আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Showing posts with label India. Show all posts
Showing posts with label India. Show all posts

Sunday, 22 August 2010

বারাক ওবামার ধর্ম আর রক্ত-তেল চোরা সাদা সাহেবদের কেয়ামতের দিন


               মেরিকার আকাশ বাতাস এখন একটি মসজিদ নির্মাণের প্রশ্নে সরগরম। ঠিক মসজিদ নয়, ১১সেপ্টেম্বর, ২০০১এ ধ্বংশ প্রাপ্ত বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের নিচের তলার সামান্য কাছেই একটি ইসলামি কেন্দ্রের  নির্মাণের প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতি ওবামা সমর্থণ জানিয়েছিলেন। যে কেন্দ্রে একটি মসজিদও থাকবে।  তাঁর বক্তব্য ছিল, এই দেশে মুসলমানদের অন্য সবার মতোই ধর্ম চর্চার সমান অধিকার রয়েছে। ব্যস! তাতেই চটে লাল আমেরিকা! এতো ভালো কথা সহ্য করতে তারা আর প্রস্তুত নয়। পরে তাঁকে একটু পিছিয়ে এসে বলতে হয়েছে, যারা সেই কেন্দ্র গড়তে চাইছেন তাদের উৎসাহিত করতে তিনি কিছু বলেন নি। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ন্যান্সি পেলসি বলেছেন, সংবিধান সব ধর্মের সমান অধিকার দিয়েছে বটে, কিন্তু একটি ধর্ম কেন্দ্র হবেটা কোথায় সেটি হবে একেবারেই স্থানীয় সিদ্ধান্ত।    প্রতিপক্ষ রিপাব্লিকানেরাও দ্বিচারিতার নিদর্শন রেখে মুসলমানেদের অধিকারকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না। বরং উলটে ওবামাকেই ঝেড়ে কাশতে অনুরোধ করছে যাতে তাঁকে চেপে ধরতে সুবিধে হয়। রিপাব্লিকানদের হয়ে সবচে বেশি গলা উঁচু সেই মহিলা সারা পলিন্সের যিনি গেল নির্বাচনে উপরাষ্ট্রপতি পদে দাঁড়িয়ে উল্টপাল্টা মন্তব্য করে প্রচুর লোক হাসিয়েছেন, এবং এখন দুর্নীতির অভিযোগে হালে পানি পাচ্ছেন না। ইদানিং তিনি খুব ধর্মবাতিকগ্রস্থ হয়েছেন।
         যারা এই ইসলামি কেন্দ্রটি গড়তে চাইছে তারা যে খুব ইসলামের বিজয় রথ ছোটাবার বাসনাতে কাজটি করছে তা কিন্তু নয়। তারা হচ্ছেন আমেরিকার সেই মুসলমান যারা  লাদেনের পাপকে ধুয়ে দেবার জন্যে মাঠে নেমেছেন। ইসলামে দানবীয়করণের বিরুদ্ধে গোটা বিশ্বকে একটা বার্তা দেয়াই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। আর তাদের সঙ্গে যে শুধু মুসলমানেরাই রয়েছেন তাই নয়, রয়েছেন প্রচুর খৃষ্টান, এমনকি অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে তাদের সঙ্গে প্রচুর ইহুদীও রয়েছেন। যে সংগঠনটি এই ইসলামি কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল তাদের নাম ‘কোরডোবা ইনিসিয়েটিভ’ (Cordoba initiative)। কোরডবা হচ্ছে স্পেনের এক বিখ্যাত প্রাচীন প্রাক-ধর্মযুদ্ধ  ইসলামি তীর্থক্ষেত্রে নাম। যায়গাটি তখন ইহুদি, খৃষ্টান , ইসলাম সহ নানা ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের জন্যে বিখ্যাত ছিল। সেখানে যে বিখ্যাত মসজিদটি ছিল ধর্মযুদ্ধের পরে সেটি এক খৃষ্টান চার্চে পরিণত হয়। আমরা সবাই জানি ধর্মযুদ্ধ খৃষ্টান চার্চগুলোর ধর্মীয় সহিষ্ণুতার সবচে’ কুখ্যাত নজির। সেই যুদ্ধ কেবল আরব উত্থানের পতন ঘটায় নি, গোটা ইউরোপকেও ঘনঅন্ধকারে ছেয়ে ফেলে। যাকে আমরা জেনে না জেনে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলে চিহ্নিত করে থাকি। প্রায়শঃ এই পদগুচ্ছ অকারণে  ভারতের ইতিহাসেও প্রয়োগ করি। এহেন এক উদ্যোগকে যারা বাধা দিচ্ছেন আর ভাবছেন তাদেরকে  ধর্মকেন্দ্র গড়তে দিলে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে নিহতদের অপমান করা হবে, তারা যে লাদেনবাহিনীর চে’ ভালো মানুষের দল নন, সেটি বুঝতে বুদ্ধি খাটাবার প্রয়োজন পড়ে না। বুদ্ধিমান অনেকেতো এও বলছেন ‘কোরডবাকে’ ধর্মকেন্দ্র গড়তে দিলে লাদেন সেটিকেও উড়িয়ে দেবেন। কিন্তু আপাতত লাদেনের খৃষ্টান প্রতিপক্ষরাই এর পথ আটকে তার কাজ কমিয়ে দিচ্ছেন । অথচ যে নিউইয়র্কে কেন্দ্রটি হবে, সেখানে প্রায় পাঁচ লক্ষ মুসলমান রয়েছেন আর রয়েছে অজস্র মসজিদ। তাতে এই আরেকটা যোগ হবে মাত্র। কিন্তু এক নতুন বার্তা নিয়ে। সেটি যারা হতে দিচ্ছেন না তারা স্পষ্টতই চাইছেন না ইসলাম তার পুরোনো গৌরবময় পরিচয় ফিরে পাক। পেলে যে মধ্য এশিয়াতে মার্কিনি তেলচোরাদের আসন্ন বিপদ!      
                ইতিমধ্যে নানা কারণে ওবামার  জনপ্রিয়তাতে ভাটা পড়েছে । সামনেই , নভেম্বরে সিনেটের কিছু আসনে মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে। তার আগে সে জনপ্রিয়তাতে আর ভাটা পড়ুক সেটি তিনি বা দল চাইছেন না। কিন্তু সম্ভবত আঁচড় যা পড়বার তা পড়ে গেছে। আমেরিকা জুড়ে ইসলাম বিরোধী প্রচার কিছু তো বেড়েইছে, সেই সঙ্গে এই বিশ্বাসও বেড়েছে যে ওবামা আসলে অন্তর থেকে একজন মুসলমানই।
জাতি রাষ্ট্র, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে পশ্চিমী দেশগুলোর সাধারণত অহংকারে মাটিতে পা পড়েনা। ওদের থেকে পাঠ নিয়ে আমাদের দেশেও অনেকে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার পাঠ নিতে বলেন। তার মধ্য , কিছু আগ মার্কা বামপন্থীও রয়েছেন। কিন্তু , আমেরিকার ঘটনাক্রম দেখে মনে হচ্ছে না কি যে ওরা আমাদের থেকে আর যাই হোক এ ব্যাপারে মোটেও বেশি সভ্য নয়! কল্পনা করুন যে মুম্বাইর হোটেল তাজের কাছে এক মসজিদ তৈরির  কথা বললেন, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আব্দুল কালাম , কিম্বা কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধি। কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, শিবসেনা, ভাজপারা কী বলতে পারে আমরা সহজেই  আঁচ করতে পারি।  আব্দুল কালামকে পাকিস্তান আর সোনিয়া গান্ধিকে ইতালি পাঠাবার ব্যবস্থা করে দিলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না! দু’জনকেই তার পরে  সিদ্ধি বিনায়কের মন্দিরে গিয়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করে আসতে হতো। আমেরিকার রাষ্ট্রপতিকেও ঠিক তেমনটাই করতে হয়েছে!
           ইতিমধ্যে সরকারীভাবে ঘোষণা দিয়ে জানাতে হয়েছে যে রাষ্ট্রপতি ওবামা একজন নিষ্ঠাবান খৃষ্টান এবং রোজ প্রার্থণা করেন। ধর্মীয় উপদেষ্টার পরামর্শ না নিয়ে তিনি দিনের কোনো কাজই করেন না। তার জন্যে কেউ তাঁকে ধর্মান্ধ বা মৌলবাদি বলছে না!  তাঁর বাবা মুসলমান ছিলেন, তিনিও মুসলমান হতেই পারেন। এই সরল  কিম্বা জটিল বিশ্বাস থেকেও এই ক’দিন আগও কিছু মানুষ তাঁকে মুসলমান বলে ভাবতেন। সম্প্রতি নানা কারণে এমন বিশ্বাস করবার লোক বেড়ে গেছিল।  ওই মন্তব্যের দিন কতক আগেই পিউ গবেষণা কেন্দ্র বলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা দেখিয়েছিল ওবামাকে মুসলমান বলে মনে করবার মত লোক ১১% থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ শতাংশ । প্রতি পাঁচজন মার্কিনিদের মধ্যে একজন ভাবছেন ওবামা একজন মুসলমান । ঐ মন্তব্যের পর আগষ্টের মাঝামাঝি টাইমস মেগাজিন আরেকটি সমীক্ষা চালায়। তাতে সেই পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ২৪ শতাংশ। তারা ভাবছেন ওবামা একজন মুসলমান তাই ওমন কথা বলেছেন। তিনি যে  একজন সৎ মানবতাবাদির অবস্থান থেকে কথাটা বলতে পারেন এই সহজ সত্য ওদের সাদা চামড়াতে ঢাকা উন্নত মস্তকে কিছুতেই ঢুকতে চাইছে না । ৪৭ শতাংশ লোক অবশ্যি সেরকম ভাবছেন না, কিন্তু তাতে ওবামা আশ্বস্ত  হলেও আমাদের হবার কোনো কারণ নেই। কারণ তাঁরা এই ভেবে তুষ্ট যে তিনি একজন নিষ্ঠাবান খৃষ্টান। মাত্র ২৪ শতাংশ এ নিয়ে কোনো মত জানান নি।
                 ওই যারা মত দেননি তাদের সংখ্যার থেকে অল্প কিছু বেশি লোক বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের সামনে ইস্লামিক কেন্দ্রটি গড়বার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের সংখ্যা ২৬ শতাংশ।  তাদের কেউ কেউ সেই অধিকারের পক্ষে লড়াই চালাবার সাহসও গুটিয়ে নিয়েছেন। এবং বাণিজ্য কেন্দ্রের সামনে গিয়ে ধর্ণাও দিচ্ছেন। এর মধ্য অভিশপ্ত সেপ্তেম্বরে নিহত আহতদের পরিবারের অনেকেও রয়েছেন, যারা মনে করেন ঘৃণা কখনো ঘৃণার নিদান হতে পারে না। তাদের সংগঠনটির নাম “September 11th Families for Peaceful Tomorrows” । তারা এও এই বলে সভ্যতার চরম নিদর্শন উপস্থিত করছেন, “What better place for healing, reconciliation and understanding than Ground Zero? We honor our family members by practicing American principles and moving forward from Ground Zero to a future of peaceful coexist”
                পিউ গবেষণা কেন্দ্রটি যে সমীক্ষা চালিয়েছিল তাতে মার্কিনি রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে কিছু মজার তথ্য বেরিয়ে এসছে। বিতর্কিত মন্তব্যটি করাবার আগেই যে কিছু লোক ওবামাকে মুসলমান বলে ঠাউরেছিল তার কারণটি কিন্তু আর কিছু নয়, তিনি তার আগেকার রাষ্ট্রপতিদের থেকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে কম হাজিরা দিচ্ছেন। এর মানে, এখনো সে দেশে এক রাষ্ট্রপতির কাছে ধর্মের, তাও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের, থেকে দূরে সরে থাকাটা ভারতীয় উপমহাদেশগুলোর যেকোনো  দেশের মতোই খুব একটা নিরাপদ নয়। এখনো ৪৮ শতাংশ মার্কিনি  লোক মনে করেন রাষ্ট্রকে ধর্মের থেকে দূরে সরে থাকা উচিত নয়। এই সংখ্যাটা  ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ এর আগের দশক থেকে সামান্য কমেছে মাত্র!
