আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Wednesday, 13 June 2018

শরাইঘাটের শেষ রণ এবং নাগরিক বিল

(C) NorthEast Now
( এটি একটি বক্তৃতা। মনে করুন দিয়েছেন, সুকুমার দত্ত।এক কল্পিত সভার।ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার কোনো এক শহরে নাগরিক বিল বিরোধী প্রতিবাদী সভা। মনে করুন সভাটি হয়েছে এমন এক সংগঠনে--যেখানে নানা মত এবং পথের লোকজন রয়েছেন। রয়েছেন নানা ভাষা-বর্ণ-ধর্মের মানুষ।  বন্ধু রয়েছেন, বান্ধবী রয়েছেন। রয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী , এমন কি শত্রুও। যেমন হয় আর কি... )
      দু'বছর আগে আপনারা শরাই-ঘাটের শেষ যুদ্ধ লড়ছিলেন। জাতি-মাটি-ভেটি রক্ষার সংগ্রাম। আপনারা পরিবর্তন' আনতে চাইছিলেন। আমরা ক'জন তখন নীরব, চুপ-চাপ। নিঃসঙ্গ এবং বিচ্ছিন্ন। কথা বলতে পারছিলাম না। এক জ্যেষ্ঠ সহকর্মী বরুণ শইকীয়া বলছিলেন, আক্ষেপে, দেখছেন কি দত্ত, আপনি আমি-- এমন দুই চারজন ছাড়া আজ কারো সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছে না। যুক্তি বুদ্ধির আর কোনো বালাই নেই।” এখন আমার সামনে বসা মুখগুলো দেখছি, আপনাদের মুখ। আপনারা কি তখন জানতেন না, একটি রাজপত্র এসেছে। একটি বিল আনবার প্রস্তুতি চালানো হচ্ছে? আমরা তো জানতাম। এবং হাসছিলাম, আপনাদের উন্মাদনা দেখে। আপনারা তো তখন শরাইঘাটের যুদ্ধের বড় বড় সেনানী। ভীষণ ব্যস্ত। তখন কই গেছিল, ধর্মনিরপেক্ষতা? 
        সুতরাং গায়ে না পড়লে কেউ ধর্মনিরপেক্ষ হয় না। এই বিল সংসদে টিকবে না, এই কারণেই। অন্তত বিরোধী কোনো পক্ষই এর রাস্তা খুলে দেবেন না। ভাষা-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে। তামিলরাও প্রশ্ন করছেন, শ্রীলংকাতে নিপীড়িত তামিলদের কথা নেই কেন এই বিলে? এমন হাজারো প্রশ্ন উঠবে। আর যথাসময়ে বিল উড়ে যাবে। আর এই বিল তত নয় অসমিয়া বিরোধী, যতটা মুসলমান সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিরোধী, আর গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ প্রমূল্য বিরোধী। এই বিল দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বদলে একে হিন্দু রাষ্ট্র করে তুলবার সামাজিক ভিত্তি তৈরি করতে চায়, কাঠামোগত পরিবর্তনে'র প্রস্তুতি চালাবার স্বীকৃতি আদায় করে নিতে চায়।
        কিন্তু কোথাও আন্দোলন হচ্ছে না, হচ্ছে আসামে। কারণ আর কিছু না, অসমিয়ার গায়ে পড়েছে। অসমিয়া ভাবছেন, বাংলাদেশ থেকে এতো এতো লোকজন চলে এলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। পড়বেই তো। অসমে যত অসমিয়া আছেন, তার সমানে বা বেশি সংখ্যাতে বাংলাদেশে শুধু বাঙালি হিন্দুই আছেন। বাকি অমুসলমানদের কথা নাই বা বললাম। কিন্তু অবাঙালি তো কোনোদিনই আসেন নি। আসেন যে নি, তা এই তথ্যেই স্পষ্ট যে আপনারা কোনো ডি-ভোটার অবাঙালি পাবেন না, ডিটেনশন ক্যাম্পে কোনো অবাঙালি পাবেন না। তবে সব কি বাঙালি হিন্দু চলে আসবে? 
      কী ভাবছেন? বাংলাদেশ গেট খুলে রেখেছে? বিল হবে আর লাইন দিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালিরা অসমে ঢুকে যাবেন? মুসলমানের তাড়া খেয়ে? তবে আর ধর্মনিরপেক্ষতা রইলটা কই? এতোদিন এই তত্ত্ব তো হিন্দুত্ববাদীরা বলে বেড়াতেন। আমরা কি তাদের প্রচারে এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছি?  সবাই মিলে মুসলমান ভীতি দাঁড় করাচ্ছেন, আর এই বিলের এটাই উদ্দেশ্য।
       এই বিল যখন ভারতীয় সংসদে প্রথম আসে সেই জুন, ২০১৮তেই বিবিসির কাছে বিবৃতি দিয়ে প্রথম বিরোধিতা করেছিলেন, রাণা দাসগুপ্ত।  তিনি সেই দেশের  হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা। তিনি বলেছিলেন, “ আমাদের আশংকা, ভারতের এ ধরনের ঘোষণায় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন বাড়বে।... এমন কোন সিদ্ধান্ত ভারতের নেয়া উচিত নয়, যা এদেশের সংখ্যালঘু নাগরিকদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করবে।...নাগরিকত্ব দেবার যে সিদ্ধান্ত তারা (ভারত) ঘোষণা করেছে এ সিদ্ধান্তে আমরা ক্ষুব্ধ , আমরা বিচলিত।
          অধিকাংশ বাঙালাদেশীই সংখ্যালঘু অত্যাচারের মুখে সেই দেশেই নিজেদের মর্যাদা আর অধিকারের জন্যে লড়বেন। পালাবেন কেন?  ১৯৭১এর ২৪মার্চ অব্দি চলে আসবার পথ খুলাই ছিল। ১৯৫০ আর ১৯৭০এর  পাকিস্তান রাষ্ট্রের মদতে ভয়াবহ গণহত্যার দিনগুলোতে যারা আসেন নি, তারা এখন সবাই চলে আসবেন ভাববার যুক্তিটা কী? আর আসছেন না যে, অন্তত আসামে না---তার পরোক্ষ প্রমাণ হচ্ছে ডি-ভোটার বলে অভিযুক্তের সংখ্যা দেখুন, আর এই তিনদশকে ঘোষিত বিদেশীর সংখ্যাটি মিলিয়ে দেখুন। ঘোষিতরাও পরে মামলা লড়ে স্বদেশী প্রমাণিত হচ্ছেন।
