মূল অসমিয়া গল্প: অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা
বাংলা অনুবাদ: সুশান্ত কর
"পানী গাভিনী আছিল আরু অন্যান্য ' অক্টোবর ২০১৯-শে প্রকাশিত লেখিকার গল্প সংকলনের ৭ম গল্প "তেজ'-এর বাংলা অনুবাদ , প্রকাশিত হল "সেবা' অক্টোবর ২০২৫ সংখ্যাতে
এটি ডাক্তার কমল নারায়ণ বরুআর বাড়ি।শহরের লোকে বরুআ ডাক্তারের বাড়ি বলেই জানে।কমল ডাক্তার সরকারি চাকরি করেছিলেন।এই শহরে যখন ছেলেদের স্কুলে দেন তখনই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন।পুরো জীবন তিনি এই হাসপাতাল থেকে সেই হাসপাতালে বদলি হয়েই জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন।অবসর নিয়ে বাড়ির শান্তিতে দশটা বছর কাটিয়ে এক রাতের শ্বাসকষ্টে সংসারের মায়ামোহ তিনি ত্যাগ করেন।থেকে গেলেন স্ত্রী মায়া।ডাক্তার হিসেবী আর দূরদর্শী মানুষ ছিলেন। স্ত্রী আর চারপুত্রের দায়িত্ব ভালো করেই পালন করেছিলেন।হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতেই তিনি ছেলেদের এবং তাদের মায়ের কথা ভেবেই এই দুবিঘা মাটি নিয়েছিলেন।সামান্য দূরেই দাদার বাড়ি,আধাঘণ্টার পথ গেলেই জ্যাঠামশাইর বাড়ি। বিপদে আপদে কাউকে ডাকলে পাবেন। তবে মায়া বরুআর কোনোদিনই কারও কাছে সহায় সাহায্য চাইবার দরকার পড়েনি।বাজার হাট বাড়ি বাগিচা সবই সামলেছিল যোগেন।কোনো একটি হাসপাতালে,করৈগুড়ি হাসপাতালেই হবে মনে হয়,অনাথ যোগেনকে পেয়ে নিয়ে এসেছিলেন। ডাক্তার যোগেনকে পড়িয়েছিলেনও।চারবারের চেষ্টায় ম্যাট্রিক পাশ করেছিল।কমল ডাক্তারই ধরাধরি করে যোগেনকে ফার্মাসি একটায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।সততা,কাজের প্রতি নিষ্ঠার জন্যেই যোগেন ‘হেলথ কেয়ার ফার্মাসি’-তে টিকে গিয়েছিল।এখন যোগেন নির্ভুল ভাবেই রোগীকে প্রাথমিক বিধান বলে দিতে পারে।মায়া বরুআর দ্বিতীয় ছেলে যখন জন্মায় তখনই ডাক্তার নিয়ে এসেছিলেন মণিমালা,ছোট্টো করে মণিকে।হাসপাতালের ভাত খেয়ে রোগী আর নার্সদের আদরেই সে বড়ো হচ্ছিল।একটি কম বয়সী মেয়ে সিঁথিতে সিঁদুর নিয়ে এসে হাসপাতালে মেয়েটিকে জন্ম দিয়েই রাতের আঁধারে মা-বাবার সঙ্গে চলে গিয়েছিল।পরিত্যক্ত মেয়েটি নার্সদের হাতেই বড়ো হচ্ছিল। ওকে পেয়ে বরুআ ডাক্তার বাড়ি নিয়ে এলেন। মণি বাড়ির ভেতর ভাগের দেখা শোনা করত। যোগেন আর মণিমালা দুজনেই ডাক্তারের বরুআ উপাধি নিয়েছিল।কোনো কাগজে পত্রে মা-বাবার নাম দেবার ঘরগুলোতে মায়ের নাম লিখেছিল মায়া বরুআ, বাবা ডাঃ কমল নারায়ণ বরুআ।একদিকে যোগেন আর দিকে মণিকে নিয়ে আত্মীয় স্বজন কাউকে কোনো ঝামেলাতে না ফেলে সংসার যাত্রা সামাল দিয়ে যাচ্ছিলেন মায়া বরুআ।ডাক্তার শনিবারে এসে রবিবারে সকালেই ফিরে যান। তিনি জানতেই পারেন নি কীভাবে তাঁর বাড়িটি ‘মেধাবী ছেলেদের বাড়ি’ বলে পরিচিত হয়ে গেল। কী করে বা চার চারটি ছেলে এমন স্বর্ণাভ হরফে লেখা প্রমাণপত্র পাবার মতো ক্যারিয়ার গড়ে তুলল। এ কি কোনো তামাসা? চারটি ছেলেই এমন ফলাফল করল যে খবরের কাগজে ছবি উঠল, ঝটপট যেখানে যা পড়তে চায় সেখানেই আসন পেয়ে ভর্তি হতে থাকল। বড়ো ছেলে ডাঃ প্রবোধ নারায়ণ বরুআ আমেরিকা থাকে। ওখানকারই মেয়ে বিয়ে করে এখন সেখানেই থাকে। দ্বিতীয় ছেলে ডাঃ আলোক নারায়ণ বরুআ চিরদিনই দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এসেছে। এখনও প্রবোধ আর আলোকের মধ্যে তফাৎ বিশেষ নেই—একই চাকরি,একই বিদেশে বাসা,বিদেশের স্ত্রী।তৃতীয় পুত্র অঞ্জন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার,বাঙালুরুতে থাকে।ওর স্ত্রী জোনালি অসমের নগাঁওর মেয়ে। একেবারে ছোটোটি বুদ্ধ,দিল্লির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছে। সব কিছু খাপে খাপে মিলে এগুচ্ছে।ডাক্তার রিটায়ার করলে পরে আমেরিকা গিয়ে দুই ছেলের সংসারও দেখে এলেন। ফিরে আসবার পর মায়ার সে আমেরিকার কত কী গল্প।বিকেলে যোগেন আর মণিকে নিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসেন, ডাক্তারও বসেন। কথার মাঝখানে উঠে গিয়ে মণি বানিয়ে নিয়ে আসে চা আর পকোড়া। সঙ্গে মায়া বরুআর হাতে তৈরি খাবার দাবার আছেই। কথা বার্তায় চা-নাড়ু পিঠায় মিলে বিকেল পাক ধরে আসে।বেশির ভাগ সময়েই মায়া বরুআই কথা বলেন,বাকি তিনজন শ্রোতা।পুরো জীবন জুড়ে এই "ছেলেরা' "ছেলেরা' করতে করতে জীবন কাটিয়েছেন এই সরল মহিলাটি;বাইরের পৃথিবীর সম্পর্কে সামান্য ধারণাও বলতে গেলে নেই তাঁর।