আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Sunday, 8 November 2026

কথা সাহিত্যে কাজি নজরুল –-ভক্তি বনাম বিদ্রোহ

 (লেখাটি নভেম্বর, ২৬-শে তিনসুকিয়া কলেজ থেকে প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন 'অন্বীক্ষা'-তে প্রকাশিত)



বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার বাংলা আকাদেমি দুই সংগঠনই কবি নজরুলের রচনাবলী প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের রচনাবলীর বারোটি খণ্ড আমরা দেখেছি। বোঝাই যায়—জীবনের বাইশ তেইশ বছরের সাহিত্য জীবনে কী ব্যাপক সংখ্যাতে তিনি কাজ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ৮০ বছরের কাজের জীবন পেয়েছিলেন। নজরুল যদিও ১৯৭৬ অবধি বেঁচে ছিলেন—১৯৪২-এর পরে তো আর লিখতে গাইতে পারেন নি। সেই দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রায় তিন দশক পরে জন্মেও কাজি নজরুল থেমে গিয়েছিলেন প্রায় একই সময়ে। একই বছরে জন্মে জীবনানন্দ দাশের তখন আসলে আবির্ভাব হচ্ছে, তাও নজরুলের অনুসরণে। এতো বিচিত্র রচনার মধ্যে কবিতা গানের বাইরে তিনি খুব কম পঠিত ও আলোচিত। তাই আমরা তাঁর একটি কম চেনা কাজের জগত  --  মূলত তাঁর ছোটো গল্প নিয়েই কথা বলব। এবং তাঁকে বোঝার চেষ্টা করব।

কাজি নজরুল ইসলাম "বিদ্রোহী' বলেই পরিচিত। এবং এই পরিচয়েই তিনি বাঙালি তথা ভারতবাসীর কাছে অধিক পরিচিত এবং সমাদৃতও। কিন্তু সেই নজরুলের অধিকাংশ গান তো প্রেমের আর পূজার গান! বাঙালি মধ্যবিত্তদের মধ্যে জনপ্রিয় প্রায় কোনো দেবদেবী বা নবি অবতারকেই তিনি বাদ দেন নি, যাদের নিয়ে গান বাঁধেন নি।বাদ পড়েছেন কেবল কিছু লৌকিক দেবদেবতা। আল্লাহ রসুল নিয়ে গান বেঁধেছেন, কিন্তু বোধ করি সবচাইতে বেশি বেঁধেছেন কালীকে নিয়ে। তার মানে শ্যামাসংগীত লিখেছেন। ফলে তাঁকে কেবল "বিদ্রোহী' বলতে পারি না, এই প্রশ্নটিকে আমি শুরুতেই স্পষ্ট করে দিতে চাইছি। যদিও তিনি কবিতা লিখে কাগজ সম্পাদনা করে ব্রিটিশ সরকারের রোষে পড়েছিলেন, হাজতেও গিয়েছেন। তাই বলে এই এক জায়গাতেই তিনি টিকে থাকেন নি। ১৯৪২ –এর পরেও যদি তিনি লেখালেখিতে  থাকতেন সক্রিয়—তবেই তাঁর পরিচয় আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হতে পারত। এমন বহু কবি শিল্পীকেই আমরা দেখেছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু লেখার শৈলীই নয় জীবনের ভাবনাও পালটেছেন। রবীন্দ্রনাথও পালটেছেন। ফলে আজকের দিনে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বিচারও খুবই কঠিন কাজ।

নজরুল কি পালটেছেন? মাত্র ২২/২৩ বছরের সামান্য সময়ে কেউ একজন কতটাই বা পাল্টাতে পারেন? আমাদের মতে পালটেছেন। এবং একই সময়ে দ্বিসত্তার মানুষও ছিলেন। কিন্তু তাঁকে ঠিকঠাক চেনার আরও একটি মুস্কিলও আছে। তাঁকে নানাভাবে লোকে চিহ্নিত করবার চেষ্টা করে ভুল করেছেন, সেই নিয়ে তাঁর একটি বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতাই আছে। "আমার কৈফিয়ত' নাম। বহু চেনা কবিতা—তবু আমাদের বক্তব্যকে দাঁড় করাতে কয়েকটি চরণ মনে করা যাক -- ""আনকোরা যত নন্‌ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন্‌ খুশী।/"ভায়োলেন্সের ভায়োলিন্‌' নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!/"এটা অহিংস', বিপ্লবী ভাবে,"নয় চর্‌কার গান কেন গা'বে?'/ গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্‌ফুসি!/স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!...''

            এর পরে যদি আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে যায় কোনো এক বিশেষণে চিহ্নিত করা। তখনও কমিউনিস্ট পার্টি সেভাবে পরিচিত হয় নি। যদি হত, কবিতাতে সেই উল্লেখও থাকত—"কেউ ভাবে আমি কমিউনিস্ট'।কাজি নজরুলই প্রথম কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক গানটি বাংলাতে অনুবাদ করেন। "সাম্যবাদী', "সর্বহারা' নামে তাঁর কাব্যগ্রন্থ আছে। রুশ বিল্পব সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলেন, বহু কবিতাতে সাম্যবাদী সমাজ আসছে বলে আশার বার্তাও শুনিয়েছেন। তাতে করে, বহু কমিউনিস্ট অনুরাগী দাবি করেন, তিনি আজীবন সক্রিয় থাকলে,পার্টিতে এসে যেতেন। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, না তিনি তা হতেন না। যতদিন সক্রিয় ছিলেন, এরই মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক হতাশাও এসেছিল। বিষ্ণু রাভার মতো নির্বাচনে দাঁড়িয়ে সেকালে হেরেও ছিলেন।

            নিজের কবি সত্তা নিয়ে সেই কবিতাতেই কী লিখেছিলেন? ""বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই "নবী',/ কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!'' আরও লিখেছেন,একই কবিতাতে,""বড় কথা বড় ভাব আসে না ক' মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!/অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!'' এইখান থেকে আমরা তাঁকে বোঝার শুরু করতে পারি। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের নাম দেশে একই সঙ্গে নিয়ে থাকেন বটে আম-জনতা। কিন্তু মনে রাখা ভালো যে বাংলা কবিতার পঞ্চপ্রধানের মধ্যে নজরুলের নাম নেই। কিন্তু বাংলা গানের "পঞ্চকবি'দের মধ্যে নজরুলও রয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ তো আছেনই। সবারই গান দিয়ে বাংলা গানের আধুনিকতার সূচনা যদিও হয়েছিল, আধুনিক গান বললে আমরা তাঁদের পরবর্তী সবার  গানকে বুঝি।

গান আর কবিতা বাদ দিলে কাজি নজরুলের আর সব রচনা নিয়ে লোকজন পরিচিত কম—আগেই লিখেছি। তিনি তো প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন। গল্প লিখেছেন, নাটক লিখেছেন।তিনি বাংলা ছায়াছবির শুরুর যুগে প্রচুর ছবিতে গান বেঁধেছেন, সুর করেছেন। এমন কি দুই চারটিতে অভিনয়ও করেছেন। সবই সেই ১৯৪২- অবধি ৪৩বছরের জীবনে। তাতে এমন অভিযোগও শোনা যায় যে তিনি সেই সব ছবির দাবিতে প্রচুর ফরমায়েশি গান তৈরি করেছেন, ভেতর থেকে সেই সব গান আসবার কথা না। বিশেষ করে তাঁর শ্যামা সঙ্গীত বা ইসলামী গানের মতো ধর্মীয় গানগুলো সম্পর্কে এমন একটি মত চালু আছে। নইলে যিনি বিদ্রোহী কবিতা লিখেছেন, ভগবান বুকে ভৃগুর পদচিহ্ন এঁকে দেবার আহ্বান জানিয়েছেন—তিনি এত ধর্মের গান লেখেন কী করে? এই হিসেব অনেকে মেলাতে পারেন না। 


