আমার চেতনার রঙে রাঙানো এই খেলা ঘরে:

~0~0~! আপনাকে স্বাগতম !~0~0~

*******************************************************************************************************

Sunday, 19 February 2012

সুরমা নদীর গাংচিল হেমাঙ্গ বিশ্বাসের আকাশী গঙ্গা


(নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সংস্কৃতি সম্মেলনের তিনসুকিয়া শাখার মুখপত্র 'প্রতীতি'র জন্যে হেমাঙ্গ বিশ্বাস নিয়ে এক প্রাথমিক পাঠ)
                 
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।
    বীন্দ্রনাথের এটি জনপ্রিয় অনুকবিতা। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের পূর্বোত্তরের বাঙালিদের কথা ভেবে লেখেন নি তো? গেল বছর আমরা রবীন্দ্রসার্ধশতবর্ষ নিয়ে মাতলাম। অথচ কই, কেউ কবি অশোক বিজয় রাহার কথা বিশেষ মনে রাখলেন না তো! এবারে আমরা স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে মেতেছি, সব্বাই। প্রায় সমস্ত ছোট বড় শহরে তাঁকে নিয়ে উৎসব অনুষ্ঠান হচ্ছে আর হবে, কিন্তু কই, আমাদের ঘরের কাছের মানুষ যিনি আমাদের জন্যেই আজীবন পণ করেছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, জেলে গেছেন সেই হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে স্মরণ করবার দায় আমরা গুটি কয় ‘বুদ্ধিজীবি’র কাঁধে চাপিয়ে দিব্বি সুখে আছি! এবছর তাঁর শতবর্ষ! তাঁকে সেভাবে স্মরণ না করবার কারণটুকু কি? তিনি আমাদেরই লোক, ‘গাঁয়ের যোগী’ বলে! কলকাতাতে দীর্ঘদিন থাকলেও ঠিক সেখানকার মূলস্রোতের সিলমোহর তাঁর গায়ে পড়েনি বলে? এভাবে যে আমরা কোনদিনই স্বনির্ভর হয়ে, স্বমর্যাদাতে নিজের পায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না, সে যতই রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, নেতাজী সুভাষের উত্তরাধিকার আমাদের উপর বর্তাক -- এই সত্যটুকু নিয়ে কি খানিক অবসরেও ভাবব না?
soruo-white swan

