আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Sunday, 29 August 2010

রাষ্ট্রীয় নাগরিকপঞ্জিঃ সন্দেহ আর শংকা

From My Google Blog
                                                                   মূল অসমিয়াঃআব্দুল সালাম *
                  
                         ’বছরের ভূমিকম্পের শেষ ধাক্কাটিও ১৯৮৫ র ১৫ আগষ্টে সম্পাদিত অসম চুক্তির সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেছিল। অসমের মানুষ ধীরে ধীরে অনুভব করলেন বিদেশি সমস্যা আর বিদেশি খেদা আন্দোলনের  প্রকৃত চরিত্র। সাম্প্রদায়িকতা আর উগ্র জাতীয়তাবাদের থেকে জন্ম নেয়া ফ্যাসিজমের ধার কমতে শুরু করল, কিন্তু তাতে খুশি  নয় সংঘ পরিবার, রাজনৈতিক দল বিজেপি আর তাদের সমভাবাপন্ন দলগুলো ।
             অসমে পূর্ববঙ্গীয় মূলের যেসব মুসলমানদের বৃটিশ তার ঔপনিবেশিক  স্বার্থেই আমদানি করে এনে বন-জংগল, নদী পাড়ের চরাঞ্চল আর অনুর্বর জমিতে বসিয়েছিল, সেই সব মানুষকেই আবারো শত্রু এবং বৃহৎ বাংলাদেশ বা ইসলামিস্তান সৃষ্টির ষড়যন্ত্রকারী বলে চিহ্নিত করে অহরহ তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত আরম্ভ হয়েছিল, সেই ষাটের দশকের থেকে। আগেকার অসম আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রকৃত সত্য অনুধাবন করে এখন মৌনতা অবলম্বন করে বসে আছে, কিন্তু সাম্প্রদায়িক সাম্প্রদায়িক মনের অনেকে আইনের সাহায্যে হবে না জেনে মুসলমানদের ‘হাতে বা ভাতে’ মারবার জন্যে সভা-সমিতিতে প্রকাশ্যে আহ্বান জানাতে  শুরু করল।
                    দরিদ্র নিরালম্ব মুসলমানেরা ঠেলা রিক্সা চালিয়ে, হোটেলের থালা বাসন ধুয়ে, নালা নর্দমা পরিষ্কার করে, বছরের হিসেবে চুক্তিতে হাল বেয়ে বা দিন মজুরি করে কোনোক্রমে পেটেভাতে টিকে ছিল। এদেরই কাউকে কাউকে উজান অসম বা অরুণাচলের মতো জায়গা থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ভাতে মারবার ব্যাবস্থা হয়েছিল।  এই মুসলমানদের কেউ না ছিল  বিদেশি  না বাংলাদেশি। তারা ছিল ব্রহ্মপুত্রের ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ এবং নৃগোষ্ঠিগত সাফাই অভিযানের (এথনিক ক্লিনজিঙে)  বলি ভারতীয় নাগরিক। এমন অমানবিক আর বেআইনি কাজকর্ম দেখেও এমনিতে যারা মানবাধিকার, আইনের শাসন, সংবিধানের কথা বলে কথার খৈ ফোটান তাদের মুখ রইল বন্ধ হয়ে।বৃহৎ অসমিয়া জাতির স্বার্থে কলম ধরে যারা বৌদ্ধিক নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন তাদেরকে কলম রইল বন্ধ হয়ে। যাদেরকে হৃদয়বান এবং অসমের চিন্তানায়ক বলে শ্রদ্ধা করা হয় তারাও রইলেন মৌন। ‘মৌনেনঃ সম্মতি লক্ষনম’। বেঁচে থাকবার দুর্বার  প্রবৃত্তিতে সেই সব শ্রমজীবী মানুষগুলো বৌ বাচ্চাকে লালন পালন করতে ভারতের নানা প্রদেশে দৌড়ে গেল। বিজেপি, শিবসেনা আর অন্যান্য উগ্রহিন্দুত্ববাদি সংগঠনগুলো সেখান থেকেও এই ভারতীয় মুসলমানদের তাড়িয়ে দিল। মহাপুরুষ শংকর দেবের অসাম্প্রদায়িক দর্শনের প্রচার করতে ব্যস্ত অসমের এক সংবাদপত্র এই দুর্ভাগা মুসলমানদের ‘বিষ্ঠা’ বলে ঘৃণাভরা লেখা ছাপালো। এমন কুকর্ম চলছেই , বন্ধ হয় নি।
                  পূর্ববঙ্গীয় মূলের মুসলমানের ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোস পরা কিছু সংগঠন আর হিন্দুত্ববাদি নেতা সংগঠনের আগ্রাসী কাজ কর্মে শংকিত হয়ে পড়ল। ধর্মনিরপেক্ষতা আর অসম –অসমিয়াদের স্বার্থে নিত্য মুখর সারা অসম ছাত্র সংস্থাকেও এমন অমানবিক কাজের বিরোধীতা করতে কখনো দেখাতো যায়ই নি, উল্টে দেখা গেল সমর্থন দিতে ।  এই ‘মিঞারা’ হয়ে গেলেন ‘বাংলাদেশি-ইসলামিস্তানের সৈনিক’ , ট্রেডমার্কধারী সফট টার্গেট। দুর্ভাগা এই মানুষগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার হিটলারের অধীনের দেশগুলোর ইহুদি এবং বিশ শতকের ষাটের দশক অব্দি আমেরিকার নিগ্রোদের মতো সমস্ত ক্ষেত্রে বৈষম্য, বঞ্চনা আর লাঞ্ছিত মানুষের মতো জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। এদের মধ্যের কিছু মানুষ-- যারা মন্ত্রী, এম এল এ, আধিকারিক ইত্যাদি হতে পেরেছেন তাদের অবস্থা জার্মান নাজি কনসেন্ট্রেশন কেম্পের ‘কাপো’ দের থেকে ভালো কিছু নয়।
                     এতো কিছুর পরেও এই মানুষগুলো ঘোর অন্ধকারের পরে আলোর জন্যে  বড় আগ্রহে পথ চেয়ে রইল। অসমে যে সমস্ত পূর্ববঙ্গ মূলের মুসলমান রয়েছেন তারা  সেই বৃটিশ যাদের পাঁচ টাকার ‘রেলওয়ে ফেমিলি টিকিটে’ পূববাংলা থেকে অসমে এনে বি-ফর্মে ( B-form) জমি আবন্টন দিয়ে বসিয়েছিল তাদের তৃতীয় পুরুষ বা বংশধর। এই মানুষগুলোকেই ভোতার লিস্টে নামভর্তীর জন্যে বারে বারে সরকারী আধিকারিকদের সামনে  লাইন দিতে হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ন্যায়ালয়ের বিচারকের পরিবারের লোক, উকিল কিম্বা সরকারী কর্মচারীরাও রেহাই পেলেন না। ঠিক ইহুদি আর নিগ্রোদের মতৈ ডানদিকে পুরুষেরা আর মহিলারা বাঁদিকে।
উপযুক্ত নথিপত্র পরীক্ষার শেষে ভোটার লিস্ট তৈরি হলো, ছাত্র সংস্থা নারাজ। অভিযোগ উঠল লাখো লাখো বাংলাদেশির নাম ঢুকেছে। কোনো প্রাথমিক অনুসন্ধান না করেই প্রায় তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার নাগরিকের নামের পাশে সন্দেহজনক ভোটারের ( D-voter) ছাপ মেরে দেয়া হলো। মা-বাবা নয়, সন্তান হলো ডি-ভোটার। দাদা ভারতীয় নাগরিক , ছোট ভাই বোন হলো ডি-ভোটার।  সমকালীন রাজনৈতিক পরিবেশে বৈষম্যের নজির বিহীন ব্যবস্থাতে কিছু সংখ্যালঘু মানুষকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে ফেলা হলো। পৃথিবীর আর কোনো দেশে কি কেউ শুনেছে এমন অদ্ভূৎ ব্যবস্থার কথা?
                 অসমে যে সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জি প্রস্তুতির          ( উন্নীতকরণ) প্রকল্পকে এই পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে। অসমে এন আর সি প্রস্তুত করা হচ্ছে না , হচ্ছে নবীকরণ । ভিত্তি হবে ১৯৫১ সনের  নাগরিক পঞ্জি । অসম চুক্তির কোন দফাতেই বা ১৯৫১ সনের নাগরিক পঞ্জিকে ভিত্তি ধরার দলিল করা হয়েছে? এখন সেই অসম্পূর্ণ নাগরিক পঞ্জিকে ভিত্তির দলিল করা হলো কেন, সেইটেই লাখ টাকার প্রশ্ন।  কে দেবে তার উত্তর? কারই বা গরজ পড়েছে ! সমস্ত ষড়যন্ত্রের আঁচ পেয়েও ১৯৫১কে ভিত্তি বর্ষ ধরাতে কাউকে দেখা গেল না প্রতিবাদ করতে । সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। অসম চুক্তিতে যদিও ১৯৭১এর ২৮ মার্চের মাঝরাত অব্দি সময়কে নাগরিকত্বের ভিত্তি বছর ধরা হয়েছে, কার্যতঃ এখন ১৯৫১ সনকেই ভিত্তি বছর ধরা হলো। কারণ সরকার নিবন্ধনের জন্যে যে সব দরখাস্তের ফর্ম বিতরণ করেছে তার ১২ নং ঘরটিতে ১৯৫১ সনের নাগরিক পঞ্জির ক্রমিক নম্বর আর গৃহ সংখ্যা লেখাটা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর পরেই শুধু ১৯৭১, ১৯৬১ এবং তার আগের ভোটার তালিকার তথ্য দিয়ে ফর্মখানা ভরাতে হবে। এভাবেই বরপেটা আর ছয়গাঁও রাজস্ব চক্রে পরীক্ষামূলক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যঢ়যন্ত্র দিয়ে কত মানুষকে রাষ্ট্রহীন করা যায় তার পরীক্ষামূলক প্রকল্প।
               উপরে উল্লেখিত দুটো রাজস্ব চক্রের মুসলমানেরা ১৯৫১ সনের নাগরিক পঞ্জিকে মূল প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ঘোষণা করাতে কোনো আপত্তি করেন নি। এ নিয়ে তারা চিন্তিত নন। স্বাধীনতার আগে থেকে তাদের পূর্বপুরুষেরা এই এলাকাতে বাস করে আসছেন । তার নথিপত্র তাদের রয়েওছে।  তারা আশা করছেন রাষ্ট্রীয় নাগরিকপঞ্জিতে নাম নিবন্ধন করে ফটো পরিচয় পত্র পেয়ে গেলে এতো দিন ধরে তারা যে দুর্ভোগ ভোগে আসছেন তার অন্ত হবে। ফুরোবে যত সন্দেহ সংশয় ইত্যাদি। স্বাধীন নাগরিকের মতো থাকতে পারবেন ভারতের সর্বত্র।
কিন্তু,নাগরিকপঞ্জির ফর্ম , ১৯৫১সনের রাষ্ট্রীয় নাগরিকপঞ্জি আর ১৯৭১, ১৯৬১ সনের ভোটার তালিকা দেখে তাদের চোখ কপালে উঠবার জোগাড়। এদের মনে এক সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে, ভাবতে বাধ্য হয়েছে কোথাও একটা ষঢ়যন্ত্র হচ্ছে এই মানুষগুলোকে রাষ্ট্রহীন করবার। সাধারণ মুসলমানেরা এটা ভাবতে বাধ্য হলেন যে যে কাজটি ট্রাইবুনেল আর ন্যায়ালয় দিয়ে করা যায় নি, সেই কাজটিই এবারে সহজেই নাগরিকপঞ্জি দিয়ে করতে চাইছে স্বার্থান্বেষী মহল।
                অসমের মুখ্য সচিব ২০০৫ সনের মে মাসে অনুষ্ঠিত ত্রিপাক্ষিক সভার পর নাগরিকপঞ্জি উন্নয়নের জন্যে যে কার্যপ্রণালী হাতে নিয়েছিলেন তাতে স্পষ্টভাবেই স্বীকার করেছিলেন যে অসমে বহু জেলাতেই ১৯৫১ সনের নাগরিক পঞ্জি এবং ১৯৬৬-৭১ ভোটার তালিকা আংশিকভাবেই আছে। জনগণ তাদের অসুবিধের কথা বিবেচনা করে নাগরিকত্বের দাবি সাব্যস্ত করতে যাতে অসুবিধে নাহয় তার জন্যে কেন্দ্রীয় সরকারকে বিকল্প গ্রহণযোগ্য নথির এক তালিকা তৈরি করবার দায়িত্ব দিয়েছিল। বিকল্প নথির তালিকা তৈরি করবার জন্যে কেন্দ্রীয় সরকারের পিল্লাই মশাই সময় করে উঠতে পারেন নি, এরই মধ্যে দরখাস্ত পেশ করবার শেষ তারিখ  ১০ আগষ্ট দোরগড়াতে এসে পৌঁছে যায়।
