আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Showing posts with label Assamese Literature. Show all posts
Showing posts with label Assamese Literature. Show all posts

Sunday, 19 February 2012

সুরমা নদীর গাংচিল হেমাঙ্গ বিশ্বাসের আকাশী গঙ্গা


(নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সংস্কৃতি সম্মেলনের তিনসুকিয়া শাখার মুখপত্র 'প্রতীতি'র জন্যে হেমাঙ্গ বিশ্বাস নিয়ে এক প্রাথমিক পাঠ)
                 
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।
    বীন্দ্রনাথের এটি জনপ্রিয় অনুকবিতা। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের পূর্বোত্তরের বাঙালিদের কথা ভেবে লেখেন নি তো? গেল বছর আমরা রবীন্দ্রসার্ধশতবর্ষ নিয়ে মাতলাম। অথচ কই, কেউ কবি অশোক বিজয় রাহার কথা বিশেষ মনে রাখলেন না তো! এবারে আমরা স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে মেতেছি, সব্বাই। প্রায় সমস্ত ছোট বড় শহরে তাঁকে নিয়ে উৎসব অনুষ্ঠান হচ্ছে আর হবে, কিন্তু কই, আমাদের ঘরের কাছের মানুষ যিনি আমাদের জন্যেই আজীবন পণ করেছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, জেলে গেছেন সেই হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে স্মরণ করবার দায় আমরা গুটি কয় ‘বুদ্ধিজীবি’র কাঁধে চাপিয়ে দিব্বি সুখে আছি! এবছর তাঁর শতবর্ষ! তাঁকে সেভাবে স্মরণ না করবার কারণটুকু কি? তিনি আমাদেরই লোক, ‘গাঁয়ের যোগী’ বলে! কলকাতাতে দীর্ঘদিন থাকলেও ঠিক সেখানকার মূলস্রোতের সিলমোহর তাঁর গায়ে পড়েনি বলে? এভাবে যে আমরা কোনদিনই স্বনির্ভর হয়ে, স্বমর্যাদাতে নিজের পায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না, সে যতই রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, নেতাজী সুভাষের উত্তরাধিকার আমাদের উপর বর্তাক -- এই সত্যটুকু নিয়ে কি খানিক অবসরেও ভাবব না?
soruo-white swan

         ‘হেমাঙ্গ বিশ্বাসঃ সাংস্কৃতিক চেতনাৰ অমল সুবাস’ নামে ফটিক বরার এক চটি বই রয়েছে। সেখানে তিনি এক জায়গাতে আক্ষেপ করে লিখেছেন, “আধুনিক অসমৰ আকাশৰ তিনিটা উজ্জ্বল তাৰকাই সংস্কৃতিৰ পোহৰেৰে জনজীৱন পোহৰাই আছে। ডিব্রুগড়ৰ তামোলবাৰী বাগিচাত ওপজা জ্যোতিপ্রসাদ, সুদূর সাগৰ পাৰৰ ঢাকাত ওপজা বিষ্ণুপ্রসাদ আৰু সুৰমা উপত্যকাৰ শ্রীহট্ট জিলাৰ মিৰাশী গাঁওত ওপজা হেমাঙ্গ বিশ্বাস---তিনিও আঢ্যবন্ত, আটন্তিয়াৰ পৰিয়ালত , সোণৰ নহলেও, ৰূপৰ চামুচ মুখত লৈ জনম লৈছিল। উত্তৰাধিকাৰ ৰূপে পোৱা সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আৰু প্রাচুর্য্য নেওচি বোকা-পাণী, ধুলি-বালি , জেং জোং ভৰা গাঁৱলীয়া বাটেৰে , বাহনি-ঝাৰণিৰ মাজেৰে অনাহাৰে অর্দ্ধ্বাহাৰে  পৰৰ কাৰণে কন্দা জীৱন কটাই গ’ল।...তিনিও দুখীয়া হালোৱা, হজুৱা, বণূৱা, তলমজলীয়াৰ ঘৰে ঘৰে গানৰ  অগণী সিঁচি সিঁচি গ’ল। তিনিও গাঁৱলীয়া বাটেৰে , ভৰা নৈৰ ঘাটেৰে বাট বুলি লোককৃষ্টি, কলা, লোকসঙ্গীতৰ সেণ চেকুঁৰা বুটলি, বুকুৰ মৌৰ তিওৱা প্রেমৰ অমিয়া মাধুৰী ঢালি সেণসেৰীয়া সংস্কৃতি সৃষ্টি কৰি গ’ল। জ্যোতিপ্রসাদ আৰু বিষ্ণু ৰাভাক অলপ হ’লেও মানুহে চিনি পায়। পিচে তৃতীয় জনক আজিৰ অসমৰ মানুহে, বিশেষকৈ আজিৰ পুৰুষে, চিনি নাপায় বা পোৱা সকলেও পাহৰি পেলাইছে।”  ফটিক বরাকে এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হেমাঙ্গ বিশ্বাস কোন?’ তার উত্তরে তিনি বইটির ভূমিকাতেই লিখেছেন, “...হেমাঙ্গ বিশ্বাস এনে এজন মানুহ যিজনে চিলেটৰ (শ্রীহট্ট) বঙালী হৈও অসমীয়া ভাষা, কৃষ্টি আৰু সংস্কৃতিৰ লোকায়ত ৰূপটো সংৰক্ষিত কৰিবলৈ আন বহুতৰ লগে ভাগে আৰু অকলেও প্রাণে পণে চেষ্টা কৰি গ’ল; যিজনে জ্যোতিপ্রসাদ, বিষ্ণু ৰাভা, ভূপেন হাজৰিকা, নৰহৰি বুঢ়াভকত, মঘাই ওঝা, ব্রজেন বৰুৱা, ৰমেন বৰুৱা, আব্দুল মালিক, দিলীপ শর্মা, কুলধৰ চলিহা, প্রফুল্ল চন্দ্র বৰুৱাকে আদি কৰি আন বহুতো প্রতিভাশালী আৰু একনিষ্ঠ লিখক –শিল্পীক গোটপিত খুৱাই একেলগে অসমৰ জনসংস্কৃতিৰ প্রচাৰ কৰি উন্নতি সাধনৰ বাবে কাম কৰিবলৈ এখন মঞ্চলৈ উলিয়াই আনিছিল...।” তথ্যগুলো দিলাম, এই ইঙ্গিত দিতে যে এতো বিশাল ব্যক্তিত্বের পুরো একটা পরিচয় তুলে দিতে আরেকটা বই লিখতেই হয়। আবার কোনো একটা দিক তুলে ধরাও সমস্যা, কেননা আমাদের এই শহরে অধিকাংশের  কাছে ব্যক্তি হেমাঙ্গের প্রাথমিক পরিচয়টুকু তুলে ধরাটাই এখনো এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমরা তাই , সেই কাজটাই করব ভাবছি।
হেমাঙ্গ জীবনীঃ   খোয়াই তাঁর ভালোবাসা
            হেমাঙ্গ বিশ্বাসের রাজনৈতিক প্রেরণার স্থল নিশ্চয়ই সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকতাবাদ, কিন্তু যেহেতু সারা জীবন বাংলা এবং অসমিয়াতেই কাজ করেছেন তাই যে মাটিতে তাঁর শেকড়কে পুষ্ট করেছে তার প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ পেয়েছিল ‘সীমান্ত প্রহরী’ কাব্যগ্রন্থের’ খোয়াই’ ( ১৯৫৩) কবিতার এই ক’টি পংক্তিতে, “‘তোমার কূলকে ভালবেসেই তো/কূল ছাড়া আমি/...ব্রহ্মপুত্র আমার বিস্ময়/পদ্মা আমার শ্রদ্ধা/গঙ্গা আমার ভক্তি/তুমি আমার ভালবাসা... খোয়াই।”।
          এই খোয়াই নদীর পাড়েই তখনকার অসমের , এখনকার বাংলাদেশের সিলেটের হবিগঞ্জের মিরাশি গ্রামে ১৯১২র ১৪ জানুয়ারি তারিখে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্ম। তাঁর বাবা হরকুমার বিশ্বাস ছোটখাটো হলেও জমিদার ছিলেন। তখনকার দিনের মেট্রিক পাশ হলেও বাংলা ইংরেজি সংস্কৃতে তাঁর বেশ চর্চা এবং জ্ঞান ছিল। ফলে পাঁচ গাঁয়ের ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের মধ্যেও তাঁর বেশ সম্মান ছিল। মা সরোজিনী বিশ্বাসের পরিবারটিও  সঙ্গীত কাব্য চর্চাতে সমৃদ্ধ ছিল। একদিকে সামন্তীয় শাসন শোষণ এবং অন্যদিকে গীতা বেদান্ত সঙ্গীতের সুর এবং স্বর যুগপৎ দেখেছেন ও শুনেছেন বাড়িতে। একদিকে হিন্দুত্বের বড়াই অন্যদিকে ঢুলি মালি নমশূদ্র মুসলমান প্রজাদের মুখের ভাত কেড়ে নিয়ে দূর-দূর-ছাই-ছাই তাঁকে ছেলেবেলা থেকেই বিরক্ত করে তুলেছিল। ফলে তিনি বাড়ি ছেড়ে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন খোয়াই নদীর পাড়ে পাড়ে। প্রজাদের পাড়ায় পাড়ায়। বাড়িতেই পদাবলী কির্তন , ওঝাপালা লেগেই থাকত ।সেগুলোতো আয়ত্বে এসছিলই, প্রজাদের মধ্যে ভিড়ে গিয়ে লোকগীত, লোক নৃত্য, যাত্রা।  বাউল গানেও মজে গেলেন। শুধু বাংলা নয় মণিপুরি নৃত্যগীতের সঙ্গেও তার পরিচয় ঘটেছিল গ্রামের বাড়িতে থাকতেই।  মিরাশি গ্রামের স্কুলেই নিয়েছিলেন প্রাথমিক স্কুলের পাঠ। সেদিনগুলোতেই স্কুলে যাবার আসবার পথে পথেই হয়েছিল তার এই লোকসংস্কৃতির আদি পাঠ। স্কুলের প্রধান শিক্ষক শিখিয়েছিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীত। পরে অবশ্যি মা তাঁকে শেখাতে শুরু করেন । মা শিখিয়েছেন প্রচুর মেয়েলি ব্রতকথার গান, শ্যামাসঙ্গীত এমন কি রজনীকান্তের গানও।
           ক্লাস সেভেনে পড়বার সময়ে বাবার হঠাৎ খেয়ালে তিনি চলে এলেন উজান অসমের ডিব্রুগড়ে। জর্জ হাইস্কুলে ভর্তি হলেন, থাকার ব্যবস্থা হলো বিখ্যাত ওম বাবার আশ্রম বা বিরাজ আশ্রমে। এখানে অসমিয়া গান কবিতা সাহিত্যের প্রতি তাঁর সমান আগ্রহে পেয়ে বসল। বন্ধু লোহিত কাকতি তাঁকে শেখালেন, প্রথম অসমিয়া গান,” কিয়োনো পাহৰা অসমীয়া হেৰা/ চিৰদিন তুমি আছিলা স্বাধীন/ ভাৰতৰ মাজে তোমাৰ জননী/ বীৰ প্রসৱিনী আছিল এদিন...।”  কিন্তু এখানে স্থায়ী হলেন না। ধর্মমতি বাবারই মনে হলো, এই আশ্রমে অধর্ম বেশ ঘাটি গেড়েছে। নিয়ে গিয়ে আবার ভর্তি করে দিলেন হবিগঞ্জের সরকারী হাইস্কুলে। সেখানেই ১৯৩০শে তিনি মেট্রিক পাশ করেন।
             হবিগঞ্জে তিনি যখন ছাত্র তখনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গোটা ভারত চঞ্চল হতে শুরু করেছে। হবিগঞ্জও তখন নীরব ছিল না। ভগৎ সিঙের মামলা, যতিন দাসের অনশনে মৃত্যু, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ইত্যাদি হেমাঙ্গের মনে প্রবল ছাপ ফেলে। নিজেও একটা দুটো করে মিছিলে পা মেলাতে শুরু করেন। ‘অনুশীলন সমিতি’তে যোগ দিয়ে কিছুদিন অনুশীলন করলেও, গান্ধির অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সেই ১৯৩০এই ১৪৪ ধারা ভাঙার অপরাধে হেমাঙ্গের হাজতবাস হলো। বয়স তাঁর তখন মাত্র সতের। হবিগঞ্জ, সিলেট হয়ে পরে তাঁকে নগাওঁ জেলে নিয়ে আসা হয়। এখানে তাঁর জেল সঙ্গী হিসেবে পেলেন পরে যিনি অসমের মুখ্যমন্ত্রী হবেন সেই বিমলাপ্রসাদ চালিহা এবং আরো অনেককে। বিমলাপ্রসাদের কাছেই জেলেই তিনি পার্বতী প্রসাদের ‘বনগীত’ এ পাঠ নিলেন। অসমীয়া ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আকর্ষণ আরো খানিকটা বাড়ল। ক’মাস পরে জেল থেকে ছাড়া পেলেন। হেমাঙ্গ গিয়ে সিলেট মুরারি চাঁদ কলেজে বিজ্ঞানে নাম লেখালেন। কিন্তু আইন অমান্য আন্দোলনে সময় গান্ধির আহ্বানে প্রকাশ্য জনসভাতে নিজে আবার কলেজ ছাড়ার কথাও ঘোষণা করলেন। ইতি পড়ল তাঁর প্রথাগত শিক্ষাতে। ইতিমধ্যে কংগ্রেসে নেতাজি সুভাষের প্রভাব বাড়ছে। নেতাজি সিলেটে এলে সেই সভা সংগঠনে হেমাঙ্গ অগ্রণী ভূমিকা নিলেন। সুভাষের প্রভাবেই হোক, আর বাড়ির কাছে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলার মতো ঘটনার জন্যেই হোক, কিম্বা রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ , গোর্কির ‘মাদার’এর বাংলা অনুবাদ কিম্বা বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ পড়ে ফেলবার জন্যেই হোক-- ধীরে ধীরে গান্ধির প্রতি তাঁর আকর্ষণ কমছিল। কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী ঝোঁককেও তিনি ভালো চোখে নিতে পারছিলেন না, কেননা বাড়িতে এই ঝোঁকের প্রতি তাঁর ছিল আবাল্য লড়াই। সুতরাং নিজে থেকেও কিছু সঙ্গীকে নিয়ে এক সময় তিনি কংগ্রেসের স্বীকৃত পথের বাইরে গিয়ে কিছু রাজনৈতিক প্রচারে মন দিলেন। ফলে আবার গ্রেপ্তার। এবারে আড়াই বছর। আবারো একই জেল বদলের অনুক্রমে নগাওঁ এলেন, পরে গুয়াহাটিও গেলেন। এই যাত্রাতেই তিনি হেলে বসে শুনলেন এবং শিখলেন জ্যোতিপ্রসাদের ‘গছে গছে পাতি দিলে ফুলৰে শৰাই।’
এদিকে জেলেই তাঁর শরীরে যক্ষা বাসা বাঁধে। তখন যক্ষা মানে মারণ রোগ! উপায়ুক্ত মোলান সাহেব রাজনীতি করবেন না বলে দাসখত লিখে দেবার শর্তে মুক্তি দিতে রাজি হলেন। হেমাঙ্গ থুড়িই দেবেন! সরকার নিজেই পরে উপায় না দেখে মুক্তি দিল। শিলঙে তখন ডাঃ বিধান রায় চিকিৎসা করতেন। তাঁর কাছে গেলেন। তিনি তাঁকে যাদব পুরে নিজের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে পাঠালেন। সেখানেই কমিউনিষ্ট নেতা অনিলেন্দ্র রায়ের কাছে তাঁর মার্ক্সবাদে দীক্ষা। সেখানেই সিলেটের দুই কমিউনিষ্ট নেতা দিগিন দাসগুপ্ত এবং চঞ্চল শর্মার সঙ্গে চেনাপরিচয় হয়। সুতরাং সেই হাসপাতাল থেকেই তিনি সিলেট পার্টির প্রতি সহমর্মীতা প্রকাশ করেন। এবং সুস্থ হয়ে সিলেট যখন ফেরেন ততদিনে তিনি পুরো দস্তুর কমিউনিষ্ট।
           তখনই তাঁর গ্রামে একটি ঘটনা ঘটে যাতে কেবল মানচিত্রের স্বাধীনতা নয় খোলনলচে পালটানো নিয়ে তাঁর প্রত্যয়দৃঢ়তার পরিচয় মেলে।  তাঁদের গ্রামে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের উদ্যোগে একটি হিন্দু মন্দির গড়ে তোলা হবে। তাতে কোনো অসুবিধে ছিল না। কিন্তু সেখানে অনেকেই এলেন যারা হিন্দু ঐক্য নিয়ে প্রবল ভাষণ দিচ্ছিলেন। সেই সভার সভাপতি ছিলেন হেমাঙ্গের  বাবা হরকুমার বিশ্বাস। বাবার উপস্থিতিতেই হেমাঙ্গ সেখানে দাঁড়িয়ে বললেন,” হিন্দু ঐক্য নয়, চাই শোষিত মানুষের ঐক্য...মানুসের সেবা, বিশেষতঃ, শোষিত জনগণের সেবা আমার ধর্ম।” এরকম কিছু লড়াই পরিবারের ভেতরেই করার পরিণাম যা হবার ছিল তাই হয়েছিল। ছেলে বলে রেয়াত করেন নি বাবা। ১৯৪২এ বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন হেমাঙ্গ।
         সে সময় একবার হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচঙে  ম্যালেরিয়া রোগ মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এতে হাজার হাজার লোকের মৃত্যু ঘটে। এ সময় বানিয়াচঙে মানুষের সেবাতে  ছুটে গিয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। সে সময়ই গান লিখেছিলেন, 'বাইন্যাচঙে প্রাণ বিদরী ম্যালেরিয়া মহামারী/হাজার হাজার নর-নারী মরছে অসহায়,/শান্তি ভরা সুখের দেহ/শূন্য আজি নাইরে কেহ/মৃত সন্তান বুকে লইয়া কান্দে বাপ-মায়...'
ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে, ফ্যাসীবাদের বিপদ ঘণ্টাও আতঙ্কিত করে তুলেছে বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষকে। স্পেনের গৃহযুদ্ধে কডওয়েল , লোরকার মতো কবি বুদ্ধিজীবিদের মৃত্যুও লেখক শিল্পীদের আতঙ্কিত করতে শুরু করে।  রম্যাঁ রল্যাঁ, গোর্কি, আইনষ্টাইন, আদ্রেঁ জিদ প্রমুখদের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক স্তরে গড়ে উঠে ‘ফ্যাসীবাদ বিরোধী লেখক শিল্পী সঙ্ঘ’। এর সঙ্গে বিশ্ব জুড়েই কমিউনিষ্টরা ছিলেন বটে, কিন্তু কমিউনিষ্টরা ছাড়াও অনেকে এর সঙ্গে জুড়েছিলেন,  ফ্যাসীবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা যারাই আক্রান্ত বোধ করছিলেন সেই সমস্ত লেখক শিল্পীরা। যেমন ভারতে এর সঙ্গে জুড়েছিলেন জহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথের, পণ্ডিত রবি শঙ্কর, পৃথ্বিরাজ কাপুর , বুদ্ধদেব বসুদের মতো ব্যক্তিত্বও । ১৯৩৬এ লক্ষ্ণৌতে  এঁদের সবার উদ্যোগে এবং মুন্সি প্রেমচান্দের পৌরহিত্যে আয়োজিত হয় এর প্রথম অধিবেশন। ভারতে এর নাম হয় ‘সারা ভারত প্রগতিশীল লেখক শিল্পী সংঘ’ । এই সংগঠন দীর্ঘস্থায়ী না হলেও  শিল্প সাহিত্যের অঙ্গনে ‘প্রগতিশীল’ শব্দটি এই সংঠনের নামের থেকেই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। পরের বছর রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে এর কলকাতা বা বঙ্গীয় শাখা গড়ে উঠে। ১৩৩৮এ কলকাতাতে সর্বভারতীয় সংগঠনটির দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
          যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি, জাপানের ভারতের দোরগড়াতে এসে ব্রহ্মদেশ আক্রমণ, ৪২এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এই সংগঠনে কিছু মতভেদ এবং বিশৃঙ্খলাও দেখা দেয়। কমিউনিষ্ট পার্টি তখন সাংস্কৃতিক কাজে কর্মে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৩এ পার্টির মুম্বাই কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গড়ে উঠে ভারতীয় গণ নাট্য সংঘ , যেটি পরে আই পি টি এ নামে বিখ্যাত হয়। কায়ফি আজমী,  বলরাজ সাহনী, শংকর, শৈলেন্দ্র, পৃথ্বিরাজ কাপুরেরা উদ্যোগ নিয়ে সংগঠনটি গড়তে তোলেন।  বাংলার প্রাদেশিক কমিটিতে মনোনীত হন সুনীল চ্যাটার্জী, দিলীপ রায়, সুধী প্রধান, বিজন ভট্টাচার্য,দেবব্রত বিশ্বাস , শম্ভু মিত্র, সুজাতা মুখার্জী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, স্নেহাংশু আচার্য, বিষ্ণু দে’র মতো ব্যক্তিত্ব।  হেমাঙ্গ বিশ্বাস এর আগেই ১৯৪২এ তাঁর শিল্পীদল নিয়ে এসে কলকাতাতে অনুষ্ঠান করে গেছিলেন। সুতরাং তিনিও রইলেন প্রাদেশিক সংগঠনে। পূর্বোত্তরের আর যে খ্যাতনামা ব্যক্তিটি সংগঠনের শুরু থেকেই এর সঙ্গে ছিলেন তিনি ত্রিপুরার সচীন দেব বর্মণ।
হেমাঙ্গ জীবনীঃ   .ব্রহ্মপুত্র তাঁর  বিস্ময়
            আমরা গণনাট্যের নাটক ‘নবান্ন’ কিম্বা বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্রদের নিয়ে কিছু লিখছি না এই ভেবে যে এগুলো সবাই এক আধটু জানেন এবং এখানে এগুলো হবে অপ্রাসঙ্গিক। পার্টি এবং কৃষক সভার কাজ করতে করতেই পার্টির সাংস্কৃতিক কাজে কর্মের নেতৃত্বে চলে এসছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস।  যেমন ১৯৮৮ এ এখনকার কাছাড়ের কাটাখালে    বসেছিল কৃষক সভার জেলা সম্মেলন। প্রকাশ্য অধিবশনের সভাপতি আরেক শিল্পী প্রতিভা ইরাবৎ সিং । সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার দায় হেমাঙ্গের কাঁধে। ১৯৪৫এ নেত্রকোনাতে অনুষ্ঠিত কৃষক সভার সর্বভারতীয় সম্মেলনে সেই ইরাবত সিং হেমাঙ্গের ‘কাস্তেটারে দিও জোরে শান’কে মনিপুরি নৃতিনাট্যে রূপান্তরিত এবং অনুবাদ করে পরিবেশন করেন। তেভাগা আন্দোলনের সময়ের বার্মা সীমান্তে শহীদের মৃত্যু বরণ করেন ইরাবৎ সিং।  এই ইরাবৎ সিংকে হেমাঙ্গ উৎসর্গ করে লিখেছিলেন ‘সীমান্ত প্রহরী’ নামে বিখ্যাত কবিতা এবং একই নামের পুরো একখানা বই। প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৬১তে।   এই গণনাট্যের আদর্শে গড়ে ১৯৪৫এ তুলেছিলেন ‘সুরমা ভ্যালি কালচারাল স্কোয়াড’। সেটি নিয়ে তিনি শিলচর, শিলং , গুয়াহাটি হয়ে অসমের প্রধান প্রধান সমস্ত শহরে ভ্রমণ করেন। অভিনব ছিল সে পরিকল্পনা। “মণিপুরি বীর টিকেন্দ্রজিৎ, খাসিয়া জাতীয় বীর তিরোৎ সিং, জয়ন্তীয়া বীর কিয়াং নাবা, অসমের মণীরাম দেওয়ান, কুশল কোঁয়র, কনকলতাকে নিয়ে ব্যালে, কার্টুন, ছায়ানৃত্য, গণসংগীতে প্রস্তুত করেছিলেন  অনবদ্য আলেখ্যে। যার আবেদন সহজেই তখন পৌঁছুতে পেরেছিল মানুষের মনে।   সর্বত্র বিপুল সাড়া এবং সমর্থণ পেয়ে এরই শাখা খুলে খুলে  এগুতে থাকেন। সে যাত্রাতেও তিনি দ্বিতীয়বারের জন্যে ডিব্রুগড়ে আসেন এবং সেখানে গোবিন্দ শর্মাকে সভাপতি ও নগেন কাকতিকে সম্পাদক করে ডিব্রুগড় শাখাও গঠন করেন। ১৯৪৬এর শুরুতে তেজপুরে তাঁদের অনুষ্ঠানের কথা শুনে  অভিভূত হলেন জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা। অসুস্থতার জন্যে হাজির হতে পারেন নি। ডাক্তারে নির্দেশ উপেক্ষা করে ডেকে পাঠান হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে । দু’জনার দীর্ঘ আলাপ হলো জ্যোতিপ্রসাদের বাড়িতে । জ্যোতিপ্রসাদ যেন বহুদিন ধরে  সন্ধান করে ফেরা বন্ধুকে কাছে পেলেন। তেজপুরে তাঁরা সাদ্রিভাষাতেও চা বাগানের শ্রমিকদের সংগ্রামের উপর ভিত্তি করে একখানা নাটক করেছিলেন, ‘বদলা লেনা’। জ্যোতিপ্রসাদের সঙ্গে সেই শুরু হওয়া বন্ধুত্বকে আমৃত্যু সম্মান জানিয়েছিলেন হেমাঙ্গ। নিজের দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ ‘ কুল খুড়ার চোতাল’ তিনি উৎসর্গ করেছিলেন তাঁকে।
              তাঁর এই ভ্রমণের সফলতার উপর ভিত্তি করেই ১৯৪৭এ শিলচরে বসে ভারতীয় গণ নাট্য সংঘের প্রথম প্রাদেশিক সম্মেলন। জ্যোতিপ্রসাদ শারীরিক অসুস্থতার জন্যে সেই সম্মেলন উপস্থিত থাকতে পারেন নি , কিন্তু শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে সভাপতি করে সঙ্ঘের প্রাদেশিক সমিতি গঠন করা হয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস হলেন সম্পাদক আর ডিব্রুগড়ের নগেন কাকতি সহ –সম্পাদক। এই সম্মেলন অবিভক্ত অসমের সমস্ত জাতি-জনজাতির সাংস্কৃতিক সমানাধিকারের আর সমমর্যাদার আকাঙ্খাকে সামনে তুলে ধরে। বড় জাতিগুলোর আধিপত্যকামী এবং জনজাতিদের বিচ্ছিন্নতার মানসিকতা –দুইএরই বিরোধীতা করা হয় এই সম্মেলনে। শিলচর সম্মেলনেই বডো শিল্পীদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নীলেশ্বর ব্রহ্ম, রবীন বসুমাতারি। যোরহাট থেকে যাওয়া মিশিং শিল্পীদলের নেতৃত্বে ছিলেন লক্ষ্মীনাথ দলে। মণিপুরি দলের নেতৃত্বে ছিলেন কামিনী সিংহ প্রমুখ। জ্যোতিপ্রসাদ এবং হেমাঙ্গ বিশ্বাসের নেতৃত্বে সমগ্র অসমে গণনাট্য শক্তিশালী সংগঠন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সে এতোটাই যে শাসক শ্রেণি আতঙ্কিত হয়ে ১৯৪৯এর জুলাই মাসে ডিব্রুগড়ের নালিয়াপুলে যে দ্বিতীয় প্রাদেশিক সম্মেলন হয়েছিল তার শেষ দিনের শান্তি সমাবেশে এসে পুলিশ বিনা প্ররোচনাতে গুলি চালায়। সে পুলিশ কিন্তু স্বাধীন দেশের স্বাধীন পুলিশ! সাংস্কৃতিক সম্মেলনে ভয়ার্ত প্রশাসন। গুলিতে বীনা বরা এবং ষোড়শী নাগ নামে দুজন মহিলা সাংস্কৃতিক কর্মী শহীদ হন। স্বাভাবিক ভাবেই জ্যোতিপ্রসাদ এই প্রতিবাদে সংবাদপত্রে যে বিবৃতি দিলেন কোনো কাগজ সেটি ছাপবার সৌজন্যও দেখায় নি।পরে তিনি ‘নালিয়াপুলের বিপদ সংকেত’ নাম দিয়ে প্রচার পত্র হিসেবে বিলি করেন। অসমের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে এই প্রচার পত্রের শক্তি এতোটাই যে জ্যোতিপ্রসাদের রচনাবলীর প্রথম সংস্করণেও প্রকাশক/সম্পাদকেরা এটিকে ঠাই দিতে সাহস করেন নি। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের নজরে পড়তে তিনি এর বিরোধিতা করেন। পরে আরো অনেকে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। চাপে পড়ে দ্বিতীয় সংস্করণে একে ঠাই দেয়া হয়।
            ইতিমধ্যে বিষ্ণু রাভাও এসে গণনাট্যে এসে যোগ দিলেন। ১৯৪৮এ খোয়াঙে অনুষ্ঠিত জনজাতি ছাত্র সম্মেলনে হাজির হয়ে গণনাট্য  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে  জ্যোতিপ্রসাদের পরামর্শে। বিষ্ণু রাভা ছিলেন সেই সম্মেলনের সাংস্কৃতিক শাখার সম্পাদক। ১৯৫৫তে গুয়াহাটির জাজেস ময়দানে অসম গননাট্য সঙ্ঘের তৃতীয় অধিবেশনের আয়োজনে বিষ্ণু রাভা, ভূপেন হাজারিকা মূল উদ্যোগ নিয়েছিলেন।  ঔপন্যাসিক হাওয়ার্ড ফাস্ট, এরেন বুর্গ, টিখনভের মতো ব্যক্তিত্বরা সেই সম্মেলনে শুভেচ্ছাবাণী পাঠিয়েছিলেন। বলরাজ সাহানী, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুমিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখ এসছিলেন সর্বভারতীয় সংগঠনের পর্যবেক্ষক হয়ে। মেঘালয়, মণিপুর, কাছাড়, গোয়াল পাড়ার মতো প্রত্যন্ত জেলাগুলো থেকে এসছিলেন প্রতিনিধিরা।  মঘাই ওঝা সেই সম্মেলনের ঢোল বাজিয়ে প্রথম বারের জন্যে গোট সবাইকে মুগ্ধ করেন। এর পরে তিনি বহুবার ভারতের বহু জায়গাতে গিয়ে ঢোলবাদনের জন্যে ডাক পেয়েছিলেন, গিয়েও ছিলেন। গোটা দেশ মোহিত হয়েছিল অসমের ঢোলের তানে।
