আমেরিকার আকাশ বাতাস এখন একটি মসজিদ নির্মাণের প্রশ্নে সরগরম। ঠিক মসজিদ নয়, ১১সেপ্টেম্বর, ২০০১এ ধ্বংশ প্রাপ্ত বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের নিচের তলার সামান্য কাছেই একটি ইসলামি কেন্দ্রের নির্মাণের প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতি ওবামা সমর্থণ জানিয়েছিলেন। যে কেন্দ্রে একটি মসজিদও থাকবে। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই দেশে মুসলমানদের অন্য সবার মতোই ধর্ম চর্চার সমান অধিকার রয়েছে। ব্যস! তাতেই চটে লাল আমেরিকা! এতো ভালো কথা সহ্য করতে তারা আর প্রস্তুত নয়। পরে তাঁকে একটু পিছিয়ে এসে বলতে হয়েছে, যারা সেই কেন্দ্র গড়তে চাইছেন তাদের উৎসাহিত করতে তিনি কিছু বলেন নি। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ন্যান্সি পেলসি বলেছেন, সংবিধান সব ধর্মের সমান অধিকার দিয়েছে বটে, কিন্তু একটি ধর্ম কেন্দ্র হবেটা কোথায় সেটি হবে একেবারেই স্থানীয় সিদ্ধান্ত। প্রতিপক্ষ রিপাব্লিকানেরাও দ্বিচারিতার নিদর্শন রেখে মুসলমানেদের অধিকারকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না। বরং উলটে ওবামাকেই ঝেড়ে কাশতে অনুরোধ করছে যাতে তাঁকে চেপে ধরতে সুবিধে হয়। রিপাব্লিকানদের হয়ে সবচে বেশি গলা উঁচু সেই মহিলা সারা পলিন্সের যিনি গেল নির্বাচনে উপরাষ্ট্রপতি পদে দাঁড়িয়ে উল্টপাল্টা মন্তব্য করে প্রচুর লোক হাসিয়েছেন, এবং এখন দুর্নীতির অভিযোগে হালে পানি পাচ্ছেন না। ইদানিং তিনি খুব ধর্মবাতিকগ্রস্থ হয়েছেন।
যারা এই ইসলামি কেন্দ্রটি গড়তে চাইছে তারা যে খুব ইসলামের বিজয় রথ ছোটাবার বাসনাতে কাজটি করছে তা কিন্তু নয়। তারা হচ্ছেন আমেরিকার সেই মুসলমান যারা লাদেনের পাপকে ধুয়ে দেবার জন্যে মাঠে নেমেছেন। ইসলামে দানবীয়করণের বিরুদ্ধে গোটা বিশ্বকে একটা বার্তা দেয়াই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। আর তাদের সঙ্গে যে শুধু মুসলমানেরাই রয়েছেন তাই নয়, রয়েছেন প্রচুর খৃষ্টান, এমনকি অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে তাদের সঙ্গে প্রচুর ইহুদীও রয়েছেন। যে সংগঠনটি এই ইসলামি কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল তাদের নাম ‘কোরডোবা ইনিসিয়েটিভ’ (Cordoba initiative)। কোরডবা হচ্ছে স্পেনের এক বিখ্যাত প্রাচীন প্রাক-ধর্মযুদ্ধ ইসলামি তীর্থক্ষেত্রে নাম। যায়গাটি তখন ইহুদি, খৃষ্টান , ইসলাম সহ নানা ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের জন্যে বিখ্যাত ছিল। সেখানে যে বিখ্যাত মসজিদটি ছিল ধর্মযুদ্ধের পরে সেটি এক খৃষ্টান চার্চে পরিণত হয়। আমরা সবাই জানি ধর্মযুদ্ধ খৃষ্টান চার্চগুলোর ধর্মীয় সহিষ্ণুতার সবচে’ কুখ্যাত নজির। সেই যুদ্ধ কেবল আরব উত্থানের পতন ঘটায় নি, গোটা ইউরোপকেও ঘনঅন্ধকারে ছেয়ে ফেলে। যাকে আমরা জেনে না জেনে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলে চিহ্নিত করে থাকি। প্রায়শঃ এই পদগুচ্ছ অকারণে ভারতের ইতিহাসেও প্রয়োগ করি। এহেন এক উদ্যোগকে যারা বাধা দিচ্ছেন আর ভাবছেন তাদেরকে ধর্মকেন্দ্র গড়তে দিলে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে নিহতদের অপমান করা হবে, তারা যে লাদেনবাহিনীর চে’ ভালো মানুষের দল নন, সেটি বুঝতে বুদ্ধি খাটাবার প্রয়োজন পড়ে না। বুদ্ধিমান অনেকেতো এও বলছেন ‘কোরডবাকে’ ধর্মকেন্দ্র গড়তে দিলে লাদেন সেটিকেও উড়িয়ে দেবেন। কিন্তু আপাতত লাদেনের খৃষ্টান প্রতিপক্ষরাই এর পথ আটকে তার কাজ কমিয়ে দিচ্ছেন । অথচ যে নিউইয়র্কে কেন্দ্রটি হবে, সেখানে প্রায় পাঁচ লক্ষ মুসলমান রয়েছেন আর রয়েছে অজস্র মসজিদ। তাতে এই আরেকটা যোগ হবে মাত্র। কিন্তু এক নতুন বার্তা নিয়ে। সেটি যারা হতে দিচ্ছেন না তারা স্পষ্টতই চাইছেন না ইসলাম তার পুরোনো গৌরবময় পরিচয় ফিরে পাক। পেলে যে মধ্য এশিয়াতে মার্কিনি তেলচোরাদের আসন্ন বিপদ!
ইতিমধ্যে নানা কারণে ওবামার জনপ্রিয়তাতে ভাটা পড়েছে । সামনেই , নভেম্বরে সিনেটের কিছু আসনে মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে। তার আগে সে জনপ্রিয়তাতে আর ভাটা পড়ুক সেটি তিনি বা দল চাইছেন না। কিন্তু সম্ভবত আঁচড় যা পড়বার তা পড়ে গেছে। আমেরিকা জুড়ে ইসলাম বিরোধী প্রচার কিছু তো বেড়েইছে, সেই সঙ্গে এই বিশ্বাসও বেড়েছে যে ওবামা আসলে অন্তর থেকে একজন মুসলমানই।
জাতি রাষ্ট্র, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে পশ্চিমী দেশগুলোর সাধারণত অহংকারে মাটিতে পা পড়েনা। ওদের থেকে পাঠ নিয়ে আমাদের দেশেও অনেকে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার পাঠ নিতে বলেন। তার মধ্য , কিছু আগ মার্কা বামপন্থীও রয়েছেন। কিন্তু , আমেরিকার ঘটনাক্রম দেখে মনে হচ্ছে না কি যে ওরা আমাদের থেকে আর যাই হোক এ ব্যাপারে মোটেও বেশি সভ্য নয়! কল্পনা করুন যে মুম্বাইর হোটেল তাজের কাছে এক মসজিদ তৈরির কথা বললেন, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আব্দুল কালাম , কিম্বা কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধি। কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, শিবসেনা, ভাজপারা কী বলতে পারে আমরা সহজেই আঁচ করতে পারি। আব্দুল কালামকে পাকিস্তান আর সোনিয়া গান্ধিকে ইতালি পাঠাবার ব্যবস্থা করে দিলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না! দু’জনকেই তার পরে সিদ্ধি বিনায়কের মন্দিরে গিয়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করে আসতে হতো। আমেরিকার রাষ্ট্রপতিকেও ঠিক তেমনটাই করতে হয়েছে!
ইতিমধ্যে সরকারীভাবে ঘোষণা দিয়ে জানাতে হয়েছে যে রাষ্ট্রপতি ওবামা একজন নিষ্ঠাবান খৃষ্টান এবং রোজ প্রার্থণা করেন। ধর্মীয় উপদেষ্টার পরামর্শ না নিয়ে তিনি দিনের কোনো কাজই করেন না। তার জন্যে কেউ তাঁকে ধর্মান্ধ বা মৌলবাদি বলছে না! তাঁর বাবা মুসলমান ছিলেন, তিনিও মুসলমান হতেই পারেন। এই সরল কিম্বা জটিল বিশ্বাস থেকেও এই ক’দিন আগও কিছু মানুষ তাঁকে মুসলমান বলে ভাবতেন। সম্প্রতি নানা কারণে এমন বিশ্বাস করবার লোক বেড়ে গেছিল। ওই মন্তব্যের দিন কতক আগেই পিউ গবেষণা কেন্দ্র বলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা দেখিয়েছিল ওবামাকে মুসলমান বলে মনে করবার মত লোক ১১% থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ শতাংশ । প্রতি পাঁচজন মার্কিনিদের মধ্যে একজন ভাবছেন ওবামা একজন মুসলমান । ঐ মন্তব্যের পর আগষ্টের মাঝামাঝি টাইমস মেগাজিন আরেকটি সমীক্ষা চালায়। তাতে সেই পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ২৪ শতাংশ। তারা ভাবছেন ওবামা একজন মুসলমান তাই ওমন কথা বলেছেন। তিনি যে একজন সৎ মানবতাবাদির অবস্থান থেকে কথাটা বলতে পারেন এই সহজ সত্য ওদের সাদা চামড়াতে ঢাকা উন্নত মস্তকে কিছুতেই ঢুকতে চাইছে না । ৪৭ শতাংশ লোক অবশ্যি সেরকম ভাবছেন না, কিন্তু তাতে ওবামা আশ্বস্ত হলেও আমাদের হবার কোনো কারণ নেই। কারণ তাঁরা এই ভেবে তুষ্ট যে তিনি একজন নিষ্ঠাবান খৃষ্টান। মাত্র ২৪ শতাংশ এ নিয়ে কোনো মত জানান নি।
ওই যারা মত দেননি তাদের সংখ্যার থেকে অল্প কিছু বেশি লোক বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের সামনে ইস্লামিক কেন্দ্রটি গড়বার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের সংখ্যা ২৬ শতাংশ। তাদের কেউ কেউ সেই অধিকারের পক্ষে লড়াই চালাবার সাহসও গুটিয়ে নিয়েছেন। এবং বাণিজ্য কেন্দ্রের সামনে গিয়ে ধর্ণাও দিচ্ছেন। এর মধ্য অভিশপ্ত সেপ্তেম্বরে নিহত আহতদের পরিবারের অনেকেও রয়েছেন, যারা মনে করেন ঘৃণা কখনো ঘৃণার নিদান হতে পারে না। তাদের সংগঠনটির নাম “September 11th Families for Peaceful Tomorrows” । তারা এও এই বলে সভ্যতার চরম নিদর্শন উপস্থিত করছেন, “What better place for healing, reconciliation and understanding than Ground Zero? We honor our family members by practicing American principles and moving forward from Ground Zero to a future of peaceful coexist” পিউ গবেষণা কেন্দ্রটি যে সমীক্ষা চালিয়েছিল তাতে মার্কিনি রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে কিছু মজার তথ্য বেরিয়ে এসছে। বিতর্কিত মন্তব্যটি করাবার আগেই যে কিছু লোক ওবামাকে মুসলমান বলে ঠাউরেছিল তার কারণটি কিন্তু আর কিছু নয়, তিনি তার আগেকার রাষ্ট্রপতিদের থেকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে কম হাজিরা দিচ্ছেন। এর মানে, এখনো সে দেশে এক রাষ্ট্রপতির কাছে ধর্মের, তাও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের, থেকে দূরে সরে থাকাটা ভারতীয় উপমহাদেশগুলোর যেকোনো দেশের মতোই খুব একটা নিরাপদ নয়। এখনো ৪৮ শতাংশ মার্কিনি লোক মনে করেন রাষ্ট্রকে ধর্মের থেকে দূরে সরে থাকা উচিত নয়। এই সংখ্যাটা ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ এর আগের দশক থেকে সামান্য কমেছে মাত্র!