      আমরা সেই হিসেবটাই মেলাবার চেষ্টা করব। সেই হিসেব না মিলিয়ে তাঁর  তাঁর গল্প উপন্যাসকে নিয়ে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়ে। তবু সেইসব কথা-সাহিত্যের প্রাথমিক পরিচয় তো আগে একটা দেওয়া যাক। নজরুলের বাল্য বন্ধু  শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় --সেই কালের পাঠক তাঁকে নিপীড়িত জনের কথাকার বলে বরণ করে নিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের তো বটেই, এককালে তাঁকে বলা হত বাংলা গল্পে শরৎ চন্দ্রের সার্থক উত্তরসূরি। নজরুলের নাম সেভাবে বাংলা কথা সাহিত্যে উচ্চারিত হয় না। এর একটি কারণ অবশ্য কথাসাহিত্যে তাঁর রচনার সংখ্যা। খুবই কম। সব মিলিয়ে তাঁর ছোটো গল্প মাত্র আঠারোটি। আর উপন্যাস চারটি। কিন্তু অন্য কারণ অবশ্যই গল্পগুলোর বিষয় আশয়। তাঁর সব কটা গল্প এবং উপন্যাসগুলো সম্পর্কে একবাক্যে বলে দেওয়া যায় যে সেগুলো সবই নারীপুরুষের প্রেমের গল্প। এবং সেই যে তিনি লিখেছিলেন, "অমর কাব্য তোমরা লিখিও,বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!'— তাঁর অধিকাংশ গল্পে ঠিক সেই "দুঃখ' কিন্তু নেই। দুই একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে সেগুলোতে দারিদ্র্যের, অত্যাচারের, পরাধীনতার দুঃখ নেই। আছে প্রেমাস্পদকে না পাবার বেদনা কেবল। তাঁর গল্পের দুটি বাদে আর একটিতেও নায়কের সঙ্গে নায়িকার মিলন হয় না। সবই বিয়োগান্তক গল্প। টানা পড়লে মনে হবে একটি বাঁধা ছকে লেখা গল্পগুলো। গল্পগুলোর রচনাশৈলী যাই হোক না কেন, ছকটি কিন্তু লেখার অক্ষমতার থেকে আসে নি। এসেছে তাঁর ধর্ম চিন্তার থেকে। যদিও তাঁর গানে ধর্মের উপস্থিতি যতটা স্পষ্ট—গল্পে সেরকম নয়। সুফি কাহিনিধারার সঙ্গে যারাই পরিচিত --লায়লা মজনু,সইফুল মুলুক বদিউজ্জামাল বা সাধারণভাবে আরব্যরজনীর প্রেমকথা—তাঁরাই পড়তে পড়তে ধরতে পারবেন, নজরুল যেন তাঁর সময়ের সুফি রূপকথা লিখবার চেষ্টা করছেন। অর্থাৎ সেগুলোর আধুনিকীকরণ করছেন। তাঁর গল্পগুলোর ভেতরেও চরিত্রগুলোর সংলাপে বা পরিবেশ ও ভাষা নির্মাণের শৈলীতেও পাঠক সেরকম আভাস পাবেন। সেই সঙ্গে আমাদের মনে রাখা ভালো যে অসম-বাংলার আদিকাব্য গ্রন্থ চর্যাপদের কবি কাহ্নর সেই আহ্বান "আলো ডোম্বী তোএ সম করিব ম সাঙ্গ'। এই ধারাতেই পরে দেখা দেয় বৈষ্ণব সাহিত্য। বৈষ্ণব  ধর্মেরও প্রচলিত কাহিনিটি রাধা ও কৃষ্ণের বিচ্ছেদে শেষ হয়। কাজি নজরুল সেই বৈষ্ণবীয় ঢঙেই তাঁর গল্পগুলো লিখেছেন। এর পেছনে তত্ত্বটা কী—আমার সেই আলোচনার গভীরে যাব না, আমাদের সেই যোগ্যতাও নেই। কিন্তু দর্শনে অযোগ্য পাঠকও ধরে ফেলবেন যে এগুলো নিছক প্রেমকাহিনি নয়, আরও বড় কোনো সত্যের সন্ধান। প্রেমকাহিনি বলেও এগুলো জনপ্রিয়তা পেতে পারত, পায়নি কেন—আমাদের ভাবায়। এর একটি কারণ এই হতে পারে যে  "বিদ্রোহী', "সর্বহারা', "সাম্যবাদী'র কবিতাগুলোর কবিকে তাঁর গল্পে উপন্যাসে আর সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। যেভাবে পাওয়া যায় বন্ধু শৈলজানন্দকে। এখন কথা উঠতে পারে, তিনি তো হাফিজের কবিতা, ওমর খৈয়ামের কবিতাও নিজের মতো করে অনুবাদ করেছেন, তবে গল্পে সেই ধারাকে পেলে একজন পাঠক নেবেন না কেন? এর জবাব হতে পারে এরকম যে "বিদ্রোহী' কবিতার কজন পাঠক নজরুলের অনুবাদে হাফিজ বা খৈয়াম পড়েছেন? কবি নজরুলের "বিদ্রোহী' ভাবমূর্তিই "ব্যথার দান' গল্প বা "বাঁধনহারা' উপন্যাসের কথাশিল্পী নজরুলকে দাঁড়াতে দেয়নি। তাঁর "মৃত্যুক্ষুধা' বা  "কুহেলিকা' উপন্যাস দুটিতে আছে, বিদ্রোহ—দারিদ্র্য- জাতধর্মের ভেদাভেদের প্রসঙ্গ।কিন্তু সে দুটিরও মূল কাঠামোটি –সেই প্রেম আর প্রেমের পথে মুক্তির সন্ধান। তাঁর অনুবাদে ওমর খৈয়ামের সেই চরণগুলো পড়া যাক ""হৃদয় যাদের অমর প্রেমের জ্যোতির্ধারায় দীপ্তিমান,/মসজিদ মন্দির গির্জা, যথাই করুক অর্ঘ্য দান–/প্রেমের খাতায় থাকে লেখা অমর হয়ে তাদের নাম,/স্বর্গের লোভ ও নরক-ভীতির ঊর্ধ্বে তারা মুক্ত-প্রাণ।'' তাঁর গল্প-উপন্যাসের নায়ক নায়িকারা সেই সেরকমই মুক্তপ্রাণ।

