আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

***************************************************



Saturday, 1 January 2011

।। বৈদ্যুতিন মাধ্যমঃ নাগরিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এক নতুন প্রত্যাহ্বান ।।

              
    (লেখাটি আজ ১৯-০৪-১১ র দৈনিক যুগশঙ্খে সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত।)
  ( বর্তমান প্রবন্ধটি আসলে গেল নভেম্বর-ডিসেম্বর, ২০১০ মাসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সহযোগিতাতে বিদ্যায়তনিক কর্মী মহাবিদ্যালয়ের ( এ এস সি) আয়োজিত সঞ্জীবনী পাঠমালাতে দেয়া বক্তৃতা। বিষয় ছিলঃ "স্বাধীনতা উত্তর কালে বাংলার নগর সংস্কৃতি''। অমন এক কেজো বক্তৃতাকে এখানে হাজির করাটা অনেক অধ্যাপকের কাছেই অকেজো আর হাস্যকর প্রয়াস বলে মনে হতে পারে। যখন ছাত্র ছিলাম তখন, যখন ছাত্র পড়াই তখনও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মতান্ত্রিকতার কাছে নির্ভেজাল আত্মসমর্পণ করাটা শিখলামও না, শিখতে চাইলামও না। বেশ কিছু বৈষয়িক লাভালাভ চিরদিনই আমার হাত থেকে ছুটে গেল, ছুটে যায়--- জেনেও। এই বক্তৃতা ছিল, তেমনই অশিক্ষার এক ফসল। নিয়মতান্ত্রিকতার ছোট্ট মঞ্চকেও তার ভেতর থেকে অন্তর্ঘাত করবার এক ছোট নিদর্শন মাত্র। তাই এতে নেই সেমিনার পেপারেরর প্রচলিত ঢং, এখানে তুলে দেবার সময়েও মূল সুরটি যাতে অক্ষত থাকে তাই কোনো পরিবর্তন করাটা দরকার বলে বোধ করি নি।)

               যে বিষয়টা নিয়ে আমি বলব ভেবেছিলাম তার দুটো দিক ছিল। একটা হলো, কেন আমি ‘প্রত্যাহ্বান’ শব্দটি ব্যবহার করলাম—সেই তত্বের দিক। আরেকটা হলো তথ্যের দিক—কীভাবে সে প্রত্যাহ্বান আসছে। কিন্তু যে সময়ের পরিসর আমাদের বেঁধে দেয়া হয়েছে তাতে দুটো দিককে সামাল দেয়া বেশ মুস্কিল। দক্ষ লোকেরা অবশ্যি সেটিও করে ফেলেন। কিন্তু আমি যে তেমন দক্ষতার দৃষ্টান্ত দেব তার পথে আমার সমস্যা হচ্ছে ভাষার কিম্বা পরিভাষার। যেমন ধরুন , ‘নগর’ শব্দটির যে মানে আমরা এ ক’দিন ধরে শুনে আসছি, মনে হচ্ছে আপনারাও সে মানের সঙ্গে বেশ অভ্যস্ত । আমার ঐতিহ্য তেমন নয়। আপনাদের দেখে মনে হচ্ছে জেলা সদরগুলো থেকে এসেও ‘মফসসল’ শব্দটি বেশ হজম করছেন। আমার কিন্তু বেশ ঢেকুর উঠছে। আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের ভাষাতে শব্দটি নেই। যে শহরে আমি বড় হয়েছি, সেই শিলচরকে লোকে আদর করে বলে ‘কবির শহর’। তাকে ‘মফসসল’ বললে অপমানিত বোধ করবারই কথা। ‘মহানগর’, ‘নগর’, ‘শহর’, ‘গঞ্জ’, ‘গ্রাম’ –এতোগুলো শব্দ আছে বাংলা ভাষাতে, কিন্তু মনে হচ্ছে নগর কলকাতার পরিভাষাতে সচেতনভাবেই দুটো শব্দকে রাখা হচ্ছে—‘নগর’ এবং ‘মফসসল’ । একে আমি বলছি ‘প্রতিষ্ঠান’।