         গণনাট্যেরে স্বর্ণযুগে ১৯৫৫র গুয়াহাটি সম্মেলনই ছিল শেষ। ১৯৫১তে জ্যোতিপ্রসাদের অকাল প্রয়াণ হলো, হেমাঙ্গও সুস্থ রইলেন না তেমন ১৯৫৫র সম্মেলনের পর। তাছাড়া  পার্টির ভেতরে বাইরেও নানা রাজনৈতিক বিতর্কে তখন  পুরোনো বন্ধুরা অনেকেই আলাদা হতে শুরু করেন গোটা দেশেই। সে প্রসঙ্গে বিস্তৃত আমরা এখানে যাব না। কিন্তু তাই বলে গণনাট্যরে প্রয়াস ব্যর্থ হবার ছিল না, হয় নি। সে এক দিশা নির্দেশের কাজ করেছিল। সেই দিশাতে পরেও অজস্র শিল্পী মাঝে মধ্যেই গণনাট্যের পতাকা তলায় বা তার বাইরে নিজেদের মতো সংগঠন করে কাজ করে গেছেন এবং যাচ্ছেন । বাংলা অসমিয়া বডো নানান ভাষা সম্প্রদায়ের মধ্যে।
           হেমাঙ্গ বিশ্বাসের শরীরের সেই পুরোনো অসুখ মাঝে মধ্যেই চাগিয়ে উঠত। চিকিৎসার জন্যে তাঁকে চিনে পাঠানো হলো ১৯৫৮তে। চিনে গিয়েও অবসরে কাল কাটাবার মানুষতো আর তিনি নন, বিপ্লবোত্তর চিনকে দেখে নেবার বুঝে নেবার সুযোগ ছাড়বেন কেন? সেই অভিজ্ঞতাগুলো লিখে পাঠালেন ‘নতুন অসমীয়া’ কাগজে অসমিয়াতে। সম্পাদক তিলক হাজারিকা সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে ছেপে গেলেন। পরে সেগুলোই সংকলিত করে প্রকাশ পায় ‘চীন চাই আহিলোঁ।’ পরে এর বাংলা সংস্করণও প্রকাশিত হয়। অসমিয়া এবং বাংলা সাহিত্যে এই ভ্রমণ কাহিনির সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম!  বিপ্লবোত্তর চিন সম্পর্কে এটি কেবল অসমিয়াতে নয়, যেকোনো ভারতীয় ভাষাতে প্রথম বই।
   
        চিন থেকে ফিরে আসার ক’দিন পরেই ১৯৬০ এর ভাষা আন্দোলন এবং পাশাপাশি ভাষা সংঘর্ষ শুরু হয়। সেই সময় তিনি ভূপেন হাজারিকাকে সঙ্গে নিয়ে নানা ভাষা সম্প্রদায় থেকে শিল্পী নিয়ে শিলং থেকে যাত্রা শুরু করেন। সেই সুরমা ভ্যালী কালচারাল স্কোয়াডের দিনগুলোতে যেন ফিরে গেলেন। কৌশলগত অবস্থান থেকে সেবারে গণনাট্যের নাম ব্যবহৃত হলো না। ‘Let us meet cultural troupe’ ছিল নতুন স্কোয়াডের নাম।  কিন্তু ইতিমধ্যে ব্রহ্মপুত্রের জল অনেক দূর বয়ে গেছে , বিদেশি সাম্রায্যবাদীদের জায়গাতে ভাতৃঘাতি রক্তপাতে উষ্ণ এবং লাল হচ্ছে জল এবং উপত্যকা। সুতরাং এবারের অভিযান ছিল অনেক বেশি সাহসী এবং ঝুঁকি পূর্ণ। কিন্তু বিখ্যাত ‘হারাধন –রংমনে’র গীতি আলেখ্য সহ আরো প্রচুর গান, কবিতা, নাটক নিয়ে দু’ই তাঁরা যেন সংগ্রামী ঐক্যের যুদ্ধ জয় করলেন। বাংলা অসমিয়াতে  ভূপেন হাজারিকার সাগর সঙ্গমে গানটিও ছিল সেই অভিযানের অন্যতম জনপ্রিয় গান।  যে দিকে গেলেন, গানের সুরেই দাঙ্গাবাজদের প্রতিহত করতে করতেই এগুলেন তাঁরা।
হেমাঙ্গ জীবনীঃ   গঙ্গা তাঁর ভক্তি
          হেমাঙ্গ চিনে যাবার আগে থেকেই স্তালিনের মৃত্যুর পর থেকে চিন-সোভিয়েত লাইনের বিতর্কে আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলন দু’ভাগে বিভাজিত হতে শুরু করে। ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদের পথে ফিরে যাবার অভিযোগ উঠছিল। এমন কি চেকোশ্লাভাকিয়া আক্রমণের মধ্যি দিয়ে সোভিয়েতের সাম্রায্যবাদী চরিত্র স্পষ্ট হয়ে বেরুচ্ছিল বলে সাম্যবাদীদের থেকেই অভিযোগ উঠতে শুরু করেছিল। ভারতেও তার অভিঘাত এসে পড়তে শুরু করেছিল, যদিও স্পষ্ট হতে সময় নিয়েছিল। আমরা জানি চিন –সোভিয়েত লাইনের বিতর্কে কমিউনিষ্ট পার্টি প্রথমে ১৯৬৪তে এবং পরে ১৯৬৭তে ত্রিধা বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯৬৮তে গড়ে উঠা সিপিএম আসলে মধ্যপন্থা একটা নিয়েছিল, তাই তাকেও ভাঙ্গনের মুখে পড়তে হয় ১৯৬৭তে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে দুটো বিদেশী দেশের তর্কে ভারতের দলগুলোর এতো উৎসাহ কেন? আর তাতে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো অসমের এই ব্যক্তিটির কী সম্পর্ক? সংক্ষেপে বলতে পারি, পুঁজিবাদ একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা । পুঁজির স্বার্থে শ্রমকে শোষনের ব্যবস্থা। সুতরাং তার বিরুদ্ধে লড়াইটাও শ্রমিকদের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। সোভিয়েতের সমর্থণে দাঁড়াবার মানে ছিল পুঁজিবাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান , আর চিনের সমর্থণে দাঁড়াবার মানে ছিল বিপ্লবের পতাকাকে তুলে ধরা। তাছাড়া চিন ভারতের মতোই ছিল এক সামন্তীয় কৃষি নির্ভর দেশ। সে দেশে বিপ্লব হয়ে গেছে ক’বছর আগে, এটি ভারতের মতো যেকোনো আধা সামন্তবাদী দেশের কাছে আলাদা এক প্রেরণা এবং শিক্ষার স্থল। পুঁজিবাদের শিক্ষা যদি বিলেতি মার্কিনিদের থেকে নেয়া যেতে পারে তবে তার বিরুদ্ধে লড়াইর দীক্ষা সোভিয়েত-চিনের মতো বিদেশের থেকে নেয়াটা দোষের হয় কেবল কুযুক্তির জোরে।
             সে যাই হোক, হেমাঙ্গের জীবিকার একটা দরকার ছিল। ১৯৫৯তে তিনি পার্টি কর্মী রুনু দত্তকে বিয়ে করেন। পরের বছর তাঁর পুত্র মৈনাকের জন্ম। ১৯৬১তে তিনি কলকাতার রুশ দূতাবাসের বার্তা বিভাগে অসম শাখার দায়িত্বের   চাকরি পেয়ে চলে যান। তাই বলে, ১৯৬৪তে তিনি সিপি আই-র সোভিয়েত লাইনে রইলেন না। এমন কি ১৯৬৭তে সিপিএমের সুবিধেবাদেও না, সিপিএম যখন গণ আন্দোলনের পথ ছেড়ে পশ্চিম বাংলাতে  রাইটার্স দখলের পথ করছে হেমাঙ্গের তখন সগর্ব উচ্চারণ, “মাথা নিচু করে রাইটার্সে যাব না!” তিনি একাই রইলেন।  নকশাল বাড়ির বিদ্রোহকেও তিনি স্বাগত জানিয়েছিলেন। ফলে  সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ যখন তাঁকে চিন সমর্থণ ত্যাগ করবার চাপ দিল, তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে  ‘ডাঃ দ্বারকানাথ কোটনিস স্মৃতিরক্ষা সমিতি’র হয়ে দ্বিতীয়বারের জন্যে চিনে যান। ডাঃ কোটনিস হচ্ছেন সেই মহান ভারতীয় যাকে জাপান চিন আক্রমণ করলে চিনা কম্যুনিষ্ট পার্টির অনুরোধে চিনা বিপ্লবীদের চিকিৎসার জন্যে পাঠান ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র বসু। ১৯৩৮এ তিনি সদলবলে সেখানে যান, এবং বিপ্লবীদের সঙ্গে মহান চিনা লং মার্চে যোগ দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে দারুণ অসুখে পড়ে ১৯৪২এর ৯ ডিসেম্বরে তিনি চিনেই মারা যান। নানকান গ্রামে বিপ্লবী শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। শুনা গেছে যে বিপ্লবীদের সেবাতে এই মহান ডাক্তার কখনোবা টানা বাহাত্তর ঘন্টা কাজ করে গেছেন। সেই পরিশ্রমই পরে তাঁর প্রাণ নেয়। সেই মহান বিপ্লবী ডাক্তারকে চিন কোনদিন ভুলেনি। সেই স্মরণীয় ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানাতেই আরো অনেকের সঙ্গে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের এই দ্বিতীয়বার চিন যাত্রা। এবারেও তাঁর ভ্রমণ কাহিনি লিখে বের করেন, ‘আকৌ চিন চাই আহিলো’। বইটি ১৯৭৭এ ছেপে বেরোয়। এবারের বইতে ষাটের              দশকের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়কার মতাদর্শগত বিতর্কের  আভাস তুলে ধরবার প্রয়াস নেন। এই নিয়েও ভারতীয় কোনো ভাষাতে এটিই প্রথম বই। অসমিয়াতেও , বাংলাতেও।  ১৯৮০তেও তৃতীয়বারের জন্যে তিনি চিন গেছিলেন। সেবারে চিন সরকারের আমন্ত্রণে।
হেমাঙ্গ জীবনীঃ   পদ্মা তাঁর  শ্রদ্ধা
           ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর ‘মাস সিঙ্গার্সে’র সঙ্গী রত্না সরকার, প্রীতি চৌধুরী, মিঠুন মুখার্জি, টুঙ্কু সরকার ও দীপক পাত্রকে সঙ্গে  নিয়ে তিনি গেছিলেন বাংলাদেশে । পুরোনো সংগ্রামী সাথি নজরুল ইসলাম খানের গোপীবাগের বাড়িতে উঠেছিলেন। তাঁর সে ভ্রমণের উদ্যোক্তাদের মধ্যে সেদেশের প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্বিক  বদরুদ্দীন উমরও ছিলেন । ছিলেন ফকির আলমগীরের মতো শিল্পীরাও। সেবারে ঢাকাতে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে গান গেয়ে গেয়ে যোগ দিয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে   ঢাকার ২৭টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জোট  'গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফ্রন্ট' হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে সংবর্ধনা দিয়েছিল । দেশ ছেড়ে আসার পর এই প্রথম এবং শেষবারের জন্যে তিনি দেখতে গিয়েছিলেন তার পৈতৃক ভিটে হবিগঞ্জের মিরাশি গ্রাম।  জয়দেবপুরে  গিয়েছিলেন কবি গোবিন্দ দাস ও কবিয়ালগুরু হরি আচার্যের ভিটে দেখতে। তিনি সেদিন গোবিন্দ দাসের একটি গান সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন ফকির আলমগীরকে , "স্বদেশ স্বদেশ করছ যারে, এদেশ তোমার নয়।”  সত্যিতো যে দেশকে বাল্যে নিজের বলে জেনেছিলেন, সেই দেশই তাঁর রইল না! তাঁর একখানা গান রয়েছে,” হবিগঞ্জের জালালি কইতর, সুনাম গঞ্জের কুড়া, সুরমানদীর গাংচিল আমি শূণ্যে দিলাম উড়া/শূণ্যে দিলাম উড়ারে ভাই যাইতে চান্দের চর/ডানা ভাইঙ্গা পড়লাম আমি কইলকাতার উপর/তোমরা আমায় চিননি/তোমরা আমায় চিননি।” তাঁকে চেনাতো সত্যি আমাদের এখনো অনেক বাকি। কলকাতা প্রবাস তাঁকে যে সুখি করতে পারেনি এওতো এই গানে বোঝাই যায়। কলকাতা সত্যি তাঁকে আজও তেমন চেনেও নি, জীবনের শেষ দিকে বোধহয় দুটো মাত্র কেসেট বেরিয়েছিল এই মহান শিল্পীর। নিজে তিনি কখনোই সেরকম প্রকাশক খোঁজে ফেরেনও নি। হবিগঞ্জের মিরাশি গ্রাম, সুরমা নদী নিশ্চয় তাঁর স্মৃতিকে ভারাতুর করে তুলত।  কিন্তু ভুলে থাকতে পারতেন না ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে তাঁর জীবনের সবচে’ উজ্জ্বল দিনগুলোকেও । সেতো তাঁর কলকাতার বাড়ির নামেই প্রকাশ-- ‘জিরণি’। আর একমাত্র কন্যার নাম রেখেছিলেন –‘রঙিলী’।
