লেখাটা আজ বেরুলো সাময়িক প্রসঙ্গে ( ০৩-১০-১০)ঃ
আবুল হোসেন মজুমদারকে নিয়ে আর জানতে পড়ুনঃ
From My Articles |
আবুল হোসেন মজুমদারকে নিয়ে আর জানতে পড়ুনঃ
From My Articles |
সুজিত চৌধুরী উত্তর বরাক উপত্যকার সমাজবৈজ্ঞানিক অধ্যয়নে যে ব্যক্তি খুব দ্রুত তাঁর জায়গা নিচ্ছেন তাঁর নাম জয়দীপ বিশ্বাস বললে আমার মনে হয় না কেউ বিশেষ দ্বিরুক্তি করবেন। সম্প্রতি জয়দীপের একটি লেখা আমার খুব মনে দাগ কেটেছে এর জন্যে যে আমার নিজের চিন্তাকেন্দ্রে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে জাঁকিয়ে জায়গা জুড়ে বসে আছে। ১৯শে মে’র দিনে জয়দীপ দৈনিক যুগশঙ্খে লিখেছিলেন , “উনিশ নিয়ে অন্য কথা।” সেখানে তিনি বরাক ও ব্রহ্মপুত্রের বাঙালিদের ভাষা সমস্যা ও রাজনৈতিক অবস্থানের এক প্রতিতুলনা করে বেশ কিছু মূল্যবান মন্তব্য করেছেন। লেখাটির শেষের দিকে তিনি বরাক ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিদের ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধে অখণ্ড অভিবাজ্য বাঙালি জাতিসত্বা নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করবার আহবান জানিয়েছেন। তাতে বদরুদ্দিন আজমল এবং চিত্ত পালদের ফতোয়াবাজিকে প্রতিহত করতেও আহবান জানিয়েছেন। কিন্তু মজার কথা হলো বদরুদ্দিন আজমল যে জনগোষ্ঠীটির প্রতিনিধিত্ব করেন তাদের সম্পর্কে একটি শব্দও ব্যয় করতে বেমালুম ভুলে গেছেন । এক জায়গাতে তিনি এও লিখেছেন , “ বর্তমানে বাঙালি হওয়ার অপরাধে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় কাউকে শারীরিক বা মানসিক হেনস্তার শিকার হতে হয় না। কেন হয় না তার কারণ অন্যত্র এবং ভিন্ন একটি লেখার বিষয় হতে পারে।” ঘটনাক্রমের কী কৌতুক তাঁর ক’দিন পরেই বরপেটাতে অশুদ্ধ নাগরিকপঞ্জি তৈরির প্রতিবাদ করতে গিয়ে চার যুবক পুলিশের গুলিতে মারা গেলেন। এমন কৌতুক জয়দীপের লেখাটির অন্যত্রও রয়েছে। জয়দীপ লিখলেন, “ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা সাহিত্যের ধারাটি খুবই সমৃদ্ধ। কিন্তু কোনো পত্রপত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিনেই অসমের বাঙালির রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার নিয়ে কোনো কথা কখনোই ওঠেনা।” এই কথাগুলো বর্তমান লেখক পড়েছি তিনসুকিয়াতে বসে যুগশঙ্খের ডিব্রুগড় সংস্করণে। এহ বাহ্য! এখানে এ নিয়ে কথা ফাঁদলে আমরা খেই হারিয়ে ফেলব। জয়দীপের লেখাটির মতো লেখা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার কাগজে বেরোয় আকছার। লেখেন অমল গুপ্ত, মণীন্দ্র রায়, প্রমুখ অনেকেই। এ উপত্যকাতে বাঙালিদের সংগঠনের কোনো অভাব নেই। কিন্তু তাঁরা প্রায় প্রত্যেকে নিজেদের ‘হিন্দু বাঙালি’ বলে প্রকাশ্যে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তারা যে সবাই সাম্প্রদায়িক এমনটা নয়, মুসলমানদের ‘বাঙালি’ করে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসার আগে বাস্তবিক কিছু সমস্যা রয়েছে। এতে শুধু প্রমাণ করা হবে এই অভিযোগ যে, সব বাঙালি মিলে অসমকে ‘বাংলাদেশ বানাবার ষঢ়যন্ত্রে' মেতেছে। মুসলমানেরাও এমন অভিযোগ থেকে আপাতত নিরাপদ দূরত্বে থাকতেই ভালোবাসেন।