(লেখাটি নভেম্বর, ২৬-শে তিনসুকিয়া কলেজ থেকে প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন 'অন্বীক্ষা'-তে প্রকাশিত)
বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার বাংলা আকাদেমি দুই সংগঠনই কবি নজরুলের রচনাবলী প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের রচনাবলীর বারোটি খণ্ড আমরা দেখেছি। বোঝাই যায়—জীবনের বাইশ তেইশ বছরের সাহিত্য জীবনে কী ব্যাপক সংখ্যাতে তিনি কাজ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ৮০ বছরের কাজের জীবন পেয়েছিলেন। নজরুল যদিও ১৯৭৬ অবধি বেঁচে ছিলেন—১৯৪২-এর পরে তো আর লিখতে গাইতে পারেন নি। সেই দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রায় তিন দশক পরে জন্মেও কাজি নজরুল থেমে গিয়েছিলেন প্রায় একই সময়ে। একই বছরে জন্মে জীবনানন্দ দাশের তখন আসলে আবির্ভাব হচ্ছে, তাও নজরুলের অনুসরণে। এতো বিচিত্র রচনার মধ্যে কবিতা গানের বাইরে তিনি খুব কম পঠিত ও আলোচিত। তাই আমরা তাঁর একটি কম চেনা কাজের জগত -- মূলত তাঁর ছোটো গল্প নিয়েই কথা বলব। এবং তাঁকে বোঝার চেষ্টা করব।
কাজি নজরুল ইসলাম "বিদ্রোহী' বলেই পরিচিত। এবং এই পরিচয়েই তিনি বাঙালি তথা ভারতবাসীর কাছে অধিক পরিচিত এবং সমাদৃতও। কিন্তু সেই নজরুলের অধিকাংশ গান তো প্রেমের আর পূজার গান! বাঙালি মধ্যবিত্তদের মধ্যে জনপ্রিয় প্রায় কোনো দেবদেবী বা নবি অবতারকেই তিনি বাদ দেন নি, যাদের নিয়ে গান বাঁধেন নি।বাদ পড়েছেন কেবল কিছু লৌকিক দেবদেবতা। আল্লাহ রসুল নিয়ে গান বেঁধেছেন, কিন্তু বোধ করি সবচাইতে বেশি বেঁধেছেন কালীকে নিয়ে। তার মানে শ্যামাসংগীত লিখেছেন। ফলে তাঁকে কেবল "বিদ্রোহী' বলতে পারি না, এই প্রশ্নটিকে আমি শুরুতেই স্পষ্ট করে দিতে চাইছি। যদিও তিনি কবিতা লিখে কাগজ সম্পাদনা করে ব্রিটিশ সরকারের রোষে পড়েছিলেন, হাজতেও গিয়েছেন। তাই বলে এই এক জায়গাতেই তিনি টিকে থাকেন নি। ১৯৪২ –এর পরেও যদি তিনি লেখালেখিতে থাকতেন সক্রিয়—তবেই তাঁর পরিচয় আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হতে পারত। এমন বহু কবি শিল্পীকেই আমরা দেখেছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু লেখার শৈলীই নয় জীবনের ভাবনাও পালটেছেন। রবীন্দ্রনাথও পালটেছেন। ফলে আজকের দিনে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বিচারও খুবই কঠিন কাজ।
নজরুল কি পালটেছেন? মাত্র ২২/২৩ বছরের সামান্য সময়ে কেউ একজন কতটাই বা পাল্টাতে পারেন? আমাদের মতে পালটেছেন। এবং একই সময়ে দ্বিসত্তার মানুষও ছিলেন। কিন্তু তাঁকে ঠিকঠাক চেনার আরও একটি মুস্কিলও আছে। তাঁকে নানাভাবে লোকে চিহ্নিত করবার চেষ্টা করে ভুল করেছেন, সেই নিয়ে তাঁর একটি বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতাই আছে। "আমার কৈফিয়ত' নাম। বহু চেনা কবিতা—তবু আমাদের বক্তব্যকে দাঁড় করাতে কয়েকটি চরণ মনে করা যাক -- ""আনকোরা যত নন্ভায়োলেন্ট নন্-কো’র দলও নন্ খুশী।/"ভায়োলেন্সের ভায়োলিন্' নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!/"এটা অহিংস', বিপ্লবী ভাবে,"নয় চর্কার গান কেন গা'বে?'/ গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্ফুসি!/স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!...''