                অনেক ভারতীয় কালো সাহেবেরাও মসজিদ নির্মাণ নিয়ে করা ওবামার মন্তব্যকে ভালো চোখে দেখেন নি। তাঁরাও ইসলামী আতঙ্ককে বিশ্বের সবচে বড় বিপদ হিসেবে দেখেন, এবং কোনো মুসলমান ধর্ম কেন্দ্রকে বিশ্বাস করতে পারেন না। আজকাল যে আমেরিকা আর ইউরোপের দেশে দেশে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচার ও ব্যবস্থা নেবার প্রবণতা বেড়েছে তাতে তাঁরা খুব হ্লাদিত। তাঁদের ধারণা, এর ফলে পৃথিবী ইসলামী সন্ত্রাসবাদ নামের ‘দানবীয়’ বিপদ থেকে মুক্ত হবে। তাঁদের সাহেব প্রীতিতে অন্ধচোখ দেখেও না যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাতে কিছু মৌলবাদি যদি তিন হাজার লোককে মেরেছিল, যারা মৌলবাদি নয় বলে বড়াই করে সেই সাহেবদের, পশ্চিমী দেশগুলো সেই বাহানা নিয়ে আফগানিস্তান নামের দেশটির  ভেতরে ঢুকে আজ প্রায় একটি দশক জুড়ে ঘাটি গেড়ে বসে মেরেছে তার থেকে বহুগুণ বেশি সাধারণ নিরীহ মানুষ । বছরে সেই সংখ্যা হাজার ছাড়ায়। তারা জোর করে বা ভয় দেখিয়ে সামরিক ঘাটি করে বসে আছে  মধ্য এশিয়ার প্রায় সমস্ত দেশে। কোনো এক সুদূর আশির দশকের শুরুতে পৌনে দু’শো কুর্দ নাগরিককে মারবার অপরাধে যারা সাদ্দামকে বিচারের প্রহশনে বসিয়ে মেরে ফেললে, তারা এই সাত বছরে মেরেছে ১ লক্ষ ৬১ হাজারেরো বেশি ইরাকি মানুষ। সাদা কিম্বা কালো কোন সাহেবদের চোখেই এই মৃত্যু কোনো আতঙ্কের ব্যাপারই নয়! মধ্য এশিয়ার  দেশগুলোর দখলদারি নিয়ে মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যেও মারামারি করে ওই সাহেবেরা। কারণতো একটাই মাটির তলার তেল সাবাড় করো আর যুদ্ধের বাজার ছড়িয়ে চলো।
              ফ্লরিডার ডোভ ওয়ার্ল্ড আউটরিচ সেন্টার বলে এক খৃষ্টীয় চার্চ আগামী ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে ওই বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের সামনে কোরান পোড়াবে বলে হুমকি দিয়ে রেখেছে। তারা সেই দিনটির নাম দিয়েছে ‘কোরান পোড়ানোর দিন’।  কার্ল মার্ক্সের মতো নিন্দিত নাস্তিক জানতেন যে যিশু খৃষ্টের মতো কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন না। তারপরেও ওই কাল্পনিক ভদ্রলোকটির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার অন্ত ছিলনা। এই তথ্য বহু মার্ক্স বিরোধীতায় অন্ধদের কিম্বা অন্ধ মার্ক্সবাদি নাস্তিকদের জানা নেই। তাঁর মতে খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতক অব্দি খৃষ্ট ধর্মই ছিল রোমান সভ্যতার সমাজবাদ! সেই খৃষ্ট ধর্মের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবার মতো লোক সংখ্যাতে নগন্য হলেও অভাব নেই। The Christian Science Monitor বলে একটি বৈদ্যুতিন কাগজে ডান মারফি  লিখেছেনঃ   The increasingly acrimonious debate over the construction of the so-called Ground Zero mosque in Manhattan, about two blocks away from the World Trade Center towers that were destroyed by Al Qaeda on Sept. 11, 2001, echoes similar debates in Europe and could, if the rhetoric becomes commonplace, have broad and negative ramifications for the integration of America's growing Muslim population ।
              এই সহজ বুদ্ধির লোকের সংখ্যা কমে গেছে আজকের মার্কিনি সাম্রাজ্যবাদিদের শাসিত এবং অনুগত বিশ্বে। বিপদ এইখানেই মারাত্মক। ওবামা এই সহজ বুদ্ধির থেকেই কথাগুলো বলেছিলেন। কিন্তু, তিনিও এই ব্যবস্থার দাস, তাই তাঁকে আপাতত পেছনে হাঁটতেই হলো। কিন্তু তর্কের যে ঢেঊ উঠল তা, ধর্ম এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে গোটা পৃথিবীকে আরো একবার কাঁপাবে। আমাদের দেশের ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে যারা বেশ গৌরবান্বিত, তাদের কথা নাহয় বাদই দিলাম, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গিয়ে যারা ইঊরোপের জাতিরাষ্ট্রগুলোর নজির দিয়ে ভাষা নির্ভর জাতীয়তাবাদের পক্ষে ওকালতি করেন, তাঁরাও তাঁদের তত্বর বিশুদ্ধতা আর  ফাঁকির যায়গাগুলো নিয়ে আরেকবার ভাবতে শুরু করলে আমরা ভবিষ্যত নিয়ে আশান্বিত হতে পারি। 
                                   
আপাতত নইলে কোরান পোড়াবার দিন পালিত হোক। ওদের ক্ষমতা আছে পালন করবে, কে ঠেকাবে!  কিন্তু সেদিন আসবে খুব শীঘ্রই, যেদিন ঐ  তেল আর রক্তচোরা সাদা সাহেবদের কেয়ামতের দিন  পালিত হবে গোটা বিশ্বে, মায় আমেরিকাতেও!  সেই অপেক্ষাতে আমাদের কাটবে আরো কিছু দিন, হয়তো কয়েকটি বছর কিম্বা দশক। কিন্তু আসবে , সে নিশ্চিত !

Monday, 22 March 2010

মুনাফা মার্কিনিদের , দায় আমাদেরঃ পারমাণবিক ক্ষতির সামাজিক দায় বিল ---দাসত্বের এক নয়া নমুনা!

          বাংলাতে একে কী বলা যাবে আমি নিশ্চিত নই। বোধহয় বিষয় ও ভাষার জটিলতার জন্যে ইংরেজি দু’একটা কাগজের বাইরে ভারতীয় ভাষার অন্য কাগজগুলো এ নিয়ে বেশি মাতামাতি করেনি। আমি বাংলাতে লিখলাম ‘পারমাণবিক ক্ষয়-ক্ষতির সামাজিক দায় বিল ২০১০’ ইংরেজিতে এটিকে বলা হচ্ছে ‘Civil Liability for Nuclear Damage Bill 2010’. সরকারও সাহস করেনি একে সরবে সংসদে নিয়ে আসতে।  যেটুকু আওয়াজ না করলেই নয় তাই করে গেল ১৫ মার্চে লোকসভাতে আনতে গেছিল সেই বিল। কিন্তু সমস্ত বিরোধীদের এক যোগে বিরোধের ফলে সেটি আটকে গেছে। বলা ভালো আটকে আছে।
পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজন টয়োজন নিয়ে গেল বছর খুব একগুচ্ছ বিতর্ক হয়ে গেছিল। তখনই মার্কিনি দাসত্বের অভিযোগ উঠেছিল এই সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু এবারেরটা একেবারেই নগ্ন। কল্পনা করুন যে ভূপালের চেয়েও ভয়ঙ্কর কোনো দুর্ঘটনা ঘটালো কোনো কোম্পানী , যার আশঙ্কা করেই অনেকে পারমাণবিক শক্তির বিরোধীতা করে থাকেন, তখন আপনি ঐ বিদেশি কোম্পানীকে আর কোনো ধরা ছোঁয়ার মধ্যে পাবেন না। লাভের ভাগ নিয়ে ও চম্পট দেবে, লোকসানের ভাগ নিয়ে আপনি মরতে থাকুন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। এই হচ্ছে এই বিলের সার কথা! 
ইতিমধ্যে ওয়েস্টিং হাউস এবং জেনারেল ইলেক্ট্রিক  কোম্পানী দুটো এ দেশে বেশ ক’টি কোটি কোটি ডলারের পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপন করতে এগিয়ে এসছে। কিন্তু আসবার আগেই ওরা নিশ্চিতি চাইছে ভূপাল দুর্ঘটনার পর ইউনিয়ন কার্বাইডের যে সামান্য ভোগান্তি হয়েছে তাও যেন না হয়। সে নিশ্চিতি এতোটাই যেটুকু ওদের নিজেদের দেশ আমেরিকাও ওদের দেয় না। ওদের এই আকাঙ্ক্ষা নিজেই প্রমাণ করে শক্তির পারমাণবিক বিকল্প কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে!