এই নিষ্পাপ সরল মহিলাটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন কমল নারায়ণ বরুআ।তাঁর নিজের কিছু একটা হলে কে এই পায়রা পাখির মতো মহিলাটির দেখাশোনা কে করবে?এমনই এক বিকেলে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলেন।উঠোনেরই পুকুর পাড়ে ছোটো একটা বাড়ি করে দুই কাঠা মাটি যোগেনের নামে লিখে দিলেন।আরও একটা কাজ করলেন তিনি।যোগেনের বিয়ে দিয়ে দিলেন,কনে মণি। ডাক্তার নিজেই করলেন কন্যাদান। বিয়ে বেশ বড়ো করেই হল।জামা-কাপড়,গয়না-গাটি,আসবাব পত্র,খাওয়া দাওয়া কিছুই কিছু কম হল না। কোথাও কোনো আটক নেই,প্রাণ ঢেলে হাত উজাড় করে বিয়েতে খরচ করলেন তিনি বড়ো আশা করেছিলেন বিয়েতে ছেলেদের কেউ না কেউ আসবে।এল না।এক বিশাল দুনিয়ায় ডানা ঝাপটে বেড়ানো ছেলেগুলো এই অনাথ দুটি ছেলে-মেয়ে দুটির বিয়ে নামের উৎসবের জন্যে কই আর সময় বের করে আসবে?নিজের ভাই-বোন হলেও আসতে পারত কিনা সংশয় আছে।বড়ো তিনটি টাকা পাঠাতে চাইছিল।ছোটোটি পাঠাতে পারত না,ওকে উলটে দিতেই হয়।ডাক্তার দৃঢ় কণ্ঠে মানা করে দিলেন।ছোটোটি দিল্লির থেকে যোগেনের জন্যে পাঞ্জাবি একটা পাঠিয়েছিল। কেন জানি পাঞ্জাবিটি ডাক্তার যোগেনকে দিলেন না। এ বাড়িতে প্রায়ই দিন-হাজিরা করতে আসে খগেন --ওকে দিয়ে দিলেন।এত দিন যে বাড়িতে ছিল সেই বাড়ি থেকে পুকুর পাড়ের নতুন বাড়িতে যাবার সময় মণি ডাক্তারকেও প্রণাম করেছিল।কী জানি কী হল গুরু গম্ভীর মানুষটি, আবেগকে বেশি প্রশ্রয় দেন না—যোগেন আর মণি এসে প্রণাম করতেই হু হু করে কেঁদে ফেলেছিলেন।সবাই তো দেখে অবাক।মণিও ডাক্তারনিকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল।উপস্থিত সবার চোখ ভিজে এসেছিল। কেউ বা রসিকতা করেছিল এই বলে,""ডাক্তার,আপনার মেয়ে তো আপনার বাড়িতেই রইল। বিদায় দিয়ে বের করে দিতে হলই না। এত কাঁদবার কী বা আছে?'' এমন কি মায়া বরুয়া নিজেও কি কম অবাক হয়েছিলেন? মা-বাবা মারা যেতেও মানুষটি এত কাঁদেন নি। ""মা,আমাকে ছেড়ে যাবেন না!'' বলে যখন মণি তাঁকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল।তিনি নিজেও কান্না আটকাতে পারেন নি। তবুও ডাক্তারের এই বিহ্বল রূপ তাঁকে অবাক করে।আন্মনে নিজে নিজেকে বলছিলেন,এমন রুক্ষ কঠোর গলার আড়ালে যে মানুষটি দেখছি এতটা কোমল।জীবন জুড়ে দুই হাতে টাকা উপার্জন করলেন,কিছু কম পরিশ্রম কি করলেন?আগে রোববারে বাড়িতে এটা ওটা ছোটোখাটো কাজে হাত লাগিয়ে দেখাশোনা করে বিশ্রাম করতেন।পরে রবিবারেও বাড়ি এসে সকাল বিকেল রোগী দেখতে শুরু করেন।রোগীও এর ওর থেকে খবর পেয়ে এসেই যাচ্ছিল। লোকে বলাবলি করত, কমল ডাক্তার একবার ছুঁয়ে দিলেই অসুখ পালায়। ছেলেদের পাঠাবার জন্যে টাকার দরকারও বেড়ে আসছিল।বয়সে এরা একটি আরটির প্রায় সমান, এক সঙ্গেই লেখা পড়াতে এগিয়ে যাচ্ছিল।দুটি ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে ডাক্তার টাকা ধারও করেছিলেন।মায়া বরুআকে এসব কথার কিছুই তখন জানতে দেন নি।তবুও মায়া টের পেয়েছিলেন। সঙ্গের ডাক্তারদের মতো কমল ডাক্তারের বড়ো দালান কোঠা হল না,দামী গাড়ি—সম্পত্তি টম্পত্তি বিশেষ কিছু হল না।একটা সাধারণ বাড়ি আর একটি গাড়ি যেটি প্রায়ই মেরামত করতে হয়। এইটুকুনই। নিজেরও পোশাকে আশাকে বিশেষ বিলাসিতা ছিল না। গাড়িটাও শেষ বয়সে নিজেই চালিয়ে বেড়ালেন। চাকরি শেষ করে বাড়ির শহরে ফিরে এখানেও চেম্বারে রোগী দেখতেন,দুই বেলা যে দেখবেন শরীর দিচ্ছিল না।শেষ জীবনের উপার্জনগুলোও তিনি ব্যাঙ্কে জমিয়েছিলেন। সরকারি চাকরির পেনশন ছিল। তিনি নিশ্চিন্ত ছিলেন, অর্ধেক হলেও স্ত্রী টাকাগুলো পেতে থাকবেন। আর মেয়ে মানুষটির খরচই বা কী,সারা জীবন হাত গুটিয়েই চালিয়ে দিলেন। চাকরি শেষে একসঙ্গে যে টাকাগুলো পেলেন সেগুলো মণি-যোগেনের বাড়ি তৈরি আর বিয়েতেই খরচ করে ফেললেন। মণি যোগেনের বিয়ের এক বছর যেতে না যেতেই এক রাতে ডাক্তার বুক ব্যথার কথা জানিয়ে সেই যে শুলেন আর উঠে বসলেন না। থেকে গেলেন মায়া বরুআ, চারটি বৃত্তি পেয়ে সোনার হরফে লেখা সার্টিফিকেটের ক্যারিয়ার গড়া চার ছেলে, মুখাগ্নি করে মাথা মোড়ানো সন্তান আর নিরামিষ ভাত খেয়ে পিতৃকৃত্য করা মেয়ে মণি।
