(ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মমাসে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের তিনসুকিয়া শাখার আমন্ত্রণে ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬-শে দেওয়া বক্তৃতার লিখিত রূপ )
সত্তর বছরের জীবন ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (১৮২০-১৮৯১)। তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা, সংস্কারমুক্তির লড়াই, মাতৃভাষায় আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের প্রয়াস, অসীম ত্যাগ আর অপার দয়ার গল্পগুলো শুনে শুনে আমরা বড়ো হয়েছি বটে। এবং এখন, তাঁর জন্মের দুই শতক পরে, তিনি "বাঙালির একজন' ভেবে সকল বাঙালি আমরা গৌরব করি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে লিখেছিলেন—""মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চর্য ব্যতিক্রম হয় কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে চার কোটি বাঙালি নির্মাণ করিতেছিলেন সেখানে হঠাৎ দুই-একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন।''—তার কী হবে? বাঙালির কি এখনও তাঁর নাম উচ্চারণের অধিকার আছে? অথবা ক'জন ভারতীয়ের আছে—বিশেষ করে যখন দেশে একটি স্কুল বন্ধ হলে কেউ ফিরেও তাকায় না, সামনে আবর্জনার দম ফেলে (যেমন আমার পাড়াতেই হচ্ছে এক বন্ধ স্কুলের গেটে), কিন্তু কোন মসজিদের নিচে মন্দির চাপা পড়েছিল সেটিকে খুঁড়ে উদ্ধার করবার জন্য লড়াই করে! যখন যাদবপুর অথবা জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এক মহাকাব্যের চরিত্রের নাম করে হামলা হয়—যেন পারলে সেগুলোতেও এরা মন্দিরই খুলে বসে আরকী!
পারিবারিক ঐতিহ্য, দারিদ্র্য ও তীব্র ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য:
বিদ্যাসাগর হঠাৎ করেই আকাশ থেকে অলৌকিকভাবে জন্মগ্রহণ করেননি। একে তো তাঁর আগেই রাজা রামমোহন রায় দেখা দিয়েছিলেন, আর দেখা দিয়েছিলেন ডিরোজিওর মতো অসাধারণ শিক্ষকের একদল দুরন্ত ছাত্র—যাঁরা ইয়ং বেঙ্গল গ্রুপের ছেলে, যাঁদের অনেকেই আজীবন বিদ্যাসাগরের সঙ্গী ছিলেন। তার উপরে তাঁর ঠাকুরদাদা রামজয় তর্কভূষণ পারিবারিক কলহে ক্ষুব্ধ হয়ে গৃহত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হন, সন্ন্যাসী-ফন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছিলেন বলে আমরা জানি। আর সন্ন্যাসীর গল্প শুনলে আমরা ভক্তিতে মাথা নত করে আর কোনো প্রশ্ন করতে ভুলে যাই। প্রশ্ন করতে ভুলে কি আর বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করা যায়? সেই ঠাকুরদা প্রচণ্ড সাহসী আর জেদি মানুষ ছিলেন। পথে একা বাঘ-ভাল্লুক ও ডাকাতদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে একটি লোহার লাঠি রাখতেন। তিনি আদি নিবাস বনমালীপুরের বাড়ি থেকে সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে গেলে তাঁর স্ত্রী বীরসিংহ গ্রামে চলে আসেন। বহু পরে রামজয় সেই বীরসিংহ গ্রামে এলে সেখানকার জমিদার দিয়েছিলেন নিষ্কর ব্রহ্মোত্তর বাস্তুভূমি—তা প্রত্যাখ্যান করে নিজের আত্মসম্মান বজায় রাখতে খাজনা ধার্য করে নিয়েছিলেন।গ্রামের অনেকেই রামজয়কে বুঝিয়েছিলেন যে জমিটি লাখেরাজ বা নিষ্কর করে নিলে তাঁরই লাভ হবে। কিন্তু অত্যন্ত আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও তেজস্বী রামজয় সেই দান ফিরিয়ে দেন। এই অস্বীকৃতির পেছনে রামজয়ের মনোগত ভাব ছিল, তিনি যদি জমিদারের দেওয়া নিষ্কর জমিতে বাস করেন, তবে জমিদার আজীবন মনে মনে এই অহংকার করার সুযোগ পাবেন যে—""আমি এই পরিবারকে চিরকালের জন্য বাসস্থান দান করেছি''। তাঁর আরও বিশ্বাস ছিল, নিষ্কর জমিতে বাস করলে তাঁর আজীবনের সাধনালব্ধ পুণ্য বা গৌরবের একটি অংশ সেই ভূস্বামী বা জমিদার পেয়ে যাবেন। নিজের স্বকীয়তা ও আত্মসম্মানকে তিনি কোনো জমিদারের দয়ার ওপর টিকিয়ে রাখতে চাননি।স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, খাজনা বা কর দিয়েই তিনি ওই জমিতে থাকবেন, তবু বিনা মূল্যের বা দয়ার দান গ্রহণ করবেন না। তাঁর এই তীব্র জেদ, মাথা উঁচু করে বাঁচার প্রবৃত্তি এবং নিজের পুণ্য বা অধিকার অন্যকে ভাগ না দেওয়ার যে জেদ ছিল—তাই কিন্তু পরবর্তীতে বিদ্যাসাগরের চরিত্রে "আলু-পটল বেচে খাব, তবু দাসত্ব করব না' বা "চটিজুতো বিতর্ক'-র মতো আপসহীন আত্মমর্যাদার জন্ম দিয়েছিল। সেই বীরসিংহ গ্রামের লোকেও তাঁকে সহজভাবে নেননি। গ্রামের মানুষের পরশ্রীকাতরতা ও নীচতাকে নির্মমভাবে বিদ্রূপ করে বলতেন, "এ গ্রামে একটাও মানুষ নেই, সবই গরু'। এই সব সংঘাতের সঙ্গে আপস করতে না পেরেই আবারো বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ""সেই তেজোময় নির্ভীক ঋজু চরিত্রমাহাত্ম্য অখণ্ডভাবে জ্যেষ্ঠ পৌত্রের অংশে রাখিয়া গিয়াছিলেন।'' তাঁরই স্ত্রী অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের ঠাকুমা দুর্গা দেবী চরম দারিদ্র্য আর অবহেলার মুখোমুখি হয়েও সুতা কেটে রোজগার করে নিজের ও সন্তানদের আত্মসম্মান বজায় রেখেছিলেন। মায়ের এই মরণপণ লড়াই দেখে বড়ো ছেলে ঠাকুরদাস মাত্র চোদ্দ-পনেরো বছর বয়সে কলকাতায় চলে আসেন এবং চরম অর্থকষ্টের মধ্যে নিজের সততা বিসর্জন না দিয়ে পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেসব আমরা জানি। দুর্গা দেবীর প্রভাব ছেলের উপরে যত নয়, তত পড়েছিল তাঁর পুত্রবধূর উপরে। বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবীই তাঁকে শিখিয়েছিলেন যে শাস্ত্রের চেয়ে মানুষের দুঃখ দূর করা বড় ধর্ম। বিদ্যাসাগরের এই অদ্ভুত পৌরুষ ও সততার ছাঁচটি তৈরি হয়েছিল বীরসিংহের গরিব ঘরে।
তাঁর বাবা তাঁকে নিয়ে খুব বড়ো স্বপ্ন দেখতে পারেননি, চেয়েছিলেন বড়োজোর সংস্কৃত টোলের পণ্ডিত হবেন। তিনি টোল নয়, দেশে তৈরি প্রথম সংস্কৃত কলেজে পড়তে গিয়ে পরে সেই কলেজের কর্মচারী, শিক্ষক এবং অধ্যক্ষ হয়ে চাকরিও ছেড়েছিলেন; সেই কলেজই ছাত্র হিসেবে তাঁকে বিদ্যাসাগর উপাধি দিয়েছিল—সেসব আমরা জানি। কিন্তু বিদ্যাসাগর উপাধি তো আরও অনেকেই পেয়েছেন। এই যেমন জীবানন্দ বিদ্যাসাগর, রামকমল বিদ্যাসাগর—এঁরা সংস্কৃত কলেজ থেকেই এই উপাধি পেয়েছিলেন। আরও একজন ছিলেন কালীপ্রসন্ন ঘোষ: ইনি সংস্কৃত কলেজের ছাত্র ছিলেন না, কিন্তু তাঁর প্রগাঢ় পাণ্ডিত্যের জন্য "পূর্ববঙ্গ সারস্বত সমাজ' থেকে তাঁকে "বিদ্যাসাগর' উপাধি দিয়েছিল। তাঁরা সবাই শাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন মাত্র। আর আমাদের বিদ্যাসাগর বাবার স্বপ্নের বিরুদ্ধে গিয়ে শাস্ত্রকথার "বারোটা' বাজিয়েছেন, সংস্কৃত কলেজকে গিয়েছিলেন "বারোটা বাজিয়ে' আধুনিক শিক্ষার কেন্দ্র করতে। শেষ পর্যন্ত রসময় দত্তের মতো লোকের সঙ্গে কাজিয়া করে সেই কলেজের চাকরিও ছাড়েন। তাই আমরা তখন তাঁকে অনেক গালিগালাজ করলেও আজও মনে রেখেছি। আজ থাকলেও কি তিনি গালিগালাজ খেতেন না বলে মনে হয়? রীতিমতো তাঁর হাতে "হিন্দু বিপন্ন' বলে আওয়াজ তোলবার লোকের অভাব হত না। আমার তাঁর মতো এত সাহস-টাহস নেই—তাই নিজে শিক্ষক হয়েও এই শহরে বা সমাজে বেশি কিছু করতে পারিনি। "উজান' নামে একখানা কাগজ করেছি বটে—কিন্তু সেটিও বিদ্যাসাগরের বন্ধু অক্ষয় দত্তের সেকালে সম্পাদিত কাগজ "তত্ত্ববোধিনী'-র তুলনায় অতি সাধারণ—অতি সামান্য, সাগরপাড়ে শিশিরবিন্দু—যদিও আমাদের অনুপ্রেরণা ছিল সেই সব ঐতিহ্যই। সাধারণত সুধী সমাবেশকে আমি এড়িয়েই চলি। তিনসুকিয়ার তিন দশকের প্রবাসজীবনে আপনারা আমাকে খুব বেশি মঞ্চ আলোকিত করতে দেখেননি, আজ এসেছি—কারণ শহর ছেড়ে যাব—আর খুব বেশি দিন নেই। কেউ আমাকে শহর থেকে তাড়াতে চাইলে খুব একটা কষ্ট করতে হবে না—এই সুসংবাদটি দেবার সুযোগ ছাড়ি কেন? এই ফাঁকে আমাকে সুযোগটি করে দেবার জন্য নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের তিনসুকিয়া শাখাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