         ‘হেমাঙ্গ বিশ্বাসঃ সাংস্কৃতিক চেতনাৰ অমল সুবাস’ নামে ফটিক বরার এক চটি বই রয়েছে। সেখানে তিনি এক জায়গাতে আক্ষেপ করে লিখেছেন, “আধুনিক অসমৰ আকাশৰ তিনিটা উজ্জ্বল তাৰকাই সংস্কৃতিৰ পোহৰেৰে জনজীৱন পোহৰাই আছে। ডিব্রুগড়ৰ তামোলবাৰী বাগিচাত ওপজা জ্যোতিপ্রসাদ, সুদূর সাগৰ পাৰৰ ঢাকাত ওপজা বিষ্ণুপ্রসাদ আৰু সুৰমা উপত্যকাৰ শ্রীহট্ট জিলাৰ মিৰাশী গাঁওত ওপজা হেমাঙ্গ বিশ্বাস---তিনিও আঢ্যবন্ত, আটন্তিয়াৰ পৰিয়ালত , সোণৰ নহলেও, ৰূপৰ চামুচ মুখত লৈ জনম লৈছিল। উত্তৰাধিকাৰ ৰূপে পোৱা সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আৰু প্রাচুর্য্য নেওচি বোকা-পাণী, ধুলি-বালি , জেং জোং ভৰা গাঁৱলীয়া বাটেৰে , বাহনি-ঝাৰণিৰ মাজেৰে অনাহাৰে অর্দ্ধ্বাহাৰে  পৰৰ কাৰণে কন্দা জীৱন কটাই গ’ল।...তিনিও দুখীয়া হালোৱা, হজুৱা, বণূৱা, তলমজলীয়াৰ ঘৰে ঘৰে গানৰ  অগণী সিঁচি সিঁচি গ’ল। তিনিও গাঁৱলীয়া বাটেৰে , ভৰা নৈৰ ঘাটেৰে বাট বুলি লোককৃষ্টি, কলা, লোকসঙ্গীতৰ সেণ চেকুঁৰা বুটলি, বুকুৰ মৌৰ তিওৱা প্রেমৰ অমিয়া মাধুৰী ঢালি সেণসেৰীয়া সংস্কৃতি সৃষ্টি কৰি গ’ল। জ্যোতিপ্রসাদ আৰু বিষ্ণু ৰাভাক অলপ হ’লেও মানুহে চিনি পায়। পিচে তৃতীয় জনক আজিৰ অসমৰ মানুহে, বিশেষকৈ আজিৰ পুৰুষে, চিনি নাপায় বা পোৱা সকলেও পাহৰি পেলাইছে।”  ফটিক বরাকে এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হেমাঙ্গ বিশ্বাস কোন?’ তার উত্তরে তিনি বইটির ভূমিকাতেই লিখেছেন, “...হেমাঙ্গ বিশ্বাস এনে এজন মানুহ যিজনে চিলেটৰ (শ্রীহট্ট) বঙালী হৈও অসমীয়া ভাষা, কৃষ্টি আৰু সংস্কৃতিৰ লোকায়ত ৰূপটো সংৰক্ষিত কৰিবলৈ আন বহুতৰ লগে ভাগে আৰু অকলেও প্রাণে পণে চেষ্টা কৰি গ’ল; যিজনে জ্যোতিপ্রসাদ, বিষ্ণু ৰাভা, ভূপেন হাজৰিকা, নৰহৰি বুঢ়াভকত, মঘাই ওঝা, ব্রজেন বৰুৱা, ৰমেন বৰুৱা, আব্দুল মালিক, দিলীপ শর্মা, কুলধৰ চলিহা, প্রফুল্ল চন্দ্র বৰুৱাকে আদি কৰি আন বহুতো প্রতিভাশালী আৰু একনিষ্ঠ লিখক –শিল্পীক গোটপিত খুৱাই একেলগে অসমৰ জনসংস্কৃতিৰ প্রচাৰ কৰি উন্নতি সাধনৰ বাবে কাম কৰিবলৈ এখন মঞ্চলৈ উলিয়াই আনিছিল...।” তথ্যগুলো দিলাম, এই ইঙ্গিত দিতে যে এতো বিশাল ব্যক্তিত্বের পুরো একটা পরিচয় তুলে দিতে আরেকটা বই লিখতেই হয়। আবার কোনো একটা দিক তুলে ধরাও সমস্যা, কেননা আমাদের এই শহরে অধিকাংশের  কাছে ব্যক্তি হেমাঙ্গের প্রাথমিক পরিচয়টুকু তুলে ধরাটাই এখনো এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমরা তাই , সেই কাজটাই করব ভাবছি।
হেমাঙ্গ জীবনীঃ   খোয়াই তাঁর ভালোবাসা
            হেমাঙ্গ বিশ্বাসের রাজনৈতিক প্রেরণার স্থল নিশ্চয়ই সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকতাবাদ, কিন্তু যেহেতু সারা জীবন বাংলা এবং অসমিয়াতেই কাজ করেছেন তাই যে মাটিতে তাঁর শেকড়কে পুষ্ট করেছে তার প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ পেয়েছিল ‘সীমান্ত প্রহরী’ কাব্যগ্রন্থের’ খোয়াই’ ( ১৯৫৩) কবিতার এই ক’টি পংক্তিতে, “‘তোমার কূলকে ভালবেসেই তো/কূল ছাড়া আমি/...ব্রহ্মপুত্র আমার বিস্ময়/পদ্মা আমার শ্রদ্ধা/গঙ্গা আমার ভক্তি/তুমি আমার ভালবাসা... খোয়াই।”।
          এই খোয়াই নদীর পাড়েই তখনকার অসমের , এখনকার বাংলাদেশের সিলেটের হবিগঞ্জের মিরাশি গ্রামে ১৯১২র ১৪ জানুয়ারি তারিখে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্ম। তাঁর বাবা হরকুমার বিশ্বাস ছোটখাটো হলেও জমিদার ছিলেন। তখনকার দিনের মেট্রিক পাশ হলেও বাংলা ইংরেজি সংস্কৃতে তাঁর বেশ চর্চা এবং জ্ঞান ছিল। ফলে পাঁচ গাঁয়ের ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের মধ্যেও তাঁর বেশ সম্মান ছিল। মা সরোজিনী বিশ্বাসের পরিবারটিও  সঙ্গীত কাব্য চর্চাতে সমৃদ্ধ ছিল। একদিকে সামন্তীয় শাসন শোষণ এবং অন্যদিকে গীতা বেদান্ত সঙ্গীতের সুর এবং স্বর যুগপৎ দেখেছেন ও শুনেছেন বাড়িতে। একদিকে হিন্দুত্বের বড়াই অন্যদিকে ঢুলি মালি নমশূদ্র মুসলমান প্রজাদের মুখের ভাত কেড়ে নিয়ে দূর-দূর-ছাই-ছাই তাঁকে ছেলেবেলা থেকেই বিরক্ত করে তুলেছিল। ফলে তিনি বাড়ি ছেড়ে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন খোয়াই নদীর পাড়ে পাড়ে। প্রজাদের পাড়ায় পাড়ায়। বাড়িতেই পদাবলী কির্তন , ওঝাপালা লেগেই থাকত ।সেগুলোতো আয়ত্বে এসছিলই, প্রজাদের মধ্যে ভিড়ে গিয়ে লোকগীত, লোক নৃত্য, যাত্রা।  বাউল গানেও মজে গেলেন। শুধু বাংলা নয় মণিপুরি নৃত্যগীতের সঙ্গেও তার পরিচয় ঘটেছিল গ্রামের বাড়িতে থাকতেই।  মিরাশি গ্রামের স্কুলেই নিয়েছিলেন প্রাথমিক স্কুলের পাঠ। সেদিনগুলোতেই স্কুলে যাবার আসবার পথে পথেই হয়েছিল তার এই লোকসংস্কৃতির আদি পাঠ। স্কুলের প্রধান শিক্ষক শিখিয়েছিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীত। পরে অবশ্যি মা তাঁকে শেখাতে শুরু করেন । মা শিখিয়েছেন প্রচুর মেয়েলি ব্রতকথার গান, শ্যামাসঙ্গীত এমন কি রজনীকান্তের গানও।
           ক্লাস সেভেনে পড়বার সময়ে বাবার হঠাৎ খেয়ালে তিনি চলে এলেন উজান অসমের ডিব্রুগড়ে। জর্জ হাইস্কুলে ভর্তি হলেন, থাকার ব্যবস্থা হলো বিখ্যাত ওম বাবার আশ্রম বা বিরাজ আশ্রমে। এখানে অসমিয়া গান কবিতা সাহিত্যের প্রতি তাঁর সমান আগ্রহে পেয়ে বসল। বন্ধু লোহিত কাকতি তাঁকে শেখালেন, প্রথম অসমিয়া গান,” কিয়োনো পাহৰা অসমীয়া হেৰা/ চিৰদিন তুমি আছিলা স্বাধীন/ ভাৰতৰ মাজে তোমাৰ জননী/ বীৰ প্রসৱিনী আছিল এদিন...।”  কিন্তু এখানে স্থায়ী হলেন না। ধর্মমতি বাবারই মনে হলো, এই আশ্রমে অধর্ম বেশ ঘাটি গেড়েছে। নিয়ে গিয়ে আবার ভর্তি করে দিলেন হবিগঞ্জের সরকারী হাইস্কুলে। সেখানেই ১৯৩০শে তিনি মেট্রিক পাশ করেন।
             হবিগঞ্জে তিনি যখন ছাত্র তখনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গোটা ভারত চঞ্চল হতে শুরু করেছে। হবিগঞ্জও তখন নীরব ছিল না। ভগৎ সিঙের মামলা, যতিন দাসের অনশনে মৃত্যু, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ইত্যাদি হেমাঙ্গের মনে প্রবল ছাপ ফেলে। নিজেও একটা দুটো করে মিছিলে পা মেলাতে শুরু করেন। ‘অনুশীলন সমিতি’তে যোগ দিয়ে কিছুদিন অনুশীলন করলেও, গান্ধির অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সেই ১৯৩০এই ১৪৪ ধারা ভাঙার অপরাধে হেমাঙ্গের হাজতবাস হলো। বয়স তাঁর তখন মাত্র সতের। হবিগঞ্জ, সিলেট হয়ে পরে তাঁকে নগাওঁ জেলে নিয়ে আসা হয়। এখানে তাঁর জেল সঙ্গী হিসেবে পেলেন পরে যিনি অসমের মুখ্যমন্ত্রী হবেন সেই বিমলাপ্রসাদ চালিহা এবং আরো অনেককে। বিমলাপ্রসাদের কাছেই জেলেই তিনি পার্বতী প্রসাদের ‘বনগীত’ এ পাঠ নিলেন। অসমীয়া ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আকর্ষণ আরো খানিকটা বাড়ল। ক’মাস পরে জেল থেকে ছাড়া পেলেন। হেমাঙ্গ গিয়ে সিলেট মুরারি চাঁদ কলেজে বিজ্ঞানে নাম লেখালেন। কিন্তু আইন অমান্য আন্দোলনে সময় গান্ধির আহ্বানে প্রকাশ্য জনসভাতে নিজে আবার কলেজ ছাড়ার কথাও ঘোষণা করলেন। ইতি পড়ল তাঁর প্রথাগত শিক্ষাতে। ইতিমধ্যে কংগ্রেসে নেতাজি সুভাষের প্রভাব বাড়ছে। নেতাজি সিলেটে এলে সেই সভা সংগঠনে হেমাঙ্গ অগ্রণী ভূমিকা নিলেন। সুভাষের প্রভাবেই হোক, আর বাড়ির কাছে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলার মতো ঘটনার জন্যেই হোক, কিম্বা রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ , গোর্কির ‘মাদার’এর বাংলা অনুবাদ কিম্বা বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ পড়ে ফেলবার জন্যেই হোক-- ধীরে ধীরে গান্ধির প্রতি তাঁর আকর্ষণ কমছিল। কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী ঝোঁককেও তিনি ভালো চোখে নিতে পারছিলেন না, কেননা বাড়িতে এই ঝোঁকের প্রতি তাঁর ছিল আবাল্য লড়াই। সুতরাং নিজে থেকেও কিছু সঙ্গীকে নিয়ে এক সময় তিনি কংগ্রেসের স্বীকৃত পথের বাইরে গিয়ে কিছু রাজনৈতিক প্রচারে মন দিলেন। ফলে আবার গ্রেপ্তার। এবারে আড়াই বছর। আবারো একই জেল বদলের অনুক্রমে নগাওঁ এলেন, পরে গুয়াহাটিও গেলেন। এই যাত্রাতেই তিনি হেলে বসে শুনলেন এবং শিখলেন জ্যোতিপ্রসাদের ‘গছে গছে পাতি দিলে ফুলৰে শৰাই।’
এদিকে জেলেই তাঁর শরীরে যক্ষা বাসা বাঁধে। তখন যক্ষা মানে মারণ রোগ! উপায়ুক্ত মোলান সাহেব রাজনীতি করবেন না বলে দাসখত লিখে দেবার শর্তে মুক্তি দিতে রাজি হলেন। হেমাঙ্গ থুড়িই দেবেন! সরকার নিজেই পরে উপায় না দেখে মুক্তি দিল। শিলঙে তখন ডাঃ বিধান রায় চিকিৎসা করতেন। তাঁর কাছে গেলেন। তিনি তাঁকে যাদব পুরে নিজের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে পাঠালেন। সেখানেই কমিউনিষ্ট নেতা অনিলেন্দ্র রায়ের কাছে তাঁর মার্ক্সবাদে দীক্ষা। সেখানেই সিলেটের দুই কমিউনিষ্ট নেতা দিগিন দাসগুপ্ত এবং চঞ্চল শর্মার সঙ্গে চেনাপরিচয় হয়। সুতরাং সেই হাসপাতাল থেকেই তিনি সিলেট পার্টির প্রতি সহমর্মীতা প্রকাশ করেন। এবং সুস্থ হয়ে সিলেট যখন ফেরেন ততদিনে তিনি পুরো দস্তুর কমিউনিষ্ট।
           তখনই তাঁর গ্রামে একটি ঘটনা ঘটে যাতে কেবল মানচিত্রের স্বাধীনতা নয় খোলনলচে পালটানো নিয়ে তাঁর প্রত্যয়দৃঢ়তার পরিচয় মেলে।  তাঁদের গ্রামে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের উদ্যোগে একটি হিন্দু মন্দির গড়ে তোলা হবে। তাতে কোনো অসুবিধে ছিল না। কিন্তু সেখানে অনেকেই এলেন যারা হিন্দু ঐক্য নিয়ে প্রবল ভাষণ দিচ্ছিলেন। সেই সভার সভাপতি ছিলেন হেমাঙ্গের  বাবা হরকুমার বিশ্বাস। বাবার উপস্থিতিতেই হেমাঙ্গ সেখানে দাঁড়িয়ে বললেন,” হিন্দু ঐক্য নয়, চাই শোষিত মানুষের ঐক্য...মানুসের সেবা, বিশেষতঃ, শোষিত জনগণের সেবা আমার ধর্ম।” এরকম কিছু লড়াই পরিবারের ভেতরেই করার পরিণাম যা হবার ছিল তাই হয়েছিল। ছেলে বলে রেয়াত করেন নি বাবা। ১৯৪২এ বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন হেমাঙ্গ।
         সে সময় একবার হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচঙে  ম্যালেরিয়া রোগ মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এতে হাজার হাজার লোকের মৃত্যু ঘটে। এ সময় বানিয়াচঙে মানুষের সেবাতে  ছুটে গিয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। সে সময়ই গান লিখেছিলেন, 'বাইন্যাচঙে প্রাণ বিদরী ম্যালেরিয়া মহামারী/হাজার হাজার নর-নারী মরছে অসহায়,/শান্তি ভরা সুখের দেহ/শূন্য আজি নাইরে কেহ/মৃত সন্তান বুকে লইয়া কান্দে বাপ-মায়...'
ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে, ফ্যাসীবাদের বিপদ ঘণ্টাও আতঙ্কিত করে তুলেছে বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষকে। স্পেনের গৃহযুদ্ধে কডওয়েল , লোরকার মতো কবি বুদ্ধিজীবিদের মৃত্যুও লেখক শিল্পীদের আতঙ্কিত করতে শুরু করে।  রম্যাঁ রল্যাঁ, গোর্কি, আইনষ্টাইন, আদ্রেঁ জিদ প্রমুখদের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক স্তরে গড়ে উঠে ‘ফ্যাসীবাদ বিরোধী লেখক শিল্পী সঙ্ঘ’। এর সঙ্গে বিশ্ব জুড়েই কমিউনিষ্টরা ছিলেন বটে, কিন্তু কমিউনিষ্টরা ছাড়াও অনেকে এর সঙ্গে জুড়েছিলেন,  ফ্যাসীবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা যারাই আক্রান্ত বোধ করছিলেন সেই সমস্ত লেখক শিল্পীরা। যেমন ভারতে এর সঙ্গে জুড়েছিলেন জহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথের, পণ্ডিত রবি শঙ্কর, পৃথ্বিরাজ কাপুর , বুদ্ধদেব বসুদের মতো ব্যক্তিত্বও । ১৯৩৬এ লক্ষ্ণৌতে  এঁদের সবার উদ্যোগে এবং মুন্সি প্রেমচান্দের পৌরহিত্যে আয়োজিত হয় এর প্রথম অধিবেশন। ভারতে এর নাম হয় ‘সারা ভারত প্রগতিশীল লেখক শিল্পী সংঘ’ । এই সংগঠন দীর্ঘস্থায়ী না হলেও  শিল্প সাহিত্যের অঙ্গনে ‘প্রগতিশীল’ শব্দটি এই সংঠনের নামের থেকেই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। পরের বছর রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে এর কলকাতা বা বঙ্গীয় শাখা গড়ে উঠে। ১৩৩৮এ কলকাতাতে সর্বভারতীয় সংগঠনটির দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
          যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি, জাপানের ভারতের দোরগড়াতে এসে ব্রহ্মদেশ আক্রমণ, ৪২এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এই সংগঠনে কিছু মতভেদ এবং বিশৃঙ্খলাও দেখা দেয়। কমিউনিষ্ট পার্টি তখন সাংস্কৃতিক কাজে কর্মে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৩এ পার্টির মুম্বাই কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গড়ে উঠে ভারতীয় গণ নাট্য সংঘ , যেটি পরে আই পি টি এ নামে বিখ্যাত হয়। কায়ফি আজমী,  বলরাজ সাহনী, শংকর, শৈলেন্দ্র, পৃথ্বিরাজ কাপুরেরা উদ্যোগ নিয়ে সংগঠনটি গড়তে তোলেন।  বাংলার প্রাদেশিক কমিটিতে মনোনীত হন সুনীল চ্যাটার্জী, দিলীপ রায়, সুধী প্রধান, বিজন ভট্টাচার্য,দেবব্রত বিশ্বাস , শম্ভু মিত্র, সুজাতা মুখার্জী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, স্নেহাংশু আচার্য, বিষ্ণু দে’র মতো ব্যক্তিত্ব।  হেমাঙ্গ বিশ্বাস এর আগেই ১৯৪২এ তাঁর শিল্পীদল নিয়ে এসে কলকাতাতে অনুষ্ঠান করে গেছিলেন। সুতরাং তিনিও রইলেন প্রাদেশিক সংগঠনে। পূর্বোত্তরের আর যে খ্যাতনামা ব্যক্তিটি সংগঠনের শুরু থেকেই এর সঙ্গে ছিলেন তিনি ত্রিপুরার সচীন দেব বর্মণ।
হেমাঙ্গ জীবনীঃ   .ব্রহ্মপুত্র তাঁর  বিস্ময়
            আমরা গণনাট্যের নাটক ‘নবান্ন’ কিম্বা বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্রদের নিয়ে কিছু লিখছি না এই ভেবে যে এগুলো সবাই এক আধটু জানেন এবং এখানে এগুলো হবে অপ্রাসঙ্গিক। পার্টি এবং কৃষক সভার কাজ করতে করতেই পার্টির সাংস্কৃতিক কাজে কর্মের নেতৃত্বে চলে এসছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস।  যেমন ১৯৮৮ এ এখনকার কাছাড়ের কাটাখালে    বসেছিল কৃষক সভার জেলা সম্মেলন। প্রকাশ্য অধিবশনের সভাপতি আরেক শিল্পী প্রতিভা ইরাবৎ সিং । সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার দায় হেমাঙ্গের কাঁধে। ১৯৪৫এ নেত্রকোনাতে অনুষ্ঠিত কৃষক সভার সর্বভারতীয় সম্মেলনে সেই ইরাবত সিং হেমাঙ্গের ‘কাস্তেটারে দিও জোরে শান’কে মনিপুরি নৃতিনাট্যে রূপান্তরিত এবং অনুবাদ করে পরিবেশন করেন। তেভাগা আন্দোলনের সময়ের বার্মা সীমান্তে শহীদের মৃত্যু বরণ করেন ইরাবৎ সিং।  এই ইরাবৎ সিংকে হেমাঙ্গ উৎসর্গ করে লিখেছিলেন ‘সীমান্ত প্রহরী’ নামে বিখ্যাত কবিতা এবং একই নামের পুরো একখানা বই। প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৬১তে।   এই গণনাট্যের আদর্শে গড়ে ১৯৪৫এ তুলেছিলেন ‘সুরমা ভ্যালি কালচারাল স্কোয়াড’। সেটি নিয়ে তিনি শিলচর, শিলং , গুয়াহাটি হয়ে অসমের প্রধান প্রধান সমস্ত শহরে ভ্রমণ করেন। অভিনব ছিল সে পরিকল্পনা। “মণিপুরি বীর টিকেন্দ্রজিৎ, খাসিয়া জাতীয় বীর তিরোৎ সিং, জয়ন্তীয়া বীর কিয়াং নাবা, অসমের মণীরাম দেওয়ান, কুশল কোঁয়র, কনকলতাকে নিয়ে ব্যালে, কার্টুন, ছায়ানৃত্য, গণসংগীতে প্রস্তুত করেছিলেন  অনবদ্য আলেখ্যে। যার আবেদন সহজেই তখন পৌঁছুতে পেরেছিল মানুষের মনে।   সর্বত্র বিপুল সাড়া এবং সমর্থণ পেয়ে এরই শাখা খুলে খুলে  এগুতে থাকেন। সে যাত্রাতেও তিনি দ্বিতীয়বারের জন্যে ডিব্রুগড়ে আসেন এবং সেখানে গোবিন্দ শর্মাকে সভাপতি ও নগেন কাকতিকে সম্পাদক করে ডিব্রুগড় শাখাও গঠন করেন। ১৯৪৬এর শুরুতে তেজপুরে তাঁদের অনুষ্ঠানের কথা শুনে  অভিভূত হলেন জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা। অসুস্থতার জন্যে হাজির হতে পারেন নি। ডাক্তারে নির্দেশ উপেক্ষা করে ডেকে পাঠান হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে । দু’জনার দীর্ঘ আলাপ হলো জ্যোতিপ্রসাদের বাড়িতে । জ্যোতিপ্রসাদ যেন বহুদিন ধরে  সন্ধান করে ফেরা বন্ধুকে কাছে পেলেন। তেজপুরে তাঁরা সাদ্রিভাষাতেও চা বাগানের শ্রমিকদের সংগ্রামের উপর ভিত্তি করে একখানা নাটক করেছিলেন, ‘বদলা লেনা’। জ্যোতিপ্রসাদের সঙ্গে সেই শুরু হওয়া বন্ধুত্বকে আমৃত্যু সম্মান জানিয়েছিলেন হেমাঙ্গ। নিজের দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ ‘ কুল খুড়ার চোতাল’ তিনি উৎসর্গ করেছিলেন তাঁকে।
              তাঁর এই ভ্রমণের সফলতার উপর ভিত্তি করেই ১৯৪৭এ শিলচরে বসে ভারতীয় গণ নাট্য সংঘের প্রথম প্রাদেশিক সম্মেলন। জ্যোতিপ্রসাদ শারীরিক অসুস্থতার জন্যে সেই সম্মেলন উপস্থিত থাকতে পারেন নি , কিন্তু শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে সভাপতি করে সঙ্ঘের প্রাদেশিক সমিতি গঠন করা হয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস হলেন সম্পাদক আর ডিব্রুগড়ের নগেন কাকতি সহ –সম্পাদক। এই সম্মেলন অবিভক্ত অসমের সমস্ত জাতি-জনজাতির সাংস্কৃতিক সমানাধিকারের আর সমমর্যাদার আকাঙ্খাকে সামনে তুলে ধরে। বড় জাতিগুলোর আধিপত্যকামী এবং জনজাতিদের বিচ্ছিন্নতার মানসিকতা –দুইএরই বিরোধীতা করা হয় এই সম্মেলনে। শিলচর সম্মেলনেই বডো শিল্পীদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নীলেশ্বর ব্রহ্ম, রবীন বসুমাতারি। যোরহাট থেকে যাওয়া মিশিং শিল্পীদলের নেতৃত্বে ছিলেন লক্ষ্মীনাথ দলে। মণিপুরি দলের নেতৃত্বে ছিলেন কামিনী সিংহ প্রমুখ। জ্যোতিপ্রসাদ এবং হেমাঙ্গ বিশ্বাসের নেতৃত্বে সমগ্র অসমে গণনাট্য শক্তিশালী সংগঠন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সে এতোটাই যে শাসক শ্রেণি আতঙ্কিত হয়ে ১৯৪৯এর জুলাই মাসে ডিব্রুগড়ের নালিয়াপুলে যে দ্বিতীয় প্রাদেশিক সম্মেলন হয়েছিল তার শেষ দিনের শান্তি সমাবেশে এসে পুলিশ বিনা প্ররোচনাতে গুলি চালায়। সে পুলিশ কিন্তু স্বাধীন দেশের স্বাধীন পুলিশ! সাংস্কৃতিক সম্মেলনে ভয়ার্ত প্রশাসন। গুলিতে বীনা বরা এবং ষোড়শী নাগ নামে দুজন মহিলা সাংস্কৃতিক কর্মী শহীদ হন। স্বাভাবিক ভাবেই জ্যোতিপ্রসাদ এই প্রতিবাদে সংবাদপত্রে যে বিবৃতি দিলেন কোনো কাগজ সেটি ছাপবার সৌজন্যও দেখায় নি।পরে তিনি ‘নালিয়াপুলের বিপদ সংকেত’ নাম দিয়ে প্রচার পত্র হিসেবে বিলি করেন। অসমের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে এই প্রচার পত্রের শক্তি এতোটাই যে জ্যোতিপ্রসাদের রচনাবলীর প্রথম সংস্করণেও প্রকাশক/সম্পাদকেরা এটিকে ঠাই দিতে সাহস করেন নি। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের নজরে পড়তে তিনি এর বিরোধিতা করেন। পরে আরো অনেকে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। চাপে পড়ে দ্বিতীয় সংস্করণে একে ঠাই দেয়া হয়।
            ইতিমধ্যে বিষ্ণু রাভাও এসে গণনাট্যে এসে যোগ দিলেন। ১৯৪৮এ খোয়াঙে অনুষ্ঠিত জনজাতি ছাত্র সম্মেলনে হাজির হয়ে গণনাট্য  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে  জ্যোতিপ্রসাদের পরামর্শে। বিষ্ণু রাভা ছিলেন সেই সম্মেলনের সাংস্কৃতিক শাখার সম্পাদক। ১৯৫৫তে গুয়াহাটির জাজেস ময়দানে অসম গননাট্য সঙ্ঘের তৃতীয় অধিবেশনের আয়োজনে বিষ্ণু রাভা, ভূপেন হাজারিকা মূল উদ্যোগ নিয়েছিলেন।  ঔপন্যাসিক হাওয়ার্ড ফাস্ট, এরেন বুর্গ, টিখনভের মতো ব্যক্তিত্বরা সেই সম্মেলনে শুভেচ্ছাবাণী পাঠিয়েছিলেন। বলরাজ সাহানী, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুমিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখ এসছিলেন সর্বভারতীয় সংগঠনের পর্যবেক্ষক হয়ে। মেঘালয়, মণিপুর, কাছাড়, গোয়াল পাড়ার মতো প্রত্যন্ত জেলাগুলো থেকে এসছিলেন প্রতিনিধিরা।  মঘাই ওঝা সেই সম্মেলনের ঢোল বাজিয়ে প্রথম বারের জন্যে গোট সবাইকে মুগ্ধ করেন। এর পরে তিনি বহুবার ভারতের বহু জায়গাতে গিয়ে ঢোলবাদনের জন্যে ডাক পেয়েছিলেন, গিয়েও ছিলেন। গোটা দেশ মোহিত হয়েছিল অসমের ঢোলের তানে।
         গণনাট্যেরে স্বর্ণযুগে ১৯৫৫র গুয়াহাটি সম্মেলনই ছিল শেষ। ১৯৫১তে জ্যোতিপ্রসাদের অকাল প্রয়াণ হলো, হেমাঙ্গও সুস্থ রইলেন না তেমন ১৯৫৫র সম্মেলনের পর। তাছাড়া  পার্টির ভেতরে বাইরেও নানা রাজনৈতিক বিতর্কে তখন  পুরোনো বন্ধুরা অনেকেই আলাদা হতে শুরু করেন গোটা দেশেই। সে প্রসঙ্গে বিস্তৃত আমরা এখানে যাব না। কিন্তু তাই বলে গণনাট্যরে প্রয়াস ব্যর্থ হবার ছিল না, হয় নি। সে এক দিশা নির্দেশের কাজ করেছিল। সেই দিশাতে পরেও অজস্র শিল্পী মাঝে মধ্যেই গণনাট্যের পতাকা তলায় বা তার বাইরে নিজেদের মতো সংগঠন করে কাজ করে গেছেন এবং যাচ্ছেন । বাংলা অসমিয়া বডো নানান ভাষা সম্প্রদায়ের মধ্যে।
           হেমাঙ্গ বিশ্বাসের শরীরের সেই পুরোনো অসুখ মাঝে মধ্যেই চাগিয়ে উঠত। চিকিৎসার জন্যে তাঁকে চিনে পাঠানো হলো ১৯৫৮তে। চিনে গিয়েও অবসরে কাল কাটাবার মানুষতো আর তিনি নন, বিপ্লবোত্তর চিনকে দেখে নেবার বুঝে নেবার সুযোগ ছাড়বেন কেন? সেই অভিজ্ঞতাগুলো লিখে পাঠালেন ‘নতুন অসমীয়া’ কাগজে অসমিয়াতে। সম্পাদক তিলক হাজারিকা সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে ছেপে গেলেন। পরে সেগুলোই সংকলিত করে প্রকাশ পায় ‘চীন চাই আহিলোঁ।’ পরে এর বাংলা সংস্করণও প্রকাশিত হয়। অসমিয়া এবং বাংলা সাহিত্যে এই ভ্রমণ কাহিনির সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম!  বিপ্লবোত্তর চিন সম্পর্কে এটি কেবল অসমিয়াতে নয়, যেকোনো ভারতীয় ভাষাতে প্রথম বই।
   
