আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Monday, 25 July 2022

উজান অসমে বাংলা ব্যানারে কালি এবং প্রগতিশীলদের 'ভাষা আইন’

 (লেখাটি ২৪ জুলাই, ২০২২ -এ করিমগঞ্জ আসাম থেকে  জাহিদ রুদ্র সম্পাদিত  "মননভূমি' কাগজে প্রকাশিত।)

 

  পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের সর্বত্র ‘ভাষা আইন' আছে।  পশ্চিমবঙ্গে শুরুতে কেবল বাংলা ও ইংরাজিই স্বীকৃত সরকারি ভাষা হলেও এখন আরও এগারোটি সহযোগী সরকারি ভাষা রয়েছে। অসমের বরাকের তিন-জেলাতে যেমন বাংলা, পশ্চিম বাংলাতেও দার্জিলিঙের তিন জেলাতে নেপালি সহযোগী সরকারি ভাষা। এ ছাড়াও নানা জেলা এবং ব্লক স্তরেও যদি কোনও ভাষিক গোষ্ঠীর মানুষ ১০%-ও রয়েছেন—সারা রাজ্যে হয়তো ১%-ও নন—তেমন অনেক ভাষাও স্বীকৃত । যেমন উর্দু, হিন্দি, ওড়িয়া, সান্তালি, কুরুখ, তেলেগু, কুর্মালি, তেলেগু, কামতাপুরি, রাজবংশী এমন কি পাঞ্জাবিও। অর্থাৎ মোট চৌদ্দটি সরকারি ভাষা। কোথাও অসমিয়া জনসংখ্যা ১০% হলে অসমিয়াকেও সহযোগী সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দিত।  না  দিলেও অসমিয়াতে ব্যানার লাগিয়ে অসমিয়া অনুষ্ঠান করলে সারা বাংলাতে কেউ বাধা দিতে যান না।পশ্চিম বাংলা বলেই না,দেশের সব রাজ্যেই অন্তত বড় বড় শহরে অসমিয়া অনুষ্ঠানাদি হয়—অসমিয়াতেই হয়—অসমিয়াতেই তার প্রচার হয়। তাই বলে কি কেউ তাতে বাংলা ভাষার বা তামিল তেলেগু ভাষার বা মারাঠি ভাষার বা হিন্দি ভাষার অবমাননা হল বলে হুমকি ধমকি দিয়ে থাকেন? যান না। এমন করবার কল্পনাও করেন না। আর সংবিধানও এর অনুমতি দিয়ে থাকে। সংবিধানের ২৯ এবং ৩০ অনুচ্ছেদে সমস্ত সংখ্যালঘু ভাষা চর্চার অধিকার সুরক্ষিত। সেই জন্যে অসমেও যখন বাঙালি বা অন্য-ভাষিক সম্প্রদায় অনুষ্ঠানাদি করেন সরকার এখানে এইসবে বাধা দিতে আসে না। অধিকাংশ অসমিয়া মানুষও এতে আপত্তি করবার কিছু দেখেন না —আসে যারা কোনও আইনের ধার ধারে  না।  অনেকটা সারা দেশে হিন্দু নামধারী কিছু সংগঠন যেমন করে—আইন তারা নিজের হাতেই নিয়ে নেয়। অসমে এখন লাচিত সেনা ও এমন কিছু সংগঠনও তাই করছে।
দেখা গেছে জাতীয়তাবাদীদের ভয়ে তটস্থ দক্ষিণ পন্থী দলগুলোও এই নিয়ে রা তো করেই না, কিছু বাম ব্যক্তি বা দল বা সংগঠনও মনে করেন লাচিত সেনার তরুণরা হচ্ছেন  ‘সংগ্রামী বন্ধুসকল' আর প্রদীপ দত্তরায়ের বিডিএফ বা অন্যান্য বাঙালি সংগঠনগুলো ‘সাম্প্রদায়িক'। সে নাহয় তাঁরা বলুন। কিন্তু সেই প্রগতিশীল বা ‘বামে’রা যতক্ষণ লাচিত সেনাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলতে পারছেন না ততক্ষণ সাধারণ বাঙালিকে -- এমন কি ‘প্রগতিশীল’ যারা রয়েছেন বা হতে চাইছেন তাদেরকেও --- সঙ্গে পাওয়া কঠিন।একজন প্রগতিশীল বাঙালিও বাঙালি হবার ‘অপরাধে’ আক্রান্ত হবার ভয়ে থাকেন। ঠিক যেমন একজন প্রগতিশীল যেকোনও ভাষী মুসলমান হিন্দুত্ববাদীর ভয়ে থাকেন। বাঙালি সাম্প্রদায়িকেরা অসমিয়া প্রগতিশীলদেরও এভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আক্রমণ করেন না, সাহস করেন না। কা বিরোধী আন্দোলনের দিনে, মনে আছে কি, বিধায়ক শিলাদিত্য দেব—কিছু বাঙালি সংগঠনকে নিয়ে গুয়াহাটির খানাপাড়াতে একটি সমাবেশের আহ্বান দিয়ে পরে নাকখত দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। অসম সাহিত্য সভার সঙ্গে মিলে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের স্মরণ অনুষ্ঠান করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। স্থিতি ঠাণ্ডা হতেই সব ভুলে গেছিলেন। এমন কি সাম্প্রতিক তিনসুকিয়ার ঘটনাতে দেখা গেছে বহু হিন্দুত্ববাদী যারা হিন্দু বলে বাঙালি ও অসমিয়া ঐক্যের স্বপ্ন দেখেন --- তাঁরাও আতঙ্কিত।  তবু হিন্দুত্ববাদীরা কখনও বা  বাম-অসমিয়া তো বটেই আসুর মতো জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধেও মুখ খুলেন—যখন অসমিয়া নয়—আক্রমণের লক্ষ্যমুখ থাকেন মুসলমান। যতই নিজেদের ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলুন—অসমিয়া জাতীয়তাবাদীরা ইসলাম বা মুসলমানের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করলে বা বললে—সাধারণত মুখ খুলেন না। এত এত ফেক এন্টাকাউন্টার নিয়ে কজনে কথা বললেন? কিন্তু নগাঁওতে আসুর সদস্য কীর্তিকমল বরা আক্রান্ত হলেই শুধু এরা এমনই সরব হলেন যে পুলিশ প্রধানকেও শহর ছেড়ে চলে যেতে হল।
  সম্প্রতি তিনসুকিয়া সহ উজান এবং মধ্য অসমে একাধিক শহরে বাংলাতে লেখা ব্যানারে,দেওয়াল লেখাতে কালি মেখেছে লাচিত সেনা।  যেন কালি মাখানো অভিযান শুরু করেছে। কিছু বাঙালি সংগঠন ভাটি অসম থেকে সমানে উগ্র ভিডিও ভাষণ দেওয়াতে দিন কয় ভিডিও যুদ্ধ হল। ২২ জুনের তিনসুকিয়ার ঘটনা এর জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে সেখানে একটি সংগঠন ছিল নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন, আরটি ছিল বর্ণালি শিশু কল্যাণ সংস্থা। আরও একটি বিপদনাশিনী পুজোর ব্যানার ছিল। প্রথম দুটির জন্যেই লোক আতঙ্কিত হয়েছেন বেশি, ক্ষুব্ধও। যেখানে সেই ঘটনা হয়েছে -- সেই দুর্গাবাড়িতে একটি প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে। শহরের প্রাণ কেন্দ্রে এটি। এখানে সব ভাষাতেই অনুষ্ঠানাদি হয়ে থাকে। কিন্তু বাঙালির সংগঠনগুলো এখানেই সভাসমিতি ইত্যাদি করে থাকেন। অসম আন্দোলনের দিন থেকে কা-বিরোধী আন্দোলনের দিনেও এখানে বাংলা ব্যানার টানানো হয়েছে, তোরণ হয়েছে। অনুষ্ঠান হয়েছে। কেউ কখনও বাধা দেয় নি। কা-বিরোধী আন্দোলনের শুরুর দিনে ২০১৬-র ডিসেম্বরে এই প্রেক্ষাগৃহেই  ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’র আহ্বানে উত্তর পূর্বভারত বাংলা ছোটো কাগজ সম্মেলন হয়েছিল। সারা শহরে বাংলা ব্যানার লেগেছিল—কেউ বিরোধিতা করেনি। আজ শুরু হয়েছে—যখন জাতীয়তাবাদ নিজেই হিন্দুত্বের চাপে বিপন্ন। অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে—তখন এই নতুন সংগঠনটি খালি ময়দানে নিজেদের চ্যাম্পিয়ন করতে নেমেছে। এরা কেবল ব্যানারেই কালি মাখে না—এখানে ওখানে বাঙালি ছোটো দোকানদারকেও নানা কারণে হেনস্তা করছে। এদেরই মতো একটি সংগঠন অসমিয়া যুবমঞ্চকে দেখা গেল ব্যানার প্রসঙ্গে যেভাবে ভিডিও হুমকি টুমকি দিল—দুদিন পরে লক্ষিমপুরে এক বাজারে মুসলমান মাছব্যাপারির তকি মাটিতে ফেলে অপমান করল। ওদের অন্ধ ধারণা যে অসমিয়া মুসলমান বাকি মুসলমানের মতো কিছুই করেন না না। এরা ‘প্রায় হিন্দু’। হিন্দু এরা বলবেন না, বলবেন ‘অসমিয়া’। ফলে বাংলা ব্যানার টানানো যেভাবে পাপ, মুসলমানের তকি লুঙ্গি দাড়ি রাখাও পাপ। আজ অব্দি শোনা যায় নি—শার্ট প্যান্ট পরা কোনও মুসলমানকে এই জাতীয়তাবাদীরা হেনস্তা করেছেন বলে।


