আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Tuesday, 10 August 2010

নবজাতকের কাছে এখনো অম্লান থাকুক, থাকবে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার


          (জন্মদিনে সুকান্ত স্মরণে তিনসুকিয়ার ইউ সই টিভি চ্যানেলের জন্যে প্রস্তুত বক্ততা) 
        

এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান:
                 ই গেল সপ্তাহে অসমের প্রায় সমস্ত কাগজে গুয়াহাটি শহরের একটি সংবাদ ছিল এরকম। মরিয়ম বেগম বলে এক শ্রমিক পত্নী সন্তান প্রসব সম্ভাবনা নিয়েই বাসে চেপে মফসসলের বাড়ি থেকে গুয়াহাটিতে স্বামীর কাছে আসছিলেন। বাসের ভেতরেই প্রসব বেদনা শুরু হওয়াতে বাসটি তাকে গুয়াহাটি কমার্স কলেজের সামনে নামিয়ে রেখে চলে যায়। সভ্রান্ত-শিক্ষিত মানুষের ভীড়ে সেই মহিলার একটুকুও স্বচ্ছন্দ আশ্রয় মেলেনি। সেই পথের ‘পরেই পথচলতি কিছু মানুষ একটু আড়াল তৈরি করে দেন। সেখানেই ভদ্রমহিলা দুটি যমজ সন্তানের জন্ম দেন। পরে অবশ্যি খবর দিলে ‘মৃত্যুঞ্জয়’ এসে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই প্রতিকূল পরিবেশে জন্ম নিতে গিয়ে একটি সন্তান জন্মেই আহত হয়। এবং পরে মারা যায়। স্বাধীনতার ছ’টি দশক অতিক্রান্ত করেও যখন এমন ঘটনা আমাদের সমাজে আকছার ঘটে  তখন কি মনে হয় না সুকান্তের সেই অঙ্গীকার এখনো কেমন জ্বলজ্যান্ত ভাবে প্রাসঙ্গিক। মনে পড়ে?
                   যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে
                  তার মুখে খবর পেলুমঃ
                   সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
                   নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার
                  জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।
                 খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত
                 উত্তোলিত, উদ্ভাসিত
                 কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।

তাঁর সেই বিখ্যাত কবিতা ‘ছাড়পত্রে’ সুকান্ত লিখছেনঃ
                 এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
                 জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে
                 চলে যেতে হবে আমাদের।
                 চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
                 প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
                এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি
                নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

হে সাথী, আজকে স্বপ্নের দিন গোনাঃ
                সুকান্ত লিখেছিলেন ওই একই কবিতার শেষেঃ
                 অবশেষে সব কাজ সেরে
                আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
                করে যাব আশীর্বাদ,
                 তারপর হব ইতিহাস।।

            সশরীরে এই কবি আজ আর নেই আমাদের কাছে। এমন কি ৪৭এর ১৫ আগষ্ট যেটুকু স্বাধীনতা আমাদের জুটেছে তার ক’মাস আগেই তাঁকে চলে যেতে হয়েছে। কিন্তু তিনি, তাঁর কবিতা এখনো বর্তমান। ইতিহাসের সামগ্রী হতে তাঁর এখনো অনেক বাকি মনে হয় না কি?
    আমাদের স্বাধীনতার বছরটির সঙ্গে এই কবির জন্ম মৃত্যু দিনটির এক আশ্চর্য সংযোগ রয়েছে। ১৫ আগষ্ট তাঁর জন্ম দিন। বছর ১৯২৬। ১৯৪৭ তাঁর মৃত্যুর বছর। রবীন্দ্র জন্ম জয়ন্তীর মাত্র ক’দিন পর ১৩মে। এই বিশ বছর ন’মাস দিনেই তিনি ছাড়পত্র ( ১৩৫৭), ঘুমনেই ( ১৩৫৭), পূর্বাভাস (১৩৫৭), মিঠেকড়া ( ১৩৫৮), অভিযান (১৩৬০), হরতাল    ( ১৩৬৯), গীতিগুচ্ছ ( ১৩৭২), কবিতালিপি ( ১৯৮৩) ইত্যাদি আটটিরও বেশি গ্রন্থে ছড়ানো ছিটানো গান,কবিতা, গল্প,নাটক, প্রবন্ধের রচয়িতা। পথে পথে মিছিলে মিছিলে শোনা যাচ্ছে তাঁর অঙ্গীকার ,
                  এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি
                  নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

কিম্বা ,
                 বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত,
                বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।

            তের চৌদ্দ বছরের কবির কবিতা পড়ে মুগ্ধ তাঁর চেয়ে বয়সে বড় ‘পদাতিকে’র কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর বন্ধু হয়ে যাচ্ছেন। পরে তিনিই তাঁর বেশির ভাগ গ্রন্থের সম্পাদনা করছেন ও ভূমিকা লিখছেন। ‘পরিচয়’, ‘কবিতা’র মতো সেকালের সেরা কবিতা পত্রিকাতে তাঁর কবিতা বেরুচ্ছে।
            সারা বাংলা কিশোর বাহিনীর তিনি উদ্যোক্তা ও নেতা। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের বীরেরা জেলথেকে ছাড়া পেয়েই  কলকাতার যক্ষা হাসপাতালে আসছেন কবির সঙ্গে দেখা করতে আর তাঁকে অভিনন্দন জানাতে। তাদেরই কেউ তাঁকে জানাচ্ছেন তখনই এই বিশবছরের কবির জীবনী বেরুতে যাচ্ছে আমেরিকা আর ফ্রান্সে! এই সম্মান তাঁর জুটছে কেবল কবি হবার জন্যে নয়। কেবলি কাগজে লিখে  ‘অঙ্গীকার’ জানাবার লোকতো তিনি ছিলেন না। ছিলেন একাধারে বিপ্লবী ও স্বাধীনতার আপোসহীন সংগ্রামী। কমুনিষ্ট পার্টির সারাক্ষণের কর্মী। সেই কাজে নিজের শরীরের উপর  যে অত্যাচারটুকু তিনি করলেন তাতেই না তাঁর শরীরে প্রথম ম্যালেরিয়া ও পরে যক্ষা বাসা বাঁধে এবং অকালেই তাঁর প্রাণটি কেড়ে নেয়।
     তাঁর রচনার সংখ্যা এমনিতে খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু যদি তাঁর বয়সটির কথা মনে রাখি, তবে সেই সংখ্যা অবিশ্বাস্য। তাঁকে আমরা কবি হিসেবেই জানি। কিশোর কবি। কিন্তু যেমন রবীন্দ্রনাথ কেবল কবি ছিলেন না । সুকান্তও ঐ বয়সেই লিখেছিলেন কবিতা ছাড়াও, গান, গল্প, নাটক এবং প্রবন্ধ। তাঁর ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ প্রবন্ধটি পাঠেই বেশ বোঝা যায় ঐ বয়সেই তিনি  বাংলা ছন্দের প্রায়োগিক দিকটিই শুধু আয়ত্বে আনেন নি, সে নিয়ে ভালো তাত্বিক দক্ষতাও অর্জন করেছিলেন। অথচ ১৯৪৫এ প্রবেশিকা পরীক্ষাতে তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন। স্কুলের ছাত্র হিসেবে ভালো মার্ক্স পাওয়া মেধাবী ছাত্র হবার নজির তাঁর নেই তেমন। ভারত ছাড়ো আন্দোলন ঝিমিয়ে গেলে আবার স্কুলে যেতে হচ্ছে বলে তিনি বেশ হতাশই হয়েছিলেন।
নিবারণ ভট্টাচার্য ও সুনীতি দেবী্র এই ক্ষণজন্মা সন্তান সুকান্ত জন্মেছিলেন এক মধ্যবিত্ত পরিবারে।  তাঁর বাবা জ্যাঠাদের পূব বাংলার ফরিদপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে কলকাতা এসে বহু সংঘাত সংঘর্ষের মধ্যি দিয়ে  থিতু হতে হয়েছিল। একান্নবর্তী পরিবারটিকে ধরে রেখেছিলেন তাঁরা।
তাঁদের বাড়িতে সাহিত্যের এক ভাল পরিবেশ ছিল। মনীন্দ্রলাল বসুর ‘রমলা’উপন্যাসের নায়ক সুকান্তের নামেই আদরের ভাইটির নাম রেখেছিলেন জ্যাঠতুতু দিদি রানি। রানিদিদির উৎসাহেই লেখালেখিতে সুকান্তের হাতে খড়ি। মনীন্দ্র বসুর উপন্যাসের সুকান্তকেও অকালেই যক্ষা রোগে চলে যেতে হয়েছিল। কবি সুকান্তেরও সেই একই গতি হবে রানিদি নিশ্চয়ই স্বপ্নেও ভাবেন নি। এই সংযোগ দেখতে পাবার বহু আগেই সেই রানিদির হঠাৎ মৃত্যু হয়েছিল। সুকান্তের বয়স তখন মাত্র সাত বা আট। তার পরেই বাবা জ্যাঠাদের পরিবার আলাদা হয়ে যায়।
    সেই আট ন’ বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন।  স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ একটি ছোট্ট হাসির গল্প লিখে আত্মপ্রকাশ করেন। তার দিনকতক পরে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে প্রথম ছাপার মুখ দেখে তাঁর লেখা বিবেকান্দের জীবনী।  মাত্র এগার বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতি নাট্য রচনা করেন। এটি পরে তাঁর ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয়। বলে রাখা ভালো, পাঠশালাতে পড়বার কালেই ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত। সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন যখন তখন বাল্য বন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন। অরুণাচল তাঁর আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন।
 ১৯৪১ পর্যন্ত এসে কলকাতা রেডিওর গল্পদাদুর আসরের নিয়মিত যোগদাতা ছিলেন সুকান্ত। সেখানে প্রথমে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেই আসরেই নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। গল্পদাদুর আসরের জন্য সেই বয়সেই তাঁর লেখা গান মনোনীত হয়েছিল আর সুর দিয়ে গেয়েছিলেন আর কেউ নন সেকালের অন্যতম সেরা গায়ক পঙ্কজ মল্লিক। স্কুলের লেখাপড়াতে খুব ভালো ছিলেন সে খবর তেমন মেলেনা। কিন্তু তাঁর প্রতিভা যে ছিল প্রশ্নাতীত তা এই সব সম্মান আর স্বীকৃতিতেই প্রমাণ মেলে। 

আমার ঠিকানা খোঁজ করো শুধু   সূর্যোদয়ের পথেঃ
 

              দাদা সুশীল ভট্টাচার্যের বন্ধু বারীন্দ্রনাথ ঘোষের সংস্পর্শে এসে সুকান্ত সাম্যবাদী চেতনাতে উব্দুদ্ধ হন এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তিনিতো আর শুধু স্বাধীনতার স্বপ্নই দেখতেন না। তিনি যে ‘নতুন চিঠি আসন্ন যুগের’ পেয়েছিলেন সে ছিল সাম্যবাদের। তিনি যখন পার্টিতে যোগ দেন তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। বিয়াল্লিশের 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের দামামা বাজছে। আর ওদিকে বাংলার ভয়ঙ্কর পঞ্চাশের মন্বন্তর। নিজের শেষ জীবনের সেরা রচনাটি  ‘সভ্যতার সংকট’ লিখে রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হয়েছেন। সব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের উপর সমস্ত বিশ্বাস হারিয়েও লিখে গেছেন , 'মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।’ লিখে গেছেন ‘জন্মদিনে’ কবিতায় তাঁর উইল পত্র ঃ
                    ‘আমার কবিতা , জানি আমি ,
                    গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী ।
                    কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন ,
                    কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন ,
                    যে আছে মাটির কাছাকাছি ,
                   সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।"
         বলা হয়ে থাকে সুকান্ত সেই কবি। এ একটু বাড়াবাড়ি। কেননা এ কবিতা রবীন্দ্রনাথের বিনয় মাত্র। তিনি নিজেই চিরদিন সেই জনটি ছিলেন , কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন ,/কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন’ ।  মনে পড়ে জীবনের প্রথম ভাগেই সেই চিত্রা কাব্যগ্রন্থের ‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতাতে  রবীন্দ্রনাথ আর একবার কোনো এক কবিকে সম্বোধন করে লিখছেনঃ
                        “কবি , তবে উঠে এসো — যদি থাকে প্রাণ
                       তবে তাই লহো সাথে , তবে তাই করো আজি দান ।
                       বড়ো দুঃখ , বড়ো ব্যথা — সম্মুখেতে কষ্টের সংসার
                      বড়োই দরিদ্র , শূন্য , বড়ো ক্ষুদ্র , বদ্ধ , অন্ধকার ।
                      অন্ন চাই , প্রাণ চাই , আলো চাই , চাই মুক্ত বায়ু ,
                      চাই বল , চাই স্বাস্থ্য , আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু ,
                      সাহসবিস্তৃত বক্ষপট । এ দৈন্যমাঝারে , কবি ,
                     একবার নিয়ে এসো স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি ।”
    সে ছিল রবীন্দ্রনাথের বাকি জীবনের কাজের ইস্তাহার। তার তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ‘শ্রীনিকেতন’। হ্যাঁ, সুকান্তদের মতো তিনি সরাসরি বিদ্রোহের পথে হাঁটেননি বটে। সম্ভবত তাই জীবনের শেষে ওমন আরেক কবির ‘বাণী-লাগি কান পেতে’ ছিলেন। কিন্তু সেরকম কবি তখন আরো অনেক ছিলেন।   একা সুকান্তকে সে দায় দিলে তাঁর গৌরব বাড়ে হয়তো, কিন্তু তাঁর সমকালের পরিবেশটিকে বোঝা যায় না। সুকান্তের বন্ধু , তাঁর বেশিরভাগ গ্রন্থের সম্পাদক ‘পদাতিকে’র লেখক সুভাষ মুখপাধ্যায়ের কথা ভুলা যাবে কী করে? যাঁর ‘পদাতিকে’র প্রথম কবিতার পংক্তিগুলোই ছিল এরকমঃ
                    “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
                    এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,
                   দুর্যোগে পথ হয় হোক দুর্বোধ্য
                   চিনে নেবে যৌবন আত্মা।“

কাস্তের কবি দিনেশ দাশকে ভুলি কী করে, যার সেই কবিতার পংক্তি এক সময় মুখে মুখে ফিরতঃ
                  নতুন চাঁদের বাঁকা ফালিটি
                 তুমি বুঝি খুব ভালবাসতে?
                 চাঁদের শতক আজ নহে তো
                এ-যুগের চাঁদ হ'লো কাস্তে!

         এমন তখন আরো অনেক ছিলেন।  অরুণ মিত্র, সরোজ দত্ত, বীরেন্দ্র চট্টপাধ্যায়, সমর সেন এমন আরো কত! ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা না হয় ভুলে থাকাই গেল, তখন সময়টাই এমন ছিল যে ‘পথের পাঁচালী’র আনন্দ যাত্রার পাঁচালীকার  আপাত উদাসীন লেখক  বিভূতি বন্ধোপাধ্যায়ের কন্ঠেও সেদিন শোনা গেছিল ‘অশনি সংকেত’। পঞ্চাশের আকালের উপর  লেখা উপন্যাস।  তখনকার বহু কবি লেখক  গোটা ভারতেই হয় সরাসরি কমিউনিষ্ট পার্টিতে নাম লিখিয়েছেন, না লেখালেও ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক শিল্পী সঙ্ঘে’ ছিলেন না এমন কবি লেখক শিল্পীদের নাম করা মুস্কিল! বুদ্ধদেব বসুর মতো ‘কবিতা’ নিবেদিত প্রাণও দূরে সরে থাকতে পারেন নি।
Add caption
From Sukanta Kar
তবে কিনা অন্যদের অনেকেই যখন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তখন কিছুটা সংশয়ী –সন্দিগ্ধ ছিলেন,অনেকেই তাঁকে বর্জন করছিলেন, সুকান্ত কিন্তু ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতাতে নির্বিরোধ উচ্চারণ করছেঃ
যদিও রক্তাক্ত দিন, তবু দৃপ্ত তোমার সৃষ্টিকে
এখনো প্রতিষ্ঠা করি আমার মনের দিকে দিকে।
                রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এতোটাই ছিল যে তিনি রীতিমত সাধনা করে নিজের হাতের লেখাকেও রবীন্দ্রনাথের মতো করে তুলেছিলেন। দু’জনের হাতের লেখা পান্ডুলিপি দেখলে চট করে অনেকে ধরতে পারবেননা কোনটা কার লেখা।
Add caption
From Sukanta Kar
              সুভাষ মুখপাধ্যায় লিখেছিলেন, তাঁরা কবিতা ছেড়ে পার্টিতে এসছিলেন , আর সুকান্ত এলেন কবিতা নিয়ে। এর অর্থ সুকান্ত যখন পার্টিতে যোগ দিলেন তখন পার্টি তার রাজনীতির প্রচারে শিল্প সাহিত্যেকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। এক দশক পরেই দেখা গেছে শিল্প সাহিত্যের জন্যে কাজটা খুব সুখকর হয় নি। কিন্তু , সুকান্তের কাছে পার্টির আর পাঁচটা কাজের থেকে কবিতা লেখা আলাদা কিছু ছিল না। দুটোই তিনি সমান নিষ্ঠার সঙ্গে করছিলেন। কবি লেখক হিসেবে সেই বয়সেই অপার সম্মানের অধিকারি হওয়া সত্বেও তাঁর স্বপ্ন ছিল বিপ্লবী কর্মীদের মধ্যে তাঁর কবিতা তথা অন্য লেখালেখি জনপ্রিয় হলেই তাঁর শ্রম স্বার্থক। নিজের লেখা লেখি নিয়ে তাঁর আর কোনো স্বপ্ন বা পরিকল্পনা ছিল বলে মনে হয় না। তাই নিজের লেখাকে তিনি মোটেও সযত্ন লালন করতেন না। টুকরো টাকরা ছেঁড়া কাগজে, সিগেরেটের প্যাকেটে এখানে ওখানে লিখে ফেলে রেখে দিতেন। তেমন কোনো খাতা তাঁর ছিল না। এবাড়িতে অবাড়িতে দেয়ালে দেয়ালে কয়লা পেন্সিলে লিখে বকা খাবার নজিরও তাঁর প্রচুর আছে। সেগুলোরই কিছূ  পরে বন্ধুদের আনুকুল্যে সংগৃহীত হয়ে ‘পূর্বাভাসে’ দেয়ালিকা নামে সংকলিত হয়েছিল। বন্ধুদের কেউ কেউ বিশেষ করে তাঁর আবাল্য বন্ধু অরুণাচল তাঁকে লেখাগুলো যত্ন করে খাতায় তুলে রাখতে বললে বলতেন, যখনই দরকার তখনই লেখার জন্যে তিনি নিজেই যখন রয়েছেন তবে আর যেগুলো সংরক্ষিত রাখবার দরকার কী? এ যেন ছাত্র রাজনীতির নেতার বক্তৃতা। বক্তব্য রাখবার জন্যে বক্তা স্বয়ং যখন রয়েইছেন তবে আর লিখে রাখবার দরকার কী!
               তাই বলে তাঁর লেখাগুলো হারিয়ে যায় নি। তাঁর বন্ধুরা  , অনুগতরা তাঁর সেই লেখালেখিগুলোর অনেকটাই সংগ্রহ করতে পেরেছেন। এবং সেগুলো ছেপে সংরক্ষিত করতে পেরেছেন। ভাগ্যিস, এখানে ওখানে প্রচুর প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর লেখা। পার্টির কাগজ ‘স্বাধীনতা’র কিশোর বিভাগ  তিনি নিজেই সম্পাদনা করতেন। আকালের দিনগুলোতে ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পিসঙ্ঘের পক্ষে আকাল (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। বাংলার কিশোর বাহিনী থেকে তাঁর ও অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্যের সম্পাদনাতে বেরিয়েছিল ‘অপরাজেয়’ , যেখানে তাঁর ‘অভিযান’ কাব্যনাট্যটি প্রকাশ পেয়েছিল। সেসব গ্রন্থও তাঁর লেখা সংগ্রহে সাহায্য করেছিল অনেক। এমনিতে নিজের জীবিতাবস্থাতে তিনি নিজের কোনো কাব্য বা গদ্য গ্রন্থের প্রকাশিত সংকলন দেখে যেতে পারেন নি। তিনি যখন রোগ শয্যাতে তখন ‘ছাড়পত্র’ প্রকাশের উদ্যোগ চলছে। বন্ধু অরুণাচল তাঁকে কিছু ছাপা পৃষ্ঠা দেখিয়েছিলেন মাত্র। একে একে তাঁরাই তাঁর সব লেখা উদ্ধার করে গ্রন্থবদ্ধ করেন। এ পর্যন্ত দু’ই বাংলা থেকেই তাঁর অজস্র রচনা সংকলন বেরিয়েছে।
              তাঁর জনপ্রিয়তা এমনই যে আজো বাংলা কিম্বা বাঙালি প্রধান এলাকার যেকোনো গণআন্দোলনে তাঁর কবিতার থেকে পংক্তি বাছাই করে দেয়াল লিখতে কিম্বা শ্লোগান দিতে শোনা যায়। ইতিহাসের কী পরিহাস তাঁরই ভ্রাতুষ্পুত্র বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যখন পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তখন সেখানে সংঘটিত হচ্ছে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম আর লালগড় ! আর আজকের কবির কন্ঠে উচ্চারিত হচ্ছেঃ
                      হে কবি সুকান্ত!

