আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Showing posts with label Sylhetti. Show all posts
Showing posts with label Sylhetti. Show all posts

Sunday, 20 August 2017

Script Identity Region: ‘ সিলেট নাগরি’ লিপি এবং সাহিত্য অধ্যয়নের একটি নাগরিক প্রয়াস


নুসন্ধানের যাত্রাটি শুরু হয়েছিল দশক তিন আগেই। তারই ফলশ্রুতিতে ২০০৬তে ‘সিলেটি নাগরির পহেলা কেতাব।  ও দইখুরার রাগ’ নামে বইটি সম্পাদনা করে বের করেন  অধ্যাপিকা অনুরাধা চন্দ। কিন্তু যাত্রাটি ওখানে থামে নি। ফলে ২০০৮ এর ডিসেম্বরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সিলেটি নাগরি’ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজিত হয়। তাতে যে গবেষণা নিবন্ধগুলো পড়া হয়---সেগুলোকেই দুই মলাটে বেঁধে আবার নিজের সম্পাদনাতে প্রকাশ করেন অনুরাধা চন্দ ২০১৩তে। তারও হয়ে গেছে বছর পাঁচেক। দুই বইয়েরই প্রকাশনার সঙ্গে জড়িয়েছিল দে’জ।  সঙ্গে প্রথমটির সহযোগী প্রকাশক যেমন ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব কালচারাল টেক্সট অ্যান্ড রেকর্ডস তেমনি দ্বিতীয়টির সহযোগী প্রকাশক ‘মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইন্সটিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ, কলকাতা। দ্বিতীয়টির নাম ‘স্ক্রিপ্ট আইডেন্টিটি রিজিওন: এ স্টাডি ইন সিলেট নাগরি’ (Script Identity Region: A Study in Sylhet Nāgari)। আমরা মূলত এই দ্বিতীয়টির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতেই কী বোর্ড চাপছি।  
সিলেট নাগরি নিয়ে সিলেটিদের বিচিত্র রকম গৌরব বোধ রয়েছে, রয়েছে কৌতূহলও। সম্প্রতি লিপি-ভাষাকে একাকার করে নিয়ে স্বতন্ত্র সিলেটি ভাষার দাবি আসামেও শোনা গেছে। সিলেটে বিলেতে তো দাবিটি বেশ পুরোনো হয়েই গেছে। কিন্তু সেই পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদের উনিশ শতকের শুরুর দিনগুলো থেকে এখানে ওখানে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রয়াস বাদ দিলে এভাবে সমবেত বিদ্যায়তনিক গবেষণার বিষয় হয়েছে এই প্রথম।ভূমিকাতে সম্পাদিকার এমনটাই দাবি। আমাদেরও অনুসন্ধান বলে অন্তত ভারতে বাংলাদেশে দাবিটি সত্য। যদিও বিলেতে Sylheti Translation And Research’ (STAR) বলে একটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়ে কাজ করছে। সিলেটি নাগরিকে আন্তর্জালের ব্যবহারোপযোগী করবার জন্যে ইউনিকোডে নিয়ে আসবার জন্যেও তাঁরা কাজ করছেন।  কিন্তু বিশেষ ভাষাবৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক গবেষণাদি যে তারা করেছেন আমাদের মনে হয় নি। তবে  ২০১৬তে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রেরও আয়োজন করেছিলেন তারা---উদ্দেশ্য সিলেটিকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দেয়া। তার বিস্তৃত এখনো আমাদের জানবার সুবিধে হয় নি  সেটি এরকম দ্বিতীয় প্রয়াস। আমরা প্রথম প্রয়াসটি নিয়েই আপাতত লিখছি।
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ১
সিলেট নাগরীর কথা গ্রিয়ার্সন তাঁর মহাগ্রন্থে খুব ছোট করে হলেও প্রথম আলোচনা করেছিলেন। লিখেছিলেন, লিপিটির নাম  দেবনাগরীনিম্নশ্রেণির মুসলমানেরা স্বাক্ষর দিতে গিয়ে এই লিপি ব্যবহার করেনআর সম্প্রতি এই লিপিতে বাংলা পুথি’  ছাপা হচ্ছে। পরের উল্লেখটি আছে,বি সি এ্যালেন সম্পাদিত ‘Assam District Gazatteers’এর দ্বিতীয় খণ্ডে।ওতেও মোটামুটি গ্রিয়ার্সনেরই প্রতিধ্বনি এর কিছু পরে পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ এই নিয়ে প্রথম বিস্তৃত এক নিবন্ধ লেখেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকার ১৩১৫ বাংলাতে। সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকাতে তিনি নানা সময়ে যে কটি প্রবন্ধ লেখেন তার মধ্যে প্রথমটির নামেই সিলেট নাগরী’ কথাটি তাত্ত্বিকভাবে প্রথম মেলেবছরখানিকের মধ্যে প্রকাশিত অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধির শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ বইতেও অতিসামান্যই আছে।এর পরে শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষদ পত্রিকাতেও লিপিটি নিয়ে অনেকেই আলোচনা শুরু করেন।তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন মোহম্মদ আশরফ হোসেন সাহিত্যরত্ন।এর পরেই সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের। অডিবিল-এর ভূমিকা অংশের পরিশিষ্টে বাংলার অন্যান্য লিপির সঙ্গে সিলেট নাগরী’ নিয়েও তিনি বেশ কিছু পঙক্তি ব্যয় করেছেন।লিপি পরিচয় দিতে গিয়ে সুনীতিকুমার লিখলেন,‘a kind of modified Dēva-nāgari,called ‘Silēt Nāgari’ ভাষাবিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রায় সমস্ত তাত্ত্বিক আলোচনাতে এর পরে সিলেট নাগরী’ কথাটি চালু হয়ে গেল। সুকুমার সেনও তাই লিখলেন। কিন্তু লিপিনামটি পুথি লিখিয়েদেরই দেয়া বলেই মনে হয়। পহেলা কেতাবের  ১৩৩৬এর সংস্করণের সম্পাদক তথা সংশোধক মহাম্মদ আব্দুল লতিফের পদে আছে,“ছিলেটি নাগরী পুথি পহেলা কিতাব নাম...
উনিশ শতকের মাঝামাঝি ১৮৬০ থেকে ৭০ কোনো এক সময় মুন্সী আব্দুল করিম এই লিপির হরফ কাটিয়ে প্রথম তাঁর প্রতিষ্ঠিত সিলেটের ইসলামীয়া প্রেস’ থেকে বই ছাপানো শুরু করেন। পরে পরে কলকাতা এবং সিলেটে আরো কতকগুলো প্রেসে সিলেটি নাগরী বইপত্র ছাপা শুরু হয়।পদ্মনাথ ভট্টাচার্য ছাড়াও পরবর্তী কালে শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি,মুর্তাজা আলিও সিলেটি নাগরীতে স্বরব্যঞ্জন মিলিয়ে ৩২টি হরফের কথাই লিখেছিলেন,কিন্তু তারপরেও এই বর্ণমালাতে সংশোধন হয়েছে।অনুরাধা চন্দ লিখছেন,“মনে হয় শুরুতে এই বর্ণমালা দ্বৈতস্বর ও যুক্তব্যঞ্জন বর্জিত ছিল।তবে কালক্রমে বেশ কয়েকটি যুক্তব্যঞ্জন সংযোজিত হয়। পদ্মনাথ যে পহেলা কেতাব ব্যবহার করেছেন তাতে ষোলোটি সংযুক্ত বর্ণ রাখা ছিলঅনুরাধা চন্দের ব্যবহৃত পহেলা কেতাব’ পুস্তিকায় একুশটি সংযুক্ত বর্ণ রয়েছে।পদ্মনাথ এই লিপির বর্ণনা প্রসঙ্গে হসন্ত চিহ্নটির অভাব লক্ষ্য করেছেন,‘যদি হসন্ত চিহ্নটি পরিগৃহীত হইত,তাহা হইলে সমপদ’ যে সম্পদ’ তাহা অনায়াসেই বুঝিতে পারা যাইত।’ হসন্ত চিহ্নের ব্যবহার না থাকাতেই যে দইখুরার পদে প্রেমের মালা’ হয়েছে পেরমের মালা লিপির সীমাবদ্ধতাতেই শব্দটি পেরম’ হয়েছে,যা কিনা মান বাংলা বা সিলেটি কোনো শব্দই নয়। যাই হোকলিপিটি এখন কম্প্যুটারে এবং আন্তর্জালে ব্যবহার উপযোগী করে ইউনিকোড কনসর্টিয়াম’ (The Unicode Consortium) স্বীকৃতি দিয়েছে। সেখানে একক বর্ণসংখ্যা মোটের উপর একই আছে।হলন্ত চিহ্ন,এবং অনুস্বারের জন্যে স্বতন্ত্র সংকেতের ব্যবস্থা রাখাতে যুগ্মব্যঞ্জনের স্বতন্ত্র সংকেতের দরকার পড়বার কথা নয়।তার বিপরীতে চারটি পদ্যচিহ্ন’-এর জন্যে সংকেত রয়েছে।সম্ভবত পর্বাঙ্গ,পর্ব,চরণ,স্তবক ভেদ দেখাবার জন্যে।ইতিমধ্যে কিছু ইউনিকোড ফন্ট তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেগুলো খুব ব্যবহারবান্ধব নয় এখনো। আমরা অতিকষ্টে এই কটি বর্ণ টাইপ করে দেখাচ্ছি... i a i e o k p c t g j 
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ২
একক বর্ণ হিসেবে পাঁচটি স্বর এবং সাতাশটি ব্যঞ্জনের সংখ্যাতে এই অব্দি আর কোনো হেরফের হয় নি।সংখ্যা বোঝাবার জন্যে স্বতন্ত্র কোনো সিলেটি নাগরী চিহ্ন নেই।বাংলা সংখ্যা-সংকেত দিয়েই শুরু থেকেই কাজ চালানো হচ্ছে।  অনুরাধা চন্দের কথাতে,“ ...সিলেটি কথ্যভাষার উচ্চারণ ও ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই বর্ণমালা গড়ে উঠেছে।একটি ধ্বনির জন্য একটি বর্ণ,এই নিয়মটি তত্ত্ব হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে হয়। কথাগুলো অন্যত্র তপোধীর ভট্টাচার্যও লিখেছিলেন। সিলেটিতে স্বরস্বনিম বলতে সত্যিই পাঁচটির বেশি নেই। ব্যঞ্জন স্বনিম বলতে আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করেও ত্রিশটির বেশি মেলা কঠিন।এবং অনেকেই যেভাবে ,,’ আদি সিলেটি বর্ণমালা তালিকাতে বাদ দিয়ে দেন,আমরা অনুসন্ধান করে দেখেছি সেগুলো বাদ দেবার কোনো কারণ নেই। সিলেটি নাগরী বর্ণমালাতেও এগুলো দিব্বি শোভা পাচ্ছে। এই বিষয়গুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ।বাংলা কিংবা দেবনাগরী যে বর্ণমালা থেকেই লিপিটি এসে থাকুকসংস্কৃতানুসরণ না করে স্বাভাবিক উচ্চারণরীতি অনুসরণ করেছিলেন বলেই কিছু বিভ্রান্তি এই লিপির স্রষ্টারা এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন বলেই মনে হয়।আরবি লিপি শৈলীরও কিছু প্রভাব অবশ্যই পড়েছে,সিলেটি নাগরী পুথিকে তাই পেছন থেকে পড়তে হয়।কিন্তু আরবি বর্ণমালা সংখ্যা দিয়েও এই লিপির স্রষ্টারা বিভ্রান্ত হয়েছেন এমনটা দেখি না।
লিপিটির দেবনাগরী উৎস নিয়ে অধিকাংশেরই কোনো দ্বিমত নেই।শুধু মুর্তাজা আলি মনে করতেন দেবনাগরীর সঙ্গে  বাংলা-কাইথির কাছেও সিলেটি নাগরী ঋণী। কোনটি বাংলা আর কোনটি দেবনাগরী থেকে এসেছে এই নিয়ে  শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি এবং মুর্তাজা আলির বক্তব্যের একটি তুলনামূলক অধ্যয়ন করে অধ্যাপক উষারঞ্জন ভট্টাচার্য মোটের উপরে মুর্তজা আলির পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন।নাগরীর ফ,র বর্ণগুলো কাইথির থেকে এসছেএবং ভ বর্ণের সঙ্গে কাইথি ভ-এর মিল রয়েছে বলে মুর্তজা লিখেছিলেন। ’-এর সঙ্গে না হোককাইথি ,’-এর কথাটি খুব একটা ভুল নয় বলে আমাদেরও অভিমত।আমরা ইউনিকোড হরফগুলো পরীক্ষা করে দেখেছি।
 কিন্তু দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হুসেন চৌধুরী বলে এক গবেষক আরবি লিপি শৈলীর প্রভাবে সরাসরি বাংলা থেকেই হরফগুলো এসেছে বলে দাবি করেছেন। এই দাবিটিকে খারিজ করেছেন অনুরাধা চন্দ ‘পহেলা কিতাবে’
আরবি লিপির প্রভাবটি সামান্য ঘোরালো।অনুরাধা চন্দ লিখছেন,“আরব ও পারস্যে জের’,‘জবর’,‘পেশ’ এই তিনটি স্বরচিহ্ন সামান্য অদলবদল করে নানা ধ্বনির প্রকাশ করা যায়।সিলেট নাগরী লিপিতেও আমরা এই রীতি দেখতে পাই।সামান্য পরিবর্তিত একই অক্ষর দিয়ে ভিন্ন ধ্বনির প্রকাশ সম্ভব।তিনি প,,,,,ধ এই ক্রমে সিলেটি নাগরী হরফগুলোর নজির দিয়েছেন।তিন-চার শতকের দরবারী ভাষা ফারসির প্রসারের ফলে সিলেটি ভাষাবৈচিত্র্যে আরবি -ফারসির উচ্চারণগত প্রভাব বেশ ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। ফারসি লিখতে আরবি লিপির প্রচলনও ছিল। ফলে সিলেট নাগরিতে আরবির প্রভাব কিছুই পড়বে নাসেসব হবার নয়।  কিন্তু হরফে সরাসরি আরবির চিহ্নমাত্র নেই। এমনি বই ছাপবার বেলা পেছন থেকে সামনের দিকে পৃষ্ঠা এগোলেওপঙক্তিগুলো কিন্তু বাংলা বা ব্রাহ্মিপরিবারের লিপির মতোই বামদিক থেকে ডানেই এগিয়েছে। অনুরাধা চন্দ তাঁর পহেলা কেতাব’ সেভাবেই সম্পাদনা করে ছেপেছেন।
এই যে আরবি পরম্পরার সবটা নিলেন না,সেখানে একটি আন্তসংগ্রামের সংকেতও অবশ্যই মেলে। যে কথা রিচার্ড ঈটন বাংলাতে কেন আরবি লিপি চলল না,বোঝাতে গিয়ে লিখেছিলেন।নিছক ইসলাম প্রীতির জন্যেই নাগরীপুথির লেখকেরাও বাংলা লিপি বেছে নেন নি,যদি এমনতর হত তবে আরবি লিপির আরো ঘনিষ্ঠ অনুসরণ দেখা যেতে পারত।এই প্রসঙ্গে মনে করতে পারি,যে হিন্দুদের মধ্যে যেমন রীতি ছিল সংস্কৃত ছাড়া ধর্মগ্রন্থাদি চর্চা করা যাবে না,করলে রৌরব নরক বাস হবে,মুসলমানদের মধ্যেও ছিল,আল্লাহ আরবিতে কোরান দিয়েছেন।অন্য লিপি বা ভাষার ব্যবহার মানেই তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধাচরণ করা।তবু যারা ভারতে হিন্দুস্তানির থেকে উর্দুর উদ্ভব করিয়েছিলেন,তারা সেই ইসলামী সংস্কৃতির সংস্কার করেই করেছিলেন।ভারতেই প্রথম অন্য কোনো ভাষাতে কোরান অনুবাদ হয়,আর সেটি উর্দুতে।তাও উর্দুর জন্যে তারা আরবি লিপি মেনে নিয়ে আপস একটা করেছিলেন।বাংলাতে কেউ কেউ চেষ্টা করেছিলেন।কিন্তু বাংলার মুসলমান সেই লিপিও মানেন নি।অধিকাংশই বাংলা লিপি আর বাংলা ভাষা মেনে নিলেন বলেই বাঙালি আজ এতো বিশাল এক জনগোষ্ঠী।সিলেটি নাগরী লিপি ছিল তার মাঝামাঝি একটি ব্যবস্থা।প্রধানত যে লিপিকে নির্ভর করে সিলেটি নাগরী এল সেটি দেবনাগরী।লিপিটি উত্তর ভারতেও তখনো আজকের মতো জনপ্রিয় ছিল না।সংস্কৃতের সর্বমান্য লিপিও ছিল না।এখনো সংস্কৃত লিখতে বাংলা-অসমিয়া লিপি দেদার ব্যবহৃত হয়। প্রত্যন্ত এলাকার নিরক্ষর বহু মানুষের কাছে বাংলা লিপি পরিচিতও ছিল না। মোগল আমলে রাজকার্যেও ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছিল ফার্সির ব্যবহার।আজ যেমন হয় প্রধানত ইংরেজি এবং হিন্দি। ফলে এক প্রজন্মের ব্যবধানে আজকের আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছেও বাংলা লিপির পরিচয় আর সেভাবে নেই।সুতরাং বাঙালি হয়ে কেন বাংলা লিপি জানবে না,এই প্রশ্ন শুধু উন্নাসিক সমাজবিচ্ছিন্ন আধুনিক মধ্যবিত্ত মনেই জাগতে পারে।তাদের কাছে সেদিন বাংলা লিপি শেখা যা,দেবনাগরী শেখাও তাই ছিল।তবু,তারা করলেন কি,জ্ঞান পিপাসার প্রাবল্যে দেবনাগরী-বাংলা যেটুকু বুঝলেন,তাই ভেঙেচুরে অনেক সংক্ষিপ্ত আর সরল একটি বর্ণমালা গড়ে ফেললেন।বর্ণ সংখ্যা রাখলেন ততটাই যতটা উচ্চারণ অনুমোদন করে। তাঁরা ভাষাবিজ্ঞান জানতেন না,কিন্তু এই সরল সত্য বুঝতেন। সেকালে আজকের মতো মান-উচ্চারণরীতি গড়ে তুলবার কোনো উপায় ছিল না। রেডিও,টিভি,রেকর্ড,ক্যাসেট বা কম্প্যুটার কিছুই তো ছিল না।ফলে তাঁরা বাধ্য ছিলেন  অনুসরণ করতে সিলেটি উচ্চারণ।কিন্তু যে ভাষাতে কাব্য করলেন সেটি সেকালের সাহিত্যের মান সাধু বাংলা...মহম্মদ আব্দুল লতিফের এই চরণগুলো পড়লে দুই একটি রাবীন্দ্রিক ক্রিয়াপদও দুর্লভ হয় না,“তার পর আরজ করি করিনু তামাম।।/ ছিলেটি নাগরী পুথি পহেলা কিতাব নাম  কলকাতাকে কেন্দ্রকরে মূলত উত্তরভারতীয় প্রব্রজিত মুসলমানদের প্রভাবে যে ‘দোআশলা’ বাংলা গড়ে উঠেছিল, সুকুমার সেন যাকে লিখেছেন ‘ইসলামী বাংলা’ বলে, সেই ভাষাও সিলেটি নাগরি সাহিত্যে ছাপা জমানাতে দুর্লভ নয়।
