আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

***************************************************



Friday, 25 February 2011

এ বাড়ির পথ বুঝি বন্ধুর? তাই তুমি রাখবে স্মরণে জানি বন্ধু, যে আছো দূরঃ গুয়াহাটি থেকে শিলচর পথকথা।



( পথগুলো যদি খুব একটা মসৃণ হয়, তবে কেউ তার যাত্রা পথের কথা মনে রাখে নাঃ পালজর লাচুঙপা, সভাপতি, দ্য ট্রেভেল এজেন্টস আসোসিয়েসন অফ সিকিম)

                                   ( লেখাটার ইংরেজি অনুবাদ এখানে পড়া যাবে)
               এই ছবিটা দেখুন উপরে। দেখে কি মনে হয়? পূর্বোত্তর ভারতের এক সুন্দর ব্যস্ত পথের পরে সার বেঁধে গাড়ি এগুচ্ছে, তাদের স্বস্তি আর নিরাপত্তা দেবার কাজে সদা প্রস্তুত ভারতীয় সেনা। খুব একটা সুন্দর পথ? খুব নিরাপদ? আমার সন্দেহ আছে। যাত্রীদের কেউ নিশ্চিত নয় এই পথে সে লুণ্ঠিত কিম্বা অপহৃত হবে কিনা। তাই তাদের নিরাপত্তার নিশ্চিতি চাই আর কেউ নয় ভারতীয় সেনার হাতে। ভয়টা আর কারো নয়, পথের পাশের স্থানীয় মানুষের ভিড় থেকেই বেরুতে পারে। আপনি যদি গুয়াহাটি কিম্বা লামডিং থেকে শিলচরের পথে আসতে থাকেন রেলে কিম্বা সড়ক পথে তবে আপনার যেটুকুন নিরাপত্তার দরকার তা এই সেনাবাহিনীর লোকেরা সারাক্ষণ আপনাকে দেবার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকবে। খুব চেনা দৃশ্য এটা। কিন্তু গল্পটি এখানে শেষ নয়। দুটো পথই বছরের বেশির ভাগ সময় হয়, বন্ধ নতুবা নষ্ট থাকে। বিশেষ করে বর্ষার বেলা। ধ্বস আর বৃষ্টির জন্যে। তার উপর ব্রডগেজের কাজের বিলম্ব, মিটার গেজের লাইন কিম্বা কোচের যত্নের অভাব বিগত বছর গুলোতে এই পথ ধরে যাত্রাকে প্রায় নরক গমনের সমতুল্য করে ছেড়েছে। 
                          
এই পথ ধরে কেবল যে শিলচর কিম্বা বরাকউপত্যকার মানুষ যাতায়াত করে তাইতো নয়। পুরোটা উত্তর কাছাড় জেলা, দক্ষিণ মেঘালয়, দক্ষিণ মণিপুর, পুরো মিজোরাম আর ত্রিপুরার মানুষ এই পথ ধরেই বাকি ভারতে যায় আসে। তারপরেও যদি সারাটা বছরও পথ দুটো বন্ধ থাকে দিল্লি দিসপুরের কেউ এ নিয়ে সামান্যও মাথা ঘামায় না ।
কেন দিসপুর। আইজল কেন নয়? ইম্ফল? আগরতলা? কেন নয়? কারণ সবাই এখানে নিজেদের ভেতরের মাথাব্যথাগুলো নিয়ে ব্যস্ত। তার উপর সবাই ভালোবাসে শুধু কৃতিত্বগুলো বহন করতে, দোষগুলো অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে সুখে ঘর করতে। ডোনের (DoNER) বলে একটা সরকারি সংস্থা আছে। কিন্তু সে বড়জোড় পরামর্শ করে ,উপদেশ দেয়। নির্দেশ দিতে পারে না। আগরতলা তার রেহাই মূল্যের আর সবচে' সংক্ষিপ্ত বায়ুপথ নিয়ে উল্লসিত। এখন বাংলাদেশের মধ্যি দিয়ে রেল এবং সড়ক পথের স্বপ্নে মশগুল। ঐ পথগুলো খুলে গেলে তার যোগাযোগের সমস্যা প্রায় শূন্যে নেমে যাবে। অসমের উপর প্রায় কোনো নির্ভরতা থাকবে না। 
                   
আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি মিজোরাম ত্রিপুরাকে অনুসরণ করবে। দক্ষিণ মণিপুরও তাই করবে। মেঘালয়ের ডাউকি সীমান্ত দিয়ে অন্য আরেক প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু যদি কলকাতা বা দক্ষিণ ভারতের দিকে যেতে হয় উত্তর কাছাড় পাহাড়ও যে উত্তরের অন্য পথটি ধরবে এমন মনে করবার কোনো কারণ নেই।বাঙ্গালদেশের সাহবাজপুর এবং করিমগঞ্জের মহীশাসনের পথটিকে খুলে দেবার প্রস্তাব একটা ছিল। ডোনের-এর সিদ্ধান্তও হয়ে আছে। কিন্তু এখন অব্দি অসম সরকার যে এনিয়ে কোনো উৎসাহ দেখাচ্ছে এমন দেখা যায় নি। এই ঘটনা রাজ্যটির এই দক্ষিণের ভাগকে ক্ষুন্ন করে রেখেছে। সেই ক্ষোভ এতোটাই যে এখানে বাতাসে কান পাতলেই যে কেউ শোনবে যে লোকে স্বপ্ন দেখছে সেই দিনের যেদিনগুলোতে ঐ আগরতলা পথ উত্তরাপথের উপর তাদের নির্ভরতার বেশিটাই কমিয়ে আনবে। এই বিনির্ভরতা তাদের নিয়ে যেতে পারে এক স্বতন্ত্র রাজনৈতিক আখ্যান নির্মাণের পথে। কেন্দ্রশাসিত রাজ্যের পুরোনো দাবিটি আছেই, আছে স্বশাসনের দাবিও। সম্প্রতি স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক পরিষদের কথাও উঠছে। কিন্তু তাতেই ওই দাবিপথ না থেমে যাবার সম্ভাবনা তখন উজ্জ্বল হয়ে উঠবে আরো।ডিমারাজি রাজ্যের দাবিটা আজকাল বেশ জোর গলাতেই শোনা যাচ্ছে। এমনটি হলে কিন্তু অসম খুব শীঘ্রই তার আরো এক ভৌগলিক এবং আর্থ -রাজনৈতিক অংশকে হারিয়ে বসবে যাকে সে প্রথমে ১৮৭৪ এবং পরে আবার ১৯৪৭এ পেয়ে গেছিল প্রায় বিনাশ্রমে । অন্য স্বার্থের কথা যদি অসম নাও ভাবে এই কথাতো ভাবতেই পারে যে তার রাজস্বের এক বড় উৎস হাত ছাড়াতো হবেই, সেই সঙ্গে সমস্ত ভবিষ্যত সম্ভাবনা।
                  'কনসার্ন ফর শিলচর' বলে একদল অনামা ব্লগার আজকাল এখানকার আর্থসামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে খুব আন্তরিক এবং গভীর অধ্যয়ন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের সাম্প্রতিক এক ব্লগ পোস্টে লিখেছেন, ( ইংরেজিতেই, ব্লগে যে তাদের কোন অসমিয়া বাংলা লিখতে নিষেধ করেন জানি না। যদিও তারাও এই তথ্যও ভুলে বসে আছেন যে যত নগন্যই হোক শিলচরের একাংশ মানুষের মাতৃভাষা কিন্তু কিছুতেই আর যাই হোক বাংলা নয়।) “When, the then Prime Minister HD Devegowda landed in Silchar to lay the foundation stone of the broad gauge conversion work of the Lumding – Silchar corridor in 1996, he greeted the people of Silchar with a few words in Assamese, completely ignorant of the fact that, the couple of thousands strong crowd which had gathered to listen to him did not speak the language at all. He was also shamelessly insensitive to the fact, that, the region he was visiting had a bloody yet illustrious history of struggle to safeguard their mother tongue Bengali. That insensitivity was just a symbolic representation of the insensitivity the gauge conversion project itself was to face in the years to come.” খুবই সত্যি উচ্চারণ। কিন্তু আমার এই দেখে বড্ড অস্বস্তি হয় যে শিলচরের মধ্যবিত্তেরা নিজেরা কিন্তু গোটা পূর্বোত্তর নিয়ে ভাবেন খুব কম। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী যে ব্যবহারটি করেছিলেন সেরকম কিন্তু তারা শুধু বরাক উপত্যকা নিয়েই করেন না। গোটা পূর্বোত্তর নিয়ে তাদের মনমানসিকতাটাই ওরকম। আমরা কি মিজোরামের কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী লাল থানহাওলার ঐ সেদিন ২০০৯এর ৬ জুনে সিঙ্গাপুরে গিয়ে এক আন্তর্জাতিক আলোচনা চক্রে দেয়া ভাষ্য ভুলে গেছি? সেখানে তিনি বলেছিলেন, “I am a victim of racism. In India, people ask me if I am an Indian. They ask me if I am from Nepal or elsewhere. They forget that the North-East is part of India.” ২৪ এপ্রিল, ২০১০এ তিনি আইজলের এক সম্মেলনে আবারো কথাটা পেড়েছিলেন, “You (বাকি ভারত) continue to ask for our passports at hotels and airports… It means you don’t accept us (পূর্বত্তরীয়দের) as one of you, as Indians.”
                     কিন্তু মুস্কিল হলো, আমাদের পূর্বত্তরীয়দের নিজেরাই কেউই এই রোগটি থেকে মুক্ত নই। এইতো ক'দিন আগে গুয়াহাটি শহরে এক দল মহিলা পুরুষ মিলে এক মিজো তরুণীর সঙ্গে যেভাবে বীরত্ব প্রদর্শন করলেন, মনে পড়ে? এমন ঘটনা গোটা পূর্বোত্তরে খুবই সাধারণ। আমরা ভালো আর আলোময় জীবনের সন্ধানে নিজেরা আমাদের সীমানার বাইরে বেরুতে চাই। ওখানে আশা করি লোকে আমাদের সম্মান জানাবে দেবে পুরস্কার। কিন্তু, নিজের রাজ্যে, নিজের বাড়িতে, পাড়ায় আমরা আমাদের চিরাচরিত অতিথি বৎসলতার পরম্পরাকে ভুলে যেতে বসেছি। বহিরাগত লোকেদের আমরা আমাদের এলাকাতে স্বাগত জানাতে মোটেও প্রস্তুত নই। বাইরের লোকেদের আমন্ত্রণ জানাবার, তাদের স্বাগত জানাবার মতো যে একটা পরিবেশ তৈরি করব সে কথা আমরা ক্বচিৎ কখনো ভেবে থাকি। ভাবিই না , যে এখানে এনে নিজেদের সংস্কারকে ওদের থেকে অন্তত উন্নত চেহারাতে উপস্থিত করব যাতে ওরা নিজেরাই দেশ এবং দেশের বাইরে গিয়ে আমাদের ভালোটা আলোটা বলে বেড়াতে অন্তর থেকেই বাধ্য হয়ে পড়েন। যেমনটি কেরালাতে হয়ে থাকে। সিকিম, আমাদের পূর্বত্তরের রাজ্যটিও আজকাল সেই অভ্যেসইও করে থাকে। গুটি কয় প্রবাসীরা বাইরে গিয়ে গোটা পৃথিবীর আমাদের সম্পর্কে থাকা ভ্রান্ত ধারণাগুলো দূর করবার দায়টা নিয়ে নিতে পারেন না।
                আমার মনে পড়ছে বর্তমান ডিমা হাছাও জেলার এক প্রভাবশালী বিধায়ক এবং মন্ত্রী একবার ব্রডগেজ লাইন বসানো এবং মহাসড়কের কাজের বিরোধীতা করেছিলেন এই যুক্তিতে যে তাতে করে বাইরের লোকেরা এসে স্থানীয় জনজাতিদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করবে এবং তাদের সাংস্কৃতিক অবনমন ঘটাবে । আমি তাঁর নাম নেব না , কেন না এই মুহূর্তে আমার কাছে কোনো হাতে থাকা প্রমাণ নেই। কিন্তু, কিছু পারিপার্শিক প্রমাণ জোটানো একেবারেই কঠিন নয়। ডিএইচডি যে বছর কয় ক্রমাগত রেল গাড়ি এবং লাইনের উপর হামলা চালিয়ে যেতে সাহস করেছিলে, স্থানীয় মানুষের একাংশের সমর্থণ ছাড়া এটা সম্ভবই ছিল না। লোকে এও বলে থাকে যে ওরা পরিবহন শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের, মহাসড়কের কাজে কনট্রাক্ট পেতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের এবং তাদের রাজনৈতিক সহযোগীদের হাতের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করেছে। হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারির সঙ্গে এই সব দুষ্ট লোকের নষ্ট বুদ্ধির সংযোগ থাকা খুবই সম্ভব। এই কেলেঙ্কারি নিয়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে এখন যারা চেঁচামেচি করছেন তারাও এদিকটা নিয়ে বেশি কিছু বলছেন না। এর আগেও যে তারা উত্তর কাছাড়ের মানুষের দুর্ভোগগুলো নিয়ে খুব একটা মাতামাতি করেছেন তাও নয়। এ একেবারেই, মূল ভারতের গণমাধ্যমের মতোই। এটা সবাই জানে যে ঐ মাধ্যমগুলো আমাদের অর্জনগুলোকে নিয়ে কখনোই কোনো গল্প করে না, করে আমাদের যা কিছু বিসর্জন, বিয়োজন এবং যা কিছু ব্যর্থতা তাই নিয়ে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা শুধু ব্যস্ত থাকে উজান ভাটি নিয়ে, সদিয়া ধুবড়ি নিয়ে। অসম কথাটার মানেই তারা এইটুকুনি বোঝেন। উত্তর দক্ষিণ বোঝেন না, বোঝেন না সদিয়ার থেকে শিলচর , কিম্বা ধুবড়ির থেকে ধলাই, না বোঝেন বরাক-- ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা। এমন কি অসম সরকারের পর্যটন মন্ত্রকের যে একখানা ওয়েবসাইট রয়েছে তাতেও বরাকউপত্যকার কথা নেই। তাদের ভ্রমণের ইতিকথা ধুকে ধুকে এসে জাটিঙ্গাতেই ফুরিয়ে যায়।এককালের ডিমাছা রাজধানী খাসপুর নেই, সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দির, ভুবন পাহাড়, সেই পাহাড়ের নাগাদের পবুয়ান মন্দির এবং বিখ্যাত গুহার কথা নেই। শাহ আদম খাকি সহ কোনো পীরের মোকামের কথা নেই। এর অনেক গুলোই কিন্তু ইতিহাসের যুগেরও বহু বহু আগের কথা।
                        আমাদের ভাষা, পরিচয়, লোক পরম্পরা, এমন কি আমাদের পারম্পারিক আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেও বাঁচাবার একটা ব্যবস্থা বের করে নেয়া যেতে পারে, তাই বলে চিরদিনের মতো বাইরের লোকের জন্যে বাড়ির দরজা বন্ধ করে রেখে দিতে পারি না। বাইরের লোকেরা দুদিনের স্ফূর্তি করতে এখানে আসবে না।আসবে বিচিত্র সব কারণে। থাকবে নানা সময়ের হিসেবে। অনেকে এখানে থেকেও যাবে। আর সবাই যে আসবে কোনো দূর প্রদেশ কিম্বা দেশ থেকে তাওত নয়। আসবে আমাদের পাশের জেলা কিম্বা রাজ্য থেকেও। তাদের বরণ করে নেবার জন্যে হৃদয় থেকেই আমাদের প্রস্তুতি চাই। দুর্নীতিবাজ আমলা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল, আছে এবং থাকবেই। কিন্তু বিশাল মেগামার্টের কাছে একটি ছাত্র সংস্থার বিশাল অংকের চাঁদা চাইবার খবর কাগজে বেরিয়ে যাওয়াতে গেল বছর নভেম্বরে গোটা রাজ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি যে ব্যবহার করা হলো সেটি মোটেও সঠিক পথ ছিল না। এরকম ঘটনাবলী রাজ্যের বাইরে এক অনাকাংখিত বার্তা পাঠায়। তাতে আমাদেরই যে লোকগুলো রাজ্যের বা অঞ্চলটির বাইরে আছেন তাদের সেখানে বড় বিব্রত হতে হয়। এরকম অনাকাংখিত চাপের রাজনীতির এমনও মানে হয় যে ঐ সব সংগঠনগুলোকে বিশাল চাঁদা দিয়ে তুষ্ট রেখে এই রাজ্যে যে কেউ যা তা করতে পারে। যখন এদের কর্মচারীরা ভালো মাইনে আর চাকরির শর্তের জন্যে , বা উৎপাদকেরা ভালো মূল্যের জন্যে, ক্রতারা ভালো মানের জন্যে আওয়াজ তুলে তখন তাদের পাশে দাঁড়াবার জন্যে এমন গোটা রাজ্যে আওয়াজ উঠতে দেখি নাতো।
