আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Monday, 23 May 2016

১৯৮৩র অসম: নিপীড়িত বাঙালি হিন্দু-৩




মূল অসমিয়াঃ দিগন্ত শর্মা
বাংলা অনুবাদ: সুশান্ত কর
                          
                    ( শিলচর থেকে প্রকাশিত "অরুণোদয়' কাগজে বেরুচ্ছে ধারাবাহিক। ক্লিক করুন প্রথম অংশ এবং দ্বিতীয় অংশ পড়তে)




নদী পাড়ের ঝোপেঝাড়ে শকুন উড়েছিল
(অরুণোদয়, মার্চ ২০১৬)
বৃহত্তর আর্নে চরঅঞ্চলের অন্তর্গত টেঙানি-নলবাড়ি গ্রামে অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদীদের আক্রমণের খবরে নিমেষে কাছের গ্রামগুলোতেও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। ভোর রাতে যখন তারা টেঙানি-নলবাড়িতে    আগুনের লেলিহান শিখা দেখেছিলেন তখনই সবাই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু পানবাড়ি, শিবনগর, আর্নে, কাকোবাড়ি, মুক্তিয়ার, মাণিকপুর, আর্নে তিরাশি ইত্যাদি গ্রামের মানুষ ভাবতেই পারেন নি যে অচিরেই তারাও আক্রমণের মুখোমুখি হবেন।
            পানবাড়ি শিবনগর গ্রামের তিনকুড়ি বছরের বয়স্ক ব্যক্তি লালমোহন দেবনাথ বললেন, “ তিরাশি সনে পানবাড়ি শিবনগর গ্রামে প্রায় ৫০টার মতো পরিবার বাস করতো। ফেব্রুয়ারি মাসের সেই আক্রমণে এই সমস্ত পরিবার তাদের বাড়িঘর সব হারালো। প্রথমে আমরা গ্রামের মানুষ আক্রমণকারীদের বাধা দিতে গেছিলাম। কিন্তু বাধা দিতে গিয়েই বুঝতে পারলাম এতো হাজার হাজার মানুষকে বাধা দেবো কী করে? শেষে পিছিয়ে এলেন আমাদের গ্রামের লোকেরা। যদিও ওরা গ্রামের বহু মানুষকে হত্যা করেছিল, অনেকেই ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের দিকে পালালেন। কেউ কেউ নৌকা করে নদী পার করে ডিব্রুগড় গিয়ে পৌঁছুলেনবাকিরা ব্রহ্মপুত্রের কাছেই ঝোপেঝাড়ে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টা করলেন। ”
কালীদাসী মালোদাস
            গ্রামের সবাই প্রাণ বাঁচাতে কি পারলেন? ---আমাদের এই প্রশ্ন শুনে লালমোহন কিছু সময় চুপ করে রইলেন। তিনি যখন বলছিলেন পানবাড়ি শিবনগরের   আরো কিছু মানুষ সেখানে ছিলেন। কিন্তু লালমোহন দেবনাথের কথার উপরে কেউ কথা বলছিলেন না। লালমোহনের নীরবতা পুরো পরিবেশটাকেই নীরব করে ফেলল। (আমরা তাঁর বাড়ির উঠোনে বসেই কথা বলছিলাম।)  নীরবতা ভেঙ্গে লালমোহন দেবনাথ আবার বললেন, “ ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের জঙ্গলে লুকিয়েও আমাদের বহু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পারেন নিহাজার হাজার লোকে ঘেরাও করে সেই জঙ্গলের ভেতরেই বহু মানুষকে মেরে ফেলল। প্রাণ বাঁচাতে কেউ কেউ সেখান থেকেও দৌড়েছিলেন, কিন্তু পারেন নি। ঘিরে ফেলে কুপিয়ে কুপিয়ে , নইলে তির ছুঁড়ে মেরে ফেলল।  পরদিন আমাদের এলাকা পুরো যখন ঘুরে দেখেছিলাম নদীর কাছে বেশ কিছু মৃতদেহ। একজন ছিলেন বনমালী শর্মা, তাঁর মৃতদেহ দেখেছি বাঁধের উপরে।  আর তিনটা মৃতদেহ নদীর কাছে পেয়েছিলাম , তিনজনকেই টুকরো টুকরো করে কেটেছিল। দিন কয় আমরা সবাই দেখেছি  ঐ ঝাড়ের উপরে ঝাঁক বেঁধে শকুন উড়তে দেখেছি।  কাক উড়ছিল শয়ে শয়ে। জঙ্গলের ভেতরে শেয়াল-কুকুরের হাঁক শুনেছি।   সেসব শুনে দেখে আমরা গ্রামের সব মানুষই নিশ্চিত সেখানে প্রচুর মৃত দেহ ছিল। আজ অব্দি আমাদের গ্রামের বহু মানুষ নিরুদ্দেশ।    যারা ঘর-বাড়ি হারিয়েছিলেন তারা বহুদিন কাছের ভৈরবপুরের আশ্রয় শিবিরে ছিলেন।   আমরাও ছিলাম। কিন্তু শিবিরের অবস্থাও এতোই জঘন্য ছিল যে সেখানেও চিকিৎসার অভাবে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। আমার মনে আছে,  তাদের মধ্যে একজন ছিলেন দশরথ দেব।    
            লালমোহন দেবনাথকে আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনাদের উপরে আক্রমণ কারা , কেন করেছিল---আপনি কিছু জানতে পেরেছিলেন?
            “ হ্যাঁ, ঘটনার পরে জেনেছি।” তিনি আবার বললেন, “আর্নে চরআঞ্চল এলাকার বা পানবাড়ি এলাকার মানুষকে ‘বিদেশী’ বলে আক্রমণ করেছিল। বাঙালি দেখে দেখে আক্রমণ করেছিল। আমাদের গ্রামের কাছেই একই এলাকার মিসিং , হাজং ইত্যাদি আর যেসব জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন তাদের উপরে করে নি। বেছে বেছে বাঙালি সম্প্রদায়কেই আক্রমণ করেছিল। অসমের বিদেশী বিতাড়নের আন্দোলনকারীরা স্থানীয় কিছু মানুষকে দিয়ে এই কাজ করিয়েছিল। আমাদের বাঙালিরাও কোথাও কোথাও প্রত্যাক্রমণ করেন, তাতে তাদের অনেকেও মারা গেছিলেন বা আহত হয়েছিলেন। তাতেই প্রমাণ---আক্রমণকারী ছিল কারা। ...”
            “এখানে আপনার কখন থেকে বাস করছেন?”
            “ ১৯৬৬তে এখানে এসেছি। এর আগে আমার বাবা থাকতেন ত্রিপুরার আগরতলাতে। এখানে যখন আসি    তখন আমি ছোট ছেলে।” আক্ষেপের স্বরে তিনি বললেন, “ তখন থেকেই এখানে বাস করছি। এই মাটিগুলো ব্রহ্মপুত্রের চরের মাটি। খুব ভালো খেত কৃষি হয়। আমরা যখন এসেছি, তখন থেকেই পাশের মিসিং আর অন্যান্য জনগোষ্ঠীর লোকজনের সঙ্গে মিলেমিশে বাস করছিলাম। বানের সময় যেমন সবাই মিলে বাঁধে বা অন্যান্য উঁচু জায়গাতে আশ্রয় নিই , হাটে বাজারেও একই সঙ্গে যাই আসি, কাজ কর্ম করি। কিন্তু ১৯৮৩র ফেব্রুয়ারিতে যেন কেন আমাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দিল। শ’য়ে শ’য়ে বাঙালি মারা গেলেন, হাজারে হাজারে  পঙ্গু হলেন।  ...” 
            লালমোহন দেবনাথের মতো ২নং আর্নে চরাঞ্চলের  বছর ষাটেকের দুর্য রায়ও ১৯৮৩র ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনাগুলো সাক্ষী।
