আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

***************************************************



Monday, 22 August 2011

অসমের বাঙালির রাজনীতিঃ বহমান বয়ান স্রোতে খানিক অবগাহন০২



                          [গুয়াহাটির পুরোনো ছোট কাগজ 'একা এবং কয়েকজনে'র এবারের শারদ সংখ্যাতে প্রকাশিত]

                                  

                               (আগের পোষ্ট দেখতে এখানে ক্লিক করুন)
                           প্রসঙ্গঃ  ধর্মীয়  বৈচিত্র   এবং  বাঙালি
        তাহলে দাঁড়ালো এই যে, দুই উপত্যকার ভেদরেখা রয়েছে, এই অব্দি প্রায় সবাই একমত। কিন্তু তার উর্ধে উঠার যে আহ্বান তাতে জয়দীপ নিজেও সমর্থ হচ্ছেন না । আমরাও হব না, তাই আমরা আপাতত সেরকম প্রস্তাব দিচ্ছিও না। জয়দীপের দ্বিতীয় আহ্বান ধর্মীয় ভেদের উর্ধে উঠার। আমরা দেখিয়েছি, মানসিক হেনস্তার সঙ্গে মুসলমানদের উপর যে শারীরিক হেনস্তাগুলো হয়ে থাকে সেগুলো তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। সৌমিত্রও ধর্মীয় ভেদের উর্ধে উঠার কোনো সম্ভাবনাকে নাকচ করেছেন। আমরাও নাকচ করব। এর জন্যে নয় যে আমরা মুসলমানদেরকে খুব অন্ধভাবে ধর্ম বিশ্বাসী বলে বোধ করি, এবং ভাবি যে ওরা ধর্মের বাইরে গিয়ে কিছু ভাবেনই না। প্রচারটা এরকমই রয়েছে বটে, কিন্তু মুসলমানের হাড়ির খবর নিয়েছেন কে কবে আর কতটা? শিলচরের বেশ প্রগতিশীল কাগজেও দেখেছি গ্রামে গিয়ে বোরখা না পরে মুসলমান মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে দেখে সম্পাদকেরা অবাক হয়ে গেছেন! কারণ তাদের বই পড়া জ্ঞান বলে মুসলমান মেয়েরা বোরখা না পরে বাইরে বেরোতেই পারে না। বরং হিন্দুদের বেরিয়ে পড়া হাড়ির আসল খবরও ঢাকা হয়ে থাকে প্রবল ভাবে । ঢাকবার জন্য ছাপা কিম্বা বৈদ্যুতিন মাধ্যমগুলোও এই দেশে রয়েছে হিন্দুদেরই হাতে । এই সাম্প্রতিক দিনলোতে দেখবেন অসমের বাংলা কাগজগুলো যখন –ডি-ভোটার প্রশ্নকে শিরোনামে নিয়ে আসছে, অসমিয়া কাগজগুলোতে তখন তার চিহ্ন অব্দি নেই, সেখানে আছে ‘নাগরিক পঞ্জি প্রস্তুত, অসম চুক্তির বাস্তবায়নে’র মতো বিষয়গুলো। গেল ৩০ জুলাই ওদিকে বরাকে আর ভাটি অসমে ডি-ভোটার নিয়ে বন্ধ হয়ে গেল। গুয়াহাটিতে আঠাশটির মতো সংগঠন বৃহৎ নদী বাঁধের সঙ্গে নাগরিক পঞ্জি প্রস্তুত করবার দাবিতে বিশাল সমাবেশ করে গেল। পরদিনের কাগজে দেখুন, দুই ভাষার কাগজে শিরোনাম ভিন্ন। কেউ কারো সংলাপে চোখ বুলায় নি, দেখেনি, শোনেনি। সে এক প্রবল নিরালাপের নির্মাণ প্রয়াস।দুই যুদ্ধমান পক্ষ ।অথচ সংলাপের মস্ত সম্ভাবনাই ছিল এবং আছে । যারা ‘গণতান্ত্রিক চেতনা’কে কেবল অর্থনৈতিক সংঘাতের দৃষ্টিতে দেখেন তাঁদের তত্বে কিন্তু কথা ছিলনা, নদীবাঁধের মতো বিষয়ে জাতীয় প্রশ্নকে জড়িয়ে ফেলে মানুষকে আলাদা করে ফেলবার।
         
         বেদ মন্ত্র, সরস্বতী বন্দনা, নারকেল ভেঙ্গে পুরুত ডেকে ঈশান না দিয়ে এই দেশের কোনো সরকারী এবং সার্বজনীন ( এমনকি বহু বাংলা ভাষা সাহিত্যেরও ) অনুষ্টান প্রতিষ্ঠানের সূচনা হয় না-- বাকি যাত্রা পথের ধর্মীয় বিবরণ দিতে গেলে সে আরেক নিবন্ধ দাঁড়িয়ে যাবে। গীতা স্কুলে পড়তে না চাইলে দেশে ছেড়ে যাবার আহ্বান যে মন্ত্রী এই দেশে দিয়ে থাকেন, তার প্রতিবাদ হলেও, তাঁকে কেউ দেশ ছাড়বার কথা বলবার সাহস করে না। অথচ কল্পনা করুন, সেই রাজ্যেই কোনো মন্ত্রী বলছেন, “স্কুলে কোরান না পড়তে চাইলে এই দেশে ছেড়ে চলে যান!” কী হবে তাঁর দশা! অথচ এই দেশেই ‘কোরান’ আরবির খোলস ছেড়ে প্রথম এক অন্যভাষা ঊর্দুতে লেখা হয়েছিল! এইসব সত্য ঢাকা থাকে সংবিধানের শব্দ ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ সাইনবোর্ডের তলায়। ওগুলো নিয়ে তারা সবাই জানেন যারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে থাকেন। মনে করা হয়ে থাকে যে হিন্দুদের ঐক্য নেই, জাতে পাতে তারা বিভক্ত। অথচ এই অসমেই মুসলমানেরা গরিয়া, মরিয়া, মিঞা, কাছাড়ি, সিলেটি, তালুকদার, মজুমদার, সৈয়দ, মাইমাল, কিরাণ এমন কত বিভাজনে যে বিভক্ত; পরস্পরের মধ্যে অনেক সময় বিবাহাদি নিষিদ্ধতো বটেই , জল অচলের ব্রাহ্মণ্যবাদী পরম্পরাও রয়েছে এই নিয়ে হিন্দু পণ্ডিতদের মধ্যে কোনো জিজ্ঞাসা নেই, নেই কৌতুহল, অধ্যয়নতো দূর অস্ত ! স্মরণ করুন, গেল বছর রাজ্যসভাতে সরকারী দলের প্রার্থীকে ভোট দেবার উপহার স্বরূপ নাথ যোগী উন্নয়ন পরিষদ ইত্যাদি স্থাপনের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছিল সেগুলোর মধ্যে একটি ছিল মাইমাল উন্নয়ন পরিষদ। যিনি এই দাবি আদায় করেছিলেন তিনি এ আই ডি ইউ এফ দল ছেড়ে গেছিলেন। মনে করা হয়, এই দলটি সমস্ত মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ সংগঠন, যখন সত্য হলো গরিয়া, মরিয়া অসমিয়া এবং বিহারি ও ঊর্দুভাষী মুসলমানদের মধ্যে এর প্রায় কোনো ভিত্তিই নেই। আছে তাদের মধ্যে যারা মূলগত ভাবে ‘বাঙ্গালি’—তার মধ্যে ‘ন-অসমিয়া’রাও রয়েছেন। তাও সবার নয়, সেখানেও নদুয়া, আহলে সুন্নত ইত্যাদি ধর্মীয়ধারাগত বিভাজন রয়েইছে। এদের জাতে পাতের এবং ধর্মের উর্দ্ধে উঠার প্রয়াসকে যদি সন্দেহের চোখেই দেখাই হয়, তবে এও চোখে পড়া উচিৎ যে এরা মূলত  ‘বাঙালি মুসলমানে’র দল। প্রখ্যাত অসমিয়া পণ্ডিত সঞ্জীব বরুয়া এদের সম্পর্কে লিখেছেন, “Ajmal’s primary constituency: the East Bengali origin Muslims (Assam: confronting a failed partition) ।
       
    ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের সামান্য অংশকেও ধর্ম নিয়ন্ত্রণ করে না। এই সত্য বহু নাস্তিকও মাঝে মধ্যে না বোঝার ভান করেন। বরং স্বয়ং ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে তার ধারক মানুষটির সামাজিক অবস্থান। অসমে বা ভারতে মুসলমানের কথা বলবার সময় এটা মনে রাখা হয় না যে এদের অধিকাংশই এখনো পড়ে আছেন, “সবার পিছে, সবার নিচে, সব- হারাদের মাঝে।” সর্বহারাকেই একমাত্র বিপ্লবী শক্তি বলে যাদের প্রচার প্রবল তাদের চরণও এই ‘সবার অধম দীনের হতে দীন’দের মাঝে চরে ফিরতে এখনো স্বচ্ছন্দ বোধ করে না । বেশির ভাগ পন্ডিতই এখনো এদের ধর্মবিশ্বাসের স্বাতন্ত্র্যকে প্রাবল্য ভেবে দ্বিধায় ভোগেন। এমন কি যদি ধরেও নিই যে মুসলমানকে নিয়ে গড়ে উঠা সমস্ত দলগুলো আসলে প্রবল সাম্প্রদায়িক, তবে সেখানেও দেখব তারা যখন তাদের রাজনৈতিক সমাবেশ করেন মূলত গাঁয়ে গঞ্জে, হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলগুলো দাপিয়ে বেড়ায় নগর -শহরের বুক চিরে। এখানেই স্পষ্ট হয়ে পড়ে হিন্দু-আর মুসলমান ভারত আসলে অনেকটাই শহুরে এবং গ্রামীণ ভারত। হিন্দু উগ্রপন্থীরা যখন দেশিও প্রশাসনের মদতে গুজরাট-২০০২ কিম্বা নেলি ১৯৮৩ বাঁধায়, মুসলমান উগ্রপন্থীদের কৌশল তখন মুম্বাই ২৬/১১। মদত করে বিদেশি প্রশাসন। মুসলমানেরা বিদেশের মদতে মৌলবাদ ছড়ায় যখন সত্য , তখন তার উলটো পিঠে এও সত্য যে এই দেশের শাসক শ্রেণিতে এদের অংশদারিত্ব নিতান্তই গৌণ। কিন্তু প্রচারের বেলা প্রথমাংশকে যতটা মেলা হয়, দ্বিতীয়াংশকে রাখা হয় ততটাই ঢেকে। এই দেশে শয়তানি করবার বেলাও মুসলমানদের সমানাধিকার বলে কিছু নেই। রাজ্যের কারাগারগুলোতে গেলেই দেখা যাবে সেখানে পড়ে পড়ে পচেন বেশিরভাগ গরীব লোক, আর তার মধ্যে বেশি মুসলমান, তার পরেই রয়েছেন পিছিয়ে পড়া অন্যান্য হিন্দু জনগোষ্ঠীর মানুষ। শ্রেণি চরিত্র বোঝবার সবচে’ ভালো জায়গাই বোধহয় জেল । 
                    বিশ্বাসটাই ধর্মীয় পরিচয়ের একমাত্র উপকরণও নয়। পুরুষ পরম্পরাতে ধর্মকে নিয়ে গড়া উঠা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে চাইলেও একজন ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারে না । কারণ শেষ অব্দি ব্যক্তি সমাজের অধীন। কট্টর নাস্তিককেও তাই শ্মশানে কিম্বা গোরস্তানে নিয়ে গিয়েই শেষকৃত্য করতে হয় । কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে সেটি এখনো নির্ধারিত হয় তাঁর পিতৃ পরিচয় দিয়ে। গার্গ কিম্বা পরাশর উপাধিধারী অসমীয়া ব্যক্তির স্মরণ সভাতে কোনো ‘ভকত’ ডাকা হবে না সেই সম্ভাবনা প্রায় নেইই। আমাদের মতো উদার বাংলাভাষী হিন্দু বা মুসলমান যেমন অসমীয়া সভ্যতার প্রতি উন্নত ধারণা রাখি বলেই আশা করতে পারি না যে কখনোই কোথাও উগ্রতার দ্বারা অপমানিত হব না , সুতরাং আমাদের ভাবতেই হয় বাংলা ও বাঙালির স্বাধিকার আর সমমর্যাদা নিয়ে—তেমনি এই দেশে কোনো মুসলমান নাস্তিক হলো বা ধর্মকে সামাজিক জীবনে গুরুত্ব দিলনা বলেই আশা করতে পারে না যে তাকে কখনো ‘বাংলাদেশি’ বলে অযথা নোটিশ ধরিয়ে দেয়া হবে না যখন কিনা সে বাস করছে এই দেশে কয়েক প্রজন্ম , পথে দাঁড় করিয়ে জুতোর মালা পরিয়ে দেয়া হবে না, সস্তা মজুর হিসেবে লুণ্ঠন চালানো হবে না, বা তাকে আই এস আই-এর চর বলে মিথ্যে মামলাতে জড়িয়ে হাজতে ঠেলে দেয়া হবে না। সাদাত হাসান মন্টোর মতো উপমহাদেশের এক আশ্চর্য প্রতিভা কিম্বা একেবারেই সাম্প্রতিক কালের মকবুল ফিদা হুসেন কে কেন দেশ ছেড়ে যেতে হয়; কেন প্রথমজনকে পাকিস্তান আর দ্বিতীয়জনকে কাতারের নাগরিকত্ব নিয়ে নিয়েই ভারতের প্রতি ভালাবাসাকে ব্যক্ত করতে হয়--- আমরা ভাবতে বসতে পারি। সুতরাং তাঁকেও ভাবতে হয়--- মুসলমান পরিচয়ের স্বাধিকার আর সমমর্যাদা নিয়ে। একে সাম্প্রদায়িকতা বলে আখ্যা দেয়া নিজেই আসলে আরেক ধরণের তরল সাম্প্রদায়িকতা । ভাষিক পরিচয়কে তুলে ধরে ধর্মীয় পরিচয়কে দাবিয়ে দেবার পরামর্শের অর্থ তাঁকে এই পরামর্শ দেয়া যে ভাষার জন্যে অপমানের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠো, কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়ের জন্যে সমস্ত অপমান নিয়ে চুপ করো। ওটা সাম্প্রদায়িকতা । ধর্ম তোমাকে যে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে একে নিয়ে বেশি গো ধরোনা--- এটা সামন্তবাদ!
                    ধর্মীয় পরিচয়কে যে অসমে হিন্দুদের বেলাতেও অস্বীকার করা যাবে না , আমরা আগে তার ইংগিত দিয়ে এসছি। ষাটের দশকের ভাষা দাঙ্গার পরে যে দীর্ঘদিন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে বাংলাভাষা এবং সাহিত্যের প্রচারে প্রসারে ভাটা এসছিল, এই সত্যতো আমরা অস্বীকার করিনি। দেখা যাবে, এই সমগ্র সময় জুড়ে ধর্মকে কেন্দ্র করেই বাঙালি হিন্দুরা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধরে রেখেছেন। সেই ধর্ম অসমিয়াদের থেকে অনেকটাই আলাদা । বাংলা ভাষাতে প্রকাশ্যে প্রেমের গান গাওয়া নিষিদ্ধ হতে পারে, হরিনাম নিতে কোথাও কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় নি। বাংলা স্কুলের সংখ্যা, কাগজের সংখ্যা যে সময়গুলোতে কমে এসছিল সেই সময়গুলোতে বিভিন্ন গুরুকে কেন্দ্র করে হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর এবং মন্দিরের সংখ্যা কিন্তু বেড়েই গেছে। এর জন্যে কোনো পরিসংখ্যানের দরকার পড়ে না । খোলা চোখেই দেখা যায়। মসজিদের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে যতই হৈ হট্টগোল হোক না কেন, সমৃদ্ধিতে এই মন্দির গুলোর সঙ্গে কিছুতেই টেক্কা দিতে পারবে না। এর একটা কারণের ইঙ্গিত জ্যোতির্ময়ের এই উচ্চারণেও মেলে, “পূর্ববঙ্গমূল বাঙালিদের সন্তান-সন্ততিরা এখানকার মাটিতে জন্ম নিলেও পূর্বপুরুষের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিচ্ছিন্নতার মনোভাব কাটাতে পারেননি। অন্তত অনেকের ক্ষেত্রে কথাটি সত্য । ... সুতরাং এঁদের কাছে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিষয়ক কাঁদুনি গেয়ে কোনও লাভ হবে না।” (ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ) মুসলমানের ভয়ে বা তাড়া খেয়ে –যে কারণেই হোক যারা ভারতে এসছেন তাদের মনে মুসলমান ভীতি প্রবলভাবে রয়েছে। আমরা লেখাপড়া করা লোকে যদিও এও জানি যে দেশভাগ রাজনৈতিক অভিসন্ধি মাত্র নয়, মূলত এটি বাজার দখলের গুজারাটি-মাড়োয়াড়ি-সিন্ধি হিন্দু মুসলমান মুৎসুদ্দি শিল্পপতিদের আর তাদের সহযোগী সামন্ত প্রভুদের কাজ । ড০ সুজিত চৌধুরী তাঁর ‘ধর্ম, রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতাঃ উৎস পটভূমি”তে দেখিয়েছেন, “...আরো এগার বছর আগে থেকে বিড়লা (ঘমশ্যাম দাস) যা চাইছিলেন, মুসলিম লিগ তা চাইতে শুরু করেছে মাত্র ১৯৩৮সালে, তা-ও সাংগঠনিক ভাবে সে দাবি মুসলিম লিগ তখনো তোলেনি।” ( প্রবন্ধ একাদশ) কেবল কৌতুহল জাগিয়ে দেবার জন্যে আমরা এইটুকুন তুলে দিলাম। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন। বিড়লা শুধু চান নি, রীতিমত চাপে ফেলে দু’পক্ষকে দেশভাগে রাজি করিয়েছিলেন,মায় বৃটিশকেও। সম্ভবত তাই আজকাল লালকৃষ্ণ আদবাণি, যশোবন্ত সিংহের মতো নেতাদেরও জিন্নাপ্রীতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সাধারণ বাঙালি হিন্দু মানুষটিকে এটি দেখানো তত সহজ কাজ নয়। এর জন্যে এই ধর্মপ্রবণতা সেখানেই দেখা যাবে যেখানেই গেছেন উদ্বাস্তুরা, মায় বরাক উপত্যকাতেও। বরাকউপত্যকার রাজনীতিকে তাই নিয়ন্ত্রণ করে এই ধর্মীয় প্রভেদ। হিন্দু বাঙালিরা সেখানে এতে একটু এগিয়ে বই, পিছিয়ে নেই। ভারতীয় জনতা পার্টির জয় যাত্রাও তাই ওখান থেকেই শুরু হয়েছিল। যাত্রা শুরু করেছিল বাংলদেশ থেকে আগত হিন্দুদের শরণার্থী স্বীকৃতি দিতে হবে এই আওয়াজ দিয়ে । এ আই ইউ ডি এফ তো ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে এসছে এই সেদিন। এবং হিন্দুদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকাশ্য আওয়াজ দিয়েছে এখনো দেখা যায় নি । হ্যা, জনগণনাতে অসমীয়া লিখিয়ে দেবার আহ্বান জানাবার দায় একটা বর্তায় বটে, আমরা তাতে পরে আসব। হিন্দু পরিচয়কে তুলে ধরবার আরেকটি সুবিধে আছে যে এতে সর্বভারতীয় একটা পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে বিচ্ছিন্নতার বোধকে কাটানো যায়। এই বোধ বরাক উপত্যকাতে এই ভাবেও প্রকাশ পায়, মনে করা হয় সে উপত্যকাতে সমস্ত বঞ্চনার দায় দিসপুরের। এটি মূলত সেখানকার এক হিন্দু মধ্যবিত্ত নির্মিত বয়ান। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং রাজনীতির আর সমস্ত মার প্যাঁচে বাকি ভারতের হাল যাই হোক না কেন, মনে করা হয় বরাক উপত্যকার প্রতি কেন্দ্র সবসময়েই সদয়। এমন কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালে ‘ভাষা শহীদ ষ্টেশন’ নামাকরনের দাবিটি যখন দিল্লীতে গিয়ে আটকে গেল ‘আঞ্চলিক দেশপ্রেমে’র দোহাই দিয়ে, মনে করা হচ্ছে যে দিসপুর থেকেই কেউ কলকাঠি নেড়েছেন। তাই সাংসদদের সেখানকার রাজনীতিতে পরম আদর, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে এর ঠিক উলটো। এখানে দিল্লীকেই মনে করা হয় নন্দ ঘোষ। ব্রহ্মপুত্র উপত্যাকাতে হিন্দু পরিচয় হিন্দু অসমীয়া প্রতিবেশির সংগেও সংলাপের এক সহজ সংযোগ তৈরি হয়। তৈরি হয় একটা নিরাপত্তার বলয়। এরকমই এক সাম্প্রতিক বৌদ্ধিক প্রকাশ ‘রাগ-অনুরাগ’ যার কথা আমরা আগে লিখেছি।
            
