আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Wednesday, 14 November 2012

দেশভাগ, ১৯৫০এর গণহত্যা এবং আমার মামার বাড়ির গল্প

করিমগঞ্জের বর্তমান বাড়িতে শিবমন্দির এবং বিগ্রহ
    দেশভাগ যাদের স্থানান্তরিত করেছিল আমরা অনেকেইতো তাদের উত্তরপ্রজন্ম। তাই, আমাকে যখন বলা হলো তেমন স্থানান্তরিত কাউকে নিয়ে লিখতে হবে, ভাবলাম কেনই বা আমার নিজের পরিবারকে নিয়েই নয়। কিন্তু দেশভাগের পরেওতো আমাদের স্থানান্তরণ ঘটেই চলেছে। ফলে আমিতো আর থাকিনা আমার পরিরারের সঙ্গে। একটা প্রশ্নমালা তৈরি করে পাঠিয়েছিলাম আমার বাবা এবং বড় মামার কাছে। ইচ্ছে ছিল পরিবারের নারী পক্ষদের থেকেও কিছু স্মৃতিকথা বের করে আনা। কিন্তু সে সম্ভব হয় নি। দুজনেই যদিও বা সমবয়সী ( আটাত্তর) প্রায় আমার বাবা শারীরিক ভাবে ইতিমধ্যে এতো দুর্বল যে নিজে থেকে বেশি কিছু লিখতে পারেন না, মামা কিছু নিজে লিখেছেন, বাকিটা শুনে শুনে লিখে দিয়েছে আমার মামাতুতো দাদা প্রবাল কান্তি সেন।সে নিজে করিমগঞ্জের ‘সেবা’ কাগজের সহসম্পাদক । যেভাবে পেয়েছি তাই মনে হলো অনেক।সাধুবাংলাতেই লিখেছেন। আমরা হুবহু বয়ানে তাই আগে তুলে দিই, পরে নিজের কথা লিখছি।
একটি  সাক্ষাৎকারঃ   
    নামঃ গোপিকা রঞ্জন সেন।জন্ম তারিখঃ ১৬-০১-১৯৩৪। জন্মস্থানঃনিজ কুরুয়া, থানা ঃ বালাগঞ্জ, জিলাঃশ্রীহট্ট।পিতার নামঃ ৺হরমোহন সেন।পূর্ব পাকিস্তানে থাকা কালীন আপনার পেশাঃ ছাত্র। পূর্ব-পাকিস্তানে থাকা কালীন পিতা/মাতার পেশাঃ গৃহস্থি।দেশভাগের আগে ও পরে আপনার ধর্মঃ হিন্দু।পূর্বপাকিস্তানে আপনার ঠিকানাঃ ঐ। মাতার নাম ও তাঁর পৈত্রিক ঠিকানাঃ ৺নীরদা বালা সেন; গ্রামঃ কেয়ামপুর, সদর সিলেট। মামার নামঃ ৺অধর চন্দ্র দেব।ভারতে আপনার ঠিকানাঃ করিমগঞ্জ। ( ঘাট লাইন, রায়নগর )প্রথম ঠিকানাতে অতিবাহিত সময়ঃ অদ্যাবধি প্রথম ঠিকানাতে আছি। পূর্ব পাকিস্তানে ফেলে আসা সম্পত্তি (ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনও সম্পত্তি বা বস্তু থাকলে তার বিষয়েও লিখুন) ঃ বসত বাড়ী এবং ধানক্ষেতের জমি। ভারত সরকার কর্তৃক বণ্টিত সম্পদঃ (X )।ভারতে আপনার আগমনের বিস্তৃত বৃত্তান্তঃ আলাদা ভাবে যুক্ত।   আপনার সঙ্গে আর ক’জন বা ক’টি পরিবার যাত্রা শুরু করেঃ আমাদের পরিবার একক ভাবেই আসিয়াছি। পূর্বপাকিস্তানে থেকে যাওয়া আপনার কোনো আত্মীয়ের নাম ও ঠিকানাঃ মামাতুতো ভাইয়েরা বর্তমানে বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব বাড়িতেই আছে, কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়া আপনার আত্মীয়দের দেশভাগ –পূর্ব অবস্থা (আর্থিক-সামাজিক)ঃ সম্পন্ন পরিবার। তাদের বর্তমান পরিস্থিতিঃ জানা নাই। আপনার পরিবারের কোনো সদস্য বা কোনো আত্মীয় কি দেশভাগের সময় বা যাত্রাকালে নিহত হয়েছিলেন? সেক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট বর্ণনা করুনঃ না। আপনার পরিচিত অন্য কেউ কি দেশভাগের সময় নিহত হয়েছিলেন? সেক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট বর্ণনা করুন।: না। আপনাদের সাথে কি কোনো সশস্ত্র প্রতিরক্ষা সহচর ছিল (মিলিটারি, পুলিশ বা অন্য কেউ) ? থাকলে নাম ও পদবীঃ না। ভারতে তৎকালীন প্রবেশ স্থলঃ সুতারকান্দি বর্ডার।
             দেশভাগের কথা জানার পর আপনার ব্যক্তিগত কী অনুভূতি হয়েছিল? ঃ দুঃখজনক। সামগ্রিকভাবে দেশভাগ সম্পর্কে আপনার অনুভূতি কী? দেশভাগ কি অনিবার্য ছিল?: দেশভাগ অনিবার্য্য ছিল না, দেশভাগের ফলে লক্ষ লক্ষ হিন্দু পরিবার স্থায়ী বাড়িঘর ত্যাগ করিয়া নিঃস্ব ও উদবাস্তু হইয়াছে। অনেকে প্রাণ হারাইয়াছে। শত শত হিন্দু রমনীরা ধর্ষিতা হইয়াছে। আপনার মতে কি ভারত , পাকিস্তান, এবং বাংলাদেশ আলাদা আলাদা রাষ্ট্র হিসাবে বর্তমানে ভালো আছে? ঃ না।দেশভাগের পর আপনার সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা কি আগের চেয়ে ভালো হয়েছে?ঃ আমরা সংগ্রাম করিয়া জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করিতেছি।  আপনার বন্ধু বান্ধবী, পরিবার-পরিজন বা অন্য কারো সাথে কি আপনি পুনর্মিলিত হতে চান বা তাদের বর্তমান অবস্থা জানতে চান? ঠিকানা বা কোন তথ্য দিতে পারেন? ঃমামাতুতো ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করার ইচ্ছা অবশ্যই আছে। আপনার কি বর্তমান বাংলাদেশ সরকার থেকে কিছু চাইবার আছে? বিশেষ করে অর্পিত সম্পত্তি আইন উঠে যাবার পর?: আমাদের ফেলে আসা সম্পত্তি উদ্ধারের ব্যাপারে সাহায্য করার যদি কোন সুযোগ থাকে। (সম্পত্তির দলিলাদি আমাদের নিকট আছে।)

১৯৪৭ ইংরেজীতে দেশভাগ এবং আমাদের ভারতে আগমনের বৃত্তান্তঃ
     আমাদের বাড়ি শ্রীহট্ট জিলার সদর মহকুমায় ছিল। শ্রীহট্ট জিলার ৫টি মহকুমা ছিল। যথাক্রমে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলবীবাজার, সদর সিলেট এবং করিমগঞ্জ। দেশভাগের পরে ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা  চিহ্নিত করার সময় সম্পূর্ণ শ্রীহট্ট জিলাকে পূর্ব্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। করিমগঞ্জ মহকুমার মাত্র ২টি থানা ভারতের সংগে যুক্ত রহিয়াছে।
    দেশভাগের আগে বর্ত্তমান বাংলাদেশে (পূর্ব্ব পাকিস্তান) হিন্দু-মুসলমান শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করিয়া আসিয়াছেন। দেশভাগের আগে পূর্ব্বপাকিস্তানের ( বর্ত্তমান বাংলাদেশ) সংগে রেল, বাস এবং রেল, বাস এবং জলপথে ভারতের সংগে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল।পূর্বপাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে আমি একজন ভূক্তভোগি হিসাবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এখানে তুলিয়া ধরিতেছি।
     ১৯৫০ ইং ( ১৩৫৭ বাংলা) ফাল্গুন মাসের শেষের দিকে ( তারিখ মনে নাই) আমি এবং আমাদের গ্রামের একটি ছেলে ( আমরা দুইজনই তখন স্কুলের ছাত্র) করিমগঞ্জ যাওয়ার উদ্দেশ্যে By train  শ্রীহট্ট হইতে কোলাউড়া নামক রেল জংশনে আসি। এখান হইতে পৃথক ট্রেইনে করিমগঞ্জ যাইতে হইবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা কোলাউড়া জংশনে পৌঁছিয়া করিমগঞ্জ যাওয়ার কোনো Train পাই নাই। Train না থাকার কারণে হিন্দুমুসলমান বহুযাত্রী কোলাউড়া জংশনে আটক পড়িয়া যান।
    সন্ধ্যার পরে একজন মুসলমান ব্যক্তি মাইক যোগে ঘোষনা করিতে লাগিল, মুসলমা যাত্রিরা কেহ যেন ঐ দিন করিমগঞ্জ না যান। আমি ঐ ঘোষক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করিলাম কেন এই ঘোষণা? সে আমাকে বলিল এই ঘোষণা শুধু মুসলমান যাত্রিদের জন্য।
    আমরা প্লেটফর্মে হাটাহাটি করিতেছি, এমন সময় আমাদের পরিচিত জনৈক মুসলমান কলেজ ছাত্রের সংগে দেখা হইল। তাহাকে আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম করিমগঞ্জ যাওয়ার Train বন্ধ কেন ? সে তখন আমাদিগকে একটু দূরে নিয়া গিয়া প্রকৃত ঘটনা আমাদিগকে বলিল। সকালে একটি Train কোলাউড়া হইয়া করিমগঞ্জ গিয়াছে। ভৈরব নামক স্থানের একটি সেতুর উপর উক্ত Train দাঁড় করাইয়া নৃশংসভাবে অনেক হিন্দু যাত্রিকে খুন করা হইয়াছে এবং মৃতদের লাস নদীতে ফেলিয়া দেওয়া হইয়াছে। Train এর প্রতিটি কামরা রক্তে লাল ছিল। ঐ Train করিমগঞ্জ পৌছার পর Train এর কামরাগুলিতে রক্ত দেখিয়া করিমগঞ্জের মানুষ উত্তেজিত হইয়াছে। এবং সেখানে কিছু গোলমাল হইয়াছে। Train টিকে সেখানে আটক রাখা হইয়াছে। ঐ Train  ফেরৎ না আসায় এখান হইতে কোন Train করিমগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করিতেছে না। একই কারণে করিমগঞ্জ না যাওয়ার জন্যে মুসলমান যাত্রিদের নিষেধ করা হইতেছে।
     উক্ত ছাত্রটি আমাদিগকে আরো জানাইল যে, সরকারের সমর্থণে সমগ্র পূর্ব্বপাকিস্তান ব্যাপিয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাইবার একটি পরিকল্পনা রচনা করা হইয়াছে। ভৈরব নামক স্থানে একটি সেতুর উপর Train আটক  করিয়া  যে হিন্দু নিধন যজ্ঞ হইয়াছে তাহা উক্ত পরিকল্পনারই অঙ্গ এবং দাঙ্গা যে সমগ্র দেশ ব্যাপিয়া ছড়াইয়া পড়িবে এই ঘটনা তাহারই ইঙ্গিত বহন করিতেছে।
     আমরা করিমগঞ্জ যাইবার চেষ্টা না করিয়া নিজনিজ বাড়িতে ফিরিয়া যাইবার জন্য সে আমাদিগকে অনুরোধ করিল।আমাদের বাড়ি শ্রীহট্ট শহর হইতে ১০ মাইল দক্ষিণে। আমরা যদি রাতের Train এ বাড়ীতে যাইতে হয় তা হইলে বাড়ীতে পৌছিতে অনেক রাত হইয়া যাইবে। তাই আমরা বাড়ীতে না যাইয়া কোলাউড়া হইতে ২ ঘণ্টার রাস্তা মঙ্গলো বাজারের পাশে আমাদের আত্মীয় বাড়ীতে যাওয়াই যাওয়াই স্থির করি এবং যথাসময়ে Train এ উঠি। উক্ত Train মঙ্গলো বাজার ষ্টেশনে রাত ১১- ৩০ মিনিটে পৌছে। আমরা Train হইতে নামিয়া যাই এবং নির্দ্দিষ্ট সময়ে Train খানা উক্ত ষ্টেশন ছাড়িয়া যায়। ষ্টেশন হইতে আমাদের আত্মীয় বাড়ী পায়ে হাটিয়া যাইতে আধা ঘণ্টা সময় লাগিবে। Train হইতে নামিয়া যাইবার সময় একজন লোক আমাদের Ticket চাহিয়া নিয়া গেল আমরা আত্মীয় বাড়ি যাওয়ার রাস্তা ধরিয়া হাটিতে আড়ম্ভ করিয়াছি এমন  সময় ৮/১০জন লোক লাঠি ছুরি লইয়া আমাদিগকে ঘেরাও করিয়া মারামারি আরম্ভ করিল এবং আমাদের সংগে সমস্ত জিনিস পত্র লুটপাট করিয়া লইল। এই ফাঁকে প্রাণ বাঁচাইবার জন্য আমরা দৌড়াইতে আরম্ভ করিলাম তাহারা আমাদের পিছনে ধাওয়া করিল বটে কিন্তু আমাদিগকে ধরিতে পারে নাই। আমরা রাত প্রায় ১ ঘটিকার সময় আত্মীয় বাড়ী পৌছিয়াছি।
     আমরা সেখানে গিয়া জানিলাম তাহাদের আশেপাশে বাজারে দোকানগুলো ঐদিনই লুটপাট করা হইয়াছে এবং তাহারাও আতঙ্কের মধ্যে রহিয়াছেন। আমরা পরদিন ভোরে একজন মুসলমান লোককে সংগে নিয়া মুসলমান পোষাক পরিধান করিয়া ‘ছনখাইড়’ নামক একটি গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলাম। সেখানে পৌছিয়া জানিলাম যে আগের দিন তাহাদের আশে পাশের বাজারগুলোও লোটপাট হইয়াছে। ঐদিনই সকাল ১০ ঘটিকায় প্রায় ৫০০০ লোক উক্ত ছনখাইড় গ্রাম আক্রমণ করিয়াছে। সকল জিনিষ পত্র লোটপাট করিয়া নিয়া গিয়াছে। এই গ্রামে প্রায় ৫০০ পরিবার হিন্দুর বাস ছিল। গ্রামের মেয়েরা জঙ্গলে যাইয়া লুকাইয়া থাকায় তাহাদের ইজ্জত রক্ষা পাইয়াছে।
    আমরা সেখান হইতে মুসলমান পোষাকে একজন লোক সংগে নিয়া আমাদের বাড়ীতে পৌঁছাই। বাড়ি পৌঁছিয়া জানিলাম আমাদের গ্রাম সহ আশেপাশের অন্যান্য গ্রামগুলাও আক্রান্ত হইয়াছে। দেশের অন্যান্য অংশ হইতেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সংবাদ আসিতে লাগিল।
    করিম গঞ্জ বাজারে আমার বাবার একটি ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। তাই আমি আমার মা ও ভাই বোনকে নিয়া করিমগঞ্জ চলিয়া আসি। আসার সময় সুতারকান্দি বর্ডারে আমার মায়ের সোনা গহনা যাহা ছিল সব তাহারা রাখিয়া দেয়।আমাদের গ্রামের তথা দেশের অন্যান্য অংশের লোকজন বাড়িঘর ত্যাগ করিয়া বিভিন্ন সীমান্ত দিয়া ভারতে প্রবেশ করে। ভারতে আসিয়া অধিকাংশ লোকই আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নেয়। করিমগঞ্জ আশ্রয় শিবির হইতে অনেক লোককে দোহালিয়া নামক জায়গায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পুনর্বাসন দেওয়া হইয়ছিল। সেখানে মেলেরিয় রোগে আক্রান্ত হইয়া অনেক লোক মারা গিয়াছিল।
     এখানে একটি কথা উল্লেখ করা আবশ্যক, দাঙ্গার সময়ে পূর্ব্ব পাকিস্তানের সরকার হইতে হিন্দুদের কোন রকম নিরাপত্তা দেওইয়া হয় নাই। বরং হিন্দুদের পক্ষ থেকে থানায় সাহায্য প্রার্থণা করিতে গিয়া গালাগালি শুনিতে  হইয়াছে।
আমাদের ভারতে আগমন এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমি এখানে তুলিয়া ধরিলাম, তাহা আমার জ্ঞান বিশ্বাস মতে সম্পূর্ণ সত্য!
                                            শ্রী গোপিকা রঞ্জন সেন
                                             ০২-০৭-১২
 

আমাদের  সংযোজনঃ
    আমার মামারা তিন ভাই, সবচে’ ছোট আমার মা। গোপিকা রঞ্জন আমার বড় মামা। এর পর থেকে মামা বলেই উল্লেখ করব। সম্ভবত তাঁদের দেশ ছাড়বার বছরে আমার মায়ের বয়েস তিন ছিল। যদিও কোনো একক সাক্ষাৎকার বা স্মৃতিকথা কোনো পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না তবু বেশ কিছু আগ্রহব্যঞ্জক তথ্য এখানে পাওয়া যাচ্ছে। যে হাঙ্গামা শুরু হয়েছিল প্রায় তিনমাস আগে ডিসেম্বর ১৯৪৯ থেকে তার সম্পর্কে তিনি কিছুই প্রায় জানতেন না কোলাউড়া স্টেশনে আসবার আগে অব্দি। মুসলমান যাত্রীদের করিমগঞ্জ যেতে মানা করা হচ্ছে শুনে কোন ভয় শংকারও কারণ দেখেন নি। সম্পন্ন গৃহস্থ মানে ধনী কৃষকের ঘরের সন্তান তিনি, করিমগঞ্জে আগে থেকেই আছে পৈত্রিক ব্যবসা। বাবা ওখানেই আছেন। যেতে আসতে কোনো সীমান্ত চৌকি ছিল বা ভিসা পাসপোর্ট দিতে হতো এমন সংবাদ নেই। যিনি ঘোষণা করছেন তাকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করছেন কারণ। পরে যার থেকে জানলেন তিনি কলেজে পড়া ছাত্র মাত্র নয়। দেশের খবরাখবর রাখেন এবং খবরের ভেতরের খবর রাখবার যোগ্যতাও রাখেন। রাষ্ট্র নিজে এটা সংগঠিত করছে এটা বোঝেন এবং বোঝাতে পারেন। তিনি মুসলমান। কিন্তু বক্তা এবং স্রোতার পরস্পরের মধ্যে নিজেদের পরিচিতি নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। নেই সংশয়। অথচ সেদিনই সামান্য দূরে ভৈরব সেতুতে কয়েক শত হিন্দু যাত্রীদের উপর আক্রমণ নেমেছে। তিনি তাদেরকেও বাড়ি ফিরে যাবার পরামর্শ দেন। আত্মীয় বাড়ি যাবার পথেও আক্রান্ত হলেন, গিয়েও জানলেন আশেপাশের বাজারে সেদিন হামলা হয়ে গেছে তারপরেও পরদিন সকালে মুসলমান সঙ্গীকে নিয়ে ছনখাইড় পথ ধরতে অসুবিধে হয় নি। ছনখাইড়ে গিয়ে শুনলেন সেখানেও আগুন জ্বলেছে। মেয়েরা জঙ্গলে গিয়ে প্রাণ বাঁছিয়েছে। সেখান থেকেও বাড়ি যাবার নিরাপত্তা পাওয়া গেল আরেক মুসলমান সঙ্গীর থেকে। রাষ্ট্র কী আচরণ করত এসব তাঁর শোনা কথার থেকে কিছু জানা যাচ্ছে। এসব হামলা থেকে বাঁচাবার কোন উদ্যোগই ছিল না। বরং পুলিশে নালিশ করলে গালিগালাজ শুনতে হতো হিন্দুদের। তাদের প্রত্যক্ষ বাজে অভিজ্ঞতাটি এই যে যখন একেবারে চলে আসছিলেন তখন সুতারকান্দি সীমান্তে তাঁর মায়ের সোনা গহনা ‘তাহারা’ রাখিয়া দেয়। আমরা অনুমান করতে পারি ওদিককার সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর কথা বলা হচ্ছে। একেবারে নিরাশ্রয় তারা হলেন না কিন্তু । এ যেন  ওবাড়ি থেকে এবাড়ি চলে আসা। ওবাড়িতে শুধু আর যাবেন না। করিমগঞ্জে ব্যবসা না থাকলে চলে আসতেন কি? জানি না।   সবটাইতো আর নিরাপত্তাহীনতার গল্প নয়। সেই মুসলমান কলেজ পড়ুয়া ছাত্রটি থেকে শুরু করে বাড়ির পথের মুসলমান সঙ্গীদের আশ্বাস বলে এক বাস্তবতাও ছিল তো? সম্ভবত সেগুলো অনেককে আটকেও রেখেছিল।যেমন তাঁর মামাদের।তাঁরা কিন্তু চলে আসেন নি।
             আমি আমার পরিবারের কথা কিছু জানি। আমার বাবা সে অর্থে কোনকালেই বাংলাদেশ থেকে চলে আসেন নি। ১৯৬৪ নাগাদ নাগাল্যাণ্ড সরকারের চাকরি নিয়ে তুয়েনসাং জেলার সামাতুরে চলে যান। সেখানে থাকতেই দেশের বাড়িতে তাঁর বাবা মারা গেলে দূরত্বের জন্যে তিনি আসতে পারেন নি। পরের বছর এসছিলেন। পরের বছর যখন করিমগঞ্জে গিয়ে বিয়ে করেন তখনো দেশের বাড়ি হাত ছাড়া হয় নি। কিন্তু সেখানে গেছেন বলে শুনিনি। কারণ ওখানে মহিলা বলে কেউ নেই। তাঁর মা গত হয়েছিলেন বাবার আগেই। ততদিনে তাঁর বড় তিন বোনেদেরও বিয়ে হয়ে গেছে এবং তাদের পরিবার এসে গেছেন অসমে। ছোট দুই ভাই ছিলেন ,তারাও জীবিকার সন্ধানে শিলচরে এবং গুয়াহাটিতে তখন। বাড়িটি আছেই। সেই বাড়ি নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখান নি বাবা—এই অভিমান পরে অনেক শুনেছি মেজো কাকার কাছে। ১৯৫২ থেকে পাসপোর্ট ব্যবস্থা চালু হলেও মনে হয় না খুব কড়াকড়ি ছিল। আমাদের পরিবারের কারো কোন পাসপোর্ট ছিল না। তার দরকার আছে বলেও মনে হয় না কেউ ভাবতেন। শুধু ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই সমস্ত যোগাযোগ তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল সে দেশের সঙ্গে। এই তাদের দেশভাগ।
    