                           পুনর্মূদ্রিত এন আর সি আর ভোটার তালিকাগুলোতে এমন কিছু ভুল থেকে গেছে যে গুলোকে সবাই  উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আর ষঢ়যন্ত্রমূলক বলে  ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ নানা সময়ে নানা প্রয়োজনে বরপেটা পুলিশ অধীক্ষক এবং জেলা নির্বাচন আধিকারিকের থেকে ১৯৫১ সনের নাগরিকপঞ্জি আর ১৯৬৬-৭১ সনের ভোটার তালিকার কপি সংগ্রহ করেছিল। বর্তমানের জেলা নিবন্ধক ( জেলা শাসক) সেগুলোকে যখন আবার ছেপে প্রকাশ করেছেন তখন দেখা গেল তাতে সেই সব মানুষের নাম নেই। তার উপর আগেই সংগ্রহ করা এন আর সি-র  প্রতিলিপিতে  যার ক্রমিক নম্বর ছিল ৩৭৮, এখন প্রকাশ করা প্রতিলিপিতে তার ক্রমিক নম্বর হচ্ছে ১৭৮। মাঝের দুশো নম্বর গেল কৈ ? কতকগুলোর শুধু ক্রমিক নম্বর আছে , নাম নেই। নাম লেখার জায়গাতে লেখা আছে ‘ উইতে খেয়েছে’ ( ঊঁয়ে খালে)। বাবার নামের জায়গাতে ‘অজ্ঞাত’, ‘অমুক’, ‘অমুকের বাবা’ ইত্যাদি। কোনো ক্রমিক নম্বরের জায়গাতে আছে ‘বাচ্চা’ ( কেঁচুয়া)। পাইলট প্রকল্পের জায়গাতে যেসব মানুষের ১৯৫১র আগেই জন্ম হয়েছে  তাদের জন্মস্থানের জায়গাতে লেখা আছে ময়মন সিংহ, ঢাকা, পূর্ব বা পশ্চিম পাকিস্তান ইত্যাদি। অথচ তাদের জন্ম ভারতে প্রমাণ করবার জন্যে সমস্ত উপযুক্ত নথিপত্র তাদের হাতে  রয়েছে। পুরুষের স্বামীর নাম বলে পুরুষের নাম আর মহিলার স্বামীর নাম বলে মহিলার নাম লেখা হয়েছে। বাবার বয়স ১০, ছেলের বয়স ৫০, মায়ের বয়স নিজের পেটের ছেলের চে’ কম লেখা হয়েছে। একই ক্রমিক নম্বর চার পাঁচজন কিম্বা চার পাঁচ পরিবারের নামের আগে লেখা রয়েছে। বেশ কিছু মুসলমান গ্রামকে হিন্দু গ্রাম বলে দেখানো হয়েছে। মুসলমান পরিবার হয়েছেন হিন্দু পরিবার। বরপেটা রাজস্ব চক্রের ২৪টি গ্রামের এন আর সি, ১১ টি গ্রামের ১৯৬৬র এবং ১২টি গ্রামের ১৯৭১ সনের ভোটার তালিকা পাওয়াই যাচ্ছে না। এমন অবস্থাতে ফর্মের ১২ নং ঘরটি তারা পূরণ করবেন কী করে? শুধুমাত্র ঘিলাজারি আর হাউলি মৌজার ১,৭০০টি পরিবার মূদ্রিত এন আর সি এবং ভোটার তালিকার থেকে বাদ পড়েছে । তিনশ বছরের প্রাচীন অসমিয়া মুসলমান মানুষের গ্রাম ( খিলঞ্জিয়া মুসলমান)  ভেল্লা । সেই ভেল্লারও এন আর সি পাওয়া যায় না বলে সংবাদ পত্রে বেরিয়েছে। ডিসি বাহাদুর মৌন, গৃহ সচিব, মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল সব্বাই মৌন, সদুত্তর নেই।
ডাঃ ভূমিধর বর্মন ( অসম চুক্তি রূপায়ণ মন্ত্রী) বিধান সভাতে ঘোষণা করলেন –১৯৫১ সনের এন আর সি, ১৯৬৬-৭১ সনের ভোটার তালিকাতে নাম না থাকলেও ‘পুরোনো মাটির দলিল’ দেখিয়েও এন আর সি-তে নাম নথিভূক্ত করতে পারা যাবে। বিজ্ঞপ্তি জারি করাবার দাবি জানাবার বেলা নির্বিকার হয়ে রইলেন। অসম মন্ত্রীসভার মন্ত্রী, জেলা শাসক, সারা অসম ছাত্র সংস্থা ইত্যাদির মৌখিক প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্রীয় সরকারের জারি করা Citizenship (Registration of Citizens and Issue of National Identity Card ) Amendments Rules,2009 বিধি কিম্বা আইন আদালত কতটা গুরুত্ব দেবে তা জানবার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির দরকার পড়ে না।
                   ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়। মুসলমান মানুষ, কিছু সংগঠন, রাজনৈতিক দল এই সব অসুবিধেগুলো দূর করবার দাবি জানিয়ে নানা স্তরে আবেদন নিবেদন করতে শুরু করতেই এদেরকে শত্রু বলে ঠাউরে নিয়ে বিকারগ্রস্ত কিছু মানুষ আপত্তিকারীদের অসমের শত্রু, বাংলাদেশি           ( মিঞা)র দালাল বলে চেঁচামেচি শুরু করে দিল। আপত্তির যে কিছু নায্যতা থাকতে পারে তার আভাস নেবার জন্যেও কোনো দরকার বোধ করে নি তারা যারা নিজেদের অসমের সয়ম্ভূ অভিভাবক বলে দাবি করে।
                   ১৯৫১ সনে অসমে লোকগণনা আয়োগের মুখ্য কর্তাব্যক্তি  ছিলেন আর এস ভাগাইওয়ালা, আই এ এস। তাঁর প্রতিবেদনে জানা গেল নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তির ফলে যে ৬৮,৪৫১ জন মানুষ অসমে প্রত্যাবর্তন করেছেন তাঁদের নাম ইতিমধ্যে সমাপ্ত আর সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জিতে ওঠে নি। তারপর পাহাড়ি জেলাগুলো, ব্রহ্মপুত্রের চরগুলো, গোয়ালপাড়া আর কামরূপের একাংশ মুসলমানদের নাম এন আর সি-তে ওঠে নি। সেই মানুষগুলোর বেলা কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে  তার কোনো উত্তর নেই। এই সব মানুষেরা নিবন্ধনের জন্যে  ১২ নং ঘরে কী লিখবে? সবাই নিরুত্তর!
                       মাঝখানে একবার দেওরিকুছিম দত্তাকুছিম ধাকালিয়াপাড়াম যুগীরপাম, দাবালিয়াপাড়া ইত্যাদি কিছু গ্রামের এন আর সি আর ভোটার তালিকা পাওয়া না গেলে  এলাকার বিভিন্ন সংগঠন, রাজনৈতিক দলগুলো যখন প্রতিবাদী কর্মসূচী হাতে নিয়েছিল , তখন সঙ্গে সঙ্গেই বরপেটার জেলা নিবন্ধন আধিকারিক এই পাঁচাখানা গাঁয়ের আগের বিশুদ্ধ আর সম্পূর্ণ এন আর সি বের করে দিলেন। চিঠি নং BA-NRC/2/2010/50Dt.12.07.2010  । অথচ এটিই  আগে পাওয়া যায় নি বলে জানানো হয়েছিল। সেই সঙ্গে তিনি আগের কিছু নথিপত্র নষ্ট করে দেবারও নির্দেশ দিলেন। আগে কেন এগুলো পাওয়া যায় নি তার কোনো কারণ জানানো হলো না। সাধারণ মানুষ বাক হয়ে ঘটনাক্রম লক্ষ্য করলেন, তাদের  ষঢ়যন্তের সন্দেহ আরো দৃঢ় হলো।
                       নাগরিকত্ব দাবির জন্যে প্রতিশ্রুতি মতো বিকল্প নথির তালিকা নেই, এন আর সি নেই, ভোটার তালিকা নেই। তা হলে ১০ আগষ্টের ভেতরে আবেদনপত্র জমা দেন কী করে এই লোকগুলো?  জেলা নিবন্ধক সভা সমিতেতে বলে বেড়ান, “বিকল্প নথির তালিকার জন্যে যোগাযোগ করা হয়েছে। ভাবনার কিছু নেই। আপনারা দর্খাস্ত জমা দিন।”  লিখিত প্রতিশ্রুতি চাইলে তিনি চুপ মেরে যান। মানুষ মুখের কথাতে বিশ্বাস করেন না। মৌখিক কথাতে দর্খাস্ত দেয়ার মানেই হলো মরণ ফাঁদে পা দেয়া—মানুষের এই বিশ্বাসই আরো দৃঢ় হলো।
                        রাষ্ট্রীয় নাগরিকপঞ্জি উন্নীত করবার কাজে যে সব ভুল ত্রুটি দেখা দিয়েছে সেগুলো সংশোধন করবার জন্যে সে সংগঠন, দল বা ব্যক্তি দাবি জানালেন তাদের দমন করতে আখ্যা দেয়া হলো , ‘ বাংলাদেশির দালাল’, ‘অসম বিরোধী চক্র’ কিম্বা ‘অসমের শত্রু’। প্রতিবাদ করা চলবে না, যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবেই দর্খাস্ত জমা দিতে হবে । আধিকারিক, মন্ত্রী আর তাদের চেলাচামুণ্ডারা বলে বেড়াচ্ছে যে , ভাবনা কিসের? পুরোনো মাটির দলিল থাকলেই হলো ! কেল্লা ফতে! লিখিত নোটিস দিতে বলতেই সব্বাই চুপ। সেরকম আধিকারিদের সংখ্যালঘু মানুষের বিশ্বাস করা মানেই হলো মৃত্যুর সমনে সহি করা। এমনটি ভাবা যে ভুল ছিল না সেটি পরে প্রমাণিত হলো।
                     ২১ জুলাই তারিখে বরপেটাতে বেরুনো আমসুর প্রতিবাদি মিছিল এন আর সি উন্নীতকরণ বন্ধের  দাবিতে না সেইসব ভুলত্রুটিগুলো সংশোধনের দাবিতে ছিল সে কথা জানবার কারো কোনো গরজ দেখা গেল না।  চারজন প্রতিবাদীকে হত্যা এবং শতাধিক আহতের প্রতি নূন্যতম সমবেদনার গরজ নেই, তার বিপরীতে  প্রকৃত ঘটনাকে বিকৃত করে বিবৃতি দেয়া হলো আর তাতে  আক্রমণাত্মক ভাষার প্রোয়োগ করা হলো। ‘ ওরা বাংলাদেশি, কেন প্রতিবাদ করবে? এতো সাহস কোথায় পেল? কে উৎসাহিত করলে এদের?’ ইংগিতের আঙুল একবার দিসপুর আরেকবার হাতিগাঁওয়ের দিকে । হাতিগাঁওয়ের দিকে আঙুল দেখাবার অর্থ দুটো—এক হাতিগাঁও মানে জমিয়ত আর এ ইউ ডি এফ আরেকটি হাতিগাঁওয়ের ওপারে বাংলাদেশ। অতীতেত অসম আন্দোলনের সময়কার মানসিকতার পুনরাবৃত্তি ঘটল।
                    চারটা নিরীহ জীবন কেড়ে নেবার পর সরকার আপত্তির নায্যতা বুঝতে পেরে ভুল ত্রুটিগুলো সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছে, নাগরিকপঞ্জি উন্নয়নের কাজ সাময়িক ভাবে স্তগিত রেখেছে। কিছু লোকের তাতে বিলম্ব সহ্য হচ্ছে না। স্তগিতকরণ চলবে না! ভুল নেই! ভুলত্রুটির কথা যারা বলছে তারা বাংলাদেশের দালাল! বাংলাদেশির কাছে আত্মসমর্পণ চলবে না! এরকম দাবিতে আবারো ৮৩র সেই আহ্বান জানাতে চাইছে।
                      অসমের মানুষ এখন আবেগ সর্বস্ব না হয়ে যুক্তি তথ্য, তথ্য এবং অন্য পক্ষের আপত্তির কারণ জানবার জন্যেও আগ্রহী। এ একটি প্রশংসনীয় দিক বলে বিবেচিত হচ্ছে। ন্যায়-নিষ্ঠার ভিত্তিতে কোনো রাখঢাক না করে নাগরিকত্বের প্রমাণ দেবার সুবিধে দেয়া হোক। ন্যায়-নিষ্ঠার নীতিও এমনটি দাবি করে। সমাধান হোক –যাতে কোনো বিদেশির নাম অন্তর্ভূক্ত না হয় বা কোনো ভারতীয়ের নাম যেকোনো অজুহাতে কাটা না পড়ে সেটি দেখা উচিত। অসম এবং বৃহত্তর অসমিয়া জাতির স্বার্থে কথাগুলো সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করুক সবাই। আবেগের বদলে যুক্তিতে এগিয়ে যাক। যেভাবে তিরাশির আগুন মাড়িয়ে পার করে চলে এলাম , সেভাবেই সন্দেহ-শংকার এই দুর্ভাবনার থেকেও আমরা বেরিয়ে আসতে পারব। আঁধারের পর আলো আসবেই আসবে।
* মূল লেখাটি বেরিয়েছিল জনপ্রিয় অসমিয়া দৈনিক আমার অসমের ১০ আগষ্ট, ২০১০ সংখ্যাতে( পৃঃ৫)। লেখক অসমের নগাঁও জেলার  ধিং কলেজের অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপক।  ফোনঃ ৯৮৩৫৩-৬০৬৯৬
 