                  তার তৃতীয় কারণটি সর্বভারতীয়। শ্রেণি বা বর্ণগত বিভাজনকে হিসেবে নিলে দেখা যাবে গোটা পূর্বোত্তরের বাঙালি বর্ণহিন্দু এখন বহুজায়গাতে সংখ্যালঘু হলেও বৃটিশ ভারতে শাসক শ্রেণিতো ছিলেনই, আর এখনো এরা অসমীয়া বর্ণহিন্দু শাসকশ্রেণির মতোই সর্বভারতীয় হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানী শাসকশ্রেণির ছোট সহযোগীমাত্র। এখনো প্রশাসনে , আমলাতন্ত্রে, ব্যবসায়ে, চাবাগানের মতো শিল্পে, স্কুলে, কলেজে , হাসপাতালে, আইন আদালতে এরা এক নির্ণায়ক অবস্থানে রয়েছেন। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্যিক সরকারী কার্যালয়গুলোতে গেলেই স্পষ্ট অসমিয়া বাঙালি শ্রমবিভাজন চোখে পড়ে এখনো । একদিকে বাজারে এবং অন্যদিকে পথের কাছের ছোট বড় দোকানেও চোখে পড়ে এই বিভাজন। চাঁদাতোলার রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত অন্যথা কবেই দমে যেত। এদের এই স্বচ্ছন্দ অবস্থান ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে সমস্ত জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সংগঠন থাকা সত্বেও বাঙালি হিন্দুর এক আলাদা সংগঠন না থাকার কারণ কিনা এটা বেশ গুরুত্ব দিয়েই ভাবা যেতে পারে, বরাক উপত্যকাও বঞ্চনার শত অভিযোগ সত্বেও অসম থেকে বেরিয়ে যাবার আওয়াজ তুলেও সুবিধে করতে পারেনা তার একটি কারণ এই। সুজিত চৌধুরী লিখেছেন সমস্যাটা হলো, বরাকে আঞ্চলিক বোর্জুয়া গড়ে উঠেনি ( বরাক উপত্যকার বাঙ্গালিঃঅস্তিত্ব ও অবয়বের সঙ্কট; প্রবন্ধ একাদশ), আমরা একে অস্বীকার করিনা। তিনি আমাদের মতোই সুবিধেভোগী শ্রেণির কথাও লিখেছেন। কিন্তু এই বোর্জুয়ার দরকারটা কেন, বডোলেন্ডে বা ডিমাহাচাওতে অন্তত আওয়াজগুলো এতো তীব্র কেন? —--এর উত্তর সন্ধান করলেই হয়তো তিনি অন্যভাবে ভাবতেন। নাগালেন্ড, মেঘালয়, মিজোরাম বেরিয়ে যেতে পারল কিসের জোরে--- তাও কি অনুসন্ধান করা যেত না? আমাদের কি মেনে নিতে হবে যে ওরা শ্রেণির বিচারেও বাঙালিদের থেকে এগিয়ে গেছেন বহুদূর? বরং ওখানেও গেলে দেখা যাবে অর্থনীতির লাগামটা মাড়োয়াড়িদের সঙ্গে ছোট সহযোগী হিসেবে রয়েছে বাঙালি হিন্দু হাতেই। যে বাঙালিদের এক বড় অংশ মূলত সিলেটিরা এখন শিলচরে পুনর্নিবেশ করে গড়ে তুলেছেন রাজ্যের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক শহর। সম্ভবত দ্বিতীয়, জনসংখ্যাতে তাই বটে। খোলা চোখে শিলচরকে দেখে বাইরের কেউ বিশ্বাসই করবেন না যে এটি তেজপুর, তিনসুকিয়া বা ডিব্রুগড় থেকে পিছিয়ে পড়া কোনো শহর।
        ২০০৭এ যখন রাজ্য জুড়ে আবার বিদেশি বিতাড়ন তথা ‘অসম আন্দোলন-০২’ চলছিল তখন ড০ অমলেন্দু গুহের এক সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন রূপ কুমার দাস। ‘আবেগের ভিত্তিতে রাজনীতি নয়ঃ ড০ অমলেন্দু গুহ’ শিরোনামে প্রকাশ পেয়েছিল দৈনিক যুগশঙ্খের ১৯ আগষ্ট সংখ্যাতে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল , “ অসমে বাঙালি হিন্দুদের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার তথা অস্তিত্ব রক্ষার  কথা বলবার জন্য কোনো সক্রিয় নেতা বা শক্তিশালী সংগঠন নেই, কারণ কি? উত্তরে ড০ অমলেন্দু গুহ বলেন এর কারণ হয়তো অনেকগুলো। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বার বার হিন্দু মুসলমান, পূর্ববঙ্গীয় মুসলিমদের ঘর পুড়েছে। তাড়া খেয়ে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে , রক্তাক্ত সংঘর্ষে প্রিয়জনকে হারাতে হয়েছে। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করতে হয়েছে এবং পাশাপাশি কিছু তথা কথিত উচ্চ শ্রেণির বাঙালি বাড়ি , গাড়ি, সম্পত্তি ইত্যাদি করে লাখপতি কোটিপতিও হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ১৯৪৭-৭১এর সময়টায় যারা প্রব্রজিত তাঁদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেছে, যার জন্যে আমার মনে হয় তাঁরা সৎপথে কৌটা নেড়ে টাকা পয়সা তুলে মজবুত সংগঠনও তৈরি করতে পারছেন না এবং এক একটা সংগঠন ভেঙ্গে গিয়ে অনেকগুলো সংগঠন জন্ম দিচ্ছে। শুনেছি ‘আমসু’ নামে আটটি সংগঠন আছে এবং বাঙালি যুব ছাত্র ফেডারেশন নামেও গোটা তিনেক।... বাঙালি হিন্দুদের সাংগঠনিক অবস্থা কমজোরি হওয়ার আরো একটি কারণ তাঁদের স্বাভাবিক মুসলমান বিদ্বেষ। স্বাভাবিক বলছি এজন্যই যে এদের আগের প্রজন্ম অত্যাচারিত হয়েই পূর্ব পাকিস্তান থেকে ( বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১) চলে আসতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু, আবেগের ভিত্তিতে রাজনীতি করলে আন্দোলন বিপথে পরিচালিত হয়। নায্য অধিকারের জন্য হিন্দু মুসলমান, অসমীয়া বাঙালি নির্বিশেষে সমস্ত গরীব মানুষ একত্রিত হয়ে আন্দোলন করলে আন্দোলন জোরদার হতে পারে।...বাঙালি হিন্দুদের রাজনৈতিক চেতনা আরো উন্নত হওয়া প্রয়োজন । যাতে হিন্দুত্ববাদীদের উত্থানের যথাযথ তাৎপর্য তাঁরা বুঝতে পারেন।”
              বরাককে আলাদা করে নেবার প্রশ্ন উঠলে এই অমলেন্দু গুহ কথিত ‘উচ্চ শ্রেণির বাঙালি বাড়ি , গাড়ি, সম্পত্তি ইত্যাদি করে লাখপতি কোটিপতিও হওয়া’ শ্রেণিটি থেকে আশংকা ছড়ানো হয়, মুসলমানেরা আধিপত্যে চলে আসবে। যেটি লুকোনো হয়, তা এই যে দিল্লি এবং দিসপুরের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস হবে-- যেটি তাদের কাছে এখনই লাভজনক নয়। যেমন ছিল না তাদের পূর্বসূরীদের ১৯০৫এর বঙ্গ ভঙ্গের সময়। দিসপুরের বঞ্চনার সবটা যে সত্য নয়, তা আঞ্চলিক উন্নয়নের সরকারি তহবিলের তছরূপ আর অব্যবহৃত পড়ে থাকবার মধ্যেই ধরা পড়ে যায়। ধরা পড়ে মহাসড়ক আর ব্রডগেজ নির্মাণের কাজে পরিবহন লবির ষড়যন্ত্র–র কথা সামনে এলেও ব্যবসাটির বাড়বাড়ন্তের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধের অভাব কিম্বা স্বরূপ উন্মোচনে সাহসের অভাবের মধ্যি দিয়ে।
          সুতরাং আমরা যখন ব্রহ্মপুত্র উপত্যাকাতে ‘হিন্দু বাঙালি’ বয়ান নির্মাণের প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলব তখন ধরে নেবার কোনো কারণ নেই যে এরা একটু বেশিই রক্ষণশীল । বরং এটা বলা যেতে পারে যে বাস্তবতার ভিন্নতা এই প্রশ্নে তাদের একটু বেশিই স্পষ্টবাদী করে রেখেছে। এখানে বাঙালি হিন্দু যুব ছাত্র ফেডারেশন বলে যে সংগঠনটি রয়েছে তার সংখ্যালঘু ছাত্র সংস্থার মতোই অজস্র গোষ্ঠী বিভাজনে মিল থাকলেও স্পষ্টই ওরা ‘হিন্দু বাঙালি’ স্বার্থের পক্ষে কথা বলে, প্রথমটি মুসলমান বাঙালিদের পক্ষে । এদের বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অধীন বলে ধরে নেবার কোনো কারণ নেই। এই লেখা যখন লিখছি, সেদিনই কাগজে দেখলাম, ডি-ভোটার নিয়ে হেনস্তার প্রতিবাদে ‘লিগ্যাল আণ্ড হিউমেন রাইটস প্রটেকশন ফোরাম ফর পার্টিশন ভিকটিমস , অসম’ এর আয়োজনে একটি সভা হলো ওদালড়ি জেলার জগন্নাথঝাড় গ্রামে। সংগঠনের নামেই প্রকাশ যে এরা ‘হিন্দু বাঙালি নিয়ে কথা বলছিলেন।সেখানে ‘নেতাজি বিশেষজ্ঞ’ অঘোর মিত্র , সম্পাদক প্রধান সহদেব দাস সহ, আরো অনেকের সঙ্গে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছেন সভাপতি মণীন্দ্র রায়। ইনি শিলচরে বড় হয়েছিলেন , ১৯৬১র বাংলা ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। কবি, লেখক সাংবাদিক হিসেবে খ্যাত। ইনিও সেখানে হিন্দুদের স্বার্থে কথা বলছিলেন। এরকম প্রচুর সংগঠন রয়েছে হিন্দু বাঙালিদের এই উপত্যকাতে । এই সংগঠনগুলোর মধ্যে কোনো ঐক্য নেই, নেই তেমন প্রত্যয়। সেই হাহাকার সেই সভাতেও শোনা গেছে । ‘গ্রেনাইট পাথরের মতো জড়তা গ্রাস করেছে...’ বলে অমল গুপ্তের যে লেখাটির কথা আগে উল্লেখ করছিলাম , তাতে জাকির হুসেনের গল্প রয়েছে। যে বাংলা বলে না কেননা ‘বাবু ডর করে। ’ কিন্তু তার পরেই আমরা দেখিয়েছি মানিক দাসের উদ্ধৃতিতে মুসলমানের কোনো কথা নেই। কারণটি অমল গুপ্তের পরের কথা থেকেই আঁচ করা যায় ‘রাজ্যে হিন্দু মুসলিম প্রায় এক কোটি বাংলাভাষী মানুষ। বাঙালি হিন্দুরা কোনো ঐতিহাসিক কারণেই হয়তো বাঙালি মুসলিমদের সঙ্গে এক দূরত্ব বজায় রেখে চলে। অসমীয়াদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও ভালো নয়। অথচ বাঙালি মুসলিমরা অসমিয়াদের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে চায়। তাই স্বাভাবিক ভাবে রাজ্যের হিন্দুরা সবদিক থেকেই প্রায় একঘরে অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে...” রাজ্যের হিন্দুরাই যদি একঘরে হয়ে দিন কাটাচ্ছে তবে জাকির হুসেনের কেন ‘ডর করে’ ?--- তার কোনো জবাব নেই। একে ঠিক ঘৃণা বলব না । কারণ অমল গুপ্ত এবং মনীন্দ্র রায়দের বেশ কিছু সাহসী লেখা আমরা পড়েছি যখন ২০০৭ এ এই মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ বলে উজান অসম এবং অরুণাচল থেকে তাড়ানো হচ্ছিল। ভাটি অসমের চর অঞ্চলের মুসলমানদের দারিদ্র্য দুর্দশা  নিয়ে অমল গুপ্তের বেশ কিছু হৃদয়স্পর্শী লেখা পড়বার অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু সে সেই অর্থনৈতিকশ্রেণি অবস্থান থেকে। বাঙালি পরিচয়টা দাঁড় করাবার সাহসী প্রয়াসও চাপা থাকে না সেগুলোতে, কিন্তু ঐ ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে এনে। উপরের উদ্ধৃতিতেও দেখা যাবে, তিনি হিন্দু মুসলমানের দূরত্বের কারণটা কোনো এক ঐতিহাসিক কারণের উপর ছেড়ে চলে এসছেন। অনেকেই এতে দেশভাগের কথা বলেন। কিন্তু তিনি সম্ভবত এর বেশি কিছু ইঙ্গিত দিতে চাইছিলেন। এই মাত্র। অর্থাৎ এর বাইরে, এর গভীরে কোথাওতো তিনি অধ্যয়নের জায়গাটাকে ফাঁকা অনুভব করেছেন। মুসলমানেরা অসমীয়াদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে চান বলে অভিমান প্রকাশ পেয়েছে । কিন্তু হিন্দুদের সঙ্গে অসমীয়াদের একেবারে ‘সম্পর্কও ভালো নয়’ বা ভালো করবার প্রয়াস নেই এই তথ্য এ পর্যন্ত এসে কেউ মেনে নেবেন না । একই সময়ে প্রকাশিত ‘রাগ-অনুরাগে’ সুলেখক মানিক দাসের একটি মূল্যবান লেখা রয়েছে, “ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাত অসমীয়া বাঙালী সম্পর্ক”। তাতে তিনি শুরুর দিকে লিখেছেন, “ মানবীয় কোনো সম্পর্কই শাশ্বত নহয়... বাঙালীসকলৰ জীবন-যাপনৰ আত্মবিশ্বাসী গতি প্রকৃতিত অসমীয়া –বাঙ্গালী সম্পর্কৰ পৰিবর্তনৰ প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায়। আগতে বাঙ্গালী সকলে ইয়াত অনুগৃহীতৰ দৰে বাস কৰিব লগীয়া হৈছিল। জড়তা আৰু অনিশ্চয়তা আছিল নিত্যসঙ্গী । এতিয়া সেই অৱস্থা নাই। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ক্রমশঃ তেওঁলোকৰ ওচৰত স্বভূমি হৈ উঠিছে ।” একই লেখাতে মানিক দাস এমনও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, “প্রসঙ্গত এই কথা উল্লেখ কৰা দৰকাৰ। পৰিৱর্তিত পৰিস্থিতিত আৰু সময়ৰ তাগিদাদ অসমীয়া আৰু বাঙালী সকলে বহুদিনীয়া তিক্ততা পাহৰি বহু পৰিমাণে ওচৰা-ওচৰি হৈ পৰিছে, আৰু আহিব, আহিবই লাগিব। অবশ্যে এই অহাটো বহুতৰ পক্ষে কাংক্ষিত নহ’বও পাৰে । যেনে, অবাঞ্ছিত বাংলাদেশিৰ আগমন আৰু অৱস্থানক বৈধতা দিয়াৰ কামত ব্যস্ত বহুতেই আশংকা কৰিব পাৰে যে অসমীয়া বাঙালীয়ে পুৰণা বিবাদ পাহৰি একেলগ হ’লে তেওঁলোকৰ সেই বৈধতা দিয়াৰ আয়োজন বিপর্যস্ত কৰি দিব পাৰে। সেই কথা ভাবি তেওঁলোকে বাঙালীসকলৰ হাজাৰ বিজাৰ দোষৰ কথা তুলি অনবৰতে বাঙ্গালী বিদ্বেষ প্রচাৰ কৰি অসমীয়া মনক বিষাক্ত কৰি দিব পাৰে । তেনে মানুহৰ ৰাজকীয় পদশব্দ সঁচাকৈয়ে শুনা গৈছে ।” সুকুমাৰ বাগচি এবং জ্যোতির্ময় সেনগুপ্ত যাদের ‘রাজকীয়’ পদশব্দের বার্তা জানালেন তাদের সম্পর্কে এই লেখক কী বলবেন? তাঁর এই আশঙ্কা একেবারে নিরর্থকও নয়। ‘ন-অসমীয়া’দের যে ক’জন অসমিয়াতে লেখালেখি করে বেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তাঁদের দু’একজনকে সেই সময় দেখা গেছিল ‘বাঙালি’ বিরোধী জিগির তুলতে কাগজ কাগজে। একজন প্রখ্যাত লেখক শিলচর থেকে চাকরি বদল করে এসেই একটি অসমিয়া কাগজে লিখেছিলেন বরাকে কেমন বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদ চলে । তিনিও কিন্তু নিজেকে বামপন্থী বলে দাবি করেন, এবং অসমিয়া জাতি গঠনের মহান দায়িত্বে রয়েছেন বলে মনে করেন। তেভাগা আন্দোলনে বরাকের যোগাযোগ নিয়েও তাঁর লেখালেখি রয়েছে । তাঁর কাছে ১৯শের সমস্ত অর্জনকেই বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদ বলে মনে হয়েছিল। ১৯৬১র ১৯জুনে হাইলাকান্দিতে যারা মৃত্যু বরণ করেছিলেন তাঁদের অসমীয়া ভাষার শহীদ বলে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে দেখা গেছিল। শিলচর বেতারে-দূরদর্শনে ‘বাংলাদেশি’ গান শুনে এসে তাঁর মনে হয়েছিল সেই উপত্যকা বাংলাদেশ হতে আর দেরি নেই। তাঁর মতে এই ষঢ়যন্ত্রের পেছনে মদত রয়েছে বাংলাদেশ আর পশ্চিম বাংলার কিছু উগ্রজাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবিদের, যারা সেখানেও আজকাল উনিশ মে পালন করেন। দীর্ঘদিন এই নিয়ে দু’একটি কাগজে তর্ক হয়েছিল। বর্তমান লেখকও তখন কোনো এক কারণে ঐ লেখকের ঊষ্মার কারণ হয়েছিলেন। তখন কেউ কেউ তাদের মধ্যে বহু অসমিয়াও রয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে মানিক দাসের মতো অভিযোগ তুলেছিলেন। স্পষ্ট বোঝা যায় মাত্র, এ হচ্ছে দু’দিক থেকেই অসমীয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণিটির প্রিয় হবার প্রতিযোগিতা মাত্র। শুধু শুধু বাংলাদেশ আর পশ্চিম বাংলার ঘাড়ে দায় চাপাবার প্রয়াস। যদি এই সমস্ত ন-অসমিয়া বুদ্ধিজীবিদের প্রচারে সম্প্রতি গড়ে উঠা অসমীয়া বাঙালি সম্পর্ক বিপর্যস্ত হয়ে যায়, তবে বুঝতেই হবে এ একেবারেই ঠুনকো সম্পর্ক , ভেঙ্গে যাওয়াই তার নিয়তি। ময়মনসিংহমূলীয় ‘ন-অসমীয়া’ কিম্বা ‘বাঙালি হিন্দু’ কারো সঙ্গেই অসমীয়া মধ্যবিত্ত কিম্বা উগ্রজাতীয়তাবাদীদের একেবারে সম্পর্কচ্ছেদ করবার কোনো সম্ভাবনাই নেই, যেমন নেই নির্বিরোধ ঐক্যের। অন্তত যতদিন সংখ্যালঘু –সংখ্যাগুরু ( ভাষিক এবং ধর্মীয় দুই অর্থেই) সমস্যার কোনো সাংবিধানিক সমাধান না বেরিয়ে আসছে। সংখ্যালঘুর অধিকারের যথার্থ সুরক্ষাই আসলে এমন আশঙ্কা থেকে সবাইকে মুক্ত করতে পারে, মায় সংখ্যাগুরুকেও—এই আপাত স্ববিরোধী উক্তিটিতে আমরা পরে আবার ফিরে আসব।
           