তিনখানা গল্প সংকলন ছিল তাঁর। "ব্যথার দান' (১৯২২),"রিক্তের বেদন' (১৯২৫),"শিউলিমালা' (১৯৩১)। এর মধ্যে প্রথমটিতে ছটি, দ্বিতীয়টিতে আটটি, আর শেষটিতে চারটি গল্প আছে। সব মিলিয়ে আঠারো। প্রেম তো আছেই, আর প্রায় সব ক'টিতে আছে অহৈতুকী রাজনৈতিক যুদ্ধ –যাকে মনের ভেতরে চলা যুদ্ধের প্রতীক হিসেবেই পড়া যেতে পারে আর আছে বিচ্ছেদ। মিলন মাত্র দুটি গল্পে "হেনা' এবং "অগ্নিগিরি'। গল্পগুলোর প্রেক্ষাপট বহুক্ষেত্রেই বাংলার বাইরে, এমন কি দেশেরও বাইরে।প্রথম গল্প "ব্যথার দান'-এর প্রেক্ষাপটই তো ইরান দেশের যুদ্ধক্ষেত্র। দ্বিতীয় গল্প "হেনা'-র নায়ক আরও দূর ফ্রান্সে চলে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভারতীয় সৈনিক, যেমন নজরুল নিজে ছিলেন। তৃতীয় গল্প "বাদল বরিষণে'-র নায়ক যুক্তপ্রদেশে গিয়ে পৌঁছায়। দ্বিতীয় সংকলনের "রিক্তের বেদন' গল্পের নায়ক  চলে যায় সেই মধ্যপ্রাচ্যে, কুর্দিস্তানে, কারবালাতে। "বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী'-র গল্প শোনা হয় বাগদাদে সহযোদ্ধার থেকে। "মেহের নেগার'-এর প্রেক্ষাপট কাশ্মীর। এই অবধি বাকি গল্পগুলো বাংলাতে শুরু হলেও নায়ক যুদ্ধে বিদেশে চলেই যায়। দ্বিতীয় সংকলনের পঞ্চম গল্প "রাক্ষুসী'-তে এসে বাংলাদেশের মাটিতে শেকড় ছড়ায় গল্পগুলো।


চরিত্রগুলো যুদ্ধে যায় বটে। কিন্তু যুদ্ধের লাভ ক্ষতি নিয়ে তাদের বিশেষ মাথা ব্যথা দেখি না। এই যেমন ত্রিকোণ প্রেমের গল্প "ব্যথার দান'-এর মূল কথা হল -- প্রেমাষ্পদকে না পেয়েও দারার সিদ্ধিলাভ। সে  সাধক রুমির সেই গানটি গেয়ে উঠে ,""ওগো প্রিয়তম! তুমি যত বেদনার শিলা দিয়ে আমার বুকে আঘাত করেছ, আমি তাই দিয়ে যে প্রেমের মহান-মসজিদ তৈরি করেছি!''  গল্পের শেষ হয় এই রবীন্দ্রগানে,""আমার সকল দুখের প্রদীপ জ্বেলে দিবস গেলে করব নিবেদন,/আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন!'' এই  যে "বেদনার শিলা দিয়ে' বুকে আঘাত করা—এটা যেন লেখক মনে পূর্ণ নির্ধারিত একটি ছক। ফলে অধিকাংশ সময়ই সেগুলো বাস্তবের আকর থেকে বিচ্ছেদের দাবি মেনে কৃত্রিম আমদানি বলে মনে হয়। "বাদল বরিষণে'-তে কাজরিয়ার গায়ের রং কালো সেটি একটি পথের কাঁটা হয়ে হাজির হয়, "মেহের নেগার' তথা গুলসনের মা বেশ্যা—সেটা একটা সমস্যা। " এ ঘুমের ঘোরে' গল্পে পরি আজহারকে বিয়ে করল না শুধু এই জন্য যে এতে তার যুদ্ধে যাওয়া হবে না, যাকে করল সে আজহারের বন্ধু—এবং পরির সামনে আজহারের প্রতিনিধি। নিরাকার দেবতার সাকার মূর্তি যেন। বিপরীতে "রিক্তের বেদন' গল্পে যোদ্ধা প্রেমিকের প্রত্যাখ্যাত বেদুয়িন যুবতী ওকে পাবার জন্যেই যেন সেনার শিবিরে অস্ত্র চুরির দায়ে ধরা পড়ে প্রেমিকের হাতে নিহত হয়। প্রেমিকের মনে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়—কর্তব্য না প্রেম—কোনটা বড়ো? যখন সে কর্তব্যের দায়ে প্রেমাষ্পদাকে হত্যা করে প্রেমের টানে দেহটিকে কোলে করে, মেয়েটি এই বলে মৃত্যু বরণ করে , ""এই "আশেকের' হাতে "মাশুকের' মরণ বড়ো বাঞ্ছনীয় আর মধুর, নয় হাসিন.'' বহু গল্পে যদিও প্রেমের দাবিতেই বিচ্ছেদ স্বীকার করে যুদ্ধে চলে যায় প্রেমিক পুরুষটি। দুটি গল্পে অন্তত বিচ্ছেদ মহা-দুষ্ট প্রেমাষ্পদকে সুবোধ বালকে পরিণত করে। "বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী' বা তৃতীয় সংকলনের দ্বিতীয় গল্প "জিনের বাদশা'-তে যেমন। "এ ঘুমের ঘোরে' গল্পে পরি যখন একজনকে বিয়ে করে সামাজিকভাবে এবং শারীরিকভাবেও স্বীকার করে মনের বেড়ি আজহারের পায়ে পরিয়ে রাখে তখন সমাজ সংস্কারকে প্রশ্ন করে। জবাবও সে নিজের মতো তৈরি করে। যাকে আমাদের অনেকের মনে হবে "আধুনিক' উচ্চারণ। কথাটি এই –পরি ভাবছে, ""অন্তরের গভীর সত্যকে বরণ করে নিতে গিয়ে সমাজ আর ধর্মকে আঘাত করা হয় বলে যদি মনে করি, তাহলে সেটা আমাদেরই ভুল; কারণ আমরা সমাজ আর ধর্মের অন্তর্নিহিত আদত সত্যকে উপেক্ষা করে তাদের বাইরের খোলসটাকে আঁকড়ে ধরে মনে করি,আমাদের মতো সত্যবিশ্বাসী আর নেই। আমাদের এ অন্ধবিশ্বাস যে মিথ্যা, তা সব চেয়ে বেশি করে জানি আমরা নিজেরাই।'' কাজি নজরুলের ধর্মবোধকে বুঝতে এই কথাগুলো আমাদের কাজে আসবে। এ যেন অনেকটা মীরার কৃষ্ণ ভজনের মতো ব্যাপার। সেরকমই "রাজবন্দির চিঠি' গল্পে—গল্প বিশেষ নেই-- মৃত্যুমুখী কথক তরুণটির অদ্ভুত অভিমান--যাকে সে ভালোবেসে ঘর করেছে, কথক মনে করে সে একটি দিনের জন্যেও তাকে ভালোবাসে নি—বাস্তব যদিও এমন মোটেও না। সেই নারীটিই হয়ে উঠে কথকের আরাধ্যদেবতা। ওকে সে লেখে,""কত জন্ম ধরে তোমায় খুঁজে বেড়িয়েছি এমনই করে, তুমি কিন্তু ধরা দাওনি। …'' চিঠি লেখার উদ্দেশ্য একটাই, অভিশাপ দিয়ে জানানো ""যেন তুমি জীবনে একটি দিন সত্যিকার ভালোবেসে দুঃখ পেয়ে আমার ব্যথা বোঝো!'' আমাদের মনে পড়ছে রাধারমণ দত্তের সেই পদ, "বনমালী তুমি পরজনমে হইয়ো রাধা'। এই চিঠি আদৌ কোনো রাজবন্দি নয়, রীতিমত ভক্ত-সাধকের চিঠি—প্রেম যার দেবতা স্বরূপ। নজরুলের সমস্ত গল্পের উপন্যাসেরই এই মূল সুর।