আমরা যে বইটি নিয়ে কথা বলব সেটি দ্বিভাষিক। ভারত বাংলাদেশের ষোলজন গবেষকের রচনা এতে ঠাঁই পেয়েছে। আসাম তথা বরাক উপত্যকারও একাধিক গবেষক রয়েছেন। সম্পাদিকার একটি স্বতন্ত্র রচনা ছাড়াও সূচনা এবং সমাপ্তি রচনা দুটিও সুখপাঠ্য গবেষণা নিবন্ধই। পাঠকের জন্যেও এতো সুপরিকল্পিত দিশানির্দেশ যে আমরা এর সমালোচনা লিখতে গিয়ে ভাবছিলাম , এর পরে আর আমাদের লিখবার কী থাকে?  তিনি নিছক সম্পাদনা করেন নি, বিষয়টি নিয়ে ভারতে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ক্ষেত্র অনুসন্ধান করে বেড়িয়েছেন। বহু পুথি নিজে সংগ্রহও করেছেন, পাঠও শুনেছেন। লেখকদের অনেকেই তাঁর সঙ্গে পথ হেঁটেছেন, সঙ্গ দিয়েছেন। তার বাইরেও রয়েছেন  অনেকেই। আসামে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অধ্যাপক অমলেন্দু ভট্টাচার্য, আবদুল মুসাব্বির ভুঁইয়া, আবিদ রাজা মজুমদার, সামসুল হক বড়ভূঁইয়া, তুষার কান্তি নাথ, সঞ্জীব দেব লস্কর এবং পার্থপ্রতিম দাস। এছাড়াও বিজয় কুমার ধর, অধ্যাপক আবুল হুসেন মজুমদার, মুজ্জামিল আলি লস্কর এবং সর্বোপরি অধ্যাপক সুজিত চৌধুরী এবং সদ্য প্রয়াত কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যও নানা সময়ে নানা ভাবে তাঁকে ঋদ্ধ করেছেন। কালিকার থেকেই দইখুরার রাগের নিজের সংগ্রহের প্রথম পুথিটি তিনি পান।
তিনটি ভাগে বইটি পরিকল্পিত। প্রথম ভাগে ‘এলাকা এবং মানুষ’ চিনিয়েছেন, চিনিয়েছেন তার ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি। ছটি ইংরেজি নিবন্ধের লেখক যথাক্রমে সুচন্দ্রা ঘোষ, রিলা মুখার্জি, হরপ্রসাদ রায়, সঞ্জীব দেব লস্কর, স্বপ্না ভট্টাচার্য(চক্রবর্তী), সুদেষ্ণা পুরকায়স্থ। দুটি বাংলা নিবন্ধের লেখক অমলেন্দু ভট্টাচার্য এবং তুষার কান্তি নাথ। দ্বিতীয় ভাগে ‘লিপি এবং ভাষা’। সেই সঙ্গে কারা লিপিটি গড়ে তুলেন, লেখেন এবং পড়েন ---তাদের কথা। এই ভাগে দুটি ইংরেজি নিবন্ধের লেখক আবদুল মুসাব্বির ভুঁইয়া, এবং মীনা দান। তিনটি বাংলা নিবন্ধের লেখক আবিদ রাজা মজুমদার, সাদিয়া চৌধুরী পরাগ এবং সামসুল হক বড়ভুঁইয়া । তৃতীয় বিভাগটিতে কথা হয়েছে ‘লিপি এবং সাহিত্য’ নিয়ে। সেই সঙ্গে সেই সঙ্গে তিনটি নিবন্ধ জানিয়েছে সেই বৃত্তান্ত কী ভাবে একটি নবগঠিত সম্প্রদায় এই লিপি, সাহিত্য এবং তার অন্তর্নিহিত দর্শনে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তুলছেন। অথবা উল্টো করে লিখলে ---পরিচিতি গড়ে তুলবার স্বার্থে একটি লিপি এবং সাহিত্যেরও বিকাশ ঘটাচ্ছেন। এই পর্বের তিনটি মূল্যবান প্রবন্ধের দুটি ইংরেজিতে লিখেছেন স্বপন মজুমদার এবং সম্পাদিকা অনুরাধা চন্দ স্বয়ং এবং একটি বাংলা প্রবন্ধের লেখক নন্দলাল শর্মা।
প্রথমভাগে লিপি বা সাহিত্যের কথা বিশেষ নেই। কিন্তু যে পরিবেশে সেই কথা ও কাহিনি তৈরি হয়েছে সেটি এখানে ‘নির্মিত’ হয়েছে। ছবির ক্যানভাস যেমন। অধিকাংশই চেনা কথা। শুরুর লেখিকা সুচন্দ্রা ঘোষ। তাঁর ইংরেজি নিবন্ধের তিনি মেঘনা উপত্যকার পুব দিককার ভূগোল এবং রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন।  কিন্তু সেই সঙ্গে প্রতিবেশী বঙ্গ বা বৃহত্তর বাংলা, আরাকান এবং কামরূপের সঙ্গে সম্পর্কটিও ছুঁয়ে গেছেন। সেই সঙ্গে শ্রীহট্টের নিজস্ব পরিচিতি গড়ে উঠবার আমাদের অনেকটা চেনা কথাই শুনিয়েছেন তাম্রফলক, মুদ্রার সাক্ষ্য সহ।  যে কারণে তাঁর লেখাটি শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ—সেটি এই যে--- দ্বাদশ –ত্রয়োদশ শতক অব্দি ইতিহাস পরিক্রমা করে তাঁর সিদ্ধান্ত এই অব্দি নথিপত্রের প্রাথমিক পাঠ বলে গাঙ্গেয় উপত্যকার থেকে ভিন্ন কোনো নতুন বা স্বতন্ত্র লিপি শৈলী মেঘনা উপত্যকাতে দেখা দেয় নি।
 রিলা মুখার্জির ইংরেজি নিবন্ধটিতে কিছু ভিন্ন স্বর এর জন্যেই রয়েছে যে সুরমা-মেঘনা নদী পথ, নৌ বাণিজ্যের ইতিহাসটি তিনি বুঝবার চেষ্টা করেছেন। ‘space’, ‘place’ , ‘region’ এমন কয়টি প্রতিশব্দকে এমনভাবে ব্যবহার করে তাঁর নিবন্ধটিকে সাজিয়েছেন যে যথেচ্ছ বাংলা অনুবাদে ব্যঞ্জনাটি ধরা কঠিন। কিন্তু তাঁর ভাষাতে বললে, একটি ‘স্পেসে’র ‘প্লেসে’ রূপান্তরের কাহিনি তিনি বলে গেছেন। কামরূপের সময় থেকেই চীনের সঙ্গে সংযোগ আদির কথা তিনি উল্লেখ করে দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে চন্দ্ররাজাদের পশ্চিমভাগ ফলক সম্পর্কে দু’টি তথ্যের উল্লেখ করছেন। এক, এতে পাঁচ-ছ লাইন নাগরি লিপি ব্যবহৃত হয়েছে,যেখানে আমরা জেনে এসেছি অন্যান্য অধিকাংশ তাম্রফলকাদিতেই সংস্কৃতের জন্যেও কুটিল-প্রত্ন বাংলা, বাংলা আদি লিপিই ব্যবহৃত হচ্ছে।  দুই, রাজধানী বিক্রমপুরে কামপুচীয় নাগরিকের আসবার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। ভাটেরা ফলকের প্রত্ন বাংলা লিপির সঙ্গে তিনি কাম্পুচিয়াতে পাওয়া একটি খেমের ফলকের মিলের কথা উল্লেখ করছেন। ঐ সময়ে একটি ছায়াচ্ছন্ন প্রান্তীয় এলাকার থেকে সিলেট একটি বৃহত্তর অঞ্চলের অংশ হিসেবে থাকবার ফলে এই সব হচ্ছে। ভারতমহাসাগরীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা (IOTS), মালদ্বীপের সহস্রাব্দ প্রাচীন কড়ি অর্থনীতির উত্থান এবং মোঘল আমলের পরে থেকে পতন, এবং ষষ্ঠ-সপ্তদশ শতকে যখন প্রতিবেশী ত্রিপুরা, জয়ন্তিয়া, মণিপুর, কোচ বিহারাদিতেও যখন রূপার মুদ্রা প্রচলিত তখন সিলেটে কড়ির ব্যবহারের এক চিত্তাকর্ষক বর্ণনা তিনি দিচ্ছেন। জাতীয় ইতিহাসের ছায়াতে প্রান্তীয় ইতিহাসের স্বাতন্ত্র্য ঢাকা পড়ে যায় এই সতর্কবাণীতেই তাঁর নিবন্ধ শেষ হয়েছে।
 হরপ্রসাদ রায়ের ইংরেজিতে তৃতীয় নিবন্ধটি চারদিক থেকে সিলেটে তথা পূর্বোত্তরে আর্য, বিস্তৃতভাবে অনার্য নৃগোষ্ঠীগুলোর প্রব্রজনের একটি ঐতিহাসিক রূপরেখা আঁকবার চেষ্টা করেছেন। কোথাও কোথাও পুরাণে ইতিহাসে গুলিয়েছেন বলেও আমাদের মনে হচ্ছে। পাণ্ডবদের নাগাপাহাড় বিজয়ের গল্পকে কোনো প্রশ্ন করছেন না।
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ৩
 সঞ্জীব দেবলস্করের চতুর্থ নিবন্ধটিও ইংরেজিতে এবং বিষয়টির গভীরে গিয়ে বিচিত্র প্রব্রজন থেকে একটি জনগোষ্ঠী গড়ে উঠবার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটটি ব্যাখ্যা করছে। যেমন শাহজালাল এবং তাঁর সঙ্গীদের দ্বারা এখানে দ্বিতীয় কৃষি বিপ্লবটি হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন, এবং জনজাতিরা শুধু ইসলামই গ্রহণ করেন নি, তাঁরা ভাষাও গ্রহণ করছেন অর্থাৎ বাঙালি হচ্ছেন। জনপ্রিয় ইতিহাসের কথাতে এই ভাষান্তরের কথাটি বিশেষ গুরুত্ব পেতে দেখা যায় না।   কাছাড়ের বড়খলা-সোনাই এলাকাতে  ক্ষেত্র অনুসন্ধানের উপর ভিত্তি করে তিনি ‘কাছাড়ি’ এবং ‘নাগামৌলবি’দের নজির দিয়েছেন, যারা কাছাড়ি বা নাগাও নন, মৌলবিও নন। তবে শুধু কৃষি বিস্তারই নয়, ডিমাছা রাজদরবারের দণ্ডবিধির নজির দিয়ে তিনি এখানে  প্রচলিত বর্ণবিদ্বেষকেও সহজ ধর্মান্তরণের একটি কারণ বলে মনে করেন। কিন্তু সেই ইসলাম ছিলনা কেতাবি শরিয়তি ইসলাম, ছিল হিন্দু বৌদ্ধ ঐতিহ্য সমন্বিত মারিফতি ইসলাম। ফলে যে ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য বিশেষ করে সঙ্গীতের ধারার উদ্ভব হল, সেই পরিবেশেই সিলেটি নাগরি লিপি এবং সাহিত্যও  দেখা দিল।  
স্বপ্না ভট্টাচার্যের পঞ্চম প্রবন্ধের পরিসর চেনা গণ্ডির বাইরে-- আরাকান। সেখানে নৃগোষ্ঠীগুলো এবং তাদের মধ্যেকার  বৌদ্ধমতধারাগুলোর উদ্ভব এবং বিকাশ নিয়ে তাঁর দাবি ‘Some observation’ তুলে ধরেছেন। ভারে এবং ব্যাপ্তিতে প্রবন্ধটি এই সংকলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ। সেই প্রাচীন কাল থেকে সাম্প্রতিক ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু বাংলা ভাষা সাহিত্যের ছাত্রদের জন্যে আমরা সংক্ষেপে যেটি বলতে পারি ‘আরাকানের রাজসভা’তে মুসলমান সুফি কবিদের হাতে বাংলা সাহিত্য দেখা দেবার আর্থ-রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটটি স্পষ্ট করেছেন। উত্তর এবং মধ্য মায়ান্মার থেকে এলাকাটির বিচ্ছিন্নতা এক উদার  বৌদ্ধ ধর্মীয় পরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। ফলে হিন্দু এবং ইসলামী ঐতিহ্যও সহজেই সেখানকার সমাজের এবং ধর্মের ভেতরে এবং প্রতিবেশে সহজেই জায়গা করে নিতে পেরেছে। ‘হিন্দু’ বলতে আমরা  ব্রাহ্মণ্য, যৌগিক, তান্ত্রিক সব ঐতিহ্যেরই কথা বলছি। আরাকান বুঝতে গেলে  বাংলা এবং পূর্বোত্তর ভারতকে বুঝতেই হয়। আরাকানের শাসকদের কাছে একদিকে মধ্যদেশের বর্মণ রাজাদের চাপ, আর দিকে মোঘলের চাপ সইতে হচ্ছিল। মোঘলদের বিরুদ্ধে বাংলার সুলতানদের সঙ্গে একসময় ঘনিষ্ঠ আঁতাত গড়ে উঠে। একসময় আরাকানের বৌদ্ধ রাজারা নিজেদের মুসলমান নামও রাখতেন, মুদ্রাতে ইসলামী কালিমাও ব্যবহার করতেন। রিচার্ড ঈটন ভারতে , বিশেষ করে বাংলাতে ইসলামে ধর্মান্তরণের যে inclusion, identification এবং displacement-এর তত্ত্ব উপস্থিত করেছেন, তার প্রথম এবং দ্বিতীয় স্তরটি আরাকানের রাজসভার সেকালীন সাংস্কৃতিক আবহেও স্পষ্ট। ফলে রাজনৈতিক ভাবে মোঘল এবং ধর্মীয় দিক থেকে শরিয়তি ইসলাম বিরোধী বহু সুফি আরাকানে গিয়ে স্থায়ী বাসা করেন। রাজসভাতে কাজ নিয়ে, সাহিত্যও করেন অনেকে। আলাওল যে জায়সীর ‘পদ্মাবতী’ অনুবাদ করেছিলেন---সেটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি লেখিকা স্পষ্ট করবার চেষ্টা করেছেন। জায়সী নিজে সুফি ছিলেন, এবং মোঘল বিরোধী শাসকদের পৃষ্ঠপোষণা পেয়েছেন। তাই রাজপুত রাজা রতনসিং তাঁর গল্পে মহিমান্বিত, সুলতান আলাউদ্দিন প্রতিনায়ক এবং শরিয়তি ইসলামের প্রতীক। শ্রীলঙ্কার রাজকুমারী পদ্মিনী বৌদ্ধ ধর্মাদর্শের প্রতীক। তাঁর চরিত্রটি বার্তা লেখিকার মতে, বৌদ্ধ মধ্যপথই সবচাইতে কাঙ্ক্ষিত। জায়সির পদ্মাবতী ঐতিহাসিক চরিত্র কি না, কাহিনির সিঙ্ঘালা আদৌ শ্রীলঙ্কা কি  বর্তমান হারিয়ানার একটি এলাকা সেই সব তর্ক আছে। আমরা সেদিকে যাচ্ছি না। যেটি গুরুত্বপূর্ণ---সে হলো আরাকানে যখন এই কাব্য অনুদিত হচ্ছে তখন আসলে কবি এবং পৃষ্ঠপোষক রাজার উত্তরভারতীয় শাসকদের এবং শরিয়তি ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষোভের অভিব্যক্তি ঘটছে। সেন রাজাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের তাড়ায় বহু বৈষ্ণবও আরাকানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ফলে সেই বৈষ্ণবদের মধ্যে প্রচলিত ব্রজবুলি শৈলীর আশ্রয় নিলেন আলাওল। আমরা আলাওলের কথা লিখলাম, তিনি দৌলত কাজি, মাগনঠাকুর সহ আরো অনেকের অনেক কথাই লিখেছেন। আঠারো শতকের শেষের দিকে একদিকে মোঘল এবং আর দিকে বর্মণ রাজা বডোপায়ার কাছে আরাকান তার স্বাধীনতা হারায়। আরাকান থেকে মহামুনির প্রতিচ্ছবি নিয়ে চলে যান বর্মণ রাজা, সেই সঙ্গে যায় আরাকানের গৌরবের দিন। ঈটন কথিত displacement প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে এর পরে। সেই নিয়ে তিনি বিস্তৃত লেখেন নি এখানে। তবে বর্তমান রাখাইন-রোহিঙ্গিয়া সংঘাতের পশ্চাদভূমির অনেকটাই ইঙ্গিত মেলে। সেই নিয়ে লেখিকার স্বতন্ত্র অধ্যয়নও রয়েছে। তাঁকে এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বললেই চলে। আরাকানের ইতিহাস সন্ধান করতে গিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত এই পুরো এলাকাতে বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে ইসলামী ঐতিহ্যের থেকে আলাদা করা কঠিন। এমন কি মহামুনি ঐতিহ্যের সন্ধানে তিনি আসামের হাজো অব্দি পৌঁছেছেন যেটি কি না এখনো হিন্দু-বৌদ্ধ-ইসলামী তীর্থ বলে বিবেচিত হয়। ফলে তিনি গোটা পূর্বোত্তর ভারতে এবং বাংলার সমাজে ‘হারানো’ বা ‘লুকোনো’ বৌদ্ধধর্মাদর্শে নিয়ে আরো বিস্তৃত অধ্যয়নের প্রয়োজনের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর নিবন্ধের কথা লিখতে গিয়ে ভূমিকাতে অনুরাধা চন্দ মনে করিয়ে দিয়েছেন নবীবংশের লেখক সৈয়দ সুলতান, যিনি আরাকানের রাজসভাসদ ছিলেন, সিলেটের তরফ পরগণার থেকেই গিয়েছেন। এবং সিলেট হয়েই সুফি ধর্মাদর্শ চট্টগ্রামের পথ ধরে আরাকান অব্দি গিয়েছে। সুফি দর্শনের পথটি মিথিলা,গৌড় , সিলেট হয়েই আরাকান অব্দি এগিয়েছিল সেসব কথা তথ্য দিয়ে সুকুমার সেন সহ অনেকেই কিন্তু লিখে গেছেন।
এই পর্বে দুই বাংলা নিবন্ধের প্রথমটি লিখেছেন অমলেন্দু ভট্টাচার্য , দ্বিতীয়টি তুষার কান্তি নাথ। অমলেন্দু দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে। সাধারণত দাবি করা হয়ে থাকে হিউয়েনসাং যে ‘সিলিচটল’এর কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি আসলে সিলেট। অমলেন্দুর দাবি, এটি শিলচর হতেও পারে। এহ বাহ্য। মনু সংহিতার মতো আর্যব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্য  থেকে শুরু করে বৈষ্ণব , শৈব, সুফি ঐতিহ্যের শেকড় থেকে ফসল তাঁর জিজ্ঞাসার বিষয় হয়েছে। সিলেটের রঘুনন্দনের স্মৃতি নয়, বরাক-সুরমা উপত্যকাতে অনুসৃত হয় প্রাচীনতর মনুস্মৃতি। সৈয়দ শাহনূর রচিত সিলেটি নাগরি সাহিত্য ‘সাতকন্যার বাখান’এর নজির দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন নারীর স্বভাব এবং প্রকৃতি বর্ণনাতে কবি মনুস্মৃতি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। ‘বাদসার থান’, ‘ ডরাই ঠাকুরাণী’ , ‘খলকুমারী’ ‘ঘোড়ামুখী’ ‘পাতা খাউরি’ ইত্যাদি লৌকিক দেবদেবীর উৎস, পূজাপদ্ধতি, এবং উপাসক সম্প্রদায় নিয়ে সমস্ত জিজ্ঞাসার শেষে যে ছবিটি তিনি তুলে ধরেন, সেও বাকিদেরই মতো লোকসংস্কৃতির ‘সমন্বয়ী রূপ’। যদিও ‘সমন্বয়ী রূপ’ বলা চলে কি না সেই নিয়ে কিন্তু ঈটন প্রশ্ন তুলেছেন। ভেদবুদ্ধিই যেখানে নেই, সেখানে সমন্বয় বা কিসের?