                          বরাককে আলাদা করে নেবার প্রশ্ন উঠলে মুসলমানদের তরফেও উলটো আশঙ্কা ছড়ানো হয় বটে, হিন্দু আধিপত্য   বিস্তারের । কিন্তু তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। দীর্ঘ তিন দশক ধরে বরাক থেকে কোনো মুসলমান সাংসদ নেই। অবাঙালিদের কথা বাদই দিলাম। কোনো দীর্ঘস্থায়ী স্বাধীন বিধায়ক নেই একা শহীদুল আলম চৌধুরী ছাড়া । বিধায়কদের যাদেরই ক্ষমতার অলিন্দে একটু বাড়বাড়ন্ত দেখা যায় শাসক দলগুলো পরের নির্বাচনেই তাদের ডানা ছাটে । অবাঙালিদের কথা বাদই দিলাম। আসলে দিসপুরের অসমীয়া বর্ণহিন্দু শাসকেরা বরাকের এই সামাজিক বিভাজনকে নিয়ে বৃটিশের মতোই খেলিয়ে নিতে সুবিধে পায়। বরাকের আঞ্চলিক বর্ণহিন্দুদের ক্ষমতার একাধিপত্যে রাশ ধরতে মুসলমান, এবং অন্যান্য অবাঙালি বিধায়ক এবং স্থানীয় মূলত গ্রামীণ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কাজে লাগায়। সেই ছোট মুৎসুদ্দিদের আয় মূলত আসে কৃষি ছাড়িয়ে নানা সরকারী কন্ট্রাকটরি, সরকারি প্রকল্প (তাতে সংখ্যালঘু উন্নয়নও থাকে) , পরিবহন ব্যবসা, খুচরো ব্যবসা এবং আদালতের মামলা থেকে। সাচার কমিটিও দেখিয়েছে রাজ্যের প্রায় ৩১ শতাংশ মুসলমানেদের সেই সব বাঙালির পাশে ঠাই নেই, যাদের কথা অনুরাধা শর্মা পুজারী প্রখ্যাত দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ Myron Weiner-এর লেখা থেকে নিয়ে দেখিয়েছেন। ‘রাগ-অনুরাগে’ তাই শুধু বরাকের ‘ইতিহাস সুকীয়া’ বলে তার কথাই নেই নয়, কোনো মুসলমানের কথাও নেই। সেই বাঙালিদের পাশে অসমিয়ারা এখন আছেন বলেই তাদের সম্পর্কে পুরোনো বয়ান পাল্টাচ্ছে । মুসলমানেরারাও অফিসে আদালতে, স্কুলে কলেজে সমানে থাকতেন, সে অসমীয়া বা বাঙালি যাই হোক, তবে তাদের সম্পর্কেও বহু প্রচলিত বয়ানকেও কল্পকথার গল্প বলেই সহজেই মেনে নেয়া যেত। মায়, বদরুদ্ধিন আজমলের ‘অসমিয়া লেখানোর ফতোয়া’কেও প্রত্যাহ্বান জানাবার দরকার পড়ত না। সম্ভবত, তিনি সেরকম কোনো ফতোয়া দিতেনও না, কারণ ‘ভাষা কী এবং কাকে বলে’ সেই বোধ মুসলমান মধ্যবিত্তদের থাকত যথেষ্টই , কাউকে বলে দিতে হতো না। একা বদরুদ্দিন আজমলকে দিয়ে মুসলমান বাঙালির শ্রেণি ভিত্তিকে ধরা যায় না ।
               জ্যোতির্ময় যেমন পূর্ববঙ্গ থেকে ভিটেমাটি হারা হয়ে এই দেশে আসাদের বেলা লিখেছেন, “এঁদের কাছে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিষয়ক কাঁদুনি গেয়ে কোনও লাভ হবে না।” আমরাও একই কথা লিখতে চাই মুসলমান বাঙালিদের বেলা, বিশেষ করে চর অঞ্চলের মুসলমানদের বেলা। কারণ ভাষা তাদের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ যারা তাকে লিখিতরূপে রোজকার জীবন জীবিকাতে ব্যবহার করেন। সেই জীবন দেবনা, আর বলব--- ১৯শের বেদীতে মাথা ঠুকো, এর চে নিষ্ঠুরতা আর কিছু হতেই পারে না। এই সত্য কি, জানেন না মৌলানা বদরুদ্দিন আজমল? যারা তাঁর ফতোয়াকে বিরোধীতা করেন তাদের থেকেতো বেশিই জানেন। এটা আমরা নিশ্চিন্তেই বলতে পারি । তাই তাঁকে পরামর্শ দিতে হয়েছে । কারণ যারা তা লেখাবে তারা লিখতে জানেন না, তাদের হয়ে লিখে দেন অন্যে। যিনি লিখে দেন তাঁকেই তাঁরা জিজ্ঞেস করেন আমার ভাষাটা কী? মুসলিম? কারণ ধর্মটা কি তা সে আরো বেশি জানে যে সাত দিন সাদা ভাত খেতে পায় না। আল্লাকে তার ডাকতে হয়। ভাষাটা তাদের লেখাতে হয় ব্যবহার করতে হবে বলে নয়, ‘বাংলাদেশি’ নয় বলে প্রমাণ করবার জন্যে। আরো একটা মোকালমোয়া, নেলি বা গোহপুর থেকে কোলের শিশুটিকে বাঁচাবার জন্যে। জ্যোতির্ময় এই লিখে আক্ষেপ করেছেন, ‘ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় যাঁরা শহিদ হয়েছেন (সংখ্যাটা এগারোর চেয়ে বেশি হলেও)’ কেউ তাদের স্মরণ করে না । অসমিয়া সাংবাদিক দিগন্ত শর্মা তাঁর ‘নেলি -১৯৮৩’ বইতে লিখেছেন নেলিতে সংখ্যাটা ১৮১৯ এবং তার থেকেও বেশি। তাদের কেউ বাংলাদেশি ছিলেন বলে প্রমাণিত হয় নি। প্রতি বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি আসে আর যায় , কিন্তু কোনো বাঙালি তাদের জন্যে দু’ফোটা চোখের জল ফেলে না। অসমিয়া সমাজতো দূরেই থাক।  আগামী দিনেও ফেলবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আজ অব্দি তার কোনো বিচার হয় নি ।
                  যে অসমিয়া কাগজগুলো বদরুদ্দিন আজমলের ‘ফতোয়া’র জন্যে অভিনন্দন জানিয়েছিল তারাই তখন এই অভিযোগ তুলেও হৈচৈ ফেলেছিল, চর অঞ্চলে জনগণনার  কাগজ যাচ্ছে বাংলায়। ‘ফতোয়া’র পাঠ যারা পড়ছেন, তারা তার বিপরীতে এই সংবাদের পাঠগুলো পড়তে পান নি, হয়তো পড়তে পাননি বা পড়তে চান নি। আমাদের প্রশ্ন হলো, এই বাংলায় কাগজ পাঠাবার কাজ গুলো করছিলেন কারা? কী করেই বা করছিলেন? আমাদের এও প্রশ্ন, কয়েক দশক ধরে যে মুসলমানেরা জনগণনাতে নিজেদের ‘অসমিয়া’ লিখিয়েই আসছেন তাদের হঠাৎ নতুন করে আবার এমন ‘ফতোয়া’ দেবার দরকার পড়লই কেন? দিগন্ত শর্মা বরং এই সমস্যা ভালোই বুঝেছেন, “ তাঁরা যদি পৃথক পরিচয়ের কথা ভাবেন তবে তাঁদের প্রভুত্ববাদী অসমিয়াদের রোষে পড়তে হবে। ওমন রোষকে প্রতিহত করতা পারবার মতো শক্তি এখনো তাঁরা জোটাতে পারেন নি । কারণ অসমের সমস্ত মুসলমানকে একত্রিত করতে পারবার মতো সামর্থ্য এখনো তাঁদের হয় নি ।” (সুশান্ত কর কৃত অনুবাদ গ্রন্থ, নেলি ১৯৮৩) ‘আমার অসমে’র যে ‘প্রথম কলামে’র কথা আমরা শুরুর দিকে লিখলাম, তাতে এই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তার পরেও ঐ ‘কলামে’ যাদের বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ পেয়েছিল আমরা তাদের মৌলানা আজমলের সমর্থক বলেই জানি । এই প্রসঙ্গে একটি চিত্তাকর্ষক ঘটনার কথা আমাদের মনে পড়ছে । লোকসভাতে বিজয়ের পর ছেড়ে দেয়া দক্ষিণশালমারা বিধানসভা উপনির্বাচনে যখন আজমলপুত্র প্রার্থী হয়েছিলেন কংগ্রেসের প্রার্থী ওয়াজেদ আলি তখন আজমল পুত্রের বিরুদ্ধে বাংলা না জানার অভিযোগ এনেছিলেন। সেই অভিযোগের জবাব দিতে হোজাই থেকে এক বাংলা শিক্ষককে ভালো মাইনে ও থাকা খাওয়ার সুবিধে দিয়ে মুম্বাইতে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আব্দুর রহমান ইংরেজি জানেন, জানেন উর্দু এবং হিন্দিও। কিন্তু জানেন না অসমিয়া ও বাংলা। শিক্ষক নির্বাচনী প্রচারে সারাক্ষণ তাঁর সঙ্গে ছিলেন যাতে বাংলা বলতে প্রার্থীকে সাহায্য করতে পারেন। মৌলানা আজমলের ‘ফতোয়া’র এক নির্বাচনী হিসেব ছিল। অগপর সঙ্গে আঁতাত করলে যে অসমিয়া জাতীয়তা বিপন্ন হবে না এই বার্তা পৌঁছে দিয়ে বিজেপিকে দূরে ঠেলে দেবার কৌশলগুলোর একটিও এটি । এরকম  তখন অনেকে লিখেছিলেন, যারা দুনিয়াটাকে কেবল ভাষার দূরবীনে দেখেন না। এবং তাতে তিনি বহুদূর সফলও হয়েছিলেন। আজ যদি এমন হতো যে, অগপ-এ আই ডি ইউ এফ সরকার হতো , তা হলেও আমরা নিশ্চিত যে সেই সরকারকে ডি-ভোটার নিয়ে অন্তত সেরকম অবস্থানে যেতেই হতো যে অবস্থানে বর্তমান সরকার এগুতে বাধ্য হচ্ছে । এই আই ইউ ডি এফ নিজে কী করছে তার থেকেও বড় কথা, আই এম ডি টি আইন যারা বাতিল করালেন তাদের রাজনৈতিক স্থিতি এখন শূন্যের দিকে আর তার প্রতিবাদে গড়ে উঠা দল এখন সমস্ত প্রতিষ্ঠিত দলকে প্রত্যাহ্বানের মুখে ফেলে দিয়েছে। তার নিজের অস্তিত্বও বিপন্ন হবে যদি সমস্যাটির এক সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান না বেরিয়ে আসে । আই এম ডি টি আইন বাতিল হওয়াতে তাতেই একদিকে যেমন ১৯৪৬এর বিদেশি নাগরিক আইনের পূর্ণ প্রয়োগের রাস্তা খুলে গেছে, তেমনি তার প্রতিবাদে পায়ের নিচে জমি ফিরে পেতেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও শুরু হয়ে গেছে। অরাজনৈতিক সংগঠনগুলোও ক্রমেই কথা বলবার সাহস গোটাতে সমর্থ হচ্ছে । রোজকার কাগজ খুললেই এই সাহসের ছবি স্পষ্ট চোখে পড়ে ।
            যে আই এম ডি টি আইন বাতিল হবার পরেই ডি-ভোটার করে হেনস্তা বেড়ে গেল, বা ডিটেনশন কেম্পে আটকে রাখা হচ্ছে বহু হিন্দু বাঙালিকেও সেই আইন বাতিলের সারিতে ছিলেন বহু হিন্দু বাঙালি সংগঠনও। মনে করা হচ্ছিল যে, ১৯৫০এর আসাম থেকে অনুপ্রবেশকারী বহিষ্কার আইন প্রয়োগ করে হিন্দুরা আত্মরক্ষা করে নেবেন। কিন্তু পড়া হয়নি, অসম আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে এখনো যারা সক্রিয়, তাদের মন। তারাতো আর হিন্দুতে মসুলমানে তফাৎ করতে কখনোই রাজি ছিল না । তাই, অসমের রাজ্যপালের এক নির্দেশ বলে ২০০৯ থেকে শুরু হলো ধর্মনির্বিশেষে ডিটেনশন। এখন এই আই এম ডি টি আইন বাতিল পক্ষের অনেক বাঙালি হিন্দু নেতা (সবাই নন) মুখে কুলুপ এটেছেন। যে দলটি বাঙালি হিন্দুদের শরণার্থীর মর্যাদা দিয়ে, মুসলমানকে তাড়াতে হবে বলে শুরু থেকেই রাজনীতির খাতা খুলেছিল এই রাজ্যে, তাদের এবারে হিন্দু বাঙালিরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটি এক শুভ লক্ষণ। তবে এবারে কি তাদের এই আই ডি ইউ এফের পক্ষে যাওয়া উচিৎ ? না আমরা মোটেও সেরকম দলীয় ইস্তাহার লিখতে বসিনি। এ আই ডি ইউ এফের ডি-ভোটার ইস্যুতে আন্তরিকতা নিয়ে স্বয়ং দলটির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক প্রশ্ন তুলেছেন। বর্তমান লেখকের এই নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধান নেই। তাই, আমরা সেই সংশয়কে স্পষ্ট করতেও যাব না। এই নিয়ে বাঙালি হিন্দুরা যদি সত্যি কাল এমন এক দল করেন যেটি হবে চরিত্রে আঞ্চলিক এবং অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অপরাক্রমী তাতেও আমাদের আপত্তি করবার কারণ দেখছি না । আমরা কেবল, বাঙালি ভাবনার গতিবিধিকে বিধিকে বোঝবার চেষ্টা করছি। বুঝতে চাইছি যে এ আই ডি ইউ এফ কে সাম্প্রদায়িক দল বলা হচ্ছে কেন? তাদেরকেতো এখন হিন্দুদের শরণার্থী হিসেবে মেনে নেবার দাবি তুলে হিন্দুত্ববাদী প্রতিপক্ষের পালের হাওয়া কেড়ে নিতেও দেখা যাচ্ছে।
অমল গুপ্তের আরো এক লেখা বেরিয়েছিল গেল লোক সভা নির্বাচনের পরঃ ‘শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিছাড়া বাঙালিদের অস্তিত্বই বিপন্ন।’ বলাই বাহুল্য যে তিনি ‘হিন্দু বাঙালি’দের কথা লিখছেন। বাঙালি শব্দের ভেতরে মুসলমানদের টেনে নেবার তেমন সমর্থ ‘বাকস্বাধীনতা’র বাস্তবতাই এখনো এই উপত্যকাতে গড়ে উঠেনি । এর মধ্যে সোজা সাম্প্রদায়িকতা খোঁজে নিয়ে কোনো লাভ নেই। কিন্তু লেখাটির শেষে তিনি মন্তব্য করেছেন, “ ...ইউ এম এফের মতো ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলও  ছিল । তখন কিছুটা হলেও সুবিচার পাওয়া যেত। কিন্তু এ আই ডি ইউ এফের মতো দল নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করলেও বাস্তবে কিন্তু এর উলটো । ধর্মনিরপেক্ষ হলে তাঁদের ঝুলিতে ঢালাওভাবে লক্ষ লক্ষ মুসলিম ভোট পড়ত না । অন্তত ২৫টি আসনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলে নিজেদের প্রতিপন্ন করতে পারত না । এ আই ডি ইউ এফ দাবি করেছে আগামী ২০১১ সালের বিধানসভার নির্বাচনে ১২৬টি বিধানসভার মধ্যে অন্তত ৪০টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করবে । রাজ্যের পরিস্থিতি সেই দিকেই যাচ্ছে ... ভবিষ্যতে এ আই ইউ ডি এফ রাজ্যের রাজনীতিতে এক বিশাল শক্তিরূপে দেখা দেবে। আর পাশাপাশি বাঙালি হিন্দুরা, তাঁদের কী হবে? তাঁদের কি কোনো রাজনৈতিক দল গড়ে উঠবে? নতুন কোনো সংগঠন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে না ওঠা পর্যন্ত রাজ্যের ৬১ লক্ষ বাঙালি হিন্দুর কানাকড়িও মূল্য থাকবে না। ...।আগামী দিনে বাঙালি হিন্দুরা যাতে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিগণিত হতে পারে সে ব্যাপারে আজই , এখনি সক্রিয়ভাবে চিন্তা করতে শুরু করে দিতে হবে।” এই ‘আজই , এখনি’ লিখবার সময় তাঁর চিন্তাতে ছিল ২০১১ র বিধানসভা নির্বাচনও। কিন্তু দেখা গেল, এখনো ডি-ভোটার বিরোধী আন্দোলনের জোয়ারের দিনেও বাঙালি হিন্দুর তেমন কোনো সংগঠন গড়ে উঠে নি। বিজেপিতেও তাঁরা ভরসা স্থাপন করেন নি । তাঁর আশা করেছিলেন এ আই ডি ইউ এফের দাবি অনুযায়ীই বিধান সভার সদস্য সংখ্যা ৪০এর দিকেই যাবে। যায়নি বটে, কিন্তু দ্বিতীয় বৃহৎ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এবং আঠারোজন বিধায়কদের মধ্যে দু’জন বাঙালি হিন্দুও রয়েছেন। লামডিঙের স্বপন কর আর বকোর গোপিনাথ দাস। কী বলা যাবে? এখনো এই উত্থানকে ঈর্ষার দৃষ্টিতে দেখে যাবে বাঙালি হিন্দু? আর নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে করে যাবে হাহাকার শুধু? স্বপন কর আর গোপীনাথ দাস সম্পর্কেও কি এই বলেই আত্মতুষ্ট থাকতে হবে, “বরাক ব্রহ্মপুত্রর নাম আর পুইসার ধান্ধায় দালাল হকলে লাইন মারিয়া যাইরা। ইতা আর কতগু?” এখানেও কি এই মন্তব্য থেকে কোনো শিক্ষা নিতে হবে নাঃ “আত্মীকরণ মানে কিন্তু আপোষ নয়, আত্ম-বিনষ্টিও নয়। অন্যকে জানার মাধ্যমেই আত্ম-বিস্তার ঘটে।” অন্তত ২৫টি আসনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলে নিজেদের প্রতিপন্ন করল বলেই যদি একটি দল আর ধর্মনিরপেক্ষ রইল না, তবে বাঙালি হিন্দুর যে দল গড়বার আহ্বান জানানো হচ্ছে তাকে কি বলা যাবে? তার অধিকাংশ বিধায়ক কি বাঙালি হিন্দু হবেন না? আর হলে কি তারা কেবল হিন্দু বলেই ধর্মনিরপেক্ষ থেকে যাবে? ইউ এম এফ কি এর জন্যেই ধর্মনিরপেক্ষ ছিল যে তার নেতৃত্বে ছিলেন কালিপদ সেন, ডাঃ অর্ধেন্দু দে’র মতো হিন্দু নেতাও? আর দলটির জন্ম হয়েছিল সি আর পি সি-র মতো ধর্মসম্পর্কশূণ্য মানবাধিকার সংগঠনের উদ্যোগে ? আর এ আই ডি ইউ এফকে কি এর জন্যে মেনে নেয়া যাবে না যে তাদের জন্মের পেছনে রয়েছে জমিয়তের মতো এক ইসলামী ধর্মীয় সংগঠন? আর এর নেতৃত্বে আছেন একজন মৌলানা? তারাতো, জাতে পাতের উর্দ্ধে উঠে প্রার্থী দিয়েছিল , কোনো জাতিবিদ্বেষী স্লোগানও দেয় নি। তার পরেও? ইউ এম এফের মতো সেই ধর্মনিরপেক্ষ দলটি রাজ্য রাজনীতিতে একটি বিধান সভার সময়-কাল কেন পার করতে পারল না সফলতার সঙ্গে, তার কোনো পূণর্মূল্যায়ন করতে হবে না? এইখানেই আসে শ্রেণি-বর্ণের প্রশ্নগুলো।
                 দেশের রাজনীতিতে কংগ্রেসের মতো  একটি দল যেভাবে শ্রেণি-বর্ণের ব্যবস্থাপনা করে ফেলে তার বিপরীতে আজও কোনো রাজনৈতিক দলের তেমন কোনো সামগ্রিক প্রতি-পরিকল্পনাই নেই। ইউ এম এফ ছিল মূলত কিছু বাঙালি হিন্দু মুসলমান মধ্যবিত্ত নেতৃত্বাধীন দল। মৌলানা আব্দুল জলিল রাগিবির মতো নেতারা ছাড়া আর কার কতটা নিজের নির্বাচন চক্রের বাইরে গণভিত্তি ছিল গ্রামীণ জনতার উপর বা তাদের নিয়ে কোনো ভাবনা ছিল এটা গুরুত্ব দিয়েই ভাববার বিষয়। সাহিত্যের আসরের মধ্যমণি, সাহেবি পোষাকে কেতাদুরস্ত গোলাম ওসমানি বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হতেই পারেন। কিন্তু সাধারণ চরের মুসলমানের কাছে নিজের মানুষ বলে গ্রহণযোগ্য হতে হলে বেশ ও ভাষায় তাঁকে গোলাম ওসমানির থেকেও কল্পনাতীত ধনি ব্যাবসায়ী ব্যক্তি হয়েও মৌলানা বদরুদ্দিন আজমল হতেই হয়। যে হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোক চরের কৃষক জাকির হোসেনকে সৎ পরামর্শ দেবেন, এই মৌলানার সংস্পর্শ ছাড়ুন। ধর্ম আফিম মাত্র! জাকির হুসেন তখন তর্জনী তুলে সেই হিন্দু ভদ্রলোককে দেখিয়ে দেবেন, বাবু আপনার সঙ্গে , আপনার পাশে দেখি তবে দাঁড়িয়ে আছেন রামকৃষ্ণ মিশনের, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের , হিন্দু মিলন মন্দিরের গেরুয়া পাগড়ি পরা সন্নেসী মহারাজ। ইনি কি তবে ধর্মের কথা বলেন না? তাঁর ধর্ম কি আফিম নয়? না আপনি এসছেন, আমারই ইহকালতো গেল পরকালটাও কেড়ে নিতে!
           মৌলানা বদরুদ্দিন আজমল এবং তাঁর দলের নিরাসক্ত অধ্যয়ন পাওয়া যাবে প্রখ্যাত অসমিয়া বুদ্ধিজীবি সঞ্জীব বরুয়ার লেখাতে। প্রথমবার যখন দলটি নির্বাচিত হয়ে এসছে, সঞ্জীব বরুয়ার সামনে যখন ইউ এম এর ব্যর্থতা রয়েইছে, সেই তখনই ২০০৬ এর ১লা জুনে টাইমস অব ইন্ডিয়াতে লিখছেনঃ “It is a myth that Muslims vote for the Congress because of its secular credentials. Minority prudence has always been a factor. Muslims have often voted strategically for the most likely winner. The phenomenon hides a dark side of our democracy. Security of life and property should be a universal public good. It has become a private good that political parties provide selectively in exchange for political support. Voting to ensure ones physical security erodes the meaning of citizenship. Security is a major reason why Muslims of East Bengali descent have traditionally voted for the Congress in Assam. The emergence of the Assam United Democratic Front (AUDF) signals the desire to reject that dependency. Liberal democrats should welcome the assertion of a confident political voice by a minority.” (বড় অক্ষর আমাদের;Minority Report Impact of Assam polls on Muslim politics) ২০০৮এও তাঁর অবস্থান পাল্টায় নিঃ “Ajmal is an unusual figure in Indian politics. He probably detests what the BJP or the AGP would call the politics of ‘minority appeasement’ or of ‘vote banks’, as much as they do. However, he rejects that style of politics on behalf of Muslims. In Assamese politics, however, one must always distinguish between the ethnic Assamese Muslims – once an influential community, but now a small minority – and Ajmal’s primary constituency: the East Bengali origin Muslims. Ajmal seeks to assert the rightful share of power by the state’s 26.6 million Muslims. That such a bold Muslim voice would now emerge in Assam is not surprising. Muslims currently constitute nearly 31 per cent of the state’s population, second only to Jammu and Kashmir’s; that is about the same as the proportion of Muslims in undivided India.”( Assam: Confronting a Failed Partition) । এই অন্তর্দ্রষ্টা বুদ্ধিজীবি সেই ২০০৮এই লিখেছেন, “In Assam’s politics, the consequences of the failed Partition, therefore, have now entered an unfamiliar and somewhat unpredictable phase. It is unlikely that ‘who can guarantee security’ would remain for long the overwhelming question that the East-Bengali-origin Muslims would ask, which has limited their political choices in the past. If that happens, the Congress may not be able to hold on to this base for long. But this time it might lose it not to a regional force on pragmatic grounds as in the past, but to a more assertive Muslim voice” ( বড় অক্ষর আমাদের।)বিদেশি সমস্যার সমাধান সম্পর্কেও তাঁর কিছু সদর্থক বাস্তববাদী প্রস্তাব রয়েছে, আমরা এখনো শুনতে প্রস্তুত হইনি, সম্ভবত আরো বেশ কিছু ব্যর্থতার পর শুনতে বসব। আগ্রহীরা The Telegraph, ডিসেম্বর ২০০৮এ প্রকশিত তাঁর “Defining Migrants, Foreigners and Citizens in Assam” লেখাটি পড়তে পারেন।
        