            সেই দুর্য রায় এখনো আছেন ২নং আর্নে চাপরিতে। দুর্য রায়ের বড়ভাই মণ্টু রায় ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি এলাকার সব মানুষের সুখ দুঃখের সংবাদ রাখতেন। রক্তাক্ত ফেব্রুয়ারিতে উগ্রজাতীয়তাবাদী স্থানীয় অসমিয়া মানুষের আক্রমণে তিনি আহত হন। ঘটনার পরে সরকারী তদন্ত আয়োগের (তেওয়ারি আয়োগ) সামনে তিনি সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। পরে সেই মণ্টু রায়ের মৃত্যু হয়। তাঁর ভাই দুর্য রায় বললেন, “সেদিনের আক্রমণে ২নং আর্নে বহু মানুষ মারা গেছিলেন। মারা যাওয়া মানুষের অধিকাংশই ছিলেন বৃদ্ধ –বৃদ্ধা, শিশু আর মহিলা। আমি যেটুকু জানি ২নং আর্নে চরাঞ্চলের প্রাণ কুমার সরকার (৭০), মাদারী মণ্ডল( ৫০), সুবল সরকার (৭০), কাঞ্চন সরকার (৬০), রতন বর্মণ (  ১০), যোগেশ রাজবংশী ( ৭০), হেমন্ত সরকার  ( ৭০), রায়মোহন বিশ্বাস ( ৭৫) এমন বেশ কিছু মানুষের মৃত্যু হয়। আহত মানুষের তো কোনো হিসেবই নেই।”
            তেমনি আর্নে পানবাড়ি গ্রামের বহু পরিবার সেই আক্রমণের পরে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন। প্রায় ১১০টি পরিবার শিলাপাথার শহরের কাছে  থিতু হলেন। শিলাপাথারের সেই নতুন নিবাসীর একজন অঞ্জলি ভৌমিক বললেন, “ সকালে প্রায় সাতটাতে  আমাদের পানবাড়ি গ্রামটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে আক্রমণ করে। যারা দৌড়ে পালাচ্ছিলেন তাদের ধনুকে তির ছুঁড়ে মারা হয়। হাতের কাছে যাদেরকেই পেয়েছে তাদের কুপিয়ে হত্যা করে। আমার চোখের সামনে আমার স্বামী সুনীল ভৌমিককে কুপিয়ে হত্যা করে। তখন সুনীলের বয়স ছিল ৩৫ বছর। আমাদের বিয়ের তখন ৪ বছর মাত্র হয়েছিল। ছেলে জগন্নাথের বয়স তখন মাত্র ৪ বছর হয়েছিল। আমি ওকে কোলে নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে প্রাণ বাঁচাই। সুনীলও দৌড়োচ্ছিল, তাতেই হোঁচট খেয়ে গড়িয়ে পড়েছিল। আর উঠতে পারল না। আমি কিছু দূর থেকে দেখছিলাম ওকে কিছু মানুষ কোপাচ্ছে। ...”
            কথাগুলো বলে অঞ্জলি হু হু করে কেঁদে ফেললেন। তাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে আমরা কোনো ভাষা খোঁজে পাচ্ছিলাম না। কিছু পরে অঞ্জলি বললেন, “ পুরো জীবনটাই পিতৃহারা সন্তানটিকে নিয়ে, বাড়ি ঘর হারিয়ে চরম যন্ত্রণাতে জীবন অতিবাহিত করেছি। যে দুর্যোগপূর্ণ সময় আমাদের জীবনে নেমে এসেছিল সে আর কারো জীবনে না নামুক। কিন্তু আজ অব্দি বুঝতে পারিনি আমাদের অপরাধ কী ছিল? শিকারিরা যেমন জীবজন্তুকে তাড়া করে সেভাবে  তাড়িয়ে তাড়িয়ে আমাদের মানুষকে কেন আক্রমণ করল? কোনোদিনই আমরা ন্যায় পেলাম না।”।
            উল্লেখযোগ্য যে সেই পানাবাড়িতে যজ্ঞেশ্বর বিশ্বাস (৪০) , সাধুচরণ সাহা (৭০), ধীরেন শিকদার (৩৫), উমা শর্মা (৭), বনমালী শর্মা (৬০), সরস্বতী দেবী (৫০) , দশরথ দেবনাথ (১৭) এমন অনেক মানুষকেই অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদীরা হত্যা করেছিল।
            সেরকম কাকোবাড়ি গ্রামেও বহু মানুষের মৃত্যু হয়। আক্রমণ কারীদের হাতে ৬২ বছরের নরেন ঘোষ, ৩৫ বছরের নরেশ ঘোষ এবং নরেশের বৃদ্ধা মা আশি বছরের ফালো মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছিল। বৃদ্ধা ফালো মণ্ডল ঘরের থেকে নড়াচড়া করতে পারতেন না।  সেই অসহায় বৃদ্ধা মহিলাকে হত্যা করেছিল অসমিয়া জাতির অস্তিত্ব রক্ষার নামে। এদিকে কাকোবাড়ি গ্রামে আক্রমণ করতে এসে আন্দোলনকারীরাও বাঙালি প্রত্যাক্রমণকারীদের হাতে অনেকে প্রাণ দিয়েছে। এই সম্পর্কে  কাকোবাড়ি অঞ্চলের পরমা মণ্ডল বলেছিলেন, “ আমাদের গ্রামে আক্রমণ হবে বলে আমরা আগে থেকেই অনুমান করতে পেরেছিলাম। একাংশ মানুষ আমাদের খবর দিয়েছিলেন যে আন্দোলনকারীরা আন্দোলনকারীরা বাঙালিদের গ্রামগুলোকে আক্রমণ করবার পরিকল্পনা করছে। অনেকে অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহ করছেন। আক্রমণ করতে লখিমপুর জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আন্দোলনের সমর্থক এসে শিলাপাথারে সমবেত হয়েছে। ফলে আমরাও আত্মরক্ষার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলাম। বন্দুক –বারুদ কই পাই, তাই বর্শা-বল্লম, দা –লাঠি সেসবই ছিল। কিন্তু ঐ হাজার হাজার মানুষকে আমরা বাধা দিই কী করে? তবুও আমি, সুচল মণ্ডল এমন অনেকে মিলে লড়ে গেছি। আমরা লড়াইটা করেছিলাম বলেই গ্রামের অনেকেই বিশেষ করে মহিলারা, ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে সুবিধে পেল। আমাদের প্রত্যাক্রমণে যদি কারো মৃত্যু হয়েছিল জানি না। কিন্তু অনেক মিসিং সম্প্রদায়ের মানুষকে আক্রমণকারীদের দলে দেখেছিলাম। সেদিন আমার পা ওরা কুপিয়ে ভেঙ্গেছিল। যে আমাকে আঘাত করেছিল সে মিসিং সম্প্রদায়ের ছিল। আমাদেরই কিছু মানুষের প্রত্যাক্রমণে সেই মানুষটির মৃত্যু হয়েছিল। ...”
এমনি ভাবে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী তথা আক্রমণকারী এবং বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ‘যুদ্ধ’ও হয়েছিল। মোট কথা আর্নে চরাঞ্চলের বালিতে সেদিন বয়ে গেছিল রক্তের নদী, আকাশে উড়েছিল ধোঁয়া ছাই। একদিন পরেই আরেকটি নৃশংস কাণ্ড সংগঠিত হয়েছিল চিমেনচাপরিতে।   


চিমেনচাপরির বিষাদ গাঁথা
আসু গণ-সংগ্রাম পরিষদের নৃশংসতার জীবন্ত সাক্ষী মাতা-পুত্র
পরমার সামনে হাজির হতে আজো কেন সৎ সাহস হলো না জাতীয়তাবাদী নেতাদের?

