১)
                     সেবার বাবা এলেন একা। হঠাৎই। দিন কতক আগে চিঠি এলো তিনি আসছেন। এক ঝাঁপে ছ’ছটাকে  পেছনে ফেলে হি ই ই ই ----ই করে একেবারে সপ্তম স্বর্গে  গিয়ে আমি দাঁড়ালাম ।
কতদিন... কত কত দিন ধরে স্বপ্ন দেখে গেছি, আমার সেই শৈশবের রাজপাটে আবারো গিয়ে পা রাখব। যে রাজপাটে  আমি রাজা , পনঙ্কু মন্ত্রী। আমি যা বলতাম সেই নির্দেশ মানাই ছিল পনঙ্কুর কাজ । তার উপর আর কোনো কথা ছিল না। মাঝে মধ্যে তার পরামর্শ আমাকে মানতে হতো। তাই বলে মায়ের হাতের মার আর  বাবার চোখের লালকে  ভয় পাওয়াটা কোনো কাজের কাজ ছিল না। সে আমাদের আইনে ছিল না। আমাদের রাজত্ব চলছিল নিরঙ্কুশ । দিনের পর দিন।
                   পনঙ্কু আমার ছেলেবেলার প্রথম বন্ধু। আমার বাবার অফিসের বেয়ারা। অফিসটা যে কোয়ার্টারে থাকতাম তার উলটো দিকের পাহাড়ে। পাহাড় বললে ভয় পাবার কিছু নেই। এখানেই আসলে পাহাড়টা মোড় ফিরেছে।   মাঝের খাদটা ওখানে শুরু হয়েছে মাত্র।  সেখানে আরেক বেয়ারার বাড়ি ছিল। যে আমাকে বিশেষ পাত্তা দিত না বলে নাম ভুলে গেছি।
                      অফিসে কাজ থাকতো না বোধ হয় বিশেষ। কারন পনঙ্কু প্রায়ই এসে জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিত। আমি আর আমি পাখি হয়ে যেতাম। কে জানত  আমরা গেছি কোন পাহাড়ে, কোন অরণ্যে।   বাবাদের অফিসের ঠিক উপর দিয়ে চলে গেছে যে পথ সেটি তখন জানতাম তুয়েনসাং  গিয়ে থেমেছে। ওই পথ দিয়ে বাবা প্রায়ই জীপে করে চলে যেতেন। সেই পথের ওপারে এক বিশাল মাঠ ছিল, যেখানে প্রায় বিকেলে সামাতুরের নাগা ছেলেরা ফুটবল খেলত। তাতে আমার কোনো নিমন্ত্রণ থাকবার কথাও ছিল না, ছিলও না।  বাড়ি থেকে কখনো তাকাতাম ওদিকে ।   সে ওই খেলা দেখব বলে নয়। যেদিন সেখানে কোনো খেলা হত না সেদিন প্রচুর ঘোড়া দৌড়ে বেড়াত । কখনো সন্ধ্যে হয়ে চাঁদ উঠে আসত। ঘোড়াগুলো তখনো চরে বেড়াতো। রাত বাড়লে ওরা চাঁদের দেশে  বাড়ি চলে যেত । কিন্তু কোন পথে, তার কোনো চিহ্ন রেখে যেত না। গেলে আমি আর পনঙ্কু নিশ্চিত ওখানে হানা দিতাম পরদিনই।
                    সেই মাঠের বাঁয়েই ছিল এক পুলিশ ফাঁড়ি। তার উপরে এক বিশাল বাঁশের তোরণের ভেতরে সেনা বাহিনীর আড্ডা। ওই তোরণ পার করে একদিন নিয়ে গেছিল পনঙ্কু। সেখানে পথের দু’ধারে সারি সারি কাটা বাঁশের ফলা মাটিতে গাঁথা ছিল। পনঙ্কুকে জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিল, বড়রা যখন কোনো দুষ্টুমি করে তখন এখানে এনে শুইয়ে দেয়া হয়। সেই থেকে এই শরশয্যা আমার কাছে এক আতঙ্ক। ঠিক করেছিলাম, এমন কোনো দুষ্টুমি নিশ্চয়ই বড় হয়ে করব না যাতে এখানে এসে শুয়ে পড়তে হয়।
From My Google Blog
                 সেই থানার গেটেই এক অচেনা গাছে সবুজ সবুজ বেশ টক দেখতে ফল ফলত। পনঙ্কু করত কি, আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে  বলত , পাড় । একদিন, মনে আছে, ঠিক ধরা পড়ে গেছিলাম। পুলিশ এসে বেশ গোঁফ ফুলিয়ে কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। ব্যাটা আমাদের রাজত্বকে প্রত্যাহ্বান জানাচ্ছিল। পনঙ্কু  ভয় পেত না, নির্বিকার আমাকে বলে যাচ্ছিল, তুই পাড়তে থাক। আর নিজে কী সব কথা বলে বলে  সেই পুলিশকে বশ করত।  আমি তার মাথা মুণ্ডু ছাই কিছু বুঝতেই পারতাম না। সে বলত ওদের মাতৃভাষায়। বোধহয় বশ করত মন্ত্র পড়ে। 
               ও নির্ঘাৎ প্রেম করত। বিয়ে থা করে নি। নইলে একদিন ...সেই যে  বাবার অফিসের পশ্চিমে পুলিশ ফাঁড়ির পাশ দিয়ে এক চিলতে পথটা চড়াই উৎরাই পার করে চলে গেছে এঁকে বেঁকে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে কাজলা দীঘির ঘাট ছাড়িয়ে সেই লুকোনো আরণ্যক ঝরণাতে  একদিন আমাকে নিয়ে গেল কেন? ওখানে  দল বেঁধে মেয়েরা ঝরণার নিচে কেলি করছিল।  আমি ততক্ষণে ওর কাঁধে। ও বেরসিক ওভাবেই ওদের সঙ্গে আলাপ জমাচ্ছিল আর  আমি হাঁ করে দেখছিলাম ! ওভাবেও লোকে স্নান করে বুঝি ! স্নান লোকে করে  ঐ এক চিলতে  কালো অন্ধকার ঘরে , যেমনটি  আমরা  করে থাকি ।   ওদের দু’একজন আমাকে নিয়েও টানা টানি করেনি যে তা নয়, কিন্তু আমাদের তখন কড়া নিয়ম ছিল যেখানেই যাই তার দাগ রাখা যাবে না। জলে নামলেও নামতে পারি, কিন্তু চুল ভেজানো না ।
                সেই রাজপাট ছেড়ে আমি চলে এসছিলাম ৭২এর শরতে। শারদীয় দুর্গাপুজোর দিনকতক আগে। এসছিলাম করিমগঞ্জে মামার বাড়ি। সেবারেই আমার প্রথম পুজো দেখা। শিউলি ফুলে... থুড়ি...কচুরিপানার ফুলে ফুলে দোলে বেড়ানো। ভেসে কাটানো।   কিন্তু আমি কি জানতাম যে সে রাজ আর রাজত্ব, সেই বৃন্দাবন আর নিশ্চিন্দিপুর আমি পেছনে ফেলে এসছি চিরদিনের মতো? পনঙ্কু , প্রায়ই দেখতাম, মাকে মেঘের দিকে হাত তুলে দেখাতো আর বলত কোন মেঘে ওর কার বাড়ি।  মাও আমার হার মানতেন না।  তিনিও রোজ একটা দক্ষিণের মেঘের দিকে তাকিয়ে দেখাতেন সেই পাহাড়ের ওদিকটাতেই তাঁর মায়ের বাড়ি । সে দেশের নাম পাকিস্তান । পরে জেনেছি, মায়েদের বাড়ি ছিল বটে পাকিস্তানে।  কিন্তু তখনকার নতুন বাড়িটি আর  সে পাকিস্তান নেই। পাকিস্তানের সীমান্ত পেরিয়ে সে তখন ভারত বর্ষের এপ্রান্ত।  সম্ভবত তাই তিনি তখনো তার দেশবাড়ির নাম বললেই বলতেন পাকিস্তান। আমি জানতাম সামাতুরের বাইরে আছে আরেক  রূপ কথার দেশ। সে দেশের নাম পাকিস্তান। আর ওখানে একজনই মহিলা থাকেন । তিনি আমাদের মায়ের  মা, দিদিমা। আমি চলে এসছিলাম সেই আশ্চর্য ভদ্রমহিলাকে দেখে যাব বলে।
From My Google Blog
                   কে জানত সেই ভদ্রমহিলা মন্ত্র জানেন? না ঠিক , তিনি ধরে রাখেন নি। কিন্তু রাখলেও রাখতে পারতেন। হয়েছিল এই, আমাকে স্কুলে ভিড়িয়ে দেবেন বলে বাবা সবাইকে নিয়ে এসে আমাদের শিলচরে ভাড়া করা বাড়িতে কাকাদের সঙ্গে রেখে নিজে ফিরে গেছিলেন একা। দু’বছর পর আমার বড় কাকার বিয়ে হলো, বাবা এসে মা আর ছোট ভাইবোনদের নিয়ে গেলেন। আমাকে রেখে গেলেন একা, নির্বাসনে।  লেখাপড়ার শাস্তি বরাদ্দ করে।
                   তারপর ওরা আসতেন প্রতি দুবছরে একবার মাসখানিকের জন্যে। সেদিনগুলোতে ছিল আমার মুক্তির দিন, ছুটির দিন, দিন উৎসবের। কিন্তু সেবার হঠাৎই বাবা একা এলেন।  প্রথমমানের ( এখনকার তৃতীয় শ্রেণি) পাঠশালাতে যে ছেলেকে নাম লিখিয়ে দিয়েছিলেন ঢুকিয়ে   সেই আমি তখন সবে ক্লাস এইটের ষান্মাসিক দিয়েছি। বাবা এলেন আমাকে নিয়ে যেতে। এক মাস পুজোর ছুটি। সেই ছুটিতে আমি যাব সেই নিশ্চিন্দিপুরে। আমি কি পারি স্বর্গে পা না বাড়িয়ে?
