আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Showing posts with label অসমের বাংলা কবিতা. Show all posts
Showing posts with label অসমের বাংলা কবিতা. Show all posts

Wednesday, 7 February 2018

গুহাচিত্র বনাম ফেসবুক স্টেটাস


(ছবি ঋণঃ আনন্দবাজার পত্রিকা)
কটা কাল ছিল মানুষ গুহাতে ছবি এঁকে নিজের 'স্টেটাস' জানাতেন। সেগুলো স্থানে ভ্রমণ করতে পারত না। কিন্তু কালে ভ্রমণ করে একাল অব্দি এসে পৌঁছেছে। সভ্যতার ইতিহাস পাঠ তাই এখনো সহজ হয়ে আছে। আজকাল লোকে ফেসবুকে, টুইটারে স্টেটাস লেখেন। সেগুলো দ্রুত স্থান ভ্রমণ করে। তারপরে তলিয়ে যায়। হোয়াটস এপে হলে যাকে পাঠানো হলো, তিনি পর মুহূর্তে 'ডিলিট' করে দেন। এই হচ্ছে, এর সর্বোচ্চ সম্মান। তার মানে গুহাচিত্রের বিপরীতে এই সব কালভ্রমণ করতে একেবারেই অক্ষম। চিরকালীন' বলে শব্দটি এখানে একেবারেই বেমানান।
          সম্প্রতি দেখলাম, কেউ  কেউ স্টেটাস দিয়ে জানাচ্ছেন দেখলাম ফেসবুকে আর ভালো লাগছে না। যারা জানাচ্ছেন , তারা যে ফেসবুকের চমকে ধরা কে সরা জ্ঞান করছিলেন , তাও দেখছিলাম। ভালো যদি নাই লেগে থাকেসে আমাদের কাছে সুসংবাদ। আন্তর্জালে আমার উপস্থিতি এই ফেব্রুয়ারিতে এক দশক পার করেছে। আন্তর্জালে বাংলা লেখালেখি ভারতেই যারা শুরু করেছিলেনখুব অতিশয়োক্তি হবে নাতাদের প্রথম দিককার মানুষ আমি। তখন পূর্বোত্তরে কেউ লিখতেনই না। গোটা ভারতে যে কজন হাতগুণা লিখতেনআমরা বলতে গেলে পরস্পরকে চিনতাম। ফেসবুক থাকলেও সেরকম জনপ্রিয় ছিল না। তখন ব্লগ ছিলছিল ই-মেল গ্রুপঅর্কুট , ইত্যাদি। অসমিয়াতেও কেউ লিখতেন না। ২০১০এ ফেসবুক পোষ্ট করলেই ই-মেলে চলে যাচ্ছেদেখে ব্যবহারকারী হুহু করে বাড়তে শুরু করে। আমরা সেই সময় অসমিয়ার প্রচারে প্রসারেও কাজ করি যেমনপূর্বোত্তরে বাংলা লেখালেখি নিয়েও কাজ শুরু করি। রোমানে বাংলা--অসমিয়া লিখিয়েদের থেকে কত গালি অপমান যে সইতে হয়েছে বোঝাই কী করে! এক বন্ধু প্রায় বাজিই ধরেছিলেন আন্তর্জালে বুঝি বাংলা লেখাই যায় না। তাঁকে যখন শিলচরে গিয়ে প্রায় জোরে ধরেই বাংলা লেখা দেখাইশেখাই---ফিরতে না ফিরতে দেখি তিনি ফেসবুকে গ্রুপ খুলে বসেছেনবাংলাতে। ফেসবুকের এতোই চমক। অথচতিনি কবি। আশা করেছিলামনিজের একখানা ব্লগ করবেন। যেভাবে নিজের খাতাতে স্থায়ীভাবে লিখে রাখেনসেভাবেই ব্লগে লিখে রাখবেন। যেভাবে নিজের সম্পাদিত কাগজ করবেনসেভাবেই ব্লগ সম্পাদনা করবেন। কিন্তু সেগুলোতে তো এতো এতো গরম গরম লাইকআর বাহবা মেলে না। ফলে সমস্যা হলো। তারা লাইকের মোহে বুঁদ রইলেন। এবং রাতারাতি কেউকেটা বিখ্যাত হয়ে গেলেন (বলে ভেবে নিলেন)। গোঁদের উপরে বিষফোড়ার মতো এলো স্মার্টফোন। বাংলা লেখালেখি সে আরো সহজ করে তুলল। এখন আর বলতে হলো না। বা হয় না।