অনেক ভারতীয় কালো সাহেবেরাও মসজিদ নির্মাণ নিয়ে করা ওবামার মন্তব্যকে ভালো চোখে দেখেন নি। তাঁরাও ইসলামী আতঙ্ককে বিশ্বের সবচে বড় বিপদ হিসেবে দেখেন, এবং কোনো মুসলমান ধর্ম কেন্দ্রকে বিশ্বাস করতে পারেন না। আজকাল যে আমেরিকা আর ইউরোপের দেশে দেশে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচার ও ব্যবস্থা নেবার প্রবণতা বেড়েছে তাতে তাঁরা খুব হ্লাদিত। তাঁদের ধারণা, এর ফলে পৃথিবী ইসলামী সন্ত্রাসবাদ নামের ‘দানবীয়’ বিপদ থেকে মুক্ত হবে। তাঁদের সাহেব প্রীতিতে অন্ধচোখ দেখেও না যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাতে কিছু মৌলবাদি যদি তিন হাজার লোককে মেরেছিল, যারা মৌলবাদি নয় বলে বড়াই করে সেই সাহেবদের, পশ্চিমী দেশগুলো সেই বাহানা নিয়ে আফগানিস্তান নামের দেশটির ভেতরে ঢুকে আজ প্রায় একটি দশক জুড়ে ঘাটি গেড়ে বসে মেরেছে তার থেকে বহুগুণ বেশি সাধারণ নিরীহ মানুষ । বছরে সেই সংখ্যা হাজার ছাড়ায়। তারা জোর করে বা ভয় দেখিয়ে সামরিক ঘাটি করে বসে আছে মধ্য এশিয়ার প্রায় সমস্ত দেশে। কোনো এক সুদূর আশির দশকের শুরুতে পৌনে দু’শো কুর্দ নাগরিককে মারবার অপরাধে যারা সাদ্দামকে বিচারের প্রহশনে বসিয়ে মেরে ফেললে, তারা এই সাত বছরে মেরেছে ১ লক্ষ ৬১ হাজারেরো বেশি ইরাকি মানুষ। সাদা কিম্বা কালো কোন সাহেবদের চোখেই এই মৃত্যু কোনো আতঙ্কের ব্যাপারই নয়! মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর দখলদারি নিয়ে মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যেও মারামারি করে ওই সাহেবেরা। কারণতো একটাই মাটির তলার তেল সাবাড় করো আর যুদ্ধের বাজার ছড়িয়ে চলো।
ফ্লরিডার ডোভ ওয়ার্ল্ড আউটরিচ সেন্টার বলে এক খৃষ্টীয় চার্চ আগামী ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে ওই বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের সামনে কোরান পোড়াবে বলে হুমকি দিয়ে রেখেছে। তারা সেই দিনটির নাম দিয়েছে ‘কোরান পোড়ানোর দিন’। কার্ল মার্ক্সের মতো নিন্দিত নাস্তিক জানতেন যে যিশু খৃষ্টের মতো কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন না। তারপরেও ওই কাল্পনিক ভদ্রলোকটির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার অন্ত ছিলনা। এই তথ্য বহু মার্ক্স বিরোধীতায় অন্ধদের কিম্বা অন্ধ মার্ক্সবাদি নাস্তিকদের জানা নেই। তাঁর মতে খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতক অব্দি খৃষ্ট ধর্মই ছিল রোমান সভ্যতার সমাজবাদ! সেই খৃষ্ট ধর্মের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবার মতো লোক সংখ্যাতে নগন্য হলেও অভাব নেই। The Christian Science Monitor বলে একটি বৈদ্যুতিন কাগজে ডান মারফি লিখেছেনঃ The increasingly acrimonious debate over the construction of the so-called Ground Zero mosque in Manhattan, about two blocks away from the World Trade Center towers that were destroyed by Al Qaeda on Sept. 11, 2001, echoes similar debates in Europe and could, if the rhetoric becomes commonplace, have broad and negative ramifications for the integration of America's growing Muslim population ।
এই সহজ বুদ্ধির লোকের সংখ্যা কমে গেছে আজকের মার্কিনি সাম্রাজ্যবাদিদের শাসিত এবং অনুগত বিশ্বে। বিপদ এইখানেই মারাত্মক। ওবামা এই সহজ বুদ্ধির থেকেই কথাগুলো বলেছিলেন। কিন্তু, তিনিও এই ব্যবস্থার দাস, তাই তাঁকে আপাতত পেছনে হাঁটতেই হলো। কিন্তু তর্কের যে ঢেঊ উঠল তা, ধর্ম এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে গোটা পৃথিবীকে আরো একবার কাঁপাবে। আমাদের দেশের ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে যারা বেশ গৌরবান্বিত, তাদের কথা নাহয় বাদই দিলাম, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গিয়ে যারা ইঊরোপের জাতিরাষ্ট্রগুলোর নজির দিয়ে ভাষা নির্ভর জাতীয়তাবাদের পক্ষে ওকালতি করেন, তাঁরাও তাঁদের তত্বর বিশুদ্ধতা আর ফাঁকির যায়গাগুলো নিয়ে আরেকবার ভাবতে শুরু করলে আমরা ভবিষ্যত নিয়ে আশান্বিত হতে পারি।
আপাতত নইলে ‘কোরান পোড়াবার দিন’ পালিত হোক। ওদের ক্ষমতা আছে পালন করবে, কে ঠেকাবে! কিন্তু সেদিন আসবে খুব শীঘ্রই, যেদিন ঐ তেল আর রক্তচোরা সাদা সাহেবদের কেয়ামতের দিন পালিত হবে গোটা বিশ্বে, মায় আমেরিকাতেও! সেই অপেক্ষাতে আমাদের কাটবে আরো কিছু দিন, হয়তো কয়েকটি বছর কিম্বা দশক। কিন্তু আসবে , সে নিশ্চিত !
বাংলাতে একে কী বলা যাবে আমি নিশ্চিত নই। বোধহয় বিষয় ও ভাষার জটিলতার জন্যে ইংরেজি দু’একটা কাগজের বাইরে ভারতীয় ভাষার অন্য কাগজগুলো এ নিয়ে বেশি মাতামাতি করেনি। আমি বাংলাতে লিখলাম ‘পারমাণবিক ক্ষয়-ক্ষতির সামাজিক দায় বিল ২০১০’ ইংরেজিতে এটিকে বলা হচ্ছে ‘Civil Liability for Nuclear Damage Bill 2010’. সরকারও সাহস করেনি একে সরবে সংসদে নিয়ে আসতে। যেটুকু আওয়াজ না করলেই নয় তাই করে গেল ১৫ মার্চে লোকসভাতে আনতে গেছিল সেই বিল। কিন্তু সমস্ত বিরোধীদের এক যোগে বিরোধের ফলে সেটি আটকে গেছে। বলা ভালো আটকে আছে।
পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজন টয়োজন নিয়ে গেল বছর খুব একগুচ্ছ বিতর্ক হয়ে গেছিল। তখনই মার্কিনি দাসত্বের অভিযোগ উঠেছিল এই সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু এবারেরটা একেবারেই নগ্ন। কল্পনা করুন যে ভূপালের চেয়েও ভয়ঙ্কর কোনো দুর্ঘটনা ঘটালো কোনো কোম্পানী , যার আশঙ্কা করেই অনেকে পারমাণবিক শক্তির বিরোধীতা করে থাকেন, তখন আপনি ঐ বিদেশি কোম্পানীকে আর কোনো ধরা ছোঁয়ার মধ্যে পাবেন না। লাভের ভাগ নিয়ে ও চম্পট দেবে, লোকসানের ভাগ নিয়ে আপনি মরতে থাকুন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। এই হচ্ছে এই বিলের সার কথা!
ইতিমধ্যে ওয়েস্টিং হাউস এবং জেনারেল ইলেক্ট্রিক কোম্পানী দুটো এ দেশে বেশ ক’টি কোটি কোটি ডলারের পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপন করতে এগিয়ে এসছে। কিন্তু আসবার আগেই ওরা নিশ্চিতি চাইছে ভূপাল দুর্ঘটনার পর ইউনিয়ন কার্বাইডের যে সামান্য ভোগান্তি হয়েছে তাও যেন না হয়। সে নিশ্চিতি এতোটাই যেটুকু ওদের নিজেদের দেশ আমেরিকাও ওদের দেয় না। ওদের এই আকাঙ্ক্ষা নিজেই প্রমাণ করে শক্তির পারমাণবিক বিকল্প কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে!