                বামদল বা ব্যক্তি – বিশেষ করে বাম-অসমিয়াকে সামনে এসে কথা বলতে দেখা গেল না।  কিন্তু কাউকে কাউকে বলতে শোনা গেল—এই দুর্গাবাড়ির কর্তাব্যক্তিরা বা নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের নেতৃত্ব সবাই শাসক দলগুলোর সঙ্গে থাকেন। এখনও তাই আছেন। অগত্যা—এরাই অসমিয়া বাঙালি বিভাজন করতে এই সব বাংলা ব্যানার-ফ্যানার চাপিয়েছেন। অদ্ভুত সমাজ বিচ্ছিন্নতা। লাচিত সেনার থেকে এমন অবাস্তব সমাজ-বোধ ভিন্ন কিছু না।অসমিয়া বাঙালি বিভাজন টেনে প্রবল বানের দিনে মানুষের দৃষ্টিকে অন্যদিকে টেনে নেবার অভিযোগ—লাচিত সেনার বিরুদ্ধে আনা যেতেই পারে—যে বাঙালি সুরক্ষা পরিষদ হুঙ্কার দিয়েছে শিবসাগরে গিয়ে লাচিত সেনাকে পিটবে—তাদের সম্পর্কেও একই অভিযোগ আনা যেতে পারে। যদিও বাঙালি সংগঠনটি সেই ‘পিটাপিটি’র প্রতিযোগিতাতে হাস্যকর ভাবে হেরেছে। তাই বলে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনকেই আসল  অপরাধী সাজানো? যাদের কোনও রেকর্ড নেই অসম সাহিত্য সভা, বডো সাহিত্য সভা, বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের মতো ভাষা সাহিত্যের অনুশীলনে বা অধিকার রক্ষা ও সম্প্রসারণের স্বার্থে কাজ করবার। কিছু দিবস পালন আর উৎসব আয়োজনই এদের কাজ। দুর্গাবাড়ির পেছনেই বঙ্গীয় বিদ্যালয়কে অসমিয়া একটি স্কুলের সঙ্গে মিশিয়ে দেবার সাম্প্রতিক উদ্যোগের বিরুদ্ধেও এরা এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করে নি। এমন কি নিজেদের উপরে আক্রমণ নামতেও যারা রা করবার সাহস জোটাতে পারে নি—তাঁরা করবেন বিভাজনের ষড়যন্ত্র? তাঁদের নীরবতা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে সারা শহরে। শাখা সভাপতির একটি অডিও ভাইরাল হয়েছে—তাঁদের ভীতির প্রমাণ স্বরূপ। প্রতিপক্ষ এদেরকেই অসমিয়া ভাষার অবমাননার , বাঙালী আগ্রাসনের প্রতিভূ বলে দাঁড় করাচ্ছে। আর একদল ‘বাম’ শাসকদলের স্বার্থে এরা বিভাজনের খেলা খেলছেন বলে কানাঘুষো করছেন। হ্যাঁ, বিভাজনের রাজনীতি এরা একটা করেন। সেটি এদের প্রাতিষ্ঠানিকতার অঙ্গ। শতবর্ষের অনুষ্ঠানের যে লোগো এরা সারা দেশের জন্যে বানিয়েছেন—সেটি দেখলে মনে হবে কোনও হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের লোগো।এদের অনুষ্ঠানাদিতেও বৈদিক স্ত্রোত্রের এত বাড়বাড়ন্ত যে মনে হবে এরা খ্রিস্টান, বৌদ্ধকেও বাঙালি বলে মনে করেন না, মুসলমানের তো কথাই নেই। এভাবে এরা যে নিজের সমাজকেই ভাগ করে নিজেদেরই দুর্বল করে রাখেন সেই বোধটুকু এদের নেই। এবং সাম্প্রতিক সমাজ বাদ দিন—শিল্প সাহিত্যের জগতেও এরা থাকেন বলে মনে হয় না।  সেই প্রসঙ্গ ভিন্ন। কিন্তু যারা এদেরকে অসমিয়া বাঙালি সংঘাতের সূত্রধার মনে করেন—তাঁরাও কম সাম্প্রদায়িক নন। বস্তত সংখ্যাগুরু অসমিয়া জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সাহস করে না দাঁড়াতে পেরে এরা নিজেদের প্রগতিশীলতাকেও করে ফেলেন অসমিয়া বিষয়বস্তু। অগত্যা অসমিয়া বাঙালি এক হয়ে কোনও সাংস্কৃতিক মঞ্চেও আজকাল দাঁড়াতে দ্বিধা করেন। আজকাল আর গণনাট্যও হয় না, জন-সাংস্কৃতিক পরিষদও হয় না। এই বিভাজনের সুযোগে হিন্দুত্ব তার কাজ করে যায়।  