জয়দীপ এতো জটিলতার মধ্যি দিয়ে যান নি। না গিয়েই বদরুদ্দিন আজমলের ‘ফতোয়াবাজি’র বিরুদ্ধে জাতিকে এক হতে বলে দিয়েছেন।
জয়দীপকে বামপন্থার ধারক বলেই জানি।আমাদের সুযোগ থাকলে দেখাতাম অসমিয়া জাতিয়তাবাদের যে চিত্রগুলোর অনেকটাই জয়দীপ সঠিকভাবেই তুলে ধরেছিলেন সেই জাতীয়তাবাদের তাত্বিক আধার এবং শব্দাবলী অনেকটাই স্তালিন প্রভাবিত বাম্পন্থার দান। মায়, ‘জাতি গঠন প্রক্রিয়া’ শব্দগুচ্ছ অব্দি।
মার্ক্সবাদ, ভাষাজাতীয়তাবাদ আর ধর্মের কোনো ককটেল হতে পারেনা বলে যদি পাঠকের ধারণা হয়, তবে তার একটি নিদর্শনতো আমরা জয়দীপের মধ্যেই দেখালাম, হয়তো জয়দীপ নিজেও সেটি উপলব্ধি করেননি। কিন্তু আরেকটি স্পষ্ট চমকদার নিদর্শন সম্প্রতি আমি আমার এক বন্ধুর ‘ফেসবুক নোটে’ পেয়েছি। তমাল দাশগুপ্ত নামে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক “পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি জাতীয়তাবাদ” নামে সেই নোটে লিখেছেন, “মার্ক্সিয় চিন্তায় ধর্ম নিয়ে সেই এঙ্গেলস থেকে আজকের টেরি ইগলটন পর্যন্ত যে কাজ হয়েছে, আমি চাই হিন্দু বাঙালির ওপরে সেই চিন্তার প্রয়োগ ঘটিয়ে একটি সুসংহত কাজ হোক, যাতে অনেকগুলি বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের সমস্যাগুলি চিহ্নিত করা যাবে। আমরা, পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ বাসিন্দা যে জন্মসূত্রে হিন্দু বাঙালি সেটা লুকোছাপা করার চেষ্টা হাস্যকর, তাকে ট্যাবু বানিয়ে তোলা এবং তার উল্লেখ নিষিদ্ধ করা এবং তা নিয়ে এক ফ্রয়েডিয় অস্বস্তিতে ভোগা আমাদের শিক্ষিত বাম-লিবেরাল অংশটির এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর ফলে এক ভয়াবহ গ্যাপ তৈরি হয়েছে, বাকি বাঙালির সঙ্গে এই অংশটির। এরা বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না বা বাবা তারকনাথ জাতীয় বাংলা ছবি কেন রইরই করে চলে সেটা ভেবে অবাক হয়ে যান। দমদমে যখন বিজেপি জেতে, তখনও এই বুর্জোয়া লিবেরাল বামপন্থিরা অবাক হয়ে যান। সাধে কি আর নরেন্দ্রনাথ দত্তর পিতাঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন, বড় হয়ে আর যা-ই হোস না কেন বাবা, অবাক হোস না।” বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে তমালের বেশ গৌরব বোধ আছে। এক জায়গাতে তিনি লিখেছেন, এবং আমাদের মতে সঠিক ভাবেই লিখেছেন, “এই প্রসঙ্গে না বলে পারছি না যে তথাকথিত ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আসলে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপরে কিঞ্চিত কসমেটিক সার্জারি ঘটিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছিল, আমাদের উদারপন্থি ভারতীয়তাবাদি লোকগুলি তা বেমালুম চেপে যান, বা হয়ত খবরই রাখেন না। একবার দেখেছিলাম রবীন্দ্রনাথের বাংলার মাটি বাংলার জলের বিকৃত হিন্দি অনুবাদ দেখানো হচ্ছে দূরদর্শনের ন্যাশনাল নেটওয়ার্কে , দেশ কি মিট্টি দেশ কি জল! ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশনের বহরটা ভাবুন একবার! এটা ইতিহাসের যে কোনও ছাত্রের কাছে অজানা নয় যে বঙ্কিমের বঙ্গমাতাকেই ভারতমাতা বলে বাজারে ছাড়া হয়েছিল, আর বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ব্যবহৃত স্লোগান বন্দেমাতরম ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের স্লোগান হয়ে ওঠে। স্বদেশি কথাটাই তো বাঙালি জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি। তা একসময় ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াইতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রয়োজন হয়েছিল যখন, তখন উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয়রা বাঙালি জাতীয়তাবাদ থেকে ধার নিয়েছেন, বেশ করেছেন।” তিনি লিখেছেন, “কিন্তু আজ যদি সেই ভারতীয় জাতীয়তার দোহাই দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়, তা ইতিহাসবিরুদ্ধ, এবং তা মোটেই সহ্য করা যায় না।” আমাদের মত অবশ্যি হলোগে’ একে সহ্য করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কেননা, জাতীয়তাবাদের কাজই অন্যকে দমন করা, প্রত্যাখ্যান আর অস্বীকার করা। ফিলিস্তিনিদের জমিতে ইহুদী বসতি স্থাপন করা। আদিবাসিদের জায়গা জমিথেকে উচ্ছেদ করা, ভাষা সংস্কৃতিকে বিলোপ করা—যেমনটি হচ্ছে ২১শে ফেব্রুয়ারীর দেশ বাংলাদেশে। যে গাছ লাগিয়েছো তার ফলতো খেতেই হবে। কিন্তু এও বাহ্য! বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাস নিয়ে তমালের অধ্যয়ন বেশ গভীর , “হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতি শাসিত হচ্ছে comprador শ্রেণির দ্বারা। বৌদ্ধধর্মের বিলুপ্তির পরে যে দুটি ধর্ম আমাদের গ্রাস করেছে, সনাতন ধর্ম ও ইসলাম, দুটিই পশ্চিম থেকে আগত। বৌদ্ধধর্ম আমাদের মননের খুব কাছাকাছি ছিল, ভৌগলিক দিক থেকেও সেই নৈকট্য খুব প্রকট, কারণ এটি ছিল পূর্বভারতের ধর্ম। সনাতন ধর্মের জাতপাত আমাদের কুৎসিত অভিশাপ। আর পূর্ববঙ্গে প্রচারিত ইসলামের গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা, ভিন ধর্মের প্রতি নোংরা বিদ্বেষ এবং ভিনধর্মীকে নিকেশ করে পূণ্যার্জন এসবের কথা যত কম বলা যায় ততই ভাল।... ইসলামের ইতিহাস আমি খুব বেশি জানি না, তবে লালন ফকির আছেন। যদিও তিনি আসলে হিন্দু ছিলেন, এবং সনাতন ধর্মের ছুঁৎমার্গের সমস্যায় পড়ে কিভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তা আমাদের জানা।”