Enhanced by Zemanta

Sunday, 22 August 2010

বারাক ওবামার ধর্ম আর রক্ত-তেল চোরা সাদা সাহেবদের কেয়ামতের দিন


               মেরিকার আকাশ বাতাস এখন একটি মসজিদ নির্মাণের প্রশ্নে সরগরম। ঠিক মসজিদ নয়, ১১সেপ্টেম্বর, ২০০১এ ধ্বংশ প্রাপ্ত বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের নিচের তলার সামান্য কাছেই একটি ইসলামি কেন্দ্রের  নির্মাণের প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতি ওবামা সমর্থণ জানিয়েছিলেন। যে কেন্দ্রে একটি মসজিদও থাকবে।  তাঁর বক্তব্য ছিল, এই দেশে মুসলমানদের অন্য সবার মতোই ধর্ম চর্চার সমান অধিকার রয়েছে। ব্যস! তাতেই চটে লাল আমেরিকা! এতো ভালো কথা সহ্য করতে তারা আর প্রস্তুত নয়। পরে তাঁকে একটু পিছিয়ে এসে বলতে হয়েছে, যারা সেই কেন্দ্র গড়তে চাইছেন তাদের উৎসাহিত করতে তিনি কিছু বলেন নি। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ন্যান্সি পেলসি বলেছেন, সংবিধান সব ধর্মের সমান অধিকার দিয়েছে বটে, কিন্তু একটি ধর্ম কেন্দ্র হবেটা কোথায় সেটি হবে একেবারেই স্থানীয় সিদ্ধান্ত।    প্রতিপক্ষ রিপাব্লিকানেরাও দ্বিচারিতার নিদর্শন রেখে মুসলমানেদের অধিকারকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না। বরং উলটে ওবামাকেই ঝেড়ে কাশতে অনুরোধ করছে যাতে তাঁকে চেপে ধরতে সুবিধে হয়। রিপাব্লিকানদের হয়ে সবচে বেশি গলা উঁচু সেই মহিলা সারা পলিন্সের যিনি গেল নির্বাচনে উপরাষ্ট্রপতি পদে দাঁড়িয়ে উল্টপাল্টা মন্তব্য করে প্রচুর লোক হাসিয়েছেন, এবং এখন দুর্নীতির অভিযোগে হালে পানি পাচ্ছেন না। ইদানিং তিনি খুব ধর্মবাতিকগ্রস্থ হয়েছেন।
         যারা এই ইসলামি কেন্দ্রটি গড়তে চাইছে তারা যে খুব ইসলামের বিজয় রথ ছোটাবার বাসনাতে কাজটি করছে তা কিন্তু নয়। তারা হচ্ছেন আমেরিকার সেই মুসলমান যারা  লাদেনের পাপকে ধুয়ে দেবার জন্যে মাঠে নেমেছেন। ইসলামে দানবীয়করণের বিরুদ্ধে গোটা বিশ্বকে একটা বার্তা দেয়াই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। আর তাদের সঙ্গে যে শুধু মুসলমানেরাই রয়েছেন তাই নয়, রয়েছেন প্রচুর খৃষ্টান, এমনকি অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে তাদের সঙ্গে প্রচুর ইহুদীও রয়েছেন। যে সংগঠনটি এই ইসলামি কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল তাদের নাম ‘কোরডোবা ইনিসিয়েটিভ’ (Cordoba initiative)। কোরডবা হচ্ছে স্পেনের এক বিখ্যাত প্রাচীন প্রাক-ধর্মযুদ্ধ  ইসলামি তীর্থক্ষেত্রে নাম। যায়গাটি তখন ইহুদি, খৃষ্টান , ইসলাম সহ নানা ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের জন্যে বিখ্যাত ছিল। সেখানে যে বিখ্যাত মসজিদটি ছিল ধর্মযুদ্ধের পরে সেটি এক খৃষ্টান চার্চে পরিণত হয়। আমরা সবাই জানি ধর্মযুদ্ধ খৃষ্টান চার্চগুলোর ধর্মীয় সহিষ্ণুতার সবচে’ কুখ্যাত নজির। সেই যুদ্ধ কেবল আরব উত্থানের পতন ঘটায় নি, গোটা ইউরোপকেও ঘনঅন্ধকারে ছেয়ে ফেলে। যাকে আমরা জেনে না জেনে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলে চিহ্নিত করে থাকি। প্রায়শঃ এই পদগুচ্ছ অকারণে  ভারতের ইতিহাসেও প্রয়োগ করি। এহেন এক উদ্যোগকে যারা বাধা দিচ্ছেন আর ভাবছেন তাদেরকে  ধর্মকেন্দ্র গড়তে দিলে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে নিহতদের অপমান করা হবে, তারা যে লাদেনবাহিনীর চে’ ভালো মানুষের দল নন, সেটি বুঝতে বুদ্ধি খাটাবার প্রয়োজন পড়ে না। বুদ্ধিমান অনেকেতো এও বলছেন ‘কোরডবাকে’ ধর্মকেন্দ্র গড়তে দিলে লাদেন সেটিকেও উড়িয়ে দেবেন। কিন্তু আপাতত লাদেনের খৃষ্টান প্রতিপক্ষরাই এর পথ আটকে তার কাজ কমিয়ে দিচ্ছেন । অথচ যে নিউইয়র্কে কেন্দ্রটি হবে, সেখানে প্রায় পাঁচ লক্ষ মুসলমান রয়েছেন আর রয়েছে অজস্র মসজিদ। তাতে এই আরেকটা যোগ হবে মাত্র। কিন্তু এক নতুন বার্তা নিয়ে। সেটি যারা হতে দিচ্ছেন না তারা স্পষ্টতই চাইছেন না ইসলাম তার পুরোনো গৌরবময় পরিচয় ফিরে পাক। পেলে যে মধ্য এশিয়াতে মার্কিনি তেলচোরাদের আসন্ন বিপদ!      
                ইতিমধ্যে নানা কারণে ওবামার  জনপ্রিয়তাতে ভাটা পড়েছে । সামনেই , নভেম্বরে সিনেটের কিছু আসনে মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে। তার আগে সে জনপ্রিয়তাতে আর ভাটা পড়ুক সেটি তিনি বা দল চাইছেন না। কিন্তু সম্ভবত আঁচড় যা পড়বার তা পড়ে গেছে। আমেরিকা জুড়ে ইসলাম বিরোধী প্রচার কিছু তো বেড়েইছে, সেই সঙ্গে এই বিশ্বাসও বেড়েছে যে ওবামা আসলে অন্তর থেকে একজন মুসলমানই।
জাতি রাষ্ট্র, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে পশ্চিমী দেশগুলোর সাধারণত অহংকারে মাটিতে পা পড়েনা। ওদের থেকে পাঠ নিয়ে আমাদের দেশেও অনেকে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার পাঠ নিতে বলেন। তার মধ্য , কিছু আগ মার্কা বামপন্থীও রয়েছেন। কিন্তু , আমেরিকার ঘটনাক্রম দেখে মনে হচ্ছে না কি যে ওরা আমাদের থেকে আর যাই হোক এ ব্যাপারে মোটেও বেশি সভ্য নয়! কল্পনা করুন যে মুম্বাইর হোটেল তাজের কাছে এক মসজিদ তৈরির  কথা বললেন, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আব্দুল কালাম , কিম্বা কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধি। কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, শিবসেনা, ভাজপারা কী বলতে পারে আমরা সহজেই  আঁচ করতে পারি।  আব্দুল কালামকে পাকিস্তান আর সোনিয়া গান্ধিকে ইতালি পাঠাবার ব্যবস্থা করে দিলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না! দু’জনকেই তার পরে  সিদ্ধি বিনায়কের মন্দিরে গিয়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করে আসতে হতো। আমেরিকার রাষ্ট্রপতিকেও ঠিক তেমনটাই করতে হয়েছে!
           ইতিমধ্যে সরকারীভাবে ঘোষণা দিয়ে জানাতে হয়েছে যে রাষ্ট্রপতি ওবামা একজন নিষ্ঠাবান খৃষ্টান এবং রোজ প্রার্থণা করেন। ধর্মীয় উপদেষ্টার পরামর্শ না নিয়ে তিনি দিনের কোনো কাজই করেন না। তার জন্যে কেউ তাঁকে ধর্মান্ধ বা মৌলবাদি বলছে না!  তাঁর বাবা মুসলমান ছিলেন, তিনিও মুসলমান হতেই পারেন। এই সরল  কিম্বা জটিল বিশ্বাস থেকেও এই ক’দিন আগও কিছু মানুষ তাঁকে মুসলমান বলে ভাবতেন। সম্প্রতি নানা কারণে এমন বিশ্বাস করবার লোক বেড়ে গেছিল।  ওই মন্তব্যের দিন কতক আগেই পিউ গবেষণা কেন্দ্র বলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা দেখিয়েছিল ওবামাকে মুসলমান বলে মনে করবার মত লোক ১১% থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ শতাংশ । প্রতি পাঁচজন মার্কিনিদের মধ্যে একজন ভাবছেন ওবামা একজন মুসলমান । ঐ মন্তব্যের পর আগষ্টের মাঝামাঝি টাইমস মেগাজিন আরেকটি সমীক্ষা চালায়। তাতে সেই পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ২৪ শতাংশ। তারা ভাবছেন ওবামা একজন মুসলমান তাই ওমন কথা বলেছেন। তিনি যে  একজন সৎ মানবতাবাদির অবস্থান থেকে কথাটা বলতে পারেন এই সহজ সত্য ওদের সাদা চামড়াতে ঢাকা উন্নত মস্তকে কিছুতেই ঢুকতে চাইছে না । ৪৭ শতাংশ লোক অবশ্যি সেরকম ভাবছেন না, কিন্তু তাতে ওবামা আশ্বস্ত  হলেও আমাদের হবার কোনো কারণ নেই। কারণ তাঁরা এই ভেবে তুষ্ট যে তিনি একজন নিষ্ঠাবান খৃষ্টান। মাত্র ২৪ শতাংশ এ নিয়ে কোনো মত জানান নি।