এই বিল অনুযায়ী দুর্ঘটনার শিকার কোনো পক্ষের থেকেই ভারতে বা ওদের নিজেদের দেশে কোনো ধরণের মামলা মোকদ্দমা করা যাবে না। দুর্ঘটনার কোনো ধরণের দায় ওদের থাকবে না। দায় বর্তাবে ভারত সরকারের ঘাড়ে । বিলের ধারা ৭ বলছে, “Central Government shall be liable for nuclear damage in respect of a nuclear incident” কেননা বিদেশিদের তৈরি কেন্দ্রগুলোর মালিকানা বুঝি ভারত সরকারের । ব্যাপারটা একটু জটিল বটে। ভারত সরকারের হয়ে ওই শক্তি কেন্দ্রগুলো চালাবে কিন্তু Nuclear Power Corporation of India Limited (NPCIL). তারপরেও বিলে প্রায়ই ভারত সরকার ও পরিচালক (Operator) শব্দগুলো কিন্তু আলাদা করেই বলা আছে। বিলের ষষ্ঠ ধারাতে সরকার ও পরিচালকের যৌথ দায়ের চূড়ান্ত সীমা বেঁধে দিয়ে বলা হয়েছে, “the rupee equivalent of 300 million special drawing rights (SDRs),” এটি খুব প্রায়োগিক ভাষা। টাকার ভাষাতে এর অর্থ হলো দু’হাজার সাতাশি কোটি টাকা ( ২০৮৭ কোটি) বা পঁয়তাল্লিশ কোটি আশি লক্ষ (৪৫৮ মিলিয়ন) ডলার । সমপর্যায়ের মার্কিনি আইনে (প্রাইস এন্ডারসন আইন) ব্যক্তিমালিকানা কোম্পানীগুলোকে যে দায় বহন করতে হয় এর পরিমাণ তার থেকে এক নয়, দুই নয়, তেইশ (২৩!) গুণ কম। এর মধ্যে আবার পরিচালন সংস্থার দায় মাত্র পাঁচশ কোটি টাকা ( ৫০০ কোটি) । সে যারই দায় হোক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে দায় এ দেশের আমজনতার ঘাড়েই চাপছে। যখন কিনা , যে আমেরিকার চাপে আইনটির খসড়া তৈরি হয়েছে সে দেশেও এমন বিধঘুটে ব্যাপার নেই! এমন কী দায়ভারের কোনো চূড়ান্ত সীমাও ওখানে বেঁধে দেয়া নেই।
ভারত সরকারের অধীন পরিচালন সংস্থা এন.পি.চি.আই.এল. ইচ্ছে করলে নির্মাণ চুক্তি করবার বেলা কোনো কোম্পানীর ঘাড়ে সে দায় চাপাতে পারে কিন্তু সেটাও ঐ ৫০০ কোটি টাকার উপরে যাবে না , কিছুতেই। কিন্তু সেটাও আদায় করাবার দায় ওই ভারতীয় পরিচালন সংস্থারই। আর কোনো ভারতীয় ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি বা সংস্থা স্বদেশে বা ঐ কোম্পানীর দেশে কোনো মামলা করতে পারবে না। অর্থাৎ , এই গণতন্ত্রের জয়ধ্বজা তুলবার যুগেও পৃথিবীর সবচে’ শক্তিশালী গণতন্ত্রের চাপে সবচে’ বড় গণতন্ত্রের দেশে এই মহাপুরুষেদের কোম্পানীগুলো থাকবে সমস্ত আইনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওদের গাফিলতির জন্যে আপনার গাঁ-গঞ্জ উচ্ছন্নে গেলেও আপনি ওদের টিকিটির নাগাল পাবেন না। ভারতীয় আইন ব্যবস্থাকে ওরা সহজেই বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে প[রবে! ধারা পঁয়ত্রিশে বলা হয়েছে, “No civil court shall have jurisdiction to entertain any suit or proceedings in respect of any matter which the Claims Commissioner or the Commission, as the case may be, is empowered to adjudicate under this Act and no injunction shall be granted by any court or other authority in respect of any action taken or to be taken in pursuance of any power conferred by or under this Act,”
পারমাণবিক ক্ষয়ক্ষতি দাবি কমিশন একটা থাকবে (Nuclear Damage Claims Commission) ওদের রায়ই চূড়ান্ত হবে এর বিরুদ্ধেও কোথাও কোনো মামলা করা যাবে না। মার্কিনি আইনে কিন্তু মার্কিন আদালতকে পুরো স্বাধীনতা দেওয়া রয়েছে। ক্ষতির দায় দাবি করবার সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে নতুন বিলে । আঠারো ধারাতে বলা হয়েছে দশ বছর পর করা কোনো দাবি গ্রহণ করা হবে না। আম পাঠকের মনে হতে পারে , এতো অনেক বেশি সময়। কিন্তু যারা জানেন, পারমাণবিক ক্ষতির সময়ের বিশাল ব্যাপ্তির কথাটা তাদের কাছে এই সময় অতি নগণ্য মাত্র।
এই শক্তিকেন্দ্রগুলো থেকে যে মুনাফা হবে তার কথা মাথায় রাখলে এই যে রেহাই ওদের দেয়া হচ্ছে সেটিকে ভারতীয় আম জনতার সঙ্গে করা এক নিষ্ঠুর রসিকতা বলেই মনে হবে। শুধু কি তাই! আমাদের স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে যে এই শক্তি কেন্দ্র গুলো দেশের বিদ্যুত সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু ওরা যাতে ভারতে বাজারজাত করতে পারার মত কমদামে বিক্রী করে সে ব্যাপারেও এই আইনে ওদের ব্যাপক ছুট দেবার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ওখানেও অনেকটা ছাড়ের দায় বহন করবে ভারতীয় পরিচালন কমিটিটি।
আমেরিকার ওই কোম্পানীগুলো ছাড়া ভারত যে আর কোনো আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে তাও নয়। বস্তুত চের্নোবিল দুর্ঘটনার পর থেকে এমন এক আন্তর্জাতিক দায় দায়িত্বের আদর্শ স্থাপনের চেষ্টা হলেও তা খুব একটা শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াতেই পারেনি। এমন অবস্থায় এই বিল এমন এক ধারণা দিতে চাইছে যেন ভারত এক আন্তর্জাতিক কর্তব্যের দায় বহন করতে চলেছে। এই যদি সে দায়ের নমুনা হয়, তবে বলতেই হবে উন্নয়নের লোভে এবং তার নামে ভারত অমানবিকতার এক অত্যন্ত নিকৃষ্ট নমুনা পেশ করতে চলেছে। এই আদর্শে মুনাফাটা বিদেশী, কিন্তু ক্ষতিটা স্বদেশী। মুনাফা ব্যক্তিক, কিন্তু ক্ষতিটা সামাজিক! ভারতের সরকার যে এ দেশের মানুষ নয়, বরং বিদেশের কয়েকটি কোম্পানী চালাচ্ছে এর চে’ নির্লজ্জ উদাহরণ আর কী হতে পারে!
ভারতের কিন্তু রাশিয়া ঐ ফ্রান্সের সঙ্গেও পারমানবিক ব্যবসা ও চুক্তি রয়েছে। ওদেরো ওমন এক আইনের দরকার নেই এ দেশে ব্যবসা করতে। মজার কথা এই যে পারমাণবিক শক্তি মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাবিত বিলের বিরুদ্ধে এবারে কেবল বিরোধীরাই নয়, খোদ সরকারেরই বিভিন্ন মন্ত্রক প্রতিবাদের বিণ বাজাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রক এতোটা আর্থিক দায়ভার নিতে প্রস্তুত নয়, পরিবেশ মন্ত্রক পরিবেশের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে চিন্তিত। বোধ করি তাতেই সরকার একটু নড়ে চড়ে বসেছে। কিন্তু খুব যে একটা পিছু হটবে তা মনে হয় না। কেন না, ২০০৮এর ভারত মার্কিন পারমাণবিক চুক্তির এটা এক বাধ্যবাধকতা। তখনই ঠিক হয়ে আছে যে ভারতের Nuclear Power Corporation of India Limited (NPCIL) হবে শক্তি কেন্দ্রগুলোর পরিচালন কর্তা। এই কর্তাটিই লাঠি হাতে দারোয়ান। রাতে চুরি হলে সব দায় ওর। নির্মাণ ও সরবরাহের কাজটা করবে মার্কিনি কোম্পানীগুলো। মুনাফাটাও ওরা নিয়ে যাবে। কিন্তু কেউ যাতে এখানে ওদের টিকি ধরে টান না দেয় তার নিশ্চয়তা দিতে অরকম একটা আইন আনতে হবে। সরকার এখন সেই নির্দেশনামাই অনুসরণ করছে। এটা না করতে পারলে দু’বছর ধরে বাজানো সব ঢাক ঢোল অথলে গেল! দেখা যাক , এখন স্বপ্নের পারমাণবিক বিদ্যুতের বিনিময়ে ভারতের মানুষ ঠিক কতটা মরতে তৈরি হোন।
বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র হবারসুবাদে এক সময় আমার ইংরেজিলিখতে হাত কাঁপত। বলতে হলেবোধহয় এখনো ঠোঁট কাঁপবে। আজআমি একটি কাগজ( প্রজ্ঞান) নিয়মিতসম্পাদনা করি যার বেশির ভাগলেখাই থাকে ইংরেজিতে।এ দরকারেএবং আনুষঙ্গিক আরো অজস্রদরকারে আজ আমাকে রোজ ইংরেজিলিখতে হয়। আমার হাত কাঁপে না।কারণটি, আরকিছু নয়। ইচ্ছা,নিষ্ঠা, দৃঢ়তা–এই ভারি শব্দগুলো উচ্চারণকরা যেতেই পারে। কিন্তু সহজশব্দটি হচ্ছে‘কম্প্যুটার’।আজ অনেকদিন ধরে কলম চালাই না।পিড়িতে বসেরাতের খাবার নাখেয়েওযদি কোনো বাঙালির লজ্জানা হয়, আমারতবে কলম না চালাবার জন্যেলজ্জা কিসের?
দুটোইলেখার যন্ত্র। তাতে, কম্প্যুটারেওহাত কাঁপবার কথা ছিল বটে ।কিন্তু কাঁপে যে না, তারকারণ এর সঙ্গে এক বিশাল অভিধানপাওয়া যায়। যে আপনা আপনি আমারলেখার ভুল ধরে ফেলে এবং মুহূর্তেঠিক করে নিতে পারি। অনেক সময়আমার বাক্যের ভুলও ধরে দেয়কম্প্যুটার। অন্ততঃ কলমেলিখলে যতটা ভুল থাকতে পারততার প্রায় আশি শতাংশই এখনথাকবার সম্ভাবনা নেই। আর এইইংরেজিতেই আমাকে আমার লেখালেখিরএবংপত্রিকা সম্পাদনার কাজেদেশে বিদেশে বহু লেখকের সঙ্গেযোগাযোগ করতে হয়। দেশে বিদেশেযোগাযোগ করতে হলে যে আন্তর্জালিকার( ইন্টারনেট) দরকারপড়ে সেতো অভিধানকে আরো বিশালকরে দিয়েছে। আপনি যে ইংরেজিশব্দটিএম.এস.ওয়ার্ডেখুঁজে পাবেন না, তাকেসেখান থেকেই ক্লিক করে দিন, সেআলাদীনের প্রদীপের মতো সারাপৃথিবী থেকে খুঁজে এনে সেইশব্দের অর্থ আপনার ডান হাতেরকাছে ফেলে দেবে। সুতরাং আরভয় কিসের? আপনাকেবিশেষ শ্রম করতে হবে না।
আচ্ছাকেমন হতো, যদিআপনি এরকমই নির্ভয়ে বাংলালিখতে পারতেন? আমারএ ক’বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতেপারি অসম তথা পূর্বোত্তরভারতের বহুপাঠকই মন খারাপকরে বলবে, ওটিহবার নয়! ছাপাখানাতেযে বাংলাতে কাজকরা যায় এইযথেষ্ঠ। বিশ্বায়নের যুগে এমনবাংলার বিশ্ব জয়ের স্বপ্নদেখাই বৃথা। বিশেষ করে আমারমতো বাংলার ছাত্রই যখনগৌরবেরসঙ্গে শোনাচ্ছি ইংরেজিতেহাত পাকাবার গল্প, তখনআর ভরসা কোথায়!