ভালোই তো হলোতাই নাভাবের আদান প্রদান খুব দ্রুত হতে শুরু করল। ভাবের তুফান ছুটল। সেই তুফানে বহু বাড়ি ঘর সংসার উড়েও গেল। তুফান সব সময়েই ভালো। তার মানে বর্ষা এলো। এবারে চাষাবাদ হবেফসল ফলবে। কিন্তু তুফানের আগে পরে বানও ডাকে। বানের তোড়ে সব ভেসে মিশে একাকারও হয়ে যায়। আর তৈরি করে দলা দলা আবর্জনা। সেই সব আবর্জনা দেখে যদি ঘেন্নাতে কেউ কেউ চলেই যানবাংলা ভাষার পক্ষে তবে সেই সব সুসংবাদ। কিন্তু আমরা যাই না কেনকারণপালাবার মধ্যে সুখ নেই। আবর্জনার পুণর্ব্যবস্থাপনার  মধ্যে রয়েছে যেটুকু। খুব কম লোকে তাতে হাত দিচ্ছেন। সেই কম লোকেই আগামীর দিশা দেখাবেন বলে আমার বিশ্বাস। এই যেমন একটিই মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়একটিই মাত্র কলেজ কলকাতার সরসুনা কলেজ আন্তর্জালের বিশাল জগতের রহস্য নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছেনআলো দেখাচ্ছেন--- ভাবা যায় কি সেই সব কাজের একটি অংশ হলো রবীন্দ্রনাথের নানা পাঠের আন্তর্জাল উপস্থিতি। ফেসবুকের মহাপুরুষ--নারীরা সেসব সম্ভবত দেখেনও নিকল্পনাও করতে পারেন না। বাংলা ওয়েবজিনওয়েবপত্রিকাক্রমেই বাড়ছে। এমন কি পূর্বোত্তরেও। ঈশানের পুঞ্জমেঘকাঠের নৌকার বয়সতো হচ্ছেই। (জনপ্রিয় নয় যদিওঅনেকে ঘেন্নাও করেন। সেসব ভালো)। বেশ কিছু ইউনিকোড পত্রিকা এখন আসাম ত্রিপুরার থেকে বেরোচ্ছে। রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, বিশ্বরাজ ভট্টাচার্যে মতো তরুণ কবিরা এখন ব্লগজিনে মজেছেন। একা একাই আলোর মশাল হাতে তুলে নিয়েছেন। খুব কম। তাতেই আশা জাগছে। রাতের আকাশের আঁধার কণাদের সংখ্যাই তো বেশি। অগুনতি তারারাও রয়েছে বটে। দেখা গেলে বোঝা যায় আকাশ পরিষ্কার। সুতরাং তাদেরও ফেলা যাবে না। কিন্তু আলো করে তো একা চাঁদ। আমাদের এই নবীন চাঁদদের অভিনন্দন... তাঁদের পক্ষ বদল ঘটুক। রাহু-কেতুর ভোগে না পড়লেই হলো। আমাদের জন্যে সেই সুসংবাদ। ফেসবুকে অনেকেই প্রশংসা প্রশস্তি করেনআসলে নিজেরা বিনিময়ে তোল্লা পাবেন বলে। কিন্তু এই তরুণেরা জানেনআমাদের প্রশস্তি নির্ভেজাল। কেবলই ভাষা এবং ভাবের সমবেত স্বার্থে। 
          আজ সকালে প্রবীণ কথাশিল্পী মিথিলেশ ভট্টাচার্য আমাকে ফোন করেছিলেন। আন্তর্জালের 'আবর্জনানিয়ে নিজের উষ্মা জানাতে। আমিও সমবেদনা জানালাম। কিন্তু সঙ্গে করে মনে হলোআমাদের এই সব শুক্লপক্ষ সংবাদও এই প্রবীণদের কাছে পৌঁছানো চাই। তাঁরা আন্তর্জালে আসবেন না। তাঁদের সসম্মানে অন্যরকম করে নিয়ে আসা চাই। আমাদের দৈনিক কাগজের আত্মপ্রতিষ্ঠাকামী 'অসভ্যসম্পাদক যখন সাহিত্যের পাতাতে রাশিফল ছেপে যাচ্ছেআর ভগীরথ মিশ্রআবুল বাসারঅমর মিত্রদের 'জয়পতাকাআমাদের দেখিয়ে বিদ্রূপ করে যাচ্ছেতখন আমাদের অনুপস্থিত পূর্বসূরিদের সসম্মান উপস্থিতি সম্ভব করাটা হোক আমাদের পরবর্তী রণকৌশল। সেই কাজ একা কারো দ্বারা সম্ভব নয়। সমবেত 'ভাবান্দোলনে'র দ্বারা সেসব সম্ভব। আমাদের 'রিফিউজি লতাজীবনের অন্ত পড়ুক। তৃণ গজাক , তার ফাঁকে ফাঁকে মহীরুহ অঙ্কুর মেলুক।