                 ওই যারা মত দেননি তাদের সংখ্যার থেকে অল্প কিছু বেশি লোক বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের সামনে ইস্লামিক কেন্দ্রটি গড়বার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের সংখ্যা ২৬ শতাংশ।  তাদের কেউ কেউ সেই অধিকারের পক্ষে লড়াই চালাবার সাহসও গুটিয়ে নিয়েছেন। এবং বাণিজ্য কেন্দ্রের সামনে গিয়ে ধর্ণাও দিচ্ছেন। এর মধ্য অভিশপ্ত সেপ্তেম্বরে নিহত আহতদের পরিবারের অনেকেও রয়েছেন, যারা মনে করেন ঘৃণা কখনো ঘৃণার নিদান হতে পারে না। তাদের সংগঠনটির নাম “September 11th Families for Peaceful Tomorrows” । তারা এও এই বলে সভ্যতার চরম নিদর্শন উপস্থিত করছেন, “What better place for healing, reconciliation and understanding than Ground Zero? We honor our family members by practicing American principles and moving forward from Ground Zero to a future of peaceful coexist”
                পিউ গবেষণা কেন্দ্রটি যে সমীক্ষা চালিয়েছিল তাতে মার্কিনি রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে কিছু মজার তথ্য বেরিয়ে এসছে। বিতর্কিত মন্তব্যটি করাবার আগেই যে কিছু লোক ওবামাকে মুসলমান বলে ঠাউরেছিল তার কারণটি কিন্তু আর কিছু নয়, তিনি তার আগেকার রাষ্ট্রপতিদের থেকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে কম হাজিরা দিচ্ছেন। এর মানে, এখনো সে দেশে এক রাষ্ট্রপতির কাছে ধর্মের, তাও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের, থেকে দূরে সরে থাকাটা ভারতীয় উপমহাদেশগুলোর যেকোনো  দেশের মতোই খুব একটা নিরাপদ নয়। এখনো ৪৮ শতাংশ মার্কিনি  লোক মনে করেন রাষ্ট্রকে ধর্মের থেকে দূরে সরে থাকা উচিত নয়। এই সংখ্যাটা  ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ এর আগের দশক থেকে সামান্য কমেছে মাত্র!
                অনেক ভারতীয় কালো সাহেবেরাও মসজিদ নির্মাণ নিয়ে করা ওবামার মন্তব্যকে ভালো চোখে দেখেন নি। তাঁরাও ইসলামী আতঙ্ককে বিশ্বের সবচে বড় বিপদ হিসেবে দেখেন, এবং কোনো মুসলমান ধর্ম কেন্দ্রকে বিশ্বাস করতে পারেন না। আজকাল যে আমেরিকা আর ইউরোপের দেশে দেশে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচার ও ব্যবস্থা নেবার প্রবণতা বেড়েছে তাতে তাঁরা খুব হ্লাদিত। তাঁদের ধারণা, এর ফলে পৃথিবী ইসলামী সন্ত্রাসবাদ নামের ‘দানবীয়’ বিপদ থেকে মুক্ত হবে। তাঁদের সাহেব প্রীতিতে অন্ধচোখ দেখেও না যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাতে কিছু মৌলবাদি যদি তিন হাজার লোককে মেরেছিল, যারা মৌলবাদি নয় বলে বড়াই করে সেই সাহেবদের, পশ্চিমী দেশগুলো সেই বাহানা নিয়ে আফগানিস্তান নামের দেশটির  ভেতরে ঢুকে আজ প্রায় একটি দশক জুড়ে ঘাটি গেড়ে বসে মেরেছে তার থেকে বহুগুণ বেশি সাধারণ নিরীহ মানুষ । বছরে সেই সংখ্যা হাজার ছাড়ায়। তারা জোর করে বা ভয় দেখিয়ে সামরিক ঘাটি করে বসে আছে  মধ্য এশিয়ার প্রায় সমস্ত দেশে। কোনো এক সুদূর আশির দশকের শুরুতে পৌনে দু’শো কুর্দ নাগরিককে মারবার অপরাধে যারা সাদ্দামকে বিচারের প্রহশনে বসিয়ে মেরে ফেললে, তারা এই সাত বছরে মেরেছে ১ লক্ষ ৬১ হাজারেরো বেশি ইরাকি মানুষ। সাদা কিম্বা কালো কোন সাহেবদের চোখেই এই মৃত্যু কোনো আতঙ্কের ব্যাপারই নয়! মধ্য এশিয়ার  দেশগুলোর দখলদারি নিয়ে মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যেও মারামারি করে ওই সাহেবেরা। কারণতো একটাই মাটির তলার তেল সাবাড় করো আর যুদ্ধের বাজার ছড়িয়ে চলো।
              ফ্লরিডার ডোভ ওয়ার্ল্ড আউটরিচ সেন্টার বলে এক খৃষ্টীয় চার্চ আগামী ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে ওই বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের সামনে কোরান পোড়াবে বলে হুমকি দিয়ে রেখেছে। তারা সেই দিনটির নাম দিয়েছে ‘কোরান পোড়ানোর দিন’।  কার্ল মার্ক্সের মতো নিন্দিত নাস্তিক জানতেন যে যিশু খৃষ্টের মতো কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন না। তারপরেও ওই কাল্পনিক ভদ্রলোকটির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার অন্ত ছিলনা। এই তথ্য বহু মার্ক্স বিরোধীতায় অন্ধদের কিম্বা অন্ধ মার্ক্সবাদি নাস্তিকদের জানা নেই। তাঁর মতে খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতক অব্দি খৃষ্ট ধর্মই ছিল রোমান সভ্যতার সমাজবাদ! সেই খৃষ্ট ধর্মের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবার মতো লোক সংখ্যাতে নগন্য হলেও অভাব নেই। The Christian Science Monitor বলে একটি বৈদ্যুতিন কাগজে ডান মারফি  লিখেছেনঃ   The increasingly acrimonious debate over the construction of the so-called Ground Zero mosque in Manhattan, about two blocks away from the World Trade Center towers that were destroyed by Al Qaeda on Sept. 11, 2001, echoes similar debates in Europe and could, if the rhetoric becomes commonplace, have broad and negative ramifications for the integration of America's growing Muslim population ।
              এই সহজ বুদ্ধির লোকের সংখ্যা কমে গেছে আজকের মার্কিনি সাম্রাজ্যবাদিদের শাসিত এবং অনুগত বিশ্বে। বিপদ এইখানেই মারাত্মক। ওবামা এই সহজ বুদ্ধির থেকেই কথাগুলো বলেছিলেন। কিন্তু, তিনিও এই ব্যবস্থার দাস, তাই তাঁকে আপাতত পেছনে হাঁটতেই হলো। কিন্তু তর্কের যে ঢেঊ উঠল তা, ধর্ম এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে গোটা পৃথিবীকে আরো একবার কাঁপাবে। আমাদের দেশের ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে যারা বেশ গৌরবান্বিত, তাদের কথা নাহয় বাদই দিলাম, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গিয়ে যারা ইঊরোপের জাতিরাষ্ট্রগুলোর নজির দিয়ে ভাষা নির্ভর জাতীয়তাবাদের পক্ষে ওকালতি করেন, তাঁরাও তাঁদের তত্বর বিশুদ্ধতা আর  ফাঁকির যায়গাগুলো নিয়ে আরেকবার ভাবতে শুরু করলে আমরা ভবিষ্যত নিয়ে আশান্বিত হতে পারি। 
                                   