যেবাঙালিরা আমার সঙ্গে রোমানঅক্ষরে বার্তা বিনিময় করেন, তাদেরবেশির ভাগই অসমের লোক। তাদেরআমি প্রায়ই রসিকতা করে শোনাই‘ত্রয়ী’ছবির কেষ্ট মুখার্জীরসেই বিখ্যাত সংলাপ, “বাংলায়ফিরে এসো, বাবা!” ইংরেজিতেইবিশ্বায়ন হবে –এটি যে কেমনসেকেলে আর উত্তর ঔপনিবেশিকধারণা তা আগামী কয়েক বছরেরমধ্যেই আমাদের সব্বার চোখেরসামনে জলের মতোই স্পষ্ট হয়েযাবে।সেই ২০০২তে তিনসুকিয়াথেকে প্রকাশিত ‘দৃষ্টি’বলেএকটা কাগজে আমার তখনকারঅধ্যয়ন-অনুসন্ধানেরউপর ভিত্তি করে‘অসমেব্যবহারিক বাংলা শিক্ষারসংকট’নামে এক প্রবন্ধেলিখেছিলাম“কম্প্যুটারইংরেজি ছাড়া বোঝেনা—এ অবশ্যডাহা মিথ্যা প্রচার।তাযদি সত্যও হয় তবে ভারতবর্ষসেই দেশ যেখানে তাকে বহু ভাষারপাঠ দেয়া যায়।সেপাঠ না নেয়, তবেপুরোনো প্রযুক্তির আস্তাকুড়েতাকে ঝেড়ে ফেলে আমাদের তৈরিকরে নিতে হবে আরো আধুনিক সেইযন্ত্র যে ঈশ্বরের পাশে বসবেনা।স্বয়ংঈশ্বরকে-–যিনিবাংলা বোঝেন না—জায়গা ছাড়ারনোটিশ দেবে।যেবলবে—শুনবে বোঝবে শুধু ইংরেজিনয়—মানুষের ভাষা।তারমাতৃভাষা।সেভাষার শত বৈচিত্রকে সে বুকেধরবে পরম গৌরবে আর মমতায়।অচিরেইতা হতে যাচ্ছে বলে আমাদেরবিশ্বাস।এবংকম্প্যুটারই তা করবে...।”
কিন্তুউত্তর ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণাতেআচ্ছন্ন ভারতে কাজটা হয় নি।হয়েছে ‘ইনটারনেটকোর্পোরেশন ফর এসাইনড নেমসএণ্ড নাম্বার্স’( ICANN)নামের আন্তর্জাতিক সংস্থাটিরক’মাস আগে সিওলেঅনুষ্ঠিতবাৎসরিক সভাতে। নামেই প্রকাশওদের কাজটা কী।ওরা বলছেইংরেজির কাঁধে চড়ে ইন্টারনেটও কম্প্যুটারের বিশ্বায়নসম্ভবই নয়। কারণ এখনো বিশ্বেরঅধিকাংশ মানুষ থেকে গেছেন এইভাষাটির আওতার বাইরে। যথার্থআন্তর্জাতিকীকরণ সম্ভব শুধুইন্টারনেটকে ‘বহুভাষী’করেফেলে তবেই।এটা অন্তত; ব্যবসায়িকস্বার্থে হলেও এই প্রযুক্তিবিদেরাএখন স্বীকার করতে চলেছেন।তারা কম্প্যুটারের সাংকেতিকভাষাকে লাতিন থেকে অলাতিনেরূপান্তরিত করবার কাজটি সেরেফেলেছেন।সংস্থাটিরচেয়ারমেন পিটার ডেঙ্গেটথ্রাসেরভাষাতে, ‘চারদশক আগে ইন্টারনেটের যাত্রাশুরুর পর এই প্রথম এক সর্ববৃহৎপ্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসতেযাচ্ছে।‘একেতিনি বলছেন ইনটারনেটেরআন্তর্জাতিকীকরণের পক্ষেপ্রথম এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ!
এইঘটনা শুধু, কম্প্যুটারপ্রযুক্তিতেই বিপ্লব আনতেযাচ্ছে না।এরএক সুদূর প্রসারী সাংস্কৃতিক–রাজনৈতিক প্রভাব সারা বিশ্বেইপড়তে যাচ্ছে।যে সব ছোট ছোট ভাষাকে উপভাষাবলে ‘কাগুজে’পণ্ডিতেরা এককোনেঠেলে দিচ্ছিলেন সেগুলোও এখনমাথাতুলে দাঁড়াচ্ছে আর দাঁড়াবে।সারাপৃথিবীতেই এবারে টিভি চ্যানেলগুলোরমতোই ইনটারনেট ব্যবসায়ীরাওমাতৃভাষার প্রচার ও প্রসারেজোর দিতে যাচ্ছে।এবংভারতের মতো দেশে ইংরেজি জানা'সাহেব'রাএবারে ‘সেকেলে’হতে চললেন।গেল১৬ নভেম্বর,০৯থেকে নতুন ব্যবস্থাটি পৃথিবীরবহু দেশেই কাজ করতে শুরু করেছে।অর্থাৎ যাকে আমরা ‘ওয়েব আইডি’বা ‘ডোমেইন নেম’বলি, সেটিআর অদূর ভবিষ্যতে শুধু লাতিনেবা ইংরেজিতেই থাকছে না। বাংলাহিন্দিতেও পাওয়া যাবে। শুনেছিবাংলাদেশে এটি এখনই কাজ করতেশুরু করেছে। ভারতেও প্রক্রিয়াটিশুরু হয়েছে। এর জন্যে সরকারিতরফেও বেশ কিছু প্রশাসনিকউদ্যোগ প্রস্তুতির দরকারপড়বে। গেল ১০ ফেব্রুয়ারিতে গুয়াহাটিতেই এ নিয়ে সচেতনতা বাড়াবার জন্যে একদিনের এক কর্মশালা হয়ে গেল।পান বাজারের হোটেল প্রাগ কন্টিনেন্টালে এই ওয়ার্কশপের আয়োজক ছিল যৌথভাবে ভারত সরকারের তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রক ও সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অফ আডভান্সড কম্প্যুউটিং (C-DAC) ।
এরকমসময়ে আমরা যদি কোনো প্রস্তুতিইনা নিই তবে যে আমাদের অনেকটাপিছিয়ে যেতে হবে সে আর বিচিত্রকী? ছাপাখানাতেযে ভাবে বাংলা লেখা হয় তাইদেখে আমাদের অনেক বাঘা বাঘাপণ্ডিত লেখক সাহিত্যিকেরওপিলে চমকে যায়। তারা আর নিজেবসে কম্প্যুটারে বাংলা লেখারসাহস করে উঠতে পারেন না। নিজেরসংগ্রহে একটি কম্প্যুটারথাকলেও না। অবশ্যি এইচিত্রটিঅসম তথা পূর্বোত্তর ভারতের।জানি না, কেন।বাকি ভারতে কিন্তু আজকাল বোধহয়এমন কোনো লেখকই নেই যিনি তাঁরমাতৃভাষাতে লিখবার বেলাকম্প্যুটার না ব্যবহার করেন।আগে যারা টাইপ রাইটার ব্যবহারকরতেন তাদের প্রায় প্রত্যেকেতোবটেই, নতুনপ্রজন্মের আরো অজস্র লেখক এইসারিতে যোগ দিচ্ছেন। এবংকম্প্যুটার লেখকের সংখ্যাবহু বাড়িয়ে দিচ্ছে বলেই আমারবিশ্বাস। আজকাল বহু লেখকেরইনিজেদের ব্লগ বা ওয়েবসাইটরয়েছে।তাঁরা যখন বই করে সেলেখাগুলো প্রকাশ করেন, সেখানেওসে ব্লগের কথা উল্লেখ থাকেদেখি। বহু বড় কাগজের সঙ্গেছোট কাগজেরও রয়েছে নিজেদেরব্লগ। লিটিল ম্যাগ মেলা নিয়েসম্প্রতি শিলচর খুব মেলা হয়েগেল। লিটিল ম্যাগ কাগজেরসম্পাদকদের এক আলাদা অভিমানওথাকে । কিন্তু সেই অভিমানীরাকি খবর রাখেন আজকাল ‘ব্লগসাহিত্য’বলেও সাহিত্যের একশক্তিশালী ধারা গড়ে উঠছে।যশোধরা রায় চৌধুরী,অতিথিহয়ে গিয়ে, শিলচরেরসেই মেলাতে এ কথা বলেওছেনশুনেছি।‘রোধেতার গতি’এমনসাধ্য কারো নেই। এর একটা বড়কারণ ব্লগে লিখবার জন্যেআপনাকে কোনো নাক উঁচু সম্পাদকবা প্রকাশকের পেছনে লেগে থাকতেহয় না। অমুক বাজে লেখে বলেলেখার বাজার থেকে ‘আউট’করেদেবার সম্পাদকীয় ‘দাদাগিরি’একেবারেই মাঠেমারা যেতে চলেছে! সেখানেআপনিই লেখক, আপনিইসম্পাদক, আপনিইপ্রকাশক।আর কাউকে পড়াবারজন্যে বই নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরতেহয় না, আপনিনিজের বাড়িতে বসেই দেখবেনআপনারপাঠক ছড়িয়ে আছেন বিশ্বময়! আমরাএ নিয়ে বিস্তৃত পরে কখনো লিখব।আপাততঃ কিছু ভালো বাংলার সঙ্গেঅন্য ভারতীয় ভাষারব্লগেরও কাগজের ঠিকানা আপনারাএই ব্লগের লিঙ্কে দেখে নেবেন আশা করি।
কিন্তুসবচে; বড়যে কারণটির জন্যে ব্লগ লেখারসংস্কৃতি দ্রুত ছড়াচ্ছে তাহলো, বাংলালেখার উপায়টি মোটেও ছাপাখানারমতো দামি আর পিলে চমকাবার মতোনয়। একে ‘ইউনিকোড’বলে । সহজেইআপনি বিনামূল্যে ইন্টারনেটথেকে নামিয়ে নিয়ে লিখে যেতেপারেন, যেভাবেইংরেজি লেখেন। বাংলা,অসমিয়া, মনিপুরিলিখবার জন্যে ‘অভ্র’খুব ভালো এবং জনপ্রিয় সফটওয়ার।এতে প্রচুর ফণ্ট বৈচিত্র পাওয়াযায়, একেবারেছাপাখানার মতো। এতে কেবলঅসমিয়া লিখবার জন্যে ‘ৰ,ৱ’এমন দু’একটা বর্ণে একটু জটিলতারয়েছে। তাও তেমন কিছু নয়।‘বরাহ’দিয়ে ভারতের সবভাষাতে লেখাযায়। অসমিয়া-বাংলা-মণিপুরিভাষাগুলো লিখবার জন্যে অসমেতৈরি হয়েছে‘আদর্শরত্নে’। গোগোলনিজেও আজকাল ভারতীয় ভাষালিখবার উপযোগী সফটওয়ারসমর্থণ নিজে দিয়ে থাকে। এছাড়াওআরো প্রচুর রয়েছে। আমরা ক’টিরনাম নিলাম মাত্র। শুধু সংক্ষেপেবলে রাখি যে আমরা ব্লগের কথাবললাম বলে যেন কেউ মনে না ভাবেনযে শুধু সাহিত্যের কাজই হচ্ছেওখানে। অসমে আবার আমরা বাংলাতেকিছু লেখালেখির কথা বললেসাহিত্য আর সমাজ বিজ্ঞান ছাড়াবিশেষ কিছু বুঝি না। আসলে এখনইযে কেউ ইচ্ছে করলে বাংলা, অসমিয়া, হিন্দিতেযাকে বলে ‘ওয়েব সার্চ’---করতেপারেন। করেন খুব কম লোকে। কারণঐ আমাদের উত্তর ঔপনিবেশিকমনের সংস্কার সহজে যাবার নয়।তার উপর এখানে কিছু উপাচার্যেরপদবীর ব্যক্তিও মনে করেন, ইন্টারনেট‘বই সংস্কৃতি’কে ধ্বংস করছে।