          এতে ‘প্রতিষ্ঠান’ কথাটারও যে কিছু বোঝানো গেল না। ‘প্রতিষ্ঠানে’র যে আভিধানিক অর্থের সঙ্গে আমরা পরিচিত তাতে সে পরিপ্রেক্ষিত ছাড়া তেমন মন্দ কিছু নয় যে তাকে প্রত্যাহ্বান জানাতে হবে। যখনই সন্মিলিত কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে আমরা দল বেঁধে কোথাও বেশ একটা দীর্ঘকালের জন্যে জড়ো হই তখন তাকেই বলে প্রতিষ্ঠান। তার অবয়ব থাকতেও পারে, নাও পারে। যেমন আমাদের জাত, ধর্ম, অর্থ ব্যবস্থা—সেগুলোও এক একটা ‘প্রতিষ্ঠান’। বামপন্থী ঘরানায় আমরা যে প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার স্লোগান শুনেছিলাম তার কারণ কিছু চিহ্নিত প্রতিষ্ঠান, যেগুলো পুরোনো হয়ে যাচ্ছিল বা যাচ্ছে সেগুলো আরো কিছু মহত্তর প্রতিষ্ঠানের পথ রুখে দাঁড়িয়ে ছিল। বুঝতেই পারছেন আমার ‘প্রত্যাহ্বান’ শব্দটির অনেকটাই সেই বাম সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। কিন্তু তার মানে এও নয় যে বাম প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার প্রতি আমার বেশ শ্রদ্ধাভক্তি আছে। প্রতিষ্ঠান বলতে তাঁরা কিছু বুঝতেন কিনা সে নিয়ে তর্ক হতেই পারে। কিন্তু বিকল্প প্রতিষ্ঠান নিয়ে তাদের যে বিশেষ কোনো ধ্যান ধারণা ছিল না—সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেতো বটেই আজকাল এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও। কিছু কিছু ছোট ছোট ব্যতিক্রম রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর নাম নেবার সময় এখনো আসেনি।

                এদের এই অবস্থানের সঙ্গে পোস্টমডার্নদের অবস্থানের মূলগত কোনো বিরোধ নেই। পোস্টমডার্নরা যেমন বলেন ‘গ্র্যান্ডন্যারেটিভ’ আর সম্ভব নয়—এরা সেটি বলছিলেন অন্যভাষায় অন্য চিহ্ন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে। যেমন ধরুন, ‘দেশ-আনন্দবাজারে’র বিকল্প এরা দাঁড় করাচ্ছিলেন ‘লিটিলম্যাগ।’ সে আরো মারাত্মক! যে ঢাউস আকারের তিনচারশ টাকার লিটিল ম্যাগাজিনগুলোতে বহু পড়াশোনা করা বিদ্বজ্জনেরা লেখেন তেমন কাগজ করার সাহস করা শিলচর-শিলিগুড়িতে বেশ বিপদ আছে। আর কিনে পড়তে গেলেও যে বেকার ছেলেটি ট্যুশন পড়িয়ে মাসের শেষে শ’তিনেক টাকা রোজগার করে তার বুকে লাগবে; আর খোঁজে পেতে গেলেও তাকে বেশ পড়াশোনা করা ছেলে হতে হবে। তার জন্যে সে শুধু পাকা মাইনের চাকরি পাবার স্বপ্ন দেখে দিন গুনতে পারে। কিন্তু চাইলেই পান কিনতে গিয়ে একটা ‘দেশ’ পত্রিকা কিনে বাড়ি চলে যেতে পারে।