পথের পথিক যেতে যেতে খানিক দাঁড়িয়ে দেখে যায় যে বাড়িটি --সেই বাড়ির গৃহিণী,কমল ডাক্তারের কপোতের মতো কোমল স্বভাবের স্ত্রী,মণি আর যোগেনের মা,চারটি মা-বাবার নাম উজ্জ্বল করা মেধাবী ছেলের মা,পরিজনদের কাছে ডাক্তরনি মায়া বরুআ সপ্তাহ খানিক আগে বিছানা থেকে উঠতে যেতেই মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। মণি-যোগেন যেটুকু পারল ডাক্তার কবিরাজ করল, খবর শুনে আত্মীয় স্বজন অনেকেও এলেন।মানুষটির শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে গেল।ডাক্তার কলকাতার একটি কোম্পানির থেকে প্রতি শীতে ডাক্তারনির জন্যে ফুলের গুটি এনে দিতেন। ফুলের কাজ করবার জন্যে সেই কোম্পানি একটি ছোটো খুন্তি-দা দিয়েছিল তাঁকে। খুন্তির সেই বাক্স বের করে গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে যে মহিলা এত দিন ফুল গাছের ফাঁকে ফাঁকে কাজ করতেন তাঁকে আজ বিছানাতে পড়ে পায়খানা পেচ্ছাব সব করতে হচ্ছে,তাঁর মুখের কথা এখন অস্পষ্ট। চোখ থেকে অনবরত দু পাশে ঝরছে পানির ধারা। যে হাতটি ভালো আছে সেটি নেড়ে কিছু কথা বলবার চেষ্টা করেন। কেউ তার অর্থ বুঝে উঠতে পারে না। শুধু মণি সামান্য ধরতে পারে। ‘মা! মা!' বলে মণি আর যোগেন ছায়ার মতো তাঁর সঙ্গে লেগে আছে।
আমেরিকার থেকে দুই ডাক্তার পুত্র,বাঙালুরুর ইঞ্জিনিয়ার আর দিল্লির গবেষক – এই চার পুত্র এসে পৌঁছুল। বাবা মারা যাবার সময় আমেরিকার দু'টি আর দিল্লিরটি আসতে পারেনি। বাঙালুরুরটি এসে পৌঁছেছিল কাজ-কর্ম সব হয়ে যাবার পর। স্ত্রীর দিকের একটি বিয়েও ছিল।এক গুলিতে দুই শিকার। দিল্লির ছেলে সে সময় ভিয়েতনাম ছিল।নানান কাজের প্রবল চাপ,আসব বললেই আর আসতে পারে কই? এলেও কি আর মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে? কিন্তু এখন অবস্থা ভিন্ন। এক মহিলা একপাশ মৃত শরীর নিয়ে পড়ে আছে।নানান জনে খবরও দিয়ে যাচ্ছেন,এবারে তো যেতেই হবে।তার উপর বাবাও নেই। চার ছেলেই যখন এই দায়িত্বের মুখোমুখি হল তখন তাদের বাবাকে মনে পড়ল।এতদিন শুধু নিজেদের কথাই ভেবে যাচ্ছিল। বাকি সবার কথা ভাবছিলেন একজন মৌন গম্ভীর মানুষ।তিনি এখন নেই; সমস্যাগুলো মাথায় তুলে নিতেন, কথা কম কাজ বেশি করতেন—সেই মানুষটির অভাবের মানেটা কি এরা এবারেই প্রথম টের পেল।
মাকে দেখে ছেলেগুলো চিন্তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল প্রায়। কী মানুষ কী হয়ে গেলেন। মা মানেই হচ্ছে এদের জন্যে বাইরে কোথাও ঘুরে এসে থালা ভরা সুস্বাদু খাবার তৈরি পাওয়া, শোবার জন্যে আরামদায়ক বিছানা,পরবার জন্যে পরিচ্ছন্ন পোশাক আর নিশ্চিন্ত সময়।এদের সবাইকে হাতে ধরে ধরে এই মা-ই যেটুকু পারেন পড়িয়েছিলেন।আর সব কিছুর আগে ছিল এই ছেলেদের পড়াশোনা।পারতপক্ষে তিনি বাড়ি ছেড়ে কোত্থাও যেতেন না,পাছে ছেলেদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটে।পরিজনে বলাবলি করতেন,মায়া ডাক্তারনি কি আর বাড়ি ছেড়ে আসবে? ছেলের পড়ার ক্ষতি হবে না?” কথাগুলোতে চাপা ঈর্ষা ছিল,অভিযোগও ছিল। নিজের বোনের বিয়েতে এসে কোনোমতে একরাত থেকে যাবার জন্যে তৈরি হতেই সবাই মায়া বরুআকে ঝেঁপে ধরেছিল। ওরই ছেলে আছে, আর কারও তো নেই;ওরই সংসার আছে,আর কারও তো নেই। জবাবে শান্ত মহিলাটি মাথা নুয়ে মৃদু হেসেছিল। দ্বিতীয় ছেলেটি সেবারে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিল।কোথাও বেড়াতে যাবার, ঘোরা ফেরা করবার প্রশ্নই নেই।বাড়িটিকে কামড়ে ধরে থাকতে থাকতে কখন যে বাড়িটি ফাঁকা হয়ে গেল মহিলাটি টেরই পেলেন না।একটা সময় তবু হোস্টেলে নিয়ে যাবার জন্যে পিঠে-পুলি বেঁধে দিতে পেরেছিলেন,আজ সে সব যে দেবেন -- ছেলেরা বহুদূর পৌঁছে গেছে। তারপরে সেই রবিবারের মানুষটি বিরামবিহীন তার কাছে থাকা শুরু করলেন। সেই সময় জুড়ে তাঁর নজরের বাইরে যে ভাইপো ভাইঝি, বোনপো-বোনঝিরা বড়ো হচ্ছিল তাদের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়াও সম্ভব হয় নি।অসুস্থ মানুষটির গায়ে গা ঠেকিয়ে তিনি সংসার টানবার চেষ্টা করছিলেন। সেই অবলম্বনও এক রাতে মিলিয়ে গেল।একটা বাক্সে তিনি নরম সুতির চাদর, ধুতি, বিছানা চাদর ভাঁজ করে গুটিয়ে রেখেছিলেন। পরে পরে প্রায় ছিঁড়তে বসা হালকা কাপড় সব। মানুষটি যদি বুড়ো হয়ে বিছানাতে পড়েন,পেচ্ছাব পায়খানা করেন—পরিষ্কার করতে কাপড় পাবেন কই? দোকানে পয়সা দিলেও পাবেন না। এখন সেই কাপড়ে এক পাশে মরে পড়ে থাকা মহিলাটিকে পরিষ্কার করে রাখছে মণি।