পাঠক লক্ষ্য করুন, মার্ক্স থেকে ইগেলটন অব্দি যার পড়াশোনার ব্যাপ্তি, পুরোটা পড়লে দেখবেন বাংলা ভাষা সাহিত্যের প্রতি তাঁর দখল অগাধ, কিন্তু তিনি ইসলামের ইতিহাস খুব জানেন না। অথচ এটা জানেন যে , “পূর্ববঙ্গে প্রচারিত ইসলামের গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা, ভিন ধর্মের প্রতি নোংরা বিদ্বেষ এবং ভিনধর্মীকে নিকেশ করে পূণ্যার্জন এসবের কথা যত কম বলা যায় ততই ভাল।”
জাতীয়তাবাদের এমনতর ধারাভাষ্যগুলোর যে ফাঁক ও ফাঁকি রয়েছে, যে ভাষ্যগুলোতে বাঙালির প্রায় অর্ধেক অংশ মুসলমানেদের কোনো জায়গা নেই সেখানে এক প্রতিভাষ্য তৈরি হওয়াটাতো প্রাকৃতিক ভাবেই অনিবার্য। বরাক উপত্যকার বাঙালিদের মধ্যে অধ্যাপক আবুল হোসেন মজুমদার সেই প্রতিভাষ্যকারদের মুখ্যজন--অগ্রপথিক।
আমাদের প্রতিষ্ঠিত ধারাভাষ্যগুলো একটি ত্রিভূজকে নিয়ে ভাবতে খুব অভ্যস্ত। তার তিন বিন্দুতে রয়েছে হিন্দু, মুসলমান ও কমিউনিষ্ট। এই ত্রিভূজের প্রতিটি বিন্দু ভাবে অন্য দুটি বিন্দু তার বিপক্ষ এবং পরস্পর মিত্র পক্ষ। অথচ ঘটনা হলো আমরা বাস করি এক বিশৃঙ্খল চিহ্ন বিশ্বে। সেই বিশ্বে দু’তিনটি প্রধান চিহ্নের বাইরেও অজস্র ছোট বড় চিহ্ন এবং তাদের প্রবাহ প্রাধান্যের দাবি নিয়ে ঢেউ খেলিয়ে যায় সে দিকে যেন আমাদের চোখ পড়েও পড়ে না। প্রধান চিহ্নের আকর্ষণ আমাদের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রাখে। বরাক উপত্যকাতে তাই ১৯শের আন্দোলনের কোনো উত্তরাধিকার নেই।
অধ্যাপক আবুল হোসেন মজুমদারকে নিয়ে বছর দুই আগে সাময়িক প্রসঙ্গ আমাকে দিয়ে এক লেখা বের করিয়েছিল।‘অধ্যাপক আবুল হোসেন মজুমদার এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পথ বিকল্প’ ( রবিবারের প্রসঙ্গ, ২৮ ডিসেম্বর,২০০৮)। সেবারে অবশ্যি শেষ অব্দি একা আমিই থেকে গেছিলাম। এবারে সাময়িক প্রসঙ্গ আরো বড় করে সেই একই উদ্যোগ নিয়েছেন দেখে ভালো লাগছে। কিন্তু আমাকেই যখন আবারো লিখতে বলা হলো তখন একটু বিপদেই পড়ে গেলাম । তাঁকে নিয়ে আমার যেটুকু বলবার সামর্থ্য ছিল তার প্রায় সবটাই আমি সেবারে উজাড় করে দিয়েছিলাম। এবারে পরিস্থিতির এমন কিছু পরিবর্তন হয় নি যে তাঁকে নিয়ে আমার বলবার কথা বিশেষ পাল্টাবে। সুতরাং পুনরাবৃত্তির দায় নিতে কারই বা ভালো লাগে। কিন্তু মিলনদা’র বারংবার দূরভাষে দেয়া চাপের ধাক্কাকে উপেক্ষা করা চাট্টিখানি কথা ছিল না মোটেও। মানুষটি সেই একই আছেন, মত ও পথ পাল্টায় নি কিছু। একজন কর্মঠ মানুষতো সব সময়ই নতুন। এই তর্ক উঠতেই পারে। কিন্তু আমরা যে সমস্যাটির কথা সেবারেও বলেছিলাম এবারেও বলব-- উপত্যকার বাইরে থাকার জন্যে তাঁর পুরোনো রচনার যা কিছু আমার