Thursday, 16 November 2017

কেন্নো পোকার রেল


মূল অসমিয়া: নবকান্ত বরুয়া
বাংলা অনুবাদ: সুশান্ত কর

(সুপর্ণা ভট্টাচার্য সম্পাদিত, শিলচর থেকে প্রকাশিত শিশু সাহিত্য পত্রিকা 'কাশফুলে'র শারদ সংখ্যা, ২০১৭তে প্রকাশিত হল)



[ কেরেলুয়ার রেল’ নবকান্ত বরুয়ার প্রসিদ্ধ শিশু নাটকগুলোর একটি। মূলত ‘আকাশবাণী’র জন্যে এমন বেশ কিছু নাটক তিনি লিখেছিলেন। ফলে মঞ্চ নির্দেশনা বলে সেরকম কিছু নেই। পদ্যে লেখা হলেও অভিনয়ের সময় কখনো বা পরিচালকেরা এতে সুরসংযোজন করে গীতিনাট্যেরও রূপ দিয়েছিলেন। বাণী কটকীর মতো কোনো কোনো পরিচালক ‘মুখোশ নাটক’-এ পরিণত করে এগুলো মঞ্চেও পরে অভিনয় করান। অন্য দুই এক নাটকের সঙ্গে ‘কেরেলুয়ার রেল’ নাটকটি যোরহাট , গৌহাটিতে বেশ ক’বার অভিনীত হয়েছিল। নবকান্ত লিখেছেন, এগুলো এতোই জনপ্রিয় হয়েছিল যে এককালে ছেলেমেয়েরা পথে ঘাটেও এর সংলাপ আওড়াতো। নাটকটির পাণ্ডুলিপি লেখকের কাছে ছিল না। আকাশবাণীতে নাটকটি অভিনয় করেছিলেন ভারতী বরুয়া, তিনি বহু পরে স্মৃতি থেকে এর পুনরুদ্ধার করে ছাপা সম্ভব করেছিলেন। ‘মনত পরার শব্দ’, ‘কাগজ কলমর রণ’, ‘ গোলাপ আরু বেলি’, ‘মই টুনটুনিয়ে টুনটুনালো’ এই চারখানা নাটক সহ ‘কেরেলুয়ার রেল’ নিয়ে  শিশু নাটকের সংকলন বেরিয়েছিল প্রথমে ১৯৮৪তে  ‘মনত পরার শব্দ’ নামে। ১৯৯০তে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে নাম হয় ‘কেরেলুয়ার রেল’। এই সবক’টি আবার সংকলিত  হয় তাঁর মৃত্যুর পর ২০০৩এ ‘অন্বেষা’ প্রকাশিত এবং গগণ চন্দ্র অধিকারী সম্পাদিত ‘ নবকান্ত বরুয়া শিশু সাহিত্য সমগ্র---প্রথম খণ্ড’-তে। যেখান থেকে আমরা অনুবাদের পাঠটি নিয়েছি। তিনি নিজে এগুলোকে ‘ননসেন্স রাইম’ গোত্রের বলেছেন। কিন্তু ‘রাইম’ বললে আমরা যা বুঝি, এর ছন্দ হবে ছড়ার--- সে নাটকগুলোতে নাটকের দাবি মেনে ‘ছড়া’র বহু কিছুই নেই, ‘ননসেন্সে’র সবটাই রয়েছে। মাত্রার বৈচিত্র্য আছে, গদ্যের চলন দেবার চেষ্টাও আছে। অন্ত্যানুপ্রাসও আছে, আছে শ্রুত্যনুপ্রাস।আবার বহু জায়গাতে নেই। অনুবাদ করতে গিয়ে আমাদের এই সব সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমরা প্রথমত, চেষ্টা করেছি বাংলা ছন্দের তিন রীতিরই আশ্রয় নিয়ে পদ্যের ধাঁচটা রাখতে। এবং যথাসম্ভব সর্বত্র অন্ত্যানুপ্রাস রাখতে। ফলে বহু সংলাপ ছাড়তে এবং কিছু সংলাপ জুড়তে হয়েছে বাংলায়। বহু শব্দকে নিয়েও খেলা করতে হয়েছে, তাতেই ‘বরসা, মশেলা, কিইচ্ছা’ শব্দগুলো এসেছে। যদিও নাটকের মূল গল্প কাঠামোটি অক্ষতই থেকেছে। দ্বিতীয়ত রেলযাত্রীরা বহুভাষিক হয়ে থাকে, এই কথাটি লেখক মনে রেখে শুধু অসমিয়া নয়, মাঝে মধ্যেই বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি কথন ভঙ্গীরও মিশেল ঘটিয়েছেন। একটি পুরো বাংলা পঙক্তি ছিল ‘কোথায় যাচ্ছ বরের পোলা’। সমস্যা হলো -- একে কি উলটে অসমিয়া করব? তাতে পাঠক ভাবতে পারেন, আমরা অনুবাদ করতে ভুলে গেছি। তো অসমিয়া আমরা রাখিনি। কিন্তু তৃতীয় সমস্যাটি আরো জটিল। তৃতীয় জিরাফের নাম ছিল ‘চিকুট’। এটিকে যমক অলঙ্কার করে ব্যবহার করেছেন।  ‘চিকুট’-এর অর্থ অসমিয়াতে ‘চিমটি’— এবং ‘চিমটি’ ধরে এর পরে গল্প এগিয়েছে। অথচ বাংলা উচ্চারণে শব্দটি হবে ‘সিকুট’ -- যার আর অন্য কোনো অর্থ হয় না। এই সমস্যাকে আমাদের সমাধান করে এগোতে হয়েছে। কী করেছি সে যথাস্থানে পড়াই ভালো। নবকান্ত লিখেছিলেন, “এই নাটককেইখনত কোনো বিশেষ মূল্যর দাবি নাই।” আমাদেরও এই অনুবাদ নিয়ে একই কথা। একটা পরীক্ষা করা হল, এই মাত্র।


আর হ্যাঁ, ছবিগুলো এঁকে দিয়েছেন দুর্লভ ভট্টাচার্য। সুকুমার রায়ের রচনাগুলোর মতোই এই ছবিগুলো ছাড়া নবকান্ত বরুয়ার রচনাও অসম্পূর্ণ। বাংলার পাঠকের অবশ্য তাঁর রচনাগুলো পড়লে উপেন্দ্র কিশোর, সুকুমার রায়দের মনে পড়বে। রবীন্দ্রনাথ সহ এঁদের কাছে ঋণ নবকান্ত স্বীকার করেন। বর্তমান সংকলনেও ভূমিকা লিখতে গিয়ে বীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেসব বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। আমরা যেন মনে রাখি, উপেন্দ্র কিশোর এবং সুকুমার রায়েও লুই ক্যারল সহ বহু পশ্চিমা লেখকের প্রেরণা কাজ করছিল, নবকান্তেও তার ব্যতিক্রম ঘটে নি। তার সঙ্গে শুধু তাতে বাংলার ঐতিহ্যের সংযোজন ঘটেছে। তার পরেও সুকুমার রায়েরই মতো নবকান্তের রচনা তাঁর নিজেরই রচনা, মৌলিক। ‘কোনো কবি বা কোনো শিল্পী সম্পূর্ণ এককভাবে অর্থপূর্ণ হ’ব নোয়ারে।’ বীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই কথাটি মনে রেখে যদি এই একক অনুবাদ নবকান্তের বাকি রচনাতে প্রবেশে আগ্রহ বাড়ায় তবেই আমাদের এই পরীক্ষা, এই  শ্রম সফল।    ---অনুবাদক]       



ধুয়া: ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক
পীঁ পীঁ পীঁ পীঁ
রেল চলে চলে রেল
             কেন্নো পোকার রেল চলে পাঞ্জাব মেল।

বিছা: মাকড়ি দি গো মাকড়ি দি;
বলছি তুমি, বাড়ি আছো কি?