                     তুমি কি জানতে যে
                     তোমাদেরই বংশে আসবে
                    এই বাংলার ধ্বংসকর্তা?

                    তুমি কি জানতে যে
                   তোমাদেরই বংশে আসবে সে
                   যে "গরীব মানুষকে চাপা দিয়ে
                   বড়লোকের মোটরগাড়ী" বানাবার
                   সব আয়োজন পাকা করবে?

              কিন্তু এও ঠিক যে, স্কুল পাঠ্য বইতে এখনো সংকলয়িতারা তাঁর কবিতাকে বাদ দিতে না পারলেও উঁচু ক্লাসের সাহিত্যের ইতিহাস লেখকেরা বা তাত্বিকেরা তাঁর কবিতার জন্যে বেশি পৃষ্ঠা বরাদ্দ করেন নি। বাংলা কবিতার ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের পর কে ----এই প্রশ্ন এলেই নির্দ্বিধায় তাঁরা আজ জীবনানন্দের নাম নিয়ে থাকেন । আর কারো কারো নাম যোগ দিতে হলে সেখানে বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু , সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তীর নাম চলে আসে, সুকান্তের আসে না। এমন তাত্বিকতা যে পক্ষপাত মুক্ত তা বলা যাবে না। কেন না, সমর  সেন , সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো পরিণত কবির নাম না নেয়াটাও আমাদের কৌতুহলী করে। তাই বলে সুকান্তকে বিনা প্রশ্নে কবি হিসেবে গ্রহণ করাটাও হবে আরেক ধরণের পক্ষপাত। এটি ঘটনা যে সুকান্ত চর্চা আজকাল কমেছে। গণআন্দোলন বিহীন পরিবেশে তাঁর কবিতা তেমন পাঠক টানে না। তাঁর, কিম্বা নজরুলের কিম্বা বীরেন্দ্র চট্টপাধ্যাদের  কবিতার আবেদনের স্থান কালের পরিসর স্বল্প। বিদ্রোহী –বিপ্লবী কবি হিসেবে তাঁরা নিজেদের পরিচয় গড়েছেন। সে তাঁরা ছিলেন আছেন এবং থাকবেন। কিন্তু বিশুদ্ধ সাহিত্যিক বা কবি হিসেবে কোনো প্রতিষ্ঠা তাঁরা আকাঙ্খাও করেন নি, নেইও। নজরুলত লিখেইছেনঃ
             বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
             অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!
             সুকান্তও কি ওই কথাই বলতে চাননি যখন লেখেনঃ
             প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা–
             কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
             ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়ঃ
             পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্‌সানো রুটি।।
    সুকান্তের বেলা বয়স একটা সীমা বেঁধে দিয়েছিল। নজরুলের বেলাও কথাটা সত্যি। কেননা বেশিদিন নজরুলও সুস্থ শরীরে লিখে যেতে পারেন নি। কিন্তু তাঁদের গানগুলো দেখায় কোথাও তাঁরা দিক বদল করওছিলেন। রূপ রঙের বৈচিত্র নিয়ে  শিল্পী হিসেবে তাঁদের স্থান পাকা করবার সম্ভাবনা পুরো মাত্রাতে ছিল। এবং সেদিকে তাঁর ঝুঁকছিলেনও। কিন্তু সময় বিদ্রোহী-বিপ্লবী সত্বার মধ্যে তাঁদেরকে সবদিক দিয়েই  বেঁধে ফেলেছিল। 

যদিও নগণ্য আমি, তুচ্ছ বটবৃক্ষের সমাজেঃ    
 

    ছন্দ-অলঙ্কারের মতো কবিতার ঔপকরণিক বিষয়গুলোতে সুকান্তের দক্ষতা ঈর্ষণীয় ছিল। সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু,  রাজনৈতিক বা আদর্শগত বোধ তখনো পরিপক্ক হবার বয়স ছিল না। রবীন্দ্রনাথকেও সেই পরিপক্কতার জন্যে জীবনের নিদেন পক্ষে তিনটি দশক ব্যয় করতে হয়েছিল।  তাই তাঁর ‘বিয়েবাড়ির মজা’ কবিতাটির  রাজনৈতিক আবেদন আজ আমাদের হাসির উদ্রেক করে। তিনি লেখেনঃ
          বললে পুলিশঃ এই কি কর্তা, ক্ষুদ্র আয়োজন?
          পঞ্চাশ জন কোথায়? এ যে দেখছি হাজার জন!
          এমনি ক’রে চাল নষ্ট দুর্ভিক্ষের কালে?

      আমরা যারা সেই দুর্ভিক্ষের ইতিহাস জানি তারা জানি যে, “এমনি ক’রে চাল নষ্ট দুর্ভিক্ষের কালে?” এই প্রশ্ন করবার অধিকার ব্রিটিশের অধীনস্থ কোনো পুলিশের ছিল না। কবিতার এমন বিচারে যদি কেউ আপত্তি করেন তবে সে দোষ আমাদের নয়। রাজনীতির বার্তা দেয়াকেই যারা কবিতার আসল উদ্দেশ্য মনে করেন তাঁরা নিজেরাই এমন সম্ভাবনার বীজ উৎপাদন করে কবিতাতে বা উপন্যাসে বপন করে রেখে দেন। বিখ্যাত আবৃত্তিকার প্রদীপ ঘোষ এক সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা তাঁকে যখন সুকান্তের কবিতা আবৃত্তি করতে ডাকছেন তখন আগে থেকেই জানিয়ে দিচ্ছেন তিনি যেন ‘প্রিয়তমাসু’ কবিতাটি না পড়েন। কেননা সে কবিতার একজায়গাতে রয়েছেঃ
             যুদ্ধ চাই না আর, যুদ্ধ তো থেমে গেছে;
             পদার্পণ করতে চায় না মন ইন্দোনেশিয়ায়
            আর সামনে নয়,
            এবার পেছনে ফেরার পালা।

এই ‘পেছনে ফেরার’ কথা থেকে আয়োজকদের মনে হয়েছে কবির রাজনৈতিক বিচ্যুতি হয়েছে! তার মানে দাঁড়ালো এই যে রাজনীতির বাতাবরণ পাল্টালেই এমন কবিতার আবেদন পালটে যায়। সযত্ন সংরক্ষণ করতেন না বলে সুকান্তের বহু কবিতা পুনরাবৃত্তির দোষেও দুষ্ট হয়েছে। পড়তে পড়তে মনে হয়, একই কথা বার বার বলছেন, যেমনটি রাজনীতি বা সমাজকর্মের মাঠের কর্মীরা বলে থাকেন। তাঁর বৈষয়িক দরকার থাকলেও শৈল্পিক দরকার একেবারেই নেই। কোথাও কোথাওতো  পংক্তিগুলো হুবহু এক প্রায়। যেমন ‘সিগেরেট’ এবং ‘ দিয়াশলাই কাঠি’ কবিতা দুটো।
সিগেরেট’ কবিতাতে লিখছেনঃ
               তাই, আর নয়;
               আর আমরা বন্দী থাকব না
              কৌটোয় আর প্যাকেটে;
              আঙুলে আর পকেটে
              সোনা-বাঁধানো ‘কেসে’ আমাদের নিঃশ্বাস হবে না রুদ্ধ।
               আমরা বেরিয়ে পড়ব,
               সবাই একজোটে, একত্রে–
              তারপর তোমাদের অসতর্ক মুহূর্তে
              জ্বলন্ত আমরা ছিট্‌কে পড়ব তোমাদের হাত থেকে
             বিছানায় অথবা কাপড়ে;
              নিঃশব্দে হঠাৎ জ্বলে উঠে
              বাড়িসুদ্ধ পুড়িয়ে মারব তোমাদের
             যেমন করে তোমরা আমাদের পুড়িয়ে মেরেছ এতকাল।।

দিয়াশলাই কাঠি’ কবিতাতে আবারো লিখছেন প্রায় ঐ একই কথাঃ
               আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,
               আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব
              শহরে, গঞ্জে , গ্রামে–দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
              আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়–
              তা তো তোমরা জানোই!
              কিন্তু তোমরা তো জানো না:
             কবে আমরা জ্বলে উঠব–
             সবাই শেষবারের মতো!

    তেমনি ‘জাগবার দিন আজ’ কবিতাতে আছেঃ
                 আজকের দিন নয় কাব্যের -
                 আজকের সব কথা পরিণাম আর সম্ভাব্যের;

   তেমনি আছে ‘মৃত পৃথিবী’তেঃ
                আজকের দিন নয় কাব্যের
               পরিণাম আর সম্ভাব্যের...

       এরকম কিছু ত্রুটি আর সীমাবদ্ধতা সত্বেও আমাদের বিশ্বাস সুকান্ত কোনোদিন ফুরিয়ে যাবেন না। সাহিত্যের ইতিহাসের লেখকেরা বা তাত্বিকেরা তাঁর জন্যে বেশি পৃষ্ঠা বরাদ্দ না করলেও যখনই যেখানে  আম ‘জনতার মুখে ফোটে’ উঠবে  ‘বিদ্যুৎবাণী’ সুকান্ত সেখানে উচ্চারিত হবেন সে সত্য আমাদের দেখিয়েছে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম। তিনি লিখেছিলেনঃ
             যদিও নগণ্য আমি, তুচ্ছ বটবৃক্ষের সমাজে
             তবু ক্ষুদ্র এ শরীরে গোপনে মর্মরধ্বনি বাজে,
             বিদীর্ণ করেছি মাটি, দেখেছি আলোর আনাগোনা
              শিকড়ে আমার তাই অরণ্যের বিশাল চেতনা।

          আমরাও মনে করি তাঁর সিগারেট, একটি মোরগের কাহিনী, দেশলাই কাঠি, প্রিয়তমাসু, রবীন্দ্রনাথের প্রতি,আঠার বছর বয়স, রানার , অনুভব, লেনিন ইত্যাদি কিছু কবিতা ক্রমেই বাংলার মুষ্ঠিমেয় কিছু ধ্রুপদী কবিতার সারিতে নাম লেখাবে এবং আরো বহু বহু দিন আবৃত্তি তথা পাঠ করা হবে কবিতাগুলো। স্বাধীনতার এতোটা বছর পরেও যে শিশু আগামী কাল জন্ম নেবে তার জন্যে স্থান ছেড়ে দেবার, প্রাণপণে জঞ্জাল সরাবার কাজ এখনো সম্পন্ন হয়ে ওঠেনি। এখনো এ বিশ্বকে তার জন্যে বাসযোগ্য করে তুলা যায় নি। যে মানুষ তাতে হতাশ হয়ে সুকান্তের অঙ্গীকার ভুলে যায় তার মানবতাবোধ, তাঁর শিল্পবোধ আর সভ্যরুচিকে নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলতে পারি। তাই বলে সুকান্তের মহত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবার মত অশিক্ষা  যেন আমাদের আচ্ছন্ন না করে   । নবজাতকের কাছে এখনো অম্লান থাকুক আর থাকবে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।