কী  হয়েছিল  তবে  ১৯৫০ এ ঃ
    দেশভাগের তিন বছর পর এই হাঙ্গামা কেন? মুসলমানের দেশে হিন্দুকে মারা হবে--- এ আর বিচিত্র কী কথা! –এভাবে কেউ কেউ ভাবতে পারেন। কিন্তু এ আসলে অতিসরলী করণ হয়ে যাবে। আসলে এটি ছিল ১৯৭১এর মুক্তি যুদ্ধের গর্ভযন্ত্রণা।দু’বছর পরেই কিন্তু ১৯৫২র ভাষা আন্দোলন এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি। এটা আমাদের বোঝা ভালো। ১৯৪৯এর ডিসেম্বরে কমিউনিষ্ট দমনের অভিযান দিয়ে শুরু হয়েছিল ঘটনাক্রমের। খুলনা জেলার বাগেরহাট মহকুমাতে কালশিরা গ্রামে কমিউনিষ্ট সন্দেহে পুলিশ ধরতে যায় জয়দেব ব্রহ্মকে। তাঁকে না পেয়ে তাঁর স্ত্রীকে ধর্ষণ করবার চেষ্টা করে। তিনি চেঁচালে প্রতিবেশি লোকেরা এসে মেরে পুলিশ তাড়িয়ে দেয়। একজন পুলিশ মারাও গেছিল। তারই প্রতিশোধ নিয়ে পরদিন জেলার পুলিশ সুপার সশস্ত্র পুলিশ এবং আনসার বাহিনী  ( ভারতের হোমগার্ডের মতো অনেকটা) নিয়ে এসে কালশিরা এবং পাশের হিন্দু গ্রামগুলোতে আক্রমণ নামান। সাধারণ মুসলমান গুণ্ডাদের উস্কে রেখেছিলেন লুটপাট এবং ঘরে আগুন দিতে। সেই শুরু। সেই মাসেই প্রায় হাজার ত্রিশেক লোক খুলনা ছেড়ে ভারতে চলে আসেন। জানুয়ারিতে পুলিশ একই রকম তেভাগা আন্দোলনের ঘাটি রাজশাহী জেলার নাচোলে  সাওঁতালদের উপর আক্রমণ নামায়। বিখ্যাত নেত্রী ইলা মিত্রকে তখনই পুলিশ থানাতে নিয়ে গিয়ে অমানবিক অত্যাচার এবং ধর্ষণ করে। ইলা মিত্র চিকিৎসার জন্যে এবং মামলা এড়াতে ১৯৫৪এর জুনে  কলকাতা  চলে এসে থেকে গেলেও অত্যাচারিত  সাঁওতালরা চলে এসছিলেন পাকাপাকি  সেরকম খবর নেই। হয়। ১০ ফেব্রুয়ারিতে প্রাদশিক বিধান সভাতে কংগ্রেস সদস্যরা কালশিরা এবং নাচোলের ঘটনা নিয়ে আলোচনার দাবি জানালে অধ্যক্ষ অনুমতি দেননি। প্রতিবাদে কংগ্রেস সদস্যরা বেরিয়ে আসেন। সেদিনই ঢাকাতে আক্রমণ নামে।  বিমান বন্দরে পলায়নরত যাত্রীদেরকে হত্যা করা বরিশাল , ময়মন সিংহ, নোয়াখালিতেও আক্রমণ নামে।  বরিশালে যে আক্রমণ নামে সেটিই বোধকরি ভয়াবহ ছিল। প্রায় ছ’লাখের উপর মানুষ শুধু সেই জেলা থেকেই পালিয়ে ভারতে এসছিলেন। নোয়াখালিতে আক্রান্ত অধিকাংশই ত্রিপুরাতে প্রবেশ করেছিলেন। সব মিলিয়ে দশলাখের বেশি মানুষ সেবারে গোটা দেশ ছেড়ে ভারতে এসছিলেন।
            আমার মামা যে ভৈরব সেতুর কথা উল্লেখ করেছেন সেটির সরকারি নাম ছিল এণ্ডারসন ব্রীজ। সেটি কিন্তু সিলেটের  নয় । এখনকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব বাজার জংশনকে যুক্ত করে মেঘনা নদীর উপর  এই সেতু প্রায় এক কিলোমিটার থেকেও বেশি দীর্ঘ।  সিলেট জেলা থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে এর অবস্থান।  অসম বেঙ্গল রেলওয়ে অসমের চাবাগানগুলোর সুবেধের জন্যে  ১৮৯১তে  চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রেল বসিয়ে ক্রমে কোমিল্লা কোলাউড়া হয়ে লামডিং অব্দি টেনে এনেছিল যে লাইন এই সেতু কিন্তু সেই  লাইনে পড়ে না। আখাউড়া থেকে এর একটা শাখা চলে গেছিল ঢাকা ময়মনসিংহকেও যুক্ত করে। সেই লাইনেই ১৯৩৭এ ঐ সেতু তৈরি হয়। উদ্বোধনের তারিখটি এখন বেশ আগ্রহোদ্দীপক মনে হবে। ৬ ডিসেম্বর। সুতরাং ঠিক ঐ রেলই রক্তধোয়া হয়ে করিমগঞ্জ পৌঁছেছিল কিনা নিশ্চিত জানি না।  সম্ভবত ঢাকা থেকে আখাউড়া হয়ে আসছিল সেই ট্রেন। এখনো ঢাকা সিলেটের রেলপথ এটাই। 
              যাইহোক, সিলেটে তখন দু’শোর উপর গ্রাম আক্রান্ত হয়েছিল। ৫০০র উপর ছোটবড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। মণিপুরিরাও ব্যাপক আক্রমণের স্বীকার হয়েছিলেন। এই মণিপুরি বা সাঁওতাল বা গারো বা হাজং যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন তাঁরা কেউ কেউ যদিও বা সাময়িক ভাবে সীমান্তের এপারে এসছিলেন পাকাপাকি থেকে গেছিলেন এমন সংবাদ কিন্তু নেই। আর থাকলেও শরণার্থী সংক্রান্ত রাজনৈতিক বয়ানে কিন্তু তারা ভারতে একেবারেই অনুপস্থিত।
             সুতরাং যতটা বলা হয় যে মুসলমানরা ক্ষেপে গিয়ে হিন্দুদের দেশছাড়া করিয়েছিল—এগুলো এতো সরল বাক্য নয়। মুসলমানরা বাঁচিয়েও ছিল, প্রতিরোধও করেছিল। তার প্রথম কারণতো অবহমান সামাজিক ঐক্য। যেমন আমার মামাদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। এর রাজনৈতিক কারণও ছিল। সেও অনেকগুলো। ৮ অক্টোবর ১৯৫০এ আইন এবং শ্রমমন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল তাঁর পদত্যাগ পত্রে১ বাঙালি এবং অবাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিরোধ , নিজামুদ্দিন এবং শোহরাবর্দী গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ, ইন্দো-পাক বাণিজ্যিক সম্পর্কের জটিলতার থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেওয়া এবং দুই বাংলা এক করার লড়াই প্রবল হয়ে উঠার আশঙ্কা ইত্যাদির থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে এই হাঙ্গামা বলে উল্লেখ করেছেন। এগুলো হয়তো সব ঠিকই। কিন্তু এরমধ্যেই ইতিমধ্যে যে এক বাঙালি জাতীয়তাবাদ দানা বাঁধছিল তার ইঙ্গিত আছে। আর তেভাগা আন্দোলনের ভয়তো ছিলই। যার বৌদ্ধিক নেতৃত্ব অবশ্যই ইলা মিত্রের,রণেন মিত্রের মতো বাঙালি বর্ণহিন্দুদের হাতে ছিল। যে লড়াইতে অচিরেই মুসলমানরা যোগ দিতে পারতেন বৃহৎ সংখ্যাতে,আর দিয়েওছিলেন অনেকে। কেননা “বাঙ্গালী মুসলনমান সে সময়ে দেশের সম্পদের মাত্র ৩ শতাংশের অধিকারী ছিলেন, যখন স্টেট টেন্যান্সি এক্ট ১৯৫১ জারি করা হয় তখনও দেশের ১৫ শতাংশ সম্পদ ও ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রন করতে উচ্চবর্ণের হিন্দু ও মারোয়ারী সম্প্রদায় ।”২  বস্তুত ব্যাপক মুসলমান কৃষক জনতার সঙ্গে বর্ণহিন্দু জমিদার, জোতদার ,ধনীকৃষকদের সংঘাত কাজে লাগিয়ে মুসলমান জনতাকে নমসূদ্র সহ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া হিন্দু জনগোষ্টীর বিরুদ্ধেও লেলিয়ে দিতে চাইছিল। যে জনগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মুসলমানের দ্বন্দ্ব ছিল অবৈরি। তাই যোগেন মণ্ডলের মতো নেতা পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সেই দ্বন্দ্বকে বৈরি দ্বন্দ্বে পরিণত করে ফেলতে চেয়েছিল এবং অনেকটাই পেরেছিল পাকিস্তান নামের নয়াউপনিবেশের  শাসক শ্রেণি। যার গাঁটছড়া তখনো বাঁধা ছিল ব্রিটিশের সঙ্গে, এবং মুখিয়ে ছিল আমেরিকা সহ অন্যান্য পশ্চিমী দেশগুলোর দিকে, যেমন ছিল ভারতীয় শাসকদেরও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রায্যবাদ তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশেই সামন্তশেণী এবং দেশীয় পুঁজিপতিদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে শাসন চালিয়ে যেতে সমর্থ হয় ,কিন্তু পরোক্ষে। পুঁজিবাদী উৎপাদনের সমস্ত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে, সেই সঙ্গে বহাল রাখে উদ্বৃত্ত আহরণের সমস্ত অর্থনীতি বহির্ভূত উপায়সমূহ। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণও সেই স্বার্থেই দরকার পড়ে। পাকিস্তানের কাছে এই উপায়গুলোর একটি ছিল ঊর্দু জাতীয়তাবাদ। এমনিতে ভারত থেকে আলগা হবার পরেই ভারতীয় বর্ণহিন্দুদের সঙ্গে যে বিবাদ তার কার্যকারিতা ফুরিয়ে যাবার কথা ছিল। জিন্না তাই একবার পাকিস্তানে ধর্ম-জাতির নির্বিশেষে কোন বৈষম্য রাখা হবে না বলে ঘোষণা করেন। হয়তো তিনি তা মনের একদিক থেকে চেয়েওছিলেন। কিন্তু অচিরেই তিনি উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র স্বীকৃত ভাষা বলে ঘোষণা দিয়ে বসেন।স্বাধীনতার বছরেই পরের মার্চ মাসে তিনি ঢাকাতে এসে এই ঘোষণা দেন। তার আগের মাসেই পাকিস্তান সংসদে কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান সংসদে দাবি তুলেছিলেন ইংরেজি উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সেখানে সেটি নাকচ হয়ে গেলেও ঢাকাতে ছাত্ররা পথে নামে। অনেকের সঙ্গে গ্রেপ্তার বরণ করেন নবীন ছাত্র নেতা শেখ মুজিবর রহমান। যিনি পরে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেবেন। সে বছরের জুন মাসে তিনি মৌলানা ভাসানীর সঙ্গে মিলে গড় তোলেন আওয়ামী লীগ। দুই পাকিস্তানের সবচে’বড় জনগোষ্ঠী ছিল তখন বাঙালিরা।  সুতরাং তারা না আলাদা হয়ে যায়, অখণ্ড বাংলার স্বপ্নকে সাকার করবার জন্যে মাঠে নামে এমন এক ভয় জিন্না এবং পরবর্তী শাসকদের কুরে কুরে খাচ্ছিল। সেই সঙ্গে শুধু নাচোল বা তেভাগাই নয় চীন বিপ্লবের ভূতও তাড়া করে ফিরছিল দ্বিখণ্ডিত ভারতের শাসকদের। এগুলো আটকাতে গেলে হিন্দু আর মুসলমানে বিরোধটা চাগিয়ে দিতে হয়। তবে পশ্চিম বাংলাতেও আর কেউ অখণ্ডবাংলার স্বপ্ন দেখার সাহস করে না। ইতিমধ্যে দু’টুকরো সিলেট নিয়ে হয়তো তিনি ভাবেন নি। হয়তো ভেবেছিলেন সিলেটের স্থানীয় পাকিস্তানপন্থীরা, যারা বর্ণহিন্দু আধিপত্যের থেকে মুক্তি চাইছিলেন আর সিলেটি হিন্দুরা তখনো দেশ ছাড়ার নাম নিচ্ছিলেন না। এতোসব কথা আমার মামারা জানতেন না। তাই যেদিন ভৈরবের পুলে গণহত্যা হয় সেদিনও তারা বেরিয়েছিলেন করিমগঞ্জ আসবেন বলে, সেখানে তাদের পৈত্রিক ব্যবসা আছে আগে থেকেই। আর যে ব্যক্তি মুসলমানদের করিমগঞ্জ যেতে মানা করছিল তাঁকে গিয়ে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞেস করতে পেরেছিলেন, কারণটা কী?

তথ্যসূত্রঃ

১) আইন এবং শ্রমমন্ত্রীর যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের পদত্যাগ পত্র;মুক্তমনা ইয়াহুগ্রুপ.
২)বাংলা বিভাজন ভবিষ্যত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের সূচনা করেছিলো হয়তো- ০৩/রাসেল পারভেজ;আমারব্লগ ডট কম.
গ্রন্থসূত্রঃ
১) দেশভাগ –স্মৃতি আর স্তব্ধতা; সম্পাদনা সেমন্তী ঘোষ;গাঙচিল; কলকাতা৭০০১১১।
২)বাংলায় মুসলমানের আটশ বছর;জাহিরুল হাসান;পূর্বা;কলকাতা-৯।