From My Google Blog
সেই স্বর্গে পনঙ্কু ছিল না। বাবা ততদিনে বদলি হয়ে গেছেন কিফ্রিতে। এখন নাগাল্যান্ডের মায়ান্মার সীমান্তে এক স্বতন্ত্র  জেলা শহর । সামাতুর থেকে বড়, দীর্ঘ আরো অপূর্ব এক  শৈল শহর। কিন্তু , তখন তুয়েনসাঙের,  মনে হয় ছিল, এক  মহকুমা শহর। ওই তুয়েনসাং নামটা জুড়ে ছিল বলে মনের কোনে একটা আশা জেগেই ছিল পনঙ্কু কি আসবে না ,আমি এসছি জেনে? সে কি সত্যি ভুলে গেছে আমাকে ?  কৈ, আমিতো তাঁকে ভুলিনি একটি দিনের জন্যেও। আমার চোখতো এখনো শরতের তুলো তুলে মেঘে খুঁজে  বেড়ায় আমার সেই প্রথম প্রেম, প্রথম বন্ধু পনঙ্কুকে। আমিতো আর ছিলাম না ‘কাবুলিওয়ালা’ মিনি । আমি সুশান্ত।
From My Google Blog
                   অনেক অনেক দিন পর আবার চড়লাম পাহাড় লাইনের রেলে। মামার বাড়ি যেতে আসতে মাঝে বদরপুর ঘাটে বরাকনদীর উপর যে রেল সেতুটা পেরিয়ে যেত মাথার উপর দিয়ে সেই সেতু পার করে রেল চলে যায় পাহাড়ে। কত কত দিন এ পথ দিয়ে যেতে আসতে দিন গুনেছি কবে আসবে সেই দিন আবারো যেদিন আমি ওই সেতুর নিচে দিয়ে নয়, যাব উপর দিয়ে । নদী পেরিয়ে। আজ সেই দিন আবার এলো। সে আজ বহু বহু দিন আগের কথা। তেত্রিশটি শরৎ আগের কথা। সন   ১৯৭৮এর গল্প।
From My Google Blog
                                                                    (২)
                  লামডিঙে ট্রেন পালটে পরদিন ভোরের অল্প আগে ডিমাপুরে পৌঁছুলাম। এলাম, আর একটা গাড়ি চেপে কিফ্রি রওয়ানা দিলাম ---ব্যাপারটা ওরকম ছিল না মোটেও। সেখানে একটা  হোটেলে উঠতে হলো। ভেতরে যাবার ইনার লাইন পারমিট এই শহরেই মেলে। সেটি আগে যোগাড় যন্ত্র করতে হয়। মনে হয় না, বাবার সে সমস্যা ছিল। তাঁর স্থায়ী অনুমতিপত্র ছিল। কিন্তু কথা হলো পরের গাড়ি পেলে তবেতো? এখানে বসে থাকতে হবে, বাজারের জিনিসপত্র নিয়ে যদি কোনো ট্রাক কিফ্রি যায় আর সামনের ওই তিনচারটে আসন খালি থাকে তবে তাতে চড়া যাবে। নাগাপাহাড়ের পথে পথে তখন আজকের মতো না বাস ছিল, না টেক্সি। তাই কিফ্রি থেকে সাধারণত লোক তখনই বাইরে যেত যখন ওরকম গাড়িঘোড়ার সংখ্যা বেড়ে যেত। পুজোর সময় সেরকম গাড়ির সংখ্যা সঙ্গত কারণেই বেড়ে যেত। প্রথমদিন বাবা গোটা দিন ঘুরে কোনো ব্যবস্থা করতে পারেন নি। বিকেলে আমরা এমনি এমনি এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ালাম। প্রথমবারের মতো ডিমাপুর শহরটা ঘুরে দেখলাম। শিলচরের মতোই বড়ো শহর,  লোকে বলে নাগাল্যান্ডের অর্থনৈতিক রাজধানী। সে রাজ্যের  একমাত্র সমতল শহর। আমাকে একা রেখেই সকালে বাবা বেরুতেন গাড়ির খোঁজে, পরদিন দুপুরে এসে জানালেন তার পরদিন বিকেলে একটা গাড়ি যাবে বাজারের কিছু জিনিসপত্র নিয়ে।  সঙ্গে যাবে কিফ্রির একমাত্র পুজোর প্রতিমা।
From My Google Blog
                       প্রতিমা আমাদের সঙ্গে যাবে শুনে আমার এখনো মনে আছে, প্রতিক্রিয়া হয়েছিল দু’রকম। মনে হচ্ছিল আমাদের উপরেই বোধহয় দায়িত্ব পড়ল সেই প্রতিমা নিয়ে যাবার। এভাবে সেই পুজোর সঙ্গে আমি জড়িয়ে গেলাম। আবারো মন খারাপ হয়ে গেল। কেননা শিলচরে আমাদের পাশের বাড়িতে ঘটা করে পুজো হতো। বাড়ির  পুজো, কিন্তু তাতে পাড়ার সবার অবারিত দ্বার ছিল। সে পুজোতে মুর্তি আমাদের চোখের সামনে তৈরি হতো। শ্রাবণ মাসে শিল্পী এসে কাঠামো তৈরি করে মাটির প্রথম পোঁচটা দিয়ে চলে যেতেন করিমগঞ্জে। যেখানে তাঁর বাড়ি। শিলচরের আগে করিমগঞ্জের পুজো আর শিল্পীদের কদর ছিল বেশি। দিন কতক পর সম্ভবত পুরো ভাদ্র পার করে এসে তিনি সেই কাঠামোতে আরেকপোচ মাটি চড়াতেন, সাদা কাপড়ে মোড়তেন, তার উপর আবারো মাটি।সেই মাটি শুকোলে সাদা রঙ। এমনি করে আমরা আমাদের চোখের সামনে দুর্গার হয়ে উঠা দেখতাম। ফলে সেই প্রতিমা যখন বিসর্জনের জন্যে নিয়ে যাওয়া হতো, আমার মনে হতো সত্যি সত্যি দুর্গা না যাবার বায়না ধরেছেন। আর লোকগুলো জোর করে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ট্রাকে তুলে দিচ্ছে।
From My Google Blog
                      কিফ্রির মূর্তি যখন আমাদের ট্রাকের পেছনে তোলা হলো, তখন মনে হলো ইনি একেবারেই ফেলনা। তাঁর কোনো কদর নেই। মূর্তি নিয়ে যেতে এসছিলেন রঞ্জিৎ কাকু। ট্রাকেই আলাপ। পরে পরে জেনেছিলাম ইনি হচ্ছেন সেখানকার সেই লোক যাকে নইলে কারো চলে না। মূর্তি আনো ...রঞ্জিৎ, পেন্ডেল সাজাও ...রঞ্জিৎ, হ্যাজাক জ্বালাও ... রঞ্জিৎ, কারো বাড়িতে জল আসছে না রঞ্জিৎ, কারো ঘরের চালে ফুটো রঞ্জিৎ, কারো বাড়ি বদল করা চাই রঞ্জিৎ... । ইনি সর্ব ঘটের কাঠালি কলা, ডাক পেলেই হলো, বৌদি...ই... বলে হাঁক পেড়ে গিয়ে হাজির। আগে এ বাড়ি ওবাড়ির সুখ দুঃখের খবর  জানাবেন, এক আধটু হাসির হুলোড় জমাবেন , দু’এককাপ চা চেয়ে খেয়ে নেবেন। তারপর জিজ্ঞেস করবেন, ডেকেছিলে কেন, বল?