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথোত্তর কবি লেখকদের দাবি ছিল,তাঁরা চারপাশের বাস্তব জীবনের যন্ত্রণাকে সাহিত্যে নিয়ে আসবেন। এটাই বিষ শতকের আধুনিকতা। নজরুলের গল্পে সেই চারপাশটা নেই। বন্দুক গোলার উল্লেখ না রেখে ঢাল তলোয়ার ঘোড়ার কথা লিখলে একে হাজার বছর আগেকার লোকগল্পের বেশি কিছু মনে হয় না। বাংলার এক কবির প্রেমের গল্পের অধিকাংশ চরিত্রগুলো ঢাকা কলকাতা কুমিল্লা মুর্শিদাবাদের বদলে খামোখা ইরানের গোলেস্তান, কিরগিস্তানের বোস্তান, আফগানিস্তান এই সব এলাকাতেই বাস করে কেন? এর জবার একটাই -- ব্যাপক পার্শি প্রাচীন সাহিত্য পড়বার প্রভাব।প্রথম গল্পের চরিত্র নামেই সেই সাহিত্যের ছাপ অতি স্পষ্ট। নজরুল যে একের পরে এক আধুনিক সুফি গল্প পড়াচ্ছেন আমাদের --এটি জলের মতো স্পষ্ট হয় তাঁর "সালেক' গল্পটিতে এসে। গ্রামে এক দরবেশ এসছেন। সেই দরবেশের কাছে সামাজিক মান প্রতিপত্তি সব হারিয়ে দীক্ষা নিতে ছুটে গেলেন কাজি। দরবেশ গেয়ে উঠলেন গান। কাজি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে! জবাব এল নদীর কলতান থেকে, "" মাতাল হাফিজ!'' এই হাফিজ ইরানের কবি মুহম্মদ সামসুদ্দিন হাফিজ। যার অনেক কবিতাই নজরুল অনুবাদ করেছিলেন।

"বাদল বরিষণে'-তে নায়ক যখন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে কাবুলের আমিরের হয়ে লড়তে যুদ্ধে যাবে তখন মনে হয়—একটি সঙ্গত কারণ রয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ সেনা ছেড়ে  "হেনা'-র প্রেমাষ্পদ যখন সেই একই আমিরের দলে ভেড়ে তখন কোনো যুদ্ধকেই আর রাজনৈতিক কারণে মহৎ বলে মনে হয় না,বিশেষ করে চরিত্রগুলো যখন নজরুলের। "হেনা'-তে  ব্রিটিশ সেনার বেশ প্রশস্তিই গাইছেন নজরুল, গল্পের কথকের আড়ালে। কথক লিখছেন, ""নাঃ, আমিরের হয়ে যুদ্ধ করাই ঠিক মনে করলুম।কেন? এ "কেন'র উত্তর নেই। তবুও আমি সরল মনে বলছি, ইংরেজ আমার শত্রু নয়। সে আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। যদি বলি, আমার আবার এ যুদ্ধে আসার কারণ একটা দুর্বলকে রক্ষা করবার জন্যে প্রাণ আহুতি দেওয়া, তা হলেও ঠিক উত্তর হয় না।আমার অনেক খামখেয়ালির অর্থ আমি নিজেই বুঝি না!'' এই না বোঝাটা কবি নজরুলেরও। বিদ্রোহী কবি এতটা রাজনীতি অসচেতন মানতে যদিও বা আমাদের বেশ কষ্ট পেতে হবে। যখন গল্প লিখছেন তখন তো তিনি বিদ্রোহী কবি। জেল-টেল খেটে ফেলেছেন। তখন এহেন ব্রিটিশ প্রশস্তি মেনে নিতে বেগ পেতে হয়। আমাদের কেবল মনে রাখতে হবে, স্বদেশী আন্দোলন টান্দোলন দেখা দিলেও সাধারণভাবে বাঙালি তথা ভারতীয় মধ্যবিত্তদের মধ্যে ব্রিটিশ তাড়িয়ে স্বাধীনতা পেতে হবে—সেরকম ভাবনা তখনও পাকা হয়ে বসে নি।অহিংসার প্রচারক গান্ধি নিজেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনার পাশে দাঁড়ানো ভারতীয়দের কর্তব্য বলে ভেবেছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধিতা তখন ছিল নিছক নিপীড়ক শাসকের বিরোধিতার মতো—যা স্বাধীন দেশেও আমরা দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু যুদ্ধ বাঁধলে এখনও লোকে ভাবে দেশের সেনার পাশে দাঁড়ানোটাই দেশপ্রেম—এও অনেকটা সেরকমই। তার উপরে ব্রিটিশ সমাজে ব্রাত্য ভারতীয় যেন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে একটি স্বীকৃতি আদায়ের সুখও অনুভব করত। কাজি নজরুলের প্রথম উপন্যাস "বাঁধন হারা'র গল্পও অনেকটা এরকমই। "রিক্তের বেদন'-এ যেখানে প্রেমের সঙ্গে কর্তব্যে দ্বন্দ্ব বাঁধছে—ব্রিটিশ সেনার কর্তব্য পালন করতে গিয়ে ছেলেটির মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল, ""প্রেমের চরণে কর্তব্যের বলিদান দেব?'' এমন যে প্রেমের উচ্ছ্বাস সে একটি বারের জন্যেও প্রশ্ন করল না, একটি দখলদার সেনার হয়ে যুদ্ধটি মহান "কর্তব্য' কেন হবে! আমাদের মনে রাখতে হবে ব্রিটিশ বাহিনী তখন সেখানে অটোমান সাম্রাজ্যের খলিফার পতন ঘটাবার যুদ্ধ করছে। যার বিরুদ্ধে ভারতে খিলাফৎ আন্দোলন দেখা দিলে সেনা থেকে ফিরে এসে নজরুল সেই আন্দোলনের সমর্থনে কলম ধরেছিলেন। সেই যুদ্ধের পরে তুরস্ক স্বাধীন হয় কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে। সেই কামাল পাশাকে নিয়েও নজরুলের একটি বিখ্যাত কাব্য নাটিকা রয়েছে। সেই যুদ্ধের পরে ব্রিটিশ আর ফরাসিরা মিলে অটোমান সাম্রাজ্যকে দখলে রাখতে যেভাবে ভাগবাটোয়ারা করে তার খেসারত এখনও মধ্যপ্রাচ্যকে দিতে হচ্ছে একের পরে এক যুদ্ধে। প্যালেস্টাইনের সংগ্রামও সেই ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা। সেই পাপ-যুদ্ধকে বিনা প্রশ্নে নজরুল মহান মনে করছেন। "অতৃপ্ত কামনা'-র ছকটিও একই। নজরুল যেন ধরেই নিয়েছেন তার গল্পের তরুণটি যুদ্ধে যাবে। "রাজবন্দির চিঠি'-তে আশা করা যেত স্বদেশী সংগ্রামী এসে হাজির হবেন। যেমন নজরুল ছিলেন। কিন্তু না--  প্রেসিডেন্সি জেল থেকে স্ত্রীর কাছে চিঠি লিখছে, বিচারে তার ছোটো হাজতবাস জুটলেও এর আগেই সে যক্ষ্মা রোগে মারা যাবে। যেতে যেতে এই চিঠিতে সে স্ত্রীকে দেশোদ্ধারের কোনো মহৎ কর্তব্যের কথা কিছুই জানায় না। সংসারের কথাও কিছু লেখে না। লিখে জানায় প্রেমের অভিমান। ফলে ব্রিটিশ বিরোধিতা না থাক, কিন্তু যুদ্ধ যে হচ্ছে কেন—সেই তথ্যটুকুও যখন গল্পে মেলে না তখন পাঠককে বুঝে নিয়ে বেগ পেতে হয় না, আমাদের বুঝে নিতে হয়—রাজনৈতিক যুদ্ধটি এখানে গৌণ, মুখ্য যুদ্ধ হচ্ছে বিরহীর মনে।


"বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী'-র গল্পটি ইতিমধ্যে মৃত সহযোদ্ধার থেকে শোনা। আমাদের মেনে নিতে অসুবিধে নেই—প্রায় প্রতিটি গল্পই হয় সেনা শিবিরে শোনা অথবা সেই ছকে তৈরি করা। যুদ্ধ একটি ছক মাত্র। এবং এই ছকে বাঁধতে গিয়ে অধিকাংশই গল্প-রসে সিক্ত হতে পারে নি, না প্রেমের গল্প হিসেবেও নয়। প্রথম গল্প "ব্যথার দান'-এ টানা গল্প বিশেষ কিছু নেই বলে গল্পের বুনোনটি ধরা কঠিন-- বুঝে নিতে হয়। "হেনা'-ও তাই, অনেকটা দিনলিপির আদলে লেখা। প্রথম সংকলনের শেষ "গল্প' "রাজবন্দির চিঠি' বা দ্বিতীয় সংকলনের শেষ "গল্প' "দুরন্ত পথিক'-কে তো অনায়াসে সংকলনের বাইরে ঠেলে দেওয়া যায়, তা করাই উচিত। "সাঁঝের তারা' গল্পটির শুরু হয়ে এই বলে যে ""সাঁঝের তারার সাথে যেদিন আমার নতুন করে চেনা-শোনা, সে এক বড়ো মজার ঘটনা।'' কিন্তু এর পরে আর কোনো ঘটনার সন্ধান করে পাঠককে হতাশ হতে হয়,মজার তো কোনো প্রশ্নই উঠে না। তৃতীয় সংকলনের শেষ গল্প "শিউলিমালার' ব্যারিস্টার নায়ক আজহার যখন শিলং পাহাড়ে গিয়ে প্রেয়সীকে পেয়েও রেখে আসে—আমাদের "শেষের কবিতা' উপন্যাসের কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস পড়ে—কী হতে পারত, আর কী হল! "শেষের কবিতা' কিন্তু ততদিনে প্রকাশ পেয়ে গেছে।

মাটির ছোঁয়াতে যে গল্পগুলো একাধিকবার পড়বার ইচ্ছে করবে তার মধ্যে রয়েছে সেই দ্বিতীয় সংকলনের "রাক্ষুসী' গল্প। তৃতীয় সংকলনের "পদ্মগোখরা', "জিনের বাদশা' এবং "অগ্নিগিরি'। এর মধ্যে "জিনের বাদশা'-তে আগেই লিখেছি প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে  শয়তান প্রেমাষ্পদ পরিণত হয় সুবোধ বালকে। "রাক্ষুসী'-তে পরকীয়ার পাপে লিপ্ত স্বামীকে পাপ-মুক্ত করতে গিয়ে স্ত্রী যখন তাকে হত্যা করে প্রথমে আইনের শাস্তির মুখে পড়ে এবং পরে সন্তান সহ সামাজিক প্রত্যাখ্যানের মুখে বিড়ম্বিত হয়—একটি মোক্ষম অনুভব সে উচ্চারণ করে, ""আমি যদি ওইরকম একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসতুম আর যদি আমার সোয়ামি ওই জন্যে আমাকে কেটে ফেলত, তাহলে পুরুষেরা একটি কথাও বলত না। তাদের সঙ্গে মেয়েরাও বলত, "হাঁ, ওরকম খারাপ মেয়েমানুষের ওই রকমেই মরা উচিত। কারণ তারাও বরাবর দেখে আসছে, পুরুষদের সাত খুন মাফ।''' বিদ্রোহী কবির সঙ্গে তাঁর গল্পে এই প্রথম আমাদের সরাসরি আলাপ হবে।

রচনাশৈলীর দিক থেকে "বাদল বরিষণে' কবির কলমে তৈরি কাব্যিক গদ্য হিসেবেই এটি সুখপাঠ্য। এতে বেশ কিছু হিন্দি ভজন এবং লোকগানের কলি আছে। "মেহের নেগার'-ও গানে, কাব্যিক গদ্যে রূপকের আশ্রয়ে বুনোট এবং ভাষার জন্যে একটি সুখপাঠ্য গল্প হয়ে উঠে। প্রেমাস্পদের কাব্যিক গদ্য আরব সাগরের বেলাভূমি ও আশপাশের প্রকৃতির সঙ্গে এবং কোনো অতীত প্রেমিকার স্মৃতির সঙ্গে মিশে যদি আনন্দ দিতে সমর্থ হয় পাঠককে -- তবে এটিই প্রাপ্তি। এর বেশি কিছু নেই। শেষ গল্প "শিউলিমালা'-র রসোদ্ঘাটন অসম্ভব হবে যদি ভাষার শৈলীর ভেতরে প্রবেশ না করা যায়। "রাক্ষুসী'-র ভাষা বয়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবারে কথক একটি নারী। সে কথা বলছে বীরভূমের বাগদিদের ভাষাতে। পুরোটাই ও কোনো মহিলাকে বলছে, শ্রোতার দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না জানিয়েই থেমে গেছেন লেখক। তৃতীয় গল্প সংকলনে এসে গল্পগুলো যেন অনেকটা চেনা ছকে এসে ঢুকেছে। যদিও রয়েছে সেই প্রেমের গল্পই। এবারে কোনো কথক নয়, গল্প বলছেন লেখক স্বয়ং। "পদ্মগোখরা' অনেকটা লোক কাহিনির গুপ্তধন পাবার রোমাঞ্চকর গল্পের মতো। সেই গুপ্তধনকে আলগে রাখে এক জোড়া পদ্মগোখরা সাপ। এরা আবার দুধও খায়, পোষও মানে। গল্পটিতে বেশ কিছু বাঁক আছে, ছোটো করে বলাও কঠিন। আরিফ আর জোহরা স্বামী স্ত্রী। এই গল্প সাপদুটিকে সন্তানবৎ ভালোবেসে গৃহবধূ জোহরার বিড়ম্বনার কাহিনি। "জিনের বাদশা'-ও সেই পুথি সাহিত্যের রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনির আদলেই লেখা। যদিও এতে কিন্তু জিন ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১৯১৩-১৪ সনে নজরুল ময়মনসিংহ জেলাতে এসে ষষ্ঠ সপ্তম শ্রেণিতে পড়েছিলেন। ফলে সেখানকার ভাষা জনজীবনের সঙ্গে তাঁর আলাপ ছিল। নজরুলের গল্পে আমরা দেখব, শুরু থেকেই তিনি প্রমথ চৌধুরি-রবীন্দ্রনাথ জুটি প্রচলিত প্রমিত ভাষার আশ্রয় নিচ্ছেন। এবং দরকারে আঞ্চলিক ভাষা বৈচিত্র্যও ব্যবহার করছেন। আধুনিক সাহিত্যের যা একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।রাক্ষুসী গল্পে বাগদিদের ভাষা ব্যবহারে শুরু।"জিনের বাদশা'-তে সংলাপ অংশের পুরোটিতেই তিনি ব্যবহার করেছেন ময়মনসিংহী ভাষা। যেমন আল্লারাখার সংলাপে আছে,""এই দিক দিয়া যাইতেছিলাম,দেহি কেডা জলে ভাসতে আছে, দেইহ্যা ছুড্যা জলে লাফ দিয়া পরলাম, তুইল্যা দেহি তুমি! আল্লারে আল্লা, খোদায় আনছিল আমারে এই পথে, নইলে কি অইত! কী অইছিল তোমার?'' এমনি একটি ময়মনসিংহের প্রেক্ষাপটে গল্প "অগ্নিগিরি'। সংলাপে ময়মন সিংহের ভাষা সেই গল্পেও ব্যবহৃত হয়েছে। নূরজাহানের যে কথাতে সুপ্ত অগ্নিগিরি সবুর বিস্ফোরিত হল –সেটি এরকম, "আপনি বেডা না?...আল্লায় আপনারে হাত-মুখ দিছে না।'