বিদ্যাসাগরকে নিয়ে গল্প-গুজব:
বিদ্যাসাগরের পথের আলোয় বসে লেখাপড়া করা, চটিজুতো বিতর্ক, মায়ের জন্য গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়বার গল্প—এই সব গল্প জনপ্রিয় জনশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে। সেই সব নিয়ে আমরাও বেশি বলব না। কিন্তু তাঁর অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক শম্ভুচন্দ্র বাচস্পতি যখন বুড়ো বয়সে কন্যার সমান দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে এলে তা দেখতে গিয়ে বিদ্যাসাগর চোখের জল ফেলেছিলেন, আর বলেছিলেন, জীবনে এই বাড়িতে জলস্পর্শ করবেন না—এমন ধারা গল্প আমরা জেনেশুনেই বেশি ছড়াই না। অথবা ধরুন বারাণসীর সেই গল্প—শেষ জীবনে বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কাশিবাস করেছিলেন। সেখানেই তিনি মারা যান ১৮৭৫-এ। বাবাকে দেখতে বিদ্যাসাগর কাশী গেছেন। কিছু ব্রাহ্মণ তাঁকে টাকার জন্য চেপে ধরলেন। তিনি বললেন, আপনাদের যদি বিশ্বেশ্বর মেনে মান্যগণ্য করি তবে তো আমার মতো নরাধম আর দ্বিতীয় নেই। তাতে ব্রাহ্মণেরা বেশ চটে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তবে আপনি মানেন কাকে? তাঁর জবাব, এই যে সাক্ষাৎ আমার মা-বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। কেবল সংক্ষেপে জানিয়ে রাখি, মাকে শ্রদ্ধা করতে হয় বলেই বিদ্যাসাগর মাতৃভক্ত ছিলেন না, আসলেই তিনি ছিলেন আজীবন তাঁর সহচরী। বাবা নন, বিদ্যাসাগর আজীবন এক পিতৃদ্রোহী সন্তান ছিলেন। কাশীতে বলবার কথাটি তিনি নিছক কর্তব্যের দায়েই বলেছিলেন।রামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎকার নিয়েও একটি গল্প চালু আছে। শ্রীরামকৃষ্ণ এবং বিদ্যাসাগরকে আপনি একই সঙ্গে শ্রদ্ধার আসনে বসাতেই পারেন—কিন্তু তিনি যে দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন, একে অবহেলা করে বিদ্যাসাগর মানুষটির মূল মর্মার্থ কি বোঝা যায়? গল্পটি সবাই জানেন, জানেন সেই লোনা জল আর ক্ষীরসমুদ্রের প্রসঙ্গটি। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাতে বলেছিলেন বটে, বিদ্যাসাগরের সমাজসেবা, দয়া এবং শিক্ষাবিস্তারের কাজগুলো "সত্ত্বগুণের লক্ষণ', এই লোকহিতৈষা করতে করতে হৃদয়ে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি জাগে। কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি জাগাটি কি খুব জরুরি ছিল? এই নিয়ে তাঁর উপর আজীবন চাপ ছিল। বেথুনের ছাত্রীদের জন্য তিনি চেম্বার্সের একখানা বই বাংলায় "বোধোদয়' নামে স্বাধীন অনুবাদ করেছিলেন। এর প্রথম সংস্করণে কোনো ঈশ্বর প্রসঙ্গ রাখেননি। চাপে পড়ে পরের সংস্করণে দুই-একটি কথা জুড়েন—যেমন, "ঈশ্বর নিরাকার চৈতন্য স্বরূপ' ইত্যাদি। এতে ভাবার কোনো কারণ নেই যে বিদ্যাসাগর-চরিত্রে ভগবৎ ভক্তির কোনো ভূমিকা আছে। চিঠিপত্র লিখলে শুরুতে "শ্রী দুর্গা', "হরি' ইত্যাদি লিখতেন নিতান্ত সংস্কারবশে। আমাদের কোনো সমস্যা নেই তিনি আস্তিক না নাস্তিক ছিলেন এই নিয়ে, যেমন ছিল না রামকৃষ্ণেরও—সে তো রবীন্দ্রনাথও ঈশ্বর নিয়ে সারাজীবন বহু কথাই লিখেছেন। কিন্তু বহু পরে রবীন্দ্রনাথ যে লিখবেন, ""ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো''—এই কথাটির মর্ম কি আজ বহু বেশি অনুধাবন করবার দরকার নেই? বিদ্যাসাগর, রামমোহন, ডিরোজিও, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, অক্ষয় কুমার দত্তদের সঙ্গে উনিশ শতকে এই সারিতেই কি বিদ্যাসাগর এক উজ্জ্বল নাম নন? আজ একুশ শতকে আমরা যখন নতুন করে "ধর্মকারা'-তে বন্দি হচ্ছি, তখন নতুন করে বিদ্যাসাগরের পারলৌকিক কল্যাণচিন্তা বাদ দিয়ে ইহলৌকিক কল্যাণচিন্তা আর কর্মের মর্ম অনুধাবন করা বেশি জরুরি নয়? আজকাল আমরা এমনও গোঁড়া হয়েছি যে ধর্মকারার প্রসঙ্গ এলেই বাংলাদেশ, আফগানিস্তানের দিকে তাকাই—স্বদেশে যেন সবই ঠিকঠাক চলছে। অথচ, প্রতিদিন দেশে মন্দিরে, মসজিদে গোমাংস ফেলে দেওয়া নিয়ে মারামারি-কাটাকাটি হয়—স্কুলের সামনে ফেলে আসুন, কেউ কিছু বলবে না। তিনসুকিয়া বঙ্গীয় বিদ্যালয়ের সামনেও নর্দমা কম কিছু পড়ে থাকে না। রবীন্দ্র কবিতাটি তবে আরও একবার পড়ি আমরা—""যে পূজার বেদি রক্তে গিয়েছে ভেসে/ভাঙো ভাঙো, আজি ভাঙো তারে নিঃশেষে—/ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,/এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।''
সমাজতাত্ত্বিক বিচার: বিনয় ঘোষের মূল্যায়ন:
তাঁর বিশাল কর্মক্ষেত্র নিয়ে বলা তো কঠিন। তার উপর ছিল আমার সময়ের অভাব। আজকাল NEP 20-র যুগ। টাকা ঢেলে ঢোল পিটিয়ে ব্যবস্থা হচ্ছে যাতে ছাত্র-শিক্ষকেরা বহু বেশি লেখাপড়া করবার ছলে লেখাপড়া ছেড়েই দেয়। এর জন্য কোনো গবেষণার দরকার নেই, অভিজ্ঞতা যার আছে তিনিই জানেন—যদি লেখাপড়ার সংস্কৃতির সঙ্গে আদৌ তাঁর কোনো পরিচয় থাকে। বহু শিক্ষকেরও সেই পরিচয় থাকে না, জীবনে আমি দেখেছি। ভালো হত যদি কোনো একটা দিক বা তাঁর কোনো একখানা বই তুলে নিতে পারতাম। পরে মনে হলো—তাঁর ব্যক্তিত্বের জ্যোতিটাকে নিছক বাঙালিআনার বাইরে থেকে আমি যেভাবে দেখি—তার একটা ঝলক দিতে যদি পারি। পারব কতটা তাও জানি না, আর পারলেও তা খুব প্রিয়দর্শন তো হবে না। বিনয় ঘোষ বহু আগেই আমাকে বিদ্যাসাগরকে দেখবার একটা চোখ তৈরি করে দিয়েছিলেন। আমি সেই চোখেই তাকাবার চেষ্টা করছি—একথা জেনেই যে নতুন শতকের তিনসুকিয়া শহরে বিনয় ঘোষ খুব চর্চিত নাম নন। তাঁর "বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ' গ্রন্থে বিদ্যাসাগরের চরিত্র ও কর্মের এক গভীর অর্থনৈতিক ও শ্রেণিভিত্তিক সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করেছেন। বিনয় ঘোষের এই মূল্যায়নটি অন্যান্য প্রথাগত জীবনীকারদের আবেগঘন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. বিদ্যাসাগর এবং "ইন্টেলেকচুয়াল অন্ট্রাপ্রেনিউর' (Intellectual Entrepreneur) তত্ত্ব:বিনয় ঘোষ দেখিয়েছেন যে, বিদ্যাসাগর যখন ১৮৫৮ সালে গর্ডন ইয়ং-এর মতো ব্রিটিশ আমলাদের সংকীর্ণতার প্রতিবাদে সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপালের পদ থেকে পদত্যাগ করেন, তখন তাঁর সামনে কোনো নিশ্চিত আয়ের উৎস ছিল না। সমকালীন সমাজপতিরা ভেবেছিলেন বিদ্যাসাগর এবার উপোস করবেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর তাঁর উপার্জিত মূলধন—অর্থাৎ ‘বিদ্যা’-কে পণ্যে রূপান্তরিত করে স্বাধীন বাণিজ্যের পথ বেছে নেন। তিনি বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সাথে মিলে ঋণ নিয়ে "সংস্কৃত প্রেস' এবং বইয়ের আড়ত বা "ডিপজিটরি' প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতচন্দ্রের "অন্নদামঙ্গল' প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর সফল বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়। আজকের কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের বই-বাজার প্রতিষ্ঠায় এই উদ্যোগের এক বিশাল ভূমিকা ছিল; যদিও বাজারটি আগে জন্ম নিয়েছিল।বিনয় ঘোষের মতে, বিদ্যাসাগর ছিলেন বাংলার প্রথম সফল "ইন্টেলেকচুয়াল অন্ট্রাপ্রেনিউর'। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সামন্ততান্ত্রিক সমাজের করুণা বা ঔপনিবেশিক সরকারের চাকুরির দাসত্ব করে নিজের স্বাধীন সমাজসংস্কারের কাজ চালানো অসম্ভব। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে যে চিন্তার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা যায় না, বিদ্যাসাগর তা প্রমাণ করেছিলেন। তাঁর অর্জিত এই বাণিজ্যিক লভ্যাংশই পরবর্তীকালে তাঁর বিধবাবিবাহ আন্দোলন ও অগণিত বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনার মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি বা "ফান্ড' জুগিয়েছিল।