      বরং আমাদের কাছে উলটো নথি আছে। ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে এতো বাণিজ্যিক বন্ধুত্ব করে, আজকাল গুয়াহাটিতেও বাংলাদেশের দূতাবাস খোলা হয়েছে। কোনোদিন কি শুনেছেন, বাংলাদেশীদের ফিরিয়ে নেবার জন্যে কোনো কথা হয়েছে? কেউ কি সেরকম দাবিও তুলল? কথা বলবে কী করে? তুললেই বাংলাদেশও কম করেও পাঁচ লাখ অবৈধ ভারতীয়, যাদের অধিকাংশই পশ্চিম বাংলা সহ এই পূর্বোত্তর ভারত থেকে সেই দেশে গিয়ে সস্তা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন --- তাদের তালিকা ধরিয়ে দেবেন। বাংলাদেশ তাদের থেকে লাভ তুলছে, তাই তাড়াবার কথা এখনো বলছে না। এমন কি বাংলাদেশের প্রশাসনে হিসেব করে দেখবেন, জনসংখ্যার তুলনাতে বহু বেশি হিন্দু নিয়োজিত আছেন। এবং তা উঁচু উঁচু পদে। যারা মন্দির ভাঙার সত্যটা চড়া গলায় বলে, তারা মিহি গলাতেও সেই সব উচ্চারণ মাত্র করে না। এবং বাংলাদেশী মুসলমানেরাও সেই নিয়ে বিশেষ কোনো প্রশ্ন তুলে না। আপনারা আন্তর্জাল ঘাটলেই একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে সেই সব তথ্য পাবেন। আমরা ২০১৪র একটি সংবাদ প্রতিবেদনে দেখেছি  ভারত থেকে অবৈধ বাংলাদেশীরা সেদেশের জিডিপিতে ৬,৬০ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন, মানে প্রায় ৬.৬ বিলিয়ন। তার বিপরীতে  অবৈধ ভারতীয়রাও দেশে পাঠিয়েছেন ৩৭০ কোটি ডলার। মানে ৩.৭ বিলিয়ন। মনে রাখবেন পরিমাণটি ডলারে। টাকাতে নয়। এই সব সুখস্বপ্ন ছেড়ে মন্দির ভেঙে দিচ্ছে বলে, জোকার দিতে দিচ্ছে না কোথাও কোথাও বলে---লোকে দেশ ছেড়ে চলে আসবে---অর্থনীতির কোন শাস্ত্র সেসব স্বীকার করে? শুধু গেরুয়া অর্থশাস্ত্র ছাড়া? 
       বাংলাদেশ থেকে হিন্দু আনার জন্যে তো নয়, দেশকে হিন্দু ভারত গড়বার  দূরগামী লক্ষ্যে একটি প্রতীকী যুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়া হলো। তাও আবার ইসরায়েল মডেলে। তা ইহুদিরা তো তবু বহু হাজার বছর ধরে ইসরায়েল ছাড়া, আর সারা বিশ্বে তাদের শুধু তাড়াই দেওয়া হয় নি, ইসরায়েলে ফেরার জন্যে বহু প্রলোভনও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয়রা তো পালটা প্রলোভনেই বিশ্বময় ছড়িয়েছেন। তাড়া খেয়ে বিদেশে যান নি। দুবাই সহ মধ্যপ্রাচ্য শুধু শ্রমিকদের জন্যেই নয়, ভারতীয় বণিকদের জন্যেও লোভনীয় ব্যবসা আর বিলাসের জায়গা। এমন কি বিলে যে দুই দেশের নাম আছে সেই বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানে এখন বৈধ উপায়েও লাখো ভারতীয় কায়িক এবং বৌদ্ধিক শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে, পুঁজির সঙ্গে করে। আমরা কার গল্প কাকে শোনাচ্ছি? 
       যাই হোক, একটা প্রতীকী যুদ্ধ সারা দেশের জন্যে শুরু হলো, আর তাৎক্ষণিকভাবে একটি শুরু হলো অসমের জন্যে। এন আর সি তর্কটিকে চাপা দিয়ে দেওয়া হলো। কেবল যে এই নাগরিক বিলকেই এক তরফা অসমিয়াদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাই নয়, আসাম চুক্তি করবার বেলা, আই এম ডি টি বাতিলের বেলা, এমন কি এন আর সি প্রক্রিয়া শুরুর বেলাও সব জনগোষ্ঠীর অভিমত নেওয়া হয় নি। এমন কি যদিও বা বলা হচ্ছে, ১৯৭১এর আগে আসা পূর্ববঙ্গ মূলের বাঙালি হিন্দু-মুসলমান আসামেরই মানুষ, তাদের সমানাধিকার এবং মর্যাদা স্বীকার করে নেওয়া হবে, বা হয়েছে---তাদের কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে নি---তারা কী চাইছেন। বিদেশী খুঁজতে গিয়ে যে তাদেরই হয়রানিটা হচ্ছে সবচাইতে বেশি সেই সত্য কেউ শুনতেও রাজি নন।  তবু প্রতিবাদ যখন হয় নি, তারা যখন এই প্রক্রিয়াগুলোর সঙ্গে সহযোগিতাই করছেন---ধরে নেয়াই যেতে পারে তাঁরাও আশা করছেন, যে এন আর সি-তে এসে তিন দশক আগেকার অসম আন্দোলনের একটি যুক্তিসঙ্গত পরিসমাপ্তি ঘটবে। কে বিদেশী আর কে তা নয়---সেই তর্কের মীমাংসা হয়ে যাবে।
      তাহলে এখন আমাদের তর্কের বিষয় কী হওয়া উচিত ছিল? ১) এন আর সি-তে বাদ পড়া মানুষের কী হবে? বাংলাদেশে পাঠানো হবে? সেই দেশের সঙ্গে চুক্তি কই? ২) বাংলাদেশীদের লাথি মেরে তাড়ানো হবে? যেভাবে মায়ন্মার তাবৎ রোহিঙ্গিয়াদের বাংলাদেশী বলে তাড়াচ্ছে? আমি আশা করছি, কোনো স্বাভিমানী অসমিয়া মায়ন্মারের মানে'র মতো আচরণ করবেন না। তাতে বিশ্বজুড়ে মান বাড়বে না। ৩) জেলে রাখবো? এতো জেল কই? আর অসমের মানুষ এতো বিশাল অনুৎপাদনী ব্যয়ভার বইবে কেন? 
     তবে কী হবে? আরে, সেই নিয়ে কথাটাই তো চাপা দিয়ে দিল এই নাগরিক বিল।  
    এন আর সি-র প্রথম খসড়াতে বরাকের এবং ভাটি অসমের বেশি মানুষের নাম বাদ পড়ল। বরাক ক্ষুব্ধ হলো। তাদের খুশ করতে বরাকে জেপিসি-কে পাঠানো হলো দু'দিনের জন্যে। বরাক এন আর সি গেল ভুলে। তো অসমিয়া পক্ষ গেলেন খুব রেগে। ব্রহ্মপুত্রের উত্তাল তরঙ্গ সামাল দেওয়া কঠিন হলো। অতএব দুর্বল নথির প্রশ্ন এলো, ডি-ভোটারদের আত্মীয় স্বজনকে এন আর সি থেকে বাদ দেবার প্রশ্ন এলো। প্রশ্ন এলো সারা রাজ্যে তাদের চিহ্নিত করবার। সারা রাজ্যেই হঠাৎই শুরু হলো ছেলে ধরবার মতো করে বিদেশী ধরা। এবং চরিত্রগতভাবে সেই প্রক্রিয়া একেবারেই ধর্ম নিরপেক্ষ। হিন্দু -মুসলমান সবাইকে ধরছে। কিন্তু কাউকে জেলে পুরেনি। পুরল কই? না তিনসুকিয়াতে। উজান অসমে। যেখানে বিল বিরোধী আবেগ অতি তীব্র। বেছে বেছে কিছু বাঙালি হিন্দু গেলেন জেলে। কেন? এখনি কেন? কেউ প্রশ্ন করলেন? বরং অনেকেই আশ্বস্ত হলেন,  শরাইঘাটর যোজারু --জাতির বিরুদ্ধে নে যায়। 