মাকড়সা: না থেকে ভাই  কই বা যাব,
             তাঁত মেলানো, কই বা থুব?
বিছা: কী বা তুমি বুনছ দিদি?
মাকড়সা: আয় তোরে ভাই দেখিয়ে দি,
               ...... ফুল
বিছা: তোমার জন্যেই এনেছিলাম এক লাছি উল।
মামার  ছেলেকে দিতে  সোয়েটার চাই।
মাকড়সা: আগে কেন বলিস নি রে, ভাই?
  পরশু দেখ, লাগিয়েছি এইখানা তাঁত
  বাতাসে ছিঁড়ল কিনা সুতোটার গাঁট
             এক মাথা টানি যদি আর মাথা ছিঁড়ে
    আগেকার মতো যদি কিছুতেই জুড়ে।
বিছা: আগের মতো লাগলে তবে,---  হবে
মাছিরাম কেরানিকে খবরটা তো দেবে।
কী দারুণ গো, কী দারুণ! নকল করা জানে
আমরা কী গো! মানুষই তো দেখে হার মানে!
মাকড়সা: চল̖ , তবে কেন্নো রেলে ওর খবরে যাই।
মাছিরাম কেরানিটাকে কই বা গিয়ে পাই?
বিছা এবং
মাকড়সা: কেন্নো পোক ঝোঁক ঝোঁক, এই র্যা্লা!
দাঁড়াও দেখি,যাচ্ছ কোথা নবাব পোলা?
কাপলিং ছেঁড়া দেখি পাঞ্জাব মেল
ঠেল রে  গজরা, ইঞ্জিন ঠেল!
ধুয়া:  ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক
পীঁ পীঁ পীঁ পীঁ
রেল চলে চলে রেল
চলে পাঞ্জাব মেল।

                                              কেন্নো: যাবে যদি, খোলো সাহেব
                        কালো ওভার ক’ট;
        মেমও ছেঁড়ো লাল রশি
                        লাগবে  চাকায় জট ।
                        করো না কো ঠেলা ঠেলি
                        ডান হাতে টিকিট কিনে
                                                              বাম হাতে দোয়ার মেলি
                                                              নাও গো বসার সিট চিনে।
                                                              গল্প করো, আলাপ করো,
                                                              কার পরিচয় কী?
                                                              পি পি পি!
                                                              মিষ্টি কথায় তুলে ধরো। 
                                                              অচেনা কোনো প্যাসেঞ্জার
                                                             নিয়ে আমি  যাই--
                                                              এমন কোনো  কারবার
                                                             আমার তো গো নাই।
 বিছা:      ইনি মিসেস মাকড়ি দিদি তাঁত বুনেন ভালো।
চরকা নেই, মাকু নেই অন্ধকার বা আলো।
চিকন করে সুতো কাটেন,তাঁত বুনেন বসে
              পাড়া পড়শি কেউ শোনে না সাড়া শব্দ এসে।
              রান্না করা নেই, নেই তেল  মশেলা
              লিকুইড ডায়েটে  রোজ চলে  দু’বেলা।
মাকড়সা: একে তো চেনোই, নাম শ্রী বিছাধর
  গায়ে কালো সোয়েটার বরসা ঋতুভর।
সরু গলা, যায় না খোলা
এ নিয়েই পথ চলা।
সবাই: এভাবেই যাই তবে, চলো!
কী বলো ভাই, কী বলো?
কেন্নো: যাই তবে এভাবেই
ওঠো,আছো যেভাবেই।
আগে গিয়ে বলে দিও,নেমে যাবে কই!
মাকড়সা: মাছিরাম মশায়ের বাড়িমুখে অই!
কেন্নো: কে সে মাছিরাম?
           কীই বা ভালো নাম?
             নীলচে
             না কালচে,
             বোতলা না মৌ,
          না ঐ  আদরের কুনকুনি বৌ
          ফলে ফলে ডিম পাড়ে,
                  বাকিদের বাড়িঘর ---
                    কে  চেনে  কারে!
মাকড়সা: আম ঝুলে ডালে ডালে
  নীল মাছি পালে পালে
  যেখানে মানুষ থাকে
  মাছি ঘুরে ঝাঁকে ঝাঁকে।
বিছা: এ মাছি  গো, সে মাছি না;
           কাঁঠালের আঠাতে তার পাখা লাগে না।
           আসলে কী গল্প জানো,
  বলি তবে,মানো কি মানো।
  মাছিমরা ছিল তার নাম,
  তখনো জন্মে নি তো রাম।
  যখন মরা মরা চেঁচিয়ে,
  উঁইঢিবি গুড়িয়ে
  বেরিয়ে রত্নাকর,
              লেখে রামায়ণ
              আমাদেরও মাছিবর,
  মাছিরাম কেরানিতে পেলো প্রমোশন।
কেন্নো: ঠিক আছে, ঠিক হ্যাঁয়!
দেখি, গাড়ি কই যায়!
উঠে যাও এইবার
আমিই ইঞ্জিন,আমিই ডেরাইভার!
                         ধুঁয়া নেই, ধূলি নেই
                         লাল এক রেল...
                         ঠেল রে গজরা, ইঞ্জিন ঠেল!
 
ধুয়া:  ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক
পীঁ পীঁ পীঁ পীঁ
        রেল চলে চলে রেল
                        কেন্নো পোকার রেল
                        চলে পাঞ্জাব মেল!

বিছা:        আরে! এ যে আরো আছে প্যাসেঞ্জার
               রকম রকম কত রকম দেখো ফ্যাশন যার।
        ইনি মিস্টার গো বরুয়া, তাঁর ভাঙা মটর গাড়ি।
মাকড়সা: কলকাতা যাবেন বুঝি, হবে রিপিয়ারি?
কেন্নো: এ যে দেখি শিরি যুক্ত পি পিঁপড়া বাবু
             জংলি শসার বিচি লেগে হলেন বুঝি কাবু?
বিছা:        পি পিঁপড়া? নাম শুনি নি। কোথায় নিবাস?
কেন্নো:       পি কক্, পি হেন্ ---এদের পাশাপাশি বাস।
             সোনা পিঁপড়া, ডাঁই পিঁপড়া, পিঁপড়া আছে কত!
             লিখেছে এদের কথা শাস্ত্র আছে যত।
             কলহ না করে যেন কর্ম করে খায়,
             শিরি কিষ্ণ শেখালেন-- গীতাতে বাখায়!
              সব পিঁপড়া মিলে নিল পি পিঁপড়া নাম।

সবাই: বলো রাম রাম!
               উঠে যাও, উঠে যাও! কথায় কী কাম?   