২. "বুর্জোয়া হিউম্যানিজম' (Bourgeois Humanism) ও বিদ্যাসাগরের শ্রেণি-অবস্থান:বিনয় ঘোষ বিদ্যাসাগরের দর্শনকে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের "বুর্জোয়া হিউম্যানিজম' বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী মানবতাবাদের আলোয় বিচার করেছেন। তাঁর মতে, বিদ্যাসাগর জন্মসূত্রে দরিদ্র রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হলেও চিন্তায় ছিলেন পুরোদস্তুর আধুনিক বুর্জোয়া মানবতাবাদী। তিনি মধ্যযুগীয় পারলৌকিক মোক্ষলাভের ধারণাকে সম্পূর্ণ বর্জন করে ইহজাগতিক মানুষের ইহকালীন দুঃখ দূর করাকেই জীবনের একমাত্র ব্রত করেছিলেন।তবে বিনয় ঘোষ অত্যন্ত নির্মোহভাবে বিদ্যাসাগরের একটি শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতাও দেখিয়েছেন। বিদ্যাসাগরের সমস্ত আন্দোলন—শিক্ষা বিস্তার, বিধবাবিবাহ বা বহুবিবাহ রোধ—ছিল মূলত সমকালীন শহুরে ও মফশলীয় "উচ্চবর্ণের মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজ'-কেন্দ্রিক। গ্রামীণ সর্বহারা কৃষক বা শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কোনো রূপরেখা বিদ্যাসাগরের সমাজচিন্তায় ছিল না, কারণ তিনি নিজেই ছিলেন সেই উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক মহান প্রতিনিধি। কিন্তু তা সত্ত্বেও, রক্ষণশীল সামন্ততান্ত্রিক সমাজের ভিত নাড়িয়ে দিতে তাঁর এই বুর্জোয়া হিউম্যানিজম ছিল অত্যন্ত বৈপ্লবিক।
তিনি যে পুরো বাঙালি সমাজকে নাড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন বা এখনও পেরেছেন—এমনটা নয়। তাই অধিকাংশ বাঙালি এখনও বিদ্যাসাগর সম্পর্কে স্কুলে পড়া অংশের বেশি পড়েনও না, মানেনও না। সেকালে নমঃশূদ্র সমাজে সমান্তরাল শিক্ষা বিস্তার ও সমাজসংস্কারের আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হয়েছিল হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের মতো পিতা-পুত্রকে—যাঁরা মতুয়া ধর্মান্দোলন দাঁড় করান। রামকৃষ্ণ মিশনও সেই জায়গা দখল করতে ব্যর্থ হয় পরের কালে। সেরকম মুসলমান সমাজে এগিয়ে আসতে হয়েছিল সৈয়দ আমীর আলির মতো ভদ্রলোকদের—যাঁদের কথা আমাদের স্কুলে-কলেজেও পড়ানো হয় না বলতে গেলেই হয়। আমীর আলি ১৮৭৭ সালে মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত অধিকার আদায়ের জন্য ‘সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’ (Central National Muhammedan Association) প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল আধুনিক ভারতের মুসলমানদের প্রথম রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। যদিও এই সবই শুরু হয়েছিল ইয়ং বেঙ্গলের প্রৌঢ় সদস্যদের, ব্রাহ্মসমাজের এবং বিদ্যাসাগরের প্রয়াসের দেখাদেখি। পাইকপাড়ার রাজা ইন্দ্রচন্দ্র সিঙের মতো কলকাতার বহু বিশিষ্ট হিন্দু বুদ্ধিজীবী আমীর আলি প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যদিও বিদ্যাসাগরের বহু আগে হুগলী মহসিন কলেজ প্রতিষ্ঠা করে হাজি মহসিন উজ্জ্বল কীর্তি রেখেছিলেন, কিন্তু তিনি তা করেছিলেন চুঁচুড়ার মতো মফশলে—ফলে তিনি আরও অনালোচিত থেকেছেন। আমরা ছেলেবেলায় তাঁরও দান ও দয়ার কাহিনী স্কুলে পড়েছি—এর বেশি পড়াবার কথা শিক্ষকেরা ভাবেননি, এতে ঝামেলা অনেক। আমীর আলি, হাজি মহসিন বা হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের সমাজ ও শিক্ষা সংস্কার নিয়ে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন কোনো আলোচনা সভার আয়োজন করবেন—কল্পনা করতে পারি কি? পারলে বুঝব আমরা বৌদ্ধিক জিজ্ঞাসাতে বহু এগিয়ে আছি।
শিক্ষাসংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আঘাত:
সংস্কৃত কলেজের ‘বারোটা’ বাজাতে তিনি কী কী করেছিলেন তা জানা দরকার। ১৮৫১ সালে সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হওয়ার পর বিদ্যাসাগর সেই প্রাচীন প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চাকেন্দ্রে পরিণত করার জন্য যে সমস্ত সংস্কার সাধন করেন, তা তাঁর জীবনী বইগুলোতে বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার শতাব্দীপ্রাচীন কুসংস্কারগুলোর ওপর হাতুড়ির মতো আঘাত করেছিলেন:
১। জাতিভেদের প্রাচীর ভাঙা: পূর্বে সংস্কৃত কলেজে কেবল ব্রাহ্মণ ও বৈদ্যদেরই প্রবেশাধিকার ছিল। বিদ্যাসাগর একে তীব্র পক্ষপাতদুষ্ট মনে করে কায়স্থ সহ সর্বস্তরের হিন্দুদের জন্য কলেজের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন।
২। ছুটির দিনের আধুনিকীকরণ: পূর্বে চন্দ্রকলার হ্রাসবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে প্রতিপদ ও অষ্টমীর দিনে কলেজ বন্ধ থাকত, যার ফলে কোনো নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা যেত না। বিদ্যাসাগর এই অবৈজ্ঞানিক নিয়ম বাতিল করে রবিবারকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন হিসেবে ধার্য করেন।
৩। ফি বা বেতনের প্রবর্তন: মূল্য না দিলে মানুষ উপকারের গুরুত্ব বোঝে না—এই মনস্তাত্ত্বিক সত্য অনুধাবন করে তিনি বিনা-বেতনের প্রথা তুলে দিয়ে নামমাত্র ফি ও ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিতির নিয়ম চালু করেন।
৪। বার্কলের দর্শন প্রত্যাখ্যান ও ইহজাগতিকতার জয়: বেনারস সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ডক্টর ব্যালান্টাইন যখন পাঠ্যতালিকায় বিশপ বার্কলের ‘Principles of Human Knowledge’ বইটি অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেন, বিদ্যাসাগর তার জোরালো বিরোধিতা করেন। শিক্ষাসমাজের সেক্রেটারি মি. মুয়াটকে লেখা তাঁর বিখ্যাত চিঠিতে তিনি যুক্তি দেন যে, ভারতীয়রা ইতিমধ্যে বেদান্তের মায়াবাদের প্রভাবে বাস্তব জগৎকে মিথ্যা মনে করে উদাসীন ও নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। তার ওপর যদি পাশ্চাত্য দর্শনের মায়াবাদও শেখানো হয়, তবে তাদের জাগতিক ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির চেষ্টা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এই বিতর্কে বিদ্যাসাগরের প্রখর বাস্তবমুখী চেতনার জয় হয়।
বাংলাই নয়, গোটা ভারতে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারের অগ্রণী পুরুষ ছিলেন বিদ্যাসাগর। কী কী করেছিলেন এর একটা খতিয়ান নেওয়া যাক। ১৮৪১-এ যখন তিনি কলেজের পাঠ শেষ করেন, সে বছরই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধানের পদ লাভ করেন। সেখানে পাঁচ বছর পড়ান।