             অসমের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আমৃত্যু কখনোই বিচ্ছিন্ন হয় নি। প্রায়ই তিনি এসছেন এটা ওটা অনুষ্ঠানের বা ব্যক্তিগত উপলক্ষে। শেষ দিকে তিনি দলের বাইরে গিয়ে ‘মাস সিঙ্গার্স’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। সেই সংগঠন নিয়ে দেশে বিদেশে গেছেন, এসছেন অসমেও বহুবার।  মঘাই ওঝার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দাঁড়িয়েছিল নিতান্তই ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক। আজীবন তাঁর এবং তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে বিপদে সম্পদে।  মঘাই ওঝার মৃত্যুর পরেও নিজের বহু অর্থ কষ্ট সত্বেও নিয়মিত অর্থ সাহায্য পাঠাতেন। ‘অসম আৰু বঙ্গৰ লোক সঙ্গীত সমীক্ষা’ বইটি তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন। লিখেছিলেন, মঘাই তাঁর শিল্পী জীবনের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার।  আশির অসম আন্দোলনের দিনগুলোতেও তিনি ছুটে এসছিলেন ষাটের দিনগুলোর মতো সাংস্কৃতিক বাহিনী নিয়ে বেরুবেন বলে। কিন্তু ভূপেন হাজারিকা সেবারে সঙ্গ দিলেন না। গুয়াহাটিতে এক ট্যুরিষ্ট লজে এসে উঠেছিলেন। সেখানে যে গুটিকয় গুনমুগ্ধ এবং পুরোনো বন্ধু দেখা করতে গেছিলেন তাদের তিনি বলেছিলেন, “ যি দেখিছো অসমত যেন এখনো নিরপেক্ষ ঘৰ নাই।...ইয়ালৈ আহি দেখিছো অস্তিত্বৰ চেতনা বৰ দলৈ সোমাইছে। পৰিস্থিতি কেতিয়াও এনে হোৱা নাই। ই ভাষিক সমস্যা নহয়...মিলনৰ প্রক্রিয়া কিন্তু থানবান হৈ গৈছে। সাংস্কৃতিক ভেটি কঁপি উঠিছে, সংহতির মূলতে ভাবুকিয়ে দেখা দিছে।” ( তিলক হাজারিকা সম্পাদিত ‘বিপ্লবী গণ শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস’ বই থেকে ফটিক বরার পূর্বোক্ত গ্রন্থে ব্যবহৃত উদ্ধৃতি)
             ১৯৮২তে ‘দিশারি’ সাংস্কৃতিক সংস্থার আমন্ত্রণে তিনি গেছিলেন শিলচরে। দিশারি তখন ‘মৈত্রী উৎসব’ নামে তিনদিনের এক বার্ষিক অনুষ্ঠান নিয়মিত করত। এই ‘দিশারি’র প্রতিষ্ঠাতা অনন্ত দেবও ছিলেন আসলে পুরোনো গণনাট্য আন্দোলনের কর্মী। সেই অনুষ্ঠানে হেমাঙ্গ ছাড়াও আমন্ত্রিত হয়ে গুয়াহাটি থেকে গেছিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী দিলীপ শর্মা, গোয়াল পাড়া থেকে লোক সঙ্গীত শিল্পী প্রতিমা পাণ্ডে বরুয়া। আলোচনা চক্রে যোগ দিতে গেছিলেন অমলেন্দু গুহ। বহুদিন পরে পুরোনো বন্ধুরা সমবেত হয়েছিলেন আবারো। স্বাভাবিক ভাবেই এক আলাদা আবেশময় পরিবেশ তৈরি হয়েছিল গোটা শহরের সাংস্কৃতিক মহলে। সেকালের ‘দিশারি’র কর্মী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী শুভপ্রসাদ নন্দীমজুমদার ঠিকই লিখেছেন,  এর পরে যেন আবারো নতুন করে তাঁর ‘মাস সিঙ্গার্সে’র আদলে গণ সঙ্গীতের দল করবার ধুম উঠে গেল শহরে।   বর্তমান লেখকেও তখন জড়িয়েছিলেন ‘শান্তসেনা’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে। যাদের গণসঙ্গীতের নিজস্ব দল ছিল। সেই সংগঠনের বার্ষিক অনুষ্ঠানে একক হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান ‘জন হেনরি’র তালে তালে একক নৃত্য অনুশীলন এবং পরিবেশনের দুর্বল হলেও একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সে ১৯৮৩র কথা।
            ‘মাটি আৰু মানুহ’ নামে অসমের অন্য এক সাংস্কৃতিক  কিংবদন্তি লোকনাথ গোস্বামীর নেয়া হেমাঙ্গের এক সাক্ষাৎকার রয়েছে। লোকনাথ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন ১৯৮৬র নভেম্বরে । তখনো তিনি জানিয়েছিলেন শীত পেরুলেই তিনি অসমে আসবেন আবার। কিন্তু শরীরের  অসুস্থতা ক্রমে বেড়েই গেল। ঠিক পরের বছর ১৯৮৭র ২২ নভেম্বর হেমাঙ্গ থেমে গেলেন।  কিন্তু অসমের বাঙালি কিম্বা অসমিয়া হয়ে উঠার অর্থ যে অন্তর থেকে অর্জিত প্রতিবেশি চেতনা এই যে দীক্ষা এবং শিক্ষা তিনি তাঁর গোটা জীবন দিয়ে  গেছেন তা এতো সহজে হারিয়ে যাবার নয়।
          সিলেট থেকে  যাত্রা শুরু করে জীবনের এক উজ্জ্বল অধ্যায় অসমে যাপন করলেও বাংলা এবং অসমীয়াতে ‘গণ সঙ্গীতে’র ধারাটি প্রতিষ্ঠা পায় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের দৃঢ় সাংগঠনিক এবং তাত্বিক অবস্থানের জন্যেই। গণসঙ্গীতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, “স্বাদেশিকতার ধারা যেখানে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার মহাসাগরে গিয়ে মিলেছে, সেই মোহনায় গণসঙ্গীতের জন্ম।” শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যেমন ‘ঘরানা’, তার বিপরীতে লোক সঙ্গীতের ‘বাহিরানা’ নিয়েও তাঁর চিন্তা পরের চিন্তকদের ভাবনার দিশা দিয়েছে। সুরমা ভ্যালি কালচারাল স্কোয়াডের এবং গণনাট্যের শুরুর দিনগুলোতে তৈরি হয় তাঁর বিখ্যাত  গান ‘তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান’। তখন এবং পরের জীবনে তাঁর লেখা এবং গাওয়া   বিখ্যাত গানগুলো হলোঃশঙ্খচিলের গান,   জন হেনরীর গান,   মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য,   বাঁচব বাঁচব রে আমরা,   মশাল জ্বালো,    সেলাম চাচা,    আমি যে দেখেছি সেই দেশ,‘হবিগঞ্জের জালালী কইতর সুনামগঞ্জের কুড়া’, ‘ও সোনা বন্ধুরে’, ‘আমার মন কান্দে পদ্মার চরের লাইগ্যা’ । ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘লালন ফকির’ ইত্যাদি ছায়াছবিতে, যাত্রাপালা ‘লেনিন’এ এবং  কল্লোল, তীর, লাললণ্ঠন ইত্যাদি নাটকে সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন । ‘লাললন্ঠন’ নাটকে তিনি বিভিন্ন চিনা সুর ব্যবহার   করেছিলেন । তিনবার চিনে গিয়ে চিনা ভাষাটাও তিনি অনেক রপ্ত করেছিলেন। ফলে বেশ কিছু চিনা গান কবিতা বাংলাতে অনুবাদও করেছিলেন। এছাড়াও দেশ বিদেশের প্রচুর বিখ্যাত গানকে তিনি ওমন ভাবে বাংলাতে অনুবাদ করে জনপ্রিয় করেছিলেন যে সাধারণ শ্রোতাদের অনেকেই এগুলোকে  হেমাঙ্গের বিশুদ্ধ বাংলা বলেই জানেন এখনো। যেমন পিট সিগার কলকাতার ময়দানে এসে গেয়েছিলেন ‘উই শ্যাল অভার কাম।’ হেমাঙ্গকে তিনিই ডেকে তুললেন মঞ্চে । তিনি গাইলেন ‘আমরা করব জয়।’ এটি এর পর  নানা ভাষাতে অনুদিত হয়ে এতো জনপ্রিয় হয় যে গোটা ভারত জয় করে বসেছিল বটে, যদিও ‘মা তুমি শিগগির এসো’ কবিতার ‘ইবনদি’ এখনো ফিরে আসে নি।
            ‘সীমান্ত প্রহরী’ কবিতার বইএর এক দুর্দান্ত দীর্ঘ কবিতা এটি। শেষ হয়েছে, “ইবনদির সাথে/এই আমার শেষ সাক্ষাৎ।/মাঝরাতে হ্যাপিভ্যালির চূড়ায়/ভয়ে ভয়ে চাঁদ উঠেছিল/কুয়াশার ঘোমটা পরে।/সারারাত জেগেছিলাম আমি।/আর জেগেছিল/সুদূর খাসিয়া পুঞ্জিতে/ফুলকুমারী কাসান্থিউ।/থেকে থেকে কেঁদে উঠেছিল—/ইম্মেই ওয়ান ক্লোয়/মা, তুমি শিগগির ফিরে এসো।” অসমের এক গুরুত্বপূর্ণ কবি তপন মহন্ত লিখেছেন, “ ‘ইবনদি’ ... কি সাম্রাজ্যবাদীর নিগড়ে পিষ্ট ভারত বর্ষের প্রতীক নয়?...কবিতাটিও  এলিজি কবিতা হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। কবিতাটি শুধু বাংলায় লেখা বলেই কি প্রচারের অভাবে তলিয়ে গেল বিস্মৃতির অন্তরালে?”আমরা কথাটার একটাই মানে করতে পারি, কবিতাটি হারাবে না, হারাবেন না কবিও, শুধু দিন কাল এখনো পাল্টায় নি বিশেষ ফুরোয় নি সেই ফুলকুমারী কাসান্থিউর মায়ের পথ চেয়ে থাকা। কোথাও কি ভুল হয়েছিল? পার্টির ভুল  নাহয় হয়েইছিল,  কিন্তু হেমাঙ্গ নিজেই বা কেন ফিরে এলেন না! কেনই বা কলকাতাতে তাঁকে ‘জিরণি’ নিতে হয়েছিল? চল্লিশের দশকে সুরমাভ্যালী স্কোয়াডের যিনি মহানায়ক, ষাটের দশকে “‘Let us meet cultural troupe’ এর যিনি দুর্নিবার সংগ্রামী, আশির দশকে তিনি ‘মাস সিঙ্গার্সে’র অতিথি গায়ক কেন? ‘ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়া নয়া বাংলা গড়বার’ কিম্বা “ সমতলে লুইতের বুকে/ উদ্দাম ঝরনা হয়ে নেমে আসুক; ঝুমুর মাদল আর বিহু পেঁপায়/ পারে পারে ঐকতান তুলুকঃ /জীবনের/ সৃজনের/ স্বপ্নের/ শান্তির।” ( সীমান্তপ্রহরী) এই পংক্তিগুলোতো তাঁর নিজের ছিল, শুধু পার্টির নয়।  সেখানে, “...মিলনৰ প্রক্রিয়া কিন্তু থানবান হৈ গৈছে। সাংস্কৃতিক ভেটি কঁপি উঠিছে, সংহতির মূলতে ভাবুকিয়ে দেখা দিছে।” বলে আত্মতুষ্টি লাভের সুযোগ রয়েছে কি? যে ডানা ভেঙ্গে তিনি কলকাতার উপর গিয়ে পড়েছিলেন সেতো আমাদের সব্বার  এক স্বপ্নেরও ডানা। আর কোথাও কি কোনো ভুলচুক ছিলনা, সত্যি? বাবা ‘হরকুমার বিশ্বাস’এর  যে শ্রেণি বিশ্বাস এবং প্রতাপ তাঁকে হবিগঞ্জের বাড়ি থেকে তাড়িয়েছিল সেই ক্ষমতাই তো  তাঁকে এবং আমাদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল! তার কোনো সুরাহা  করতে হবে না? প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের  করতে হবে। হেমাঙ্গকে জেনে তাঁকে ছেড়ে এগিয়ে যেতে হবে। কেননা, আমাদের  ‘জিরণি’ এখানেই এই মাটিতেই যে গড়তে হবে, সে কথা ভুললে চলবে কেন?