          আমাদের ছেলেবেলা 'দেশ আনন্দবাজারে’র বিরুদ্ধে বাম সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আকছার গালিগালাজ শুনেছি। আজকাল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতেও আনন্দবাজার-আজকালের ব্যবসা চলে না, বরাক উপত্যকাতেতো একেবারেই না। আজকাল গোটা অসমে বাংলা ছোটকাগজের সংখ্যা ৭৭টিরও বেশি। তথ্যটি আমি দিচ্ছি গুয়াহাটির বিখ্যাত প্রবন্ধের কাগজ ‘নাইন্থ কলাম’ থেকে। পূর্বোত্তরে সংখ্যাটি ১১৮ বা তারো বেশি। এগুলো আনন্দবাজারকে ঠেলে বের করতে পারেনি। করেছে যে দশ বারোটি রঙিন চকচকে বাংলা কাগজ বেরোয় গুয়াহাটি, ডিব্রুগড়, শিলচর, করিমগঞ্জ, ধর্মনগর, আগরতলা এবং শিলং শহর থেকে—তারা। এবং সম্ভবতঃ গেল দু’বছরে গুয়াহাটি শহর থেকে ‘ব্যতিক্রম’ বা ‘অন্যদেশ’ নামের কাগজগুলো যে দুর্দণ্ড প্রতাপে আমাদের ভাবনাগুলোকে ভাষা দিতে শুরু করেছে তাতে শীঘ্রই ‘দেশ-নবকল্লোলে’র মতো কাগজগুলোও ওখান থেকে পাততাড়ি গোটাতে শুরু করবে। 'ব্যতিক্রম' ওখানকার এক বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও বটে।১ এই এরা সাহিত্যের জন্যে যে পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছেন, তাতে লিটিলম্যাগগুলোও বাড়ছে এতো দ্রুতো লয়ে। নইলে 'নগর কলকাতা'র 'বাম'পন্থার রপ্তানী করা 'প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা'র তত্ব এতোদিন আমাদের পথে বসিয়ে রেখেছিল। একেও তাই আমার মনে হয় আরো এক 'প্রতিষ্ঠান' যার ক্ষয় অবধারিত। সেটিতে আমরা আবার পরে আসছি।

            এই যে স্থান-কাল পাল্টালে শব্দগুলোর মানের বদল ঘটে যাচ্ছে, বা কিছু মানেকে সচেতনভাবে রক্ষা করা কিম্বা অন্তর্ঘাত করবার প্রয়াস হচ্ছে একে নাম দিতে পারি 'চিহ্নায়ন' প্রক্রিয়া। কথাগুলো বললেই 'আধুনিকোত্তরবাদে'র কথা মনে পড়ে যায়। বললে অনেক কথাই বলা যায়--যার সুযোগ নেই। আর একেবারে না বললে, আমাদের সিদ্ধান্তকে দাঁড় করানো যাবে না। আমরা যে এক ক্রম সম্প্রসারণমান আবিচ্ছিন্ন অথচ বিশৃঙ্খল বিশ্বে বাস করি--এ নিয়ে কোনো সংশয় থাকা উচিৎ নয়, একে শুধু বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। ব্যাপারটা এখন ইন্টারনেটের যুগে অনেক প্রত্যক্ষ। তাই ফরাসী বা বিলেতিরা আধুনিকোত্তরবাদের জন্ম দিয়েছে আর বলছে এখন আর কোনো 'মহা আখ্যান' গড়ে তোলা সম্ভব নয়।আমাদের আগেকার 'প্রতিষ্ঠান বিরোধী'রা তাতে চোখে চড়ক গাছ দেখছেন আর সউৎসাহে সে দলে যোগ দিয়েছেন বা দিচ্ছেন।

           কিন্তু, আমার নিজের প্রায়ই সগৌরবে মনে হয়, আমরাতো এখনো 'রামায়ণে'র যুগে বাস করি। রবীন্দ্রনাথ আমাদের 'মহাআখ্যান'--কবে ফুরোবেন কেউ জানি না। দেরিদা-ফুকো--লাকারা ফুরিয়ে যাবেন। আমরা সাহিত্যের ইতিহাস পড়ি। কিন্তু, যদি শুধু 'রামায়ণে'র কিম্বা 'কোরানে'র কিম্বা তথাকথিত মধ্যযুগের 'চন্ডীমঙ্গলে'র ইতিহাস ভালো করে পড়তে পারতাম --কী করে সেগুলো রূপান্তরিত, পুনঃসৃজিত হচ্ছে, কারা পড়ছেন, দেখছেন শুনছেন এবং কোথায় কোন কোন ভাষাতে--তবে চিহ্ন বিজ্ঞানের জনক আমরা হতে পারতাম।২ হইনি, তার কারণ 'বিলেত' বলে যে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে সে আবার 'নগর কলকাতা'র ঘাড়টিকে জন্ম থেকেই বাঁকা করে রেখে দিয়েছে। বিলেতি ভাষাতে কোট না করলে আমাদের পান্ডিত্য সিদ্ধ হয় না।