                          গোটা পথে দেখছিলাম ট্রাক চালাচ্ছিল ড্রাইভার, কিন্তু সেই ড্রাইভারকে চালাচ্ছিলেন রঞ্জিৎ কাকু। আমাকে নিয়ে যখন বাবা পেছনে সিটে বসেছিলেন, রঞ্জিৎ কাকু টেনে নিয়েছিলেন সামনের একটিমাত্র সিটে যাতে আমি সেখান থেকে গোটা পথ দেখে দেখে যেতে পারি। পাহাড়ি পথে আমি পরে অজস্র বার  ঘুরে বেড়িয়েছি। পাহাড় অতিক্রম না করে আমরা শিলচরের লোকেরা  পৃথিবীর কোত্থাও যেতে পারি না। জোয়াই শিলঙের মতো সুন্দর পথ আমি পূর্বভারতে আর কোথাও দেখিনি, গ্যাংটক দার্জিলিঙেও না। কারণ শিলং রয়েছে মেঘালয়ের মালভূমির উপর। বাংলা ছায়াছবিগুলো এই পথের পাশে এসে সুটিং করলে সুইজারল্যান্ড যাবার ব্যয় বাঁচাতে পারত। এরা শিলং অব্দি এসছে অনেকবার কিন্তু তার দক্ষিণে যাবার সুবুদ্ধি আজো হয়েছে বলে দেখিনি। দেখলে দার্জিলিঙ নিয়ে বাঙালির অহঙ্কার সেই কবেই ফুরিয়ে যেত। রবীন্দ্রনাথ চিনেছিলেন এই শহরকে ।তাই তাঁর সবচে’ রোমান্টিক উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’ লিখেছিলেন এই শহরকেই সম্মান জানাতে।
From My Google Blog
                              নাগাল্যাণ্ডের পথে পথে পাইন বন ছড়ানো থাকলেও সৌন্দর্যে সে   শিলঙের ধারে কাছেও যায় না। কিন্তু বিশাল উঁচু... যার সামনে আমার মেঘালয় কিম্বা উত্তরকাছাড়ের পাহাড়গুলোকে মনে হয় নিতান্তই ‘বাওনা’ । দূর দূর পাহাড়ের অন্ধকার  গায়ে গায়ে যেন এখানে ওখানে নক্ষত্রের মেলা বসেছে। রঞ্জিৎ কাকু , বলে যাচ্ছিল কোনটা কোন শহর। কোনটা দিয়ে আমরা যাব আর কোনটাকে আমরা এড়িয়ে যাব। ওই কাছ থেকে যে শহরটিকে দেখা যাচ্ছিল সেখানে আসতে যখন ট্রাকের কয়েক ঘন্টা লেগে যাচ্ছিল, আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। দু’চোখের পাতা এক করা কষ্টকর হচ্ছিল।
From My Google Blog
                           মাঝরাতে ওরা ঠিক করলেন একজায়গাতে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ঘুমোবেন। ঘুমোবেন মানে, ড্রাইভার আর ওর সঙ্গী চলে গেল ট্রাকের পেছনে। পথের উপরেই শুবে বলে। আমরা ভেতরে শুলাম  আয়েস করে তা কিন্তু নয়। হাত পা মেলে শোবার কোনো উপায় ছিলই না।  ব্যাপারটা আমার  মোটেও পোষালো না। এই আকস্মিক রসভঙ্গের জন্যে আমি মোটেও তৈরি ছিলাম না। আরেকটা কথাতো বলাই হয় নি, এই আরণ্যক পথের মাঝে শুয়ে পড়ে হাওয়া খাবার ঋতু সেটি মোটেও ছিল না। হাড়ে ততক্ষণে  একটু একটু করে ঘাস গজাতে শুরু করেছিল।
                        আমার এখনো মনে আছে, গাড়িটা আসছিল গদাই লস্করি চালে। সেটি ফেরার পথে নিজের অভিজ্ঞতার থেকেই বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তখন আঁচ করছিলাম বাবা আর রঞ্জিৎ কাকুর উদ্বেগ দেখে। সেদিনি সন্ধ্যেতে মহাষষ্ঠী, আর আমরা দাঁড়িয়ে তখনো বহু বহু দূর। বাবা বলছিলেন, আর গাড়ি পেলে না? রঞ্জিৎ কাকু বলছিলেন পুজোর সময় এর চে’ ভালো উপায় ছিল না। আমার তাতে কিছু যাচ্ছিল না, আসছিল না। রাতের অন্ধকারেই যে পথের বেশিটা পার করিনি সেই আমার সৌভাগ্য। এই পথ আমি আগে দেখিও নি, আর দেখলেই বা কী? এই পথ আমার জন্মভূমির পথ। তাকে দেখবার মোহটাই যে আলাদা !   সকাল বেলা এক ছোট্ট শহরে এসে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। যতদূর মনে পড়ছে সে শহরের নাম ফেক, এখন এক জেলা শহর। আমরা সেখানে হাত মুখ ধুয়ে চা খেয়ে রোদ পোহায়ে হাড়ের গজানো ঘাসগুলোকে ঘুম পাড়ালাম। বাঁদিকে যে পথটা উপরের দিকে উঠে গেছিল সে পথে কিচ্ছুটি দেখার উপায় ছিল না। বাবা বলছিলেন একেই বুঝি মেঘ বলে! আর কী আশ্চর্য ডানদিকে যে পথটা নিচে নেমে গেছিল সেই পথে আলো ঝলমল সূর্য নেমে এসছে। লাল নীল পরি, গন্ধর্বরা খেলে বেড়াচ্ছে। কেউ উঠে আসছে, কেউ মেনে গিয়ে পথের বাঁকে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি নিশ্চিৎ আজকাল ইন্টার নেটের ছবি ট্যাগ করবার যুগে সেই দৃশ্য  খুবই সাধারণ মনে হলেও আমাদের ছেলেবেলা সেই ছবি দেখিয়ে কাউকে উন্মনা করে দেবার জন্যে   যথেষ্ট ছিল ।
From My Google Blog
                  এক সময় মেঘের বুক চিরে আমাদের গাড়ি এগুতে শুরু করেছিল। এমন মেঘের বুক চিরে এগুবার উত্তেজনার রঙই আলাদা। আমার মনে আছে, এই মাত্র ক’বছর আগে সস্ত্রীক আরো কিছু আত্মীয় আত্মীয়ার সঙ্গে  সঙ্গে যখন চেরাপুঞ্জির পথে যাচ্ছিলাম আমরা একটা খেলা শুরু করেছিলাম। কেউ বলল, এই ই...ই...ই...ই...ই গেল! অন্য জন বলল, এই...ই...ই...ই এলো! যদি মেঘ মিলিয়ে না গেল, কিম্বা রোদ চলে  না এলো তবে যে কথাটা বলল সে গেল ...হেরে ।  এমন রৌদ্রমেঘের খেলা আমি তখন একাই উপভোগ করছিলাম। আমার সেই আনন্দে রঞ্জিৎ কাকু অল্প অল্প গা ভাসাচ্ছিলেন। বাবা আমার চাপা মানুষ, চুপ করে হাসছিলেন।
From My Google Blog
                  কিন্তু বেশিক্ষণ চলল না সে   খেলা। খানিক পরেই ঝলমলে রোদ আর পথের উৎকন্ঠা সবার ঘাম বের করে এনেছিল। মাঝে মাঝে একেকটা ঝরণা চোখে পড়লেই ইচ্ছে হচ্ছিল ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীর শীতল করি। সেই সৌভাগ্যও যে হতেই পারে অতোটা আমি ভাবিই নি। দুপুরে গাড়ি এক ঝরনার কাছে দাঁড়িয়ে পড়লে দেখি সবাই কনডাক্টার গাড়ির ইঞ্জিনে জল দিল। ড্রাইভার আর রঞ্জিত কাকু প্রায় জন্মদিনের পোষাকে সেই ঝরনাতে জল হয়ে গেল। আমারও ইচ্ছে করছিল বটে, কিন্তু বাবা সেটা কিছুতেই হতে দেবেন না। যদি নতুন জলে এই পুজোর দিনগুলোতে জ্বর চড়ে তবে মায়ের কাছে বাবার নিস্তার ছিল না। কিন্তু, আমিও একটু চেপে ধরতেই হাঁটু অব্দি পা ভেজাবার অনুমতি পাওয়া গেছিল। একটু পরে দেখি বাবাও সে জলে পা ভেজাতে শুরু করেছেন।
                   সন্ধ্যে হতেই আমারো মনে হচ্ছিল, পথটা সত্যি বড় দীর্ঘ হয়ে গেছে। রাত প্রায় নটায় দ্বিতল বাড়ির নিচের তলার খোলা দরজা দিয়ে লণ্ঠনের যে আলোর রেখা পথ দেখাচ্ছিল এখনো মনে পড়লে সে রেখাগুলো  আমার চোখ এলোমেলো করে দেয়। মা! বলে ডাকতে আমার লজ্জা করছিল।  মিতু...উ...উ...উ...,আমার বোনের নাম ধরে জোরে ডাক দিতেই রাতের পাখিরা ডানা ঝাপটে এসে আমার গায়ে  পড়ল। ছোঁ মেরে নিয়ে ভেতরে চলে গেল। বাবা কোথায় পড়ে রইলেন আমি ফিরেও তাকাই নি।  
                                                              (৩)
                          পরদিন সেই ভোর  থেকেই দেখি আমাদের বাড়িতে দৌড় ঝাঁপের শেষ নেই। এক জন আসছেন তো আরজন যাচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ আবার, “কৈ গো আপনার  বড় পোলা? আইছে বুলে?” জিজ্ঞেস করতে করতে বিছানা ঘরেও উঁকি দিচ্ছিলেন। না না, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই আমি এক কেউ কেটা গেছি বলে  তারা সবাই আমাকে দেখতে আসছেন। আসলে আমাদের কোয়ার্টার বাড়িটা ছিল শহরের অনেকটা মাঝামাঝি।
From My Google Blog
                        এই রে, মাঝমাঝি বললে কী বোঝা যাবে? তার মানে এই নয় যে এখানেই সব বাজার হাট, অফিস আদালত, হাসপাতাল , পোস্ট আপিস। পুরো শহরটি প্রায় মাইল তিনেক লম্বা। যেপথে আমরা এসে শহরে ঢুকেছিলাম সেটি উপরে উঠে সোজা চলে গেছে তুয়েনসাং। সেখানেই এক জায়গায় ডানদিকে একটু উপরের দিকে  মোড় নিয়ে আবার পেছন দিকে সমান্তরালে আরেকটা পথ চলে এসছে শহরের প্রবেশ পথের সমান্তরালে উপরে। সেই পথ মাইল দু-এক গিয়ে মিলেছে কিফ্রির লয়লা স্কুলের মাঠে। সেই স্কুলে আমার ভাই বোনেরা পড়ত। ঐ উপরের পথের মাঝামাঝি আমাদের বাড়ি। সেই অর্থে আমাদের বাড়িটা শহরের মাঝামাঝি। সুতরাং স্কুলের দিকথেকে যারাই পুজোমন্ডপের দিকে এগুচ্ছিলেন তারা অতটা পথ একা এগুবার পথে সঙ্গী জোটাতে এসে আমাদের বাড়িতে হানা দিচ্ছিলেন।
From My Google Blog
                        নিচের সেই তুয়েনসাং পথের মোড়ের কাছেই পুজোর মন্ডপ। ওখানেই শহরের ছোট্ট বাজার হাট। এর থেকে উপরে চড়লে শহরটা আর বেশি দূর এগোয় নি। লোকজনের বসতবাড়ি মূলত আমাদের দিকটাতেই। অফিস আদালত সব গোটা শহরে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে  এখানে ছড়ানো ছিটোনো। সব ক’টা পথের কাছে কাছেও নয়।
                       কিফ্রির বাজার হাট বললেও বিশেষ কিছু বোঝা যাবে না। সামাতুরে আমরা দেখতাম মাঝে মধ্যে হেলিকপটার এসে বাবাদের অফিসের উপরের মাঠের এক প্রান্তে ‘ড্রপিং’ করে যেত। সেগুলোই যে দু’একটা দোকান পাট ছিল ওদের পসারের জিনিস পত্তর । সে ‘ড্রপিং’ থেকেই আমাদের ঘরে চাল ডাল পাওয়া যেত। মানে দোকানির থেকে কেনা যেত।  শাক সবজি প্রায় সবাই বাড়িতে ফলাতো।  আমাদের বাড়ির সামনে এক বড় ফুলের বাগান যেমন ছিল, পেছনটার তেমনি ছিল সবজি খেত। নিজেদের গরু ছিল বেশ কিছু, ছাগলও ছিল। আর ছিল প্রচুর মুরগি।  পরে যখন শিলচরে এসে বাবা বাড়ি করেন, সেখানেও গরু ছাগল পোষতে না পারলেও আমরা বেশ কিছুদিন মুরগি পোষার চেষ্টা করেছিলাম। মাছ পাওয়া যেত না। একবার মনে আছে, বাবা তুয়েনসাং থেকে এক বড় তেলের টিনে প্যাক করা জ্যান্ত মাগুর মাছ কিনে নিয়ে গেছিলেন। সেই মাছ আমরা অনেকদিন ধরে খেয়েছিলাম। সে  এক  আশ্চর্য অভিজ্ঞতা ছিল। নইলে আমরাতো শুধু জানতাম ছোট টিনের কৌটার মাছ। যেগুলো ‘ড্রপিঙে’ আসত। এখনো, এই তিনসুকিয়াতে সার্ডিন’ মাছের  কৌটা পাওয়া যায় বলে আমি মাসের বাজারের এক কৌটো অবশ্যই নিয়ে আসি।
                   কিফ্রিতে সামাতুরের থেকে অবস্থা খানিকটা ভালো ছিল। এখানে ‘ড্রপিং’ নেই। সপ্তাহে দু’একটা গাড়ি আসত সব্জি মাছ ইত্যাদি নিয়ে। থামত আমাদের বাড়ির কাছেই উপরের রাস্তাতে। হয়তো অন্যত্রও অন্য গাড়ি থামত। আমি তত নিশ্চিত নই। লোকের জানাই থাকত কবে গাড়ি আসবে। কারণ, ওটাইতো নিত্যদিনের ব্রেকিং নিউজ ---থুড়ি বিশেষ বিশেষ খবর ছিল। ব্যস , মুহূর্তে ওইখানেই সব ছু! মন্তর!