        চিন থেকে ফিরে আসার ক’দিন পরেই ১৯৬০ এর ভাষা আন্দোলন এবং পাশাপাশি ভাষা সংঘর্ষ শুরু হয়। সেই সময় তিনি ভূপেন হাজারিকাকে সঙ্গে নিয়ে নানা ভাষা সম্প্রদায় থেকে শিল্পী নিয়ে শিলং থেকে যাত্রা শুরু করেন। সেই সুরমা ভ্যালী কালচারাল স্কোয়াডের দিনগুলোতে যেন ফিরে গেলেন। কৌশলগত অবস্থান থেকে সেবারে গণনাট্যের নাম ব্যবহৃত হলো না। ‘Let us meet cultural troupe’ ছিল নতুন স্কোয়াডের নাম।  কিন্তু ইতিমধ্যে ব্রহ্মপুত্রের জল অনেক দূর বয়ে গেছে , বিদেশি সাম্রায্যবাদীদের জায়গাতে ভাতৃঘাতি রক্তপাতে উষ্ণ এবং লাল হচ্ছে জল এবং উপত্যকা। সুতরাং এবারের অভিযান ছিল অনেক বেশি সাহসী এবং ঝুঁকি পূর্ণ। কিন্তু বিখ্যাত ‘হারাধন –রংমনে’র গীতি আলেখ্য সহ আরো প্রচুর গান, কবিতা, নাটক নিয়ে দু’ই তাঁরা যেন সংগ্রামী ঐক্যের যুদ্ধ জয় করলেন। বাংলা অসমিয়াতে  ভূপেন হাজারিকার সাগর সঙ্গমে গানটিও ছিল সেই অভিযানের অন্যতম জনপ্রিয় গান।  যে দিকে গেলেন, গানের সুরেই দাঙ্গাবাজদের প্রতিহত করতে করতেই এগুলেন তাঁরা।
হেমাঙ্গ জীবনীঃ   গঙ্গা তাঁর ভক্তি
          হেমাঙ্গ চিনে যাবার আগে থেকেই স্তালিনের মৃত্যুর পর থেকে চিন-সোভিয়েত লাইনের বিতর্কে আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলন দু’ভাগে বিভাজিত হতে শুরু করে। ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদের পথে ফিরে যাবার অভিযোগ উঠছিল। এমন কি চেকোশ্লাভাকিয়া আক্রমণের মধ্যি দিয়ে সোভিয়েতের সাম্রায্যবাদী চরিত্র স্পষ্ট হয়ে বেরুচ্ছিল বলে সাম্যবাদীদের থেকেই অভিযোগ উঠতে শুরু করেছিল। ভারতেও তার অভিঘাত এসে পড়তে শুরু করেছিল, যদিও স্পষ্ট হতে সময় নিয়েছিল। আমরা জানি চিন –সোভিয়েত লাইনের বিতর্কে কমিউনিষ্ট পার্টি প্রথমে ১৯৬৪তে এবং পরে ১৯৬৭তে ত্রিধা বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯৬৮তে গড়ে উঠা সিপিএম আসলে মধ্যপন্থা একটা নিয়েছিল, তাই তাকেও ভাঙ্গনের মুখে পড়তে হয় ১৯৬৭তে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে দুটো বিদেশী দেশের তর্কে ভারতের দলগুলোর এতো উৎসাহ কেন? আর তাতে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো অসমের এই ব্যক্তিটির কী সম্পর্ক? সংক্ষেপে বলতে পারি, পুঁজিবাদ একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা । পুঁজির স্বার্থে শ্রমকে শোষনের ব্যবস্থা। সুতরাং তার বিরুদ্ধে লড়াইটাও শ্রমিকদের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। সোভিয়েতের সমর্থণে দাঁড়াবার মানে ছিল পুঁজিবাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান , আর চিনের সমর্থণে দাঁড়াবার মানে ছিল বিপ্লবের পতাকাকে তুলে ধরা। তাছাড়া চিন ভারতের মতোই ছিল এক সামন্তীয় কৃষি নির্ভর দেশ। সে দেশে বিপ্লব হয়ে গেছে ক’বছর আগে, এটি ভারতের মতো যেকোনো আধা সামন্তবাদী দেশের কাছে আলাদা এক প্রেরণা এবং শিক্ষার স্থল। পুঁজিবাদের শিক্ষা যদি বিলেতি মার্কিনিদের থেকে নেয়া যেতে পারে তবে তার বিরুদ্ধে লড়াইর দীক্ষা সোভিয়েত-চিনের মতো বিদেশের থেকে নেয়াটা দোষের হয় কেবল কুযুক্তির জোরে।
             সে যাই হোক, হেমাঙ্গের জীবিকার একটা দরকার ছিল। ১৯৫৯তে তিনি পার্টি কর্মী রুনু দত্তকে বিয়ে করেন। পরের বছর তাঁর পুত্র মৈনাকের জন্ম। ১৯৬১তে তিনি কলকাতার রুশ দূতাবাসের বার্তা বিভাগে অসম শাখার দায়িত্বের   চাকরি পেয়ে চলে যান। তাই বলে, ১৯৬৪তে তিনি সিপি আই-র সোভিয়েত লাইনে রইলেন না। এমন কি ১৯৬৭তে সিপিএমের সুবিধেবাদেও না, সিপিএম যখন গণ আন্দোলনের পথ ছেড়ে পশ্চিম বাংলাতে  রাইটার্স দখলের পথ করছে হেমাঙ্গের তখন সগর্ব উচ্চারণ, “মাথা নিচু করে রাইটার্সে যাব না!” তিনি একাই রইলেন।  নকশাল বাড়ির বিদ্রোহকেও তিনি স্বাগত জানিয়েছিলেন। ফলে  সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ যখন তাঁকে চিন সমর্থণ ত্যাগ করবার চাপ দিল, তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে  ‘ডাঃ দ্বারকানাথ কোটনিস স্মৃতিরক্ষা সমিতি’র হয়ে দ্বিতীয়বারের জন্যে চিনে যান। ডাঃ কোটনিস হচ্ছেন সেই মহান ভারতীয় যাকে জাপান চিন আক্রমণ করলে চিনা কম্যুনিষ্ট পার্টির অনুরোধে চিনা বিপ্লবীদের চিকিৎসার জন্যে পাঠান ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র বসু। ১৯৩৮এ তিনি সদলবলে সেখানে যান, এবং বিপ্লবীদের সঙ্গে মহান চিনা লং মার্চে যোগ দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে দারুণ অসুখে পড়ে ১৯৪২এর ৯ ডিসেম্বরে তিনি চিনেই মারা যান। নানকান গ্রামে বিপ্লবী শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। শুনা গেছে যে বিপ্লবীদের সেবাতে এই মহান ডাক্তার কখনোবা টানা বাহাত্তর ঘন্টা কাজ করে গেছেন। সেই পরিশ্রমই পরে তাঁর প্রাণ নেয়। সেই মহান বিপ্লবী ডাক্তারকে চিন কোনদিন ভুলেনি। সেই স্মরণীয় ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানাতেই আরো অনেকের সঙ্গে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের এই দ্বিতীয়বার চিন যাত্রা। এবারেও তাঁর ভ্রমণ কাহিনি লিখে বের করেন, ‘আকৌ চিন চাই আহিলো’। বইটি ১৯৭৭এ ছেপে বেরোয়। এবারের বইতে ষাটের              দশকের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়কার মতাদর্শগত বিতর্কের  আভাস তুলে ধরবার প্রয়াস নেন। এই নিয়েও ভারতীয় কোনো ভাষাতে এটিই প্রথম বই। অসমিয়াতেও , বাংলাতেও।  ১৯৮০তেও তৃতীয়বারের জন্যে তিনি চিন গেছিলেন। সেবারে চিন সরকারের আমন্ত্রণে।
হেমাঙ্গ জীবনীঃ   পদ্মা তাঁর  শ্রদ্ধা
           ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর ‘মাস সিঙ্গার্সে’র সঙ্গী রত্না সরকার, প্রীতি চৌধুরী, মিঠুন মুখার্জি, টুঙ্কু সরকার ও দীপক পাত্রকে সঙ্গে  নিয়ে তিনি গেছিলেন বাংলাদেশে । পুরোনো সংগ্রামী সাথি নজরুল ইসলাম খানের গোপীবাগের বাড়িতে উঠেছিলেন। তাঁর সে ভ্রমণের উদ্যোক্তাদের মধ্যে সেদেশের প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্বিক  বদরুদ্দীন উমরও ছিলেন । ছিলেন ফকির আলমগীরের মতো শিল্পীরাও। সেবারে ঢাকাতে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে গান গেয়ে গেয়ে যোগ দিয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে   ঢাকার ২৭টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জোট  'গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফ্রন্ট' হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে সংবর্ধনা দিয়েছিল । দেশ ছেড়ে আসার পর এই প্রথম এবং শেষবারের জন্যে তিনি দেখতে গিয়েছিলেন তার পৈতৃক ভিটে হবিগঞ্জের মিরাশি গ্রাম।  জয়দেবপুরে  গিয়েছিলেন কবি গোবিন্দ দাস ও কবিয়ালগুরু হরি আচার্যের ভিটে দেখতে। তিনি সেদিন গোবিন্দ দাসের একটি গান সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন ফকির আলমগীরকে , "স্বদেশ স্বদেশ করছ যারে, এদেশ তোমার নয়।”  সত্যিতো যে দেশকে বাল্যে নিজের বলে জেনেছিলেন, সেই দেশই তাঁর রইল না! তাঁর একখানা গান রয়েছে,” হবিগঞ্জের জালালি কইতর, সুনাম গঞ্জের কুড়া, সুরমানদীর গাংচিল আমি শূণ্যে দিলাম উড়া/শূণ্যে দিলাম উড়ারে ভাই যাইতে চান্দের চর/ডানা ভাইঙ্গা পড়লাম আমি কইলকাতার উপর/তোমরা আমায় চিননি/তোমরা আমায় চিননি।” তাঁকে চেনাতো সত্যি আমাদের এখনো অনেক বাকি। কলকাতা প্রবাস তাঁকে যে সুখি করতে পারেনি এওতো এই গানে বোঝাই যায়। কলকাতা সত্যি তাঁকে আজও তেমন চেনেও নি, জীবনের শেষ দিকে বোধহয় দুটো মাত্র কেসেট বেরিয়েছিল এই মহান শিল্পীর। নিজে তিনি কখনোই সেরকম প্রকাশক খোঁজে ফেরেনও নি। হবিগঞ্জের মিরাশি গ্রাম, সুরমা নদী নিশ্চয় তাঁর স্মৃতিকে ভারাতুর করে তুলত।  কিন্তু ভুলে থাকতে পারতেন না ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে তাঁর জীবনের সবচে’ উজ্জ্বল দিনগুলোকেও । সেতো তাঁর কলকাতার বাড়ির নামেই প্রকাশ-- ‘জিরণি’। আর একমাত্র কন্যার নাম রেখেছিলেন –‘রঙিলী’।