                 আধুনিকোত্তরবাদিরা অনিশ্চয়তাবাদের কথা বলেন, বলেন বিশৃঙ্খলার কথা। তারা এন্ট্রপির কথা পড়েছেন। আমরাও পড়েছি। কিন্তু জলের তাপ শূন্য ডিগ্রীতে নামিয়ে আনলে যে সে বরফ হয়ে যায় এবং সেই বরফে বিলেতেরও উত্তরের মহাদেশের কেউ কেউ ঘর বানিয়েও বসত করেন--সে তথ্যও দিব্বি চেপে গেছেন। শৃঙ্খলা বিশৃঙ্খল বিশ্বের একটি অন্তর্লীন সত্য। আর তাই কেবল প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা কিম্বা 'মহাআখ্যানে'র বিরোধীতা কোনো সম্পূর্ণ তত্বই নয়। 'বিকল্প প্রতিষ্ঠান' একটি চিরন্তন এবং ঐতিহাসিক সম্ভাবনা । ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে তার সম্ভাবনা ছিল, আছে এবং থাকবে।

                         এবারে আমরা বৈদ্যুতিন মাধ্যম নিয়ে কথা বলবার মতো জায়গায় এসে গেছি। নব্বুইয়ের দশকের প্রথম বছরগুলোতে বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে যখন উপগ্রহ চ্যানেলগুলো এসছিল স্টার টিভি, এম টিভি দিয়ে ওরা যাত্রা শুরু করেছিল। পন্ডিতেরা বলছিলেন এসব বিশ্বায়নের উপরিকাঠামো গঠনের ষঢ়যন্ত্র। পশ্চিমের সংস্কৃতি আমাদের দেশজ সংস্কৃতির বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দেবে। হয়তো, খানিকটা তাতে সত্য ছিল। কিন্তু, ঘটনা কী চেহারায় এগুলো? সেই আদ্যিকালের ইংরেজি চ্যানেলগুলো প্রান্তে চলে গেল। আমরা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে বসেও একসময় কলকাতার বাংলা চ্যানেলগুলো দেখতে পেলাম। এভাবে বাংলার মূলস্রোতের সঙ্গে আমরা পরিচিত হলাম। যে অসমে এক সময় ভাষার জন্যে প্রাণ দিতে হয়েছে, সেখানে কিছু চ্যানেল বাংলা এবং বডোতো বটেই সাদ্রি, ডিমাসার মতো ছোট ছোট এবং কোত্থাও মর্যাদা না পাওয়া ভাষাগুলোতে চব্বিশঘন্টা ধরে সংবাদ অনুষ্ঠানাদি প্রচার শুরু করল। এমন ঘটনা নগর কলকাতা কল্পনাও করতে পারে না। ছোট ছোট শহরে গড়ে উঠা চ্যানেল এখন নগর কলকাতা যাদের ভুলে গেছিল--সেই অসমের বাঙালিদের আত্মপ্রকাশের এক একটা মঞ্চ দিয়ে দিল। স্রষ্টা আর ভোক্তার তফাৎ এতোটাই ঘুচে গেল যে আমাদের শহরগুলো থেকে গোটা ভারতে দেখা গেল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর দেবজিৎ, অভিজ্ঞান, অমিত, সপ্তপর্ণাদেরও মুখ। হয়তো, সুমন নচিকেতা, লোপামূদ্রাদের সামনে এরা এখনো ধূমকেতু, কিন্তু এইতো সবে শুরু।

                 এর থেকেও বড় মঞ্চ আর প্রত্যাহ্বান নিয়ে হাজির হচ্ছে ইন্টারনেট। এ ক'দিন আমরা কম্পিউটারে এখানে কিছু কিছু বাংলা লেখা পড়েছি। স্লাইডশো দেখেছি। আমাদের অধ্যাপকেরা বোধ করি এখনো এর বেশি এগুতে পারেন নি। এ যদি হতো, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আমি নিশ্চিত, আপনারা দু'একজন বক্তার পুরো বক্তৃতাই এখানে লেখা দেখতেন কাগজের বদলে কম্পিউটারের পর্দায়। এবং তা ছাপার অক্ষর থেকেও সুজ্জিত ফন্টে। আপনারা বাংলাদেশের একটা সফটওয়ারই দেখেছেন--যদিও তার ব্যবহার দেখেন নি। মেহেদি হাসানের 'অভ্র'।