তবু স্কোয়াস, লঙ্কা, গাজর,  ফুল কপি, বাঁধা কপির গাছ লাগাবার স্বভাবটা কেউ ছাড়েনি। বিপদতো লেগেই থাকত। ফুলের গাছে বাড়ির চারপাশটা  অবশ্যই সাজাতো সবাই। শখে নয় ততটা। যতটা বাড়ির ঠাকুর দেবার  দরকারে । শখের গাছ ছিল ডালিয়া। আরো দু’একটা পাহাড়ি ফুল ছিল। সেগুলোর নাম আজ আর আমি মনে করতে পারি না।  ডালিয়া পারি, এর থেকে সহজে চোখ ফেরানো মুস্কিল।  কত বিচিত্র রঙ আর কত বিচিত্র বাহার।    
                                 যেভাবে লোক আসছিল, আমাদের সঙ্গে নিয়ে পুজো দেখতে যাবে বলে তাতে এ ক’দিনের টানা যাত্রার ধকলের পরেও বেশিক্ষণ শুয়ে থাকা মুস্কিল ছিল । বুঝতে পারছিলাম এ শুধু পুজো দেখতে যাওয়া নয়, পুজো করতে যাওয়া। সবাই গেলে তবেই না ওখানকার কাজগুলো সব হয়ে উঠবে সময় মতো। ওদের কথা থেকেই বুঝতে পারছিলাম, এ আমার শিলচরের পাশের বাড়ির পুজো নয়। এ হলোগে এক্কেবারে নিজেদের বাড়ির  পুজো। এই যে পরের বাড়ির  থেকে নিজেদের পুজোতে অবস্থানের পাল্টে যাওয়া তার অনুভূতিটাই ছিল অন্যরকম। পাশের বাড়ির পুজোর প্রতিটি দিনের সঙ্গী থেকেও সেই ছেলেবেলাই আঁচ করাতাম কোথায় যেন কিসের একটা অভাব রয়েছে। দেবী আমাদের বন্ধুবান্ধবদের চোখের সামনেই হয়ে উঠতেন মানেতো তাঁকে আমরাই গড়ে তুলতাম। তারপরেও যেন তিনি আমাদের হয়ে উঠতেন না। পুজোর মূল আয়োজনে আমাদের ইচ্ছে অনিচ্ছের কোনো মূল্যই ছিল না। আর পুজোর দিন কয়টিতে সে বাড়ির আত্মীয়রা অন্য শহর বা গ্রাম থেকে এসে যেভাবে হম্বি-তম্বি শুরু করতেন সেটি ছিল একেবারেই অসহ্য আর অপমানকর। বোধকরি জমিদারবাড়িগুলোতে সেরকম  অপমানের জবাব দিতেই একসময় দুর্গা পুজোর গণতান্ত্রিকীকরণ হয়ে গেছিল। পুজো হয়ে গেছিল বারোয়ারি। ছোট্ট করে আর পরোক্ষে  হলেও আমি সেই সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে গেছিলাম যেন। সুতরাং আমিতো সে পুজোতে যাবই । আরো আগেই যাব। ভাবখানা এই যেন... আমায়  নইলে... তোমার প্রেম হতো যে মিছে।
বোন ভাইয়েরাও বলে রেখেছে, সাত সকালে উঠতে হবে। পুজো মন্ডপে যেতে হবে। কিন্তু আমার  আরো কিছু কাজ ছিল। দেখবার ছিল যদি শহরটা সামাতুর হয়, যদি বেরিয়েই দেখি পনঙ্কু আমার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। আমিতো আর পুজো দেখতে আসিনি। সে কি আর কম দেখেছি! এসছি সামাতুরের জন্যে, পনঙ্কুর জন্যে। বাবাকে পথে পথে বলেও এসছি, আমাকে সামাতুর নিয়ে যেতে হবে। বাবা  বলেছিলেন, ‘হবে। যদি গাড়ি পাওয়া যায়।‘ কিন্তু তাঁর মুখ থেকেই শুনেছি সামাতুরের অনেকেই এখন এখানে এই কিফ্রিতে আছেন। আর পনঙ্কু, সাকিবারাও মাঝে মাঝেই এখানে এসে থাকে। সে তথ্য বাবা কিছু না ভেবেই দিয়েছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু দিয়ে আমার উৎসাহ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
                            যেমন নতুন প্রেমিকেরা সব মেয়েতে তার প্রেমিকার মুখ খুঁজে ফেরে পথে নেমেই আমি নাগা পুরুষ দেখলেই তার চেহারাটাকে মেলাবার চেষ্টা করতে শুরু করলাম পনঙ্কুর সাথে। স্নান সকালের দুধ রুটি মুখে দিতেই মা নতুন জামা বের করে দিলেন। সার্টটা তিনিই নিজেই বহু বহুদিন পর আমার গায়ে চাপিয়ে দিলেন। সেটি গায়ে মানিয়েছে কি না অনেক ক্ষন ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। না জানি, কত দিন ধরে এই মুহূর্তটির জন্যে তিনি সময় গুনছিলেন। বাড়িতে আসা একদল নারী পুরুষ আর আমাদেরই বয়সের তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমি আর বোন মিতু সেই সকালে মন্ডপের পথে পা বাড়ালাম। মা-বাবা ছোট ভাইটিকে নিয়ে আসবেন পরে। মূল পথটা ছেড়ে একটা ফাঁড়ি পথে চড়াই উৎরাই ভেঙ্গে   আমাদের দলটি মন্ডপের দিকে এগুচ্ছিল আর বোন আমার গাইডের কাজ সামাল দিচ্ছিল। সে শুধু পথ দেখাচ্ছিল না। আমাকে পথের পরে প্রতিটা ঘর, অফিস, গাছ, পাখি, পারলে পতঙ্গের সঙ্গেও আলাপ করিয়ে করিয়ে নিয়ে তবে পথ হাঁটছিল। এমনকি কোথায় পা ফেলতে হবে কোথায় নয় সেই নির্দেশও দিতে দিতে এগুচ্ছিল। পাছে, তার সমতলের অনভিজ্ঞ ভাইটি পা পিছলে খাদে পড়ে যায়!    