             আমাদের প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় ভেদের উর্দ্ধে উঠে ‘বাঙালি’ পরিচয় নিয়েই হোক--- যেমন আশা করেন জয়দীপ বিশ্বাস বা ড০ সুজিত চৌধুরী ‘বাঙালি হিন্দু’ পরিচয় নিয়েই হোক –যেমন আশা করেন অমল গুপ্ত বা মণীন্দ্র রায় বা সৌমেন ভারতীয়া তিনিও তাঁর লেখাতে এই দরকারের কথা লিখেছেন) – আমরা কি ওমন ভাষা বদল করে কথা বলতে পারি?” ড০ অমলেন্দু গুহ কিন্তু লিখেই দিয়েছেন, “বাঙালি হিন্দুদের সাংগঠনিক অবস্থা কমজোরি হওয়ার আরো একটি কারণ তাঁদের স্বাভাবিক মুসলমান বিদ্বেষ।”  ১৯০৫র বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে পর হতাশ হয়ে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তাঁর ভাষা বদলেছিলেন। সেই ১৯০৫এর বঙ্গভঙ্গের সময় থেকেই কিন্তু আমাদের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যথার্থ শুরু। তার থেকেই জাতীয়তাবাদের পাঠ নিয়েছেন তাবৎ ভারতীয় অন্য সমস্ত জনগোষ্ঠী । অসমিয়া জাতীয়তাবাদের যাত্রাও তার পরেই শুরু । সেই ইতিহাসের পাঠ আমরা এখনো সেভাবেই পড়ি যেভাবে আমাদের পড়ানো হয়। অথচ ঘটনা হলো ১৯১১তে যখন সিলেটকে অসমের সঙ্গে রেখে দিয়ে বাংলাভাগ রদ করা হলো তখন একা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কারোরই বিশেষ হৃদয় কাঁদেনি । কথা ছিল ‘বাঙালির বিভাজন’ও রদ করা হবে । যারা সেই আশার কথা শুনিয়েছিলেন তাঁরাই ১৯৪৭এর বিভাজনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯০৫র অবস্থানের জন্যে বিন্দুমাত্র আত্মসমালোচনা না করে ।  যত দিন যাচ্ছে তাঁদের স্বরূপ ততবেশি উন্মোচিত হচ্ছে । তাদের রাজত্ব আর ক্ষমতা তারা ঢাকা-কলকাতাতে ভাগাবাগি করে নিয়েছেন। আবর্জনার মতো ছুঁড়ে ফেলেছেন আমাদের। শতাব্দির ব্যর্থতার পরেও কি আমরা ইতিহাসকে ফিরে পড়ব না?
           রবীন্দ্রনাথ সেই তখনই মুসলমান নিয়ে বঙ্গভঙ্গ বিরোধীদের দায়বোধকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আত্মসমালোচনার স্বর একমাত্র তাঁর কণ্ঠেই শোনা গেছিল, “হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সকল দিক দিয়া একটা সত্যকার ঐক্য জন্মে নাই বলিয়াই রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষেত্রে তাহাদিগকে এক করিয়া তুলিবার চেষ্টায় সন্দেহ ও অবিশ্বাসের সূত্রপাত হইল । এই সন্দেহকে অমূলক বলিয়া উড়াইয়া দিলে চলিবে না । আমরা মুসলমানকে যখন আহ্বান করিয়াছি তখন তাহাকে কাজ উদ্ধারের সহায় বলিয়া ডাকিয়াছি , আপন বলিয়া ডাকি নাই । যদি কখনো দেখি তাহাকে কাজের জন্য আর দরকার নাই তবে তাহাকে অনাবশ্যক বলিয়া পিছনে ঠেলিতে আমাদের বাধিবে না । তাহাকে যথার্থ আমাদের সঙ্গী বলিয়া অনুভব করি নাই , আনুষঙ্গিক বলিয়া মানিয়া লইয়াছি । যেখানে দুইপক্ষের মধ্যে অসামঞ্জস্য আছে সেখানে যদি তাহারা শরিক হয় , তবে কেবল ততদিন পর্যন্ত তাহাদের বন্ধন থাকে যতদিন বাহিরের কোনো বাধা অতিক্রমের জন্য তাহাদের একত্র থাকা আবশ্যক হয় ,— সে আবশ্যকটা অতীত হইলেই ভাগবাঁটোয়ারার বেলায় উভয় পক্ষেই ফাঁকি চলিতে থাকে।” মসুলমানের স্বতন্ত্র চেষ্টা নিয়ে তখনি তিনি এমন অজস্র উক্তি করেছিলেন, “আজ আমাদের দেশে মুসলমান স্বতন্ত্র থাকিয়া নিজের উন্নতিসাধনের চেষ্টা করিতেছে । তাহা আমাদের পক্ষে যতই অপ্রিয় এবং তাহাতে আপাতত আমাদের যতই অসুবিধা হউক , একদিন পরস্পরের যথার্থ মিলনসাধনের ইহাই প্রকৃত উপায় । ধনী না হইলে দান করা কষ্টকর ; মানুষ যখন আপনাকে বড়ো করে তখনই আপনাকে ত্যাগ করিতে পারে । যত দিন তাহার অভাব ও ক্ষুদ্রতা ততদিনই তাহার ঈর্ষা ও বিরোধ । ততদিন যদি সে আর কাহারও সঙ্গে মেলে তবে দায়ে পড়িয়া মেলে — সে মিলন কৃত্রিম মিলন।” এরকম উক্তি করবার দায়ে আজকাল মার্ক্সবাদীরা নিত্য গালি খায়, “ছোটো বলিয়া আত্মলোপ করাটা অকল্যাণ , বড়ো হইয়া আত্মবিসর্জন করাটাই শ্রেয়।” ‘পরিচয়’ বইতে প্রকাশিত যে ‘হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রবন্ধে এই সব কথা রয়েছে সেখানে তিনি শুরুতেই মুসলমানদের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিয়ে লিখছেন, “আমার নিশ্চয় বিশ্বাস , নিজেদের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রভৃতি উদ্‌যোগ লইয়া মুসলমানেরা যে উৎসাহিত হইয়া উঠিয়াছে তাহার মধ্যে প্রতিযোগিতার ভাব যদি কিছু থাকে তবে সেটা স্থায়ী ও সত্য পদার্থ নহে । ইহার মধ্যে সত্য পদার্থ নিজেদের স্বাতন্ত্র্য উপলব্ধি । মুসলমান নিজের প্রকৃতিতেই মহৎ হইয়া উঠিবে এই ইচ্ছাই মুসলমানের সত্য ইচ্ছা।” আমরা ঘটা করে রবীন্দ্র জন্ম জয়ন্তী করি, কিন্তু এমন প্রস্তাব এলে ঘোর মার্ক্সবাদীরাও সাম্প্রদায়িকতা বলে ঘৃণায় প্রত্যাখ্যান করি। এইসব কথা অবশ্যই আমি বৌদ্ধিক জিজ্ঞাসু মধ্যবিত্তদের জন্যে তুলে দিলাম, আম বাঙালি হিন্দুর জন্যে নয়।
            আম বাঙালি হিন্দুর একটি অংশ মুসলমানের তাড়া খেয়ে এসছেন, আর ১৯৪৭এর পর মুসলমানই বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠী তথা শ্রেণি । এই  হিন্দু বাঙালিদের এইসব কথাতে একতরফা  রাজি করাবার প্রয়াস মিছে। আর ঠিক তাই আমার মতে বাঙালি হিন্দুর স্বতন্ত্র সংগঠনের প্রস্তাবকে সাম্প্রদায়িকতা বলে নাকচ করবার কোনো মানেই হয় না । যেমন মানে হয় না মুসলমানের স্বতন্ত্র সংগঠনকে সাম্প্রদায়িক বলবার। শর্ত হচ্ছে, যতক্ষণ তা থাকছে আত্মরক্ষাত্মক এবং , পরাক্রমী বা পরবিদ্বেষি নয়। রবীন্দ্রনাথের এই বাণীটি মনে রাখা ভালো, “স্বাজাত্যের অহমিকার থেকে মুক্তি দানের শিক্ষাই, আজকের দিনের প্রধান শিক্ষা।” রবীন্দ্রনাথও ‘কাশি হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে’ প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, কিন্তু ‘হিন্দুত্ব’ বলে আমরা যাকে চিনি তার সম্পর্কে সতর্কবাণীও শুনিয়েছিলেন।  এরকম সংগঠনগুলোকে পরিচিত করবার জন্যে আমরা ‘সম্প্রদায়গত’ বলে একটা শব্দ বাংলাতে প্রচলিত করতেই পারি । শব্দটি আছেই আমাদের ভাষায়। শুধু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় নি তেমন। আমার মনে হচ্ছে, ‘সাম্প্রদায়িকতা’ এবং সম্প্রদায়গত’ চিহ্ন দুটি নিয়ে বাঙালিদের সংশয় ঘুচে গেলেই অনেক নির্দ্বিধ উদ্যোগ নিতে সমর্থ হবেন। এই নিয়ে ‘প্রাতিষ্ঠানিক মার্ক্সীয়’ অস্পৃশ্যতাকেও ঝেড়ে ফেলা যায় যত তাড়াতাড়ি, ততই আমাদের মঙ্গল। তাঁর মানে কিন্তু এও নয় যে এমন সংগঠন গড়ে তোলার দায়িত্ব মার্ক্সবাদীদের কাঁধেই বর্তায় –এমন কিছুও বলতে চাইছি।। এমনিতেও ‘প্রাতিষ্ঠানিক মার্ক্সবাদ ব্রহ্মপুত্রতে ‘অসমিয়া জাতি গঠন’ আর বরাক উপত্যকাতে ‘বাঙালি জাতিগঠনে’র পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে তাতে ‘অন্য বা অপরে’র অবস্থানটা কোথায়, স্বাধীনের না অধীনের—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
           আমরা আগেই লিখেছি যে অমল গুপ্তের “বাঙালি হিন্দুরা যাতে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিগণিত হতে পারে সে ব্যাপারে আজই , এখনি সক্রিয়ভাবে চিন্তা করতে শুরু করে”এই প্রস্তাবে সোজাসাপটা সাম্প্রদায়িকতা খোঁজে লাভ নেই। তেমনি মণীন্দ্ররায়কেও দেখা যাবে , তিনি যখন বাঙালি হিন্দুর কথা লেখেন তখনো মুসলমানের কথা ভুলেন না। তিনিই লিখেছিলেন, “সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বডোরা আজ নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। তাঁরা তাঁদের নিজেদের ভাষা সংস্কৃতি দিয়েই অস্তিত্ব রক্ষা করতে চায়। তাঁরা বলে দিয়েছেন,বডোরা অসমিয়া নয়। কার্বি আংলং কামতাপুরের রাজবংশীরা নিজেদের গৃহভূমি চায়। তাঁরাও অসমিয়ার গন্ডি থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। এমতাবস্থায় অসমের রাজনৈতিক চালচিত্র পরিবর্তন হতে চলেছে ।নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় গড়ে উঠেছে বডোদের রাজনৈতিক মঞ্চ । গড়ে উঠেছে মুসলমানদেরও রাজনৈতিক সংগঠন। গড়িয়া-মরিয়ারাও স্বাধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার। চা শ্রমিকেরাও সচেতন হয়ে উঠেছে । শুধু সময়ের অপেক্ষা । আগামী জনগণনাতেই স্বরূপ প্রকাশ পাবে । ততক্ষণ রাজ্যের ভাষিক সংখ্যালঘু এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু একাত্ম হলে রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যেতে          বাধ্য । এই পটভূমিকায় অসমে ইনারলাইন পারমিট, দ্বি-নাগরিকত্ব বা স্বায়ত্ব শাসনের আওয়াজ অসমকে রক্ষা করতে পারবে কি? না সম মর্যাদা, সম অধিকার দিয়ে অসমকে সঞ্জীবিত করে তোলা হবে? সেটাই এখন দেখার বিষয়। অন্যথায় অসম আরো খন্ড খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত হয়ে ‘অসম’ বা ‘আসাম’ নামটাই বিলীন হয়ে যাবে। অসমিয়া সমাজ কি এই দৃশ্য মেনে নেবে?”           ( বঙ্গভাষী অসমিয়া বনাম বঙ্গভাষী অসমিঞা অসমিয়ার অশনি সংকেত)
           তিনি যে রাজ্যের ‘ভাষিক সংখ্যালঘু এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু’র একাত্ম হবার কথা লিখেছেন, ডি-ভোটার প্রশ্নে দেখা যাচ্ছে কেবল এ আই ডি ইউ এফ নয়, রাজ্য জমিয়ত সহ মুসলমানদের অনেকেও সেদিকে এগুচ্ছেন। যখন কেবল হিন্দুদের শরণার্থী বলে মুসলমানদের নির্বিচারে তাড়ানোর ওকালতি করা কিছু সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদী দল রয়েছে, তখন তাঁরা এই দাবিকে মেনে নিয়েই মুসলমানদের উপরেও নির্বিচার অন্যায়ের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন।  কিছুদিন আগে বরপেটার বিধায়ক আব্দুর রহমান খান, ১৯৭১এর পরে একজনও মুসলমান এদেশে আসেন নি, এসছেন কেবল হিন্দুরা—এরকম বিবৃতি দিয়ে বিধান সভায় হৈচৈ করেছিলেন। এমন আরো বহু অসংগত ঘটনাও ঘটবে –সেগুলোকে প্রতিহতও করতে হবে । তাঁর নিজের দলও তাঁর এই মন্তব্যের দায়িত্ব নেয় নি । কিন্তু তার দায়ে অসমের ১৩টি হিন্দু বাঙালি সংগঠনের সমন্বয় রক্ষী সমিতি যেমন তাঁকে ধিক্কার দিতে গিয়ে অতিশয়োক্তি করে বলেছে --- ১৯৭১এর পর একজনও হিন্দু আসেননি--- তাতেও কারো উদ্দেশ্যই সফল হবার নয়। তাই যদি হবে তবে, আর শরণার্থী বলে এতোদিন স্বীকৃতি দেবার কথা উঠছে কাদের এবং কেন? তবে কি ধরে নিতে হবে, যে ১৯৭১এর আগে যে মুসলমানেরা এসছেন তাঁরা পূর্ণনাগরিকের মর্যাদা পাবেন আর ১৯৪৭ থেকে ৭১ অব্দি আসা সমস্ত হিন্দুরা শরণার্থীর মর্যাদায় এই দেশে থাকবেন, তিব্বতিদের মতো? আত্মীকরণের এক প্রক্রিয়া আগেও চলেছিল সেই ইউ এম এফের সময়, বা একাংশ বামেদের ‘অসম আন্দোলন’ প্রতিরোধের বেলা , কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে শিলচরের প্রতিবাদি গণমঞ্চ বা রাজ্য ভিত্তিক বাঙ্গালিদের মানবাধিকার সংগঠন সি আর পি সি ও ‘নতুন বয়ানে' কথা বলতে শুরু করেছে, এ আই ডি ইউ এফের মতো। এগুলো সবই শুভ লক্ষণ। কিন্তু অস্থায়ী লক্ষণ।
             শেষ অব্দিতো সমস্ত বিরোধ আর বিভেদই অধিকার ও সম্মান অর্জন আর ক্ষমতার অংশদারিত্বের জন্যে? সমস্ত পর-বিদ্বেষি জাতীয়তাবাদ বা সাম্প্রদায়িকতার যাত্রা শুরু হয় সংখ্যালঘু হয়ে যাবার ভয় থেকে, সংখ্যাগুরু হবার বাসনার          থেকে। জার্মানির ফাসিবাদের গোড়ার কথাও তাই; আমাদের দেশে ১৯০৫এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন এবং তার পর ১৯৪৭এর পাঁচ ভাগে বাংলাভাগের কিম্বা অসম ভেঙ্গে বহু রাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা বা তার ভবিষ্যত সম্ভাবনারও গোড়ার কথাও তাই। সেই ভয় মুক্তির জন্যে আমরা বিচ্ছিন্ন হওয়া, দেশ বা প্রদেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া, আর তাও না পারলে দাঙ্গা বাঁধানো, বোমা ফোটানোর পথ নিয়েছি। কিন্তু, স্বয়ং দেশকেই ভয়মুক্ত করে পুনরায় গড়ে তোলবার কর্মসূচি কেউ হাতে নিইনি। শাসক শ্রেণী বা জাতি বা জনগোষ্ঠীর শরিক বা সঙ্গী থাকতে যারা ইচ্ছুক তারা সেকথা কোনোদিনই ভাববে না । কারণ এ তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। কিন্তু সংখ্যালঘুর সংখ্যাগুরুতে পরিণত হবার বাসনার ভয় থেকে সেই শাসকগোষ্ঠী কোনোদিনই মুক্ত হয় না । হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক থেকেই তা বোঝানো যায়, কিন্তু আমরা বডোদের সাম্প্রতিক বিদ্রোহের থেকেও তা আঁচ করব।
           ৩০ অক্টোবরের বোমা বিষ্ফোরণের আঁচ থেকে অসমিয়া শাসকশ্রেণিও গা বাঁচাতে পারে নি। আর এখনো আরো কত ‘ভবিষ্যত ৩০ অক্টোবর বোমা বিষ্ফোরণে’র জন্যে তাকে দিন গুনতে হচ্ছ। কেননা বডোরা আলাদা রাজ্যের দাবিতে নতুন করে সংগঠিত হচ্ছেন । এবং সেখানে তারাও ‘অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদে’র বডো সংস্করণ চালাতে চাইবেন, যেখানে বাঙালি আর অসমিয়া বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্তের স্বার্থ এক হতে যাচ্ছে আর শীঘ্রই সে প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে। দু’পক্ষই সংখ্যালঘুতে পরিণত হবেন। ভ্লাদিমির লেনিন তাই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, “যে জাতি পরকে পীড়ন করে অধীন করে রাখতে চায় সে কি নিজেকে মুক্ত করতে পারে? পারে না” বডোরাই কি পারবেন? কোচেদের স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবি তাদের দাবি করা ভূখণ্ড নিয়েই দড়ি টানাটানি শুরু করেছে। আলফা যখন কেন্দ্রীয় সরকারে সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে, বরাক উপত্যকাতে নানা সংগঠন তখন আর অসম চুক্তির দিনগুলোর মতো নীরব থাকবার ভুল করতে চাইছে না। আলোচনাতেই অংশদারিত্ব দাবি করছে । তার মধ্যে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনও রয়েছে । কালে কালে এমন দাবি আরো বাড়বে । এর’চে কি ভালো নয়, ক্ষমতার যথার্থ বিকেন্দ্রীকরণের এক বিকল্প কর্মসূচী হাজির  করা? হিন্দু বাঙালির জন্যে সেই কর্মসূচী আরো বেশি জরুরি। বরাক উপত্যকা যদিও বা এক স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের কল্পনা করতে পারে, যদিও তা নিয়ে আজ অব্দি বিশেষ সুবিধে করতে পারেনি, অন্যত্রতো তা সম্ভবই নয়। এখানে ইতিমধ্যে যে বিচিত্র স্বায়ত্বশাসিত বা স্বতন্ত্র প্রাদেশিক ভূখণ্ডের বাস্তবতা রয়েছে বা সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে সেখানে বাঙালির স্থানিক বৈচিত্রও প্রচুর দেখা দিচ্ছে । বডোলেন্ডে, ডিমা হাসাওতে, কার্বি আংলঙে, মধ্য অসমে , ভাটি বা উজান অসমে তার স্বার্থ সব এক নয়। ডিমাহাসাওতে যেমন ইতিমধ্যে স্বায়ত্বশাসিত পরিষদে বাঙালির অংশদারিত্বের দাবি উঠছে, অবশ্যই হিন্দু বাঙালির।
                 এইখানে এসে বাঙালি মধ্যবিত্ত  এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে পারেন। পালটা জাতি বিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িকতার বদলে নিজেদের অধিকার সুনিশ্চিত করবার সঙ্গে সমগ্র অসমের জন্যেই এক বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচী হাজির করতে পারেন। সুজিত চৌধুরীর জাতি-গঠনের দায় সম্পূর্ণ করবার আহ্বান আমাদের পছন্দ নয়। কারণ তা হবার নয়। কেবল ভাষা নির্ভর জাতি গঠন তার আভ্যন্তরীণ সমস্ত বৈচিত্রকে নাকচ করে । সেকি অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদের থেকে আমরা শিখি নি? যে ব্রিটিশদেরকে আমরা পূর্ণ জাতি বলে অন্ধের মতো ভেবে এসছি, দেখা যাচ্ছে ঐ মায়ার পেছনে তার শাসক শ্রেণি এখনো ছুটছে!  এবং 'সাংস্কৃতিক বৈচিত্র'কে দমন করবার কথা বলে বেড়াচ্ছে। স্মরণ করুন গেল ফেব্রুয়ারীতে মিউনিখের এক সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুনের দেয়া বিবৃতি , “State multiculturalism has failed” বিবিসি লিখছে , “he argued the UK needed a stronger national identity।”  কিন্তু সুজিত চৌধুরী সেই লেখার শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন, “ আমি কোনো স্বতন্ত্র কর্মসূচী প্রস্তাব হিসাবে উত্থাপন করছি না। বরাক উপত্যকায় যথার্থ বাঙালি সমাজ গড়ে ওঠার পথে দুটো অন্তরায়ই শেষ পর্যন্ত ক্রিয়াশীল বলে মনে হয়। তার একটা গ্রামও শহরের বিভাজন, দ্বিতীয়, হিন্দু মুসলমান বিভাজন। তার সঙ্গে আরো কিছু আঞ্চলিক প্রেক্ষিতের প্রশ্নও রয়েছে । বরাক উপত্যকায় অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীসমূহ রয়েছেন, তাদের স্বাধিকার ও সকল ধরণের বিকাশ-প্রক্রিয়াকে অক্ষুন্ন  অবারিত রেখে বরাক উপত্যকার বাঙালি সমাজের যথার্থ বিকাশ বরাক উপত্যকার বাঙালি সমাজের যথার্থ বিকাশ বরাক উপত্যকার যৌথ সমাজ গড়ে তোলারো পূর্বশর্ত। ” ‘বাঙালি সমাজের যথার্থ বিকাশ বরাক উপত্যকার যৌথ সমাজ গড়ে তোলারো পূর্বশর্ত’ লিখছেন , কিন্তু তার আগে লিখছেন “বরাক উপত্যকায় অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীসমূহ রয়েছেন, তাদের স্বাধিকার ও সকল ধরণের বিকাশ-প্রক্রিয়াকে অক্ষুন্ন  অবারিত রেখে।’ এরই জন্যে আমার মনে হয়েছে এ আসলে তার জাতিগঠনের দায়কেই শেষ বিচারে অন্তর্ঘাত করে । তিনি লিখেছেন, “সমাজ গঠনের প্রক্রিয়া বহুমাত্রিক, জটিল ও প্রবহমান। তার জন্য কর্মসূচী নিরূপন আমার সাধ্যাতীত। আমার এই আলোচনায় কিছু বিশ্লেষণ রয়েছে, তা সত্য মিথ্যা বা অতিসরলীকৃত হতে পারে, আংশিক বা অপূর্ণতো বটেই—বরাক উপত্যকার ভবিষ্যত নিয়ে শহর ও গ্রামে যারা ভাবিত, তাঁরা সচেতন প্রজ্ঞায় ও অকুণ্ঠ পরিশ্রমে ও সম্পর্কে পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন করুন...” এই লিখে তিনি নিজেই তাঁর থেকে এগিয়ে যাওয়া কিম্বা সমান্তরালে হাঁটার সম্ভাবনাকে নাকচ করে গেছেন। আমাদের পথ হাঁটা হবে আঁকাবাকা, তার জন্যে প্রস্তুত হতেই হবে।
                 