                       কম্পিউটার বুঝি ইংরেজি ছাড়া কিছু বোঝে না, এই এক ঔপনিবেশিক বোধ হলো অন্যতম কারণ যে গেল দুই দশকে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে গোটা দেশ ছেয়ে গেছে। পন্ডিতেরা আশংকা করছেন আরো দশক দুই পর বাংলা সহ ভারতীয় ভাষাগুলোর অস্তিত্ব থাকবে কি না। ২০০২ সনে আমি নিজেও যখন কম্পিউটারের ব্যবহার জানতাম না, তখনই এক প্রবন্ধে লিখেছিলাম ভারতবর্ষ হচ্ছে সেই দেশ যেখানে কম্পিউটার হয়ে উঠবে বহুভাষিক। ৩ এটা এখন হচ্ছে, কিন্তু আমরা সে প্রক্রিয়া শুরু করিনি। কারণ আমাদের ঔপনিবেশিক মোহাচ্ছন্ন মন বিদেশ থেকে নির্দেশ না পেলে নড়ে চড়ে বসে না। গেল বছর অক্টোবরে ইণ্টারনেট কোরপোরেশন ফর এসাইন্ড নেমস এন্ড নাম্বারস ( আই সি এ এন এন)৪ বলে একটি প্রতিষ্ঠান, যাদের সদর দপ্তর সিওলে--তারা ইন্টারনেটের চল্লিশ বছরের ইতিহাসে এক যুগান্তরকারী ঘটনা ঘটিয়েছেন। এতে তারা আশা করছেন, ইন্টারনেটের সত্যিকার আন্তর্জাতিকীকরণ ঘটবে। তাঁরা লাতিন কোডিং ব্যবস্থাকেই পালটে দেবার কাজ সম্পূর্ণ করেছেন। 'ইংরেজিতে শুধু বিশ্বময় ছড়ানো যাবে'---এতোদিনকার এই লালিত বিশ্বাসকেই তাঁরা ধ্বসিয়ে দিয়েছেন। কোনো রাষ্ট্র চাইলেই তারা সে ব্যবস্থাটি সে দেশকে দিচ্ছেন ভারত সরকার ইতিমধ্যে সে আবেদন করেছেন এবং পূর্ণদ্যোমে কাজও শুরু করে দিয়েছেন। ইন্টারনেটের সমস্ত বিষয়কে ভারতীয় ভাষাগুলোতে অনুবাদের ব্যবস্থা করবার কাজ এগুচ্ছে। ছোট ছোট কিছু ভাষাতে তা সম্পূর্ণও হয়ে গেছে। তার সমান্তরালে আরো বেশ কিছু কাজ এগুচ্ছে। লিনাক্সের ভারতীয় ভাষাগুলোর সংস্করণ বহুদিন হলো বেরিয়ে গেছে। 'ফায়ারফক্স' ব্রাউজারেরও তাই।গোগোল ভারতীয় ভাষাগুলোর সংস্করণ বহুদিন হলো বেরিয়ে গেছে। 'ফায়ারফক্স' ব্রাউজারেরও তাই। গগোল ভারতীয় অনেক ভাষা লেখা পড়ার সফটওয়ার ছেড়েছে বহুদিন হলো। এগুলো যে কেউ পেতে এবং ব্যবহার করতে পারেন বাংলাতে। ইংরেজিতে আর ব্যবসা এগুবে না জেনে মাইক্রোসফট সেভেন এবং উইন্ডো সেভেনও এখন বাঙালি হয়ে গেছে। এগুলো যখন হচ্ছিল না বা হয় নি তখনই অনেকগুলো ইউনিকোড ব্যবস্থা এসে গেছিল ভারতীয় ভাষাগুলো লেখা পড়ার জন্যে। একা 'বারাহা' দিয়ে আপনি ভারতের যে কোনো ভাষা লিখতে ও পড়তে পারেন। কিন্তু সেটির তেমন ফন্ট বৈচিত্র নেই, রয়েছে 'অভ্রে'র ৫ । অত্যন্ত আকর্ষণীয়, ব্যবহার বান্ধব এই সফটওয়ার নির্মাতা মেহেদি হাসান এক বাংলাদেশী তরুণ। শুধু ভাষার জন্যে কম্পিউটার ব্যবহার করবার স্বার্থে বাংলাদেশের সফটওয়ার প্রযুক্তি যে কী দ্রুত হারে বাড়ছে-- না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। লিনাক্সের বাঙালি পরামর্শদাতারা প্রায় সব্বাই বাংলাদেশের লোক।৬ কম্প্যুটারকে তারা বাঙালি করে ছেড়েছেনতো বটেই--তাদের সুবাদে বিশ্বময় ছড়িয়ে যাবার স্বাধীনতা পেয়ে গেছে অসমিয়া, মণিপুরি, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, হাজং, চাকমাদের মাতৃভাষা। রাজবংশীর মতো ভাষাকে বাংলা কিম্বা অসমিয়া বলে আটকে রাখবার দিন ফুরোলো বলে।