Thursday, 15 July 2010

জাতি গঠন প্রক্রিয়া আর ভাষা-জাতীয়তাবাদের আঁতের কথা

‘জাতি’ শব্দটির বিচিত্র সব অর্থের সঙ্গে আমরা ভারতীয়েরা সেই আবহমান কাল থেকে পারিচিত । কিন্তু ব্রিটিশ ভারতে তার আরো তিনটি অর্থের সঙ্গে পরিচিত হলাম। তার একটি ‘ভারতীয় জাতি’, দ্বিতীয়টি ‘হিন্দু জাতি’ আর তৃতীয়টি ‘মুসলমান জাতি’। এই শব্দগুলো জন্মালো স্পষ্টতই ‘ব্রিটিশ জাতি’কে নকল করবার প্রেরণার থেকে। সেই ব্রিটিশ , যারা নিজের দেশে মূলত ইংরেজদের আধিপত্য কায়েম করতে গিয়ে স্কাটিশ,আইরিশদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা ছাড়াও পৃথিবীর যেখানে গেছে সেখানেই চেষ্টা করেছে আদিবাসিদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে। আমিরিকা, অস্ট্রেলিয়া তার দুট বড় নিদর্শন। ১৯০৫এর বাংলাভাগের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পর থেকে ‘জাতি’ শব্দটি ভারতে রাজনৈতিক বাদানুবাদের কেন্দ্রে চলে এলো। দুই বিশ্বযুদ্ধের বাতাবরণও তাতে ইন্ধন যোগালো। হিটলারের ফাসিবাদের পেছনেও ছিল সেই জাতীয়তাবাদের প্রেরণা। তার উল্টো পিঠে আরো অনেকের সঙ্গে প্রবল হল ইহুদি জাতীয়তাবাদ।
বিলেতিদের বিরুদ্ধে লড়তে গেলেও ওদের মতো হবার এবং সম্ভব হলে ওদের টেক্কা দেবার ঔপনিবেশিক ঝোঁকটা আমাদের ছিল বরাবরই। সুতরাং আমরাও এক ‘ভারতীয় জাতি’র স্বপ্ন দেখলাম। কিন্তু তাতে বাঁধ সাধাবার লোক আমাদের ঘরেই ছিল। ‘হিন্দু এবং মুসলমান’ জাতীয়তাবাদ সেরকম দুটো প্রত্যাহ্বান। ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা বলতে চাইল ধর্ম কখনো জাতীয়তাবাদের আধার হতে পারে না। এক্কেবারে মিথ্যে বলছিলেন তাঁরা। অরবিন্দ থেকে গান্ধী সব্বার জাতীয়তাবাদের আধার ছিল এক নম্র হিন্দুত্ব। ১৯৪৭এর বাংলাভাগের পক্ষে দাঁড়িয়ে অরবিন্দ তাঁর খোলস ঝেড়েও ফেলেছিলেন। কিন্তু এহ বাহ্য। গোটা বিশ্বের কোনো জাতিরাষ্ট্রই প্রকৃতার্থে ধর্ম সম্পর্ক শূণ্য হতেই পারে নি। মায়, বারাক অবামাকেও মার্কিন রাষ্ট্রপতির পদে জিতে আসতে তাঁর মুসলমানমূলীয় হবার বাস্তবতাকে আড়াল করবার জন্যে যথাসাধ্য করতে হয়েছিল। ইসলামী মৌলবাদের কথা যারা বলেন, তাঁরা ভুলে যান কী করে যে বিশ শতকের দুই বিধ্বংসী জাতীয়তাবাদ জার্মান ও ইহুদি জাতীয়তাবাদের অন্যতম আধার স্পষ্টতই ধর্ম?
এই চালাকিগুলো ভারতের মার্ক্সবাদিরা শুরু থেকেই ধরে ফেলেছিলেন। তাই তারা যেমন বলছিলেন , ধর্ম জাতীয়তাবাদের আধার হতে পারে না, তেমনি বলছিলেন ভারতীয় বলে কোনো জাতি গড়ে উঠবার দিল্লী এখনো অনেক ‘দূর অস্ত!’ এমন কি , বাঙালি, তেলেগু, তামিল, অসমিয়া এই জাতিগুলোই এখনো গড়ে উঠতে পারে নি ঠিক মতো। এরা গড়ে উঠবার প্রক্রিয়াতে আছে মাত্র! বেশ! আর যায় কোথায়! জাতি গঠনের মাদকতার থেকে এরাও মুক্ত হতে পারলেন না! এরা ‘জাতি’র এক নতুন সংজ্ঞা জোগাড় করলেন! যোগালেন যোসেফ স্তালিন। স্তালিন জানালেন, “জাতি হচ্ছে একই ভাষা, একই বাসভূমি, একই অর্থনৈতিক জীবন এবং একই মনস্তাত্বিক কাঠামো—সাধারণভাবে এই চারটা বৈশিষ্ট সম্পন্নতার উপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে উঠা এক সুস্থির জনসমষ্টি।” ভারতীয় মন বলে কথা । বিলেতিদের মতো হও, পারলে ওদের টেক্কা দাও। সেই রোগ থেকে বামেরাও মুক্ত হলেন কৈ! বিনা প্রশ্নে , সেই থেকে ভারতীয় বামপন্থার এটিই মূল মন্ত্র! অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদের পরিভাষাগুলো একটু খুঁটিয়ে দেখলে সবাই দেখবেন এগুলো বামপন্থীদের থেকে ধার করা। তার মধ্যে জনপ্রিয়তমটি হচ্ছে ‘অসমিয়া জাতি গঠন প্রক্রিয়া’। প্রতিষ্ঠিত সমস্ত অসমিয়া বুদ্ধিজীবিদেরকে সেই প্রক্রিয়ার ভেতরেই পাওয়া যাবে। কারো সাধ্য নেই সেই প্রক্রিয়ার বাইরে দাঁড়িয়ে কোনো কথা বলেন! ইসমাইল হোসেন, যিনি নতুন সাহিত্য পরিষদের সদস্য এবং সুযোগ পেলেই বরাক উপত্যকার বাঙালিদের গালি গালাজ করে থাকেন, সেই বামপন্থার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। তেমন আরো অনেক আছেন। আপনি নাম করুন, তাঁকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই পেয়ে যাবেন! হীরেন গোঁহাই সম্প্রতি এক জাতীয় অভিবর্তনের আয়োজন করলেন, সেই জাতীয়তার বাইরে রাখলেন বাঙালি –বিহারি শ্রমিকদেরও! তিনি কিন্তু শ্রমিক দরদি বামপন্থী!
পশ্চিম বাংলার সরকারি বামদেরে আপনি সবসময়েই বাঙালি জাতীয়তার পক্ষে পাবেন। ওদের রাজ্যেও যে ভাষিক সংখ্যালঘুদের দশা অসমের থেকে একচুলও ভালো নয় তা নিয়ে কোনো বামপন্থীদের কখনো উচ্চবাচ্য করতে দেখবেন না! এই প্রশ্ন কাউকে ওঠাতে দেখবেন না যে যোসেফ স্তালিনের সেই আদর্শ জাতিটি ছিল কোন দেশে? কোত্থাও না!
স্তালিন এবং তাঁর উত্তরসূরিরা বরং সেরকম এক আদর্শ রাষ্ট্র পরে গড়ে তুলতে চাইছিলেন। তাই করতে গিয়ে ওরা ‘জাতিগুলোর মুক্ত সম্মেলন’ সোভিয়েতের অন্য রাষ্ট্রগুলোর উপর রুশি আধিপত্য কায়েম করতে গেছিলেন। নব্বুইর দশকগুলোতে সোভিয়েত ভেঙ্গে যাবার অন্যতম কারকগুলোর একটি এও ছিল। ভেঙে যাওয়া রাষ্ট্রগুলোও যে আদর্শ জাতি রাষ্ট্র নয় তার অতি সাম্প্রতিক নজির জাতি দাঙ্গা জর্জরিত কিরঘিজস্তান। আর আমাদের পাশের চিন দেশটি যে কেমন বর্বর জাতিরাষ্ট্র সেতো আমরা তিব্বতী, উইঘুরদের আন্দোলনের দিকে তাকালেই টের পাচ্ছি !
২১ জুলাই ভাষা শহিদদিবসকে সামনে রেখে কথাগুলো বলছি কেবল এরজন্যে যে, বরাক উপত্যকাতেও প্রতিষ্ঠিত ধারার দলীয় কিম্বা দল বহির্ভূত বামপন্থী বুদ্ধিজীবিরা অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদের নিদান দিতে গিয়ে বাংলা ভাষা ভিত্তিক এক জাতীয়তাবাদের কথা বলে থাকেন। এবং বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে সে জাতীয়তাবাদ ক্রমশই প্রবল হচ্ছে। সম্প্রতি এক বুদ্ধিজীবিতো আরেকটু এগিয়ে গিয়ে লিখেছেন, “...রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক অধিকারের জায়গা থেকে অনেক বেশি জরুরি গুয়াহাটি, নগাঁও, লামডিং কিংবা ডিব্রুগড় , বিজনি ধুবড়ি, গোসাইগাঁও, বঙাইগাওয়ে উনিশে উদযাপিত হওয়া।” এ পর্যন্ত প্রস্তাবটি সাধু। সেটা আজকাল কিছু কিছু হয়েও থাকে। তাতে আপত্তির কিছু নেই। তারপরেই লিখেছেন, “তখনই বুঝব সংগঠিত হচ্ছে বাঙালি। এই প্রচেষ্টাই শুরু হওয়া প্রয়োজন। বদরুদ্দিন আজমল এবং চিত্ত পালদের ফতোয়াবাজিকে প্রতিহত করতে গেলেও ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধে অখণ্ড অভিবাজ্য বাঙালি জাতিসত্বা নির্মাণের প্রক্রিয়া এখনই শুরু হওয়া দরকার। উনিশে মের পঞ্চাশ বছরে এটাই হোক থিম।” ( উনিশ নিয়ে অন্য কথা; জয়দীপ বিশ্বাস; দৈনিক যুগশঙ্খ, ১৯ মে, ২০১০) । এই হচ্ছে বামপন্থা! একটি প্রাকৃতিক ঘটমান সামাজিক প্রক্রিয়া নিয়েও সে ‘শুরু হওয়া দরকার’ ভাবতে পারে! উপরের উদ্ধৃতিটিতে নিম্নরেখ আমাদের। এমন অসমিয়া বাক্যও এঁদের অসমীয়া সতীর্থরাও আকছার লিখে থাকেন! বদরুদ্দিন আজমল এবং চিত্ত পালেরা কোনো ধর্মীয় ফতোয়াবাজি করেন নি। বরং সেই অসমিয়া জাতিসত্তা নির্মাণের ধ্বজা তুলে ধরেছেন, যা বামপন্থীরাও সগৌরবে বয়ে বেড়ান। এখানে অসমিয়া মূলধারার বামপন্থীদের কোনো বিরোধ নেই! ‘নতুন পৃথিবী’র মতো কাগজ পড়লেই যে কেউ আমাদের পক্ষের সমর্থন পেয়ে যাবেন! এই ‘নির্মাণ প্রক্রিয়া’র মোদ্দা কথা হচ্ছে, ভাষার নামে সব্বাইকে এক করো, আর সমস্ত পরিচিতির বৈচিত্রকে বিলোপ করো! সেই ভারতীয় বৈচিত্রকে ওরা বিলোপ করতে চান যার গৌরব রবীন্দ্রনাথই প্রথম তুলে ধরেছিলেন ইঊরোপীয় জাতিরাষ্ট্রের ধারণাকে নস্যাৎ করে!
এবারে, যারা ধর্ম ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ভয়াবহতাকে জানেন তারা এই ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের মধ্যে মুক্তিপথের দিশা পেয়ে থাকবেন। চট করে ধরতে পারেন না এতে গলদ কোথায়! বরঞ্চ বর্তমান লেখকের বিরুদ্ধে বেশ চটেও যাবেন! গলদ এই যে, ভয়াবহতাতে এই জাতীয়তাবাদ যে কম কিছু নয় তা ঐ লেখকের পুরো রচনা, যেটি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বহু পাঠকও পড়েছেন, তার প্রথমাংশ জুড়েই রয়েছে। এওতো এমনই হলো--- ইসলামী জাতীয়তাবাদ থেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভালো, অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদ থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভালো! এই জাতীয়তাবাদিদের এক অন্ধ বিশ্বাস আছে যে হিন্দু বাঙালিরা এক্ষেত্রে বেশ উদার হয়! বাকিরাই যত নষ্টের মূল!
বাঙালি হলেও ব্রহ্মপুত্রের বাঙালির যে এক স্বাতন্ত্র্যের জায়গা রয়েছে তার উল্লেখ করতে লেখক ভুল করেন নি। কিন্তু তাকে মেনে নিতে অস্বীকার করবার প্রবণতা এই জাতীয়তাবাদের মধ্যেও প্রবল। জাতীয়তাবাদ মাত্রেই যেরকমটি ঐক্যনীতির উপর ভিত্তি করে দাঁড়াবার চেষ্টা করে তাকে রবীন্দ্রনাথই কেবল খুব ভালো চিনতে পেরেছিলেন, সেই ঐক্যনীতিকে তিনি বলেছিলেন ‘অজগর সাপের ঐক্যনীতি।’ যে ‘অভিবাজ্য বাঙালি জাতিসত্তা নির্মাণের প্রক্রিয়া’র কথা বলা হচ্ছে তাতে পশ্চিম বাংলা, ত্রিপুরা বা বাংলাদেশের বাঙালিরা জড়াবে কিনা, জড়ালে কতটা আর কী ভাবে, আমরা নিশ্চিত, সেসব প্রশ্নের উত্তর লেখক দিতে যাবেন না। কারণ কোনো জাতীয়তাবাদের তত বিস্তৃত কোনো লক্ষ্য বা কর্মসূচী থাকেই না! ঐক্যের স্লোগানের আড়ালে জাতীয়তাবাদ যে কেমন জাতিকে ভেঙ্গে ফেলে তার ভূরিভূরি প্রমাণ অসমিয়াদের থেকে দেয়াতো যাবেই, কিন্তু শুরুর নজিরটি দেয়া যাবে সেই বঙ্গভঙ্গের রাজনীতি থেকেই!
‘ভাষার নামে জাতি গড়ে আর ধর্মের নামে জাতি ভাঙ্গে’—এই কুসংস্কার আমাদের যত তাড়াতাড়ি বিদেয় হয় ততই মঙ্গল! ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার হিন্দু বাঙালিরা দেখছি হিন্দু পরিচয়েই গৌরব বোধ করে। ‘হিন্দু বাঙালি’ নামে একাধিক সংগঠনও আছে! ‘হিন্দু’ শব্দটির মধ্যি দিয়ে সে আসলে সর্বভারতীয় হিন্দু সত্তার সঙ্গে একত্ব অনুভব করে! ‘খিলঞ্জিয়া’ না হবার বেদনার থেকে অনুভব করে এক কাল্পনিক মুক্তি! বরাকউপত্যকার রাজনীতিতেও যখন কোনো বাঙালি বা মনিপুরি ‘হিন্দু’ নামের আড়ালে সংগঠিত হয় সে তখন আরো বড় ঐক্যের অংশ বলে নিজেকে ভেবে নিয়ে নিরাপদ বোধ করে। ‘হিন্দু’ কিম্বা ‘মুসলমান’ –শব্দদুটো সবসময় কোনো এক ধর্মবিশ্বাসকে বোঝায় না, ঐতিহাসিক ভাবে গড়ে ওঠা এক সম্প্রদায় পরিচয়কেও তুলে ধরে। এই সম্প্রদায় পরিচয় যখন প্রশ্ন চিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে থাকে তখন সে ঐ অতি ক্ষুদ্র ‘বরাকের বাঙালি সত্তাকেই তার একমাত্র পরিচয় বলে তুলে ধরে নিজের পায়ে কুড়ুল মারতে যাবে কেন ? মুসলমান পরিচয়তো কাউকে বিশ্ব জুড়া আরো বড় সত্তার অংশ করে! তাতে আমাদের সমস্যা হবার কথা নয়! আমাদের সমস্যা হয় তখন যখন কেউ নিজের পরিচয়কে প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে অন্যের পরিচয়কে অবমাননার আশ্রয় নেয়! সেই সমস্যা শুধু ধর্মের ধ্বজাধারিরাই তৈরি করে না। ভাষার ধ্বজাধারীরাও করে। তাই লেখক সঠিকভাবেই লিখেছেন, “ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে একজন বাঙালিকে “প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য লক্ষণরেখা মেনে চলতে হয়।” কিন্তু এই তিনিও যে ব্রহ্মপুত্রের বাঙালিদের কথা বলতে গিয়ে অহিন্দুদের কথা ভুলে গেছেন তার নজির এই বাক্যটি , “বর্তমানে বাঙালি হবার অপরাধে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় শারীরিক বা মানসিক হেনস্তার শিকার হতে হয় না...।” হিন্দুরাও প্রচুর পরিমাণে বিদেশি নোটিশ পাচ্ছেন, ভোটার তালিকাতে ডাউটফুল হয়ে আছেন সে না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু তিনি সেই সব বাংলা ভাষী মুসলমানেদের কথা ভুলে গেলেন কী করে যাদের প্রতিবার ভোট এলেই বাংলাদেশি সন্দেহে উজান থেকে ভাটি ব্রহ্মপুত্রের দিকে গরুখেদা খেদানো হয়! ভাষা জাতীয়তাবাদের এই হচ্ছে আঁতের কথা, আসল মুখ ।
‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এই বাস্তবতার থেকে চোখ মুদে থাকে মাত্র! সে নিজেকে হিন্দু সত্তার থেকে স্বতন্ত্র করে বটে , কিন্তু মুসলমান বা অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সংকটের সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করে না! ভাষা জাতীয়তাবাদ নিজে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ হানে না, কিন্তু সে রকম কোনো আক্রমণের অস্তিত্বকেও অনেক সময় অস্বীকার করে কার্যত সে পরোক্ষে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পক্ষে দাঁড়ায়। অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদ তাই ‘নেলি’র আগুনে কলঙ্কিত হয়েছিল । আর গুজরাটের কলঙ্ক গায়ে না লাগালেও সাচার কমিটির প্রতিবেদন দেখিয়েছে ‘বাম প্রগতিশীলদের’ রাজ্য পশ্চিমবাংলাতে মুসলমানদের হালত কেমন! সেই অপরাধের কলঙ্ক ঘুচাতে বাম সরকার যখন সে রাজ্যে মুসলমানদের জন্যে সংরক্ষণের কথা বলছেন, তখন তাদের সরকারে থাকা দলিত মন্ত্রীরাই বলছেন সে রাজ্যের দলিতরাও খুব ভালো নেই! আর আদিবাসিরা কেমন আছেন জানতে মহাশ্বেতা-কবীর সুমনদের কণ্ঠে কান পাতাই যথেষ্ঠ! ‘ভাষা জাতীয়তাবাদ’ বাঙালির ভেতরে বাইরের এই সব ছোট ছোট অন্যান্য জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় পরিচিতির অস্তিত্ব এবং সম্মানকে নির্বিকার অস্বীকার করে! তাই সে কোথাও গিয়ে পৌঁছুতে পারে না! অসমিয়া জাতীয়তাবাদ আজ প্রায় কোনঠাসা! বাঙালি জাতীয়তাবাদের বরাক উপত্যকাতে আজ অব্দি কোনো অর্জন নেই! আর বাংলাদেশ ! সে আজ অব্দি নিজেকে পাকিস্তানের চরেদের থেকে মুক্ত করতে পারে নি!আমেরিকার থেকেতো দূর অস্ত! অমুসলমানেরা, অবাঙালিরা মোটেই নিরাপদে নেই সে দেশেও! আমরা কি কোনো নতুন পথে পা বাড়াতে রাজি আছি? মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে আমাদের প্রতিষ্ঠাকে বিপন্ন করবার ঝুঁকি নিতে রাজি আছি তো? এই না হয় হোক, ২১শের জিজ্ঞাসা!
ঐ লেখাতে জয়দীপ অর্ধ সত্য লিখেছেন, “ ১৯৮৬র ২১শে জুলাই যখন দিব্যেন্দু-জগন্ময় করিমগঞ্জে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিলেন, তখন ...সেবা সার্কুলারের বিরোধিতায় বরাক উপত্যকা উত্তাল। কিন্তু কী আশ্চর্য সেই সময়েও লামডিং বা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অন্যত্র কোনোও উত্তাপই সঞ্চারিত হয় নি।” আমার মনে আছে বরাক উপত্যকা সংগ্রাম সমন্বয় সমিতির সেন্ট্রেল রোডের কার্যালয়ে এক সন্ধ্যে বেলা ‘সারা অসম বাঙালি যুব ছাত্র ফেডারেশনে’র নেতৃত্ব গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তারা এসছিলেন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার থেকে আন্দোলনের গতিবিধি বুঝতে। এরা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতেও সেদিন এমন বেশ কিছু উদ্যোগের সঙ্গী ছিলেন। বাঙালিদের তারা সেদিন তেমন সংগঠিত করতে না পারলেও সেই আন্দোলন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতেও সেদিন প্রবল ঢেউ তুলেছিল। ১৯শের পঁচিশ বছর উদযাপনের দিনে সংগ্রাম সমন্বয় সমিতি গান্ধী বাগে যে সমাবেশের ডাক দিয়েছিল তাতে প্রধান অতিথি ছিলেন আটসুর তখনকার সভাপতি ড০রণোজ পেগু। এই আটসু ও রনোজ পেগুর নেতৃত্বে সেদিন অসমের সমস্ত জনজাতীয় সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল । পাশের জেলা উত্তর কাছাড়েও সেরকম দু’দুটো সারা অসম ভিত্তিক সম্মেলন হয়েছিল । যেখানে সমন্বয় সমিতি ছাড়াও ‘আকসা’র নেতৃবৃন্দও যোগ দিয়েছিল! সেই ঐ জনজাতীয় সংগঠন গুলো ২১শের গুলি চালনার পরে পরেই হুমকি দেয় ১৫ আগষ্টের মধ্য সেবা সার্কুলার প্রত্যাহার করতে হবে! সেই হুমকিতে সরকার পিছু হটে। সার্কুলারটি সরকার ১৫তারিখেই স্তগিত করে। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেনি, এর পরে পরেই বডোল্যাণ্ড আর কার্বি স্বায়ত্ব শাসিত রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন অন্য মোড় নিয়ে নেয়। আটসুর নেতৃত্বে গড়ে উঠে আর্মকা, আর আর্মকা আলফার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক গণযুদ্ধ শুরু করে! ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন হন সৌরভ বরা! বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদকে দাঁড় করাতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙ্গালি আর দুই উপত্যকার অবাঙালিদের এই গৌরবময় সত্যকে আড়াল না করলেই কি নয় ! নয়! কারণ এরই নাম “জাতি গঠন প্রক্রিয়া!” এই প্রক্রিয়া অন্যের অস্তিত্ব, অবদান সমস্ত কিছুকে অস্বীকার করে, অবনমন করে, বিলোপ করে।
সেরকম সমস্ত প্রক্রিয়ার বাইরে বেরিয়ে সমস্ত অপমানিত জনগোষ্ঠি আর পরিচিতির পক্ষে দাঁড়ানোই হোক ২১শের প্রতিজ্ঞা!