               আমরা গেল শতকের প্রথম দশকে কংগ্রেসের ‘পাবনা প্রদেশিক সম্মিলনী’তে রবীন্দ্রনাথের সভাপতির অভিভাষণটি সবাইকে একবার স্মরণ করতে অনুরোধ করব। সেখানে তাঁর এগিয়ে দেওয়া প্রস্তাবগুলোতে কংগ্রেস কান দেয়নি বলেই তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিদেয় নিয়েছিলেন। এই অভিভাষণের দিনগুলোতে গান্ধি দেশে এসে সক্রিয় হন নি, তখনি তিনি যে ভাষণ দিচ্ছেন আমার সবসময়েই মনে হয়েছে সমকালীন রাজনীতিকদের সবার থেকে তিনি ছিলেন অগ্রগামী। সেখানেই তিনি বহুমাত্রিক ভারতীয় আদর্শে স্বায়ত্ব শাসনের কথা তুলে বলছেন, “সমস্ত বৈচিত্র্য ও বিরোধকে একটা বৃহৎ ব্যবস্থার মধ্যে বাঁধিয়া তোলাই আমাদের পক্ষে সকলের চেয়ে বড়ো শিক্ষা। এই শিক্ষা যদি আমাদের অসম্পূর্ণ থাকে তবে স্বায়ত্তশাসন আমাদের পক্ষে অসম্ভব হইবে। যথার্থ স্বায়ত্তশাসনের অধীনে মতবৈচিত্র্য দলিত হয় না, সকল মতই আপনার যথাযোগ্য স্থান অধিকার করিয়া লয় এবং বিরোধের বেগেই পরস্পরের শক্তিকে পরিপূর্ণরূপে সচেতন করিয়া রাখে।” এই বক্তৃতা এবং তাঁর রাজনৈতিক ভাবনা নিয়ে আমরা অন্যত্র লিখেওছি । ( শিলাইদহ থেকে শ্রীনিকেতনঃ যে পথে রবীন্দ্রনাথ আনতে গেছিলেন ‘স্বর্গ হতে বিশ্বাসে’র  ছবি) । পুরো বক্তৃতাটি যখনি ফিরে ফিরে পড়ি, তখনি সেটি আমার কাছে নতুন নতুন চিহ্নায়িত এনে হাজির করে, মনে হয় এখনো আমরা তাঁর রাজনৈতিক ভাবনাকে কেউ বিশেষ হৃদয়ঙ্গম করতে পারিনি। সেখানেই তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ভ্রুণাকারে কিছু প্রস্তাবও দিচ্ছেন। বিলেতি ওয়েষ্টমিনিস্টারের ধাঁচের গণতন্ত্র পেয়ে অভ্যস্ত আমাদের সেরকম কিছু প্রস্তাবকে এখনো ছেলেখেলা বলেই মনে হতে পারে, “দেশের সমস্ত গ্রামকে নিজের সর্বপ্রকার প্রয়োজনসাধনক্ষম করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে। কতকগুলি পল্লী লইয়া এক-একটি মণ্ডলী স্থাপিত হইবে। সেই মণ্ডলীর প্রধানগণ যদি গ্রামের সমস্ত কর্মের এবং অভাবমোচনের ব্যবস্থা করিয়া মণ্ডলীকে নিজের মধ্যে পর্যাপ্ত করিয়া তুলিতে পারে তবেই স্বায়ত্তশাসনের চর্চা দেশের সর্বত্র সত্য হইয়া উঠিবে। নিজের পাঠশালা, শিল্পশিক্ষালয়, ধর্মগোলা, সমবেত পণ্যভাণ্ডার ও ব্যাঙ্ক্‌ স্থাপনের জন্য ইহাদিগকে শিক্ষা সাহায্য ও উৎসাহ দান করিতে হইবে। প্রত্যেক মণ্ডলীর একটি করিয়া সাধারণ মণ্ডপ থাকিবে, সেখানে কর্মে ও আমোদে সকলে একত্র হইবার স্থান পাইবে এবং সেইখানে ভারপ্রাপ্ত প্রধানেরা মিলিয়া সালিশের দ্বারা গ্রামের বিবাদ ও মামলা মিটাইয়া দিবে।“ সুপ্রিম কোর্টের দেশে আমরা গ্রামের মামলা গ্রামেই ফুরিয়ে যাবে এমন প্রস্তাবকে হেসেই উড়িয়ে দেব। আসলে তিনি যা চাইছিলেন, ক্ষমতার ভারটি থাকবে পরিধিতে, কেন্দ্রে সে হবে একেবারেই হালকা, দেশকে জুড়ে রাখতে যতটুকু তার দরকার ততটুকুই । ফুলের ঝালরের মতো। “...এমনি করিয়া ভারতবর্ষের প্রদেশগুলি আত্মনির্ভরশীল ও ব্যুহবদ্ধ হইয়া উঠিলে ভারতবর্ষের দেশগুলির মধ্যে তাহার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা সার্থক হইয়া উঠিবে এবং সেই দৈশিক কেন্দ্রগুলি একটি মহাদেশিক কেন্দ্রচূড়ায় পরিণত হইবে। তখন সেই কেন্দ্রটি ভারতবর্ষের সত্যকার কেন্দ্র হইবে । নতুবা পরিধি যাহার প্রস্তুতই হয় নাই সেই কেন্দ্রের প্রামাণিকতা কোথায়। এবং যাহার মধ্যে দেশের কর্মের কোনো উদ্‌যোগ নাই, কেবলমাত্র দুর্বল জাতির দাবি এবং দায়িত্বহীন পরামর্শ, সে সভা দেশের রাজকর্মসভার সহযোগী হইবার আশা করিবে কোন্‌ সত্যের এবং কোন্‌ শক্তির বলে” অর্থাৎ দেশটি এখন আছে দেব মন্দিরের ঘণ্টার মতো। বাইরে চাকচিক্য, ভেতরে অন্ধকার। তাকে হতে হবে ফুলের মতো । বাইরেটা মাটির দিকে নোয়ানো,    প্রতিটি পাপড়ির নিজেকে মেলে ধরছে সুর্যের মুখোমুখি , ইচ্ছেমতো ।
                এই বিকেন্দ্রীকরণের পরিকল্পনা রবীন্দ্রনাথের পর একেবারেই এগোয়নি তা নয়, কিছু সংগঠন যখন অসমের জন্যে স্বায়ত্বশাসন দাবি করছে তখন আসলে, দিল্লীর থেকে আভ্যন্তরীণ সমস্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার দাবি করছে। কিন্তু সেই ওই দিসপুর অব্দি । তাকে গ্রাম স্তর অব্দি নিয়ে যাবার কথা ভাবা যেতেই পারে, নানা ধরণের আঞ্চলিক, সামাজিক, জাতি-বর্ণএবং সম্প্রদায়গত আত্মনির্ভরতার শর্তে স্বায়ত্বশাসনের ব্যবস্থার কথা ভাবা যেতেই পারে।
                  