                     শিলচরের মানুষ নিজেদের 'শান্তির দ্বীপে'র অধিবাসী বলে ভাবতে ভালোবাসেন । শব্দগুচ্ছটি সত্তরের শেষের দিকে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মুখ থেকে বেরুনো মাত্র আহ্লাদে আটখানা কিছু সংবাদ মাধ্যম, আর তাঁর নিজের দল একে ভুলতেই দেয় নি। এই সুকৌশলী শব্দগুচ্ছ উপত্যকার মধ্যবিত্তের, যারা এমনিতেও নিজেদের পূর্বত্তরের বাইরের লোক বলে কল্পনা করে ভালোবাসেন সেই, ভালোবাসাকেই বাতাস যুগিয়ে আরো শূন্যে উড়িয়েছে মাত্র। কিন্তু তাই বলে কি আর তারা কোনো ধরণের আলাদা আচরণ করে থাকেন? যে কোনো মিজো নারী পুরুষকে জিজ্ঞেস করে দেখুন। তারা জানাবেন শিলচরের বাজারে , হোটেলে তাদের প্রতি কেমন আচরণটা করা হয়ে থাকে। মিজো নারীদের প্রতি দুর্ব্যহারের ঘটনা সেখানে প্রায়ই ঘটে থাকে। এমন বহু মামলা পুলিশের কাছে ঝুলছে। যদিও এটি সত্যি যে সত্তরের শেষে যখন এম এন এফের আন্দোলন তুঙ্গে ছিল তখন কিছু দিন বাদ দিলে শিলচরের কেউ কখনোই মিজো তাড়ানোর জন্যে হাঙ্গামা করেন নি, যা মিজোরামে প্রায়ই হয়েই থাকে। কিন্তু, এমন শান্তিপ্রিয়তাকে ওখানকার জনসংখ্যার গঠন দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়, কোনো স্বতন্ত্র বাঙালি অহমিকা দিয়ে নয় । বাঙালিদের সংখ্যালঘু কিম্বা প্রান্তিক অবস্থানে পৌঁছে যাবার আশঙ্কা সেই উপত্যকাতে নেই। যদি সেখানকার মধ্যবিত্ত আজ ভেবে থাকেন যে কোনো অবস্থাতেই দিশপুরের উপর কিম্বা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অসমিয়া মধ্যবিত্তের উপর, যদিও ক্ষোভের কারণগুলোর বেশিটাই সংগত, আর ভরসা করতে পারবেন না, সুতরাং এদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখার কোনো মানেই নেই, তবে এ শুধু এই প্রমাণ করে যে তারাও অসমিয়া মধ্যবিত্তকে ওখানে আর স্বাগত জানিয়ে নিজেদের উন্নত ব্যবহারে মন জয় করতে প্রস্তুত নন। যে কোনো একটা বছরে দুই উপত্যকার মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় কতটা হয়ে থাকে তার হিসেব নিলেই আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট হবে। ব্রহ্মপুত্র থেকেতো হয়ই না তেমন, কিন্তু বরাক থেকেওতো হাতগুনা ব্যতিক্রম বাদ দিলে হয় না দেখি। অথচ কলকাতা বাংলাদেশের অতিথিরা প্রায়ই যাতায়াত করতে থাকেন। ফিরে গিয়ে যে তারাও এই উপত্যকাকে মনে রাখেন তেমন কিন্তু মনে হয় না বিশেষ। এক স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্ব না হয় আদায় করাই গেল। যার আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই বাড়ছে সেখানে । কিন্তু সেতো কোনোভাবেই উপত্যকাকে পূর্বোত্তরের বাইরে নিয়ে যাবে না। অসমিয়া, মিজো, খাসিয়া, মণিপুরি এই সব মানুষের সঙ্গেই বাস করতে হবে তখনো। বর্তমান লেখকের মতো, ওখানকার বহু মানুষ তখনো ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা বা পূর্বোত্তরের অন্যত্র যাবেন থাকবেন জীবিকার জন্যে, ব্যবসার জন্যে, আত্মীয়তার সন্ধানে। এই তথ্য উল্লেখ করাটা খুব মজার হবে যে মেঘালয় সরকার দীর্ঘদিন ধরে যোগীঘোপা থেকে টিক্রিকিল্লা, আমপাতি, ডলু, বাঘমারা, ডাউকি , কালাইন হয়ে হয়ে করিমগঞ্জের বদরপুর দুই উপত্যকার কেউই সেদিকে খুব একটা কান দেন নি। ইতিমধ্যে এই পথে সমীক্ষার কাজ অনেকটা এগিয়েছে, শিলং চন্দ্রনাথপুর সমীক্ষার কাজ এবছরে হবে তা এবারের রেল বাজেটেই ঘোষিত হ'ল।এই প্রকল্প যদি সত্যি হয় , তবে দুই উপত্যকার বিভাজন বহুদূর কমে যাবে। এবং তাতে দুই উপত্যকার রক্ষণশীল যারা পূর্বোত্তর ভারতের 'বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যে' পরম্পরার প্রতি নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে পালাতে পারলে বাঁচেন , তাদের বহুদূর হতাশ করে ফেলবার সম্ভাবনাই প্রবল।
                             