আপাতত নইলে কোরান পোড়াবার দিন পালিত হোক। ওদের ক্ষমতা আছে পালন করবে, কে ঠেকাবে!  কিন্তু সেদিন আসবে খুব শীঘ্রই, যেদিন ঐ  তেল আর রক্তচোরা সাদা সাহেবদের কেয়ামতের দিন  পালিত হবে গোটা বিশ্বে, মায় আমেরিকাতেও!  সেই অপেক্ষাতে আমাদের কাটবে আরো কিছু দিন, হয়তো কয়েকটি বছর কিম্বা দশক। কিন্তু আসবে , সে নিশ্চিত !

Friday, 13 August 2010

Fidel Sangma's Facebook notes

Fidel Sangma's Facebook notes

Tuesday, 10 August 2010

নবজাতকের কাছে এখনো অম্লান থাকুক, থাকবে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার


          (জন্মদিনে সুকান্ত স্মরণে তিনসুকিয়ার ইউ সই টিভি চ্যানেলের জন্যে প্রস্তুত বক্ততা) 
        

এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান:
                 ই গেল সপ্তাহে অসমের প্রায় সমস্ত কাগজে গুয়াহাটি শহরের একটি সংবাদ ছিল এরকম। মরিয়ম বেগম বলে এক শ্রমিক পত্নী সন্তান প্রসব সম্ভাবনা নিয়েই বাসে চেপে মফসসলের বাড়ি থেকে গুয়াহাটিতে স্বামীর কাছে আসছিলেন। বাসের ভেতরেই প্রসব বেদনা শুরু হওয়াতে বাসটি তাকে গুয়াহাটি কমার্স কলেজের সামনে নামিয়ে রেখে চলে যায়। সভ্রান্ত-শিক্ষিত মানুষের ভীড়ে সেই মহিলার একটুকুও স্বচ্ছন্দ আশ্রয় মেলেনি। সেই পথের ‘পরেই পথচলতি কিছু মানুষ একটু আড়াল তৈরি করে দেন। সেখানেই ভদ্রমহিলা দুটি যমজ সন্তানের জন্ম দেন। পরে অবশ্যি খবর দিলে ‘মৃত্যুঞ্জয়’ এসে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই প্রতিকূল পরিবেশে জন্ম নিতে গিয়ে একটি সন্তান জন্মেই আহত হয়। এবং পরে মারা যায়। স্বাধীনতার ছ’টি দশক অতিক্রান্ত করেও যখন এমন ঘটনা আমাদের সমাজে আকছার ঘটে  তখন কি মনে হয় না সুকান্তের সেই অঙ্গীকার এখনো কেমন জ্বলজ্যান্ত ভাবে প্রাসঙ্গিক। মনে পড়ে?
                   যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে
                  তার মুখে খবর পেলুমঃ
                   সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
                   নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার
                  জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।
                 খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত
                 উত্তোলিত, উদ্ভাসিত
                 কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।

তাঁর সেই বিখ্যাত কবিতা ‘ছাড়পত্রে’ সুকান্ত লিখছেনঃ
                 এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
                 জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে
                 চলে যেতে হবে আমাদের।
                 চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
                 প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
                এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি
                নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

হে সাথী, আজকে স্বপ্নের দিন গোনাঃ
                সুকান্ত লিখেছিলেন ওই একই কবিতার শেষেঃ
                 অবশেষে সব কাজ সেরে
                আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
                করে যাব আশীর্বাদ,
                 তারপর হব ইতিহাস।।

            সশরীরে এই কবি আজ আর নেই আমাদের কাছে। এমন কি ৪৭এর ১৫ আগষ্ট যেটুকু স্বাধীনতা আমাদের জুটেছে তার ক’মাস আগেই তাঁকে চলে যেতে হয়েছে। কিন্তু তিনি, তাঁর কবিতা এখনো বর্তমান। ইতিহাসের সামগ্রী হতে তাঁর এখনো অনেক বাকি মনে হয় না কি?
    আমাদের স্বাধীনতার বছরটির সঙ্গে এই কবির জন্ম মৃত্যু দিনটির এক আশ্চর্য সংযোগ রয়েছে। ১৫ আগষ্ট তাঁর জন্ম দিন। বছর ১৯২৬। ১৯৪৭ তাঁর মৃত্যুর বছর। রবীন্দ্র জন্ম জয়ন্তীর মাত্র ক’দিন পর ১৩মে। এই বিশ বছর ন’মাস দিনেই তিনি ছাড়পত্র ( ১৩৫৭), ঘুমনেই ( ১৩৫৭), পূর্বাভাস (১৩৫৭), মিঠেকড়া ( ১৩৫৮), অভিযান (১৩৬০), হরতাল    ( ১৩৬৯), গীতিগুচ্ছ ( ১৩৭২), কবিতালিপি ( ১৯৮৩) ইত্যাদি আটটিরও বেশি গ্রন্থে ছড়ানো ছিটানো গান,কবিতা, গল্প,নাটক, প্রবন্ধের রচয়িতা। পথে পথে মিছিলে মিছিলে শোনা যাচ্ছে তাঁর অঙ্গীকার ,
                  এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি
                  নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