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ৪
 তুষার কান্তি নাথ ‘দেবী রণচণ্ডী’র উৎস এবং বিবর্তনের সন্ধানে আবারও সেই সমগ্র পূর্বোত্তর ভারত, বাংলাদেশের সঙ্গে উত্তরপূর্ব এশিয়ার সমাজ-সংস্কৃতি-ইতিহাসের দিকে তাকিয়েছেন। তাঁর দাবি, মোঙ্গলীয় ঐতিহ্যের থেকে আসা একটি দৈবধারণার উপরে আর্যব্রাহ্মণ্য প্রলেপ দিয়ে ‘দেবী রণচণ্ডী’ কে গড়ে তুলা হয়েছে।  একটি কৌতূহলী প্রবন্ধের তাঁর নিবন্ধটি শেষ হয়েছে। কাছাড়ি রাজসভার অন্যতম সাহিত্যকৃতি ভুবনেশ্বর বাচস্পতির ‘শ্রীনারদীয় রসামৃত’ রাজপরিবারের উপাস্য ‘দেবী রণচণ্ডী’ কোনো উল্লেখ কিংবা বন্দনা কিছুই নেই। কেন? 
এই পর্বের শেষ নিবন্ধটি আবার ইংরেজিতে। ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ বইটির লেখক অচ্যুতচরণ চৌধুরী ইতিহাসকে কেমন রূপ দিচ্ছেন---সেটাই ধরিয়ে দিলেন সুদেষ্ণা পুরকায়স্থ। অচ্যুতচরণ পেশাদার ঐতিহাসিক ছিলেন না, তবু তাঁর ইতিহাসটি হয়ে উঠেছিল সেকালের মানে ‘যৌক্তিক এবং বৈজ্ঞানিক’ ইতিহাস গুলোর অন্যতম। যে কারকগুলো এটা সম্ভব করেছে---লেখিকা একে একে চিহ্নিত করবার চেষ্টা করেছেন। অনেকেই তখন একে পশ্চিমা পদ্ধতির, বিশেষ করে পশ্চিমা স্থানীয় ইতিহাসের আদল অনুসরণ করেছে বলে প্রশংসাও করেছেন। লেখিকা দেখিয়েছে, সেসব ছিল। কিন্তু স্থানীয় তথ্যের সন্ধান এবং যাচাই সমস্যা তাঁকে স্থানীয় পদ্ধতি গড়ে তুলেই সমাধান করতে হয়েছিল। নির্ভর করতে হয়েছিল বংশপঞ্জি, লোকশ্রুতি ইত্যাদির উপরে। প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে দাঁড়িয়েও সেকালের এক ঐতিহাসিক কীভাবে বিদ্যাচর্চার রাজধানী কলকাতা যাবার হাতছানি এড়িয়েও গ্রামের বাড়ি থেকে অসাধ্য সাধন করেছেন সেই গল্প এখনো বহু স্থানীয় ইতিহাসবিদদের প্রেরণার স্থল হতে পারে।
দ্বিতীয় পর্বে যেখানে  আলোচনা সিলেটি নাগরিতে প্রবেশ করেছে। এই পর্বের প্রথম লেখাটিই অধ্যাপক আবদুল মুসাব্বির ভূঁইয়ার, যার বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিষয়টিই ছিল ‘সিলেটি নাগরি’---তাঁর মতে ‘জালালাবাদী নাগরি’। যদিও তাঁর পড়াবার বিষয় আরবি ভাষা এবং সাহিত্য। সিলেটি নাগরি লিপির উদ্ভব এবং বিকাশের একটি সামগ্রিক ইতিহাসের ছবি তিনি তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন। গ্রিয়ার্সন থেকে শুরু করে পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ হয়ে সুনীতি কুমার, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি, আহমেদ হাসান দাবি প্রমুখ যারাই সিলেটি নাগরি লিপি এবং সাহিত্য নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন তাঁদের অধ্যয়নের সঙ্গেও সংক্ষিপ্ত পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।  প্রায় সঠিকভাবেই লিখেছেন, সরাসরি বাংলা বা দেবনাগরি থেকে এই লিপি আসে নি। এই দুই লিপির থেকেই সে উপকরণ নিয়েছে, সেই সঙ্গে আরবি –পার্শি ধ্বনিতত্ত্বের প্রভাবেও প্রভাবিত হয়েছে। কিন্তু  শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি সিলেটি নাগরি লিপির উদ্ভবের কারক হিসেবে শাহজালাল এবং তাঁর শিষ্যদের ধর্মপ্রচারের কাজ এবং কালকে জুড়তে চেয়েছিলেন। সুনীতি কুমারও বুঝি সেরকমই দাবি করেছেন এবং কালও মোটামুটি চতুর্দশ শতক বলে সুনির্দিষ্ট করেছিলেন। আমরা তলিয়ে দেখেছি, সুনীতি কুমার আদৌ সেরকম দাবি করেন নি। শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি দাবিটি সঠিক করেন নি বলে উষারঞ্জন ভট্টাচার্য অন্যত্র লিখেছেন। অন্যদিকে আহমেদ হাসান দানি সিলেটি নাগরি লিপির উদ্ভবের সঙ্গে বহু পরের আফগান শাসকদের ভাষানীতি এবং সংস্কৃতির সঙ্গে জুড়তে চান। এই তর্কে আবদুল মুসাব্বির ভূঁইয়ার স্থিতি শিবপ্রসন্ন লাহিড়ির পক্ষে। সিলেটি লিপিতে লেখা সাহিত্যের ভাষাকে তিনি বলেন ‘সিলেটি বাংলা’।  সম্পাদিকা অনুরাধা চন্দকে দেখলাম, ‘সিলেটি বাংলা’র দাবিকে মেনে নিতে। গ্রন্থশেষে সম্পাদকীয় মন্তব্যে । ‘সিলেটি’র দাবিটি একেবারে নিরর্থক নয় এর জন্যে যে সিলেটি ছাপটি প্রবল। কিন্তু সিলেটে বাংলা লিপিতে বা  প্রতিবেশী  এলাকার সাহিত্য তুলনা করলে দেখা যাবে প্রাক-ঔপনিবেশিক কালে সারা বাংলাতেই এমনটা হয়েছে, যাকে ‘উপভাষা’ বলি তার ছাপও পড়েছে, আবার  সাধারণ একটি মান বাংলা গড়ে তুলবার প্রবণতাও দেখিয়েছে সাহিত্যের ভাষা। ‘পহেলা কেতাবে’র ছোট্ট নমুনা আমরা দেখালামই। একটি পদের নজির দিতে পারি --- যেটি সিলেটি দেখাবে, সম্ভবত শোনাবেও... “...শুতিলে না আইসে নিদ্রা বসিলে পোড়ে হিয়া/বিষ খাই মরি যাইমু কালার বালাই লৈয়া/প্রতাপ আদিত্যে বলে বিড়ম্বনা আশে/মিছা ভুলি রহিলুম এ ভব-মায়া রসে। এখন এই রচয়িতা প্রতাপাদিত্য কিন্তু যশোরের রাজা হওয়াই সম্ভব। কিংবা এই সুবিখ্যাত বৈষ্ণব পদ পড়ামাত্র মনে হবে হবিগঞ্জের কারো লেখা, “দেইখ্যা আইলাম তারে---/সই দেইখ্যা আইলাম তারে।/এক অঙ্গে এত রূপ নয়ানে না ধরে।।/বান্ধ্যাচে বিনোদ চূড়া নব গুঞ্জা-দিয়া।/উপরে ময়ুরের পাখা বামে হেলাইয়া---” পদটি কিন্তু, সবাই জানি, জ্ঞানদাসের লেখা। সুতরাং মুহম্মদ আবুল বশর যে লিখেছিলেন,লিপি আছে ভাষা নেই--- তা বোধহয় বিশ্বলোকে একটাই,আর তা সিলেটি নাগরী লিপি” আবিদ রাজা মজুমদার তাঁর নিবন্ধে কথাটির উল্লেখ করেছেন। নন্দলাল শর্মা কিন্তু লিখেছেন, এই লিপিতে বাংলা ভিন্ন অন্যান্য ভাষার পুথিও কিছু লেখা হয়েছে। আর ‘বাংলা’ পুথির লিপ্যন্তর তো হয়েইছে।
এই পর্বের দ্বিতীয় রচনাটি ইংরেজিতে। অনুরাধা চন্দের ইতিপূর্বে সম্পাদিত ‘সিলেট নাগরির পহেলা কিতাব ও দৈ খুরার রাগ’ বইটির উপর ভিত্তি করে মীনা দানের ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। অত্যন্ত সুব্যবস্থাপিত কিন্তু সংক্ষিপ্ত আলোচনা। সাধারণত ভাষাবিজ্ঞানের সামগ্রিক ছবি এতো সংক্ষেপে আলোচনা করাই কঠিন। যেখানে লেখিকাকে স্বনিম এবং উপস্বনের তফাৎ অব্দি বুঝিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। ভাষাবিজ্ঞানের চেনা ক্রমকে পালটে তিনি বাক্যতাত্ত্বিক, রূপতাত্ত্বিক আলোচনা সেরে ধ্বনি তত্ত্বে এসেছেন। ভাষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টির থেকে তিনি লিখছেন, স্বল্পশিক্ষিত নিম্নতর শ্রেণির মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না এই লিপি কাঠামোকে গড়ে তোলা। প্রথমত প্রতিবেশী লিপিগুলোর সঙ্গে কোনো রকম বিভ্রান্তি এড়াতে এরা নতুন বর্ণ গড়েছেন। তাঁরা জানতেন একটি বাংলা ভাষাবৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করছেন, ফলে মনে হয়েছে আরবি ফারসির বদলে দেবনাগরি বর্ণবিন্যাসকে আশ্রয় করলেই ভাষার প্রয়োজনটি মিটবে ভালো। উচ্চারণ অনুসারে লিপি গড়তে গিয়ে ধ্বনি প্রতি একটিই হরফ রেখেছেন। উদাহরণ স্বরূপ শিষধ্বনির জন্যে বাংলাতে যেখানে তিনটি  বর্ণ রয়েছে, সিলেটি নাগরিতে রয়েছে একটি মাত্র। ফলে বর্ণমালাটি রপ্ত করা নিশ্চয় সহজ হচ্ছিল। যদিও যুক্তাক্ষর নিয়ে তিনি বিশেষ কথা বলেন নি। আশা করেছেন, আরো যেসব শতাধিক পুথি বা বই উদ্ধার করা গেছে সেগুলোর একটি তুলনামূলক আলোচনা ভাষা এবং লিপি সম্পর্কে আরো সব নতুন দিক খুলে দেবে। 
আবিদ রাজা মজুমদার নিজেও ভাষাতাত্ত্বিক, সম্পাদিকার কাজের সহকর্মী । প্রচুর ক্ষেত্র অনুসন্ধানে সঙ্গ দিয়েছেন। মূলত এর উপরে ভিত্তি করেই বরাক উপত্যকাতেই যারা এখনো নাগরি পুঁথি পাঠ করেন সেরকম জনাকয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছেন। যেমন হাইলাকান্দির ফরাস উদ্দীন চৌধুরী, বাঁশকান্দির শেখ ফরিজ আলী, শেখফকির আলী প্রমুখ। পুঁথি কারা পড়েন, কীভাবে পড়েন সেইসব কথাই লিখেছেন তিনি। সেই সঙ্গে এসেছে বরাক উপত্যকার ভূগোল,ইতিহাস এবং জনগোষ্ঠীগত বৈচিত্র্যের উৎস কথা।
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ৫
সাদিয়া চৌধুরী পরাগের পরবর্তী বাংলা প্রবন্ধটিও একই পথে হেঁটেছে। তিনি মূলত তাঁর বাংলাদেশের বাড়ির মহিলাদের মধ্যে নাগরি পুথি পড়ার কথা স্মৃতি থেকে লিখেছেন। প্রথম ভাগে তিনি অত্যন্ত সংক্ষেপে নাগরি সাহিত্যের উদয় এবং বিলয়ের কারকগুলো বলবার চেষ্টা করেছেন । শাহজালাল এবং তাঁর অনুগামীদের দ্বারা ভাষায় ভাবনায় পরিবর্তনের একটি প্রেক্ষাপটের কথা স্বীকার করেও গোলাম কাদিরের সাক্ষ্যে আস্থা জানিয়ে তাঁরও বক্তব্য মোঘলদের দ্বারা পরাস্ত আফগানেরাই এই লিপির উদ্ভব এবং বিকাশ ঘটান। ঔপনিবেশিক আমলে বাংলাকে বিধর্মীদের ভাষা বলে প্রচারকে মোকাবেলা করতেই সিলেটে সিলেটি নাগরি সাহিত্যের প্রচার প্রসার বাড়ে। উর্দু-আরবি ফার্সি শব্দপ্রয়োগ হলেও, সিলেটি ভাষারীতির মিশ্রণ ঘটলেও ভাষা এগুলোর বাংলাই। এবং বিষয়ে আসয়েও কেবলই ইসলামী বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, রামায়ণ, মহাভারতের কাহিনি, পদ্মাপুরাণ ইত্যাদি সহ ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়েও পুথি লেখা হয়েছে।  শিক্ষাদীক্ষাতে কোণঠাসা মুসলমান সমাজের কাছে এই সাহিত্য একটি বিকল্প নিয়ে এসেও হাজির হয়। পাকিস্তান আমলের বাংলা ভাষা আন্দোলন যে ঐক্য গড়ে তুলে তাতে সিলেটি নাগরি সাহিত্যের সেই উচ্ছ্বাস স্তিমিত হতে শুরু করে, এবং মুক্তি যুদ্ধের পরে আর স্বাতন্ত্র্য টিকিয়ে রাখবার দরকারটাই নেই হয়ে যায়। তাছাড়া জমিদারি প্রথার অবলুপ্তি, সর্বজনীন শিক্ষা বিশেষ করে নারীদের ব্যাপকভাবে শিক্ষাতে নিয়ে আসাতেও এই সাহিত্যের পাঠক কমে যায়। সাহিত্যের পাঠক এখন আবার বেড়েছে কি না, আমাদেরও জানা নেই । কিন্তু বাংলাদেশ থেকে মূলত  বিলেত প্রবাসী কিছু সিলেটির উদ্যোগে আন্তর্জাল জমানাতে যে নতুনকরে লিপি এবং সাহিত্যকে পুনর্জীবিত করবার প্রয়াস চলছে, সেই সংবাদ সম্ভবত তাঁর কাছে পৌঁছোয় নি। বস্তুত সংকলন সম্পাদিকার কাছেও পৌঁছোয় নি।  
সামসুল হক বড়ভূঁইয়ার  রচনাটি আবিদ রাজা মজুমদারের পরিপূরক বললেই হয়। তিনি ক্ষেত্র অনুসন্ধানে সোনাই এলাকায় যাদের কাছে পুথি দেখেছেন সেরকম জনাকয়েক ব্যক্তির এবং সংগৃহীত পুথির নামোল্লেখ করেছেন। এখনো কোথাও কোথাও কিছু পুথি পড়া হয় বলে জানিয়েছেন। বিশেষ করে মহরম মাসে ‘জংগনামা’ গান এবং নাচের প্রচলন আছে বলে জানিয়েছেন। 
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ৬
তৃতীয় পর্বে সিলেটি নাগরি সাহিত্যের সামাজিক তথা ঐতিহাসিক তাগিদটিকে  বুঝবার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রথম নিবন্ধটি লিখেছেন স্বপন মজুমদার। তিনি প্রাকৃতিক তথা অকৃত্রিম এবং কৃত্রিম ভাষা তথা লিপির তফাৎটিকে বুঝবার চেষ্টা করেছেন। কখনো একটি পুরো ভাষাই গড়ে তুলা হয় কৃত্রিম ভাবে যেমন আস্পারেন্তো। আবার ভারতে যখন বহু প্রান্তিক ছোটখাটো জনজাতিদের ভাষাতে লেখালেখি সম্ভব করে তুলতে রোমান লিপির ব্যবহার করা বা করানো হয়---তখন লিপিটি হয়ে যায় কৃত্রিম। সিলেটি নাগরি সেরকম এক কৃত্রিম লিপি। সেই কৃত্রিমতা কখনো প্রতাপের নিজের দরকারে ঘটতে পারে, কখনো বা তাকে প্রতিহত করতে। যখন একদল মানুষে ভেবেছেন স্বাভাবিক বাংলা ভাষা এবং লিপিতে নিজেদের কথা বলবার স্বাভাবিক অধিকার পাচ্ছেন না তখনই এই লিপির দরকার মনে করছেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি চর্যার ‘সান্ধ্যভাষা’র কথাও এনেছেন। যেখানে  বাইরের এবং ভেতরের বার্তা ভিন্ন। ‘সান্ধ্যভাষা’তে অবশ্য শুধু ব্যবহারিক ভাষারই কথা বোঝায় না,কাব্যভাষাকেও বোঝায়—যেখানে শব্দের আভিধানিক এবং ব্যঞ্জনার্থ ভিন্ন---সেই কথাটি মনে হল না তিনি মনে রেখেছেন। তাতে অবশ্য সমস্যা বিশেষ হয় না। ঐতিহ্যের দিক থেকে তিনি চর্যার সাহিত্য এবং সিলেটি নাগরি সাহিত্যকে একই গোত্রের মনে করছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ নিছক কোনো সাম্প্রদায়িক প্রেরণাতে লিপিটির উদ্ভব হয় নি, হয়েছে সংগ্রামী প্রেরণার থেকে। বাংলা ভাষা এবং লিপিতে অশিক্ষার ফল এই লিপি তাও নয়। এমনকি উনিশ শতকে ছাপা সাহিত্যে জোয়ার আসবার পেছনে  খৃষ্টান মিশনারিদের প্রতিরোধ করবার তাগিদও কাজ করেছে, যে মিশনারিদের পেছনে কিনা শাসকদেরও প্রশ্রয় ছিল মূলত তিনটি বই ‘পহেলা কিতাব’, ‘আহকামে চরকা’ এবং ‘চরকাফাজিলত’এর উপর ভিত্তি করে তাঁর বক্তব্য তিনি দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ব্রাহ্মি লিপি বৌদ্ধদের হাত ধরেই এই অঞ্চলে এসে থাকবে। তাঁর লেখাতে দেবনাগরি এবং নেওয়ারির দুই বিকল্প নামও তাঁর লেখাতে পাচ্ছি –যথাক্রমে দেশনাগরি এবং নাগরি। সিলেটি নাগরিতে এই দুইয়েরও প্রভাব থেকে থাকবে। আমরা জানি দেবনাগরি , নেওয়ারি বাংলা বা সিলেটি নাগরি সবই ব্রাহ্মিরই দ্বিতীয় সহস্রাব্দের বিচিত্র রূপান্তর। আর ব্রাহ্মিই সরাসরি এসেছিল, বা বৌদ্ধদেরই হাতে করে এসেছিল---সেরকম বক্তব্য সামান্য সমস্যাসঙ্কুল। কিন্তু একটি নতুন প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। ‘ব্রাহ্মি’ সম্পর্কে এই অভিমতকে দেখা যাচ্ছে সম্পাদিকাও তাঁর সমাপ্তি মন্তব্যতে অস্বীকার করছেন না। কিন্তু দুজনের কেউই কোনো তথ্য দেন নি। আমরা কিন্তু ব্রাহ্মিকে সরাসরি এই এলাকাতে আসবার নজির বিশেষ পাইনি, এলেও সেটি প্রথম সহস্রাব্দের প্রথমদিকেই আসা সম্ভব ছিল। ব্রাহ্মি গুপ্ত স্তর পার করে একদিকে দেবনাগরি, অন্যদিকে কুটিল-কামরূপী স্তর পার করে বাংলা-অসমিয়া লিপিস্তর অব্দি এসেছে। এবং সিলেটে সর্বপ্রাচীন যে লিপিটি মিলেছে সেই নিধনপুর ফলকের লিপি কিন্তু কুটিল-কামরূপী। ফলে সেই সময় বা তারপরে আবার বৌদ্ধদের হাত ধরে ব্রাহ্মির চলে আসাটি সত্য হলেও ইতিহাসকে আরো বহু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাবে।  রিলা মুখার্জি চন্দ্ররাজাদের ফলকে দুই একছত্র নাগরি লিপির যে কথাটি লিখেছিলেন, সেটি বরং সত্য হওয়াই সম্ভব। আনুষঙ্গিক আরো বহু নজির যেমন আছে, তেমনি এই সময়টাই  প্রত্নরূপ ছেড়ে একদিকে নাগরি আর দিকে বাংলা-অসমিয়া লিপির জন্মক্ষণ।
(C)নববার্তা প্রসঙ্গ কিস্তি ৭