                                 একটাই পুজো পুরো শহরে।  করেন মুলত বাঙালিরা হিন্দুরা। কিন্তু এ  ছাড়াও ছিলেন কিছু অসমিয়া, বিহারি, নেপালি মানুষ। তারা সব্বাই নাগাল্যান্ডের বাইরের লোক, বাঙালিদের বেশিরভাগই অসমের অবিভক্ত কাছাড় জেলার লোক। তারা ওখানে আছেন আমাদের পরিবারটিরই মতো সরকারি চাকরি করেন বলে, ছোটখাটো ব্যবসা করেন বলে কিম্বা করেন হাতের কাজ ।  বছরের ঐ একটা সময় ওরা বাড়ি না যেতে পারার দুঃখ ভুলেন ঐ পুজোতে। সেই সকালে সবাই গিয়ে জড়ো হবে। নিজেরাই হাত লাগিয়ে এটা ওটা সম্পন্ন করবে। হাসবে, মস্করা করবে, পরনিন্দা পরচর্চা করবে। আবার সময় হলে, ‘বাদলটা প্রসাদ না নিয়ে কোথায় চলে গেল, বলতো!’, ‘নবীন এটা কী করল , ওর বৌকে না নিয়ে চলে এলো!’, ‘ এই দাস বৌদিকে দিয়ে যদি একটা কাজও ভালো করে হয়!’ বলে কিফ্রিতুতো দিদি, বৌদিরা অনুযোগের ঝড়ও ছোটাবেন। ভট্টাচার্য জেঠু হয়তো, ততক্ষণে গর্জন করে গোটা মণ্ডপ মাথায় তুলে বলবেন, “রায়কে আমি বললাম ওর অফিস থেকে এক দশটা টিন জোগাড় করে দিতে, না বাবু পারবেন না! বাবুর মান খসে যাবে অফিসারকে বলতে! বেটা আসবিতো দুপুর বেলা । তোর ঠ্যাঙ ভেঙ্গে দেব। ” আর বেশিদূর যাব কেন, আমার মাকেই দেখলাম কতমানুষকে তেমন শাসন করছেন। উনি শাসন করতে চিরদিনই ভালো বাসেন। তাঁকে নইলে কারো চলছিল না, কিন্তু তাঁর নিন্দুকের সংখ্যাও কম ছিল না। সে নিন্দুকের দলে যে মাঝে মধ্যে আমিও ভিড়ে যাই নি তাও সত্য নয়। দিনের দুবেলা সবার খাবার পাত পড়ত মণ্ডপে। যদিও অনেকেই বাড়িতে খেয়ে দেয়েও আসত। দুপুর গড়ালে কেউ কেউ খানিকক্ষণের জন্যে বাড়ি গেলেও সন্ধ্যে হবার আগেই আবার ভিড় বেড়ে উঠত। চারদিকে গোল করে চেয়ারে বসে আড্ড জমাতো যে যার মতো। এক কোনে হয়ত দেখা গেল কেউ গেয়ে উঠছেন আগমনির গান, কেউ শ্যামা সঙ্গীত, কেউ বাউল গান তো, কেউ সরাসরি হেমন্ত মান্না দে কিম্বা কিশোর কুমার । কারো গলা বাঁকা তো কারো বা ভাঙ্গা। কিন্তু তাতে কারো রসগ্রহণে কোনো অসুবিধে হচ্ছিল না। অন্য কোনে তখন কেউ কৌতুক শুনিয়ে আড্ডা জমিয়ে রেখেছেন।  আমি তখন খুব ভালো বাথরুম সিঙ্গার ছিলাম। রেডিওতে যে গান শুনতাম তাই পথে ঘাটে গুনগুনিয়ে গায়ক হবার স্বপ্নে দিন কাটাতাম। সে গানগুলোর বেশির ভাগই ছিল শিলচর কিম্বা ঢাকা সিলেটের রেডিও স্টেশনের সম্প্রচারিত বাঙলা আধুনিক কিম্বা ছায়াছবির গান। হিন্দি গান যে শুনতামনা তা নয়, কিন্তু সেকালে আমার এক ভ্রান্ত বোধ গড়ে উঠেছিল যে হিন্দি গান করে বাজে ছেলেরা। রকে বসে আড্ডা দেয়াই যাদের জীবনের লক্ষ্য। আমার কাকিমা রোজ সকালে শ্যামা সঙ্গীত গেয়ে গেয়ে পুজো দিতেন আর আমাদের ঘুম ভাঙাতেন। আমি সেগুলোর অনেকটাই শিখে ফেলেছিলাম।  সেগুলো গেয়ে আমিও আসর জমিয়ে দিয়েছিলাম, বললে আমার আজকালকার অনেক বন্ধু বিশ্বাসই করবে না।  আজো আমি প্রাণ ভরে গান শুনি , সেকালের গানগুলো আমার এখনো এতো প্রিয় যে তার প্রায় সবকিছুই আমার সংগ্রহে রয়েছে। কিন্তু যেগুলো সম্ভবত ভারতে খুব কম লোকের সংগ্রহে রয়েছে সে হলো, বাংলাদেশের সাবিনা ইয়াসমিন, সুবীর নন্দী, এন্ড্রো কিশোর, ফিরদৌসী রহমানদের গান। আজ সিডি ইন্টারনেটের যুগে আমার সেই পুরোনো প্রেমকে যে আবারো এভাবে এতো করে কাছে পেয়ে যাব বহুদিন তা স্বপ্নেও ভাবিনি। সাবিনা আমার সবচে’ প্রিয় শিল্পীদের একজন । লতা মুঙ্গেসকরও আমাকে ততো মুগ্ধ করতে পারে না। কিন্তু কলেজ জীবনে যখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে আমার দ্বারা  গায়ক হবার কোনো সম্ভাবনা নেই আমি যে গুনগুন করা ছেড়েছি, তাই নয়, এখন আর আমি কোনো গানের একটি কলিও মনে রাখতে পারি না। এ এক অদ্ভূত মানসিক অবস্থান। শুধুই মনে হয় কী হবে মনে রেখে? অথচ এই লেখা যখন তৈরি করছি তখনো আমার কম্প্যুটারে বাজছেন সুবীর নন্দী। গান না শুনে আমি কোন দিন কোনো লেখা পড়ার কাজ করতেই পারিনি।
                             দশমীর বিকেলে দুর্গা আবারো ট্রাকে চড়লেন। পেছনে গোটা শহরের যত জীপ রয়েছে, সংখ্যাটা আমার মনে আছে আঠারোটা, সেগুলোর এক দীর্ঘ লাইন। গোটা শহর তাতে চড়ে বসেছে। বিকেলের  আকাশ লাল হয়ে আসতেই সূর্যের সঙ্গে করে সমতলের কোলাহল থেকে বহু বহু দূরে একা এক কিফ্রি শহরের দুর্গার  শুরু হলো  দীর্ঘ বিদায় যাত্রা। কাছে পিঠে কোনো নদী ছিল না। অথবা কাছেই ছিল, কিন্তু এতো বিশাল উঁচু পাহাড়ের নিচে নামাটাইতো ঘন্টা কয়েকের যাত্রা। শরতের শুক্লা পক্ষ। এখানে ওখানে তুলো তুলো মেঘে সাজানো স্পষ্ট আকাশ । গোটা পাহাড় একসময়  জ্যোৎস্নাতে ঝলমল করে উঠল। সে রাতের জ্যোৎস্নার রঙ সম্ভবত কোনদিনই ভোলা যাবে না। কারণ ওমন বিসর্জনের যাত্রার অভিজ্ঞতাও আর কোনো দিন হয়ে উঠবে না।
                              ঝিঁঝিঁ পোকার সাম্রাজ্যে সেদিন হানা দিয়েছিল সেই গান , “ মারে ভাসাইয়া জলে কী ধন লইয়া যাইমু ঘরে...।” পরে জেনেছি, সে আমাদের সিলেট-কাছাড় অঞ্চলের এক জনপ্রিয় লোক গান। কিন্তু শিলরেতো সেটি শুনিনি কখনো। ওখানেতো চলে বিসর্জনের মহামিছিলে চলে ‘দম মারো দম... হরে কৃষ্ণ হরে রাম...” এখন সম্ভবত বাংলাব্যান্ড ‘দোহারে’র শিল্পীরা বিশ্বময় ঐ গানটিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। বছর কয় আগে যখন কালিকারা  তখনো তেমন নাম করেনি, টিভিতে দেখছিলাম ওরা ঐ গানটি কলকাতার কোনো বিসর্জনের ঘাটে বসে গাইছিল।  কিফ্রির মানুষগুলো যখন গাইছিল , “ মারে ভাসাইয়া জলে...।”  তখন কি আর ওরা শুধু দুর্গার কথা মনে রেখেই গাইছিল? দেশের বাড়িতে পড়ে থাকা বৃদ্ধা মায়েদের কথা, বাবাদের কথা --- সেই ভাইয়েদের কথা , বোনেদের কথা ভেবে কি তাদের চোখ থেকে দু’এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়েনি যাদের তারা মুখ দেখেন নি বহু বহু দিন। যাদের জন্য হয়তো এবারেও পুজোতে দুটো জামা কেনবার পয়সা পাঠাতে পারে নি, আর পারলেও তারা যে সময় মতো সেটি হাতে পেয়েছেন তার কোনো নিশ্চিতি নেই। আমি জানি, এরা সব্বাই বাড়িতে খাম, পোস্ট কার্ড কিনে এনে রেখেছেন। আর বিসর্জনের ঘাট থেকে ফিরেই রাতে নতুবা পরদিন সকালে সব্বাই বসে যাবেন আলাদা আলাদা করে বাড়িতে চিঠি লিখতে।  সেদিন দুপুরে পোস্টাপিসে সব্বাই আবার মুখোমুখী হবেন, বাড়িতে চিঠি পাঠাতে। “কত চিঠি লেখে লোকে-কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে।” প্রতিবার পুজোর পর আমি নিজেও যে নিজের চিঠিটা পোস্ট করবার পর থেকেই দিন গুনে থাকি  কবে আসবে এক গুচ্ছ চিঠি।  শুধু আমারই জন্যে। এবারেই শুধু তার ব্যতিক্রম হবে।
                 আঠারোটা গাড়ি যখন এক সঙ্গে পথ চলে তখন একটানা চলে না কখনো, এখানে ওখানে থামতে থামতে হৈহোল্লোড় করতে করতে দু’ঘন্টার পথ পাঁচ ঘন্টায় পার করে  দশমীর চাঁদ যখন ওনেকটাই মাথার উপরে উঠে এসছে তখন গাড়ি এসে থামল এক পাহাড়ি সেতুর পার করে।  গাড়ি থেকে যখন নেমে সবাই জড়ো হলাম তখনকারমতো কোনো অভিজ্ঞাতকে মনে রেখেই কি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে
                               বসন্তের এই মাতাল সমীরণে” যে ভদ্রমহিলাটি , “আমার এ ঘর বহু যতন করে /ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে/আমারে যে জাগতে হবে/কি জানি সে আসবে কবে...” এই বলে বনে গেল না তার মাথায় ছিট ছিল। বনে যারা গেছিল তারা  মাতাল ছিল বটে, কিন্তু ততোটা নয় যতটা হলে মেয়েদের আর বাচ্চাদেরো পাহাড়ের খাদ বেয়ে নিচে জলের কাছে নামতে দিতে পারে। সুতরাং আমরা রইলাম উপরে । বড়দের কেউ কেউ আমাদের সঙ্গ দিলেন। বাকিরা একচালা মূর্তি নিয়ে মুহূর্তে পাহাড়ের গায়ে মিলিয়ে গেলেন। আমরা শুধু শুনতে পারছিলাম দূর থেকে ‘দুর্গা মাইকি জয়!”  কোথায় গেলেন , কী করলেন কিচ্ছু দেখা যাচ্ছিল না। আমরা তখন শরতের এই জ্যোৎস্না মাখা সমীরণে মাতাল ছিলাম। যদিও নাচছিলাম সেই গানের তালে  , মাকে ভাসাইয়া জলে কী ধন লইয়া যাইমু ঘরে...।
                                                            (৪)