এতে বুঝি কেবল দুষ্ট ছেলেমেয়েরা বসে গেম খেলে আর ছবিদেখে! আমিনিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতেপারি আমি মাও-ৎসে-তুঙেররচনাবলী পুরো এবং মার্ক্সের‘পুঁজি’পুরোটা ইন্টারনেটে প্রথমপেয়ে সংগ্রহ করেরেখেছি। তাওবিনা মূল্যে! পড়াহয় নি সবটা। আমার ইচ্ছে নয়, বিদ্যেকম বলে। পড়ে বুঝব না।তা ওটিআমাদের তিনসুকিয়ার বাজারেপেতে গেলে আলাদীনের প্রদীপেরসহায় নিতে হবে! সম্প্রতি পশ্চিম বাংলার ‘ভাষা প্রযুক্তি গবেষণা পরিষদ’ আই আই টি খড়গপুর ও শিবপুর বি ই কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে পুরো রবীন্দ্র রচনাবলী ইন্টারনেটে তুলে দিয়েছে। তাদের পরিকল্পনা আছে অদূর ভবিষ্যতে বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর, শরৎ চন্দ্র, নজরুলদেরকেও ইন্টারনেটে নিয়ে আসার। যদিও এদের সবার রচনারই সবটা নাহলেও অনেকটাই এখনই নেটে পাওয়া যাচ্ছে।সম্প্রতিপ্রকাশিত সুবীর ভৌমিকের‘The Troubled Periphery’ বইটিরকথাআমরা ইন্টানেটে যারালেখাপড়া করি তারা ভ্রুণাবস্থাতেইতাঁর নিজেরসুসজ্জিত ব্লগথেকে জেনে গেছি এবং বাড়িতেবসে কিনেএনে অনেকে তা পড়েওফেলেছি! এওজেনেছি তিনিই বোধহয় একমাত্রবাঙালি বুদ্ধিজীবি যিনি নিজেপূর্বোত্তরীয় বলে এক আলাদাগৌরব বোধ করেন। উৎসর্গেরপৃষ্ঠাতে নিজের মেয়ের পরিচয়দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘The Daughter of North East’! ‘সুসজ্জিত’লিখে মনে পড়ল ব্লগ বা সাইটসাজাতে না জানলেও কোনো সমস্যানেই । বাংলাতেই ‘বাংলাহ্যাক্সের’মতো বেশকিছু সাইট রয়েছে যারানিখরচাতে পরামর্শদিয়ে থাকে।
তাহলেরইল বাকি, আমরাযা দিয়ে আলাপ শুরু করেছিলাম, সেইঅভিধান! ইংরেজিরমতো স্বতঃস্ফূর্ত কাজ করবারমতো অভিধান এখনো কোনো ভারতীয়ভাষার নেই বটে, সেটিহবে ঐ ‘আই.সি.এ.এন.এন’নামের সংস্থাটির প্রকল্প যখনপুরো মাত্রায় কাজ শুরু করবেতখন। আমি নিজে যদিও এখনো পরীক্ষাকরিনি তবে অপেন অফিস এবংমাইক্রোসফট২০০৭ যে বাংলা-অসমিয়াসংস্করণ ছেড়েছে তাতে ইতিমধ্যেসেই ব্যবস্থা থাকলেও থাকতেপারে।কিন্তু আপনি সাইট খুলেদেখে নেবার মতো বাংলাতেসংসদেরঅভিধানথেকেশুরু করে প্রচুর আছে। গোগোলব্যবহার করে বাংলা লিখলে সেটিশুরুতেই আপনাকে অনেক শব্দেরবিকল্প সামনে এনে দেয়,আপনিপছন্দের শব্দটি ব্যবহার করতেপারেন। ‘অভ্র’ও এম এস ওয়ার্ডেরমতো অনেক বাংলা শব্দ সমর্থণকরে। বিশেষ করে দিন, মাসেরনামের মতো বহু প্রচলিত শব্দগুলোলিখতে শুরু করলেই সে পুরো শব্দদেখাতে শুরু করে । আপনি সেটিতেটিপে দিলেই এ বসে যায়।হিন্দিসহ অন্য ভারতীয় ভাষারও প্রচুরআছে। নেই অসমিয়ার এবং অন্যপূর্বোত্তরীয় ভাষার অভিধান।এবং নেই সিলেটি সহবাংলা ভাষারপূর্বোত্তর ভারতীয় উপভাষাগুলোকেসমর্থণ করবার মতো কোনো অভিধান।সেই খালি জায়গাকে ভরে তুলতেগেল ক’বছর ধরে তৈরি হচ্ছে‘শব্দ’( XOBDOঃ) ।এর ওয়েব ঠিকানা হচ্ছেঃhttp://www.xobdo.org/।ভাষার প্রশ্নে যে বৈচিত্রনিয়ে আমাদের গোটা দেশে গৌরবকরে বেড়াবার কথা ছিল তাকেইআমরা কাজিয়ার বিষয় করে রেখেছিগেল প্রায় এক শতাব্দি বা তারোবেশি সময় ধরে। ‘শব্দ’সেইগৌরবকে প্রতিষ্ঠা দেবারঐতিহাসিক দায়িত্ব নিজের কাঁধেতুলে নিয়েছে। অচিরেই এটি হবেপূর্বোত্তর ভারতের সবচে’বড়আর বৈচিত্রময় অভিধান ও বিশ্বকোষ।আমরা তাই নিয়েই লিখব বলে এখনকলম তুলে নিয়ছি। থুড়ি, কম্প্যুটারেরবোতাম টিপে চলেছি!
ধানবাদেরইন্ডিয়ান স্কুল অব মাইন্সেরপেট্রলিয়াম প্রযুক্তিতেস্নাতক বিক্রম বরুয়াটেস্কাস টেক বিশ্ববিদ্যালয়থেকে স্নাতকোত্তর সম্পূর্ণকরে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্রহয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতেরআবুধাবিতেগিয়ে থিতু হয়েছেন।সেখানে তিনি এক তেল সংরক্ষণাগারেঅভিযন্তার দায়িত্বে কাজ করেন।২০০৬এর শুরুতে আরবের মরুভুমিতেনিঃসঙ্গ জীবন যাপন করবারদিনগুলোতে স্বাভাবিকভাবেইদেশের নদী-পাহাড়–সবুজ অরণ্য তার কাছে ডাকপাঠাতো। ছেলেবেলা থেকেইকল্পবিজ্ঞানের গল্পে ও নানাপ্রবন্ধপাতি অসমিয়াতে লিখেতিনিহাত পাকিয়েছেন। বিদেশেযখন নিজের ল্যাপটপে লিখবেনবলে ভাবছিলেন তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দরকার পড়ছিল একঅভিধানের । গোগোলে যখন তিনিঅনুসন্ধান করলেন বাংলা, হিন্দি, পাঞ্জাবি, মালয়ালমভাষাতে বেশ কিছু অভিধানেরখোঁজ পেলেন। অসমিয়াতে একটিওনয়।
ব্যস, আরযায় কোথায়! ২০০৬এরমার্চের ১০ তারিখে ‘আসামনেট’ইয়াহুগ্রুপে( অসমেরমানুষের সবচে’সক্রিয় আন্তর্জালিকাগোষ্ঠী) তিনি‘শব্দে’র যাত্রা ঘোষণা করলেন।কম্প্যুটার প্রযুক্তিতে তিনিযে তেমন দক্ষ ছিলেন তা নয়, নাছিল তাঁর ভাষা বিজ্ঞানের উপরকোনো অধ্যয়ন! যারামনে করেন কোনো এক বিষয়ে হাজারটাবই গিলে না খেয়ে কাজেহাত দেয়াউচিত নয় তাঁরা যে কেমন সেকেলেলোক, বিক্রমতাঁর উজ্জ্বল উদাহরণ! চাইকেবলস্বপ্ন আর সেই স্বপ্নকেসাকার করবার এক দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা।বাকি কাজ আপনি এগোয়। শুরুশুরুতে বিশ্বের নানা কোন থেকেপ্রিয়ঙ্কু শর্মা, পল্লবশইকিয়া, উজ্জ্বলশইকিয়ারা এসে যোগ দেন। ধীরেআরো অনেকে। প্রিয়ঙ্কু শব্দকেজীবনী শক্তি যোগাবার সঙ্গেসঙ্গে এর প্রচারে উঠে পড়েলাগেন। প্রচার বিমুখ হয়েশব্দের এক পাও এগুনো সম্ভবছিল না, আজোনয়। কেন না এর চাই সারা বিশ্বেরযেখানেই পূর্বোত্তরের মানুষরয়েছেন তাদের থেকে অনেক অনেকসহকর্মী। পল্লব ‘হৃদয়ে’রমতোই আড়ালে থেকে এর প্রাণস্পন্দনকে সচল রাখবার কাজকরছিলেন। অর্থাৎ, তিনিযাকে বলে ‘ডাটাবেস’তার কাজটাদেখছিলেন। এখনো তাই করে যাচ্ছেন।এই বিক্রম, প্রিয়াঙ্কু, পল্লবমিলে এখনো'শব্দ' সাইটেরবছরের ডোমেন ভাড়াটা বহন করেন।উজ্জ্বল শইকিয়াও শুরুর দিকে‘শব্দে’র সাইট গড়ে তুলতে বেশখাটাখাটুনি করেছেন।একে একেএলেন দিপাঙ্কর এম বরুয়া, দ্বীপায়নবরুয়া, অপূর্বমিলি, রাজীবকুমার দত্ত, নীলোৎপলবরপূজারী, কিশোরকুমার বর্মন, রুবুতমাউত, হাসিনুসসুলতান, রূপমকুমার শর্মা, রেশ্মীরেখা দত্ত, সুদীপ্তাগগৈ আনিসুজ্জামান এমন আরোঅনেকে।
গুয়াহাটিআই আই টিতে এক বড় কর্মীগোষ্ঠীগড়ে উঠল। বুলজিৎ বুড়াগোহাঁই, ঋতুরাজশইকিয়া, স্বপ্নিতাকাকতি, অর্চনারাজবংশী, সঞ্জীবশর্মা, ড০কৃষ্ণাবরুয়া এমন আরো অনেককে নিয়ে।এদের সবার চেষ্টাতে বহু শব্দ‘শব্দে’এসে জমা হলো। ২০০৭এর১৭ জানুয়ারীতে আই আই টিক্যাম্পাসেই ‘শব্দে’র প্রথমমুখোমুখী বসে এক সফল সভা হলো।এর আগে সবই হচ্ছিল ইণ্টারনেটে।শুরুথেকেই ‘শব্দে’র সম্পাদনারসমস্যা ছিল। একা বিক্রম এদিকটাসামলাতেন। ২০০৭ থেকে প্রিয়াঙ্কুওতার সঙ্গে এ কাজে হাত বাড়ালেন।পরে রূপঙ্কর মোহান্ত এবংরূপকমল তালুকদার এসেওএকাজে লেগে পড়লেন।
২০০৭এরশেষের দিকে ‘শব্দে’র ডাটাবেসকে‘মাইক্রোসফটে’রMSSQL প্রযুক্তিথেকে ‘ওপেন সোর্সে’রMySQL এস্থানান্তরণ ঘটিয়ে সাইটিকেওসাজিয়ে তোলা হয়। পল্লব এবংবিক্রমকে এর জন্যে পৃথিবীরদু’প্রান্তে থেকেও বহুখাটাখাটুনি করতে হয়েছিল।কাজটি বড় চাট্টিখানি ছিল নামোটেও। পিয়াঙ্কু, যিনিএখন উত্তর কোরিয়ার হাংকুকবিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশ বিষয়েঅধ্যাপনা করে তখন ফ্লরিডাবিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলেন ।একইবিশ্ববিদ্যালয়েরকম্প্যুটারবিজ্ঞানের ছাত্র সাকিব রহমানকেসঙ্গে নিয়ে তিনিও দিনে রাতেকাজ করে সাইটটিকে তার বর্তমানরূপ দেন। বিক্রমের ভাষাতে, “ Thus, our beloved princes XOBDO got a new look… almost like a bridal make-up!”