        
(পরমার ছিন্ন হাতখানা)
    আর্নে বালিচরে বাঙালি অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে  অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদীদের আক্রমণের কিছু পরেই অন্য এক নৃশংস ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল চিমেন চাপরিতে। বিশেষ করে চিমেন চাপরির খেরনি বস্তিতে অসমের ‘অস্তিত্বরক্ষা’র আন্দোলনকারীরা পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করেছিল। খেরনি বস্তি অঞ্চলে আক্রান্ত বহু পরিবার পরে চিমেন চাপরি ছেড়ে  এসে মাজরবাড়ি চিমেনমুখ অঞ্চলে বাস করতে শুরু করেন। বাড়ি ঘর হারিয়ে সর্বস্বান্ত ভুক্তভোগীরা এখনো আছেন মাজরবাড়ি অঞ্চলে--- উগ্রঅসমীয়াদের আক্রমণের সাক্ষী হয়ে। ...
            চিমেনচাপরির ভুক্তভোগী জনতা শুধু আন্দোলনকারীদের আক্রমণেরই সাক্ষী নয়, বিদেশী বহিষ্কার আন্দোলনের নামে অসমের বিভিন্ন প্রান্তে ফ্যাসিবাদের যে জোয়ার উঠেছিল তারও প্রমাণ। শিলাপাথারের কাছের বৃহত্তর আর্নে চরে বা চিমেন চাপরিতে উগ্র অসমিয়াদের আক্রমণ কেমন নৃশংস ছিল আর সেই আক্রমণের ফলে এক একজন ব্যক্তি বা এক একটা পরিবারকে ঘটনার পরবর্তী কালে কীভাবে জীবন অতিবাহিত করতে হয়েছিল---তার নজির পরমা মালোদাস নামের তরুণের জীবন পরিক্রমা।...
            ধেমাজি জেলার অন্যতম শহর শিলাপাথারের থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মাজরবাড়ি বাজার। চিমেনমুখ গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত মাজরবাড়ি এলাকার প্রাণকেন্দ্র স্বরূপ এই বাজারটিতে যখন আমরা গিয়ে হাজির হৈ তখন আমদের সঙ্গী সমাজকর্মী ধনঞ্জয় নাথ বলল, ‘ঐ ছেলেটিকে দেখুন।’
            এক তরুণকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম, আমরা যে চায়ের দোকানে বসে আছি সেদিকে এগিয়ে আসছেন ঐ তরুণটি।
            সেই তরুণের সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দিল ধনঞ্জয়। আমরা নমস্কার জানালাম। প্রত্যুত্তরে সেই তরুণ এক হাত তোলে সম্ভাষণ জানালেন। আমরা একটু অবাক হলাম। দু হাত তোলে সম্ভাষণের প্রত্যুত্তর দেবার  জন্যে তাঁর অন্য হাতটি নেই। ঠিক কব্জির নিচেই হাতটি ছিন্ন। ...
            এই তরুণই পরমা মালোদাস। আর তাঁর এই ছিন্ন হাত হচ্ছে ‘অসম আন্দোলনে’র ফ্যাসিস্ট বাহিনীর জঘন্যতম কার্যকলাপের জ্বলন্ত উদাহরণ। ১৯৮৩ সনের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় ভাগে ‘অসমিয়া’ মানুষের পরিকল্পিত আক্রমণের সাক্ষী পরমা মালোদাস। আর সারা আসাম ছাত্র সংস্থা, অসম গণ সংগ্রাম পরিষদ ইত্যাদির নেতৃত্ব তথা প্রফুল্ল মোহন্ত, ভৃগু কুমার ফুকন, ভরত চন্দ্র নরহ প্রমুখ নেতার নির্দেশে পরিচালিত বিদেশী বিতাড়ন আন্দোলনের গণসংহার কর্মসূচীর অন্যতম প্রমাণ। ...
            বাঙালিদের উপরে যে কী নির্দয়ভাবে অসমের ভূমিপুত্রেরা অত্যাচার –উৎপীড়ন চালিয়েছিলেন , মানবাধিকার লঙ্ঘন করে বিশ্ব কাঁপিয়েছিলেন তারই সাক্ষী হয়ে রয়েছেন পরমা মালোদাস।   উল্লেখযোগ্য যে আন্দোলনকারীরা চিমেন চাপরির বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাতে আক্রমণ চালাতে গিয়ে এই পরমার এক হাত দায়ে কেটে দুই টুকরো করে ফেলেছিল... আর সেই সময় পরমা ছিলেন এক কিশোর মাত্র। সেই পরমার ছিন্ন হাতটি অসম আন্দোলনের বর্বর চরিত্রের প্রতীক।
            মাজরবাড়ি বাজারে দেখা হলে সেই সব ভয়াবহ দিনটির কথা পরমা বলেছিলেন এইভাবে, “ সেদিন আবহাওয়া মেঘলা ছিল। দিনের প্রায় দশটা এগারটার সময় বাড়ির কাছেই বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিলাম। কিন্তু হঠাৎই টের পেলাম গ্রামের মানুষ দৌড়োদৌড়ি করছেন। চীৎকার চেঁচামেচি করে পালাচ্ছেন। দৌড়ে বাড়ি যেতে গিয়ে দেখি আমাদের বাড়ির দিকেই প্রচুর মানুষ হাতে অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসছেন। চেঁচামেচি শোনে বেশ ভয় করছিল। দূরে গ্রামের আর মাথাতে আগুনের শিখা চোখে পড়ল। তখন আমার ঠাকুমাও বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি হাঁটতে পারেন না। তবুও লাঠি একটাতে ভর করে বেরিয়ে এলেন। অন্যেরা ইতিমধ্যে পালাতে শুরু করেছে। আমি ঠাকুমার হাতে ধরে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলাম। হাঁটবার শক্তি ছিল না, তবু ঠাকুমা হেলে দুলে প্রাণ বাঁচাতে এগুচ্ছিলেন। কিছুদূর এগোবার পরে প্রচুর লোকে আমাদের ঘিরে ফেলল। ওদের হাতে দা-তলোয়ার –লাঠি-মশাল এমন কত কী!  ওদের দেখে ভয়ে প্রায় মূর্ছা যাই আর কি। কী করবো ভেবেই পাচ্ছিলাম না। তখনি ওরা আমাদের ঘিরে ফেলল আর আমার সামনেই ঠাকুমাকে কুপিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলল। আমার মনে হলো মাথা ঘোরাচ্ছে, সে অবস্থাতেই ক’জন আমাকে ঘপ করে ধরে টেনে নিয়ে গেল। দা দিয়ে মারলো আমাকে। আমি চীৎকার করলাম। কেউ একজন আমার বাঁহাতে ঘা বসালো আর হাতখানা দু’টুকরো হয়ে একটুকরো দূরে ছিটকে পড়লো। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলাম।”
            কথাগুলো বলে বহু সময় মৌন হয়ে রইলেন পরমা। পরমার কথা শোনে আমরাও নির্বাক। কিছুক্ষণ নীরব থাকবার পরে দেখি ডানহাতে বাঁহাতের ছিন্ন অংশে স্পর্শ করলেন পরমা। “এই দেখুন!” ---পরমা ছিন্ন হাতখানা আমাদের দিকে তুলে ধরলেন---অসমীয়া উগ্রজাতীয়তাবাদীদের একটি কিশোরের উপরে চালানো ‘দানবীয় নিপীড়নের প্রতীক’ সেই খণ্ডিত হাতখানা কিছুক্ষণ আমাদের চোখের সামনে স্থির হয়ে রইল।
            কোনো প্রশ্ন নাই, কোনো উত্তর নেই ---আমাদের থেকে।
            মৌনতা ভেঙ্গে পরামাই বললেন, “ গলাতে, পিঠেও আছে আক্রমণকারী আন্দোলনকারীদের দায়ের ঘায়ের চিহ্ন।” এবারে পরমা গায়ের জামা তোলে শরীরের ক্ষতচিহ্ন দেখালেন। তারপরে আবার বললেন, “আমাকে ওরা মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে গেছিল। পরে রাতে বাবা এসে আমাকে তোলে নিয়ে যান। ঠাকুমা প্রিয়বালা মালোদাসের মৃতদেহ সেখানেই পড়ে রইল। পরে গ্রামের মানুষ সৎকার করেন। এদিকে আমার মা কালীদাসী মালোদাসের ঠিক চোখের নিচে দায়ের ঘা পড়েছিল। নাকটি কাটা গেছিল। মা আর আমাকে দু’দিন পরে আশ্রয় শিবিরে আসা ডাক্তার চিকিৎসা করেন। পরে অরুণাচলের পাশিঘাট হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা হয়। আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছিল।”
            এক দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পরমা থমকে রইলেন। কথাগুলো শোনে ধনঞ্জয় বলল, “ পরমার জীবন কথা আমরা ভালো করেই জানি। পরমা সেই ঘটনার পরে এক হাতেই বইএর বোঝা  নিয়ে বহু দূরের স্কুলে যাওয়া আসা করেছিল। আমাদের সঙ্গে লেখাপড়া করেছিলবিশ কিলোমিটার দূরে সাইকেল চালিয়ে শিলাপাথারে মেট্রিক পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এই পরমা এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে ধরে বাড়ি বাড়ি মুড়ি বিক্রি করে পরিবার চালিয়েছে। কিন্তু এই পরমাকে সাহায্য করতে বা ন্যায় দিয়ে কেউ এগিয়ে এলো না। পরমার দোষ কী ছিল? আসলে পরমার মতো যুবকের সামনে দাঁড়াবার সাহস আজ অসম আন্দোলনের নেতৃত্বের নেই। তারা নির্যাতিত  লোকেদের ক্ষতিপূরণ বা ন্যায় প্রদানতো দূর , এই সব নিপীড়িতদের  কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করবারও সৎ সাহস ওদের নেই হয়ে গেছে। ...”
           