স্বপন মজুমদারে ভাবনকেই আরো গভীরে নিয়ে গেছে সম্পাদিকা অনুরাধা চন্দের ইংরেজি লেখাটি, যার  শিরোনামের বাংলা ভাবার্থ দাঁড়ায় ‘সত্যিকার মুসলমান হয়ে উঠা: সিলেটি নাগরি অভিজ্ঞতা’। স্বপন মজুমদার যদি এই তথ্য জানিয়েছেন যে সুফিরা মধ্য এশিয়াতেই বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনের সংস্পর্শে এসেছেন, অনুরাধা তবে এই তথ্যও জানিয়েছেন কামরূপের যোগ দর্শনের বই ‘অমৃতকুণ্ড’ আরবি ফার্সিতে অনূদিত সুফিদের দ্বারাই মধ্য এশিয়া অব্দি ছড়িয়ে পড়ছে...এমন আরো বহু গ্রন্থ পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে সুফিদের দ্বারা অনূদিত হচ্ছে এবং ইসলামী বিশ্ববীক্ষার ভেতরে গ্রহণ করে মানানই করা হচ্ছে। সুসংগঠিত হিন্দু বা ইসলাম ধর্মের প্রতাপের বাইরে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম, সহজিয়া বৈষ্ণব এবং নাথ ধর্মের সঙ্গে সুফি দর্শনের বিচিত্র রসায়নের ইতিবৃত্ত তিনি বর্ণনা করছেন। চারটি পাঠ তিনি নিয়েছেন ‘পহেলা কেতাব’, ‘রাধাপিয়ারি’ , ‘মুফিদুল মুমিন’ এবং ‘মুফিদুল আওয়াম’ । এর মধ্যে দ্বিতীয়টি ছাপা নয়। এর চারপুথিই যদিও প্রায় একই সময়কার--- ‘সত্যিকার মুসলমান’ হবার কাহিনি কেমন পালটে যাচ্ছে তার চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। নাগরি লিপি তর্কের বাইরেও সামাজিক ইতিহাসের পাঠ হিসেবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা।  প্রথমটিতে শরিয়তি ইসলামকে বিরোধিতা করা হচ্ছে। দ্বিতীয়টিতে সংশয় ‘ চিনিতে না পাইলাম আমি কুনু জন দানা’। তৃতীয়টিতে শরিয়তি পথকে স্বীকার করে নিয়েও মারিফতিকে বর্জন করা হয় নি, কিন্তু চতুর্থটিতে   একদিকে  সুফি সাধুদের সরাসরি ‘শয়তানের খলিফা’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ইসলামের বিবর্তনটি স্পষ্ট ধরা পড়ে। রিচার্ড  ঈটন কিন্তু অনুরাধা চন্দের পড়া রয়েছে। আমরা যে ঈটনের অন্তর্ভুক্তি, পরিচিতকরণ এবং প্রতিস্থাপনের তত্ত্বটির কথা লিখে এসেছি অনুরাধার নিবন্ধটি কিন্তু সেই তত্ত্বকেই আরো পোক্ত করে। তিনি কেন বা সেই তত্ত্বের উল্লেখ করলেন না, আমাদের কৌতূহল জাগে। দু’জনের বক্তব্য খুবই কাছাকাছি। কিন্তু উল্লেখ না করবার ফল হয়েছে এই যে  এককালিক ভিন্নস্বরের  পাঠ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখিকা লিখছেন, ভালো বা সত্যিকার মুসলমানের ধারণাকে কোনো এক সংজ্ঞার মধ্যে ধরা যাচ্ছে না। মুসলমান সমাজকেও পরিচিতিতে বেঁধে ফেলা যাচ্ছে না।এটি সত্য বটে --- কিন্তু একে কালক্রমিক বিবর্তন বলে ধরে নিতেও অসুবিধে নেই। যদি আমরা মনে রাখি যে পঞ্জিকার কাল এবং সামাজিক বিভিন্ন স্তরের কালের ধারণা ভিন্ন হতে বাধ্য। একই কালে বহু কাল সহবাস করতেই পারে, আর সেটিই হয়েছে। দইখুরা আর তাঁর ‘রাগে’র প্রথম সম্পাদকের কালতো স্পষ্টতই ভিন্ন, চিন্তাপ্রস্থানও দুই বিপরীত মেরুর। নন্দলাল শর্মা এর পরে শিতালং শাহের যে পরিচয় দিয়েছেন তাতেও প্রথম দুই স্তর একই ব্যক্তিতে অস্পষ্ট থাকে নি। অনুরাধার আলোচিত শেষ দুই গ্রন্থে যে ইসলাম ধরা দিয়েছে তাকে তিনিও ‘Modernity’ বলছেন। যথার্থই বলেছেনএইসব ধর্মীয় সরলরৈখিক অবস্থানকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলাটাই আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসার অভাবটিকে ভালো চেনায়। এগুলোতে মেয়েদের মাঠে কাজ করতে মানা করা হচ্ছে, এবং পর্দাপ্রথা অনুসরণ করতে বলা হচ্ছে। ঠিক সেই সময় যখন বর্ণহিন্দুদের মধ্যে মেয়েদের পর্দার বাইরে বের করে আনবার সামাজিক সংগ্রাম চলছে। আমরা যদি মনে রাখি বর্ণহিন্দুরা ছিলেন মূলত জমিদার, এবং মুসলমান মূলত তাদের রায়ত তথা কেউ কেউ জোতদার---তবে ধর্মের বাইরে বেরিয়ে এই বৈপরীত্যের একটি আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক কারকের সন্ধান মেলা খুব অসুবিধে হবার কথা নয়। বস্তুত কালান্তরের বিপরীতে ‘সামাজিক স্থানান্তর’এর একটি ভাবনাতেও পেয়ে বসে।
শেষ তথা পরের  বাংলা রচনাটি শিতালং  শাহ ও তাঁর গান নিয়ে নন্দলাল শর্মার লেখা। এর প্রথম ভাগে তিনি স্বাভাবিক ভাবেই সিলেটের, সিলেটি নাগরি লিপি এবং সাহিত্যের, সাধারণ ভাবে ‘মরমী’ দর্শন এবং সাহিত্যের বিকাশ এবং পরিবেশের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করে শিতালং শ শাহকে নিয়ে লিখবার পরিবেশটি গড়েছেন। শেষভাগেই শিতালং  শাহের জীবন, সাধনা এবং গান নিয়ে বিস্তৃত লিখেছেন। বাউল সুফিদের অনেকেই নিজেদের গানের লেখা বা ছাপারূপ দেবার বিরোধী ছিলেন। শিতালং  শাহও তাই। সুতরাং সেই অর্থে তাঁকে লেখক বলা যাবে না।মূলত গোলাম কাদিরের অভিমতের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরও অভিমত সিলেটি নাগরি লিপি সপ্তদশ শতকের আগেকার নয়। তাঁর অভিমত এই লিপিতে সিলেটি তথা বাংলা  ছাড়াও অন্যান্য ভাষার সাহিত্যও কিছু কিছু মেলে। যদিও বা  এই লিপিতে প্রেমকথা, শাস্ত্রাচার এমন কি উনিশ বিশ শতকে সমকালীন সমাজবাস্তবতা নিয়েও  কিছু পুথি মেলে তবু বিশেষ ভাবে ফকিরদের দ্বারাই এই সাহিত্য ‘শাসিত’ বলে একে ‘ফকিরি লিপি’ও মনে করা যেতে পারে। তিনি সিলেটে অধ্যাপনা করেন। ‘সাধক কবি ফকির শিতালং  শাহ’ নামে একটি সংকলনগ্রন্থেরও সম্পাদনা করেছেন।  সুতরাং তিনি যখন লেখেন এখন আর কাছাড় ছাড়া কোথাও বিশেষ এই সাহিত্য গান করে পড়া হয় না---তখন তথ্যটি নজরে না পড়ে থাকে না। শিতালং  শাহ ১৮০০ খৃষ্টাব্দে করিমগঞ্জের শ্রীগৌরীর কাছে কিত্তা শিলচর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর সুফিতত্ত্বশ্রয়ী এবং ইসলামী দুই ধরণের  গানই মেলে। ‘রাগ শিতালঙ্গী’ নামে তার গানগুলো কাছাড় সিলেটে এক সময় বেশ জনপ্রিয় ছিল।সুফিগানগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই বৈষ্ণবীও ছাপটিও স্পষ্ট। লেখক যদিও শিতালঙের সুফিগানগুলোকে ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের গান’ বলে লিখেছেন, আমাদের মনে হয় এগুলোই প্রথম পর্যায়ের। শরিয়তি এবং মারিফতি পথের দ্বন্দ্ব একটি তাঁর মধ্যে কাজ করেছিল। যে দ্বন্দ্বটি কিনা সময়ের দ্বন্দ্ব বলে অনুরাধা চন্দ স্পষ্ট করেছেন চারজন গীতিকবির পাঠ নিয়ে আলোচনাতে। বিয়ের আগে  তিনি ভুবন পাহাড়ে বহুদিন থেকে সাধনা করবার সংবাদ পাচ্ছি। সেই সাধনার পথ শরিয়তি হতে পারে না। অনুরাগীদের থেকে সংগৃহীত গানের কালক্রম অবশ্য নির্ণয় করা কঠিন। কিন্তু মারা যাবার পরে তাঁর মাজার কেন্দ্রিক কোনো অনুষ্ঠানাদি যাতে না হয় সেই নির্দেশিকা দিয়ে গেছিলেন দেখে মনে হয়, ক্রমেই তিনি মারিফতি পথ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। সেই নির্দেশ এতোই প্রভাবী ছিল যে বহুদিন তাঁর মাজার অরক্ষিত ছিল, পরে সাধারণ দেয়ালে ঘিরে দিলেও উরুস বা সেরকম কোনো অনুষ্ঠানাদি হয় না। নন্দলাল শর্মা শিতালং  শাহের বেশ কিছু গানের কলি উদ্ধার করে দিয়েছেন  । তাতে একটি বিষয় বেশ বোঝা যায়, ইসলামী গানগুলোর কোনো কোনোটিতে সমকালীন সামাজিক দ্বন্দ্ব বেশ স্পষ্ট। সেদিক থেকে এগুলোতে একটি ‘আধুনিকতা’র ছাপ আছে। যেমন “ বিদদা শিকখা লেখাপড়া ছআলেতে ধুম/ শও কথা নেক আমল হইতেছে গুম/... ফরকন্দাজ মাঝে গেল উঠিয়া শরম/ মাতাপিতারে করে বেহদ্দ ছিতম”। অন্যদিকে শৈল্পিক রুচিতে সুফিগানগুলোই উতরে গেছে বলে মনে হয়। এই যেমন একটি গানের দু’চারটি চরণ এরকম: “ জালাই মমের বাতি পুশাইলাম সারা রাতি গ/ ফুল বিছানাএ আতর ছিটাই ইনতেজার বেদনি।।/ হরেক রংএ জনতর বাজে হরেক কুঠাএ গুপি শাজে গ/ খালি গিরদক কুলে লইআ পুশাইলাম রজনি।” লেখকের দাবি সিলেটি নাগরী সাহিত্যেই নয়, “বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও শিতালং শাহ একজন কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব।’
রাধারমণ, হাছন রাজা,লালন ফকিরের গানের পাশাপাশি অতিসাম্প্রতিক আবদুল করিমের গানও যেখানে আমরা আবাল্য শুনে বড় হয়েছি , সেখানে করিমগঞ্জ তথা আসামের কবি শিতালং শাহের গান কেন আধুনিক গীতিমাধ্যমগুলোতে আর সেরকম শোনা যায় না সেটি আমাদের ভাবতে বসায়। শুধু ‘দোহার’ বাংলা বেণ্ড একটি গান ‘শুয়া উড়িল’কে সম্প্রতি আবার বেশ নাগরিক স্রোতাদের মধ্যে নিয়ে এসেছে, এর বাইরে আমরা বহু সন্ধানেও পাই নি।
‘স্ক্রিপ্ট আইডেন্টিটি রিজিওন’-এর মতো বই সাধারণত জনপ্রিয় হয় না। আর জনপ্রিয় না হবার সমস্যা হচ্ছে আগ্রহী জিজ্ঞাসু মনও সহজে এসবের সন্ধান পান না। আমাদের আলোচনা যদি বইটি সম্পর্কে সামান্য পরিচিতি বাড়াতে সাহায্য করে, সেই সঙ্গে পড়বার আগ্রহ এই ভেবেই শ্রম স্বীকার করা।
সিলেটি নাগরি নিয়ে দুটি ধারণাকে আমাদের অন্ধবিশ্বাস বলেই মনে হয়েছে। এক, লিপিটি শাহজালাল বা তাঁর সঙ্গী আউলিয়াদের দ্বারা প্রচলিত। বা তাঁরও আগে প্রচলিত ছিল। তাঁরা একে জনপ্রিয় করেছেন। দুই, সিলেটি লিপি আলাদা তাই ভাষা আলাদা। এই বই এবং অন্যত্র অনুসন্ধান করেও এই দুই সিদ্ধান্তের পক্ষে আমরা কোনো যুক্তি পাই নি। সেই চতুর্দশ শতকে বাংলাদেশে আর কোনো লিপিতে সেরকম সাহিত্যের সন্ধান মিলছে না, মিলবে কেবলই সিলেটি নাগরিতে--- যুক্তি হিসেবেও খুব সবল নয়। যারা এমন দাবি করছেন তারা বাকি বাংলার ইতিহাস নিয়ে বেশি ভাবতে আগ্রহী বলে আমরা দেখিনি। এই বইতেও না, অন্যত্রও না।  আর লিপি জনপ্রিয় করবার জন্যে সিলেটি বা বাঙালি তায় মুসলমান এক বিশাল জনসম্প্রদায়ের দরকার। যেটি মোঘল আমলের আগে সিলেট কাছাড় অঞ্চলে হয় নি। মোঘলেরাও বাংলা ভাষাকে সেরকম প্রশ্রয় দেন নি। ফলে বাংলা আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে। আরাকানে, কাছাড়ে, কোচ-কামতাপুরে, ত্রিপুরাতে। তার বাইরের লোকজন একটি ‘সান্ধ্যভাষা’র উপকরণ  হিসেবে সিলেটি নাগরির আশ্রয় নিচ্ছেন -- যে প্রক্রিয়াটির কথা স্বপন মজুমদার এই বইতেই ব্যাখ্যা করছেন, সেসব অনেক বিশ্বাস এবং গ্রহণযোগ্য।
দ্বিতীয়ত সিলেটি নাগরি অনেকটা বৈষ্ণবপদের ‘ব্রজবুলি’ ভাষার মতো। যে ভাষাতে কথা বলবার আদৌ কোনো জনসম্প্রদায় নেই। এমন কি সব বৈষ্ণবেরাও সেই ভাষা ব্যবহার করতেন না। সিলেটি নাগরি সেরকম মূলত ‘সুফি’, ‘বৈষ্ণব’ গানে ব্যবহৃত লিপি। বাকি যা কিছু বিষয় বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে  সবই উনিশ শতকের ষাটের দশক থেকে বিশ শতকের ষাটের দশক অব্দি এক শতকের ছাপা গ্রন্থের বাজারের স্বার্থে। এই শতকে সিলেটিরা বাংলা লিপি ব্যবহার করেছেন তার চে’ বহু বেশি। আর লিপি আলাদা হলেই যদি ভাষাকে আলাদা হতে হয়, তবে বাংলা লিপি বলে যেটিকে জানি সেটিকে সংস্কৃত ভাষাই বা কেন বলা যাবে না? বাঙালি তো এই লিপিতেই সংস্কৃত চর্চা করে।আরবি, রোমান, সিলেটি নাগরি সহ বাংলার প্রায় নটি লিপি ছিল, সিলেটি তার মধ্যে একটি। আর ছাপাখানার মুখ দেখেছে রোমান, বাংলা এবং সিলেটি নাগরি লিপি। এই তিনটি। সেই গৌরব তার প্রাপ্য। সম্প্রতি আন্তর্জালে ইউনিকোডেও এসেছে এই লিপি। তাই বলে সাহিত্যিক অন্তর্বস্তুর কোনো ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ছাড়াই, লিপির ইতিহাসের কোনো অনুসন্ধান ছাড়াই দাবি করা হবে সিলেটি ভাষার লিপি  সিলেটি---সেসব আমাদের অন্ধ বিশ্বাস বলে মেনে নিতে অসুবিধে থাকবার কথা নয়।
অনুরাধা চন্দ এবং সহযোগীদের প্রয়াস সেই সব বিশ্বাসের ভিত নড়বড়ে করে দিয়ে নাগরি সাহিত্যের দিকে নজর ফেরাবে বলে আশা করা চলে। তবে পরবর্তী কোনো প্রয়াসে যেন আন্তর্জাল প্রয়াসগুলোও অন্তর্ভুক্ত হয়। বিলেত থেকে যে প্রয়াসগুলো হচ্ছে তার ব্যাপ্তি বহু ব্যাপক। বিলেতের অধিকাংশ বাঙালিই কিন্তু সিলেটি। সুতরাং তাদের বাস্তবতা বোঝাও আমাদের কাজ। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় এমনি এমনি তাদের প্রয়াসে যুক্ত হয় নি। তাদেরই প্রেরণাতে বাংলাদেশে ইতিমধ্যে আবারও নতুন প্রকাশনা সংস্থা গড়ে উঠছে, যারা সিলেটি নাগরি বই পত্র প্রকাশ করছেন। সেলিম মুস্তফার ‘উৎস প্রকাশন’ সেরকম একটি। সুতরাং নন্দলাল শর্মা লিখতে পারেন পুথি পড়া সংস্কৃতি বাংলাদেশে নেই,কাছাড়ে আছে। পুথি ছাপানো সংস্কৃতি কিন্তু বাংলাদেশে দিব্বি আছে। সেগুলো আন্তর্জালেও সুলভ। স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের নতুন নজরে তাকাবার কাজ ফুরোচ্ছে না।
                                                   ------ ---- ----




Saturday, 7 September 2013

অসমিয়া ভাষা, সিলেটি উপভাষা এবং অসমে ভাষাচর্চার রূপরেখা

                 এই ভিডিও শুনতে সাইডবারের ভিডিও বন্ধ করুন)            

              (লেখাটি  বাঙ্গালনামাতে বেরুলো । এলেখার দ্বিতীয় অংশ রয়েছে এখানে। এছাড়াও আছে  দুই কিস্তিতে এখানে এবং এখানে  বাংলামেইল ডট কম-এ)       
                                                   

          ।। সিলেটি  উপভাষা   এবং  বরাক  উপত্যকার   ভয়  ।। 
              বাংলার উপভাষা সিলেটি নিয়ে অসমের বাঙালি যত না চর্চা করেছে বিদগ্ধ অসমিয়া পন্ডিতেরা তার চেয়ে বেশি আলোচনা করেছেন। সেপ্টেম্বর ২০১০এ প্রকাশিত 'বাঙ্গালনামা'র দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যাতে প্রকাশিত 'প্রসঙ্গ সিলেটি ভাষা' লেখাতে সঞ্জীব দেব লস্কর লিখেছেন, “ইতিমধ্যে সিলেট মদনমোহন কলেজের প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ প্রণব সিংহ, বরাক উপত্যকার জন্মজিৎ রায়, আবুল হোসেন মজুমদার, ঊষারঞ্জন ভট্টাচার্য কিছু কাজ করেছেন, একটি সম্পূর্ণ অভিধান, বলা চলে কোষগ্রন্থই রচনা করেছেন জগন্নাথ চক্রবর্তী, আর আবিদরাজা মজুমদারের আরেকটি অভিধানও প্রকাশের পথে। বর্তমান লেখকের এ দিকে মোটেই কোনো বিশেষ পাঠ বা অনুধ্যানই নেই।” সঞ্জীব যাদের নাম করেছেন তাদের মধ্যে প্রণব সিংহের সঙ্গে বর্তমান লেখকের পরিচয় নেই। বাকিরা প্রত্যেকেই গবেষক-অধ্যাপক তথা শিক্ষক এবং বহু গ্রন্থের লেখক বটে।  উষা রঞ্জন অনুবাদ সাহিত্যে সাহিত্য একাদেমি পুরস্কারও পেয়েছেন এবং বর্তমান লেখকের শিক্ষক।   কিন্তু সম্ভবত কেউই  পূর্ণকালীন ভাষা গবেষক নন। কেবল মাত্র সম্প্রতি প্রকাশিত জগন্নাত চক্রবর্তীর অভিধান দেখায় গুণগত ভাবে  প্রয়াসগুলো যাই হোক না কেন, পরিমাণগত দিক থেকে তাঁর ভাষা অধ্যয়ন বেশ  সুগভীর এবং আন্তরিক। যদিও তিনি 'বরাক বাংলা' বলতে ঠিক কোনটিকে বোঝাতে চেয়েছেন সেই প্রশ্নটি অস্পষ্ট থেকেই গেছে। সঞ্জীব বরাক উপত্যকার  বিদগ্ধ লেখক । তাঁর কথাতে  নির্ভর করতে পারি ।
      