১৮৪৬-এ যে সংস্কৃত কলেজে পড়িয়েছিলেন, সেখানেই সহকারী সম্পাদকের পদে চাকরিতে প্রবেশ করেন। মাইনে সমানই ছিল। কিন্তু একে তো মাইনেতে ব্যয়সংকুলান হত না, তায় বইয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহের ফলে তিনি প্রথমে একটি বইয়ের দোকান এবং পরে ছাপাখানা খোলেন। ব্রাহ্মণ-কায়স্থ ঘরের কেউ যে ছাপাখানা খুলবেন, এটি তখন ভালো নজরে দেখতেন না অনেকেই। সম্ভবত সেটিই কারণ ছিল যে কলেজ পরিচালন সমিতির সম্পাদক রসময় দত্তের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাঁধে। বিরোধ এই পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় যে কলেজের উন্নতি সংক্রান্ত বিদ্যাসাগরের তৈরি একটি প্রতিবেদন রসময় দত্ত অনুমোদন করেননি, বা পুরোটি পরিচালন সমিতিতে আলোচনার জন্য আনেনইনি। ফলে বিদ্যাসাগর চাকরিই ছেড়ে দেন। সেটি ১৮৪৭ সাল। দু-বছর পরে তিনি আবার চাকরি নেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে। এবারে শিক্ষক নন, বড়বাবু এবং কোষাধ্যক্ষের কাজ—এভাবে বলা যেতে পারে। যদিও মাইনে বেশ মোটাই ছিল—৮০ টাকা। পরের বছরের শেষ দিকে, ১৮৫০-এর ডিসেম্বরে আবার সেই চাকরি ছেড়ে ফিরে আসেন সংস্কৃত কলেজে, এবারে সাহিত্যের অধ্যাপকের দায়িত্ব নিয়ে। এবারে রসময় দত্তকে কলেজ ছেড়ে যেতে হয়, অস্থায়ী সম্পাদকের দায়িত্ব মেলে বিদ্যাসাগরের। কিন্তু পরের মাসেই তিনি কলেজের অধ্যক্ষ হন এবং সম্পাদকের পদটি তখন লোপ পায়। ১৮৫৩-তে তিনি তাঁর জন্মগ্রাম বীরসিংহে প্রথম একটি বেসরকারি অবৈতনিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শিক্ষাভাবনা নিয়ে সংস্কৃত কলেজের বাইরে পা ফেলবার সেই শুরু। ১৮৫৫-তে অধ্যক্ষ থাকার পাশাপাশি তিনি দায়িত্ব পান দক্ষিণ বাংলার স্কুল পরিদর্শকের। দায়িত্ব পেয়েই তিনি যেটি করেন, দক্ষিণ বাংলার প্রায় প্রতিটি জেলাতেই বেশ কিছু স্কুল চালু করেন এবং সেগুলোতে যোগ্য শিক্ষকের অভাব পূরণের জন্য সংস্কৃত কলেজে নর্মাল স্কুল তৈরি করে দায়িত্ব দেন তাঁর বন্ধু এবং লেখক-সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্তকে। কেবলই কি স্কুল প্রতিষ্ঠা? প্রতিটির পাঠ্যক্রম তৈরি ও পাঠ্যবই রচনাতে অমানুষিক পরিশ্রম করে গেছেন। ১৮৫৭-তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে যে ছয়জন ভারতীয় পরিচালন সমিতির সদস্য হয়েছিলেন, বিদ্যাসাগরও তাঁদের একজন ছিলেন। সে বছর এবং পরের বছরে তিনি অনেকগুলো বালিকা বিদ্যালয়ও চালু করেন। প্রথমে সেগুলোর ব্যয়ভার সরকারের বহন করবার কথা থাকলেও সিপাহি বিদ্রোহ তথা প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের অজুহাতে সরকার সেই ব্যয় বহন করতে অস্বীকার করলে গোটা চাপ বিদ্যাসাগর নিজের কাঁধে নেন। নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ৩,৪৩৯ টাকা ধার দিয়ে তিনি পঁয়ত্রিশটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এবং ১৮৫৮-তে শিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তার সঙ্গে মতবিরোধের ফলে সাত বছরের মাথায় সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের চাকরিটিও ছেড়ে দেন। বিদ্যাসাগরের পদত্যাগের কথা শুনে সমকালীন শিক্ষা-সেক্রেটারি রসময় দত্ত ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ""চাকরি ছাড়লে বিদ্যাসাগর খাবে কী?'' বিদ্যাসাগর তাঁর জবাবে পিঠ সোজা করে উত্তর পাঠিয়েছিলেন, ""দত্তমহাশয়কে বলো, বিদ্যাসাগর বাজারে আলু-পটল বেচে খাবে, কিন্তু চাকুরির দাসত্ব করবে না।'' অর্থাৎ, পুরো চাকরিজীবনে এই দত্তমহাশয়ের সঙ্গে তাঁর বিরোধ লেগেই ছিল। আমরা তাঁর সম্পর্কে জানি তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। কিন্তু সেই দায়িত্ব তিনি বহন করেন মাত্র সাত বছর। যখন চাকরি ছাড়েন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৮।
দু-তিন বছর পরে, ১৮৬১-তে কলকাতা ট্রেনিং স্কুলের সম্পাদক মনোনীত হন। ১৮৬৪-তে সেই স্কুলের নাম বদল করে হয় কলিকাতা মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন। ১৮৬৩-তে সরকার তাঁকে ওয়ার্ডস ইনস্টিটিউশনের পরিদর্শক মনোনীত করেন। নাবালক জমিদার সন্তানদের শিক্ষা দেবার জন্য প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হয়েছিল।
১৮৫৮-তে তিনি সংস্কৃত কলেজ ছাড়েন, ১৮৬৯-এ তাঁকে নিজের হাতে গড়া বেথুন বালিকা বিদ্যালয়েরও সম্পাদকের দায়িত্ব ছাড়তে হয়। সেই বছরে বীরভূমের বাড়িতে আগুন লাগলে, সেই বাড়িও চিরদিনের জন্য ছাড়েন। এরপর তাঁর শরীর ভাঙতে থাকে। স্বাস্থ্য ফেরাবার জন্য তিনি তখনকার অবিভক্ত বাংলার কিন্তু এখনকার কার্মাটাড়ে একটি বাগানবাড়ি কেনেন। সেখানে সাঁওতাল আদিবাসীদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে; সেখানেও একটি স্কুল তৈরি করেন। ১৮৭৩-এ কলকাতায় তৈরি করেন মেট্রোপলিটান কলেজ। এর পরে এই কলেজটিই তাঁর ধ্যানজ্ঞানে পরিণত হয়। সেই কলেজ এখনকার বিদ্যাসাগর কলেজ। ১৮৭৫-এ কলকাতার বাদুড়বাগানে নিজের বসতবাড়ি তৈরি করেন, সেই বছরেই তাঁর বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মারা যান। এই বাদুড়বাগানের বাড়িতেই ১৮৮২-তে রামকৃষ্ণ এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে, প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হন। ১৮৮৩-তে তিনি নতুন গড়ে ওঠা পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো মনোনীত হন। এই বাদুড়বাগানের বাড়িতেই ১৮৯১-তে তিনি লিভার ক্যান্সারে ভুগে অকালে মারা যান।
তাঁর জন্মের দুশো বছর পরে, এই মঞ্চের পাশের স্কুলটিই যখন মাতৃভাষা পড়াতে পড়াতে অস্তিত্ব হারাতে বসেছিল, তখন একে দ্বিভাষিক করা হল। আর এখন শিক্ষকেরাই ছাত্রদের বলছেন, তোমরা বাংলা বিষয়টি পোড়ো না। ফলে তিনসুকিয়া কলেজের মতো কলেজ—যেখানে স্নাতক স্তরে সাম্মানিক বিষয় বহু সাধনার ফলে এই সেদিন প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও, প্রথম ছাত্রদলের প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সম্মানজনক অবস্থান নিয়ে উত্তীর্ণ হবার পরেও আমরা প্রতি বছর এই আতঙ্কে কাটাচ্ছি—এবারে ছাত্র আসবে তো? যে স্কুলটির কথা বললাম, সেটিকে মাঝে অন্য একটি স্কুলের সঙ্গে মিশিয়ে বাস্তবে বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল—সেই কথা তো আপনারা ভালোই জানেন।
গত আগস্ট ২০২৬-এর সংসদীয় রিপোর্টে জানানো হয়েছে... ভারতের প্রায় ৭৩ শতাংশ পড়ুয়া উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। ২০২৪-২৫ বছরেই প্রাথমিক স্তরে যেখানে ছাত্রসংখ্যা ছিল ৬ কোটি ১৮ লক্ষেরও বেশি, উচ্চমাধ্যমিকে সেখানে মাত্র ৯৪ লক্ষ। সেই কমিটি স্কুল বন্ধেরও একটি বড়ো হিসেব দিয়েছে। সেসবে আমরা যাচ্ছি না। আপনারা অসমে দেখবেন—শীতকালে ঘটা করে গুণোৎসব হয়, আর গ্রীষ্মে হাজারের উপরে স্কুল বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ছাত্র অথবা স্কুল বন্ধের কারণ নিয়ে যা সংসদীয় কমিটিই জানিয়েছে, সেগুলো এরকম—
১. স্কুলের অভাব: উচ্চতর স্কুলশিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পর্যাপ্ত পরিমাণ উন্নত বা উচ্চস্তরের স্কুলের অভাব।
২. আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ও কর্মসংস্থান: পরিবারের আর্থিক অনটন এবং কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে অনেক পড়ুয়াকে মাঝপথে পড়াশোনা ছাড়তে হচ্ছে।
৩. শিক্ষার ক্রমবর্ধমান খরচ: পড়াশোনার খরচ দিন দিন বাড়তে থাকা একটি বড় কারণ।
৪. পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষার ঘন ঘন বদল: বারবার সিলেবাস ও পরীক্ষার ধরন পরিবর্তন এবং সময়মতো পাঠ্যবই না পাওয়া শিক্ষাব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
৫. মানসিক চাপ ও বিভ্রান্তি: এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়ারা তীব্র মানসিক চাপ ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ছে।