     কিন্তু কার্বি আংলঙে আমরা যে মহড়া দেখলাম, খিলঞ্জিয়া ঐক্যের ফাঁপা রূপটা তো দেখলাম। এখন কার্বি জনগোষ্ঠীর সপক্ষে দাঁড়িয়ে দুই চার কথা বললেও অনেকে বলছেন, এই সব কমনিষ্টি কথা। 
      ত্রিশ জুনের পরে যদি এভাবে কেউ মুসলমান পেটানো শুরু করে, তবে সব হিন্দু এক হবে।  মাদানি পার্টিকে' দেখে নেবার কথা দেখি বলেই রাখা আছে। বিল থাকল কি না থাকল--তাতে কার কী আসে যায়?
        বাঙালি হিন্দু বার্তা পেল কারা তাদের রক্ষক। অসমিয়া বার্তা পেলেন, ঘরর ল'রা জাতির বিরুদ্ধে নে যায়। 
      বহু বছর আগে আশির দশকে প্রান্তিকে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক পরাগ কুমার দাস। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, "...আগামীর দিনগুলোতে যদি আমরা ভাষিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাই তবে পমুয়া মুসলমানদের সঙ্গে হাত মেলাতেই হবে; আর যদি ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই তবে বাঙালি হিন্দুদের কাছে টেনে নিতে হবে... উভয় পক্ষকে ছেড়ে দিয়ে খুব বেশি দিন আমরা টিকে থাকতে পারব না। এবং ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শস্বরূপ অসমিয়া জাতি নিশ্চয় সবসময় ধর্মের থেকে ভাষার উপরেই বেশি গুরুত্ব দেবে।” হিন্দু অথবা মুসলমান পূর্ববঙ্গ মূলের মানুষের দুই পক্ষকেই বাদ দিয়ে অসমিয়া টিকে থাকতে পারবে না বলেই মত দিয়েছিলেন পরাগ কুমার দাস। এই সত্য এখন স্কুল পড়া ছেলেমেয়েরাও বোঝে। তিনি শুধু আশা করেছিলেন,ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শস্বরূপ অসমিয়া জাতি নিশ্চয় সবসময় ধর্মের থেকে ভাষার উপরেই বেশি গুরুত্ব দেবে।” কিন্তু শরাইঘাটের শেষ রণে যোগ দেবার ঘটনাতো তাঁর আশাকে ভুল প্রমাণ করে ছেড়েছেই।  তার সঙ্গে আছে বিশ্বায়ন পরবর্তী যুগের ভারতীয় শাসক শ্রেণির ছোট সহযোগী হিসেবে সুযোগ সুবিধেগুলো আদায় করবার প্রশ্ন। ফলে বরাক-ব্রহ্মপুত্র-পাহাড়ে- ভৈয়ামে গেরুয়া ঐক্যের রাজনীতিটি চালিয়েও অসমিয়া সম্পন্ন থাকতেই পারে। ভারতীয় শাসক শ্রেণি অসমিয়া মধ্যবিত্তকে বিপন্ন করে ফেলে কিছু করে ফেলবে, এমনটা আমরা বিশ্বাস করি না। বাঙালি হিন্দুর বা মুসলমানের ভোটের কথাটাও তাকে সেই অসমিয়া মধ্যবিত্তেরই স্বার্থে মনে রাখতে হয়। আপাতত সে মনে রাখছে, হিন্দু বাঙালি ভোটের কথা বেশি বেশি---এই মাত্র। হিন্দু রাষ্ট্রের জন্যে সেই সব দরকার। আর তাই অনেকেই, বিশ্বাস রেখেছেন, ঘরর লরা—জাতির বিরুদ্ধে নে যায়। 
        ধর্মনিরপেক্ষতা তার পরেও বিপন্ন হতেই পারে। মানে বিল বাতিল হলেও।  বিপন্ন হতে পারে, সেই সব মানুষ---যাদের শ্রমের বাজারে দরকষা কষি করতে হয়। যাদের খেটে খেতে হয়, যাদের  কাজিরাঙ্গা থেকে উচ্ছেদ করলে হিন্দুত্বে আচ্ছন্ন মন বলে, বেশ করেছে। বাংলাদেশী তাড়িয়েছে। কিন্তু আমচাঙে উচ্ছেদ করলে প্রশ্ন -- খিলঞ্জিয়াকে কেন উচ্ছেদ করা হবে! উচ্ছেদিত মানুষগুলো এক হতে পারে না। কিন্তু জমি তাদের হারাতেই হয়, সেই জমি নাখিলঞ্জিয়া' বণিকেরই হাতে যায় নির্বিবাদে। ‘খিলঞ্জিয়া’ বণিক হয় তাদের ছোট সহযোগী।
 তারা বানে বিধ্বস্ত হয়, নদীভাঙনে বাড়ি হারায়, ঘর হারায় --হারায় তাবৎ লিগ্যাসি ডাটা। কোনো মধ্যবিত্তও যদি প্রশ্ন করে গিয়ে লিগেসি ডাটা এরা পাবে কই? তাঁকে চুপ করিয়ে দেওয়া চলছে চলবে---বেটা, বাংলাদেশীর দালাল -- বলে। এরা মাদানি পার্টি'র লোক। তাদের দেখে নেওয়া হবে। সেই সব মানুষকে মানতেই হবে তার প্রতিবেশী সমাজের মানুষটি দানব। এবং আপাতত  ‘মাদানি পার্টি’রও কেউ কেউ সেটি বিশ্বাসও করছেন। বাঙালি হিন্দু বড় হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেছে বলে নিন্দে মন্দও করছেন। হয়ে আছেন অনেকে এটা সত্য। সেই অসম আন্দোলনের দিন থেকে তাদের মধ্যে ক্রমাগত প্রচার চালিয়ে গেছে হিন্দুত্ববাদী শিবির। গড়ে তুলেছে, এই জনপ্রিয় আখ্যান, "নির্বোধ অসমিয়া। টের পাবে যখন অসম মুসলমানে নিয়ে যাবে।' এবং সেই আখ্যানে বহু "বুদ্ধিমান অসমিয়ার'ও অবদান প্রচুর। নিত্যদিন কাগজ খুললেই পড়া যায়। কিন্তু তার বিপরীতে যদি কেবল  হেমাঙ্গ বিশ্বাস আর অমলেন্দু গুহের আদর্শই সামনে দাঁড় করানো হয়, তবে তো তা বুদ্ধির পরিচয় বলে মনে করতে পারি না।  কিছু গান করা , কবিতা লেখা বামুন কায়েত নন।বাঙালি হিন্দু মানে রামা কৈবর্ত আর নরহরি বিশ্বাসও। অর্জুন নমঃশূদ্র।  বিদেশী নোটিশ পেয়ে যিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। মারা যাবার পরে প্রমাণিত হয়েছিল যে তারা মা-ভাই-বোনে সবাই ভারতীয় -স্বদেশী।  নির্বাচনে ইস্যু হয়েছিল সেই মৃত্যু। তারপরেও  তাঁর বৃদ্ধা মাকে বেরুতে হয়েছিল বৌ নাতি-নাতিনীর জন্যে দুমুঠো ভাতের জোগাড় করবেন বলে।
‘মাদানি পার্টি’ কি কিছু শুনছেন? বন্ধুকে চিনতে পারছেন? শত্রু শিবিরে বন্দি তাদেরই বন্ধু।  সেই শিবিরে হানা দেবেন কবে? না কি শিবির ভেঙ্গে তারাই বেরিয়ে নেতৃত্ব ছিনিয়ে নেয়া অব্দি দিন গুনবেন? বাকি ভারতে যারা জয়ভিম-লালসেলাম করছেন---তারা কিন্তু ঠিক সেই কাজটাই করছেন। 
         