Monday, 5 July 2010

লং ড্রাইভে রবীন্দ্রনাথ

                                                               মূল অসমিয়াঃ বিকাশ জ্যোতি শইকিয়া।
লং ড্রাইভে বেরিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁকে সেলাম ঠুকছে পথের পাশের গাছগুলো।
ফুলগুলো, সম্ভাষণ জানাচ্ছে বুড়ো পাহাড়ের পাথরগুলো।


রবীন্দ্রনাথের ঠোঁটে সিগেরেট, গেল রাতের  নেশার খানিকটা দু’চোখের আবেশে
পথ চলতি লোকেরা দেখে রবীন্দ্রনাথের এলটো কার, বেপরোয়া চাল চলন
ঐ যে , কানে মোবাইল নিয়ে ড্রাইভিং সিটে রবীন্দ্রনাথ, কারের স্টিরিওতে দুমদাম মিউজিক
নচিকেতার গান, ট্রাফিক জ্যামে মন্থর রবীন্দ্রনাথের গাড়ি


মালিগাঁওয়ের একটি ধাবাতে থেমে যায় রবীন্দ্রনাথের কার, ধাবার ভেতরে একটা ইন্টারভ্যুর আশাতে নীলিম কুমার
কাউণ্টারে দুই প্লেট পর্ক, আর একটা ব্লেন্ডারস প্রাইড ফুল অর্ডার দিয়ে সিট টেনে বসে পড়েন রবীন্দ্রনাথ,
বিস্মিত নীলিম কুমার, দু’পেগ টেনে বলেন, দাদা , একটা কবিতা শোনান
ধুর কবিতা!! বিরক্তিতে মুখ কোঁচকান রবীন্দ্রনাথ। বিরবিরিয়ে বলেন, দুনিয়াতে যত্তসব টাকার ধান্দা !
তার চে’ বলো এই রাজ্যে  কি কিছু ম্যানেজ করা যাবে, এন আর এইচ এমের বাজার শুনেছি বেশ ভালো
বাঁধের ঠিকাতেও বুঝি অঢেল টাকা, পি ডাব্লিউ ডি-র খবর কী, পেপারের বিজনেসও মন্দ নয় !
আশ্চর্যচকিত হয়ে যান নীলিম কুমার, এ কী বলছেন রবীন্দ্রনাথ! কী বলছেন এ সব ?
From Uddiponar Kobita

এই কি সেই রবীন্দ্রনাথ যিনি কবিতা লিখেছিলেন, গীতাঞ্জলি, দ্য সং অফারিংস
‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ!’ অ্যাঁ ! কী পরিবর্তন, বেশ  ! বেশ!
মুড অফ হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের। কী কবিতা , কোথায় কবিতা, কিসের কবিতা!
 এ পাগল বলে  কী! ছাড়ো তো তোমার প্রলাপ, কবিতাতে কি কিছু পাল্টায় ?
কল্পনারসিকের বাজে কালচার!  কার জন্যে কবিতা ? নিরন্ন মানুষের পেট ভরে না কবিতাতে
সোনাগাছির বেশ্যারা কাবিতা লেখে ভদ্রমানুষের, বানে ধোয়া ধেমাজি কবিতা লেখে রাজনীতির মানুষের
সংঘর্ষে নিহতের আত্মীয়রা লেখে শোকের স্বরলিপি, কবিতার বিষাদ


বিব্রত, বিমূঢ় নীলিম কুমারকে ছেড়ে চলে আসেন রবীন্দ্রনাথ।  আবার, আবারো ড্রাইভিঙে রবীন্দ্রনাথ
এইবার রবীন্দ্রনাথের ঠোঁটে শিস, এইবারে রবীন্দ্রনাথের ড্রাইভিঙে বসন্ত, ব্রেক মারেন, স্পীড বাড়ান
ধীরে ধীরে খুলে যায় রবীন্দ্রনাথের মুখোস, ভিজে আসে রবীন্দ্রনাথের দুটো চোখ, পথের পাশে দাঁড় করান গাড়ি
স্টিয়ারিঙে মুখ রেখে হুঁ হুঁ করে কাঁদেন রবীন্দ্রনাথ, হুঁ হুঁ করে কাঁদেন, হুঁ হুঁ করে কাঁদেন
কেন কাঁদেন রবীন্দ্রনাথ? কেন কাঁদেন, কেন কাঁদেন
এতোদিন কি তবে রবীন্দ্রনাথ একা ছিলেন, নির্বাসিত ছিলেন, ছিলেন বিপন্ন আর ক্লান্ত !
মরে যাওয়া রবীন্দ্রনাথ কোত্থেকে এসেছিলেন, কোথায় কাটিয়েছিলেন দিনগুলো, কী খেয়েছিলেন, কোথায় শুয়েছিলেন
এতোদিন কি বিশ্বকবি কবিতা লিখছিলেন, কফিহাউসের আড্ডাতে কি ছিলেন তিনি
নাটক দেখেছিলেন, পড়েছিলেন খবরের কাগজ, ধর্ষণ বলাৎকারের ছবিরা কি তাঁর সকালবেলাগুলো গিলছিল?


গেল রাতে স্বপ্নে রবীন্দ্রনাথ, লং ড্রাইভে রবীন্দ্রনাথ, পথের পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কাঁদছিলেন
পথ চলতি লোকেরা  দেখছিল সেই দৃশ্য, সিনেমার মতো পার হয়ে যাচ্ছিল সেই দৃশ্য আর মিলিয়ে যাচ্ছিল


রবীন্দ্রনাথ লং ড্রাইভে আসছিলেন  আর পথের পাশের গাছগুলো, ফুলগুলো তাঁকে  সেলাম ঠুকছিল
সারা রাত ধরে   লং ড্রাইভে আসছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আর ভোর বেলা চলেও গেছিলেন


আবার কি  কখনো  আসবেন, লং ড্রাইভে রবীন্দ্রনাথ ?




From Uddiponar Kobita

Thursday, 17 June 2010

It's the Human Being who created the Idea call "God'

One thing is positive about the 'Creator God'. At least those who have deep believe on that 'human-created idea' they can't be ego-centric beyond a limit.  Man neither created nor can create this universe. But, yea they have created the idea call 'God'.
Giving all the credit to that man-made idea call 'God' stops all the process of searching the truth about nature. All the credit should go to the nature itself and its laws. Those who can't imagine that nature itself has that capacity; they also can't imagine how powerful it is. So, we'll see that those believer fools often in the name of God declare that this earth will be destroyed on this or that day. As if, the very existence of this universe depends on these Fool's predictions.
Personally, I don't believe on that section of present day environment scientist as well, who believe that environment pollution or Global warming will destroy the human civilization.    Even God can do all the evil to human being if he don't get due PUZA, nature will not.
If we believe that human being is the nature's best creation then we also should believe that nature has all ready created some of its finest saver among human being. They are not Sadhus like Ravisankar or Saibaba or Pope Benedict but, the scientist or people with scientific temperament, who can explain to us if any information can pass through the black hole. No God Man in this world can move around this world in 90 minutes. Who can they are the greatest man or women of this human civilization. If we have to offer any kind of thanks & Gratitude to anyone, that should be done to those greatest son and daughters of this mother (Or you can say father) universe.