খরচের কথায় আমি জানাই, অসমে প্রচলিত "নিযুত ময়না', "নিযুত বাবু' বা বিনামূল্যে বই দেওয়া অথবা ভর্তির সুযোগও ছাত্র স্কুলে-কলেজে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হচ্ছে। ছাত্র স্কুলে-কলেজে আসার, খাতা-কলম কেনার, যাতায়াতের খরচ সামাল দিতে পারছে না। আর ঘন ঘন পাঠ্যক্রম বদল, আর প্রচুর বিষয় একসঙ্গে গিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা দেখে সাধারণ ভোটার মোহিত হন—কিন্তু ছাত্র-শিক্ষক এবং অভিভাবকের বদহজম হলেও কেউ মুখ খুলে বলতে সাহস পাচ্ছেন না। যিনি বা যাঁরা বলছেন—তাঁদের কী দশা হচ্ছে সবাই দেখছেন—বিদ্যাসাগরের মতো চাকরি যাচ্ছে। বিদ্যাসাগরের পাশে তবু ব্রিটিশ সরকার কিছুটা হলেও দাঁড়িয়েছিলেন—এখন বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল না খুললে কেউ পাশে দাঁড়াচ্ছেন না। সেখানেও আছে এনইপি ২০২০-এর চাপ। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত কোনো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের দ্বারা বিনামূল্যে বই পাঠিয়ে বইদোকানে যাওয়ার অভ্যাসটিকে যেভাবে মারা হচ্ছে, তাতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরেও বই-কেনা বিষয়টাই ছাত্রদের মগজে ঢোকে না; তার উপরে বিষয়ের চাপ বেড়েছে চার-পাঁচ গুণ বেশি।
এমন সময় দাঁড়িয়ে বিদ্যাসাগরের নামোচ্চারণের মানেটা কী, আপনারা নিজেরাই ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এছাড়াও তিনি বিধবাবিবাহের প্রচলন করা, বহুবিবাহ বন্ধ করা, বাল্যবিবাহ রোধ করা নিয়েও লড়েছিলেন বলে আমরা জানি। সবই কি বন্ধ হয়ে গেছে? আজকাল দেশে একটি বাজে প্রচার করা হয়—মুসলমানেরা বুঝি বহুবিবাহ করে, বাল্যবিবাহ বেশি করে—এর মতো মিথ্যাচার আর হয় না। এই নিয়ে দেশে প্রচুর সাম্প্রদায়িকতা করে আসলেই বিদ্যাসাগরের প্রয়াসগুলোকেই এখনও চাপা দেওয়া হয়; ঢেকে ফেলা হয়। এখন তো দেশে অভিন্ন দেওয়ানি আইনের কথা হচ্ছে, এবং বর্ণহিন্দু সমাজ—যে সমাজে বিদ্যাসাগরের কালে কেউ কেউ শতাধিক বিয়েও করতেন—তাঁরা খুব খুশি হন তখন "আমাদের এক বিদ্যাসাগর ছিলেন' ভেবে। মুসলমানের কেন বিদ্যাসাগর নেই—বলে অনেকে তেড়ে প্রশ্ন করেন। যখন বাস্তব হল, মুসলমান সমাজে বিধবাবিবাহের আন্দোলনের বিশেষ দরকার না থাকলেও তা হয়েছিল উনিশ শতকে; আর হিন্দু সমাজে এমন বিয়ে আইনে সিদ্ধ হলেও এখনও তেমন হয় না। আর বহুবিবাহ? অভিন্ন দেওয়ানি আইনের কথা উঠলে জনজাতি সহ কিছু সমাজকে এর বাইরে রাখার কথা যখন হয়, তখন কেউ আর প্রশ্ন করে না; আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য অরুণাচলেই তো এখনও ব্যাপক হারে তা চালু আছে। আমি তিনসুকিয়া শহরের এক বাঙালি বনেদি ভদ্রলোককে জানি যাঁর দুই স্ত্রী আছেন—নাম করলে আপনারা চিনে যাবেন। দেশে জনজাতিদের মধ্যে বহুবিবাহের হার সবচাইতে বেশি এখনও—প্রায় ২.৪ শতাংশ; মুসলমান সমাজে মাত্র ১.৯%, খ্রিস্টান সমাজে ২.১ শতাংশ। শিখ সমাজে ০.৫%। বাকি হিন্দু-বৌদ্ধ সমাজে ১.৩%। শ্রেণি বিচার করলে দেখবেন—এই জনজাতি সমাজ আর মুসলমান সমাজে বিশেষ তফাত নেই। খ্রিস্টানদের মধ্যে বেশি হবারও কারণ এদের মধ্যে জনজাতি বেশি। বনেদি মুসলমান সমাজ বহু দিন থেকেই আমাদের মতো "হম দো হমারা দো' বলতে বলতে এখন "হামারা এক' নীতি বাস্তবে প্রয়োগ করে দেশীয় সমাজের জন্য অন্য এক সমস্যা তৈরি করলেও, এক সময় আমরা গুজরাটে প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক বাণী শুনেছি—"হম দো হমারা পঁচিশ' বলে।সমস্যার মূলে আছে অশিক্ষা, অসচেতনতা ইত্যাদি—সেদিকে যাতে নজরই না যায় বিদ্যাসাগরের মতো—এর জন্যই এত আয়োজন। বিদ্যাসাগরের নাম নেব আর অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে যথেষ্ট প্রগতিশীল ভেবে তুষ্ট থাকব—এ হয় না। ইসলামের একটাই অপরাধ—সেখানে চারটি বিয়ে শাস্ত্রসিদ্ধ—কিন্তু কেউ ভাবে না যে এই রীতিই ছিল আরবদের মধ্যে শতসহস্র বিয়ে নিষিদ্ধ করে আনা এক সংস্কার আন্দোলনের সিদ্ধান্ত। আর সেটিও এখন কেউ মানে না। এমন শাস্ত্রবিধি নেই কোন্ ধর্মে? আমরা তো এখনও মনুসংহিতার হয়ে ওকালতি করছি—তবে কেন ঘোষণা করছি না যে আমাদের অমুক-তমুক শাস্ত্র সংস্কার হয়ে গেছে, সেগুলো এখন নিষিদ্ধ? অত্যন্ত চটুল তর্ক এই সব। জানি, আপনারা অনেকেই আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন।
বাল্যবিবাহও এখন দেশে কমলেও নিশ্চিহ্ন একেবারেই হয়ে যায়নি। চোখ-কান খোলা রাখলে নিজের চারপাশেই দেখবেন। কিশোরী কন্যাকে বাড়িতে রেখে যে মা-বাবাকে কাজে বেরিয়ে যেতে হয় এবং যাঁরা প্রতিবেশীদের বিশ্বাস করতে পারেন না—সেই দরিদ্রশ্রেণিই এখনও বিয়ে বেশি দিয়ে থাকে; যদিও বহু জায়গাতে বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করতে গেলে এখনও আপনাকে প্রাণ দিতে হতে পারে। কিন্তু সবচাইতে চিত্তাকর্ষক তথ্যটি কী জানেন? দেশে এখনও বাল্যবিবাহের হার প্রায় ২০%। আর সবচাইতে বেশি বিয়ে হয় বিদ্যাসাগরের নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ আর আরও একটি বাঙালি অধ্যুষিত রাজ্য ত্রিপুরাতে।
বিধবাবিবাহের প্রশ্নে আমি বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষেই কিছু তথ্য গুটিয়ে রেখেছিলাম—সেগুলোর উল্লেখ করছি। ২০১৯-এর নভেম্বরের ১০ তারিখে পশ্চিমবঙ্গের চন্দননগরের বছর পঁচিশের এক তরুণ—নাম গৌরব অধিকারী—একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়। সেই স্ট্যাটাস তখন বিশ্বজুড়ে সংবাদ। আমরা যখন দেখেছি, তখনও স্ট্যাটাসটি সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি শেয়ার হয়ে গেছে। টুইটারে, হোয়াটসঅ্যাপে কতটা ছড়িয়েছে, কে তার হিসেব রাখে! কিন্তু আমরা বিষয়টি আগে দেখেছি একটি টিভি চ্যানেলে; পরে দেখি বিবিসি সহ দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও স্ট্যাটাসটি সংবাদে এসেছে। বাংলাদেশের মুফতি ইউসুফ মাহমুদি এক ওয়াজে বসে সেদেশের বিভ্রান্ত, ধর্মচ্যুত মুসলমানদের সমালোচনা করে গৌরবের পক্ষে দাঁড়ালেন। সে নিয়েও বাংলাদেশের টিভিতে ও কাগজে হৈচৈ পড়ে গেছে। গৌরবের বাবা মারা গেছেন ২০১৪-তে। বাড়িতে সে আর তার মা। তাকে কাজে-অকাজে বাইরে বাইরে ঘোরাঘুরি করতে হয়; বাড়িতে মা একাই থাকেন। মায়ের বয়স ৪৫ মাত্র।""তাই আমি আমার মা এর জন্য জীবনে চলার পথে নতুন সঙ্গী চাই... হয়তো কারোর এটা মন্দ লাগতে পারে কারও লাগতে পারে বিসদৃশ.. কিন্তু মা একা একা ফাঁকা বাড়ীতে থেকে থেকে ডিপ্রেসড হয়ে পড়েন.. মা গান শুনতে.. বই পড়তে খুব ভালোবাসেন...আমার বাড়ির হাজার দশেক বই ই মায়ের অবসর যাপন...☺. কিন্তু আমার মনে হয় একজন সঙ্গীর পরিপূরক বই বা গান বা স্ট্র্যান্ড এ হাঁটতে যাওয়া হতে পারে না.. আমার মা এর জন্য আমি এই পোস্ট করছি..একা একা কষ্ট পেয়ে কাছিম হয়ে থাকার চেয়ে জীবনটা ভালো ভাবে বাঁচা দরকার বলেই আমি মনে করি.. আমি যত দিন যাবে আরও ব্যস্ত হয়ে পড়ব.. আমার ও সংসার হবে.. কিন্তু মা..???''সে আরও লিখেছে—""এটা আমার মনের ইচ্ছে মা কে নতুন জীবন দেওয়ার... আমি আমার মা কে একটা নতুন জীবন দিতে চাই.. মা আমার মা ও বটে কন্যা ও বটে....'' লিখেছে—""এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিছনে এরকম কোন কারণ নেই যে আমি দায়িত্ব নিতে পারি না বা পারব না.. আমি মায়ের সঙ্গেই ছিলাম আছি এবং থাকব ও.. আমার ভালোবাসা মা কে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে মা কে নিয়ে কবিতা লেখা নয়..''
