আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

***************************************************



Sunday, 24 March 2013

বাংলা নববর্ষ এবং বর্ষপঞ্জীঃ একটি ব্যক্তিগত গদ্য।

(এই নিবন্ধ লেখার  সাত বছর হয়ে গেল । মাকুম কেন্দ্রীয় রঙালী বিহু উদযাপন সমিতির ২০০৭ এর স্মরণিকাতে বেরিয়েছিল। এখন ২০১৩র রঙালী বিহু  আসার সময় হলো। তাই  সেই পুরোনো লেখাকেই ভাবলাম  সামান্য  সময়োচিত সংশোধন করে এখানে তুলে  রাখা যাক। এর কোনো বাংলা সংস্করণ ছিল না । সেই অনুবাদও কের ফেললাম । মূল অসমিয়া এখানে দেখুন । সবাইকে রঙালী বিহু  আর নতুন বছর ১৪২০এর  জন্যে আগাম  শুভেচ্ছা  জানালাম)

            
সমিয়া নববর্ষকে নিয়ে কিছু লেখা খুব সহজ। খবরের কাগজ, সাময়িকীগুলোতে অসংখ্য লেখালেখি এই সময়ে পড়তে পাই । কেননা, অসমিয়া নববর্ষ মানে ‘ব’হাগ বিহু’। অসমের জাতীয় উৎসব ‘ব’হাগ বিহু’। অসমের জাতীয় উৎসব ব’হাগ বিহুতে অসমিয়া নববর্ষেরো আরম্ভ অর্থাৎ ১লা বৈশাখ থেকে । বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে লিখবার জন্যে এই দিনটিতে এমন কোন উৎসবের প্রচলন নেই। বাংলা নববর্ষকে এ কালে মহিমান্বিত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি এ উপলক্ষ্যে বহু গান-কবিতা-প্রবন্ধ লিখেছিলেন। শান্তিনিকেতনে উৎসবেরো আয়োজন করেছিলেন। পরে সাহিত্যকর্মীরা নববর্ষ উপলক্ষ্যে কিছু না কিছু একটা লিখতে শুরু করেন। বহু জায়গাতে এদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন হয় । শিলচর, আগরতলাতে শুরু করে কিছু শহরে বৈশাখের প্রথম দিন উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে কিছু গণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কিন্তু বিহুর মতো সমগ্র জাতিটি পালন করতে পারে বাংলা নববর্ষ এখনো তেমন উৎসব হয়ে ওঠেনি । ঘরে ঘরে সামান্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা হয়, আর ব্যবসায়ীরা গণেশ পুজো করে বছরের নতুন ‘হালখাতা’র সূচনা করেন। কোথাও কোথাও বা বাড়িতে লক্ষ্মী পুজোও করেন । আর কী?
          বৈচিত্রের কথা এসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঐক্যের কথাটাও স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে। আমাদের মনে পড়ল—বাংলা আর অসমিয়া নববর্ষ দেখি একই দিনে, বর্ষপঞ্জীও ( Calendar) একই। এ বছর দুই বর্ষপঞ্জীই ইংরেজি ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হলো আর আগামী বছর ১৩ এপ্রিলে শেষ হবে। অসমিয়া-বাংলা দুই ভাষাতেই এই বছরটি ১৪২০। শুধু বাংলাতে একে বলা হয় বঙ্গাব্দ, আর অসমিয়াতে ভাষ্করাব্দ। কেরালা, তামিল নাডু, বিহার, পাঞ্জাব, ত্রিপুরা, মণিপুর সহ বহু ভারতীয় প্রদেশ ছাড়াও নেপাল, বাংলাদেশের মতো ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিবেশী দেশ দুই একটির জন্যেও এটা সময় নববর্ষ উদযাপন করবার। এসব জায়গাতে এই সময় যেসব পারম্পরিক অনুষ্ঠানাদি পালিত হয় সেগুলোর বেশির ভাগই কৃষি নির্ভর । মাস এবং বার ক’টির নামও শুধু বাংলা আর অসমিয়াতেই নয়, সমগ্র উত্তর ভারতীয় আর্যমূলীয় ভাষাগুলোতে একই। নামের উৎসগুলোও একই। যেমন, বিশাখা নক্ষত্রের থেকে বাংলাতে বৈশাখ, অসমিয়াতে ব’হাগ; শ্রবণা নক্ষত্রের থেকে বাংলাতে শ্রাবণ অসমিয়াতে শাওণ।