          
সূর্য এবং কালীদাসী মালোদাস
মাজরবাড়ির একটি ভগ্নপ্রায় কুড়ে ঘরে আমাদের দেখা হয় পরমার বাবা সূর্য মালোদাসের সঙ্গে। তিনি বলেছিলেন, “চিমেন চাপরির খেরনি বস্তিতে থাকবার সময় আমার ছিল ১২ বিঘা খেতের জমি। এখন আছে শুধু এই ভিটাটাই। তিরাশি সনের ঘটনা আমাদের সব শেষ করেছে। আমার বড় ছেলে পরমার একটা হাত কেটে ফেলল। আমার স্ত্রীর মুখেই কোপিয়েছে। আমার মাথাতে দায়ের আঘাতের চিহ্ন এখনো আছে। বহু মানুষ এসে আমাদের আক্রমণ করেছে, ঘরে আগুন দিয়েছে, তাড়া করেছে। কিন্তু বহু অসমিয়া মানুষ আমাদের আশ্রয়ও দিয়েছেন। আমার স্ত্রী কালীদাসীকে বড়োরাই উদ্ধার করে পরে আমাকে সমঝে দেন। অন্যদিকে মিসিং জনগোষ্ঠীর একাংশ আমাদের গ্রামে আক্রমণ করেছিল, অন্য মিসিঙেরা আবার আশ্রয়ও দিয়েছিলেন, প্রাণও বাঁচিয়েছিলেন। সে যাই হোক, আমার স্ত্রীর মুখের সেই ক্ষতচিহ্ন আর পরমার কাটা হাত দেখলে আজও এলাকার মানুষের মনে পড়ে সেই ভয়াবহ দিনটির কথা। মৃত্যু না হওয়া অব্দি আমরা সেই আক্রমণের কথা ভুলতেই পারবো না। সেই আঘাত শুধু আমাদের দেহেই স্থায়ী হয় নি, মনেও স্থায়ী হয়ে রইল।...”
            চিমেন চাপরির আক্রমণের আগে অঘটন ঘটবে বলে খবরটা দিয়েছিলেন এক অসমিয়া মানুষই। অনেকে গৃহহারাদের আশ্রয়ও দিয়েছিলেন। চিমেন চাপরির খেরনি বস্তির একজন ভুক্তভোগী মহিলা হিমানী দাস। মহিলা সেই দিনটির কথা বললেন এইভাবে, “ আমাদের গ্রামের কাছেই এক অসমিয়া গ্রাম ছিল। গ্রামটির নাম ছিল বরুয়াপাম। সেদিন বরুয়াপামে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। একজন অসমিয়া মানুষ, তাঁর উপাধি বরদলৈ। বরদলৈ সেদিন খুব ভোরে আমাদের গ্রামে গিয়ে খবর দিয়েছিলেন যে আজ গণ্ডগোল একটা হবে। আমাদের সাবধানে থাকতে বলে গেলেন। সকাল নটা বাজতেই আক্রমণ নামলো। গ্রামের উত্তর দিক থেকে আগুন দিল। ঘরে আগুন দিল, বহু মানুষকে মারলো। আমাদের সম্পর্কিত  একজন ছিলেন হেমন্ত দাস, তাঁকে পরিচিত অসমিয়া লোকেই ধরে নিয়ে গিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে আগুন দিল। এভাবে আক্রমণ নামলে আমরা যখন রাস্তা দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে পালিয়ে আসছি তখন আবার কিছু মিসিং আর বডো পরিবারের লোকজন আমাদের আশ্রয় দিলেন। পরে আমরা দৌড়ে দৌড় এসে তেলেম রেল স্টেশনে উঠলাম। সেখানে রাত কাটালাম। কয়েক হাজার মানুষ ভিড়েছিল স্টেশনে। কিন্তু রাতে অরুণাচল থেকে কিছু আদি জনগোষ্ঠীর যুবক এসে আমাদের লোকজনের ভিড় থেকে জোর জুলুম করে বেশ কিছু মেয়েদের তোলে নিয়ে গেল।        সেই মেয়েরা আর ঘুরে এলো না। এর পরে আমরা শিলাপাথারে এসে আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নিলাম। প্রায় এক মাস থাকলাম। তারপরে আমরা মাজরবাড়িতে ফিরে আসি। ...”
কথাগুলো বলে মহিলা কেঁদে ফেললেন। কিছু পরে বললেন, “ আমাদের বাঙালিদের কী দোষ ছিল?”
হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারবে না। কিন্তু চিমেন চাপরির ঘটনা স্পষ্ট করে একাংশ অসমিয়া বিদেশীর নামে বাঙালিদের হত্যা করতে, বাড়ি ঘর, জমি জমা দখল করতে গিয়েছিল। সেভাবে আরেক অংশ নির্যাতিত  আর্ত মানুষজনকে আশ্রয় দিয়ে মানবতা বোধের নিদর্শনও তোলে ধরেছিলেন। 



Tuesday, 24 November 2015

বেত্রাঘাত




(মূল অসমিয়া কবিতাটি লিখেছেন  অজয় লাল দত্ত  ।   এই সময়ে কথাপ্রধান এই কবিতাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে অনুবাদ করে ফেললাম। ---সুশান্ত কর)
(C)Image:ছবি




















খোলা মঞ্চে দাঁড়িয়ে উদাত্ত কণ্ঠে
যখন মানুষকে ঘৃণা করবার জন্যে ভাষণ দিতে পারে
তখন আর বেত্রাঘাতের প্রয়োজন নেই!