মণিকে এই সময় রান্নাঘরে বেশি করে সময় কাটাতে হচ্ছে।পালা করে করে ছেলেরা মায়ের কাছে আসছে,ঔষধ পত্রও দিচ্ছে। মেম-বৌদের একজনও আসেনি। রাতে বড়ো আর মেজো ছেলে দুটি ইংরাজিতে কী সব কথা বলে মণি শুনতে পায়। ফোনগুলো নিয়ে রাস্তায় চলে যেতে হয়,ওখানে বুঝি ভালো নেটওয়ার্ক মেলে। নগাঁওর বৌটি এসে দুই রাত থেকে আবার নিজের বাড়ি চলে গেছে। ওর এক দিদি থাকে চেন্নাইতে,বহুদিন দেখা সাক্ষাৎ হয় নি—সে বুঝি আসবে। তাড়াতাড়ি ফিরেও যেতে হবে। আর এখানে থেকেই বা কী করবে? সবাই তো রোগীর সঙ্গে লেগেই আছে। বাকি সব কাজের জন্যে মণি আছেই। স্ত্রীকে রেখে আসতে গিয়ে তিন নম্বরটি দিন চারেক শ্বশুর বাড়ি কাটিয়ে এল। দুই দাদা তো যা করবার করেই যাচ্ছে।সে তো আর ডাক্তার নয় বা ডলারের হিসেবে টাকার জোরও নেই।
সবার মাঝে দৌড়াদৌড়ি করছে মণি আর যোগেন। বিশেষ করে মণির হাত থেকে কাজ যেন কিছুতে ছুটতেই চায় না। মায়ের কাছে যে দু'দণ্ড বসবে—তারও সময় পেয়ে উঠছে না। অবশ্য দুটি নার্স পালা করে কাজে লেগেই আছে। মণির মনে হচ্ছে মায়ের কষ্ট হচ্ছে।নার্স দুটি যেন ভালো করে দেখাশোনা করছে না।পয়সা দিয়ে রাখা নার্সেরা কি আর ওর মতো ভালো করে দেখাশোনা করতে পারবে?প্যাকেটের জিনিসগুলো যেন অসুস্থ মহিলাটির মুখে তেতো হয়ে এসেছে।মুখটা কষটা কষটা লাগছে। একদিন মণি করল কি, বাগানে গিয়ে ভাদালি পাতা একটু এনে যোগেনকে দিয়ে মাছ আনাল। আদা রসুন থ্যাৎলে মাগুর মাছের ঝোল পুরনো চালের মণ্ডে মেখে এক চামচ দুই চামচ করে খাইয়ে দিল।কাজটি করতে গিয়ে মণি কারও কোনো অনুমতি নিল না। শরীরটা একটা কাপড়ে মুছে দিয়ে পরিষ্কার কোমল সুতির কাপড় পরিয়ে দিল।পরিয়ে মণি মাকে কোলে তুলে নিয়ে ভাদালি পাতার ঝোল আর ভাতের মণ্ডগুলো খাইয়ে দিল। কেউ তাকে কিছু বলল না। আরও একটা কাজ করতে শুরু করেছে। মায়ের শিয়রে বসে সন্ধ্যাবেলা এক আধটু ঘোষা১ পাঠ করে শোনাবার চেষ্টা করে। ছোটোবেলা সে কত কত দিন মায়ের গা ঘেঁসে বসে মায়ের সঙ্গে এই ঘোষা গাইত। ডাক্তারের একখানা ছবি এনে সে টেবিলে এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছে যেন মা দেখতে পারেন।ঘোষা কয়েক পদ গেয়ে সে ফটোটির পাশে একটা বাতি জ্বালায়,নতুন ফুলের মালা পরায়।সে দেখে সে দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মা ঘুমিয়ে পড়ে। রাতেও সে অসুস্থ মহিলাকে ছাড়ে না।অসুস্থ মহিলাটির বিছানার পাশে সেও পাটি পেড়ে শুয়ে পড়ে। থেকে থেকে সে মেঝের বিছানার থেকে মাকে দেখতে থাকে।প্রতিবারেও ওর চোখ ভারি হয়ে আসে। কী হবে?ছেলেরা মানুষটির কী ব্যবস্থা করবে?বারে বারে ওর মনে পড়ে সেই গম্ভীর মানুষটিকে।মনে পড়ে বিয়ের দিন প্রণাম নিতে গিয়ে মানুষটির বুক ভাঙা কান্না। কেন কেঁদেছিলেন অমন করে?কিছু কি জানতেন?সবার সামনে যোগেনের হাত ধরে বলেছিলেন, মাকে দেখবি। মণিকেও কিছু বলতে চাইছিলেন। পারেননি, বুক ভার হয়ে উঠেছিল। সেই চোখ জোড়া মনে পড়লে ওর বুকেও যেন পাথর চাপা পড়ে।
সত্যিই, মণির বড়ো চিন্তা হচ্ছে।রান্নাঘরের কাজে আর ওর মন বসছে না। মায়ের কাছ থেকে একটুও সরতে মন চায় না। প্রথমে মণি ভেবেছিল কোনো না কোনো ছেলে হলেও মায়ের সঙ্গে থাকতে আসবে।আসবে না কেন? দু-দু'জন ডাক্তার ছেলে। বাবার তৈরি বাড়িঘর আছে।আলাদা করে চেম্বার ভাড়া নিয়েছিলেন ডাক্তার।চেম্বারের সঙ্গে ঔষধের দোকানটাও আছে।এসে বসলেই পারে। রান্নাঘর সামাল দিতে মণি তো আছেই।মেম-বৌদি কী কীই বা খাবে? ছেলে-মেয়েরা এখানকার স্কুলে পড়তে পারবে। এখান থেকেই কতয় বড়ো মানুষ হয়ে বেরুল। কোনো অসুবিধে নেই।এত এত লেখাপড়া করে এরা আজ ডাক্তার, এখানেও চাকরি পাবে। একেবারে যদি নাও থাকে, মা ভালো হওয়া পর্যন্ত থাকলেই হল।মা বলে কথা।নিশ্চয় আসবে।ধীরে ধীরে মণি বুঝতে পারল, একজনও এখানে থাকতে আসবে না।এদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছে।বড়ো দু'জন বিদেশের সংসার ছেড়ে আসবে না। তৃতীয়জনেরও একই কথা। ছোটোটির বহুদিন ধরেই বাড়ির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বললেই চলে।কী জন্যে বা একবার বাবার থেকে একটু বেশি টাকা চেয়েছিল।বাবা তখন মণি-যোগেনের বাড়ি তৈরি করছিলেন,তাদের বিয়ের জোগাড়-যন্ত্রও করছিলেন। এককথায় বা বলে দিলেন, “পারব না''; চাকরি থেকে অবসর নেবার পরে অবস্থার কথাও জানালেন। সবই জানে মণি।পরিষ্কার সে বুঝতে পারল আধমরা মানুষটির কাছে থাকতে কেউ আসছে না।সে বোঝার চেষ্টা করে। আসবে বললেই বা আসে কী করে? এত কিছু যে ত্যাগ করবে—এরা তো মানুষ সবাই, ভগবান তো নয়। মা বাবা তবে মানুষ ছিলেন না! কত কী না ত্যাগ করলেন এই দুটি মানুষে মিলে। জট পাকানো চিন্তায় মণিকে জাপটে ধরল। সে কেবল চোখের পানি মোছে।