ধুয়া:  ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক
পীঁ পীঁ পীঁ পীঁ
            রেল চলে চলে রেল
                        কেন্নো পোকার রেল
                    চলে পাঞ্জাব মেল!

পিঁপড়া: কে কে শুনবে বলো, মজার কিইচ্ছা।
                রূপকথা জানি বেশ, শোনাই যত ইচ্ছা।
মাকড়সা: কিচ্ছা জানো! বেশ!
    সেই যে রাজা ছিল, গোধার দেশ!
বিছা: নইলে,সেই যে ছিল রাজহাঁস এক,
সোনার ডিম দিত। প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক!
নতুবা সেই বুড়ো
কচু খেতে সারা দিন মাটি গুড়ো গুড়ো...
পিঁপড়া: সেসব কথা,কথা কি এমন
অং বং চং
এ মন তালাসি, পেয়েছি নূতন
গল্প বলার ঢং।
 গোবরে পোকা: বলো বলো বলো! কিসের ঢং?
                       চিনের যাদু বুঝি, চিং চাং চং !
                  নাকি সেই আলাদিনের  আশ্চর্য বাতি,
                       কেঁচোমাটি সন্ধানে হাম কলকাতা যাতি।  
                 দৈত্যটা শিখেছে কি নতুন কেরামতি?
                         রেডিয়েটার হয়েছে লিক, চাই মেরামতি।
পিঁপড়া:       এক ছিল বন্ধু
              তার ছিল সন্দুক।
গোবরে পোকা: সন্দুকে বন্ধু থাকা কাহানি নেই মাঙতা।
পিঁপড়া: আরে, বলা ভুল হয়েছে,
                কী যেন,প্যাঁচ লেগেছে।
                 এইবার গল্প বলি, একদম টাটকা!
                 নেই কোনো ফাটকা।
                এক ছিল বন্দুক,
                না ছিল সন্দুক।
                 বন্ধুরা প্যাঁচিয়ে দিল রাং রাং রাং তা।
                  তবে বুঝো এইবার
                 কিছু কর কানটার।
                  কালো কচু তুলে এনে কান করো সাফ।
                  চিড়িয়াখানায় যেয়ে
                 তামোল পান  খেয়ে
                  একা একা  চরছিল তিনটি জিরাফ।
সবাই: জিরাফ!
পিঁপড়া:       হ্যাঁ, জিরাফ!
স্বরটা ভীষণ রাফ।
সারাটা শরীর ভরে তুল তুলে পাফ।
কপালে রয়েছে এক ছোট ফুট নোট
ওরা যে  বংশের, তার নাম হলো কূট।
সবাই: জানি, জানি, সেতো জানি!
মাটিতে গজায় লংকা ধানি।
কূট বংশ মহা বংশ
চাণক্যের অংশ
চিত্রকূটের সরোবরে
চরে পরম হংস।
গোবরে পোকা:      প্রথম জিরাফের নাম কি বা কূট,
বিসকূট, মিসকূট না কিসকূট?
পিঁপড়া: কেবলই ই কুট!
ওর ভাই সই করে
মিস্টার বি কুট।
তারও যে ছোট ভাই
  মিস্টার চি কুট।
ইকুট বিকুট  ভাই
তামোল পান খাই
জিহ্ব দেয় পুড়িয়ে
পাণ মশলা কুড়িয়ে
পায় কই---
                        যায় তার সন্ধানে।
কেবা বলো, জুড়ায় জ্বালা  মন দানে!
বাড়িতে তখন বসে   কোন কূট?
বাতাও ভাই, বাতাও দেখি! কোন কূট?
সবাই: সিকুট  সিকুট চিকুট!
পিঁপড়া: চিকুট! অসমিয়া চিকুট ।
                     চিকুট মানে চিমটি।
                        খাও, পাও টেরটি।
                                     ( পিঁপড়া সবাইকে চিমটি কাটে।
বিছা: আরে আরে আরে! পি পিঁপড়া  চিমটি কাটো কেন?
পিঁপড়া: আকাশ কেন নীল,পাহাড় কেন খাড়া? জানো না যেন!
লবণ জলে উঠেনা কেন সাবানের ফেন্?
চিমটি দিলে বাচ্চারা হে করে ঠেন্ ঠেন্!

বিছা: খবরদার! আমায় যদি কাটো!

তবে এই যে ফুলের ঝাড়ু,
  আমার গায়ে দেখ̖ছো, গাড়ু!
ছিঁড়ব তোমার পিঠে, দেখি কেমন করে ঝাঁটো।
মাকড়সা: পি  পিঁপড়া কেটে দিল। আনো রে আনো, টিংচার।
গোবরে পোকা: গো বরুয়াকে কাটিস যদি হবি তবে পাংচার।
পিঁপড়া: এসব এখন রাখো,
    কেন্নো রেলটা দেখো।
                                                         সবাই ওকে চিমটি কাটো, কুট!
    ইকুট বিকুট চিকুট। কাট কুট কুট!
সবাই:        হেইও!  হেই! উঠ উঠ উঠ!
    চিকুট চিকুট চিকুট!
 কেন্নো: খবরদার! খবরদার!
    পিপিলিকা খবরদার!
                 খবরদার বিছাধর!
                  মাকড়িদি নট নড়াচড়!
                 এতোক্ষণ ছিলাম রেল
                 খেলছিলাম মজার খেল
                    জানো না কি, পূর্বপুরুষ আমার অষ্টাবক্র
    গা প্যাঁচিয়ে হচ্ছি দেখো সুদর্শন চক্র।
মাকড়সা: আমার সুতা ছিঁড়িল
বিছা:              আমার জামা ফাটিল
গোবরে পোকা: আমার পাখা ঝরিল
পিঁপড়া: আমি হলাম চ্যাপেটা। এখন কী করি লো!
সবাই: বাঁচাও ! বাঁচাও!   হে অষ্টাবক্র পুত্র।
          চক্র যদি না মেলে দাও, পালাই তবে কুত্র?
কেন্নো: বেশ!
                 তবে চিমটিও যেন হয় শেষ!
                 উঠে এসো, উঠে বসো ! চালাই আবার রেল।
                 গার্ড বাবু বাজাও হে! বাজাও হুইসেল।     
 