বেত্রাঘাতের দরকার সেই ওদের পিঠে
যারা খিদের কথা বলে,
পেটের দায়ের কথা বলে,
জীবনের জ্বালার কথা বলে,
যে জ্বলন্ত মানুষগুলোকে হাতে হাত ধরে এক হতে বলে!
কারণ ভয় এদের থেকেই, যার পেটে আগুন আছে
হাতে এসে পৌঁছুতে আর কতই বা দূর?
হয়ে উঠতে পারে ভয়ঙ্কর...

যার অভাবের কোনো ইতিহাস নেই
যে বর্ণের গালিচাতে কাটিয়েছে শৈশব
যে বাতানুকূল ঘরে ‘ ঘামে স্নাত শরীরে’র কবিতা লিখে জুটিয়েছে বৈভব
লেহন অথবা ভক্তি, ক্ষয় সমস্ত শক্তি
নজির হিসেবে নিন, দুই এক উক্তি!

আসলে বেত্রাঘাত সেই ওদের জন্যেই
যারা হয়তো ভুল করেছে
হয়তো পরের ভুল ধরেছে
হুঁশিয়ার করতে করেছে দুঃসাহস
ভয় এই এদের থেকেই...
যার পেটে ইঁদুর আছে
শাসনের দড়ি কেটে যদি ফেলে পাছে?

বিভেদকামীকে শক্তি যোগানো
প্রেমের বদলে ঘৃণা বিলোনো,
এরাতো কুটুম্ব, খেলোয়াড়ের, পাশা খেলার
আছে পুরস্কার-টুরস্কার, মুক্তোর মালা,
তাঁরাইতো মুখ্য অতিথি, খেলা শেষের ভোজসভার......


000~~~~~~~~~~~~~~~000

মুল অসমিয়া কবিতাও এখানে রইল।

000~~~~~~~~~~~~~~000

বেত্ৰাঘাত
--------
মুকলি মঞ্চত থিয় হৈ উদাত্ত কণ্ঠৰে
যেতিয়া মানুহক ঘৃণা কৰাৰ ভাষণ দিব পাৰে
তেতিয়া আৰু বেত্ৰাঘাতৰ প্ৰয়োজন নাই!
বেত্ৰাঘাতৰ প্ৰয়োজন সেই সকলৰ পিঠিত
যিয়ে ভোকৰ কথা কয়,
পেটৰ দায়ৰ কথা কয়,
জীৱনৰ জ্বালাৰ কথা কয়,
যিয়ে জ্বলি থকা মানুহবোৰক এক হোৱাৰ কথা কয়!
কাৰণ ভয় এই সকলৰ পৰা, যাৰ পেটত অগনি আছে
হাত পাবলৈনো কেত পৰ?
হৈ পৰিব পাৰে ভয়ংকৰ...
যাৰ অভাৱৰ ইতিহাস নাই
যিয়ে বৰ্ণৰ দলিচাত কটাইছে শৈশৱ
যিয়ে বাতানুকুল ৰূমত 'ঘামে ধোৱা গা'ৰ কবিতা লিখি গোটাইছে বৈভৱ
লেহন অথবা ভক্তি, ক্ষয় সকলো শক্তি
উদাহৰণ হিচাবে লওক, দুই এটা উক্তি!
আচলতে বেত্ৰাঘাত সেই সকলৰ বাবেহে
যি সকলে হয়তো ভুল কৰিছে
হয়তো আনৰ ভুল ধৰিছে
সঁকিয়াই দিবলৈ দুঃসাহস কৰিছে
ভয় এইসকলৰ পৰা...
যাৰ পেটত নিগনি আছে
শাসনৰ জৰী কুটি দিয়ে যদি পাছে?
বিভেদকামীক শক্তি যোগোৱা
প্ৰেমৰ সলনি ঘৃণা বিলোৱা,
এইসকলটো কুটুম, খেলুৱৈৰ, পাশা খেলৰ
আছে বঁটা-বাহন, মুকুতাৰ ধাৰ,
তেওঁলোকেইতো মুখ্য অতিথি, খেলৰ শেষৰ ভোজমেলৰ.....


Tuesday, 27 October 2015

১৯৮৩র অসম: নিপীড়িত বাঙালি হিন্দু-০২


দিগন্ত শর্মা
(দিগন্ত শর্মা, সাদিন কাগজের সাংবাদিক এবং অনুসন্ধানী লেখক। এর আগে তিনি  ‘ নেলি ১৯৮৩নামে একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন লিখেছিলেন তিনি। বর্তমান অনুবাদক  সেটি বাংলাতে অনুবাদ করেছিলাম। দু’টিই আগে পরে বই হিসেবে বেরোয়। সেই বইতে মূলত ধরা হয়েছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু তথা মুসলমানদের  উপরে নেমে আসা আক্রমণের  ছবি। এবারে বাঙালি হিন্দুর উপরে কেমন অত্যাচার নেমে এসেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে তিনি ঘুরেছেন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার  পূব থেকে পশ্চিমে। আর লিখছেন এই নিবন্ধ। ধারাবাহিক ভাবে এটি এই ব্লগ ছাড়াও প্রকাশিত হবে, আরো দুই একটি ব্লগে এবং ছাপার অক্ষরে বেরুচ্ছে শিলচর থেকে প্রকাশিত চন্দন সেনগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক ‘অরুণোদয়ে’।  এবারে দ্বিতীয় পর্ব। লেখকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে যোগাযোগ করুন, এই নম্বরে: ৯৮৫৪৬-৩১৯২৮। )


মূল অসমিয়াঃ দিগন্ত শর্মা

বাংলা অনুবাদঃ সুশান্ত কর





  
         হাত জোড় করছি – জমি বাড়ি সব ছেড়ে যাবো, আমাদের মেরো না:  মহিলার নাম সোনামতি৮৩র ফেব্রুয়ারির হিংসাত্মক ঘটনার কথা বলতে গিয়ে মুখ খুলেই হু হু করে কাঁদতে শুরু করলেন। শাড়ির আঁচলে দুই গাল বেয়ে নেমে আসা চোখের জল মোছবার চেষ্টা করলেন যদিও, স্রোত থামবার নামই করল না। মুহূর্ত কয় আমরাও বেশ অস্বস্তি অনুভব করলাম। “মহিলাকে সেই সব দুঃখের দিনের কথাগুলো জিজ্ঞেস করে কি ভুল করলাম কিছু?”—এমন একটা ভাবনা নাড়িয়ে গেলো। ঠিক সেই সময় আর্নে রামনগরের কিছু মানুষ বলতে শুরু করলেন---না কেঁদে থাকবে কী করে? চোখের সামনে পরিবারে সমস্ত মানুষকে মেরে ফেলল।
            ধীরে ধীরে সোনামতি বলতে শুরু করলেন, “ ওই উত্তর দিক থেকে লাঠি-বল্লম-তিরধনুক-তলোয়ার নিয়ে প্রচুর মানুষে যখন আমাদের বাড়িটি ঘিরে ফেলল, পালাতে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না। আক্রমণকারী দলটি আমাদের পরিবারটিকে  ধরে ফেলল। আমি ওদের পায়ে ধরে কাকুতি মিনতি করলাম, “হাত জোড় করছি, পায়ে পড়ছি। এই জমিবাড়ি ছেড়ে আমরা চলে যাবো।আমাদের মেরো না।” খানিক থেমে জল চোখে তিনি আরো বললেন, “ কিন্তু ওরা আমার অনুরোধে কান দিল না। আমার চোখের সামনে আমার মানুষটিকে (স্বামী), আমার মা আর চার বছরের মেলে চামেলিকে ঘা মারতে শুরু করল। আমি দু’বছরের ছেলে কাজলকে নিয়ে যে দিকে চোখ যায় দৌড়োলাম। কিন্তু পেছন থেকে কেউ একজন আমাকে লাঠির ঘা মারতেই আমি গড়িয়ে পড়লাম। তারপর আর কিছুই বলতে পারি না। পরদিন দু’জন মানুষ আমাকে ধরে দাঁড় করিয়ে দিলেই দেখলাম, আমি বাড়ির কাছেই পড়েছিলাম। আমার পাশেই শুয়ে শুয়ে কাঁদছে ছেলে কাজল। ঐ দু’জনের একজন আমাকে ধরে দাঁড় করিয়ে গ্রামের অন্য মাথায় শিবিরে নিয়ে এলেন। অন্যজন কাজলকে কোলে করে নিয়ে এলেন। গ্রামের লোকেরাই জানালো সেদিনের আক্রমণে আমার বর রাজকুমার নমশূদ্র, মা কুমুদিনী নমশূদ্র , আমার মেয়ে চামেলি মারা গেছে...।
            ওদিকে সেই সময়, আমি চারমাসের গর্ভবতী ছিলাম। সব হারিয়ে আমি উপায়হীন হয়ে পড়লাম।  আহত শরীর , পেটে বাচ্চা। সেই সঙ্গে আহত দুবছর বয়সী কাজল। শিবিরে যে ডাক্তারেরা এসেছিলেন, তারা তার চিকিৎসা করেছিলেন বটে কিন্তু মাস কয় পরে সেও মারা গেল। ভালো চিকিৎসা করাতে পারলাম না।  গর্ভের সন্তানটিই জীবনের ভবিষ্যৎ ভেবে  আশাতে বেঁচে রইলাম। সেই সন্তানেরই আমি মা এখন। সেই অন্যায়ের বিচার আমি পেলাম না। হয়তো ন্যায়, কোনোদিনই পাবো না। ...”
          