             স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে—তাহলে বাংলা নববর্ষ, অসমিয়া নৱবর্ষ বলে বলবার অর্থ কী! এ দেখছি আসলে ভারতীয় নববর্ষ। কিন্তু তাতেও সমস্যা আছে। ভারতবর্ষ বড় বৈচিত্রময় দেশ। বহু ভারতীয় দীপাবলীর দিনে, কেউবা রামনবমীর দিনে, কেউবা আবার ফাল্গুন মাসের দোলের দিন নববর্ষ উদযাপন করেন। ইসলামীয় এবং আৰু খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যের কথাও আমাদের ভুললে চলছে না ।কেরালাতে খ্রিষ্টধর্মের এবং সিন্ধুপ্রদেশে আরবদের সঙ্গে ইসলাম আসার দিন থেকে ধরলে এ দুটো ধর্মীয় পরম্পরাও সহস্রাব্দের বেশি সময় ধরে ভারতীয় সভ্যতার অঙ্গ। যদিও মুসলমানরা সেভাবে নববর্ষ পালন করেন না, তবু তাদের হিজরি সন আরম্ভ হয় ১ মহরমের থেকে । আর খ্রিষ্টীয় নববর্ষের কথাতো আমরা সবাই জানি। কেননা, সমস্ত ভারতীয় আজকাল উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে এই দিনটি পালন করেন। ফলে সর্বভারতীয় নববর্ষের দিন বলে বলতে হলে ১ জানুয়ারি।
            
            
  সে যাই হোক, আমার মনে হলো বাংলা এবং অসমিয়া নববর্ষের সেই ঐক্য সূত্র সন্ধান করা যাক। কিন্তু সমস্যা হলো, সেই কাজ করতে গেলে ইতিহাস অধ্যয়ন করতে হবে। অথচ আমি ইতিহাসের পাঠক মাত্র, ছাত্র নই। ইতিহাসের সত্যতা আমার লেখাতে নাও থাকতে পারে। শুধু চাইছি, যদি কিছু পাঠকের মনে বিষয়টিকে নিয়ে আরো একটু বেশি ভালো অনুসন্ধানের আগ্রহ জাগাতে পারি তবেই নিজেকে সার্থক বুলে ভাবব । তাই লেখাটার নাম দিলাম, ‘ব্যক্তিগত গদ্য’।
                অনুসন্ধান করলে ভারতবর্ষে আরো অসংখ্য বর্ষপঞ্জী পাওয়া যাবে। অসমে যেমন শংকরাব্দের প্রচলন আছে, বাঙালি বৈষ্ণবরাও চৈতন্যাব্দ বলে একটি বর্ষপঞ্জী কখনো বা অনুসরণ করেন দেখি। আহোম রাজারাও এক নিজস্ব ঐতিহ্য সম্ভূত বর্ষপঞ্জী সঙ্গে নিয়ে অসমে এসছিলেন । নাম ছিল ‘লাকনি’। রাজত্বের শুরুর দিনগুলোতে সেই বর্ষপঞ্জীই ব্যবহার করতেন । তেমনি আরো অনেক আছে। বেদ- মহাকাব্যের যুগে সত্য-দ্বাপর ইত্যাদি চারটি যুগের বাইরে বর্ষপঞ্জীর হিসাবটি কেমন ছিল আমি জানি না। আমাদের অনুমান, আমার মতো আরো অনেকেই জানেন না। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে ইসলামীয় হিজরি স প্রচলিত হবার আগে যদি কোথাও কোনো বর্ষপঞ্জীর রাজকীয় ব্যবহার ছিল তবে সে ছিল শকাব্দ। শক সম্রাটদের কেউ ( রাজা শালিবাহনের কথা কেউ কেউ বলেন) এর প্রচলন করেছিলেন খৃঃ পূঃ ৭৮ সনে। শকরা বাইরের থেকে এখানে এসে সাম্রায্য বিস্তার করতে এসছিলেন। তাঁদের বৌদ্ধিক এবং সাংস্কৃতিক মান যে বেশ উন্নত ছিল সেটি এই কথাতেই অনুমান করতে পারি যে তখনকার দিনেই তাঁরা সৌরকেন্দ্রীক বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেছিলেন। সৌরকেন্দ্রীক বর্ষপঞ্জীর ধারণা যদি সঙ্গে নিয়েও এসছিলেন, মাসের নামগুলো কিন্তু তাঁরা ইতিমধ্যে ভারতীয় ঐতিহ্যের অঙ্গ হয়ে পড়া আর্য ঐতিহ্যের থেকেই নিয়েছিলেন । বৈশাখ , জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ইত্যাদি বারো মাসের নাম সেভাবেই এসে বাংলা-অসমিয়া বর্ষপঞ্জীতে থেকে গেল। কালে এই শকাব্দ ব্রাহ্মণ্য সংস্কারের অঙ্গ হয়ে উঠল। এবং আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্ম সংস্কৃতি যেখানে যেখানে গেছিল সেখানে সেখানে শকাব্দ গিয়ে প্রচলিত হতে পেরেছিল । অসমে কুমার ভাস্কর বর্মার দিন থেকেই ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেতে শুরু করেছিল । এবং শকাব্দও তখন থেকেই শাষকশ্রেণীর মধ্যে প্রচলিত হয়েছিল বলে অনুমান করতে পারি। শকাব্দের সঙ্গে বঙ্গাব্দ-ভাস্করাব্দ ইত্যাদির অনেকটা মিল আছে। যেমন বছরের শুরু আর শেষ প্রায় একই। বৈশাখ , জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ইত্যাদি মাসের নামও প্রায় একই। সোম, মঙ্গল, বুধ ইত্যাদি সপ্তাহের নাম ক’টিও তখন থেকেই প্রচলিত। এটি সহজেই বোঝা যায় যে, তখনকার দিনে জ্যোতির্বিদ্যা যদ্দূর অগ্রগতি লাভ করতে পেরেছিল তারই ‘নবগ্রহ’ ধারণার থেকে নামগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল। আধুনিক কালে এই নবগ্রহের ধারণা শুধু জ্যোতিষের মতো অপবিজ্ঞানে টিকে আছে। জ্যোতির্বিদ্যা সূর্য-চন্দ্রকে গ্রহ বলে স্বীকার করে না।
                এ বছর শকাব্দ ১৯৩৫। ১৪২০ নয়। বঙ্গাব্দ বা ভাস্করাব্দের থেকে শকাব্দ ৫১৫ বছর এগিয়ে আছে। আধুনিকতার প্রতি আমাদের যতই আকর্ষণ থাকুক না কেন, কিছু কথাতে আমরা প্রাচীনতার প্রতি আকর্ষণ সহজে ছাড়ি না, বিশেষ করে যদি তা আমাদের ঐতিহ্য সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন দেখা দেয়, আমরা শকাব্দ কেন ছেড়ে দিলাম ? শকাব্দর প্রচলন থাকলে দেখি আমরা খ্রিষ্টীয় বর্ষপঞ্জীর সঙ্গে টেক্কা দিতে পারতাম । দেখাতে ১৯৩৫। কিন্তু সময়োচিত সংস্কার করে গেলে শকাব্দের হিসাব দ্বাবিংশ শতিকার কাছ চেপে যেতো। কিন্তু শকাব্দকে ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনার্য মানুষ কখনোই আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেন নি। রাষ্ট্রের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে কখনোই ব্যাপকভাবে শকাব্দ প্রচলিত হয় নি । এটি মূলতঃ শাসক-অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বিহুর মতো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের থেকেই কথাটি আমরা সহজেই ধরতে পারি । ঐতিহাসিকরা বলেন, ভাস্কর বর্মণ যেমনটি করেছিলেন তেমনি কোথাও কোথাও উন্নত কৃষিব্যবস্থা