Monday, 24 May 2010

বিহুঃ অসমিয়া সমাজের আয়ুরেখা নির্মাণের এক সংক্ষিপ্ত ইতিকথা।


From Bihu: Sushanta


 ( উত্তরবাংলার ছোট কাগজ 'মুখোমুখি'র জন্যে লিখলাম । লেখাটা গুরুচণ্ডালীতেও বেরুলো।)                             
                অতি চেনেহৰ মুগাৰে মহুৰা অতি চেনেহৰ মাকো।
                 তাতকৈ চেনেহৰ বহাগৰ বিহুটি নাপাতি কেনেকৈ থাকো ।।
           মাঠের ফসল ফলানোর বীজ ছড়ানো থেকে ফসল ফলে উঠার প্রক্রিয়ার সঙ্গে গোটা পৃথিবীতেই মানুষের জন্ম তথা যৌন  জীবনের সাদৃশ্য কল্পনা করাটা এক স্বাভাবিক  প্রাকৃতিক প্রবণতা। তার ফলে  সভ্যতার উন্মেষ লগ্ন থেকেই গোটা পৃথিবীর প্রায় সমস্ত আদিম মানুষেরাই কিছু আচার সংস্কার আর উৎসবের সূচনা করেছিল। সে আমরা জানি। সূচনা লগ্নের সেই উৎসবের রেশ এখনো আমাদের উন্নত সংস্কৃতিতেও থেকে গেছে। বাংলা অসমের তান্ত্রিক আচার বা অসমের কামাখ্যা ধামের অম্বুবাচি তেমনি একটি। সারা ভারতের রঙের উৎসব হোলিও তাই । পরে যদিও এদের সঙ্গে সতীর দেহত্যাগের কাহিনি, রামায়ণের কাহিনি , ভক্ত প্রহ্লাদের কাহিনি ইত্যাদি জুড়ে দিয়ে এক ব্রাহ্মণ্য আভিজাত্য দেবার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কৃষিই যাদের জীবিকা সেই গ্রাম ভারতে সংস্কার গুলো নানা চেহারাতে তার আদিম প্রকৃতিতে এখনো রয়ে গেছে। এখনো দীর্ঘ খরার থেকে মুক্তি পেতে লোকে বেঙের বিয়ে দেয়। কুমারি মেয়েকে নগ্ন করে মাঠে শুইয়ে রাখে বা ঘুরিয়ে নিয়ে আসে।বস্তুত জন্মান্তরবাদ থেকে শুরু করে প্রায় কোনো হিন্দু আচার ও বিশ্বাসই নিজেকে আদিম প্রকৃতি পূজোর পরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি, কিম্বা করেনি।   
            অসমের ‘বিহু’ তেমনি এক সূচনার রূপান্তরিত শিল্পীত  রূপ। অসম বললেই আজকাল প্রথমেই মনে পড়ে ‘বিহু’র কথা। চোখের সামনে ভেসে উঠে ‘ঢোল-পেঁপা-গগনা’ বাজাচ্ছে একদল ছেলে আর তাদের সঙ্গে কোমর দুলিয়ে নেচে চলেছে কয়েক জোড়া তরুণ তরুণী। পরনে তাদের ধুতি পাঞ্জাবি, মাথায় লাল সুতোতে ফুলের কাজ করা  গামোছা ( ওরা বলেন ‘ফুলাম গামোছা’) বাঁধা, মেয়েদের পরণে মেখেলা চাদর আর গায়ে সোনা রূপার অসমিয়া ছাঁদের গহনা। তাই দেখে মনে হয়ে বটে এ যেন এক প্রেমের উৎসব। আর মনে হবেই না কেন, গান গুলোও তো তেমনি ঃ কোমোৰা বগালে চালত,/জীৱনে মৰণে নেৰিবা লাহৰী/নেৰিবা বিপদৰ কালত।/চাইনো চাই থাকিলে হাবিয়াস নপলায়/নেখালে নুগুচে ভো্‌ক,/কিনো খায়ে যাবি বালিহাটৰ বেঙেনা/দলিয়াই দি যাম তোক।”(বুলজিত)১ কিন্তু উপমা-রূপকগুলো লক্ষ্য করুন—উঠে এসছে একেবারেই কৃষি জীবন থেকে। এবারে, কৃষি জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটা উৎসব কেবল এক নির্দিষ্ট ভাষিক গোষ্ঠীর উৎসব হতে পারে না।
               ‘বিহু’ সম্পর্কে পূর্বোত্তরের আন্তর্জালিক অভিধান ‘শব্দে’ লেখা হয়েছে , “বিহু অসমীয়াৰ জাতীয় তথা স্বকীয় উৎসৱ ৷ ‘বিহু’ শব্দটো সংস্কৃত ‘বিষুবত’ শব্দৰ পৰা অহা বুলি ধাৰণা কৰা হয় ৷ বৈদিক ‘বিষুবন’ শব্দই এবছৰ ব্যাপী হোৱা ‘সত্ৰ’ বা ‘যজ্ঞ’ৰ মাজৰ দিনটোক বুজায় ৷ অৰ্থাৎ দিন আৰু ৰাতি সমান হোৱা দিনটোক বুজায় ৷ এই দিনটোক মকৰ সংক্ৰান্তি বুলি কোৱা হয় ৷ কিছুমান পণ্ডিতে অসমীয়া ‘বিহু’ শব্দটি সংস্কৃত ভাষাৰ ‘বিষুবন’ শব্দৰ লগত মিল থকা বুলি ধাৰণা কৰিছে ৷ বিহু প্ৰধানত অসমীয়াৰ কৃষিৰ লগত জৰিত এটা উৎসৱ।” (www.xobdo.org)  বেশির ভাগ অসমিয়া অভিধানের এবং পন্ডিতদের সেরকমই মত। হতে পারে সংস্কৃত ‘বিষুবত বা বিষুবন’ থেকে শব্দটি এসছে। বাংলাতেও ‘বিষুব সংক্রান্তি’ কথাটা রয়েছে। আর সে শব্দও কৃষি সভ্যতার সঙ্গেই সংযুক্ত। ভোরে স্নান করে সূর্যদেবতাকে প্রণাম করা হচ্ছে সারা ভারতের সমস্ত সংক্রান্তিতে করণীয় প্রথম কাজ। এই জল আর সূর্য কৃষিকাজের জন্যেই দরকার। কিন্তু অসমে বিহু শব্দটির অন্য উৎসও রয়েছে। আর সেই উৎসগুলো দেখায় ‘বিহু; কেবল অসমিয়াদের উৎসব নয়। পূর্বোত্তরের প্রায় সমস্ত জনজাতির উৎসব। মায় সিলেটি কাছাড়ি বাঙালিদের পৌষ সংক্রান্তির সঙ্গে ‘ভোগালি’ বা মাঘ বিহুর পার্থক্য অতি সামান্য। সুপরিচিত অসমিয়া ভাষাতাত্বিক ড০ উপেন রাভা হাকাচাম দেখিয়েছেন বিহুর সঙ্গে সম্পৃক্ত ‘গগণা’, পেঁপা, হুঁচরি, মেজি, হারলি ইত্যাদি শব্দগুলোর উৎস, তিব্বত বর্মী শাখার ভাষা বডো গারো, ডিমাসা, মিশিং, তাই আহোম ইত্যাদি। ‘বিহু’শব্দের সংস্কৃত উৎসের কথা তিনি জানেন। তারপরেও তিব্বত বর্মী ভাষাগুলোর থেকে আসা আপাত ভিন্নার্থক শব্দের উল্লেখ করেছেন। যেমন তাই আহোম পয়হু/পিহু/বিহু। এবারে, ‘পয়’ শব্দের অর্থ কিন্তু ‘বিষুব’ জাতীয় কিছু নয়। ঠাট্টা তামাস। রং ধেমালি। তেমনি তাই-আহোম ‘বৈহু’র ‘বৈ’ অর্থ পুজো ‘হু’ অর্থ গরু। বডো মূলীয় ‘বিহু’ শব্দের ‘বি’ মানে হাটা, হু মানে দেওয়া ( বি-খোজ, হু-দি)।  দেউরি ‘বিচু’ শব্দের ‘বি’ অর্থ অতি, চু  অর্থ  আনন্দদায়ক । ( উপেন রাভা)২ বডোরা বৈশাখের বিহুকে বলেন ‘রংজালী বৈশাগৌ’। এতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘হৌচৌৰি হৌচৌৰি বিহৌ মাগি ফুৰাৰ’ প্রথা রয়েছে। অসমীয়াতে এসে সেই প্রথার নাম হয়েছে ‘হুঁচরি’। রাভাদের বিহুর জনপ্রিয় নাম ‘বাইখ’, সনোয়াল কাছাড়িদের ‘বাইথ’, মিশিংদের ‘আলি আই লৃগাং’। বডোদের  এদের বেশির ভাগ জনগোষ্ঠীই যদিও নিজেদের অসমিয়া বলে পরিচয় দেয় তাদের উৎসবের দিন ক্ষণ আর রকম সকম মোটেও হুবহু এক নয়। বডোরা নিজদের অসমিয়া বলে পরিচয় দেয় না। তাই আহোমরা যদিও সে পরিচয়  দেয় তারাও আজকাল ‘তাই বিহু’বলে স্বতন্ত্র আয়োজন করে থাকেন। চাকমাদের মধ্যে ‘বিজু’, মারলাদের ‘সাংগ্রাই’ আর ত্রিপুরিদের ‘বৈসুক’ এর থেকে আদ্যাক্ষর নিয়ে আজ ক’বছর ধরে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের এই তিন জনগোষ্ঠী একত্রে পালন করছেন ‘বৈসাবি’ উৎসব। সেটি নিশ্চয় অসমিয়া ব্যাপার নয়।
                    বাকি ভারতের লোকেদের কাছে যে ‘বিহু’ বললেই আজকাল অসম আর অসমিয়াদের কথা মনে পড়ে তার কারণ গেল অর্ধ শতক ধরে এরা একে সফলতার সঙ্গে লৌকিক উৎসব থেকে জাতীয় উৎসবে রূপান্তরিত করেছেন। সেটি অসমিয়া মধ্যবিত্তের এক রাজনৈতিক উদ্যোগ। রাজনীতি বললে অনেকেই দলীয় রাজনীতির কথা বুঝে থাকেন আমরা সেরকম কিছু বোঝাতে চাইছিনা। বাকি ভারতের থেকে বিশেষ করে বাঙালিদের থেকে নিজদের স্বতন্ত্র বলে তুলে ধরাটা একসময় অসমিয়া মধ্যবিত্তের অনিবার্য প্রয়োজন হিসেবে দেখা দিয়েছিল। জাতীয় উৎসব ‘বিহু’ সেই প্রয়োজনের ফসল। নইলে একসময় অসমিয়াদের  অজনজাতি অভিজাত অংশ ‘বিহু’কে মোটেও শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন না। ভাটি অসমে বিহু তেমন কোনো জনপ্রিয় উৎসব ছিলনা এই সেদিন অব্দি। আজো গোয়াল পাড়ার ‘বিষুয়া উৎসবে’ আর সবই আছে, নেই শুধু কোনো নৃত্যগীত। বাংলা ভাষাতে প্রথম ইতিহাস গ্রন্থের অসমিয়া লেখক হলিরাম ঢেকিয়াল ফুকন তাঁর ‘আসাম বুরঞ্জী’তে লিখেছিলেন , “ বিহুর গান একটা হইয়া থাকে তাহাতে সাধারণ লোকের স্ত্রীলোক ও লম্পট পুরুষসকল একত্র হইয়া জুগুপৎচিত নৃত্যগীত করিয়া থাকে।” অসমিয়া জাতীয়তাবাদের পিতৃপুরুষ আনন্দরাম বরুয়ার জীবনী লেখক গুণাভিরাম বরুয়া লিখেছেন , “ অশ্লীলতা তেঁও বৰ ঘৃণা কৰিছিল। বৈশাখৰ বিহুত নগাঁওৰ স্থানে স্থানে অশ্লীল নৃত্যগীত হৈছিল সেইসকলক তেঁও নিবাৰণ কৰালে আৰু এইৰূপ কার্য যে অনিষ্টজনক তাক তেঁও সকলোকে বুজাই দিছিল।” (দেবব্রত)৩                   অসম সাহিত্য সভার দু’একজন প্রাক্তন সভাপতিও ছিলেন বিহু বিরোধী। এরা প্রায় প্রত্যেকেই বাংলার নবজাগরণের দ্বারা বিশেষ করে ‘ব্রাহ্ম ধর্ম’ আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। বাংলাতে যেমন রবীন্দ্রনাথের আগে পুরোনো লোক সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যানের এক আয়োজন পূর্ণদ্যমে চলছিল। এখানেও তাই হচ্ছিল। ড০ দেবব্রত শর্মা লিখেছেন অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি কমলাকান্ত ভট্টাচার্য বিহু বিরোধীতা করেছিলেন এই ভয়ে, “ জানোচাঁ ‘বিহুর গীতবোৰ বৰ নিলাজ অভং’ শুনি সতীৰ মতিভ্রম হয়। তেওঁ নিলাজ (বিহু) গীতৰ ঠাইত বীৰ-গীত গাবলৈহে আহবান জানাইছিল। মন কৰিবলগীয়া যে অসমীয়া ভাষা-সাহিত্যর কামত একাণপতীয়াকৈ আত্মনিয়োগ করা এই সকল ব্যক্তির সম্পর্কে কোনো আঁচনি বা চিন্তা নাছিল। সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনো আঁচনি নাছিল। সংস্কৃতি সম্পর্কে তেঁওলোকৰ ধাৰণা আছিল হয় বাংলা সংস্কৃতি কেন্দ্রিক, নহয় ব্রাহ্মণ্য/সত্রীয়া সংস্কৃতি কেন্দ্রিক। (দেবব্রত)৪
    বস্তুত মেয়েরা প্রকাশ্য বিহু নৃত্যে যোগ দিত অতি অল্পই। ছেলেরাই মেয়ে সেজে বিহুর নানা নৃত্যে যোগ দিত। আজ যখন গাছ তলার বিহুকে এক পাশে সরিয়ে দিয়ে মঞ্চ বিহু নামে এক নতুন ধারা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে, মেয়েদের যোগদান ব্যাপক ভাবে বেড়েছে, তখনো একে বিকৃত  প্রথা বলবার লোকের অভাব নেই। এই সেদিন চাও দেবেন্দ্রচরণ বরবরুয়া ‘প্রান্তিকে’৫ লিখেছেনঃ  “...বুঢ়াচেওৰ বিহুত ছোয়ালীৰ ( মেয়েদের-লেখক) স্থান নাছিল । আজিকালি ডেকা ( জোয়ান ছেলে),বুঢ়া, ল’ৰা, চেমনীয়া ( কিশোর-লেখক) গোট খাই লগত সৰু ডাঙৰ ছোয়ালী লৈ ঘৰে ঘৰে বিহু মৰা বিকৃত প্রথা এটা ওলাইছে। এনে প্রথাক বিশিষ্ট সাহিত্যিক ড০  নির্মলপ্রভা বৰদলৈয়ে ধিক্কাৰ দি কৈ গৈছে যে ‘আগতে হুঁচুৰি ( বিহুর আরম্ভ অংশের এক আবশ্যিক অংগ-লেখক) গাবলৈ মানুহৰ ঘৰলৈ যাওঁতে ল’ৰা লগত ছোয়ালী নানিছিল। ল’ৰাক কোনোয়ে ছোয়ালী সজাই নচুয়াইছিল। এতিয়া হুঁচৰি গাওঁতে ছোয়ালিয়েও বিহু মাৰিবলৈ যায়, বাঃ আধুনিকতা।”    বিশ শতকের ষাটের দশক অব্দি ‘হুঁচরি’তে- যাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাচ গান করা আর গৃহস্থকে আশীর্বাদ জানানো হয়—তাতে মেয়েরা যেমন অংশ নিতনা তেমনি গানের বিষয়েও প্রেমপ্রীতির আধিক্য ছিলনা।ষাটের দশক থেকে ছেলেদের মেয়ে সাজিয়ে নিয়ে যাবার প্রথা প্রচলিত হয়। তখন থেকেই এতে প্রেমের গানের আধিপত্য বাড়তে শুরু করে। আশির দশকে সেই সাজানো মেয়েদের প্রতিস্থাপিত করে রীতি মতো কৈশোরোত্তীর্ণ যুবতিরা। ৬
From Bihu: Sushanta
         স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় জাতীয়তাবোধে উদ্দীপিত অসমীয়ারা যখন নানা গোষ্টীতে বিভক্ত জাতিকে একত্রে বাঁধবার প্রয়োজনে এক জাতীয় উৎসবের প্রয়োজন বোধ করছিলেন, তখন অনেকেই বাঙালি হিন্দুর  আদর্শে দুর্গা পূজাকে সে জায়গা দেবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ঢাকার থেকে প্রকাশিত কালীপ্রসন্ন ঘোষের সম্পাদিত বাংলা পত্রিকা ‘বান্ধবে’র অনুসরণে ডিব্রুগড়ের চা-বাগিচা মালিক গংগারাম চৌধুরী ‘আসাম বান্ধব’ প্রকাশ করতেন। ঐ কাগজ দুর্গা পূজার পক্ষে জোর সওয়াল করেছিল। ‘আলোচনী’ নামে অন্য এক কাগজের নেতৃত্বে আরো অনেকে তখনই বিহুর পক্ষে উঠে পড়ে লাগেন। লক্ষীনাথ বেজবরুয়া, রজনীকান্ত বরদলৈ, জ্ঞানদাভিরাম বরুয়া প্রমুখ লেখক বুদ্ধিজীবিরা অনেক লড়াই করে ‘বিহু’ মতো এক ধর্ম নিরপেক্ষ উৎসবকে অসমীয়াদের জাতীয় উৎসবের মর্যাদাতে উন্নিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল এমন এক উৎসব যার ছায়াতলে নানা জনগোষ্ঠীতে বিভক্ত অসমের সমাজ মিলনের স্বাদটুকু নিতে পারে। সাহিত্য সভার ১৯৫৯সনের সভাপতি  অতুল চন্দ্র হাজারিকা বলেছিলেন, “আজি কেই বছৰ মানৰ পৰা অসমৰ বহু ঠাইত ৰাজহুয়াভাবে বিহু উৎসব পালন কৰা হ’ব ধৰিছে সাংস্কৃতিক উৎসব হিচাপে। নতুন যুগৰ নতুন বিহুতলীক ( যেখানে বিহু উদযাপিত হয়-লেখক) উদ্দেশ্য কৰি আমি ক’ব পাৰোঁ  মিকিৰ কচাৰী বড়ো/আবৰ মিছিমি গাৰো/ খাচীয়া, জয়ন্তীয়া, মিৰি নগা/ জনমে মৰণে সতে লগা-ভগা আহাঁ আহাঁ আহাঁ/ আমার এই বিহুতলী যাউতিযুগীয়া/ সকলোৰে উমৈহতীয়া ( সার্বজনীন-লেখক)।”  (দেবব্রত)৭
             পৌষ সংক্রান্তি বা নববর্ষের মতো ব্যাপারকে নিয়ে বাংলারও এক ধর্ম নিরপেক্ষ জাতীয়  উৎসব গড়ে উঠতে পারত। আধুনিক বাংলাদেশের ‘নববর্ষ’ সেটিকে প্রমাণ করে। কিন্তু বর্ণহিন্দু বাঙালি সেরকম কোনো উদ্যোগকে  প্রশ্রয় দিলনা। অথচ সেই কাজই অসমিয়াদের মধ্যে করতে সফল হলেন এক বিশাল মাপের বাঙালি ভদ্রলোক ও গণ সঙ্গীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস। তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি, “যি নাই অসমত সি নাই বিহুগীতত”  এখনো অসমিয়া সমাজে প্রবাদের মতো শোনা যায়। তাঁর ‘অসম আৰু বংগৰ লোকসঙ্গীত সমীক্ষা’ বইতে যা লিখেছেন তাকে বাংলা করলে দাঁড়ায় , “ অসমে যা নেই তা বিহু গানেও নেই। অসম এবং অসমিয়া জনমানসের নির্ভুল দর্পণ এই বিহু.।.. ধর্মপ্রভাবমুক্ত ইহজগত   এবং শ্রমশীল জীবনের প্রতি অসীম মমতা—এই হলো বিহুর দর্শন। ...শারদীয় উৎসব, দীপান্বিতা, দোল এই সবগুলো হিন্দুদের উৎসবে পরিণত হয়েছে। জাতীয় উৎসবের মর্যাদা  এগুলো হারিয়েছে...। বর্ণহিন্দু সমাজের বিধি নিষেধ আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই হলো বিহুর প্রধান উপজীব্য...।দুঃখের বিষয় ভারতের সবগুলো উৎসবই সাম্প্রদায়িক। বসন্ত উৎসব রূপান্তৰিত হয়েছে হোলি বা চৈতন্য উৎসব ইত্যাদিতে। শারদীয় উৎসব পরিণত হয়েছে দুর্গোৎসব ইত্যাদিতে। কারবালার কাহিনীমূলক মহরম হলো মুসলমান সম্প্রদায়ের। কিন্তু বিহু তার মধ্যেও এর ধর্মনিরপেক্ষ প্রকৃতি অক্ষুন্ন রাখতে পেরেছে। এটাই বিহুর গৌরব, অসমিয়া জনগণের গৌরব।” সেই গৌরবকে সম্মানিত করে চূড়ান্ত গানটি গাইলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাসেরই এককালের শিষ্য ভূপেন হাজারিকাঃ ‘বিহু মাথোঁ এক ঋতু নহয়  , নহয় বহাগ এটি মাহ। অসমিয়া জাতিৰ ই আয়ুস ৰেখা...”
From Bihu: Sushanta
          ‘লোক সংস্কৃতি’র থেকে ‘জাতীয়  উৎসব’ হয়ে উঠতে গিয়ে কিছু পরিবর্তনতো বিহুর মধ্যে হয়েইছে। উজান অসমের মূল স্রোতের অসমিয়াদের ‘বিহু’ই প্রচারের মুখ দেখেছে বেশি। আগে যেখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘হুঁচরি’ গেয়ে সংগৃহীত ধনে গাছতলাতে বিহু হতো, এখন সেখানে সংগঠিত কমিটির অধীনে  ‘দুর্গাপূজা’ ও তার পরবর্তী অনুষ্ঠানের মতো চাঁদা তুলে মঞ্চে বিহু আয়োজিত হয়। জাতীয় রাজনীতির প্রয়োজনে বিহুর এই যে রূপান্তরণ তার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছে আধুনিক রাষ্ট্র ও ব্যবসায়িক কোম্পানীগুলো। গ্রামের বিহু এখন নগর কেন্দ্রিক এবং কোটি টাকার আয়োজনে রূপান্তরিত হয়েছে। বিহুর একধরণের ব্যবসায়িক রূপান্তরো ঘটছে । যাকে বলতে পারি বিহুর পণ্যায়ন। বিহুকে পণ্য করে  বিকৃত করবার অভিযোগও আজকাল সরবে শোনা যাচ্ছে। একে আটকানো কতটা যাবে সেটি বলা মুস্কিল।  দেবব্রত শর্মা আক্ষেপ করে লিখেছেন , “ড০ ভূপেন হাজাৰিকার দৰে একালৰ গণশিল্পীয়ে (আজিৰ গেৰুয়া নির্বাচন প্রার্থী) বিহু সন্মিলনত এৰাতি গোয়াৰ বাবদ গণি গণি আদায় লৈছে লাখৰ হিচাপত টকা। তার বিপৰীতে গাঁওবোৰ নিজম পৰি আহিছে। অভাব অনাটনে বিহুৰ হৰিষ হৰিছে ( আনন্দ হরণ করেছে-লেখক)।” (দেবব্রত)৮
    আর সমস্ত জনগোষ্ঠির লোক সংস্কৃতির বেলাতে যেমন বিহুর বেলাতেও তেমনি কোনো ধরাবাঁধা ‘শাস্ত্রীয়’ নিয়ম নেই।  না আছে তার নাচের গানের কিম্বা বাদ্যের কোনো জটিল তত্ব কথা। হাজার বছরের পরম্পরা পরিবর্তনের মধ্যি দিয়ে যেতে যেভাবে তাকে গড়ে তুলেছে সে সেভাবেই গড়ে উঠেছে।  ফসল উৎপাদনের সঙ্গে মানুষের যৌনজীবনের সাদৃশ্য কল্পনার থেকে যার যাত্রা শুরু সে সেখানেই মোটেও থেমে থাকেনি কোনোদিনই।এমন কি অনেক সময় আজ বিহুর সঙ্গে যে কৃষি কাজের কোনো সম্পর্ক রয়েছে তাকেই বেশ খোঁজে বের করতে হয়। এই যেমন বিহু নাচের ব্যাপারটি। একে  অসমিয়া স্বতন্ত্র নাচের শৈলী বলে গোটা বিশ্ব জানে। বড় যৌন উত্তেজক বলে মুখরোচক আলোচনাও হয়। ভাবনা ওইখানেই থেমে যায়। আসলে কিন্তু এই নাচে বৈশাখের গাছে গাছে নতুন ডাল পালা মেলা আর পাতা গজানোর উৎসব শুরু হয় তারই এক শৈল্পিক পুনস্থাপন করা হয়। নিচের ছবিটি দেখুন আর বিহু নাচের সঙ্গে তার সাদৃশ্য কল্পনা করুন। ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। মহিষের শিঙে তৈরি পেঁপাতে ( কৃষি সমাজের জনপ্রিয় বাদ্য। বাংলাদেশের কৃষির দেবতা শিবের শিঙার থেকে আকারে সামান্য ছোট আর সুসজ্জিত) মুক্তি নাথ বরগোঁহাই লিখেছেন ,” আমাক অগ্রজ তথা সমল ব্যক্তিয়ে ১৯৬০-৬১ চনতে এনেদৰে শিখাইছিল...পেঁপাৰ প্রথম লহৰ বজালে দুয়োখন হাত কঁকালত থৈ হাউলি ঢেঁকি খোজৰ দোপন দি ঢোলৰ তাল আৰু লয়ৰ লগত সংগতি ৰাখি,ঠাইতে ঘুৰি ঘুৰি নচা আৰু পেঁপাবাদকে উশাহ সলাওঁতে ঢোলৰ বুলনীত থিয় হৈ হাত মেলি নচা।” ৯ অর্থাৎ ঢেঁকিতে পাড় দেবার
From Bihu: Sushanta
অনুকরণ করে এক  সুন্দর এক নৃত্য ভঙিমা গড়ে তোলা হচ্ছে। হাত মেলে নাচাটাও আসলে শিল্পী শিখেছেন বসন্তের নতুন পাতাভরা ডালের থেকে। এমন কি ‘নাচনী’রা ( নৃত্যাঙ্গনা-লেখক) যখন কোমরটাকেও একটু পেছনে ঠেলে মাথা এক পাকে উপরে আবার পরের পাকে নিচে নামিয়ে হাত মেলে নিজের চারদিকে ঘুরছে তখন আসলে ওরা বসন্তের শেষদিনগুলোতে বড় বড়  গাছে  স্বর্ণলতার প্যাঁচিয়ে ওঠাকে নৃত্যশৈলীতে  রূপান্তরিত করছে। বিহুনামে ( বিহুগানে-লেখক) রয়েছেঃ গছত বগোয়া ক’লীয়া লতা চ’তে গৈয়ে গৈয়ে/গছত বগোয়া ক’লীয়া লতা বহাগে পালেহি/ গছত  বগোয়া ক’লীয়া লতা ফুলিলে ভেবেলি লতা। কিম্বা ধরুন এই গানটি ঃ ৰাঙলী মদাৰৰ পাতে ঐ নাচনী/ৰাঙলী মদাৰৰ পাত। কঁকাল ঘূৰাই ঘূৰাই নাচিবি নাচনী লগাইছো নামৰে জাত। 
    এই যে ‘নামৰে জাত’—জাত কিন্তু বিহু গানের এক রকমফেরের নাম। তেমন কোনো শাস্ত্রীয় বিধিবিধান না থাকলেও স্থানে কালে বিহু নাচের যেমন তেমনি গানেরও বেশ রকমফের প্রচলিত রয়েছে। বিহু গানের ঘোষা, পদ, যোজনা, চুটি, বা খন্ড ছিগা নাম , যোরা নাম, জাত (জাত নাম), বহুয়া নাম ইত্যাদি বেশ ভাগ রয়েছে। চুটি মানে ছোট, ছিগা মানে ছেঁড়া, নাম কথাটার অসমিয়া অর্থ গীত , এসছে বৈষ্ণব পরম্পরার থেকে। এই চুটি নামই মূল বিহু। শুরুতে শুধু এগুলোই ছিল। সাধারণত এগুলো চার পংক্তির স্তবক হয়। চুটি নাম দিয়ে বিহুনাম ‘পকি উঠে’ মানে জমে উঠে। বাংলা কবির লড়াইর মতো বিহুতে জোরানামের প্রচলন পরবর্তী ঘটনা। লোকসংস্কৃতির গবেষকেরা একে কী বলবেন জানিনা। এ হলো বিহুর মূল কারক থেকে অপসারণ বা বিস্তার। জোরানামের সময় অব্দি এসে তরুণ জিজ্ঞেস করছে, বাঁহৰে আগলৈ চাই পঠিয়ালো/ বাঁহৰ কোনডাল পোন ( সোজা-লেখক)/ সঁচাকৈ সুধিছো মিছাকৈ নক’বা / তোমাৰ মৰমিয়াল কোন? । তরুণী যেন জলের ঘাটে দাঁড়িয়ে জলাজমিতে মহিষ চরাতে  ব্যস্ত তরুণকে শুনিয়ে জবাব দিচ্ছেঃ তিৰোতাৰ জনম দি বিধাতাই স্রজিলে/ পুৰুষৰ লগতে যোৰ/ আয়ো লোকৰ বোপায়ো লোকৰ/ তোমাকে বুলি যাওঁ মোৰ।
    মুল কারক থেকে অপসারণ এখানেই থেমে থাকেনি। ব্যক্তি, পরিবার, গ্রাম ও স্বদেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি, ইতিহাস সমস্ত কিছুকেই বিহু নিজের মধ্যে ধারণ করে হয়ে উঠেছে আক্ষরিক অর্থেই অসমিয়া সমাজের দর্পণ।  আনন্দের উৎসব বিহুতে অসমিয়া মানুষ নিজের দারিদ্র্যের নিরানন্দের কথা জানিয়ে এও গেয়ে উঠেছেঃদেউতা অ’ খুজি মাগি এমুঠি রান্ধো/ মাহ হালধিরে, গরু গা ধুয়াই লৈ, তরালি পঘারে বান্ধো। কিংবা গেয়েছেঃ টকাৰ সৰু সৰু মাত সমনীয়া /টকাৰ সৰু সৰু মাত/ম’হঘূলি চাপৰিত টকাৰ মাত শুনি/এৰি যাওঁ পেটৰে ভাত।        ( বুলজিত) ইতিহাসের স্বাক্ষর ধরে রেখেছে এমন গানঃ স্বর্গদেউ ওলালে বাটচৰাৰ মুখলৈ/ দুলীয়াই পাতিলে দোলা/ কাণত জিলিকিলে নৰা জাংফাই/ গাতে গোমেচেঙৰ চোলা। কিম্বা দিখৌত গুমগুমাই  কোম্পানীৰ জাহাজ ঐ/ঢেঁকীত গুমগুমাই থোৰা/ গাত জুই জ্বলিছে সৰিয়হ ফুটিছে/ তোমাক দেখিবৰে পৰা। সিপাহী বিদ্রোহ বা দেশের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মণিরাম দেওয়ান আর পিয়লি বরুয়া ফাঁসি কাঠে ঝুলেছিলেন। সেই ঘটনাকেও অসমিয়া শিল্পী বিহু গানে ধরে রাখতে ভুল করেনিঃ সোণৰ ধোঁয়াখোয়াত খালি ওই মণিৰাম/ৰূপৰ ধোঁয়াখোয়াত খালি/ কোম্পানীৰ ঘৰতে কিনো দায় লগালি/ ডিঙিত চিপেজৰী ল’লি। সুতরাং  কেউ যখন বিহুর দিনগুলোতে গেয়ে উঠেঃ আমি অসমীয়া গাতে মুগা-ৰিহা/খোপাত আমাৰ কপৌফুল,/আমাৰে চিনাকি ব’হাগৰ বিহুটি/হাততে জেতুকা বোল।–এই কথাগুলোর ব্যঞ্জনা বিস্তর , অর্থ ব্যাপক। অন্য কাউকে খাটো না করে  নিজের সমাজের এর চেয়ে সুন্দর পরিচয় আর কিসেই বা কেউ তুলে ধরতে পারে! 