               এই বিল অনুযায়ী দুর্ঘটনার শিকার কোনো পক্ষের থেকেই ভারতে বা ওদের নিজেদের দেশে কোনো ধরণের মামলা মোকদ্দমা করা যাবে না। দুর্ঘটনার কোনো ধরণের দায় ওদের থাকবে না। দায় বর্তাবে ভারত সরকারের ঘাড়ে । বিলের ধারা ৭ বলছে,           “Central Government shall be liable for nuclear damage in respect of a nuclear incident” কেননা বিদেশিদের তৈরি কেন্দ্রগুলোর মালিকানা বুঝি ভারত সরকারের । ব্যাপারটা একটু জটিল বটে। ভারত সরকারের হয়ে ওই শক্তি কেন্দ্রগুলো চালাবে কিন্তু Nuclear Power Corporation of India Limited (NPCIL).  তারপরেও বিলে প্রায়ই ভারত সরকার ও পরিচালক (Operator) শব্দগুলো কিন্তু আলাদা করেই বলা আছে। বিলের ষষ্ঠ ধারাতে সরকার ও  পরিচালকের যৌথ দায়ের চূড়ান্ত সীমা বেঁধে দিয়ে বলা হয়েছে, “the rupee equivalent of 300 million special drawing rights (SDRs),” এটি খুব প্রায়োগিক ভাষা। টাকার ভাষাতে এর অর্থ হলো  দু’হাজার সাতাশি কোটি টাকা ( ২০৮৭ কোটি) বা পঁয়তাল্লিশ কোটি আশি লক্ষ    (৪৫৮ মিলিয়ন) ডলার । সমপর্যায়ের মার্কিনি আইনে (প্রাইস এন্ডারসন আইন)  ব্যক্তিমালিকানা কোম্পানীগুলোকে যে দায় বহন করতে হয় এর পরিমাণ তার থেকে এক নয়, দুই নয়, তেইশ (২৩!) গুণ কম। এর মধ্যে আবার পরিচালন সংস্থার দায় মাত্র পাঁচশ কোটি টাকা           ( ৫০০ কোটি) । সে যারই দায় হোক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে দায় এ দেশের  আমজনতার ঘাড়েই চাপছে। যখন কিনা , যে আমেরিকার চাপে আইনটির খসড়া তৈরি হয়েছে সে দেশেও এমন বিধঘুটে ব্যাপার নেই! এমন কী দায়ভারের কোনো চূড়ান্ত সীমাও ওখানে বেঁধে দেয়া নেই।
ভারত সরকারের অধীন পরিচালন সংস্থা এন.পি.চি.আই.এল. ইচ্ছে করলে নির্মাণ চুক্তি করবার বেলা কোনো কোম্পানীর ঘাড়ে সে দায় চাপাতে পারে কিন্তু সেটাও ঐ ৫০০ কোটি টাকার উপরে যাবে না , কিছুতেই। কিন্তু সেটাও আদায় করাবার দায় ওই ভারতীয় পরিচালন সংস্থারই। আর কোনো ভারতীয় ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি বা সংস্থা স্বদেশে বা ঐ কোম্পানীর দেশে কোনো মামলা করতে পারবে না। অর্থাৎ , এই গণতন্ত্রের জয়ধ্বজা তুলবার যুগেও পৃথিবীর সবচে’ শক্তিশালী গণতন্ত্রের চাপে সবচে’ বড় গণতন্ত্রের দেশে এই মহাপুরুষেদের কোম্পানীগুলো থাকবে সমস্ত আইনি ধরাছোঁয়ার বাইরে।  ওদের গাফিলতির জন্যে আপনার গাঁ-গঞ্জ  উচ্ছন্নে গেলেও আপনি ওদের টিকিটির নাগাল পাবেন না। ভারতীয় আইন ব্যবস্থাকে ওরা সহজেই বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে প[রবে! ধারা পঁয়ত্রিশে বলা হয়েছে, “No civil court shall have jurisdiction to entertain any suit or proceedings in respect of any matter which the Claims Commissioner or the Commission, as the case may be, is empowered to adjudicate under this Act and no injunction shall be granted by any court or other authority in respect of any action taken or to be taken in pursuance of any power conferred by or under this Act,”
 পারমাণবিক ক্ষয়ক্ষতি দাবি কমিশন একটা থাকবে (Nuclear Damage Claims Commission) ওদের রায়ই চূড়ান্ত হবে এর বিরুদ্ধেও কোথাও কোনো মামলা করা যাবে না। মার্কিনি আইনে কিন্তু মার্কিন আদালতকে পুরো স্বাধীনতা দেওয়া রয়েছে। ক্ষতির দায় দাবি করবার সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে নতুন বিলে । আঠারো ধারাতে বলা হয়েছে দশ বছর পর করা কোনো দাবি গ্রহণ করা হবে না। আম পাঠকের মনে হতে পারে , এতো অনেক বেশি সময়। কিন্তু যারা জানেন, পারমাণবিক ক্ষতির সময়ের বিশাল ব্যাপ্তির কথাটা তাদের কাছে এই সময় অতি নগণ্য মাত্র।
এই শক্তিকেন্দ্রগুলো থেকে যে মুনাফা হবে তার কথা মাথায় রাখলে এই যে রেহাই ওদের দেয়া হচ্ছে সেটিকে ভারতীয় আম জনতার সঙ্গে করা এক নিষ্ঠুর রসিকতা বলেই মনে হবে। শুধু কি তাই! আমাদের স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে যে এই শক্তি কেন্দ্র গুলো দেশের বিদ্যুত সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু ওরা যাতে ভারতে বাজারজাত করতে পারার মত কমদামে বিক্রী করে সে ব্যাপারেও এই আইনে ওদের ব্যাপক ছুট দেবার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ওখানেও অনেকটা ছাড়ের দায় বহন করবে ভারতীয় পরিচালন কমিটিটি। 
আমেরিকার ওই কোম্পানীগুলো ছাড়া ভারত যে আর কোনো আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে তাও নয়। বস্তুত চের্নোবিল দুর্ঘটনার পর থেকে এমন এক আন্তর্জাতিক দায় দায়িত্বের আদর্শ স্থাপনের চেষ্টা হলেও তা খুব একটা শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াতেই পারেনি। এমন অবস্থায় এই বিল এমন এক ধারণা দিতে চাইছে যেন ভারত এক আন্তর্জাতিক কর্তব্যের দায় বহন করতে চলেছে। এই যদি সে দায়ের নমুনা হয়, তবে বলতেই হবে উন্নয়নের লোভে এবং তার নামে  ভারত অমানবিকতার এক অত্যন্ত নিকৃষ্ট নমুনা পেশ করতে চলেছে। এই আদর্শে মুনাফাটা বিদেশী, কিন্তু ক্ষতিটা স্বদেশী। মুনাফা ব্যক্তিক, কিন্তু ক্ষতিটা সামাজিক! ভারতের সরকার যে এ দেশের মানুষ নয়, বরং বিদেশের কয়েকটি কোম্পানী চালাচ্ছে এর চে’ নির্লজ্জ উদাহরণ আর কী হতে পারে!
    ভারতের কিন্তু রাশিয়া ঐ ফ্রান্সের সঙ্গেও পারমানবিক ব্যবসা ও চুক্তি রয়েছে। ওদেরো ওমন এক আইনের দরকার নেই এ দেশে ব্যবসা করতে। মজার কথা এই যে পারমাণবিক শক্তি মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাবিত বিলের বিরুদ্ধে এবারে কেবল বিরোধীরাই নয়, খোদ সরকারেরই বিভিন্ন মন্ত্রক প্রতিবাদের বিণ বাজাচ্ছে।  অর্থ মন্ত্রক এতোটা আর্থিক দায়ভার নিতে প্রস্তুত নয়, পরিবেশ মন্ত্রক পরিবেশের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে চিন্তিত। বোধ করি তাতেই সরকার একটু নড়ে চড়ে বসেছে। কিন্তু খুব যে একটা পিছু হটবে তা মনে হয় না। কেন না, ২০০৮এর ভারত মার্কিন পারমাণবিক চুক্তির এটা এক বাধ্যবাধকতা। তখনই ঠিক হয়ে আছে যে ভারতের Nuclear Power Corporation of India Limited (NPCIL) হবে শক্তি কেন্দ্রগুলোর পরিচালন কর্তা। এই কর্তাটিই লাঠি হাতে দারোয়ান। রাতে চুরি হলে সব দায় ওর। নির্মাণ ও সরবরাহের কাজটা করবে মার্কিনি কোম্পানীগুলো। মুনাফাটাও ওরা নিয়ে যাবে। কিন্তু কেউ যাতে এখানে ওদের টিকি ধরে টান না দেয় তার নিশ্চয়তা দিতে অরকম একটা আইন আনতে হবে। সরকার এখন সেই নির্দেশনামাই অনুসরণ করছে। এটা না করতে পারলে দু’বছর ধরে বাজানো সব ঢাক ঢোল অথলে গেল! দেখা যাক , এখন স্বপ্নের পারমাণবিক বিদ্যুতের বিনিময়ে ভারতের মানুষ ঠিক  কতটা মরতে তৈরি হোন।

Sunday, 31 January 2010

Computer, Internet, Matribhasha Ebong Antorjalik Obhidhan 'SHOBDO'


কম্প্যুটার, ইন্টারনেট, মাতৃভাষা এবং
আন্তর্জালিক অভিধান শব্দ:

ইংরেজির আধিপত্যকে বিদেয় দিয়েই হবে কম্প্যুটার ইন্টানেটের প্রথম আন্তর্জাতিকীকরণঃঃ
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র হবার সুবাদে এক সময় আমার ইংরেজি লিখতে হাত কাঁপতবলতে হলে বোধহয় এখনো ঠোঁট কাঁপবেআজ আমি একটি কাগজ ( প্রজ্ঞান) নিয়মিত সম্পাদনা করি যার বেশির ভাগ লেখাই থাকে ইংরেজিতে এ দরকারে এবং আনুষঙ্গিক আরো অজস্র দরকারে আজ আমাকে রোজ ইংরেজি লিখতে হয়আমার হাত কাঁপে না কারণটি, আর কিছু নয়ইচ্ছা,নিষ্ঠা, দৃঢ়তা এই ভারি শব্দগুলো উচ্চারণ করা যেতেই পারেকিন্তু সহজ শব্দটি হচ্ছে কম্প্যুটার আজ অনেকদিন ধরে কলম চালাই না পিড়িতে বসে রাতের খাবার না খেয়েও যদি কোনো বাঙালির লজ্জা না হয়, আমার তবে কলম না চালাবার জন্যে লজ্জা কিসের?