ঈশ্বর নমশূদ্রের সারা গায়ে এখন আঘাতের চিহ্ন
  সোনামতি, পক্ষ, মিছিলা...অজস্র মহিলার জীবনে অন্ধকার নামিয়ে এনেছিল বিদেশী বহিষ্কার আন্দোলনের ফ্যাসিস্ট কার্যকলাপ। সারা আসাম ছাত্র সংস্থা, সারা আসাম গণসংগ্রাম পরিষদ এবং এদের সমর্থক (অসম সাহিত্য সভা) সংগঠনের নেতৃত্বে একাংশ উগ্র-অসমিয়াদের দ্বারা  সংগঠিত বাংলাভাষী গণনিধন কাণ্ডের পরিণতিতে  ধেমাজির শিলাপাথারের নিকটবর্তী আর্নে রামনগর  গ্রামের বহু পরিবার নিঃশেষ হয়ে গেছিল। কিন্তু শুধু ঐ আর্নে রামনগরই নয়। এই গ্রামের পাশের ‘আর্নে তিরাশি’ গ্রামেও শতাধিক মানুষকে এরা হত্যা করেছিল। ‘অসমের অস্তিত্বরক্ষা’র আন্দোলনের ঘাতক বাহিনীর লোকেরা। শিলাপাথারের কাছের বৃহত্তর আর্নে চর অঞ্চলের অন্তর্গত ‘আর্নে তিরাশি’ নামের গ্রামেই ১৯৮৩র ফেব্রুয়ারি মাসে সব চাইতে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।  গ্রামের নাম এমন হবার কারণ ছিল, মাত্র তিরাশিটি পরিবার শুরুতে এই গ্রাম বসিয়েছিল। সেই তিরাশি  পরিবারের গ্রামে মৃতের সংখ্যা ছিল শতাধিক। গ্রামের কোনো এক পরিবারের একটি কুঁড়েঘরও যদি দাঁড়িয়ে থাকতো। আক্রমণকারীরা পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে নিঃশেষ করেছিল। সেই গ্রামের এক ব্যক্তি ঈশ্বর নমশূদ্র। প্রায় ৭০ বছর বয়সের এই বৃদ্ধের বিদেশী বিতাড়ন আন্দোলনের সময় বয়স ছিল দুই কুড়ি।  ঈশ্বর নমশূদ্রের সারা গায়ে এখন আঘাতের চিহ্ন।  মাথাতে যদি দায়ের ঘায়ের চিহ্ন, পিঠে বল্লমের, পায়ে বন্দুকের গুলির চিহ্ন , তো হাতে তলোয়ারের ঘা। বুকে ধনুক থেকে ছোঁড়া তির বেঁধার চিহ্ন স্পষ্ট।
          
মাথাতে যদি দায়ের ঘায়ের চিহ্ন
  ঈশ্বর নমশূদ্র বলছিলেন, “আমাদের গ্রামের চারদিকে উঁচু উঁচু খাগের জঙ্গল ছিল। তাই আক্রমণ করতে ওরা ঠিক কোনদিক থেকে আসছিল ধরা যায় নি। কিন্তু ওরা যে হা রে রে রে !---- করে আসছিল সেটা টের পাওয়া যাচ্ছিল।  কী করা ঠিক হবে ভাবতে ভাবতেই ভোরের দিকে অসমিয়া, মিশিং জনগোষ্ঠীর একাংশ মানুষ গ্রাম ঘিরে ফেললো। হাতে তাদের অগুণতি অস্ত্র-শস্ত্র। আমাদের বাড়ি ছেড়ে পালাবার বাইরে উপায় ছিল না। তাই সবাই দক্ষিণের ব্রহ্মপুত্র নদীর দিকে দৌড় দিল। কিন্তু ওরা যে আমাদের সবাইকে ঘিরে ফেলেছে, বুঝতে পারি নি। অন্যদের মতো আমিও ন’মাসের ছেলে অজিতকে কোলে করে প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দিলাম। কিন্তু সামনের থেকে একদল লোক আমাকে আটকে দিল। ওদের কেউ আমাকে লম্বা লাঠি দিয়ে মারলো  । আমি গড়িয়ে পড়ে গেলাম।    আমার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল ন’মাসের শিশুটি। কই পড়ল ---দেখবার জন্যে ফিরে তাকাতেই দেখি মাটিতে পড়ে কাঁদছে শিশুটি, ওকেই ঘা মেরে দুই টুকরো করে ফেলল। দেখে আমি চীৎকার করে উঠেছি কি, ওদের কেউ আমাকে দা দিয়ে ঘা দিল, কেউ বল্লমে খোঁচালো,কেউ তির দিয়ে  বুকে পিঠে বিঁধলওরা গেল কিন্তু পরে ঘরে আগুন দিতে এলো আরো একদল, তারা গুলি ছুঁড়লে আমার পায়ে গুলি লাগলো।আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলাম। সেদিন সন্ধ্যাতে কেউ আমাকে তুলে নিয়ে গেলো। পরদিন আশ্রয় শিবিরে ডাক্তার এলো।চিকিৎসা করল। প্রায় এক মাস পরে লখিমপুর গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলাম। আমার পুরো শরীরে আঘাতেচিহ্নগুলোর চিকিৎসা করাতে গিয়ে বহু টাকা ব্যয় হলো। আজও  কখনো শরীরের  প্রচণ্ড ব্যথাতে আমি ছটফটাতে থাকি।  সেই নৃশংস আক্রমণে মরে গেলে ভালোই ছিল। কিন্তু মরলাম না। মানুষের হিংস্রতার সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছি। কিন্তু শরীরে আঘাতের ব্যথা-বেদনার  থেকেও   মনে যে ঘায়ের দাগ থেকে গেলো ---তার যন্ত্রণা যে কী বিষম বোঝাতে পারবো না। সেই যন্ত্রণার চিকিৎসা হাসপাতালে হবে কী করে?