২০০৮এরজানুয়ারীতে ফ্রেন্ডস অব আসামএ্যাণ্ড সেভেন সিস্টার্স( FASS)তাদের বার্ষিক সভাতে সুযোগকরে দেয় ‘শব্দ’এর সাইটকে জনসমক্ষে তুলে ধরতে ।প্রচারমাধ্যমগুলো সে ঘটনাকে দারুণভাবেতুলে ধরে। এর পেছনে অবশ্যবুলজিতের এক বড় ভূমিকা ছিল।এবারে ওর ভূমিকা প্রশ্নাতীত।অসমের যেকোনো ভালো ভালো সদর্থককাজের সংবাদ সংগ্রহ করা ওসেগুলোকে যথাসম্ভব বেশি প্রচারদেয়াটা ওঁর অনেকটা ‘শখে’রমতো। ব্যক্তিগত জীবনে তিনিএখনো গুয়াহাটি আই টি আইর গবেষণাছাত্র। সে বছরের শুরু অব্দি১০,২০০অসমিয়াশব্দ সংগৃহীত হয়েছিল। সে বছরে ২০,০০০এর লক্ষ্যমাত্রা স্থির করাহয়েছিল। এ কোনো সহজ কাজ ছিলনা। কেবল শব্দ জুড়ে যাওয়াইতোআর কাজ নয়, এগুলোরশব্দতাত্বিক বিশ্লেষণ, যথার্থইংরেজি সহ বিভিন্ন ভাষাতেএদের অর্থ লেখা, সেইসঙ্গে এটাও নিশ্চিত করা যেশব্দগুলোর পুনরুক্তি হয় নিএমনি আরো কত কিছু! প্রায়দৈনিক হিসেব রাখার নিয়মানুবর্তীতামেনে বছর শেষের আগেই বড়দিনেরদিনে সেই লক্ষ্যে গিয়ে পৌঁছানোগেছিল পৃথিবীর নানা কোনে ছড়িয়েথাকা ‘শব্দ’কর্মীদের কাছেসে ছিল যথার্থই এক উৎসবেরমুহূর্ত।
আগেযাদের নাম উল্লেখ করা গেল তারাছাড়াও সে বছর এসে কাজে নেমেছিলেনবিরাজ কুমার কাকতি, অঞ্জলিসনোয়াল, প্রশান্তবরা, পার্থশর্মা, প্রবীনকাকতি, প্রসেনজিৎখনিকর, মৌসুমীহাজরিকা, আব্দুলওয়াহাব, পাপড়িগগৈরা লেগে থেকে সেই লক্ষ্যমাত্রাতেপৌঁছুনো সম্ভব করে তুলেন।একই বছরে প্রবাদ-প্রবচনযোগ দেবারও এক ব্যবস্থা গড়েতোলা হয়। এ পর্যন্ত পূর্বোত্তরেরঅন্য সব ভাষাকে ‘অন্য ভাষা’( Other Languages) বলেউল্লেখ করা হতো। সেবারেই‘শব্দ’ঠিক করে কাউকে এভাবেস্বতন্ত্র করার কাজটা ঠিকহচ্ছে না। সমস্ত ভাষাগুলোরইসমান মর্যাদা ও স্বীকৃতি থাকাউচিত। সুতরাং সাইট সম্পাদনাকরে সমস্ত ভাষা নাম স্বতন্ত্রভাবে লেখা শুরু হয়।
২০০৯তেপূর্বোত্তরের অন্য ভাষা থেকেওবেশ কিছু সহযোগী এসে যোগ দেন।তাই, মিশিংভাষার শব্দ যোগাচ্ছেন অঞ্জলিসনোয়াল, মাড়শব্দ যোগাচ্ছেন লালরেমথাঙমাড়, খাসিশব্দ যোগাচ্ছেন বানলাম ওয়ার্জর, মৈতৈশব্দ প্রদান করে যাচ্ছেন মোহেননাওরেম, ডিমাসাতেরয়েছেন বেশ ক’জন কুলেন্দ্রদাউলাগাপু, অনুজফঙলোসা, অর্ণবফঙলোসা এবং উত্তম বাথাহি, প্রণবদোলে মিশিং, নববডো এবং নওগওত ব্রহ্ম যোগাচ্ছেনবডো এবং মর্নিঙ্কি ফাঙশো ওদীপক টুমুঙ যোগাচ্ছেন কার্বিভাষার শব্দ। এখন সারাবিশ্বে‘শব্দে’র প্রায় ১২০০ সদস্যছড়িয়ে রয়েছেন । যদিও তাদেরসবাই সমান সক্রিয় নন।
এ পর্যন্তযতগুলো শব্দ এতে এসছে তার একসাম্প্রতিক( ২০সেপ্টেম্বর, ২০০৯) হিসেবএরকমঃ
ভাষা
শব্দসংখ্যা
ভাষা
শব্দসংখ্যা
অসমিয়া
২২৬২৮
ককবরক
৩০৬
ইংরেজি
১২৪২৩
বিষ্ণুপ্রিয়া
২৩৩
ডিমাসা
২৭০৫
নাগামিজ
১৩৮
কার্বি
১৩৭০
মিজো
১২০
মৈতৈ
৯৩০
গারো
১১৭
তাই
৯১৫
চাকমা
৮৭
বডো
৮০৪
আপাতানি
৭৫
মাড়
৬৩২
আও
৭৩
খাসি
৪০৫
মনপা
১৮
মিশিং
৩৬৪
কাওব্রু(রিয়াং)
০
এইতালিকাতে বাংলা নেই। নেইহিন্দি । পূর্বোত্তরের আরোদুটো প্রধান ভাষা। নেপালিওনেই। নেই আরো বেশ কিছু প্রাচীনভাষা। থাকা উচিত ছিল কী?