দুটোই লেখার যন্ত্রতাতে, কম্প্যুটারেও হাত কাঁপবার কথা ছিল বটে কিন্তু কাঁপে যে না, তার কারণ এর সঙ্গে এক বিশাল অভিধান পাওয়া যায়যে আপনা আপনি আমার লেখার ভুল ধরে ফেলে এবং মুহূর্তে ঠিক করে নিতে পারিঅনেক সময় আমার বাক্যের ভুলও ধরে দেয় কম্প্যুটারঅন্ততঃ কলমে লিখলে যতটা ভুল থাকতে পারত তার প্রায় আশি শতাংশই এখন থাকবার সম্ভাবনা নেইআর এই ইংরেজিতেই আমাকে আমার লেখালেখির এবং পত্রিকা সম্পাদনার কাজে দেশে বিদেশে বহু লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়দেশে বিদেশে যোগাযোগ করতে হলে যে আন্তর্জালিকার ( ইন্টারনেট) দরকার পড়ে সেতো অভিধানকে আরো বিশাল করে দিয়েছেআপনি যে ইংরেজি শব্দটি এম.এস.ওয়ার্ডে খুঁজে পাবেন না, তাকে সেখান থেকেই ক্লিক করে দিন, সে আলাদীনের প্রদীপের মতো সারা পৃথিবী থেকে খুঁজে এনে সেই শব্দের অর্থ আপনার ডান হাতের কাছে ফেলে দেবেসুতরাং আর ভয় কিসের? আপনাকে বিশেষ শ্রম করতে হবে না
আচ্ছা কেমন হতো, যদি আপনি এরকমই নির্ভয়ে বাংলা লিখতে পারতেন? আমার এ কবছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি অসম তথা পূর্বোত্তর ভারতের বহু পাঠকই মন খারাপ করে বলবে, ওটি হবার নয়! ছাপাখানাতে যে বাংলাতে কাজ করা যায় এই যথেষ্ঠবিশ্বায়নের যুগে এমন বাংলার বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখাই বৃথাবিশেষ করে আমার মতো বাংলার ছাত্রই যখন গৌরবের সঙ্গে শোনাচ্ছি ইংরেজিতে হাত পাকাবার গল্প , তখন আর ভরসা কোথায়!
যে বাঙালিরা আমার সঙ্গে রোমান অক্ষরে বার্তা বিনিময় করেন, তাদের বেশির ভাগই অসমের লোকতাদের আমি প্রায়ই রসিকতা করে শোনাই ত্রয়ী ছবির কেষ্ট মুখার্জীর সেই বিখ্যাত সংলাপ , “বাংলায় ফিরে এসো , বাবা!” ইংরেজিতেই বিশ্বায়ন হবে এটি যে কেমন সেকেলে আর উত্তর ঔপনিবেশিক ধারণা তা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের সব্বার চোখের সামনে জলের মতোই স্পষ্ট হয়ে যাবে সেই ২০০২তে তিনসুকিয়া থেকে প্রকাশিত দৃষ্টি বলে একটা কাগজে আমার তখনকার অধ্যয়ন-অনুসন্ধানের উপর ভিত্তি করে অসমে ব্যবহারিক বাংলা শিক্ষার সংকট নামে এক প্রবন্ধে লিখেছিলাম কম্প্যুটার ইংরেজি ছাড়া বোঝেনাএ অবশ্য ডাহা মিথ্যা প্রচার তা যদি সত্যও হয় তবে ভারতবর্ষ সেই দেশ যেখানে তাকে বহু ভাষার পাঠ দেয়া যায় সে পাঠ না নেয়, তবে পুরোনো প্রযুক্তির আস্তাকুড়ে তাকে ঝেড়ে ফেলে আমাদের তৈরি করে নিতে হবে আরো আধুনিক সেই যন্ত্র যে ঈশ্বরের পাশে বসবে না স্বয়ং ঈশ্বরকে -–যিনি বাংলা বোঝেন নাজায়গা ছাড়ার নোটিশ দেবে যে বলবেশুনবে বোঝবে শুধু ইংরেজি নয়মানুষের ভাষা তার মাতৃভাষা সে ভাষার শত বৈচিত্রকে সে বুকে ধরবে পরম গৌরবে আর মমতায় অচিরেই তা হতে যাচ্ছে বলে আমাদের বিশ্বাস এবং কম্প্যুটারই তা করবে...
কিন্তু উত্তর ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণাতে আচ্ছন্ন ভারতে কাজটা হয় নি হয়েছে ইনটারনেট কোর্পোরেশন ফর এসাইনড নেমস এণ্ড নাম্বার্স( ICANN) নামের আন্তর্জাতিক সংস্থাটির মাস আগে সিওলে অনুষ্ঠিত বাৎসরিক সভাতেনামেই প্রকাশ ওদের কাজটা কী ওরা বলছে ইংরেজির কাঁধে চড়ে ইন্টারনেট ও কম্প্যুটারের বিশ্বায়ন সম্ভবই নয়কারণ এখনো বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ থেকে গেছেন এই ভাষাটির আওতার বাইরেযথার্থ আন্তর্জাতিকীকরণ সম্ভব শুধু ইন্টারনেটকে বহুভাষী করে ফেলে তবেই এটা অন্তত; ব্যবসায়িক স্বার্থে হলেও এই প্রযুক্তিবিদেরা এখন স্বীকার করতে চলেছেন তারা কম্প্যুটারের সাংকেতিক ভাষাকে লাতিন থেকে অলাতিনে রূপান্তরিত করবার কাজটি সেরে ফেলেছেন সংস্থাটির চেয়ারমেন পিটার ডেঙ্গেট থ্রাসের ভাষাতে , ‘চার দশক আগে ইন্টারনেটের যাত্রা শুরুর পর এই প্রথম এক সর্ববৃহৎ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে একে তিনি বলছেন ইনটারনেটের আন্তর্জাতিকীকরণের পক্ষে প্রথম এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ!
এই ঘটনা শুধু, কম্প্যুটার প্রযুক্তিতেই বিপ্লব আনতে যাচ্ছে না এর এক সুদূর প্রসারী সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়তে যাচ্ছে যে সব ছোট ছোট ভাষাকে উপভাষা বলে কাগুজে পণ্ডিতেরা এককোনে ঠেলে দিচ্ছিলেন সেগুলোও এখন মাথাতুলে দাঁড়াচ্ছে আর দাঁড়াবে সারা পৃথিবীতেই এবারে টিভি চ্যানেলগুলোর মতোই ইনটারনেট ব্যবসায়ীরাও মাতৃভাষার প্রচার ও প্রসারে জোর দিতে যাচ্ছে এবং ভারতের মতো দেশে ইংরেজি জানা 'সাহেব'রা এবারে সেকেলে হতে চললেন গেল ১৬ নভেম্বর,০৯ থেকে নতুন ব্যবস্থাটি পৃথিবীর বহু দেশেই কাজ করতে শুরু করেছে অর্থাৎ যাকে আমরা ওয়েব আইডি বা ডোমেইন নেমবলি, সেটি আর অদূর ভবিষ্যতে শুধু লাতিনে বা ইংরেজিতেই থাকছে নাবাংলা হিন্দিতেও পাওয়া যাবেশুনেছি বাংলাদেশে এটি এখনই কাজ করতে শুরু করেছেভারতেও প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছেএর জন্যে সরকারি তরফেও বেশ কিছু প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রস্তুতির দরকার পড়বে গেল ১০ ফেব্রুয়ারিতে গুয়াহাটিতেই এ নিয়ে সচেতনতা বাড়াবার জন্যে একদিনের এক কর্মশালা হয়ে গেল। পান বাজারের হোটেল প্রাগ কন্টিনেন্টালে এই ওয়ার্কশপের আয়োজক ছিল যৌথভাবে ভারত সরকারের তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রক ও সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অফ আডভান্সড কম্প্যুউটিং (C-DAC)
এরকম সময়ে আমরা যদি কোনো প্রস্তুতিই না নিই তবে যে আমাদের অনেকটা পিছিয়ে যেতে হবে সে আর বিচিত্র কী? ছাপাখানাতে যে ভাবে বাংলা লেখা হয় তাই দেখে আমাদের অনেক বাঘা বাঘা পণ্ডিত লেখক সাহিত্যিকেরও পিলে চমকে যায়তারা আর নিজে বসে কম্প্যুটারে বাংলা লেখার সাহস করে উঠতে পারেন নানিজের সংগ্রহে একটি কম্প্যুটার থাকলেও নাঅবশ্যি এই চিত্রটি অসম তথা পূর্বোত্তর ভারতের জানি না, কেন বাকি ভারতে কিন্তু আজকাল বোধহয় এমন কোনো লেখকই নেই যিনি তাঁর মাতৃভাষাতে লিখবার বেলা কম্প্যুটার না ব্যবহার করেন আগে যারা টাইপ রাইটার ব্যবহার করতেন তাদের প্রায় প্রত্যেকেতো বটেই, নতুন প্রজন্মের আরো অজস্র লেখক এই সারিতে যোগ দিচ্ছেনএবং কম্প্যুটার লেখকের সংখ্যা বহু বাড়িয়ে দিচ্ছে বলেই আমার বিশ্বাসআজকাল বহু লেখকেরই নিজেদের ব্লগ বা ওয়েবসাইট রয়েছে তাঁরা যখন বই করে সে লেখাগুলো প্রকাশ করেন , সেখানেও সে ব্লগের কথা উল্লেখ থাকে দেখিবহু বড় কাগজের সঙ্গে ছোট কাগজেরও রয়েছে নিজেদের ব্লগলিটিল ম্যাগ মেলা নিয়ে সম্প্রতি শিলচর খুব মেলা হয়ে গেললিটিল ম্যাগ কাগজের সম্পাদকদের এক আলাদা অভিমানও থাকে কিন্তু সেই অভিমানীরা কি খবর রাখেন আজকাল ব্লগ সাহিত্য বলেও সাহিত্যের এক শক্তিশালী ধারা গড়ে উঠছে যশোধরা রায় চৌধুরী ,অতিথি হয়ে গিয়ে, শিলচরের সেই মেলাতে এ কথা বলেওছেন শুনেছি রোধে তার গতি এমন সাধ্য কারো নেইএর একটা বড় কারণ ব্লগে লিখবার জন্যে আপনাকে কোনো নাক উঁচু সম্পাদক বা প্রকাশকের পেছনে লেগে থাকতে হয় নাঅমুক বাজে লেখে বলে লেখার বাজার থেকে আউট করে দেবার সম্পাদকীয় দাদাগিরি একেবারেই মাঠেমারা যেতে চলেছে! সেখানে আপনিই লেখক, আপনিই সম্পাদক, আপনিই প্রকাশক আর কাউকে পড়াবার জন্যে বই নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে হয় না, আপনি নিজের বাড়িতে বসেই দেখবেন আপনার পাঠক ছড়িয়ে আছেন বিশ্বময়! আমরা এ নিয়ে বিস্তৃত পরে কখনো লিখব আপাততঃ কিছু ভালো বাংলার সঙ্গে অন্য ভারতীয় ভাষার ব্লগের ও কাগজের ঠিকানা আপনারা এই ব্লগের লিঙ্কে দেখে  নেবেন  আশা করি