                                  পুজোর ক’দিনে আর দশমীর পর এবাড়ি ওবাড়ি যেতে আসতে কিফ্রি শহরের অনেকটাই আমার জানা হয়ে গেছিল। চেনা হয়ে গেছিল যাদের চেনা যেতে পারত। যারা আমাদের পরিবারের সঙ্গে কোনো না কোনো সম্পর্কে বাঁধা। দিনে দুপুরে কখনো একা কখনো ভাই বোনদের নিয়ে এবাড়ি ওবাড়ি যেতে আসতে কোনো বাধা ছিল না , তা যত দূরেই হোক। একেতো পথে গাড়িঘোড়া বিশেষ নেই, তার উপর পাহাড়ে এক আধটু শীত পড়লে যা হয় রোদের সস্নেহ ছোঁয়াতে গোটা দিন ঘুরে বেড়ানো যেতে পারে। লক্ষ্মী পুজোর দুপুরে মা আমাকে পাঠালেন ধরকাকুদের বাড়িতে। সম্ভবত পুজোর জন্যে দরকারি কিছু জিনিস দিয়ে আসতে এবং বিনিময়ে অন্য কিছু নিয়েও আসতে।  কী, সেটি মনে নেই। লক্ষ্মীপুজো যদিও যার যার বাড়িতে হবে তবু যেমন তখন দেশের বাড়িতে হতো এখানেও হৈ হোল্লোড়ের কোনো খামতি দেখিনি। বরং যারা  অবিবাহিত ছিলেন তাদের কারো বা কারো বাড়িতে ছিল বিশেষ নিমন্ত্রণ। যেমন রঞ্জিত কাকু। দিনে একবার এমনিতেই আসেন। লক্ষ্মীপুজোর সকালে দেখলাম তিনিই এসে এটি নিশ্চিত করে গেলেন যে আমাদের বাড়িতেই রাতে খিচুড়ি তৈরি হবে আর অর্ধেক কিফ্রি সেটি খেতে আসবে। কে কে আসবে, সে তালিকাও তিনি তৈরি করে গেলেন বাড়ি বাড়ি খবর দিতে। বিকেলে তিনিই এসে কোমরে গামছা বাঁধবেন, কথা রইল। এতে মানা করবার সাধ্যি কারো নেই, ইচ্ছেও নেই। কেননা তাতেই তো এই ঘরে দুটো লোক জোটাবার বাহানা পাওয়া যাবে। আর সেবারে  আমার উপস্থিতি ছিল এক বাড়তি বাহানা।  
                                     বাবা এখানে যে কোয়ার্টারে ছিলেন, সেটি ছিল দ্বিতল। এখানে স্টেট বেঙ্কের কর্মীরা বাবাকে নিয়ে তিনজনের পরিবার থাকতো। বাড়ির মালিক নাগা মানুষ। নাগাদের কোন শাখার মনে নেই, সুমি, সাংতাম কিম্বা ইয়েমচুঙের কোনো একটা হবেন। কেননা কিফ্রিতে ওদের উপস্থিতিই বেশি ছিল।  যদিও অনেকেই তখন পাকা ‘আসাম টাইপ’ ঘরে বাস করছিলেন ওরা উঠোনের শেষ প্রান্তে নাগা কায়দায় তৈরি কাঠ-বাঁশের মাচার মতো ঘরে বাস করতেই ভালো বাসতেন । সেটি ওদের জীবনধারার সঙ্গে সঙ্গতি পূর্ণ ছিল।  বাইরে থেকে দেখলে বোঝবার উপায়ই ছিল না যে ওরাই বাড়ির মালিক। সামাতুরে আমাদের বাড়িতে  নাগা মানুষের নিত্য আনাগোনা ছিল।  বাবা সেখানে খণ্ড উন্নয়ন অফিসে ( ভিডিও)  প্রথমে কাজ করতেন। বোধহয় তাই। এখানে সেরকম বালাই নেই। যা কিছু কাজ তা অফিসেই হতো। বাড়িতে অকাজের ভ্রমণ না হলে কেউ বিশেষ আসত না। এই বাড়ির মালিক ভদ্রলোককেও কখনো আমাদের ঘরে এসে দু’দন্ড বসে আড্ডা দিয়ে যেতে  দেখিনি। তারা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। পুজো চলে গেলেই শুধু ওদের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দেবার সুযোগ পেয়েছিলেন মা।
                                      ওদিকে পাশের ঘরে তখন কেউ ছিলনা। গোটা উপর তলাটা জুড়ে থাকতেন বেঙ্কের ম্যানেজার। একা এক মারাঠি ভদ্রলোক । আর বাড়ি থাকলেই কীসব পুজো পাঠ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু তার, এক ভৃত্য ছিল বিহারি মুসলমান। সে একাই বাড়িটার তাপ বাড়িয়ে   রাখত। নিচের তলাতে আমাদের দু’ঘরের রান্নাঘর ছিল পাশাপাশি। সুতরাং সেই ভৃত্যের সঙ্গে আমাদের দেখা দেখি হতো  রান্নাঘরের দাওয়াতেই বেশি। লক্ষ্মীপুজোর দিন তারও মনিবের ঘরে ছুটি। সে যোগ দিল আমাদের ঘরেরই কিছু খুচরো কাজে। সে খুব জোরে রেডিও বাজাতো। সেই রেডিও শুনলেই মনে হতো, আমরা এখনো পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনো গ্রহে পা দিইনি। তা নইলে, কাক পক্ষীর ডাক শুনবার জন্যেও কখনো হৃদয় কাঁদতে শুরু করত। শোনা যেত শুধু দূর পাহাড় থেকে ছুটে আসা বাতাসের ডাক। 
মা আমাকে একাই পাঠালেন ধরকাকুদের বাড়ি। ওরা আমার পূর্ব পরিচিতও ছিলেন।
From My Google Blog
              একবার সামাতুর গেছিলেন ওরা স্বামী স্ত্রী।  দু’রাত্তির থেকেছিলেন আমাদের বাড়ি ।তখন ওদের নতুন বিয়ে, এখন তিন সন্তানের মা-বাবা। বাবা কিফ্রি থেকে চলে আসবার অনেক দিন পরে অব্দি ওরা ওখানে ছিলেন। দীর্ঘদিন চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল। লিখতেন মূলত কাকু, আমাদের মাকে।  ওরা কলকাতার কাছে বাড়ি করছেন জানতাম, বড় ছেলেটিকে সেখানে কোথাও পড়তে পাঠিয়েছিলেন। তার পর আজ বহুদিন আর কোনো যোগাযোগ নেই। 
                                একা পথ হাঁটতে একটু ভয় যে করছিল না তা নয়, কিন্তু সাবালক হবার এমন স্বীকৃতি উপভোগ করতে কারই বা ইচ্ছে না জাগে। একা একা উপরের পথে চড়তে শুরু করলাম। সারামাটি পাহাড়টা দেখতে দেখতে হিসেব করছিলাম ওখানে যেতে কোন পথে কতদূরই বা যেতে হবে। বোন সঙ্গে নেই, সুতরাং শাসন করবার কেউ ছিল না। আমি তারিয়ে তারিয়ে পথের প্রতিটি ছবি চেখে চেখে এগুচ্ছিলাম। তখন একটু আধটু মেয়ে দেখার অভ্যেসও গড়ে উঠছিল না বললে, ডাহা মিথ্যে বলা হবে। পথে যেতে যেতে লাল নীল চাদর গায়ে  ওমন কিছু নাগা মেয়েরাও আমার দিকে এক আধটু  দৃষ্টি ছুঁড়ে দেবার করুণা         করছিল । বুঝিবা, ভাবছিল এ কোন দেশের রাজকুমার !আমিও হাঁটছিলাম, যেন রাজত্বটা একটু দেখে নিতে এসছি। কখনো ডাইনে, কখনো বাঁয়ে।  কখনো হাঁটছি তো কখনো দাঁড়িয়ে আছি। কখনো সামনে তো কখনো পেছনে চোখ আমার ঘুরছে ফিরছে। কোন তাড়া নেই। ওবাড়িতে যাবার কীই বা আনন্দ, যতটা রয়েছে পথের পরে।
From My Google Blog
                             কিফ্রি সাগরপার থেকে প্রায় ২,৯৪০ ফুট উপরে। তার থেকেও প্রায় ৮,০০০ ফুট উপরে সারামাটি পর্বতমালা। সারামটির কাছে কিফ্রিকে দেখলে মনে হয় যেন মায়ের কোলে শিশু শুয়ে রয়েছে।   শীতে সারামাটিতে বরফ জমে, কিন্তু আমার সে দেখবার সৌভাগ্য হয় নি। পরে একদিন এক বৃষ্টির ভোরে বোন তুলে দিয়েছিল ঘুম থেকে। ওর ধারণা ঠান্ডা যখন পড়েছে, পাহাড়ে তবে বরফ দেখা দেবে। প্রবল উত্তেজনায় , কেউ টেরটি পায়নি, আমরা দুই ভাইবোন নাগা-চাদর গায়ে ছাতা হাতে  বেরিয়ে পথের উপর। এ বাড়ি ওবাড়ির মুরগিরাতো সেই মাঝ রাতেই জেগে হাঁক পাড়ে, আর যে পাখিরা ছিল তাদের তখন ঘুম ভেঙেছে মাত্র ।  আর সব্বাই ঘুমিয়ে আছে।  স্বয়ং পথও এতো ভোরে ওর বুকের উপর আমাদের এই উপদ্রব আশা করেনি। কিন্তু বোন বেচারি দাদাকে দেখাবার উল্লাসে এটি মোটেও ভাবে নি যে মেঘলা ভোরে সামনের পথটাও ওখানে স্পষ্ট চোখে পড়ে না, দূরের সারামাটিতো কল্পনারও বাইরে। তবে বৃথা যায়নি সে জাগরণ। আমরা দুটিতে সেই ঝিরেঝিরে বৃষ্টিতে এক ছাতার নিচে হেঁটে হেঁটে চলে গেলাম বাবাদের বেঙ্কে। মেঘলা ভোরে পূব আকাশে অল্প অল্প রোদের আভাসের রূপ কেমন তা বলে দেখানো আমার সাধ্যি নেই। তার মধ্যে যদি এমন হয় যে আমরা দাঁড়িয়ে আছি লাল, হলদে,সাদা ডালিয়া ফুলের বাগিচায়। এক একটা গাছ সেখানে আমাদের দুটি কিশোর কিশোরীর মাথার থেকেও উঁচু । আশ মিটিয়ে দু’জনের হাতে যতটা ধরে ডালিয়া পেড়ে আমরা হাতে নিয়ে ফিরে এলাম, ঘর সাজাবো বলে।  সারামাটি তখনো মেঘের চাদর গায়ে শুয়ে ছিল।
                                  এই সারামাটি পর্বতমালার কোনো এক ঝরণা থেকে নেমে গেছে নদী বরাক। সোজা দক্ষিণে গিয়ে মণিপুরে ঢুকে গেছে। মণিপুর থেকে কাছাড় হয়ে অসমে। করিমগঞ্জে গিয়ে সুরমা কুশিয়ারা হয়ে বাংলাদেশে দেশে ঢুকে সেই নদী মেঘনাতে গিয়ে মিশেছে। ঐ নদীর উপর মণিপুরের  টিপাইমুখে বাঁধ হচ্ছে বলে এখন প্রতিবাদে ধরণিতল কাঁপিয়ে রেখেছে গোটা বাংলাদেশ ।  ওতো কথা তখন জানতাম না। আমরা এতো আত্মবিস্মৃত আর আত্মঘাতি মানুষ যে এখনো আমাদের পাঠ্য বইতে লেখে বরাক মনিপুর থেকে নেমে এসছে। ওদিকে আমরা ছেলে বেলা পড়েছি বরাক বুঝি নেমেছে পাটকাই পর্বতমালা থেকে। পাটকাই তিনসুকিয়ার একেবারেই কাছে অরুণাচল প্রদেশে এসে ছুঁয়েছে।  সেই বা কী করে হয়! বছর খানিক আগে ‘এবিওজিনেসিস’ (Abiogenesis ) নামে ডিমাপুরের একটি ব্যান্ড এই পাহাড়কে নিয়ে দুর্দান্ত গান বেঁধেছে ‘সারামাটি টিয়ারস’ । আমার সম্পাদিত পত্রিকা ‘প্রজ্ঞানে’ এ নিয়ে এক প্রতিবেদন তৈরি করবার বেলা ওদের সঙ্গে সারামাটির কথা আমি নিজেও এতো ভালো করে জানতে শুরু করি। যে সে ব্যান্ড নয়।  পূর্বোত্তর ভারতের সঙ্গীতের ঐতিহ্য নিয়ে বাকি ভারতের এখনো কোনো ধারণাই নেই। বিশেষ করে পাহাড়ি রাজ্যগুলোর । অভিমানে ওরাও বাকি ভারতের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ গড়েন বলে মনে হয় না। অথচ সিঙ্গাপুর থেকে সিকাগো ওদের খ্যাতি রয়েছে। অরুণাচলের এক লামা তাসি গ্র্যামী পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হবার আগে কেই বা জানত, আর তার পরেই বা ক’জন তাঁকে মনে রেখেছে !                     