বাংলা, হিন্দি, নেপালিভাষাএবংপূর্বোত্তরভারতঃ
এইকথাটাই আমি বিক্রম এবং শব্দেরঅন্য বন্ধুদের অনেক দিন আগেইজিজ্ঞেসকরেছিলাম, বাংলানেই কেন? শব্দেরসঙ্গে আমার যোগাযোগ ২০০৮এরমাঝামাঝি। আমাদের তিনসুকিয়াকলেজের নিয়মিত প্রকাশনা‘প্রজ্ঞানে’রজন্যে ‘শব্দ’সম্পর্কিততথ্যাদি পাঠান বুলজিৎ । সেখানেতা ছাপাও হয়। সেই থেকে তিনিআমাদের কাগজের এক সক্রিয়শুভানুধ্যায়ী। ‘প্রজ্ঞানে’র‘প্যানোরামা’তে চোখ ফেরালেইবুলজিৎকে অনেকটা চেনা যায় ।আমি নিজেও বাংলাতে লেখার সঙ্গেঅসমিয়াতে লিখি ।অসমিয়া থেকেঅনুবাদের কাজ করি । আর যেহেতুতা ব্লগে করি, অন্যঅভিধানের সঙ্গে ‘শব্দ’ও সেইথেকে আমার সহযোগী। ‘শব্দে’রনিজের গোগোল বন্ধু গোষ্ঠীআছে (xobdo@googlegroups.com)।এছাড়াও আমাদের মত বিনিময় হয়েথাকে ‘ফাস’, আসামনেট’, ‘শিলচর’(Silchar@yahoogroups.com) ইয়াহু গোষ্ঠীতে। বিক্রমবলছিলেন বাংলাতে ইতিমধ্যেঅনেক অভিধান রয়েছে। আরেকটাজমবে কিনা, এনিয়ে তাঁর সংশয় আছে। কিন্তুসেই অভিধানগুলোতে ‘হে-তাই’( He-She / 3rdt person, singular number) নেই, নেই‘লগে লগে’, ‘বিয়ানিবেলা’, ‘হাইঞ্জাবেলা’, ‘কিয়ানো’,‘কুশিয়ার’এমন আরো কত কিছু। তিনি যখনজেনেছিলেন এ হচ্ছে ‘সিলেটি’তখনকথাটা নিজেদের মধ্যেআলোচনা করেছিলেন । প্রিয়ঙ্কুএবং অন্যেরা এমন আরো অনেকেখবর নিয়ে জেনেছিলেন, যেঅবিভক্ত বাংলাদেশে একে একসময়স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে দাঁড়করাবার চেষ্টা হয়েছিল । সিলেটিনাগরি লিপিও গড়ে তোলার চেষ্টাহয়েছিল। এখনো সে চেষ্টা একেবারেবাদ পড়ে নি। বরং বিদেশেও কোথাওকোথাওএকে স্বতন্ত্র ভাষাহিসেবে শেখানোই হচ্ছে।অসমিয়া ভাষা তাত্বিকেরাওএকে নিয়ে বেশ আলোচনা করেছেন, বেনুধররাজখোয়া থেকে শুরু করে প্রায়সবাই।উপেন রাভা হাকাচামতোএকে অসমের এক প্রাচীন স্থানীয়ভাষাই বলেন। যদিও এঁরা প্রায়সবাই একে হয় অসমিয়ার উপভাষাবা বৃহত্তম অসমিয়ার অংশ হিসেবেদেখেছেন।প্রিয়ঙ্কু আমারপ্রথম জিজ্ঞাসার ক’দিন পরেইজানান, ব্যাপারটাওঁদেরবিবেচনাতে আছে। সিলেটিকেআলাদা ভাষা বা উপভাষা হিসেবেওনেবার কথা বিবেচিত হচ্ছিল।কিন্তু, আমিওঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেজানাচ্ছিলাম, কেবলসিলেটি নিলেতো হবে না, ‘কাছাড়িবাংলা’র কথা যে কেউ বলে না।আর দক্ষিণ ত্রিপুরার প্রধানউপভাষা কুমিল্লার ভাষার কীহবে? এছাড়া পদ্মা নদীর গোটা পূর্বপারের বাঙালি, যারাপূর্বোত্তর ভারতে এসছেন বাআছেন, তারাইবা বাদ যাবেন কেন? এগুলোআলোচনা চলছিল।
সম্প্রতিএকটা লেখাতে বিক্রম শুরুতেইপ্রশ্ন করেছেন, “ How many of you, whose mother tongue is Assamese, have the basic knowledge of the languages of the neighboring states, like Khasi, Ao, Mizo, Meetelon? Let alone these languages, how many of you know even the basics of few languages of Assam itself? Like Bodo, Mising, Rabha, Karbi? Probably very few of you are, that can be counted on finger-tips. The reverse is also true… there is hardly any genuine effort to learn Assamese by the non-native-speakers residing in the state, let alone those in the neighboring seven-sister states. Can we break this barrier?’ এইযে‘barrier’---- একেবলমানবিক সম্পর্কের নয়, পরম্পরার, ইতিহাসের, সংস্কৃতিরএবংভূগোলেরো বটে। বিক্রমেরকথাগুলোরAssamese শব্দেরজায়গাতেBengali বসিয়েদিয়েও একই প্রশ্ন ছোঁড়ে দেয়াযায়।এঁরা যেমন সিলেটি বাকাছাড়ি সম্পর্কে বিশেষ জানতেননা, আমিলক্ষ্য করেছিলাম বাঙালিবন্ধুরাও জানতেন না, কাছাড়েসিলেটির আরো এক প্রাচীন রূপান্তর‘কাছাড়ি’ও বটে! এটাশিলচর শহরের অনেকেও জানেননা, বাজানলেও আলাদা করে স্বীকারকরতে চান না। সেই ক্ষোভেসম্প্রতি হাফলঙেরজগন্নাথচক্রবর্তী, যিনিআদতে হাইলাকান্দির সন্তান, একঢাউস সাইজের অভিধান লেখে নামদিয়েছেন, ‘বরাকউপত্যকার আঞ্চলিক বাংলা ভাষারঅভিধান ও ভাষাতত্ব।’আমিতাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ইটাকোন বা’ষা? সিলেটিঅইলে ইতো খালিবরাকর বা’ষানায়!” তাঁরজবাব ছিল, “চিলটিনায়। চিলটি হ’কলে আমারতাইনতরভাষারে মান্যতা দেইন না, এরলাগ্গিউ নাম দিলাইলাম ‘বরাকবাংলা’!” অভিধানেরঅনেক জায়গাতে তিনি ‘আঞ্চলিকবাংলা’কথাটিও ব্যবহার করেছেন।‘লেখকের নিবেদনে’এক জায়গায়লিখেছেন, “ ঢাকাবাংলা একাডেমি প্রকাশিতমুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত‘বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাঅভিধান’এ সিলেট অঞ্চলস্বাভাবিকভাবে অন্তর্ভূক্তহলেও বরাক উপত্যকার আঞ্চলিকবাংলা সম্ভবত আলাদা রাষ্ট্রেরঅঞ্চল বলেই বাদ পড়েছে। আরকলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের‘আঞ্চলিক বাংলা ভাষার অভিধান’সংকলন প্রকল্পটি যেহেতুপশ্চিমবঙ্গ কেন্দ্রিক তাইওখানেও স্থান হয়নি বরাকউপত্যকার।”ছেলেবেলা তাঁরমুখের বাংলা শোনে যে সেখানকারইবাঙালিআত্মীয় তাঁর মা-বাবাকেপরামর্শ দিতেন, ‘ এসবগ্রাম্য নীচ লোকের ভাষা নাশেখাতে...।”এই তথ্য তিনি বেশ খেদের সঙ্গেইউল্লেখ করেছেন।
‘কাছাড়িহকল, চিলটিহকল আর অইলগিয়া( হ’লগৈ) অসমিয়াসকল’—এদের যে এক প্রাচীনঐতিহাসিক আত্মীয়তা রয়েছে একথা আমরা জেনেওনা জানার ভানকরে থাকি । বাঙালিতো আমরাবটেই--- এনিয়েযেন কেউ আমার কথাগুলোকে ভুলনা বোঝেন। কিন্তু বাঙালি বলেপ্রমাণ করবার দৌড়েআমরা এতোবেশি পশ্চিমের( কলকাতা) দিকেতাকিয়ে থাকি যেঅসমিয়া সহঅন্যরাতো বটেই, নিজেদেরদিকেই ভালো করে তাকাবার আমাদেরফুরসত মেলে না। আমার মনে আছেপ্রথম প্রথম তিনসুকিয়া শহরেএক অনুষ্ঠানে শক্তিপদ ব্রহ্মচারিরএক কবিতা পড়তে আমার পা কাঁপছিল।এই ভয়ে যে, কোনোবাঙালি যদি আমাকে জিজ্ঞেসকরে বসেন, ‘কেসে হরিদাস বাবাজী?’ কলকাতাতেতোএঁর নাম শোনা যায় নি!
বাঙালিরবড় ভাগটা যেহেতু পূর্বোত্তরেরবাইরে থাকেন, অবাঙালিঅনেকেই আমাদের ‘বহিরাগত’বলেভেবে নেন, ‘খিলঞ্জিয়া’রতালিকাতে হিসেবই করেন না।আমরাও যেন এই সত্যকে প্রমাণকরবার জন্যে সদাব্যস্ত। আমাদেরআচারে ব্যবহারে এবং অনুষ্ঠানে। তাই সামাজিক হাজারটা প্রশ্নেবাঙালিকে দেখা যাবে নীরবদর্শক। আমাদের মধ্য সংঘাতভেদাভেদ আছে।নেইটা-- কারমধ্যে? নাগা-কুকীবছরে সাতবার রক্তাক্ত সংঘাতেব্যস্ত হয়। তাই বলে, এতোনৈরাসক্তি আর নিস্পৃহতা নিয়েকেউবাস করে না।তাই বলে, এইসত্যকে ভুলব কী করে যে ‘চুঙ্গাপিঠা’আর ‘মেড়ামেড়ির’ঘর নাহলে আমাদেরও পৌষ সংক্রান্তিজমে উঠে না! সম্প্রতিআমি অসমিয়া ‘ফেলানি’উপন্যাসখানাব্লগে অনুবাদ করছি। করতে গিয়েএমন অনেক শব্দে আটকে যাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে এমন বহু শব্দরয়েছে যেগুলো আমাদের ভাষাতেরয়েছে । কিন্তু যেহেতু আমাকেকলেজ ষ্ট্রিটের অভিধান অনুসরণকরতে হবে আমাকে সেগুলো কেবলঅসমিয়া বলে বাদ দিতে হবে।যারাই অনুবাদ করেন তারাইনিশ্চয় আদর্শ বাংলাতে প্রথমপুরুষের একবচনে লিঙ্গ ভেদ( সিলেটিঃহে –তাই) নাথাকার যন্ত্রণাটা উপলব্ধিকরেন। এতোটা সাহস অবশ্যি আমিএখনো করতে পারিনি, কিন্তুআমার প্রায়ই মনে হয়, ‘আমারলগে’, ‘চড়াই’, ‘কুশিয়ার’ইত্যাদি প্রয়োগ করতে পারব নাকেন? এগুলোতোআমাদের নিজেদের শব্দ। এতেভেজালটা কোথায়? ‘উরুকারমেজি’রবদলে আমি কেন ‘মেড়ামেড়িরঘর’(স্মরণকরুনঃ অসমিয়া মেরঘর, বেড়াতেঘেরা ঘর) ব্যবহারকরে আত্মীয়তাটা জাহির করবনা? কেনআমাকে এর জন্যে টীকা দিয়েলিখতে হবে ‘ভোগালি বিহুর একবিশেষ পরম্পরা!’ আমারটাবুঝিদিব্বি উবে যাবে আলেয়ারআলোর মতো সমস্ত মান্য স্মৃতিথেকে? কিন্তুআমি জানি ‘মেরামেড়ির ঘরের’ওটীকা নাদিলে উজানেরবাঙালিকিছুই বুঝবেন না। তার সংস্কৃতিএবং কলকাতার থেকে পাওয়া বইতেশব্দটি নেই!