লামডিং থেকে প্রকাশিত কাগজ 'সৃজনে' প্রকাশিত এই লেখা
               সঞ্জীব সঙ্গতকারণেই “...এ সময়ের কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে”  অভিযোগ জানিয়ে লিখেছেন,  “... এ উপভাষাকে একটা ভাষার স্খলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেও প্রয়াসী।” তিনি বেশ উৎসাহ ভরে লিখেছেন ,”... এখন শিল্প সংস্কৃতির রাজধানী কলিকাতায় জিন্স পরা ইলেকট্রনিক যন্ত্র হাতে নাগরিক ব্যান্ডের শিল্পীরা           (দোহারঃ লেখক) দুনিয়ার যত বাঙাল কবির পদ গেয়ে আসর জমিয়ে রাখছে। সিলেটি হাসন রাজাকে তো কবিগুরু অনেক আগেই জগৎ সভায় প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন। ...আমাদের ভাষাপৃথিবীর এই যে বিস্তৃতির সূচনা, এটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে বিভিন্ন ঔপভাষিক অঞ্চলের বাঙালিদের সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন।” কিন্তু এর পরেই  লিখলেন, “এ অবস্থায় বরাক উপত্যকার বাঙালিরা সিলেটি ভাষা, অর্থাৎ উপভাষা নিয়ে অতি উৎসাহী হলে, এদের ভাষিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে সদা সচেষ্ট এক শ্রেণির অসমিয়া নেতৃত্ব একটা বিশেষ মওকা পেয়ে যেতে পারেন।” এই শেষোক্ত মন্তব্য একটি ধোঁয়াসা তৈরি করে ।  এটি বরাক উপত্যকার  বিদ্যায়তনিক মহলে একটি প্রতিষ্ঠিত অভিমত। এক গড়ে তোলা চিহ্ন বিশেষ। এই ভয়ের স্পষ্ট কারণ হলো সিলেটি আর অসমিয়ার মধ্যেকার মিলগুলো খুবই চোখে পড়বার মতো । তাতে করে সুনীতি চট্টপাধ্যায়ের ছাত্র বাণীকান্ত কাকতি বাদে প্রায় সমস্ত অসমিয়া ভাষাতাত্বিক সিলেটিকে অসমিয়া বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করেন। এই তালিকাতে শেষতম সংযোজন ড০ উপেন রাভা হাকাচাম ।
                  অসমিয়ারা উপভাষাটিকে দখল করে নেবেন এই ভয়ে সিলেটি নিয়ে বেশি চর্চা না করবার, নাটকে, গল্পের সংলাপে সিলেটি ব্যবহার না করবার, রেডিও, টিভিতে সিলেটি ব্যবহার না করবার পরামর্শ বরাক উপত্যকার বেশ খ্যাতনামা বিদগ্ধজনেরা দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসছেন। তাদের মধ্যে অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য, 'সাহিত্য' সম্পাদক বিজিত ভট্টাচার্যও রয়েছেন।  যে চিহ্নায়নের প্রতাপেই অসম তথা বরাক উপত্যকাতেই , শুধু যে এই উপভাষা  নিয়ে  তাই নয়, সামগ্রিক ভাবেই ভাষা নিয়ে বাংলাতে অধ্যয়ন হয়েছে অতি অল্প। ১৯শের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কতটা সঠিক ভাবে কে লিখলেন তাই নিয়ে সেখানে রীতিমত প্রতিযোগিতা  চলে, হয় না শুধু ভাষা নিয়ে কোনো অধ্যয়নের প্রয়াস। অথচ, গোটা পূর্বোত্তরের অঙ্গ হিসেবে বরাক উপত্যকাও  যেহেতু এক বহু ভাষিক অঞ্চল ভাষা গবেষণার পক্ষে অঞ্চলটি প্রায় অনাবিষ্কৃত সোনার খনি। এই অভিমতটি অনেকটা এরকম -- নিজের সুন্দরী বৌকে বেশি লোক দেখিয়ে বেড়ানোর দরকার নেই , কেননা প্রতিবেশি মাতব্বরের  চোখ রয়েছে তার উপর !!! সুতরাং বোরখা চাপাও, ঘোমটা চড়াও। আড়াল করো, পর্দা টানো ! রক্ষণশীলতা আর বলে কাকে ! 
                  এই যে সঞ্জীব লিখলেন, “এক শ্রেণির অসমিয়া নেতৃত্ব একটা বিশেষ মওকা পেয়ে যেতে পারেন।” চিহ্নায়নের এমন প্রক্রিয়াতে তাঁরা যে  অসমিয়া ভাষাতাত্বিকদের  এমন মওকা  দিয়েই  বসে আছেন, এই সত্যও মনে হয় না বরাকের অনেকে জানেন। কারণ জানতে গেলেও চর্চা করবার উৎসাহ চাই। বরাক উপত্যকার ভাষাচর্চা করেন এমন এক বন্ধুর সঙ্গে সাম্প্রতিক এক আলোচনাতে তাঁকে যখন জানালাম যে অসমিয়াতে এক জাতীয় অভিধান লেখা হয়েছে আর সেটি গোটা অসমে বেশ হৈচৈ ফেলে দিয়েছে, তাঁর সদম্ভ উক্তি ছিল, “ধুস! অসমীয়াতে কি কেউ ভাষা তাত্বিক রয়েছে!” অথচ এই জাতীয় অভিধানের  তার তুল্য কাজ সত্যি বাংলাতে হয় নি , আর সম্ভবত হওয়া সম্ভবও নয়। এরা মুল ভাষার সঙ্গে অসমিয়ার সমস্ত উপভাষাকে এক জায়গাতে এনে জড়ো করে ফেলেছেন এই অভিধানে । প্রথম খন্ড বেরিয়েছে, আরো তিনটি বেরুচ্ছে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে  অন্যত্র অন্য সময়ে লেখা যাবে । বর্তমান লেখকের ধারণা সিলেটে যারা সিলেটিকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন তারাও ভাষাটি নিয়ে বেশ গভীরে গিয়ে কিছু কাজ করছেন। দেশে না পারুন বিলেতে তারা স্কুলে কলেজেও ভাষাটাকে শেখাবার কাজ করে ফেলছেন। সঞ্জীব “এদের পেছনে কিছু সন্দেহজনক চক্রও সক্রিয়” থাকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অথচ সঠিক অবস্থান হতো, এই প্রবণতার সমাজতাত্বিক কারণ অনুসন্ধান করা। সংশয়বাদ নতুন চিন্তার পথ খুলে দেয় বটে, কিন্তু অনেক সময় তা নতুন  চিন্তার পথ রুদ্ধও করে।  বিশেষ করে যদি সেই সংশয় পথচ্যুত হয়। কোনো 'চক্র' নিয়ে সন্দেহটা চরিত্রগত দিক থেকে ভাষাতাত্বিক নয়, রাজনৈতিক। এমন বৈদগ্ধ যেমন নিজের দৌর্বল্যকে প্রকাশ করে , তেমনি যার সঙ্গে মিতালি করে নিজের পথ করে নেয়াটা  খুবই সহজ তাকেই ঠেলে দেয় অহেতুক শত্রু পক্ষে। একটা অবৈরি দ্বন্দ্বকে করে রাখে বৈরি।
     কিছু অসমিয়া ভাষাতাত্বিক সিলেটিকে অসমিয়া বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করেন যদি এইমাত্র অপরাধে কেউ বলে উঠেন যে , “ধুস....স.....!” তবে রবীন্দ্রনাথ নিয়েও বলতে হয়,“ধুস! রবীন্দ্রনাথ ভাষাতত্বের কিছু বুঝতেনই না!” তিনি এক`বার লিখেছিলেন ,   “সেইজন্য বলিতেছিলাম, আসাম ও উড়িষ্যায় বাংলা যদি লিখন পঠনের ভাষা হয় তবে তাহা যেমন বাংলাসাহিত্যের পক্ষে শুভজনক হইবে তেমনিই সেই দেশের পক্ষেও। কিন্তু ইংরেজের কৃত্রিম উৎসাহে বাংলার এই দুই উপকণ্ঠবিভাগের একদল শিক্ষিত যুবক বাংলাপ্রচলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহধ্বজা তুলিয়া স্থানীয় ভাষার জয়কীর্তন করিতেছেন।” এই পর্যন্ত মনে হবে রবীন্দ্রনাথ নির্ভেজাল বাংলার পক্ষে বলছেন, আর কারো বিরুদ্ধে নয়। তার পরেই লিখছেন, “এ কথা আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, দেশীয় ভাষা আমাদের রাজভাষা নহে, যে-ভাষার সাহায্যে বিদ্যালয়ের উপাধি বা মোটা বেতন লাভের আশা নাই। অতএব দেশীয় সাহিত্যের একমাত্র ভরসা তাহার প্রজাসংখ্যা, তাহার লেখক ও পাঠক-সাধারণের ব্যাপ্তি। খণ্ড বিচ্ছিন্ন দেশে কখনোই মহৎ সাহিত্য জন্মিতে পারে না । তাহা সংকীর্ণ গ্রাম্য প্রাদেশিক আকার ধারণ করে । তাহা ঘোরো এবং আটপৌরে হইয়া উঠে, তাহা মানব-রাজদরবারের উপযুক্ত নয়।” (পৃঃ ৭৪১, ভাষাবিচ্ছেদ;পরিশিষ্ট,শব্দতত্ব; রবীন্দ্ররচনাবলী, ৬ষ্ঠ খন্ড;১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বিশ্বভারতী প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ) ।  অর্থাৎ তিনি অসমিয়া ওড়িয়ার মত ভাষাকে সাহিত্য চর্চার ভাষা বলেই ভাবছেন না । রচনাটি অবশ্যি পরে পরিত্যক্ত হয়ে 'শব্দতত্বে'র পরিশিষ্টে যুক্ত হয়েছে। আমার সেই পূর্বোক্ত বন্ধুটি এই একুশ শতকে এসেও রবীন্দ্রনাথের ফেলে আসা চিন্তার থেকে  বেশি এগুতে পারেন নি । দুটো ভাষার মধ্যে মিল দেখে যদি, অসমিয়ারা বলতে শুরু করে যে সিলেটি অসমিয়ারই উপভাষা তবে ওই একই যুক্তিতে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দাবিটিও দিব্বি দাঁড়িয়ে যায়। আর অসমিয়া হয়ে যায় বাংলা ভাষা, বাংলা হয়ে যায় হিন্দি, হিন্দি হয়ে যায় উর্দু! উর্দু হয়ে যায় পার্শি।  এমন হালকা যুক্তি, এক করে না। সাময়িক ভাবে ভয়ে আতঙ্কে  একাকার  করে রাখতে পারে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এই যুক্তিগুলো যে কেমন প্রবল বিভেদের বীজ বপন করে তা আমরা অসম , বাংলাদেশ, পশ্চিম বাংলা তথা উপমহাদেশের রাজনীতিতে বহুবার দেখেছি , আগামীদিনগুলোতেও  আরো অনেক দেখতে পাব। তার চে' কি ভালো নয় এই সন্ধিচুক্তিতে সই করা যে , “ভাই, কার ভাষাটি যে কি, তা  ঠিক করবে শুধু সেই যে ঐ ভাষাটিতে কথা বলে। অন্যে নয়।” 
    একালের এক বিদগ্ধ বাঙালি ভাষাবিদ পবিত্র সরকার এক জায়গাতে লিখেছেন , “যারা মনে করে, যে ভাষাটা বলছি সেটা বাংলা, সেটা আমার পরিচয়, তারাই বাঙালি।” কিন্তু এর পরেই তিনিও উল্টো সুরে গেয়েছেন , “কেউ কেউ 'বাংলা' নামটা জানেন না, কিন্তু তাঁদের ভাষা যদি পন্ডিতের বিচারে ব্যাপক বাংলার অন্তর্গত হয়, তাঁরাও বাঙালি।” ( বাঙালি কে?; ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ) এই 'পণ্ডিতে'র কর্তৃত্বের দরকারটা তাঁর মতো বাম শিবিরের ভাষাবিদেরও  পড়ে, কেননা  তাঁকেও যে রাজবংশীদের বাংলাভাষা বৃত্তের থেকে আলাদা হয়ে যাবার প্রবণতাকে 'শিক্ষবিস্তারের অসম্পূর্ণতার প্রমাণ' বলে অন্যত্র দেখাতে হবে! ( ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ;ঐ) এমন ,'শিক্ষবিস্তারের অসম্পূর্ণতার প্রমাণ' নিয়ে যাদের কাজকারবার তারাই শুধু দুটোভাষার ঐক্যের সূত্রগুলোকে দিয়ে অনৈক্যের মহিরুহ  বপন করতে পারেন। এই যে অসমিয়া, বাংলা,হিন্দি,উর্দু কিম্বা  পার্শি ---এগুলোর আলাদা ভাষানাম হবার কারণটাইতো   এই  যে ওদের মধ্যে প্রচুর মিল থাকা সত্বেও  কিছু অমিল রয়েছে যেগুলো নির্ধারক। এদের কেবল গঠন নয়, ভূগোল ইতিহাস এবং ব্যবহারকারীদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস   নির্ধারণ করে ওরা স্বতন্ত্র নামে পরিচিত হবে না  একই নামে।  'অসমীয়া আরু তিব্বত বর্মীয় ভাষা' বইতে উপেন রাভা হাকাচাম লিখেছেন, “ ভাষা-বিজ্ঞানর সহজ-সূত্রতে সীমাবদ্ধ না থাকি দুটা ভাষার আংশিক সাদৃশ্য দেখিলেই ইটো ভাষা যে সিটোতকৈ অধিক সমৃদ্ধশালী তাক জাহির করার প্রবণতাই নির্মোহ আলোচনার ব্যাঘাত ঘটাইছে।” এই একই  কথাতো  কেবল ভাষাগত গঠন দেখিয়ে দুটো ভাষার  এক নামে চিহ্ণিত করে ফেলবার প্রয়াস যারা করেন তাদের বেলাও খাটে। এমন প্রয়াস কেবল ভাষাতত্বেরই বিরোধী নয়, এই প্রয়াস রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক এবং ভৌগলিক ইতিহাসেরও  বিরোধী বটে।
     সিলেটি  তথা পূব বাংলার ভাষাগুলো যে অসমিয়ার  বেশ ঘনিষ্ট ভাষা এমন চিন্তার পথিকৃত কিন্তু স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ । সুনীতি চট্টপাধ্যায়তো সরাসরি লিখেই ফেলেছেন, “ The Bengali Dialects of the Extream east and south-east (Sylhet, Chittagong) are certainly more removed from Standard Bengali than is Assamese.” ( OBDL;পৃঃ১০৮) । ভাষা রাজনীতি ছেড়ে  ভাষা দুটোর  তুলনামূলক  ভাষাতাত্বিক অধ্যয়ন করলে কিন্তু  অনেক অনুন্মোচিত তত্ব আর তথ্য বেরিয়ে আসবার সম্ভাবনা এখনো প্রবল।  শুধু অসমিয়াই কেন, চাকমা, হাজং, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি,রাহবংশী ইত্যাদি ভাষার সঙ্গেও তুলনামূলক আলোচনা হতেই পারে। যদিও এই শেষোক্তভাষাগুলোকে বাংলা বলে চালিয়ে দেবার, 'শিক্ষবিস্তারের অসম্পূর্ণতার প্রমাণ' উপস্থিত করবার   ব্যামো থেকে আমরা নিজেরাই এখনো বেরুতে পারিনি । আমাদের যত রাগ সেই অসমিয়াদের বিরুদ্ধে যারা সিলেটিকে অসমিয়া বলে দাবি করেন। সেই দাবির চেহারা কেমন আমাদের বর্তমান প্রবন্ধে তারই এক রূপ রেখা তুলে ধরব।
 ।। 'অসমিয়া   কে ?  ঃ  অসমিয়া ' সংজ্ঞার  সমস্যা ।।  
                  সেই ১৯১৩ সনে বেণুধর রাজখোয়া তাঁর Notes on the Sylhetee Dialect বইতে সিলেটিকে অসমীয়া বলে দাবি করা শুরু করেছেন। তাতে শেষতম সংযোজন ড০ উপেন রাভা হাকাচাম। তিনসুকিয়া মহাবিদ্যালয়ে ২০০৯ সনে অসমের ভাষা উপভাষাগুলো সম্পর্কে এক বক্তৃতা দিতে এসছিলেন  ড০  হাকাচাম । সেখানে তিনি এমন দাবিও করেছিলেন যে বহু প্রকৃত অসমিয়াও অসমে তত খিলঞ্জিয়া নন সিলেটিরা যতটা খিলঞ্জিয়া , যতটা প্রাচীন। কথাটা তিনি ময়মনসিংহ মূলের মুসলমানদের সম্পর্কেও বলেছিলেন, যাদের সাধারণভাবে প্রায় সব্বাইকে বাংলাদেশি বলে ভেবে নেয়া হয়। তিনি তাই যাকে তাকে বিদেশি, 'খিলঞ্জিয়া নহয়' বলে প্রত্যাখান করবার প্রবণতার বিরোধীতা করেছিলেন এমন একটি সভাতে যেখানে সিলেটি শ্রোতা দু' একজন যদিও বা ছিলেন ,ময়মনসিংহ মূলীয় একজনও ছিলেন না। কাউকে খুশি করবার কোনো প্রয়োজন ছিল না। বরং কেউ কেউ এমন উক্তিতে বিরক্ত হলেও হতে পারতেন। কেউ যে হলেন না, তার কারণ 'যিনি খিলঞ্জিয়া তিনিই অসমিয়া' এমন এক ভাব অসমে বহুল প্রচলিত রয়েছে।
             'কে অসমিয়া?' ( অসমিয়া কোন?) এই নিয়ে গেল ক'বছরে অসমের আলো-হাওয়া রৌদ্র বেশ সরগরম। অনেকে অনেক কথা বলেছেন, এখনো কেউ কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেন নি। এই বিতর্কে দুটো প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে । একদল রয়েছেন যারা মনে করেন, যার মাতৃভাষা অসমিয়া, যিনি শয়নে স্বপনে অসমিয়া ভাষা -সংস্কৃতি তথা জাতির উন্নতির জন্যে ভাবেন এবং কাজ করেন তিনিই অসমিয়া। অন্য প্রবণতাটি অল্প শিথিল। এই দ্বিতীয় দল মনে করেন মাতৃভাষা অসমিয়া   হতেই হবে এমন কোনো কথা নেই । কিন্তু  অসমের মাটিকে যিনি আপনার করে নিয়েছেন অসমের  ভাষা সংস্কৃতি সম্পদের প্রতি যার ভাব ভালোবাসা আছে তিনিই, যিনি আর কোনো রাজ্য বা দেশকে   তার নিজের রাজ্য বলে ভাবেন না তিনিই অসমিয়া।  যে বক্তৃতার কথা লিখলাম সেখানে ড০ হাকাচামও স্পষ্টতই বলেছেন , তিনি অসমিয়া বটে , কিন্তু অসমিয়া তাঁর মাতৃভাষা নয়। ধাতৃভাষা । তাঁর মাতৃভাষা রাভা ।  কিন্তু মুস্কিল হলো, এই দুই প্রবণতার মধ্যেকার জলবিভাজন রেখাটি প্রায়ই অস্পষ্ট। তাছাড়া, যেখানে ভারতের অধিকাংশ লোকই দেশপ্রেমের কোনো পরীক্ষা না দিয়েই , অথবা অনেক সময় তেমন কোনো পরীক্ষাতে ব্যর্থ হলেও ভারতীয় থেকে যান, সেখানে একজন  ব্যক্তি যার মাতৃভাষা অসমীয়া নয় তাকে যদি সারাক্ষণ অসম প্রেমের পরীক্ষার মধ্যি দিয়ে জীবন যাপন করতে হয় তবে জীবন যে কত স্পর্শকাতর আর দুর্বিষহ হয় সে প্রশ্নের উত্তর কখনো কোনো অন্যভাষীদের থেকে জানতে চাইলে জানা যেত। কিন্তু, সেটি চায় বা কে!