প্রচলনের জন্যে প্রয়োজন বোধ করে রাষ্ট্র ব্রাহ্মণদের ভূমিদান করে এনে বসিয়েছিল বটে , কিন্তু খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দ জুড়ে বৌদ্ধ জৈন ইত্যাদি ধর্মের মতো প্রবল সাংগঠনিক শক্তি ব্রাহ্মণ্য পরম্পরার ছিল। দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরু থেকেই সে ঠাই নেয় ইসলাম এবং নববৈষ্ণব ধর্ম। সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রবেশ অবাধ এবং সহজ ছিল না। এটা মানুষের প্রতিরোধের জন্যে নয়, এর নিজের সংকীর্ণতার ফলেই হয়েছিল। ভারতীয় সমাজজীবনের বৈচিত্রের সমস্যাকে ব্রাহ্মণ্যবাদ বর্ণবাদ দিয়ে সমাধান করতে চেয়েছিল। যে প্রয়াসে মানুষের থেকে সবসময় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বাধার সামনে পড়তে হয়েছিল। তবুও উন্নত কৃষির সঙ্গে আর্থ-রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাগুলোর কিছু পরিবর্তন এসে পড়েছিল ; ধর্ম- দর্শন-বিদ্যা চর্চার এলাকাতেও এ ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম দর্শনের প্রভাব সেভাবেই উপর থেকে সমাজের ভেতরে ঢোকতে শুরু করেছিল বা ঢোকেছিল। আজকের ইংরেজি ভাষার মতো আর্য ব্রাহ্মণ্যদের ভাষা সমগ্র সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছিল । তাই, বাঙালি বা অসমিয়ার মতো ভাষিক গোষ্ঠী দুটোর অধিকাংশ মানুষ অনার্যমূল থেকে এলেও দুই গোষ্ঠীই আদি ভাষা হারিয়ে আর্যভাষা গ্রহণ করল। কিন্তু সেটি মুখের কথার ভাষাতেই হলো, যাকে আমরা প্রাকৃত বলি। জ্ঞান-ধর্ম-দর্শন চর্চার ভাষা সংস্কৃত হয়ে রইল। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের জন্যে তাদের চিন্তাপ্রবাহ দুর্বোধ্য এবং অচেনা হয়ে রইল। কেউ যদি অল্প কিছু বুঝলেন তিনি তাকে নিজের সাম্প্রদায়িক ( সম্প্রদায় বিদ্বেষী অর্থে নয়) আঞ্চলিক ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়ে নিজের মতো করে আবার প্রকাশ করলেন। তেমনি ব্রাহ্মণ্যবাদও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্তরে রূপ পাল্টালো, ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী দর্শন শাখা-প্রশাখাও গড়ে উঠল। তার উপর ইসলাম বা বৌদ্ধ ধর্মের মতো ব্রাহ্মণ্যবাদের কোনো ঐক্যবদ্ধ সাংগঠনিক রূপ ছিল না, একথা সবাই জানেন । শকাব্দের ধারণাও তেমনি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলো । বাংলাতে এটি বঙ্গাব্দের রূপ নিল এবং অসমে ( তখনকার কামরূপের পূর্বাংশে) ভাস্করাব্দর। এই পরিবর্তন এতোটাই ব্যাপক ছিল যে শকাব্দের থেকে কয়েকশ’ বছর বাদ পড়ল।
       
                