নজরুলের ছোটো গল্পগুলোর ভাষা বয়ন এই "শিউলিমালা'-র চারটি গল্পে এসে পুঁথিসাহিত্যের আবহ থেকে বেরিয়ে আসছিল। তাঁর কোনো গল্পেরই ভাষা অলঙ্কার নির্মাণ দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যায় না। কিন্তু আগেকার গল্পগুলোর ভাষাতে কবি নজরুল ছাপিয়ে যাচ্ছিলেন, এই সংকলনেই কথাশিল্পীর স্থৈর্য ধৈর্য গাম্ভীর্যকে তিনি রপ্ত করছিলেন। কিন্তু এরপর আরও এক দশকের বেশি তিনি সক্রিয় থাকলেও ছোটো গল্পে তাঁকে আর পাওয়া গেল না। নাগরিক পরিবেশের গল্প হলেও বিচ্ছেদের মধ্যে প্রেমসাধনার যে ছক—সেই ছক থেকে কিন্তু এই "শিউলিমালা' গল্পতেও তিনি বেরোন নি। পদ্ম গোখরা গল্পে যেমন সাপে দুধ খায় না, তিনি খাইয়েছেন—এই গল্পে শিলঙে শিউলি ফুল ফোটে না—তিনি ফুটিয়েছেন। এই সব ত্রুটি রয়েছে। সেই সঙ্গে আমরা এও মনে করিয়ে দিতে চাই—রুমি, খৈয়াম, হাফেজ, শিরাজের সঙ্গে নজরুলের প্রতিটি গল্পে সুযোগ পেলেই রবীন্দ্রসঙ্গীত বা কবিতার থেকে উদ্ধৃতি কিন্তু রয়েছে।

তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা চারটি। শেষ উপন্যাস জীবনের জয়যাত্রা (১৯৩৯)-- কিন্তু সেটি দুর্লভ। "বাঁধন হারা' (১৯২৭) , ১৯৩০-এর "মৃত্যু ক্ষুধা' (১৯৩০) এবং "কুহেলিকা' (১৯৩১) -- তিনটি উপন্যাসেই কিন্তু নায়কের দুজন করে প্রেমাস্পদ। কারও সঙ্গেই তাদের মিলন হয় না। একজন নিছক ব্রিটিশ সেনার যোদ্ধা, একজন কমিউনিস্ট, আর জন স্বদেশী বিপ্লবী। তাও ছাপিয়ে গেছে সাধক সত্তাই। বিদ্রোহী নয়। আমরা পরিসরের কথা ভেবে সেগুলো নিয়ে বিস্তৃত আলোচনায় যাচ্ছি না।