 দুর্গাবাড়িতে সেরকম বাংলা ব্যানার টানানো বা অনুষ্ঠান করা নতুন কোনও কথা নয়।তিনসুকিয়ার এক অগ্রণী বাম-সাংস্কৃতিক কর্মী ছিলেন অশোক কর্মকার। লিবারেশন সিপি আই এম এল করতেন। আই পি এফে ছিলেন। জন-সাংস্কৃতিক পরিষদেও ছিলেন। যতদূর জানি—তিনি এই নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনেরও সদস্য ছিলেন, বর্ণালি শিশু কল্যাণ সংস্থারও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’র তিনি প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। প্রতিষ্ঠার দুবছর পরে তাঁর অকাল বিয়োগ ঘটে। কিন্তু তাঁর আদর্শ পরবর্তী পনেরো বছর পরেও এই একটিই সংগঠন  ধরে রেখেছে। তিনি অসমিয়া বাংলা দুই ভাষাতেই লিখতেন। নাটক লিখতেন। প্রবন্ধ লিখতেন। নাটক করতেন। অগত্যা তাঁর দুই সমাজেই প্রতিষ্ঠা ছিল। কিন্তু সেই যে সন্ত কবিরকে নিয়ে গল্প আছে—তাঁর মৃত্যুর পরে হিন্দু শিষ্যরা চাইছিল শ্মশানে নিয়ে যাবে, মুসলমান শিষ্যরা চাইছিল কবর দেবে। শেষে শবের চাদর তুলে দেখা গেল দেহ নেই—কিছু ফুল পড়ে আছে। অশোক কর্মকারও এখন দ্বিখণ্ডিত। তাঁর স্মরণে ছবি শোভা পায় বিষ্ণু-জ্যোতি সাংস্কৃতিক সমাজে। তাঁর প্রয়াণ দিবসে স্মারক বক্তৃতাও হয় কখনও কখনও। সেটি মূলত অসমিয়াদের সংগঠন। আর ছবি নেই স্মারক বক্তৃতা নেই—তবু নানা ভাবে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কাগজকে ধরে রেখেছে ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’। তিনি দেখে যান নি যে তাঁর কাগজ এখন গোটা পূর্বোত্তরে বা তার বাইরেও একটি পরিচিত নাম। এবং সাংস্কৃতিক প্রতিবাদে শহরের অগ্রণী নাম। এমন একটি অসমিয়া কাগজও এই শহরে নেই। ডিগবয় থেকে নতুন সাহিত্য পরিষদের একটি পত্রিকা কখনও বেরিয়ে থাকে।  
অশোক কর্মকারের সতীর্থ কিছু লিবারেশন কর্মী সমর্থকও উজানে ছিলেন, বা আছেন। অন্য বামদলের সমর্থকেরাও রয়েছেন। ডান দলেরও লোক আছেন। শাসক দলেরও সমর্থক এই গোষ্ঠীতে রয়েছেন। গুটি কয় মানুষ—সামাজিক দায়বোধ থেকে কাজ করেন—সেখানে ভাবাদর্শের গণ্ডি  সংকীর্ণতারই নামান্তর হয়ে যায়। সেই ‘উজান’ বহু অনুষ্ঠান এই দুর্গাবাড়িতে করেছে। কখনও অসমিয়া ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি বিরোধী কোনও কাজ করেনি। যদিও নিজেদের বাংলা ব্যানারে বুক চেতিয়ে লিখে গেছে ‘আমার ভাষা আমার পরিচয়’। ২১শে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে বহুভাষিক অনুষ্ঠান করেন বলেই সেখানে অসমিয়াতেও লিখে রাখেন ‘মোর ভাষা মোর পরিচয়’। এভাবে উজান চেষ্টা করে গেছে উভয় সম্প্রদায়ের ‘প্রগতিশীল’ লোকজনকে ভিড়িয়ে অনুষ্ঠানাদি করবার। এবারেও করেছে ২১শের অনুষ্ঠানে ‘ভাষার গান, দেশের গান, মানুষের গান’ । সেখানে চিনিয়েছে টিভির রিয়ালিটি শোয়ের বাইরেও গান রয়েছে। কেবল ভক্তি আর প্রেমের গানের বাইরেও গান রয়েছে। বলিউড সিনেমার বাইরেও বাংলা অসমিয়াতে উপভোগ্য দেশের গান রয়েছে। অসমিয়া শিল্পীরাও এসে ভিড় করে গান করে গেছেন। এই সব করতে করতে প্রবল কমিউনিস্ট এবং মুসলমান বিরোধী কেউ কেউ লাল পতাকা হাতে নিয়েও কখনও থানা চারিআলিতে গিয়ে দাঁড়াবার নজির আছে।  কিন্তু লালপন্থীরা যদি এমন অদ্ভুত প্রচারে থাকেন যে দুর্গাবাড়ির সবাই শাসক বিজেপি বা কংগ্রেসের লোক—তাই বাংলা ব্যানার চাপান -- তবে এরাও ভয়ে কুঁচকে যাবেন। বরং এই আস্থা বেড়েই যাবে যে শাসকদলের ছত্রছায়াতেই তাঁদের ভাষিক অস্তিত্ব সম্পন্ন থাকবে। যদিও বাস্তব এই যে সাম্প্রতিক বাঙালি বিরোধী আক্রমণের পেছনে শাসকদলের ‘কা’ আইন এনে বাঙালি রক্ষার লোকদেখানো নাটকই মূলত দায়ী। অসমিয়া লোকে বলতেই বলে, কা না আসতেই এই। এলে পরে কী হবে?  


নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন একটি সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান। সমগ্র দেশে তাঁদের শাখা সংগঠন রয়েছে। এই বছর এরা শতবর্ষ উদযাপন করছেন। দেশের কোথাও এই সব বাংলা ব্যানার লেখা, বাংলা অনুষ্ঠান করবার জন্যে তাদের অপরাধী সাজাবার নজির নেই। অসমে তাই হল। তাতে কি লাচিত সেনা এবং  অসমিয়া জাতীয়তাবাদীদের সম্মান বাড়ল? এরা ‘প্রগতিশীল সংস্কৃতি’ চর্চা করেন কি লোকে যখন খেতে পায় না তখন ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা...’  এমন অতিভক্তির গান করেন—সেই প্রসঙ্গ বৌদ্ধিক তর্কের বিষয় হতে পারে। বাঙালি সংখ্যাগুরু এলাকাগুলোতে এদের বিশেষ সম্মান প্রতিষ্ঠাও নেই। শিলচর আগরতলা শিলিগুড়ি কলকাতাতে নেই। অস্তিত্ব নেই বলেই বলতে পারি। যেখানে বাঙালি সংখ্যালঘু, যেখানে মুক্ত চিন্তার বিশেষ পরিবেশ নেই বাঙালির -- সেখানেই এদের অস্তিত্ব। আর যেখানে নিখিল ভারতও নেই—সেখানে বাঙালির আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি চর্চার অন্যকিছুও নেই। শিলঙের মতো দুই একটি জায়গা ব্যতিক্রম। শিলঙে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ রয়েছে।এই সংগঠনটিতে স্বাভাবিক ভাবেই কংগ্রেস বিজেপির মতো দলগুলোর সমর্থকই বেশি,কিন্তু সবাই নয়। হলই বা — সেটি কি নতুন কোনও ‘অপরাধ’? নির্বাচনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোকেও বাংলাতে ব্যানার পোস্টার সাঁটতে দেখা যায়। তিনসুকিয়া শহরে অসম জাতীয় পরিষদ তথা অজাপকেও বাঙলাতে সেইসব করতে দেখা গেছে বাঙালির ভোট পাবার স্বার্থে। পৌরনির্বাচনের দিনেও দেখা গেছে। তখন কিন্তু লাচিত সেনা বা কোনও ‘জাতীয়তাবাদী প্রগতিশীল’ও রা করেন না। আর  সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে সেইসব করবার তাদের এবং বাঙালি জনতার অধিকারও আছে।  বিজেপি বা কংগ্রেসে এই সব করে বলেই লাচিত সেনা এভাবে চটে বলে যদি কোনও প্রগতিশীল দল বা ব্যক্তি দাবি করেন বা মনে করেন তবে একজনও বাঙালি তাদের ধারে কাছে ঘেঁষবেন না। বরং  বাঙালির ভেতরে কমিউনিস্ট বিরোধী বিজেপি কংগ্রেসের প্রচারই শক্তি পাবে। কিন্তু বিজেপি কংগ্রেসের ভয় দেখিয়ে বা দেখে এই যে বাম দল বা লোকেরা ‘জাতীয়তাবাদ’ করেন—তাতেই বা কজন অসমিয়া লোকই এখন এই সব দলের সঙ্গে আছেন? প্রচুর পদ্মে ছাপ দেওয়া অসমিয়াও আছেন—বাকি দিনগুলোতে নিজেদের কম্যুনিস্ট বলে জাহির করেন। বাঙালি সমাজেও, অসমিয়া সমাজেও। কিন্তু তবু এইসব ‘প্রগতিশীল’দের ভাবনা-- অসমিয়া জাতীয়তাবাদের পথ ধরে যদি  অসমীয়ার কোনও মুক্তি আসে। এরা অনেকে শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতি করেও আকণ্ঠ মধ্যবিত্ত শ্রেণি-রাজনীতিতে ডুবে আছেন। নিজেরাও জানেন না—এই সব চাতুরি ধরা খুব কঠিন কিছু না।  এঁরা নিজেরা কিন্তু ‘অসম সাহিত্য সভাতে'ও যান  --যে সংগঠনের নেতৃত্ব এখন নিন্দুকে বলেন শাসকদলের  হাতে। তিনসুকিয়াতে সিপি আই এম এল লিবারেশনের এক সময়ের সমর্থকের অসম সাহিত্য সভার জেলা সভাপতি হবারও নজির আছে। অসম আন্দোলনের দিনে যখন এরা জনসংস্কৃতি  পরিষদ করছিলেন—তখনও সগর্বে অসম সাহিত্য সভার কেন্দ্রীয় অধিবেশনে শোভা পাবার নজির আমাদের হাতে আছে।