   প্রচলিত মত হলো, কুমার ভাস্করের রাজ্যাভিষেকের দিন থেকে ভাস্করাব্দের প্রচলন হয়েছিল। বর্ষপঞ্জীটি তখন থেকেই প্রচলিত হলেও ‘ভাস্করাব্দ’ শব্দটি তখন থেকেই প্রচলিত হয়েছিল কি না আমরা জানি না । কিন্তু ‘বঙ্গাব্দ’ শব্দের প্রচলন তখন ছিল না, এ কথা নিশ্চিত হয়েই বলতে পারি । তখনকার দিনে বর্তমান অবিভক্ত বাংলার সমুদ্রতীরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের একটি ছোট ভূখণ্ডই বঙ্গ বলে পরিচিত ছিল। বাকি অংশ গৌড়, পৌণ্ড্র এমনকি কামরূপ ইত্যাদি নামেও পরিচিত ছিল। কুমার ভাস্কর বর্মার সময় গৌড়ের রাজা ছিলেন শশাংক। সম্রাট আকবরের সময়ে সমগ্র ভারতবর্ষকে শাসনের সুবিধার জন্যে ‘সুবাহ’ নাম দিয়ে কয়েকটি প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ করা হয়েছিল। তারই পূর্ব-প্রান্তিক সুবাহটির নাম দেয়া হয়েছিল ‘সুবাহ-বাংলা।’ তাতে সিলেট বা শ্রীহট্ট অব্দি অন্তর্ভূক্ত ছিল। এই সুবাহ বা সুবে-বাংলার লোকেরাই ক্রমে নিজেকে বাঙালি বলে বলতে শুরু করেন । সেটিও ভালো করে মাত্র ঐ সেদিন, রাজা রামামোহন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো সমাজ সংস্কারকদের লেখালেখির মধ্যি দিয়ে । চর্চাপদের কবি ভুসুকু লিখেছিলেন, ‘আজি ভুসুকু তই বঙালী হৈলি।’ সেই বঙ্গ ছিল সেই তখনকার প্রান্তীয় ছোট এক ভূখণ্ড। যেখানে পা দেয়াটাও বহু বামুনেরা পাপ কর্ম বলে ভাবতেন।
             অনেকে বলেন, রাজা শশাংক তাঁর দিনে বঙ্গাব্দের প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু বর্ষপঞ্জীর মতো উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত বিষয় একটা শশাংক প্রচলন করেছিলেন বলে বিশ্বাস করার সমস্যা আছে। কিছু বাঙালি পণ্ডিত বলতে চান, রাজা শশাংক কামরূপ অব্দি তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন । এবং একই বর্ষপঞ্জীর প্রচলন এখানেও হয়েছিল। তখনকার দিনে হর্ষবর্দ্ধনের সাম্রায্য প্রায় পুরো উত্তর ভারতবর্ষকে নিজের ভেতরে নিয়ে নিয়েছিল ,বর্তমান বাংলাদেশেরও অনেকটাই সেই সাম্রাজ্যের ভেতরে গেছিল । তাঁর সঙ্গে কুমার ভাস্কর বর্মার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। শশাংকর বিরোধ ছিল দু’জনের সঙ্গেই । হর্ষবর্ধ্বনের পরে তাঁর বিশাল সাম্রায্যের অনেকটাই নিজের অধীনস্থ করতে পেরেছিলেন । শশাংক এমনকি দক্ষিণের উড়িষ্যা অব্দি তাঁর সাম্রায্য বিস্তার করেছিলেন। কিন্তু কামরূপ দখল করেছিলেন বলে সমর্থিত তথ্য অত্যন্ত কম। তাই, অনুমান করতে পারি বঙ্গাব্দ হর্ষবর্দ্ধনের সময়েই প্রচলিত হয়েছিল। দু’জন বন্ধু রাজা একসঙ্গে এই বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেছিলেন না এক জন অন্যজনের থেকে ধারণাটি নিয়েছিলেন সে বিষয়ে ঐতিহাসিকরাই ভালো করে বলতে পারবেন। সময়ের ঐক্যের দিকে তাকিয়ে আমরা  শুধু জোরের সংগেই বলতে পারি, দু’ জায়গাতে একসঙ্গে এই নতুন বর্ষপঞ্জী প্রচলিত হয়েছিল, বিচ্ছিন্নভাবে নয়। অবশ্য আরেকটা কথা আমরা এখানে ইঙ্গিত দিতে পারি , তখনকার কামরূপ বর্তমান পূর্ব-বাংলা তথা বাংলাদেশ অব্দি বিস্তৃত ছিল। সম্ভবত , তখনকার বঙ্গ বলে পরিচত ভূখণ্ডও। বর্তমান ময়মন সিংহ-শ্রীহট্ট-কুমিল্লা আদি অবশ্যই কামরূপের অধীনস্থ ছিল। এমনও হতে পারে কামরূপের সেই ভাগ প্রায় সহস্রাব্দ পরে যখন মোগলের অধীনস্থ হলো তখনই সেই বর্ষপঞ্জী পুরো ‘সুবেহ বাংলা’তে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্রাট আকবরের অৱদান এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করবার মতো।
        
               