Saturday, 13 October 2012

উপন্যাস ‘কমলিনী উপাখ্যান’: একটি সহজ পাঠ

“এই মেয়েটিরে লইয়া তাহার ভিতরে ময়ূরপঙ্খের তুল্য আকাশ; বৃষ্টির বিন্দুমাত্র চিহ্ন নাই, অথচ কান্দিতে আছে—যা এই হাৎকা হইয়া উঠা নাগরেরা চোখের নাগালে পায় না। তাই মস্করা ইত্যাদি, মণ্টু ঘোষের দোকানে, বিপ্রকে স্পর্শে না। গ্যাঁজাইবার বিষয় অভাব হইলে , যদিও ইয়েনান বক্তৃতা হইতে লোডশেডিং পর্যন্ত হাজার বিষয়, তবু মেয়েটির বৃত্তান্ত একা ঘুরিয়া বেড়ায়। এবং গ্যাঁজাইবার আবেগ ক্ষীণ হইলে, বিপ্র ভূমিকাহীন প্রস্থান করে। ঘোষের দোকানে ইহা নিত্য ঘটনা, বিশদে বলিবার কিছু নাই। যদিও পরবর্তী ঘটনা সকলের গোচরে ঘটেনা, উহা কমলিনীর পাঠক্রম।”—এভাবেই শুরু হয়েছে পল্লব ভট্টাচার্যের উপন্যাস ‘কমলিনী উপাখ্যান’ । উপন্যাসটি কমলিনীর পাঠক্রমই বটে। আশির দশকের মাঝামাঝি ১৯৮৫-৮৬তে পল্লব যখন সদ্য কৈশরোত্তীর্ণ তরুণ, তখন লেখা এই উপন্যাস ছেপে বেরিয়েছে এই সেদিন ফেব্রুয়ারি, ২০১২তে। বের করেছেন ত্রিপুরার বিখ্যাত প্রকাশক ‘অক্ষর’। কিছু কিছু লেখা আছে লোককথার সেই কচ্ছপের মতো এগিয়ে গিয়ে পাঠকের দরবারে পৌঁছোয়। আর আমাদের পূর্বোত্তরের কোনো প্রকাশনা হলেতো আর কথাই নেই।সবারই প্রায় ভাগ্য সেই একই। পল্লবের উপন্যাসটি তাই। খুব পরিচিত নয়, কিন্তু আমি নিশ্চিত যারা পড়ে ফেলেছেন একবার কমলিনীর প্রেমে পড়ে গেছেন, নিশ্চিত। কমলিনীর তাঁর ভাবনাকে গ্রাস করবে, এবং ‘বৃত্তান্ত একা’ ঘুরে বেড়াবে। আমাদেরও তাই হয়েছে। কেন, বলছি।
                  তার আগে জানিয়ে দিই, পল্লব ত্রিপুরা নিবাসী। পূর্বোত্তরের বাংলা কথা এবং কবিতা সাহিত্যে তিন দশক ধরে এক পরিচিত এবং সম্মানিত নাম। যারা সাহিত্য পাঠ করেন নিত্য, তাঁরা পল্লবের লেখা না পড়ে ফেলে রাখেন না। নিত্য পাঠ যাদের অভ্যাসে নেই তাঁরা হয়তো তাঁর নাম জানেন না তেমন, কেননা পল্লব প্রচার যেদিকে-- হাঁটেন তাঁর উল্টো পথে। যে পথে কমলিনী হাঁটে । একা নিঃসঙ্গ।
                  কী নিয়ে লিখেছেন উপন্যাস? ওই যে লিখেছেন ‘উহা কমলিনীর পাঠক্রম।” এইটেই উপন্যাসের বিষয় বটে।কমলিনীর পাঠক্রম। ‘...তবু মেয়েটির বৃত্তান্ত একা ঘুরিয়া বেড়ায়।’ সেই বিপ্র আর কমলিনীর প্রেমের কথাতে কথাতে আসছি পরে। কিন্তু এ মন্টু ঘোষের চায়ের দোকানে বসে যে আড্ডা, সেই আড্ডার কাহিনিও বটে। আড্ডার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা, আড্ডার থেকে বেরিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জীবন বৃত্তান্ত। পড়তে পড়তে মনে হয় যেন, এই জীবন এক বৃহৎ আড্ডাশালা। আমাদের কোন অসুবিধে নেই যদি পাঠকের মনে পড়ে যায় সেই বিখ্যাত শব্দটি , ‘মধুশালা।’ হরিবংশরাই বচ্চনের সেই বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থটির নাম। সেই আড্ডাতে ‘গ্যাঁজাইবার আবেগ ক্ষীণ হইলে’ বিপ্রের মতো কেউ কেউ কমলিনীর সন্ধানে ‘ভূমিকাহীন প্রস্থান করে’ মাত্র। উপন্যসের শেষে বাসে চড়ে বিপ্র সেই বৃহৎ আড্ডাশালা থেকে তাই করে।
                এবারে, আড্ডার কাহিনি লেখক লিখবেন কী করে? আড্ডার কি আর কোনো পুনরুপস্থাপন সম্ভব? সেতো এক মহা বিশৃঙ্খল ব্যাপার। আড্ডাতে বসে আমরা করি বটে গল্প। কিন্তু সে গল্পের কি আর কোনো শুরু আছে, না শেষ? দ্বিতীয় ব্যক্তিটি এসে কথা বলতে শুরু করলেই শুরু, এবং শেষ ব্যক্তিটি উঠে গেলেই শেষ। মাঝের খেই কে কবে ধরতে পেরেছে? সেখানেতো কথা হয় ‘ইয়েনান বক্তৃতা হইতে লোডশেডিং পর্যন্ত হাজার বিষয়’ নিয়ে। সেই অসাধ্য সাধনের এক পরীক্ষা করেছিলেন সদ্য কৈশরোত্তীর্ণ তরুণ লেখক। এবং আমাদের অভিমত তিনি আশ্চর্যরকম সফল হয়েছিলেন।আড্ডার সমস্ত রং রূপ এনে এই উপন্যাসে তিনি হাজির হয়েছেন। এমনকি তার ভাষাটিও। তাই কিছু কিছু পাঠকের মনে হবে বড় বিশৃঙ্খল বয়ন এর। সে অর্থে কোনো কাহিনি নেই। চরিত্রগুলো গল্পের টানে গড়ে উঠেনা, লেখকের সৃজনী ইচ্ছার টানে গড়ে উঠা চরিত্রগুলো যখন খুশি তখন এসে হাজির হয় এসে । লেখকও যদি আড্ডা দিতেন পাঠকের সঙ্গে তবে তিনি যে বিশৃঙ্খলার সূত্র মেনে চলতেন, পল্লব তাই করেছেন। ফলে যে পাঠক আড্ডার মেজাজে না বসবেন , তিনি বইটা হাতে নিয়েও মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিতে পারেন। তাই বলে, সত্যিই কিন্তু বিশৃঙ্খল নয় এই উপন্যাস। এমনটা হয় না, যদি লেখক পাকা হন। কেউ কেউ আজকাল কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে বলেন বটে, জীবন বড় বিশৃঙ্খল, সুতরাং সাহিত্যও হবে সেরকমই। কিন্তু সে হচ্ছে অর্ধবিজ্ঞান এবং অর্ধ সাহিত্য তত্ত্ব। বিশৃঙ্খলার যে তত্ত্বটি রয়েছে বিজ্ঞানে, ইংরেজিতে যাকে বলা হচ্ছে ‘কেওস থিয়োরি’, সে কিন্তু শেষ অব্দি এক শৃঙ্খলার কথাতে এসেই শেষ হয়, না হওয়া অব্দি তৃপ্ত হয় না। পল্লবের উপন্যাসটিরও রয়েছে সেরকম শৃঙ্খলা। তাঁর এক চরিত্র অশেষ গুপ্ত এক জায়গাতে বলছিলেন, “ তত্ত্বের সৌন্দর্য বড়ো কথা নয়। পরীক্ষার সঙ্গে না মিলিলে সেটা ভুল তত্ত্ব।” আমরা জানিনা, পল্লব সেরকম কিছু তত্ব্ব নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন কিনা, কিন্তু তার উপন্যাস ‘বিশৃঙ্খলা’র তত্ত্বকে সত্য প্রমাণিত করে যেন। বস্তুত তাঁর উপন্যাসটি জীবনের সেই শৃঙ্খলারই সন্ধানের গল্প। কমলিনী সেই শৃঙ্খলারই নাম। আমরা কমলিনীর কথাতে আসব পরে। সেটি থাক শেষ পাতে আকর্ষণের মতো। আপাতত আড্ডার মানুষগুলোকে চেনা যাক। আড্ডা বলেই কথা। একে ধরতে গেলে আমাদেরকেও পল্লবের পথেই বুঝিবা হাঁটতে হবে, বহু কথা ধরা দেবে, বহু কথা নয়।
             কারা আসেন মন্টু ঘোষের দোকানে? বিপ্র আসে সেতো জানাই গেল। আসে যুধিষ্ঠির, হিমাদ্রি, শ্যামল, পার্থ, সৌরীন আরো অনেকে। অবনীমোহন যেমন বিপ্রের বাবা, লাবণ্য মা--তেমনি নানা চরিত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যাদের দেখা মন্টু ঘোষের দোকানে পাওয়া যাবে না। কিন্তু উপন্যাসে রয়েছেন। যেমন, প্রসন্ন চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী দীপালি, উপপত্নী মীনারানি, অখিল, বিনয় মন্ডল, অশেষ গুপ্ত, রঞ্জন, জবা, নুনু, গরিবা, নিরাপদ, প্রতিমা, আব্বাস আলি ইত্যাদি। এরা কোথাকার লোক, কোন শহর কিম্বা প্রদেশের কোনো তথ্য নেই। কিন্তু অধিকাংশ চরিত্র পাহাড় ঘেরা সমতলের এক আধাশহরের বাসিন্দা বলে মেনে নিতে কোনো অসুবিধে নেই। তার উপর, ভাষাতে ওমন পূর্বোত্তরীয় প্রচুর নাম-ক্রিয়াপদের অনুপ্রবেশ দিয়েও লেখক নিজেই ইঙ্গিতটি দিয়ে রেখেছেন যে এটি আসলে ত্রিপুরারই গল্প।
              “মণ্টু ঘোষের দোকানের যা হাল, তাহাতে কীই বা বেচিবার থাকে। আর এই দোকানে যাহারা কিনিতে আসে তাহাদেরও যে হালৎ, তাহাতে কেনাবেচা দুটোই হাস্যকর চেষ্টা। যুধিষ্ঠির তাই বলে, ঘোষের দোকানে তো কাস্টমার নাই, সব কাস্টকুমার” এই হলো সেই দোকান যেখানে আড্ডাটি বসে। বিপ্র এই আড্ডার পার্শিক চরিত্র, কিন্তু উপন্যাসের কেন্দ্রীয়। সে অবনীমোহন লাবণ্যের চতুর্থ সন্তান। তাঁর বড় ভাই ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করে। বাড়িতে থাকা না থাকার সময় অসময় নেই। মেজো ভাই দূরে কোথাও থেকে ব্যক্তিগত কোম্পানিতে কাজ করে। ব্যস্ততা এতোই যে অবনীমোহনের মৃত্যুতেও বাড়ি আসার ছুটি পায় নি। আর সেজোটি অনেক কিছুই করে, কী –সেটি কেউ জানে না, মা লাবণ্যও না। তবে টাকা বানাচ্ছে এটা বোঝা যায়। কিন্তু বিপ্র বৈষয়িক অর্থে কিছু করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার ছাত্র ছিল এখন চিন দেশের লংমার্চের কাহিনি পড়ে। আর কমলিনীর সন্ধান করে। বিপ্র কী করে খাবে, ভেবে মায়ের চোখের জল ঝরে। বাবা অবনীমোহন কিছু একটা চাকরি করতেন, তিরিশ বছর চাকরি করে লোয়ার থেকে আপার ডিভিশনে উঠেছিলেন। কিন্তু শ্বাস ফেলে টের পেলেও বেঁচে যে ছিলেন সেটি টের পেতেন না। বিড়িতে তেতো টান দিতেন, মানে খুব একটা স্বচ্ছল জীবন ছিল না। তাঁর শেষ জীবনে বেকার বিপ্র যখন ভাতের গ্রাস মুখে তুলত মনে হতো বাবার হাড় চিবুচ্ছে। নিজেকে মানুষ ভাবতে ঘেন্না করত। লেনিনের ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে কী করিতে হইবে?’ পড়তে পড়তে বিপ্রের মনে হয়, কোথায় পৌঁছুবেন না জেনেও বাবা কিন্তু বেঁচে থাকতে চান। না চাইলেই কি আর অনর্থক মরে যাওয়াটাও উচিত? এর মধ্যে কি আছে কোনো বীরত্ব? এই সব প্রশ্ন তাকে কিম্বা লেখকে তাড়া করে। ওদিকে গোপন বিপ্লবী দলের কর্মী কবি অশেষ গুপ্তের লাস যখন পথের পাশে পড়ে থাকতে পাওয়া গেল, তখন তাঁর প্রতি সমস্ত শ্রদ্ধা নিয়েও কৃষ্ণসুন্দরের মনে হয়, এও এক অর্থহীন অপরিপক্ক মৃত্যু। দেশের জন্যেও মরবার সঠিক মুহূর্ত সেটি ছিল না। তবে কিনা বিপ্রের এই জিজ্ঞাসা উত্তরাধীকার সূত্রেই পাওয়া। কোন এক মুহূর্তে অবনীমোহনের মনেও প্রশ্ন জাগে, ‘মায়া যাহাকে জড়ায় সে অবনীমোহন হয়। অবনীমোহন হইয়া কী পাওয়া গেল?’ তাঁর আক্ষেপ, ‘...ফুরাইবার আগে একবার দপ করিয়া জ্বলাও হইল না।’। সেই জ্বলার আশাপ্রদীপ, তিনি বিপ্রের মধ্যে জ্বলে উঠবে বলে মনে করেন। বিহারি গরিবা গাঁজাও বিক্রি করে। তার সঙ্গে বিপ্রকে দেখে তাঁর সন্দেহ হচ্ছিল, তিনি যে তাকে স্বপ্নের সফরি ভেবে নিশ্চিন্ত থাকতে চাইছিলেন, সে চাওয়া কি ভুল ছিল? এ তাঁর সন্দেহ ছিল মাত্র। বিপ্র বস্তিবাসীদের জীবনের আঁচ নিতে গিয়ে গাঁজাতে টান দিয়েছিল বটে, হাত জোড় করে গরিবাই মানা করেছিল। যাতে করে নিজেকে তার মনে হয়েছিল, সে গরিবারও সন্তান। সেই গরিবাই পথে পেয়ে তাকে একদিন বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার সংবাদ দিয়েছিল।
                কৃষ্ণসুন্দর বয়সে প্রবীণ। খুব যে বয়স তা নয়, ছেচল্লিশ। এই বয়সেই যেন মনে বুড়িয়ে গেছেন। শ্মশানে দাঁড়িয়ে অবনীমোহনের শরীরে পুড়ে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল, ‘কত কিছু হইতে চাওয়া আর না পারা একটি শরীর ধোঁয়াতে মিশিয়া যাইতেছে...পুড়িয়া যাইতে আছে। মনে মনে তিনিও পুড়িতেছেন।’ বিপ্রের ভাবগুরু কি অনেকটা? না হলেও পরিপুরক। মানে তাঁর জিজ্ঞাসা যেখানে থৈ পাচ্ছে না, সেখান থেকেই বিপ্রের শুরু। মন্টু ঘোষের দোকানের ধুলিকালির বেড়াতে বহুদিন ধরে ঝুলন্ত উড়ন্ত এরোপ্লেনের ছবি ওয়ালা ক্যালেণ্ডারের দিকে তাঁকালে তাঁর বিষন্নতা বাড়ে। গতির এমন স্থির চিত্র এ জীবনে আঁকা হবে না ভেবে, পাক ধরা চুলে হাত বুলিয়ে তিনি আন্মনে বলে উঠেন, “যৌবন যায়...” । ছেলেবেলা কিচ্ছু না বোঝে ‘ভুলো মৎ, ভুলো মৎ’ স্লোগানে গলা মিলিয়ে জেঠার হাতে মার খেয়েছিলেন। বোধকরি, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’ স্লোগানের দিকে লেখকের ইঙ্গিত। রাতে বিধবা মা তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, ‘সত্য কথা কহিতে নাই।’ ছোটবেলার স্বাধীনতা মানেই রিফিউজি কলোনির স্কুলে চকলেটের দিন। বন্দেমাতরম বলে চিৎকার করবার দিন। স্বাধীনতার মানে বুঝবার দিন নয়। বোঝেনও নি । জেঠার গলগ্রহ হয়ে বড় হয়েছেন। বড়বেলাতে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়া দেখেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার যে মানে তিনি বোঝেছেন, তা দেখেন নি কোথাও। কলকাতাতে (নামটি নেই, মহাকরণের উল্লেখ থেকে আমাদের অনুমান) কলেজ পড়া কৃষ্ণসুন্দরের জীবন থেকে একে একে চলে গেছে বন্ধুরা, উৎপল, ত্রিদিব, খুকু, শুভেন্দু...। কেমিস্ট্রির ছাত্র ত্রিদিব সত্তরের নকশাল আন্দোলনে সময়ের আগে বোমা ফোটাতে গিয়ে ‘ঠুণ্ডা জগন্নাথ।’ বোমা ফুটুক, কিন্তু সমস্ত প্রস্তুতির পর --এই ছিল কৃষ্ণসুন্দরের মনের বাসনা, যা তিনি এখনো মনে মনে লালন করেন। তাই জীবনের সমস্ত শ্লোগান মুছে ফেলে উৎপলের শেক্সপিয়র পড়াতে ফিলাডেলফিয়া চলে যাওয়া, তাঁকে ম্লান করে। খুকু ভালো গান করত, এখন হারমোনিয়ামে , ‘কিচেনের ভারে, গয়নার ধারে’ ধুলো জমেছে বহুদিন। শুভেন্দু করে মানবাধিকার সংগঠন সি আর পি সি। কৃষ্ণসুন্দর কোথায় তারা কেউ জানে না। তাঁর ধারণা, জানে হয়তো জবা। জবাকে নিয়ে রঞ্জনে তাতে এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। এবং জবাকে নিয়ে গেছিল রঞ্জন। সেই রঞ্জন যে তাঁকে প্রথম বুঝিয়েছিলেন, ‘তাড়াহুড়া করে,বাইরে থেকে চাপ দিয়ে কিছু পাল্টানো যায় না...ভেতর থেকে পাল্টানোর জন্যে সময় দিতে হয়। ঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয়।’ বোঝাই যায় এই তর্ক তাঁর যৌবনের মার্ক্সবাদী কম্যুনিষ্ট দলের দুই লাইনের তর্ক। এবং রঞ্জনের পক্ষ কিছুদিন পরেই শাসনে বসেছিল। তার জন্যে কোনো সময়ের অপেক্ষা করে নি। ‘কী এক কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হইয়া সেই রঞ্জন দত্ত, আজকাল তাহার সাদা অ্যাম্বাসেডরের ভিতরে বসিয়া কালো কাচ দিয়া বাহির দেখে।” জি-কে পরীক্ষাতে পাঁচ নম্বর ছেড়ে দিয়ে ছেলে সন্তানটি তার সমস্ত পরিশ্রমে জল ঢেলে দিয়েছে বলে লিপস্টিকে কদাকার ঠোঁট উল্টে জবা এখন দুঃখ করে। এখন সকাল থেকেই তিনি ‘জর্ডনের বিশুদ্ধ জল’ গলায় ঢালেন, এই কৃষ্ণ সুন্দরের নিত্য সঙ্গী। ‘সকল কিছুর পর উহাতেই মুখ দেখিতে হয়।’ অথচ এক কালে ইনি ভালো বাঁশি বাজাতেন। এখন মদ্যপানও তাঁকে উদাস করে। জীবনের নদী এখন মরে গেছে, মাছ দূরেই থাক , কাদাখোঁচাও আসবে না। শুধু ‘ঘুম আসিবে মৃত্যুতুল্য আচ্ছন্নতায়...।’ ভাবতে ভাবতে কান্না পায় তাঁর কখনো...অধ্যাপক বুদ্ধিজীবি প্রশান্ত কুমার দেবের সভাতে বক্তৃতা শুনে পার্থ যখন কাগজের খবর পড়ে বোমা মারবার ইচ্ছেতে উত্তেজিত হয়, তাঁর তখনো মনে হয় নিজেকে পুড়িয়ে আলো হতে চেয়েছিলেন। এখন পড়ে আছে শুধু ছাই আর ধ্বংসস্তূপ। পিকেডি-র বক্তৃতা শুনতে শুনতে তার মনে পড়ে কলেজের দিনগুলোর সেই মূর্তিভাঙার বিপ্লবীআনার রাজনীতির কথা। বাস্তবতার বাইরে যা আজও মনকে লোভায় তেমনি এক অন্যতর মূর্তি যেন আজ আবার তৈরি করছেন পিকেডি আটটি খণ্ড দলিল জুড়ে জুড়ে। পাঠকের বুঝতে অসুবিধে হয় না, চারু মজুমদারের আটটি দলিলের কথা হচ্ছে। সেই বক্তৃতা শুনতে শুনতে তাঁর মনও যে আবার এতোদিন সামান্য উত্তেজিত হচ্ছিল না তা নয়। কিন্তু আবার মনে পড়ে যায় সৌরীণদা এখন পাগলা গারদে। নির্বাক। তিনি যেন সেই ভেজা দিয়াশলাই কাঠি যাতে আর কোনো অগ্নিগুণ থাকে না। ‘পুনরায় যদি রৌদ্র হইতে উষ্ণতাপ সংগ্রহ করা যায়, তবে জ্বলিলেও জ্বলিতে পারে এক আধটা কাঠি।’ সেই কাঠি যেন উপন্যাসের শেষে এসে তিনি খুঁজে পান বিপ্রের মধ্যে। কমলিনীর সন্ধানে বিপ্র যখন বাসে চড়ল, বিদায় জানাতে এসে কৃষ্ণসুন্দরের মনে হচ্ছিল বাসের ভেতরেও আসলে বসে আছে কৃষ্ণসুন্দর।
                 প্রসন্ন চৌধুরী আরেকটি বেশ বড় চরিত্র এই উপন্যাসে। তাঁরই যেন পরোক্ষ কিম্বা প্রত্যক্ষ শাখা প্রশাখা অখিল, রঞ্জন ইত্যাদিরা এবং তাঁর স্ত্রী দীপালি অবশ্যই। তাঁকে না বুঝলে আসলে বিপ্র কৃষ্ণসুন্দরের এহেন হতাশার কিছুই বোঝা হবে না।যদিও ইনি ঘোষের দোকানের আড্ডার কেউ নন।বাংলার শিক্ষিকা স্ত্রী দীপালি আর কলেজের হোস্টেল ছেড়ে আসা মেয়েকে নিয়ে তাঁর ছোট সংসার। পার্টি করতে করতে আর নির্বাচন লড়তে লড়তে , মেয়ে বৌএর দিকে নজর দিতে পারেন নি খুব। তাই মেয়ে যখন হোস্টেল ছেড়ে আসে, পাশে বসিয়েও কারণটি জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেন নি ভালো করে। যৌবনে স্বাধীনতার জন্যে লড়েছিলেন, কিন্তু স্বরাজ আসেনি বোঝেন। জীবনানন্দের কবিতা বুঝতেন, কিন্তু এখনকার জীবনের মানে বোঝেন না। কিন্তু ইনি কৃষ্ণসুন্দর নন। ‘বহুৎ মাছ খাইয়া এখন বিড়াল তপস্বী হইয়া’ আছেন। জীবনের শেষ বেলাতে এসে এঁর ব্যর্থতা বোধ তাঁকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে যেন। মনে হয়, জীবনে সবই হয়ে গেল, যা চেয়েছিলেন তা নয় তেমন, যা চাননি তাই। তিনি কিছু করেন না যেন। নির্বাচনের সময় এলে পার্টি তার নাম নিয়েই ফেলে, তিনিও দাঁড়িয়ে পড়েন। জিতেছিলেন একবারই। তার নামে এক জমিও এসে গেছিল। কোন এক সেটেলমেন্ট বাবুর পেন্সিলের টানে বিনামূল্যেই। নির্বাচনের সময়ে নিজের কিছু নেই দেখাবার জন্যে সমস্ত স্থাবর সম্পত্তিই লিখে দিয়েছিলেন দীপালির নামে। আজ তাঁর সত্যি মনে হচ্ছে, কিচ্ছুটি নেই। তিনি নিঃস্ব। সেখানে তিনি নুনু-যতন-গরিবাদের বসিয়েছিলেন। যতনার মতো অনেকে তাই তাঁকে দেবতা জ্ঞান করে। দীপালির বড় ইচ্ছে এই জমির একটা হিল্লে করা, দালাল নিরাপদকে জুটিয়েছেন। এখন সেখানে এক ফ্যাক্টরি বসবে। প্রসন্নের ইচ্ছে নুনু-গরিবাদের লিখে দিয়ে দেয়া। গণি মিঞা উকিল তাঁর বন্ধু ছিলেন, মারা গেছেন। তিনি থাকলে বুদ্ধি দিতেন। এখন বৌ বলে কিনা, ‘বিনবায় ধরছে, ভূদান করবা? তা চুপে চুপে ক্যান, পত্রিকায় দাও, যাতে খবর হয়।’ জমি বিক্রির জন্যে দীপালি দালাল নিরাপদের সঙ্গে নিরাপদ যোগযোগ গড়ে তোলেন। নুনুদের বস্তিতে বিপ্রের যাতায়াত ছিল। তাদের মধ্যে গিয়ে সে এক তথ্যচিত্র করে, ‘পভার্টিঃ কজ অফ ইণ্টারনেল মাইগ্রেশন’। ব্যয় কোত্থেকে আসবে, বিনয় সেই প্রশ্ন উঠলে শ্যামল, যুধিষ্ঠিরেরা জবাব দেয়, চাঁদা তুলে হবে সেই চিত্র। ‘বস্তি উন্নয়ন কমিটি’ সম্প্রতিই শুধু বানিয়ে রেশন কার্ড পাইয়ে দেবার ব্যবস্থা করেছে সে এবং তার সঙ্গীরা । জমির মালিক প্রসন্ন চৌধুরী , এ কথা জেনে বলেছিল, ‘যারই হোক, জমি ছাড়বে না।’ জমি তাঁকে জমিদার বানিয়েছিল বটে। ইয়ার দোস্ত চ্যালাও ভাল জুটেছিল। তাদেরই কেউ তাঁর কাছে নিয়ে এসছিল সদ্য বিধবা মীনারানিকে । এসছিল কাজ চাইতে, তিনি ঠাই দিলেন খামার বাড়িতে। খামার বাড়িতে ধান তোলা, সেদ্ধ করা ছাড়াও আর যা কাজ তাকে করতে হয়েছিল, তাতে শরীর ছিঁবড়ে হয়ে এসছিল। শেষ কালে প্রসন্নের পায়ে পড়ে মীনারানি ভিক্ষে করেছিল , মরলে যেন তিনি মুখে আগুন টুকু দেন। দেন নি। সকালে যে খবর দিতে এসছিল তার হাতে টাকা কটা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘দায় সারো’। তখনই আসছিল দীপালির সন্তান, মাতৃসদনে। এখন যখন মেয়ের ক্ষোভ বুঝে উঠতে পারেন না, ইচ্ছে জাগে, ‘সব যদি আবার নতুন করে শুরু করা যাইত...বড়ো ভুল হয়ে গেছে , মা...।’ বস্তুত প্রসন্ন চৌধুরীই বোধ করি সেই ব্যক্তি যিনি ‘কমলিনী’র বৃত্তান্তকে অনেক বেশি স্পষ্ট করেন। তিনি শাসক শ্রেণি এবং দলের লোক বটে, ব্যবস্থার ভেতরের লোক। কিন্তু ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক নন। ইচ্ছে করলেই সব পালটে দিতে পারেন না। বিপ্রের মনে একবার প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল, ‘নিজের জীবন কি সত্যই রচনা করিতে পারিতেছে! পারা যায়? পূর্বে রচিত না হইলেও, পারিপার্শ্বিক দ্বারা রচিত হইবার নানাহ সম্ভাবনা লইয়া, জীবন রচিত হইয়া চলিতেছে। ইহাতে হয় স্রোতে ভাসিতে হইবে, নয় প্রতিস্রোতে। প্রায় সকলেই বলে, সে প্রতিস্রোতে ভাসিতেছে, কিন্তু ইহা যে আদতে স্রোত নয়, একথাই বা কে নিশ্চিত বলিবে?’ সেই প্রতিস্রোতের স্রোতকে ভয় করছিল বিপ্র। কিন্তু সেই স্রোতেই গা ভাসিয়ে বিপন্ন প্রসন্ন চৌধুরী আসলে এই উপন্যাসের এক ট্রাজিক চরিত্র। তাঁর প্রতি ঘৃণার উদ্রেক ঘটিয়ে নায়ক খলনায়কের দ্বন্দ্বে জমিয়ে তুলতে যান নি পল্লব এখানেই তাঁর মুন্সিয়ানা। বরং প্রশ্নগুলোকেই আরো ঋদ্ধ করেন। তিনি হতে চেয়েছিলেন এক ‘না-পারা স্বপ্নের সওয়ারি।’ শৈশবে অক্ষম হাতে গোরা সৈন্যের দিকে ঢিল ছুঁড়েছিলেন। মড়কের রোগীর পথ্য কিনতে গিয়ে বাবার পকেট কেটেছিলেন। আখড়াতে লাঠি খেলা, ছুরি খেলা শিখেও বিশ্বাস করতেন ‘চরখা আর খাদিতে আত্মনির্ভর হইবে পচা পানার ম্যালেরিয়া গ্রাম।’ কিন্তু মাঝ বয়সে এসে স্বাধীনতার যে চেহারা দেখলেন এবং নিজেও আঁকলেন তাতে নিজেই অবাক হন। ‘তিনি ভাবিয়াছিলেন স্বাধীন সমাজের সেনা -পুলিশের দরকার হয় না। আজ স্বাধীনতাই সেনা ও পুলিশনির্ভর। হয়তো সেই চাওয়া এক শতাব্দীর কাজ ছিল না, তবু তাহারে মূর্তি বানাইয়া, তাহার ভাবনা সহ দেশকে এমন এক অটোমোবাইলে তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে, যাহার ব্রেক নাই। ছুটিতে আছে এক অনিবার্য ধ্বংসের দিকে।’ ভয় হয়, আজকের ছেলেরাও কি সেই যৌবনের প্রসন্ন হতে গিয়ে বার্ধক্যের প্রসন্ন হয়ে পড়ছে? এখনো ইচ্ছে করে নিজেকে পাল্টাবার , কিন্তু চৌধুরী বংশের আভিজাত্যকে মরতে দিতে মন সায় দেয় না। তাঁর এই দ্বন্দ্বের শরিক নন স্ত্রী দীপালি। তাঁর সমস্যা অন্য। নষ্ট প্রসন্নের সঙ্গিনী ছিলেন আজীবন। নিজেকে এক সময় মনে হতো প্রসন্নের হাতের পুতুল। সেই পুতুল জীবন থেকে বেরিয়ে আসতেই তাঁর প্রয়াসগুলো সবল হয়েছে, যখন প্রসন্ন নিজেও আর পুতুল নাচাবার সামর্থ্য রাখেন না কোনো, চানও না। তাঁর গর্ভে মেয়ে এসছিল জ্যোতির্ময়ের সৌজন্যে। অপঘাতে সে মারা যায় । তার কাটা ছেঁড়া শরীরের ফুলে ওঠা, পচা টুকরোগুলো দিন দুই পরে পাওয়া গেছিল এক পুরোনো কুয়োতে। স্পষ্ট নয়, বোধকরি এর জন্যে প্রসন্নকেই দায়ী করেন দীপালি। ওদিকে মেয়ে একান্তে একদিন মায়ের পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে আবিষ্কার করে মাকে লেখা জ্যোতির্ময়ের চিঠি। সেই থেকে তাকে আর বোঝেন না, প্রসন্ন। শহরের কলেজের হোস্টেল ছেড়ে সে অন্য বাড়িতে গিয়ে উঠে। কোথায়, কেন –কেউ জানে না। ব্যর্থজীবন প্রসন্ন ইচ্ছে করলেই জিজ্ঞেস করতে পারতেন, “এ কী কৌতুক নিত্যনূতন/ ওগো কৌতুকময়ী ,/আমি যাহা কিছু চাহি বলিবারে/ বলিতে দিতেছ কই ।/অন্তরমাঝে বসি অহরহ/মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ ,/মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ/ মিশায়ে আপন সুরে।” জীবনের শেষ বেলাতে এসে মনে হয় এই প্রসন্নই শুধু নুনু-গরীবাদের মধ্যে পেয়েছিলেন কমলিনীর সন্ধান। কিন্তু তখন আর তাঁর করবার বেশি কিছু ছিল না বিশেষ। শুধু উপন্যাসের শেষের দিকে নিরাপদের জবানীতে বিপ্র জানতে পায়, যে মেয়ের সন্ধানে শহরে যাবার আগে চুপিচুপি তিনি জমির সবটাই নুনু-গরিবাদের লিখে দিয়ে গেছেন। বিপ্রও এই প্রথমই মনোযোগ দিয়ে জানতে এবং বুঝতে পারে, জমিটি তাঁর। নিজের বাড়িটি , যে টুকু বোঝা যায়, তাঁকে তুলে দিতেই হয় গোল্ডেন রিসর্ট কনস্ট্রাকশনের হাতে।
               এবারে আমাদের কমলিনীর কথাতে আসতেই হবে। রাধা প্রসঙ্গে শব্দটি অজস্রবার উচ্চারিত হয়েছে বাংলা কবিতায়, গানে। নিধু বাবুর টপ্পাতে আছে, “কমলিনী অধিনী তোমার, শুন অলিরাজ।সদত তোমারে, ভাবি হে অন্তরে, এই মোর কায।” উপন্যাসের শেষের দিকে রয়েছে, বাসে চড়ে বিপ্রের চলে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে কৃষ্ণসুন্দর ভাবছেন, “ যাচ্ছিস, যা। জানি না, সেখানেও পাবি কিনা। তবে মনে রাখিস, কমলিনীর দিকে যাওয়ার চেষ্টাটাই আসল।”
                