*********


তথ্যসূত্রঃ
 ১) বুলজিত বুড়াগোহাইর সংগ্রহ থেকে;http://buljit.blogspot.com/
 ২) ড০ উপেন রাভা হাকাসাম;অসমীয়া আরু অসমর তিব্বত বর্মীয় ভাষা; পৃঃ১০১।
 ৩)ড০ দেবব্রত শর্মার ‘অসমীয়া জাতি গঠন প্রক্রিয়া আরু জাতীয় জনগোষ্ঠীগত অনুষ্ঠানসমূহ’ তে ব্যবহৃত উদ্ধৃতি; পৃঃ ৩২৮) 
 ৪)  ঐ; পৃঃ ৩২৯
 ৫)অসমৰ লোকসমাজ লোক উৎসৱ বিহুৰ হুঁচৰি, পদ, ঘোষা। যোজনা, নাম , জাত নাচ আদিৰ চমু মর্মকথা; প্রান্তিক; ১৬-৩০  
   এপ্রিল, ২০১০ সংখ্যা; পৃঃ১২ ।
 ৬) ড০ প্রদীপ নেওগ; গৃহস্থৰ চোতালত হঁচৰি মৰা প্রথাটো চলি থকা প্রসংগত;প্রান্তিক; ১৬-৩০ এপ্রিল, ২০১০ সংখ্যা;পৃঃ১৭ ।
       ৭) ঐ; পৃঃ৩৩১)
        ৮)ঐ; পৃঃ৩৩৩)
        ৯)  পেঁপাবাদন আৰু নাচোনশৈলী; প্রান্তিক, ১৬-৩০ এপ্রিল সংখ্যা, পৃঃ ২৬ 
      

Saturday, 15 May 2010

আমাদের অত্যন্ত প্রিয় এই যে মাতৃভাষাগুলো

( ১৯শে মে, ভাষা শহিদ দিবসকে মনে রেখে এই অনুবাদ)
ঋতুরাজ কলিতা




আমাদের ভারতবর্ষের এই অংশটির এই যে মাতৃভাষাগুলোঃ
অসমিয়া,মণিপুরি, বাংলা, বডো, ভোজপুরি, মিশিং, সিলেটি,নেপালি, খাসি, হিন্দি,রাজস্থানী,
কার্বী,তিওয়া, ডিমাসা,জেমি নাগা, তাংখুল, আংগামি, কুকি, মিজো,মনপা,ককবরক...
আমাদের অত্যন্ত প্রিয় তথা পূজনীয়। ইতিহাস আর ভাষাবিজ্ঞান আমাদের জানিয়েছে যে
হাজার হাজার বছর ধরে বিকশিত আমাদের এই সমস্ত ভাষাই
সমস্ত সামাজিক এবং মানবিক ভাব প্রকাশ তথা  বিনিময় করবার জন্যে পুরোপুরি উপযুক্ত
জীবনের সমস্ত আনন্দ বেদনা, দয়া করুণা, ক্ষোভ প্রীতি সবগুলো অনুভূতির পরিপূর্ণ বাহন

তবুও , কাগজের পৃষ্ঠা তথা দূরদর্শনের পর্দাতে নানারকম খবরগুলো দেখে শুনে
জায়গায় জায়গায় অহরহ যে সব ছোট বড় আন্দোলন হচ্ছে সেগুলোর  স্লোগান পড়ে শুনে
আমাদের মনে কেন জানি এই সন্দেহ জাগে যে
আমাদের এই ভাষাগুলো
সত্যি বুঝি একই রকম করে নানা রকম মানুষের মর্মবেদনাকে প্রকাশ করতে পারে?

একই রকম প্রকাশ করতে পারে কি সেনা আতিশয্যের বলি নিরীহ অসমিয়া কৃষকের যন্ত্রণাকে?
আর উগ্রপন্থীর মাইন আক্রমণে পা কাটা পড়া তেলেগু সেনার দুর্ভাগ্যকে?
( যদি তাই হয়, তবে কেন অসমিয়া বর্ণমালাতে  এক বিশেষ ধরণের খবরই দেখি বেশি বেশি করে?)
একই রকম বর্ণনা করতে কি পারে থৌবাল গ্রামে পুলিশের হাফাজতে     মৃত কাঠ মিস্ত্রি ছেলেটির
তথা ইম্ফলে সন্ত্রাসবাদি বোমা বিস্ফোরণে মৃতা মণিপুরি ব্যাবসায়ী মায়ের কাহিনিকে?
( যদি তাই হয়, তবে কেন মণিপুরি স্লোগানগুলোতে আমরা এক বিশেষ ধরণের প্রতিবাদই দেখি
বেশি বেশি  করে?)


মা বাবাকে হঠাৎ করেই হারিয়েছে যে ডিমাসা বা জেমি নাগা বা মাড় কিংবা ভোজপুরি কিশোরীটি
তার হৃদয়ের হাহাকারকে কি সেই একই রকম ব্যক্ত  করতে পারে?
(যদি তাই হয়, তবে কি জেমিনাগা গণহত্যার বিরুদ্ধেও  একই রকম প্রতিবাদে সোচ্চার হতো না ডিমাসা নারী?)
উদ্যত অস্ত্রের সামনে হতবাক নাগা বা কুকি বাসযাত্রীদের হাহাকারকে কি একই রকম বোঝাতে পারে?
একই রকম বোঝাতে পারে কি উগ্রপন্থীর আকাশছোঁয়া টাকার দাবিতে বিভ্রান্ত
অসমিয়া আর রাজস্থানী মূলের ব্যবসায়ীদের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তাকে?

যদি প্রতিটি ভাষা সবার সুখ দুঃখ একই সমান করে প্রকাশ করে পারত
তিনসুকিয়ার গ্রামবাসিদের কন্ঠে কি আর শুনতে পেতাম সেই সংগঠন আর সেই ব্যক্তির জন্যে
জিন্দাবাদ ধ্বনি, যাদের নির্দেশে গণহত্যাতে মারা গেছে তিনসুকিয়ারই শতাধিক অন্যভাষী
যার সন্ত্রাসবাদি আক্রমণে হতাহত হয়েছে নিম্ন অসমের শহর গুলোর শত সহস্র আম জনতা
( অর্থাৎ তোমরা সেদিন স্লোগান দিয়েছিলে গণহত্যা জিন্দাবাদ, বোমা বিস্ফোরণ জিন্দাবাদ)
ধরা বাঁধা কতকগুলো শব্দ এবং শব্দজোড়কে গেঁথে গেঁথে
আজ আমরা আমাদের ভাষাগুলোর যে অবস্থা করেছি...
সেগুলো কি আর বোঝাতে পারল গুয়াহাটির বেলতলাতে
দুর্বৃত্তের অপ্ররোচিত আক্রমণে জীবিকা হারানো শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বেদনাকে?
বোঝাতে পারল কি অসমের চর অঞ্চলের থেকে উজানের ইটভাটাতে ট্রাকে করে যাবার বেলা
বিদেশি আখ্যা দিয়ে যেখানে সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা খিদে তৃষ্ণাতে আবদ্ধ করে রাখবার যাতনা?
ঠিক ঠিক করে কি বোঝাতে পেরেছে গ্রামে গ্রামে বাঁদরের দলে
আর শোনিতপুর-নগাঁও-গোলাঘাটের গ্রামাঞ্চলে হাতিতে দলিত মথিত করে
যাদের খেত খামার ধ্বংস করেছে সেই জনতার ভবিতব্যকে?

রাষ্ট্রযন্ত্র, নিপীড়িত জাতিসত্তা, নারী-নির্যাতন, সন্দেহযুক্ত বিদেশী, হাতি মানুষের  সংঘাত
ইত্যাদি কিছু শব্দবন্ধের অকারণ আধিক্য তথা অহরহ চাপে
আমাদের পূজনীয় মাতৃভাষাগুলো কি তাদের স্বাভাবিক ন্যায় অন্যায় বোধ হারিয়ে ফেলেছে
এমন কি আমাদের ...এই ভাষাগুলোর প্রিয় সন্তানদের--- জীবন মৃত্যুর পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা?

এগুলো কি চমস্কি যেমনটি বলেছেন,
মানুষের সত্য সন্ধানের পথে  জীব বৈজ্ঞানিক ভাবে অপ্রতিরোধ্য এক একটা সিড়ি...
না, হয়ে পড়েছে আমাদের অহরহ আত্ম প্রবঞ্চনার নীরব সাক্ষী এবং অসহায় সহায়ক ?

( কবিতাটি ড০ হীরেন গোঁহাই সম্পাদিত ‘নতুন পদাতিক’ কাগজের  এপ্রিল,২০১০ সংখ্যাতে প্রকাশ পেয়েছে। ঋতুরাজ নিজেও কাগজটির সহ সম্পাদক।)
অনুবাদঃ ১৫-০৫-১০

Friday, 14 May 2010

‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় উনিশ’ : বাঙালির আত্মাভিমান, অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদ এবং রবীন্দ্রনাথের হৃদয় কথা



                   
             “আমাৰ ,ভাৰতবর্ষৰ এই খণ্ডৰ অধিবাসিসকলৰ, এই যে মাতৃভাষাবোৰঃ/অসমীয়া,মণিপুৰি,বাংলা,বডো,ভোজপুৰী,মিছিং,চিলেটী,নেপালী,খাচি,হিন্দী, ৰাজস্থানী,/কার্বী,তিৱা,ডিমাছা,জেমিনাগা,টাংখুল,আঙ্গামী,কুকি,মিজো,মনপা,ককবৰক…/আমাৰ অতিকৈ প্রিয় তথা পূজ্য।...” এভাবেই শুরু হয়েছে সুপরিচিত অসমিয়া তরুণ কবি ঋতুরাজ কলিতার এক আশ্চর্য সুন্দর গদ্য কবিতা। কবিতাটি দীর্ঘ। সবটা তুলে দেয়াটা এই প্রবন্ধের পক্ষে বিরক্তিকর হবে। আমি বরং প্রাসঙ্গিক ক’টা পংক্তি তুলে দিচ্ছি।“…তথাপি, কাকতৰ পাত তথা দূৰদর্শনৰ পর্দাত ভিন ভিন বাতৰিবোৰ দেখি-শুনি…আমাৰ মনত কিয় জানো এই সন্দেহ আহে/যে আমার এই ভাষাবোৰ/সঁচাকৈয়ে জানো প্রকাশ কৰিব পাৰে সকলোধৰণৰ মানুহৰ মর্মবেদনা?...।যদি প্রতিটো ভাষাই সকলোৰে সুখদুখ সমানেই প্রকাশ কৰিব পাৰিলেহেতেন/তিনিচুকীয়াৰ গাঁওবাসীৰ কণ্ঠত শুনিলোহেঁতেন জানো সেই সংগঠন আৰু সেই ব্যক্তিৰ বাবে জিন্দাবাদ ধ্বনি, যাৰ নির্দেশিত গণহত্যাত নিহত হৈছে তিনিচুকীয়াৰেই শতাধিক অন্যভাষী…বুজাব পাৰিছে জানো অসমৰ চৰ অঞ্চলৰ পৰা উজনিৰ ইটাভাটালৈ ট্রাকেৰে গৈ থাকোঁতে/বিদেশী আখ্যা দি যেয়ে –সেয়ে ঘন্টাৰ পিচত ঘন্টা ভোকে-পিয়াহে আৱদ্ধ কৰি ৰখাৰ যাতনা?...।”               
                    স্পষ্ট যে উগ্রজাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কবি কন্ঠ সোচ্চার। ঋতুরাজ অসমের সর্বজন শ্রদ্ধেয় লেখক বুদ্ধিজীবী হীরেন গোহাঁই সম্পাদিত বহুল প্রচারিত ছোট কাগজ , ‘নতুন পদাতিকে’র অন্যতম সহযোগী সম্পাদকও বটে। কবিতাটি সে কাগজেরই সাম্প্রতিক সংখ্যাতে ( ১০ এপ্রিল,১০) প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং তিনি একেবারে যে সে ব্যক্তি নন।
               না, না। ঋতুরাজ কিম্বা তাঁর কবিতা আমাদের আলোচনার বিষয়ই নয়। আমাদের বিষয়, ‘সিলেটি’ শব্দটি। সে আবার বাংলার থেকে স্বতন্ত্র উল্লেখ করবার মতো আলাদা মাতৃভাষা হলো কবে? অনেক অসমিয়া লেখক বুদ্ধিজীবী ‘সিলেটি’কে বাংলার থেকে স্বতন্ত্র পূর্বোত্তর ভারতীয় ভাষা হিসেবে ভাবতে ভালোবাসেন। ‘নিন্দুকে’রা বলেন  এ হলো বাংলার থেকে আলাদা করে পরে অসমিয়ার স্বগোত্রীয় বলে চালিয়ে দিয়ে সেই ভাষাতেই মিলিয়ে দেবার পরিকল্পনা মাত্র। ঋতুরাজ কিম্বা তাঁর মতো বাম প্রগতিশীলদের কলমেও যখন সেই পরিকল্পনার ছায়ার দেখা মেলে তখন চোখ আমাদের একটু কোঁচকায় বটে। মনে হয় যেন বাম দক্ষিণ নির্বিশেষে অসমিয়া মানেই উগ্রজাতীয়তাবাদি। কিন্তু ব্যাপার এতো সহজ নয়। সে নিয়ে আমরা পরে আসছি।
   