দু’দিন থেকে মায়ের সব কাজকর্ম মণি নিজে করতে শুরু করেছে।যেগুলো পারে না যোগেনকে ডাকে। যন্ত্র চালিয়ে চালিয়ে রাতে মায়ের কাছে বসে থাকতে ছেলেদেরও যে সুযোগ দিচ্ছে না আর। এই কদিন এদের মধ্যে ঘন ঘন কী সব কথাও হচ্ছে। মণি কান পেতে শোনে। কী করবে এরা মাকে নিয়ে? নিয়ে যাবে? থাকতে যখন পারবে না,নিয়েই যাবে হয় তো।এটাই স্বাভাবিক। মায়ের অসুখটা বেশ বড়োই,তবু যত্ন আত্তি করলে সুস্থ হবেন।সেই যে শইকিয়া মাস্টার -- একই অসুখে পড়েছিলেন। ভালো হয়ে এখন দেখছি ঘুরে বেড়াতে পারেন। মাকে আর কী করতে হবে? ঘরের বার-ভেতর করে থাকতে পারলেই হল। শইকিয়া মাস্টারের টাকার জোর কম ছিল। তিনি শেষের দিকে মাইনে পেয়েছিলেন।ছেলে দু’টিরই বা কত আর উপার্জন? একটির একটি ছোটো দোকান, আরটির ইংলিশ স্কুলের চাকরি। মা সে হিসেবে টাকাতে ডুবে আছেন বলতে গেলে।যত্ন আত্তিতে সেই মানুষটি উঠে দাঁড়ালেন,মা-ও উঠবেন।কে বা নিয়ে যায়।দেশে থাকা ছেলেই নিয়ে যাবে হয় তো।সেখানেই বা কে দেখাশোনা করবে? থাকার মধ্যে তো আছে এই এক নিজের ভাষায় কথা বলতে জানা বৌটি।এতটা কি সে করবে?এই বাড়িতেই তো সে দুই রাত থাকতে হাঁপিয়ে উঠে। বছরে একবার আসে কি না আসে। এসেই এখানে পা রেখেই নিজের মায়ের বাড়ি চলে যায়। নাতির টানে মা আর ডাক্তার বাবা কত কী জোগাড় করে রাখেন। সবই পড়ে পড়ে বাসি হয়, মলিন হয়। মলিন হয় মা-বাবার মন।সেই মেয়েটি মায়ের কী যত্ন নেবে?আবার মনকে জাপটে ধরে বিস্তর দুশ্চিন্তা।একেবারে তো আর রাখতে হবে না। একটু উঠে বসতে পারলেই আবার বাড়ির মানুষ বাড়ি ফিরে আসবেন।ওসব জায়গার ব্যবস্থা-পত্রও ভালো। মা শীঘ্রই সুস্থ হয়ে ফিরবেন।মণির চোখের পানির ধারা শুকোতে জানে না। বিদেশে কি নিয়ে যেতে পারবে? তুলে ধরে ধরে এত দূরে মানুষটিকে নিয়ে যাবে কী করে? কিছু একটা ব্যবস্থা থাকবে হয় তো।টাকা পয়সা থাকলে আজকাল কী বা না করা যায়।ঐ দেখি বরদলৈ প্রফেসরের মাকে উড়িয়ে দিল্লি নিয়ে যাওয়া হল। অপারেশন করানো হল,আবার উড়িয়ে আনা হল। লাইট লাগানো বাঁশি বাজানো গাড়িতে এনে বাড়ি পৌঁছে গেলেন তিনি। বুড়ি এখন ভাদ্রমাসের নামঘরেও যাচ্ছেন,আসছেন।কত বয়স হল সেই বুড়ির,তাঁর তুলনায় মায়ের আর কীই বা বয়স?মণি তার ছোট্টো পৃথিবীর অভিজ্ঞতাতে কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করে,পারে না।কেমন যেন সব প্যাঁচিয়ে যায়।
মণি বুঝে ফেলল,সে বোঝার মতো একেবারেই নয় কথাগুলো। ছেলেরা মায়ের কাছে থাকতেও আসছে না,তাঁকে নিয়েও যাচ্ছে না।কী করবে তবে?এ কদিন ধরে এরা ফিরে যাবার কথাই আলোচনা করছে।কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না মণি,যোগেনও কিছু ধরতে পারেনি।মায়ের মুখের সামান্য চেহারা ফিরেছে।ছেলেরা কাছে কাছে আছে, মানুষটি কি কিছু কম শান্তি পাচ্ছেন?অসাড় হাতখানাও সামান্য নাড়াচাড়া করতে পারছেন।ব্যায়াম করাতে একটি লোক আসছে।মা ভালো হয়ে যাবেন,আবার আগের মতো হবেন।ছেলেদের কিছু না কিছু করতেই হবে।এমন একজন মা পায় কজন ছেলে?আবার রান্নাঘরের কাজে মণি মন দিয়ে লেগে পড়ে। বাঁশের কোড়ল দিয়ে মাছের টক রেঁধেছে,নরসিংহের পাতা দিয়ে মাঝের ঝোল রেঁধেছে,সর্ষে দিয়ে ছোটো মাঝের ভাজা করেছে। সবাই পেট পুরে খেয়েছে,মণির প্রশংসাও করেছে।ওর একটাই আশা।ছেলেরা মায়ের সঙ্গে কিছুদিন থাকুক।ছোটোটি গেছেই, বাকিরাও এক পা তুলে রেখেছে।এই ক’দিন মা মনে যতটা শান্তি পেয়েছেন হাজার চেষ্টাতেও মণি-যোগেন তা যোগাতে পারবে না। ক্ষণিকের জন্যে শুকোনো ওর চোখ জোড়া আবার ভিজে আসে।
মেজো ছেলে কয়েকটি মিষ্টি আর বিস্কিটের থলে এনে মণির হাতে দিল।আজ সবার আত্মীয় স্বজন আসবেন।কিছু একটা আলোচনা আছে।মাকে মনে হয় কিছু একটা করে বিদেশে নিয়ে যাবে গিয়ে।ওকে বলেছে মায়ের পাকড় চোপড়,বিছানা-পত্র,ওষুধ-পত্র সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে। সে করেওছে। বাক্সে কাপড় ভরাতে গিয়ে দেখেছে একটা বাক্স ভালো নেই, নতুন বাক্স এসে গেছে। মণির হাতে এখন একশ একটা কাজ রীতিমত নৃত্য করছে।উপায় না দেখে সে যোগেনকে তো কাজে লাগিয়েছেই,বাড়ির কাজের লোক বিমলের স্ত্রীকেও ডেকে এনেছে। ওর নিজের সংসারের কাজ আসমানে চড়েছে। ছেলেটা কখন কী খেয়ে স্কুলে যাচ্ছে,কখন ফিরে আসছে ও খেয়ালই করছে না। চলবে,ও নিজের পায়ে খাড়া হওয়া শিখুক। ছেলের মুখখানাও শুকিয়ে গেছে। দিদিমা! দিদিমা ! বলে ছায়ার মতো যার গায়ে জুড়ে সে থাকে তাঁর কীই বা হল?এত এত মানুষে ওর দিদিমাকে ঘিরে রাখে, সে একবার গিয়ে যে দেখবে তার সুযোগই পায় না। মা দিদিমার জিনিসপত্র গোছাচ্ছে। কাকে সে জিজ্ঞেস করে দিদিমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কই? মাকে জিজ্ঞেস করলে তো শুধুই কাঁদে। না কেঁদে মণি করে কী,কাজ করে আর কাঁদে।