    এমন এক জটিল সামাজিক স্থিতিতেই উপেন রাভাকেও লিখতে হয়েছে এটি তাঁর বই পড়লেই বোঝা যায়। তাই তিনিও 'অসমীয়া' অবিধার ওই দুই প্রবণতাতেই যাতায়াত করেছেন। 'অসমীয়া আরু অসমর ভাষা-উপভাষা' বইএর মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন, “ইয়াত আলোচিত ভাষার সমলরাজি দরাচলতে উপভাষা (আঞ্চলিক), স্থানীয় উপভাষা নে নৃগোষ্ঠীয় উপভাষা--ইয়াক চিহ্ণিত আরু নামকরণ করাটো অতিশয় স্পর্শকাতর বিষয়।” বর্তমান লেখককেও তেমনি সামাজিক স্থিতির কথা মনে রেখেই   এই প্রবন্ধ লিখে যেতে হচ্ছে । তাঁর এই স্বীকারোক্তি কিম্বা সঞ্জীবের পূর্বোক্ত সংশয় এটিও প্রমাণ করে   যে ভারত তথা অসমে  নিরাসক্ত নিরপেক্ষ সমাজবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্যে সামাজিক পরিবেশ এখনো তেমন অনুকুল নয়।  
                            ড০ উপেন রাভা হাকাচাম কেবল অসমেরই নন, তীব্বত বর্মীয় ভাষাগোষ্ঠীর উপর তিনি এখন গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চলেই একজন খ্যাতনামা এবং নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ।   গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসমিয়া বিভাগের অধ্যাপক ড০  হাকাচাম তিব্বত বর্মী ভাষা এবং ভাষাতত্ব পড়িয়ে থাকেন। বাংলাতে ভোট বর্মী বা অষ্ট্রিক মূলীয় ভাষাগোষ্ঠীদের নিয়ে বিস্তৃত অধ্যয়ন এখনো দুর্লভ। অসমীয়াদের মধ্যে ড০ প্রমোদ চন্দ্র ভট্টাচার্য  A Descriptive Analysis of the Bodo Langauage নিয়ে সেই ১৯৬৫তে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেছিলেন। সেটি বই হিসেবে বেরোয় ১৯৭৭এ। তিনি এর পরেও কিছু কিছু কাজ করলেও ঠিক দুই দশক পর ১৯৯৭তে লেখা হলো আরেকটি দিকদর্শক  বই ‘Rabha and Assamese Languages: A Comparative Studies’ ড০ উপেন রাভা হাকাচামের পি এইচডি গবেষণা পত্র।  তাঁর পরে তিনি রাভা, অসমিয়া এবং ইংরেজি ভাষাতে এই পথে নিরলস কাজ করে চলেছেন। তার মধ্যে অসমিয়াতে লেখা দু’টো বই আমাদের বর্তমান নিবন্ধের জন্যে বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য। একটি ‘অসমীয়া আরু অসমর তিব্বত-বর্মীয় ভাষা’ এবং দ্বিতীয়টি ‘অসমীয়া আরু অসমর ভাষা উপভাষা।’ এই দুটিতেই তিনি অসমের প্রায় সমস্ত ভাষাগুলোকে ছুঁয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন। শুধু হিন্দি এবং বাংলা ছাড়া ।  সম্ভবত এটি ধরে নিয়েছেন যে এ দুটো অসমের বাইরের ভাষা ।  কিন্তু হিসেব মেলে না যখন দেখি, নেপালি আর সাদরি ভাষার সঙ্গে বইগুলোতে সিলেটি আর ময়মন সিংহের বাংলা উপভাষা দিব্বি জায়গা করে নিয়েছে। কারণটি বোঝা যায় যদি, ভেবে নিই আসলে তিনি অসমে প্রচলিত ভাষাগুলো নয় ঠিক সেই ভাষাগুলো নিয়েই অধ্যয়ন করেছেন যেগুলোকে কোনো না কোনো ভাবে অসমিয়া ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে এনে ফেলে দেয়া যায়।  সিলেটিকেও অসমিয়ার একটি উপভাষা বলতে বলতে থেমে গেছেন। জোর দিয়ে বলতে যে পারছেন না, তাই নিয়ে তাঁর আক্ষেপও অস্পষ্ট নয়। কেন আর কেমনতর আক্ষেপ সে নিয়ে আমরা যথা স্থানে লিখব। কিন্তু এই তথ্য জানিয়ে দেয়া ভালো যে এই দুট বইএর প্রথমটিতে ২৭৬ থেকে ৩০০ অব্দি ২৫ পৃষ্ঠা এবং দ্বিতীয়টিতে ১০ থেকে ১৩ অব্দি ৩ পৃষ্ঠা তিনি সিলেটির জন্যে বরাদ্দ করেছেন। আলাদা করে লিখলে শুধু এইগুলো নিয়েই একটি ছোট্ট কিন্তু মূল্যবান পুস্তক হয়ে যেতে পারে । 
        যে মুখবন্ধের কথা আমরা লিখছিলাম সেখানেই তিনি খানিক পরে লিখছেন , “সেইদরে হাজং, মৈমনসিঙীয়া,চিলটীয়া (কাছারী), দেহান, রাজবংশী আদি বাংলা বা অসমীয়ার একোটা উপভাষা হিচাপেহে বিবেচিত হৈ আহিছে যদিও বর্তমান স্বতন্ত্র ভাষা হিচাপে স্বীকৃতি প্রদানর ক্ষেত্রত সেই সেই ভাষা-ভাষীর মাজত রাজনৈতিক আরু বিদ্যায়তনিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাইছে।” তথ্য হিসেবে কথাগুলো মোটের উপর সঠিক। শুধু, 'দেহান' রাজবংশীরই একটি উপভাষা হলেও এখনো তাদের মধ্যে ভাটি অসমের  রাজবংশীর মতো অসমিয়ার থেকে বেরুবার তাগিদ নেই। আর 'সিলেটি'দের অতিক্ষুদ্র এক বাংলাদেশি অংশই এখনো ওই স্বাতন্ত্র্যের দাবিদার। মৈমনসিংহমুলীয়দের যারা অসমিয়া বলে এককালে লিখিয়েছিলেন তাদের মধ্যে এখন বাংলা মূলে ফিরে আসবার প্রবণতা বাড়ছে । হাজং এবং রাজবংশীদের দাবিটা বোধহয় বিশুদ্ধ, কিন্তু স্বীকৃতি মিলছে না ।
    সিলেটি উপভাষা নিয়ে তিনি এই বইএর  পঞ্চম অধ্যায়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন।  সে অধ্যায়ের নাম “ অসমীয়ার জাতিগত/ সামাজিক শ্রেণিগত উপভাষা” এর উপ-অধ্যায় বিভাজনও বেশ চিত্তাকর্ষক ।  ১) চাহ জনগোষ্ঠীর কথিত ভাষাঃসাদরি বা বাগানীয়া ;২) অভিবাসী মুসলমানর কথিত ভাষা (ভাটিয়া) আরু বাংলার মৈমন সিং উপভাষা;৩) নেপালী সকলরর কথিত অসমীয়া আরু অসমর নেপালী ভাষা; ৪) বরাক উপত্যকার চিলেটিয়া (কাছারী) উপভাষা; ৫) কাছারর দেহান বা ধেয়ান উপভাষা।
              মুখবন্ধেও  তিনি অসমের বেশ কিছু সামাজিক শ্রেণি উপভাষার নাম করেছেন , “নেপালী সকলর নেপালী- অসমীয়া, অভিবাসী সম্প্রদায়র উজানী (দেশী) আরু ভাটিয়া (ময়মন সিঙীয়া) অসমীয়া, কাছারর বাঙালীসকলর চিলেটীয়া (কাছারীয়) অসমীয়া, অভিজাত আরু শিক্ষিত বাঙালী পরিয়ালর ঔপনিবেশিক অসমীয়া (ব্রিটিছর দিনত মফচলীয় আমোলাপট্টিত আরু সম্প্রতি রেলোয়ে কলনিত এনে ভাষার নমুনা পোয়া যায়) ,নগর-মহানগর কেন্দ্রিক মাড়োয়ারী  সম্প্রদায়র হিন্দী মিশ্রিত বজরুয়া অসমীয়া (broken Assamese), কুলি-নাপিত-ধোবা-রিক্সাওয়ালা আদি বৃত্তিজীবি লোকর দেশোয়ালী অসমীয়া  ইত্যাদি  এই শ্রেণীর অসমীয়ারূপে অতি সম্প্রতি বহুভাষিক অসমীয়া মাতৃভাষী চাকরিজীবি ,ব্যবসায়, গৃহীণী আরু ছাত্র-ছাত্রীকো প্রভাবান্বিত করি 'চলতি অসমীয়া' বা 'জনপ্রিয় অসমীয়া ভাষা'র প্রচলনত ইন্ধন যোগাইছে।” এর থেকে স্পষ্ট তিনি 'চিলেটীয়া অসমীয়াদে'র 'অসমীয়া মাতৃভাষী'দের সঙ্গে একাকার করছেন না। বরং সিলেটিকে অসমের ভাষা অর্থেই অসমিয়া বলছেন। তাহলে এই ভাষাগুলোকে তিনি উপভাষা কেন বলছেন এই প্রশ্ন উঠতেই পারে । এই প্রশ্নও অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে যে মূল অধ্যায়ে তিনি মারোয়াড়ি বা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার রেল ওয়ে কলোনির বাংলাকে নিয়ে আলোচনা করতে উৎসাহ দেখালেন না কেন? শুধু তিনিই নন, প্রায় কোনো অসমিয়া ভাষাবিদকেই এদের নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করতে দেখা যাবে না।
      সাদরি ভাষাকে যে তাদের ভাষাবিশেষজ্ঞরা স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে দাবি করেন সেটি তিনি মূল অধ্যায়ে বেশ সম্মানের সঙ্গেই উল্লেখ করেছেন , “সাদরি ভাষার বিশেষজ্ঞসকলর মতে ই এটা স্বতন্ত্র আরু পূর্ণাঙ্গ ভাষা , ই কারো মিশ্রিত ভাষা নহয়।” সাদরিকেই সুকুমার সেন প্রমুখ অনেকেই  বাংলার ঝাড়খন্ডি উপভাষা বলবার ভুল করেছিলেন । উপেন রাভা হাকাচামও কিন্তু   লিখেছেন, '...সেইবাবে বহুতে সাদরিক বাংলার ভগ্নীভাষা বুলিহে ক'ব বিচারে......সামাজিক আরু রাজনৈতিক কারণত বাংলা ভাষাই যিমান দ্রুতবেগত বিকাশ আরু বিবর্তন লাভ করিবলৈ সক্ষম হৈছে; তার বিপরীতে সাদরি ভাষার এটা বিশেষ সময়লৈকে বিকাশর ধারা আছিল তেনেই স্তিমিত। সেই কারণে বাংলার ভগ্নীভাষা হোয়া সত্বেও দুয়োটার মাজত দূরত্ব বাঢ়ি গৈছে...।” অসমে এর উপর অসমিয়ার ব্যাপক প্রভাব পড়বার বিষয়ে তিনি এর পর বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। এতে ভাষাতাত্বিক দিক থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যেত যে এখানে সাদরির আরো এক বা একাধিক উপভাষা গড়ে উঠেছে। কিন্তু, সিদ্ধান্ত ভাষাতাত্বিক না হয়ে হয়ে পড়ে ভাষারাজনৈতিক। তিনি এর পরে লেখেন, “...যেতিয়ারে পরা অসমর চাহ-বাগিচাসমূহত শিক্ষার মাধ্যম হিচাপে অসমীয়া ভাষা সাহিত্যর পঠন-পাঠন হ'বলৈ ধরিলে, আনকি বহু প্রাক্তন চাহ-বনুয়াই ঘাই অসমীয়া জনজীবনর লগত মিলি জীবন নির্বাহ করার ( বৈবাহিক আরু সামাজিক ভাবেও) পরিবেশ রচনা করিলে তেতিয়াই অসমীয়ার এই স্থানীয় উপভাষা বা মান্য অসমীয়াই তেওঁলোকরো মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করিবলৈ ধরিলে।” একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র ভাষার একাংশ কালে গিয়ে  আরেকটি স্বাধীন স্বতন্ত্র ভাষার উপভাষা হয়ে উঠতে পারে কিনা সেই ভাষাতাত্বিক প্রশ্ন তোলাই রইল। তাঁর কিন্তু বিশ্বাস, স্বাধীন স্বতন্ত্র অসমিয়া ভাষার একাংশ সিলেটি ভাষাটিও কালক্রমে বাংলার উপভাষা হয়ে পড়েছে । কীভাবে---- সে কথাটি আমরা পরে আবার পাড়ব। কিন্তু , এমন এক সিদ্ধান্ত যা একেবারেই ভাষাবিজ্ঞানের বিষয় তাই নিয়ে  নিয়ে আলোচনা করবার কোনো মুক্ত পরিবেশ আছে কিনা সেই প্রশ্ন কিন্তু আমাদের মনে তীব্রভাবেই রয়েছে । প্রশ্নটি তুলতে চাইলেই সঞ্জীবের মতো বলে দেয়া হতে পারে,আর সেটি অসমিয়া হতে চাওয়া বা হয়ে  যাওয়া সাদরিরাও  বলতে পারেন, “এদের পেছনে কিছু সন্দেহজনক চক্রও সক্রিয়, যারা অসম আর অসমীয়াকে ভাগ করতে চায়। ” এই কথাও আমাদের মনে রাখা ভালো যে সাদরিকে বাংলার কিম্বা হিন্দির  উপভাষা বলে চালিয়ে দেবার মতো লোকের অভাবও কিন্তু এই অসমেও কম নেই। বরাক উপত্যকাতে এদের হিন্দিভাষী বলে চালিয়ে দিয়েই ভোটের রাজনীতিটি হয়ে থাকে। ১৫ জন  ভাষা শহিদের উপত্যকাতে  কেউ এখনো এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবার সাহস করে উঠতে পারেন নি।
              মৌখিক ভাবে দুই উপত্যকাতেই  সাদরি 'চা-জনজাতির' বা 'বাগানীয়া' ভাষা হিসেবেই অত্যন্ত অপমান জনক ভাবে পরিচিত। সাধারণ লোকে এদের 'কুলি', 'লেবার'ও বলে থাকেন, তা ব্যক্তিটি যদি কলেজ অধ্যাপক হন তবুও। উপেন রাভাও 'বাগানীয়া' শব্দটি ব্যবহার করেছেন।তাই,  সাদরি ভাষার একাংশ  অসমে নিজেদের ঝাড়খন্ডি জনজাতি হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই লড়ছেন। সাদরিতে আজকাল রেডিও টিভিতে স্বতন্ত্র অনুষ্ঠান হয়েই থাকে ।  অদূর ভবিষ্যতে তারাও সেই প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলো তুলতেই পারেন। অবশ্যি এই প্রবণতাও দেখবার মতো যে অসমিয়ার এক উপভাষা বলে প্রচারিত হওয়া সত্বেও সাদরিতে অসমে যত গান, চলচ্চিত্র ইত্যাদি তৈরি হয়েছে সম্ভবত বাংলাকেও সেখানে পেছনে ফেলে দিয়েছে। 'চামেলি মেমসাহেবের' মতো সাদরি -অসমিয়া মিশ্রিত ধ্রুপদী ছায়াছবি অসমেই তৈরি হয়ে ভারত বিজয় করতে সমর্থ হয়েছিল। পরে এর বাংলা ও হিন্দি সংস্করণও বেরিয়ে দর্শক মন মোহিত করেছিল।