জন সংস্কৃতি পরিষদ বা গণ নাট্য সঙ্ঘ এখন কই? অভিনেতা বিরিঞ্চি বরা সম্প্রতি গ্রেপ্তার হলে পশ্চিম বঙ্গ গণনাট্য থেকে প্রতিবাদের পোস্টার আমাদের হাতে এসেছে। অসমের গণনাট্য থেকে আসে নি। থাকলেও নজরে পড়ে নি। দ্বিতীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাঙালি যদি নিজ ভাষাতে বৌদ্ধিক এবং সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকার না পায়—তবে আর অসমে এই সব আশা করে লাভ নেই। তিনসুকিয়াতে বিষ্ণু-জ্যোতি সাংস্কৃতিক সমাজ বলে একটি  আছে। তার অনেকেই কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের মানুষ। কিন্তু সেখানেও সেদিন এক কর্মকর্তাই বললেন, আমরা রা করব কী? আমাদের ভেতরেই এনকাউন্টার রাজ—বুলডোজার সমর্থক লোক আছেন। কল্পনা করুন— নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন তো বিষ্ণুপ্রসাদ -জ্যোতিপ্রসাদ বাদ দিন হেমাঙ্গ বিশ্বাসেরও  নাম নিতে ভয় পায়। শঙ্খ ঘোষের নাম নিতেই সংকোচ বোধ করে। অতুল প্রসাদ দ্বীজেন্দ্রলালের নিচে নামেই না। এই বিষ্ণু-জ্যোতি সাংস্কৃতিক সমাজের অনুষ্ঠানে আমরা গিয়ে থাকি—আমাদের ‘উজানে’র অনুষ্ঠানেও অনেকে আসেন। অতিথি করেও আমরা আমন্ত্রণ জানাই। কিন্তু লক্ষ করেছি, আমাদের অনুষ্ঠানে অসমীয়া নাচ গান কবিতার অনুষ্ঠান  হলেও তাঁদের অনুষ্ঠানে কখনও বাংলা বা অন্যান্য অনুষ্ঠান হয় না।  অন্য কিছু সংগঠনে  যদি বা হল, তবে সেই সব  সাধারণত পশ্চিম বঙ্গীয় হন। পশ্চিম বঙ্গীয় অতিথি ছাড়া গুয়াহাটি বইমেলা থেকে শুরু করে অসম সাহিত্য সভার কেন্দ্রীয় অধিবেশনও সম্পন্ন হয় না কোনোদিনই। ফলে তলায় তলায় একটি দূরত্ব থাকাও সত্য।

যাই হোক, এত কথা টানবার উদ্দেশ্য একটাই-- কংগ্রেস বিজেপি করল বলেই বাংলাতে ব্যানার টানলে বা অনুষ্ঠান করলে তাদের আপনি অপরাধী সাজাতে পারেন না। আমরা নিশ্চিত নই, কোনও কমিউনিস্ট দল কি নিয়ম করেছে যে তাঁরা কোনোদিন উজান অসমে বাংলা ব্যানার লাগাবেন না? তবে যে তারা বাঙালি সমাজ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হবেন এটি নিশ্চিত। যদিও আমরা একাংশ বাম-ভাবাপন্নদের চিন্তাতে আঘাত করতেই এই কথাগুলো লিখছি, সবাইকে একই ছাদে ঢালবার বাসনা আমাদের নেই। অনেকেই সাধারণ বাঙালির মতোই এদের বিরুদ্ধে ভয়ে মুখ খোলেন না।  এমন কাজ তো ভারতীয় সংবিধান বিরোধী নয়। সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার লেখা আছে “Any section of the citizens residing in the territory of India or any part thereof having a distinct language, script or culture of its own shall have the right to conserve the same”।  বরঞ্চ লাচিত সেনার কাজগুলোই আইন হাতে নেবার মতো হয়েছে। এরা কেবল ব্যানারে কালি মাখায় না, এখানে ওখানে ছোটো দোকানিদেরও অপমান  করে, তাড়াতে উদগ্রীব হয়। আর সম্প্রতি শৃঙ্খল চলিহার একটি সাক্ষাৎকার সামনে এসেছে যেখানে তিনি উজান অসমের সমস্ত বাঙালিকে বাংলাদেশি বলছেন। এরা ভাটি অসমের মুসলমান শ্রমিকদেরও বাংলাদেশি বলে প্রায়ই হেনস্তা করেন। দাড়ি লুঙি আর কানের নিচে ঘোমটা মহিলা শ্রমিক দেখলেই হল পথে ঘাটে। ভাগ্যিস আজকাল রিকশা- ঠেলার ব্যাবহার কমেছে। নইলে মুসলমান রিকশাওয়ালা ঠেলাওয়ালাকে এরা এবং প্রায় সমস্ত ‘জাতীয়’ সংগঠনগুলো আর সংবাদ মাধ্যম এই সেদিন অব্দি ছেড়ে কথা বলতেন না। ‘সন্দেহজনক নাগরিক’ বলেও এই সম্প্রদায়কে এরা আবিষ্কার করে রেখেছিলেন। আজকাল এই সব কম শোনা যায় । সম্ভবত তাড়াবার কৃতিত্বে সন্তুষ্ট আছেন।  সেই সব কিছুই আইন হাতে নেওয়াই। সেই সব  সম্পর্কেও বোর্জুয়াদলগুলোকে তো অবশ্যই, কমিউনিস্ট দলগুলোকেও এবং ‘প্রগতিশীলদের' সাধারণত চুপ থাকতেই দেখেছি। কেবল ডিব্রুগড়ে এক দশক আগে একটি সংগঠন ব্যাপক হারে মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ বলে তাড়ানো শুরু করলেই অসমিয়া মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে এর বিরোধিতাও সমানে হয়েছিল। কিন্তু ছোটোখাটো আক্রমণে কারই বা রা করবার সময় থাকে? কিন্তু এমন আক্রামকদের সংগ্রামী কিন্তু বিভ্রান্ত যুব-বন্ধু বলে উল্লেখ করছেন ‘প্রগতিশীল’রা এমন আশ্চর্য ঘটনাও দেখেছি । এরা এগিয়ে এসে শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজকে সংগঠিত করে সংগ্রাম করবে বলে অলীক স্বপ্নও কেউ কেউ দেখেন। বাস্তবে এরা কিন্তু শ্রমিক আন্দোলন বা কমিউনিস্ট আন্দোলন সবল হলে কম্যুনিস্টদেরও ধরে আগেও পিটেছে, পরেও পিটবে। লাচিত সেনা এখন ভয় পাবার মতো সংখ্যাতে কম্যুনিস্ট দেখে না বলে।


                এই কদিন আমরা অসমিয়া জাতির স্বার্থে এদের ভিডিও জারি করে বাঙালি সমাজকে গালি দিতে যেমন দেখেছি, কাউকে কাউকে পরদিনই নূপুর শর্মার সমর্থনে একই ভাষাতে দেশের মুসলমানদের গালি পড়তেও দেখেছি। লক্ষিমপুরে এক মাছ ব্যবসায়ীর মাথার তকি ছুঁড়ে ফেলে হাজতেও গেছেন এমন এক ভিডিও যোদ্ধা। তার সংগঠনটির অবশ্য নাম অন্য।  এদের বন্ধু বলে সম্বোধন করে কেউ কেউ বাঙালিদের হেমাঙ্গ বিশ্বাসের পথ অনুসরণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ‘বাঙালি হোন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো’—এটি একটি অসমিয়া জনপ্রিয় আখ্যান। এর জন্যে কাউকে বামপন্থী হতে হয় না। আমরা শিলাদিত্য দেবকেও বিপদে পড়ে ভগবান রামকে ছেড়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের শরণ নিতে দেখেছি। দুই চারটি বিদ্যানিকেতনে এরা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের প্রতিমূর্তি স্থাপন করে নিজেদের শ্রদ্ধাটা আগে দেখান। হেমাঙ্গ বিশ্বাস বাংলাতেও গেয়েছিলেন, লিখেছিলেন। তখন অব্দি একটি পরিবেশ ছিল। কিন্তু হারাধন রংমনের স্বপ্ন সাকার হয়নি -- এটি একটি বাস্তবতা। এর পরে ভূপেন হাজরিকাও গাইছিলেন, ‘আমি অসমীয়া নহও দুখিয়া বুলি সান্ত্বনা লভিলে নহব’। গেয়ে অসমীয়া সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন। তাঁর প্রতিমূর্তি আজ গোটা অসমে শোভা পায়। নইলে বাংলা আর বাঙালির কাছেই তিনি জনপ্রিয় হয়েছিলেন। তিনসুকিয়া সহ অসমের বহু শহরে তাঁকে অনুষ্ঠান করতে এককালে বাধা দেওয়া হয়েছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ষাটের পরের দিনগুলো কলকাতাতেই কাটিয়েছিলেন। আশির অসম আন্দোলনের দিনে অসমে এসে আবার সাংস্কৃতিক যাত্রা করবার পরিকল্পনা করেও হতাশ হয়ে ফিরে যান। বাঙালিকে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অনুসরণ করবার পরামর্শ দেবার মানে কী? অসমিয়াতে লিখে বলে গেয়ে নেচে এর পরে কলকাতা চলে যাবার পরামর্শ? সেতো মধ্যবিত্ত বাঙালি করছেই। এবং এত সুবিধেবাদী এই সম্প্রদায়টির দাদু দিদিমারা তার পরেও বাংলাদেশ ছেড়ে পালাবার গল্পই তাঁদের নাতিনাতনিদের শুনিয়ে থাকেন। অসম ছেড়ে বেরিয়ে পড়বার, পশ্চিম বাংলা গিয়ে প্রবাসী জীবন বেছে নেবার,প্রব্রজনের মধ্যবিত্ত গল্পগুলো আর করেন না। ভাবখানা এই যেন, তবু তো এরা আমাদের ‘হিন্দুভাই’। অসমিয়াদের যেমন ‘আমার লরা’—সেই রকমই আরকি।  ডিব্রুগড় তিন সুকিয়ার মাত্র কয়েক কিলোমিটার উত্তরে ব্রহ্মপুত্রের উত্তরে শিলাপাথারে ও চিমেন চাপরিতে ১৯৮৩-তে বাঙালি হিন্দুদের বিরুদ্ধে গণহত্যা হয়েছিল—এরা জানেনও না,মানেনও না।   