বাড়িটা গমগম করছে। ছোটোটি, -- বাপের বাড়ি গেছিল নিজেদের ভাষাতে কথা বলতে পারে ওর যে বৌ--সবাই গতকাল ফিরে এসেছে।আজ সকালে বসবার ঘরে নিজের ঘর থেকেও চেয়ার এনে দিয়েছে যোগেন।মণি আর যোগেন মিলে ধরাধরি করে বসবার খাটে একটি তোষক চাদর বিছিয়ে দিয়েছে।বিমলের বৌ আর মণি চা দেবার জন্যে এসে মানুষগুলোর মাঝখানে দাঁড়াল।এই মাত্র মণি মাকে এক জোড়া পরিষ্কার মেখেলা চাদর পরিয়ে এসেছে। এমনিতেও বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলেই পরনের বাসি চাদর না পালটে তিনি বেরোন না। তাঁর গায়ে যদি আজ বাসি কাপড় থাকে তবে খুব ক্ষুণ্ণ হবেন। সবাই তো একবার হলেও তাঁর কাছে আসবেনই। বিমলের বৌকে সঙ্গে নিয়ে মণি সবাইকে চা দিচ্ছে।রান্নাঘরে লুচি ভাজবার জন্যে আটা ডলে এসেছে।এতজন মানুষকে চা-জলখাবার দেবার ব্যবস্থা করতে হবে।বিমলের বৌকে চা দেবার কথা বলে মণি রান্নাঘরে যেতে চাইছিল। হঠাৎ কানে পড়ল উপস্থিত মানুষজনে বাড়ি বিক্রির কথা আলোচনা করছে।মণি চায়ের ট্রে নিজের হাতে নিয়ে বিমলের বৌকে রান্নাঘরে পাঠিয়ে দিল। নিজে সে চাও দিল,লোকজনের কথায় কানও দিল।
পারলে বাড়িটা বিক্রি করে একেবারে সব ঝামেলা চুকিয়ে যেতে চাইছে। তার মানে মাকে নিয়ে একেবারে বিদেশে গিয়ে জীবনের শেষটা কাটাবার ব্যবস্থা করছে। মণির চোখে অশ্রুধারা আবার বইতে শুরু করল। বাড়ি কেন বিক্রি করতে হবে? ভালো হয়ে কি মানুষটি নিজের বাড়ি আসতে চাইবে না? আবার বুঝি বাড়ি বেচতেও পারবে না। ডাক্তার বাবা কীসব দলিল পত্র করে গেছেন। কথাগুলোর মাথামুণ্ডু কিছুই সে ধরতে পারছিল না। মণি চায়ের কাপগুলো নিয়ে আবার রান্নাঘরে চলে গেল।
লুচি ভাজতে শুরু করতেই যোগেন এসে ওকে ডেকে নিয়ে গেল।বসবার ঘরে জড়ো হওয়া লোকেরা ওকে ডাকছে। বড়োটি ওকেও বসতে বলল। মোড়া নিয়ে বসল মণি।
""শুন, মণি'' বড়োভাইর গলা অনেকটা ডাক্তার বাবার মতো।
""তুইও শোন, যোগেন!''
মণির পাশে যোগেনও দাঁড়াল।
""মায়ের জন্যে তোরা অনেক করলি।''
""বাবার জন্যেও করেছিস।''
""বাবা তোদের হাত উজাড় করে দিয়েও গেছেন ।''
""নিজের বাবাও এতটা করে না।''
""তোরা আছিস বলেই বাড়িখানা থাকবে, নইলে সবই এখানেই ভেঙে চুরে ক্ষয়ে সব শেষ হয়ে যাবে ।''
"" আমারই সঙ্গের এক ডাক্তার কিছুদিন আগে বাড়ি এসে বাবার বইপত্র সব জ্বালিয়ে দিয়ে গেল ।''
""বই কেন জ্বালাতে গেল? ''
""যে কোম্পানি বাড়িটা কিনবে,ওরা একটা গেস্ট হাউস বানাবে ওখানে। বইতে ঠাসা বাড়িটা ওরা নেবে না বলেছিল।''
"" কাউকে দিয়ে কেন দিল না বইগুলো? ''
""ও এসছিল চারদিনের ছুটি নিয়ে, কী বা করবে? ''
"" বইগুলো গেল বটে,কিন্তু বাড়িটা তো রইল ।''
"" তোদের ভাগের জমি বাড়ি বাবা দলিল পত্র করে রেখে গেছেন ।''
""বাবা দলিল করে গেছেন জমি বাড়ি বিক্রি করা যাবে না,কেবল ভোগ করা যাবে। ''
""এই সব জটিলতা না থাকলে আমরা আমাদের ভাগের জমিজমা বিক্রি করেই যেতাম ।''
""কে এসবের দেখাশোনা করে?''
"" একবার আসা যাবার দামই উঠে না।''
"" ভাড়াই দিয়ে যাব বলে ভেবেছি। ''
"" স্কুলটা যে বলল এই বাড়িটা নেবে—সেই অনেক ভাগ্য।''
"" এতোটা মাটির সঙ্গে কে এই বাড়ি ভাড়া নেবে?''
""যে টাকা ভাড়া দেবে তার চে’ বহু বেশি টাকা এদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখতেই যাবে। ''
"" ভাড়াও যে খুব কম দেবে তাও কিন্তু নয়।''
"" মায়ের খরচগুলো বেরিয়ে আসবে।''
"" অসমে ওল্ড এজ হোমগুলোতে যে এত খরচ, ভাবিই নি কখনও।''
"" ওটা দামি কিন্তু ভালো, মানুষের যত্ন নেয়, পরিবেশও ভালো। ''
"" একজন অসুস্থ মহিলাকে রাখতে এক কথাতে রাজি হয়ে গেল।''
""নার্স-ডাক্তার সব কিছুরই ভালো ব্যবস্থা আছে।''
"" আমরা দ্বিগুণ টাকা দেবার বন্দোবস্ত করেছি। সমস্ত ধরণের কেয়ার পাবেন তিনি।''
"" ভালোই করেছ, এই জঙ্গল ঘেরা বাড়িতে কোন সাহসে অসুস্থ মানুষটিকে ফেলে রেখে যাবে?''