                  এতো কথা আমরা লিখলাম এই কথা স্পষ্ট করতে যে , বিবাদটি নেহাতই অসমিয়া বনাম সিলেটি বাংলার নয়। বিবাদটি ভাষা বিজ্ঞান বনাম ভাষারাজনীতিরও বটে ।  এই বিবাদ  ভাষা নিরপেক্ষভাবে 'জাতীয়তাবাদে'র ধারণার আভ্যন্তরীণ বিসঙ্গতিরও পরিণাম বটে, শুধু মাত্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদের নয়। শুধু সিলেটি-অসমিয়ার তুলনা করে কিম্বা না করে বিষয়ের সমগ্রতাকে বোঝা যায় না মোটেও।  আমি জানি না, ড০ হাকাচাম বর্তমান লেখকের অনুরোধ মনে রেখেছেন কি না। তাঁকে একান্ত আলাপে অনুরোধ জানিয়েছিলাম, তীব্বত-বর্মী ভাষাগুলোর গবেষক হিসেবে তাঁর উচিৎ কেবল বর্তমান অসম কিম্বা পূর্বোত্তর ভারত নয় প্রাচীন কামরূপ এবং তার সংলগ্ন এলাকা তথা বর্তমান বাংলাদেশের  দিকেও  দৃষ্টি দেয়া। তাতে, এ অঞ্চলের ভাষাগুলোর আরো অনেক অনেক নতুন দিক সামনে চলে আসবে। যে কথা তাঁকে বলিনি তা এই যে , ঢাকা কিম্বা চট্টগ্রামের উপভাষাগুলোর সঙ্গেও অসমীয়া ভাষার মিল খুব একটা কম পাওয়া যাবে না।  সেগুলোরও অধ্যয়ন করলে হয়তো 'সিলেটি'রা কেন নিজেদের   অসমিয়া বলে না এই নিয়ে তাঁর আর কোনো আক্ষেপ  থাকবে না। সিলেটি যদি অসমিয়া হয়, তবে সমগ্র পুব বাংলার ভাষাকেও তাই হতে হয় বৈকি । কেননা সেই সমস্ত উপভাষা /স/ কে /হ/ উচ্চারণ করে আর বর্গীয় সমস্ত অঘোষ অল্পপ্রাণকে মহাপ্রাণপ্রায় করে ফেলে। পুব বাঙালিরা বিশুদ্ধ বাংলা /ক,ত,চ,ট,প/ উচ্চারণ করতেই পারে না। আর চাটগেঁয়েরা অসমিয়াদের মতোই নঞার্থক অব্যয় ক্রিয়াপদের আগে  ---'নাযাও', 'নাখাও' ইত্যাদি শব্দে যেমন----উপসর্গের মত ব্যবহার করেন। এখন, যদি এই তর্ক করি যে সিলেটিরা অসমে থাকেন বলেই অসমিয়া, আর অন্যেরা যেহেতু অসমে থাকেননা , তাই তাদের ভাষাগুলোর সঙ্গে অসমিয়ার মিল আশি শতাংশ থাকলেও  সেগুলোকে অসমিয়া বলে যাবে না তবে স্পষ্টতই সে তর্ক ভাষাবিজ্ঞানের সীমার থেকে বেরিয়ে পড়ে। উপেন রাভার নিজের জনগোষ্ঠঈ 'রাভা'রা এই যুক্তিতে অসমে হয়ে পড়েন অসমিয়া, বাংলাদেশ আর পশ্চিম বঙ্গে বাঙালি। আর তাই সিলেটি বনাম অসমিয়ার আলোচনা সেই ১৯১৩র বেণুধর রাজখোয়ার ' Notes on the Sylhetee Dialect'  বইএর বাইরে যায়ই না। সব্বাই ঐ ওখান থেকেই শুরু করেন।  ড০ হাকাচামও তাই করেছেন।
।।  সিলেটি   বনাম  কাছাড়ি   উপভাষা ।।
                   সিলেটি ভাষা এবং তার ভাষা এলাকার সম্পর্কে শুরুর তথ্যগুলো  উপেন রাভা গ্রীয়ার্সন আর সুনীতি চট্টপাধ্যায় থেকে নিয়েছেন। গ্রিয়ার্সনেই উল্লেখ আছে এর এক স্থানীয় বৈচিত্র 'কাছাড়ি' বলেও পরিচিত , ওখানকার  লোকেরা ওই নামেই ওকে চেনে।  সঞ্জীব 'বাঙ্গালনামা'তে প্রকাশিত প্রবন্ধে লিখেছেন, “এর মধ্যে আবার কাছাড়ের সিলেটি উপভাষার সঙ্গে সদর সিলেটের ভাষার কিছু পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্য মূলতঃ উচ্চারণগত। " ' তুই কিতা কররে 'আর  'তুইন  কিতা করিতরে' এই দুই বাক্যের পার্থক্য কেবল উচ্চারণের নয় রূপতত্বেরও বটে।সঞ্জীবের মতো  উপেন রাভা এ কে বৈশ্যের Case Marker in Sylheti' প্রবন্ধের  উল্লেখ করে পাদটীকাতে লিখেছেন , “স্থানীয়    লোকে ইয়াক অকল ছিলটি  (Sileti) বুলিয়ে চিনাকি দিয়ে।”  কেন  অমনটি লিখলেন এটি আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় । সত্য হলো,শুধু মাত্র সিলেটিরাই 'কাছাড়ি'র অস্তিত্বকেও অস্বীকার করবার চেষ্টা করেন। এতে দুটো বাঘকে এক সঙ্গে শিকার করা যায়।    'কাছাড়ি'কে আলাদা করে নিয়ে যাবার অসমিয়াদের প্রয়াসকে রোখা যায়, সিলেটিদের সংখ্যা বাড়িয়ে ফেলে সামাজিক আধিপত্য সুরক্ষিত করা যায়। আসল রাজনীতিতো সেই আধিপত্যেরই, তাই না? 
                     অনেকে 'কাছাড়ে'র সংস্কৃত উৎসের সন্ধান করবার চেষ্টা নানা সময় করেছেন ,কাছাড়ি' শব্দটি  কিন্তু স্পষ্টতই বডো কাছাড়িদের সঙ্গে সম্পৃক্ত । সেটি যে স্থানীয় ভাবে প্রচলিত নাম এই তথ্যের উল্লেখ  উপেন রাভার  পক্ষে সুবিধে জনক হতো।  এই সুবিধের কথাটি   পাদটীকাতে  তাঁর দাবিটি থেকেও স্পষ্ট, যেখানে তিনি জানাচ্ছেন, শব্দটি প্রথমে ভোলানাথ  তিওয়ারী ব্যবহার করেন । পরে  ড০ উপেন্দ্র নাথ গোস্বামী তাঁর 'অসমিয়া ভাষা আরু উপভাষা' এবং ড০ প্রমোদ চন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর ' অসমর অবিভক্ত কাছাড় জিলার ভাষা উপভাষা' 'বইতে 'কাছাড়ি' নামটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন।  সিলেটি অসমিয়া বিতর্কে এই কাছাড়ি প্রসঙ্গও আরেক চিত্তাকর্ষক বিষয়। ১৯৮৮তে হাইলাকান্দিতে অনুষ্ঠিত অসম সাহিত্য সভার অধিবেশনে এই কাছাড়িকেই 'বরাকি'ভাষা নাম দিয়ে এই চেষ্টা হয়েছিল যদি ওই টুকরোকে অন্তত অসমিয়ার অনুগত ভাষা করে ফেলা যায়। জগন্নাথ চক্রবর্তী এই উপভাষাকেই  'বরাক বাংলা' নাম দিয়ে তাঁর অভিধান লিখেছেন বলে আমাদের ধারণা। অভিধানে এর সংজ্ঞাটি অনেকটাই অস্পষ্ট। তিনি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন, তখন তাঁর এক আত্মীয় এসে তাঁর মুখে 'গ্রাম্য বাংলা' শুনে ভর্ৎসনা করেছেন বলে এক সংবাদ তিনি দিয়ে রেখেছেন। ঐটেই আসলে 'কাছাড়ি' বাংলা।  বরাক উপত্যকাতে বাস করে অভ্যস্থ এমন যে কেউ শুনলেই বোঝেন কে কাছাড়িতে আর কে সিলেটিতে কথা বলছেন।গ্রীয়ার্সনও উল্লেখ করেছেন, স্থানীয় সিলেটিরা একে 'মুসলমানি' বাংলাও বলে থাকেন ,এটা না জেনেই যে এই ভাষাতে  ওখানকার   প্রাচীন   হিন্দুরাও, যারা মূলত গ্রামে থাকেন,  কথা বলেন।  এই প্রাচীনদের বাসভুমি ও ভাষাঞ্চলকে  সঠিক ভাবেই জগন্নাথ  বরাক উপত্যকার মূল ভাষাঞ্চলের বাংলা বলছেন। সিলেটিকে তিনি অন্য নব্য আগন্তুকদের সঙ্গে আগন্তুক ভাষাঞ্চলের বাংলা বলে স্বতন্ত্র করেছেন। 
                    গ্রিয়ার্সন মাগধী প্রাকৃতের চারটি ঔপভাষিক বৈচিত্রের কথা লিখে গেছেন। তার মধ্যে 'কামরূপী' প্রাকৃতের মধ্যে পূর্বী শাখাতে রয়েছে অসমিয়া, পশ্চিমা শাখাতে রয়েছে  উত্তর বাংলার  কোচ বিহার জলপাইগুড়ির  বাংলা ভাষা , রাজবংশী সহ। সিলেটি 'বঙ্গ-প্রাকৃতে'র পূর্বী শাখার অংশ। পরে কী করে এই সিলেটি 'কামরূপী' উপভাষার অঙ্গ হয়ে গেল এটিও আমাদের কাছে বেশ ধোঁয়াসা। সুকুমার সেনও এমন ঔপভাষিক বিভাজন টেনেছেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যথার্থ ভৌগলিক ভাষা জরিপ তখনো হয় নি। এমন কিছু তথ্য সূত্র থেকে উপেন রাভা হাকাচাম এও দাবি করেছেন যে , “ অসমিয়ার গোয়ালপরীয়া বা রাজবংশী উপভাষার সৈতে বিশেষ সম্পর্ক থকা দেহান বা ধেয়ান উপভাষারো বিশেষ বরঙণি নথকা  নহয়।” চিলারায়ের সেনা বাহিনীর সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র নদী, বড়াইল পাহাড় অতিক্রম করে গিয়ে কোচ সেনাদের পরিবারেদের কেউ কেউ  ওখানে থেকে গিয়ে 'ধ্যানী' হয়ে গেছিলেন। এই ঘটনা ঘটেছে মাত্র এই সেদিন সতেরো  শতকে।  তাদের থেকে বাংলা কিছু শব্দ বাক্যের ঋণ নিয়েছে বটে। তাই বলে সেই ঋণ  প্রাচীনতর  বাসিন্দা কাছাড়ি -সিলেটিদের ভাষাকেই গড়ে তুলবে এ একটু কষ্ট কল্পনা বলেই আমাদের মনে হয়। অথচ তিনি দাবি করেছেন, “সেইবাবেই এই উপভাষাটোত প্রচলিত আরু কামরূপী উপভাষা বা অসমীয়া মান্যরূপত  প্রচলিত প্রায় শতকরা ৭৫টা শব্দই সজাতীয় (cognate) বুলি শব্দর সংখ্যানুপাতিক বিচারত ধরা পরে।” তিনি কোনো সংখ্যানুপাতিক বিচার করেন নি। এই কথাগুলো  তিনি নিয়েছেন  ড০ উপেন্দ্র নাথ গোস্বামী এবং ড০ প্রমোদ চন্দ্র ভট্টাচার্যের উপরোক্ত দুটি গ্রন্থের থেকে। আমাদের এই সংখ্যাতাত্বিক বিচার নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। এটি সঠিক হবার সম্ভাবনাই বেশি।   শতাংশের পরিমাণটা আর একটু বেশি হলেও আমাদের আনন্দিত বই আতঙ্কিত হবার কোনো কারণ দেখি না। বরং বড়াইল পাহাড় , বরাক সুরমা নদী অতিক্রম করে সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে  তিব্বত -বর্মী জনগোষ্ঠীগুলোর প্রব্রজনের সঙ্গে প্রাচীন কামরূপের সঙ্গে সম্পর্কিত করে এই সাদৃশ্যের সন্ধান করলে আরো অনেক পাকা ভিতের উপর তাঁর যুক্তি দাঁড়িয়ে যেত। বর্তমান মেঘালয়ের পশ্চিম পাশে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকা জুড়ে রঙপুর, দিনাজপুর, ময়মন সিংহ, জয়ন্তিয়া ইত্যাদি এলাকা যেখানে এখনো বড়ো, গারো, রাভা, রাজবংশীরা ব্যাপক সংখ্যাতে বাস করেন সেগুলোকে উপেন রাভা তাঁর অধ্যয়ন থেকে একেবারেই বাদ দিয়েছেন।    তিনি কাছাড়ি বা সিলেটিদেরকে বাংলাদেশের ওই জেলা বা মহকুমাগুলোর থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন করে বুঝবার চেষ্টা করেছেন।  বস্তুত প্রায় সমস্ত অসমিয়া ভাষাতাত্বিকেরা এই ভুল গুলো করে আসছেন বলে আমাদের মনে হয়। এমন কি অবিভক্ত সিলেটের দক্ষিণ এবং পশ্চিম ভাগের হবিগঞ্জ , সুনাম গঞ্জের ভাষাকেও তাঁরা কেউ হিসেবে নেন নি। কেন, এটি বোঝা খুব কঠিন নয়। যে বেনুধর রাজখোয়ার নোটকে তাঁরা 'বেদ'তুল্য মর্যাদাতে তুলে রেখেছেন সেই বেনুধর রাজখোয়া সিলেট মহকুমার প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন। সেই সময়ে ঐ নোটটি লিখেছিলেন। তিনিও সমগ্র জেলাকে অধ্যয়ন করেন নি।  অথচ হবিগঞ্জি, সুনামগঞ্জি উপভাষাগুলোও সে সময়ের অসমের ভেতরের সিলেটের ভাষা ছিল। 
                     রংপুর থেকে সিলেট -- এই সমগ্র এলাকার ঠিক মাঝখানটিতে এখনো বাস করেন খাসিয়ারা যাদের ভাষাটিতো অস্ট্রিক বটেই, শারীরিক গঠনেও অস্ট্রিক মিশেল ব্যাপক। বরাক নদীর তীরে বদরপুরের  সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দির, যেখানে  প্রতি বসন্তে বারুণী মেলা বসে এবং ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে কামাখ্যা মন্দির, যেখানে প্রতি বর্ষাতে অম্বুবাচি মেলা বসে ---ওই দুটোই আদতে অস্ট্রিক নরগোষ্ঠীর তীর্থভূমি ছিল এই উল্লেখ বহু ঐতিহাসিক করে গেছেন।  তাদের মধ্যে বাণিকান্ত কাকতিও রয়েছেন। তাঁর মতে কামরূপ একটি অষ্ট্রিক মূলীয় শব্দ। দুটোই  কিন্তু এখন বাঙালিদের প্রধান তীর্থ ক্ষেত্র। অসমীয়াদেরও বটে। কিন্তু বৈষ্ণব ধর্মের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের পর  অসমীয়াদের মধ্যে কামাখ্যার গুরুত্ব সত্রগুলোর তুলনাতে কমে  গেছে। বর্তমান উত্তর কাছাড়ের জেলা সদরের নাম হাফলং, আর  ওদিকে মেঘালয় সিলেট সীমান্তে তেমনি এক শৈলশহরের নাম জাফলং। প্রথমটির মূল বাসিন্দারা এখন যদিও ডিমাসা কাছাড়িরা, দ্বিতীয়টির মূল বাসিন্দার কিন্তু সেই খাসিয়ারা। কোথাওতো এই দুই নরগোষ্ঠীর ইতিহাস এসে মিলে গেছে, নতুবা দুইপ্রান্তের দুই শহরের নামে এতো সুন্দর সাদৃশ্য হবে কেন?   নীহার রঞ্জন যেমন  বাঙালিদের বেলা  বডো মিশ্রণ প্রায় নেই বলে বলেছিলেন, বাণীকান্ত কাকতি অসমিয়াদের ক্ষেত্রেও ওই একই কথা লিখে গেছেন--- সেই তথ্যের উল্লেখ উপেন রাভা নিজেই করেছেন। তার মানে অসমিয়া -সিলেটিদের মধ্যে অস্ট্রিক মিশেলটাকেও অস্বীকার করা একেবারেই যাবে না। এই সমস্ত উপকরণই যে সমগ্র পূব বাংলার লোকেদের অসমিয়াদের ঘনিষ্ঠ করেছে সেদিকে দৃষ্টি দিলে লাভ বই ক্ষতিটা কোথায় বোঝা আপাত দৃষ্টিতে কঠিন হলেও, এই অনুমান আমরা করতেই পারি যে এতে না বাঙালিরা না অসমিয়াকেই বাংলা বলে ফেলবার 'মওকা' পেয়ে যান এই আতঙ্ক কোথাও না কোথাওতো রয়েইছে। মেঘালয়ের পুবে শুধু বড়াইলের দিকে চোখ না ফেলে পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্রের যে অংশটি বাংলাদেশের মধ্যি দিয়ে গেছে সেদিকে দৃষ্টি দিলে ড০উপেন রাভা দেখবেন ওখানে রাভা, বডো, গারোদের ভাষার স্বতন্ত্র স্বীকৃতি নেই। সত্যিই ওখানে তাদের বাঙালির অংশ করে ফেলবার দুষ্প্রয়াস চলছে! অসমে সিলেটি কেন অসমিয়া হলো না সেই আক্ষেপ না করে বাংলাদেশে 'রাভা' কেন বাংলা হতে যাবে, --- সেই প্রশ্নটি তোলা তাঁর পক্ষে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়বদ্ধতার কাজ হবে, নয় কি? ভাষা তত্বের দিক থেকেও প্রশ্নটি বেশ সঙ্গতিপূর্ণ। 