ধুয়া:  ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক
পীঁ পীঁ পীঁ পীঁ
                  রেল চলে চলে রেল
                        কেন্নো পোকার রেল
                        চলে পাঞ্জাব মেল।


                         ~~~~~০০০~~~~~

 
   
   
   



Wednesday, 18 January 2017

বিমলের অমল কথা




হুদিন দেখা হয় নি, কথা হয় নি বিমলের সঙ্গে। শিলচরে গেলেও দেখা হয়েছে বলে মনে পড়ে না। এই মাত্র মাস কয় আগে ফেসবুকে একদিন সে নিজেই টোকা দিয়েছিল। আশা করেছিলাম, পুরোনো স্মৃতি ঝালাই করা যাবে আবার। ও মা! দিন কয় পরেই শুনি কি না, সে নেই! কঠিন অসুখ তাকে নিয়ে গেছে অকালেই।
            শুনলাম, সে বুঝি খুব টেনশনে থাকত। তাতেই বেঁধেছে বিপদ। কিন্তু বাইরে থেকে কোনোদিনই বোঝা যেতো না। একটা হাসি লেগেই থাকত এই সপ্রতিভ যুবকের মুখে। দেখা হলেই রঙ্গ রসিকতা ছাড়া কথা না হয়ে ছিল এমন দিন মনে পড়ে না। তখন সোনার কাছাড়। সোনার কাছাড় পরিবারের প্রতি আমার আবাল্য সম্পর্ক ছিল। সে বাড়ির লোকজনের কেউ আমার সহপাঠী বন্ধু, তো কেউ আমার প্রতিবেশী। ফলে যাতায়াত ছিলই। সারা শহর ঘুরে দিনে কিম্বা রাতে সোনার কাছাড়ে আড্ডা দেয়াটা একসময় আমার নিয়মে পরিণত হয়ে গেছিল। বিশেষ করে  কবি সাংবাদিক বিজয় ভট্টাচার্য সেখানে যোগ দেবার পরে বেড়েছিল। পরে পরে যারা যোগ দিলেন তাদের মধ্যে দুই ‘দাসে’র একজন এই বিমল কান্তি দাস, অন্যজন পীযুষ কান্তি দাস। দু’জনেই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে গেছে শহরে জীবন গড়বার স্বপ্ন নিয়ে। বিমল তাপাঙ থেকে এসে প্রথমে পলিটেকনিকে, পীযুষ জালালপুর থেকে এসে গুরুচরণ কলেজে আমার সহপাঠী। দু’জনেই কবিতা লিখত। এবং দু’জনেই সামাজিক বিভিন্ন সংগ্রামে শরিক। এবং সোনার কাছাড়ে সাংবাদিকতা দিয়ে জীবনের শুরু সেই সোনার কাছাড়ে। অন্য সাংবাদিকদের থেকে এই দুই কবির সঙ্গে আড্ডা জমে উঠত বেশ ঘনিষ্ঠ। নিজেও কবিতা লিখতাম কিনা।  সম্পর্ক সেখানে থেমে থাকে নি। দু’জনের সঙ্গেই নানা সামাজিক কাজেও এক সঙ্গে জড়াবার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। চাতলাতে গড়ে উঠেছিল অসমের সংযুক্ত  বিপ্লবী আন্দোলন পরিষদ তথা আর্মকার ভগ্নি সংগঠন তপশীলি জাতি সংরক্ষণ সুরক্ষা পরিষদ। সে সংগঠনের কিছু যোগাযোগ বিমলের সৌজন্যে পাওয়া গেছিল। যতদূর মনে পড়ে দুই এক সভাতেও সে গেছিল, আমাদের সঙ্গে। কিন্তু এহ বাহ্য। সে সাহিত্য করত, বিভিন্ন সাহিত্য অনুষ্ঠানে , আসরে দেখাদেখি আড্ডা হতো। সোনার কাছাড়ে কাজ করত। সেখানেও  গেলে ও থাকলে বসতেই হতো। আর একটা সময় দীর্ঘদিন সে আমাকে টেনে বসিয়ে রাখত। সে কারণটি অন্য। পীযুষের তখন এক ‘মাধবীলতা’ ছিল। মহিলাটি কবিতা লিখত। সুতরাং দেখাদেখি হলে আপডেট দিয়ে রাখত। দেখাদেখি একদিন দেখি, বিমলও মনের কথা বলে ফেলেছে। সেই মহিলার অমন কালিদাসী নাম পড়ে নি বটে, কিন্তু বিমলের টেনশনের শেষ ছিল না। সেই টেনশন সে আমার সঙ্গে ভাগ করে নিত। আর কারো সঙ্গে করত কিনা জানি না, কিন্তু একদিন চেপে ধরে বলে আমাকে ওর সঙ্গে সিনেমা যেতেই হবে । গোপীনাথ হলে। যেতেই হবে, কেন না ওর ‘মাধবীলতা’কে নিয়ে সোজা সিনেমা দেখতে যাবার সাহস গোটাতে পারছিল না বেচারা । যদি কারো নজরে পড়ে যায়। ফলে এই ‘নজরকাঁটা’টিকে সঙ্গে নিয়ে পরিচিতজনকে বিভ্রান্ত করবার ব্যবস্থা করা, আর কি। সেই ভালোবাসার দিনগুলোর ফসলই মনে হয়, তার কবিতার বই, “ভালোবাসার একশত সনেট।”
    