ভক্তির থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাঁর  বিদ্রোহী সত্তাকেও বোঝাই যাবে না।বিদ্রোহী কবিতাতেও যখন লেখেন, আমি ভৃগু—ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন—তখনও কিন্তু তিনি একাধারে ভক্তের বিদ্রোহের কথাই লিখেছেন। তাঁর সম্পাদিত কাগজ "ধূমকেতু' নিষিদ্ধ হয়েছিল। তাঁর জেল হয়েছিল। মামলা চলাকালে আদালত তাঁর বক্তব্য শুনতে চাইতে তিনি লিখিত জবাব দেন। নজরুলের একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ "রাজবন্দির জবানবন্দি'। সেখানেই তিনি লিখেছেন, ""আমার এই দেহ-মন্দির জাগ্রত দেবতার আসন বলেই তো লোকে এ-মন্দিরকে পূজা করে, শ্রদ্ধা দেখায়, কিন্তু দেবতা বিদায় নিলে এ শূন্য মন্দিরের আর থাকবে কি? একে শুধাবে কে? তাই আমার কণ্ঠে কাল-ভৈরবের প্রলয়তূর্য বেজে উঠেছিল, আমার হাতে ধূমকেতুর অগ্নি-নিশান দুলে উঠেছিল, সে সর্বনাশা নিশানপুচ্ছে মন্দিরের দেবতা নট-নারায়ণ-রূপ ধরে ধ্বংস-নাচন নেচেছিলেন। এ ধ্বংস-নৃত্য নব সৃষ্টির পূর্ব-সূচনা।'' এক মুসলমান কবির কলমে ধ্বংসের দেবতা নটরাজের কল্পনাকে কেবল রূপক উপমা ভাবার কোনো কারণ নেই। এক্কেবারে এই সব লালনের গানের "খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়'-এর মতো ব্যাপার স্যাপার। লালনের গানে যেমন আকুতি আছে "মিলন হবে কত দিনে/আমার মনের মানুষের সনে।।' নজরুলের দেবতা সেই মনের মানুষ। লালন হাছনের গানেও আমরা মনের মানুষকে কখনও আল্লাহ কখনও কৃষ্ণরূপে দেখেছি। নজরুল সেই পরম্পরারই ধারক ছিলেন। কিন্তু লালনের গানে তো আর শিব কালী দুর্গা দশমহাবিদ্যার দেখা মেলে না, নজরুলের গানে—তাও মেলে। সেই সবও নতুন কিছু নয়। আজকাল আমরা প্রবল হিন্দু মুসলমানের বিরোধের কথা শুনি, এককালে শাক্ত বৈষ্ণব শৈবেও প্রবল বিরোধের গল্প শোনা যেত। কিন্তু ভারতীয় সমাজে তো বটেই বাংলার সমাজেও গোটা মোঘল জমানাতে এই সব বিরোধের বিশেষ রাজনৈতিক কারণ ছিল না। যোগ তন্ত্র বৌদ্ধ এবং সুফি ধর্মচর্চার মধ্যে ব্যাপক লেনদেন গড়ে উঠেছিল। ভারতীয় যোগ তন্ত্র সাধনাকে সুফিরা গোটা বিশ্বে নিয়ে গিয়েছিলেন। এদের এত বিচিত্র রূপ গড়ে উঠেছিল যে কারও কারও ধর্মাচারকে আজকের দিনে ঘোর কুসংস্কার বলেই মনে হবে। কিন্তু সেই সব কুসংস্কারের বিপদ যদিও বা কিছু ছিল সেই সব আজকের "আধুনিক' ধর্মরাজনীতির মতো ভয়াবহ কিছু ছিল না। সেদিক থেকে নজরুল অনেক "প্রাচীনপন্থী'ই ছিলেন। তাঁকে কষ্ট করে "অসাম্প্রদায়িক' হতে হয় নি। আজকাল অসাম্প্রদায়িকতার প্রমাণ দিতে হয়, বিশেষ করে মুসলমানদের। আপনি যদি অযোধ্যাতে রামমন্দিরের পক্ষে দাঁড়ান—তবে আর আপনি সাম্প্রদায়িক নন। মুসলমান হলে তো আপনি একটু বেশিই "অসাম্প্রদায়িক'। ভালো মুসলমান। আজকের এই রাজনীতি দেখা দিচ্ছিল মাত্র নজরুলের কালে। তাই তাঁকে কবিতাতে প্রশ্ন ছুঁড়তে হয়েছে, ""হিন্দু না ওরা মুসলিম এই জিজ্ঞাসে কোন জন হে, কাণ্ডারি বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা'র …''  এই সব দেখায় আমরা সামাজিক ইতিহাসে সামনের দিকেই হাঁটি না কেবল, কখনও পেছনের দিকেও এগোই। নজরুলকে সুফি, যোগী, তান্ত্রিক—যাই বলি না কেন---সে একদিকে যেমন আজকের আচার উৎসব আড়ম্বর সহ সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট ধর্মের থেকে উন্নত ছিল—যেমন ছিল লালন হাছন রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা। আর দিকে নজরুল প্রবল কুসংস্কারেও মজেছিলেন। লোকে বলেন,তাঁর পুত্র বুলবুলের অকাল মৃত্যুতে মনে শান্তির সন্ধানে তিনি যোগীরাজ বরদাচরণের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন—কিন্তু আসলে যখন তিনি ভালো করে কবিতা লেখাও শুরু করেন নি—নিতান্ত কিশোর—সেই কালেই নানা তীর্থে সাধু সঙ্গের সন্ধানে ছুটতেন। তারাপীঠ, আদ্যাপীঠ, দক্ষিণেশ্বর ছাড়াও আরও বহু ঠাঁই ঘুরেছেন। তারাপীঠের সাধক বামাক্ষ্যাপার কাছে বহুবার গিয়েছিলেন। কেবল ছেলের মৃত্যুর পরে তিনি বরদাচরণের কাছে পৌঁছান। তাঁর কাছে তিনি আশা করেছিলেন, ছেলেকে বাঁচিয়ে ফেরাবেন। সেটি তিনি করেন নি। অথচ, একদিন বুঝি ধ্যানে বসিয়ে ছেলেকে দেখিয়েছিলেন এমন একটি গল্পও আছে। ওখানেই শেষ নয়, উত্তর কলকাতার ভাড়া বাড়িতে রীতিমত কালী মূর্তি গড়িয়ে পূজাআচ্চাও করেছেন। যিনি দেশের মুক্তির স্বপ্ন দেখছিলেন, তিনিই কিনা ব্যক্তিগত জীবনে আধ্যাত্মিক মুক্তির সন্ধান করতে করতে এত দূর এসে পৌঁছেছিলেন। মানব সভ্যতা তথা ধর্মের ইতিহাসে মূর্তি পূজার বাইরে বেরিয়ে নিরাকার এক ঈশ্বরের সেবাকে অগ্রগমন বলে মানা হয়। এমনতর মানবার পক্ষে প্রচুর যুক্তি আছে। কিন্তু যেমন বিবেকানন্দ মূর্তিপূজা নিয়ে পালটা যুক্তি দিয়ে উনিশ শতকের বাংলার ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে বিপরীত পথে হাঁটিয়েছিলেন, ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলনকে প্রান্তে ঠেলে দিয়েছিলেন—মুসলমান নজরুল ব্যক্তিজীবনেই এমন উলটো পথে হেঁটেছিলেন। আর তাঁর এই ধর্ম জিজ্ঞাসার কথা তিনি খুব সংক্ষেপে গুরু বরদাচরণের বই "পথহারার পথ ও দ্বাদশ বাণী'-র ভূমিকাতে লিখেছিলেন। বরদাচরণের অত্যন্ত প্রিয় শিষ্য ছিলেন কাজি নজরুল। এখানেই আসতেন নেতাজি সুভাষও। সুভাষে নজরুলে দেখাদেখি ওখানেই হয়। বরদাচরণের একাধিক মুসলমান শিষ্য ছিলেন। নজরুল সবার মধ্যে প্রিয়। তাঁকে "কাজিভায়া' বলে ডাকতেন। নিজের গ্রন্থের ভূমিকা লেখাবার জন্যে কাজিভায়াকেই তাঁর মনে হল সবচাইতে যোগ্য ব্যক্তি। সেই ভূমিকা "যোগসাধনা' নামে নজরুলের কোনো কোনো প্রবন্ধ সংকলনে মেলে। আর মেলে "ভক্তিগীতি মাধুরী' নামে নজরুলের ৫০১-টি ভক্তি গীতির সংকলনের শুরুতে। ভূমিকাতে নজরুল নিজের কথাই লিখেছেন বেশি, কীভাবে জীবনের শুরুর দিকে ধর্ম জিজ্ঞাসার সূত্রপাত, মাঝে রাজনৈতিক ঝড়ঝঞ্ছাতে উড়ে বেড়ালেন—এবং পুত্র মৃত্যুর পরে বরদাচরণের কাছে গিয়ে স্বস্তি পেলেন। "ভক্তিগীতি মাধুরী' বইটিরও বুঝি নজরুলের নিজের লেখা একটি ভূমিকা ছিল। কোনো কোনো সমালোচক লিখেছেন,সেই ভূমিকাতে বইটি সম্পর্কে লেখা ছিল, ""তিনি (বরদাচরণ মজুমদার) এই গ্রন্থ-গীতার উদগাতা।'' এই মাধুরী বইটি দেখেছি। কলকাতার করুণা প্রকাশনী থেকে ছাপা। সেখানে নজরুলের এই ভূমিকাটি নেই। নজরুল-রচনাবলীর সম্পাদকেরাই লিখেছেন তাঁর লেখালেখি খুঁজে পাওয়া এক কঠিন কাজ, খুবই অগোছালো ছিলেন। তবু নজরুল যেমন ভাবাবেগ সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন, অসম্ভব নয়  যে নিজের বইটিকে "গীতা' বলবেন। এবং সেই গীতা পড়ে বিশ একুশ শতকের মানুষ ধর্মীয় সমস্ত গোঁড়ামির থেকে বেরিয়ে আসবেন। বাস্তবে এটা হয় নি। হিন্দুতে মুসলমানে নজরুলও বিভাজিত হয়েছেন। শ্যামা সঙ্গীতে তাঁর নাম সাধক কমলাকান্তের পরেই নেওয়া হয়ে থাকে। নজরুলের গান না জেনেই প্রচুর কট্টর সাম্প্রদায়িকের ঘরেও দীপাবলির দিনে নজরুলের গান বাজে। তাঁর ইসলামী গান বা গজলগুলো কিন্তু বাজে না। হিন্দুরা সাধারণত তাঁর এই সব গান করেন না। খুবই স্বাভাবিক তাঁর শ্যামা সঙ্গীত গান করেন—এমন মুসলমানের সংখ্যাও খুবই বিরল। "ভক্তিগীতি মাধুরী'-তে সকল রকমের গানই রয়েছে।