লেখাটা বেরিয়েছে শিলচরের মাসিক দিগন্তিকার নভেম্বর, ১২ সংখ্যাতে
   কিন্তু কমলিনী কি কিছু করে না? সেও কি যায় না? উপন্যাসের শুরু হয়েছে কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে। ‘কমলিনী আমার নাম। আমারে দেখিতে সহসা আয়নার দরকার হয় না। যদিও অই ফুলটি, যাহা জাতীয়, আজ অবধি দেখিলাম না। তবু, নিজেরে যখন দেখি অই ফুলটির মনোলোভা টের পাই বিপ্রের চোখে।’ সে মেয়ে মেয়ে নয়, যে কমলিনী বা কমল ফুল দেখেনি। এই কথাটা এখন বলবার সময় এসে গেল। গুরুগম্ভীর শৈল্পীক কুশলতার সঙ্গে লেখক এক রসিকতাপূর্ণ চালাকি করেছেন পাঠকের সঙ্গে। পাঠকের মনে এক বাসনা জাগে বিপ্র-কমলিনীর প্রেম কাহিনি পড়বেন বলে। কথা যত এগোয়, তিনিও সেই ভ্রমের থেকে বেরুতে থাকেন বিপ্রের সঙ্গে সঙ্গে। অথবা বেরোন না। কমলিনী এক ভাবের নাম। অথবা এক মেয়ের নাম। এর সঙ্গে বিপ্রের আলাপ হয় বিনয়ের পাল্লাতে পড়ে। ভাব হলেও তার আবির্ভাব হঠাৎ হতে পারে নাতো। কেউ আলাপ করিয়ে দিতে হবে। লেখক পরিপক্কতার সঙ্গে কথাটি মনে রেখেছেন। বিনয় মন্ডল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিস্কের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় বলতে মনে পড়ল, ত্রিপুরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা কিন্ত ১৯৮৭তে । উপন্যাস লেখা হয়ে উঠবার পরের বছর। তাতে ক্ষতি বৃদ্ধি কিছু হয় নি। বিপ্রের সঙ্গে যেচে এসে ক্যান্টিনে আলাপ। সেই আলাপ সাত মাসের ঘনিষ্ট বন্ধুত্বে পরিণত হলো। এই সাত মাসে, ‘কমলিনী কীরূপে থাকিয়া গেল, গড়িয়া উঠিল। গড়িয়া যে উঠিল, ইহাতে তাহার তেমন ভূমিকা নাই। হয়তো সময়ের জটিলতা। যে জটিলতা লইয়া আজিকাল ঘোষের দোকানেও সে বেমানান।’ বিনয় সপ্রতিভ তরুণ। তার ভেতরে বিপ্রের চোখে ধরা পড়ে যেন যেন এক স্বপ্নের দেশ। চুম্বকের মতো টানে বিপ্র তার অনুগামী হয়ে গেল। মন্টুঘোষের দোকানে একদিন যখন সব্বাই এক জ্যোতিষকে নিয়ে ব্যস্ত হয়েছিল। বিপ্রও খেলার ছলে হাত দেখিয়েছিল, জ্যোতিষ যা বলেছিল, উপন্যাসে সেও অর্থবহ, “আপনার কিছুই পাওয়ার নেই।’ শুনে বিনয় বলছিল, ‘ কিন্তু...বৈষম্য যতদিন থাকবে,...অন্তত হাত চেপেতো আর বসে থাকা যাবে না।” তার টেবিলে তখন গুয়েভারার ডাইরি। বিপ্রের মনে হলো বিনয়ের চোখে লেগে আছে আলো। বিনয়ের সঙ্গে করেই নুনুদের বস্তিতে যায় বিপ্র প্রথম। ‘মিডলক্লাস জীবনের বাইরে যাচ্ছি।’ এই ছিল বিনয়ের উত্তর।
                  এবারে, এই মিডিলক্লাস বাইরের জীবনটি কেমন? ‘গ্রামের বাইরে, বোধ হয় খাসভূমিতে, ঘর নয়, কতগুলা ঝুপড়ি, কোনমতে বান্ধিয়া রাখা, ভাল করিয়া বাতাস আইলে লণ্ডভণ্ড হইয়া যাইবে মনে লয়; এইগুলিতে উহারা থাকে। ভিতরে খাট পালঙ্ক দূরে থাক, একটা কাঁথা কী বিছানাও নাই। দেখিয়া অবধি তাহার মনে হইতেছিল, এমন জীবন আগে দেখে নাই। ঘুমায় কোথায় জিজ্ঞাসা করায়, নুনুর বৌ অবাক চাহিয়া মাটির দিকে আঙুল দেখাইল।’ এই ‘অবাক চাহিয়া’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণসুন্দর একজায়গাতে ভেবেছিলেন, ‘এ-ই ভারতবর্ষ। এইখানে আসিয়া নিজেরে স্ট্রেঞ্জার বলিয়া বোধ হয়।’ বিনয়রা জানেনা তারা মাটিতে শোয় ---এই তথ্যটাই নুনু তেলেঙ্গার বৌএর কাছে অবাক কথা। বিপ্রও ভাবে, এদের সঙ্গে বিনয়ের পরিচয় কী করে! ‘নুনুদের জীবনে ঢুকিয়া যাওয়া কি সম্ভব, বিনয়ের পক্ষেও? ভাবিয়া পায় না।’ কে কবে এই নুনুদের চা-বাগানের শ্রমিক করে এনেছিল নুনু নিজেও জানে না। মালিক বাগান বেচে দিলে থাকার কোন জায়গা নেই বলে নুনুরা এখানে এসে উঠে। আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি, এই জমি খাস হয়ে নেই। এ জমির মালিক প্রসন্ন চৌধুরী। চাষের কাজ জানে না বলে দিনমজুরি করে। যেদিন কাজ জুটে না পাখি শিকার করে পুড়িয়ে খায়। এই বস্তিতে গরিবারাও থাকে । সে তিনপুরুষের প্রাচীন এখানে। উপন্যাসের শুরুতে আছে কিন্তু দিন তিনেক আগেও একটি লোক বিহার থেকে এসছে। জমি ছিল না। ‘জমিদারের খেতিতে বেগার খাটুয়া বাপ, ভুখ মিটাইতে না পারিয়া উহারে ভাগাইয়াছে।’
             বিনয় আর বিপ্রকে খাওয়াবে বলে বড় আনন্দে নুনু ছুটতে ছুটতে দুটো পাখি মেরেছিল তিরে। সেই মাংস বিনয় খায় নি। বিপ্রেরও উদ্গার এসছিল। কিন্তু বিনয়, বুঝতে না দিয়ে যখন বলল, ‘মাংস বাচ্চাদের দাও নুনু। আমি খাব না...’ তখন নুনুর বকলমায় আসলে বিপ্রেরই মনে হয়েছিল, ‘বাবু, যতই চেষ্টা করো, নুনু হইতে পারিবে না। নুনু হওয়া যায় না।’ সেদিন ফিরবার পথে প্রথমে ধুলি ঝড় এবং বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছিল এদের দু’জনকে। কাছেই টিলার উপর শাদা বাড়ি। প্রসন্ন চৌধুরীর বাড়ি এটা বিপ্র বিনয় কেউ জানত না। ‘বৃষ্টিতে ভিজিতে ভিজিতে দেখে , ক্রমশ আকাশ মাঠ শাদা হইয়া যাইতেছে। সমস্ত নীলাভ কালো মুছিয়া, শাদা বাড়িটিও আর স্পষ্ট নয়, জলরঙে ধুইয়া গিয়াছে।’ বিপ্র দেখছিল দাঁড়িয়ে। বিনয় বলল, ‘বৃষ্টি আর থামবে না, চল যাই।’ কিয়ৎক্ষণ পরে বিপ্রের উত্তর, ‘ চল, অই বাড়িতে যাই।‘ ‘কী করবি গিয়ে? কাউকে চিনিস, না কেউ তোকে চেনে?’ বিপ্র তখন নিজেতে মগ্ন। বুঝিবা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। বিনয়ের আবার জিজ্ঞাসা, ‘ তুই চিনিস?’ নিজের ভাবনা বলয়ের ভেতর থেকে অস্ফুট উত্তর ‘কমলিনী’।
             বাস্তবে বাড়িটি প্রসন্ন চৌধুরীর। তাঁর একটি মেয়ে আছে। যার কোন নাম নেই উপন্যাসে। ওদিকে কমলিনীর নেই কোন শরীরী অস্তিত্ব। সেই কি কমলিনী? দুই কি এক? তাকে যে কোথাও ভালো করে দেখেছে বিপ্র, পাশে বসে দুটো মনের কথা বলেছে কোনদিন-- সেরকম একটিও তথ্য নেই গোটা উপন্যাসে। এর কি দুটো ইঙ্গিত? এক , দু’জনের সত্যিই বাস্তব সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাই উপন্যসের শেষে সেই মেয়েটি যেমন নিরুদ্দেশ, বিপ্রও যাত্রা করে সেই নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রবল অস্পষ্টতা আছে সেই সম্পর্কের। এমন কি, বিপ্রতো এও জানতো না বাড়িটি প্রসন্ন চৌধুরীর। যেদিন জেনেছিল, সেদিনই শুধু সে সব ছেড়ে বাসে চড়ে বসে। সুতরাং প্রথম সম্ভাবনাটি নাকচ হয়ে যায়। দুই, তেমন প্রবল না হলেও অস্পষ্টতা প্রসন্ন চৌধুরীর মনেও রয়েছে নিজের মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে। তিনি জানেনও না সে তার নিজের ঔরসজাত নয়। তিনও শহরে ছুটছেন মেয়ের সন্ধানে। পাচ্ছেন না। বিপ্র প্রসন্ন দু’জনেই তখন সন্ধান করছেন জীবনের মানে, দু’জনেই কিন্তু দুভাবে জুড়ে গেছেন নুনু তেলেঙ্গাদের জীবনের সঙ্গেও । নুনুদের জমির অধিকারের প্রশ্নে দু’জনের অবস্থানের কোনো ভিন্নতা নেই। এই অধিকার সাব্যস্ত করা নিয়ে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে লড়ছেন যখন তখনই নিজেকেও প্রসন্ন চৌধুরীর মনে হচ্ছে নিঃস্ব, তিনি যেন জানেন ভুল কোথায় হয়ে গেছে। জীবনে প্রথমবার মেয়েকে দিয়ে সেই ভুল শুধরাবার চেষ্টা নিচ্ছেন। আর ওদিকে নুনুদের গ্রামে গিয়ে বিনয়ের সেই উদ্গারের পর থেকেই বিপ্রের মনে আঁকা হচ্ছে ছবি , ‘কমলিনী’র। এ কমলিনীকে বিনয় চেনে না। বিনয় সম্পর্কে এর পর থেকে বিপ্রের উপলব্ধি হচ্ছে, ‘ উহার কোনো ঠায় ঠিকানা আদৌ ছিল না। তিক্ত বিতৃষ্ণায় চক্ষু বুজিয়া আসিল।’ এক বিকেলে বিপ্র জানছিল, গবেষণার কাজে বিনয় বিদেশ যাবে। তার ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় যাইবেন বিনয়বাবু, সে কোন দেশ? উহাতে কি বদলাইবার থাকিবে না?’
             প্রসন্ন, বিনয়, বিপ্র এবং কমলিনীর সংযোগের অনেকগুলো ইঙ্গিত আছে উপন্যাসে । সংযোগ রেখাটি যেমন হয় না সরল সোজা, তেমনিই। বাঁকা। পড়তে হয় মন দিয়ে, ধরতে হয় ‘সৃজনশীলতা’ দিয়ে। কথাটি বিনয়েরই, “ অধরাকে ধরতে হয়। ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে হয়। ইহাই সৃজনশীলতা।” নুনুদের জমি বাঁচাবার জন্যে উকিল বন্ধু গণি মিঞার অভাবে যখন হাহাকার করছিলেন প্রসন্ন। তার ঠিক পরের অধ্যয়টি শুরু হচ্ছে এই বাক্য দিয়ে, ‘ এই হাহাকারটি কাহারেও বুঝাইবার নয়। হয়ত বিনয়ই বুঝিত...’ কিন্তু এরপরেই বাক্যটি ঘুরে যায়, ‘ এখানে আইলেই বিপ্রের গতি কেন শ্লথ হয়।’ নুনুদের বস্তিতে যাবার পথেই টিলার উপর প্রসন্ন চৌধুরীর শাদা বাড়ি। ‘নুনুদের গ্রামে যাইবার পশ্চাতে যে এই আকর্ষণটি কম নয়, ইহাই অস্বীকার করে কীরূপে?’ জমি চলে যাবে জেনেও যখন যতনবুড়া, চধরি ‘নিশ্চিন্তে হাড়িয়া লইয়া বয়, টানিতে টানিতে ঘনঘন মাথা নাড়ায় আর হাসে’ বিরক্তি ভরে বিনয় বিপ্রকে বলে, ‘ভাব , এদের অবস্থা।’ কিন্তু এই উদ্বেগবিলাস নিয়েইতো বিনয় বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে। কোন আলো ধরতে যাচ্ছে সে? এতেই কি বেঁচে থাকার কোন সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে? বিপ্র জানে না। ‘শুধু ছাই উড়াইতে থাকে। একদিন এই ছাইয়ের ভিতর হইতে, কমলিনী উঠিয়া আইবে। বহুদিন পর, সে মনে মনে ডাকিয়া উঠিল, ---কমলিনী।’ নানা রূপে নানা চেহারাতে কমলিনী ধরা দেয় তার কাছে। পূর্ণস্বরূপে কক্ষনোই না। জরাগ্রস্ত অবনীমোহনকে দেখে বিপ্রের মনে হয় কমলিনী এক সাগর, নদী যেমন সাগরের দিকে ছুটে, ‘ এই জীবন কী তবে কমলিনীর দিকে যাইবার জন্যই রচিত?’ তার পরেই আছে সেই স্রোত –প্রতিস্রোতের কথা—যেগুলো আমরা আগে লিখছি। যেখানে বিপ্রের মনে জাগে এই জিজ্ঞাসা, প্রতিস্রোতটিই যে ‘আদতে স্রোত নয়, একথাই বা কে নিশ্চিতে বলিবে?’ নিজের জীবনকে অর্থহীন মনে হয়। অর্থ বুঝিয়ে দিতে পারত আবার সেই কমলিনী। আর কেউ না। কিন্তু তার সঙ্গেই ‘অই দূরত্ব আজিও ঘুচিল না।’ ভাবতে ভাবতে সে যেদিকে এগোয় সে গরিবাদের বস্তি।
         