                 তার উপরে ‘কৈবর্ত’ হবার একটা চাপতো ছিলই। অনেকে স্বীকার করবেন না। অস্বস্তি বোধ করবেন। কিন্তু এটা থাকে। এমন একটি জনগোষ্ঠী যাদের অধিকাংশই দরিদ্র মৎস্যজীবী। যেসব গ্রামে থাকেন, সেখানে স্কুল, হাসপাতাল, বিদ্যুৎতো দূর একটা ভালো পথও থাকে না। যারা সেই জীবিকা কিম্বা গ্রাম থেকে বেরুলেন, শহরে এসে তাদের অধিকাংশই অসংগঠিত শ্রমে জড়িয়ে পড়েন। অসংগঠিত শ্রম মানেই কিন্তু জীবনের অনিশ্চয়তা। বিমলের মতো কেউ কেউ কখনো  বা এই পলিটেকনিক অব্দি পড়তে পারেন। কিন্তু স্থায়ী চাকরি জোটাতে পারেন না। সাংবাদিকতাতে এসেও তো বিমলের সঙ্গ ছাড়ে নি সেই অনিশ্চয়তা। নাগরিক জীবনে নিজেকে খাপ খাওয়াতে গিয়ে শেকড়ে আর মগডালেও একটা দ্বন্দ্ব বাঁধে। তাই বোধ করি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনেও জড়িয়েছিল। তার মধ্যে একদিকে যেমন ছিল বরাক উপত্যকা কৈবর্ত সমাজ উন্নয়ন সমিতি সংস্থার মতো সামাজিক সংগঠন , অন্যদিকে আবার মহকুমা মাদক দ্রব্য নিবারণী সমিতিও ছিল। বিশেষ কোনো কাজের সংগঠন হয় না এই দ্বিতীয় ধরণের সংগঠনগুলো। শুধু একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠার অনুভব  এনে দেয়। তাতে যা হয়--- লক্ষ্যচ্যুতি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। অর্থাৎ শুধু নিজের পিছিয়ে পড়া সমাজ কিম্বা শুধুই  কবিতার জন্যে জীবন নিবেদন করলে যিনি আশ্চর্য প্রতিভার সাক্ষর রাখলেও রাখতে পারতেন, তা আর পেরে উঠেন না। অবশ্য কৈবর্ত সমাজের সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা পরে কী ছিল সে আর আমরা বিস্তৃত জানি না।  জানবার সুযোগ ছিল না। ছিল কবিতা নিয়ে জানবার, কেন জানা হলো না---সেই কথাই লিখলাম এতোক্ষণ।    কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে তার প্রতিষ্ঠা ছিল প্রশ্নাতীত। সাংবাদিকদের কাগজ পাল্টাতে হয়, সেও পালটেছিল। কিন্তু কাজের অভাব হয়েছিল, বলেতো মনে হয় না । সাংবাদিকতার কাজে শুনেছি  ভাষা এবং বানানের প্রশ্নে সে ছিল আপস বিহীন।  মৃত্যুকালেও সেই ছিল দৈনিক যুগশঙ্খের সাংবাদিক।
               আশা ছিল, এবারে আবার আন্তর্জালে পুরোনো সম্পর্কেই ঝালাই পালাই হবে। আন্তর্জালে আমাদের পূর্বোত্তরের লেখকদের আড্ডা ‘ঈশানের পুঞ্জমেঘে’ সক্রিয় হবে সে। সমৃদ্ধ করবে, সমৃদ্ধ হবে। সেরকম কিছু হবার আগেই চলে গেলো। ‘প্রতাপ’ কাগজের সম্পাদক কবি শৈলেন দাস সরল মনেই ব্যক্ত করেন নিজের জীবন যুদ্ধের কথা। ‘কৈবর্ত’ হয়ে নাগরিক বুধ-মণ্ডলে নিজের জায়গা খোঁজে নেবার চাপ এবং তাপের কথা। তিনি বিমল কান্তি দাসের স্মৃতিকে হারিয়ে যেতে না দিতে পণ করেছেন। প্রতাপের বিশেষ সংখ্যা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জেনে ভালো লাগল এই ভেবে যে বিমলের জীবন সংগ্রাম এবং ভাষা-সাহিত্য-সমাজের কাজের কথা যদি কোনো ভাবে এই সমাজকে সাহস এবং প্রেরণা যোগায় তবে তার শরিক হওয়া আমাদের দায়। আমাদের কর্তব্য। কোনো চাপ কিম্বা তাপ—আর কোনো বিমলকে না অকালে নিয়ে চলে যায়—সেই পথে যদি ‘প্রতাপ’ কাঁটা বিছিয়ে দিতে পারে, সেই বা কম কিসে। আমরা তাই ‘প্রতাপে’র সহযাত্রী। 
              এক সময় বিয়েও করে ফেলে। সংসারে সুখ দেখে ভালো লাগছিল। কিন্তু সোনার কাছাড় সরে পড়াতে সেই আড্ডাটি অনিয়মিত হতে শুরু করে। নিবেদিতা লেনের সেই প্রাচীন  লেটার প্রেস সংস্কৃতির থেকে  শ্যামাপ্রসাদ রোডের নবীন অফসেট সংস্কৃতিতে তাল মেলানো কঠিন হলো। আমাদের সঙ্ঘ ভেঙ্গে গেলো। তার পরেও দেখা হয় নি নয়। যখনি দেখা হতো, হতো সেই প্রাণোচ্ছল তরতাজা যুবকের সঙ্গে। লড়াই করে উঠে আসা তরুণ, সম্ভবত মৃত্যুকালেও তার আয় এবং উপায় বিশেষ কিছু ছিল না। ফলে সাধারণ ছন্দ অলংকার আয়ত্ত করেও কবিতার কর্ষণ করতে হলে যে নীরবতার দরকার পড়ে, মনে হয় না বিশেষ জুটিয়ে উঠতে পেরেছিল। নতুন লিখতেই শোনাতো প্রচুর সেই সব ব্যক্তিগত আড্ডাতে। দৈনিক কাগজে, ছোট কাগজে বেরুলেও পড়া হতো, আর সাহিত্য আসরগুলোতে তো বটেই।  কিন্তু, এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ওর কবিতাতে জোরালো একটা বক্তব্য রাখবার চেষ্টা সবসময়েই করত, কিন্তু রসঘন হয়ে উঠতে পারত বলে মনে হয় নি।  তাই মনেও থাকে নি বিশেষ। মাঝে মধ্যে গানও লিখবার চেষ্টা করত। কেউ কোথাও গেয়েছে কিনা, নিজের এই দেড় দশকের প্রবাস জীবনে জানা হয়ে উঠে নি। আরেকটা সমস্যা বরাক উপত্যকার কিছু লেখক লেখিকাকে নিয়ে রয়েছে, তাদের অনেকেরই লেখালেখি বড়াইল অতিক্রম করে আসে না খুব একটা। এই নিয়ে তাদের নিজেদের উদ্যোগও নজরে আসে না। ফলে যোগাযোগের একটা অভাব থেকেই যায়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে শহর শিলচর অব্দি পৌঁছুতে পারলে অনেকেই যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এর বাইরে যে বিশাল বাংলা কবিতার গলি ঘুঁজি আছে সেদিকে নজর দিয়ে সেখানকার আলো –হাওয়া-রোদ্দুরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল করবার দরকার এবং উৎসাহ দুইই অনেকে হারিয়ে বসেন।