                  ‘এবিওজিনেসিসে’র দুটো এলবাম ইতিমধ্যে দু’দুবার , ৫১ এবং ৫২ সংখ্যক গ্র্যামী পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হয়েছিল।  নিজেদের কিছু বাদ্য যন্ত্রও ওরা নিজেরা তৈরি করেছেন। তার মধ্যে একটি বাঁশে তৈরি বাঁশির মতো দেখতে। দলের প্রধান দুই সদস্য আর সদস্যা মোয়া এবং আরেনলা মিলে নাগা পরম্পরাগত বাঁশিতে সামান্য পরিবর্তন করে নাম দিয়েছেন ‘হাওয়ে’।  কিন্তু সেতো একালের  কথা । সত্য হলো তখন সেই পাহাড়ের নামটা  কিফ্রিতে তখনো কেউ বেশেষ  জানত বলে মনে হয় না। তারা শুধু জানতেন ওই পাহাড়টাই সবচে উঁচু, ওতে বরফ জমে। ঐ সারামাটির কোলেই কি সামাতুর? আমি জানি না। কিন্তু ‘সামাতুরে’র পর এই রহস্য ভরা ‘সারামাটি’র পর্বত আমার স্মৃতিতে এতোটাই  জায়গা করে নিল যে আজ এই আধা বুড়ো বয়সেও আমি কখনো এই আনন্দে ঘুম ছেড়ে জেগে উঠি যে সেই ভীষণ সুন্দর  পাহাড়ে আমি চলে এসছি। পা ফেলে রীতিমতো এর কোলে ঘুরে বেড়াচ্ছি। হয়তো আজ রাতেও ওদের দুটির সঙ্গে আমি আবার মুখোমুখি হ’ব। মুখোমুখি হতে চাই দিনে দুপুরে, কিন্তু হতে পারি কৈ। যেতে পারি কৈ? আমার সঙ্গে যাদের নিতে ইচ্ছে হবে তাদের সব্বাই এখন পাহাড় চড়তে ভয়ে পায়।    মাঝে মাঝে এও মনে হয়, গেলে কি আর কখনো আমার রাতগুলো  অমন দারুণ সব সুন্দর স্বপ্নময় হয়ে থাকবে  ? 
                        ধরকাকুদের বাড়ির পথে হঠাৎ দেখি  বাঁদিকের এক ছোট্ট শাখা পথ থেকে ( গলি বলা যাবে না)  দু’ট বাচ্চা নাগা ছেলে ট্রাইসাইকেলে পথে নেমে এসছে। ওপথে ট্রাইসাইকেল চালাবার বিপদ জানি। একবার পনঙ্কু আমাকে এরকম তুলে ছেড়ে দিয়েছিল। শুরুতে যদিও বা ভালই লাগল গতি বেড়ে যেতেই আমিতো থামেতেই পারি না। ভাগ্যিস নিচের মোড়টাতে গিয়ে পথ খানিকটা সমতল আর চওড়া হয়ে গেছিল। ওখানে গিয়ে সাইকেল আপনি থেমে গেছিল। কিন্তু ওরা বেশ সেই ঢালি পথে সাইকেল চালাচ্ছিল, আর থেকে থেকে পা নামিয়ে সেটি বেশ দাঁড় করিয়ে নিজেদের পালা বদল করছিল।  তাদের সেই খেলাতে আমার চোখ আটকে গেছিল বলে আমি দেখিনি উলটো দিক থেকে তখন তিনটি নাগা পুরুষ আমার দিকেই তাকাতে তাকাতে আমার সম্ভবত আমাকে নিয়েই কথা বলতে বলতে চড়াই উঠছিল। তার থেকে একজন এসে আমার পথ আটকে দাঁড়ালো। শুরুতে আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম।   কিন্তু ওর মুখে নীরব হাসি দেখে সে ভয় চলে গেল, সে জায়গা নিল ক্রোধ। এ কেমন ঠাট্টা, আমাকে কি বাচ্চা ছেলে পেয়েছে ? ঠিক কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এক সময় ক্রোধের জায়গা নিল লজ্জা। সে লজ্জা আমার মুখেও হাসি আনতেই সে সঙ্গীদের নাগাতে কিছু বলল। কিন্তু আমাকে  কিছু বলে না । আমি ডানে যেতে চাইলে সে ডানে পথ আটকায়, বায়ে যেতে চাইলে সে বায়ে।  আমি বলতেও পারি না, যেতে দাও। ততদিনে আমি নাগামিজ ভাষা ভুলে গেছি। দু’দিনের অতিথি হয়ে ভুল ভাষা বলে লোক হাসিয়ে হবে টা কী, তাই আর নতুন করে শিখবার চেষ্টাও করি নি। এক সময় আমার কান্না পাবার জোগাড় হলো, এতো আচ্ছা মুস্কিল হলো দেখি। কে বা কারা ওদের উদ্দেশ্যটাই বা কী, কিছুই বুঝতে পারছি না। ওভাবে কেউ কাউকে পথে আটকায় জানলেতো আর আমাকে একা আসতে দেয়াই হতো না। কী মনে করে যেন, ওরা একসময় নিজেদের মধ্যে হা হা করে হাসতে হাসতে আমার পথ ছেড়ে দিল। আমি দ্রুত পায়ে ধরকাকুদের বাড়ি চলে এলাম।
                     ওদের বাড়ির ছেলে মেয়েরা খুব সরল ছিল। আর ছিল মিশুকে। এই ক’দিনে আমি ওদেরও দাদা হয়ে গেছি। ওরা আমাকে বাড়ির বাইরেই পাকড়াও করে ভেতরে খবর দিল। ধরকাকু ওখানে এক সরকারী স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। সম্ভবত তাই তাঁর সেদিন বন্ধ ছিল। কাকু জিজ্ঞেস করলেন, কী রে পনঙ্কু তোদের বাড়ি যায় নি? ওতো তোকে দেখতেই যাচ্ছে! “প...ন...ঙ্কু!” আমি যেভাবে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। আমি যাই। বলে পা বাড়াতেই, কাকিমা ভেতর থেকে এসে বললেন, “আরে, যাবি। ও কিফ্রিতে থাকবেতো। তোর সঙ্গে দেখা না করে যাবে না।“ কে শোনে কার কথা! আমি যে কাজে মা পাঠিয়ে ছিলেন, সে কাজ চট জলদি সেরে জোরে পা চালালাম। এখনো আমাকে হাঁটতে হবে অ...নে...ক  পথ! ডিঙোতে হবে অনেক চড়াই ।
                   কেন ও বলল না, ও পনঙ্কু! কেন শুধু  কতকগুলো শুকনো ঠাট্টা করে চলে গেল? ওই  কী?  ও জানল কী করে আমি এসছি? যদি দেখাই করবে তবে আমাকে  অমন আসতে দিল কেন? ওরতো কথা ছিল আমাকে কাঁধে তুলে নেবে! ছোঁ মেরে সেই পুরোনো দিনগুলোর মতো আবার হারিয়ে যাবে পাইন বনে!  ছিল কী? পনঙ্কু কি এতো বুড়িয়ে গেছে? ও কি এতো মুটিয়ে গেছে? যে লোকটা আমার পথ আটকালো সেতো তেমনি ছিল দেখতে। ওর গায়ে ফুলহাতা কাজ করা কালো ডোরা কাটা সাদা সার্ট ছিল। পায়ে বুট জুতো। পনঙ্কুকে আমি দেখেছি সারাক্ষণ গায়ে একটা সাদা গেঞ্জি বা গেঞ্জি সার্ট পরে থাকতে। খাকি কিম্বা কালো পেন্ট ।   পায়ে চপ্পল কখনো থাকতো, কখনো না। শক্ত সমর্থ ছিল ,কিন্তু তেমন স্বাস্থ্য ছিল না।
                           সে ঐ খালি পায়ে , খালি গায়ে কিফ্রি চলে আসবে—অতোটা ভাবার মতো বুদ্ধু আমি ছিলাম না। কিন্তু মোটা হতে হবে আর চুলেও দু’একটা পাক ধরাতে হবে ----এমন কোনো শর্ত থাকবারওতো কথা ছিল না।
                          বাড়ি যেতে যেতে হাঁপিয়ে পড়েছি। কিছুটা ঘেমেও গেছি । কিন্তু এরই মধ্যে গোটা ঘর খুঁজে দেখি কোত্থাও কেউ নেই। মাকে জিজ্ঞস করলাম, ‘কেউ এসছিল?’  ‘কে আসবে?’ মায়ের পাল্টা প্রশ্ন,  “এসছিস যদি তাড়াতাড়ি স্নান করে আয়।” আমার কি আর তখন স্নানে মন? মায়ের প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারিনি , লজ্জায়। কী বলব?  সত্যটা কী ?  ও গেল কোথায়? আমার এই দৌড়ে আসাটাই যে বৃথা গেল।
তবু আসেই নি যখন, আমি স্নান সারতে গেলাম বাথরুমে । দু-এক মগ জল ঢালতেই শুনি উপরের সেই বাড়িতে নেমে আসার পথের থেকে ডাক, “ ও বাবুনি! কী করি আছা?” আমার হাত থেমে গেল, হৃদকম্পন বেড়ে গেল। “ কে এলো এই ব্যস্ত দিনে?” মায়ের   গলায় বিরক্তি। তার পরের ডাক একেবারে ঘরের ভেতর, “ তোমাখানর খবর লব আহিলোঁ।” ‘ ও! পনঙ্কু! আহা আহা।”  আমি কি খুব দ্রুত হাত চালিয়ে ছিলাম? মনে পড়ে না। এমনিতে একচোট হেসে ফেলেছিলাম ঐ স্নানের ঘরে বসে। ও ওই পথের উপর ঠাট্টাটা করে আমাকে মুস্কিলেই ফেলে দিয়েছিল। আমার ‘প্রেসটিজ’ বলে কিছু রইল না। ও আফটার  অল আমার মন্ত্রি ছিল। আমার নির্দেশ পালন ওর আজ ছিল। আজ  অমন আচরণ করল যেন, আমি এক বাচ্চা ছেলে আর ও জ্যাঠা মশাই।   এখন আমি ওর সামনে যাই কী করে?  কথাই বা কী বলব? আমিতো আর ওর ভাষা বলতে পারি না। ও বললে কিছুটা বুঝব, কিন্তু জবাবে রা করা প্রায় অসম্ভব ছিল। এই সত্য আমি এ ক’দিনে কিফ্রি থেকে বুঝেছি। নাগা কারো সঙ্গে আমি একটিও কথা বলতে পারি নি। পুজোর সময়ও অনেকে গেছিল পুজো দেখতে। কারো সঙ্গে আমার আলাপ করিয়েও দেয়া হয়েছিল। আমি শুধু মুখে এক চিলতে হাসি এনে মাথা নাড়িয়ে গেছি। এই ক’বছরে এতোটা দূরত্ব তৈরি হবে সে আমার কল্পনা করবারও দরকার পড়েনি কক্ষনো। দু’একটা শব্দ যে উচ্চারণ করতে পারব না তা নয়, কিন্তু যদি ভুল বলি--  সে লজ্জায় তাও বলিনি।