                   কেমন হতো যদি, উপত্যকার সঙ্গে পাশের জেলা রাজ্যতে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে শিলচরে এক জনমত গড়ে উঠে? যেমন ষ্টেশনের নামাকরণ নিয়ে গড়ে উঠেছে? এই সম্ভাবনার কথা নিয়ে অসমীয়া বুদ্ধিজীবি এবং দিশপুরকে সহমতে নিয়ে আসাটা কি খুবই দুষ্কর? অনেকেতো এখনো বরাকের কথা জানেনই না ভালো করে! পর্যটন মানেই আতিথেয়তা। আতিথেয়তা মানে এক সদর্থক মনোভঙ্গী। আর কোন ব্যবসাবুদ্ধিই বা দুই উপত্যকার মানুষকে কাছে টেনে নিয়ে আসতে পারে? জানি, অনেকেই একে 'আকাশ কুসুম' বলে উড়িয়ে দেবেন। এতো জঘন্য পথঘাট নিয়ে ভ্রমণ বিলাশ? এমন প্রলাপ শুধু পাগলেই বকতে পারে। আমার কেবল জবাব হবে এ সবই মানসিক সংস্কৃতির কথা। পালজোর লাচুঙপা, দ্য ট্রেভেল এজেন্টস আসোসিয়েসন অফ সিকিমের তিনি সভাপতি।উত্তর সিকিমে বিশেষ করে তিব্বত সীমান্তে যেতে সরকারী অনুমতির দরকার পড়ে। এক বিদেশি পর্যটন গবেষক এবং লেখক আন্ড্র্যু ডানা হাডসন গেল বছরের ১৮ মে তারিখে এক সাক্ষাৎকারে এই নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। পালজোরের জবাব ছিল এরকম, “Our clients shouldn’t feel harassed about getting into the restricted areas, but if you make it free for everyone, people will lose their curiosity,” তিনি আরো এক মূল্যবান মন্তব্য করেছিলেন যা মনোভঙ্গীর এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে অক্ষত থাকবে, “If the roads are all too smooth, you won’t remember the journey.” (পথগুলো যদি খুব একটা মসৃণ হয়, তবে কেউ তার যাত্রা পথের কথা মনে রাখে না)
                            আমি জানি না রেল কিম্বা সড়ক যে পথেই হোক শিলচর যাবার মতো সুন্দর পথ অসমে আর দ্বিতীয়টি আছে কিনা। আমি জানি না, অসমের আর কোথাও দয়াং কিম্বা জাটিঙ্গার মতো সবুজ, স্বচ্ছ নদী রয়েছে কিনা। আমি জানি না ভুবন পাহাড়ের মতো বিশাল রোমাঞ্চকর গুহা অসমে আর রয়েছে কিনা। বাকি সব পাহাড়, অরণ্য, ইতিহাসে ধন্য রাজনীতি, সংস্কৃতি কিম্বা ধর্মের কেন্দ্রগুলোর কথা না হয় উল্লেখ করলামই না। সে গুলো নিয়ে অন্য কখনো, অন্য কোথাও লিখব না হয়। আপাতত দাঁড়ানো যাক।

তথ্যসূত্রঃ

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...

Google+ Badge

^ Back to Top--'উপরে ফিরে আসুন'