তথ্যসূত্রঃ
 ১) হেমাঙ্গ বিশ্বাসঃ সাংস্কৃতিক চেতনার অমল সুবাস; ফটিক বরা; সুভাষ সুরভি প্রকাশন;ডিব্রুগড়-০৩; ২০০২।  
 ২) উজান গাঙের নাইয়াঃ হেমাঙ্গ বিশ্বাস; তপন মহন্ত; নাইন্থ কলাম’—অসমের কৃতী বাঙালি সংখ্যা; গুয়াহাটি; মে , ২০১১)
৬) হেমাঙ্গ বিশ্বাসৰ গান আৰু কবিতা; অমিয় ভূষণ চক্রবর্তী; ‘অনীক’ ফেব্রুয়ারী মার্চ, ১৯৮৮ হেমাঙ্গ বিশ্বাস স্মরণ সংখ্যাতে প্রকাশিত ‘অগ্নিখেলার সাথী’ প্রবন্ধের হরেন্র্র নাথ বরঠাকুরের করা অসমিয়া অনুবাদ; নতুন পদাতিক ; গুয়াহাটি ১ আগষ্ট, ২০০৩।
   

Sunday, 27 March 2011

।। পূর্বোত্তরের বাংলা সাহিত্য এবং বিকল্প প্রতিষ্ঠানের খোঁজ।।




       ( ৩১ মার্চ, ২০১১ গুয়াহাটির কটন কলেজের বাংলা বিভাগে  দেবার জন্যে তৈরি বক্তৃতা।লেখাটা আজ ২৪শে এপ্রিল, ১১এবং আগের রোব্বারে দৈনিক জনকণ্ঠে বেরুলো)              
   পূর্বোত্তরের বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমার অধ্যয়ন বড় বিচ্ছিন্ন। এর কোনো ধারাবাহিকতা নেই, নেই কোনো মনোযোগ। কৈশোরের সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা আমাকে শেষটায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে নানা সমাজতাত্বিক জিজ্ঞাসার সামনে। সেসব জিজ্ঞাসা আমাকে এতো ব্যস্ত করে রাখে যে সাহিত্যের অধ্যাপনাটা আমার পেশা হলেও নেশা হতে পারে নি, সাহিত্য কর্মতো নয়ই। সুতরাং সাহিত্যের তত্ব আর তথ্য নিয়ে আমার অজ্ঞতাকে আপনারা নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন। আমাকে এমন এক বিদ্বজ্জন সমাজে টেনে এনে যে সম্মান উদ্যোক্তারা দিলেন তার ভার বহন করবার যোগ্যতা আমার কতটুকু রয়েছে সেই নিয়েও আমার সন্দেহ বেশ গভীর।
                    সাহিত্য নিয়ে আমার সমাজতাত্বিক জিজ্ঞাসাগুলোও এমন বিধঘুটে যে যারা শুনেন তাঁরা বিশেষ উত্তর দিতে চান না। নতুবা ক্ষমা ঘেন্না করে দেন আর কি। সাহিত্যর বহু প্রচলিত প্রশ্ন যেগুলো ইউরোপীয় তাত্বিকেরা দশকওয়ারি হিসেবে উৎপাদন করেন, এবং আমাদের কলকাতার তাত্বিকেরা সেগুলো পরিস্রুত করে ভারতের বাজারে অথবা 'নাবাজারে' চালান দেন, সেগুলো আমার কিছু কিছু জানা আছে। কিন্তু এর কোনোটাই যে আমাদের পূর্বোত্তর ভারতের কবি-লিখিয়েদের মৌলিক সমস্যার কোনো সমাধান দিতে পেরেছে আমি দেখিনি। ব্যাপরটি আমাকে হতাশ করেছে বহুদিন। আমাদের লেখকেদের অনেক সময় পূর্বোত্তরের পশ্চাদপদতা তার জাতিগত ভেদবিভেদ নিয়ে বেশ চিন্তিত হাহাকার করতে দেখি। কিন্তু, সেই পশ্চাদপদতার জন্যে শিল্পকর্মের কোনো সমস্যা হচ্ছে এই সত্য মানতে বেশিরভাগ লেখক এক্কেবারেই নারাজ। তাঁদের কথা হচ্ছে ভালো লিখলে তার পাঠক আছে। সে লেখক হোন নগরের কিম্বা পর্বত অরণ্যের। এই ধারণা যে একেবারেই অসত্য তা হয়তো নয়, কেননা তাঁদের অনেকেরই স্বদেশ বা বিদেশে বা অন্যপ্রদেশে লেখা বেরোয়। কিন্তু, আমি যখন আমার ছাত্রদের ওদের কথা জিজ্ঞেস করি, ছাত্রেরা কিচ্ছুটি জানে না। আমি যখন আমার সহকর্মীদের তাঁদের কথা জিজ্ঞেস করি, দেখি তাঁরা জানেন না। যখন বন্ধুদের জিজ্ঞেস করি, দেখি তাঁরা জানেন না। প্রতিবেশি রাজ্যের রাজধানী যাকে লোকে বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির পীঠ বলে সেখানকার বন্ধুদের গিয়েও জিজ্ঞেস করি দেখি তাঁরা জানেন না। কেউ জানে না, কেউ চেনে না। হাত গুনা কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে। গেল দু'বছরে বাংলার প্রধান কেন্দ্রটি থেকে যারাই এই উপত্যকার নানা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এসছেন, আমি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছি এরা প্রায় প্রত্যেকে বলেছেন এখানকার লেখালেখি সম্পর্কে তাঁরা বিশেষ কিছু জানেন না। 'দেশে'র মতো কাগজ যার এই অঞ্চলে আছে এক বিশাল বাজার তার সম্পাদক শিলচরে গিয়ে অবাক হয়ে গেছেন এতো কাগজ এখানে বেরোয় দেখে, এতো লোকে এখানে লেখে দেখে। এই সংবাদগুলো আমরা সব্বাই এখানকার কাগজেই পড়েছি। মহাশ্বেতা দেবীর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে প্রণাম করতে গেলে আমাদের শ্রদ্ধেয় মাষ্টার মশাই উষারঞ্জন যেভাবে প্রত্যাখাত হয়েছেন, সেই সংবাদ 'ব্যতিক্রমে' পড়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে অপমানিত বোধ করে একা একা হজম করে চুপচাপ বসেছিলাম। কারণ মহাশ্বেতা মহান লেখিকা আর আমাদের মাষ্টার মশাই কেউ না কিচ্ছুটি না। এইতো সাধারণ্যে ধারণা ! আমার মনে আছে ইনি যখন অনুবাদ সাহিত্যে সাহিত্য একাদেমী পান তখন আমার জেলার বহু সহকর্মী বাংলার অধ্যাপকদের শুরুতে বিশ্বাসই করাতে পারিনি। ভাবখানা এই যে ছোঁড়া বলে কি! অসমের কোনো বাঙালি আবার সাহিত্য একাদেমী পায় বুঝি!
                     এই কথাগুলো যদি শিলচরে উচ্চারণ করতাম, আমি জানি এতোক্ষণে 'প্রতিষ্ঠান' বলে একটা শব্দ অনেকের মনে দানা বেঁধে খোঁচাখোঁচি করতে শুরু করত। গুয়াহাটিতে বোধহয় যতদূর জানি 'প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা'র লড়াইটা তত জোরালো নয়। যারা সেই লড়াইয়ের সৈনিক তাঁরা নিশ্চিত এই প্রশ্ন করতেন, এই সব প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন নিয়ে আমার জিজ্ঞাসার পেছনে মোহটা কিসের? এমন প্রশ্নের উত্তর দিতেও রুচি হয় না। নিজের ভাষা সাহিত্যের প্রচার প্রসার চাইতে যাওয়াটা লজ্জাটা কোথায় সেকথাটাই আজো বুঝে উঠতে পারি নি।
পূর্বোত্তর ভারত, বাকি ভারত বা বাংলাদেশের বেশ কিছু ছোট কাগজ আর অত্যন্ত ভালো কিন্তু সাধারণ্যে স্বল্প পরিচিত লেখকেরা যে পরষ্পরকে চেনেন , সে আমাদের জানা আছে। আমাদের এও জানা আছে, ভালো লেখক আর ভালো লেখার বিচার করে কোনো কাগজের সম্পাদক কিম্বা প্রতিষ্ঠান নয়, কাল, মহাকাল। কিন্তু এহ বাহ্য!
                একবার এক ছাত্রীর মুখে শুনেছিলাম, সে জীবনানন্দ দাসের উপর খুব তথ্যবহুল এক প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে বলছে, “আমরা যারা বাংলাদেশে জন্মেছি...।” 'রূপসী বাংলা'র মতো মহৎ কবিতার কবিকে খুব বেশি করে পড়বার আর আমাদের কবিকে একেবারেই না পড়বার বিপদ হচ্ছে যে আমরা আমাদের ছাত্রদের এই বোধটুকুও দিতে পারছিনা যে সে বাংলাদেশে জন্মায় নি! দেখুন বিপদ। তার পর আর আমাদের অধ্যাপনা নেশা হয়ে দাঁড়ায় কী করে! আমাদের পাঠ্যক্রমেও যে এখানকার রচনাবলী এসে ঢুকবে তার জন্যে আগে মাস্টারমশাইদের সেইসব লেখককুলের কথা জানতে হবে তো।
                       আমাদের যারা প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করবার মন্ত্রে সেই কৈশোরে দীক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁরা যে কখনো এই বিপদের দিকটা নিয়ে বিশেষ ভেবেছেন, এমনটি দেখিনি । বস্তুত তাদের নিজেদের 'প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা'র তত্ব কতটা স্বদেশী ছিল আর কতটা বিদেশী, কতটা এই প্রদেশের আর কতটা তাদের কল্পিত জন্মভূমি 'বাংলাদেশের' এই প্রশ্নও আজ তোলাই যায়। তাদের চোখের সামনে প্রতিষ্ঠান মাথা উঁচুর থেকে উঁচু করে গেছে, আর নিজেরা তাঁরা একের পর এক মাথা নত করে করে পথ ছেড়ে ছেড়ে সরে গেছেন। হেরেছেন তবু যুদ্ধ ছাড়েন নি। কোনো বিকল্প প্রতিষ্ঠান দিয়ে যার বিরোধিতা করছিলেন তাকে প্রত্যহ্বান জানাতে পারেন নি। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার কথা এলেই সাহিত্যের বামপন্থার কথা এসেই যায়। বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়া নিয়ে গোটা বিশ শতকে এই পূর্বোত্তর ভারতে প্রতিষ্ঠান বিরোধীদের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো ধ্যান ধারণা ছিল না 'সাহিত্যের' মতো কিছু ছোট ছোট ব্যতিক্রম রয়েছে। সেগুলোর সমস্ত অবদান স্বীকার করেও বলছি, সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠানের টিকিটি এরা কেউ নাড়াতে পারেন নি
                প্রতিষ্ঠান বিরোধীদের অনেকেই নিজেদের বামপন্থী পরিচয় নিয়ে গৌরব বোধ করেন। কিন্তু এদের এই অবস্থানের সঙ্গে পোস্টমডার্নদের অবস্থানের মূলগত কোনো বিরোধ নেই। পোস্টমডার্নরা যেমন বলেন ‘গ্র্যান্ডন্যারেটিভ’ আর সম্ভব নয়—এরা সেটি বলছিলেন অন্যভাষায় অন্য চিহ্ন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে। যেমন ধরুন, ‘দেশ-আনন্দবাজারে’র বিকল্প এরা দাঁড় করাচ্ছিলেন ‘লিটিলম্যাগ।’ সে আরো মারাত্মক! লিটিলম্যাগ হতেই পারে। কিন্তু সে একে আন্দোলনের আদর্শ করে ফেলাটা বড় বিভ্রান্তিকর। পশ্চিমবাংলাতে যে ঢাউস আকারের তিনচারশ টাকার লিটিল ম্যাগাজিনগুলোতে বহু পড়াশোনা করা বিদ্বজ্জনেরা লেখেন তেমন কাগজ করার সাহস করা শিলচর-গুয়াহাটি-আগরতলাতে বেশ বিপদ আছে। আর কিনে পড়তে গেলেও যে বেকার ছেলেটি ট্যুশন পড়িয়ে মাসের শেষে শ’তিনেক টাকা রোজগার করে তার বুকে লাগবে; আর খোঁজে পেতে গেলেও তাকে বেশ পড়াশোনা করা ছেলে হতে হবে। তার জন্যে সে শুধু পাকা মাইনের চাকরি পাবার স্বপ্ন দেখে দিন গুনতে পারে। কিন্তু চাইলেই পান কিনতে গিয়ে একটা ‘দেশ’ পত্রিকা কিনে বাড়ি চলে যেতে পারে। এইখানেই লিটিল মেগাজিনের ব্যর্থতা। এর আছে গোষ্ঠী চরিত্র, কোনো গণ চরিত্র আদৌ নেই। যদিও অনেকে লিটিম্যাগের সাহিত্যকেই বলেন জনতার সাহিত্য।