এই সব কারণেই এখন আর ভূপেন হাজরিকাও নয় --খগেন মোহন্তও নয় --অসমীয়া সংস্কৃতির প্রধান পুরুষ এখন জুবিন গার্গ। যিনি গান করেন ‘পলিটিক্স নকরিবা বন্ধু!’ তিনি গান করেন না ‘মানুষ মানুষের জন্যে’। ‘গান করেন না ‘বুঢ়া লুইত তুমি...!’ তিনি বলেন,কা আইন বলবত হলে—আলফাতে যোগ দেবেন। পরে আর ভুলে গিয়ে যোগ দেওয়া হয়ে উঠে না। আর যখন বর্ষাশ্রী শদিয়াখোয়া বুঢ়াগোঁহাঞি বলে এক কিশোরি কবিতা লিখে হাজতে যখন যায়— দু-মাস আটকে থাকে-- প্রশাসন বলে, আলফাতে যেতে চাইছিল—লোকে টুইটারে ফেসবুকে প্রশ্ন করে—সে তো জুবিনও বলেছিলেন। তার বেলা?
অসমিয়াতে সাহিত্য চর্চা করা বাঙালি এখনও অসমে আছেন। কেউ তাদের নাম নিয়ে বলেন না কেন—তাদেরই মতো সব বাঙালিকে হওয়া দরকার? তাতেই প্রমাণ -- এই সব বাহানা মাত্র। ঊষা রঞ্জন ভট্টাচার্য আছেন, অমলেন্দু চক্রবর্তী আছেন। তাঁরা কম্যুনিস্ট নন বলে কি তাদের কোনও সম্মান থাকতে নেই?  এমন কমিউনিস্টরা আজকের দিনে বাঙালি হিন্দু বা মুসলমান কাউকেই  নিরাপত্তা দিতে পারেন না। মাঝে এই মজার কথাও বলে দিই—হেমাঙ্গ বিশ্বাস হবার পরামর্শ আবার প্রগতিশীলেরা কেবল বাঙালি হিন্দুদেরই দিয়ে থাকেন। এমনিতে তাঁরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা এক্কেবারেই করেন না। মুসলমান তো তাঁদের বিশ্বাস অসমিয়া হয়েই আছেন। কেবল মুসলমানে বদরুদ্দিন আজমলকে আদর্শ করে নিয়েছেন—এটাই সমস্যা। আজান ফকিরকে অনুসরণ করলেই আর সমস্যা নেই। হজরত শাহজালালের সাড়ে তিনশ আউলিয়াকে তো কেউ চেনেনই না। চিনবার দরকারও নেই।  কোন গাছের ‘গুটি’ থেকে যে এই সব তত্ত্ব জন্মায়। তা, কথা হচ্ছিল নিরাপত্তা নিয়ে-- কংগ্রেস বিজেপি  অল্প হলেও ভোটের স্বার্থে দেবে । সেই জন্যেই এই সমাজটি শাসক দলের সঙ্গে থাকেন।
 আমি নিজে একাধিক অসমিয়া বই বাংলাতে অনুবাদ করেছি, আরও অনেক করব। আন্তর্জালে অসমিয়া প্রচারে প্রসারে গত দশকে শুরুর দিনগুলোতে আমার ভূমিকা উল্লেখ থাকবে একটি প্রকাশিতব্য অসমিয়া প্রবন্ধ সংকলনে।  তবু মনে করি না এমন জাতীয়তাবাদী পরিবেশে এই অসমে কোনও একজনও বাঙালি অপমানিত না হয়ে থাকবেন। দীর্ঘদিন আমার কলেজ থেকে ‘প্রজ্ঞান’ নামে একটি বহুভাষিক ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছি, যার বেশিটাই থাকত অসমিয়াতে। অসমিয়া ছাত্রদের নিয়ে একটি লেখকগোষ্ঠীও গড়ে উঠেছিল। ত্রৈমাসিক ছিল কাগজটি। সাধারণত কোনও কলেজ থেকেই এমন কাগজ বেরোয় না। দেশে বিদেশে এর খ্যাতি পৌঁছে দিয়েছিলেন অসমিয়া অনুরাগীরাই। এর পরেও একাধিকবার এই শহরে আমি অসমিয়ার শত্রু বুলে আক্রান্ত এবং অপমানিতও হয়েছি। কিছু ঈর্ষান্বিত সহকর্মী আমাকে কাজটির থেকে তাড়ান অসমিয়া-বাঙালি করেই। এখন পত্রিকাটি অনিয়মিত। আগামী বছর থেকে সরকারি নীতির জন্যেই একেবারে বন্ধ হবারই সম্ভাবনা।পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ ছিলেন অসম সাহিত্য সভা এবং কামরূপ অনুসন্ধান পরিষদ প্রতিষ্ঠার পেছনে  এক প্রধান ব্যক্তি। তিনি অভিমান করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ছেড়ে সিলেটের বাড়িতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ নিতান্ত কর্মভূমি থেকে জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া ছিল না।  যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য  অসম থেকে কয়েক হাজার প্রাচীন পুথি অনুসন্ধান করে সংগ্রহ করেছিলেন। সব কিছু নিয়ে তিনি কলকাতা চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন  যতীন্দ্র মোহন সংগ্রহশালা আছে কলকাতাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এইসবই লাভ।
হেমাঙ্গ বিশ্বাস অমলেন্দু গুহের মতো মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীকে কজনই সাধারণ অসমিয়া বাঙালি মানুষ চেনেন? শ্রমজীবী মানুষ,ছোট দোকানদারেরা কি চেনেন? সমস্ত বাঙালিকে  হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে অনুসরণ করবার উপদেশ মধ্যবিত্ত উপদেশ। অকমিউনিস্ট উপদেশ! এটাই বা কেন বলা হয় না যে এই সব শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতির বৌদ্ধিক নেতৃত্বকে অসমের সমস্ত ভাষা সম্প্রদায়ের মানুষেরই উচিত অনুসরণ করা? কেন কেবল বাঙালি হিন্দু?  এখানেই দ্বিচারিতা। এমন কথা যত বেশি বলা হবে এই সব মহান শিল্পী লেখক ঐতিহাসিকদের অহেতুক লোকে ঘৃণা করবেন। ভাববেন এরা মনে হয় অসমিয়া জাতীয়তাবাদেরই প্রতিভূ ছিলেন। বাঙালির শত্রু। হেমাঙ্গ বিশ্বাস সমস্ত বাঙালির আদর্শ হতেই পারেন না। এই সামান্য কথা বোঝেন না যে সমস্ত ‘প্রগতিশীল’ অসমিয়া মধ্যবিত্ত—তাঁরা প্রমাণ করেন যে তাঁরা ‘প্রতিক্রিয়াশীল  জাতীয়তাবাদী’। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের আদর্শ যদি চান এরা সব বাঙালি স্বীকার করুন, গ্রহণ করুন—তবে বাংলা ভাষাতে এই গান গাইবার স্বাধীনতা স্বীকার করুন ----ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না, শিল্পী সংগ্রামী পল রবসন!
অসমীয়া মাধ্যমের বিদ্যালয় ইংরাজি মাধ্যমে রূপান্তরিত হবার উদাহরণ নেই, যদিও বিশ্বায়নের  জন্যে সমস্ত সরকারি বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব  বিপন্ন। বাংলা স্কুল বেশি বিপন্ন। অসমিয়া কম, কেননা অনসমিয়া ছাত্রছাত্রীরা এসে বাঁচিয়ে রাখছেন। ইংরাজি মাধ্যমে যে অভিভাবক ছেলেমেয়ে পাঠাতে পারছেন না, তারা ভাবছেন অসমে চাকরি পাবার জন্যে অসমিয়াই সই।  কিন্তু স্কুলগুলো ভাবছে অন্যরকম। লাচিত সেনার ধরণের ধমকি হুমকির জন্যে বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলো নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে সমগ্র উজান অসমে ইংরাজি মাধ্যমে যেতে শুরু করেছেন। তবু অসমিয়াতে যাচ্ছেন না। ইংরাজিতে গেলে জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো বিরোধিতা করবার যুক্তি খোঁজে পায় না। এদের কৌশল বুদ্ধি এর বেশি কাজ করতে পারে না। এ একধরণের নঞর্থক প্রতিরোধ।  তুমি আমাকে অপমান করে যাও বলে, আমরা ছাত্র পাই না বলে অসমিয়াতে যাচ্ছি না, দরকারে ইংরাজিতে যাব। ভাষা- মাধ্যমে জাতিকে রক্ষা করতে পারে বা করবে—এই তত্ত্ব এখন বাস্তবের জমিতে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে।  ১৯৬০-এর আগে থেকে এহেন তত্ত্ব প্রচার করে আসছিলেন যে মধ্যবিত্ত—তাঁরা নিজেরাই সন্তানদের এখন বেসরকারি মাধ্যমে পাঠাচ্ছেন। সেখানে সন্তানেরা বাঙালি বিহারি নেপালি সবার সঙ্গে পড়ছে। সেখানে জাতীয়তাবাদী  বা কোনও ধরণের সংগ্রামী ছাত্র সংগঠনও করা যাচ্ছে না। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অন্যকোনও প্রশ্ন তুলবার থাকলেও ছাত্ররা শিক্ষকদেরই মতো সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকছেন। বিশ্বায়নের অনুগামী জাতীয়তাবাদীদের এর জন্যে লজ্জা পাওয়া দরকার। এখন দরিদ্র বাঙালিও পড়বে ইংরাজি মাধ্যমে।  