    যা বয়ে যায় সেতো নদী। কিন্তু যা স্থির গভীর? ভাসায় না ডুবিয়ে দেয়—তার কী নাম? ‘ভাবিয়া কি কমলিনীও উন্মনা হয় না?’ কখনো বা দূরের আকাশের তারাকে দেখেও ‘কমলিনীরেও বিন্দু বলিয়া ভ্রম হয়। যেরূপ স্নিগ্ধতায় তারারা আলো ছড়ায়, তেমন স্বপ্নবৎ’ তথ্যচিত্রের পাণ্ডুলিপির লেখক বিপ্রের তেমনি কখনো আবার কমলিনীকে মনে হয়, ‘...ফ্রিজশট; স্থির হইয়া আছে। অথচ জীবন ক্রমাগত বদলাইতে আছে।’ এ আসলে বিপ্রের উদ্বেগ। জীবনের দিশা সন্ধানেই যদি জীবন যায়, তবে চলমান জীবনকে ধরে সে এগুবে কবে? করে খাবে কী , এই ভাবনাও তাকে বিব্রত করে। গরিবাদের বস্তিতে গিয়েও চরস গাঁজায় ডুবে লুম্পেন জীবন না বরণ করে নিতে হয় এই উৎকণ্ঠাও কম নয় তার। ‘কিন্তু এই হওয়াটাও যে কত কঠিন, অন্তত আজকের জন্মভিত্তির উপর দাঁড়াইয়া, একথা গরিবাই তাহারে বুঝাইয়া গিয়াছে। ভিত্তিকে মুছিয়া দিবার, হারাইয়া যাইবার প্রচেষ্টা যে ভুল, তাহা বুঝিয়াও, বুঝিবার ইচ্ছা লয় না। মনে হয় নিজেরে মুছিয়া দিতে পারিলেই, কমলিনী আসিয়া দাঁড়ায়।’ এমন অজস্র কঠিন সত্য দার্শনিক জিজ্ঞাসার সামনে লেখক পাঠককে দাঁড় করান গোটা উপন্যাসে। এবং উত্তরে ভুল- শুদ্ধের এমন দ্বান্দ্বিকতা নিয়েই পাঠকের সামনে, ‘কমলিনী আসিয়া দাঁড়ায়।’ কমলিনী নিজেই কখনো প্রশ্ন করে, ‘আমি কি কোনও দিনই স্পষ্টতা পাব না?’ বিপ্র ভেবে পায় না, ‘কমলিনী নাই বলিলে, কমলিনী থাকিবে না, এতটা কি মানিয়া লওয়া সম্ভব?’ দিনের শেষে বাড়ি ফেরা লোকের হাতে ব্যাগ দেখলে বিপ্রের মনে হয়, সেসব আগামী দিনের সঞ্চয় তাদের। ‘যত সামান্যই হোক, ইহা কি কিছুই নয়?’ অথচ নিজের দিকে তাকালেই দেখে, ‘ বাড়ি নাই, ঘর নাই, উপাধি নাই, উত্তরাধিকার নাই। এক অপরিচয়ের ভূত তাহার ভিতর ঢুকিয়া যায়।’ অস্বস্তিতে চঞ্চল কমলিনী জিজ্ঞেস করে, ‘আমি কে? বলো আমি কে?’ বিপ্রের উত্তর, ‘তুমি কমলিনী।স্থিরতা’
                 মন্টু ঘোষের আড্ডা থেকে উঠে একদিন গরিবাদের বস্তিতে গিয়ে বিপ্র এবং কৃষ্ণসুন্দর দেখেন দালাল ঘোরাঘুরি করছে। নিরাপদ। বিপ্রদের জিজ্ঞেস করে, ‘দাদাদের কী কোন কোম্পানি? হাড়িয়াতে মত্ত কৃষ্ণসুন্দর জবাব দেন, ‘টো-টো কোম্পানি।’ নিরাপদ নুনুকে বলে, ‘জমিটা বেচলে জানিও নুনুভাই।’ ‘কোন জমি?’ বিপ্রের জিজ্ঞাসা। এর পরে প্রতি প্রশ্ন আসে, ‘এটা নুনু বেচবে কী করে? এটা তো প্রসন্ন চৌধুরীর।’ কথাটি বোধকরি কৃষ্ণসুন্দরের। আগে কখনো উচ্চারণ করবার দরকার বোধ করেন নি, বললে বিস্ময়ে তাকাতো না বিপ্র। নিরাপদের মনে হয়, ‘আমি নিরাপদ, এরা দেখছি বিপদ- আপদ। সব জানে। জমির মালিকানাও।’ হাত জোড় করে সে বলে, ‘তিনিতো ভগবান মানুষ। যাওয়ার আগে, এই জমি এদের নামেই লিখে দিয়ে গেছেন।’ ‘গেছেন মানে?’ আরে না না, শহরে চলে গেছেন। যাওয়ার আগে এই জমি এদের দিয়ে গেছেন, তা কাক পক্ষীতেও জানতে পারে নি।’ ‘চৌধুরী কি এখানেই থাকতেন?’ বিপ্র আবার জিজ্ঞেস করে, এবং প্রথম জানতে পায় ‘কমলিনী’র সেই শাদা বাড়িটিতেই থাকতেন প্রসন্ন চৌধুরী। ‘মুহূর্তে তার পৃথিবী দুলিয়া উঠে। একটা শাদা বাড়ি; কাগজের মতো টুকরো টুকরো হইয়া যাহা ছড়াইয়া পড়িল। কিছুই লেখা নাই। শাদা শূন্য। এই শূন্যতায় একটি ছবি আঁকা হইয়াছিল, অথবা শূন্যতা সেই ছবি আঁকিয়া দিয়াছিল। এখন টুকরা টুকরা হইয়া সেই ছবি ভাসিতে আছে। বিপ্র দেখিতে চেষ্টা করে, সেই মুখ, সেই চোখ। কিন্তু কিছুতেই সামগ্রিকতায় মিলাইতে পারিতেছে না।” কিয়ৎক্ষণ ঘোরের পর কৃষ্ণসুন্দর জিজ্ঞেস করেন, ‘বাড়ি যাইবি না?’ বিপ্রের উত্তর, ‘ খুঁজতে হবে।’ ‘কী?’ ‘একটা বাড়ি।’ তারপরেই হচ্ছে বিপ্রের সেই বাস যাত্রা। পাঠক নিশ্চয় মুচকি হেসে ভাবতে বসবেন, ওহ! এই তাহলে কথা। তবে বাপু ঝেড়ে কাশো না কেন? প্রসন্ন চৌধুরীর মেয়েটির পেছনে ছুটছতো? কৃষ্ণসুন্দরও জিজ্ঞেস করেছিলনে, ‘খুঁজবি কীভাবে? ঠিকানা আছে?’ বিপ্র জবাব দেয়, ‘ ঠিকানা একটা নির্দিষ্ট ছাঁচ, ইহাতে কমলিনীরে আঁটিবে কেন! কমলিনী ছড়াইয়া থাকিবে ঠিকানার বাইরে। সেখানেই তাহারে খুঁজিতে হইবে। এই কথা কাহাকে বলিবে, আর বলিলেই বা কে বুঝিবে?’... শেষে গিয়ে তাই কৃষ্ণসুন্দর এই বোধে গিয়ে থামেন, ‘কমলিনীর দিকে যাওয়ার চেষ্টাটাই আসল।’
                 পল্লব যখন এই উপন্যাস লিখছিলেন, সাহিত্যে উত্তরআধুনিকতাবাদ কিম্বা যাদু বাস্তবতার কথা বেশ শোনা যাচ্ছিল। অনেকেই এই ছাঁচে ফেলে দিতে চাইলেও চাইতে পারেন উপন্যাসটিকে। পুরাকথার থেকে নেয়া কমলিনীর নামও তাদের প্ররোচিত করলেও করতে পারে। এই অব্দি এসে সব্বাই আশা করি, মেনে নেবেন যে এমন কোন আধা চেনা প্রতীচ্য তত্ত্বের আলো না ফেলেও এই উপন্যাস বেশ বুঝে ফেলা যায়। ধরেও ফেলা যায়। কোন যাদু টাদু নেই । নেই কোন বাস্তবাতিরিক্ত গল্প কথা। ছাঁচের বাইরে ঠিকানা খুঁজতে হবে বলেই কমলিনীও নয় কোন বিশৃঙ্খলার প্রতীকী নাম। সে আসলে এক নবতর শৃঙ্খলার নাম। গতির ভেতরে নবতর স্থিতির নাম। যাকে অনুধাবন করাটা আপাতত যেকোন পাঠকের বিপ্রের মতোই, লেখকের মতোই, ব্যক্তিগত কাম।
                লেখকের কথা বয়ন কৌশল নিয়ে আলাদা করে বলা যেত। কিন্তু বোধকরি ইতিমধ্যে আমরা সে পরিচয় দিয়েছি অনেক। কিন্তু এ কেমন ভাষা, ‘কান্দিতে আছে’, ‘গ্যাঁজাইবার’? একেবারে শুরুর উদ্ধৃতিটি দেখুন। এহ বাহ্য! আরো আছে। এই যেমন, “...পরনের ফিরোজ লুঙ্গিটি হাঁটুর উপর গোটানো , খালি গা, মাথায় গামছা বান্ধিয়া, তাহার বয়সি যে, এই মাত্র চাউলের বস্তাটি ট্রাক হইতে নামাইয়া, উহাদের মধ্যে আইয়া বইল, কয়দিন আগে মাত্র বিহার হইতে আইয়াছে।” কিম্বা “...বুজিবা চুকুমবুদাই, দূর রাস্তার দিকে চাহিয়া , কিছুই দেখিতেছে না, এমন দাঁড়াইয়া রহিল।” নজির লিখে গেলে তালিকা দীর্ঘ হবে। ইতিমধ্যে প্রচুর দেয়াও হয়েছে। প্রশ্নটা উঠবেই। এ কেমন ভাষা? তাই লিখছি, যিনি পড়বেন তাঁর ‘বৃত্তান্ত একা’ ঘুরে বেড়াবে। যিনি লিখেছেন তাঁরতো বটেই।
               এখন যখন এই সহজপাঠ লিখতে বসেছি তখনো মনে হচ্ছে এই জবাবদিহির দায়িত্ব এড়িয়ে এক পাও এগুনো যাবে না। আমাদের এলাকার, একালের পাঠক এই ভাষার সঙ্গে পরিচিত বটে । কিন্তু তিনি জানেন এই ভাষাতে আজকাল আর উপন্যাস কেন, কোনো কিছুই লেখা হয় না তেমন। তার উপর তিনি যে বাংলা সাধু ভাষাকে জানেন সেটি সংস্কৃতপ্রায় তৎসম শব্দ বহুল। সেই ভাষাটিকে বিদ্রূপ করে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সেই আদ্যিকালেই লিখেছিলেন“সংস্কৃত বাংলা অর্থাৎ যাকে আমরা সাধুভাষা বলে থাকি তার মধ্যে তৎসম শব্দের চলন খুবই বেশি। তা ছাড়া সেই-সব শব্দের সঙ্গে ভঙ্গির মিল করে অল্প কিছুকাল মাত্র পূর্বে গড়-উইলিয়মের গোরাদের উৎসাহে পণ্ডিতেরা যে কৃত্রিম গদ্য বানিয়ে তুলেছেন তাতে বাংলার ক্রিয়াপদগুলিকে আড়ষ্ট করে দিয়ে তাকে যেন একটা ক্লাসিকাল মুখোশ পরিয়ে সান্ত্বনা পেয়েছেন; বলতে পেরেছেন, এটা সংস্কৃত নয় বটে, কিন্তু তেমনি প্রাকৃতও নয়। যা হোক, ওই ভাষা নিতান্ত অল্পবয়স্ক হলেও হঠাৎ সাধু উপাধি নিয়ে প্রবীণের গদিতে অচল হয়ে বসেছেন। অন্ধভক্তির দেশে উপাধির মূল্য আছে।”(বাংলা শব্দতত্ত্ব ; বানান-বিধি) চলিত ভাষা , যাকে আমরা ভুল করে কখনো বা ‘মুখের ভাষা’ বলেও জানি, তাকে সাহিত্যের এবং সভার ভাষা হিসেবে দাঁড় করাবার কৃতিত্বটাও আসলে রবীন্দ্রনাথেরই, সঙ্গে ছিলেন প্রমথ চৌধুরী। এই জুটির প্রায় এক শতক পরে সেকালের সেই কৃত্রিম ভাষাতে উপন্যাস লেখা উচিত কী?-- এই প্রশ্নটি পল্লবের উপন্যাস পড়তে গেলে শুরুতেই উঠবে। তার উপর ওই ‘চাউল’, ‘চুকুমবুদাই’, ‘মাজাকি’র মতো শব্দগুলো দেখে এই প্রশ্নও উঠবে , তিনি বাংলা ভাষাটি জানেন তো?
                পল্লব নিশ্চয়ই জানেন, আমরাও জানি। শুধু জানাটা লুকিয়ে গেছে প্রতাপ লব্ধ কিছু অভ্যাসেই আড়ালে। চারপাশের বাস্তবতা । চাউল, কয়দিন, আইয়া বইল –এগুলোর সবটাই আমাদের নিত্যদিনের ব্যবহৃত বাংলা ভাষারই শব্দ। আর রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত ভাষাটিও আমাদের মুখের বাংলা নয় আদৌ। যেখানকার এ মুখের ভাষা সেখানকার বই পত্তর পড়তে পড়তে সংস্কারটা আমাদের দাঁড়িয়ে গেছে মাত্র। এমনিতেও সাধু বাংলার ব্যবহার কমে গেলেও উঠে কোনদিনই যায় নি। শরৎ চন্দ্র , তারাশঙ্কর , বিভূতি ভূষণেরা দিব্যি চালিয়ে গেছিলেন এর ব্যবহার। ফুরিয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছিল যখন তখন একে প্রায় পুনরুজ্জীবিত করলেন এসে প্রথমে জীবনানন্দ এবং পরে কমলকুমার। কমলকুমার ফিরে গেলেন, মাইকেলী যুগে—এমনটা অনেকে বলে থাকেন। আমাদের সন্দেহ আছে। তত দাঁত খটমট যুক্তাক্ষর বহুল মাইকেলী বাংলা তিনি তেমন ব্যবহার করেন নি, বরং তাঁর পরীক্ষা নিরীক্ষা ছিল সাহেবী বাংলার বাক্য গঠন অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার। কতটা পেরেছেন,সে অন্য বিতর্ক। কিন্তু করেছিলেন সেরকমই।
                রবীন্দ্রনাথ এবং প্রমথ চৌধুরী আশা করেছিলেন ‘কলকাতা’তে যেহেতু ভিড় করেন গোটা বাংলার বাঙালি, তাই ওখানকার ভাষা হয়ে উঠবে বাঙালির ভাষা। কিন্তু এটি হয়ে উঠেনি তেমন। দেশটিও ভাগ হয়ে দু’ভাগ হয় নি শুধু চার বা তারও বেশি ভাগ হয়েছে। এখনা আর বাংলার বৈচিত্র শুধু নয়, জেলার । বরং রাষ্ট্রের এবং প্রদেশের। অসম-ত্রিপুরার বাঙালিও যে বাঙালি—পুথিপত্তর সেই সত্য আড়ালে ঠেলে দিতে চাইলেও কথাটা সত্য। কলকাতার বাংলা পড়ে-শোনে বোঝেন যারা তাঁরা বিদ্বান। কিন্তু লিখতে বলতে পারেন না, অধিকাংশ বাঙালি। তাদের কাছে চলতি কিম্বা ‘মুখের ভাষা’টিও আসলে এক কৃত্রিম ভাষা, চাপানো ভাষা। আমাদের এলাকার, একালের বাঙালি সম্পর্কেও কথাটা খুবই খাঁটি। যিনি পড়েন মাও-ৎসে-তুঙের ‘ইয়েনান বক্তৃতা’ কিম্বা লুসুনের কবিতা, কিম্বা তথ্যচলচ্চিত্র করেন, ‘পভার্টিঃ কজ অফ ইণ্টারনেল মাইগ্রেশন’ নামে তিনিও ‘চলিত বাংলা’ বিশুদ্ধ বয়নে উচ্চারণে বলতে বা লিখতে পারেন না মোটেও। সেই বাঙালির গল্প ‘কমলিনীর উপখ্যান’। তাই তাঁরা যখন তাঁর উপন্যাসে চরিত্র হয়ে উঠে আসেন, তখন রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে নিজেদের ভাষাকে ছেটে উঠে আসেন নি, এসছেন সঙ্গে নিয়ে। অবিকল , অকৃত্রিম। উপন্যাসের আর প্রতিটি উপকরণ যেমন শিল্পের দাবি মেনে এসছে, মিশেছে, নবরূপ নিয়েছে –এর ভাষাটিও তেমনি। ঠিক তাই, কি? আমরা কি তবে সাধু বাংলাতে কথা বলি? নয় বটে, কিন্তু ‘সাধু বাংলা’ কথাটাও উনিশশতকী নির্মাণ ।ভাষাটি তার আগেও ছিল। আমাদের বৈষ্ণব সুফি কাব্যের ভাষা দেখুন, দেখুন পাঁচালী-মঙ্গল কাব্যগুলোর ভাষা। এ যেন প্রাদেশিক বৈচিত্রকে এক সুতোতে বাঁধতে বাঁধতে আপনিই গড়ে উঠছিল সারা বাংলার সাহিত্যের ভাষা হিসেবে। না ছিল কোনো ব্যাকরণের নির্দেশ, না ছিল কোনো শুদ্ধিকরণের সূচিবাই। তার নাম ছিল, দেশি ভাষা। বানান, শব্দপ্রকরণ, বাক্যগঠনের চরিত্রের সবটাই ছিল দেশি।সংস্কৃত বা তৎসম নয়। পল্লব সেই রীতি মেনে লিখেছেন উপন্যাস। মুখের শব্দ তিনি বসিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথও না বসিয়ে থাকেন নি। সেই যে ‘দেখলুম, খেলুম, গেলুম’ ক্রিয়াপদগুলো—নিতান্তই ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘উপভাষা’ থেকে নেয়া। পল্লবের ‘চাউল’, ‘চুকুমবুদাই’ তবে করেনি অপরাধ কোনো। যে বাঙালির এগুলো মুখের শব্দ তাঁরাও বরঞ্চ এখনো চিঠিতে, বিজ্ঞাপনে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন এহেনো বাংলা লিখতে এবং ‘কান্দিতে আছে’র মতো প্রচুর ব্যাকরণের ভুল সহই। সুতরাং এই সিদ্ধান্ত নিতেই পারি যে ‘চলিত’ সংস্কারের বাইরে বেরিয়ে এলে দেখব, যে পল্লব উপন্যাস লিখেছেন আমাদের আদি অকৃত্রিম গুরুচণ্ডালি ভাষাতেই। বরং ভাষা যখন তার অর্থবহ বর্ণনাতে বাস্তবতার ছবি আঁকে, পল্লবের ভাষা সেখানে বাস্তবতার সেই বর্ণগন্ধ ধারণ করেছে নিজের শরীরে। বোঝা যায় উপন্যাসটি আসলে ত্রিপুরার তথা পূর্বোত্তরের এক আধাশহরের মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প। কমলিনী সেই মধ্যবিত্তের সন্ধান কিনা, এই প্রশ্ন আমরাও খোলাই ছেড়ে দিলাম। শুধু এইটুকুন মনে রাখলে চলবে, যে রাধারমণ যখন এই ভাষাতেই গেয়েছিলেন, ‘আমার ছিলো আশা দিলো দাগা রে সুবল।।/আমার এই পিরিতের কার্য নয়/কেমন আছে কমলিনী রাই।' তখন সেই গানের তালে দোলেন যেসব সিলেট টিপেরার লোক তারা কিন্তু অধিকাংশই জানেন না, ডকু ফিল্ম মানে কী,আর ফিজিক্স কোন স্কুলে পড়ানো হয়। তারা সব টুনু-গরীবার আত্মীয়, হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তের দেশের লোক।

                              *******************************

Thursday, 27 September 2012

অসমিয়া ভাষাতত্ত্ব চর্চার দুই শতক

(লেখাটি শিলচরের মাসিক দিগন্তিকা কাগজের শারদ সংখ্যা, ২০১৩তে প্রকাশিত)
সাহেব সংস্পর্শ ছাড়াই উপভাষা দিয়ে যাত্রা শুরুঃ এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যে বাংলা এবং অসমিয়া ভারতীয় উপমহাদেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ আর্যভাষার প্রথম অভিধান লেখা হয়েছিল একই শতাব্দীতে কয়েক দশকের তফাতে মাত্র। আর দুটোই ছিল দ্বিভাষিক। পোর্তুগিজ পাদ্রি মনোএল দ্য আসসুম্পসাউ ১৭৩৪ থেকে ১৭৪২এর মধ্যে লিখেন একটি ব্যাকরণ এবং অভিধান - ‘ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেনগল্লা, ই পোর্তুগিজঃ দিভিদিদো এম দুয়াস পার্তেস’ । ১৭৩৫এ তিনি লিখেছিলেন ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থ ভেদ’ -যেটি আধুনিক বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য গ্রন্থ। দুটো বইই ১৭৪৩এ পোর্তুগালের রাজধানী থেকে ছেপে বেরোয়। বাংলা ভাষাতে এ দুটিই প্রথম ছাপা বই। বাংলাভাষাটিকে নিয়ে আমরা নিজেরা এর আগে বৌদ্ধিক প্রয়াসের চিহ্নই রাখিনি ।
                অন্যদিকে ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে আহোম পুরোহিত শ্রেণির প্রখ্যাত মহন পরিবারের টেঙাই পণ্ডিত ‘বরঅম্র, লতিঅম্র’ নামে একটি আহোম-অসমিয়া দ্বিভাষিক অভিধান লিখেছিলেন, মতান্তরে সংগ্রহ করেছিলেন। আহোম রাজদরবারে অ-আহোম রাজকর্মচারীদের যেমন স্থানীয় আহোম ভাষা শেখার দরকার পড়ছিল এরকম এক পরিস্থিতিতে অথবা বিলুপ্তির মুখে পড়া আহোম ভাষাকে অসমিয়ার ধাঁচে ধরে রাখবার দরকার থেকে হয়তো এটি লেখা হয়েছিল। এখনো স্পষ্ট নয় কারণটি কী? দুটো মতই রয়েছে।
                সাধারণত আমাদের আধুনিক ভাষার চিন্তার ইতিহাস নিয়ে যে বোধ তা শুরু হয় কলকাতার শ্রীরামপুরের আর শিবসাগরের মার্কিন বাপটিষ্ট মিশনারীদের নিয়ে। আমাদের চিন্তাতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ একদিকে, অন্যদিকে ‘অরুণোদয়’ কাগজ বড় জায়গা নিয়ে বসে আছে। তাতে কোনো সমস্যা ছিল না। মনে হয় যেন তারাই বাংলা আর অসমিয়া ভাষাকে নতুন করে উদ্ধার করলেন, গড়ে তুললেন। তা করলেন বটে। সে যে ভাষা ইতিহাসের এক রাজনৈতিক বাঁক-- সেটি চাপা পড়ে যায় এবং আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সত্য চাপা পড়ে যায় যদি তার আগের ইতিহাসে আমরা চোখ না ফেলি। বাংলাতে অবশ্য হেলহেডের ব্যাকরণের কথাটাও আমরা ভুলিনা , সম্ভবত তাঁর নামের সঙ্গে মূদ্রণযন্ত্র এবং পঞ্চানন কর্মকারের হাতে লিপি খোদাইর ইতিবৃত্ত জড়িয়ে আছে বলে। অন্যথা মনোএল দ্য আসসুম্পসাউ-এর নাম আমরা তাঁর প্রথম ছাপা বাংলা গদ্য গ্রন্থের প্রসঙ্গে মনে রাখি তাও সেই ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ প্রসঙ্গে ।
            