এর পরে যদি আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে যায় কোনো এক বিশেষণে চিহ্নিত করা। তখনও কমিউনিস্ট পার্টি সেভাবে পরিচিত হয় নি। যদি হত, কবিতাতে সেই উল্লেখও থাকত—"কেউ ভাবে আমি কমিউনিস্ট'।কাজি নজরুলই প্রথম কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক গানটি বাংলাতে অনুবাদ করেন। "সাম্যবাদী', "সর্বহারা' নামে তাঁর কাব্যগ্রন্থ আছে। রুশ বিল্পব সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলেন, বহু কবিতাতে সাম্যবাদী সমাজ আসছে বলে আশার বার্তাও শুনিয়েছেন। তাতে করে, বহু কমিউনিস্ট অনুরাগী দাবি করেন, তিনি আজীবন সক্রিয় থাকলে,পার্টিতে এসে যেতেন। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, না তিনি তা হতেন না। যতদিন সক্রিয় ছিলেন, এরই মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক হতাশাও এসেছিল। বিষ্ণু রাভার মতো নির্বাচনে দাঁড়িয়ে সেকালে হেরেও ছিলেন।
নিজের কবি সত্তা নিয়ে সেই কবিতাতেই কী লিখেছিলেন? ""বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই "নবী',/ কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!'' আরও লিখেছেন,একই কবিতাতে,""বড় কথা বড় ভাব আসে না ক' মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!/অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!'' এইখান থেকে আমরা তাঁকে বোঝার শুরু করতে পারি। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের নাম দেশে একই সঙ্গে নিয়ে থাকেন বটে আম-জনতা। কিন্তু মনে রাখা ভালো যে বাংলা কবিতার পঞ্চপ্রধানের মধ্যে নজরুলের নাম নেই। কিন্তু বাংলা গানের "পঞ্চকবি'দের মধ্যে নজরুলও রয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ তো আছেনই। সবারই গান দিয়ে বাংলা গানের আধুনিকতার সূচনা যদিও হয়েছিল, আধুনিক গান বললে আমরা তাঁদের পরবর্তী সবার গানকে বুঝি।
গান আর কবিতা বাদ দিলে কাজি নজরুলের আর সব রচনা নিয়ে লোকজন পরিচিত কম—আগেই লিখেছি। তিনি তো প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন। গল্প লিখেছেন, নাটক লিখেছেন।তিনি বাংলা ছায়াছবির শুরুর যুগে প্রচুর ছবিতে গান বেঁধেছেন, সুর করেছেন। এমন কি দুই চারটিতে অভিনয়ও করেছেন। সবই সেই ১৯৪২- অবধি ৪৩বছরের জীবনে। তাতে এমন অভিযোগও শোনা যায় যে তিনি সেই সব ছবির দাবিতে প্রচুর ফরমায়েশি গান তৈরি করেছেন, ভেতর থেকে সেই সব গান আসবার কথা না। বিশেষ করে তাঁর শ্যামা সঙ্গীত বা ইসলামী গানের মতো ধর্মীয় গানগুলো সম্পর্কে এমন একটি মত চালু আছে। নইলে যিনি বিদ্রোহী কবিতা লিখেছেন, ভগবান বুকে ভৃগুর পদচিহ্ন এঁকে দেবার আহ্বান জানিয়েছেন—তিনি এত ধর্মের গান লেখেন কী করে? এই হিসেব অনেকে মেলাতে পারেন না।