                   আমাদের ছেলেবেলা 'দেশ আনন্দবাজারে’র বিরুদ্ধে বাম সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আকছার গালিগালাজ শুনেছি। আজকাল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতেও আনন্দবাজার-আজকালের ব্যবসা তেমন চলে বলে মনে হয় না, বরাক উপত্যকাতেতো একেবারেই না। আজকাল গোটা অসমে বাংলা ছোটকাগজের সংখ্যা ৭৭টিরও বেশি। তথ্যটি আমি দিচ্ছি প্রবন্ধের কাগজ ‘নাইন্থ কলাম’ থেকে। পূর্বোত্তরে সংখ্যাটি ১১৮ বা তারো বেশি। এগুলো আনন্দবাজারকে ঠেলে বের করতে পারেনি। করেছে যে দশ বারোটি রঙিন চকচকে বাংলা কাগজ বেরোয় গুয়াহাটি, ডিব্রুগড়, শিলচর, করিমগঞ্জ, ধর্মনগর, আগরতলা এবং শিলং শহর থেকে—তারা । এবং সম্ভবতঃ গেল দু’বছরে গুয়াহাটি শহর থেকে ‘ব্যতিক্রম’ বা ‘অন্যদেশ’ নামের কাগজগুলো যে দুর্দণ্ড প্রতাপে আমাদের ভাবনাগুলোকে ভাষা দিতে শুরু করেছে তাতে শীঘ্রই ‘দেশ-নবকল্লোলে’র মতো কাগজগুলোও খান থেকে হয় পাততাড়ি গোটাতে শুরু করবে, নতুবা দৈনিক সকলাবেলার মতো এক পূর্বোত্তরীয় সংস্করণ বের করে টিকে থাকতে হবে। 'ব্যতিক্রম' খানকার এক বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও বটে। তেমনি নাম নিতে পারি ত্রিপুরার অক্ষর প্রকাশনীর। এই এরা সাহিত্যের জন্যে যে পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছেন, তাতে লিটিলম্যাগগুলোও বাড়ছে এতো দ্রু লয়ে। নইলে 'নগর কলকাতা''বাম'পন্থার রপ্তানী করা 'প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা 'র তত্ব এতোদিন আমাদের পথে বসিয়ে রেখেছিল। একেও তাই আমার মনে হয় আরো এক 'প্রতিষ্ঠান' যার ক্ষয় অবধারিত । আগর তলা থেকে প্রকাশিত 'কাগজের নৌকো'তে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কবি বন্ধু অমিতাভ দেব চৌধুরী গেলবছরে লিখছিলেন, “...আজকের সমাজে অনেকে নিজের প্রতিবাদী কিম্বা দায়বদ্ধ চরিত্র অটুট রাখার জন্যেই মুখিয়ে থাকেন। দায়বদ্ধতা কিম্বা প্রতিবাদও, এখানে এসে পণ্য হয়ে উঠে। হ্যাঁ, অবশ্যই ব্যক্তির ভাবমূর্তীর চাপে।” এই কথাতে আমরা আবার পরে আসছি।
                 এই যে স্থান-কাল পাল্টালে শব্দগুলোর মানের বদল ঘটে যাচ্ছে, বা কিছু মানেকে সচেতনভাবে রক্ষা করা কিম্বা অন্তর্ঘাত করবার প্রয়াস হচ্ছে একে নাম দিতে পারি 'চিহ্নায়ন' প্রক্রিয়া। কথাগুলো বললেই 'আধুনিকোত্তরবাদে'র কথা মনে পড়ে যায়। আমরা যে এক ক্রম সম্প্রসারণমান আবিচ্ছিন্ন অথচ বিশৃঙ্খল বিশ্বে বাস করি--এ নিয়ে কোনো সংশয় থাকা উচিৎ নয়, একে শুধু বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। ব্যাপারটা এখন ইন্টারনেটের যুগে অনেক প্রত্যক্ষ। তাই ফরাসী বা বিলেতিরা আধুনিকোত্তরবাদের জন্ম দিয়েছে আর বলছে এখন আর কোনো 'মহা আখ্যান' গড়ে তোলা সম্ভব নয়।আমাদের আগেকার 'প্রতিষ্ঠান বিরোধী'রা তাতে চোখে চড়ক গাছ দেখছেন আর সউৎসাহে সে দলে যোগ দিয়েছেন বা দিচ্ছেন।
               কিন্তু, আমার নিজের প্রায়ই সগৌরবে মনে হয়, আমরাতো এখনো 'রামায়ণে'র যুগে বাস করি। রবীন্দ্রনাথ আমাদের 'মহাআখ্যান'--কবে ফুরোবেন কেউ জানি না। দেরিদা-ফুকো--লাকারা ফুরিয়ে যাবেন। আমরা সাহিত্যের ইতিহাস পড়ি। কিন্তু, যদি শুধু 'রামায়ণে'র কিম্বা 'কোরানে'র কিম্বা তথাকথিত মধ্যযুগের 'চন্ডীমঙ্গলে'র ইতিহাস ভালো করে পড়তে পারতাম --কী করে সেগুলো রূপান্তরিত, পুনঃসৃজিত হচ্ছে, কারা পড়ছেন, দেখছেন শুনছেন এবং কোথায় কোন কোন ভাষাতে--তবে চিহ্ন বিজ্ঞানের জনক আমরা হতে পারতাম। হইনি, তার কারণ 'বিলেত' বলে যে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে সে আবার 'নগর কলকাতা'র ঘাড়টিকে জন্ম থেকেই বাঁকা করে রেখে দিয়েছে। আর নগর কলকাতা আমাদের দিয়েছে অনেক বটে, কিন্তু দিয়ে দিয়ে ভিখিরি আর ছিন্নমূল করে ছেড়েছে । বিলেতি ভাষাতে কোট না করলে আমাদের পান্ডিত্য সিদ্ধ হয় না।
                     আধুনিকোত্তরবাদিরা অনিশ্চয়তাবাদের কথা বলেন, বলেন বিশৃঙ্খলার কথা। তারা এন্ট্রপির কথা পড়েছেন। আমরাও পড়েছি। কিন্তু জলের তাপ শূন্য ডিগ্রীতে নামিয়ে আনলে যে সে বরফ হয়ে যায় এবং সেই বরফে বিলেতেরও উত্তরের মহাদেশের কেউ কেউ ঘর বানিয়েও বসত করেন--সে তথ্যও দিব্বি চেপে গেছেন। শৃঙ্খলা বিশৃঙ্খল বিশ্বের একটি অন্তর্লীন সত্য। আর তাই কেবল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা কিম্বা 'মহাআখ্যানে'র  বিরোধিতা কোনো সম্পূর্ণ তত্বই নয়। 'বিকল্প প্রতিষ্ঠান' একটি চিরন্তন এবং ঐতিহাসিক সম্ভাবনা । ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে তার সম্ভাবনা ছিল, আছে এবং থাকবে।
                   আর বিকল্প প্রতিষ্ঠানের কথা বললেই আমাদের পূর্বোত্তর ভারতের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের কথা পাড়তেই হয়। কেন? সেরকম প্রশ্নের উত্তরে গেল এক দশকে বহু জায়গাতে বহু কথা লেখা হয়ে গেছে। যেমন সম্প্রতি প্রকাশিত 'নাইন্থ কলামে''অসমের বাংলা কবিতা' সংকলনের মুখবন্ধে সম্পাদকেরা লিখছেন, “ বাংলার 'সাংস্কৃতিক উত্তাপকেন্দ্র' থেকে দূরবর্তী এই অঞ্চলে কাব্যচর্চার ভুবন পল্লবিত হয়েছে নিজস্ব ধারায়। গড়ে উঠেছে বাংলা কাব্যের ভিন্ন এক প্রেক্ষিত। এই কাব্যধারা নিজস্ব চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র” তাই আমাদের বন্ধু অভিজিৎ চক্রবর্তীতো তাঁর সম্পাদিত কাগজের নামই দিয়ে রেখেছেন, “কবিতার পূর্বোত্তর”। বর্তমান লেখক, সেখানেও চিঠির আকারে আর অন্যত্র নিবন্ধের আকারে এই নিয়ে আগেও লেখা লেখি করেছি। আমাদের সেই সন্মিলিত প্রয়াসকে অমিতাভ ভাষা দিয়েছেন এভাবে। 'কাগজের নৌকো'তে সেই পূর্বোক্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “...একটা বয়স পর্যন্ত আমি কলকাতার ছিলাম, আমার সমস্ত ভাব-পৃথিবী কলকাতা-কেন্দ্রিক ছিল। তারপর একটা সময় এল জীবনে যখন বুঝতে পারলাম, আমি ঠিক কলকাতার নয় বা আমার থাকা-না থাকার ওপর কলকাতা কিছুই যায় আসে না। ততদিনে ত্রিপুরার শ্যামল ভট্টাচার্য, পল্লব ভট্টাচার্য ও প্রবুব্ধ সুন্দর কর, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সঞ্জয় চক্রবর্তী ও অভিজিৎ চক্রবর্তী, শিলচর থেকে তিনসুকিয়ায় নতুন তাঁবু গেঁড়ে বসা সুশান্ত কর সবাই উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সাহিত্য নামক এক ধারণাকে হাতের কড়ির শেষদান হিসেবে আঁকড়ে ধরেছে। আমার ধারণা তাদের সঙ্গে মিলে গেল। আমরা একটা জায়গায় এক হয়ে গেলাম। এর আগে দেবাশিষ তরফদার—যাঁর বেড়ে উঠা কেবল মাত্র বরাক উপত্যকা কেন্দ্রিক ছিল না, -অস্পষ্টভাবে হলেও, এই উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সাহিত্যের দিকে এক অঙ্গুলি নির্দেশ করেছিলেন। আমাদের বাস্তবতা যে বাঙালির অপরাপর ভুবনগুলির থেকে আলাদা,...এই কথাটা সম্ভবত দেবাশিস তরফদারই প্রথম পয়েণ্ট আউট করেছিলেন। পরে দেখা গেল এই বিষয়টি নিয়ে আমরা অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় থেকেও, একই রকম ভাবছি।” 'অসীমান্তিক' গল্পের সংকলন যারা পড়েছেন তাঁরা জানেন ওখানে হাসান আজিজুল হকের উচ্চারণ আরো তীক্ষ্ণ আর ধারালো, “বলতে পারি, আবেগে আক্ষেপে সংক্ষেপে আর্তনাদ করে জানাতে পারি, কোনো বিভাজন মেনে নেয়া হবে না, কোনো বিভাজনই প্রকৃত নয়। কিন্তু সত্য হলো বিভাজন ঘটে গেছে। … সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক বিভাজন কার্যকর নয় একথা ভাবালুতা-আশ্রয়ী খানিকটা সত্য হলেও শেষ পর্যন্ত কিন্তু সত্য নয়। অভ্যাস মাফিক আবেগ মাখা ঐক্যের কথা বলা হয়, সঙ্গে সঙ্গে আবার ধরাছোঁয়া বাঁচিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের স্বতন্ত্র ইতিহাস সুরচিত হচ্ছে দেখতে পাচ্ছি। ১৯৪৭ সালে পৌঁছেই নিজের নিজের ঘর দেখা দিচ্ছে, আলাদা হয়ে যাচ্ছে হেঁসেল। বাংলাদেশ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতা মেনে নেয়া হয় তারপর থেকে তার নিজের ইতিহাস শুরু করে। উত্তরপূর্ব ভারতের বাংলাভাষা চর্চা বা সাহিত্য-ফসল আলাদা করে চোখে পড়েনি, যেন তার অস্তিত্বই নেই, যা বা যেটুকু আছে তা বুঝি পশ্চিম বঙ্গের সাহিত্যের সঙ্গে মিশে গেছে। পরিতাপ করি আর ক্ষোভ জানাই পরিস্থিতি কিন্তু এই রকম।”
                        আজ সে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে? কী রকম? পশ্চিম বাংলা কি আমাদের স্বীকার করে নিতে শুরু করেছে? না, বাংলাদেশ? এরকম প্রশ্ন কেউ করে ফেললে বুঝব, আমার বক্তব্যের কোনোটাই আমি তুলে ধরতে পারিনি। হ্যাঁ, ওখানকার দুএকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সাহিত্য পাঠ্যক্রমে ঢুকেছে। কিন্তু তাতে সার্বিক হালচাল কিছু পাল্টায় নি পাল্টাবেও না। পাল্টেছে, আমাদের এখানে, এই মাটিতে। দৈনিক কাগজগুলোর কথাতো আগেই বললাম। এবার তাকান টিভির দিকে। নব্বুইয়ের দশকের প্রথম বছরগুলোতে বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে যখন উপগ্রহ চ্যানেলগুলো এসছিল স্টার টিভি, এম টিভি দিয়ে ওরা যাত্রা শুরু করেছিল। পন্ডিতেরা বলছিলেন এসব বিশ্বায়নের উপরিকাঠামো গঠনের ষঢ়যন্ত্র। পশ্চিমের সংস্কৃতি আমাদের দেশজ সংস্কৃতির বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দেবে। হয়তো, খানিকটা তাতে সত্য ছিল। কিন্তু, ঘটনা কী চেহারায় এগুলো? সেই আদ্যিকালের ইংরেজি চ্যানেলগুলো প্রান্তে চলে গেল। আমরা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে বসেও একসময় কলকাতার বাংলা চ্যানেলগুলো দেখতে পেলাম। এভাবে বাংলার মূলস্রোতের সঙ্গে আমরা পরিচিত হলাম। যে অসমে এক সময় ভাষার জন্যে প্রাণ দিতে হয়েছে, সেখানে কিছু চ্যানেল বাংলা এবং বডোতো বটেই সাদ্রি, ডিমাসার মতো ছোট ছোট এবং কোত্থাও মর্যাদা না পাওয়া ভাষাগুলোতে চব্বিশঘন্টা ধরে সংবাদ অনুষ্ঠানাদি প্রচার শুরু করল। এমন ঘটনা নগর কলকাতাতেও কেউ কল্পনা করতে পারে না। ছোট ছোট শহরে গড়ে উঠা চ্যানেল এখন নগর কলকাতা যাদের ভুলে গেছিল--সেই অসমের বাঙালিদের আত্মপ্রকাশের এক একটা মঞ্চ দিয়ে দিল। স্রষ্টা আর ভোক্তার তফাৎ এতোটাই ঘুচে গেল যে আমাদের শহরগুলো থেকে গোটা ভারতে দেখা গেল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর দেবজিৎ, অভিজ্ঞান, অমিত, সপ্তপর্ণাদেরও মুখ। হয়তো, সুমন নচিকেতা, লোপামূদ্রাদের সামনে এরা এখনো ধূমকেতু, কিন্তু এইতো সবে শুরু। এই চেনেলগুলো সাহিত্যের তেমন উপকার প্রত্যক্ষভাবে করেনি বটে, কিন্তু ভাষার ব্যবহারের মধ্যি দিয়ে এগুলো যে আমাদের মেধাগুলোর আত্মবিশ্বাস বাড়াবার একটা ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে সেটিকে অস্বীকার করা যাবে কী করে? তিনসুকিয়ার মতো শহরে বাংলা কাগজ , বই উন্মোচিত হচ্ছে টিভি স্টুডিওতে বসে এমন সরাসরি অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে।