গৌরবের অনুপ্রেরণা হলেও হতে পারে আস্থা ভার্মা নামে আরেক তরুণী। সে তার মায়ের জন্য একই রকম বরের সন্ধানে নেমে ৩১ অক্টোবর টুইট করেছে এই লিখে— “Looking for a handsome 50-year-old man for my mother! Vegetarian, Non-Drinker, Well Established. #Groomhunting”। এখানেই শেষ নয়; গৌরবের সঙ্গে একই দিনে কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে নিজের ৫৬ বছর বয়সী মায়ের জন্য বর চেয়ে টুইট করেছে আরেক তরুণী মোহিনী ভিজ।
এই সব তথ্য দেখায় দেড়শতাধিক বছর আগে বিদ্যাসাগরের প্রয়াসে বিধবাবিবাহ আইনসম্মত হলো বটে, কিন্তু বাস্তবে এখনও এটি তত সাধারণ ঘটনা নয়; নইলে এত হল্লা হত না। জানিয়ে রাখি, তিনজনেই সামাজিক মাধ্যমে আহ্বান জানিয়ে সফল হয়েছিলেন। বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবার্ষিকীতে তাঁকে না জেনেই এভাবে বহু নেটিজেন তাঁকে সম্মান জানিয়েছিলেন। আস্থার ওই একক টুইটটির থ্রেডে (কমেন্ট সেকশনে) হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয়ে যান। সাধারণ ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটে (যেমন শাদী ডট কম বা ভারত ম্যাট্রিমোনি) যেভাবে পাত্রের বিবরণ, বয়স, চাকরি ইত্যাদি আলাদা আলাদা প্রোফাইলে সাজানো থাকে, আস্থার ওই একটি মাত্র টুইটের নিচে মানুষ ঠিক সেভাবেই কমেন্ট বক্সে নিজেদের পরিচিত একাকী বা ডিভোর্সি বাবা, কাকা বা মামাদের বায়োডাটা ও ছবি দিতে শুরু করেন। নেটিজেনরাই একে অপরকে ট্যাগ করে এবং রি-টুইট করে উপযুক্ত "ম্যাচ' বা জোড় মেলানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
টুইটারের চিরাচরিত রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির চেনা গণ্ডি পেরিয়ে ওই একটি পোস্ট যেভাবে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে একটি নিখরচায় সমাজসেবামূলক বিয়ের মাধ্যমে মানুষের সম্পর্ক তৈরির মঞ্চ হয়ে উঠেছিল, সেই কারণেই সমাজ গবেষকেরা ও সংবাদমাধ্যমগুলো লিখেছিল—""আস্থার ব্যক্তিগত টুইটার অ্যাকাউন্টটিই একটি ম্যাট্রিমোনিয়াল প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে''। এটি ছিল মূলত ইন্টারনেটের গণতান্ত্রিক ও মানবিক শক্তির এক অপূর্ব প্রতীকী রূপান্তর। যদিও ভারত ম্যাট্রিমনি, শাদী ডট কম ও জীবনসাথী-র মতো আন্তর্জাল ভিত্তিক বিয়ের সংগঠনগুলো এই শতকের শুরুর দিনগুলো থেকেই বিধবা বা দ্বিতীয় বিয়ের বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করে—আন্তর্জালের সীমাবদ্ধতার জন্যেও এরা এত প্রচারে আসেনি এই সব নিয়ে। গৌরব, আস্থা, মোহিনীদের এই সামাজিক ট্যাবু ভেঙে বেরিয়ে আসার পরে, আর কিছুটা করোনা অতিমারির সময়ে আন্তর্জালের ব্যাপক ব্যবহার বাড়াতে—এই মঞ্চগুলোও এখন বেশ প্রচারে এসেছে বটে; কিন্তু সেও মূলত কিছু বনেদি শিক্ষিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।সমাজবিজ্ঞানী বিনয় ঘোষ ঊনবিংশ শতকের নবজাগরণকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যে শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতার কথা বলেছিলেন, একবিংশ শতকের এই আধুনিক ধারাতেও তার এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। বিনয় ঘোষ দেখিয়েছিলেন যে, বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ বা নারীমুক্তির আন্দোলন মূলত কলকাতার ‘উচ্চবর্ণের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত’ সমাজের গণ্ডিতেই আবর্তিত হয়েছিল; গ্রামীণ সর্বহারা বা নিম্নবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে তার সংযোগ ছিল ক্ষীণ। আজকের দিনে দাঁড়িয়েও এই সত্যটি সারা দেশে সমান প্রাসঙ্গিক। ১৯৯০-তে প্রকাশিত বাণী বসুর উপন্যাস "শ্বেত পাথরের থালা' নিশ্চয় আমরা অনেকে পড়েছি। অথবা এরই প্রভাত রায়ের করা চলচ্চিত্র রূপ ১৯৯২-তে এলে আমরা দেখেছি; না দেখলে দেখে নেবেন। আমরা এখনও ওই থালার সংস্কারেই আটকে আছি। বিদ্যাসাগরকে চেনা এবং শ্রদ্ধা জানানো এখনও নয় এতটা সহজ। এমনকি যে মুসলমান সমাজে বিধবাবিবাহ বিধিসম্মত, সেখানেও নয়—কারণ ভারতীয় সমাজসংস্কার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আসলেই ধর্মনিরপেক্ষ—সাম্প্রদায়িক নয়। আমরা খেয়ালই করি না যে ভারতে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সমাজ পরস্পর দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত। কারোরই জীবন শেষ পর্যন্ত পুরোটা শাস্ত্রশাসিত নয়। একের থেকে অন্যকে আলাদা করা অসম্ভব।
ভাষাশিল্পী ও সাহিত্যিক রূপকার বিদ্যাসাগর:
এবারে তাঁর ভাষা ও সাহিত্যকৃতি নিয়ে কথা বলা যাক। তাঁকে অনেকে বাংলা গদ্যের জনক বলেন। গদ্যের জন্মের সঙ্গে ছাপাখানার প্রচলনের একটি যোগাযোগ আছে; ফলে আঠারো শতকেই এর জন্ম হয়েছিল। শ্রীরামপুর মিশন বা রাজা রামমোহন অথবা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের "সংবাদ প্রভাকর' কাজ অনেকটা এগিয়ে রেখেছিলেন। বিদ্যাসাগর যা করেছিলেন—ইংরেজির দেখাদেখি এতে যতিচিহ্নের ব্যবহার, যা টুকটাক শুরু হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ করে পাকা করেছিলেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় কোথাও লিখেছিলেন, বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে যে স্তরের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন, এর সঙ্গে নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের মিল রয়েছে। পাঠক ও শ্রোতা যাতে পড়ার সময় গদ্যের ধ্বনিসামঞ্জস্যে আনন্দ পায়, সেজন্য তিনি ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’ গ্রন্থে প্রথম ইংরেজি কমা (,), সেমিকোলন (;) ও দাঁড়ির (।) সুশৃঙ্খল ব্যবহার শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ভাষাশৈলীর মূল্যায়ন করে লিখেছেন:""বিদ্যাসাগর বাংলাভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। তিনি সর্বপ্রথমে বাংলা গদ্যে কলানৈপুণ্যের অবতারণা করেন। ... তিনি বাংলা গদ্যভাষার উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত এবং সুসংযত করিয়া তাহাকে সহজ গতি এবং কার্যকুশলতা দান করিয়াছেন।''