             বাঙালি সমাজে ভাষা আইনের ২০২০-এরসংশোধনের জন্যে অসমিয়া পড়ার আগ্রহ (আন্তরিক কারণে নাহলেও) বেড়েছে –এই কথাটি সত্য। শোনা যায়, ইংরাজি মাধ্যমে রূপান্তরিত কিছু আগেকার বাংলা স্কুলের শিক্ষকেরাও ভাষার চাপ কমাতে বাংলার বদলে ছাত্রদের অসমিয়া এম আই এল নিতেও চাপ দিচ্ছেন। সেই শিক্ষক অসমিয়া হতেই পারেন , বাঙালি হলেও অবাক হবার কিছু নেই। এই সব অধিকাংশ শিক্ষকই ভাষাচিন্তার থেকে ধর্ম নিয়ে বেশি চিন্তিত শঙ্কিত। গুণোৎসবে গিয়ে আমার সেরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। দুই একটি স্কুলের প্রার্থনা শুনে—মনে হয়েছে কোনও হিন্দু মন্দিরে এসে পৌঁছেছি। আজকার সারা দেশেই প্রার্থনা কী শিক্ষা দিচ্ছে — ঈশ্বর জানেন। প্রচুর সংবাদ আসে এই নিয়ে শিক্ষকেরা নিজেদের মধ্যেই সাম্প্রদায়িক লড়াই লড়ছেন।  ‘আল্লাহ’ শব্দ থাকা না থাকা নিয়ে অসমেই হল্লা হয়েছে। এমন প্রার্থনা শুনেই বাহ্যিক মূল্যায়ক হিসেবে যখন প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে বাকি প্রস্তুতির ফাঁকে কথা হচ্ছে—সব কটি বিদ্যালয় নিজেদের হতাশা ব্যক্ত করতে শুরু করেছেন। আগের বছরে এই সব শোনার অভিজ্ঞতা অসমিয়া বিদ্যালয়ে গিয়েও শুরু হয়েছিল। অবসর নেবার বয়স হয়েছে এমন অসমিয়া প্রধান শিক্ষক হুঁ-হুঁ করে কাঁদছেন এমনও তো দেখেছি। এমন আঁকা-বাঁকা পথে অসমিয়া পঠন পাঠন যদি কিছু বছর বেঁচে থাকে তবে থাকবে। এই সব কিছু নিয়ে উদাসীন লাচিত সেনা প্রশ্ন করে যাবে—‘অসমিয়া জীবনে' বাঙালির অবদান কী? কমিউনিস্ট তথা প্রগতিশীলেরাও প্রশ্ন করতে জানেন না-- লাচিত সেনার সদস্যরা বাঙালি মিস্ত্রী, ঠিকাদারকে দিয়ে নিজের বাড়ি-ঘর বা কোনও প্রতিষ্ঠান কি বানান নি?  নিজেদের বাড়ির বিয়ে জন্মদিন শ্রাদ্ধের ভোজ-ভাতে বাঙালি রাঁধুনিকে ডাকে নি? বাঙালি গাড়ি ড্রাইভার তাদের গাড়ি চালায় নি? বাঙালি হিন্দু মুসলমান চাষির ফলানো ডাল-ভাত- মাছ-মাংস-শাক –সবজি এরা মুখে দেন নি? বাঙালি রিকশাওয়ালা, টটো অটো চালক কখনো মাঝ রাতে এদের বাড়ির অসুস্থ রোগীকে নিয়ে হাসপাতাল দৌড়ান নি? বাঙালি নার্স-ডাক্তার এদের চিকিৎসা করেন নি? বাঙালি শিক্ষক এদের পড়ান নি? শ্রেণি নির্বিশেষে বাঙালিকে কি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো কবি-গায়ক-সংগঠন হতেই হবে? বাঙালির লেখা অসমিয়া গান-কবিতা শুনেই কি অসমিয়া ভাষা ও জাতিকে টিকে থাকতে হবে? গায়ক শিল্পীরাই কি ভারতীয় বিপ্লব সম্পন্ন করবেন? কী বলেন প্রগতিশীলেরা?  

অসমিয়াদের যেমন আছেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস, বাঙালিদের তেমনি— নেতাজি সুভাষ। তিনি বুঝি অসমকে পাকিস্তানে যাবার থেকে আটকেছেন। এহেন বাঙালি আরও এককাঠি সরেস। মনে মনে এদের নেতাজি নিন্দিত হিন্দুত্ববাদও রয়েছে পূর্ণমাত্রাতে। তাঁরা ভুলেই থাকেন— কেবল গ্রুপ সি-র বিরোধিতা করেন নি অসমিয়া মধ্যবিত্ত সমাজ। সিলেটটাকেও পূর্ব-পাকিস্তানে ঠেলে পাঠাতে চাইছিলেন। গোয়ালপাড়াকে অসমে ধরে রাখতে চাইলেও বীর চিলারায়ের ‘কামতাপুর’ নিয়ে এরা বিশেষ আগ্রহ দেখান নি। তাদের কাছে সেটি ছিল পাকিস্তান নয়—পূর্ব বাংলা। খেয়াল করুন—ভাষা আন্দোলন যেমন দেশভাগের পরের দশকের ঘটনা —অসম আন্দোলনও মুক্তি যুদ্ধের পরের দশকের ঘটনা। আর এখন তো ‘কা’ আইন আর আন্দোলোনের যুগ। তখন নেতাজি সুভাষ ছিলেন না। এখনও তো নেইই। যে দুর্গাবাড়ির কথা বললাম, সেখানেই তিনসুকিয়াতে নেতাজি জয়ন্তী হয়। যারা পালন করেন—তাঁরা একটি ব্যানার টিকিয়ে রাখতে পারেন নি। মামলা ঠুকবার সাহস জোটাতে পারেন নি। এভাবেই বাঙালি মনে বেঁচে আছেন নেতাজি। এদের বহু মানুষের ঘোর বিশ্বাস শৌলমারির সেই আত্মগোপনকারী সাধুটিই নেতাজি।  সেই পূর্ববাংলার প্রচুর মানুষ দেশভাগ আর মুক্তি যুদ্ধের পরে অসমে উঠে এলেন বলেই বহু অসমিয়া মধ্যবিত্ত মনে সুগভীর অন্ধ বিশ্বাস গড়ে উঠেছে যে অসমের বাঙালি মাত্রেই ‘বহিরাগত’। অসমিয়া ভাষা এরা গ্রহণ করে না নিলে এদের থেকে বিপদ প্রচুর। তাইই তাঁদের আখ্যানের নায়ক হেমাঙ্গ বিশ্বাস, অমলেন্দু গুহ, পুলক ব্যানার্জি প্রমুখ। এই আখ্যানের বিরুদ্ধে লড়াই করবার ক্ষমতা নেতাজি সুভাষের নেই—সে তিনি যত বড় বীরই হোন।  আমাদের নতুন নায়ক সন্ধান করতে হবে। অসমের জনগণমন অধিনায়ক। না কেবল বাঙালির, না কেবল অসমিয়ার। সে অধিনায়ক অসমের জনতার।  