কিম্বা ,
                 বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত,
                বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।

            তের চৌদ্দ বছরের কবির কবিতা পড়ে মুগ্ধ তাঁর চেয়ে বয়সে বড় ‘পদাতিকে’র কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর বন্ধু হয়ে যাচ্ছেন। পরে তিনিই তাঁর বেশির ভাগ গ্রন্থের সম্পাদনা করছেন ও ভূমিকা লিখছেন। ‘পরিচয়’, ‘কবিতা’র মতো সেকালের সেরা কবিতা পত্রিকাতে তাঁর কবিতা বেরুচ্ছে।
            সারা বাংলা কিশোর বাহিনীর তিনি উদ্যোক্তা ও নেতা। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের বীরেরা জেলথেকে ছাড়া পেয়েই  কলকাতার যক্ষা হাসপাতালে আসছেন কবির সঙ্গে দেখা করতে আর তাঁকে অভিনন্দন জানাতে। তাদেরই কেউ তাঁকে জানাচ্ছেন তখনই এই বিশবছরের কবির জীবনী বেরুতে যাচ্ছে আমেরিকা আর ফ্রান্সে! এই সম্মান তাঁর জুটছে কেবল কবি হবার জন্যে নয়। কেবলি কাগজে লিখে  ‘অঙ্গীকার’ জানাবার লোকতো তিনি ছিলেন না। ছিলেন একাধারে বিপ্লবী ও স্বাধীনতার আপোসহীন সংগ্রামী। কমুনিষ্ট পার্টির সারাক্ষণের কর্মী। সেই কাজে নিজের শরীরের উপর  যে অত্যাচারটুকু তিনি করলেন তাতেই না তাঁর শরীরে প্রথম ম্যালেরিয়া ও পরে যক্ষা বাসা বাঁধে এবং অকালেই তাঁর প্রাণটি কেড়ে নেয়।
     তাঁর রচনার সংখ্যা এমনিতে খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু যদি তাঁর বয়সটির কথা মনে রাখি, তবে সেই সংখ্যা অবিশ্বাস্য। তাঁকে আমরা কবি হিসেবেই জানি। কিশোর কবি। কিন্তু যেমন রবীন্দ্রনাথ কেবল কবি ছিলেন না । সুকান্তও ঐ বয়সেই লিখেছিলেন কবিতা ছাড়াও, গান, গল্প, নাটক এবং প্রবন্ধ। তাঁর ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ প্রবন্ধটি পাঠেই বেশ বোঝা যায় ঐ বয়সেই তিনি  বাংলা ছন্দের প্রায়োগিক দিকটিই শুধু আয়ত্বে আনেন নি, সে নিয়ে ভালো তাত্বিক দক্ষতাও অর্জন করেছিলেন। অথচ ১৯৪৫এ প্রবেশিকা পরীক্ষাতে তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন। স্কুলের ছাত্র হিসেবে ভালো মার্ক্স পাওয়া মেধাবী ছাত্র হবার নজির তাঁর নেই তেমন। ভারত ছাড়ো আন্দোলন ঝিমিয়ে গেলে আবার স্কুলে যেতে হচ্ছে বলে তিনি বেশ হতাশই হয়েছিলেন।
নিবারণ ভট্টাচার্য ও সুনীতি দেবী্র এই ক্ষণজন্মা সন্তান সুকান্ত জন্মেছিলেন এক মধ্যবিত্ত পরিবারে।  তাঁর বাবা জ্যাঠাদের পূব বাংলার ফরিদপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে কলকাতা এসে বহু সংঘাত সংঘর্ষের মধ্যি দিয়ে  থিতু হতে হয়েছিল। একান্নবর্তী পরিবারটিকে ধরে রেখেছিলেন তাঁরা।
তাঁদের বাড়িতে সাহিত্যের এক ভাল পরিবেশ ছিল। মনীন্দ্রলাল বসুর ‘রমলা’উপন্যাসের নায়ক সুকান্তের নামেই আদরের ভাইটির নাম রেখেছিলেন জ্যাঠতুতু দিদি রানি। রানিদিদির উৎসাহেই লেখালেখিতে সুকান্তের হাতে খড়ি। মনীন্দ্র বসুর উপন্যাসের সুকান্তকেও অকালেই যক্ষা রোগে চলে যেতে হয়েছিল। কবি সুকান্তেরও সেই একই গতি হবে রানিদি নিশ্চয়ই স্বপ্নেও ভাবেন নি। এই সংযোগ দেখতে পাবার বহু আগেই সেই রানিদির হঠাৎ মৃত্যু হয়েছিল। সুকান্তের বয়স তখন মাত্র সাত বা আট। তার পরেই বাবা জ্যাঠাদের পরিবার আলাদা হয়ে যায়।
    সেই আট ন’ বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন।  স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ একটি ছোট্ট হাসির গল্প লিখে আত্মপ্রকাশ করেন। তার দিনকতক পরে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে প্রথম ছাপার মুখ দেখে তাঁর লেখা বিবেকান্দের জীবনী।  মাত্র এগার বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতি নাট্য রচনা করেন। এটি পরে তাঁর ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয়। বলে রাখা ভালো, পাঠশালাতে পড়বার কালেই ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত। সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন যখন তখন বাল্য বন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন। অরুণাচল তাঁর আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন।
 ১৯৪১ পর্যন্ত এসে কলকাতা রেডিওর গল্পদাদুর আসরের নিয়মিত যোগদাতা ছিলেন সুকান্ত। সেখানে প্রথমে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেই আসরেই নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। গল্পদাদুর আসরের জন্য সেই বয়সেই তাঁর লেখা গান মনোনীত হয়েছিল আর সুর দিয়ে গেয়েছিলেন আর কেউ নন সেকালের অন্যতম সেরা গায়ক পঙ্কজ মল্লিক। স্কুলের লেখাপড়াতে খুব ভালো ছিলেন সে খবর তেমন মেলেনা। কিন্তু তাঁর প্রতিভা যে ছিল প্রশ্নাতীত তা এই সব সম্মান আর স্বীকৃতিতেই প্রমাণ মেলে। 

আমার ঠিকানা খোঁজ করো শুধু   সূর্যোদয়ের পথেঃ
 

              দাদা সুশীল ভট্টাচার্যের বন্ধু বারীন্দ্রনাথ ঘোষের সংস্পর্শে এসে সুকান্ত সাম্যবাদী চেতনাতে উব্দুদ্ধ হন এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তিনিতো আর শুধু স্বাধীনতার স্বপ্নই দেখতেন না। তিনি যে ‘নতুন চিঠি আসন্ন যুগের’ পেয়েছিলেন সে ছিল সাম্যবাদের। তিনি যখন পার্টিতে যোগ দেন তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। বিয়াল্লিশের 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের দামামা বাজছে। আর ওদিকে বাংলার ভয়ঙ্কর পঞ্চাশের মন্বন্তর। নিজের শেষ জীবনের সেরা রচনাটি  ‘সভ্যতার সংকট’ লিখে রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হয়েছেন। সব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের উপর সমস্ত বিশ্বাস হারিয়েও লিখে গেছেন , 'মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।’ লিখে গেছেন ‘জন্মদিনে’ কবিতায় তাঁর উইল পত্র ঃ
                    ‘আমার কবিতা , জানি আমি ,
                    গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী ।
                    কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন ,
                    কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন ,
                    যে আছে মাটির কাছাকাছি ,
                   সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।"
         বলা হয়ে থাকে সুকান্ত সেই কবি। এ একটু বাড়াবাড়ি। কেননা এ কবিতা রবীন্দ্রনাথের বিনয় মাত্র। তিনি নিজেই চিরদিন সেই জনটি ছিলেন , কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন ,/কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন’ ।  মনে পড়ে জীবনের প্রথম ভাগেই সেই চিত্রা কাব্যগ্রন্থের ‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতাতে  রবীন্দ্রনাথ আর একবার কোনো এক কবিকে সম্বোধন করে লিখছেনঃ
                        “কবি , তবে উঠে এসো — যদি থাকে প্রাণ
                       তবে তাই লহো সাথে , তবে তাই করো আজি দান ।
                       বড়ো দুঃখ , বড়ো ব্যথা — সম্মুখেতে কষ্টের সংসার
                      বড়োই দরিদ্র , শূন্য , বড়ো ক্ষুদ্র , বদ্ধ , অন্ধকার ।
                      অন্ন চাই , প্রাণ চাই , আলো চাই , চাই মুক্ত বায়ু ,
                      চাই বল , চাই স্বাস্থ্য , আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু ,
                      সাহসবিস্তৃত বক্ষপট । এ দৈন্যমাঝারে , কবি ,
                     একবার নিয়ে এসো স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি ।”
    সে ছিল রবীন্দ্রনাথের বাকি জীবনের কাজের ইস্তাহার। তার তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ‘শ্রীনিকেতন’। হ্যাঁ, সুকান্তদের মতো তিনি সরাসরি বিদ্রোহের পথে হাঁটেননি বটে। সম্ভবত তাই জীবনের শেষে ওমন আরেক কবির ‘বাণী-লাগি কান পেতে’ ছিলেন। কিন্তু সেরকম কবি তখন আরো অনেক ছিলেন।   একা সুকান্তকে সে দায় দিলে তাঁর গৌরব বাড়ে হয়তো, কিন্তু তাঁর সমকালের পরিবেশটিকে বোঝা যায় না। সুকান্তের বন্ধু , তাঁর বেশিরভাগ গ্রন্থের সম্পাদক ‘পদাতিকে’র লেখক সুভাষ মুখপাধ্যায়ের কথা ভুলা যাবে কী করে? যাঁর ‘পদাতিকে’র প্রথম কবিতার পংক্তিগুলোই ছিল এরকমঃ
                    “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
                    এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,
                   দুর্যোগে পথ হয় হোক দুর্বোধ্য
                   চিনে নেবে যৌবন আত্মা।“

কাস্তের কবি দিনেশ দাশকে ভুলি কী করে, যার সেই কবিতার পংক্তি এক সময় মুখে মুখে ফিরতঃ
                  নতুন চাঁদের বাঁকা ফালিটি
                 তুমি বুঝি খুব ভালবাসতে?
                 চাঁদের শতক আজ নহে তো
                এ-যুগের চাঁদ হ'লো কাস্তে!