"বর্ণপরিচয়' বা বাংলা প্রাইমার অনেকেই লিখেছিলেন বিদ্যাসাগরের আগে বা পরে। কিন্তু সংস্কৃতের আনুগত্য থেকে বাংলাকে মুক্ত করেন এই সংস্কৃত পণ্ডিতই। নইলে সংস্কৃত হল-বর্ণে কোথায় ক-খ-গ-ঘ পড়তে পারতেন? বহু বর্ণের তিনি প্রবর্তনও করেছেন। আমরা অসমিয়া "ৰ-ৱ' নিয়ে বহু যুদ্ধের সাক্ষী; কিন্তু কেউ বলে না, নিচে বিন্দু দিয়ে ড়, ঢ়, য়, ৎ, ং—এইসব বাংলাতে এবং অসমিয়ায় এল কোত্থেকে? কলকাতার বইবাজার থেকে, ছাপাখানার যন্ত্র আসত ওখান থেকেই। অসমিয়ায় নিচে বিন্দু দিয়ে "র' ছিল কিন্তু অন্তস্থ ৱ বোঝাতে; আর বাংলাতেও ছিল পেট-কাটা ৰ। যখন দেখা গেল বাংলায় নিচে বিন্দু "র'-কে আর সরানো যাবে না, তখন এই উনিশ শতকেই অসমিয়া অন্তস্থ ৱ-এর নিচে দীর্ঘ নিম্নরেখ দেবার চল হয়। বাকি বিন্দুসহ বর্ণ নিয়ে কেউ মুখ খোলে না, কাজিয়াও করে না। কেবল খামোখা একটি যুক্তব্যঞ্জন "ক্ষ'-কে বাদ দিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর—সেটি অসমিয়ায় থেকে গেছে। বস্তুত, সকল যুক্তব্যঞ্জনকে জুড়তে গেলে বাংলা-অসমিয়া বর্ণমালা চিনা বর্ণমালাকেও হার মানাবে।
আরও একটি তথ্য আমরা জানিই না। ছাপাখানা খোলাটা তখন ভদ্রসমাজে খুব সম্মানের কাজ ছিল না; বিদ্যাসাগরের কলেজের মান যাওয়ার এটিও একটি কারণ হতে পারে। ছাপাখানার কাজ তিনি হাতে-কলমে শিখেওছিলেন, আর ছাপাখানায় কাজের সুবিধার জন্য যে বিন্যাসে হরফগুলো সাজানো থাকত—সেগুলোরও তিনি পুনর্বিন্যাস করেন; যা মোটামুটি কম্পিউটার এসে পুরোনো ছাপাযন্ত্রকে উঠিয়ে দেওয়ার আগে অবধি প্রায় একই ছিল। আন্তর্জাল যুগে এই কাজটিতে অনন্য প্রতিষ্ঠা অর্জন করে "অভ্র কী-বোর্ড'। আমরা তাই এই কী-বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা মেহেদি হাসান খান এবং তাঁর দলকে বলি—"আন্তর্জাল যুগের বিদ্যাসাগর'। কিন্তু মোবাইলে অনেকটাই তাঁর বর্ণপরিচয়ের ক্রম সুরক্ষিত আছে, যদিও তা প্রেসের হরফ বিন্যাস থেকে ভিন্ন। কেবল বাংলাতেই নয়, বাকি ভারতীয় ভাষাগুলোতেও এর প্রভাব পড়েছিল।কিন্তু ছাপাখানার কাজ, এমনকি ছাপা বইকেও অনেকেই তখন সুনজরে দেখতেন না; ধর্মনাশের কারণ বলে মনে করতেন। একে তো যন্ত্রটি বিধর্মী সাহেবরা নিয়ে এসেছেন, তায় কারিগরদেরও অধিকাংশ ছিলেন দলিত হিন্দু বা মুসলমান। যেমন ধরুন, হ্যালহেড প্রথম বাংলা হরফ তৈরি করান পঞ্চানন কর্মকারকে দিয়ে—আপনাদের মনে পড়বে। ছাপাখানার আনুষঙ্গিক কারখানাগুলোও গড়ে হচ্ছিল অহিন্দু বস্তি এলাকাতে। বিদ্যাসাগরের কাল আসতে আসতে যদিওবা ছাপাখানার এবং ছাপা বই-পত্রিকার চল অনেক বেড়েছে, তাই বলে বর্ণহিন্দু কেউ ছাপাখানা খুলবে বা গায়ে কালি মেখে লোহা পিটবে—সে তো অসহ্য ছিল! ফলে সংস্কৃত কলেজের সম্পাদক রসময় দত্ত বিষয়টি ভালো নজরে নেননি; যাঁর অনুরোধে বিদ্যাসাগর ফোর্ট উইলিয়াম ছেড়ে এই কলেজে এসেছিলেন, তাঁর সঙ্গেই মতান্তর বাড়তে থাকে—সে সব কথা আমরা আগেই বলেছি। প্রশ্নটি নিছক মতবিরোধের ছিল না, ছিল সম্মানের; আর সেই সম্মানের অনেকখানি ছিল ছাপাখানা সংক্রান্তই—এ রকমই কেউ কেউ অনুমান করেন। (জীবানন্দ চট্টোপাধ্যায়, অনুষ্টুপ, বটতলা সংখ্যা, ২০১১, পৃ. ৭০)
এবারে, ছাপাখানা তো খুলল; আসলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও। কলেজ স্ট্রিটের সম্ভবত প্রথম প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। ফলে ব্যবসা তো বাড়াতেই হবে; তায় প্রথম দিকে ছিল ধারশোধের তাড়া। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ তখন মার্শম্যানের অধীনে, বিদ্যাসাগর তাঁকে গিয়ে ধরলেন। তিনি কাজ দিলেন অন্নদামঙ্গলের একটি উন্নততর সংস্করণ ছেপে দেওয়ার। বিদ্যাসাগর কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ি গিয়ে একটি প্রামাণিক পুঁথি এনে ছাপলেন। শ-খানেক বই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কিনে নেয়, তাঁর ধার শোধ হয়ে যায়। এর পরে শুরু হয় ক্রমাগত দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্যের মতো নানা বিষয়ের বই ছাপা। অধিকাংশই ছিল স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই। এভাবে তাঁর বইপত্র তৈরি হতে থাকে এবং প্রকাশিত হতে থাকে। আজকাল আমরা দেশে মিশনারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভাঙচুর করতে পারলে বেশ গৌরব বোধ করি—যাঁরা সেসব করে, লেখাপড়ার সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক নেই।
এখানে একটি কথা উল্লেখ রাখা ভালো—তিনি কোথাও ধর্ম নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। বরং ধর্ম-দর্শনে তাঁর অনাগ্রহ ছিল বলেই বিশপ বার্কলের বইটি পাঠ্যতালিকাতে ঢোকাতে চাননি। খ্রিস্টান লেখক বলেই নয়, তখনই তিনি বেদান্তের মায়াবাদে তাঁর আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন। তিনি "শকুন্তলা' ও "সীতার বনবাস'—এর মতো বই যখন অনুবাদ করেন, তখন কোনো ধর্মীয় আবেগ থেকে নয়, বরং প্রাচীন পুরাণের অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতিক চরিত্রগুলোকে বাংলার চেনা সামাজিক ও পারিবারিক পটভূমিতে নিয়ে এসে রাম, সীতা বা শকুন্তলার দুঃখকে তিনি প্রাগাধুনিক দেবত্বের মহিমা থেকে মুক্ত করে রক্ত-মাংসের মানুষের চিরন্তন সুখ-দুঃখের রূপ দান করেছিলেন। সেই আবহেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের রচনাগুলোও তৈরি হয়েছিল, আমাদের মনে রাখতে হবে। এর থেকেও বড়ো ছিল বাংলা গদ্যে যে আধুনিক রসসাহিত্য রচনা সম্ভব, তাও দেখিয়ে দেওয়া; অন্যথায় বাংলা উপন্যাসের জন্মই হত না। বস্তুত, বঙ্কিমের রচনাতেও এর পরে আর ঈশ্বর মূল ভূমিকাতে রইলেন না, তাঁর ‘কৃষ্ণচরিত্র’ বইটিও এক আদর্শ মানব চেতনার পুঁথি। সাহিত্যের কেন্দ্র থেকে পরিধিতে ঈশ্বরের বিদায় এবং কেন্দ্রে মানুষের চলে আসাটাই হচ্ছে আধুনিকতার মূল মর্ম; কিন্তু এর জায়গা নিতে শুরু করল—সম্প্রদায় চেতনা।