Saturday, 11 June 2022

কেকে-র ‘প্রেমের পাঠশালা’ এবং সলিল চৌধুরীর সেই অমোঘ উচ্চারণ ‘আজ নয় গুন গুন গুঞ্জন প্রেমে’

[লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে শিলচরের দৈনিক বার্তালিপিতে ১০ জুনের সংখ্যাতে। ৪ এর পাতাতে।]




আমরা দেখছি, অনেকে আবেগে বলছেন—‘আমাদের প্রজন্ম প্রেম করা শিখেছে--কেকে-র গান শুনে।' তা আমাদের প্রজন্মও প্রেম করা শিখেছে কিশোর লতার মতো বলিউড শিল্পীর গান শুনে। এতে নিজের গৌরব কোথায়? এহেন কেবলই বলিউড ছবির গান শোনে প্রেম শেখা লোকজন থাকলে কেউ কোনও দিন বাংলা গান শুনে প্রেম করা শিখবে না। আমাদের সময় যদিও লোকে প্রেম করা শিখেছে হেমন্ত সন্ধ্যার গলাতে ‘এই পথ যদি শেষ না হয়’—এমন অসংখ্য গান শুনে। এখন দেখে শুনে মনে হচ্ছে যেন--বাংলা গানে প্রেম শিখবার স্বপ্ন দেখানো ভুলিয়ে দেবেন কেকে--অনুরাগীরা। আমাদের কেকে-কে নিয়ে বলবার কিছুই নেই। তাঁর অবাঞ্ছিত করুণ অকাল মৃত্যুর প্রতি শোক এবং বিশাল প্রতিভার প্রতি সম্মান জানিয়েই লিখছি—আমাদের প্রতিটি শব্দ অনুরাগীদের জন্যে নিবেদিত।

             ‘প্রেম’ কাকে বলে? এই যে বুলডোজার নামছে গোটা দেশে--এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে প্রেম বলে না? হিংসার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে প্রেম বলে না? লোকে যে কাজ পায় না, রোজগার পায় না, বাসা পায় না --- এই নিয়ে প্রশ্ন করাকে প্রেম বলে না? কেকে বা কিশোর অনুরাগীরা তো প্রেমের সংজ্ঞাকেও খাটো করে এনেছেন। আমরা তো প্রেম করা শিখেছি চল্লিশ পঞ্চাশের সলিল চৌধুরী শুনে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস শুনে। অজিত পাণ্ডে, শুভেন্দু মাইতি শোনে।  ভূপেন হাজরিকা শুনে। পরে সুমন নচিকেতা লোপামুদ্রা শুনে। শুনুন, সুমনের ‘পেট কাটি চাঁদিয়াল'।  আর অনুভব করুন প্রেম কাকে বলে। শুনুন লোপামুদ্রার  ‘নিভন্ত এই চুল্লিতে মা একটু আগুন দে’। শুনুন ফারজানা ওয়াহিদ সায়ানের গলাতে ‘ আমি সুন্দর হব’, শুনুন কৃষ্ণকলি ইসলামের গলাতে ‘ হাত ধরেছি হাঁটছি পথে’। তাদের তুলনাতে রূপঙ্করও খাটো। আমার মনে পড়ে না রূপঙ্করের এমন কোনও গান। কেকে বা বলিউডের অধিকাংশ শিল্পী--তাতে শ্রেয়া, শান, অভিজিত, শানু, বাবুল সুপ্রিয়র মতো বাঙালি শিল্পীদেরও নিতে পারেন--কতটা  এই সব বড় প্রেমের গান গাইতে পারে? আমাদের কাছে তো সেরা প্রেমের গান বেজেছে --এই দুই বছর আগে--  ফয়েজ আহমদের ফয়েজের ... ‘হম দেখেঙ্গে'। যার কবিতা সম্প্রতি সিবিএসই- পাঠ্য থেকে বাদ পড়েছে। যারা দুই দশক ধরে এত ‘প্রেম'-এর পাঠ নিলেন--তাঁরা কজনে এর জন্যে সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তুললেন? তখন তো জানা হবে, তাঁদের বাণী--সেই সব ‘প্রেম' নয়--রাজনীতি। ১৫ আগস্ট, ২৬শে জানুয়ারিতে নেতাজি জন্মজয়ন্তীতে খেয়াল করেন নি কি বাঙালি এখন ভুলে গেছে এই সত্য যে বাংলাতে অবিস্মরণীয় সব দেশপ্রেমের গান রয়েছে—ভারতে বাংলাদেশে? তাঁরা বলিউডের হিন্দি দেশপ্রেমের গানকেই গান বলে চেনে। সর্বত্র।   সত্য বটে বলিউড সিনেমার গানে বহু ছেলে বা মেয়ে প্রেমের জন্যে প্রাণ দিতে পারে--কুলের কালি গায়ে মাখাতে পারে--তারা কজনে হাজার মানুষের ভিড়ে নেমে সাহস করে গাইতে পারে সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরে...

‘যারা কাফেতে মোড়েতে বসে আছো

আমি তোমাদের ছেড়ে চললাম

তোমরা হতাশ-পেয়ালা ভরে নিলে

আমি রক্ত ঝরিয়ে কাঁদলাম ।

 

চারমিনারের ধোঁয়াতে

জীবন-পেয়ালা জমাট কুয়াশা

ফ্লুরেসেন্ট আলোর মোড়ে মোড়ে ঘোরে

তৃষিত মুক্তিপিপাসা ।

আজ ভেঙে যাব, কাল জুড়ে যাব

তবু ভাঙতে জুড়তে চলেছি

কালবোশেখিটা তোমাদের দেব

খুঁজে আনতেই চলেছি।

 

ওগো হতাশ তোমরা কেঁদো না

কোনও সান্ত্বনা আমি দেব না

সূর্য ডোবার সংকেতে দেখ

মুক্তি-রঙের নিশানা ।

সাহারা হৃদয় দাঁড়িয়ে যারা

মোড়ে মোড়ে আজও হতাশায়

আমার রক্ত ঝরে ঝরে যাক

তাদের শূন্য পেয়ালায় ।

আজ ভেঙে যাব, কাল জুড়ে যাব

তবু ভাঙতে জুড়তে চলেছি

বিদ্রোহী আমি বিপ্লবে ডাক

তোমাদের দিতে এসেছি।’

   

 দিলীপ চক্রবর্তী সম্পাদিত 'সপ্তাহ' কাগজে
১২ জুন,২২শে প্রকাশিত

         সেই ছেলেটিও গাইতে জানে না, যে কাজ পায় নি বলে প্রেমিকা পায় না। সেই মেয়েটি , যার রূপ ভালো নয় বলে কেউ ফিরেও তাকায় না। অথচ, জানা উচিত ছিল।

আর সব বাদ দিন-- এতো যে প্রেম--- এর ঠাঁইটা তো হৃদয়ে। কাগজে জানা যাচ্ছে ,দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন কেকে। তিনি অবহেলা করে গেছেন--এবং এই অবহেলাতেই তাঁর মৃত্যু। তাঁর ‘প্রেমের পাঠশালার' ছাত্রদের কী সেই সবেও সরব হতে মানা? আরও দশজনকে সতর্ক করবার দায় নিতে হবে না? অথবা ধরুন, প্রশ্ন উঠেছে--কলেজ ছাত্ররা এত লাখ লাখ টাকা পায় কই বলিউড শিল্পীকে এনে অনুষ্ঠান করতে? এই সব নিয়ে প্রশ্নে ভাবতেও মানা কি প্রেমের পাঠশালার ছাত্রদের? অনুষ্ঠানগুলোতে অব্যবস্থার চূড়ান্ত নিয়েও যে তর্ক উঠছে সেই সব নিয়েও ভাবতে নেই কি প্রেমিক ছাত্রদের বা প্রেমিকা ছাত্রীদের?