তিনখানা গল্প সংকলন ছিল তাঁর। "ব্যথার দান' (১৯২২),"রিক্তের বেদন' (১৯২৫),"শিউলিমালা' (১৯৩১)। এর মধ্যে প্রথমটিতে ছটি, দ্বিতীয়টিতে আটটি, আর শেষটিতে চারটি গল্প আছে। সব মিলিয়ে আঠারো। প্রেম তো আছেই, আর প্রায় সব ক'টিতে আছে অহৈতুকী রাজনৈতিক যুদ্ধ –যাকে মনের ভেতরে চলা যুদ্ধের প্রতীক হিসেবেই পড়া যেতে পারে আর আছে বিচ্ছেদ। মিলন মাত্র দুটি গল্পে "হেনা' এবং "অগ্নিগিরি'। গল্পগুলোর প্রেক্ষাপট বহুক্ষেত্রেই বাংলার বাইরে, এমন কি দেশেরও বাইরে।প্রথম গল্প "ব্যথার দান'-এর প্রেক্ষাপটই তো ইরান দেশের যুদ্ধক্ষেত্র। দ্বিতীয় গল্প "হেনা'-র নায়ক আরও দূর ফ্রান্সে চলে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভারতীয় সৈনিক, যেমন নজরুল নিজে ছিলেন। তৃতীয় গল্প "বাদল বরিষণে'-র নায়ক যুক্তপ্রদেশে গিয়ে পৌঁছায়। দ্বিতীয় সংকলনের "রিক্তের বেদন' গল্পের নায়ক চলে যায় সেই মধ্যপ্রাচ্যে, কুর্দিস্তানে, কারবালাতে। "বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী'-র গল্প শোনা হয় বাগদাদে সহযোদ্ধার থেকে। "মেহের নেগার'-এর প্রেক্ষাপট কাশ্মীর। এই অবধি বাকি গল্পগুলো বাংলাতে শুরু হলেও নায়ক যুদ্ধে বিদেশে চলেই যায়। দ্বিতীয় সংকলনের পঞ্চম গল্প "রাক্ষুসী'-তে এসে বাংলাদেশের মাটিতে শেকড় ছড়ায় গল্পগুলো।
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথোত্তর কবি লেখকদের দাবি ছিল,তাঁরা চারপাশের বাস্তব জীবনের যন্ত্রণাকে সাহিত্যে নিয়ে আসবেন। এটাই বিষ শতকের আধুনিকতা। নজরুলের গল্পে সেই চারপাশটা নেই। বন্দুক গোলার উল্লেখ না রেখে ঢাল তলোয়ার ঘোড়ার কথা লিখলে একে হাজার বছর আগেকার লোকগল্পের বেশি কিছু মনে হয় না। বাংলার এক কবির প্রেমের গল্পের অধিকাংশ চরিত্রগুলো ঢাকা কলকাতা কুমিল্লা মুর্শিদাবাদের বদলে খামোখা ইরানের গোলেস্তান, কিরগিস্তানের বোস্তান, আফগানিস্তান এই সব এলাকাতেই বাস করে কেন? এর জবার একটাই -- ব্যাপক পার্শি প্রাচীন সাহিত্য পড়বার প্রভাব।প্রথম গল্পের চরিত্র নামেই সেই সাহিত্যের ছাপ অতি স্পষ্ট। নজরুল যে একের পরে এক আধুনিক সুফি গল্প পড়াচ্ছেন আমাদের --এটি জলের মতো স্পষ্ট হয় তাঁর "সালেক' গল্পটিতে এসে। গ্রামে এক দরবেশ এসছেন। সেই দরবেশের কাছে সামাজিক মান প্রতিপত্তি সব হারিয়ে দীক্ষা নিতে ছুটে গেলেন কাজি। দরবেশ গেয়ে উঠলেন গান। কাজি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে! জবাব এল নদীর কলতান থেকে, "" মাতাল হাফিজ!'' এই হাফিজ ইরানের কবি মুহম্মদ সামসুদ্দিন হাফিজ। যার অনেক কবিতাই নজরুল অনুবাদ করেছিলেন।
"বাদল বরিষণে'-তে নায়ক যখন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে কাবুলের আমিরের হয়ে লড়তে যুদ্ধে যাবে তখন মনে হয়—একটি সঙ্গত কারণ রয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ সেনা ছেড়ে "হেনা'-র প্রেমাষ্পদ যখন সেই একই আমিরের দলে ভেড়ে তখন কোনো যুদ্ধকেই আর রাজনৈতিক কারণে মহৎ বলে মনে হয় না,বিশেষ করে চরিত্রগুলো যখন নজরুলের। "হেনা'-তে ব্রিটিশ সেনার বেশ প্রশস্তিই গাইছেন নজরুল, গল্পের কথকের আড়ালে। কথক লিখছেন, ""নাঃ, আমিরের হয়ে যুদ্ধ করাই ঠিক মনে করলুম।কেন? এ "কেন'র উত্তর নেই। তবুও আমি সরল মনে বলছি, ইংরেজ আমার শত্রু নয়। সে আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। যদি বলি, আমার আবার এ যুদ্ধে আসার কারণ একটা দুর্বলকে রক্ষা করবার জন্যে প্রাণ আহুতি দেওয়া, তা হলেও ঠিক উত্তর হয় না।