              বাঙালি হিন্দুর দুই উপত্যকার বা পাহাড় সমতলের বা হিন্দু- মুসলমানের বা গ্রাম –শহরের তফাৎ আছে বলেই আমরা মনে করিনা। নেহাতই অর্থনৈতিক শ্রেনীভেদকে আমরা কিছুতেই ভুলছি না । যেখানে বহু সময় কোনো আপস অসম্ভব হয়ে উঠবে । অসমিয়া সমাজের মতোই বাঙালি সমাজের নানা জাতি-বর্ণভেদকে ভুলে যাবার কোনো মানেই নেই। অন্যান্য দ্বন্দ্বের তলাতে সেগুলো আপাতত চাপা থাকে হয়তো, কিন্তু মাইমাল উন্নয়ন পরিষদ বা নাথ যোগী উন্নয়ন পরিষদের দাবি আদায় করে নেবার মতো ঘটনাগুলো মাঝে মাঝেই এর অস্তিত্বকে বড় করে দেখায়। মমতা ব্যানার্জীর সাম্প্রতিক বিজয়ের পেছনেও এই কারকগুলো বড় করে দেখা গেছে । মধ্যবিত্তের পরিবর্তন আকাঙ্খাই পরিবর্তন নিয়ে আসেনি । বহুদিন পর, মতুয়া দর্শনের প্রবক্তা গুরুচাঁদ ঠাকুরের পুত্রবঁধু গুরুমাতাকে সামনে নিয়ে নমঃশূদ্রদের--- যাদের সিংহভাগই উদ্বাস্তু এবং বাঙালির রাজ্যেও সমান নাগরিকের অধিকার থেকে আজো বঞ্চিত রয়েছেন ---- নতুন করে সংগঠিত হতে দেখা গেছে। মার্ক্সের আশা করবার মতো ভারতীয় সমাজ থেকে বর্ণবাদ মুছে যায় নি মোটেও, এই সত্যের দিকে সম্প্রতি প্রচুর মার্ক্সবাদী নতুন করে চোখ ফেলছেন, এবং একে মোটেও এক উপরিকাঠামোর সাংস্কৃতিক বিষয় হিসেবে দেখছেন না, শ্রেণির ভাবনার সংগে একে এক করেই দেখছেন। এ ছাড়াও বাঙালি হিন্দুর এবং মুসলমানেরো রয়েছে প্রাক বৃটিশ, বৃটিশ, এবং বৃটিশ যুগে আসাদের নানা আর্থ সামাজিক বিভাজন। বৃটিশ যুগে বা তার পরে যারা এসছেন বাঙালির মধ্যবিত্তকে নির্মাণ করে রেখেছেন তাঁদেরই একাংশ। নিজেদের মতোই তারা মনে করেন এই অসমে সমস্ত বাঙালিই বোধহয় এসছে এই সেদিন, হলো মাত্র দেড়শ দুশো বছর। তাই তারাও মনে করেন, সত্য বোধহয় এই রাজ্যে ‘খিলঞ্জিয়া’ নন, তাই এই প্রদেশ নিয়ে তাদের কোনো দায় বদ্ধতা নেই তাই নয় , কোনো জিজ্ঞাসাও নেই। বরং ‘বহিরাগতরা এসে অসমে লুণ্ঠনই চালাচ্ছেন’ এমন বহুলপ্রচারের দৌড়ে ‘খিলঞ্জিয়া’ না হবার এক অপরাধ বোধ কাজ করে বাঙালির মনের মধ্যে। এমন কি সেই তাদের মনেও যারা এখানেই বিকশিত হয়েছেন সহস্রাব্দ জুড়ে। সেই সহস্রাব্দের গল্প তাঁরা জানেন না, কারণ জানবার আর জানাবার বয়ান নির্মাণের ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। তারা এখন বাঙালি সবচে’ অবদমিত স্তর, সে অবদমন স্বজাতিরও বটে । বাঙালি তাই এই রাজ্যে নিজেকেও ভালো করে না জেনেই বাস করছে । তাকে বিদেশি নোটিশ ধরিয়ে দিলে তার কাঁচা যুক্তি হয়, এই যে বাঙালি দেশের জন্যে এতো প্রাণ দিল আর আজ এই প্রাপ্য? এই ভাবনাও বাঙালির মাথাতে কাজ করে না যে প্রতিপক্ষের কাছে এমন যুক্তি বাঙালির আত্মশ্লাঘা হিসেবেই দেখা দেয় এবং দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। প্রতিপক্ষের কাছে বৃটিশের সহযোগী বলেও তার এক ছবি রয়েছে।  হিন্দু বাঙালি যখন বলে যে দেশভাগের সে বিরোধী ছিল, তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাঁর ভিটে মাটি কেড়ে নেয়া হয়েছে এই দেশে তার জায়গা হবে না কেন? ---- তখন সে এও ভাবে না তার প্রতিপক্ষের ধারণাতে এবং বহু বাঙালির মনেও বাঙালির যাবার এক ‘নির্মিত’ প্রদেশ রয়েছে এই দেশেই। পশ্চিম বাংলা-- সেখানে সে যাবে না কেন? আর সেই প্রদেশের শাসকেরা ১৯৪৭এর দেশভাগের বিরোধীতা করে নি। এমন কি ত্রিপুরাকেও অসমে মনে করা হয় বাঙালির ‘জবর দখল কলোনি’। আর তারপরেও গাঁজার নেশাতে বুঁদ আমরাইতো জানান দিই, নির্মাণ করে যাই কল্পকথার বয়ান “এপার বাংলা ওপার বাংলা মধ্যিখানে চর। তারই মধ্যে বসে আছেন শিবু সদাগর।।...” শিব ‘অপর বাংলার’তে পাড়ি দেবার কথা ভাবেনও না কোনোদিন, সেরকম কোনো প্রার্থণাও নেই !
          