পিঠে বল্লমের

            
পায়ে বন্দুকের গুলির চিহ্ন

তো হাতে তলোয়ারের ঘা

বুকে ধনুক থেকে ছোঁড়া তির বেঁধার চিহ্ন স্পষ্ট
          আর্নে তিরাশি গ্রামের ঈশ্বর নমশূদ্রের সারা শরীরের আঘাতের দাগগুলো শুধু ঐ বল্লম-দা-তলোয়ার-তিরধনুকের আঘাতের দাগ নয় তাঁর শরীরের প্রতিটি ক্ষতচিহ্নই ‘অসম –অসমিয়ার অস্তিত্বে’র নামে একাংশ ‘খিলঞ্জিয়া’ অসমিয়ার সুপরিকল্পিত ভাবে প্রদর্শন করা নির্লজ্জ হিটলারি চরিত্রের স্বাক্ষর। ‘অসম আন্দোলনে’র নেতৃত্ব তথা সমর্থক লোকজনের সৃষ্ট ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপের জ্বলন্ত প্রমাণ।
            ঈশ্বর নমশূদ্র যখন কথাগুলো বলছিলেন আর্নে তিরাশি গ্রামের মানুষজন ভিড় করেছিলেন। তারই মধ্যে এক বৃদ্ধা মাথায় গালে হাত দিয়ে কথাগুলো শুনছিলেন। ঈশ্বরের দিকে পলক না ফেলে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে যখন কথা বলতে চাইলাম, গ্রামের লোকেরা বললেন, তিনি ভালো করে কথা বলতে পারেন না। আগে গ্রামের একজন সক্রিয় মহিলা ছিলেন তিনি। তাঁর নাম দিবাসী নমশূদ্র।  শরীরে তাঁর তির বিঁধেছিল। যখন দৌড়ে পালাচ্ছিলেন তিরের ঘায়ে গড়িয়ে পড়েছিলেন।  পড়ে পড়েই দেখছিলেন তাঁর বাবা-স্বামী-পুত্রকে কোপিয়ে কোপিয়ে কাটছিল। সেই থেকে দিবাসী আগের মতো আর কথা বলতে পারেন না। এমনকি স্বামী-পুত্র এবং বাবার নামগুলোও ভুলে গেছেন। কারো বুঝতে বাকি থাকে না যে ১৯৮৩র ফেব্রুয়ারি মাসে ‘আসু’, ‘সারা আসাম গণসংগ্রাম পরিষদে’র নেতৃত্বে চলা আন্দোলনের অস্ত্রধারীরা যখন বাঙালিদের উপরে আক্রমণ নামিয়ে এনেছিল এমন বহুজনের জীবনে অন্ধকার নামিয়ে এনেছিল।  দিবাসী নমশূদ্রের মতো মহিলার জীবনেও নামিয়ে এনেছিল অকাল অন্ধকার---যার জন্যে তিনি হারালেন স্মৃতিশক্তি।

অসমের অস্তিত্বরক্ষার নামে আন্দোলনকারীর হিংস্রতাতে
নিস্তব্ধ কিশোর, নিঃশেষিত পরিবার:


             “আমাদের আর্নে তিরাশি গ্রামে আন্দোলনকারীরা  যখন আক্রমণ করে কে কোনদিকে পালিয়েছিল কোন ঠিক-ঠিকানা ছিল না। সবাই শুধু প্রাণটাই বাঁচাতে চাইছিল। পরদিনই শুধু আমরা জানতে পারছিলাম কার পরিবারের কতজন মরেছে, বা কার ঘরে কতজন বেঁচে আছে।  গ্রামের একটাও ঘর দাঁড়ানো ছিল না। সব কটিতে এই আক্রমণকারীরা আগুন দিয়েছিল। ঘটনার পর দিনে পুরো আর্নে তিরাশি গ্রামে হিসেব করে বের করতে হয়েছিল, কে আহত, কে নিহত আর কারাই বা অক্ষত বেঁচে আছেন। আমাদের গ্রামের লোকজনের খবর করে, খোঁজে বের করে , নদীর পারেও গিয়ে মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে দেখি পনেরো ষোল বছর বয়সের কিশোর মাখনদের বাড়ির লোকজন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।” ---আর্নে তিরাশি গ্রামের এক বৃদ্ধ আমাদের সামনে ‘সংঘাতকালে’র বর্ণনা দিচ্ছিলেন এই ভাবে। তিনি যখন কথাগুলো বলছিলেন, এক যুবক তাঁর মুখের দিকে তাকিয়েছিল নিষ্পলক। তাকে দেখিয়ে বৃদ্ধ বললেন, এই সেই মাখন নমশূদ্র। আন্দোলনকারীদের নিপীড়নের শিকার। ঘটনার পরদিন ওকে নদীর পার থেকেই উদ্ধার করা হয়েছিল। ওর বাবা সার্থক নমশূদ্র, মা ময়নাবালা  এবং তিন বোনের মৃতদেহ পাওয়া গেছিল গ্রামের মাঝ বরাবর বেরিয়ে যাওয়া পথের পাশে।” জিজ্ঞেস করলাম, ওর তিন বোনের নাম কী ছিল? মাখন সামান্য অপেক্ষা করে কী যেন মনে করল। আর আটকানো স্বরে বলল, বীণামতি নমশূদ্র, রশুমতি নমশূদ্র, খকিলা নমশূদ্র।
            বলেই মাখন ওখানে বসেই হু হু করে কেঁদে ফেলল। কিছুক্ষণের জন্যে আর্নে তিরাশি গ্রামে আমাদের মাঝখানে মৌনতা ছেয়ে ধরল। সেই মৌনতা আবার ভাঙল, “ ওকে আমরা এর পরে গ্রামের মানুষই বড় করলাম। ঘর সাজিয়ে দিলাম নিরাশ্রয় ছেলেটির। ওকে সান্ত্বনা দেবার আরো কোনো ভাষা আমাদের জানা ছিল না।” সেই বৃদ্ধ আবার বললেন, “ মাখনের পরিবারের তবু একজন বেঁচে রইল। কিন্তু আরান মণ্ডলের পরিবারের সব্বাইকে হত্যা করেছিল আন্দোলনকারীরা। মোট কথা শতাধিক মানুষকে এরা সেদিন খুন করেছিল। আহতেরতো কোনো হিসেবই নেই। গেল তিনটা দশক ধরে আমরা অপেক্ষা করে রইলাম, এই গণহত্যার, এই নির্মম কাণ্ডের  বিচার হবে। ন্যায় পাবো আমরা---দোষীরা শাস্তি পাবে। কিন্তু দেখলাম এই দেশে আমাদের মতো নির্যাতিতেরা বিচার পায় না। এই গণতন্ত্র, এই প্রশাসন ব্যবস্থার প্রতি আমাদের আস্থা হারিয়ে গেছে। আমাদের আর্নে চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে আক্রমণ করে গ্রামের মানুষজন তাড়িয়ে অসমিয়াদের দখলে নেবার চেষ্টা করেছিল আক্রমণকারীরা।  আক্রমণ করবার সময় আমাদের বাঙালিদের বিদেশী বলে প্রচার করেছিল। সেসব কথা আমরা সেই ঘটনার পরে জানতে পাই। কিন্তু সত্যিই কি আমরা বিদেশী?” ---তাঁর মুখ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বেরুচ্ছিল কথাগুলো। তাঁর কথাতে  ক্ষোভ আর হতাশার ছবি স্পষ্ট।
            উগ্রজাতীয়তাবাদী অসমিয়াদের একাংশ মানুষ আর্নে চরাঞ্চলের হাজার হাজার জনতার উপরে আক্রমণ চালাবার জন্যে যে পূর্বপরিকল্পনা করেছিল, গোপনে সংগঠিত হয়েছিল---লখিমপুর জেলার (তখনকার) বিভিন্ন জায়গার মানুষ সেই সব কথাও এই বাঙালি মানুষজনে পরে জেনেছিলেন। কিন্তু যে দুই গ্রামের কথা লিখলাম, তারও আগে এই পুরো চরাঞ্চলে প্রথম আক্রমণ এরা নামিয়েছিল নলবাড়ি গ্রামে।