Saturday, 3 March 2018

অভ্র ব্যবহার করে ফটোশপে বাংলা লিখুন

ছবি ১
টোশপে বাংলা লেখা একটা সমস্যা। সরাসরি লেখা যায় না। অনেকেই লিপঅপিস আদিতে বাংলা লিখে কপি পেষ্ট করেন। বা ডিটিপি কী বোর্ড ব্যবহার করে কাজ চালান। অভ্র কী বোর্ড ব্যবহার করে সহজেই আপনি লিখতে পারেন। উপায়টি এখানে বলে দিচ্ছি। আপনি যেভাবে ফটোশপে লেখেন, সেভাবেই লিখতে পারেন। শুধু অভ্র কী বোর্ডের ব্যবস্থাপনাতে (সেটিংস) সামান্য পরিবর্তন আনতে হবে যতক্ষণ আপনি ফটোশপে কাজ করছেন।
       আপনাকে যেটি করতে হবে, অভ্র কী বোর্ডের বারে গিয়ে সেটিংস দেখতে হবে। সেখানে দেখুন লেখা আছে output as ansi । এই ছবি ২-র মতো।  ক্লিক করুন।  একটি নতুন জানালা খুলবে। জিজ্ঞেস করবে আপনি আনসি ব্যবহার করতে চাইছেন কি না।
ছবি ২

আপনি ছবি ৩-এ দেখাবার মতো করে use ansi anyway-তে ক্লিক করে বেরিয়ে আসুন।
ছবি ৩
এবারে ফটোশপ গিয়ে কালপুরুষ আনসি এবং সিয়াম রুপালি আনসি খুঁজে বের করুন। ছবি ৪এ যেভাবে দেখাচ্ছে। 
ছবি ৪

     যে কোনো একটি ব্যবহার করুন। এবং লিখতে থাকুন। আপনার কাছ না থাকলে এখান থেকে ফন্ট দুটি নামিয়ে আনুন। আপনি বাংলাপেডিয়া ফণ্টও নামাতে পারেন। বিজয়ের সব না হলেও অনেক ফন্টই কাজ করবে। নামিয়ে নিন।  একই পদ্ধতিতে আপনি পেজমেকারেও বাংলা লিখতে পারেন। ছাপাখানাতে এর পরে অভ্রকে জনপ্রিয় করে তুলতেই পারেন। ছবি ৫ দেখুন
ছবি ৫
      তবে আপনি যদি ছবি সম্পাদনা এবং তৈরির জন্যে মুক্ত উৎসের জিম্প বা জি আই এম পি ব্যবহার করেন, তবে সেসব কোনো ঝামেলাই নেই। বেনসেন, আদর্শলিপি ইত্যাদি অভ্র কী বোর্ডের যেকোনো ফণ্ট ব্যবহার করেই দিব্বিই ইচ্ছে খুশি মতো বাংলা লিখতে পারেন। জিম্প ফটোশপেরই মতো, কিন্তু খানিক সহজও। ছবি ৬ দেখুন
ছবি ৬



আপনি এই ভিডিওটিও দরকারে দেখে নিতে পারেন...