                   অসমিয়া সিলেটির সাদৃশ্য দেখাতে গিয়ে এর পরেই উপেন রাভা হাকাচাম বেণুধর রাজখোয়ার উল্লেখ করেছেন। বেণুধর রাজখোয়ার নোটে পাওয়া যায় , “সিলেট অঞ্চলতো অসমর দরে প্রাতঃস্নান করি মেজি জ্বলাই চুঙা-পিঠা আরু অন্যান্য পিঠা-পনারে মাঘবিহু উদযাপন করা,পথারত নরাবিলাক রৈ যোয়াকৈ মুঠি বান্ধি (গুরির পরা কাটি আঁটি বন্ধার বিপরীতে) ধান দোয়া-চপোয়া করা, আই-বাইসকলর নাম গোয়া (সংকীর্তন) আদি দেখা পোয়া যায়। বিভিন্ন জাতি , বৃত্তি, খেল, ফৈদর বা বিষয়বোরর লগত জড়িত উপাধি (শর্মা, দাস, ডোম-পাটনি;” --এ পর্যন্ত বিশেষ  কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু , “ চিলেটর প্রাচীন নাম গোর ( গৌড়)র লগত অসমীয়া মুসলমানসকলক সূচোয়া গরিয়া শব্দর সাদৃশ্যতা--ফা প্রত্যয়ান্ত রাজবংশীয় লোকর নামর সমাহার (সুধর্মফা, জনকফা, রত্নফা); সাধারণ লোকর নামকরণত রাম শব্দর সমাহার (জয়রাম, কালীরাম, কানাইরাম, লখাইরাম, ধনীরাম, লবরাম); অসমীয়ারে বিশ্লেষণ করিব পরা স্থান নামর প্রাধান্য (বুঢ়া গোঁহাই বা বুড়া গোয়াইনর লগত জড়িত গোয়াইন ঘাট, কোঁয়রর লগত জড়িত কুয়রগড়, হাজারিকীয়া বা হাজরিকার লগত জড়িত হাজারকী অঞ্চল, বরুয়ার লগত জড়িত বরুয়া (পাহার), অসম বা আসামর লগত জড়িত আসামপাড়া, আসামপুর আদি স্থান, বগা বা বোকা আরু পানীর লগত জড়িত বগাপানী ইত্যাদি স্থাননাম) অসমীয়ার সৈতেহে তুলনীয়, বাংলা বা অইন ভাষা গোষ্ঠীর লগত নহয়।” অসমিয়া মুসলমানদের একাংশ গৌড়ের নবাব হুসেন শাহের আমলে গৌড় বাংলা থেকে এসছিলেন বলে তাদের 'গরিয়া মুসলমান' বলা হয়ে থাকে বটে। এখন, এই 'গরিয়া'দের দেখিয়ে যদি কাউকে অসমীয়া বলে দাবি করা যায় তবে সে গৌড়বাংলার সমস্ত মানুষকে। খামোখা সিলেটিদের নিয়ে এই অযৌক্তিক টানাটানি কেন ? শুধু এই মাত্র তথ্যই প্রমাণ যে বেণুধর রাজখোয়ার 'নোটস' খুব একটা নির্ভর যোগ্য গ্রন্থ হতে পারে না। কোনো সিলেটি বইটি পড়ে সন্তুষ্ট হয়ে অসমিয়া হতে চাইবেন, এই সম্ভাবনা দূর অস্ত। সিলেট ইতিহাসের কোনো এক কালে খুব অল্প সময়, গৌড় গোবিন্দের রাজ্যের অধীনে ছিল বটে কিন্তু এর প্রাচীন নাম সমতট, হারিলেক,বঙ্গ এমন কি সরাসরি কামরূপ  ছিল বললেও সহ্য করা যায়, গৌড় ছিল না কখনোই! রাম শব্দের সমাহার দেখিয়ে অসমিয়াদের সঙ্গে আত্মীয়তা দাঁড়ায় না কিছুতেই। গেল বছরের নোবেল জয়ী রসায়নবিদ বেঙ্কটরমন রামকৃষ্ণন থেকে শুরু করে শাক্ত বাঙালিদের পরম আদরের রামকৃষ্ণ পরমহংস অব্দি সবার সম্পর্কে তবে বলতে হয়, তাদের নামের সম্পর্ক অসমিয়া ভাষার সঙ্গে 'অইন ভাষা গোষ্ঠীর লগত নহয়।' আসাম পাড়া , আসাম পুর স্থাননাম থাকা এমন কোনো অসম্ভব নয়, এরকম ব্রহ্মপুত্র এলাকাতে 'বঙালি পাড়া', 'বঙালমারা' ইত্যাদি স্থান নাম প্রচুর রয়েছে।  সুধর্মফা, জনকফা, রত্নফা ইত্যাদি ফা-প্রত্যয়ান্ত নাম সিলেটিদের মধ্যে কখনো কেউ শুনেনি। এ তিনি কোথায় পেলেন অনুসন্ধান করতে হবে। তেমনি করতে হবে   কুয়রগড় বলে কোনো স্থান নাম আদৌ আছে কি না।'গোয়াইন ঘাট' আছে মেঘালয় সীমান্তে। কিন্ত এটি দ্রুত উচ্চারণে য়-শ্রুতির নিদর্শন বলেই মনে হচ্ছে। 'গোয়াইন' ব্যাপক প্রচলিত শব্দ নয়। মেঘালয় সীমান্তের এই স্থান নামে গারো বা খাসিয়া উচ্চারণের প্রভাব থাকাও অসম্ভব নয়। সিলেটিরা /স/ কে /হ/ উচ্চারণ করে বটে কিন্তু শব্দের মাঝে থাকলে স্পষ্ট /শ/ উচ্চারণ করে--- 'গোঁসাই' , বাঁশকান্দি। আদিতেও সর্বত্র /শ/ ধ্বনিটি বাদ দেয় না-- সুনামগঞ্জ , সুরমানদী। 'কুয়র' সিলেটিতে প্রচলিত শব্দ নয় বলেই জানি। 'হাজার' একটি বিশুদ্ধ বাংলা শব্দ। (হাজার বছর ধরে পথ হাঁটিতেছি...; বনলতা সেন; জীবনানন্দ দাস।)  অসমিয়া শব্দটি     'হেজার' ।   তার থেকেই অসমিয়া  উপাধি “ হাজারিকীয়া বা হাজরিকা” চন্দ্রকান্ত অভিধান অনুযায়ী এই উপাধির ইতিহাস হলো , “আহোম রজার দিনর এহেজার কাঁরীর ওপরত থকা বিষয়ার উপাধি ।”  এই থেকে বুঝি বুঝতে হবে, সিলেটের 'হাজরকী' অঞ্চল নামটি অসম থেকে গেছে! হাজার শব্দটিতো  অসমীয়া বাংলা দুই ভাষাতেই  এসছে ফারসী থেকে। বাংলাদেশের বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলার এক স্থাননামও  হাজরকি। সেই বগুড়া জেলার সঙ্গে তবে অসমের কোনো সম্পর্ক নেই কেন? কাছাড়ের মুসলমানদের মধ্যেও 'হাজারি' উপাধি রয়েছে। ভুঁইয়া, বড়ভূঁইয়া, লস্কর, বড় লস্কর ইত্যাদির মতো এই উপাধিও কাছাড়ি রাজাদের আমলে প্রচলিত হওয়া সম্ভব।অসমিয়া  'বড়ুয়া' উপাধিটি আহোম রাজাদের দেয়া। বাংলাদেশে এদিক থেকে শব্দটি যায়নি। বরং আহোম রাজারাও বৌদ্ধ ঐতিহ্য থেকে শব্দটি পাওয়া সম্ভব।  সিলেটি নয়, বরং চাটগেঁয়ে বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে বড়ুয়া বহুল প্রচলিত উপাধি। বাঙালি দিব্যেন্দু বড়ুয়া  একজন বিশ্ব দাবা চ্যম্পিয়ন। সুকুমার বড়ুয়া, বেণীমাধব বড়ুয়া বাংলাদেশের খ্যাতনামা লেখক। চিত্রপরিচালক প্রমথেশ বড়ুয়াকে বাঙালি বাঙালি বলেই চেনে। গোয়ালপাড়ার গৌরিপুরের এই রাজা যদিও বর্তমান অসমের লোক ছিলেন, তাঁর পৈত্রিক উপাধিটি আহোম রাজাদের থেকে পাবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।    চট্টগ্রামের দিকে এগুলে 'বড়ুয়া'শব্দযোগে আরো বহু স্থান নাম পাওয়া যাবে। সিলেট কাছাড়ে এক ধরণের মোটা শক্ত বাঁশের নাম 'বড়ুয়া', বরো ধানকেও অনেকে 'বড়ুয়া' ধান বলে। সংস্কৃতে শ্রেষ্ঠ অর্থে 'বর' অথবা 'বুদ্ধ' দুটো শব্দ থেকেই 'বড়ুয়া' এসে থাকতে পারে। উপেন রাভা প্রথমটির দিকে ইঙ্গিত করেন ।( অসমীয়া আরু অসমর তীব্বত -বর্মীয় ভাষা, পৃঃ৯৬) সিলেটি আর অসমিয়া উচ্চারণটি অবশ্যি একই । সিলেটিরাও 'বরুয়া' উচ্চারণ করেন। সম্ভবত পুব বাংলার কোনো উপভাষার মানুষই 'বড়ুয়া' লিখলেও উচ্চারণ করতে পারেন না। তার মানে 'বড়ুয়া' উপাধিটিকেও  যদি আত্মীয়তা করতেই হয় তবে শুধু অসমিয়া সিলেটিতে কেন, গোটা পুব বাঙালিদের সঙ্গেই করবে।      'বোকা' (কাদা) আর 'বগা' (সাদা) শব্দদুটোর অসমিয়া অর্থও এক নয়। 'বগাপানি' যেমন অসমেও আছে, তেমনি আছে মেঘালয়েও। মেঘালয় পাহাড় থেকে বয়ে যাওয়া এক উপনদীর নাম 'বগানদী'। 'বগা' শব্দটির সঙ্গে খাসিয়া ভাষার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কিনা সেটি দেখা যেতে পারে। উপেন রাভা নিজেইতো দেখছি তাঁর বইতে 'বগা' শব্দের এক মালয় উৎসের সংবাদ দিচ্ছেন। বক, বিওগ। ( অসমীয়া আরু অসমর তীব্বত -বর্মীয় ভাষা, পৃঃ৬৭)  মালয়েশিয়ার ভাষা মালয় একটি অস্ট্রিক ভাষা। সংস্কৃতে শব্দটি 'বলক্ষ', আহোমে পুক, রাভাতে বকা, গারোতে  গিপক, লেপচাতে আ-বক (ঐ) । অবশ্যি এগুলো তাঁর মতে বিতর্কিত তথ্য। অর্থাৎ, আর্য ভাষা থেকে তিব্বত বর্মী ভাষাগুলোতে গেছে না, উল্টোটা হয়েছে এ নিয়ে সংশয় থেকে গেছে। বাংলা  'বক' পাখি নামের উৎসও এই মালয় কিম্বা ভোট বর্মী শব্দ কিনা  এও ভাবা যেতে পারে। এই পাখি নাম থেকেও রঙ নামটি আসতেই পারে, পুরুষ 'বক' পাখিকে সিলেটিতে বলে ,  'বগা', ( কাছাড়িতে)  'বগুড়া' ।  ('ফান্দো পড়িয়া বগায় কান্দে রে !') অসমিয়াতে পাখি নামটি 'বগ' এবং 'বগলি' । কিন্তু সবচে বিশ্বাসযোগ্য উৎসের সন্ধান চট্টগ্রামের বান্দরবানের কাছে বাংলাদেশের সবচে' উঁচু উষ্ণ প্রস্রবণ বগাকাইন বা বগা লেক অব্দি গিয়ে পৌঁছুনো যেতে পারে। বগালেকের পাশে  বম, মুরং বা ম্রো, তঞ্চংগ্যা এবং ত্রিপুরা  ইত্যাদি  ভোট বর্মী জনজাতীয়রা বাস করেন। স্থানীয় জনজাতীয় উপকথা অনুযায়ী, অনেক  আগে ওখানে পাহাড়ের গুহায় একটি ড্রাগন বাস করতো। বম ভাষায় ড্রাগনকে বলে 'বগা' । ড্রাগন-দেবতাকে তুষ্ট করতে স্থানীয়রা গবাদী পশু উৎসর্গ করতেন। কিন্তু একবার কিছু লোকে মিলে  এই ড্রাগন দেবতাকে হত্যা করলে চূড়াটি জলমগ্ন হ্রদে পরিণত হয় এবং গ্রামগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে। ভূতাত্বিকদের মতে ওখানে হয় কখনো কোনো আগ্নেয়গিরি ছিল , নতুবা প্রকাণ্ড উল্কাপাত হয়েছিল।  তাতেই ঐ হ্রদ তৈরি হয়েছে। উপকথার আগুন উদগীরণকারী ড্রাগন বা বগার থেকে নাম পড়েছে 'বগা হ্রদ'  । এই হ্রদের থেকেও একটি ছোট্ট ঝরণা নিচে নেমে গেছে তার নাম 'বগাছড়া'। এর থেকে এটি বেশ স্পষ্টই বোঝা যায় তিব্বত বর্মী ভাষাগুলো থেকেই 'বগা' শব্দটি বাংলাতে এসে থাকবে । অসমিয়াতেও সেখান থেকেই এসে থাকবে। সিলেটির থেকে এর প্রচলন অসমিয়াতে বেশি। চাটগেঁয়ে বাংলাতে আছে কি না, আমরা জানি না।
                  জগন্নাথ চক্রবর্তী তাঁর অভিধানে 'বগা','বগুড়া' শব্দের সংস্কৃত 'বক' উৎসের উল্লেখ করেছেন। '-ড়া'টি তাঁর মতে স্বার্থিক প্রত্যয়।  অভিধানটিতে তিনি 'বরাক বাংলা' শব্দগুলোর কুকিচিন বা ভোট বর্মী উৎস নিয়ে আশ্চর্য রকম নীরব। যেগুলোর মূল খুঁজে পান নি 'অজ্ঞাত মূল' বলে থেমে গেছেন। কিন্তু সংস্কৃত উৎস পেলে তিনি ভীষণ রকম সরব। সম্ভবত এই উদ্দেশ্যে যে তাতে উপভাষাটির একটি সম্মান আদায় করে নিতে পারবেন। এতে করে তিনি তাঁর পুরো শ্রমটিকেই এক সীমাতে বেঁধে দিয়েছেন ।   উপেন রাভা হাকাচামও  এর পরে বাংলা-সিলেটি এবং অসমীয়ার এক দীর্ঘ তুলনা মূলক আলোচনা করেছেন। কিন্তু, কী মুস্কিল ! সিলেটি বলে তিনি যে শব্দ বাক্য গুলো তুলে দিয়েছেন তার সঙ্গে সম্প্রতি শারদীয়া আনন্দবাজারে' প্রকাশিত সমরেশ মজুমদারের গল্প 'ছায়া শরীরে'র সিলেটির মিল আছে। অর্থাৎ সেগুলোও বেশির ভাগ সময়ে সিলেটি নয়। তার চে'ও মজা হলো,  বাংলা বলে তিনি যে শব্দবাক্যের উল্লেখ করেছেন সেগুলোও অতি বিশুদ্ধ বাংলা। অর্থাৎ 'সাধু বাংলা' নামের কৃত্রিম ভাষাটি। ওই ভাষাতে কেউ কথা বলে না। অবশ্যি তিনি যে এটি ইচ্ছে করে করেছেন তা নাও হতে পারে। গ্রীয়ার্সনের বিশাল গ্রন্থেও এই ত্রুটি ছিল। তাঁকে যে সিলেটিরা উপকরণ গুটিয়েছিলেন তাঁরা সেই দলের লোক যাদের সম্পর্কে  সঞ্জীব লিখেছেন, “যারা সিলেটি বলেন অথচ শিষ্ট সমাজে এটা গোপন রাখতে চেষ্টা করেন।”     গ্রীয়ার্সনের তুলে দেয়া একটা গল্পে অমন অদ্ভূত মজাদার সিলেটি বাক্য প্রচুর আছে , “... আর সে তাহারে হূয়র রাখিতে বন্ধে পাঠাইল” যেকোনো সিলেটিরও এমন বাক্য শুনে পেটে খিল ধরবে।  এই ত্রুটি না বুঝেই উপেন রাভা ভেবেছেন , “যিহর দ্বারাই ই যে অসমীয়ারহে অতি ঘনিষ্ট তাক প্রমাণ করিব পরা যায়।” তাঁর এই দাবিটি মিথ্যে নয়, কিন্তু 'অসমীয়া' শব্দের পরে যুক্ত '-হে' প্রত্যয়টি অর্থবহ। বেণুধর রাজখোয়ার মতো আসলে তিনিও বলতে চাইছেন , “বাংলা বা অইন ভাষা গোষ্ঠীর লগত নহয়।”  আমরাও এর পরের অধ্যায়ে তাঁকে অনুসরণ করেই সেই চেষ্টাই করব।  কিন্তু সিলেটিকে সিলেটি আর বাংলাকে বাংলা করে নিয়ে। অসমিয়াকে আমরা সেভাবেই রাখব যেভাবে তাঁর গ্রন্থে পাব। কিন্তু সে আলোচনা সম্ভবত নিরস হবে। কেননা , সেখানে থাকবে যত ধ্বনিতত্ব, রূপতত্ব, শব্দতত্ব আর বাক্যতত্বের কথা। আমরা চেষ্টা করব 'শুষ্ক কাষ্ঠ'কে 'নিরস তরুবর' করে তুলতে।
গ্রন্থ সূত্রঃ
২) অসমীয়া আরু অসমর তিব্বত-বর্মীয় ভাষা ;ড০ উপেন  রাভা  হাকাচাম   ।
৩)অসমীয়া আরু অসমর ভাষা উপভাষা।ঃ  ঐ।
 ৪)ভাষার ইতিবৃত্ত; সুকুমার সেন।
৫)বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক বাংলা ভাষার অভিধান ও ভাষাতত্ব; জগন্নাথ চক্রবর্তী।
৬)ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ; পবিত্র সরকার।
৭)সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলাভাষা; রামেশ্বর শ'
৮ ) ভাষাতত্ব; অতীন্দ্র মজুমদার
৯)বাঙালির ইতিহাস-আদি পর্ব; নীহার রঞ্জন রায়।
১০)কাছাড়ের ইতিবৃত্ত; উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ।
১১)The Origin and Development of the Bengali Language; Suniti Kumar Chatterji.
১৩)শব্দতত্ব ; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।