         এমন তখন আরো অনেক ছিলেন।  অরুণ মিত্র, সরোজ দত্ত, বীরেন্দ্র চট্টপাধ্যায়, সমর সেন এমন আরো কত! ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা না হয় ভুলে থাকাই গেল, তখন সময়টাই এমন ছিল যে ‘পথের পাঁচালী’র আনন্দ যাত্রার পাঁচালীকার  আপাত উদাসীন লেখক  বিভূতি বন্ধোপাধ্যায়ের কন্ঠেও সেদিন শোনা গেছিল ‘অশনি সংকেত’। পঞ্চাশের আকালের উপর  লেখা উপন্যাস।  তখনকার বহু কবি লেখক  গোটা ভারতেই হয় সরাসরি কমিউনিষ্ট পার্টিতে নাম লিখিয়েছেন, না লেখালেও ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক শিল্পী সঙ্ঘে’ ছিলেন না এমন কবি লেখক শিল্পীদের নাম করা মুস্কিল! বুদ্ধদেব বসুর মতো ‘কবিতা’ নিবেদিত প্রাণও দূরে সরে থাকতে পারেন নি।
Add caption
From Sukanta Kar
তবে কিনা অন্যদের অনেকেই যখন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তখন কিছুটা সংশয়ী –সন্দিগ্ধ ছিলেন,অনেকেই তাঁকে বর্জন করছিলেন, সুকান্ত কিন্তু ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতাতে নির্বিরোধ উচ্চারণ করছেঃ
যদিও রক্তাক্ত দিন, তবু দৃপ্ত তোমার সৃষ্টিকে
এখনো প্রতিষ্ঠা করি আমার মনের দিকে দিকে।
                রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এতোটাই ছিল যে তিনি রীতিমত সাধনা করে নিজের হাতের লেখাকেও রবীন্দ্রনাথের মতো করে তুলেছিলেন। দু’জনের হাতের লেখা পান্ডুলিপি দেখলে চট করে অনেকে ধরতে পারবেননা কোনটা কার লেখা।
Add caption
From Sukanta Kar
              সুভাষ মুখপাধ্যায় লিখেছিলেন, তাঁরা কবিতা ছেড়ে পার্টিতে এসছিলেন , আর সুকান্ত এলেন কবিতা নিয়ে। এর অর্থ সুকান্ত যখন পার্টিতে যোগ দিলেন তখন পার্টি তার রাজনীতির প্রচারে শিল্প সাহিত্যেকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। এক দশক পরেই দেখা গেছে শিল্প সাহিত্যের জন্যে কাজটা খুব সুখকর হয় নি। কিন্তু , সুকান্তের কাছে পার্টির আর পাঁচটা কাজের থেকে কবিতা লেখা আলাদা কিছু ছিল না। দুটোই তিনি সমান নিষ্ঠার সঙ্গে করছিলেন। কবি লেখক হিসেবে সেই বয়সেই অপার সম্মানের অধিকারি হওয়া সত্বেও তাঁর স্বপ্ন ছিল বিপ্লবী কর্মীদের মধ্যে তাঁর কবিতা তথা অন্য লেখালেখি জনপ্রিয় হলেই তাঁর শ্রম স্বার্থক। নিজের লেখা লেখি নিয়ে তাঁর আর কোনো স্বপ্ন বা পরিকল্পনা ছিল বলে মনে হয় না। তাই নিজের লেখাকে তিনি মোটেও সযত্ন লালন করতেন না। টুকরো টাকরা ছেঁড়া কাগজে, সিগেরেটের প্যাকেটে এখানে ওখানে লিখে ফেলে রেখে দিতেন। তেমন কোনো খাতা তাঁর ছিল না। এবাড়িতে অবাড়িতে দেয়ালে দেয়ালে কয়লা পেন্সিলে লিখে বকা খাবার নজিরও তাঁর প্রচুর আছে। সেগুলোরই কিছূ  পরে বন্ধুদের আনুকুল্যে সংগৃহীত হয়ে ‘পূর্বাভাসে’ দেয়ালিকা নামে সংকলিত হয়েছিল। বন্ধুদের কেউ কেউ বিশেষ করে তাঁর আবাল্য বন্ধু অরুণাচল তাঁকে লেখাগুলো যত্ন করে খাতায় তুলে রাখতে বললে বলতেন, যখনই দরকার তখনই লেখার জন্যে তিনি নিজেই যখন রয়েছেন তবে আর যেগুলো সংরক্ষিত রাখবার দরকার কী? এ যেন ছাত্র রাজনীতির নেতার বক্তৃতা। বক্তব্য রাখবার জন্যে বক্তা স্বয়ং যখন রয়েইছেন তবে আর লিখে রাখবার দরকার কী!
               তাই বলে তাঁর লেখাগুলো হারিয়ে যায় নি। তাঁর বন্ধুরা  , অনুগতরা তাঁর সেই লেখালেখিগুলোর অনেকটাই সংগ্রহ করতে পেরেছেন। এবং সেগুলো ছেপে সংরক্ষিত করতে পেরেছেন। ভাগ্যিস, এখানে ওখানে প্রচুর প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর লেখা। পার্টির কাগজ ‘স্বাধীনতা’র কিশোর বিভাগ  তিনি নিজেই সম্পাদনা করতেন। আকালের দিনগুলোতে ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পিসঙ্ঘের পক্ষে আকাল (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। বাংলার কিশোর বাহিনী থেকে তাঁর ও অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্যের সম্পাদনাতে বেরিয়েছিল ‘অপরাজেয়’ , যেখানে তাঁর ‘অভিযান’ কাব্যনাট্যটি প্রকাশ পেয়েছিল। সেসব গ্রন্থও তাঁর লেখা সংগ্রহে সাহায্য করেছিল অনেক। এমনিতে নিজের জীবিতাবস্থাতে তিনি নিজের কোনো কাব্য বা গদ্য গ্রন্থের প্রকাশিত সংকলন দেখে যেতে পারেন নি। তিনি যখন রোগ শয্যাতে তখন ‘ছাড়পত্র’ প্রকাশের উদ্যোগ চলছে। বন্ধু অরুণাচল তাঁকে কিছু ছাপা পৃষ্ঠা দেখিয়েছিলেন মাত্র। একে একে তাঁরাই তাঁর সব লেখা উদ্ধার করে গ্রন্থবদ্ধ করেন। এ পর্যন্ত দু’ই বাংলা থেকেই তাঁর অজস্র রচনা সংকলন বেরিয়েছে।
              তাঁর জনপ্রিয়তা এমনই যে আজো বাংলা কিম্বা বাঙালি প্রধান এলাকার যেকোনো গণআন্দোলনে তাঁর কবিতার থেকে পংক্তি বাছাই করে দেয়াল লিখতে কিম্বা শ্লোগান দিতে শোনা যায়। ইতিহাসের কী পরিহাস তাঁরই ভ্রাতুষ্পুত্র বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যখন পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তখন সেখানে সংঘটিত হচ্ছে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম আর লালগড় ! আর আজকের কবির কন্ঠে উচ্চারিত হচ্ছেঃ
                      হে কবি সুকান্ত!

                     তুমি কি জানতে যে
                     তোমাদেরই বংশে আসবে
                    এই বাংলার ধ্বংসকর্তা?

                    তুমি কি জানতে যে
                   তোমাদেরই বংশে আসবে সে
                   যে "গরীব মানুষকে চাপা দিয়ে
                   বড়লোকের মোটরগাড়ী" বানাবার
                   সব আয়োজন পাকা করবে?