কিন্তু সবচে; বড় যে কারণটির জন্যে ব্লগ লেখার সংস্কৃতি দ্রুত ছড়াচ্ছে তা হলো, বাংলা লেখার উপায়টি মোটেও ছাপাখানার মতো দামি আর পিলে চমকাবার মতো নয়একে ইউনিকোড বলে সহজেই আপনি বিনামূল্যে ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে নিয়ে লিখে যেতে পারেন, যেভাবে ইংরেজি লেখেনবাংলা,অসমিয়া, মনিপুরি লিখবার জন্যে অভ্র খুব ভালো এবং জনপ্রিয় সফটওয়ার এতে প্রচুর ফণ্ট বৈচিত্র পাওয়া যায়, একেবারে ছাপাখানার মতোএতে কেবল অসমিয়া লিখবার জন্যে , এমন দুএকটা বর্ণে একটু জটিলতা রয়েছেতাও তেমন কিছু নয় বরাহ দিয়ে ভারতের সব ভাষাতে লেখা যায়অসমিয়া-বাংলা-মণিপুরি ভাষাগুলো লিখবার জন্যে অসমে তৈরি হয়েছে আদর্শরত্নে গোগোল নিজেও আজকাল ভারতীয় ভাষা লিখবার উপযোগী সফটওয়ার সমর্থণ নিজে দিয়ে থাকেএছাড়াও আরো প্রচুর রয়েছেআমরা কটির নাম নিলাম মাত্রশুধু সংক্ষেপে বলে রাখি যে আমরা ব্লগের কথা বললাম বলে যেন কেউ মনে না ভাবেন যে শুধু সাহিত্যের কাজই হচ্ছে ওখানেঅসমে আবার আমরা বাংলাতে কিছু লেখালেখির কথা বললে সাহিত্য আর সমাজ বিজ্ঞান ছাড়া বিশেষ কিছু বুঝি নাআসলে এখনই যে কেউ ইচ্ছে করলে বাংলা , অসমিয়া , হিন্দিতে যাকে বলে ওয়েব সার্চ---করতে পারেনকরেন খুব কম লোকেকারণ ঐ আমাদের উত্তর ঔপনিবেশিক মনের সংস্কার সহজে যাবার নয় তার উপর এখানে কিছু উপাচার্যের পদবীর ব্যক্তিও মনে করেন, ইন্টারনেট বই সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে এতে বুঝি কেবল দুষ্ট ছেলে মেয়েরা বসে গেম খেলে আর ছবি দেখে! আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আমি মাও -ৎসে-তুঙের রচনাবলী পুরো এবং মার্ক্সের পুঁজি পুরোটা ইন্টারনেটে প্রথম পেয়ে সংগ্রহ করে রেখেছিতাও বিনা মূল্যে! পড়া হয় নি সবটাআমার ইচ্ছে নয়, বিদ্যে কম বলেপড়ে বুঝব না তা ওটি আমাদের তিনসুকিয়ার বাজারে পেতে গেলে আলাদীনের প্রদীপের সহায় নিতে হবে! ম্প্রতি পশ্চিম বাংলার ভাষা প্রযুক্তি গবেষণা পরিষদ আই আই টি খড়গপুর ও শিবপুর বি ই কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে পুরো রবীন্দ্র রচনাবলী ইন্টারনেটে তুলে দিয়েছে। তাদের পরিকল্পনা আছে অদূর ভবিষ্যতে বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর, শরৎ চন্দ্র, নজরুলদেরকেও ইন্টারনেটে নিয়ে আসার। যদিও এদের সবার রচনারই সবটা নাহলেও অনেকটাই এখনই নেটে পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত সুবীর ভৌমিকের The Troubled Periphery’ বইটির কথা আমরা ইন্টানেটে যারা লেখাপড়া করি তারা ভ্রুণাবস্থাতেই তাঁর নিজের সুসজ্জিত ব্লগ  থেকে জেনে গেছি এবং বাড়িতে বসে কিনে এনে অনেকে তা পড়েও ফেলেছি! এও জেনেছি তিনিই বোধহয় একমাত্র বাঙালি বুদ্ধিজীবি যিনি নিজে পূর্বোত্তরীয় বলে এক আলাদা গৌরব বোধ করেনউৎসর্গের পৃষ্ঠাতে নিজের মেয়ের পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘The Daughter of North East’! ‘সুসজ্জিত লিখে মনে পড়ল ব্লগ বা সাইট সাজাতে না জানলেও কোনো সমস্যা নেই বাংলাতেই বাংলাহ্যাক্সের মতো বেশকিছু সাইট রয়েছে যারা নিখরচাতে পরামর্শ দিয়ে থাকে
শব্দ তৈরি হচ্ছে পূর্বোত্তরের ভাষাগুলোর Virtual Babel Tower’:
তাহলে রইল বাকি, আমরা যা দিয়ে আলাপ শুরু করেছিলাম, সেই অভিধান ! ইংরেজির মতো স্বতঃস্ফূর্ত কাজ করবার মতো অভিধান এখনো কোনো ভারতীয় ভাষার নেই বটে, সেটি হবে ঐ আই.সি..এন.এন নামের সংস্থাটির প্রকল্প যখন পুরো মাত্রায় কাজ শুরু করবে তখনআমি নিজে যদিও এখনো পরীক্ষা করিনি তবে অপেন অফিস এবং মাইক্রোসফট২০০৭ যে বাংলা-অসমিয়া সংস্করণ ছেড়েছে তাতে ইতিমধ্যে সেই ব্যবস্থা থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু আপনি সাইট খুলে দেখে নেবার মতো বাংলাতে সংসদের অভিধান থেকে শুরু করে প্রচুর আছেগোগোল ব্যবহার করে বাংলা লিখলে সেটি শুরুতেই আপনাকে অনেক শব্দের বিকল্প সামনে এনে দেয়,আপনি পছন্দের শব্দটি ব্যবহার করতে পারেনঅভ্রও এম এস ওয়ার্ডের মতো অনেক বাংলা শব্দ সমর্থণ করেবিশেষ করে দিন, মাসের নামের মতো বহু প্রচলিত শব্দগুলো লিখতে শুরু করলেই সে পুরো শব্দ দেখাতে শুরু করে আপনি সেটিতে টিপে দিলেই এ বসে যায় হিন্দি সহ অন্য ভারতীয় ভাষারও প্রচুর আছেনেই অসমিয়ার এবং অন্য পূর্বোত্তরীয় ভাষার অভিধান এবং নেই সিলেটি সহ বাংলা ভাষার পূর্বোত্তর ভারতীয় উপভাষাগুলোকে সমর্থণ করবার মতো কোনো অভিধান সেই খালি জায়গাকে ভরে তুলতে গেল কবছর ধরে তৈরি হচ্ছে শব্দ                   ( XOBDO ) এর ওয়েব ঠিকানা হচ্ছেঃ http://www.xobdo.org/ ভাষার প্রশ্নে যে বৈচিত্র নিয়ে আমাদের গোটা দেশে গৌরব করে বেড়াবার কথা ছিল তাকেই আমরা কাজিয়ার বিষয় করে রেখেছি গেল প্রায় এক শতাব্দি বা তারো বেশি সময় ধরেশব্দ সেই গৌরবকে প্রতিষ্ঠা দেবার ঐতিহাসিক দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেঅচিরেই এটি হবে পূর্বোত্তর ভারতের সবচে বড় আর বৈচিত্রময় অভিধান ও বিশ্বকোষ আমরা তাই নিয়েই লিখব বলে এখন কলম তুলে নিয়ছিথুড়ি, কম্প্যুটারের বোতাম টিপে চলেছি!
ধানবাদের ইন্ডিয়ান স্কুল অব মাইন্সের পেট্রলিয়াম প্রযুক্তিতে স্নাতক বিক্রম বরুয়া টেস্কাস টেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পূর্ণ করে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে গিয়ে থিতু হয়েছেন সেখানে তিনি এক তেল সংরক্ষণাগারে অভিযন্তার দায়িত্বে কাজ করেন ২০০৬এর শুরুতে আরবের মরুভুমিতে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করবার দিনগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই দেশের নদী-পাহাড় সবুজ অরণ্য তার কাছে ডাক পাঠাতোছেলেবেলা থেকেই কল্পবিজ্ঞানের গল্পে ও নানা প্রবন্ধপাতি অসমিয়াতে লিখে তিনি হাত পাকিয়েছেনবিদেশে যখন নিজের ল্যাপটপে লিখবেন বলে ভাবছিলেন তখন স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর দরকার পড়ছিল এক অভিধানের গোগোলে যখন তিনি অনুসন্ধান করলেন বাংলা, হিন্দি, পাঞ্জাবি, মালয়ালম ভাষাতে বেশ কিছু অভিধানের খোঁজ পেলেনঅসমিয়াতে একটিও নয়
ব্যস, আর যায় কোথায়! ২০০৬এর মার্চের ১০ তারিখে আসামনেটইয়াহু গ্রুপে ( অসমের মানুষের সবচে সক্রিয় আন্তর্জালিকা গোষ্ঠী) তিনি শব্দের যাত্রা ঘোষণা করলেন কম্প্যুটার প্রযুক্তিতে তিনি যে তেমন দক্ষ ছিলেন তা নয়, না ছিল তাঁর ভাষা বিজ্ঞানের উপর কোনো অধ্যয়ন! যারা মনে করেন কোনো এক বিষয়ে হাজারটা বই গিলে না খেয়ে কাজে হাত দেয়া উচিত নয় তাঁরা যে কেমন সেকেলে লোক, বিক্রম তাঁর উজ্জ্বল উদাহরণ! চাই কেবল স্বপ্ন আর সেই স্বপ্নকে সাকার করবার এক দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা বাকি কাজ আপনি এগোয়শুরু শুরুতে বিশ্বের নানা কোন থেকে প্রিঙ্কু শর্মা, পল্লব শইকিয়া, উজ্জ্বল শইকিয়ারা এসে যোগ দেনধীরে আরো অনেকেপ্রিয়ঙ্কু শব্দকে জীবনী শক্তি যোগাবার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রচারে উঠে পড়ে লাগেনপ্রচার বিমুখ হয়ে শব্দের এক পাও এগুনো সম্ভব ছিল না, আজো নয়কেন না এর চাই সারা বিশ্বের যেখানেই পূর্বোত্তরের মানুষ রয়েছেন তাদের থেকে অনেক অনেক সহকর্মীপল্লব হৃদয়ে মতোই আড়ালে থেকে এর প্রাণ স্পন্দনকে সচল রাখবার কাজ করছিলেনঅর্থাৎ , তিনি যাকে বলে ডাটাবেস তার কাজটা দেখছিলেনএখনো তাই করে যাচ্ছেন এই বিক্রম, প্রিয়াঙ্কু, পল্লব মিলে এখনো 'শব্দ' সাইটের বছরের ডোমেন ভাড়াটা বহন করেন উজ্জ্বল শইকিয়াও শুরুর দিকে শব্দের সাইট গড়ে তুলতে বেশ খাটাখাটুনি করেছেন একে একে এলেন দিপাঙ্কর এম বরুয়া, দ্বীপায়ন বরুয়া, অপূর্ব মিলি, রাজীব কুমার দত্ত, নীলোৎপল বরপূজারী, কিশোর কুমার বর্মন, রুবুত মাউত, হাসিনুস সুলতান, রূপম কুমার শর্মা, রেশ্মী রেখা দত্ত, সুদীপ্তা গগৈ আনিসুজ্জামান এমন আরো অনেকে
গুয়াহাটি আই আই টিতে এক বড় কর্মীগোষ্ঠী গড়ে উঠলবুলজিৎ বুড়াগোহাঁই, ঋতুরাজ শইকিয়া, স্বপ্নিতা কাকতি, অর্চনা রাজবংশী, সঞ্জীব শর্মা, কৃষ্ণা বরুয়া এমন আরো অনেককে নিয়ে এদের সবার চেষ্টাতে বহু শব্দ শব্দে এসে জমা হলো২০০৭এর ১৭ জানুয়ারীতে আই আই টি ক্যাম্পাসেই শব্দের প্রথম মুখোমুখী বসে এক সফল সভা হলো এর আগে সবই হচ্ছিল ইণ্টারনেটে শুরু থেকেই শব্দের সম্পাদনার সমস্যা ছিলএকা বিক্রম এদিকটা সামলাতেন২০০৭ থেকে প্রিয়াঙ্কুও তার সঙ্গে এ কাজে হাত বাড়ালেন পরে রূপঙ্কর মোহান্ত এবং রূপকমল তালুকদার এসেও কাজে লেগে পড়লেন
২০০৭এর শেষের দিকে শব্দের ডাটাবেসকে মাইক্রোসফটে MSSQL প্রযুক্তি থেকে ওপেন সোর্সে MySQL স্থানান্তরণ ঘটিয়ে সাইটিকেও সাজিয়ে তোলা হয়পল্লব এবং বিক্রমকে এর জন্যে পৃথিবীর দুপ্রান্তে থেকেও বহু খাটাখাটুনি করতে হয়েছিল কাজটি বড় চাট্টিখানি ছিল না মোটেওপিয়াঙ্কু, যিনি এখন উত্তর কোরিয়ার হাংকুক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশ বিষয়ে অধ্যাপনা করে তখন ফ্লরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্প্যুটার বিজ্ঞানের ছাত্র সাকিব রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তিনিও দিনে রাতে কাজ করে সাইটটিকে তার বর্তমান রূপ দেনবিক্রমের ভাষাতে, “ Thus, our beloved princes XOBDO got a new look… almost like a bridal make-up!”