              মনোয়েলের ব্যাকরণ এবং অভিধানটি কিন্তু লেখা হয়েছিল আজকের মান বাংলাতে নয়, এমন কি যে সাধু বাংলাকে শ্রীরামপুর মিশনের দিন থেকে সংস্কৃতপ্রায় কৃত্রিম করে তুলবার চেষ্টা হবে এবং যেটি বাংলাসাহিত্যের সাধারণ ভাষা হিসেবে প্রাক-ব্রিটিশ যুগেই গড়ে উঠেছিল-- সেই ভাষাতেও নয়। লেখা হয়েছিল ঢাকার অদূরে বর্তমানে গাজীপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত, তৎকালীন ভাওয়াল পরগণার বাংলা ভাষার উপর ভিত্তি করেই। অর্থাৎ উপভাষাচর্চা যা পরে দীর্ঘদিন চাপা পড়ে যাবে তাই দিয়েই শুরু হয়েছিল আধুনিক বাংলা ভাষাতত্ত্বের চর্চার ইতিহাস। অন্যদিকে ‘বরঅম্র, লতিঅম্রে’র যুগে আধুনিক মান অসমিয়া গড়ে উঠেনি। সেটির শুরু শিবসাগরে মার্কিন বাপটিস্ট মিশনে ‘অরুণোদয়’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে । অথবা তাকে যদি আত্মারামের অনুদিত ‘বাইবেলে’র কাল ১৮১৩ অব্দি টেনে নিয়ে যাই তবে শ্রীরামপুর মিশন এবং উইলিয়াম কেরির ভাষা-কর্মযজ্ঞের সঙ্গে জুড়ে দিতেও পারি। কারণ কেরির প্রেরণাতেই এটি অনুদিত এবং প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই ‘অম্র’ গ্রন্থটি লেখা হয়ে গেছে। বইটি সম্ভবত গোটা ভারতের ভাষাচিন্তার ইতিহাসেই এর জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ যে সাহেবি কোনো সংসর্গ ছাড়াই এক বা একাধিক ভারতীয় এটি লিখছেন। যে অসমিয়া ব্যবহার করেছেন সেটি শিবসাগর অঞ্চলের উপভাষা হওয়াই সম্ভব। কিন্তু সেই সঙ্গে তাঁরা ‘তাই-আহোমে’র মতো এমন একটি ভাষাও লিপিবদ্ধ করছেন যেটি তখন বিলোপোন্মুখ। আহোমেরা ততদিনে অসমিয়া ভাষা গড়ে তুলতে এবং আয়ত্ব্ব করতে বহুদূর এগিয়ে গেছেন।
              অসমিয়া ভাষাচিন্তার গৌরবের কাহিনিটি এখানেই শেষ নয়। ১৮১০এ রুচিনাথ কামরূপী     (বা বরগোঁহাই)র অভিধান ত্রিভাষিক । সংস্কৃতের সঙ্গে সেখানে আলাদা করে জায়গা করেছিল কামরূপী এবং উজানের অসমিয়া। তৃতীয় আরেকখানা অভিধানের সংবাদ মেলে নাথান ব্রাউনের Grammatical Notices of the Assamese Language –এর ভূমিকাতে । যাদুরাম ডেকাবরুয়ার লেখা এবং ১৮৩৯এ প্রকাশিত A Manuscript Bengali Dictionary with Assamese Definitions। জানিনা কোনো বাঙালি ভাষাচিন্তক এই অমূল্য বইখানার কোনো খবর কোনদিনই নিলেন না কেন? কোনো বাংলা বইতে এর উল্লেখ মেলে না ।১ বইটি এখন মেলেনা, জাতীয় অভিধান দলটি এর সন্ধানে আছেন। আমরাও করতে পারি। দুই ভাষার তুলনামূলক ইতিহাসে বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলো ফেলতেই পারে। বস্তুত বইটি সেই যুগে বসে লেখা যখন অসমিয়া বৌদ্ধিক সমাজ সানন্দে বাংলা চর্চা করতেন। ড০ প্রফুল্ল মহন্ত যে যুগটি সম্পর্কে তাঁর 'অসমীয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির ইতিহাস গ্রন্থে' লিখেছেন, “ অসমত বাঙালী সকলেই আছিল আধুনিকতার অগ্রদূত আরু বৃটিশর পিছতে তেওঁলোকেও এক সামাজিক মর্যাদা লাভ করিছিল। সেইকালত নিশ্চয় (অসমিয়া) অভিজাত সকলে বাংলা ভাষার জ্ঞান আয়ত্ব্ব করাটো আরু বাঙ্গালিক অনুকরণ করাটোক আধুনিক আভিজাত্য বা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিচাপে গণ্য করিছিল।” ২ এবং সেই যুগেও বটে যখন প্রথমবারের মতো ব্রিটিশের ভাষানীতি গোটা ভারত বিশেষ করে পূর্ব ভারতে সংঘাতের বীজও বপন করে। যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য পাওয়া যায় ‘অসমীয়া জাতীয় অভিধানে’র ভূমিকা অংশে। সম্পাদক লিখছেন, “নিজ মাতৃভাষার নির্বাসনর বাবে দায়ী বৃতিচ সাম্রায্যবাদক চিনাক্ত করিব নোয়ারি ই অসমীয়ার ঠাইত বাংলা জাপি দিয়া বাবে কেবল বাঙালি কেরাণী মহরীক দায়ী কৰিছিল। ফলস্বরূপে অসমিয়া ভাষার অস্তিত্বর বাবে ভাবুকি স্বরূপ বৃতিচ সাম্রায্যবাদ নেপথ্যতে থাকি গৈছিল আরু পরবর্তী প্রায় দের শতিকা কাল অসমীয়া-বঙালী সংঘর্ষই অসমর এক প্রধান জনসংঘাতর রূপ ধারণ করিছিল। বৃতিচ সাম্রাজ্যবাদ যে প্রকৃততে বাংলা ভাষার প্রতি দরদি নাছিল, সেই কথার প্রমাণ হৈছিল এই কথার পরা যে যি সময়ত বৃতিচে অসম আরু উরিষ্যাত বাংলা ভাষা জাপি দিছিল, ঠিক সেই সময়ত খোদ বংগত কিন্তু ফার্চী ভাষাহে জাপি দিছিল। তাৰ কারণ আছিল এই যে জনসংখ্যার প্রায় আধা আধা হিন্দু মুছলমান জনবসতি থকা তেতিয়ার অভিবক্ত বংগত মুছলমান সকলর ভাষা বুলি অভিহিত বা জনাজাত ফার্চী ভাষা বলবৎ কৰিলে হিন্দু সকল জাঙুর খাই উঠিব আরু তার ফল হ'ব দীর্ঘস্থায়ী হিন্দু-মুছলমান সংঘর্ষ। বৃতিচর সেই ষড়যন্ত্র যে বহুদূর ফলিয়ালে তার প্রমাণ পরবর্তী কালত হিন্দু মুছলমান সংঘাতক কেন্দ্র করি বাংলা ভাষা, বাঙ্গালী জাতি আনকি বংগদেশতে উলম্ব বিভাজন।”৩ শুধু একটি তথ্যগত ভুল রয়েছে এই গোটা বক্তব্যে। ফার্সিকে বাংলার সরকারী ভাষা হিসেবে ব্রিটিশ তখন বলবৎ করেনি। এটি ছিলই সরকারি ভাষা ১৮৩৭ অব্দি। অর্থাৎ অসমে এবং উড়িষ্যাতে বাংলা ভাষা বলবৎ করবার পরের বছরেই শুধু বাংলাদেশে বাংলা বলবৎ হয়। এর পরেই ভাষাগুলো নিয়ে বিভ্রান্তি যেমন বাড়তে থাকে সেই বিভ্রান্তি দূর করতে গিয়ে ভাষা এবং ভাষাচিন্তার বিকাশও কিন্তু হতে থাকে দ্রুত গতিতে। অসমিয়া বাংলার উপভাষা কিনা, কিম্বা সিলেটি অসমিয়ার উপভাষা কিনা এই তর্কের গোড়ার কথাটিও কিন্তু এই ইতিহাস এবং ভাষারাজনীতি। এক দশকের ব্যবধানে প্রকাশিত রবিনসন এবং নাথান ব্রাউনের ব্যাকরণেই আমরা এই ভাষারাজনীতির প্রকট চেহারাটি দেখতে পাব। প্রথমজন ছিলেন কেরির অনুগত ব্রিটিশ মিশনারী। সুতরাং তাঁর বক্তব্য ছিল অসমিয়া হচ্ছে বাঙালি বামুনদের প্রচলিত বাংলারই ভিন্ন রূপ। দ্বিতীয়জন ব্রহ্মদেশ হয়ে অসমে আসা মার্কিন মিশনারী। প্রথমজন অসমের স্কুলে অসমিয়া ভাষা প্রচলনেরও তীব্রবিরোধী ছিলেন, দ্বিতীয়জন অসমিয়াকে প্রতিষ্ঠা দেবার লড়াই লড়েছিলেন। ৪ রবীন্দ্রনাথ নাথান ব্রাউনের ব্যাকরণের সঙ্গে পরিচিত থাকা সত্বেও প্রথম জীবনে অসমিয়ার স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে রবিনসনেরই অনুসারী ছিলেন।৫ এই ভাষারাজনীতির দৌড়ে যাদুরামকে ইচ্ছে করেই প্রায় লুকিয়ে ফেলা হলো। যার কিছু বিবরণ মেলে ‘অসমীয়া জাতীয় অভিধানে’র প্রথম খণ্ডে। আপাতত সেই বিষয় এক পাশে সরিয়ে রেখে আমরা এ পর্যন্ত ভাষাদুটোতে ভাষা নিয়ে যা কিছু চিন্তন এবং মনন হয়েছে তার এক সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত তুলে ধরবার চেষ্টা নেব।
       
  রবিনসন নাথান ব্রাউনের অভিধান , ব্যাকরণ হয়ে ভাষাতত্ত্বে প্রবেশিকাঃ ভাষাচর্চার ধারাবাহিক ইতিহাস অসমিয়াতে একত্রে এখনো সুলভ নয়। বিভিন্ন বইয়ের ভূমিকা ইত্যাদিতে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ড০ মৃণাল কুমার গগৈর মতো কেউ কেউ কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন ভাবে সেই ইতিবৃত্ত নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন।৬ শ্রীগগৈ আলোচনার সুবিধার্থে গোটা সময়টাকে তিন ভাগে ভাগ করে নিয়েছেন। ১)অসমত ভাষা অধ্যয়ন ( ১৮৩৬-১৮৭৩ খৃঃ), ২) ভাষাতত্ত্বমূলক অধ্যয়ন ( ১৮৭৪-১৯৪০), ৩) ভাষাবৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন ( ১৯৪১—অদ্যাপি)
             ১৮৩৬টা তিনি শুরুর কাল ধরে নিয়েছেন কেন স্পষ্ট নয়। অসমে সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা চালু করবার হিসেব ধরলে হওয়া উচিত ছিল ১৮৩৩। এর পরে সংগঠিত ভাবে অসমিয়ার স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগতে শুরু করে। কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে দেখালাম বোধটা ছিল না নয়, আর অভিধান রচনার কালটা আসলে ১৭৯৫ থেকে শুরু। এই সময়ের মধ্যে তিনটি অভিধান অসমিয়া ভাষা নিয়ে লেখা হয়ে গেছে। ‘বর অম্র, লতি অম্রে’র কথা জানা সত্বেও তিনি হিসেব থেকে বাদ যে দিলেন তার কারণটি বুঝবার অপেক্ষা রাখে। যাদুরাম ডেকাবরুয়ার অভিধানের কথা আমরা লিখলামই। আর তাই আসলে ১৮৩৬ও নয়, ১৮৩৯এর উইলিয়াম রবিনসনের লেখা A Grammar of the Assamese Language বইটির কথাই আমাদের মনে আসে বেশি। প্রথম অসমিয়া ব্যাকরণ বলে এটিই এখন অব্দি খ্যাত। এটিও কিন্তু ছাপা হয়েছিল সেই শ্রীরামপুর মিশন কলকাতা থেকে। একদিকে যখন প্রশাসন বলে যাচ্ছিল অসমের ভাষা বাংলা, রবিনসন তাকেই সবল ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে গেছিলেন। তাঁর সামনে আর কোনো আদর্শ ছিল না বলে তিনি প্রচলিত লাতিন ব্যাকরণ এবং কেরির বাংলা ব্যাকরণের আদর্শে বইটি রচনা করেন।
       ১৮৪৬এ শিবসাগর মিশন থেকে ‘অরুনোদয়’ কাগজ বের করে ব্রহ্মদেশ হয়ে অসমে আসা মার্কিন মিশনারীরা আন্তরিকতার সঙ্গে অসমিয়া ভাষার প্রচারে প্রসারে মন দিলেন। তাদের কাজগুলো কলকাতার শ্রীরামপুরের মিশনের মতোই আন্তরিক হলেও গুণগতভাবে স্বতন্ত্র ছিল। শ্রীরামপুরীদের মতো এরা সংস্কৃতকরণের দিকেও ঝোঁকেননি। এই কাগজটি করতে গিয়ে যেমন যেমন তাদের ভাষা চিন্তা দেখা দিচ্ছিল তেমন তেমন সেগুলো লিখিয়ে নিচ্ছিলেন নানাজনকে দিয়ে, আর নিজেরাও নেমে পড়েছিলেন ব্যাকরণ অভিধানের কাজে। নাথান ব্রাউন ১৮৪৮এ লিখলেন দ্বিতীয় ব্যাকরণ Grammatical Notices of the Assamese Language। এই বইটি Grammatical Notes on the Assamese Language নামেও মেলে। ১৮৯৩তে যখন পি এইচ মুর এর তৃতীয় সংশোধন করেন তখন এই নাম সহ অহেতুক অনেক বিষয় ছেটে ফেলেন, যার মধ্যে যাদুরাম ডেকাবরুয়া প্রসঙ্গও ছিল। যা পরবর্তী গবেষকদের কাছে এখনো বেশ সংগত ঊষ্মার কারণ হয়ে আছে। ব্রাউন যেভাবে শিবসাগর অঞ্চলের উপভাষাকে ভিত্তি করেছিলেন তাকে অনেকটাই শুধরে ফেলেছিলেন মুর। এ অনেকটাই বাংলার সাধুভাষা নির্মাণের মতো ব্যাপার। অকৃত্রিম বানান টানানও পালটে ফেলা হয়। তাতে অসমিয়াকে অনেকটাই অহেতুক বাংলার কাছাকাছি নিয়ে আসা হয় বলে অনেকেই সংগত অভিযোগ উত্থাপন করে থাকেন। ৭ অথচ, ব্যাকরণটির ভূমিকাতে ব্রাউন অসমিয়া ভাষাতত্ত্ব বিশেষ করে ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে বেশ গভীরে গিয়ে আলোচনা করে এক জায়গাতে বেশ গর্বের সঙ্গেই লিখেছিলেন, “ For beauty and softness the Assamese language is much superior to the Bengali”। গোলক চন্দ্র গোস্বামী এই বইটির সম্পর্কে লিখছিলেন, “...পরবর্তীকালর কুরি শতিকাৰ শেষার্দ্ধত খাচ অসমীয়া লোকে , পণ্ডিত সকলে লিখা বৈজ্ঞানিক বুলি দাবী করিবলৈ যোয়া কোনো এখন ব্যাকরনে তাক আজিলৈকে চের পেলাব পরা নাই।” ৮ আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন যিনি বাংলা, সংস্কৃত ভাষাতেও বেশ সুলেখক ছিলেন ১৮৫৫তে একটি ছোট্ট বই লেখেন A Native ছদ্মনামে। বইটির নাম, A Few Remarks on the Assamese Language and Vernacular Education in Assam. তার আগে ১৮৪৯তে আরো দুটি বই ছেপে বেরোয় । F. O. Poviottiর An Assamese Grammar with Vocabulary and Exercise. অন্যটি দেবেশ্বর চালিহার Origin and Growth of The Assamese Language. এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল, সেই যাদুরাম ডেকাবরুয়ার মতোই অনসমীয়াদের অসমিয়া ভাষার সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দেয়া। কিন্তু সেযুগেই অসমিয়া ভাষার ইতিহাস লেখার প্রয়াস হচ্ছে এটি চালিহার বইটির নামেই স্পষ্ট।
      
     কিন্তু যে ব্যাকরণ সেসময়ে লেখা হয়ে এখনো অসমিয়া ব্যাকরণ চিন্তাকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে যাচ্ছে সেটি হেমচন্দ্র বরুয়ার লেখা এবং ১৮৫৯তে প্রকাশিত ‘অসমীয়া ভাষার ব্যাকরণ’। এর দ্বিতীয় সংশোধিত সংস্করণ বেরোয় ১৮৭৩এ। এবং এখনো এটি অনেকের কাছেই অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ। ভাষাচার্য গোলক চন্দ্র গোস্বামী লিখেছেন এক জায়গাতে, “ হেমচন্দ্র বরুয়ার ব্যাকরণখনেই আছিল অসমীয়া ব্যাকরণর সুদৃঢ় আরু সুনির্মিত বুনিয়াদ...তেখেতর ব্যাকরণখনেই আছিল অসমীয়া ভাষার লিখা অসমীয়া ব্যাকরণর এটা প্রথম প্রধান আরু উল্লেখনীয় মাইলর     খুঁটি।” ৯ । কিন্তু তিনি প্রচলিত ভাষাটির বিশ্লেষণের পরিবর্তে লিখিত অসমিয়ার রূপকে পরিশীলিত এবং মার্জিত করবার উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যে কাজগুলো তখন কিন্তু বাংলাতেও হচ্ছিল। তাঁর বিরুদ্ধেও আজকাল ভাষাটিকে সংস্কৃত এবং বাংলাগন্ধী করে ফেলবার অভিযোগও শোনা যায়।১০ ১৯০০তে প্রকাশিত তাঁর রচিত অভিধান ‘হেমকোষ’ যেটি গেল প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অসমিয়া লেখক, শিক্ষক, ছাত্র সমাজে প্রায় ‘বেদে’র মর্যাদা পেয়ে আসছে, যেটি এই এক শতাব্দী লিখিত ভাষাটিকে প্রায় শাসন করে গড়ে তুলেছে বললে অত্যুক্তি করা হয় না, সেটি সম্পর্কেই এই অভিযোগগুলো শোনা যাচ্ছে সম্প্রতি।
         ১৮৭৩এ অসমে প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে অসমিয়া স্বীকৃতি পাবার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়গুলোতে এবং অফিস-কাছাড়িতে ব্যাকরণের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। হেমচন্দ্রের ব্যাকরণটির সংশোধিত সংস্করণ বেরিয়েছিল সেই প্রেক্ষাপটে। ওই সময়ে আরো বেশ ক’টি ব্যাকরণও বেরিয়েছিল। যেমন ১৮৭৪এ দীনবন্ধু তর্কালঙ্কারের ‘অসমীয়া ল’রার ব্যাকরণ’, ১৮৮৭তে নারায়ণ শর্মা বিদ্যাভূষণের ‘আশুবোধ ব্যাকরণ’ ইত্যাদি আরো বেশ ক’টি । কিন্তু এগুলোর প্রায় সবক’টিই হেমচন্দ্রের ব্যাকরণকে অনুসরণ করে। মৌলিকতা বিশেষ আছে বলে পরবর্তী কেউ মনে করেন না। কিন্তু ঐ সময়ে আরো একটি বই অসমিয়া বাংলার তুলনামূলক আলোচনার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৯৪তে সেটি লেখেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জি এফ নিকল। বইটির নাম Manual of the Bengali Language Compromising a Bengali Grammar and Lessness with Various Appendix including Assamese Grammar . এই বইটির সন্ধান পাওয়া জরুরি। নামে মনে হয় এটিতে দুটো ভাষার তুলনামুলক অধ্যয়ন কিছু হয়েছিল। আমাদের মনে পড়বে এই বছরেই শুরু হয়ে গ্রিয়ার্সনের ভারতীয় ভাষা সমীক্ষার কাজ, শেষ হয়েছিল তিন দশক পরে ১৯২৮এ। এটির কথা সবাই জানেন বলে বিস্তৃত লিখছি না আর। ব্যাকরণের এর পরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা হচ্ছে ১৯২৫এর সত্যেন্দ্রনাথ বরার ‘বহল ব্যাকরণ’। এই দুটিতে ব্যাকরণ রচনা ভাষাবিজ্ঞানকে স্পর্শ করছে গিয়ে। ভূমিকাতে সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছেন, ব্যাকরণ ভাষা শেখায় না, ভাষাটিকে ছিঁড়ে ফুড়ে ভেতরের স্বরূপ চেনায়। ১১অন্য আরো দু’টি ১৯৩৩এ প্রকাশির শৰৎ চন্দ্রগোস্বামীৰ ‘সৰল ব্যাকৰণ’। রেফ চিহ্নের পর অসমিয়া বানানে ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব পরিহার করবার ভাবনা তাঁর থেকেই প্রচলিত হতে শুরু করে। অন্যটি, ১৯৩৬এ প্রকাশিত কালীরাম মেধির Assamese Grammar and Origin of the Assamese Language.এর একটি অসমিয়া সংস্করণও রয়েছে ‘অসমীয়া ব্যাকরণ আৰু ভাষাতত্ত্ব।’ তিনিও সত্যেন্দ্রনাথের পথে হেঁটেছেন সেই সঙ্গে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান অধ্যনের দিকেও পা ফেলেছেন, অনেকটাই। অবশ্য বাণীকান্ত কাকতির বেশ আগেই গ্রীয়ার্সন এবং অধ্যাপক নিকলকে বাদ দিলে কোনো অসমিয়া বিজ্ঞানীর হাতে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের সূচনা হয়েছিল দেবানন্দ ভঁরালীর ‘অসমীয়া ভাষার মৌলিক বিচার আরু সাহিত্যর চিনাকি’ (১৯১২) বইটি দিয়ে। কুড়ি বছর পরে এর এক সমৃদ্ধ দ্বিতীয় সংস্করণও বেরিয়েছিল। তিনিই প্রথম অসমিয়া ভাষার উৎপত্তি, ব্যাকরণের উপকরণের উৎপত্তি এসব নিয়ে ভাবেন এবং আধুনিক ব্যাকরণ কেমন হবে তার ধারণা দেবার প্রয়াস করেন। এর পরেই সত্যেন্দ্রনাথের ব্যাকরণটিও লেখা সম্ভব হয়ে উঠে। এঁরা তখনই গ্রীয়ার্সনের বইটি দেখেছিলেন বলে মনে হয় না। কারণ বইটি ছাপা যদিও শুরু হয়েছিল ১৯০৩এ সব ক’টা খণ্ডের কাজ শেষ হয়েছিল ১৯২৮এ।
      
ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের পথে পাঃ এই অব্দি সময়টাকে আমরা মোটা দাগে ব্যাকরণ, অভিধান চর্চার সময় বলে আলাদা করতে পারি। ১৯৪১এ বাণীকান্ত কাকতির বহুখ্যাত Assamese : its formation and Development বইটি বেরুবার সঙ্গে সঙ্গে চিত্রটি একেবারেই পালটে যায়। যেমন পালটে যায় সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের বিখাত ODBL বেরুবার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস। কিন্তু মাঝখানে আমাদের বাংলাতে যেমন ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ এবং সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথ, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীদের ভাষাবিজ্ঞান চর্চার কথা ভুললে চলবে না। তেমনি অসমে সেই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শাখা গড়বার প্রয়াস এবং পরে কামরূপ অনুসন্ধান সমিতি তথা অসম সাহিত্য সভা গড়ে ওঠা, এবং সেই সঙ্গে ভাষার সমাজবিজ্ঞান বা সামাজিক ভাষাতত্ত্ব নিয়ে যেসব আন্দোলন এবং লেখালেখি হচ্ছিল সেগুলোর কথাও আসলে মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া, পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ, পদ্মনাথ গোহাঞি বৰুৱাদের বিভিন্ন আন্দোলন, গবেষণা এবং অনুসন্ধানের কথা। যেগুলো ছাড়া আসলে বাণীকান্ত কাকতির আবির্ভাব রহস্য এবং গুরুত্ব অনুধাবন করা মুস্কিল হবে। উদাহরণ স্বরূপ আমরা, অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি বেণুধর রাজখোয়ার Notes on the Sylhetee Dialect বইটির কথাই উল্লেখ করতে পারি। যেটিতে তিনি সিলেটিকে অসমিয়া ভাষা বলে প্রথম দাবী করেন এবং এক দীর্ঘ ঔপভাষিক বা ভাষারাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা করেন। সম্ভবত উপভাষাতত্ত্ব নিয়ে এইটিই প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এর আগে আমরা কয়েকটি অভিধানে উপভাষাকে গুরুত্বদেবার কথা উত্থাপন করেছি। কিন্তু সেগুলো ছিল অভিধান বা ব্যাকরণ মাত্র । বেনুধর রাজখোয়ার বইটি এখন আলাদাভাবে দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু নানান ভাষাবিদের রচনাতে তার প্রচুর উল্লেখ থাকাতে অনেকটাই পুনরুদ্ধার সম্ভব। এবং যথাসময়ে আমাদের তা করতে হবে।
            বাণীকান্ত কাকতির পথ অনুসরণ করে কিন্তু তাঁকে অতিক্রম করে পরের দশকে বিরিঞ্চি কুমার বরুয়া লেখেন ‘ভাষা আরু সংস্কৃতি’ । ১৯৫৭তে বইটি প্রকাশ পায়। একই বছরে বেরোয় ডিম্বেশ্বর নেওগের New Light on the history of Growth of Assamese Language বইটি। এর অনেক বছর পর আমরা ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে লেখা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বই পাচ্ছি ১৮৮৫তে লেখা বিশ্বেশ্বর হাজারিকার Assamese language: Origin and Development । দাবি করা হয়, এই তিনটি বেশ তথ্য এবং তত্ত্ব সমৃদ্ধ অসমিয়া ভাষার ইতিহাসের গ্রন্থ।
    
 ভাষাতত্ত্ব থেকে ভাষাবিজ্ঞানে উত্তরণঃ ব্যাকরণ , অভিধান রচনার নতুন ধারাঃ এই সময়ের মধ্যেও ব্যাকরণ রচনার ধারা অব্যাহত ছিল। প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক এক একখানা ব্যাকরণ লিখলেও কে সঠিক ব্যাকরণ লিখতে পারলেন এই নিয়ে তর্কও বাংলার মতোই তীব্র ছিল। ডিম্বেশ্বর নেওগ, উপেন্দ্রনাথ গোস্বামী, ভগবান মরল, বাপচন্দ্র মহন্তের মতো খ্যাতনামা ভাষাবিজ্ঞানীরাও ব্যাকরণ রচনাতে হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭২এ লেখা গোলক চন্দ্র গোস্বামীর ‘অসমীয়া গোলক ব্যাকরণ- সুবোধ এবং প্রবোধ ভাগ’ খুব ধীরে হলেও অসমিয়া ভাষা চিন্তার জগৎখানাই পালটে দেয়। ১৯৮৭তে প্রকাশিত তাঁর আরো একখানা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘অসমীয়া ব্যাকরণর মৌলিক বিচার।( প্রথম ভাগ)’ । ২০০০এ তৃতীয় আরেকখানা লেখেন ‘অসমীয়া ব্যাকরণ প্রবেশ’। ব্যাকরণ রচনাতে গতানুগতিক পথে যারা হাঁটছিলেন তাদের প্রায় প্রত্যককেই এক প্রত্যাহ্বানের মুখে ঠেলে দেয় তাঁর এই বইগুলো এবং অন্যান্য ভাষাবৈজ্ঞানিক রচনা। ১৯৫৬তে প্রকাশিত দেবানন্দ ভঁরালির A study of Phonology and Vocabulary the Assamese Language বইটিতে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অসমিয়া ধ্বনিতত্ত্ব এবং শব্দভাণ্ডার নিয়ে অধ্যয়নের সূচনা হয়েছিল যদিও সিদ্ধি জুটেছিল ভাষাচার্য গোলক চন্দ্র গোস্বামীর ১৯৬৬তে লেখা An Introduction of Assamese Phonology বইটিতেই। অসমিয়া ভাষা চিন্তাতে তাঁর প্রভাব এতোটাই সুদূর প্রসারী হলো যে দেবব্রত শর্মার মুখ্য সম্পাদনাতে ২০১০এর ১ জানুয়ারী থেকে পরের তিন বছরে কয়েক হাজার পৃষ্ঠার চারটি সুবৃহৎ খণ্ডে বেরিয়ে ‘অসমীয়া জাতীয় অভিধান’ রীতিমত এক জাতীয় ভাষা আন্দোলনের জন্ম দিয়ে দিয়েছে সমগ্র অসমে। এর শুধু শেষ খন্ডটিরই পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৭০০! যার প্রায় দ্বিতীয় কোনো তুলনা সমগ্র ভারতে আমাদের মনে পড়ে না। রবীন্দ্রনাথ যে সামগ্রিক বাংলা অভিধানের স্বপ্ন দেখেছিলেন সেরকমতো ভারতে হয়েছে বলে শুনিনি, কিম্বা মহম্মদ শহীদুল্লাহ যেভাবে বাংলা দেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান রচনা করেছিলেন বা করিয়েছিলেন সেটিও রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতার জন্যে সামগ্রিক বাংলার অভিধান হয়ে উঠতে পারল না। অসমিয়াতে সেটিই সম্ভব করে তুললেন দুই অধ্যাপক মদন শর্মা এবং দেবব্রত শর্মার নেতৃত্বে ‘অসমীয়া জাতীয় প্রকাশনে’র এক বিশাল ভাষাকর্মী বৃন্দ। এঁদের মূল ভাষাচিন্তার গুরু কিন্তু ভাষাচার্য গোলক চন্দ্র গোস্বামী। যিনি গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম যুগে বাংলাও পড়িয়েছেন এবং পারিবারিক সূত্রে ধর্মবিপ্লবী শ্রীচৈতন্যের পরিবারের উত্তর পুরুষ। অর্থাৎ কোথাও স্রোতের বিরুদ্ধে হাঁটার প্রেরণা তিনি পরিবার থেকে পেলেও পেতে পারেন। ভাষাচার্যের পরে থেকেই মূলত অসমিয়া ভাষা তথা ব্যাকরণ চর্চাতে আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক চিন্তা গুরুত্ব পেতে শুরু করে। নামে ব্যাকরণ হলেও অনেক গুলো বই আসলে ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অসমিয়া ভাষার স্বরূপ বিশ্লেষণ। যেমন ১৯৯১তে প্রকাশিত দীপ্তিফুকন পাটগিরির ‘আধুনিক অসমীয়া ব্যাকরণ’, কিম্বা ঐ একই বছরে নরনারায়ণ শর্মার ‘অসমীয়া ভাষার রূপতত্ত্ব আরু ব্যাকরণ’, কিম্বা ১৯৯৫তে প্রকাশিত রুণিমা চৌধুরীর Assamese Verbs: A study in the Structural Paradigm. এই সারিতে সবচে গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানিত গ্রন্থ বোধকরি ভীমকান্ত বরুয়ার ১৯৯৬তে প্রকাশিত ‘অসমীয়া ভাষা’ বইটি।
    
 ভাষাতত্ত্ব থেকে ভাষাবিজ্ঞানে উত্তরণঃ তাত্ত্বিক অনুসন্ধানঃ বস্তুত এই সময়েই অসমিয়া ভাষাতে ভাষাবিজ্ঞান চর্চারও জোয়ার আসে ।আধুনিক বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের চর্চা ভারতীয় বাংলাতেও সত্তর আশির দশকের আগে খুব বেশি হয় নি। সস্যুরকে না জেনেই আগেই রবীন্দ্রনাথের হাতে বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সূচনা হলেও পরবর্তী প্রায় সবাই হাঁটছিলেন সুনীতি কুমার, সুকুমার সেনের পথ ধরে। বোধ করি ১৯৮৪ নাগাদ প্রকাশিত রামেশ্বর শ’-এর ‘সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা’ বইতেই প্রথম ভাষাবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দিকগুলোর সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটিয়ে     দেন। ১২ বরং বাংলাদেশ এই নিয়ে যে এগিয়েছিল এই কথা তিনি নিজেও যেমন লিখেছেন তেমনি সমর্থণ করেছেন হুমায়ুন আজাদ তাঁর দু’খন্ডের ‘বাংলা ভাষা’ সংকলনের ভূমিকাতে  ।১৩ অসমিয়াতে এই তাত্ত্বিক চর্চাটি আগেই শুরু হয়েছিল। উপেন্দ্র নাথ গোস্বামীর ‘ভাষাবিজ্ঞান’ ( ১৯৭৬) বইটি দিয়ে। এই পথে পরে লিখেছেন ফণীন্দ্র নারায়ণ দত্তবরুয়া ‘আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান পরিচয়’( ১৯৯০); ভাগবান মরলের ভাষার্থ বিজ্ঞান (১৯৮৮); রমেশ পাঠকের ‘ভাষা বিজ্ঞান ভূমিকা’( ১৯৮৫), ব্যাকরণ আরু প্রাকৃতি বিজ্ঞান’ ( প্রকৃতি নয় –লেখক) ( ১৯৮৮), দীপ্তি ফুকন পাটগিরির ‘ভাষাতত্ত্ব’ ( ১৯৯১) এবং ভাষাতত্ত্বর বিচিত্র কথা’( ১৯৯৬); দীপঙ্কর মরলের ‘উপভাষা বিজ্ঞান’( ১৯৯১) । এছাড়াও কটন কলেজের শতবার্ষিকীতে প্রকাশিত ‘চিন্তন আরু মনন (২০০০) এবং নাহেন্দ্র পাদুন সম্পাদিত দু’খানা প্রবন্ধ সংকলনের একটি ‘ভাষার তত্ত্বকথা’           ( ১৯৯৩) এবং ‘চিন্তা-প্রবাহ’ ( ১৯৯৬-৯৭) সাক্ষ্য দেয় যে ভাষা বিজ্ঞানের একেবারে শেষচিন্তা চমস্কি এবং চমস্কি উত্তর বিকাশের ধারা নিয়েও অসমিয়া ভাষাকর্মীরা রীতিমত চিন্তিত , মানে ওয়াকিবহাল।
       ভাষাতত্ত্ব থেকে ভাষাবিজ্ঞানে উত্তরণঃ উপভাষাবিজ্ঞান এবং তুলনামূলক অধ্যয়নে  মনোনিবেশঃ : উপভাষা চর্চাদিয়েই অসমিয়া অভিধানের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই ১৭৯৫তে। বা বেণুধর রাজখোয়ার Notes on the Sylhetee Dialect বইটির কথা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। এমন দু’চারটি বই খবর করলে এদিকে ওদিকে আরো পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু যথার্থ ভাষাবৈজ্ঞানিক উপভাষাচর্চারও সূচনা করেন উপেন্দ্রনাথ গোস্বামী ১৯৭০এ তাঁর A Study on Kamrupi: A Dialect of Assamese বইটির মধ্যি দিয়ে। এই ধারাতে পরের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো দীপঙ্কর মরলের Phonology of Assamese Dialect: contemporary Standard and Mayong ( 1992); ধীরেন্দ্র নাথ দাসের The Dialect of Goalpara and Kamrupi: A comparative Analysis (1999), বিভা ভঁরালীর ‘কামরূপী উপভাষাঃএটি অধ্যয়ন’( ২০০৪) এবং জীবন চন্দ্র পাঠকের ‘দরঙী উপভাষা অধ্যয়ন’ (২০০৫)। বোঝাই যাচ্ছে এখনো উপভাষাগুলোর এক বিশাল ক্ষেত্র অনধিত থেকে গেছে। যদিও ২০০৯তে প্রকাশিত উপেন রাভা হাকাচামের ‘অসমীয়া আরু অসমর ভাষা-উপভাষা’ বইটি এই বিষয়টি নিয়ে এক উল্লম্ফন বলে বিবেচিত হতে পারে। বইটিতে তিনি অসমিয়ার সমস্ত স্বীকৃত উপভাষার আলোচনা করেছেন। এমন কি স্বীকৃত/ অস্বীকৃত উপভাষার তালিকাতে হাজং, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি (মায়াং)এর আলোচনাও যেমন সেরে নিয়েছেন অসমিয়ার জাতিগত/সামাজিক শ্রেণিগত উপভাষার তালিকা ধরে ঝাড়খণ্ডি আদিবাসীদের, ময়মন সিংহ মূলীয়দের সঙ্গে সিলেটির আলোচনাও করেছেন। সেদিক থেকে এই বইটির বিষয় বৈচিত্র এবং এবং অধ্যয়ন ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক।
      