             অসমের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আমৃত্যু কখনোই বিচ্ছিন্ন হয় নি। প্রায়ই তিনি এসছেন এটা ওটা অনুষ্ঠানের বা ব্যক্তিগত উপলক্ষে। শেষ দিকে তিনি দলের বাইরে গিয়ে ‘মাস সিঙ্গার্স’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। সেই সংগঠন নিয়ে দেশে বিদেশে গেছেন, এসছেন অসমেও বহুবার।  মঘাই ওঝার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দাঁড়িয়েছিল নিতান্তই ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক। আজীবন তাঁর এবং তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে বিপদে সম্পদে।  মঘাই ওঝার মৃত্যুর পরেও নিজের বহু অর্থ কষ্ট সত্বেও নিয়মিত অর্থ সাহায্য পাঠাতেন। ‘অসম আৰু বঙ্গৰ লোক সঙ্গীত সমীক্ষা’ বইটি তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন। লিখেছিলেন, মঘাই তাঁর শিল্পী জীবনের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার।  আশির অসম আন্দোলনের দিনগুলোতেও তিনি ছুটে এসছিলেন ষাটের দিনগুলোর মতো সাংস্কৃতিক বাহিনী নিয়ে বেরুবেন বলে। কিন্তু ভূপেন হাজারিকা সেবারে সঙ্গ দিলেন না। গুয়াহাটিতে এক ট্যুরিষ্ট লজে এসে উঠেছিলেন। সেখানে যে গুটিকয় গুনমুগ্ধ এবং পুরোনো বন্ধু দেখা করতে গেছিলেন তাদের তিনি বলেছিলেন, “ যি দেখিছো অসমত যেন এখনো নিরপেক্ষ ঘৰ নাই।...ইয়ালৈ আহি দেখিছো অস্তিত্বৰ চেতনা বৰ দলৈ সোমাইছে। পৰিস্থিতি কেতিয়াও এনে হোৱা নাই। ই ভাষিক সমস্যা নহয়...মিলনৰ প্রক্রিয়া কিন্তু থানবান হৈ গৈছে। সাংস্কৃতিক ভেটি কঁপি উঠিছে, সংহতির মূলতে ভাবুকিয়ে দেখা দিছে।” ( তিলক হাজারিকা সম্পাদিত ‘বিপ্লবী গণ শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস’ বই থেকে ফটিক বরার পূর্বোক্ত গ্রন্থে ব্যবহৃত উদ্ধৃতি)
             ১৯৮২তে ‘দিশারি’ সাংস্কৃতিক সংস্থার আমন্ত্রণে তিনি গেছিলেন শিলচরে। দিশারি তখন ‘মৈত্রী উৎসব’ নামে তিনদিনের এক বার্ষিক অনুষ্ঠান নিয়মিত করত। এই ‘দিশারি’র প্রতিষ্ঠাতা অনন্ত দেবও ছিলেন আসলে পুরোনো গণনাট্য আন্দোলনের কর্মী। সেই অনুষ্ঠানে হেমাঙ্গ ছাড়াও আমন্ত্রিত হয়ে গুয়াহাটি থেকে গেছিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী দিলীপ শর্মা, গোয়াল পাড়া থেকে লোক সঙ্গীত শিল্পী প্রতিমা পাণ্ডে বরুয়া। আলোচনা চক্রে যোগ দিতে গেছিলেন অমলেন্দু গুহ। বহুদিন পরে পুরোনো বন্ধুরা সমবেত হয়েছিলেন আবারো। স্বাভাবিক ভাবেই এক আলাদা আবেশময় পরিবেশ তৈরি হয়েছিল গোটা শহরের সাংস্কৃতিক মহলে। সেকালের ‘দিশারি’র কর্মী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী শুভপ্রসাদ নন্দীমজুমদার ঠিকই লিখেছেন,  এর পরে যেন আবারো নতুন করে তাঁর ‘মাস সিঙ্গার্সে’র আদলে গণ সঙ্গীতের দল করবার ধুম উঠে গেল শহরে।   বর্তমান লেখকেও তখন জড়িয়েছিলেন ‘শান্তসেনা’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে। যাদের গণসঙ্গীতের নিজস্ব দল ছিল। সেই সংগঠনের বার্ষিক অনুষ্ঠানে একক হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান ‘জন হেনরি’র তালে তালে একক নৃত্য অনুশীলন এবং পরিবেশনের দুর্বল হলেও একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সে ১৯৮৩র কথা।
            ‘মাটি আৰু মানুহ’ নামে অসমের অন্য এক সাংস্কৃতিক  কিংবদন্তি লোকনাথ গোস্বামীর নেয়া হেমাঙ্গের এক সাক্ষাৎকার রয়েছে। লোকনাথ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন ১৯৮৬র নভেম্বরে । তখনো তিনি জানিয়েছিলেন শীত পেরুলেই তিনি অসমে আসবেন আবার। কিন্তু শরীরের  অসুস্থতা ক্রমে বেড়েই গেল। ঠিক পরের বছর ১৯৮৭র ২২ নভেম্বর হেমাঙ্গ থেমে গেলেন।  কিন্তু অসমের বাঙালি কিম্বা অসমিয়া হয়ে উঠার অর্থ যে অন্তর থেকে অর্জিত প্রতিবেশি চেতনা এই যে দীক্ষা এবং শিক্ষা তিনি তাঁর গোটা জীবন দিয়ে  গেছেন তা এতো সহজে হারিয়ে যাবার নয়।
          সিলেট থেকে  যাত্রা শুরু করে জীবনের এক উজ্জ্বল অধ্যায় অসমে যাপন করলেও বাংলা এবং অসমীয়াতে ‘গণ সঙ্গীতে’র ধারাটি প্রতিষ্ঠা পায় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের দৃঢ় সাংগঠনিক এবং তাত্বিক অবস্থানের জন্যেই। গণসঙ্গীতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, “স্বাদেশিকতার ধারা যেখানে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার মহাসাগরে গিয়ে মিলেছে, সেই মোহনায় গণসঙ্গীতের জন্ম।” শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যেমন ‘ঘরানা’, তার বিপরীতে লোক সঙ্গীতের ‘বাহিরানা’ নিয়েও তাঁর চিন্তা পরের চিন্তকদের ভাবনার দিশা দিয়েছে। সুরমা ভ্যালি কালচারাল স্কোয়াডের এবং গণনাট্যের শুরুর দিনগুলোতে তৈরি হয় তাঁর বিখ্যাত  গান ‘তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান’। তখন এবং পরের জীবনে তাঁর লেখা এবং গাওয়া   বিখ্যাত গানগুলো হলোঃশঙ্খচিলের গান,   জন হেনরীর গান,   মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য,   বাঁচব বাঁচব রে আমরা,   মশাল জ্বালো,    সেলাম চাচা,    আমি যে দেখেছি সেই দেশ,‘হবিগঞ্জের জালালী কইতর সুনামগঞ্জের কুড়া’, ‘ও সোনা বন্ধুরে’, ‘আমার মন কান্দে পদ্মার চরের লাইগ্যা’ । ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘লালন ফকির’ ইত্যাদি ছায়াছবিতে, যাত্রাপালা ‘লেনিন’এ এবং  কল্লোল, তীর, লাললণ্ঠন ইত্যাদি নাটকে সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন । ‘লাললন্ঠন’ নাটকে তিনি বিভিন্ন চিনা সুর ব্যবহার   করেছিলেন । তিনবার চিনে গিয়ে চিনা ভাষাটাও তিনি অনেক রপ্ত করেছিলেন। ফলে বেশ কিছু চিনা গান কবিতা বাংলাতে অনুবাদও করেছিলেন। এছাড়াও দেশ বিদেশের প্রচুর বিখ্যাত গানকে তিনি ওমন ভাবে বাংলাতে অনুবাদ করে জনপ্রিয় করেছিলেন যে সাধারণ শ্রোতাদের অনেকেই এগুলোকে  হেমাঙ্গের বিশুদ্ধ বাংলা বলেই জানেন এখনো। যেমন পিট সিগার কলকাতার ময়দানে এসে গেয়েছিলেন ‘উই শ্যাল অভার কাম।’ হেমাঙ্গকে তিনিই ডেকে তুললেন মঞ্চে । তিনি গাইলেন ‘আমরা করব জয়।’ এটি এর পর  নানা ভাষাতে অনুদিত হয়ে এতো জনপ্রিয় হয় যে গোটা ভারত জয় করে বসেছিল বটে, যদিও ‘মা তুমি শিগগির এসো’ কবিতার ‘ইবনদি’ এখনো ফিরে আসে নি।
            ‘সীমান্ত প্রহরী’ কবিতার বইএর এক দুর্দান্ত দীর্ঘ কবিতা এটি। শেষ হয়েছে, “ইবনদির সাথে/এই আমার শেষ সাক্ষাৎ।/মাঝরাতে হ্যাপিভ্যালির চূড়ায়/ভয়ে ভয়ে চাঁদ উঠেছিল/কুয়াশার ঘোমটা পরে।/সারারাত জেগেছিলাম আমি।/আর জেগেছিল/সুদূর খাসিয়া পুঞ্জিতে/ফুলকুমারী কাসান্থিউ।/থেকে থেকে কেঁদে উঠেছিল—/ইম্মেই ওয়ান ক্লোয়/মা, তুমি শিগগির ফিরে এসো।” অসমের এক গুরুত্বপূর্ণ কবি তপন মহন্ত লিখেছেন, “ ‘ইবনদি’ ... কি সাম্রাজ্যবাদীর নিগড়ে পিষ্ট ভারত বর্ষের প্রতীক নয়?...কবিতাটিও  এলিজি কবিতা হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। কবিতাটি শুধু বাংলায় লেখা বলেই কি প্রচারের অভাবে তলিয়ে গেল বিস্মৃতির অন্তরালে?”আমরা কথাটার একটাই মানে করতে পারি, কবিতাটি হারাবে না, হারাবেন না কবিও, শুধু দিন কাল এখনো পাল্টায় নি বিশেষ ফুরোয় নি সেই ফুলকুমারী কাসান্থিউর মায়ের পথ চেয়ে থাকা। কোথাও কি ভুল হয়েছিল? পার্টির ভুল  নাহয় হয়েইছিল,  কিন্তু হেমাঙ্গ নিজেই বা কেন ফিরে এলেন না! কেনই বা কলকাতাতে তাঁকে ‘জিরণি’ নিতে হয়েছিল? চল্লিশের দশকে সুরমাভ্যালী স্কোয়াডের যিনি মহানায়ক, ষাটের দশকে “‘Let us meet cultural troupe’ এর যিনি দুর্নিবার সংগ্রামী, আশির দশকে তিনি ‘মাস সিঙ্গার্সে’র অতিথি গায়ক কেন? ‘ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়া নয়া বাংলা গড়বার’ কিম্বা “ সমতলে লুইতের বুকে/ উদ্দাম ঝরনা হয়ে নেমে আসুক; ঝুমুর মাদল আর বিহু পেঁপায়/ পারে পারে ঐকতান তুলুকঃ /জীবনের/ সৃজনের/ স্বপ্নের/ শান্তির।” ( সীমান্তপ্রহরী) এই পংক্তিগুলোতো তাঁর নিজের ছিল, শুধু পার্টির নয়।  সেখানে, “...মিলনৰ প্রক্রিয়া কিন্তু থানবান হৈ গৈছে। সাংস্কৃতিক ভেটি কঁপি উঠিছে, সংহতির মূলতে ভাবুকিয়ে দেখা দিছে।” বলে আত্মতুষ্টি লাভের সুযোগ রয়েছে কি? যে ডানা ভেঙ্গে তিনি কলকাতার উপর গিয়ে পড়েছিলেন সেতো আমাদের সব্বার  এক স্বপ্নেরও ডানা। আর কোথাও কি কোনো ভুলচুক ছিলনা, সত্যি? বাবা ‘হরকুমার বিশ্বাস’এর  যে শ্রেণি বিশ্বাস এবং প্রতাপ তাঁকে হবিগঞ্জের বাড়ি থেকে তাড়িয়েছিল সেই ক্ষমতাই তো  তাঁকে এবং আমাদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল! তার কোনো সুরাহা  করতে হবে না? প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের  করতে হবে। হেমাঙ্গকে জেনে তাঁকে ছেড়ে এগিয়ে যেতে হবে। কেননা, আমাদের  ‘জিরণি’ এখানেই এই মাটিতেই যে গড়তে হবে, সে কথা ভুললে চলবে কেন?
তথ্যসূত্রঃ
 ১) হেমাঙ্গ বিশ্বাসঃ সাংস্কৃতিক চেতনার অমল সুবাস; ফটিক বরা; সুভাষ সুরভি প্রকাশন;ডিব্রুগড়-০৩; ২০০২।  
 ২) উজান গাঙের নাইয়াঃ হেমাঙ্গ বিশ্বাস; তপন মহন্ত; নাইন্থ কলাম’—অসমের কৃতী বাঙালি সংখ্যা; গুয়াহাটি; মে , ২০১১)
৬) হেমাঙ্গ বিশ্বাসৰ গান আৰু কবিতা; অমিয় ভূষণ চক্রবর্তী; ‘অনীক’ ফেব্রুয়ারী মার্চ, ১৯৮৮ হেমাঙ্গ বিশ্বাস স্মরণ সংখ্যাতে প্রকাশিত ‘অগ্নিখেলার সাথী’ প্রবন্ধের হরেন্র্র নাথ বরঠাকুরের করা অসমিয়া অনুবাদ; নতুন পদাতিক ; গুয়াহাটি ১ আগষ্ট, ২০০৩।
   