সংগ্রহে ছিল তার কিছুই এখানে নেই। সংগ্রহ যে করে নেব তারও উপায় নেই। গেল এক দশকেরও বেশি সময় তাঁকে আমি চোখে দেখিনি। নিয়মিত যোগাযোগটা দূরভাষে ছিল, এখনো আছে। সেভাবেই তাঁর কাজের খবর কিছু কিছু পাই। তাতে আমি জানি যে জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও কঠিন সব রোগ শোকের সঙ্গে লড়াই করেও ভদ্রলোক প্রতিষ্ঠানের সব হাতছানিকে নির্বিকার উপেক্ষা অবহেলা করে চলছেন । গতিশীলতার ‘মুখশ্রী’র গৌরবে উজ্জ্বল এই ব্যক্তিত্ব ‘প্রগতিশীল’তার মুখোস পরেন নি আজো। সম্ভবত ঘৃণাও করেন।
গেল ১১ সেপ্টেমর, ১০ তারিখে দৈনিক যুগশঙ্খ তাঁর এক লেখা ছেপেছে। ‘৯/১১র নবম বছরে কেন অকারণে কোরান পোড়ানোর ডাক?” বর্তমান লেখক নিজেও এনিয়ে (বারাক ওবামার ধর্ম আর রক্ত- তেলচোরা সাদা সাহেবদের কেয়ামতের দিন) অন্যত্র লিখেছিলাম। এবং যথারীতি লিখেছিলাম ১১সেপ্টেম্বরের কোরান পোরানোর ডাক, গ্রাউন্ড জিরোর কাছে ইসলামী ধর্মকেন্দ্র গড়তে বাধা দেয়া বা বারাক ওবামার বিরুদ্ধে মুসলমান হবার অভিযোগের জবাবে হোয়াইট হাউসের ঘোষণা ইত্যাদি ঘটনা দেখায় আধুনিক ধর্মহীন ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা এক মিথ্যাচার বই আর কিছু নয়।নিজেকে খৃষ্টান বলে ওবামার ঘোষণাতে“... তর্কের যে ঢেঊ উঠল তা... ধর্ম এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে গোটা পৃথিবীকে আরো একবার কাঁপাবে। আমাদের দেশের ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে যারা বেশ গৌরবান্বিত, তাদের কথা নাহয় বাদই দিলাম, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গিয়ে যারা ইঊরোপের জাতিরাষ্ট্রগুলোর নজির দিয়ে ভাষা নির্ভর জাতীয়তাবাদের পক্ষে ওকালতি করেন, তাঁরাও তাঁদের তত্বের বিশুদ্ধতা আর ফাঁকির যায়গাগুলো নিয়ে আরেকবার ভাবতে শুরু করলে আমরা ভবিষ্যত নিয়ে আশান্বিত হতে পারি। বস্তুত ওবামার এই ঘোষণা জাতি রাষ্ট্রের বিশুদ্ধতার সমস্ত ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়ে দিয়েছে।” আবুল হোসেন তাঁর ঐ লেখাতে লিখেছেন , “ ...সংখ্যাগুরুর ধর্ম যেমন সংখ্যালঘুর ধর্মের উপর নানা ধরণের চাপ সৃষ্টি করতে পারে তেমনি ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উৎখাত করার চেষ্টা করে এটা কমিউনিষ্ট আর মুসলিম দুনিয়ার একটি অস্বস্তিকর সত্য। প্রয়োজনে এর যত প্রমাণ দেয়া যাবে , তত দেয়া যাবে।” তাঁর এই প্রবন্ধের শেষ হয়েছে এই বলে , “ যারাই ভেঙ্গে থাকুক ৯/১১ তে টুইন টাওয়ার, উদ্দেশ্য ছিল খারাপ, হীন। আমরা এটাকে ধিক্কার জানিয়ে বলেছি ঐ ধ্বংশকারী অবশ্যই একবিংশ শতকে ইসলামেরও সবচেয়ে বড় শত্রু। আজও তাই বলব, আমরা গড়ার পক্ষে, ভাঙার পক্ষে নয়, আর এই গড়ার, অর্থাৎ মানুষে মানুষে সেতুবন্ধনের, বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী মানুষের মধ্যে বোঝাপড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে প্রয়াস শুরু করেছি।”