আমার অনেক খামখেয়ালির অর্থ আমি নিজেই বুঝি না!'' এই না বোঝাটা কবি নজরুলেরও। বিদ্রোহী কবি এতটা রাজনীতি অসচেতন মানতে যদিও বা আমাদের বেশ কষ্ট পেতে হবে। যখন গল্প লিখছেন তখন তো তিনি বিদ্রোহী কবি। জেল-টেল খেটে ফেলেছেন। তখন এহেন ব্রিটিশ প্রশস্তি মেনে নিতে বেগ পেতে হয়। আমাদের কেবল মনে রাখতে হবে, স্বদেশী আন্দোলন টান্দোলন দেখা দিলেও সাধারণভাবে বাঙালি তথা ভারতীয় মধ্যবিত্তদের মধ্যে ব্রিটিশ তাড়িয়ে স্বাধীনতা পেতে হবে—সেরকম ভাবনা তখনও পাকা হয়ে বসে নি।অহিংসার প্রচারক গান্ধি নিজেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনার পাশে দাঁড়ানো ভারতীয়দের কর্তব্য বলে ভেবেছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধিতা তখন ছিল নিছক নিপীড়ক শাসকের বিরোধিতার মতো—যা স্বাধীন দেশেও আমরা দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু যুদ্ধ বাঁধলে এখনও লোকে ভাবে দেশের সেনার পাশে দাঁড়ানোটাই দেশপ্রেম—এও অনেকটা সেরকমই। তার উপরে ব্রিটিশ সমাজে ব্রাত্য ভারতীয় যেন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে একটি স্বীকৃতি আদায়ের সুখও অনুভব করত। কাজি নজরুলের প্রথম উপন্যাস "বাঁধন হারা'র গল্পও অনেকটা এরকমই। "রিক্তের বেদন'-এ যেখানে প্রেমের সঙ্গে কর্তব্যে দ্বন্দ্ব বাঁধছে—ব্রিটিশ সেনার কর্তব্য পালন করতে গিয়ে ছেলেটির মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল, ""প্রেমের চরণে কর্তব্যের বলিদান দেব?'' এমন যে প্রেমের উচ্ছ্বাস সে একটি বারের জন্যেও প্রশ্ন করল না, একটি দখলদার সেনার হয়ে যুদ্ধটি মহান "কর্তব্য' কেন হবে! আমাদের মনে রাখতে হবে ব্রিটিশ বাহিনী তখন সেখানে অটোমান সাম্রাজ্যের খলিফার পতন ঘটাবার যুদ্ধ করছে। যার বিরুদ্ধে ভারতে খিলাফৎ আন্দোলন দেখা দিলে সেনা থেকে ফিরে এসে নজরুল সেই আন্দোলনের সমর্থনে কলম ধরেছিলেন। সেই যুদ্ধের পরে তুরস্ক স্বাধীন হয় কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে। সেই কামাল পাশাকে নিয়েও নজরুলের একটি বিখ্যাত কাব্য নাটিকা রয়েছে। সেই যুদ্ধের পরে ব্রিটিশ আর ফরাসিরা মিলে অটোমান সাম্রাজ্যকে দখলে রাখতে যেভাবে ভাগবাটোয়ারা করে তার খেসারত এখনও মধ্যপ্রাচ্যকে দিতে হচ্ছে একের পরে এক যুদ্ধে। প্যালেস্টাইনের সংগ্রামও সেই ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা। সেই পাপ-যুদ্ধকে বিনা প্রশ্নে নজরুল মহান মনে করছেন। "অতৃপ্ত কামনা'-র ছকটিও একই। নজরুল যেন ধরেই নিয়েছেন তার গল্পের তরুণটি যুদ্ধে যাবে। "রাজবন্দির চিঠি'-তে আশা করা যেত স্বদেশী সংগ্রামী এসে হাজির হবেন। যেমন নজরুল ছিলেন। কিন্তু না-- প্রেসিডেন্সি জেল থেকে স্ত্রীর কাছে চিঠি লিখছে, বিচারে তার ছোটো হাজতবাস জুটলেও এর আগেই সে যক্ষ্মা রোগে মারা যাবে। যেতে যেতে এই চিঠিতে সে স্ত্রীকে দেশোদ্ধারের কোনো মহৎ কর্তব্যের কথা কিছুই জানায় না। সংসারের কথাও কিছু লেখে না। লিখে জানায় প্রেমের অভিমান। ফলে ব্রিটিশ বিরোধিতা না থাক, কিন্তু যুদ্ধ যে হচ্ছে কেন—সেই তথ্যটুকুও যখন গল্পে মেলে না তখন পাঠককে বুঝে নিয়ে বেগ পেতে হয় না, আমাদের বুঝে নিতে হয়—রাজনৈতিক যুদ্ধটি এখানে গৌণ, মুখ্য যুদ্ধ হচ্ছে বিরহীর মনে।