২০০৮এর জানুয়ারীতে ফ্রেন্ডস অব আসাম এ্যাণ্ড সেভেন সিস্টার্স ( FASS) তাদের বার্ষিক সভাতে সুযোগ করে দেয় শব্দএর সাইটকে জন সমক্ষে তুলে ধরতে প্রচার মাধ্যমগুলো সে ঘটনাকে দারুণভাবে তুলে ধরেএর পেছনে অবশ্য বুলজিতের এক বড় ভূমিকা ছিল এবারে ওর ভূমিকা প্রশ্নাতীত অসমের যেকোনো ভালো ভালো সদর্থক কাজের সংবাদ সংগ্রহ করা ও সেগুলোকে যথাসম্ভব বেশি প্রচার দেয়াটা ওঁর অনেকটা শখে মতোব্যক্তিগত জীবনে তিনি এখনো গুয়াহাটি আই টি আইর গবেষণা ছাত্রসে বছরের শুরু অব্দি ১০,২০০ অসমিয়া শব্দ সংগৃহীত হয়েছিল সে বছরে ২০,০০০ এর লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছিলএ কোনো সহজ কাজ ছিল নাকেবল শব্দ জুড়ে যাওয়াইতো আর কাজ নয়, এগুলোর শব্দতাত্বিক বিশ্লেষণ, যথার্থ ইংরেজি সহ বিভিন্ন ভাষাতে এদের অর্থ লেখা , সেই সঙ্গে এটাও নিশ্চিত করা যে শব্দগুলোর পুনরুক্তি হয় নি এমনি আরো কত কিছু! প্রায় দৈনিক হিসেব রাখার নিয়মানুবর্তীতা মেনে বছর শেষের আগেই বড়দিনের দিনে সেই লক্ষ্যে গিয়ে পৌঁছানো গেছিল পৃথিবীর নানা কোনে ছড়িয়ে থাকা শব্দ কর্মীদের কাছে সে ছিল যথার্থই এক উৎসবের মুহূর্ত
আগে যাদের নাম উল্লেখ করা গেল তারা ছাড়াও সে বছর এসে কাজে নেমেছিলেন বিরাজ কুমার কাকতি, অঞ্জলি সনোয়াল, প্রশান্ত বরা, পার্থ শর্মা, প্রবীন কাকতি, প্রসেনজিৎ খনিকর, মৌসুমী হাজরিকা, আব্দুল ওয়াহাব, পাপড়ি গগৈরা লেগে থেকে সেই লক্ষ্যমাত্রাতে পৌঁছুনো সম্ভব করে তুলেন একই বছরে প্রবাদ-প্রবচন যোগ দেবারও এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়এ পর্যন্ত পূর্বোত্তরের অন্য সব ভাষাকে অন্য ভাষা ( Other Languages) বলে উল্লেখ করা হতোসেবারেই শব্দ ঠিক করে কাউকে এভাবে স্বতন্ত্র করার কাজটা ঠিক হচ্ছে নাসমস্ত ভাষাগুলোরই সমান মর্যাদা ও স্বীকৃতি থাকা উচিতসুতরাং সাইট সম্পাদনা করে সমস্ত ভাষা নাম স্বতন্ত্র ভাবে লেখা শুরু হয়
২০০৯তে পূর্বোত্তরের অন্য ভাষা থেকেও বেশ কিছু সহযোগী এসে যোগ দেন তাই , মিশিং ভাষার শব্দ যোগাচ্ছেন অঞ্জলি সনোয়াল, মাড় শব্দ যোগাচ্ছেন লালরেমথাঙ মাড়, খাসি শব্দ যোগাচ্ছেন বানলাম ওয়ার্জর, মৈতৈ শব্দ প্রদান করে যাচ্ছেন মোহেন নাওরেম, ডিমাসাতে রয়েছেন বেশ কজন কুলেন্দ্র দাউলাগাপু, অনুজ ফঙলোসা, অর্ণব ফঙলোসা এবং উত্তম বাথাহি, প্রণব দোলে মিশিং , নব বডো এবং নওগওত ব্রহ্ম যোগাচ্ছেন বডো এবং মর্নিঙ্কি ফাঙশো ও দীপক টুমুঙ যোগাচ্ছেন কার্বি ভাষার শব্দএখন সারাবিশ্বে শব্দের প্রায় ১২০০ সদস্য ছড়িয়ে রয়েছেন যদিও তাদের সবাই সমান সক্রিয় নন
এ পর্যন্ত যতগুলো শব্দ এতে এসছে তার এক সাম্প্রতিক( ২০ সেপ্টেম্বর, ২০০৯) হিসেব এরকমঃ
ভাষা
শব্দ সংখ্যা
ভাষা
শব্দ সংখ্যা
অসমিয়া
২২৬২৮
ককবরক
৩০৬
ইংরেজি
১২৪২৩
বিষ্ণুপ্রিয়া
২৩৩
ডিমাসা
২৭০৫
নাগামিজ
১৩৮
কার্বি
১৩৭০
মিজো
১২০
মৈতৈ
৯৩০
গারো
১১৭
তাই
৯১৫
চাকমা
৮৭
বডো
৮০৪
আপাতানি
৭৫
মাড়
৬৩২
আও
৭৩
খাসি
৪০৫
মনপা
১৮
মিশিং
৩৬৪
কাওব্রু (রিয়াং)





এই তালিকাতে বাংলা নেইনেই হিন্দি পূর্বোত্তরের আরো দুটো প্রধান ভাষানেপালিও নেইনেই আরো বেশ কিছু প্রাচীন ভাষাথাকা উচিত ছিল কী?