সম্রাট আকবর এই বর্ষপঞ্জীকে তাঁর পুরো সাম্রাজ্যে প্রচলন করেছিলেন। এবং তিনিই প্রথমবারের মতো ‘নওরোজ’ নাম দিয়ে নববর্ষ উদযাপন প্রথা শুরু করেন। সম্রাট আকবরের আগে পরে লেখা বাংলা কাব্য সাহিত্যগুলোতেও বঙ্গাব্দের বদলে শকাব্দের প্রচলনই বেশি দেখা যায়। যেমন মালাধর বসু তাঁর লেখা শ্রীকৃষ্ণবিজয় সম্পর্কে লিখেছেন, “তেরশ পঁচানই শকে গ্রন্থ আরম্ভণ। চতুর্দশ দুই শকে হৈল সমাপন।।” হ্যাঁ, সম্রাট আকবরের আগে ভারতবর্ষে নববর্ষের মতো ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব পালনের কোনো প্রথা ছিল না। দেবতার বাইরে ভারতীয়রা কারো জন্মদিন পালন করে নি, মৃত্যুতিথি পালন করেন। তাই, আজকালকার বার্থডেগুলোতে খ্রিষ্টীয় রীতি অনুসৃত হয়। তেমনি বছর বা মাসের শুরু থেকে শেষদিনটিতে বিশেষ করে উদযাপনের প্রথা এখনো বহু প্রচলিত। যাকে সংক্রান্তি বলা হয় । বহাগ বিহুর শুরুটাও কিন্তু চৈত্র সংক্রান্তির থেকেই হয়, ১লা বৈশাখ থেকে নয়।
             ভাস্করাব্দের পরে যদি কোনো সংস্কার হয়েছিল , আমি জানি না। যে কম সময়ে লেখাটি প্রস্তুত করতে হচ্ছে অনুসন্ধান করারও উপায় নেই। স্মৃতি নির্ভর লিখতে হচ্ছে । যেহেতু আমি , বাংলা সাহিত্যের ছাত্র,এবং অসমের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রম মূলতঃ কলকাতার লেখক নির্ভর ,  ফলে  অসম তথা পূর্বোত্তর সম্পর্কে বিশেষ কিছু কথা সেগুলোতে থাকেই না। তাই, অসমের মানুষ হয়েও মাতৃভূমি সম্পর্কে সবসময়েই এক বিচ্ছিন্নতার সমস্যাতে ভোগতে হয়। আমার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত মত এই যে অসমের বাংলা পাঠ্যক্রমের অন্তত সত্তর শতাংশ পূর্বোত্তরের বাঙালি লেখকের লেখা দিয়ে ( অথবা অসমিয়া-মণিপুরি ভাষার থেকে অনুবাদে) সমৃদ্ধ করা উচিত —যেখানে স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির গন্ধ এবং জ্ঞান থাকবে। অবশ্যে সেটি এক অন্য প্রসঙ্গ।
         বঙ্গাব্দ আকবরের সময়ে এক বড় সংস্কারের মধ্যি দিয়ে গেছিল। দিল্লীর মুসলমান শাসকরা হিজরি বর্ষপঞ্জীকে ব্যবহার করেই রাজকার্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হিজরি হলো চন্দ্রকেন্দ্রীক বর্ষপঞ্জী (Lunar Calendar) । এই বর্ষপঞ্জীকে ব্যবহার করে কৃষি কাজ, রাজস্ব আদায় করার কাজ এবং সামগ্রিকভাবে রাজ-সরকারের কাজ করতে অনেক অসুবিধে হচ্ছিল। তাই সম্রাট আকবর বর্ষপঞ্জীর সংস্কারের জন্যে চন্দ্রকেন্দ্রীক বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে পরিবর্তনের নির্দেশ দিলেন। কাজটি করতে গিয়ে তাঁকে বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য