                  জ্ঞান অর্জনের পথে শ্রব্য-দৃশ্যমাধ্যমগুলোর ভূমিকাকে আমরা কোনো স্বীকৃতি দিতে এখনো কুন্ঠিত। অথচ এরাই আমাদের মতো প্রান্তিক অবস্থানে আর ভাষিক আধিপত্যের চাপের তলাতে থাকা মানুষগুলোর জন্যে পথের নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে সে কথা যেন আমরা বুঝেও বুঝে উঠতে চাইনা। বই সম্পর্কে এক জনপ্রিয় কথাকে সংস্কারের মতো গড়ে উঠতে দেয়া হয়েছে, বইয়ের মতো বন্ধু বুঝি আর নেই। খুব ভালো কথা। কিন্তু সেই বন্ধুটিকে কাছে পেতে যে আমাদের কতটা ঘানি ঠেলতে হয় সে নিয়ে কিন্তু মনে মনে আমরা সবাই জানি। আমরা কি জানি, যে এই ভারতে কলকাতাতে যেখানে প্রথম ছাপা বই বেরুচ্ছিল সেখানে বইকেও একটা সময় লোকে খুব ভালো চোখে নেয় নি? মনে করা হচ্ছিল এবারে আর জাত ধর্ম বলে কিছু থাকবে না। এমনও হয়েছিল,যে কেউ কেউ বই ছেপে আত্মরক্ষার জন্যে এই মিথ্যেটা প্রচ্ছদে লিখেও দিচ্ছেন যে, এই গ্রন্থের কালি গঙ্গাজলে শোধন করা হইয়াছে। তারপর থেকে আমাদের সন্মিলিত ধারণা প্রায় এরকম যে জ্ঞান মাত্রেই থাকে বইএর দুই মলাটের ভেতরে সংগঠিত -সুসংবদ্ধ। যত পড়া যায়, তত জানা যায়। শুনেও যে জ্ঞান বাড়াবার একটা প্রাক-ছাপাখানা প্রাচীন রামায়ণী ঐতিহ্য আমাদের ছিল সেই তথ্য আমরা এক্কেবারেই ভুলে গেলাম। যদিও মাস্টার মশাইদের কথা শোনা আর সেই সঙ্গে বেতের বাড়ির ঐতিহ্য আমাদের এখনো আছে বহাল তবিয়তে। তাছাড়া শুনে-দেখে-পড়ে আমাদের জ্ঞান বাড়ে আর কৈ। আমরা তো সংগৃহীত করি কিছু বিশৃঙ্খল তথ্য মাত্র। সেগুলো শৃঙ্খলিত জ্ঞানে পরিণত হয় শুধু আমাদের কাজের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। যার যত বড় কাজ তাঁর তত বড় জ্ঞান।
                    সেই বিশৃঙ্খল তথ্য বিশ্বের এক আধুনিকতম আধার হচ্ছে ইন্টারনেট। টিভির থেকেও বড়। তাকে নইলে টিভিরও চলে না। যাদবপুরের মতো প্রযুক্তিবিদ্যার কেন্দ্রে গিয়েও দেখেছি ওখানকার অধ্যাপকেরা কম্পিউটারে বাংলা লেখেন শুধু পাওয়ার পয়েন্টে স্লাইডশো দেখাতে। আমাদের অধ্যাপকেরা অতি অল্পই এখনো এর বেশি এগুতে পেরেছেন আমারা এখনো ইংরেজি হরফে বাংলা লিখতে বেশ স্বচ্ছন্দ বোধ করি। যখন কিনা যুগ এতোটাই এগিয়ে গেছে যে আপনি করতে পারেন ঠিক উলটো। বাংলা হরফে ইংরেজি লিখে দূর দেশের বন্ধুকে মুহূর্তের পাঠাতে পারেন বার্তা। উত্তরভারতের হিন্দিভাষিরাও কেউ আজকাল ইংরেজি হরফে হিন্দি লেখেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। এতো ভুরি ভুরি হিন্দি সাইট আর ব্যক্তিগত ব্লগ রয়েছে যে সে এক সমূদ্র। কিন্তু বাংলাভাষাতে বাংলাদেশ ভারত থেকে এগিয়ে গেছে বহু বহু দূর। সেদেশে এখন দ্বিতী এক ভাষা আন্দোলন চলছে দ্রুত গতিতে। আর তার নেতা হচ্ছেন তরুণ মেহেদি হাসান খান।
                       কম্পিউটার বুঝি ইংরেজি ছাড়া কিছু বোঝে না, এই এক ঔপনিবেশিক বোধ হলো অন্যতম কারণ যে গেল দুই দশকে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে গোটা দেশ ছেয়ে গেছে। পন্ডিতেরা আশংকা করছেন আরো দশক দুই পর বাংলা সহ ভারতীয় ভাষাগুলোর অস্তিত্ব থাকবে কি না। এই যে আতঙ্কের পরিবেশটা তৈরি হয়েছে এর কারণ কিন্তু কম্পিউটার নয়, আপনারা মানুন বা নাই মানুন কালি-কাগজ , ছাপা বই এবং সেগুলোর থেকে উদ্গত রাজনীতি ভাষারাজনীতি । ছাপা বইয়ের আগে, উপভাষা মান্যভাষার তর্কটাও ছিল না। বইএর দরকারে ঐ তর্কটা সামনে এলো, উপভাষাগুলো চলে গেল প্রান্তে। কিন্তু সেই তর্কটা ওখানে থেমে গেলনা কিন্তু, এলো জাতীয় ভাষা রাষ্ট্র ভাষা রাজ্যভাষার তর্ক। এর মধ্যে ব্যয়সংকোচ, সুগমপ্রবেশের যুক্তিগুলো ছিল। কিন্তু আগেকার দিনে যেমন সংস্কৃত ছাড়া সাহিত্য চর্চা হবে না, বামুন ছাড়া কেউ পড়বে না, এমন যুক্তি ছিল, আধিপত্যের সেই রাজনীতিই কিন্তু ভাষা পেয়ে গেল ঐ মান্যভাষা-জাতীয়ভাষার তর্কে। বাকি ভাষাগুলো চলে গেল প্রান্তে, বিলীন হবে নাতো কি মুক্ত আকাশে সুনীল হবে? ইন্টারনেট সেই প্রান্তের ভাষাগুলোকে আবার নিয়ে আসছে চিহ্নপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রে। সামনের সারিতে। বন্দী ভাষাকে করছে মুক্ত। অভ্রের স্লোগানই হচ্ছে 'ভাষা হোক উন্মুক্ত!' অচিরেই ভাষা রাজনীতির চেহারাটাকে ইন্টারনেট আর কম্পিউটার দেবে পালটে।
                  ২০০৯ সনে অক্টোবরে ইণ্টারনেট কোরপোরেশন ফর এসাইন্ড নেমস এন্ড নাম্বারস ( আই সি এ এন এন) বলে একটি প্রতিষ্ঠান, যাদের সদর দপ্তর সিওলে--তারা ইন্টারনেটের চল্লিশ বছরের ইতিহাসে এক যুগান্তরকারী ঘটনা ঘটিয়েছেন। এতে তারা আশা করছেন, ইন্টারনেটের সত্যিকার আন্তর্জাতিকীকরণ ঘটবে। তাঁরা লাতিন কোডিং ব্যবস্থাকেই পালটে দেবার কাজ সম্পূর্ণ করেছেন। 'ইংরেজিতে শুধু বিশ্বময় ছড়ানো যাবে'---এতোদিনকার এই লালিত বিশ্বাসকেই তাঁরা ধ্বসিয়ে দিয়েছেন। কোনো রাষ্ট্র চাইলেই তারা সে ব্যবস্থাটি সে দেশকে দিচ্ছেন ভারত সরকার ইতিমধ্যে সে আবেদন করেছেন এবং পূর্ণদ্যোমে কাজও শুরু করে দিয়েছেন। ইন্টারনেটের সমস্ত বিষয়কে ভারতীয় ভাষাগুলোতে অনুবাদের ব্যবস্থা করবার কাজ এগুচ্ছে। ছোট ছোট কিছু ভাষাতে তা সম্পূর্ণও হয়ে গেছে। তার সমান্তরালে আরো বেশ কিছু কাজ এগুচ্ছে। লিনাক্সের ভারতীয় ভাষাগুলোর সংস্করণ বহুদিন হলো বেরিয়ে গেছে।'ফায়ারফক্স' ব্রাউজারেরও তাইগোগল অনেক ভারতীয় ভাষা লেখা পড়ার সফটওয়ার ছেড়েছে বহুদিন হলো। এগুলো যে কেউ পেতে এবং ব্যবহার করতে পারেন বিনামূল্যে। ইংরেজিতে আর ব্যবসা এগুবে না জেনে মাইক্রোসফট সেভেন এবং উইন্ডো সেভেনও এখন বাঙালি -অসমিয়া হয়ে গেছে। এগুলো যখন হচ্ছিল না বা হয় নি তখনই অনেকগুলো ইউনিকোড ব্যবস্থা এসে গেছিল ভারতীয় ভাষাগুলো লেখা পড়ার জন্যে। একা 'বারাহা'দিয়ে আপনি ভারতের যে কোনো ভাষা লিখতে ও পড়তে পারেন। কিন্তু বাংলা, অসমিয়া, মণিপুরি লিখবার জন্যে অভ্র তার থেকেও আকর্ষণীয়। ব্যবহার বান্ধব এই সফটওয়ার নির্মাতা মেহেদি হাসান  খান এক বাংলাদেশী তরুণ। শুধু ভাষার জন্যে কম্পিউটার ব্যবহার করবার স্বার্থে বাংলাদেশের সফটওয়ার প্রযুক্তি যে কী দ্রুত হারে বাড়ছে-- না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। লিনাক্সের বাঙালি পরামর্শদাতারা প্রায় সব্বাই বাংলাদেশের লোক। কম্প্যুটারকে তারা বাঙালি করে ছেড়েছেনতো বটেই--তাদের সুবাদে বিশ্বময় ছড়িয়ে যাবার স্বাধীনতা পেয়ে গেছে অসমিয়া, মণিপুরি, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, হাজং, চাকমাদের মাতৃভাষা। রাজবংশীর মতো ভাষাকে বাংলা কিম্বা অসমিয়া বলে আটকে রাখবার দিন ফুরোলো বলে।
            কী হয়, সেই ভাষা দিয়ে? যাদের আমাদের সৃজনী চিন্তার ভাষা বাংলা কিন্তু কম্প্যুটারে সেটির ব্যবহার জানা নেই, তাদের ধারণা মেইল করা , ইংরেজি হরফে চ্যাট করা, অরকুটে, ফেসবুকে বন্ধু বাড়ানো ছাড়া আর কিছু ওয়েব সাইট খোঁজে বেড়ানোই এর কাজ। আসলে কম্প্যুটার তথা ইন্টারনেট এখন আপনার সিনেমা-থিয়েটার হল, সঙ্গীত মঞ্চ, রেডিও, লেখার ঘর, পড়ার ঘর, লাইব্রেরী, বইয়ের দোকান, বাজার , স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়। আপনি যদি ব্লগ লিখতে পারেন তবে সেখানে আপনি লেখক সম্পাদক প্রশাসক সবটাই।
           আপনার এই আক্ষেপ করবার কোনো দরকারই নেই যে আমরা এই পূর্বোত্তরের মানুষেরতো আর এতো সাধ্যি নেই যে আমরা আরেকটা কলেজস্ট্রীট গড়ে তুলব। কলেজ স্ট্রীট এতো দ্রুত আপনাকে ঢাকা কিম্বা টোকিওর পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে না, যতটা পারে ইন্টারনেট। ফলে যে নগর কলকাতা এতোদিন শুধু লিখত বাকি বাংলা পড়ত, নগর কলকাতা গাইত বাকি বৃহত্তর বাংলা শুনত, নগর কলকাতা অভিনয় করত বাকি বাংলা তা দেখতো--বৌদ্ধিক আধিপত্যের এই সমীকরণ যাচ্ছে উলটে। হাজার পৃষ্ঠার চারশ টাকার লিটিল ম্যাগ শুধু বুদ্ধিজীবিদের জন্যে প্রকাশ করেও যারা প্রতিষ্ঠান  বিরোধিতার বড়াই করেন বা করতেন তাদের দিকে চোখটি না ফেলে গট গট করে বিশ্বজয়ের পতাকা উড়িয়ে দিচ্ছে 'উড়ালপুল', 'খোয়াব', 'সৃষ্টি', 'কৌরব', 'গুরুচন্ডালী', 'ইচ্ছামতি', 'কঁচিকাচা', 'কর্ণিকা', 'দ্রোহ', 'অলসদুপুর' 'বাঙালনামা' মতো ওয়েব কাগজগুলো। আপনি বিনে পয়সায় পড়তে পারেন। শুনতেও পারেন, কেননা অনেকেই সেখানে সঙ্গীত বক্তৃতাও তুলে দিচ্ছেন, নিজেদের লেখালেখির সঙ্গে। এই ভাবেই পুরোনো সেই পটের কথা আর ওঝাপালার ঐতিহ্যকে নিয়ে এসছেন ফিরিয়ে। কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই বটে, থাকবে কী করে? সেতো এখন ওয়েব ম্যাগাজিন হয়ে গেছে। রোজ লেখা বেরুচ্ছে। রোজ পড়া হচ্ছে--সেই আড্ডায় যোগ দিচ্ছে তিনসুকিয়া থেকে তিউনেশিয়ার বাঙালি। পশ্চিমবাংলাথেকে নিয়ন্ত্রিত হয় তেমনি আরেক আড্ডার নাম 'লোটা কম্বল'; বাংলাদেশে আছে 'সচলয়াতন', সামহোয়ার ইন, মুক্তমনা, প্রথম আলো, চতুর্মাত্রিক, আমার ব্লগ'আমার ব্লগে' আপনার লেখা পছন্দ না হলে 'বাঙাল ভাষা'তে পাঠক আপনাকে গালিও দিতে পারে। আর 'মুক্তমনা' পড়লে তসলিমা নাসরিণকে নিয়ে আনন্দবাজারীয় নাটকটা আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। সে নাটকের দিন ফুরোলো। সবই এখন 'মুক্তমনা'। কোনো কিছু আর গোপন নেই। বেড়া নেই কোনো।
             রবীন্দ্রনাথের দেড়শত বছরের সবচাইতে সেরা অর্জন যদি আমাদের কিছু থেকে থাকে তবে এই যে তাঁর লেখার প্রায় সবটাই এখন মেলে ইন্টারনেটে। এতো ঢাউস রচনাবলী আপনি কিনবেন কী করে, রাখবেন কই, সেনিয়ে সামান্যও মাথাব্যথা না ঘটিয়ে আপনি খোঁজে নিন ইণ্টারনেটে। যেখানে থাকুন যেভাবে থাকুন , নেট আছে তো রবীন্দ্রনাথ আপনার সঙ্গে আছেন
              ব্লগ লিখতে যদি আপনার আগ্রহ জন্মায়, অথচ না জানেন কী করে কী করতে হয়--আপনাকে পরামর্শ দেবার জন্যে রয়েছে 'বাংলাহ্যাক্স', 'টেকটনিক্স', 'আমার প্রযুক্তি     ' এমন আরো অনেক। বাংলা লিখতে আপনি কি বানান ভুল করেন? দেখে নেবার জন্যে সংসদের অভিধান সহ আছে প্রচুর একভাষিক দ্বিভাষিক অভিধান।