রূপঙ্কর খুব অন্যায় করেছেন--নিজেকে কেকে-র থেকে বড় শিল্পী বলে। তাঁর ‘ও চাঁদ শোনে' দুই চারটার বেশি ছেলে মেয়ে প্রেম শেখেনি মেনেই নিলাম। তাঁরও জানা দরকার--তিনি সব বাঙালির জন্যে গান করেনও না। বিশেষ করে যারা ‘হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট লভ' বা  দেবতা-প্রেমের গান ‘ঢাকের তালে' জন্মদিনের পার্টিতেও নাচবেন বলে চালিয়ে দেন। সেই সব বাঙালি শিল্পীর থেকেও তাঁর অনুরাগী কম--এর অন্যরকম হবার কথাই না।

বার্তালিপি, ১০ জুন

এমনিতেই প্রাক-স্বাধীনতা আমল থেকে হিন্দি ভাষাকে কেন্দ্র করে এক কেন্দ্রিক রাষ্ট্র গড়বার এক পুঁজিবাদী চাপ চিরদিনই ছিল। বহু আগেই আমরা তার কাছে আত্মসমর্পণ করে রেখেছি। আমরা ধরতেও পারি না আমরা যাকে নিজের পছন্দ অপছন্দ বলি—সেটি একটি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নির্মাণ। আর গত তিন দশকে তো আমরা বিশ্বায়নের স্বপ্নে মজেই আছি। কেকে, শান, শ্রেয়ারা তো এই বিশ্বায়ন যুগের শিল্পী। সেখানে বাংলা গান দাঁড়াবে কোথায়? তিনি কেকে হতে পারেন না, পারবেন না--আগামী অনেক প্রজন্মই পারবে না। সেখানে তাঁর এহেন ‘আমরা অনেক ভালো গাই' এমনিতেও দম্ভ--আর কেকের বিরুদ্ধে বললে বেশি বেশি দম্ভ বলেই শোনাবে। ভোটের সময় ভোট টানবার জন্যে ‘জয় বাংলা' বলে চেঁচানো--আর স্বজীবনে বিশ্বায়নের স্রোতে গা ভাসানোই এখন নতুন প্রজন্মের ধর্ম। সারা দেশেই। এরা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে দেশে রাজনৈতিক হাঙামা করলেও ভজনের আসরেও এমন ভিড় করে না। এরা ভজনকেও ডিজে গান বানিয়ে যায় মসজিদে। কী করতে যায় সবাই জানেন। তারা কেকে কেন শুধু--- অভিজিৎ , শান , শ্রেয়াকে এনে--ভিড় জমাবার ভণ্ডামিটা করবেই। আর করে বলেই গায়ক রূপঙ্করকে ‘সভ্যতা’ শেখাতে গিয়ে এরা নিজেরা সভ্যতার সব সীমা ছাড়িয়ে যেতেও কুণ্ঠিত বোধ করে না । 

 সেই ছাত্রেরা ফিরেও দেখবে না গান বেচে যাদের সংসার চলে--তাঁরা বাঁচলেন কি মরলেন যখন আর সিডি ক্যাসেট বাজারে চলে না। কোভিডে যাদের গান শেখাবার পাঠশালাও ছিল বন্ধ—সারা দেশেই।  কালিকা প্রসাদের পরে ‘দোহার’-এর মতো দল টিকবে কি টিকবে না—এই নিয়ে তাঁদের তর্কটা অনেকটা রাশিফল মিলল কি না মিলল বিচার করবার আমোদের মতো। তাঁরা তো কালিকাকে চিনেছেন—জি-সারেগামা দেখে। জি চ্যানেল কী করে চিনেছে—সেই প্রশ্নও তাদের মনে দেখি না। এরা এখনকার দোহারের সংগ্রামের খবর রাখে না।  রূপঙ্করও কি কোনোদিন এই সব নিয়ে বেশি ভেবেছিলেন? তাঁর গান শুনে মনে হয় নি কোনও দিন। আমাদের না-শোনা গান থেকে থাকতেও পারে।  অগত্যা-- তাঁর মনের ক্ষোভকে গদ্যে জানাবার ভাষার সমস্যা হতেই পারে। তার উপরে তাঁকে বলতে হচ্ছিল যে দলকে সমর্থন করেন সেই দলেরই ছাত্রদের বিরুদ্ধে। সেই দলটি যে তিনি কেন করেন?—এমন আদর্শবাদী প্রশ্নও খুবই সরল প্রশ্ন। এও শিল্পীর অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সর্বভারতীয় প্রশ্ন। অসমেরও হাল একই।

এর পরে নাহয় তিনি একই কথা--গানেই বলুন। কিছু হলেও লোক বেরোবে যারা শুনবে বুঝবে। তিনি বাংলা গানের অন্যতম সেরা শিল্পী ছিলেন আছেন। কোনও ট্রলই তা দমাতে পারবে না। এই কদিন আগেও ‘ইস্কাবন’ ছবিতে গাওয়া তাঁর গান ‘জোনাকি’ আন্তর্জালে লাখো মানুষ শুনছেন, এবং প্রশংসাতে ভরিয়ে দিচ্ছেন। আন্তর্জালের সব ক’টি মঞ্চে গানটি রয়েছে। এবং লাখো মানুষ শুনছেন। কেউ একটিও কটু কথা বলেন নি ফেসবুকে ছাড়া।  তিনি আগামীতে গানেই বলুন তাঁর রাগের কথা, ক্ষোভের কথা, ক্রোধের কথা। এই যেমন কিছু বাঙালি শুনেছেন শিলাজিতের সেই গায়ে কাঁটা দেয়া গান ‘এই গিটারটা বন্দুক হয়ে যেতে পারে যদি ভয় দেখাও/ নীল আকাশটা লালে লালে লাল হয়ে যেতে পারে যদি চোখ রাঙাও!’

দিলীপ চক্রবর্তী সম্পাদিত 'সপ্তাহ' কাগজে
১২ জুন,২২শে প্রকাশিত

 হ্যাঁ, আমরা নিশ্চিত তাঁর আক্রমণের অভিমুখ কেকে ছিলেন না। ছিলেন নিজের দলেরই এই সব কলেজ ফেস্টের আয়োজকেরা। যারা  বাংলা গায়কদের ছেড়ে বলিঊডের দামী শিল্পীদের দিকে ঝুঁকেছেন। এটি ‘কে ভালো কে মন্দ শিল্পী’র তর্কই নয়--এক বাংলা গানের শিল্পীর জীবিকা সংকটের, বলা ভালো গান শ্রমিকের সংকটের চিল-চিৎকার। বাণিজ্যিক গানের কারিগরেরা তাঁদের কোনও পাঠশালাতেই এই সব সংকটের কথা বলতে শেখানই নি। এমন কি ভারতের গৌরব লতা মুঙ্গেশকরও না। একটিই গান মনে করতে পারি তাঁর  --- তাও সলিল চৌধুরীর কথাতে। এর পরে আর কই? তবু সেই গানটি আমরা এখানে পুরোটাই তুলে দিতে পারি। যাতে কেকে-র মতো বলিউড শিল্পীদের , যারা বাঙালি হলেও হতে পারেন--প্রেমের পাঠশালার ছাত্রেরা ধরতে পারেন, আমরা বলতে কী চাইছি... আমরা কোন পাঠশালাতে বড় হয়েছি। কোন পাঠশালাকে আজকাল বলা হয়ে থাকে ‘দেশদ্রোহী'দের পাঠশালা। নইলে এই লেখককেও ছোটো করে  হলেও ট্রলের শিকার হবার সম্ভাবনাই বেশি।

আজ নয় গুন গুন গুঞ্জন প্রেমে

চাঁদ ফুল জোছনার গান আর নয়

ওগো প্রিয় মোর খোল বাহু ডোর

পৃথিবী তোমারে যে চায়।

আর নয় নিষ্ফল ক্রন্দন

শুধু নিজের স্বার্থের বন্ধন

খুলে দাও জানালা,আসুক

সারা বিশ্বের বেদনার স্পন্দন

ধরণীর ধূলি হোক চন্দন

টিকা তার মাথে আজ

পরে নাও পরে নাও পরে নাও।

কার ঘরে প্রদীপ জ্বলেনি

কার বাছার অন্ন মেলেনি

কার নেই আশ্রয় বর্ষায়

দিন কাটে ভাগ্যের ভরসায়

তুমি হও একজন তাদেরই

কাঁধে আজ তার ভার

তুলে নাও তুলে নাও তুলে নাও।।

পুনশ্চ সংযোজনঃ গীতিকার সলিল চৌধুরী বা গায়িকা লতা মুঙ্গেশকর ‘সেকেলে’ হয়ে গেছেন। নতুন যুগের নতুন কথা নতুন স্বর চাই অনেকে দাবি করতেই পারেন। সলিল চৌধুরীর গানের কথা কি সত্যি ‘সেকেলে’ হয়ে গেছে, কেউ বুকে হাত দিয়ে বলুন দেখি।  কাল কি সত্যিই এতো দ্রুত চলে?