  উপভাষা অধ্যয়নের পাশাপাশি উপেন রাভা হাকাচামের এই বইটি অবশ্য ১৯৭৭এ প্রমোদ চন্দ্র ভট্টাচার্য প্রতিবেশি ভাষাগুলো, বিশেষ করে ভোটবর্মী ভাষাগুলো অধ্যয়নের যে ধারার সূচনা করেছিলেন সেই ধারাতেও এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তিনি অসমিয়ার সঙ্গে প্রতিবেশি ভোটবর্মী ভাষাগুলোরও এক বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। এই বিষয়ে তাঁর আরেকটি স্বতন্ত্র বইএর নাম ‘অসমীয়া আরু অসমর তিব্বত-বর্মীয় ভাষা ’(২০০০) । ১৯৯৭তে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে করা তাঁর গবেষণা সন্দর্ভের নামই ছিল “Rabha and Assamese Language: A Comparative Study” সুতরাং আমাদের পরবর্তী অসমিয়া বাংলা ভাষা এবং উপভাষাগুলোর যে কোনো অধ্যয়নেও এই নবীন ভাষাবিজ্ঞানীকে বারে বারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখতে হবে। এটি এর জন্যেও যে বাংলাতে সেই ১৯৫১তে ‘কিরাত জনকৃতি’ দিয়ে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় যে মহান কাজটির সূচনা করেছিলেন তাও অসমের মাটিতে যোরহাট জগন্নাথ বরুয়া কলেজের এক সম্মেলন বসে, বিচ্ছিন্ন কিছু কাজবাদ দিলে তাঁর আর প্রায় কোনো গুরুত্বপুর্ণ উত্তরাধিকার নেই। অথচ, অসম তথা পূর্ববাংলাতে প্রচলিত বাংলা ভাষার অধ্যয়নে এই দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যয়নের বিষয় বলে বিবেচিত হওয়াই উচিত।
              অসমিয়াতে ১৯৮৮র সত্যেন্দ্রনারায়ণ গোস্বামীর Studies in Sino-Tibetan Language , ভীমকান্ত বরুয়ার ‘অসমর ভাষা’( ১৯৯০), একই লেখকের Nagamese : The Language of Nagaland ( ১৯৯৩), উপেন্দ্রনাথ গোস্বামীর An introduction to the Deuri Language ( 1994), এম আর বড়োর The Bodo Structure (1991), টাবু টাইডের A Dictionary of the Missing Language (1995), অপর্ণা কোঁওরের Karbi People and Their Language: A Critical Study (1991) ইত্যাদি বইগুলোর প্রত্যেকটিই এই ভোট-বর্মী ভাষাগুলো বা তাদের মধ্যে প্রচলিত নাগামীজের মতো আর্যভাষাগুলোর অধ্যয়ন করেছে ব্যাপক গভীরে গিয়ে।
              সেই যাদুরাম ডেকাবরুয়ার অভিধানেই অসমিয়া-বাংলার তুলনামূলক অধ্যয়নের সূচনা হয়েছিল। এর পরে প্রায় কোনো অসমিয়া ভাষা বিজ্ঞানের বই নেই যেখানে কোনো না কোনো ভাবে বাংলা ভাষার প্রসঙ্গ আসেনি। বাণীকান্ত কাকতির বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থটিতেতো বটেই। সে অবশ্যি বাংলা ভাষাতত্ত্বের বই সম্পর্কেও সত্য। বাংলাতে সম্ভবত অসমিয়া ভাষাতত্ত্ব চর্চার শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ । তাঁর ‘শব্দতত্ত্ব’ বইতে ‘ভাষাবিচ্ছেদ’ ছাড়াও ‘বাংলা বহুবচন’ প্রবন্ধে তার স্বাক্ষ্য রয়েছে। সুনীতি চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থটিতে সেই কাজ করেছেন বেশ গভীরে প্রবেশ করেই। তাঁর ছাত্রই ছিলেন বাণীকান্ত। সাহিত্যের ইতিহাসও লেখা সম্ভব হয় নি বাংলা অসমিয়া ওড়িয়া ইত্যাদি মাগধি অপভ্রংশজাত ভাষাগুলোর তুলনামূলক আলোচনা ছাড়া। বিশেষ করে চর্যাপদ এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের মতো গ্রন্থগুলো আলোচনাতেতো বটেই। অসমিয়া জাতীয়তা নিয়ে যেকোন আলোচনাতেও বাংলা প্রসঙ্গ এসেই থাকে। যেগুলো বাংলা সম্পর্কে অসমিয়া ভাষাবিজ্ঞানী বা তাত্ত্বিকদের দৃষ্টিভঙ্গীগুলোকে বুঝতে সাহায্য করবে। আমরা তা করব পরে যথাসময়ে। কিন্তু ১৯৭৮এ ফণীন্দ্র কুমার দত্তবরুয়ার গবেষণাগ্রন্থ A Comparative Analysis of the Morphological Aspects of Assamese and Oriya –তে যেন বিশেষ জোর দিয়েই আলাদা করে প্রতিবেশী আর্যভাষাগুলো নিয়ে ভাষাবৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন শুরু হলো। তেমনি আরেকটি সুপরিচিত বই দীপ্তি ফুকন পাটগিরির ‘অসমীয়া বাংলা আরু উরিয়া ভাষা’ (২০০৪)।ভারতীয় আর্যভাষাগুলোর স্তরগুলো নিয়ে তুলনামূলক আলোচনার জন্যে দু’টো গুরুত্বপূর্ণগ্রন্থ নগেন ঠাকুরের ‘পালি প্রাকৃত অপভ্রংশ ভাষা আরু সাহিত্য’    ( ১৯৯২) এবং সুবাসনা মহন্তর ‘ভারতীয় আর্যভাষার পরম্পরাত উদ্ভবকালীন অসমীয়া ভাষার গঠন। (২০০০) এ ছাড়াও, বিশ্বজিৎ দাস এবং ফুকন চন্দ্র বসুমতারীর সম্পাদনাতে ২০১০এ প্রকাশিত ‘অসমিয়া এবং অসমর ভাষা’ নামের সংকলন গ্রন্থটিও এই সারিতে এক নতুন সংযোজন।
       এখনো বাকি বহু পথ হাঁটাঃ পুরো আলোচনাকে গুটিয়ে আনলে আমরা দেখব অসমিয়া ভাষা চর্চার শুরুটা অসমিয়াদের হাতেই। উপভাষার চর্চা দিয়েই। রবিনসনের ব্যাকরণ যে ভাষাকে বাংলা করে তুলতে চাইছিল নাথান ব্রাউনের ব্যাকরণ তাকে আবার স্রোতে দাঁড় করালো। কিন্তু ব্রাউনের ব্যাকরণে মূরের হস্তক্ষেপ থেকে বোঝা যায় রবিনসনের ধারাটিও সমানে সজীব ছিল। পরবর্তীতে হেমচন্দ্র বরুয়া নিজের লেখা ব্যাকরণ এবং অভিধানে অসমিয়ার স্বাতন্ত্র্যকে আরো প্রতিষ্ঠা দিলেন। অসমিয়ার প্রচারেও তিনি ছিলেন আন্তরিক। তাঁর আদর্শ এতোটাই প্রতিষ্ঠা পায় যে পরবর্তী প্রায় এক শতাব্দী তা অসমিয়া লিখিত ভাষাকে রীতিমত শাসন করে। অতি সম্প্রতিই শুধু ভাষাবিজ্ঞানী গোলকচন্দ্র গোস্বামী, উপেন্দ্রনাথ গোস্বামী, ভীম কান্ত বরুয়া, রমেশ পাঠক, অপর্ণা কোয়রদের যুগেই তাঁর বিরুদ্ধে সংস্কৃত এবং বাংলাকে অনুসরণ করবার অভিযোগ উঠছে। হেমচন্দ্র বরুয়ার ১৯০০তে মৃত্যুর তিনবছরের মধ্যেই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। যার ঢেউ অভিবক্ত অসমেও পৌঁছেছিল। এখানেও এর শাখা গড়ে তুলবার আয়োজন চলছিল। যার পরিণতি একদিকে ছিল কামরূপ অনুসন্ধান সমিতি অন্যদিকে অসম সাহিত্য সভার সূচনা। তাই সত্যেন্দ্রনাথের ‘বহল ব্যাকরণে’র মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও লেখা হয়েছিল যা ছিল নির্দেশ দেবার বিপরীতে ভাষার নিয়ম অনুসন্ধানের প্রথম প্রয়াস। দেবানন্দ ভঁরালীর ‘অসমীয়া ভাষার মৌলিক বিচার আরু সাহিত্যর চিনাকি’ (১৯১২) বইটি দিয়ে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের সূচনাও এই পরিবেশেই সম্ভব হয়েছিল।
                  অন্যদিকে ভাষাতত্ত্বের চর্চাতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে অসমিয়া ভাষাবিজ্ঞানীরা কিন্তু বাঙালি বিশেষ করে ভারতীয় বাঙালিদের থেকে এগিয়ে পা ফেলেছেন। টেঙাই পণ্ডিত বা রুচিনাথ কামরূপীর সময় কোনো বাঙালি অভিধান রচনাতে হাত দেন নি, আর কোনো সাহেবও অসমে পা ফেলেন নি। গোলক চন্দ্রগোস্বামী, উপেন্দ্রনাথ গোস্বামীরা যখন আধুনিক বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান চর্চা করছেন ভারতীয় বাঙালিরা তখন সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেনের শাসনে ‘পরাধীন’, স্বাধীন পদক্ষেপ নেবার কথা ভাবছেনই না। ভোট-বর্মী ভাষাগুলোতে ‘কিরাত জনকৃতি’র পথে বাঙালিরা বিশেষ পা বাড়াননি। অতি সম্প্রতি উত্তর বাংলা বা ত্রিপুরাতে কিছু অধ্যয়নের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু অসমিয়াতে এই শাখার অধ্যয়ন বহুদূর এগিয়ে গেছে।
তারপরেও এটি ঠিক যে ব্যাকরণ এবং অভিধান বাক্যতত্ত্ব নিয়ে, উপভাষাগুলো নিয়ে, অনসমীয়া আর্য, অনার্য ভাষাগুলো নিয়ে সুগভীর কাজকর্ম এখনো অনেক করার আছে। ঐ সেদিন ২০১০এ গ্রেগরি এণ্ডার্সন, ডেভিড হ্যারিসন এবং গণেশ মুর্মুর নেতৃত্বাধীন এক গবেষক দল অরুণাচল প্রদেশে ‘কোরো’ বলে এক নতুন ভাষা খুঁজে বের করলেন। এমন প্রচুর কাজ এখানে অসমিয়া, বাংলা , হিন্দি যেকোনো ভাষাতেই করবার বাকি আছে। উজান অসমের বিভিন্ন জেলার অসমিয়া ভাষাবৈচিত্রগুলো নিয়ে অধ্যয়ন প্রায় নেইই। বাংলার সঙ্গে অসমিয়ার তুলনামূলক অধ্যয়ন এখনো গভীরে গিয়ে প্রবেশ করে নি। সাধুবাংলা বা কলকাতার মান বাংলার সঙ্গে অসমিয়ার সম্পর্ক তুলনা করতে গিয়ে প্রতিবেশি বাংলা উপভাষা নিয়ে অনেক সত্যই আড়ালে থেকে যায়, যেগুলোর অনুসন্ধান হয়তো দুটো ভাষার সম্পর্কেই অনেক নতুন তথ্য এবং সত্যের মুখোমুখি করতে পারত। উপেন রাভা হাকাচাম ‘অসমীয়া আরু অসমর ভাষা-উপভাষা’ বইয়ের মুখবন্ধে অসমের বেশ কিছু সামাজিক শ্রেণি উপভাষার নাম করেছেন , “নেপালী সকলর নেপালী- অসমীয়া, অভিবাসী সম্প্রদায়র উজানী (দেশী) আরু ভাটিয়া (ময়মন সিঙীয়া) অসমীয়া, কাছারর বাঙালীসকলর চিলেটীয়া (কাছারীয়) অসমীয়া, অভিজাত আরু শিক্ষিত বাঙালী পরিয়ালর ঔপনিবেশিক অসমীয়া (ব্রিটিছর দিনত মফচলীয় আমোলাপট্টিত আরু সম্প্রতি রেলোয়ে কলনিত এনে ভাষার নমুনা পোয়া যায়) ,নগর-মহানগর কেন্দ্রিক মাড়োয়ারী সম্প্রদায়র হিন্দী মিশ্রিত বজরুয়া অসমীয়া (broken Assamese), কুলি-নাপিত-ধোবা-রিক্সাওয়ালা আদি বৃত্তিজীবি লোকর দেশোয়ালী অসমীয়া ইত্যাদি এই শ্রেণীর অসমীয়ারূপে অতি সম্প্রতি বহুভাষিক অসমীয়া মাতৃভাষী চাকরিজীবি ,ব্যবসায়, গৃহীণী আরু ছাত্র-ছাত্রীকো প্রভাবান্বিত করি 'চলতি অসমীয়া' বা 'জনপ্রিয় অসমীয়া ভাষা'র প্রচলনত ইন্ধন যোগাইছে।”১৪ এর থেকে স্পষ্ট তিনি ‘চিলেটীয়া অসমীয়া’দের ‘অসমীয়া মাতৃভাষী’দের সঙ্গে একাকার করছেন না। বরং সিলেটিকে অসমের ভাষা অর্থেই অসমিয়া বলছেন। তাহলে এই ভাষাগুলোকে তিনি উপভাষা কেন বলছেন এই প্রশ্ন উঠতেই পারে । এই প্রশ্নও অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে যে মূল অধ্যায়ে তিনি মারোয়াড়ি বা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার রেলওয়ে কলোনির বাংলাকে নিয়ে আলোচনা করতে উৎসাহ দেখালেন না কেন? শুধু তিনিই নন, প্রায় কোনো অসমিয়া ভাষাবিদকেই এদের নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করতে দেখা যাবে না। এগুলো না করবার ফলে বিভ্রান্তি কেমন বাড়ে তার আরেকটি নজির প্রখ্যাত অসমিয়া ভাষাবিদ অধ্যাপক ড০ রমেশ পাঠকের এই মন্তব্য। তিনি এক্কেবারে সন তারিখ দিয়ে দাবি করেছেন , “ চিলেটর ভাষার সৈতে অসমীয়া ভাষার সম্পর্ক বর্তমান অবস্থাত বিচারিবলৈ যোয়াটো পর্বতত কাছকণী বিচারিবলৈ যোৱাৰ দরে হ’ব, কারণ বাংলা ভাষাই চিলেটী ভাষার রূপ এনেদরে সলাই পেলাইছে যে চিলেটী এতিয়া বাংলা ভাষারে আঞ্চলিক রূপ মাথোন। অথচ, ১৯১৩ চনলৈকে চিলেটী ভাষা অসমীয়া ভাষার সৈতে অদ্ভূৎ ধরণে মিলিছিল। ... ১৯১৩ চনত ওলোয়া বেণুধর রাজখোয়ার Notes on Sylhetee Dialect বোলা গ্রন্থখনর পরা তথ্যবোর দিয়া হৈছে। ...”১৫তার মানে ১৯১৩তে যেহেতু বেনুধর রাজখোয়ার বইটি বেরিয়েছিল সুতরাং ওই পর্যন্ত ভাষাটি প্রায় অসমিয়াই ছিল। তার পর থেকে একে বাংলা গ্রাস করেছে । এরকম ভাষাগ্রাস করা সম্ভব কিনা, সিলেটির মধ্যে আদৌ তেমন অস্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন হয়েছে কিনা এই সব ভাষাতাত্ত্বিক প্রশ্ন এক পাশে সরিয়ে রেখেও যে বিপজ্জনক আশঙ্কাটি তাঁর লেখাতেও স্পষ্ট যে এমন ভাষাতত্ত্ব অহেতুক সাধারণ অসমিয়াদের মনে বাংলা সম্পর্কে এক আতঙ্ককে লালন করতে সাহায্য করে। ড০ রমেশ পাঠকেরও মন্তব্যেরই মাঝের অংশে রয়েছে, “ চিলেটত যি ঘটিছিল বা ঘটিল তেনে ঘটনার প্রক্রিয়া কাছারতো আরম্ভ হৈছে...।” আমরা কিন্তু এখনো ড০ রমেশ পাঠকের মতো এতোটা হতাশ হয়ে মনে করিনা যে সিলেটির সঙ্গে অসমিয়ার সম্পর্ক সন্ধান করতে যাওয়াটা পর্বতে কচ্ছপের ডিম সন্ধানের মতো ব্যাপার।এতোটা মৌলিক পরিবর্তন দুই ভাষার কোনোটিরই ঘটেনি। তার সঠিক স্বরূপ তুলে ধরতে আমাদের ব্রিটিশ কিম্বা বর্তমান অসমের মানচিত্রের বাইরে বেরুতে হবে । প্রাচীন কামরূপের মানচিত্র, তথা ব্রহ্মপুত্র নদীর সমগ্র দক্ষিণ পূর্ব তীর অনুসরণ করতে হবে।
                ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাংলা নিয়ে এখনো প্রায় কোনো কাজ নেই অসমিয়াতে। বাংলাতেও নেই। সাদ্রি ভাষার সম্পর্কে কিছু অনুসন্ধান হয়ে থাকলেও সাওঁতালি,মুণ্ডারি কিম্বা খাসিয়ার মতো পূর্বোত্তরীয় জীবন্ত অষ্ট্রমূলীয় ভাষা সম্পর্কে অধ্যয়নও অনেক নতুন আলোর সন্ধান দিতে পারত। ভীমকান্ত বরুয়ার ‘অসমর ভাষা’তে  পূর্বোত্তরের সমস্ত ভাষা নিয়েও আলোচনা আছে।১৬ মণিপুরি থেকে ককবরক। নাগামিজ এবং নেফামিজ নিয়ে ইনি অন্যতম বিশেষজ্ঞ পূর্বোত্তরে। কিন্তু মেঘালয়ের ভাষা প্রসঙ্গেও তিনি খাসি ভাষা নিয়ে আমরা সুনীতি চট্টপাধ্যায় বা বাণীকান্ত কাকতির দিন থেকে যা জেনে এসছি তার থেকে একটিও বেশি বাক্য ব্যয় করেন নি । অথচ ক্ষুদ্র হলেও খাসিয়া কিন্তু বর্তমান অসমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। রাষ্ট্রীয় এবং ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন এগুলোর পথে বাঁধা, তেমনি ভাষারাজনৈতিক পরিবেশও জটিলতা বাড়িয়ে রেখেছে। সেই পরিবেশ কাটিয়ে উঠতেও ভাষার অধ্যয়ন এক অন্যতম উপায় বলে বিবেচিত হতেই পারে। বিজ্ঞানবোধের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণার সংঘাত বেঁধে যাবার ভয়েও অনেকে অধ্যয়নে বিরত থাকেন। এই কথা অসমিয়ার সম্পর্কেতোও বটেই , বাংলার সম্পর্কেও সমান সত্য।
--- --- ---- ---
১১-০৯-২০১২; শিলচরে শেষ।
--- --- ---- ---




উল্লেখপঞ্জিঃ
১) সম্পাদকীয় আগকথা; অসমীয়া জাতীয় অভিধান, ১ম খন্ড, অসমীয়া জাতীয় অভিধানঃ বৃহত্তর আরু মহত্তর অসমীয়া জাতি গঠনর অভিজ্ঞান; সম্পাদনা ড০ দেবব্রত শর্মা; অসম জাতীয় প্রকাশ; যোরহাট; ২০১০; পৃঃ২৪
২) ড০ প্রফুল্ল মহন্ত; অসমীয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির ইতিহাস; পৃঃ ১৯২ ।
৩) সম্পাদকীয় আগকথা;অসমীয়া জাতীয় অভিধান, ১ম খন্ড, অসমীয়া জাতীয় অভিধানঃ বৃহত্তর আরু মহত্তর অসমীয়া জাতি গঠনর অভিজ্ঞান; সম্পাদনা ড০ দেবব্রত শর্মা; অসম জাতীয় প্রকাশ; যোরহাট; ২০১০; পৃঃ ৮।
৪) অসমীয়া ভাষাত রবিন্সন আরু ব্রাউনর ব্যাকরণঃ লক্ষ্য আরু উদ্দেশ্য; অসমীয়া ভাষা; ড০ ভীমকান্ত বরুয়া;বনলতা, ডিব্রুগড়; পৃঃ১৫৭ ।
৫) ভাষাবিচ্ছেদ; শব্দতত্ত্ব; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; রবীন্দ্ররচনাবলী; ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ, বিশ্বভারতী; ১৯৮৫।
৬) অসমত ভাষা অধ্যয়নর ইতিহাসঃ এটি আভাস;ভাষা বিজ্ঞান আরু অসমীয়া ভাষার পরিচয়;শরাই ঘাট প্রিন্টার্স প্রকাশন, গুয়াহাটি;২০০৭; পৃঃ৯২।
৭)সম্পাদকীয় আগকথা;অসমীয়া জাতীয় অভিধান, ১ম খন্ড, অসমীয়া জাতীয় অভিধানঃ বৃহত্তর আরু মহত্তর অসমীয়া জাতি গঠনর অভিজ্ঞান; সম্পাদনা ড০ দেবব্রত শর্মা; অসম জাতীয় প্রকাশ, যোরহাট, ২০১০; পৃঃ২৫ ।
৮ )  গোলক চন্দ্র গোস্বামী;অসমীয়া ব্যাকৰণৰ মৌলিক বিচাৰ ; ১৯৮৭, পৃঃ ১০ ।
৯) ঐ; অসমীয়া ব্যাকরণর মৌলিক বিচার, পৃঃ ২৫৪।
১০)  ড০ ভগবান মৰল, অসমীয়া জাতীয় অভিধান আৰু বিকল্প বানান, আমাৰ অসম, ৯ মার্চ, ২০১০; অ জা অ-২য় খণ্ডে পুনঃমূদ্রিত; পৃঃ৩৫ ।
১১)  সত্যেন্দ্রনাথ বরা, বহল ব্যাকরণ, পৃঃ ০।
১২) ভাষাবিজ্ঞানে সাম্প্রতিক গবেষণার গতিপ্রকৃতি ; ‘সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা; রামেশ্বর শ’; পুস্তক বিপণি; কলকাতা০৯; ১৩৯০ বাংলা; পৃঃ ৭১০ ।
১৩) হুমায়ুন আজাদ; অবতরণিকাঃ বাঙলা ভাষাতত্ত্ব [ ১৭৪৩-১৯৮৩];বাঙলা ভাষা, ১ম খন্ড; সম্পাদক, হুমায়ুন আজাদ;আগামী প্রকাশনী ঢাকা;সংশোধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, আগষ্ট ২০০২; পৃঃ১০১ ।
১৪) উপেন রাভা হাকাচাম; উত্তর-পূর্বাঞ্চলর ভাষাগত ক্ষেত্রত অসমর ভাষাসমূহর সহ-অবস্থান আরু অসমীয়া ভাষার সমৃদ্ধি সাধনত ইবিলাকর ভূমিকা; ১ম অধ্যায়; অসমীয়া আরু অসমর ভাষা-উপভাষা;জ্যোতিপ্রকাশন; গুয়াহাটি-০১;জুলাই ২০০৯; পৃঃ ৩।
১৫) ড০ রমেশ পাঠক; উপভাষা বিজ্ঞানের ভূমিকা; পৃঃ ১৫৯ ।
১৬) ভীমকান্ত বরুয়া; অসমর ভাষা;৫ম পরিবর্ধিত সংস্করণ;জানুয়ারি ২০১০; বনলতা, ডিব্রুগড়।


গ্রন্থপঞ্জিঃ
১) ড০ উপেন রাভা হাকাচাম, অসমীয়া আরু অসমর তিব্বত-বর্মীয় ভাষা; প্রকাশিকা, মঞ্জুলা রাভা হাকাচামজাক; ধূপধরা, গোয়ালপাড়া; ৩য় সংশোধিত সংস্করণ, এপ্রিল ২০০৭।
২) ড০ উপেন রাভা হাকাচাম, অসমীয়া আরু অসমর ভাষা উপভাষা; জ্যোতি প্রকাশন, গুয়াহাটি; জুলাই ২০০৯।
৩) সুকুমার সেন; ভাষার ইতিবৃত্ত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তৃতীয় আনন্দ সংস্করণ,নভেম্বর, ১৯৯৪।
৪) জগন্নাথ চক্রবর্তী; বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক বাংলা ভাষার অভিধান ও ভাষাতত্ত্ব; ভাষা সংস্কৃতি আকাদেমি, হাফলং,অসম; বৈশাখ ১৪১২।
৫) পবিত্র সরকার; ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা; জানুয়ারি ২০০৩।
৬) রামেশ্বর শ'; সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলাভাষা; পুস্তক বিপণি, কলকাতা; অখণ্ড দ্বিতীয় সংস্করণ, শ্রাবণ ১৩৯৯।
৭ ) অতীন্দ্র মজুমদার; ভাষাতত্ত্ব; নয়া প্রকাশ, কলকাতা; দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৮৭।
৮) নীহার রঞ্জন রায়; বাঙালির ইতিহাস-আদি পর্ব; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা; বৈশাখ ১৪০০।
৯) উপেন্দ্র চন্দ্র গুহ; কাছাড়ের ইতিবৃত্ত; অসম প্রকাশন পরিষদ, গুয়াহাটি; দ্বিতীয় সংস্করণ অক্টোবর ২০০৪।
১০) ড০ সুজিত চৌধুরী; শ্রীহট্ট কাছাড়ের প্রাচীন ইতিহাস ; দিনকাল প্রেস লিমিটেড, শিলচর; ২০০৬
১১) Suniti Kumar Chatterji; The Origin and Development of the Bengali Language; Rupa & Co, Kolkata;1993.
১২) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; রবীন্দ্ররচনাবলী; ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ, বিশ্বভারতী; ১৯৮৫।
১৩ ) ড০ দেবব্রত শর্মা; অসমীয়া জাতি গঠন প্রক্রিয়া আরু জাতীয় জনগোষ্ঠীগত অনুষ্ঠান সমূহ; একলব্য প্রকশন, যোরহাট; ফেব্রুয়ারি, ২০০৭
১৪) ড০ প্রফুল্ল মহন্ত; অসমীয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির ইতিহাস; লয়ার্স বুক ষ্টল, গুয়াহাটি; ২০০৯।
১৫) ড০ বাণীকান্ত কাকতি; অসমিয়া ভাষার গঠন আরু বিকাশ; ড০ বাণীকান্ত কাকতি জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন সমিতি, বরপেটা; অক্টোবর ১৯৯৬।
১৬) ড০ সুজিত চৌধুরী; প্রবন্ধ একাদশ, সম্পাদনাঃ জয়দীপ বিশ্বাস; অক্ষর পাবলিকেশনস, আগরতলা/ কলকাতা; ২০১০।
১৭) সঞ্জীব দেবলস্কর ; প্রসঙ্গ সিলেটি ভাষা; বাঙালনামা ঃ দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা ;http://bangalnama.wordpress.com/2010/09/13/prasango-sylheti-bhasha/
১৮) G. A. Grierson; Linguistic Survey of India; http://www.joao-roiz.jp/LSI/