তাঁর হাতে তৎসম শব্দবহুল বাংলা সাধুভাষা দাঁড়িয়েছিল বলে একটি মত চালু আছে। আসলে আমাদের লিখিত ভাষাটি চিরদিনই ছিল এই "সাধুভাষা'—শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের যুগ থেকেই। আর তৎসম শব্দ ঢোকানোটা শুরু হয় শ্রীরামপুর মিশনের দিন থেকে। বিদ্যাসাগরের রচনায় এরই ধারাবাহিকতা সুরক্ষিত ছিল; কিন্তু তিনি তো ভারতচন্দ্র কথিত "যাবনী মিশাল ভাষা' বাদ দেননি। বাদ দেওয়া তখন সম্ভব ছিল না এবং এখনো নয়। বহুবিবাহ রোধের পুস্তিকাগুলোতে তিনি তৎকালীন কুলীন ব্রাহ্মণদের তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। সেরকম রচনাগুলোতে তাঁর এই ধারালো গদ্যে তৎকালীন মোগল আদালতের ফারসি পরিভাষা ও কড়া বিদ্রূপের মেলবন্ধন ঘটেছিল। একটি নজির উল্লেখ করা যাক—""এই সকল সম্ভ্রান্ত কুলীন মহাশয়েরা গৃহকোণে বসিয়া এক-একটি জাঁদরেল নবাব বা হাকিম সাজিয়া থাকেন। তাঁহাদের স্ত্রীদের অবস্থা হইল রাজদরবারের আর্জি পেশ করা ফরিয়াদিদের মতো। ... বৃদ্ধ বয়সেও যাঁহাদের লালসার খতিয়ান শেষ হয় না, তাঁহারা ধম্মের দোহাই দিয়া যে বেআইনি কারবার চালাইতেছেন, তাহা দেখিলে মোগল আদালতের কাজী বা মুফতিরাও লজ্জায় মস্তক অবনত করিতেন।''
হিন্দুস্তানি ভাষাতে আরবি-ফারসির বহুল প্রচলন রদ করে উনিশ শতকে ভারতে একটি নতুন ভাষা গড়ে ওঠে—তার নাম "হিন্দি'। "হিন্দ্বী' ছিল পুরোনো ভাষার নাম; তাকে মুসলমানের ভাষা করে ফেলা হয় সফলতার সঙ্গে। আর আজ যে দেশে একটিও নাগরিকের মাতৃভাষা নয়—সেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এখন হিন্দ্বী তথা উর্দু। দেখাদেখি বিদ্যাসাগরের জন্মের দুই শতক পরে একদল মূর্খ নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—বাংলাটা বাংলাদেশি ভাষা কিনা, অথবা বাংলাদেশের ভাষা আদৌ বাংলা কি না। সবকিছুই এখন হতে হবে হিন্দির দেখাদেখি! নিজেরাই ভাবুন, বাংলাদেশের ভাষার থেকে তিনসুকিয়ার বাঙালি মানুষজন নিজেদের আলগা করতে রাজি আছেন কিনা। বিশেষ করে সিলেটিকে তো একজন স্পষ্ট করেই বলেছিলেন—বাংলাদেশের ভাষা।বিদ্যাসাগরের বিরোধী শিবিরের লোক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। বহু প্রশ্নেই তাঁদের বিরোধিতা ছিল; কিন্তু অনেকেই জানেন না, তৎসম শব্দবহুল সাধুবাংলা নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন শ্রীরামপুর মিশনের খ্রিস্টান মিশনরিরা। নইলে ব্রাহ্মণদের খুশ করে বাংলা গদ্যের চলন ঘটানো যাচ্ছিল না। উইলিয়াম জোনসদের ভূমিকাও এতে ছিল—যিনি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী প্রথম কল্পনা করেছিলেন। বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমের দিনে জন বিমস বলে এক বিদেশি ভাষাবিজ্ঞানী বাংলাকে সংস্কৃত করে ফেলার প্রয়াস নিয়ে প্রশ্ন তুললে বঙ্কিম—যাঁর বিরুদ্ধেও বাংলাকে তৎসম শব্দবহুল করে ফেলার অভিযোগ আছে—‘বাঙ্গালা ভাষা’ নামে একখানা প্রবন্ধ লেখেন । সেখানে তিনি লিখেছিলেন:""যদি কোনো কথা কেবল সংস্কৃত শব্দে ব্যক্ত করিলে সুন্দর হয়, তবে সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করিব; যদি কোনো কথা দেশজ শব্দে ব্যক্ত করিলে সুন্দর হয়, তবে দেশজ শব্দ ব্যবহার করিব; যদি কোনো কথা আরব্য বা পারস্য শব্দে ব্যক্ত করিলে সুন্দর হয়, তবে আরব্য বা পারস্য শব্দ ব্যবহার করিব। ভাষা অবয়বে যাহাই হউক না কেন, তাহার প্রাণ যেন সর্বসাধারণের সহজ বোধগম্য হয়।''
এবারে বুঝুন, কোন্ মূর্খেরা বাংলাকে বাংলাদেশের ভাষা বলে, অথবা কোন্ বাঙালি মূর্খ নতুন করে বলে যে বাংলাদেশের ভাষাটি বাংলাই নয়। ফলে, এখনো বিদ্যাসাগর উত্থাপিত এমন কোনো প্রসঙ্গই নেই—যেখানে আপনি বিদ্যাসাগরকে এড়িয়ে যেতে পারেন। তিনি উত্থাপন করেননি এমন বহু প্রসঙ্গ হয়তো তখনও ছিল, এখনো রয়েছে।
উপসংহার:
এই পর্যন্ত এসে একটি বিষয় তো স্পষ্ট। তাঁর বাবা চেয়েছিলেন তিনি সংস্কৃত পড়ে পারিবারিক ব্যবসা ধরে রাখবেন, চতুষ্পাঠী খুলে বসবেন; সেটি তিনি হয়েছিলেন। সেকালে দেশের সবচাইতে বড় টোলের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। কিন্তু বাবা যে চেয়েছিলেন তিনি সংস্কৃত ভাষা, সাহিত্য ও দর্শনের শিক্ষক হবেন—সেটি তাঁর দ্বারা সেরকম হয়ে ওঠেনি। একে তো সংস্কৃত কলেজে তিনি খুবই কম দিন অধ্যাপনা করেছেন, আর এতগুলো যে বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেন, তার একটিও সংস্কৃতমাধ্যমের ছিল না। সেদিক থেকে তিনি বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই গিয়েছিলেন। এবং দরকারে তিনি গুরুজন বা ঊর্ধ্বতনদের বিরুদ্ধে যেতেন বলেই দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি উল্লেখ করা দরকার—পরপর জীবনে উন্নতি তো করেই গেছেন, কিন্তু কোনো কাজেই তিনি দীর্ঘস্থায়ী ছিলেন না। ইস্তফা তিনি জীবনে বহুবার দিয়েছেন।তবে কি তিনি খুব রগচটা ছিলেন? মানে, অল্পেতেই রেগে যেতেন? সে তো ছিলেনই; কিন্তু পরের দুঃখে কেঁদেও ভাসাতেন। ক্রোধ ও করুণার যুগলমূর্তি ছিলেন ন্যায়শাস্ত্রের এই পণ্ডিত। তাঁর স্বভাবটিকে "দ্রুম' না "সানুমান' অর্থাৎ বড় গাছ না পাথুরে পাহাড়—কার সঙ্গে তুলনীয়, এই প্রশ্ন তুলে দীর্ঘ তর্ক ফেঁদেছিলেন আরেক পণ্ডিত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। এবং লিখেছিলেন—পাহাড়ের পাথর যেমন অল্প বাতাসে দুলে না, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তার ভেতর থেকে বেরোনো ঝর্ণা নদী হয়ে যেভাবে মাটিকে উর্বর করে, সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করে, ঈশ্বরচন্দ্র ঠিক সেরকম লোক ছিলেন। রবীন্দ্রনাথও ঈশ্বরচন্দ্রের এক দীর্ঘ জীবনকথাতে সেই অভিমত সমর্থন করেছিলেন।
তিনি যে সমাজ ও দেশে বাস করতেন, তার ভীরুতা, বাচালতা, কর্মহীনতা এবং কুসংস্কারের কুৎসিত রূপ তাঁকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত করেছিল। তাই জীবনের শেষ কিছু দিন তিনি সমাজ থেকে দূরে কার্মাটাড়ের সাঁওতালদের মাঝে নিজের একাকী আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিলেন; সেখানেও গিয়ে খুলেছিলেন একটি স্কুল।
রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ ও মহিমান্বিত উক্তিতেই বিদ্যাসাগরের জীবনাবসানের প্রকৃত সত্যটি উচ্চারিত হয়—আমাদের মতো সাধারণ বাঙালি তথা ভারতবাসীদের সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ কী কঠোর শব্দ ব্যয় করেছিলেন, খেয়াল করবেন:
""এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, বাচাল মানবদলের মধ্যে বিদ্যাসাগর এই বঙ্গদেশে একক ছিলেন। তিনি তাঁহার চারিপাশের লোক অপেক্ষা বয়সে অনেক বড়ো ছিলেন। ... দগ্ধাস্থিপঞ্জরময় ভারতের এই মহাশ্মশানে বিদ্যাসাগরের চরিত্রমাহাত্ম্য এক অবিনশ্বর অক্ষয় মনুষ্যত্বের জ্যোতিস্তম্ভ রূপে চিরকাল জাগ্রত থাকিবে।''
০৬-০৯-২০২৬