মাটির ছোঁয়াতে যে গল্পগুলো একাধিকবার পড়বার ইচ্ছে করবে তার মধ্যে রয়েছে সেই দ্বিতীয় সংকলনের "রাক্ষুসী' গল্প। তৃতীয় সংকলনের "পদ্মগোখরা', "জিনের বাদশা' এবং "অগ্নিগিরি'। এর মধ্যে "জিনের বাদশা'-তে আগেই লিখেছি প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে শয়তান প্রেমাষ্পদ পরিণত হয় সুবোধ বালকে। "রাক্ষুসী'-তে পরকীয়ার পাপে লিপ্ত স্বামীকে পাপ-মুক্ত করতে গিয়ে স্ত্রী যখন তাকে হত্যা করে প্রথমে আইনের শাস্তির মুখে পড়ে এবং পরে সন্তান সহ সামাজিক প্রত্যাখ্যানের মুখে বিড়ম্বিত হয়—একটি মোক্ষম অনুভব সে উচ্চারণ করে, ""আমি যদি ওইরকম একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসতুম আর যদি আমার সোয়ামি ওই জন্যে আমাকে কেটে ফেলত, তাহলে পুরুষেরা একটি কথাও বলত না। তাদের সঙ্গে মেয়েরাও বলত, "হাঁ, ওরকম খারাপ মেয়েমানুষের ওই রকমেই মরা উচিত। কারণ তারাও বরাবর দেখে আসছে, পুরুষদের সাত খুন মাফ।''' বিদ্রোহী কবির সঙ্গে তাঁর গল্পে এই প্রথম আমাদের সরাসরি আলাপ হবে।
রচনাশৈলীর দিক থেকে "বাদল বরিষণে' কবির কলমে তৈরি কাব্যিক গদ্য হিসেবেই এটি সুখপাঠ্য। এতে বেশ কিছু হিন্দি ভজন এবং লোকগানের কলি আছে। "মেহের নেগার'-ও গানে, কাব্যিক গদ্যে রূপকের আশ্রয়ে বুনোট এবং ভাষার জন্যে একটি সুখপাঠ্য গল্প হয়ে উঠে। প্রেমাস্পদের কাব্যিক গদ্য আরব সাগরের বেলাভূমি ও আশপাশের প্রকৃতির সঙ্গে এবং কোনো অতীত প্রেমিকার স্মৃতির সঙ্গে মিশে যদি আনন্দ দিতে সমর্থ হয় পাঠককে -- তবে এটিই প্রাপ্তি। এর বেশি কিছু নেই। শেষ গল্প "শিউলিমালা'-র রসোদ্ঘাটন অসম্ভব হবে যদি ভাষার শৈলীর ভেতরে প্রবেশ না করা যায়। "রাক্ষুসী'-র ভাষা বয়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবারে কথক একটি নারী। সে কথা বলছে বীরভূমের বাগদিদের ভাষাতে। পুরোটাই ও কোনো মহিলাকে বলছে, শ্রোতার দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না জানিয়েই থেমে গেছেন লেখক। তৃতীয় গল্প সংকলনে এসে গল্পগুলো যেন অনেকটা চেনা ছকে এসে ঢুকেছে। যদিও রয়েছে সেই প্রেমের গল্পই। এবারে কোনো কথক নয়, গল্প বলছেন লেখক স্বয়ং। "পদ্মগোখরা' অনেকটা লোক কাহিনির গুপ্তধন পাবার রোমাঞ্চকর গল্পের মতো। সেই গুপ্তধনকে আলগে রাখে এক জোড়া পদ্মগোখরা সাপ। এরা আবার দুধও খায়, পোষও মানে। গল্পটিতে বেশ কিছু বাঁক আছে, ছোটো করে বলাও কঠিন। আরিফ আর জোহরা স্বামী স্ত্রী। এই গল্প সাপদুটিকে সন্তানবৎ ভালোবেসে গৃহবধূ জোহরার বিড়ম্বনার কাহিনি। "জিনের বাদশা'-ও সেই পুথি সাহিত্যের রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনির আদলেই লেখা। যদিও এতে কিন্তু জিন ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১৯১৩-১৪ সনে নজরুল ময়মনসিংহ জেলাতে এসে ষষ্ঠ সপ্তম শ্রেণিতে পড়েছিলেন। ফলে সেখানকার ভাষা জনজীবনের সঙ্গে তাঁর আলাপ ছিল। নজরুলের গল্পে আমরা দেখব, শুরু থেকেই তিনি প্রমথ চৌধুরি-রবীন্দ্রনাথ জুটি প্রচলিত প্রমিত ভাষার আশ্রয় নিচ্ছেন। এবং দরকারে আঞ্চলিক ভাষা বৈচিত্র্যও ব্যবহার করছেন। আধুনিক সাহিত্যের যা একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।