আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

***************************************************



Tuesday, 2 August 2011

বিনয় ঘোষের বিখ্যাত বই 'মেট্রোপলিটন মন, মধ্যবিত্ত, বিদ্রোহ'

From My Google Blog
       ফেসবুকের টানে লেখাপড়া লাটে উঠছিল। আজ ( ৩০জুন,১১ ; রোববার) গোটা দিন তাই স্বচ্ছানির্বাসন নিয়ে পড়লাম বিনয় ঘোষের বিখ্যাত বই 'মেট্রোপলিটন মন, মধ্যবিত্ত, বিদ্রোহ'। ১৯৭৩এ প্রকাশিত বই। আশির দশকে শিলচর ভারতী চায়ের ষ্টলে বন্ধুদের আড্ডাতে বইটির কথা খুব শুনতাম। আজ গিয়ে সাধ মিটল পড়বার। এক টানে পড়া যায়। কিন্তু শেষ অব্দি গিয়ে খুব ভালো লাগল না। 
             বইটি পাঠযোগ্য। সে অস্বীকার করছি না। নইলে খুবই বাজে টাজে বলে দিতাম। নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতার কথা পড়তে পরতে মনে হচ্ছিল এ এক্কেবারেই একালের কথা বলছেন। আর সেই সত্তরের উদ্দাম দিনগুলোতে বসে চিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উপর অগাধ আস্থা নিয়েও যেভাবে দেশে বিদেশে কমরেডদের নিজেদের মধ্যে খুনোখুনির কথা লিখছিলেন মনেতো হচ্ছিল এক্কেবারেই একালের কথা লিখছেন। সুতরাং বহু নবীন পাঠকের কাছে এই বই এক্কেবারে নবীন মনে হতে কোনো অসুবিধে নেই। সুতরাং,  এটা আমার দেরি করে পড়বার ভালো লাগে নি তা নয়। বরং এই বইটির কথা যখন বন্ধুদের আড্ডাতে শুনেছিলাম তখন আমি পড়তে পারছিলাম না বলে যেমন চাপা ঈর্ষাও হচ্ছিল, সে ঐ ওদের সঙ্গে তর্ক করতে সুবিধে হতো বলে। কিন্তু পড়বার ইচ্ছে হবার পক্ষে তখন এই কারণটা খুব বেশি ছিলনা। আমার তখনি মনে হচ্ছিল বইটা খুব একটা পড়বার মতো নয়। 'বন্ধুদের আড্ডা'র প্রসঙ্গ যখন এলো, তখন জিজ্ঞেস করতেই পারেন, চেয়ে নিয়ে পড়তে মানা করেছিল কে? এর উত্তর এই। আর আমার তখনকার মনোভাব যে বইটি পড়বার পরেও পালটায় নি, এই তৃপ্তির প্রকাশ ঘটাতেই এই পোষ্ট। 
           তখন বন্ধুরা খুব উত্তেজনার সঙ্গে জানাতো, এঙ্গেলসকেই বলে দিয়েছেন শোধনবাদের জনক। কী দুর্দান্ত আবিষ্কার না? এটা তাঁর ত্রুটি নয়। তিনি পেয়ে গেছিলেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার পক্ষে এঙ্গেলস বলে ফেলেছিলেন, জীবনের শেষে। এবারে সেই সত্তর দশকের সমস্ত নকশালরাই কী এই অভিমত দিতেন না? সংসদীয় রণকৌশলের উপর অগাধ অনাস্থা। তিনি এর বাইরে বেরোন নি। এই ভাষাতত্বে শব্দমাত্রকেই চিহ্নায়ক, আর অর্থ মাত্রকেই যাদৃচ্ছিক চিহ্নায়িত বলে অবিহিত করবার এই স্যস্যুরীয় তত্ব আছে। সেতো জেনেই থাকবেন। দেবপ্রসাদদার বইটি থেকেও কিছু ধারণা পাওয়া যাবে। আমার চোখে বস্তু মাত্রেই এক একটা চিহ্ন হিসেবে হাজির হয়। সবার কাছেই তাই। আর এরও যাদৃচ্ছিক ( এক্কেবারে নয়, দ্রষ্টার স্থানকালে গড়ে উঠা চোখের উপর নির্ভর করে) প্রচুর চিহ্নায়িত থাকে। তাঁর প্রমাণ, বইটির সমর্থণে থেকেও আমাদের পরস্পরের ভিন্ন মত। বইটি, আমার কাছে বেশ কিছু চিহ্নায়িত নিয়ে হাজির হয়েছে। বেশ কিছু, সব লিখতে গেলে বড় দীর্ঘ হয়ে যাবে। 