প্রথম আক্রমণ হয়েছিল নলবাড়িতে।
যেখানে ঘরের ভেতরেই জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল সোনাই মণ্ডলকে।

           
     আর্নে রামনগর, আর্নে তিরাশি, পানবাড়ি, কাকবাড়ি , মুক্তিয়ার, বর্মণ বস্তি, কেম্পবস্তি, দিঘলীয়া বস্তি ইত্যাদি গ্রামে প্রায় একই সময়ে আন্দোলনকারীরা আক্রমণ চালিয়েছিল। কিন্তু এগুলোর ভেতরে প্রথম আক্রমণ করেছিল কই?
                ভুক্তভোগী লোকজন আমাদের জানালেন, প্রথমে আক্রমণ হয়েছিল টেঙানি নলবাড়ি গ্রামে। আর্নে চরাঞ্চলের অন্তর্গত নলবাড়ি গ্রামের একাংশ মানুষ জানিয়েছিলেন সেই ভয়াবহ দিনের কথা।  সেই গাঁয়ের সঞ্জয় রায়ের বাড়িতে বসে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ কিছু মানুষ আমাদের সামনে বর্ণনা করেন, ১৯৮৩র ফেব্রুয়ারিতে বিদেশী বহিষ্কার আন্দোলনের সময় তাদের উপরে আক্রমণ নামার দিনের কথা। সে গ্রামের সুনীল রায় বলছিলেন, “আমাদের গ্রামের চারপাশে নলবন ছিল। লম্বা লম্বা নলবনে ভরা ছিল বলেই এই গ্রামের নাম পড়েছিল নলবাড়ি।” এমনিতে এর আসল নাম টেঙানি নলবাড়ি।
          একাজান গ্রামপঞ্চায়েতের অন্তর্গত আমাদের টেঙানি নলবাড়ি গ্রামেই প্রথম আক্রমণ করেছিল, আক্রমণকারীরা। হাজার হাজার অসমিয়া, আর জনজাতি মানুষ এসে  ভোরে আমাদের গ্রামে আক্রমণ করে, আর অতি নৃশংসভাবে  সোনাই মণ্ডলকে হত্যা করে।” এইটুকু বলে  কিছু সুনীল রায় কিছুক্ষণ থামলেন।  তাঁর পাশেই বসেছিলেন সেই গ্রামের আরো কিছু মানুষ। তাদের দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ সোনাই মণ্ডলের বৌয়ের নাম কী ছিল যেন?” কেউ একজন জবাব দিলেন, “শ্যামলা।” “হ্যা, শ্যামলা।”আবার বলতে শুরু করলেন সুনীল রায়, “ ওরা যে আমাদের গ্রামে আক্রমণ করবে সে আমরা আগেই খবর পেয়েছিলাম।  অসমিয়াদের একাংশ যদিও আমাদের আক্রমণ করতে এসেছিল, তাদেরই একাংশ আমাদের আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ছাত্র সংস্থার নেতৃত্বে আন্দোলনের সমর্থকেরা যেকোনো সময় গ্রামগুলোতে আক্রমণ নামাতে পারে।   খারাপ মানুষের মতো ভালো মানুষওতো আছে।  খবরটি পেয়ে আমরা গাঁয়ের লোকে রাতে রাতে পাহারা দেবার গ্রামরক্ষী বাহিনী তৈরি করেছিলাম।  আমাদের গ্রামে যখন আক্রমণ করে তার সামান্য আগেই গ্রামরক্ষীরা সারা রাত পাহারা দিয়ে গিয়ে শুয়েছিল মাত্র। গ্রামের একদিকে তাদের জন্যে একটা বাঁশখড়ের ঘরও তৈরি করা হয়েছিল। পাহারা শেষে সোনাই মণ্ডল সেখানেই শুয়ে পড়েছিল। ও গভীর ঘুমে শুয়ে থাকতেই আমাদের গ্রাম আক্রান্ত হলো।  লোকে পালাতে শুরু করল। হুলস্থূল চারদিকে।সবাই আর্তনাদ, চিৎকার চেঁচামেচি করে  দৌড়াদৌড়ি শুরু করল। কিন্তু সোনাই মণ্ডল সেই ঘরে শুয়ে ছিল। ওকে সেখানেই আক্রমণকারীরা পেল, আর দা দিয়ে কোপালো। ঘরে আগুন দিয়ে সেই আগুনেই ওকে ছুঁড়ে ফেলল। পরে শুনতে পাই, আগুনে ছুঁড়ে ফেলবার আগে অব্দি সোনাই বেঁচে ছিল। ওদিকে সোনাইর বৌ শ্যামলা দৌড়ে প্রাণ বাঁচালো যদিও স্বামীর মৃত্যুর পরে  এ রাজ্যে থাকবে না বলে পশ্চিমবাংলার ক্রান্তিহাটে চলে যায়। এখানকার জমি বাড়ি সব ত্যাগ করে চলে যায় শ্যামলা।” সুনীল রায় যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন সঞ্জয়ের মতো একালকার তরুণরা নীরবে কথাগুলো শুনছিল। সেখানে আরো কিছু যুবতী, বৌমানুষেরাও ছিল যারা সেই নৃশংস ঘটনাগুলো দেখে নি। কিন্তু গ্রামের বড়োদের মুখে তিন দশক আগেকার সেই নির্মম ঘটনা শুনে নতুন প্রজন্মের কী ধারণা হবে সেটাই প্রশ্ন।
            সুনীল রায় আরো বললেন, “ গ্রামেরই জগদীশ সরকারের কন্যা শেফালি সরকারকে (১৫) ওরা কোপিয়ে খুন করে। কী দোষ ছিল ঐ কিশোরীর? সেভাবেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেল হরিপদ রায়। সেরকম আরো বহু পুরুষ-মহিলার আজঅব্দি কোনো খবর বেরোয় নি। বহুদিন পরে নলবনের মাঝখানে কিছু নরকঙ্কাল পাওয়া গেছিল।  কিন্তু সেই নরকঙ্কালগুলো ছিল কাদের শনাক্ত করবে কে?  আমাদের গ্রামের অনেকেই দৌড়ে দৌড়ে প্রাণ বাঁচালেন যদিও পরে শুনেছি এই গ্রামে হামলা করবার পরে ওরা শিলাপাথার থেকে ব্রহ্মপুত্রের পাড় অব্দি পুরো অঞ্চলটিতেই বিদেশী খেদার নামে আক্রমণ নামিয়েছিল।”
            অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদী তথা বিদেশী খেদার জন্যে মারণাস্ত্র যারা এসেছিল, বা বিদেশী বলে ভেবে ‘মানুষে’র বাড়ি ঘরে আগুন দিয়ে ‘অগ্নিশিখা’ নিয়ে অসমিয়া জাতির ‘অস্তিত্ব’ রক্ষা করতে যারা এসেছিল তারা শিলাপাথারের বৃহত্তর অঞ্চলে চালিয়েছিল গণনিধন পর্ব। অসমিয়া জাতির নামে চালানো এই বর্বর গণহত্যা অভিযানের প্রথম শিকার ছিল সোনাই মণ্ডল।
           
(ক্রমশ:)
লেখকের দূরভাষ: ৯৮৫৪৬-৩১৯২৮। লেখক ‘সাদিন’ কাগজের স্টাফ রিপোর্টার।