রাক্ষুসী গল্পে বাগদিদের ভাষা ব্যবহারে শুরু।"জিনের বাদশা'-তে সংলাপ অংশের পুরোটিতেই তিনি ব্যবহার করেছেন ময়মনসিংহী ভাষা। যেমন আল্লারাখার সংলাপে আছে,""এই দিক দিয়া যাইতেছিলাম,দেহি কেডা জলে ভাসতে আছে, দেইহ্যা ছুড্যা জলে লাফ দিয়া পরলাম, তুইল্যা দেহি তুমি! আল্লারে আল্লা, খোদায় আনছিল আমারে এই পথে, নইলে কি অইত! কী অইছিল তোমার?'' এমনি একটি ময়মনসিংহের প্রেক্ষাপটে গল্প "অগ্নিগিরি'। সংলাপে ময়মন সিংহের ভাষা সেই গল্পেও ব্যবহৃত হয়েছে। নূরজাহানের যে কথাতে সুপ্ত অগ্নিগিরি সবুর বিস্ফোরিত হল –সেটি এরকম, "আপনি বেডা না?...আল্লায় আপনারে হাত-মুখ দিছে না।'
তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা চারটি। শেষ উপন্যাস জীবনের জয়যাত্রা (১৯৩৯)-- কিন্তু সেটি দুর্লভ। "বাঁধন হারা' (১৯২৭) , ১৯৩০-এর "মৃত্যু ক্ষুধা' (১৯৩০) এবং "কুহেলিকা' (১৯৩১) -- তিনটি উপন্যাসেই কিন্তু নায়কের দুজন করে প্রেমাস্পদ। কারও সঙ্গেই তাদের মিলন হয় না। একজন নিছক ব্রিটিশ সেনার যোদ্ধা, একজন কমিউনিস্ট, আর জন স্বদেশী বিপ্লবী। তাও ছাপিয়ে গেছে সাধক সত্তাই। বিদ্রোহী নয়। আমরা পরিসরের কথা ভেবে সেগুলো নিয়ে বিস্তৃত আলোচনায় যাচ্ছি না।
ভক্তির থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাঁর বিদ্রোহী সত্তাকেও বোঝাই যাবে না।বিদ্রোহী কবিতাতেও যখন লেখেন, আমি ভৃগু—ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন—তখনও কিন্তু তিনি একাধারে ভক্তের বিদ্রোহের কথাই লিখেছেন। তাঁর সম্পাদিত কাগজ "ধূমকেতু' নিষিদ্ধ হয়েছিল। তাঁর জেল হয়েছিল। মামলা চলাকালে আদালত তাঁর বক্তব্য শুনতে চাইতে তিনি লিখিত জবাব দেন। নজরুলের একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ "রাজবন্দির জবানবন্দি'। সেখানেই তিনি লিখেছেন, ""আমার এই দেহ-মন্দির জাগ্রত দেবতার আসন বলেই তো লোকে এ-মন্দিরকে পূজা করে, শ্রদ্ধা দেখায়, কিন্তু দেবতা বিদায় নিলে এ শূন্য মন্দিরের আর থাকবে কি? একে শুধাবে কে? তাই আমার কণ্ঠে কাল-ভৈরবের প্রলয়তূর্য বেজে উঠেছিল, আমার হাতে ধূমকেতুর অগ্নি-নিশান দুলে উঠেছিল, সে সর্বনাশা নিশানপুচ্ছে মন্দিরের দেবতা নট-নারায়ণ-রূপ ধরে ধ্বংস-নাচন নেচেছিলেন। এ ধ্বংস-নৃত্য নব সৃষ্টির পূর্ব-সূচনা।'' এক মুসলমান কবির কলমে ধ্বংসের দেবতা নটরাজের কল্পনাকে কেবল রূপক উপমা ভাবার কোনো কারণ নেই। এক্কেবারে এই সব লালনের গানের "খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়'-এর মতো ব্যাপার স্যাপার। লালনের গানে যেমন আকুতি আছে "মিলন হবে কত দিনে/আমার মনের মানুষের সনে।।' নজরুলের দেবতা সেই মনের মানুষ। লালন হাছনের গানেও আমরা মনের মানুষকে কখনও আল্লাহ কখনও কৃষ্ণরূপে দেখেছি। নজরুল সেই পরম্পরারই ধারক ছিলেন। কিন্তু লালনের গানে তো আর শিব কালী দুর্গা দশমহাবিদ্যার দেখা মেলে না, নজরুলের গানে—তাও মেলে। সেই সবও নতুন কিছু নয়। আজকাল আমরা প্রবল