               কী হয়, সেই ভাষা দিয়ে? যাদের আমাদের সৃজনী চিন্তার ভাষা বাংলা কিন্তু কম্প্যুটারে সেটির ব্যবহার জানা নেই, তাদের ধারণা মেইল করা , ইংরেজি হরফে চ্যাট করা, অরকুটে, ফেসবুকে বন্ধু বাড়ানো ছাড়া আর কিছু ওয়েব সাইট খোঁজে বেড়ানোই এর কাজ। আসলে কম্প্যুটার তথা ইন্টারনেট এখন আপনার সিনেমা-থিয়েটার হল, সঙ্গীত মঞ্চ, রেডিও, লেখার ঘর, পড়ার ঘর, লাইব্রেরী, বইয়ের দোকান, বাজার , স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়। আপনি যদি ব্লগ লিখতে পারেন তবে সেখানে আপনি লেখক সম্পাদক প্রশাসক সবটাই। কলেজ স্ট্রীট এতো দ্রুত আপনাকে ঢাকা কিম্বা টোকিওর পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে না, যতটা পারে ইন্টার নেট। ফলে যে নগর কলকাতা এতোদিন শুধু লিখত বাকি বাংলা পড়ত, নগর কলকাতা গাইত বাকি বৃহত্তর বাংলা শুনত, নগর কলকাতা অভিনয় করত বাকি বাংলা তা দেখতো--বৌদ্ধিক আধিপত্যের এই সমীকরণ যাচ্ছে উলটে। হাজার পৃষ্ঠার চারশ টাকার লিটিল ম্যাগ শুধু বুদ্ধিজীবিদের জন্যে প্রকাশ করেও যারা প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার বড়াই করেন বা করতেন তাদের দিকে চোখটি না ফেলে গট গট করে বিশ্বজয়ের পতাকা উড়িয়ে দিচ্ছে 'উড়ালপুল', 'খোয়াব', 'সৃষ্টি', 'কৌরব', 'গুরুচন্ডালী', 'ইচ্ছামতি', 'কঁচিকাচা', 'কর্ণিকা', 'দ্রোহ', 'অলসদুপুর' 'বাঙালনামা'র ৭মতো ওয়েব কাগজগুলো। আপনি বিনে পয়সায় পড়তে পারেন। কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই বটে, থাকবে কী করে? সেতো এখন ওয়েব ম্যাগাজিন হয়ে গেছে। রোজ লেখা বেরুচ্ছে। রোজ পড়া হচ্ছে--সেই আড্ডায় যোগ দিচ্ছে তিনসুকিয়া থেকে তিউনেশিয়ার বাঙালি। এই বাংলাতে তেমনি আরেক আড্ডার নাম 'লোটা কম্বল'; বাংলাদেশে আছে 'সচলয়াতন', সামহোয়ার ইন, মুক্তমনা, প্রথম আলো, চতুর্মাত্রিক, আমার ব্লগ। 'আমার ব্লগে' আপনার লেখা পছন্দ না হলে 'বাঙাল ভাষা'তে পাঠক আপনাকে গালিও দিতে পারে। আর 'মুক্তমনা' পড়লে তসলিমা নাসরিণকে নিয়ে আনন্দবাজারীয় নাটকটা আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। সে নাটলের দিন ফুরোলো। সবই এখন 'মুক্তমনা'। কোনো কিছু আর গোপন নেই। বেড়া নেই কোনো।