গেলজানুয়ারির ১২ তারিখে গুয়াহাটিতে‘শব্দে’র সভা বসেছিল। সেইসভাতে সিদ্ধান্ত হয়ে গেল এবারথেকেআদি, বাংলা, হিন্দিওনেপালিও ‘শব্দে’র অংশভাগীহবে।১১, ১২দু’দিন গুয়াহাটির মাছখোয়াআই.টি.এসেন্টারফর পারফর্মিং আর্ট প্রেক্ষাগৃহেবসেছিল প্রথমবারের মতোপূর্বোত্তর ভারতীয়দেরআন্তর্জাতিকসম্মেলনNEIIM 2010।আয়োজকছিল ‘ফাস’এবং অসম সরকার।সম্মেলনের শেষে ‘শব্দে’র সভাবসে। সেখানেবিক্রম, প্রিয়ঙ্কু, বুলজিত, বিরাজ, প্রশান্ত, পাপড়িরা, ছাড়াওউপস্থিত ছিলেন আকলান্তিকাশইকিয়া, ভাষ্করজ্যোতি দাস, নীলোৎপলডেকাএবং বর্তমান লেখক।
‘শব্দে’বাংলার প্রবেশ বাংলার পক্ষেদুটো কাজ করবে। বাংলা ভাষাতেপূর্বোত্তরের স্বতন্ত্রঅস্ত্বিত্ব ঘোষণার সঙ্গেসঙ্গে পূর্বোত্তরের অন্যভাষার সঙ্গেও নিজের আত্মীয়তারসূত্রে এখানকার আলো হাওয়ারকাছেও নিজের অস্ত্বিত্ব ঘোষণাকরবে। কেবল বাংলা নয় হিন্দির, নেপালি, পক্ষেওকথাটা সত্যি। এতো কেবল একঅভিধান নয়! বিক্রমসম্প্রতি এর এক সংজ্ঞা দেবারচেষ্টা করেছেন এরকম, ““XOBDO is a precise and detailed online multi-directional multi-lingual multi-media based dictionary-cum-phrasebook-thesaurus-cum-encyclopaedia of the languages of the North-East India!!” তিনিআরো লিখেছেন, “Search some very basic words like ‘mother’, ‘bamboo’, ‘river’ etc. You will get the corresponding words in almost all the major languages of the North-East – Bodo, Mising, Khasi, Karbi, Meetelon in addition to English and Assamese. Or, search the Dimasa word ‘dilao’ or the Karbi word ‘lut’ and find out what does it mean in Assamese or English or any other language of the North-East. You can actually search a word of any language and find the equivalent words in all the available languages. In other words, XOBDO is multi-directional and multi-lingual. In one article, XOBDO has been described as the ‘virtual BabelTower of the North-East’. বাইবেলীয়পৌরাণিক গাঁথার ‘বেবেল মিনারে’রমতো সত্যি সত্যি‘শব্দ’স্বর্গছোঁয়ার সম্ভাবনা রাখে।
আমরাবিক্রমের বক্তব্যের সমর্থণেএকটি উদাহরণ দিতে চাইব। ইংরেজি‘Bamboo’ শব্দটিরএখন অব্দি যে অর্থগুলো পাওয়াগেছে তা এরকমঃ অসমিয়াতে ‘বাঁহ’, বাংশ, বডো-ঔয়া(ow-vaa) , মিশিং-দিবাং(dibang), খাসি-উস্কং(u skong) , গারো-ওয়া(wa.a), মৈতৈ-ওয়া(waa) মিজো-মাউ(mau) ,কার্বি-ছেক(chek), নাগামীজ–বাশ(bas) ডিমাসা-ওয়াহ(woah)।এবারে যখন বাংলা অর্থ প্রবেশকরবে, কীআসবে? সব্বাইজানেন-বাঁশ, বংশ। জগন্নাথ চক্রবর্তী আরো একপ্রতিশব্দের কথা জানিয়েছেন–‘বা’( পৃঃ২৫৮)।তিনি এর সংস্কৃত উৎসের কথাজানিয়েছেন, লিখেছেন, সং-বংশ।সত্যি হতেও পারে। কিন্তুএখানেই তাঁর অভিধানের সীমাবদ্ধতা।সংস্কৃতের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্কেরউল্লেখ করেছেন। যেখানে তাপারেননি নীরব থেকেছেন। যথেষ্ঠসম্ভাবনা থাকা সত্বেও ভোট–মোঙ্গলীয় উৎসের দিকে তেমনতাকান নি। সংস্কৃত ‘ঘ’প্রত্যয়নিয়ে'বশ'ধাতু থেকে আসা ‘বংশ’শব্দটিরঅর্থ আমরা সবাই জানি। কুল ।এর থেকে তৃণ জাতীয় উদ্ভিদেরকল্পনাটা বড্ড কষ্টকর। এরথেকেবডো-ঔয়া(ow-vaa) থেকেগারো-ওয়াথেকেডিমাসা-ওয়াহথেকেঅসমিয়াবাঁহথেকে(সিলেটিবাংলা বাহ?) বরাক(কাছাড়ি)বাংলাবাথেকেবাংলাবাঁশথেকেএবং‘প্রোথিতে’র মতো সংস্কৃত উৎসশব্দ ‘বংশ’গড়ে দেয়া হয়েছে, ভাবাযায় না কি? আমরাঅবশ্য নিশ্চিত নই। একটাসম্ভাবনার কথা বলছি। দ্রাবিড়বা অস্ট্রিক উৎস থেকেও আসতেপারে। কন্নড় ‘বানবু’থেকেকোঙ্কনি ‘মাম্বু’পোর্তুগীজহয়ে গিয়ে ইংরেজিতে ‘ব্যাম্বো’(থেকেঅসমিয়াও সিলেটিতে তুচ্ছার্থে‘বাম্বু’) হয়েছে।মালয় দ্বীপেও এর প্রতিশব্দরয়েছে ‘সামাম্বু’। এবারে, এইযেসংস্কৃত ছেড়ে আমি অন্যদিকেদৃষ্টি ফেরালাম এটা ‘শব্দ’আমাকে বাধ্য করল।বডো- ডিমাসাপ্রতিশব্দগুলো না দেখলে আমিভাবতামই না যে ‘বাঁশ’পূর্বোত্তরভারত সহ এই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ারইসংস্কৃতির এক ঘনিষ্ঠ অঙ্গ।শ্যামের‘বাঁশি’এদিক থেকেইবাংলাতে এবং তার পরে সারাভারতে(হিন্দি‘বাঁশরি’) গিয়ে‘রাধা’কে ডাক পাঠালেও পাঠাতেপারে।এই তথ্যের উল্লেখকরলেআমাদের সম্মান বাড়ে বই কমেনা। অন্তত ‘দাদা’, কাকা’রমতো শব্দগুলো যে গেছেই এদিকথেকে এনিয়ে আমরা প্রায় নিশ্চিত।এগুলো সংস্কৃতে আর কৈ খুঁজেপাওয়া যাবে?
এভাবেভাষাগুলোর তুলনামূলক অধ্যয়নে‘শব্দ’এক বিশাল উৎস ভাণ্ডারেরকাজ করবে, এটিপ্রায় নিশ্চিত । সে বহুঅনুসন্ধানকে ইতিমধ্যে উস্কেওদিচ্ছে। তার উপরভাষাগুলোরমধ্যে পারস্পারিক অনুবাদেরকাজেও ‘শব্দ’এক সহজ সহায়কহতে পারে। ‘শব্দে’র কর্মীরাযদিও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছেন, তবুতাদের প্রায় সব্বারই বাড়ি ঘরএই ঈশান কোণে। কিন্তু বাংলা- হিন্দি-নেপালিরমতো ভাষাগুলো এসে প্রবেশ করাতেআমরা আশা করতেই পারি এবারে‘শব্দে’র বিস্তার পশ্চিম তথাবায়ু কোণ অব্দি ছড়িয়ে যেতেইপারে । শব্দ যোগাতে পারেপূর্বোত্তর ভারতের অনুবাদসাহিত্যকে এক নতুন শক্তি।অনুবাদের মধ্যি দিয়েই যেমনভাষাগুলোর সমস্ত লিখিত পরম্পরাপরস্পরের মধ্যে আরো ছড়াতেপারে তেমনি বাংলা, হিন্দিইত্যাদি ভাষাতে অনুদিত হয়েইএখানকার সমস্ত লিখিত পরম্পরাবাকি ভারতে তার বিজয় নিশানছড়াতে পারে।
এ পর্যন্তএসে আমার সেই খরগোশ আর কচ্ছপেরগল্পটির কথা মনে পড়ে গেল। সেইযে খরগোশ ঘুমিয়ে গেছিল আরকচ্ছপ দৌড়ে ওকে পেছনে ফেলেদিয়েছিল। সেটি প্রাচীন গল্প। গল্পটির এক অর্বাচীনকম্প্যুটারসংস্করণ তৈরি হয়ে গেছে।দুর্দান্ত! সংক্ষেপেসেটি এই। খরগোশ বেচারা মনখারাপ করে ভাবতে বসলে, সেওমনটিহারল কেন? অতিআত্মবিশ্বাসই তার বিপদ ডেকেএনেছে--- সেবুঝতে পারল। সুতরাং,সেআবারো গিয়ে দৌড়ের প্রস্তাবদিল কচ্ছপকে । কচ্ছপ বেচারারাজি হয়ে গেল। এবারে কিন্তুখরগোশই জিতল। ধর্য্য, স্থর্য্যনিয়ে যে এগোয় সেও জেতে বটে।কিন্তু বিজয়ী হবার জন্যেস্থৈর্য আর দৃঢ়তার সঙ্গেদ্রুতি অনেকবেশি জরুরিব্যাপার। সেটি কচ্ছপের জানাছিল না। এবারে কচ্ছপ এক দুষ্টচাল চালল। হেরে এসে সে আরেকবারদৌড়ের প্রস্তাব দিলে খরগোশআবারো একই ভুল করল। এবারে পথবেছে নেবার দায়িত্ব নিয়েছিলকচ্ছপ। যে পথে এগুলো তার মাঝেরয়েছে এক নদী। সেটি পেরিয়েওএর পরেও যেতে হবে আরো বহু দূর।খরগোশ বেচারা যখন আগে আগে এসেভাবছে কী করবে, কচ্ছপএসে দিব্বি সাঁতার কেটে পেরিয়েগেল। হেরে গিয়ে খরগোশ ভাবল, নিজেরক্ষমতার সীমাবদ্ধতাটা তারজানা উচিত ছিল । এতোবার দৌড়ঝাঁপকরতে করতে ওদের মধ্যে একটাবন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছিল। তাইখরগোশ এসে বলল, নিজেদেরমধ্যেতো অনেক প্রতিযোগিতাহলো। এবারে চলো, আমাদেরপ্রতিযোগিতা হবে ঐ পথের সঙ্গেই।নিজেদের মধ্যে কেবল সহযোগিতা।এবারেও তারা ঐ নদী পথটাই বেছেনিল । কিন্তু এবারে নদী অব্দিপথে খরগোশ কচ্ছপকে পিঠে তুলেনিল। নদীতে আসতেই কচ্ছপ নেমেগিয়ে খরগোশকে পিঠে নিয়ে নদীসাঁতরে পেরিয়ে গেল। বাকিটাপথ আবারো খরগোশের পিঠে চেপেআগের দিনের জায়গাতে গিয়ে যখনওরা পৌঁছলো বেলা ডুবতেতখনোঅনেক অনেক অনেক বাকি।
পুরোগল্পটির এক ফ্লাস প্রস্তুতিআমার নিজের ব্লগে রয়েছে।আমি নিজেও প্রায় সমস্ত কাজেএই গল্পের আধুনিক শিক্ষা কাজেলাগাই।‘শব্দ’ও তাই করে ।করতেবলছে, সব্বাইকে।নইলে যে তার পথ চলা হবেই না।যেখানে ছিল দাঁড়িয়ে থাকবে।দাঁড়িয়ে থাকবে গোটা পূর্বোত্তর! তাইকি! তাহলে চলুন, সেইখরগোশ আর কচ্ছপের মতো আমরাসবাই সেই দৌড়ের অর্বাচীনসংস্করণে নাম লেখাই। আজই গিয়ে‘শব্দে’র সাইটটি খুলুন আরমাউসে ক্লিক করে লিখতে বসেপড়ুনপূর্বোত্তরের সমস্তভাষা সাহিত্যের এক নতুনইতিবৃত্ত।
০০০০০০০০০০০০~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~০০০০০০০০০০০০০০০
ঋণ স্বীকারঃ এপ্রবন্ধ লিখতে সম্প্রতিপ্রকাশিত বিক্রম বরুয়ার দুটিলেখা থেকেও সাহায্য নিয়েছিঃMaking of XOBDO , p 105, FRIENDS, একটি‘ফাস’প্রকাশনাএবং The Virtual ‘Bebel Tower of North East’ , p69 , স্মরণিকা–NEIIM 2010