Monday, 16 December 2013

কুশিয়ারাতে এখন ঢল নেমেছে



(C)ছবি





















মূল অসমিয়াঃ সঞ্জীব গোহাঞিবরুয়া 
অনুবাদঃ সুশান্ত কর

কুশিয়ারাতে  এখন  ঢল নেমেছে
ডাঁট সবুজ  ঢল।
ঢলে ভেসে এসেছে কতকগুলো সবুজ গান ।
একটা গান, দুটো গান,
তোমার গান,আমার  গান।
সমস্বরে গাওয়া জীবনের  গান।
সবুজ দেখার জন্যে নদী পাড়ে আরেকদল মানুষের দৌড় ঝাঁপ।
এঁরা  কবিতাতে   ছন্দ সন্ধানী  অভিযাত্রী।
এখন এসেছে  কুশিয়ারাতে  সুর  ধরবে বলে ।
কবিতা আর  গান একাকার করবে বলে।
কুশিয়ারাতে জেলেরা গান গায় ; ইলিশ মাছের  গাঁথা।
জকিগঞ্জের মাইকে  আজানের  শব্দ; মিশন পাড়াতে শঙ্খ ।
সবইতো সবুজ ; এক বিস্তৃত সবুজ ।
সবুজের পাড়  ভাঙে কয়েকটি বিকেলের  শালিক।
কুশিয়ারাতে  ঢল নেমেছে ;
সবুজ ঢল। 

~~~০০০~~~
মূল অসমীয়াঃ

সঞ্জীৱ গোহাঞিবৰুৱা



কুশিয়াৰাত এতিয়া ঢল আহিছে


কুশিয়াৰাত এতিয়া ঢল আহিছে।
ডাঠ সেউজীয়া ঢল।
ঢলত ভাহি আহিছে কেতবোৰ সেউজীয়া গান।
এটা গান, দুটা গান,
তোমাৰ গান, মোৰ গান।
সমস্বৰে গোৱা জীৱনৰ গান।
সেউজীয়া চাবলৈ নৈ পাৰত আন এদল মানুহৰ হেতা-ওপৰা।
তেওঁলোক কবিতাত ছন্দ বিচৰা অভিযাত্রী।
এতিয়া আহিছে কুশিয়াৰাত সুৰ ধৰিবলৈ।
কবিতা আৰু গান একাকাৰ কৰিবলৈ।
কুশিয়াৰাত মাছমৰিয়াই গীত গায়; ইলিশ মাছৰ গাথা।
জকীগঞ্জৰ মাইকত আজানৰ শব্দ; মিছন পাৰাত শংখ।
সবেইটো সেউজীয়া; এক বিস্তৃত সেউজীয়া।
সেউজিয়াৰ পাৰ ভাঙে কেইটামান আবেলিৰ শালিকাই।
কুশিয়াৰাত ঢল আহিছে;
সেউজীয়া ঢল।

~~~০০০~~~~
 
আরেকটি বাংলা অনুবাদ দাঁড় করিয়েছে সপ্তর্ষি বিশ্বাসঃ

কুশিয়ারাতে ঢল নেমেছে

কুশিয়ারাতে ঢল নেমেছে
সবুজ ঢল।
ভেসে আসছে গান

একটা গান, দুটো গান,
তোমার গান,আমার গান।
সবুজ গান ।
সবাই মিলে গাইতে থাকা গান।
সবুজ দেখার টানে নদী পাড়ে এসেছে আরেকদল -
অভিযাত্রী, ছন্দ সন্ধানী ।
সুরকে ছুঁয়ে দিতে
ছুঁয়ে দিতে শব্দে, ছন্দে, গানে
এরা এসেছে এ নদীর কিনারে।
জেলেরা গান গায় কুশিয়ারাতে ইলিশ মাছের গাথা।
জকিগঞ্জের মাইকে আজানের শব্দ; মিশন পাড়াতে শঙ্খ ।
সবুজ ; এক বিস্তারিত সবুজ ।
সবুজের পাড় ভাঙে বিকেলের কয়টি শালিক।
কুশিয়ারাতে ঢল নেমেছে ;
সবুজ ঢল।




( ‘প্রকাশ’, ডিসেম্বর, ২০১৩ সংখ্যার থেকে)