                     ব্লগ লিখতে যদি আপনার আগ্রহ জন্মায়, অথচ না জানেন কী করে কী করতে হয়--আপনাকে পরামর্শ দেবার জন্যে রয়েছে 'বাংলাহ্যাক্স', 'টেকটনিক্স', 'আমার প্রযুক্তি' এমন আরো অনেক।


টীকাঃ

১) পূর্বোত্তরের বহু পরিচিত প্রকাশনা সংস্থা আগরতলার 'অক্ষর'। অসমের 'করিমগঞ্জে'র 'অক্ষরবৃত্ত' কাগজও একসময় বেশ মূল্যবান কিছু গ্রন্থ প্রকাশ করেছিল। বরাকউপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, গণতান্ত্রিক লেখক সংস্থা, 'খ' ইত্যাদি পত্রিকা বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশের দায়িত্ব বহন করলেও হাইলাকান্দির 'সাহিত্য'ই এখন অব্দি সদাব্যস্ত বহু মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশে। আগরতলার 'অক্ষর' বাদ দিলে এদের কারোরই উদ্যোগগুলো ব্যবসায়িক নয়। গুয়াহাটিতে কবি-ঔপন্যাসিক বিকাশ সরকারের 'মিথ প্রকাশন' প্রথম প্রকাশনার কাজে একটা নজড় কাড়ার উদ্যোগ নেয়। এই তথ্যটি জানা গেল , এবারের গুয়াহাটি বইমেলাতে 'ভিকি পাবলিশার্স' এবং 'ব্যতিক্রম'এর আয়োজিত পূর্বোত্তরের বাংলা প্রকাশনা শিল্প নিয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা চক্রের সংবাদ থেকে ( যুগশঙ্খ, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১০) । এর পর একে একে এগিয়ে আসে নাইন্থ কলাম, সাময়িক অসম, অন্যদেশ ইত্যাদির মতো কাগজ যারা প্রকাশনার কাজটিকে ব্যবসায়িক দিক থেকেও সফল করবার চেষ্টাতে হাত দেন। হেমপ্রভা প্রকাশনীর নামও এই প্রসঙ্গে নিতে হবে। এর মধ্যে ভিকি পাবলিশার্সই সম্ভবত সবচে' সফল এক ব্যবসায়িক উদ্যোগ। শীঘ্রই তারা গুয়াহাটির রিহাবাড়িতে নিজেদের এক স্থায়ী স্টল খুলতে যাচ্ছে। ক্রমে যা রাজ্যের অন্যত্রও ছড়িয়ে যেতেই পারে।

২) যেগুলো কি না ছিল একাধারে শ্রব্য-পাঠ্য-দৃশ্য কাব্য, এবং সেগুলো লেখক-গায়ক-পাঠক-দর্শকের বিভেদ প্রায়ই ভেঙ্গে দিত, তার জন্যে 'ব্রেখটীয় ফর্মূলা'রও দরকার পড়ত না। এভাবেই জ্ঞান অর্জন করে এসছে আবহমান কালের ভারতবর্ষ। ছাপাখানার উৎপাদ কেবল গ্রন্থ, যা কিনা ব্রাহ্মণদের হাত থেকে বেরিয়ে দু'একটি নগরের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে আদৌ জ্ঞান বিশ্বের একমাত্র মাধ্যম কিনা, এবং সেই বিশ্বের শ্রেণি বিভাজনকে মুছে ফেলে দিতে পেরেছে কি না কিম্বা পারবার ক্ষমতা রাখে কি না--এই প্রশ্ন আজ এই একুশ কম্প্যুটার যুগে সজোরেই উঠাই উচিৎ।