""এয়ারপোর্টটাও খুব কাছে,নেমেই একটা খবর নেয়া যাবে।''
"" এখানে আসতে আরও একদিনের পথ।''
""আমাদেরও বয়স হয়ে এসেছে,এত খারাপ রাস্তার জার্নি সহ্য করা এত সহজ নয়।''
""কবে নিয়ে যাবে বলে ভেবেছ?''
""পরশু।''
""এয়ার এম্বুল্যান্স ঠিক করা হয়েছে।''
মণি মাথা নুয়ে কথাগুলো শুনছে, যোগেনও একই রকমে বসে আছে। এতদিন ধরে যে কথাগুলো জট পাকাচ্ছিল সেগুলো এখন গিয়ে স্পষ্ট হল। তার মানে ছেলেরা মাকে গুয়াহাটিতে কোথাও রেখে যাবে। পারলে বাড়ি ঘর বিক্রি করে এইমুখো যেন আর হতে না হয় তার ব্যবস্থা করছে।পা থেকে মাথা পর্যন্ত গরম রক্তের স্রোত বয়ে গেল মণির। আবার যেন তিরতির করে নেমে এল। তার মানে,মাকে এরা কই না কই অচেনা একটা জায়গাতে রেখে দায়িত্ব সারতে চাইছে। মা সুস্থ হবেন।এই কদিনেই তো কত ভালো হলেন। হাত নাড়াতে পারছেন।পাটাও তুলতে পারছেন। পথ্য হউক,ঔষধ,ডাক্তার-কবিরাজ সবই এত ভালো করে চলছে। শইকিয়া মাস্টার, প্রফেসরের বুড়ি মা—মণি একটি শেওলা ঢাকা গর্তে দিশে হারা ব্যাঙের মতো ঘুরতে শুরু করে। সেই একই চেনা কিন্তু ঘোলা জলে ঘুরতে থাকে।
মণি বসার থেকে উঠে দাঁড়াল। তাকাল যোগেনের দিকে।ও ঠায় একই ভঙ্গিতে বসে আছে থ মেরে। মণির ক্রোধ মাথায় চড়ল। এক টানে হাত ধরে যোগেনকে বাইরে নিয়ে এল।
"" মাকে নিয়ে যেতে দেবে বুঝি? '' কথাগুলো যখন বলল,ওর দাঁতের থেকে শব্দ একটা বেরুল।
""দেব না।''
""পারবে তো?''
""তুই পারবি তো?''
"" না পারবার কী আছে?''
এর পর মণি আর যোগেন এসে ভেতরে দাঁড়াল।কী জিজ্ঞেস করে ওকে ওর বর? মাকে রাখতে না পারবার কী কারণ আছে? সেবারে এক রাতের মধ্যে ডাক্তার বাবা চলে গেলেন। কেউ এর জন্যে তৈরি ছিল না। কে সামাল দিল? মণি যে রূপসিহাট প্রাইমারি হেলথ সেন্টারে বড়ো হয়েছিল সেখানকার নার্স থেকে চৌকিদার পর্যন্ত রাতে রাতে গাড়ি ভাড়া করে কি চলে আসে নি? ডাক্তার যে সব হাসপাতালে কাজ করেছিলেন সেগুলো থেকে বাসে মটরে করে কত কত লোকজন এল। কে কী করল,কে ঘি দিল, কাঠ-খড়ি কে জোগাল মণিরা টেরই পেল না। চেনা অচেনা লোকজনে এই অনাথ প্রাণী দুটিকে এমন ভাবে ঘিরে সামলে নিল যে এরা দু'জনে চোখের পানি ফেলতেও অবসর পেল না। বুক শক্ত করে দাঁড়াল মণি। কথাটা সেই প্রথম পাড়ল।
""মাকে কোথাও নিয়ে যেতে হবে না।''
""মাকে আমরাই দেখব।''
কথাগুলো বলে মণি-যোগেন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ডাক্তারের সব কটি ছেলে, ছেলের বৌ,সমবেত লোকজন—ডাক্তারের আত্মীয় পরিজন সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
"" সত্যি বলতে কি, কথাটি মন্দ নয়।'' ডাক্তারের বৃদ্ধ দাদা বললেন।
""আমাদেরও বাড়ি ফাঁকা। ছোটোটা বদলি হয়ে এসেছে মাত্র। আবগারি বিভাগের চাকরি। যা -- বললেই পাহাড়ে কন্দরে
দৌড়োতে হবে।''
""কে কাকে দেখে? গ্রাম হোক বা শহর—একটাও ছেলে মানুষ নেই।''
"" গেলবারে আমাদের পুরোনো বাড়ি যে গ্রামে আছে—সেখানে মাঘ বিহুর মেজিই২ জ্বলল না।''
"" জ্বলল না কেন? রজাপাম গ্রামের নামঘরের মেজি তো সাতপুরুষের পুরোনো।''
"" কে কাঠ কাটে? কে মেজি তৈরি করে ? ঘরে ঘরে ছেলেগুলো কেরালা দিল্লি চলে গেছে।''
""আমাদেরও ইচ্ছে করে না মায়ের সঙ্গে নিজের দেশে থাকি? ''
"" কী করে থাকব আমরা? ''
""কোনো উপায় নেই আমাদের। কী আছে এখানে? ''
"" মায়ের আমরা ভালো করে যত্ন নেব।''
"" মা ভালো হবেন। আপনারা এসে দেখে যাবেন।''
""হবে তবে, তোরা দেখলে আমরা আর অন্য চিন্তা করছি না।''
""টাকা পয়সা দিয়ে যাব, পাঠাতেও থাকব।''
""টাকা পয়সা লাগবে না।'' মণির গলায় সারা দুনিয়ার বিবমিষা এসে জড়ো হয়েছে। ""মানুষটিকে রেখে গেলেই হল।''
""ডাক্তার বাবা মায়ের নামে টাকা পয়সা রেখে গেছেন। পেনশন তো আছেই।'' মণির মুখের ঝাল তেতো সব গড়িয়ে
যোগেনের মুখে এসে পড়েছে। ""আপনারা এদিকের কথা চিন্তা না করলেও চলবে।''
বিমলের বৌ উঁকি ঝুঁকি মারছিল। মণি বেরিয়ে গেল। সে একদিনের অতিথি। কোন কথা, কীসের কথা—কী করে বুঝবে? রান্নাঘরে যাবার পথে মণি মাকেও সামান্য দেখে গেল। এত দিন পরে দিদিমাকে একা পেয়ে মণির ছেলেটি এসে পাশে বসেছে। সে দিদিমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।অসুস্থ মানুষটির মুখেও ফুটে উঠেছে হাসির রেশ। চট করে মণি চাদরের আঁচলে চোখ মুছল।