Wednesday, 7 February 2018

গুহাচিত্র বনাম ফেসবুক স্টেটাস


(ছবি ঋণঃ আনন্দবাজার পত্রিকা)
কটা কাল ছিল মানুষ গুহাতে ছবি এঁকে নিজের 'স্টেটাস' জানাতেন। সেগুলো স্থানে ভ্রমণ করতে পারত না। কিন্তু কালে ভ্রমণ করে একাল অব্দি এসে পৌঁছেছে। সভ্যতার ইতিহাস পাঠ তাই এখনো সহজ হয়ে আছে। আজকাল লোকে ফেসবুকে, টুইটারে স্টেটাস লেখেন। সেগুলো দ্রুত স্থান ভ্রমণ করে। তারপরে তলিয়ে যায়। হোয়াটস এপে হলে যাকে পাঠানো হলো, তিনি পর মুহূর্তে 'ডিলিট' করে দেন। এই হচ্ছে, এর সর্বোচ্চ সম্মান। তার মানে গুহাচিত্রের বিপরীতে এই সব কালভ্রমণ করতে একেবারেই অক্ষম। চিরকালীন' বলে শব্দটি এখানে একেবারেই বেমানান।
          সম্প্রতি দেখলাম, কেউ  কেউ স্টেটাস দিয়ে জানাচ্ছেন দেখলাম ফেসবুকে আর ভালো লাগছে না। যারা জানাচ্ছেন , তারা যে ফেসবুকের চমকে ধরা কে সরা জ্ঞান করছিলেন , তাও দেখছিলাম। ভালো যদি নাই লেগে থাকেসে আমাদের কাছে সুসংবাদ। আন্তর্জালে আমার উপস্থিতি এই ফেব্রুয়ারিতে এক দশক পার করেছে। আন্তর্জালে বাংলা লেখালেখি ভারতেই যারা শুরু করেছিলেনখুব অতিশয়োক্তি হবে নাতাদের প্রথম দিককার মানুষ আমি। তখন পূর্বোত্তরে কেউ লিখতেনই না। গোটা ভারতে যে কজন হাতগুণা লিখতেনআমরা বলতে গেলে পরস্পরকে চিনতাম। ফেসবুক থাকলেও সেরকম জনপ্রিয় ছিল না। তখন ব্লগ ছিলছিল ই-মেল গ্রুপঅর্কুট , ইত্যাদি। অসমিয়াতেও কেউ লিখতেন না। ২০১০এ ফেসবুক পোষ্ট করলেই ই-মেলে চলে যাচ্ছেদেখে ব্যবহারকারী হুহু করে বাড়তে শুরু করে। আমরা সেই সময় অসমিয়ার প্রচারে প্রসারেও কাজ করি যেমনপূর্বোত্তরে বাংলা লেখালেখি নিয়েও কাজ শুরু করি। রোমানে বাংলা--অসমিয়া লিখিয়েদের থেকে কত গালি অপমান যে সইতে হয়েছে বোঝাই কী করে! এক বন্ধু প্রায় বাজিই ধরেছিলেন আন্তর্জালে বুঝি বাংলা লেখাই যায় না। তাঁকে যখন শিলচরে গিয়ে প্রায় জোরে ধরেই বাংলা লেখা দেখাইশেখাই---ফিরতে না ফিরতে দেখি তিনি ফেসবুকে গ্রুপ খুলে বসেছেনবাংলাতে। ফেসবুকের এতোই চমক। অথচতিনি কবি। আশা করেছিলামনিজের একখানা ব্লগ করবেন। যেভাবে নিজের খাতাতে স্থায়ীভাবে লিখে রাখেনসেভাবেই ব্লগে লিখে রাখবেন। যেভাবে নিজের সম্পাদিত কাগজ করবেনসেভাবেই ব্লগ সম্পাদনা করবেন। কিন্তু সেগুলোতে তো এতো এতো গরম গরম লাইকআর বাহবা মেলে না। ফলে সমস্যা হলো। তারা লাইকের মোহে বুঁদ রইলেন। এবং রাতারাতি কেউকেটা বিখ্যাত হয়ে গেলেন (বলে ভেবে নিলেন)। গোঁদের উপরে বিষফোড়ার মতো এলো স্মার্টফোন। বাংলা লেখালেখি সে আরো সহজ করে তুলল। এখন আর বলতে হলো না। বা হয় না।ভালোই তো হলোতাই নাভাবের আদান প্রদান খুব দ্রুত হতে শুরু করল। ভাবের তুফান ছুটল। সেই তুফানে বহু বাড়ি ঘর সংসার উড়েও গেল। তুফান সব সময়েই ভালো। তার মানে বর্ষা এলো। এবারে চাষাবাদ হবেফসল ফলবে। কিন্তু তুফানের আগে পরে বানও ডাকে। বানের তোড়ে সব ভেসে মিশে একাকারও হয়ে যায়। আর তৈরি করে দলা দলা আবর্জনা। সেই সব আবর্জনা দেখে যদি ঘেন্নাতে কেউ কেউ চলেই যানবাংলা ভাষার পক্ষে তবে সেই সব সুসংবাদ। কিন্তু আমরা যাই না কেনকারণপালাবার মধ্যে সুখ নেই। আবর্জনার পুণর্ব্যবস্থাপনার  মধ্যে রয়েছে যেটুকু। খুব কম লোকে তাতে হাত দিচ্ছেন। সেই কম লোকেই আগামীর দিশা দেখাবেন বলে আমার বিশ্বাস। এই যেমন একটিই মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়একটিই মাত্র কলেজ কলকাতার সরসুনা কলেজ আন্তর্জালের বিশাল জগতের রহস্য নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছেনআলো দেখাচ্ছেন--- ভাবা যায় কি সেই সব কাজের একটি অংশ হলো রবীন্দ্রনাথের নানা পাঠের আন্তর্জাল উপস্থিতি। ফেসবুকের মহাপুরুষ--নারীরা সেসব সম্ভবত দেখেনও নিকল্পনাও করতে পারেন না। বাংলা ওয়েবজিনওয়েবপত্রিকাক্রমেই বাড়ছে। এমন কি পূর্বোত্তরেও। ঈশানের পুঞ্জমেঘকাঠের নৌকার বয়সতো হচ্ছেই। (জনপ্রিয় নয় যদিওঅনেকে ঘেন্নাও করেন। সেসব ভালো)। বেশ কিছু ইউনিকোড পত্রিকা এখন আসাম ত্রিপুরার থেকে বেরোচ্ছে। রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, বিশ্বরাজ ভট্টাচার্যে মতো তরুণ কবিরা এখন ব্লগজিনে মজেছেন। একা একাই আলোর মশাল হাতে তুলে নিয়েছেন। খুব কম। তাতেই আশা জাগছে। রাতের আকাশের আঁধার কণাদের সংখ্যাই তো বেশি। অগুনতি তারারাও রয়েছে বটে। দেখা গেলে বোঝা যায় আকাশ পরিষ্কার। সুতরাং তাদেরও ফেলা যাবে না। কিন্তু আলো করে তো একা চাঁদ। আমাদের এই নবীন চাঁদদের অভিনন্দন... তাঁদের পক্ষ বদল ঘটুক। রাহু-কেতুর ভোগে না পড়লেই হলো। আমাদের জন্যে সেই সুসংবাদ। ফেসবুকে অনেকেই প্রশংসা প্রশস্তি করেনআসলে নিজেরা বিনিময়ে তোল্লা পাবেন বলে। কিন্তু এই তরুণেরা জানেনআমাদের প্রশস্তি নির্ভেজাল। কেবলই ভাষা এবং ভাবের সমবেত স্বার্থে। 
          আজ সকালে প্রবীণ কথাশিল্পী মিথিলেশ ভট্টাচার্য আমাকে ফোন করেছিলেন। আন্তর্জালের 'আবর্জনানিয়ে নিজের উষ্মা জানাতে। আমিও সমবেদনা জানালাম। কিন্তু সঙ্গে করে মনে হলোআমাদের এই সব শুক্লপক্ষ সংবাদও এই প্রবীণদের কাছে পৌঁছানো চাই। তাঁরা আন্তর্জালে আসবেন না। তাঁদের সসম্মানে অন্যরকম করে নিয়ে আসা চাই। আমাদের দৈনিক কাগজের আত্মপ্রতিষ্ঠাকামী 'অসভ্যসম্পাদক যখন সাহিত্যের পাতাতে রাশিফল ছেপে যাচ্ছেআর ভগীরথ মিশ্রআবুল বাসারঅমর মিত্রদের 'জয়পতাকাআমাদের দেখিয়ে বিদ্রূপ করে যাচ্ছেতখন আমাদের অনুপস্থিত পূর্বসূরিদের সসম্মান উপস্থিতি সম্ভব করাটা হোক আমাদের পরবর্তী রণকৌশল। সেই কাজ একা কারো দ্বারা সম্ভব নয়। সমবেত 'ভাবান্দোলনে'র দ্বারা সেসব সম্ভব। আমাদের 'রিফিউজি লতাজীবনের অন্ত পড়ুক। তৃণ গজাক , তার ফাঁকে ফাঁকে মহীরুহ অঙ্কুর মেলুক।



Saturday, 20 January 2018

এন আর সি, অসমিয়া,বাঙালি এবং কিছু কথা



মূল অসমিয়া: জিতেন বেজবরুয়া
বাংলা অনুবাদ: সুশান্ত কর

জিতেন বেজবরুয়ার ব্লগ
(জিতেন বেজবরুয়া তরুণ অসমিয়া বামপন্থী লেখক। লেখাটি অসমিয়াতে অসমিয়া পাঠকের জন্যেই লিখেছেন। এন আর সি নিয়ে মমতা ব্যানার্জির সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং বরাক উপত্যকাতে কিছু ব্যক্তি সংগঠনের প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা দিয়ে তিনি শুরু করেছেন, এবং  বাঙালির সমস্যা বুঝে নেবার চেষ্টা করে বাঙালিদের কিছু গণতান্ত্রিক পরামর্শও দিচ্ছেন। কিন্তু আসলে তার লক্ষ অসমিয়া গণতান্ত্রিক মন, যাকে বাঙালির সমস্যার দিকে টানবার চেষ্টা করেছেন। দুই সম্প্রদায়ের গণতান্ত্রিক মানুষের মধ্যে একটি সংলাপ গড়ে উঠবার ইচ্ছেও প্রকাশ করেছেন। তিনি বাঙালিকে অসমিয়া হয়ে যাবেন, এমন আশা করবার প্রয়াসের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “বিদেশীর নামে বাংলা মূলের বা বাঙালি মুলমানের মতো করে বাঙালি  হিন্দুদের উপরেও হয়রানি হচ্ছে। সেক্ষেত্রে অসমীয়া জাতীয়তাবাদী দল-সংগঠনগুলোরও ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে।  এর বিরুদ্ধে বাঙালি সমাজের থেকে  গণ আন্দোলন গড়ে  তোলা দকার। কিন্তু সেই গণআন্দোলন প্রক্রিয়াতে মমতা ব্যানার্জির অতিপ্রতিক্রিয়ার সমর্থন আসামেও জুটতে পারে, এহেনসম্ভাবনার কথাটি লেখাতে পরিসরের জন্যেই সম্ভবত এড়িয়ে গেছেন। নইলে আমরা নারিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে অসমিয়া গণতান্ত্রিক সমাজেরও অতি প্রতিক্রিয়া দেখেছি। দিল্লির যুব হুঙ্কার সমাবেশে অখিল গগৈর মতো ‘ফ্যাসীবাদ বিরোধী’ ব্যক্তিরও দুই কোটী হিন্দু বাঙালিকে নিয়ে ভোট বেঙ্ক গড়ে উঠবার অতিশয়োক্তিও শুনেছি। অথচ ডি-ভোটারের নামে যে লক্ষাধিক মানুষের উপরে যে অমানবিক ঘটনাগুলো ঘটে, যাদের নাম এন আর সি-তেও আসবার সম্ভাবনা নেই,  সেই নিয়ে তাঁর সেরকম হুঙ্কার শুনিনি। তবু লেখক বাঙালিদের ভেতরেও এবং অসমিয়া বাঙালিদের মধ্যেও আলোচনার দরকারটি মনে করেছেন।    তিনি লিখেছেন, ‘সংঘাতের বাস্তব  কাগুলো কী কী সেসব আলোচনা করা দরকার, খারাপ পাওয়া- ভালো পাবার কথাটি সরিয়ে রেখে’   আমাদের মনে হলো, কথাগুলো বাঙালি পাঠকের কাছেও পৌঁছুনো দরকার। নইলে সংলাপ শুরুই হবে না। তাই অনুবাদ করে নেয়া।--অনুবাদক )