৩)সেই ২০০২তে তিনসুকিয়া থেকে প্রকাশিত ‘দৃষ্টি’ বলে একটা কাগজে আমার তখনকার অধ্যয়ন-অনুসন্ধানের উপর ভিত্তি করে ‘অসমে ব্যবহারিক বাংলা শিক্ষার সংকট’ নামে এক প্রবন্ধে লিখেছিলাম “কম্প্যুটার ইংরেজি ছাড়া বোঝেনা—এ অবশ্য ডাহা মিথ্যা প্রচার। তা যদি সত্যও হয় তবে ভারতবর্ষ সেই দেশ যেখানে তাকে বহু ভাষার পাঠ দেয়া যায়। সে পাঠ না নেয়, তবে পুরোনো প্রযুক্তির আস্তাকুড়ে তাকে ঝেড়ে ফেলে আমাদের তৈরি করে নিতে হবে আরো আধুনিক সেই যন্ত্র যে ঈশ্বরের পাশে বসবে না। স্বয়ং ঈশ্বরকে -–যিনি বাংলা বোঝেন না—জায়গা ছাড়ার নোটিশ দেবে। যে বলবে—শুনবে বোঝবে শুধু ইংরেজি নয়—মানুষের ভাষা। তার মাতৃভাষা। সে ভাষার শত বৈচিত্রকে সে বুকে ধরবে পরম গৌরবে আর মমতায়। অচিরেই তা হতে যাচ্ছে বলে আমাদের বিশ্বাস। এবং কম্প্যুটারই তা করবে...।”



৬)(Ubuntu Bangladesh ;http://www.linux.org.bd/)



৭) পশ্চিম বাংলা থেকে নিয়ন্ত্রিত সমবেত ব্লগঃ

ক) কফিহাউসের আড্ডাঃ http://coffeehouseradda.com

খ) লোটাকম্বলঃ http://lotakambal.sristisukh.com

বাংলাদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত ব্লগঃ

ক) http://www.sachalayatan.com

খ)http://www.somewhereinblog.net

গ)http://mukto-mona.com/banga.blog

ঘ) http://prothom-aloblog.com

ঙ) http://www.amarblog.com/

চ) http://choturmatrik.com

কতকগুলো ওয়েব কাগজঃ

ক) উড়ালপুলঃ http://urhalpul.com

খ) খোয়াবঃ http://khoyab.in ;

গ) সৃষ্টি ঃ http://www.sristi.co.in

ঘ) কৌরবঃ http://kaurab.com

ঙ) গুরুচণ্ডালিঃ  http://guruchandali.com

চ) ইচ্ছামতিঃ http://ichchhamoti.org

ছ) কচিকাঁচাঃ http://diyala.kochisamsad.com

জ) কর্ণিকাঃ http://www.kornika/co.in

ঝ) দ্রোহ ঃ http://www.droho.net

ঞ) বাঙালনামাঃ http://bangalnama.wordpress.com

চ) অলস দূপুরঃ http://www.alasdupur.tk/

কতকগুলো প্রযুক্তির দিশা দেখাবার ব্লগঃ

ক) বাংলাহ্যাক্সঃ http://banglahyacks.com

খ) টেকটিউনসঃ http://techtunes.com.bd

\গ) আমার প্রযুক্তি ঃ http://forum.amaderprojukti.com/

আমার নিজের ব্লগঃ

ক) সুশান্তঃ http://sushantakar40.blogspot.com

খ) ঈশানকোনের কাহিনিঃ http://ishankonerkahini.blogspot.com

গ) ঈশান কোনের কথা  ঃ http://ishankonerkotha.blogspot.com

ঘ) কাঠের নৌকোঃ http://kathernouko.blogspot.com

এই ব্লগ তৈরি হয়েছে পূর্বোত্তর ভারতের বাংলা বই, কাগজের কথা মনে রেখে। যে কেউ নিজেদের প্রকাশিত বই ,পত্র পত্রিকার পিডিএফ পাঠালেই আমরা এই জনপ্রিয় ব্লগে তুলে দিচ্ছি । যদি সফল হই তবে নিজস্ব ওয়েবসাইট খুলা যাবে।

ঙ) প্রজ্ঞানঃ http://pragyan06now.blogspot.com

কৃতজ্ঞতাঃ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যখন নেট বিচ্ছিন্ন তখন আমাকে ওয়েব ঠিকানাগুলো দিয়ে সাহায্য করেছেন 'কফিহাঊসে'র কবি গল্পকার বন্ধু শ্রীমান অভ্র পাল। অভ্রকে অজস্র ধন্যবাদ!
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...

Google+ Badge

^ Back to Top--'উপরে ফিরে আসুন'