এবং ঐশ্লামিক ঐতিহ্যের কথাও মনে রাখতে হয়েছিল। এ সম্পর্কে আবুল ফজল তাঁর বিখ্যাত ‘আকবরনামা’ বইতে বিস্তৃত লিখে গেছেন। তখনকার ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে আকবর কাজটি করার জন্যে দায়িত্ব দিলেন। তিনি শকাব্দ এবং হিজরি বর্ষপঞ্জীর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে যে বর্ষপঞ্জী তৈরি করলেন সেটি প্রচলিত ভাস্করাব্দর সঙ্গে একই।
           সিদিন ছিল ১০ রবিউল আওয়াল, ৯৫৩ হিজরি, ৫ নভেম্বর, ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ। দ্বিতীয় পানিপথ যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন সম্রাট আকবর। নিজের বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখতে আকবরের ‘তারিখ –এ- ইলাহী’ তথা নতুন বর্ষপঞ্জীর হিসাব শুরু হলো সেবছর থেকে । সাধারণ মানুষের মধ্যে যেটি ‘ফসলী সন’ বলে পরিচিত হয়েছিল।
             আজ থেকে ৪৫৭ বছর আগে। এ বছরটি যদিও ১৪৩৪হিজরি চলছে। ৯৬৩ হিজরি সনের সঙ্গে ৪৫৭ যোগ করলে ১৪২০ বঙ্গাব্দ বা ভাস্করাব্দ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, সে বছর বঙ্গাব্দ হিজরির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। শুধু বৈশাখ মাসটি পড়ল হিজরি প্রথম মাস মুহরমের সঙ্গে একসঙ্গে । তাই, শকাব্দ যেখানে আরম্ভ হতো চৈত্র মাস থেকে ( তারও আগে বছরের প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ), নতুন ‘তারিখ –এ –ইলাহী’ বা ‘ফসলী সন’ শুরু হলো বৈশাখ মাসের থেকে। এটি আরো এক যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা হতে পারে যে কেন শকাব্দের থেকে বঙ্গাব্দ ৫১৫ বছর পেছনে। আইনতঃ এই নতুন বর্ষপঞ্জী সরকারিভাবে গৃহীত হয়েছিল ১০/১১ মার্চ, ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে। এ কথা স্পষ্ট যে ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ এবং ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দ এই দুই বছরের কোনোটাই তারিখ –এ –ইলাহীর প্রথম বছর ছিল না। সে ছিল ৯৫৩ বছর আগের একটি দিন; ইউরোপীয় জুলীয় বর্ষপঞ্জী অনুসারে ১২ এপ্রিল, ৫৯৪ এবং খ্রিষ্টীয় গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জী অনুসারে ১৪ এপ্রিল, ৫৯৪।       
                বর্ষপঞ্জীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ধ্যান-ধারণাকে আকবর একেবারেই বাদ দিয়েছিলেন এবং ১৪টি নতুন উৎসবের ঘোষণা করেছিলেন। তার মধ্যে একটি ছিল ‘নওরোজ’ । নওরোজ পালন করতে গিয়েই সেলিম (পরে জাহাঙ্গীর) নুরজাহানের সঙ্গে আর তাঁর পুত্র খুররম ( পরে শাজাহান) মুমতাজমহলের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। নওরোজের ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যের কথা মনে রেখে বহুদিন পর রবীন্দ্রনাথ ‘নববর্ষ’ দিনটিকে হিন্দু-মুসলমান জনতার ঐক্যবদ্ধ উৎসবের চেহারা দেবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এখন অব্দি বাঙালি হিন্দুরা দুর্গা পূজাকে বাঙালির জাতীয় উৎসব বলে ভাবতে পছন্দ করেন , যেটি কোনোভাবেই সমগ্র বাঙালির জাতীয় উৎসব হতেই পারে না। কিন্তু আকবরের এবং রবীন্দ্রনাথের সে স্বপ্ন যদি কোথাও সফল হয়েছে তবে তা বর্তমান বাংলাদেশে। বাংলাদেশের বাঙালিদের জাতীয় উৎসব ‘নববর্ষ’ ---যে উৎসবের সঙ্গে কোনো ধর্মের কোন সম্পর্ক নাই। অথচ দেখা যাবে মুসলমান মেয়েরাই লালা পেড়ে শাড়ি পরে , কপালে বিন্দি এবং পায়ে ‘আলতা’ লাগিয়ে ‘আল্পনা’ আঁকবেন, গান গাইবেন,ছেলেরা সেদিন ধুতি পরে পথে বেরুবেন, নাচবার জন্যে।
                এখানে উল্লেখ করতে পারি যে মোগল সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যাবার পরে ‘তারিখ –এ-ইলাহী’ বাংলার মতো দুই একটি জায়গার বাইরে অপ্রচলিত হয়ে পড়ল । তাই মনে হয়, এক সময় সমগ্র ভাৰতবর্ষে প্রচলিত বর্ষপঞ্জী একটি ব্রিটিশের দিনে ক্রমে ক্রমে বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য হিসাবে চিহ্নিত হ’ল। ভাস্করাব্দর সঙ্গে এই ‘তারিখ –এ –ইলাহী’র কোনো সম্পর্ক পরের সময়ে স্থাপিত হয়েছিল কি না সে বিষয়ে আমরা কিছু জানি না । বিদ্বৎজন বলতে পারবেন।
     
         
     ভারতবর্ষে এই বঙ্গাব্দর আর কোনো সংস্কার যদি হয়েছিল, জানি না । খ্রিষ্টাব্দর ‘লিপ-ইয়ার’ বা অধিবর্ষের মতো কোনো ব্যৱস্থা এই বঙ্গাব্দতে নাই। বাংলা মাসগুলোর দৈর্ঘ বিভিন্ন প্রকারের হয়। কোনো মাস ২৮ দিনের, কোনোটা আবার ৩২ দিনের। এই অসংগতি দূর করবার জন্যে তদানিন্তন পূর্ব-পাকিস্তানের বাংলা একাদেমী বিখ্যাত ভাষাতত্ববিদ ড০ মুহম্মদ শহীদুল্লাহের নেতৃত্বে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি কমিটি করে দেন। সেই কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী এখন বাংলাদেশের বর্ষপঞ্জীতে বৈশাখ থেকে ভাদ্র এই পাঁচ মাস হয় ৩১ দিনের। বাকি সাত মাস ৩০ দিনের। শুধু যে বছর খ্রিষ্টীয় বর্ষপঞ্জীর ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন যোগ হয়ে ২৯ দিনে হয় সে বছর ফাল্গুন মাসেও ৩০ দিনের বদলে ৩১ দিন হয়। উদাহরণ স্বরূপ খৃঃ ২০১২ সনটি ছিল অধিবর্ষ , ফলে গেল বছর বাংলা ১৪১৯সনের ফাল্গুন মাস ছিল ৩১ দিনের। বিদেশী শাসক শক সম্রাটরা প্রচলন করে রাখা একটি ঐতিহ্য এভাবে ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হয়ে এসে শেষে খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যকেও নিজের ভেতরে টেনে নিল । ছয়ষট্টি বছর আগে বাংলাদেশ ভারতের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কী হবে, দেড় হাজার বা তার চেয়ে বেশি দিনের ঐতিহ্যের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা এতো সহজ কম্ম নয়।

 

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...

Google+ Badge

^ Back to Top--'উপরে ফিরে আসুন'