              এর প্রথমটিতো এই যে তখনো, আমরা সাম্রায্যবাদীদের চেহারা বুঝতে বিদেশিদের উপরেই নির্ভরশিল ছিলাম। এ ছিল এক সাধারণ মার্ক্সবাদী প্রবণতা। বহু জায়গায় তাঁর নিজের লাইন আসলে মামফোর্ডের মতো বিদেশিদের বইএর হুবহু অনুবাদ। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, তবে আর এক বাঙালির বই পড়ছি কেন? সোজা সেই বিদেশির বই পড়লেই পারি। এতে চিন্তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে না। বরং লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা জাগে যে তিনি প্রচুর বিদেশি বই পড়া পণ্ডিত। আর আমাদের স্বদেশিদের চোখ যদি খুলতেই হয় তবে আমাদেরো এমন পণ্ডিত হতেই হবে, নতুবা চুপ থাকা ভালো। পার্টিগুলোর ভেতরে এবং বাইরের বামমহলেও এইভাবেও এক জ্ঞানভিত্তিক শ্রেণিভেদের পথ খুলছিল। বিলেতিদের চোখেই নিজের স্বদেশকে যদি জানতে বুঝতে হবে,তার মানে আমাদের সে ক্ষমতা নেই , চুপ থাকা ভালো। হয় অন্ধভাবে বিশ্বাস করো, নতুবা সরে পড়ো। কেডাররাজের যাত্রা এভাবেই শুরু হয়। বড় দাদারদের থেকে বিলেতি বোল শুনে টুনেও বহু অন্ধবিশ্বাসী ধরাকে সরা জ্ঞান করত, এখনো করে থাকেন। 
            ক'দিন আগে আজিজুল হ'ককে শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। মনে হচ্ছিল এর থেকে বিজেপিতে অনেক পণ্ডিত লোক পাওয়া যাবে। এই ব্যক্তি, এক্কেবারেই মার্ক্সীয় সামন্তীয় বদ্ধজলা থেকে উঠে এসে তত্বের সওদা করে বেড়াচ্ছেন। যদিও থাকেন খুবই সন্ন্যাসীর মতো। মার্ক্সবাদী অহংকারতো ওজনে ভারি হলো। কিন্তু দেশকে বিশেষ জানা হলো না ।কেননা, সেই কাজেতো বিদেশি তাত্বিক খুব বেশি নেই! আর থাকলেও সব্বার সেসব পড়বার সুযোগ আর ক্ষমতা নেই। সেদিন এক বন্ধুকে বলছিলাম ভারতকে বুঝতে গেলে রবীন্দ্রনাথ দিয়ে শুরু করলে মন্দ নয়। এবারে আমার রবীন্দ্রবাতিক নিয়ে কেউ কেউ আপত্তি করেই থাকেন। আমি যে তাঁর সমালোচনা কোথাও করিনি বা সমালোচনা সহ্য করিনা তাও নয়। কিন্তু বন্ধুটির জবার ছিল জবর দস্ত। আমাকে বলছিল, জ্যা পল সার্ত যেভাবে সাম্রায্যবাদকে সমালোচনা করেছিলেন সেই জোর নিয়ে রবীন্দ্রনাথ পেরেছেন! বোঝ ঠেলা। আমি কিন্তু জিজ্ঞেস করতেই পারতাম এবং করেওছি, জ্যা -পল সার্ত কি ভারতবর্ষের মাথামুণ্ডূ কিছু বুঝতেন? কথায় কথায়, জ্যা-পল, দেরিদা, বাখতিন আওড়ালে আপনাকে কেউ বিশেষ প্রশ্ন করবে না, মধ্যবিত্ত ভিড় আপনাকে বেশ সমীহ করবে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বা তেমন কোনো দেশিও নাম নিলে বলবে 'বাতিকগ্রস্ত।' 
           এবারে আসি দ্বিতীয় কথাতে, যদি এ অব্দি বলা কথাতে আপনারা বিশেষ জোর পাননি। 'মেট্রোপলিটন' শব্দটির তিনি কি ব্যাখ্যা করেছেন আমি উদ্বৃতি দিতেই পারি। কিন্তু কী লাভ ? সেওতো তাঁর নয়, কোনো বিদেশির। তিনি প্রায়ই এক চেটিয়া পুঁজির দিনে যে কলকাতা ক্যালিফোর্ণিয়ার তফাৎ ঘুচে যাচ্ছে অজস্রবার বলেছেন। কিন্তু আমরা সাধারণ বাংলা মানে এই শব্দটার যা করে থাকি তা এই যে, 'খুব বড় শহর, আর যেখানে নানা জাতি ধর্ম ভাষার লোক বাস করেন।' ( কসমোপলিটান --শব্দটি মনে রেখেই বলছি) সেই সামজিক বৈচিত্রে কথা তিনি লিখেছেন দুই এক জায়গায়। কিন্তু সেই সমাজগুলোর বৈচিত্র কোথাও ধুয়ে মুছে গেছে কিনা তা নিয়ে কালিক অধ্যয়ন এই বইতে নেই। অথচ, আজো কলকাতা শহরে এই বৈচিত্র চোখে পড়ে, বিশ্বায়ন সবাইকে সমান ভাবে গ্রাস করেনি , এ স্পষ্টই বোঝা