গে
৩১ ডিসেম্ব, ২০১৭তে এন আ সির প্ৰথম খসড়া  প্ৰকাশ পাবার পরের উৎকণ্ঠা আর বিভ্রান্তিতে পূর্ণ পরিবেশে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্ৰী মমতা ব্যানার্জি এই সম্পর্কে যে কথা গুলো বললেন এবং তার পরে যেসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলো হচ্ছে সেসব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। তিনি বললেন, অসমের এন আর সি প্রক্রিয়াটি হচ্ছে বাঙালিদের তাড়াবার এক চক্রান্ত মাত্র। টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করে বলা উস্কানিমূলক বক্তব্য, যা অসমের সাম্প্রতিক পরিবেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে। অতএব এইধরনের বক্তব্যের সরাসরি নিন্দা করা দরকার। পশ্চিম বাংলার  বৰ্তমান রাজনৈতিক প্ৰেক্ষাপটে বিজেপি বিরুদ্ধে নিজেরস্থান শক্তিশালী করবার জন্যেই যে মমতা বাঙালি সেন্টিমেণ্টের ব্যবস্থা নিয়েছেন, সেটুকু বুঝতে সমস্যা হয় না। এক কথাতে এ হচ্ছে  বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নিয়ে তৃণমূল আ বিজেপির মধ্যে টানাটানি তথা প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু অসমের জ্বলন্ত  পরিস্থিতিতে এর অনেক  ভয়ংক সম্ভানা আছে বলেই যেন মনে হয়।
অসমীয়া প্রতিদিন
সে যাই হোক, মমতা ব্যানার্জির এই বক্তব্যকে কোনো বিক্ষিপ্ত-ব্যক্তিগত বক্তব্য বলে সরিয়ে রাখতে পারি নাসে ঘটনার পরে পরেই রাক উপত্যকাতে বিভিন্ন ব্যক্তি আৰু সংগঠ এন আর সির বিরুদ্ধে একই রকমের  অভিযোগ উত্থাপন করছেন  দেখা যাচ্ছেপ্রকাশিত  প্ৰথম খসড়াটিতে  যে অজস্ৰ সমস্যা এবং উল্টোপাল্টা ব্যাপার আছে সেই নিয়ে সামান্যও সন্দেহ নেই সেসব  আসলেধারিতও ছিলঅসম সরকার বহু টালবাহানা করে করে উচ্চতম ন্যায়ালয়ের প্ৰবল চাপেই শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে এই খসড়াটি প্ৰকাশ করতে এগিয়ে এসেছেফলে খসড়াটি স্বাভাবিভাবেই বহু দিক থেকেই আংশিক এবং  ত্রুটিপূৰ্ণ। এবং এর ভিত্তিতে এই মুহূৰ্তটিতে মূল সমস্যাটি সম্পর্কে, অৰ্থাৎ বিদেশী প্ৰশ্নটি  সম্পর্কে  কোনোভাবেই  শেষ সিদ্ধান্ত করতে পারি না, এমনকি যুক্তিসংগত অনুমান করতেও অসুবিধেফলে আমার মনে হয় এন আর সির খসড়াটির সমস্যাগুলোর অধিকাংশই মূলত লাতান্ত্ৰিক এবং প্রায়োগিক।  ধরুন, কারোরিবারে  এনের  নাম এসেছে, কিন্তু অন্য  পাঁচজনের আসে নি, কারো নাম-উপাধি ভুলকরে এসেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। উজান  অসমের  মানুষের  নাম বেশি করে অন্তৰ্ভুক্ত হয়েছে, রাকের হয় নি এর পেছনেও নিশ্চয় এরকম  কারণই নিহিত রয়েছে। আমরা অন্তত: এই অবধি এন আ সি প্ৰক্ৰিয়ার মধ্যে কোনো ষড়যন্ত্ৰমূলক পরিকল্পনা  লুকিয়ে থাকবার কোনো লক্ষণ দেখতে পাই নি। ফলে বিভিন্ন বাঙালি  ব্যক্তি-সংগঠলাতান্ত্ৰিক-প্রায়োগিক ঘটনা একটিকে  ভুল করে  রাজনৈতিক ড়যন্ত্রের রূপে উপস্থাপন করতে চাইছেনএক্ষেত্রে  বিশেষ করে বাঙালি বিদ্বৎসমাজের  একাংশ অগ্ৰণী ব্যক্তি ভূমিকা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং হতাশাজনক। এন আর সি প্ৰক্ৰিয়াটির  বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে , তা বৃহত্তর গ্ৰহণযোগ্যতাকে আঘাত করে বাঙালি সমাজের কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না। এন আর সি সম্পূৰ্ণ বেরিয়ে গেলে বিদেশী সমস্যাটির কতটা সমাধান হবে  সে পরে কথা : কিন্তু তা ফলে বিদেশী সমস্যা সমীকটি যে গুণগতভাবে অনেকটাই বদলে যাবে , তার সমাধানের জন্যে নতুন দিক উন্মোচিত হবে সেটি নিশ্চিত। অৰ্থাৎ অসমের বিদেশী সমস্যাটির ঐতিহাসিক যাত্ৰাপথে এন আর সি কটি বড়  পদক্ষেপ। ফলে  বিদেশী সমস্যাটির ঐতিহাসিকভাবেকটি পদক্ষেপ এগিয়ে যাবার জন্যে এই প্ৰক্ৰিয়াটি ভালোয় ভালোয় হয়ে যাওয়াটা দরকারি, এবং সেটি সবারই কাম্য হওয়া উচিত। একে  প্ৰতিহত করলে বা ব্যাঘাত জন্মালে সমস্যাটি বরং বেশি জটিল রূনিয়ে ঘূর্ণিতে ঘুরতে থাকবে এবং তার ফলে অন্যদের সঙ্গে বাঙালি সমাজের জন্যেও বেশি সমস্যাসৃষ্টি করবেযদি এন আর সির  প্ৰক্ৰিয়াতে  কোথাও বা  বিশেষ ঘটনা ঘটেছে যেখানে বাঙালি মানুষের বিরুদ্ধে সরকারি কোনো কৰ্মচারী ষড়যন্ত্ৰ করছে বা অসমীয়া জাতীয়তাবাদী সগঠনের মানুষ প্ৰক্ৰিয়াটিতে হস্তক্ষেপ করছে (কেউ কেউ এমন অভিযোগ করেছেন), তবে সেই  ঘটনাগুলো ফাঁস করা হোক এবং আইনি প্ৰক্ৰিয়া আওতাতে আনা হোক অন্যদিকে, প্ৰথম খসড়াতে যে সব অসম্পূৰ্ণতা এবং ত্রুটি দেখতে পাচ্ছেন সেগুলোর প্রতি সরকারের  দৃষ্টি আকর্ষণ করা হোক। লক্ষণীয় যে বৃহত্তর ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক ভূমিকা যাই থাক, সম্প্রতি এন আর সি প্রসঙ্গে অসমিয়া জাতীয়তাবাদী এবং জনগোষ্ঠীগত দল-সংগঠনগুলোর মনোভাব দেখা যাচ্ছে সহযোগিতামূলকই। আসলে এর  অন্যথা হওয়া সম্ভবই নয়, কেননা এই দল-সংগঠনগুলো নিজেদের কথাতেই বাঁধা পড়ে গেছে। ফলে  বাঙালী বিদ্বৎ সমাজ তথা দল-সংগঠনগুলোও যদি এই প্ৰক্ৰিয়াতে আশানুরূ রনে সহযোগিতা করেন তবে এন আর সি সুসম্পন্ন হয়ে যেতে সুবিধে হবে। সুখের বিষয় যে বাঙালি সমাজের অনেক ব্যক্তি তথা সংগঠন এর জন্যে এগিয়েও এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই মমতা ব্যানার্জির বক্তব্যেরও বিরোধিতা করা  হয়েছে তাদের তরফে।