                   সাম্প্রতিক অসমে ময়মন সিংহ থেকে ১৯৭১এর মার্চের আগে আসা মুসলমানেরা আদমসুমারীতে নিজেদের মাতৃভাষা কী লেখাবেন তাই নিয়ে আলো হাওয়া বেশ উত্তপ্ত হয়েছে। বছরের আগামীদিনগুলোতে  আরো হবে এই আশঙ্কাই করা যায়। যারা বলছেন, ‘বাংলা লেখান’ তাদের সম্পর্কে অসমিয়া ভাষার পক্ষের লোকেরা বলছেন এসব বরাক উপত্যকার বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদীদের প্ররোচনা। অসমিয়া জাতিকে ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র।এক বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়বার সৎপ্রয়াসে বাঙালিরা জল ঢালছেন। অন্যদিকে এই ‘সৎপ্রয়াসকে’ বাঙালি মাত্রেই উগ্রজাতীয়াতাবাদ আখ্যা দিয়ে আসছেন। বলছেন,  এ হলো বাঙালির সংখ্যা কমিয়ে আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াস মাত্র।  মুসলমানদের মধ্যে  যারা বলছেন, ‘অসমিয়া লেখান’-তাদের সম্পর্কে বাংলার পক্ষের লোকেরা বলছেন ‘বিশ্বাসঘাতক’! আর যারা বলছেন, ‘বাংলা লেখান’ তাদের সম্বন্ধেও অসমিয়ারা অন্যকোনো শব্দ ব্যবহার করছেনই না। অসমিয়ারা বলছেন এতোদিন ঘরের বাইরে অসমিয়া লিখে পড়ে কথা বলে এই মুসলমানেরা অসমিয়া হয়েই গেছেন। বিরুদ্ধবাদিরা জিজ্ঞেস করছেন, তবে যে মূলস্রোতের অসমিয়ারা ঘরের বাইরে ইংরেজিতে লেখা পড়া করছেন, কথা বলছেন তারা কি ইংরেজ হয়ে গেলেন?   ভোটের বাজার তাতে কতটা সরগরম হবে তাতো আগামি দিনে দেখাই যাবে। কিন্তু আপাতত যে এতে পত্রিকা কাগজগুলোর বাজার বেশ জমে উঠেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।   কিন্তু যে ব্যাপারটি খোদ মুসলমানদেরকে ভাবাচ্ছে, বাঙালি বলে লিখলেও বরাকে ‘বাঙাল’ আর ব্রহ্মপুত্রে ‘বাংলাদেশি’ এই অবিধা তাদের যাবার নয়। কেউই তাদের পুরো বাঙালি কিম্বা পুরো অসমিয়া বলে মেনে নেবার মতো অবস্থাতে নেই। মেনে নেবেন এই আস্থাও কেউ যোগাবার মতো কোনো আয়োজন করছেন না। যার মারটা জোরালো, তার হাত থেকে বাঁচবার জন্যে তাঁদের দিকেই ঝুঁকে পড়বার সম্ভাবনাই বেশি এই মুসলমান মানুষগুলোর । অসমিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ । সুতরাং তাদের দিকেই ভিড়ে যাবার সম্ভাবনা যথারীতি প্রবল। যেমনটি তারা এতোদিন করে এসছেন। যদি তা না করেন তবে সে হবে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। সেটি ভালো কি মন্দ হবে সে তর্ক আমরা আপাতত না হয় তুলছি না।
       এই মুসলমানেরা থাকেন মূলত ব্রহ্মপুত্রের চর অঞ্চলে। তাদের বেশির ভাগ আসলে গরীব কৃষক, জেলে। জল জমিতে কাজ না মিললে তারা পাথর ভেঙে বড়লোকদের গাড়ি চলবার পথ তৈরি করে দিতে ছড়িয়ে পড়েন পূর্বোত্তরের অন্যত্র। সেখানে তাদের কপালে কী জোটে ঋতুরাজ লিখেছেন সেটিই, “বুজাব পাৰিছে জানো অসমৰ চৰ অঞ্চলৰ পৰা উজনিৰ ইটাভাটালৈ ট্রাকেৰে গোই থাকোঁতে/বিদেশী আখ্যা দি যেয়ে –সেয়ে ঘন্টাৰ পিচত ঘন্টা ভোকে-পিয়াহে আৱদ্ধ কৰি ৰখাৰ যাতনা?...।” এসব দেখে শুনে অন্নদা শঙ্করের সেই কবিতাকে খানিকটা পালটে দিয়ে আবৃত্তি করতে ইচ্ছে জাগে, “তেলের শিশি ভাঙল বলে খোকার পরে রাগ করো?/ তোমরা যে সব বুড়া খোকা ‘অসম’ ভেঙে ভাগ করো।    তার বেলা? ”  এই গরীব মুসলমানেরা নিজেদের অসমিয়া লিখিয়ে পিঠ বাঁচাবার যে সংগ্রামটি করেন তা খুব কম বাঙ্গালি জাতি ভাইয়ের চোখে পড়ে। কেন না ভাষা কিম্বা ধর্ম যার আধারেই ‘জাতি’ গড়বার স্বপ্ন দেখুন সেই স্বপ্নদ্রষ্টারা শ্রেণিগত ভাবেই মধ্যবিত্ত। সেই শ্রেণি অবস্থান থেকে উপরে যত দূরেই তাদের চোখ যাক না কেন তলার দিকে সে চোখ পড়ে অতি অল্প।
           আমাদের নিজেদের ‘চোখ’কে নিয়ে খুব অহঙ্কার রয়েছে। নিজেদের খুব সত্যদ্রষ্টা বলে ভাবতে আমরা ভালোবাসি। প্রায়ই ধমকে দিয়ে পরকে বলি, ‘তুমি কি আমার থেকে বেশি জানো?” সত্য হলো, আমরা কেউই বেশি জানি না। ঋতুরাজ জানেন না যে ‘সিলেটি’ বাংলার এক উপভাষা মাত্র, আলাদা কারো মাতৃভাষা নয়। এই না জানার উপর ঋতুরাজের নিজের খুব একটা দখল নেই। তিনি সেই ছেলে বেলা থেকে স্কুল পাঠ্য সমস্ত অসমিয়া বইতে, সভা সমিতিতে সেরকমই শুনে এসছেন। অত্যুৎসাহীরা ‘সিলেটি’কেও অসমিয়ার উপভাষা  বলে বৃহৎ অসমিয়া জাতি গড়বার স্বপ্ন দেখেছেন , দেখিয়েছেন। কিন্তু যারা জানেন যে সিলেটিদের মধ্যে গরীব শ্রমিক, কৃষক থাকলেও এক শক্তিশালী মধ্যবিত্ত বৌদ্ধিক সমাজ রয়েছেন তারা সে উৎসাহ  খানিকটা দমিয়ে এনে একে বাংলার থেকে আলাদা ভাষা হিসেবে ভাবতে ভালো বেসেছেন। বানীকান্ত কাকতি কে বাদ দিলে আমি এখনো কোনো অসমিয়া বইতে একে বাংলারই এক উপভাষা বলে সানন্দ স্বীকৃতি দিতে দেখিনি। । ব্যাপারটার শুরু হয়েছিল সেই ১৯১৩তে । যখন বেনুধর রাজখোয়া সিলেট জেলা মেজিষ্ট্রেট ছিলেন, তিনি তখন একটি বই লেখেন যার নাম ছিলঃ Notes on the Sylheti Dialect . তিনি দেখিয়েছিলেন যে সিলেটি উপভাষাটি আদর্শ বাংলার থেকে অসমিয়ার অনেক কাছের ভাষা । তিনি বিশেষ করে উল্লেখ করেছিলেন যে সিলেটিরা শিষ ধ্বনি স (s) কে অসমিয়াদের মতো 'স' (X) উচ্চারণ করে । এরা অল্প /h/-এর দিকে হেলে পড়ে, আদর্শ বাংলার -'সে', 'ঐ',' সেইটি'---র বদলে তারা বলে, 'হি' /he/ ( অস. সি /xi/), হউ /hou/ (অস. সৌ /xou/) , হেইটো ( অস. সেইটো /xeito/) ইত্যাদি । বেনুধর রাজখোয়া অসমিয়া লিপিতে লেখা এক পুরোনো সিলেটি 'পদ্মাপুরাণে'র পাণ্ডুলিপিও দেখেছিলেন । তার পর একেবারেই সাম্প্রতিক গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসমিয়া বিভাগের অধ্যাপক ভাষাবিদ উপেন রাভা হাকাসামের বই ‘অসমীয়া আৰু অসমৰ তিব্বত বর্মীয় ভাষা’ এবং ‘অসমীয়া আৰু অসমৰ ভাষা-উপভাষা’ বই দুটিতেও বেনুধর রাজখোয়ার  সেই শতাব্দি প্রাচীন তত্বের প্রতিধ্বনি শোনা যাবে। মাঝখানের ভাষাবিদেরা এ নিয়ে কী লিখে গেছেন উপেন রাভা হাকাচাম থেকেই না হয় তার নজির টানা যাক , “ অবশ্যে পৰবর্তী কালত ড০ উপেন্দ্র নাথ গোস্বামীয়ে তেওঁৰ ‘অসমীয়া ভাষা আৰু উপভাষা’ (১৮৮৬)নামৰ পুথিত ড০  প্রমোদচন্দ্র ভট্টাচার্যৰ সুৰতে সুৰ মিলাই ক’বলৈ অকণো সংকোচ বোধ কৰা নাই যে “ কাছাৰী উপভাষাটো কামৰূপী উপভাষা আৰু অসমীয়া মান্য ভাষাৰ ওচৰ চপা। ইয়াত শতকৰা পয়সত্তৰটা শব্দ সজাতীয় শব্দ।” ( পৃঃ ১১; ‘অসমীয়া আৰু অসমৰ তিব্বত বর্মীয় ভাষা ) । এরা পণ্ডিত মানুষ। কিন্তু তা সত্বেও তাঁদের ‘চোখ’ যে সর্বত্রগামী হয় নি সেতো বেনুধর রাজখোয়ার ঐ ছোট্ট উল্লেখটিতেই স্পষ্ট। হেইটো ( অস. সেইটো /xeito/) সিলেটি শব্দই নয়। সিলেটি শব্দ হবেঃ হকটা বা হটা বা হিটা। তাঁর অসমিয়ার সাদৃশ্য সন্ধানী চোখ ‘হিটা’কে ‘হেইটো’ শুনেছিল।
          এমন সীমাবদ্ধতা প্রায় শতাব্দী পরের উপেন রাভাতেও রয়েছে। তিনি বাংলা বলে যে ভাষার নজির দিয়ে তুলনা টেনেছেন তা প্রায়ই বাংলা সাধু ভাষা। মুখের বদলে কৃত্রিম ভাবে গড়ে তোলা সাহিত্যের ভাষা। যেমন তিনি লিখেছেন, “ অসমীয়াৰ সৈতে সাদৃশ্য থকা প্রধান কেতবোৰ ৰূপতাত্বিক বৈশিষ্ট হ’ল—ভবিষ্যত কালৰ প্রথম পুৰুষৰ ৰূপ –ইমু ( যাইমু, কৰিমু),তু,অসমীয়া –ইম/ম কিন্তু বাংলা –ইব, দ্বিতীয় পুৰুষৰ ৰূপ –ইবা ( যাইবা, কৰিবা) তু, অসমীয়া-ইবা/বা কিন্তু বাংলা –ইবে, তৃতীয় পুৰুষৰ ৰূপ –ইব (কৰিব) ,তু অসমীয়া –ইব/-ব কিন্তু বাংলা –ইবে...” ( পৃঃ ১২’ঐ) এমন নজির তাঁর দুটো বইতেই প্রচুর রয়েছে। বস্তুত প্রায় সবই এরকম। প্রথম,দ্বিতীয়, তৃতীয় পুরুষ বিভাজন বাংলাতে নেই। আমি যদ্দুর জানি অসমীয়াতেও নেই। আসলে তিনি প্রথম বলতে উত্তম পুরুষ,দ্বিতীয় বলে মধ্যম আর তৃতীয় বলে প্রথম পুরুষ বুঝিয়েছেন সেটি অসমীয়া নজির থেকে স্পষ্ট। তাই যদি হয়, তবে উত্তম পুরুষে  আদর্শ চলিত বাংলার রূপ আসলে –ইব নয় -ব ( আমি যাব, খাব।) সাধু বাংলাতে –ইব ( যাইবে, খাইবে), তেমনি মধ্যম পুরুষের চলিত বাংলার ইবে নয়, বে ( তুমি যাবে, খাবে), প্রথম পুরুষের চলিত বাংলার রূপ  ইবে নয়, মধ্যম পুরুষের মতোই –বে ( সে যাবে, খাবে)। সিলেটি উদাহরণও যথাযথ নয় এখানে। মধ্যম পুৰুষৰ ৰূপ –ইবা এবং তার দৃষ্টান্ত মোটেও  যাইবা, কৰিবা –কোনোটাই নয়। সে হবে –ইও ( যাইও, করিও) । তৃতীয় পুরুষের ৰূপ অসমীয়ার মতোই –ইব/ব হয় বটে । কিন্ত ‘কৰিব’ শব্দটি তার দৃষ্টান্ত হতে পারে না। এটি একেবারেই উত্তম পুরুষের সাধু বাংলার রূপ, সিলেটি মোটেও নয়। সিলেটি হবে ‘ হে যাইব, করব, খাইব, মরব ইত্যাদি। অসমিয়াতে ‘সি কৰিব’, কিন্তু সাধু বাংলাতে , ‘আমি করিব’ ।  এ ধরণের দৃষ্টান্ত দেয়া আর সিদ্ধান্ত টানা থেকে একটা কথাতো পরিষ্কার যে উপেন রাভা অবরোহী পদ্ধতিতে অনুসন্ধান চালিয়েছেন।  অর্থাৎ, সিদ্ধান্ত কী টানতে হবে তাঁর আগেই জানা ছিল, পরে তিনি তার অনুকূলে দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করে গেছেন। সেটি করতে গিয়ে সিলেটিকে যতটা পারেন অসমিয়ার মতো করে ফেলেছেন, আর বাংলাকে যতটা সম্ভব সাধু করে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। তাতে অসমীয়া অক্ষত থাকলেও বাংলা বা সিলেটি কেউই তাদের যথাযথ রূপ এবং চরিত্রে তাঁর গ্রন্থে এসে উপস্থিত হয় নি।  বৈজ্ঞানিক নৈরাসক্তি তাঁর অধ্যয়নে পাওয়া যাবে না। তাঁর পরেও কিন্তু তাঁর মন্তব্য আমরা সিলেটিরা বুঝি যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান না করেই একটা ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছি যে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। প্রমোদ চন্দ্র ভট্টাচার্যের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে তিনিও   লিখেছেন, “এনেদৰে কাছাৰ অঞ্চলৰ ভাষা-উপভাষাৰ তুলনামূলক বিচাৰ-বিশ্লেষণ কৰিলে কাছাৰীয় উপভাষা সীমান্তৰ মাত -কথা  ৰূপে বঙলাতকৈ অসমীয়া ভাষাৰ ওচৰ চপা আৰু ঘনিষ্ঠ ৰূপ বুলি প্রমাণ কৰিব পাৰি... কিন্তু কাছাড় আৰু কৰিমগঞ্জ অঞ্চলৰ কথিত ভাষা-উপভাষাৰ বৈজ্ঞানিক আৰু ক্ষেত্র অধ্যয়নমূলক বিচাৰ বিশ্লেষণ নোহোৱাৰ বাবে,... পুৰণি ভুল ধাৰণাই এই অঞ্চলৰ কথিত ভাষা-উপভাষাক বঙলা  বুলিহে অভিহিত কৰি চৰকাৰী ব্যৱস্থা লোৱা হৈছে।” ( পৃঃ১২; ঐ)
            তাঁর নিজের অধ্যয়নই যে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক নয় সেতো পাঠক মাত্রেই আগে দেয়া নজির থেকে ধরে নেবেন। বোঝাই যায়  জাতীয়তাবাদ  তাঁর দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রিত আর সীমাবদ্ধ করেছে। এমন জাতি, বর্ণ, অঞ্চল, শ্রেণি বা অন্যান্য সামাজিক স্বার্থ আমাদের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রিত করে বলেই সমাজ বিজ্ঞান আজো বিশুদ্ধ বিজ্ঞান বলে স্বীকৃতি পেলনা।“কাছাৰীয় উপভাষা সীমান্তৰ মাত -কথা  ৰূপে বঙলাতকৈ অসমীয়া ভাষাৰ ওচৰ চপা আৰু ঘনিষ্ঠ ৰূপ বুলি প্রমাণ কৰিব পাৰি...”-- তাঁর এই কথাৰ সঙ্গে কোনো বাঙালিই দ্বিমত পোষণ করবেন না। রবীন্দ্রনাথ অব্দি তাঁর প্রথম জীবনের এক রচনাতে  লিখেছেন, “ বীরভূমের কথিত ভাষার সহিত ঢাকার ভাষার যে প্রভেদ, বাংলার সহিত আসামির প্রভেদ তাহা অপেক্ষা খুব বেশি নহে।” (পৃঃ ৭৩৯, ভাষাবিচ্ছেদ;পরিশিষ্ট,শব্দতত্ব; রবীন্দ্ররচনাবলী, ৬ষ্ঠ খন্ড;১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বিশ্বভারতী প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ) ।   এই কথা প্রতিষ্ঠার জন্যে উপেন রাভার দরকার ছিলনা সিলেটি উদাহরণকে অসমিয়াপ্রায় আর বাংলা উদাহরণকে সাধু বাংলা করে দূরে ঠেলবার। এর পক্ষে তিনি  বহু বাংলা ভাষাবিদদের থেকেও নজির পেয়ে যেতেন। চাইকি শুধু সিলেটি কেন পূর্ব বাংলার আরো আরো উপভাষার অধ্যয়ন করলেও তিনি সেটা প্রমাণ করতে পারতেন। সম্ভবত চট্টগ্রামের ভাষার সঙ্গে আর বেশি। উপরে উল্লেখ করা প্রবন্ধেই রবীন্দ্রনাথই লিখেছেন, “ আসামিরা চ-কে দন্ত্য স ( ইংরেজি s) জ-কে দন্ত্য জ ( ইংরেজি z) রূপে উচ্চারণ করে , পূর্ববাংলাতেও সেই নিয়ম । তাহারা শ-কে হ বলে, পূর্ববঙ্গেও তাই। তাহারা বাক্য-কে ‘বাইক্য’, মান্য-কে ‘মাইন্য’ বলে, এ সম্বন্ধেও তাহার প্রভেদ দেখি না।”( (পৃঃ ৭৪১, ভাষাবিচ্ছেদ;ঐ) উপেন রাভা  বা বেনুধর রাজখোয়া কেউ ওতো দূর অব্দি তাকানই নি, কেননা তাঁদের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রিত করেছে গেল এক দেড় শতকের অসমের রাজনৈতিক ইতিহাস আর মানচিত্র। সিলেট ১৮৭৪থেকে অসমের একেজেলা ছিল। আজো তার একটা অংশ অসমেরই অংশ। কিন্তু উপেন রাভা হাকাসামের, “পুৰণি ভুল ধাৰণাই এই অঞ্চলৰ কথিত ভাষা-উপভাষাক বঙলা  বুলিহে অভিহিত কৰি চৰকাৰী ব্যৱস্থা লোৱা হৈছে।” এই কথাতে অন্য বাঙালিতো বটেই সিলেটি মাত্রকেই ক্ষেপিয়ে তুলবার পক্ষে যথেষ্ট।  অথচ তাঁর উদ্দেশ্য এক বৃহত্তর  ঐক্য গড়ে তোলা।
             গেল বছর (১ সেপ্টেম্বর,২০০৯) তিনি আমাদের তিনসুকিয়া কলেজে ভাষা উপভাষার উপর এক বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রিত হয়ে এসছিলেন। সেই সভাতে সিলেটি শ্রোতার সংখ্যা ছিল অতি নগন্য,ময়মনসিংহী কেউ তো ছিলেনই না। তাদের তুষ্ট করবার কোনো প্রশ্নই উঠেনা। তবুও তিনি  বেশ জোর দিয়েই নানা ভাষাতাত্বিক উদাহরণ দিয়ে দিয়ে বলেছেন, কৌনোজ থেকে আসা বহু মূলস্রোতের অসমিয়াদের থেকেও সিলেটিরা, ময়মনসিংহের লোকেরা এই অসমের মাটিতে বেশি প্রাচীন। বেশি ‘খিলঞ্জিয়া’।  মজার কথাটা হলো, এই সত্য কথাটা অসমের বহু সিলেটিও জানেনই না। তিনিতো ‘বাংলাদেশি’ বলে ময়মনসিংহীদের হেনস্থা করবার প্রয়াসের বিরুদ্ধেও তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ্যেই জানিয়ে গেলেন।
              উপেন রাভার এই ‘সৎ উদ্দেশ্য’কে বহু সিলেটি তথা বাঙ্গালি  সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে চাইবেন। তাঁরা  ভেবে নেবেন যে যতই ভালো ভালো কথা বলুন লিখুন অসমিয়া মাত্রেই উগ্রজাতীয়তাবাদি। এই বাঙালিদের জন্যে এবারে আমরা বাংলার উগ্রজাতীয়তাবাদিদের খবর  জানাবো।