যায়। এই নিয়ে প্রায় কোনো অধ্যয়নই নেই, কেননা তা করতে গেলে বিদেশিরা খুব একটা সাহায্য করতে পারবেন না। এক জায়গাতে কলকাতার পত্তন সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলা হয়েছে, সামন্তীয় ধাঁচে নানা বৃত্তির লোকেদের আলাদা পাড়াতে বসানো হয়েছিল। কিন্তু, পূঁজির ঠেলাতে সেই ভেদ আর থাকে নি। এক্কেবারে গণেশ ওলাটানো কথাবার্তা। ভেদ আছে, ভেদ ছিল--এই কথা বলাটা তখনকার নকশালদের মধ্যেও এক নিষিদ্ধ কথা ছিল। যদিও, দলিলগুলোতে কিছু কিছু আসছিল। কিন্তু ব্যাপক চিন্তার বিষয়তো তখন খতম লাইন, সোভিয়েত বনাম চিন লাইন, গ্রামদিয়ে শহর ঘেরাও ইত্যাদি। এখনো কলকাতা শহরে গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিষ্যদের এবং মতুয়া দর্শনের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রইল কী করে, উনিশ শতকের বাংলার ধর্ম সংস্কারের আন্দোলনের ইতিহাসে এই আন্দোলনগুলোর কথা উহ্য রইল কেন? এই প্রশ্নগুলো তখন বিনয়ঘোষ কেন, তাঁর সতীর্থদের কারো মাথাতেই আসেনি।
            দেশকে জানা বোঝাতো আশির দশক অব্দি মার্ক্সাবাদীদের চিন্তার কোনো কোনেই জায়গা পেতনা। ঐ রাষ্ট্রচরিত্র নিয়ে চায়ের কাপে তুফান উঠত কেননা সেগুলোই ছিল বিখ্যাত চিন-সোভিয়েত বিতর্কের বিষয়। আর এদেশের ন্যুনতম কর্মসূচী দাঁড় করাতে গেলে এগুলো লাগবেই। এগুলো গোড়ার কথা। আর এগুলোতে বিদেশি বই খুব সাহায্য করে। সুতরাং এর নিচে কেউ নামতেনই না। মার্ক্সবাদী অহংকারীদের যে জীবনের সর্বত্র এক নেতিবাচক চোখ গড়ে উঠেছিল যার একটি প্রকাশ সিপিএমে , অন্য প্রকাশ মাওবাদিতে তাতে এমনধারা দেশ অধ্যয়নের প্রবণতাও দায়ী। কারণ আমরা সমালোচনা করতেই শিখেছি, যে যত বড় সমালোচনা করতে পারি সে তত বড় বিপ্লবী বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। সুতরাং আর কেউ কিছু বোঝে না, আর কেউ তেমন বিপ্লবী নয়, যা কিছু 'বাম' নয় সেই কিছুই পরিত্যাজ্য। ক'মাস আগেও দেখতাম, এই নেটেই সিপিএমের পতন হোক বলে জানালেই সিপিএমরা মনে করত আমার মতো লোক ঘাসফুলের চেলা না হয়ে যায় না। কারণ, এর বাইরে কোনো দুনিয়াকে তো ওরা চেনেই না! এই যে দেশকে চেনার কাজ, সেখানে তাই রবীন্দ্রনাথ এখনো গুরুদেব। শ্রীনিকেতন এখনো পাঠশালা! মার্ক্সবাদীরা দেশকে বোঝেন না বলেই উত্তরভারতে এখনো কেউ নিজেদের প্রসার ঘটাতে পারেন নি, না পেরেছেন ত্রিপুরা ছাড়া  পূর্বোত্তরের পাহাড়ি রাজ্যগুলোতে। আর মাওবাদিরাও মধ্যভারতের আদিবাসি এলাকার বাইরে বেরুলেই চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করে। ওরা বন্ধুক ধরে এটা সমস্যা নয়, ওরা দেশকে চেনে না এটাই বড় সমস্যা। বেচারা মাও ভারতের মতো বৈচিত্রময় দেশনিয়ে কোনো 'রেডবুক' রেখে যান নি যে! তাঁর নিজের দেশেরতো বেশিরভাগ লোক হান ছিলেন। তিনি হানদের দিয়েই বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পেরেছিলেন। আমাদের 'হান' থাকলে আমরাও তাঁর থেকে বেশি পিছিয়ে থাকতাম না। তার পর ওদের থেকেও কঠোর কঠিন সেনা রাষ্ট্র গড়ে তুলতে আমরা যে পিছিয়ে থাকতাম তেমন কোনো কারণই ছিল না।
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...

Google+ Badge

^ Back to Top--'উপরে ফিরে আসুন'