 অসমিয়া প্রতিদিনে শেষাংশ
অসমিয়া মানুষের মধ্যে নিজেদের পরিচয় সংকট নিয়ে যে ভীতি রয়েছে তার পেছনে বেশ কিছু আর্থ-সামাজিক কারণ রয়েছে, বিদেশী প্রব্রজন সমস্যা তার মধ্যে একটি। সেসব ইতিমধ্যে বিস্তৃত আলোচিত হয়েছে। অসমে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি অন্তহীন আধিপত্যের পেছনেও প্রধানত  এই পরিচয় সংকই লুকিয়ে রয়েছে। ফলে অসমে অন্যান্য যে কোনধরনের  রাজনীতির জন্যে ময়দান মুক্ত করতে হলে, প্ৰগতিশীল রাজনীতি বীজ বপন করতে হলে তাগেই এই পরিচয় সংকটের প্ৰশ্নটিরকটি মীমাংসা করে নেয়াটা দরকারিসেই দিক থেকে  এন আ সিরকটি ভূমিকা আছে। নিজেকে  অসমিয়া বলেরিচয় দেয়া-নাদেয়া অন্যান্য  খিলঞ্জিয়া জনগোষ্ঠীর জন্যেও বিদেশী প্ৰব্ৰজ জনবিন্যাসগত সমস্যার থেকে শুরু করে অনেক আৰ্থ-সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করেছেফলে অসমিয়া মানুষকে, অসমের ভূমিপুত্র জনগোষ্ঠীদের এন আর সি লাগবেইএর থেকে বাঙালিরাও নিশ্চয় নিশ্চয় বাদ পড়েন নাসে যাই হোক, এন আর সি  প্ৰশ্নটির আছিলা নিয়ে বাঙালি  সমাজের যেটুকুন ক্ষোভ এবং অভিযোগ উঠে আসছে তাও আসলে  তাৎক্ষণিক নয় সে দীৰ্ঘদিনের  পুঞ্জীভূত বিষয়বিদেশীর নামে বহু বাঙালি মানুষ হয়রানির মুখে পড়ে আসছেন সে সত্য। এখানে স্পষ্ট হয়ে যাওয়া ভালো যে এখন বাঙালিকে তাড়াবে বলে যে হুলস্থূল হচ্ছে, তা হচ্ছে মূলত  হিন্দু বাঙালিদের নিয়েই হচ্ছে, বাংলা মূলের মুলমানদের নিয়ে নয়সে যাই হোক, বিদেশীর নামে বাংলা মূলের বা বাঙালি মুলমানের মতো করে বাঙালি  হিন্দুদের উপরেও হয়রানি হচ্ছে। সেক্ষেত্রে অসমীয়া জাতীয়তাবাদী দল-সংগঠনগুলোরও ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে।  এর বিরুদ্ধে বাঙালি সমাজের থেকে  গণ আন্দোলন গড়ে  তোলা দকা অসমিয়া গণতান্ত্ৰিক-প্ৰগতিশীল শক্তিগুলোকেও এতে  সহযোগ করতে হবেকিন্তু সম্প্ৰতি  বৃহৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ঢেউ দেখা যাচ্ছে তাতে  সাধাণ বাঙালি জনতার এধরণের এবং অন্যান্য আৰ্থ-সামাজিক সমস্যাড় একটা গুরুত্ব থাকতে দেখা যায় না। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ চালিত হচ্ছে মূলত বৃহৎ বাঙালি  জাতি সাংস্কৃতিক অভিমানকে কেন্দ্র করে বাঙালিরা হচ্ছেন ক বড়  জাতি, অসমিয়ার মতো ছোট নয় যাদের নিজেদেরকটি দেশ আছে, কটি প্রদেশ আছে,  অতি সমৃদ্ধ ভাষা-সংস্কৃতি আছে। সেরকম অবস্থাতে তাদের অসম রাজ্যে অসমিয়া জাতির কাছে একরকম অনুগত হয়ে থাকতে হচ্ছে। অসমের রাজনীতিতে হো, প্ৰশাসনে হো, গণমাধ্যমে হো, গণরিরের উপরেই হোঅসমিয়াদের  আধিপত্য আছে, বাঙালির নেইযেসব  এলাকাতে বাঙালিরা  একত্রিত হয়েকটি সমাজ রূপে টিকে আছেন, সেখানে তাদের নিজের ভাষা-সংস্কৃতি নিৰ্বিঘ্নে টিকিয়ে রাখতে পারছেনকিন্তু যেসব এলাকাতে তাদের অসমিয়া বা অন্য গোষ্ঠী মানুষের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে হচ্ছে সেই এলাকাগুলোতে সেভাবে টিকিয়ে রাখতে পারেন নি। সেসব কারণে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ক্ষোভ এবং অভিযোগ থাকাটি স্বাভাবিক। অসমিয়া জাতীয়তাবাদী দল-সংগঠনগুলোর বিদ্বেষমূলক মনোভাব তথা কা-কর্ম এক্ষেত্রে  ইন্ধন যুগিয়ে আসছেএটি এক অনস্বীকাৰ্য বাস্ত সত্য। কিন্তু প্ৰশ্ন হল এখান থেকে তারা যাবেন কই? টি একটি জটিল প্ৰশ্ন যা উত্ত সহজে পাওয়া কঠিনকিন্তু উত্তর সন্ধানটি অধিক জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে হয়।
অসমিয়া জাতীয়তাবাদের  উন্মেষ কাল থেকেই অসমিয়া-বাঙালি সংঘাত নানা রূপে  চলে আসছিল, বিশ শতকের শেষের দিকে সেটি অধিক তিক্ত হয়ে পড়েছিলসাম্প্রতিক সময়ে এই সংঘাত হয়তো কিছু সুপ্ত রূপে ছিলকিন্তু এন আর সি-কে নিয়ে  মমতা ব্যানার্জির বক্তব্যের পরে যা সব ক্ৰিয়া-প্ৰতিক্ৰিয়া দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে যেন অসমিয়া-বাঙালি সংঘাত আবার নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে,জঙ্গি রূনিতে শুরু করেছেসেটি  যদি বাস্তবে  ঘটে তবে সে কারো জন্যেই  মঙ্গলজনক হবে নাফলে অসমিয়া-বাঙালি উভয় জাতিরই গণতান্ত্ৰিক-প্ৰগতিশীল শক্তিগুলোর দরকার সময় থাকতেই সতৰ্ক হয়েকটি  সমাধানের জন্যে চেষ্টা করা ভালোএকটি কথা ঠিক যে অসমিয়া-বাঙালি মধ্যে  