             হিন্দু বাঙালি যদি এই সত্য আবিষ্কার করতে পারে যে এই প্রদেশ তাঁর স্বভূমি, এই প্রদেশে তার অধিকার যেমন রয়েছে , তেমনি রয়েছে প্রচুর কর্তব্যও; হিন্দু বাঙালি মধ্যবিত্ত যদি তাঁর নিজের ভেতরের এবং বাইরের সামাজিক বৈচিত্রগুলোর প্রত্যাহ্বানকে ‘মার্ক্সবাদ’ বা ‘হিন্দুত্বে’র দোহাই দিয়ে অস্বীকার এবং দমন করবার বদলে, খোলা মনে নিষ্ঠা আর আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়--- তবে সে স্বতন্ত্র দল করতে পারে, পারে সংগঠন করতে, পারে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা দাঁড় করাতে । নতুবা পরনির্ভর হয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়াই তার নিয়তি। তাকে অপেক্ষা করতেই হবে দলিত-জনজাতি-মুসলমান ঐক্যই বলুন কিম্বা শ্রমিক –কৃষক ঐক্য যদ্দিন না গোকুলে গোপনে কৈশোর অতিক্রম করে তাঁকে এসে উদ্ধার করে। ততদিন সে অরিজিৎ চৌধুরীর গল্প ‘অদেখা তুলির আঁচড়ে’ (সাহিত্য ১১২) আঁকা ছবির মতো এক আধুনিক যাযাবর জাতি, যে ভারতীয় কিন্তু তাঁর কোনো  বাসাবাড়ি নেই! নেই স্বভূমি!
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...

Google+ Badge

^ Back to Top--'উপরে ফিরে আসুন'