Friday, 27 January 2012

আপাতত, বাঙালি ঐক্যের সমস্যাটা বলি আবার।

 ( এই লেখাটি  'বন্ধ হোক সব বঞ্চনা, আমরাও চাই উন্নত বরাক' নামের এক ফেসবুকে গ্রুপে আমাদের চারজনের আড্ডাতে করা আমার এক মন্তব্যের সম্পাদিত রূপ। আড্ডা হচ্ছিল আমার, Shekhar,Hilal এবং Shovon মধ্যেই)
                রাকের বন্ধুরা আছেন, এমন কোনো গ্রুপে এমন চিন্তা উদ্রেককারী আলোচনা খুব কম হয়। তাই এই আড্ডাটা আমার মাথাতে ঘুরছিল। দেখলাম, আমি কিছু কিছু বিষয় সত্যি আগে দেখিনি। যেমন Shekharদেব শুরুতেই বরাক আর ব্রহ্মপুত্রের বাস্তবতাকে মনে রেখেই ঐক্য সূত্র খোঁজতে গেছিলেন। এটা আগে আমার চোখে পড়েনি। তাঁর শেষ দিকের মন্তব্যের সূত্রে আবার পড়ে পেলাম। আমাদের এই আড্ডাতেই দেখা গেল যে Hilalভাষা ঐক্যের পক্ষে বলছিলেন, কিন্তু তাঁকেই আবার মুসলমান মর্যাদার পক্ষেই দাঁড়াতে হলো। আমাকে এবং Shekharবাবুকেতো বটেই। Shovonনিশ্চয়ই গভীরে না ভেবে আলটপকা মন্তব্য করে না। কিন্তু এটা বোঝা যায় যে মুসলমানদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান নেই। আমি আমার বক্তব্যের পক্ষে পরে নথি দিচ্ছি। আপাতত, বাঙালি ঐক্যের সমস্যাটা বলি আবার।                
             এই যে বৈচিত্রগুলো, সেগুলোর প্রতি যদি শ্রদ্ধা নিয়ে কৌতুহল বাড়ানো যায় এবং আমাদের সবার পুরোনো সমস্ত চিন্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে যাচাই করি, এবং অবশ্যি সেই লক্ষ্যে এক প্রবল আশাবাদ পোষণ করি তবে একটা সূত্র মিলতে পারে। আমি ভালো জানি না সেটি কী? কিন্তু মিলতে পারে। বৈচিত্র আর বিরোধের যে দুটো আন্তসম্পর্কিত কিন্তু আলাদা বস্তু-- এই সত্য মনে রাখতে হবে, এটা আপাতত বলতে পারি। এবারে আবার আসি শোভনের কথাতে। এমন কথাতে যেকোনো লোকই আপত্তি করবেন , কেউ মুসলমান হলে করবেনই,"why does it happen with a particular community only? Why not with the other minority religious groups?"
  আপত্তি করবেন, কারণ এটা সত্য নয়। ভারতে
পার্শি বাদ দিয়ে কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘুই ভালো নেই। বস্তুত আর্থিক এবং সামাজিক ভাবে খৃষ্টান এবং বৌদ্ধরা সবচে' পশ্চাদপদ অবস্থানে রয়েছেন। এমন কি আর্থিক ভাবে সবল এক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও যে সামাজিক ভাবে নিরাপত্তা এবং মর্যাদাহীন অবস্থাতে পৌঁছে যেতে পারেন, সেটি আমরা আশির দশকে শিখদের বেলা দেখেছি। আর মুসলমানমাত্রকেই  যখন তখন 'পাকিস্তানের চর' বা 'দেশদ্রোহী'  ভাবা হয় তখন কোনো মুসলমানই অন্যের সম্পর্কে স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। আরেকটা কথা, দরিদ্র লোকেরা ধর্মকে আকড়ে ধরবেই , এমন কি বাস্তবে সবচে' অধার্মিক কাজেও তাদেরকেই বেশি পাওয়া যাবে। এই সত্য বহু হিন্দু মধ্যবিত্ত জেনে বুঝেও অনেক সময় বোঝেন না। সম্প্রতি অরিজিত চৌধুরী যুগশঙ্খে নিবন্ধ লিখে প্রশ্ন তুলেছেন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের লোকেরাই কেন বরাকে এতো অসামাজিক কাজ করছেন? তিনি মুহিব মজুমদারের উপর আক্রমণ, ভাঙাতে দোকান বাড়ি জ্বালানো ইত্যাদি প্রসঙ্গ টেনেছেন। নিত্য যারা অসম্মানের পরিবেশে থাকেন তারা 'ভদ্রলোকে'র মতো সর্বত্র ভারসাম্য রাখবেন কী করে? আমেরিকাতেও দেখা যাবে নিগ্রোরাই সবচে বেশি সামাজিক অসাম্যের শিকার, আবার কোনো নিগ্রো পাড়াতে চোর ছ্যেচ্ছড়ের হাত থেকে গা বাঁচানো যাবে না। 'ভদ্রলোকে'রা কোটি কোটি টাকা সুইস বেঙ্কে রাখেন, টেক্স ফাঁকি দেন, জেলে গেলেও নক্ষত্রের সম্মান পান। কৃষকেরা চুরি করে , ডাকাতি করে এবং জেলে পচেন। ভারতের যেকোনো জেলে গেলে দেখা যাবে সেখানে পচছেন মুসলমান , খৃষ্টান এই সব ধর্মীয় সংখ্যালঘুর মানুষ , এবং অবশ্যই দলিত জনজাতির মানুষেরা। আমার একবার জেলবাসের সৌভাগ্য হয়েছিল, আর শিক্ষক জীবনে অন্য কাজেও জেলে গেছি। দেখেছি।
            এবারে আসি, বাংলাদেশে বা পকিস্তানে সংখালঘুরা কেমন আছেন-- সেই প্রশ্নে মুসলমানদের বিশেষ করে,বা তাদের সমর্থণে যারা বলবেন তাদের সাফাই দিতে হয় কেন? ওগুলোতো বিদেশ। দিতে হয় এর জন্যে যে ঐ দুটো প্রতিবেশি দেশের নজির দিয়ে দেখাবার প্রয়াস হয়, দেখো মুসলমানরা নিজেরা সুযোগ পেলে অন্যের প্রতি কেমন করে? সুতরাং এই কৈফিয়ত এই দেশের মুসলমানদের আত্মমর্যাদার স্বার্থেই দিতে হয়। জীবনে উন্নতির জন্যেও আত্মমর্যাদা বোধটা খুব জরুরি। কেননা এটি এক ব্যক্তিকে আত্মবিশ্বাসও দেয়। ভারতে ইমামরা মুসলমানদের কী বিপদ ঘটাচ্ছে এই নিয়ে খুব তর্ক করা হয়, কিন্তু এরা যে 'ভুল পথে' হলেও সেই আত্মমর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাস সুরক্ষার কাজ করেন সেই সত্য গোপন করা হয়। আজকাল বদরুদ্দীন আজমল এই লক্ষ্যে রীতিমত খৃষ্টান মিশনারীদের মতো ব্যাপক কাজ করছেন। তাঁর এই সব কাজে বহু হিন্দু দরিদ্রজনও লাভান্বিত হচ্ছেন। এই নিয়েও দুটো ভালো লথা কাগজে খুব কম লেখা হয়। নিত্যদিন 'ইমাম' বিরোধী হিন্দু আস্তিক বা নাস্তিকেরা যা আজেবাজে লিখে মুসলমানদের সেই মর্যাদাবোধ এবং আত্মবিশ্বাসের জায়গাকে তলানিতে ঠেকিয়ে দেন, এবং তাতে 'অর্থনীতি বহুভূর্ত' ভাবে সস্তা শ্রমিক পেতে , রাজনৈতিকভাবে নিজেদের কর্তৃত্ব বহাল রাখতে এই সব 'সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী হিন্দু'দের সুবিধে হয় এই নিয়ে ভাবনাচিন্তাই খুব কম , লেখা লেখিতো আরো কম। যে লিখবে তার চৌদ্দ গোষ্ঠীর শ্রাদ্ধ হবে। 
           এবারে, যতটা বলা হয়, সত্যি কি মুসলমান প্রধান দেশ গুলোতে সংখ্যালঘুদের অবস্থা খুব খারাপ? সব দেশেই কি? তবে দুবাই সহ, মধ্য এশিয়ার বহু দেশে ভারতীয় হিন্দুরা দলে দলে যান কী করতে? আফগানিস্তানের সংগে ভারতের এতো প্রেম কিসের। ঐ দেশতো ধর্মনিরপেক্ষে বলে এখনো নিজেকে ঘোষণা করে নি। হ্যা, অধিকারের অসাম্য আছে, আছে মর্যাদারও। যেমন আছে ভারতে। পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে যদি হিন্দু লোক রাজনীতি, ব্যবসাতে তেমন উন্নতি করতে পারেন নি, তবে বিপরীতে এটাওতো ঠিক ওদের দেশে গুজরাট, ভাগলপুর, নেলীও হয় নি। সুতরাং বলতে গেলে বিরুদ্ধে, সব দেশের বিরুদ্ধেই বলা যাবে। ভারতে মুসলমানদের সংরক্ষণ দিয়ে দিলে ধর্মনিরপেক্ষতা গেল কোথায় এই প্রশ্ন তোলা হয়। কিন্তু এই প্রশ্ন যারা করে----, ১৯৯২র মুম্বাই দাঙ্গার , ১৯৮৩র নেলি দাঙ্গার কোনো বিচার হয় না কেন? ১৯৯৪র মুম্বাই বোম ব্লাস্টের অপরাধী ধরা পড়ে জেলেও যায়, কিন্তু যার প্রতিক্রিয়াতে এই সব হয় সেই বাবরি ভাঙ্গার নায়করা এতো সম্মানের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে ঘুরে কী করে?  এই সব প্রশ্নের উত্তরটা কী? সে যাই হোক, আপনি যে পক্ষেই থাকুন, একটি কথাতো সত্যি যে ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীত নয়। তবে এই প্রশ্ন করবার মানেই বা কী যে একটিও মুসলমান দেশ নেই যেগুলো ধর্ম নিরপেক্ষ। আবার এও সত্য নয়, যেসব মুসলমান প্রধান দেশ ঘোষিত ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ তাদের রাষ্ট্রনায়কদের একনায়ক বলে যখন মিছেমিছিই আমেরিকা প্রায় নৃশংসভাবে হত্যা করে তখন আবার আমরা নিজেদের গনতন্ত্রের বড়াই করে আহ্লদাদে মেতে উঠি। ইরাকে বা লিবিয়াতে যা হলো। মুসলমান যাবেতো যাবে কোথায়?
             এই প্রশ্নও কি মাথাতে আসেন না, যে মুসলমানদের প্রতি আল্লাই বড় অবিচার করে গেছেন! কী মুস্কিল! ভারত ছাড়া প্রায় সমস্ত মুসলমান প্রধান দেশে তিনি তেল দিয়ে গেছেন। ইন্দনেশিয়া মালোশিয়াতেও। আর একটা দেশ থেকে সামন্তবাদ বিদায় নেবে কিনা সেটি সিদ্ধান্ত নেবার দায়, ইউরোপ বাদ দিলে আর কোনো এশিয়, আফ্রিকী দেশগুলোর নিজেদের হাতে ছিল না। ভারতেও নয়। ভারতেও সামন্তবাদ টিকে আছে। আর তেলপ্রধান দেশগুলোতেতো বটেই। সৌদী রাজা বা ব্রুনেইর রাজার বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দটি করে না। সামন্তবাদ ঔপনিবেশিক শক্তিকে সস্তা শ্রম, কাঁচামালের অবাধ লুণ্ঠন এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাজারের নিশ্চিতি দেয়। আর তাই, আমরা মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডের উত্থানে যতই বিপন্নবোধ করি, মার্কিনিরা তাদের সঙ্গেই কারবার করবার আলাপ জমাচ্ছে। ইরাকেও তাই হয়েছে। আফগানিস্তানেও মোটেও ধর্ম সম্পর্ক শূণ্য সরকার ক্ষমতাতে নেই। বরং বিচ্ছিন্ন কিছু জনজাতীয় যুদ্ধবাজদের জোট সরকার চালাচ্ছে। যারা মোটেও মার্কিনি বা ভারতীয় শিল্পপতিদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো যোগ্যতা রাখে না। আর সত্য বলতে, ধর্মনিরপেক্ষ জাতি রাষ্ট্র একটি বোর্জুয়া মিথ্যাচার হিসেবেই থেকে গেছে। বৃটেন নিজেই এখন আবার নতুন করে এই সব প্রশ্নে জেরবার। আগামী দুই একবছরে স্কটিশরা বেরিয়ে গেলেও যেতে পারে যাদের সঙ্গে ইংলিশদের ভাষিক এবং ধর্মীয় বিরোধ রয়েছে। পুঁজিবাদ এগুলো জিইয়ে রাখে। কারণ, তার লুণ্ঠনকে সে যতই বাজারে স্বাধীনতার উপর ছেড়ে দেবার বড়াই করুকনা কেন, এতো ঠিক যে তার জুয়াচুরী আড়ালে থাকে না। এখনকার আর্থিক সংকট দেখাচ্ছে এই সত্যতা। 
            এই জোচ্চুরিকে আড়াল করবার জন্যে শাসকদের দরকার পড়ে সংখ্যাগুরুদের মধ্যে এক সমর্থণ ভিত্তি গড়ে তুলবার। সেই সংখ্যাগুরুর একটি ধর্মও থাকে, থাকে ভাষাও। আর ঠিক তাই আজকের কোনো দেশেই সংখ্যালঘুরা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা আর মর্যাদা নিয়ে থাকতে পারে না। যারা এর বিরুদ্ধে লড়বেন তাদের তাই 'হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই বলেও লাভ নেই', 'লাভ নেই অসমিয়া বাঙালি ভাই ভাই বলেও'। আবার এর অর্থ এও নয় যে তবে 'হিন্দু মুসলিম বা অসমিয়া বাঙালি কাটাকাটি করা যাক' এর সবগুলোই শাসকদের লাভ করে দেয়। প্রথমটি তাদের উদ্দেশ্যকে আড়াল করে, দ্বিতীয়টি বড়বেশি উন্মুক্ত করে। শুরু তাই অবশ্যই করতে হবে সংখ্যালঘুর পক্ষে দাঁড়িয়ে সংখ্যাগুরুর নিপীড়িতদের এক করে। আর ঠিক তাই, আমি প্রায়ই অসমিয়াদের পক্ষেও দুই একটা কথা বলে ফেলি। তাতে শিলচরের কিছু বন্ধু আমাকে তাদের দালাল বলে ফেলেন। অর্থাৎ , আমি এমন একটা লোক যে কিনা 'হিন্দু বাঙালি', কিন্তু 'হিন্দু' আর 'বাঙালি' ছাড়া আর সবার পক্ষে দালালি করে! আরে বাবা, যারা একতরফা অসমিয়া বিরোধী বা বিদ্বেষী, সবেতেই অসমিয়া ষঢ়যন্ত্র দেখেন তারাতো নিজেদের লড়াইটা শুরু করবার আগেই হেরে বসে থাকেন। আর ঠিক তাই, বরাক উপত্যকার আজ অব্দি কোনো হিল্লে হলো না। ব্রহ্মপুত্রেরও বটে।
                                                                                                         (c) ছবি

Thursday, 26 January 2012

বাংলাদেশে ভারত বিরোধী যে ক্ষোভ তা কেবল দুই দেশের লড়াই নয়, এক রকম শ্রেণি সংগ্রামও বটে।

                ভারতীয় রাজনীতিতে যেমন একদিকে প্রবল মার্কিন প্রীতি অন্যদিকে দুর্বল মার্কিন বিরোধিতার লড়াই চলছে, বাংলাদেশ সহ সমস্ত ভারতীয় উপমহাদেশগুলোর ছোট দেশে ভারত প্রেম এবং ভারত বিরোধীতা রাজনীতির এক বাস্তবতা। একে অস্বীকার করা যাবে না। ভারতবর্ষ সীমান্ত দিয়ে সাধারণ মানুষের, চোরাকারবারিদের, সন্দেহভাজন সন্ত্রাসবাদীদের অনুপ্রেবেশ নিয়েই আতঙ্কে থাকে। তাই কাঁটাতারের বেড়া। সীমান্তে অত্যচার খুন ইত্যাদি। কিন্তু কাঁটাতারের বাইরেও ভারতে বাংলাদেশের আরো বহু ব্যাপারেরই আইনত বা আইন বহির্ভূত ভাবে প্রবেশ নিষেধ। আইন বহির্ভূত ভাবে বলছি মানে, আম-ভারতীয়ের বাংলাদেশের বহু পণ্যের প্রতি এক সাধারণ অবজ্ঞা বোধ। যেমন ভারতে বাংলাদেশের বা পাকিস্তানের টিভি চেনেলগুলোর প্রবেশ অবাধ নয়, সাহিত্য সঙ্গীতের বা চলচ্চিত্রের সেরকম বাজার নেই। এটা সক্রিয় কোনো প্রতিরোধের জন্যে সব সময় হয় তার জন্যে নয়, এর পেছনে এক সাধারণ অবজ্ঞা বোধও কাজ করে। তার কিছু বাস্তব কারণ আছে, বাকিটা অবজ্ঞা এবং অজ্ঞতা। এই যেমন বাংলাদেশের মাটিতে ক'দিন আগে 'আনন্দ বাজারে'র কপি পুড়তে দেখে অনেক ভারতীয় নিশ্চয় ক্ষুব্ধ হয়েছি। কিন্তু এই প্রশ্ন করেছি কি ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের কোনো কাগজ পুড়িয়ে দেবার জন্যেও পাচ্ছি না কেন? অথচ এই লেখাতে কত কত ভারতীয় পণ্যের বয়কটের ডাক দেয়া হয়েছে দেখুন। তার মানে ভারতীয় পণ্য আইনী উপায়েই কী ব্যাপক ভাবে বাংলাদেশের বাজারে অনুপ্রবেশ করেছে । তার মানে, ভারতীয় পণ্য উৎপাদকদের কাছে বাংলাদেশ একটা ক্রেতা সমাবেশ মাত্র। এর কিছু পণ্য নিশ্চয়ই সেদেশেই তৈরিও হয়, যেমন ভারতে তৈরি হয় বহু মার্কিনি বা জার্মান বা কোরীয় পণ্য। এবারে উৎপাদন কেন্দ্র তখনি স্থানান্তরিত হয় যখন সহজে ও সস্তায় জমি মেলে, মেলে কাঁচামাল, এবং অতি অবশ্যই সস্তা শ্রম। 
           সস্তা শ্রমের বাজার আর ক্রেতার বাইরের উদ্বৃত্ত জনতাকে বাজার গরুছাগলের বেশি কোনো মূল্য দেয় না। তারা থাকলেই কি না থাকলেই কি? সীমান্ত তারাই অতিক্রম করে। পুঁজি যেদিকে ঘনীভূত হয় উদ্বৃত্ত জনতা সেদিকেই যাত্রা করে এক মায়াময় স্বপ্নের সন্ধানে। তাই কাঁটাতারের পক্ষে বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে তেমন সমর্থণ ভিত্তি থাকবে না, একে পার করে যাওয়াটাকে কেউ তেমন অপরাধ হিসেবে দেখবেনও না, এটা খুবই স্বাভাবিক। পৃথিবী জুড়ে তৃতীয় বিশ্বের মানুষের তাই আজ একটাই স্বপ্নের দেশ ,তার নাম আমেরিকা। সেখানেতো রীতিমতো 'নো বর্ডার আন্দোলন' জোরদার। তাই, বাংলাদেশে ভারত বিরোধী যে ক্ষোভ তা কেবল দুই দেশের লড়াই নয়, এক রকম শ্রেণি সংগ্রামও বটে।এবং ভারতের দিক থেকে তাদের লড়াইকে আমাদের বিরোধিতা করাটা অনেকটা শাসক শ্রেণির পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলবার মতো। 
            ভারতের বাজার বাংলাদেশে টিকে আছে বাংলাদেশেরই মধ্যবিত্তদের এক বড় এবং ক্ষমতাশালী পক্ষের সমর্থণে। তাই ভারত বিরোধী জিগির আসলে দেশটির ভেতরের শ্রেণিদ্বন্দ্বকেও প্রকাশ করে। জরুরি নয় যে , এর সবটাই সর্বৈব ভারত বিদ্বেষ। এবং আমাদের ভারতীয়দের এসব কথাবার্তা শুনলেই গা পুড়িয়ে তেড়ে যেতে হবে। কিন্তু মুস্কিল হলো মধ্যবিত্ত মুখে যতটা গর্জায় তত বর্ষায় না। এবং অনেক সময়েই সে তার গণভিত্তিকে ধরে রাখবার বা গড়ে তুলবার জন্যে মুখেই জগৎ মারে। এবং দিশাহীন বকুনি ঝাড়ে। স্মরণ করুন, 'ঘরেবাইরে'র সন্দীপ বিদেশি সিগারেট খেত। এবং তাদের প্রয়াসের ফলে মুসলমান প্রজা বিপন্ন হয়। ওই উদ্বৃত্ত জনতার স্বাধিকার রক্ষার লড়াই, সস্তা শ্রমিকের এবং বিপন্ন কৃষকের স্বাধিকার রক্ষার লড়াই এবং ভারতে তাদের শ্রেণি মিত্রদের সঙ্গে আঁতাত গড়বার কথা মাথায় রেখে যখন কেউ কথা বলবেন তখন তাদের বয়ানটাই আলাদা হবে। এবং হবে অনেক বেশি কার্যকরী। এই হুজুগে মধ্যবিত্ত জানেনই না, যেমন আমেরিকাতে বহু মানুষ ইরাক, আফগানিস্তান, পালেস্টাইন, ভারত, পাকিস্তানের হয়ে লড়াই করেন, তেমনি ভারতে বহু বহু মানুষ আছেন যারা নিত্যদিন উপমহাদেশে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। মধ্যবিত্ত দামী কাগজে পড়ে অরুন্ধতী রায়ের কথা জানেন। কিন্তু সেরকম মানুষ১২৫ কোটির ভারতে ওই একজন আছেন--শুনলেই আমার ভীষণ হাসি পায়। পেটে খিল ধরে।