              কিন্তু এও ঠিক যে, স্কুল পাঠ্য বইতে এখনো সংকলয়িতারা তাঁর কবিতাকে বাদ দিতে না পারলেও উঁচু ক্লাসের সাহিত্যের ইতিহাস লেখকেরা বা তাত্বিকেরা তাঁর কবিতার জন্যে বেশি পৃষ্ঠা বরাদ্দ করেন নি। বাংলা কবিতার ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের পর কে ----এই প্রশ্ন এলেই নির্দ্বিধায় তাঁরা আজ জীবনানন্দের নাম নিয়ে থাকেন । আর কারো কারো নাম যোগ দিতে হলে সেখানে বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু , সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তীর নাম চলে আসে, সুকান্তের আসে না। এমন তাত্বিকতা যে পক্ষপাত মুক্ত তা বলা যাবে না। কেন না, সমর  সেন , সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো পরিণত কবির নাম না নেয়াটাও আমাদের কৌতুহলী করে। তাই বলে সুকান্তকে বিনা প্রশ্নে কবি হিসেবে গ্রহণ করাটাও হবে আরেক ধরণের পক্ষপাত। এটি ঘটনা যে সুকান্ত চর্চা আজকাল কমেছে। গণআন্দোলন বিহীন পরিবেশে তাঁর কবিতা তেমন পাঠক টানে না। তাঁর, কিম্বা নজরুলের কিম্বা বীরেন্দ্র চট্টপাধ্যাদের  কবিতার আবেদনের স্থান কালের পরিসর স্বল্প। বিদ্রোহী –বিপ্লবী কবি হিসেবে তাঁরা নিজেদের পরিচয় গড়েছেন। সে তাঁরা ছিলেন আছেন এবং থাকবেন। কিন্তু বিশুদ্ধ সাহিত্যিক বা কবি হিসেবে কোনো প্রতিষ্ঠা তাঁরা আকাঙ্খাও করেন নি, নেইও। নজরুলত লিখেইছেনঃ
             বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
             অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!
             সুকান্তও কি ওই কথাই বলতে চাননি যখন লেখেনঃ
             প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা–
             কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
             ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়ঃ
             পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্‌সানো রুটি।।
    সুকান্তের বেলা বয়স একটা সীমা বেঁধে দিয়েছিল। নজরুলের বেলাও কথাটা সত্যি। কেননা বেশিদিন নজরুলও সুস্থ শরীরে লিখে যেতে পারেন নি। কিন্তু তাঁদের গানগুলো দেখায় কোথাও তাঁরা দিক বদল করওছিলেন। রূপ রঙের বৈচিত্র নিয়ে  শিল্পী হিসেবে তাঁদের স্থান পাকা করবার সম্ভাবনা পুরো মাত্রাতে ছিল। এবং সেদিকে তাঁর ঝুঁকছিলেনও। কিন্তু সময় বিদ্রোহী-বিপ্লবী সত্বার মধ্যে তাঁদেরকে সবদিক দিয়েই  বেঁধে ফেলেছিল। 

যদিও নগণ্য আমি, তুচ্ছ বটবৃক্ষের সমাজেঃ    
 

    ছন্দ-অলঙ্কারের মতো কবিতার ঔপকরণিক বিষয়গুলোতে সুকান্তের দক্ষতা ঈর্ষণীয় ছিল। সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু,  রাজনৈতিক বা আদর্শগত বোধ তখনো পরিপক্ক হবার বয়স ছিল না। রবীন্দ্রনাথকেও সেই পরিপক্কতার জন্যে জীবনের নিদেন পক্ষে তিনটি দশক ব্যয় করতে হয়েছিল।  তাই তাঁর ‘বিয়েবাড়ির মজা’ কবিতাটির  রাজনৈতিক আবেদন আজ আমাদের হাসির উদ্রেক করে। তিনি লেখেনঃ
          বললে পুলিশঃ এই কি কর্তা, ক্ষুদ্র আয়োজন?
          পঞ্চাশ জন কোথায়? এ যে দেখছি হাজার জন!
          এমনি ক’রে চাল নষ্ট দুর্ভিক্ষের কালে?

      আমরা যারা সেই দুর্ভিক্ষের ইতিহাস জানি তারা জানি যে, “এমনি ক’রে চাল নষ্ট দুর্ভিক্ষের কালে?” এই প্রশ্ন করবার অধিকার ব্রিটিশের অধীনস্থ কোনো পুলিশের ছিল না। কবিতার এমন বিচারে যদি কেউ আপত্তি করেন তবে সে দোষ আমাদের নয়। রাজনীতির বার্তা দেয়াকেই যারা কবিতার আসল উদ্দেশ্য মনে করেন তাঁরা নিজেরাই এমন সম্ভাবনার বীজ উৎপাদন করে কবিতাতে বা উপন্যাসে বপন করে রেখে দেন। বিখ্যাত আবৃত্তিকার প্রদীপ ঘোষ এক সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা তাঁকে যখন সুকান্তের কবিতা আবৃত্তি করতে ডাকছেন তখন আগে থেকেই জানিয়ে দিচ্ছেন তিনি যেন ‘প্রিয়তমাসু’ কবিতাটি না পড়েন। কেননা সে কবিতার একজায়গাতে রয়েছেঃ
             যুদ্ধ চাই না আর, যুদ্ধ তো থেমে গেছে;
             পদার্পণ করতে চায় না মন ইন্দোনেশিয়ায়
            আর সামনে নয়,
            এবার পেছনে ফেরার পালা।

এই ‘পেছনে ফেরার’ কথা থেকে আয়োজকদের মনে হয়েছে কবির রাজনৈতিক বিচ্যুতি হয়েছে! তার মানে দাঁড়ালো এই যে রাজনীতির বাতাবরণ পাল্টালেই এমন কবিতার আবেদন পালটে যায়। সযত্ন সংরক্ষণ করতেন না বলে সুকান্তের বহু কবিতা পুনরাবৃত্তির দোষেও দুষ্ট হয়েছে। পড়তে পড়তে মনে হয়, একই কথা বার বার বলছেন, যেমনটি রাজনীতি বা সমাজকর্মের মাঠের কর্মীরা বলে থাকেন। তাঁর বৈষয়িক দরকার থাকলেও শৈল্পিক দরকার একেবারেই নেই। কোথাও কোথাওতো  পংক্তিগুলো হুবহু এক প্রায়। যেমন ‘সিগেরেট’ এবং ‘ দিয়াশলাই কাঠি’ কবিতা দুটো।
সিগেরেট’ কবিতাতে লিখছেনঃ
               তাই, আর নয়;
               আর আমরা বন্দী থাকব না
              কৌটোয় আর প্যাকেটে;
              আঙুলে আর পকেটে
              সোনা-বাঁধানো ‘কেসে’ আমাদের নিঃশ্বাস হবে না রুদ্ধ।
               আমরা বেরিয়ে পড়ব,
               সবাই একজোটে, একত্রে–
              তারপর তোমাদের অসতর্ক মুহূর্তে
              জ্বলন্ত আমরা ছিট্‌কে পড়ব তোমাদের হাত থেকে
             বিছানায় অথবা কাপড়ে;
              নিঃশব্দে হঠাৎ জ্বলে উঠে
              বাড়িসুদ্ধ পুড়িয়ে মারব তোমাদের
             যেমন করে তোমরা আমাদের পুড়িয়ে মেরেছ এতকাল।।

দিয়াশলাই কাঠি’ কবিতাতে আবারো লিখছেন প্রায় ঐ একই কথাঃ
               আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,
               আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব
              শহরে, গঞ্জে , গ্রামে–দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
              আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়–
              তা তো তোমরা জানোই!
              কিন্তু তোমরা তো জানো না:
             কবে আমরা জ্বলে উঠব–
             সবাই শেষবারের মতো!

    তেমনি ‘জাগবার দিন আজ’ কবিতাতে আছেঃ
                 আজকের দিন নয় কাব্যের -
                 আজকের সব কথা পরিণাম আর সম্ভাব্যের;

   তেমনি আছে ‘মৃত পৃথিবী’তেঃ
                আজকের দিন নয় কাব্যের
               পরিণাম আর সম্ভাব্যের...

       এরকম কিছু ত্রুটি আর সীমাবদ্ধতা সত্বেও আমাদের বিশ্বাস সুকান্ত কোনোদিন ফুরিয়ে যাবেন না। সাহিত্যের ইতিহাসের লেখকেরা বা তাত্বিকেরা তাঁর জন্যে বেশি পৃষ্ঠা বরাদ্দ না করলেও যখনই যেখানে  আম ‘জনতার মুখে ফোটে’ উঠবে  ‘বিদ্যুৎবাণী’ সুকান্ত সেখানে উচ্চারিত হবেন সে সত্য আমাদের দেখিয়েছে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম। তিনি লিখেছিলেনঃ
             যদিও নগণ্য আমি, তুচ্ছ বটবৃক্ষের সমাজে
             তবু ক্ষুদ্র এ শরীরে গোপনে মর্মরধ্বনি বাজে,
             বিদীর্ণ করেছি মাটি, দেখেছি আলোর আনাগোনা
              শিকড়ে আমার তাই অরণ্যের বিশাল চেতনা।

          আমরাও মনে করি তাঁর সিগারেট, একটি মোরগের কাহিনী, দেশলাই কাঠি, প্রিয়তমাসু, রবীন্দ্রনাথের প্রতি,আঠার বছর বয়স, রানার , অনুভব, লেনিন ইত্যাদি কিছু কবিতা ক্রমেই বাংলার মুষ্ঠিমেয় কিছু ধ্রুপদী কবিতার সারিতে নাম লেখাবে এবং আরো বহু বহু দিন আবৃত্তি তথা পাঠ করা হবে কবিতাগুলো। স্বাধীনতার এতোটা বছর পরেও যে শিশু আগামী কাল জন্ম নেবে তার জন্যে স্থান ছেড়ে দেবার, প্রাণপণে জঞ্জাল সরাবার কাজ এখনো সম্পন্ন হয়ে ওঠেনি। এখনো এ বিশ্বকে তার জন্যে বাসযোগ্য করে তুলা যায় নি। যে মানুষ তাতে হতাশ হয়ে সুকান্তের অঙ্গীকার ভুলে যায় তার মানবতাবোধ, তাঁর শিল্পবোধ আর সভ্যরুচিকে নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলতে পারি। তাই বলে সুকান্তের মহত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবার মত অশিক্ষা  যেন আমাদের আচ্ছন্ন না করে   । নবজাতকের কাছে এখনো অম্লান থাকুক আর থাকবে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।

LinkWithin

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...

Google+ Badge