                             বাড়ির পেছন থেকেও বসবার ঘরে ঢুকে তবেই বিছানা ঘরে যাওয়া যেত। আমি চুপচাপ এক কোন দিয়ে বিছানা ঘরে ঢুকবার সময় ও ওর স্বভাব সুলভ গলা উঁচু করে আওয়াজ দেয়, “ হেইইই... কিমান টাইমতে আহিলে? “  কোনো জবাব না দিয়ে আমি দৌড়ে ঘরে। এই কথার অর্থ দুটো হতে পারে, ভাবছিলাম। “ কবে কিফ্রি এলে?”,  “ এখন যে কোথাও যাচ্ছিলে, কখন ফিরলে?” কী বিড়ম্বনা। এখন কোন উত্তর দিই? ছোট ভাইটি তখন পনঙ্কুকে ওর পুজোর নতুন খেলনা দেখাতে ব্যস্ত। বোন দৌড়ে এসে জানালো , “চিনিস? পনঙ্কুদা! সামাতুর থেকে এসছে!”  জ্যাঠাইমা!আমি চিনব না তো ও চিনবে? আমরা যখন সামাতুর শাসন করতাম ও তখন বিছানাতে বসে দুধ খেত।  জিজ্ঞেস করলাম, সঙ্গে দু’জন কে ?  ‘ওরা ওর এখানকার বন্ধু। ওর এখানে অনেকে আছে।” সঙ্গীরা সামাতুরের হলে কোনো কথা ছিল না। এখানকার বন্ধুতে আমার কী?   পনঙ্কু তখন বলে যাচ্ছিল মাকে, “ছেলে বড় হয়ে গেছে! ... আগের বার যখন আসি বাবু বলছিলেন পুজোর পরে এবারে ওকে নিয়ে আসবেন। চলে এলাম। ওকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি। দেখতে ইচ্ছেতো  হয়ই।”
                         এমনটাও হয় তবে? ও শুধু আমার জন্যেই এসছে! জোরে চুলে চিরুনি চালাতে গিয়ে শুনি ও বলছে, এসছিল পাশের গাঁয়ে ওর আত্মীয় কারো খবর নিতে । ধরবাবুদের বাড়ির কাছ দিয়ে আসবার সময় উনি জানালেন, করবাবুর ছেলে এসছে। তাই চলে এলো। সমস্ত উৎসাহ, সমস্ত উচ্ছ্বাস আমার চুল থেকে গড়িয়ে পড়া জলের সঙ্গে গলা  বেয়ে কাঁধ দিয়ে নেমে গেল। নেহাতই কৌতুহল বশে আমি ধীর পায়ে ওর কাছে গেলাম। ও আমাকে দু’হাতে জড়িয়ে কাছে  টেনে নিল। সসবই ঠিক ছিল।  কিন্তু এ সেই পনঙ্কু নয়।
                         যতক্ষণ ছিল ও আমাকে ছাড়েনি। কত কি জিজ্ঞেস করল , আমি দু’একবার ঘাড় নাড়ানোর বেশি কথাই বলতে পারলাম না। ও একা আসত, আমাকে ডেকে কাছে কিম্বা  দূরে নিয়ে যেত।  আমি ওকে বলতাম আমি ওর ভাষা ভুলে গেছি। ও নিশ্চয় আমাকে দু’একটা শিখিয়ে দিত। এখন এই এতোগুলো ওর পেয়ারের বন্ধুদের সামনে আমি বলি কী করে? আমি শুধু মাথা নেড়ে গেলাম, আর কথার জবাবে হাসবার অভিনয়টা করে ওর মান বাঁচালাম। কিন্তু ভেতরে এক তীব্র অপমান আমার সমস্ত শরীর জ্বালিয়ে যাচ্ছিল। এতো এতো দিনের অপেক্ষার পর, সেদিনগুলো ফিরে আসতে আসতেও যে ওমন রঙ পালটে ফেলবে কে ভেবেছিল? আমার যে মা ওকে রীতিমত শাসন করতেন, ওর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে শাঁসিয়ে বলে দিতেন, “আর কোনো দিন ভর দুপুরে  ওকে নিয়ে তুই ঐ  পাব্লিক ফিল্ড পার করে যাবি তোর হাড় ভেঙে দেব!” সেই মায়ের হাতে করে দেয়া  চা আর নারকেলের নাড়ু  খেয়ে ও দিব্বি রসের আলাপ জুড়েছে। আর আমি ওর কোলে বসে আছি যেন বাচ্চা ছেলে! ও কি জানে না আর দু’বছর পর আমি কলেজে যাব? ও কি আমার কাকা?  মামা?  জ্যেঠামশাই? ঘন্টা খানিক পরে ‘উঠি’ বলে বন্ধুদের নিয়ে যে বেরিয়ে চলে গেল সে তাই ছিল। তাকে নাম ধরে ডাকতে আমার লজ্জা করছিল। এ কথা বলার অর্থ ছিল না কোনো, কোনো ভাবেই, “ আবার কবে আসবে?” নীরবে বাড়ির বারান্দাতে দাঁড়িয়ে ওর চলে যাওয়া দেখলাম। 
                         আমার বন্ধু পনঙ্কু তখনো একা একা সামাতুরের ঘন জঙ্গলের পথে কোনো এক ঝরণা তলার দিকে এগুচ্ছে। ওখানে ওর বান্ধবী কেউ স্নান করতে গেছে। ওর কাঁধে    আমাদের ফেলে আসা বাড়িতে যে নতুন পরিবারটি এসছে তার বড় ছেলে। সে এখনো পাহাড়ে আছে। তার এখনো এই পাহাড় ছেড়ে নেমে যেতে অনেক দেরি...।

Thursday, 17 June 2010

It's the Human Being who created the Idea call "God'

One thing is positive about the 'Creator God'. At least those who have deep believe on that 'human-created idea' they can't be ego-centric beyond a limit.  Man neither created nor can create this universe. But, yea they have created the idea call 'God'.
Giving all the credit to that man-made idea call 'God' stops all the process of searching the truth about nature. All the credit should go to the nature itself and its laws. Those who can't imagine that nature itself has that capacity; they also can't imagine how powerful it is. So, we'll see that those believer fools often in the name of God declare that this earth will be destroyed on this or that day. As if, the very existence of this universe depends on these Fool's predictions.
Personally, I don't believe on that section of present day environment scientist as well, who believe that environment pollution or Global warming will destroy the human civilization.    Even God can do all the evil to human being if he don't get due PUZA, nature will not.
If we believe that human being is the nature's best creation then we also should believe that nature has all ready created some of its finest saver among human being. They are not Sadhus like Ravisankar or Saibaba or Pope Benedict but, the scientist or people with scientific temperament, who can explain to us if any information can pass through the black hole. No God Man in this world can move around this world in 90 minutes. Who can they are the greatest man or women of this human civilization. If we have to offer any kind of thanks & Gratitude to anyone, that should be done to those greatest son and daughters of this mother (Or you can say father) universe.

Sunday, 16 August 2009

Indepence day

I'm waiting for the day when our country would be totally free from western hegemony. Till then no celebration of independence day!