Saturday, 14 January 2012

বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদ এবং উত্তর বঙ্গের জনগোষ্ঠীগত পাকচক্র



মুল অসমিয়াঃ ভাস্কর নন্দী 
বাংলা অনুবাদঃ সুশান্ত কর

বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদের ‘মহাআখ্যান’
                  বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদের ‘মহাআখ্যান’টি শুরু থেকেই তৈরি হয়েছিল বাংলার উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলোকের চাহিদামতো সমাজ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্কে মহাজাগতিক (cosmological) ধারণা দিয়ে  । যে জটিল দ্বন্দ্ব এই জাতীয়তাবাদকে সামনে নিয়ে যেতে চায় সেই আখ্যান এই প্রবন্ধে  বিবেচনার বিষয় নয়। উত্তর বাংলা এবং পশ্চিমাঞ্চলে ( যাকে আজকাল ‘জঙ্গলমহল’ বলা হচ্ছে)  এই জাতীয়তাবাদ যে বিভাজনমুখী প্রবণতার মধ্যে পড়েছে, সেই পটভূমিতে আমরা শুধু এই কথাটাই এখানে বলে রাখতে চাইছি যে অতীতেও বিভাজন রোধ করতে ভীষণভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।  সেজন্যে অদূরেই যে  অন্ধকার ভবিষ্যত আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে আমরা  শুধু তার কারণগুলোই এখানে আলোচনা করতে চাইব।
       জাতীয়তাবাদ যেখানেই সফল হয়েছে সেখানেই সে সংশ্লিষ্ট ভূখন্ডে বসতরত নানা ধর্ম, ভাষা এবং জাতি বর্ণে বিভক্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। কিন্তু বাঙালি উচ্চবর্গের অভিজাত শ্রেণিটি নিজের অর্ধ-সামন্তবাদী (চিরস্থায়ী বন্দোবস্তজনিত) পটভূমিকে অতিক্রম করতে পারেনি, আর তাই প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক এবং সামাজিক গতিশীলতাও সৃষ্টি করতে পারেনি। সেরকম গতিশীলতার অভাবের জন্যেই এই শ্রেণিটি নিজে মুখোমুখি হয়েছে যে জনগোষ্ঠীগত পার্থক্যগুলোর সামনে সেগুলোকেও অতিক্রম করতে পারেনি।
         ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের কর্মকর্তা হিসেবে বিকশিত বাঙালি প্রটোবোর্জুয়াদের সামন্তীয় বন্ধন স্পষ্ট হয়ে পড়ে আধুনিক মানভাষা হিসেবে বাংলার বিকাশের প্রক্রিয়াটিতে। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা থেকে যতটা পারে ততটাই সরে এলো ভাষাটি এবং সংস্কৃতের উপর বড় বেশি করে নির্ভর করতে শুরু করল। এই সংস্কৃত ছিল কেবল ব্রাহ্মণ্যবাদী অভিজাত শ্রেণিটিরই ভাষা। কিন্তু এই ভাষার নির্মাণেই নয়, অন্য সমস্ত সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এবং নিম্নবর্গ জাতির মানুষের জাতীয়তার প্রতীকচিহ্নগুলোকে প্রায় সম্পূর্ণই সরিয়ে ফেলা হলো।  এই বহির্ভূতকরণের   ফলে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেয়া হলো। তার ফলে অর্থনীতি বহির্ভূত বল প্রয়োগের মধ্যি দিয়ে উদ্বৃত্ত খাজনা সংগ্রহের রাস্তা খুলে গেল। যখন ঔপনিবেশিক শিক্ষা এবং প্রশাসনের ফুটো দিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এই হিতাধিকারীদের মধ্যে ইউরোপীয় বোর্জুয়া আধুনিকতার প্রবেশ সুগম করে তুলল, তাকে নবজাগরণ বলে বলা হলো। কিন্তু তথাকথিত নবজাগরণও প্রকৃত সামাজিক উৎপাদন সম্পর্ককে অতিক্রম এবং গ্রাস করতে পারল না। আধুনিকতার এই স্পর্শ এবং তার সঙ্গে শক্তিশালী প্রশাসনিক এবং সামন্তীয় শক্তির মেলবন্ধন উচ্চবর্গীয় উগ্রজাতীয়তাবাদকে  এনে দিল প্রান্তিক মানুষের উপর প্রাধান্য বিস্তারের স্বাদ, যা কিনা এখন অব্দি চলছে।  ভারতের অন্যান্য বহু জায়গার মতো সে তার সামাজিক দূরত্ব ব্যক্তিগত বাহিনি বা বাহুবলে টিকিয়ে রাখেনি, রেখেছিল সামাজিক সাংস্কৃতিক বিদ্বেষ এবং গোঁয়ার্তুমী দিয়ে । বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য  সুদূর পরাহত হয়েই রইল।
       
           যারাই কোনোক্রমে গড়াগড়ি করতে করতে বহু কাঙ্খিত ভদ্রলোকের মর্যাদা পেয়েছিল , এই উগ্রজাতীয়তাবাদ তার ভেতর মহল থেকে উচ্চবর্গের বাইরে সেই সমস্ত বর্গকেও  সরিয়ে রাখল। সেটি না বুঝতে পারলে ভদ্রলোক-বামপন্থীদের শাসিত পশ্চিম বাংলাতে দলিত এবং মুসলমান সম্প্রদায়গুলোর চাকরি-বাকরি এবং তেমন অন্যান্য ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার শোকাবহ পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। সাধারণ ক্ষেত্রে যদি , সর্বহারা মূল্যবোধের জীবিকাগুলোকে গুরুত্বসহ নেয়া হতো তবে গ্রাম্য এবং নাগরিক সর্বহারার বৃহত্তম অংশ মুসলিমদের অবস্থা ভালো হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু প্রকৃতার্থে চিত্তরঞ্জন দাশের বিতর্কিত নাতিটি কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দরিদ্র এবং সর্বস্বান্ত মুসলিমদের জন্যে যতটা করেছিলেন, সর্বহারার স্বয়ম্ভু অগ্রণী বাহিনীটি কিন্তু সেটুকুও করে নি। অবশ্য ঐ নাতি-মুখ্যমন্ত্রী যেটুকু করেছিলেন তাও তাঁর দাদু বঙ্গচুক্তির মধ্য দিয়ে মুসলমানদের যেটুকু দিতে চেয়েছিলেন তার’চে সামান্যও বেশি ছিল না।
     চিত্তরঞ্জন দাশের পদক্ষেপটিই ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠকে বাঙালি জাতির ভেতরে টেনে নেবার মহান পদক্ষেপ।  কিন্তু সুরেন্দ্রনাথ বেনার্জী, বিপিন চন্দ্র পালের মতো বিখ্যাত নেতাদের নেতৃত্বাধীন ভদ্রলোক-সমাজ এই চুক্তির বিরোধীতা করল, এবং শেষে গিয়ে জাতীয় কংগ্রেসকে দিয়ে সেই চুক্তির বিরোধীতা করালো। ধার ঋণ বা আধিয়ার রায়তের অধিকার ইত্যাদি যেসব বিষয় মুসলিম এবং অনুঃজাতির সঙ্গে অধিক ঐক্য সম্ভব করতে পারত, সেগুলোর ক্ষেত্রে ভদ্রলোক নেতৃত্ব দৃঢ়ভাবে স্থিতাবস্থার পক্ষে দাঁড়াল। সংহতি সাধক এমন দৃষ্টিভঙ্গীর অভাবই বঙ্গভঙ্গের আধারশিলা স্থাপন করে, যা হলোগে বাঙালি জাতির সবচে’ বড় ব্যর্থতা। পশ্চিম বঙ্গের সাম্প্রতিক সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ আরেক ঐতিহাসিক পরাজয়ের সম্ভাবনাতে সগর্ভা। এবারে প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হলো উত্তর বঙ্গ।
           উত্তরবাংলার ছ’টি জেলার ভেতরে দার্জিলিংকে বাদ দিয়ে অন্য পাঁচটি  জেলাকে কেন্দ্রীয় সরকারই অতি পিছিয়ে পড়া জেলা হিসবে চিহ্নিত করেছে। দার্জিলিং বাদ পড়ে যাবার মূল কারণ হলো শিলিগুড়ি এবং দার্জিলিঙের নাগরিক বিস্তৃতি এবং সেগুলোর ব্যবসা বাণিজ্য, ছোট এবং মাঝারি উদ্যোগ, পরিবহন, পর্যটন, প্রশাসনীয় কার্যকলাপ, শিক্ষানুষ্ঠান, তুলনামূলক ভাবে ভালো আন্তর্কাঠামো এবং মানব বিকাশ। এই সমস্ত মিলে দার্জিলিং জেলাকে ‘পিছিয়ে পড়া’র সংজ্ঞার থেকে সরিয়ে রেখেছে যদিও, একই জেলার রাজস্ব এবং আরণ্যক গ্রামগুলোতে , চা-বাগানগুলোতে যদি আমরা আন্তর্কাঠামো এবং মানব বিকাশের দিকে চোখ ফেলি তবে তাদের অবস্থাও দেখব অন্য পাঁচটি পিছিয়ে পড়া জেলারই মতো, ভালো কিছু নয়। এই পিছিয়ে পড়া অবস্থার সঙ্গে এলাকাটির চা-মালিক এবং অন্যান্য পুঁজিপতি গোষ্ঠীকে দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের উপর প্রভুত্বকারী উচ্চবর্গের শাসক শ্রেণিটির স্বার্থের মধ্যে এক স্পষ্ট সম্পর্ক আছে।
            এই পিছিয়ে পড়া পরিস্থিতিটি উপর উপর শান্ত মনে হলেও জনগোষ্ঠী বা জাতিসত্তার রূপে  নিজেকে পরিচিত করতে চান তেমন এক বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখানে রয়েছেন। গেল শতকে আশির দশকের গোর্খা আন্দোলনকে বাদ দিলে অন্যদের বেলা তেমন হিংসাত্মক আন্দোলন হয় নিঅবশ্যি কামতাপুর লিবারেশন অর্গেনাইজেশনে’র মতো কিছু সংগঠনের নেতৃত্বে ক্ষণস্থায়ী হিংসাত্মক অভিযান যে একেবারে হয় নি, তাও নয়।  রাজ্য এবং দেশ যারা শাসন করেন তাদের জন্যে এগুলো নিশ্চয় ছিল গভীর বিপদের সংকেত। এই পরিস্থিতিকে কেউ কেউ আবার এক গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমাজবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বার্থে শ্রেণি সংগ্রাম বিকাশের পথে এক বড় বাধা হিসেবেও ধারণা করে নিয়েছেন। এই প্রতিবাদ এবং আন্দোলনগুলো বাঙালি উচ্চবর্গের রাজনৈতিক  শ্রেণিটির দ্বারা জনসংখ্যার সুবিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নিম্নবর্গের সম্প্রদায়গুলোর প্রতি সামাজিক শত্রুতা, উন্নয়নগত অবহেলা এবং সাংস্কৃতিক উন্নাসিকতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত।
            বড় করে দেখলে উত্তরবাংলাতে তিনটা বড়বড় আন্দোলনকে চোখের সামনেই দেখা যায়ঃ তার একটি হচ্ছে পশ্চিম বাংলার থেকে পৃথক রাজ্যের জন্য গোর্খাদের আন্দোলন, চাবাগানের আদিবাসিদের আন্দোলন এবং কামতাপুরি আন্দোলন অথবা এরই অন্য এক রূপ বৃহত্তর কোচবিহার আন্দোলন।