চা-জলখাবার সেরে মানুষজন ফিরে গেলেন।
ডাক্তারের চার ছেলে আলাদা আলাদা করে মণির বলা কথাগুলো নিয়ে ভাবতে বসল। ফিরে যাব বললেই কি যেতে পারি? কত কী ঝামেলা। কত কী ব্যবস্থা করে যেতে হবে। তাতে ব্যবস্থাগুলো যেন হতেই চায় না, পায়ে পায়ে কাঁটা। এদিক হয় তো ওদিক হয় না।
মণি রান্নাঘরে কাজ আধাতে রেখেই গায়ের চাদর৩ কোমরে জড়িয়ে বাড়ির কোনের পথ দিয়ে সোজা শইকিয়া মাস্টারের বাড়ির দিকে পা বাড়াল।ও বাড়ির মানুষজনের থেকে জেনে আসতে হবে কীভাবে এরা মরতে বসা মাস্টারকে বাঁচিয়ে তুলল। মাস্টারের স্ত্রীর বাবা বুঝি নামজাদা কবিরাজ ছিলেন। বুড়িও বাপের বিদ্যা পেয়েছেন। বাড়ির উঠোনেই কত কী বুনো ঔষধের গাছ। গন্ধে নাকে ঝিম ধরে যায়।বুড়ি শইকিয়া মাস্টারকে হামান দিস্তাতে এর থেকে কী সব গাছের শেকড় পাতা মধুর সঙ্গে পিষে খাইয়েছিলেন। সব কথা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ভালো করে জিজ্ঞেস করে জেনে আসতে হবে। মাস্টারের বাড়ি এখন ওর বড়ো ভরসার ঠাঁই।ওকে যে নার্স দিদিরা বড়ো করেছেন তাঁদেরও সে মাঝে মধ্যে এসে থাকতে বলবে। জীবনগুলো এরা রোগী দেখেই পার করলেন, কত কী জানেন। আর অন্যরা তো আছেনই। নেই নেই করে মণির বরই তো কত অসুস্থকে সুস্থ করে তুলল। কেন জানি আজ ওর সেই সব চেনা-অচেনা মুখগুলোকে খুব করে মনে পড়ল যারা বাবা মারা যেতে এসেছিলেন।এত সব মানুষ, কী করে এসে এদের দু’জনের পাশে ছায়ার মতো এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন!
ওর অস্থির চিত্ত শান্ত হয়ে এল। মণির মনে হল খুব তাড়াতাড়ি মাকে ভালো করে তুলতে পারবে। মা আবারও ফুল বাগানে ফুলের মাঝে মাঝে গুনগুন করে গান গেয়ে বেড়াবেন,দাওয়াতে বসে ছেলেটিকে রূপকথা শোনাবেন… সুরেলা গলাতে গাইবেন… এক গাছে টান দিতে বেত গাছ নড়ে, … চিল মা, চিলমা , আয় মা উড়ে… ৪ । কাছে বসে থাকবে সে,ওর বর… দাওয়ার কাছের শিউলি গাছে ফুল ফুটবে… ঝোপের মতো বড়ো হয়ে উঠা টগর গাছে বাসা তৈরি করে বসা মৌটুসি পাখি মিষ্টি করে ডাকবে… টুইট টুইট টুইট… সঙ্গে ডাকতে থাকবে ঝিঁঝিঁগুলো… জ্যোৎস্নার আলোতে মণির মা নিজেই বনের চিল মা হবেন… ডাকলেই আসবেন… চিল মা, চিলমা, আয় মা উড়ে… গভীর অরণ্য থেকে উড়ে উড়ে আসবেন…। সাতহাত লম্বা চুলের ওর পালিত কন্যার জন্যে চিল মায়ের মনে বড়ো ব্যথা… রাজার বাকি কপট স্ত্রীগুলোর থেকে আগলে রাখবেন… দিয়ে যাবেন হাজারটি অকাট্য যুক্তি, নিশ্ছিদ্র বুদ্ধি… ডাকলেই হল।
মণি মাস্টারের বাড়ি ঢোকার পথের মুখে দাঁড়িয়েই প্রাণ ঢেলে কাতর স্বরে চীৎকার করে ডাক দিল, মাস্টারনি মা গো! মাস্টারনি মা… !
টীকাঃ
১। ঘোষা :: শঙ্কর দেব রচিত ব্রজবুলি পদ সংকলন "কীর্তন ঘোষা' এবং মাধবদেব রচিত "নামঘোষা'। নামঘরগুলোতে
এগুলো নিয়মিত গাওয়া হয়। মণি তার থেকেই কিছু পদ গেয়ে শোনায়।
২। মেজি :: মাঘবিহুতে পৌষসংক্রান্তির রাতে খড়-বাঁশে ঘর তৈরি করে, তার ভেতরে বন্ধু বান্ধব, গ্রামের বা পাড়ার
লোকজন ভিড়ে ভাত রান্না করে খাওয়া দাওয়া আমোদ করেন। পরদিন ভোরে সেটি জ্বালিয়ে দেন। অসমের
বরাক উপত্যকাতে এবং অন্যান্য বাঙালি সিলেটি অধ্যুষিত এলাকাতে একই রীতিকে "মেড়ামেড়ি' বলা হয়।
৩। চাদর :: বাঙালিদের চেনা সাধারণ চাদর নয়। অসমিয়া মহিলাদের মেখেলার সঙ্গে ঊর্ধ্বাঙ্গে পরিধানের হালকা বস্ত্র
খণ্ডকে চাদর বলে। এক সঙ্গে পোশাকটিকে বলে মেখেলা -চাদর।
৪। চিল মা :: অসমিয়াতে এবং বাংলাতে সামান্য পার্থক্য নিয়ে চিল মায়ের একটি রূপকথা প্রচলিত আছে। দুটিই চিলের
কাছে প্রতিপালিত একটি কন্যার রাজার সঙ্গে বিয়ে, কুটিল সতীনদের হাতে পীড়িত হওয়া, এবং চিল মা
এসে ওকে সমস্ত বিপদ থেকে আশ্চর্য রকমে উদ্ধারের গল্প আছে। অসমিয়াতে সেই গল্পের কন্যা বিপদে
পড়লেই মাকে ডাকে ""আঁহতর পাত (পাঠান্তরে আগলি কলা পাত –লেখিকাও এই পাঠই ব্যবহার করেছেন)
লরে কি চরে। চিলনী আই মোর আগতে পরে ।।'' লক্ষ্মীনাথ বেজবরুআর "বুঢ়ী আইর সাধু'-তে গল্পটি
সংকলিত আছে। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরির "গল্পমালা'-তে "চিল মা' নামে গল্পটি আছে। সেখানে
যেভাবে পদটি আছে, আমরা সেভাবেই ব্যবহার করেছি।



No comments:
Post a Comment