আমি নিজে একজন ভাষিক সংখ্যালঘু। বাস করি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে। অসমীয়া সমাজে আমার প্রচুর বন্ধু বান্ধবী রয়েছেন, বলতে গেলে ভালো এক প্রভাব প্রতিপত্তিও রয়েছে। এবং আজকাল সেটি বিশ্বময় গিয়েছে বটে ছড়িয়ে। কিন্তু তবু আমি সারক্ষণ আতঙ্কে থাকি কখন কোথায় কোন সুযোগে কোনো এক বা একাধিক উগ্রজাতীয়তাবাদী আমাকে না ক্রীতদাসের মতো অপমান করে বসে। জয়দীপ ঠিকই লিখেছেন এখানে , “...একজন বাঙালিকে প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য লক্ষণরেখা মেনে চলতে হয় ।” জয়দীপ কিম্বা আর কোনো হিন্দু বাঙালি অনুভব করেন কিনা জানিনা, এই ভারতে একজন মুসলমানকে এর চেয়েও গভীর আর যন্ত্রণাদায়ক লক্ষণরেখা মেনে চলতে হয়। যাকে সে লক্ষণরেখা মেনে চলতে হয় , সে পরধর্ম বা ভাষা বিদ্বেষী হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু তাঁকে সেই গন্ডীর কথা ভুলে তার ঊর্ধে ঊঠার আহবান জানানো খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাঁকে তা ভুলতে দেয়া হলে তবে তো। আমি প্রায়ই লক্ষ্য করি, আবুল হুসেন মজুমদারকে চেনেন না জানেন না এমন কত সাধারণ পাঠক যাচ্ছেতাই অপমান করে কাগজে চিঠি লেখেন। কিন্তু তাঁর পক্ষে কথা বলবার জন্যে কোনো ‘বিদ্বজ্জন’ কলম ধরেন না, ধরবার দরকার বোধ করেন না। ভেবেছিলাম। ১১ সেপ্টেম্বরের সেই লেখার পর সেরকম কিছু হবে না। কিন্তু আমার সে আশার গুড়ে বালি দিয়ে দেখলাম ২০ সেপ্টেম্বরের কাগজে রাঙ্গিরখাড়ি , শিলচর থেকে হিমাংশু দাসচৌধুরী লিখেছেন, “এক শ্রেণির লেখক আছেন, যারা পত্রিকাতে কোনো যুক্তি না দেখিয়ে কেবল আবোল-তাবোল যা কিছু মনে আসে তা লিখে যান। গত ১১ সেপ্টেম্বর যুগশঙ্খের চতুর্থ পৃষ্ঠা জুড়ে আবুল হোসেন মজুমদার যে নিবন্ধটি লিখেছেন, এটি তারই একটি। মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরানে কি লেখা আছে তা আজ অনুবাদের কল্যানে শিক্ষিত মানুষ যারা ঐ ধর্ম সম্বন্ধে জানতে চেষ্টা করেছেন তারা জেনে গেছেন...” আমি একে শুধু এক সাম্প্রদায়িক পাঠকের মন্তব্য ভেবে অবজ্ঞা করতে পারতাম। কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীকেও একবার গোপীনাথ সিনেমা হলের কাছে এমন কিছু সাম্প্রদায়িক ব্যক্তির হাতে শারীরিক ভাবে হেনস্তা হতে হয়েছিল। কিন্তু সেরকম হেনস্তার পাল্লা অধ্যাপক আবুল হোসেন এবং তাঁর মতো ব্যক্তিদের দিকে অনেক ভারী। সে কেবল ওই কিছু কাগজের চিঠি লেখক কিম্বা ( ক্ষমা করবেন আমি দু’দলের মর্যাদার ভিন্নতাকে সম্মান জানিয়েই লিখছি) রাস্তার কিছু রকবাজদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই.....