        এহেন "ভক্তি' ব্যক্তি-নজরুলকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সেই ভক্তিকে কাব্য বা সঙ্গীতের ভাষাতে প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি সুর তাল লয় ছন্দ রাগ নিয়ে প্রচুর মেতেছেন—অন্যথা তাঁর গান কবিতা এত জনপ্রিয় হত না। কিন্তু সমান তালে যে সমাজকে তিনি উপড়ে ফেলে দেবার স্বপ্ন দেখেছিলেন—সেই সমাজ নিয়ে খুব গভীরে গিয়ে ভেবেছিলেন এমনতর আমাদের মনে হয় নি। তাঁর "আধ্যাত্মিকতা' এমন আরও কিছু নিবন্ধে যতটা গভীর জিজ্ঞাসা নজরে আসে ততটা গভীর জিজ্ঞাসা কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রবন্ধে মেলে না। সেখানে আবেগের ছড়াছড়ি। সঙ্গে কবিসুলভ রূপক উপমার। তাঁর "রাজবন্দির জবানবন্দি' প্রবন্ধটিও এর ব্যতিক্রম নয়। তিনি যদিও রুশ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন কবিতাতে—বাস্তবে বহু বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন স্বাধীন তুর্কির গণনায়ক কামাল আতাতুর্কের দ্বারা। এই কথা লিখেছেন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বহু খণ্ডে নজরুল রচনাবলীর সম্পাদক আব্দুল কাদির। যুদ্ধ থেকে ফিরে তিনি গান্ধির আহ্বানে খিলাফৎ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন—কিন্তু সে কোনো ধর্মীয় আবেগ নয়—আন্দোলনটির ব্রিটিশ বিরোধী চরিত্রের জন্যে। ফলে যখন সেই খিলাফতের পতন হল এবং কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্কের ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধ এবং দেশ পুনর্গঠন চলল—নজরুল আতাতুর্কের মধ্যেই স্বাধীনতার মানে সন্ধান করে ফিরলেন। বাংলাদেশে এর পরে যদি তিনি কোনো নেতৃত্বকে বরণ করেছিলেন -- তিনি ব্যাঙ্গল প্যাক্টের রূপকার চিত্তরঞ্জন দাস। ১৯২৩-এ যে চুক্তি বাংলাতে হিন্দু মুসলমান ঐক্যের একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। চিত্তরঞ্জন ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী দুজনেই চুক্তির ফলে কলকাতা মহানগরের মেয়র ও ডেপুটি মেয়র হয়েছিলেন। কিন্তু জাতীয় কংগ্রেস সেই চুক্তিকে অনুমোদন করেনি। বছর তিনেক ধরে এই নিয়ে রাজনৈতিক তর্ক বিতর্ক ছিল। ১৯২৫-এ চিত্তরঞ্জন দাশের অকাল মৃত্যুতে সেই চুক্তির টিকে থাকার সম্ভাবনা ফুরিয়ে এল। ১৯২৬-এ কৃষ্ণনগরে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে চুক্তিটি নাকচ হলে নজরুল প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়েন। সেই সম্মেলনের শুরুতেই উদ্বোধনী সঙ্গীত হিসেবে তিনি "কাণ্ডারি হুশিয়ার' গানটি রচনা করেন। সেই সম্মেলনেই ঘটনা গানটির বাণীর বিপরীত ঘটল। সেই বছরে তিনি আইনসভাতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও পরাজিত হন। কংগ্রেস তাকে সমর্থন করেনি। তারপরেও তিনি কংগ্রেসের সমাজবাদী অংশটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। কিন্তু ১৯৩০-এ ছেলে বুলবুলের অকাল মৃত্যুর পরেই রাজনীতির জগত থেকে ক্রমাগত সরে আসতে থাকেন। নইলে একসময় শ্রমিক কৃষক দলেও জুড়েছিলেন, কৃষক মৎস্যজীবীদের সম্মেলনেও তাঁকে যেতে দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু রাজনীতির রহস্য তাঁর কাছে ক্রমশ ধোঁয়াশা ঠেকছিল। তার কারণ, তিনি কখনই সেই রহস্যের গভীরে প্রবেশের চেষ্টাই করেন নি। ধর্মে যদি তিনি আশা করেছেন, লোকে বাইরের খোলস ছেড়ে অন্তরের সত্যের সন্ধান করবে, রাজনীতিতে তিনি বাইরের খোলস ভেদ করতেই পারেন নি। শ্রমজীবীদের কথা গানে থাকলেও দীন দরিদ্র ঘরের সন্তান নজরুল ক্রমেই মধ্যবিত্ত শ্রেণিটির প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করেন। আমরা যে গল্প উপন্যাসের কথা বলে এলাম সেগুলোর প্রায় সবকটাই ১৯৩০-এর আগেকার লেখা, যখন তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়। গল্পে তার প্রতিধ্বনি শুনি না ঠিক এরই জন্যে।

আরও দুই একটি তথ্যের উল্লেখ থাকা ভালো। প্রথমত ছেলেবেলা নজরুল লেটোর গানে, কবিওয়ালাদের দলে ব্যাপক যোগ দিয়েছেন। সেসব বাংলার লোকসংস্কৃতির পরম্পরা। যদিও বা জনপ্রিয় মত হচ্ছে মেয়েদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রচারের জন্যে বিদ্যাসাগর প্রমুখকে লড়তে হয়েছে, বেগম রোকেয়াকে লড়তে হয়েছে—হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মেয়েদের মধ্যে পুথি সাহিত্যের ব্যাপক চল ছিল। তাই নজরুলের প্রায় সব রচনাতে সেই সব পুথির উল্লেখ মিলবে। পদ্মগোখরার গল্প তাই তাঁর কলমেই সম্ভব। "কুহেলিকা' উপন্যাসে তহমিনার স্কুলে যাবার কোনো সংবাদ নেই—কিন্তু ওর বুদ্ধি ও সপ্রতিভ যুক্তি তর্কের সামনে বিপ্লবী জাহাঙ্গীরও বলছে, এই সব অতিরিক্ত নভেল পড়বার ফল।


শেষ যে তথ্যটির উল্লেখ আমরা করব, সে হচ্ছে নজরুলের বিয়ে হবার কথা ছিল বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ আলি আকবর খানের ভাগ্নি নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে। আলী আকবর খানেরই ইচ্ছে ছিল এই বিয়ে হোক। তিনি কলকাতাতে নজরুলের পাশেই থাকতেন। তিনি তাঁকে নিয়ে কুমিল্লা যান। অর্ধেক বিয়ে হয়েও যায়। আকিদা হয়ে গেছে। কাবিনের সময় সর্ত দেন নজরুলকে ঘর জামাই হয়ে থাকতে হবে। এ ছাড়াও আলী আকবর আরও কিছু অন্যায় করেছিলেন, নজরুলের চিঠি যাতে অন্যে না পায়, অন্যের চিঠি নজরুল না পান—সেই ব্যবস্থাও করেছিলেন। নজরুল বিয়ে অসম্পূর্ণ রেখেই চলে আসেন। পরে তিনি কুমিল্লারই আশালতা সেনগুপ্তকে বিয়ে করেন। তাঁর তথা তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কংগ্রেসের সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সূত্রেই। ১৯২১-এ প্রথম এবং এর পরে একাধিকবার ওদের বাড়িতে যান। এই যোগাযোগও আলি আকবর খানের সুবাদেই হয়েছিল। আশালতার সঙ্গে বিয়েতে সামাজিক আপত্তি অনেক উঠেছিল। সব ডিঙনো সম্ভব হয়েছিল আশালতার বিধবা মা গিরিবালা দেবী অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে। এই যে এক যাত্রাতে দুই নারীর সঙ্গে প্রেম ও বিবাহ, গিরিবালা দেবীর উদ্যোগ -- এর ছায়া নজরুলের কুহেলিকা উপন্যাসে রয়েছে। প্রমীলা দেবীকে তিনি তাঁর দোলন-চাঁপা কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেন। অন্যদিকে নার্গিস আসার খানমকেও তিনি কোনোদিনই ভোলেন নি। "চক্রবাক' কাব্যগ্রন্থের বহু কবিতা তাঁকে নিবেদন করে লেখা। প্রায় ষোল বছর নার্গিস নজরুলে কোনো যোগাযোগ ছিল না। যোলবছর পরে নার্গিসই নজরুলকে চিঠি লেখেন। জবাবে নজরুল যা লেখেন, সেটি আমরা পড়েছি। এর শেষে "চক্রবাক' কাব্যটির কথাও আছে। সেই চিঠিতেই বোঝা যাবে তখনও নার্গিসের প্রতি নজরুলের কতটা ভালোবাসা ছিল, যদিও বলছেন এই তাঁর শেষ চিঠি। ""আমার অন্তর্যামী জানেন, …তোমার যে কল্যাণ-রূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথমে দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালোবাসার অঞ্জলি দিয়েছিলাম সে-রূপ আজও স্বর্গের পারিজাত-মন্দারের মতো চির-অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। অন্তরের আগুন বাইরের সে ফুলহারকে স্পর্শ করতে পারেনি। '' এটি পরিষ্কার যে এই আগুনের আঁচেই নজরুলের প্রতিটি গল্প কবিতাও তৈরি হয়েছে।