হিন্দু মুসলমানের বিরোধের কথা শুনি, এককালে শাক্ত বৈষ্ণব শৈবেও প্রবল বিরোধের গল্প শোনা যেত। কিন্তু ভারতীয় সমাজে তো বটেই বাংলার সমাজেও গোটা মোঘল জমানাতে এই সব বিরোধের বিশেষ রাজনৈতিক কারণ ছিল না। যোগ তন্ত্র বৌদ্ধ এবং সুফি ধর্মচর্চার মধ্যে ব্যাপক লেনদেন গড়ে উঠেছিল। ভারতীয় যোগ তন্ত্র সাধনাকে সুফিরা গোটা বিশ্বে নিয়ে গিয়েছিলেন। এদের এত বিচিত্র রূপ গড়ে উঠেছিল যে কারও কারও ধর্মাচারকে আজকের দিনে ঘোর কুসংস্কার বলেই মনে হবে। কিন্তু সেই সব কুসংস্কারের বিপদ যদিও বা কিছু ছিল সেই সব আজকের "আধুনিক' ধর্মরাজনীতির মতো ভয়াবহ কিছু ছিল না। সেদিক থেকে নজরুল অনেক "প্রাচীনপন্থী'ই ছিলেন। তাঁকে কষ্ট করে "অসাম্প্রদায়িক' হতে হয় নি। আজকাল অসাম্প্রদায়িকতার প্রমাণ দিতে হয়, বিশেষ করে মুসলমানদের। আপনি যদি অযোধ্যাতে রামমন্দিরের পক্ষে দাঁড়ান—তবে আর আপনি সাম্প্রদায়িক নন। মুসলমান হলে তো আপনি একটু বেশিই "অসাম্প্রদায়িক'। ভালো মুসলমান। আজকের এই রাজনীতি দেখা দিচ্ছিল মাত্র নজরুলের কালে। তাই তাঁকে কবিতাতে প্রশ্ন ছুঁড়তে হয়েছে, ""হিন্দু না ওরা মুসলিম এই জিজ্ঞাসে কোন জন হে, কাণ্ডারি বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা'র …'' এই সব দেখায় আমরা সামাজিক ইতিহাসে সামনের দিকেই হাঁটি না কেবল, কখনও পেছনের দিকেও এগোই। নজরুলকে সুফি, যোগী, তান্ত্রিক—যাই বলি না কেন---সে একদিকে যেমন আজকের আচার উৎসব আড়ম্বর সহ সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট ধর্মের থেকে উন্নত ছিল—যেমন ছিল লালন হাছন রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা। আর দিকে নজরুল প্রবল কুসংস্কারেও মজেছিলেন। লোকে বলেন,তাঁর পুত্র বুলবুলের অকাল মৃত্যুতে মনে শান্তির সন্ধানে তিনি যোগীরাজ বরদাচরণের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন—কিন্তু আসলে যখন তিনি ভালো করে কবিতা লেখাও শুরু করেন নি—নিতান্ত কিশোর—সেই কালেই নানা তীর্থে সাধু সঙ্গের সন্ধানে ছুটতেন। তারাপীঠ, আদ্যাপীঠ, দক্ষিণেশ্বর ছাড়াও আরও বহু ঠাঁই ঘুরেছেন। তারাপীঠের সাধক বামাক্ষ্যাপার কাছে বহুবার গিয়েছিলেন। কেবল ছেলের মৃত্যুর পরে তিনি বরদাচরণের কাছে পৌঁছান। তাঁর কাছে তিনি আশা করেছিলেন, ছেলেকে বাঁচিয়ে ফেরাবেন। সেটি তিনি করেন নি। অথচ, একদিন বুঝি ধ্যানে বসিয়ে ছেলেকে দেখিয়েছিলেন এমন একটি গল্পও আছে। ওখানেই শেষ নয়, উত্তর কলকাতার ভাড়া বাড়িতে রীতিমত কালী মূর্তি গড়িয়ে পূজাআচ্চাও করেছেন। যিনি দেশের মুক্তির স্বপ্ন দেখছিলেন, তিনিই কিনা ব্যক্তিগত জীবনে আধ্যাত্মিক মুক্তির সন্ধান করতে করতে এত দূর এসে পৌঁছেছিলেন। মানব সভ্যতা তথা ধর্মের ইতিহাসে মূর্তি পূজার বাইরে বেরিয়ে নিরাকার এক ঈশ্বরের সেবাকে অগ্রগমন বলে মানা হয়। এমনতর মানবার পক্ষে প্রচুর যুক্তি আছে। কিন্তু যেমন বিবেকানন্দ মূর্তিপূজা নিয়ে পালটা যুক্তি দিয়ে উনিশ শতকের বাংলার ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে বিপরীত পথে হাঁটিয়েছিলেন, ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলনকে প্রান্তে ঠেলে দিয়েছিলেন—মুসলমান নজরুল ব্যক্তিজীবনেই এমন উলটো পথে হেঁটেছিলেন। আর তাঁর এই ধর্ম জিজ্ঞাসার কথা তিনি খুব সংক্ষেপে গুরু বরদাচরণের বই "পথহারার পথ ও দ্বাদশ বাণী'-র ভূমিকাতে লিখেছিলেন। বরদাচরণের অত্যন্ত প্রিয় শিষ্য ছিলেন কাজি নজরুল। এখানেই আসতেন নেতাজি সুভাষও। সুভাষে নজরুলে দেখাদেখি ওখানেই হয়। বরদাচরণের একাধিক মুসলমান শিষ্য ছিলেন। নজরুল সবার মধ্যে প্রিয়। তাঁকে "কাজিভায়া' বলে ডাকতেন। নিজের গ্রন্থের ভূমিকা লেখাবার জন্যে কাজিভায়াকেই তাঁর মনে হল সবচাইতে যোগ্য ব্যক্তি। সেই ভূমিকা "যোগসাধনা' নামে নজরুলের কোনো কোনো প্রবন্ধ সংকলনে মেলে। আর মেলে "ভক্তিগীতি মাধুরী' নামে নজরুলের ৫০১-টি ভক্তি গীতির সংকলনের শুরুতে। ভূমিকাতে নজরুল নিজের কথাই লিখেছেন বেশি, কীভাবে জীবনের শুরুর দিকে ধর্ম জিজ্ঞাসার সূত্রপাত, মাঝে রাজনৈতিক ঝড়ঝঞ্ছাতে উড়ে বেড়ালেন—এবং পুত্র মৃত্যুর পরে বরদাচরণের কাছে গিয়ে স্বস্তি পেলেন। "ভক্তিগীতি মাধুরী' বইটিরও বুঝি নজরুলের নিজের লেখা একটি ভূমিকা ছিল। কোনো কোনো সমালোচক লিখেছেন,সেই ভূমিকাতে বইটি সম্পর্কে লেখা ছিল, ""তিনি (বরদাচরণ মজুমদার) এই গ্রন্থ-গীতার উদগাতা।'' এই মাধুরী বইটি দেখেছি। কলকাতার করুণা প্রকাশনী থেকে ছাপা। সেখানে নজরুলের এই ভূমিকাটি নেই। নজরুল-রচনাবলীর সম্পাদকেরাই লিখেছেন তাঁর লেখালেখি খুঁজে পাওয়া এক কঠিন কাজ, খুবই অগোছালো ছিলেন। তবু নজরুল যেমন ভাবাবেগ সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন, অসম্ভব নয় যে নিজের বইটিকে "গীতা' বলবেন। এবং সেই গীতা পড়ে বিশ একুশ শতকের মানুষ ধর্মীয় সমস্ত গোঁড়ামির থেকে বেরিয়ে আসবেন। বাস্তবে এটা হয় নি। হিন্দুতে মুসলমানে নজরুলও বিভাজিত হয়েছেন। শ্যামা সঙ্গীতে তাঁর নাম সাধক কমলাকান্তের পরেই নেওয়া হয়ে থাকে। নজরুলের গান না জেনেই প্রচুর কট্টর সাম্প্রদায়িকের ঘরেও দীপাবলির দিনে নজরুলের গান বাজে। তাঁর ইসলামী গান বা গজলগুলো কিন্তু বাজে না। হিন্দুরা সাধারণত তাঁর এই সব গান করেন না। খুবই স্বাভাবিক তাঁর শ্যামা সঙ্গীত গান করেন—এমন মুসলমানের সংখ্যাও খুবই বিরল। "ভক্তিগীতি মাধুরী'-তে সকল রকমের গানই রয়েছে।
আরও দুই একটি তথ্যের উল্লেখ থাকা ভালো। প্রথমত ছেলেবেলা নজরুল লেটোর গানে, কবিওয়ালাদের দলে ব্যাপক যোগ দিয়েছেন। সেসব বাংলার লোকসংস্কৃতির পরম্পরা। যদিও বা জনপ্রিয় মত হচ্ছে মেয়েদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রচারের জন্যে বিদ্যাসাগর প্রমুখকে লড়তে হয়েছে, বেগম রোকেয়াকে লড়তে হয়েছে—হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মেয়েদের মধ্যে পুথি সাহিত্যের ব্যাপক চল ছিল। তাই নজরুলের প্রায় সব রচনাতে সেই সব পুথির উল্লেখ মিলবে। পদ্মগোখরার গল্প তাই তাঁর কলমেই সম্ভব। "কুহেলিকা' উপন্যাসে তহমিনার স্কুলে যাবার কোনো সংবাদ নেই—কিন্তু ওর বুদ্ধি ও সপ্রতিভ যুক্তি তর্কের সামনে বিপ্লবী জাহাঙ্গীরও বলছে, এই সব অতিরিক্ত নভেল পড়বার ফল।


.jpeg)

.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
No comments:
Post a Comment