এর বিস্তৃতি উপত্যকার বহু বৌদ্ধিক সমাবেশ পর্যন্ত ব্যাপ্ত। ওখানে ঠিক আক্রমণ হয় না। ওখানে রয়েছে এক নীরব উপেক্ষা আর আড়ালে ‘মৌলবাদি’ অবিধায় ভূষিত করবার সবল প্রয়াস। অধ্যাপক তমাল দাসগুপ্ত তাঁর পূর্বোক্ত লেখাতে লিখেছেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদ শুধু বাংলা ভাষা সংস্কৃতিকে এই হিন্দি ইংরেজির রাজত্বে রক্ষা করার জন্য নয়, তা শুধু গ্লোবালাইজ়েশনের যুগে মৃত্তিকা থেকে উঠে আসা প্রতিরোধ নয়, তা আমাদের মধ্যে এক কমিউনিটির জন্ম দেয়। তা অসংখ্য নিম্নবর্গীয় বাঙালির ক্ষমতায়ণের লক্ষ্যে এক সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, তাই মার্ক্সিয় চিন্তায় অপরিহার্য। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ব্যক্তি বাঙালির alienation ঘোচায়। তা আমাদের ইতিহাসের শিহরণ, তা আমাদের পরিচয়ের উল্লাস। এ মাতৃদুগ্ধের মত, তাই কোনও বিকল্প হয় না।” তমালের প্রকল্পে মুসলমান বাঙালি নেই। তমাল এ লেখাতে সঠিক ভাবেই দেখিয়েছেন পশ্চিমবাংলার সরকারী বামেদের কোনো প্রকল্পেই নিম্নবর্গীয় কোনো বাঙালি নেই। যারা আবুল হোসেন পড়েছেন তাঁরা জানেন, অধ্যাপক আবুল হোসেনের চিন্তায় এরা সবতো রয়েইছেন, মায় অবাঙালিদেরকেও তিনি তাঁর নানা লেখা এবং বক্তৃতাতে ছুঁয়ে গেছেন। এ নিয়ে আমরা আমাদের আগেকার লেখাতে বিস্তৃত লিখেছি। তার পরেও যে এক সর্বব্যাপী উপেক্ষা তাঁকে ঘিরে রাখে তার কারণ তাঁর অপরাধ, তিনি প্রায়ই মুসলমানের পক্ষেও কলম ধরেন, কোরান হাদিসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণেও মনোনিবেশ করে ফেলেন। আমেরিকাতে কোরান পোড়াবার আহবান নিয়েওই লেখাতেও করেছেন। কল্পনা করুন যে কবি নজরুলও এটা করে গেছেন !... কিছু ইসলামী গান লেখার বাইরেও রবীন্দ্রনাথ যেমন উপনিষদ-গীতার উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করে প্রচুর গদ্য লিখে গেছেন তেমনি কোরান হাদিস কোট করে প্রচুর বক্তৃতা দিয়ে যেতেন, প্রবন্ধ লিখে রেখে যেতেন নজরুল...! কল্পনা করুন! কল্পনা... করুন...!
আবুল হোসেন এমনিতে রবিঠাকুরের ভক্ত। কিন্তু যে পাড়াতে থাকেন সেটির নাম নজরুল সরণি। এটি আমার কাছে বেশ অর্থদ্যোতক। কেন জানেন? গোটা অসমে ঐ নামে আর একটাও পাড়া নেই। শিলচর শহরে, কবির শহরে, ১৯শের শহরে, ভাষা জাতীয়তাবাদের আঁতুড় ঘরে আজ অব্দি কবি নজরুলের একটিও স্মারক নেই। শ্যামাপ্রসাদের আছে কিন্তু ! নজরুলের ভুলটি কোথায় সে নিয়ে শক্তিপদের এক অতি সুন্দর কবিতা আছে। তাই দিয়ে আমার আগের লেখাটা শুরু করেছিলাম। এই লেখাটা শেষ করছিঃ একটু হলো ভুল/মুসলমানের ঘরে এসে জন্মালো নজরুল!/দানায় দানায় ঘনিয়ে উঠে জাতের রক্তবিন্দু/আলেম ঘরের ছেলে বটে তবুও যেন হিন্দু!... (শতবর্ষ পরে নজরুল; ৭ই বৈশাখ, ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, ১৪১২ বাংলা; পৃষ্ঠা ২১)
------------------
No comments:
Post a Comment