বাংলা , হিন্দি , নেপালি ভাষা এবং পূর্বোত্তর ভারতঃ
এই কথাটাই আমি বিক্রম এবং শব্দের অন্য বন্ধুদের অনেক দিন আগেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাংলা নেই কেন? শব্দের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ২০০৮এর মাঝামাঝিআমাদের তিনসুকিয়া কলেজের নিয়মিত প্রকাশনা প্রজ্ঞানে  জন্যে শব্দ সম্পর্কিত তথ্যাদি পাঠান বুলজিৎ সেখানে তা ছাপাও হয়সেই থেকে তিনি আমাদের কাগজের এক সক্রিয় শুভানুধ্যায়ীপ্রজ্ঞানে প্যানোরামাতে চোখ ফেরালেই বুলজিৎকে অনেকটা চেনা যায় আমি নিজেও বাংলাতে লেখার সঙ্গে অসমিয়াতে লিখি অসমিয়া থেকে অনুবাদের কাজ করি আর যেহেতু তা ব্লগে করি, অন্য অভিধানের সঙ্গে শব্দও সেই থেকে আমার সহযোগীশব্দে নিজের গোগোল বন্ধু গোষ্ঠী আছে (xobdo@googlegroups.com ) এছাড়াও আমাদের মত বিনিময় হয়ে থাকে ফাস, আসামনেট, ‘শিলচর(Silchar@yahoogroups.com ) ইয়াহু গোষ্ঠীতেবিক্রম বলছিলেন বাংলাতে ইতিমধ্যে অনেক অভিধান রয়েছেআরেকটা জমবে কিনা , নিয়ে তাঁর সংশয় আছেকিন্তু সেই অভিধানগুলোতে হে-তাই ( He-She / 3rdt person, singular number) নেই, নেই লগে লগে, ‘বিয়ানি বেলা, ‘হাইঞ্জা বেলা , ‘কিয়ানো,‘কুশিয়ার এমন আরো কত কিছুতিনি যখন জেনেছিলেন এ হচ্ছে সিলেটি তখন কথাটা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছিলেন প্রিয়ঙ্কু এবং অন্যেরা এমন আরো অনেকে খবর নিয়ে জেনেছিলেন , যে অবিভক্ত বাংলাদেশে একে একসময় স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে দাঁড় করাবার চেষ্টা হয়েছিল সিলেটি নাগরি লিপিও গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিলএখনো সে চেষ্টা একেবারে বাদ পড়ে নিবরং বিদেশেও কোথাও কোথাও একে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে শেখানোই হচ্ছে অসমিয়া ভাষা তাত্বিকেরাও একে নিয়ে বেশ আলোচনা করেছেন, বেনুধর রাজখোয়া থেকে শুরু করে প্রায় সবাই উপেন রাভা হাকাচামতো একে অসমের এক প্রাচীন স্থানীয় ভাষাই বলেনযদিও এঁরা প্রায় সবাই একে হয় অসমিয়ার উপভাষা বা বৃহত্তম অসমিয়ার অংশ হিসেবে দেখেছেন প্রিয়ঙ্কু আমার প্রথম জিজ্ঞাসার কদিন পরেই জানান, ব্যাপারটা ওঁদের বিবেচনাতে আছেসিলেটিকে আলাদা ভাষা বা উপভাষা হিসেবেও নেবার কথা বিবেচিত হচ্ছিল কিন্তু , আমি ওঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানাচ্ছিলাম, কেবল সিলেটি নিলেতো হবে না, ‘কাছাড়ি বাংলার কথা যে কেউ বলে না আর দক্ষিণ ত্রিপুরার প্রধান উপভাষা কুমিল্লার ভাষার কী হবে? ছাড়া পদ্মা নদীর গোটা পূর্ব পারের বাঙালি, যারা পূর্বোত্তর ভারতে এসছেন বা আছেন, তারাই বা বাদ যাবেন কেন? এগুলো আলোচনা চলছিল
সম্প্রতি একটা লেখাতে বিক্রম শুরুতেই প্রশ্ন করেছেন, “ How many of you, whose mother tongue is Assamese, have the basic knowledge of the languages of the neighboring states, like Khasi, Ao, Mizo, Meetelon? Let alone these languages, how many of you know even the basics of few languages of Assam itself? Like Bodo, Mising, Rabha, Karbi? Probably very few of you are, that can be counted on finger-tips. The reverse is also true… there is hardly any genuine effort to learn Assamese by the non-native-speakers residing in the state, let alone those in the neighboring seven-sister states. Can we break this barrier?’ এই যে barrier’---- কেবল মানবিক সম্পর্কের নয়, পরম্পরার, ইতিহাসের, সংস্কৃতির এবং ভূগোলেরো বটেবিক্রমের কথাগুলোর Assamese শব্দের জায়গাতে Bengali বসিয়ে দিয়েও একই প্রশ্ন ছোঁড়ে দেয়া যায় এঁরা যেমন সিলেটি বা কাছাড়ি সম্পর্কে বিশেষ জানতেন না, আমি লক্ষ্য করেছিলাম বাঙালি বন্ধুরাও জানতেন না, কাছাড়ে সিলেটির আরো এক প্রাচীন রূপান্তর কাছাড়িও বটে! এটা শিলচর শহরের অনেকেও জানেন না, বা জানলেও আলাদা করে স্বীকার করতে চান নাসেই ক্ষোভে সম্প্রতি হাফলঙের জগন্নাথ চক্রবর্তী, যিনি আদতে হাইলাকান্দির সন্তান, এক ঢাউস সাইজের অভিধান লেখে নাম দিয়েছেন, ‘ বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক বাংলা ভাষার অভিধান ও ভাষাতত্ব আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ইটা কোন বাষা? সিলেটি অইলে ইতো খালি বরাকর বাষা নায় !” তাঁর জবাব ছিল, “চিলটি নায়চিটি হকলে আমারতাইনতর ভাষারে মান্যতা দেইন না, এর লাগ্গিউ নাম দিলাইলাম বরাক বাংলা!” অভিধানের অনেক জায়গাতে তিনি আঞ্চলিক বাংলা কথাটিও ব্যবহার করেছেন লেখকের নিবেদনে এক জায়গায় লিখেছেন, “ ঢাকা বাংলা একাডেমি প্রকাশিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষা অভিধান এ সিলেট অঞ্চল স্বাভাবিকভাবে অন্তর্ভূক্ত হলেও বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক বাংলা সম্ভবত আলাদা রাষ্ট্রের অঞ্চল বলেই বাদ পড়েছেআর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক বাংলা ভাষার অভিধান সংকলন প্রকল্পটি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ কেন্দ্রিক তাই ওখানেও স্থান হয়নি বরাক উপত্যকার ছেলেবেলা তাঁর মুখের বাংলা শোনে যে সেখানকারই বাঙালি আত্মীয় তাঁর মা-বাবাকে পরামর্শ দিতেন , ‘ এসব গ্রাম্য নীচ লোকের ভাষা না শেখাতে... এই তথ্য তিনি বেশ খেদের সঙ্গেই উল্লেখ করেছেন
কাছাড়ি হকল, চিলটি হকল আর অইলগিয়া ( লগৈ) অসমিয়া সকল’—এদের যে এক প্রাচীন ঐতিহাসিক আত্মীয়তা রয়েছে এ কথা আমরা জেনেও না জানার ভান করে থাকি বাঙালিতো আমরা বটেই--- এনিয়ে যেন কেউ আমার কথাগুলোকে ভুল না বোঝেনকিন্তু বাঙালি বলে প্রমাণ করবার দৌড়ে আমরা এতো বেশি পশ্চিমের ( কলকাতা) দিকে তাকিয়ে থাকি যে অসমিয়া সহ অন্যরাতো বটেই, নিজেদের দিকেই ভালো করে তাকাবার আমাদের ফুরসত মেলে নাআমার মনে আছে প্রথম প্রথম তিনসুকিয়া শহরে এক অনুষ্ঠানে শক্তিপদ ব্রহ্মচারির এক কবিতা পড়তে আমার পা কাঁপছিল এই ভয়ে যে, কোনো বাঙালি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে বসেন, ‘কে সে হরিদাস বাবাজী?’ কলকাতাতেতো এঁর নাম শোনা যায় নি!
বাঙালির বড় ভাগটা যেহেতু পূর্বোত্তরের বাইরে থাকেন, অবাঙালি অনেকেই আমাদের বহিরাগত বলে ভেবে নেন, ‘খিলঞ্জিয়া তালিকাতে হিসেবই করেন না আমরাও যেন এই সত্যকে প্রমাণ করবার জন্যে সদাব্যস্তআমাদের আচারে ব্যবহারে এবং অনুষ্ঠানে তাই সামাজিক হাজারটা প্রশ্নে বাঙালিকে দেখা যাবে নীরব দর্শকআমাদের মধ্য সংঘাত ভেদাভেদ আছে নেইটা-- কার মধ্যে? নাগা-কুকী বছরে সাতবার রক্তাক্ত সংঘাতে ব্যস্ত হয়তাই বলে, এতো নৈরাসক্তি আর নিস্পৃহতা নিয়ে কেউ বাস করে না তাই বলে, এই সত্যকে ভুলব কী করে যে চুঙ্গা পিঠা আর মেড়ামেড়ির ঘর না হলে আমাদেরও পৌষ সংক্রান্তি জমে উঠে না! সম্প্রতি আমি অসমিয়া ফেলানি  উপন্যাসখানা ব্লগে অনুবাদ করছিকরতে গিয়ে এমন অনেক শব্দে আটকে যাচ্ছি আমার মনে হচ্ছে এমন বহু শব্দ রয়েছে যেগুলো আমাদের ভাষাতে রয়েছে কিন্তু যেহেতু আমাকে কলেজ ষ্ট্রিটের অভিধান অনুসরণ করতে হবে আমাকে সেগুলো কেবল অসমিয়া বলে বাদ দিতে হবে যারাই অনুবাদ করেন তারাই নিশ্চয় আদর্শ বাংলাতে প্রথম পুরুষের একবচনে লিঙ্গ ভেদ ( সিলেটিঃ হে তাই) না থাকার যন্ত্রণাটা উপলব্ধি করেনএতোটা সাহস অবশ্যি আমি এখনো করতে পারিনি, কিন্তু আমার প্রায়ই মনে হয়, ‘আমার লগে, ‘চড়াই, ‘কুশিয়ার ইত্যাদি প্রয়োগ করতে পারব না কেন? এগুলোতো আমাদের নিজেদের শব্দএতে ভেজালটা কোথায়? ‘উরুকার মেজি বদলে আমি কেন মেড়ামেড়ির ঘর (স্মরণ করুনঃ অসমিয়া মেরঘর, বেড়াতে ঘেরা ঘর) ব্যবহার করে আত্মীয়তাটা জাহির করব না? কেন আমাকে এর জন্যে টীকা দিয়ে লিখতে হবে ভোগালি বিহুর এক বিশেষ পরম্পরা!’ আমারটা বুঝি দিব্বি উবে যাবে আলেয়ার আলোর মতো সমস্ত মান্য স্মৃতি থেকে ? কিন্তু আমি জানি মেরামেড়ির ঘরের  টীকা নাদিলে উজানের বাঙালি কিছুই বুঝবেন নাতার সংস্কৃতি এবং কলকাতার থেকে পাওয়া বইতে শব্দটি নেই !