            এই বিশাল যজ্ঞশালাতে অসম তথা পূর্বোত্তরের জায়গাটা কোথায়? সত্য বলতে প্রায় শূণ্য। আমাদের বরাক উপত্যকার বন্ধুরা ভাষা নিয়ে খুব আবেগিক। কিন্তু আমার হাসি পায় যখন দেখি, ওরা সেই আবেগের কান্নাকাটিটা করেন ইংরেজি হরফে। যে দুএকটা ইংরেজি সাইট আছে শিলচর শহরের সেগুলোতে আপনি প্রেমিক প্রেমিকার সন্ধান পেয়ে যেতে পারেন, প্রেমের বাংলা কবিতার সন্ধান পাবেন না। অথচ, ওখানে বাংলা লেখার জন্যে কেউ আপনাকে জেলেও পুরবে না, আঙুল মটকাবে না, কলম কেড়ে নেবার ভয়টাও এক্কেবারেই নেই। কী মজা দেখুন, ফেসবুক যখন বিখ্যাত হয়ে গেল মিশরের বিপ্লবের অনুঘটকের কাজ করে , আমাদের শিলচরে তখন সে কুখ্যাত হয়ে গেল এক প্রেমিকের প্রেমিকা হত্যার প্রয়াসের জন্যে! আমাদের মেজাজ আর মানসিকতাটাকে চিনে নেয়া্টা তাই জরুরি।
         পূর্বোত্তর ভারতে প্রথম ইউনিকোড সম্পদ অসমিয়া ভাষার 'অভিধান' 'শব্দ' । ২০০৬ সনে আবুধাবীতে কর্মরত প্রবাসী অভিযন্তা বিক্রম মজিন্দার বরুয়া তাঁর আরো দুই বন্ধুকে নিয়ে সেটি শুরু করেন। পরে সেটি পূর্বত্তরের প্রায় সব ভাষার অভিধানে পরিণত হয়। গেল বছর থেকে এতে বাংলা, হিন্দি, নেপালিও ঢুকে গেছে। পূর্বোত্তরের ভাষাগুলোর এক তুলনামূলক অধ্যয়নের দুর্দান্ত আকরে পরিণত হচ্ছে এই অভিধানটি। ইতিমধ্যে তাতে ৩৫০০০ এর বেশি অসমিয়া শব্দ এসে গেছে। বিক্রমেরা বিহু ডট ইন বলে একটা সন্মিলিত ব্লগও চালাতেন। কিন্তু তাতে তাঁরা লিখতেন খুব কম, লিখলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লিখতেন ইংরেজিতে।
    গেল বছর জানুয়ারীতে ফ্রেন্ডস অব আসাম এন্ড সেভেন সিসটার্স সংক্ষেপে 'ফাস' আয়োজিত প্রবাসী পূর্বত্তরীয়দের সম্মেলন 'নেইমস ২০১০' পাশাপাশি 'শব্দে'র এক সভা বসে গুয়াহাটিতে। সেখানে আলাপ শুরু হয়েছিল 'শব্দে' সক্রিয় কর্মী বাড়াবার সমস্যা নিয়ে। সেখানেই ঠিক হয়, বন্ধুদের নিজেদের মাতৃভাষাতে ব্লগ লিখতে উৎসাহিত করতে পারলেই একটা অভিধানের দরকার বাড়বে। বাড়বে স্বেচ্ছাসেবী কর্মী। তার পর দীর্ঘ ছ'মাস নেদারল্যন্ড প্রবাসী অসমীয়া লেখক সমাজকর্মী ওয়াহিদ সালেহ, এবছর যিনি প্রবাসী ভারতীয় সম্মানে ভূষিত হলেন , তাঁর নেতৃত্বে এক জিমেলগ্রুপে আলোচনা চলে কী করে অসমিয়া উপকরণ নেটে বাড়ানো যায়। এই আন্দোলনের শেষে গড়ে উঠল একটা সাইট যার নাম '-জোনাকি' যুগ, ফেসবুক গ্রুপ যার নাম 'অসমীয়াত কথা বতরা' তাতে লাভ হয়েছে এই যে এখন শব্দের প্রায় প্রত্যেকের একটি করে সুদৃশ্য অসমীয়া ব্লগ আছে। 'সুগন্ধী পখিলা', 'শতদল', আমি অসমীয়া, 'খার নোখোয়ার কলম' 'জালপঞ্জী', জীবনর বাটত, 'মই আরু মোর পৃথিবী' ইত্যাদি আরো অনেক। এর মধ্যে দিল্লী প্রবাসী হিমজ্যোতি তালুকদারের 'মই আরু মোর পৃথিবী' এবং যামিনি অনুরাগের শুরু করা সন্মিলিত ব্লগ 'সুগন্ধী পখিলা' সবচে জনপ্রিয় আর সুশোভিত ব্লগ। এনাজরি ডট কম বলে একটি অসমীয়া সাহিত্য সম্ভার গেল বছর থেকে যাত্রা শুরু করলেও এরা প্রথমে লেখাগুলো হয় দিত ছবির আধারে, নতুবা ইংরেজিতে। '-জোনাকি' যুগের প্রভাবে এরাও এখন সরাসরিই ইউনিকোড ব্যবহার করেন। অরিন্দম চৌধুরীর সম্পাদিত কাগজ দ্য সানডে ইন্ডিয়ানের বাংলা ওয়েব সংস্করণ ছিলই,এখন অসমিয়া সংস্করণ এসে গেছে। বাংলাতেও আর কোনো কাগজ ইউনিকোড ব্যবহার করে বলে আমরা জানিনা। আনন্দবাজার রয়েছে। কিন্তু ওদের ব্যবস্থাটি এতো আত্মকেন্দ্রিক এবং জটিল যে সাধারণ মানুষ পড়বার ঝক্কি নেন বলে মনে হয় না। আরেকটি সুখবরতো না দিলেই নয় ,যে গুয়াহাটির এক তরুণ  বনজিৎ পাঠক গেল ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে 'কুঁহিপাত'নামে একটি অসমিয়া ফন্ট নির্মাণ করে মুক্তকরে দিয়েছেন। এবারে তিনি সেটি যাতে বাংলা, মণিপুরি, হাজং, চাকমা লিখতেও ব্যবহার করা যায় তার উপর কাজ করছেন।
                          অসমের প্রায় প্রতিটি বাংলা অসমীয়া দৈনিকের ওয়েবসাইট রয়েছে। কিন্তু তারা পৃষ্ঠাগুলো তোলেন ছবির আধারে, ইউনিকোডে নয়। আর পরের দিন বা পরের সপ্তাহেই স্থানসংকুলানের জন্যে সেগুলো সরিয়ে ফেলেন। সংরক্ষিত হয় না। তার মানে , প্রায়োগিক দিক থেকে তাঁরা এখনো পিছিয়েই আছেন। এটি কতটা তাদের সাধ আর কতটা সাধ্যির জন্যে হচ্ছে সে নিয়ে প্রশ্ন করাই যায়। যে দু'একটা বাংলা সাহিত্যের ওয়েবসাইট রয়েছে বিষয়গুলো কোনোটারই হয় ইউনিকোডে নেই অথবা অন্যকে দিয়ে ছবির আধারে তৈরি , নিত্য নবীকরণ করবার কেউ নেই। সুতরাং এখন আর খোলে না। শিলচরের চন্দ্রিমা দত্তের 'কবিতার চন্দ্রিমা' কিম্বা আগরতলার কল্যাণ চক্রবর্তীর 'ভাষা' সাইটের দশা এই। পূর্বোত্তর থেকে প্রথম বাংলা ব্লগার আমি আর রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী এবং প্রাবন্ধিক শুভপ্রসাদ মজুমদার। শুভপ্রসাদ আগে তাঁর লেখালেখিগুলো পিডিএফে করে স্ক্রাইবডে তুলে দিতেন। আর নিয়মিত লিখতেন সচলয়াতন সন্মিলিত ব্লগে। পরে 'অশুভ'নামে নিজের একটি ব্লগ করেন। এর পর এখন কবি কবি সপ্তর্ষি বিশ্বাস, জয়িতা দাস ব্লগ লেখাতে যোগ দিয়েছেন। সপ্তর্ষির ব্লগের নাম 'আমারসোনারবাংলা আমিতোমায় ভালোবাসি' এবং 'খাতা কবিতার''খাতাকবিতা'তে তিনি তাঁর পড়া ভালো লাগা নানা কবিদের কবিতাগুলো তুলে রাখেন। সপ্তর্ষি অনির্বান ধরিত্রীপুত্র এবং দেবাশিস তরফদারের নামে আরো দুটো ব্লগ নিজেই সম্পাদনা করেন। এর প্রথমটি 'মন্থরতাবিষয়ক ' দ্বিতীয়টি 'পুনরাবৃত্ত' জয়িতার ব্লগের নাম 'ইচ্ছামতি'। জয়িতারই ছোট ভাই অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিমাদ্রি শেখর দাস আরো এক পা এগিয়ে। তিনি তাঁর 'হিমাদ্রি' ব্লগে বিজ্ঞান নিয়ে আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নিয়মিত লিখছেন বাংলা ভাষাতে। 'স্বাভিমান' নামে একটি ব্লগ রয়েছে অরূপ বৈশ্যের, যাতে তিনি নানা সামাজিক আর্থরাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে বাংলা ইংরেজিতে লিখে থাকেন। সম্প্রতি নিজের বই লেখালেখি নিয়ে ব্লগ শুরু করছেন কবি অমিতাভ দেব চৌধুরীও। তাঁর ব্লগের নাম 'বাজেখাতা'।
                আমার নিজের অনেকগুলো ব্লগ রয়েছে। তার মধ্যে একটির নাম 'সুশান্ত', অন্যটি 'প্রজ্ঞান' । প্রজ্ঞান মূলত দ্বিভাষিক 'ইংরেজি ও অসমিয়া' সেখানে আমার কলেজ থেকে সম্পাদিত নিয়মিত কাগজ 'প্রজ্ঞান' সম্পর্কিত নানা বিষয় তুলে দেয়া হয়। দুটোই পূর্বোত্তর ভারতের জনপ্রিয় ব্লগগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশের 'আমার ব্লগ' এবং কলকাতার 'কফি হাউসের আড্ডা' নামের দুটো সন্মিলিত ব্লগেও আমি নিয়মিত লেখালেখি করে থাকি। এছাড়াও বাঙালনামা, গুরুচন্ডালী, সৃষ্টি, অলসকথার দুপুরের মতো ওয়েব মেগাজিনেও কখনো সখনো।এছাড়াও আমার রয়েছে ঈশানকোনের কথা, ঈশানকোনের কাহিনি এবং কাঠের নৌকো। ঈশানকোনের কাহিনিতে আমি দীর্ঘদিন ধরে অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতার বিখ্যাত উপন্যাস 'ফেলানি' বাংলাতে অনুবাদ করছি। পাঠকেরা সেখানেই সেটি পড়ছেন। অভিমত দিচ্ছেন। এবং সে অনুযায়ী সেটি সংশোধিত হয়ে হয়ে এগুচ্ছে। স্বয়ং লেখিকা এটি পড়ে পড়ে যাচ্ছেন। এবং প্রায়শঃই নিজের অভিমত জানাচ্ছেন। এই অনুবাদের কথা তিনি উপন্যাসটির সাম্প্রতিক সংস্করণে উল্লেখও করেছেন। কিন্তু যেটির কথা আমি এখানে বিশেষ করে বলতে চাইব, সেটির নাম 'কাঠের নৌকা' । শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতাগ্রন্থের নামে তৈরি এই ব্লগে আমরা যে উদ্যোগটি নিচ্ছি তা এই যে পূর্বোত্তরের যে কোনো প্রকাশক কিম্বা সম্পাদক তাঁদের সম্পাদিত প্রকাশিত পত্রিকা বা গ্রন্থের পিডিএফ পাঠিয়ে দিলেই আমরা সেটি সেখানে তুলে দিয়ে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছি। কবি বন্ধু অমিতাভ দেবচৌধুরী ইতিমধ্যে এই ব্লগে আমার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে তাঁর দু'তিনটি মূল্যবান কবিতা আর নিবন্ধ গ্রন্থ ছাড়াও আমরা তুলেছি প্রতিশ্রোত, মহাবাহুর মতো ছোট কাগজের সাম্প্রতিক সংখ্যাগুলো।তুলেছি কবি বিজয় ভট্টাচার্য্যের, তিমির দে'র সাম্প্রতিক গদ্য গ্রন্থ। সমর দেবের উপন্যাস। ভিকি পাব্লিশার্স ইতিমধ্যে 'কাঠের নৌকো'তে তাদের আটখানা প্রকাশিত গ্রন্থ পাঠিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আরো পাঠাবার প্রতিশ্রুতি রয়েইছে। আমরা চাইব, যারা দুটো কথা বাংলাতে লিখতে পারেন আর যাদের হাতে ইন্টারনেট রয়েছে তারা বাংলাতেই সেখানে লিখুন। ইংরেজি হরফে বাংলা লেখা বন্ধ করুন। ইন্টারনেট আপনার হাতে থাকলে বাকি কাজগুলো হচ্ছে বিনামূল্যে। আগামীদিনে ইন্টারনেটও প্রায় বিনামূল্যের হয়েই যাবে। অন্তত গ্রন্থের কারবার থেকে এর ব্যয় হবে অতি সামান্য। স্থানে কালে এর বিস্তার আর গভীরতা হবে ব্যাপক। সবচে' বড় কথা গ্রন্থকীটের মতো একে কোনো কম্পিউটার কীট কখনো ধ্বংস করতে পারবে না। বাংলা ভাষা সাহিত্য যেখানে ডানা মেলে অবাধে উড়তে পারে সেখানে আপনারা ডানা মেলবেনই বা না কেন? এর তো একটাই কারণ হতে পারে, পুরোনো অভ্যেস। পালিত পাখি যেমন ছেড়ে দিলে আবারো খাঁচাতে ফিরে ফিরে আসে! আমি অনেক অনেককে বলেছি। আমার হাজারো বাঙালি বন্ধু আছে দেশে বিদেশে যাদের সঙ্গে আমার বার্তালাপ হয় বাংলা ভাষাতে , বাংলা হরফে। লেখাপড়া নিয়ে আড্ডা হয় বাংলাতে। তাদের মধ্যে পূর্বোত্তরের বন্ধু ঐ হাতে গুনা কয়েকজন। তাঁরা এখনো, ইংরেজি হরফের প্রতি ভালোবাসাটা ছেড়ে উঠতে পারেন নি। শিলচর স্টেশনের নাম কেন ভাষাশহীদ স্টেশন হলো না এই নিয়েও তাঁরা তাদের হাহাকার চীৎকারের ভাষাটা কিন্তু ইংরাজি।
            আমার ইচ্ছে ছিল কী করে কাজগুলো করবেন সেই নিয়ে দুটো কথা বলবার । কিন্তু সেই সময়ও নেই, মনে হয় না আপনাদের ধৈর্যও রয়েছে। সে নাহয় হবেখন ইন্টার নেটে। আগ্রহীরা আমাকে মেল করতে পারেনঃ karsushanta40@gmail.comএ । ফেসবুক, অরকুটে খোঁজে নিলেও পেয়ে যাবেন। আর আজকের এই বক্তৃতাটাও ইতিমধ্যেই উঠে গেছে আমার ব্লগে। লগ অন করুনঃ http://sushantakar40.blogspot.com. আপনাদের স্বাগত।