দীৰ্ঘদিনের  সমন্বয়ের একটি  ঐতিহ্যও রয়েছে সেটি বড় মূল্যবান জিনিসকিন্তু সেসবের স্মরণ মাত্র এই সংঘাতের  মোকাবেলা করতে আমাদের খুব একটা সাহায্যরতে পারবে বলে মনে হচ্ছে নাসংঘাতের বাস্তব  কাগুলো কী কী সেসব আলোচনা করা দরকার, খারাপ পাওয়া- ভালো পাবার কথাটি সরিয়ে রেখে সে যাই হোক,  অসমিয়া-বাঙালি সংঘাত নিনের জন্যে কিছু মানুষ পৃথক রাজ্য গঠনের পোষকতা করেনআমাদের মনে হয় নতুন নতুন রাজ্য গঠনের দাবিতে  উত্তাল  অসমের  প্ৰেক্ষাপটে  সেই উপায় বাস্তসন্মত এবং ফলপ্ৰসূ হবে নাবাঙালিপ্ৰধান এলাকাতে  অসমিয়া বা অন্যান্য গোষ্ঠীর মানুষের  বিরুদ্ধে নৃগোষ্ঠীয় পরিষ্করণের সম্ভানাও নাকচ করতে পারি না। তবে কী করে সংঘাত নিসন হবে  সেটি বিদ্বৎ সমাজের আলোচনার বিষয়কিন্তু কটি কথা ঠিক যে বৃহৎ বাঙালি জাতীয়তাবা অসমের বাঙালিকে রক্ষা তথা উদ্ধার করবে নাঅসমের বাঙালি সমাজকে অসমের মাটিতে নতুন রাজনীতি সৃষ্টি করতে হবেসেটি কী রকম হবে সে তাদের নিজেদের মধ্য থেকেই নির্ধারিত হতে হবে।  প্ৰতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো যে তাদের সাহায্য করবে না সেটি বাঙালি জনতা বুঝতে পারছেন। অন্যদিকে, অসমিয়া জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর বাঙালিদের অসমিয়া করবার চেষ্টা না করাই ভালোতাদের নিজেদের মতো থাকতে দেওয়া দরকার। একপ্ৰকা উগ্ৰ জাতীয়তাবা আরেক প্ৰকা উগ্ৰ জাতীয়তাবাদের  জন্ম দেয়অসমিয়া উগ্ৰ জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালি উগ্ৰ জাতীয়তাবাদ এই দুটিই সমা ভয়ঙ্কর এবং সমান গণবিরোধী। ফলে গণতান্ত্ৰিক-প্ৰগতিশীল শক্তিগুলোর এর  দুটিরই বিরোধিতা এবং  সমালোচনা করাকা
অন্যদিকে, এন আর সি-র মধ্যদিয়ে বাঙালি তাড়াতে চাওয়া হচ্ছে বলে যে হুলস্থূল হচ্ছে তার মধ্যে যে প্ৰকৃত সত্যটি লুকিয়ে পড়েছে সেটি হচ্ছে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্ৰশ্নটিএন আর সি প্ৰকৃতপক্ষে কে চাইছে না ? কে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের মাধ্যমে হিন্দু বিদেশীদের ডেকে আনতে চাইছে এবং  অসম চুক্তিকে নস্যাৎ করতে চাইছে? এর উত্তর সবাই জানেকিন্তু এন আর সিকে সমালোচনা করা বাঙালি বিদ্বৎ সমা এই আল প্ৰশ্নটি সম্পূৰ্ণ ড়িয়ে  চলছেন(অন্য সময়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্ৰতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী রকম সে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কথা)  সমগ্ৰ ভাতবর্ষের সঙ্গে অসমেও এখন হিন্দু জাতীয়তাবাদী শক্তি আধিপত্য প্ৰতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেএরকম প্ৰেক্ষাপটে অসমিয়ারা  বাঙালির  বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্ৰ করছেন না বাঙালিরা অসমিয়ার বিরুদ্ধে করছেন, সেটি আসল  প্ৰশ্ন নয়। আল প্ৰশ্ন , হিন্দু জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো কী  কছে এবং কাকে কার বিরুদ্ধে ব্যহার করছে? দেখা গেছে যে এন আর সি- বিরুদ্ধে বিষোদ্গার যে চিন্তা,যে  দলের মানুষই করে থাকুন না কেন আর তাদের নিজেদের ইচ্ছা যাই হোক এর  শেষ মুনাফা কিন্তু হিন্দু জাতীয়তাবাদীদেরই হবেকেননা, এন আর সি প্ৰক্ৰিয়াটির আদৰ্শগত বিরোধী তারাই আলোচ্য বিতরকের  ফলস্বরূপে বিতর্কের  কেন্দ্ৰবিন্দুটি অন্যান্য দল-সংগঠনের দিকে চলে গেল, আর চতু হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা  একেবারেই গোবেচারার মতো আড়ালে থেকে গেল। সংক্ষেপে লিখতে  গেলে  এন আর সি-কে কেন্দ্র করে সত্যি যদি কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে তবে সে হলো হিন্দু জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর হিন্দু বিদেশীদের নাগরিকত্ব দেবার ষড়যন্ত্র।  হিন্দু জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো একটি সমসত্ব এবং  অখণ্ড হিন্দু বাঙালিররিচিতি নিৰ্মাণ করতে চাইছে এবং নিজেকে তাদের ত্ৰাণকৰ্তা রূপে  প্ৰতিষ্ঠা করতে চাইছেকিন্তু এর আড়ালে  বাঙালি জনতার স্বার্থ লুকিয়ে নেই, লুকিয়ে আছে হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা। হিন্দু বাঙালিদের অসম থেকে তাড়াতে চাওয়া হচ্ছে বলে বৃহৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদের  পোষকতা করছেন যে  বাঙালিরা তাঁরা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে এই হিন্দু জাতীয়তাবাদী পরিকল্পনাকে হাওয়া দিচ্ছেন বলেই আমাদের মনে হচ্ছে। এই হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রকল্প যেমন অসমিয়া জনতার স্বার্থের রিপন্থী, একইরকম সে  বাঙালি মানুষেরও স্বার্থবিরোধীঅসমিয়া-বাঙালি সবারই উচিত তার বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়া।


Google+ Badge