এক নতুন সাম্রাজ্যের সন্ধানে শব্দ- বাংলা ,হিন্দি , নেপালি এবং আদি ভাষাতেও চাই স্বেচ্ছাসেবীঃ
গেল জানুয়ারির ১২ তারিখে গুয়াহাটিতে শব্দের সভা বসেছিলসেই সভাতে সিদ্ধান্ত হয়ে গেল এবার থেকে আদি, বাংলা, হিন্দি নেপালিও শব্দের অংশভাগী হবে ১১, ১২ দুদিন গুয়াহাটির মাছখোয়া আই.টি. সেন্টার ফর পারফর্মিং আর্ট প্রেক্ষাগৃহে বসেছিল প্রথমবারের মতো পূর্বোত্তর ভারতীয়দের আন্তর্জাতিক সম্মেলন NEIIM 2010  আয়োজক ছিল ফাস এবং অসম সরকার সম্মেলনের শেষে শব্দের সভা বসেসেখানে বিক্রম, প্রিয়ঙ্কু, বুলজিত, বিরাজ, প্রশান্ত, পাপড়িরা, ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আকলান্তিকা শইকিয়া, ভাষ্কর জ্যোতি দাস, নীলোৎপল ডেকা এবং বর্তমান লেখক
শব্দে বাংলার প্রবেশ বাংলার পক্ষে দুটো কাজ করবেবাংলা ভাষাতে পূর্বোত্তরের স্বতন্ত্র অস্ত্বিত্ব ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পূর্বোত্তরের অন্য ভাষার সঙ্গেও নিজের আত্মীয়তার সূত্রে এখানকার আলো হাওয়ার কাছেও নিজের অস্ত্বিত্ব ঘোষণা করবেকেবল বাংলা নয় হিন্দির, নেপালি, পক্ষেও কথাটা সত্যিএতো কেবল এক অভিধান নয়! বিক্রম সম্প্রতি এর এক সংজ্ঞা দেবার চেষ্টা করেছেন এরকম, ““XOBDO is a precise and detailed online multi-directional multi-lingual multi-media based dictionary-cum-phrasebook-thesaurus-cum-encyclopaedia of the languages of the North-East India!!” তিনি আরো লিখেছেন, “Search some very basic words like ‘mother’, ‘bamboo’, ‘river’ etc. You will get the corresponding words in almost all the major languages of the North-East – Bodo, Mising, Khasi, Karbi, Meetelon in addition to English and Assamese. Or, search the Dimasa word ‘dilao’ or the Karbi word ‘lut’ and find out what does it mean in Assamese or English or any other language of the North-East. You can actually search a word of any language and find the equivalent words in all the available languages. In other words, XOBDO is multi-directional and multi-lingual. In one article, XOBDO has been described as the ‘virtual Babel Tower of the North-East’. বাইবেলীয় পৌরাণিক গাঁথার বেবেল মিনারে মতো সত্যি সত্যি শব্দ স্বর্গ ছোঁয়ার সম্ভাবনা রাখে
আমরা বিক্রমের বক্তব্যের সমর্থণে একটি উদাহরণ দিতে চাইবইংরেজি Bamboo’ শব্দটির এখন অব্দি যে অর্থগুলো পাওয়া গেছে তা এরকমঃ অসমিয়াতে বাঁহ, বাংশ, বডো-ঔয়া (ow-vaa) , মিশিং-দিবাং (dibang), খাসি- স্কং (u skong) , গারো-ওয়া (wa.a), মৈতৈ-ওয়া (waa) মিজো-মাউ (mau) ,কার্বি-ছেক (chek), নাগামীজ বাশ (bas) ডিমাসা-ওয়াহ (woah) এবারে যখন বাংলা অর্থ প্রবেশ করবে, কী আসবে? সব্বাই জানেন-বাঁশ, বংশ জগন্নাথ চক্রবর্তী আরো এক প্রতিশব্দের কথা জানিয়েছেন –‘বা ( পৃঃ ২৫৮) তিনি এর সংস্কৃত উৎসের কথা জানিয়েছেন, লিখেছেন, সং-বংশ সত্যি হতেও পারেকিন্তু এখানেই তাঁর অভিধানের সীমাবদ্ধতা সংস্কৃতের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্কের উল্লেখ করেছেনযেখানে তা পারেননি নীরব থেকেছেনযথেষ্ঠ সম্ভাবনা থাকা সত্বেও ভোট মোঙ্গলীয় উৎসের দিকে তেমন তাকান নিসংস্কৃত প্রত্যয় নিয়ে 'বশ' ধাতু থেকে আসা বংশ শব্দটির অর্থ আমরা সবাই জানিকুল এর থেকে তৃণ জাতীয় উদ্ভিদের কল্পনাটা বড্ড কষ্টকরএর থেকে বডো-ঔয়া (ow-vaa) থেকে গারো-ওয়া থেকে ডিমাসা-ওয়াহ থেকে অসমিয়া বাঁহ থেকে (সিলেটি বাংলা বাহ ?) বরাক (কাছাড়ি )বাংলা বা থেকে বাংলা বাঁশ থেকে এবং প্রোথিতের মতো সংস্কৃত উৎস শব্দ বংশ গড়ে দেয়া হয়েছে, ভাবা যায় না কি? আমরা অবশ্য নিশ্চিত নইএকটা সম্ভাবনার কথা বলছিদ্রাবিড় বা অস্ট্রিক উৎস থেকেও আসতে পারেকন্নড় বানবু থেকে কোঙ্কনি মাম্বু পোর্তুগীজ হয়ে গিয়ে ইংরেজিতে ব্যাম্বো (থেকে অসমিয়া ও সিলেটিতে তুচ্ছার্থেবাম্বু) হয়েছে মালয় দ্বীপেও এর প্রতিশব্দ রয়েছে সামাম্বুএবারে, এই যে সংস্কৃত ছেড়ে আমি অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরালাম এটা শব্দ আমাকে বাধ্য করল বডো- ডিমাসা প্রতিশব্দগুলো না দেখলে আমি ভাবতামই না যে বাঁশ পূর্বোত্তর ভারত সহ এই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ারই সংস্কৃতির এক ঘনিষ্ঠ অঙ্গ শ্যামের বাঁশি এদিক থেকেই বাংলাতে এবং তার পরে সারা ভারতে (হিন্দি বাঁশরি) গিয়ে রাধাকে ডাক পাঠালেও পাঠাতে পারে এই তথ্যের উল্লেখ করলে আমাদের সম্মান বাড়ে বই কমে নাঅন্তত দাদা, কাকা মতো শব্দগুলো যে গেছেই এদিক থেকে এনিয়ে আমরা প্রায় নিশ্চিত এগুলো সংস্কৃতে আর কৈ খুঁজে পাওয়া যাবে?
এভাবে ভাষাগুলোর তুলনামূলক অধ্যয়নে শব্দ এক বিশাল উৎস ভাণ্ডারের কাজ করবে, এটি প্রায় নিশ্চিত সে বহু অনুসন্ধানকে ইতিমধ্যে উস্কেও দিচ্ছেতার উপর ভাষাগুলোর মধ্যে পারস্পারিক অনুবাদের কাজেও শব্দ এক সহজ সহায়ক হতে পারেশব্দের কর্মীরা যদিও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছেন, তবু তাদের প্রায় সব্বারই বাড়ি ঘর এই ঈশান কোণেকিন্তু বাংলা- হিন্দি-নেপালির মতো ভাষাগুলো এসে প্রবেশ করাতে আমরা আশা করতেই পারি এবারে শব্দের বিস্তার পশ্চিম তথা বায়ু কোণ অব্দি ছড়িয়ে যেতেই পারে শব্দ যোগাতে পারে পূর্বোত্তর ভারতের অনুবাদ সাহিত্যকে এক নতুন শক্তি অনুবাদের মধ্যি দিয়েই যেমন ভাষাগুলোর সমস্ত লিখিত পরম্পরা পরস্পরের মধ্যে আরো ছড়াতে পারে তেমনি বাংলা, হিন্দি ইত্যাদি ভাষাতে অনুদিত হয়েই এখানকার সমস্ত লিখিত পরম্পরা বাকি ভারতে তার বিজয় নিশান ছড়াতে পারে
খরগোশ এবং কচ্ছপের সেই প্রাচীন গল্পের অর্বাচীন রূপান্তর এবং শব্দ:
এ পর্যন্ত এসে আমার সেই খরগোশ আর কচ্ছপের গল্পটির কথা মনে পড়ে গেলসেই যে খরগোশ ঘুমিয়ে গেছিল আর কচ্ছপ দৌড়ে ওকে পেছনে ফেলে দিয়েছিলসেটি প্রাচীন গল্প গল্পটির এক অর্বাচীন কম্প্যুটার সংস্করণ তৈরি হয়ে গেছে দুর্দান্ত ! সংক্ষেপে সেটি এইখরগোশ বেচারা মন খারাপ করে ভাবতে বসলে, সে ওমনটি হারল কেন? অতি আত্মবিশ্বাসই তার বিপদ ডেকে এনেছে--- সে বুঝতে পারলসুতরাং ,সে আবারো গিয়ে দৌড়ের প্রস্তাব দিল কচ্ছপকে কচ্ছপ বেচারা রাজি হয়ে গেলএবারে কিন্তু খরগোশই জিতলধর্য্য, স্থর্য্য নিয়ে যে এগোয় সেও জেতে বটে কিন্তু বিজয়ী হবার জন্যে স্থৈর্য আর দৃঢ়তার সঙ্গে দ্রুতি অনেক বেশি জরুরি ব্যাপারসেটি কচ্ছপের জানা ছিল নাএবারে কচ্ছপ এক দুষ্ট চাল চাললহেরে এসে সে আরেকবার দৌড়ের প্রস্তাব দিলে খরগোশ আবারো একই ভুল করলএবারে পথ বেছে নেবার দায়িত্ব নিয়েছিল কচ্ছপযে পথে এগুলো তার মাঝে রয়েছে এক নদীসেটি পেরিয়েও এর পরেও যেতে হবে আরো বহু দূর খরগোশ বেচারা যখন আগে আগে এসে ভাবছে কী করবে, কচ্ছপ এসে দিব্বি সাঁতার কেটে পেরিয়ে গেলহেরে গিয়ে খরগোশ ভাবল, নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাটা তার জানা উচিত ছিল এতোবার দৌড়ঝাঁপ করতে করতে ওদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছিলতাই খরগোশ এসে বলল, নিজেদের মধ্যেতো অনেক প্রতিযোগিতা হলোএবারে চলো, আমাদের প্রতিযোগিতা হবে ঐ পথের সঙ্গেই নিজেদের মধ্যে কেবল সহযোগিতা এবারেও তারা ঐ নদী পথটাই বেছে নিল কিন্তু এবারে নদী অব্দি পথে খরগোশ কচ্ছপকে পিঠে তুলে নিলনদীতে আসতেই কচ্ছপ নেমে গিয়ে খরগোশকে পিঠে নিয়ে নদী সাঁতরে পেরিয়ে গেলবাকিটা পথ আবারো খরগোশের পিঠে চেপে আগের দিনের জায়গাতে গিয়ে যখন ওরা পৌঁছলো বেলা ডুবতে তখনো অনেক অনেক অনেক বাকি
পুরো গল্পটির এক ফ্লাস প্রস্তুতি আমার নিজের ব্লগে রয়েছে  আমি নিজেও প্রায় সমস্ত কাজে এই গল্পের আধুনিক শিক্ষা কাজে লাগাই শব্দও তাই করে করতে বলছে, সব্বাইকে নইলে যে তার পথ চলা হবেই না যেখানে ছিল দাঁড়িয়ে থাকবে দাঁড়িয়ে থাকবে গোটা পূর্বোত্তর! তাই কি ! তা হলে চলুন, সেই খরগোশ আর কচ্ছপের মতো আমরা সবাই সেই দৌড়ের অর্বাচীন সংস্করণে নাম লেখাইআজই গিয়ে শব্দের সাইটটি খুলুন আর মাউসে ক্লিক করে লিখতে বসে পড়ুন পূর্বোত্তরের সমস্ত ভাষা সাহিত্যের এক নতুন ইতিবৃত্ত
                 ০০০০০০০০০০০০~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~০০০০০০০০০০০০০০০
ঋণ স্বীকারঃ    প্রবন্ধ লিখতে সম্প্রতি প্রকাশিত বিক্রম বরুয়ার দুটি লেখা থেকেও সাহায্য নিয়েছিঃ Making of XOBDO , p 105, FRIENDS, একটি ফাস প্রকাশনা এবং The Virtual Bebel Tower of North East , p69 , স্মরণিকা NEIIM 2010