                 বরাক উপত্যকার ভাষাকে বাংলা বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টাকে নিয়ে উপেন রাভার আক্ষেপের প্রতিধ্বনি শোনা যাবে বাংলার তথা কথিত কামরূপী উপভাষা তথা কামতাপুরি ভাষা নিয়ে সুধীর কুমার বিষ্ণুর করা এই মন্তব্যে , “ কামরূপী উপভাষাকে একটি প্রাচীন ও স্বতন্ত্র ভাষা রূপে দাবি করা হয়েছে, এর পেছনে দু’টি কারণ আছে  বলে আমার মনে হয়। প্রথমত, মাতৃভাষা সম্পর্কে মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা, দ্বিতীয়ত, ভাষা ও উপভাষা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব।” (পৃঃ ১৫৮, কামরূপী উপভাষা; সুধীর কুমার বিষ্ণু; উত্তর বঙ্গের ভাষা; সম্পাদক-রতন বিশ্বাস।)পাঠককে আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই অসমের বরাকউপত্যকার রাজনৈতিক আর সামাজিক অবস্থান থেকে পশ্চিম বাংলার উত্তর ভাগের চেহারা চরিত্র খুব একটা পৃথক নয়। পিছিয়ে পড়া উত্তর বাংলাতেও কামতাপুরি ভাষার আন্দোলনকে কঠোর ভাবে দমন করে আসছে সেখানকার সরকার আর বাঙালি মধ্যবিত্ত। তবু বরাকে যারা ভাষার প্রশ্নে প্রচণ্ড আবেগিক,  যারা মুলতঃ লেখক বুদ্ধিজীবি, রাজনীতির সঙ্গে চোখে পড়ার মতো  সম্পর্ক যাদের অতি অল্প তাদের আমরা সেই উত্তর বঙ্গের বাস্তবতার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে  দেখিই না। তাঁরা মাঝে মধ্যে স্লোগান তোলেন বটে , “মাতৃভাষা প্রাণের ভাষা। এ ভাষায় আছে অধিকার সকল জাতির সকল জনতার।” কিন্তু সেটি কতটা আন্তরিক তাঁর পরীক্ষা দেবার এখনো অনেক বাকি। বরাকের মণিপুরি ভাষাকে সরকারি ভাষা করবার প্রস্তাব সম্ভবত এখনো তাদের কোনো কল্পনাতেই নেই। কেউ সে প্রস্তাব দিলেও তিনি কতটা সমাদৃত হবেন তা এখনো দেখার বাকি।    তাঁরা বরং অতি আগ্রহী কলকাতার প্রতি। কারণ কলকাতাই বাংলার সাংস্কৃতিক রাজনীতির রাজধানী! যার একটা শাখা তারা খুলে চালাতে চাইছেন শিলচরে।  কথাগুলো কটু, অপ্রিয়। কিন্তু সত্য।
             খুব কম বাঙালিই সুধীর বিষ্ণুর মন্তব্যে সহজে কোনো ত্রুটি দেখতে পাবেন, বরং বৃহৎ বাঙালি ঐক্যের স্বার্থকে উর্ধে তুলে ধরবার জন্যে বাহবাই  দেবেন। তবু যদি কেউ ভেবে থাকেন যে অধ্যাপক সুধীর বিষ্ণু নিশ্চয়ই কোনো এলেবেলে লোক তাদের জন্যে আমরা এবারে এক মোক্ষম উদাহরণ তুলে ধরব। সেটি আর কেউ নন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের থেকে । রবীন্দ্রনাথের যে উদ্ধৃতি দু’টো এ অব্দি তুলে দিলাম যাতে মনে হতে পারে যে তিনিও ভাষাদু’টোর মিত্রতার    জয়ধ্বজা তুলবার মহান ব্রত কাঁধে তুলে নিয়েছেন, তাঁর সেই লেখার মধ্যেই পাওয়া যাবে বেনুধর রাজখোয়া বা উপেন রাভা হাকাসামের মন্তব্যগুলোর শেকড় বাকড়ের খোঁজ , “... আসাম ও উড়িষ্যায় বাংলা যদি লিখন পঠনের ভাষা হয় তবে তাহা যেমন বাংলা সাহিত্যের পক্ষে শুভজনক হইবে তেমনিই সেই দেশের পক্ষেও। কিন্তু ইংরেজের কৃত্রিম উৎসাহে বাঙ্গলার এই দুই উপকণ্ঠবিভাগে একদল শিক্ষিত যুবক বাংলা প্রচলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহধ্বজা তুলিয়া স্থানীয় ভাষার জয়কীর্তন করিতেছেন।” অসমিয়া বা ওড়িয়া ভাষাতে যে কোনো বড় কাজ করা যেতে পারে সেটি রবীন্দ্রনাথ তখন ( ১৩০৫ বাংলা) বিশ্বাসই করতে পারতেন না । তিনি লিখেছেন, “ এ কথা আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে দেশীয় ভাষা আমাদের রাজভাষা নহে, যে ভাষার সাহায্যে বিদ্যালয়ের উপাধি বা মোটা বেতন লাভের আশা নাই। অতএব, দেশীয় সাহিত্যের একমাত্র ভরসা তাহার প্রজাসংখ্যা, তাহার লেখক ও পাঠক সাধারণের ব্যাপ্তি। খন্ড বিচ্ছিন্ন দেশে কখনোই মহৎ সাহিত্য জন্মিতে পারে না। তাহা সংকীর্ণ গ্রাম্য প্রাদেশিক আকার ধারণ করে। তাহা ঘেরো এবং আটপৌরে হইয়া উঠে, তাহা মানব-রাজদরবারের উপযুক্ত নয়।” (পৃঃ ৭৪১, ভাষাবিচ্ছেদ;ঐ)
             এ বছর সমগ্র অসমেও রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষ যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে পালিত হচ্ছে আর হবে। অসমিয়া মানুষও তার উদ্যোগ নিচ্ছেন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার  প্রায় প্রতিটি সঙ্গীত বিদ্যালয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাঠ দেয়া হয়ে থাকে।  তিনি  যে প্রতিটি অসমিয়া মনে জ্যোতি প্রসাদ বিষ্ণুরাভার থেকে মোটেও কম শ্রদ্ধার আসনে বসে নেই তার কারণ ঘটনাক্রম সেই ১৩০৫ সনে রবীন্দ্রনাথের আশা করা মতো ঘটেনি,  রবীন্দ্রনাথও তাঁর তখনকার অভিমত আঁকড়ে ধরে থাকেন নি। ঐ প্রবন্ধটি লেখার সময় অব্দি এমন কি ১৯০৫এর বাংলা ভাগ বিরোধী আন্দোলনের সময় অব্দি তিনি সমকালীন উগ্র ভারতীয় তথা বাঙালি  জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ছিলেন। এমনকি ইউরোপীয় জাতি-রাষ্ট্রের ধারণার প্রতিও তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা ছিল। ওই প্রবন্ধেই তিনি লিখছেন, “ বৃটিশ দ্বীপে স্কটল্যান্ড, আয়র্ল্যান্ড ও ওয়েলসের স্থানীয় ভাষা ইংরেজি সাধুভাষা হইতে একেবারেই স্বতন্ত্র। তাহাদিগকে ইংরেজির উপভাষাও বলা যায়  না। উক্ত ভাষাসকলের প্রাচীন সাহিত্যও স্বল্পবিস্তৃত নহে। কিন্তু ইংরেজের বল জয়ী হওয়ায় প্রবল ইংরেজিভাষাই বৃটিশ দ্বীপের সাধুভাষারূপে গণ্য হইয়াছে। এই ভাষার ঐক্যে বৃটিশ যে উন্নতি ও বললাভ করিয়াছে, ভাষা পৃথক থাকিলে তাহা কদাচ সম্ভব হইত না।” এটি এক উজ্জ্বল প্রমাণ যে ভারতে ‘জাতি গঠনে’র ধারণাটি একটি ইউরোপীয় আমদানি। রবীন্দ্রনাথের নিজেরই পরের রচনাগুলোতে তার স্বীকৃতি ও উল্লেখ অজস্র আছে। জাতি রাষ্ট্রের ধারণা এক ইউরোপীয় এবং বর্বর ধারণা। যেখানেই সে ধারণা গেছে সঙ্গে করে মৃত্যু আর ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই নিয়ে যায় নি। আমরা সবাই জানি এখানে যে  ‘ইংরেজের বলে’র তিনি ভূয়সী প্রশংসা করছেন তাকেই তিনি ‘অজগর সাপের ঐক্য নীতি’ বলে পরের জীবনে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। জীবনের শেষে ‘সভ্যতার সংকট’ অব্দি আসতে আসতে সেই ক্ষোভ অভিশাপে পরিণত হয়েছে। কেবল অসমীয়ারা ক্ষুন্ন হয়ে আছে বলেই তিনি অসমীয়াকে স্বতন্ত্র ভাষা বলে মেনে নিয়েছেন তা নয়। তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেছেন ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’ই আমাদের দেশের মূল সুর।পরের স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করে নিয়ে তাকে আপন করবার প্রতিভাটা ভারতের নিজস্ব প্রতিভা।  আমরা যে রচনার থেকে তাঁর উদ্ধৃতিগুলো দিলাম সে লেখাটিও তাই পরে পরিত্যক্ত হয়েছিল। শুধু ঐতিহাসিক সত্যতার দায়ে ১২৫তম জন্মজয়ন্তীর  সময় প্রকাশিত সুলভ সংস্করণের সম্পাদকেরা একে পরিশিষ্টে ঠাই দিয়েছেন।
          অসমীয়া ভাষাতে গ্রন্থ প্রকাশের বিষয়ে লক্ষীনাথ বেজবরুয়ার সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ কিছু বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল এমন করে সবাই যদি বাংলা ছাড়তে শুরু করে তবে আর বাংলা সাহিত্য বলে কিছু টিকে থাকবে না। এই কথাগুলো অসমিয়া পন্ডিতদের মধ্যে বহুবার বহুভাবে আলোচিত হয়েছে। লোক সংস্কৃতির প্রখ্যাত গবেষক, অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক বীরেন্দ্রনাথ দত্তের কথাতে রবীন্দ্রনাথের এই সব মন্তব্য “ কিছুদূৰ বৈষয়িক ধৰণৰহে আছিল। আৰু সেয়া আছিল কবিৰ আগ বয়সৰ কথা । ৰবীন্দ্রনাথেৰ পৰিণত চিন্তাত আন এখন ছবিহে ফুটি উঠে । প্রত্যেক আঞ্চলিক ভাষাই সমৃদ্ধি লাভ কৰক আৰু তাৰ মাজতেই সাংস্কৃতিক-ভাষিক বিস্তৃতি লাভ কৰক-কবিয়ে মনে প্রাণে তাকেই কামনা কৰিছিল” ( অসমীয়া আৰু বাঙালীৰ সম্পর্কঃ এক ঐতিহাসিক বিহঙ্গম দৃষ্টি; সাতসৰী, ১৬-৩১ ডিসেম্বর সংখ্যা,২০০৭, পৃঃ২০)
           যারা ভাবেন যে কোনো এক ভাষাতে বেঁধে ফেলতে পারলেই এক সর্বভারতীয় ঐক্য দাঁড়িয়ে যাবে তাদের সে  উগ্রজাতিয়তাবাদি ধারণার বিরুদ্ধে যে রবীন্দ্রনাথ যে কেমন সোচ্চার ছিলেন তার কথা বলতে গিয়ে ওই একই লেখাতে বীরেন্দ্রনাথ প্রভাত কুমারের ‘রবীন্দ্র জীবনকথা’ থেকে এক উদ্ধৃতি দিয়েছেন, “ কবি বলেন, ভারত ব্যাপী মিলনের একটা ভারতীয় ভাষা করবার কথা হচ্ছে। তাঁর মতে এতে করে যথার্থ সমন্বয় হতে পারে না, হয়তো একাকারত্ব ( uniformity ) হতে পারে, কিন্তু একত্ব (unity) হতে পারে না। দড়ি দিয়ে বাঁধা , মিলনের প্রয়াস মাত্র। সে মিলন শৃঙ্খলের মিলন অথবা বাহ্য শৃঙ্খলার মিলন মাত্র। তবে প্রবাসী বাঙালিদের উদ্দেশে কবি বললেন, তাঁরা যেন যে দেশে বাস করেন সে দেশ সম্বন্ধে উদাসীন না থাকেন। তিনি বললেন, প্রায়ই দেখা যায় বাংলার বাইরে যেখানে বাঙালিরা থাকেন তার ভাষা সাহিত্য তথ্যাদি সম্বন্ধে তাঁদের একটা ঔদাসীন্য আছে; এই উদাসীনতা বা অবজ্ঞা অজ্ঞতারই নামান্তর। বাঙালির প্রধান রিপু এই আত্মাভিমান।”
              ঔদাসীন্যের কথা যখন এলোই তবে উল্লেখ করে রাখা মন্দ হবে না যে রবীন্দ্রনাথের  ভাষাবিজ্ঞানেরও ভালোই অধ্যয়ন ছিল। প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী সুকুমার সেনের কথায়, ঐ অধ্যয়নগুলোর কথা মনে রাখলে, “রবীন্দ্রনাথকে বাঙ্গালী ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রথম বলিতেই হয়।” ( বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস; চতুর্থ খন্ড; পৃঃ৪১৫) তাঁর সেই অধ্যয়নের মধ্যে অসমিয়া ভাষাও রয়েছে। ‘বিলাক-বোৰ’ ইত্যাদি অসমিয়া বহুবচন প্রত্যয়ের উৎস সন্ধানে তিনি বেশ নিবিড় অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন। অসমিয়া ভাষা নিয়ে নাথান ব্রাউনের ব্যাকরণ তাঁর আয়ত্বে ছিল।
এখন কথা হলো, উপেন রাভা হাকাচামের মতো অসমিয়া কিম্বা সুধীর বিষ্ণুর মতো বাঙালি ভাষাবিদেরা কি তাদের ‘শৃঙ্খলের মিলন’ তত্ব ছাড়তে রাজি রয়েছেন? রাজি আছেন কি, ‘একাকারত্বে’র ( uniformity ) তত্বকে ধুলোয় মিলিয়ে  একত্ব (unity) প্রতিষ্ঠার পথে পা বাড়াতে?  উনিশে মে’র পঞ্চাশ বছরকে সামনে রেখে এক দল সাংস্কৃতিক কর্মী সারা বরাকের শহরগুলোতে বিশেষ করে শিলচরে একটি স্লোগান দিচ্ছেন দেখা যাচ্ছে, ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনায় উনিশ’।  ভালো কথা। কিন্তু এমন চিহ্নায়নের নানান  অর্থ হতে পারে। আমজনতার কাছে যে সোজা অর্থটা সোজাসুজি পৌঁছুবে তা এই যে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার কবি, উনিশ সেই ভাষার অধিকার রক্ষার জন্যে রক্ত দেবার দিন। সুতরাং যে কোনো মূল্যেই বাংলার জন্যে লড়াইটা চালিয়ে যেতেই হবে। তাতেও মন্দ কিছু নেই।
              কিন্তু হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ কথাটার অর্থতো অনেক ব্যাপক। কেবল বাংলা ভাষার অধিকারের কথা বলা হলো গে রবীন্দ্রনাথকে হত্যা করা। মনে কি পড়ে রবীন্দ্রনাথের সেই আক্ষেপ, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে ,মানুষ করোনি।” সেদিকে খেয়াল আছে তো? ‘বাঙালির প্রধান রিপু এই আত্মাভিমান’ –এর বিরুদ্ধেও লড়াইটা সমানে হয়ে উঠবে কি? উঠছে কি?  মণিপুরি, ডিমাসাদের হৃদয়ের কথাতে কান পাতা হচ্ছে কি? রবীন্দ্রনাথের কথাগুলো অসমিয়া হৃদয়েও পৌঁছে দেবার কাজটা হয়ে উঠবে তো? বাঙালিদের মনে অসমিয়া জাতীয়তাবাদের আগ্রাসনের আতঙ্ক রয়েছে। কিন্তু অসমিয়া মনেও যে বাঙ্গালির আত্মাভিমানের আতঙ্ক রয়েছে তার প্রতি কোনো সম্মান আর সহানুভূতি রয়েছেতো?  অষ্টাদশ শতকের তিন দশক প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি থাকবার পর যখন তাকে তুলে দেয়া হয়েছিল তখন বহু বাঙালি এর বিরোধীতা করেছিলেন এই যুক্তিতে যে  অসমীয়ার স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাবার কোনো যোগ্যতাই নেই। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অসমিয়া চালু করতে গিয়ে আশুতোষ বন্দোপাধ্যায়কেও দিনেশ সেনের মতো পন্ডিত মানুষের  বিরোধীতার অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে সেই ইতিহাস  আমরা জানি তো? আমরা কি সত্য তার কোনো সমাধান বের করেছি, না বের করতে আগ্রহী? মুসলমানেরা আদমসুমারিতে নিজের মাতৃভাষা বাংলা লেখালে অসমিয়ারা আর  অসমিয়া লেখালে বাঙালিরা কি  ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে গাল দিয়েই যাব,  না এর উর্ধে গিয়েও কিছু ভাবব?
          বছর কয় আগে ভাষার দাবিতে কামতাপুরিদের ডাকা এক বন্ধের সময় আমার এক বামপন্থী অসমিয়া সহকর্মীর সঙ্গে ওদের মাতৃভাষা কী, তাই  নিয়ে তর্ক হচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, ওদের ডাকা বন্ধের কোনো বৈধতা নেই। ওরা অসমিয়া ভাষাকে ভাঙ্গবার ষড়যন্ত্র করছে। আমি বলছিলাম, “ওদিকে আপনাদের পশ্চিম বাংলার কমরেডরা বলবেন ওরা ‘বাঙালি’, এদিকে আপনারা অসমের কমরেডরা বলবেন ওরা ‘অসমিয়া’। ওদিকে বুদ্ধদেব সরকার বলবে ওরা ‘বাঙালি’, এদিকে তরুণ গগৈ সরকার বলবে ওরা ‘অসমিয়া’। ওরা বেচারা যাবে কোনদিকে ?   ভালো হয় না কি ওরা কি সেটা ওদেরই ঠিক করতে দেয়া?” তিনি খুব চটে গেছিলেন। যুক্তিতে না পেরে বলছিলেন , “আপনি আসলে অসমিয়া স্বার্থ বোঝেন না। বোঝবেন কী করে? নিজেই তো বাঙালি উগ্রজাতিয়তাবাদ ছাড়তে পারেন নি।“ আমি বললাম, “সেটি কীরকম?”             উনি বললেন, “আপনি এখনো ‘অহমিয়া’ বলে যাচ্ছেন! বলুন অসমিয়া ,যেমন বলেন ‘অস’মিয়া’ ( oxomia)।” আমি যতই বল্‌ আমি এখনো অসমিয়া ‘স’ উচ্চারণ করতে শিখিনি,; উনি বলে গেলেন , “আপনি ইচ্ছে করেই বলছেন না! বলুন ‘অসমিয়া!’”
          ভাবছি আমার এই লেখা পড়বার পর আমার অসমিয়া কিম্বা বাঙালি বন্ধু, যারা ভাষার প্রশ্নে খুবই স্পর্শকাতর, জোর গলায় ধমকে দিয়ে বলবেন নাতো, ‘থামুন মশাই! চুপ করুন। একদম বাজে কথা বলবেন না! এক্কেবাৰে কথা নক’ব!” রবীন্দ্রনাথ যেভাবে অসমিয়া হৃদয় জয় করে নিলেন আমরা কি তার থেকে শিক্ষা নিয়ে  পরস্পরের হৃদয় জয় করতে  এক্কেবারেই অপারগ? অক্ষম?! 
(লিখে শেষ ঃ ১৪-০৫-১০)