গোর্খাদের আন্দোলন
            বাংলার দুই স্থানীয় শাসক দলই বাংলা ভাগ হতে দেবে না বলে নিজেদের অনুগামীদের সান্ত্বনা দিতে পারে, কিন্ত প্রকৃত পক্ষে এই দুই দলই গোর্খাদের জন্যে এই আলাদা ভূমিখন্ডের সীমা এঁকে ফেলেছে। সে হলো, আগেরকার গোর্খা ভূ-খন্ডগত কর্তৃত্ব (Gorkha Territorial Authority. GTA) এবং এখনকার গোর্খা পার্বত্য পরিষদ (Gorkha Hill Council) কেউই সাহসের সঙ্গে স্বীকার না করলেও এটি আসলে এক ফেডারেল ব্যবস্থা।
            গোর্খালেণ্ড নামের নতুন রাজ্যটির গঠন এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। আমরা শুধু এই আশাই করতে পারি যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে গিয়ে আমাদের যেন কোনো উচ্চ সামাজিক মূল্য দিতে না হয়।
দার্জিলিং জেলার তিনটা পাহাড়ি মহকুমাতে একটি আলাদা গোর্খা রাজ্য গঠনের জন্যে গোর্খাদের দাবি অনেক আগেই মেনে নেয়া উচিত ছিল। ভারতবর্ষের জন্যে রাজ্যগুলোর পুনর্গঠন নতুন কথা কিছু নয়। ভারত বিভাজনের দিন থেকে ভারতের মানচিত্রে ক্রমাগত পরিবর্তন হয়েই এসছে। পুরোনো রাজাশাসিত রাজ্যগুলোকে নিয়ে ভারত গণরাজ্যের গঠনের সময়েও কেরালা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, উত্তরাখন্ড, ঝারখন্ড, অরুণাচল, মেঘালয়, নাগালেণ্ড ইত্যাদি রাজ্য ছিল না। তথাকথিত মূলস্রোতের বামপন্থীদের এক কথা মনে করিয়ে দেয়া দরকার যে একসময়ের বম্বে ভেঙ্গে মহারাষ্ট্র এবং গুজরাট গঠন করবার সময় বা সেরকম অন্য পরিস্থিতিতে তারাতো দেখি সে রকম রাজ্য গঠনের পক্ষেই দাঁড়িয়েছিল। অবশ্য, তারা হয়তো সেগুলোকে অতীতের ভুল বলে বলবে, এবং তার জন্যে কখনো বা আত্মসমালোচনাও করবে। কিন্তু সেরকম ভুলতো তারা তার পরেও করেছে। তার মধ্যে সবচে’ মারাত্মকটি হচ্ছে গোর্খা আন্দোলনের সময় সিপি আই-র কথা ‘ভুল’টি। দলটির তখনো কিছু বিপ্লবী রক্ত ছিল বলেই বোধ হয়, সে সময়ে ওরা গোর্খা জনগণের সমর্থণে তিনটি সূত্রের কথা বলেছিলেনঃ ১) ভারতের থেকে বিচ্ছিন্ন এক স্বাধীন দার্জিলিং রাষ্ট্র, ২) বিচ্ছিন্নতার পরে নেপালের সঙ্গে সংযুক্তি, ৩) ভারতের ভেতরে এক আলাদা রাজ্য । ‘ক্রেমলিনের বৃদ্ধপিতামহ’ (মাও একবার স্তালিন সম্পর্কে এরকম বলেছিলেন) সিপি আই-র সেই স্থিতিকে নিশ্চয়ই অনুমোদন জানিয়েছিলেন, কেননা বিচ্ছিন্নতার পর্যায় অব্দি জাতিসত্বাগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণেরপ্রসঙ্গে তাঁর স্থিতির কথা সবাই জানেন।
           কিন্তু সেই ‘বৃদ্ধ পিতামহ’ এখন পার্টি অফিসের নিথর মূর্তির বাইরে আর কিছুই নন। এখন ‘ঐক্য এবং সংহতি’র স্লোগানের দিন। কাশ্মীরের কথা উঠলেই ভারতের সঙ্গে ঐক্য এবং সংহতির কথা বলা হয়। তাহলে ভারতের ভেতরে যা গঠিত হবে সেই গোর্খালেন্ডই বা কী করে ঐক্য এবং সংহতিকে বিপন্ন করল? সেইটেই আসল কথা। কারণ বাংলার দুই শাসক দলের জন্যেই এ হচ্ছে বাংলার ঐক্য এবং অবিচ্ছিন্নতার প্রশ্ন। ‘বাংলাকে ভাগ হতে দেব না!” আমরা এভাবেই মার্ক্সবাদের উঁচু জমির থেকে এমনকি বৃহৎ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের থেকেও নিচে নেমে আসি আর বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদের ডোবাতে মাথা ডুবাই!
          দার্জিলিঙের তিনটা পার্বতীয় মহকুমা (এবং সেই সঙ্গে দার্জিলিঙের তরাই অঞ্চলও) ব্রিটিশ যুদ্ধ এবং ষড়যন্ত্রের মধ্যি দিয়ে জয় না করা অব্দি ঐতিহাসিক বাংলার অংশ হয় নি। ব্রিটিশ সিকিমের চোগিয়াল এবং ভূটানের রাজার থেকে দার্জিলিং এবং কালিম্পং কেড়ে নিয়েছিল। এই অঞ্চল  বাংলার অংশ বলে বলাটা যেমন, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা এবং অসমের পুরোনো গোয়ালপাড়া জেলা বাংলার অংশ বলে বলাটাও তেমনি কথা। বৃটিশের প্রশাসনিক নির্দেশ এবং সুবিধা ছাড়া এগুলো কখনোই বাংলার অংশ হতে পারত না। বিহার, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা, গোয়ালপাড়ার মতো জায়গাতেও বিশ শতকের শুরুতেই ব্যাপক বাঙালি থাকার বিপরীতে দার্জিলিং পাহাড়ে আজ অব্দি সাবেক বাঙালি বসতি নেই বললেই চলে। এই পাহাড়গুলো কী করে বাংলা হলো সে আমাদের বোধশক্তির বাইরে, কিন্তু প্রমাণ বহন করে এক ঔপনিবেশিক-উগ্রজাতীয়তাবাদী মানসিকতার। 

             ডুয়ার্স এবং তরাই শিলিগুড়িকে নিয়ে একটি গোর্খা রাজ্যের মূল দাবিটা ছিল সম্প্রসারণবাদী এবং উগ্র-জাতীয়তাবাদী। কারণ এই অঞ্চলগুলোতে গোর্খারা  এক ছোট সংখ্যালঘু অংশ এবং কখনোই তার ভূমিপুত্র ছিল না। গোর্খা ভূ-খন্ডগত কর্তৃপক্ষের (GTA)র সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো এই দাবিকে মাত্র কয়েকশ মৌজার দাবিতে পর্যবসিত করেছে। এই মৌজাগুলোতে গোর্খা সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা না থাকাটা নিশ্চিত করতে একটি সমিতি গড়ে দেয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার গোর্খা সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সংলগ্নতা আছে এমন মৌজাগুলোকে (GTA) তে অন্তর্ভূক্ত করবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রতিশ্রুতিতে আপত্তিকর কিছুই নেই। এমন মীমাংশার পূর্ব নজিরও আছে। পাঞ্জাব এবং হরিয়ানার বিভাজনের সময় আবোহর এবং ফাজিলকাকে নিয়ে পাঞ্জাবী এবং হিন্দিভাষীদের মধ্যে এমন বিবাদ হয়েছিল । তার মীমাংশা হয়েছিল এই নীতির ভিত্তিতে যে ‘গ্রামকে একক এবং সংলগ্নতা’র ভিত্তিতে নেয়া হবে।
চাবাগানের আদিবাসিদের আন্দোলন
             বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদের উস্কানি এবং ক্রমাগত বর্বরতাপূর্ণ গোর্খা প্ররোচনার ফলে GTAতে ভূখন্ড সম্পর্কে এক অতি শক্তিশালী  প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। এই প্রতিরোধের পেছনে প্রধান শক্তি হচ্ছে আদিবাসি বিকাশ পরিষদ (AVP) নামে চা-বাগানের আদিবাসিদের এক সংগঠন। এই AVP হচ্ছে এক শক্ত পুঁজির পুরোনো বেসরকারী সংগঠন, যার মূখ্য কার্যালয় পশ্চিম বাংলার বাইরে। ডুয়ার্স এবং তরাইকে গোর্খাল্যাণ্ডের অন্তর্ভূক্ত করার দাবিতে সাম্প্রতিক আন্দোলনের আগে অব্দি এই AVP উত্তরবাংলাতে প্রায় অপরিচিত ছিল। দূয়ার্স এবং তরাইর জন্যে সংবিধানের ষষ্ট  অনুসূচীর অধীনে স্বায়ত্বশাসনের দাবি জানিয়ে এবং সে এলাকাতে গোর্খা স্বায়ত্ত শাসনের  বিরোধীতা  করেই এভিপি বিখ্যাত হয়েছিল। এই সংগঠনটি গুরুতর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছিল এবং এর স্থানীয় নেতারা গোর্খাদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে গুরুতর সাম্প্রদায়িক হিংসাতে জড়িয়ে পড়েছিল।
            
     এখন একটি সমিতি ডুয়ার্স  আর তরাইর এক বড় অংশের মৌজা ( ১৭০টার থেকেও বেশি) জিটিএ-তে ঢোকাবার জন্যে গোর্খাদের দাবিটি পরীক্ষা করছে। এভিপি এই নিয়ে যেকোনো জরিপের পথে শারীরিক বাধা গড়ে তুলেছে। এভিপিকে প্রকাশ্যে সমর্থণ দিচ্ছে এমন কিছু উগ্রজাতীয়তাবাদী  সংগঠন যারা গোর্খালেণ্ড দাবির যেকোনো প্রকাশের বিরোধীতা করে আসছে। এই বাঙালি সংগঠনগুলোর সদস্যদের মধ্যে সমস্ত ধরণের রাজনৈতিক দলের লোকজনকে দেখা যাচ্ছে।
           জনপ্রিয় সাংবাদিক-পরিভাষাতে উত্তর বাংলার রাজনীতিতে এভিপির এই হঠাৎ উত্থানকে নানারকম ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। যেমন , গোর্খা প্রভুত্ব এবং উগ্রজাতীয়তাবাদের বিরোধীতা, এই বিশেষ মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলের চক্রান্ত এবং  সেই দলের একজন শক্তিশালী নেতা এভিপিকে টাকা এবং কর্মী যোগান দিয়ে গোর্খা আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে চাইছেন, মধ্যভারতের পাহাড় –জঙ্গল এলাকার থেকে জঙ্গলমহল অব্দি আদিবাসি চেতনার বিস্তার ...ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও এই জল্পনা কল্পনাগুলোর পেছনে কিছু সত্য আছে, তবু  সেগুলো চা-বাগানের আদিবাসী শ্রমিকের এই আকস্মিক বিস্ফোরক উত্থানের ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ তেমন এই ব্যাখ্যার জন্যে আমাদের কিছু সময়ের জন্যে হলেও ডুয়ার্স এবং তরাইর চা শ্রমিকের সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রবেশ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম উল্লেখযোগ্য কথাটা হলো, এই যে  ঐ এলাকার বাগানগুলোতে ২০০৩-০৭ সনের ভেতরে ১২০০এর থেকেও বেশি শ্রমিক আর তাদের পরিবারের সদস্যের খাদ্যাভাব জনিত তীব্র অপুষ্টিতে মৃত্যু হয়। সরকার, শাসক দলগুলো এবং মালিক সংস্থাগুলো অবশ্য মৃতের এই সংখ্যা সব সময়েই বিরোধীতা করে এসছে। কারণ এটি তাদের বিফলতার সূচক। তার উপর রয়েছে, আরেকটি অতিরিক্ত সমস্যা। সে হলো, ডাক্তারেরা সাধারণত এমন মৃত্যুকে’ হৃদযন্ত্র-শাসযন্ত্র’জনিত মৃত্যু বলে বলে দেয়। তার মানে ‘মৃত্যুর কারণ মৃত্যু’ বলে বলবার মতো।  একজন ডাক্তার অবশ্য ‘ তীব্র অপুষ্টিজনিত কারণে হৃদযন্ত্র শ্বাসযন্ত্র বিকল হয়েছে’ বলে মৃত্যুর কারণ নথিবদ্ধ করেছিলেন । কিন্তু তেহেলকার একজন সাংবাদিক তাঁর সেই নথি সম্পর্কে সাক্ষাৎ করতে যেতেই ট্রেড ইউনিয়নের গুণ্ডারা সেই ডাক্তারকে বাগান থেকেই তাড়িয়ে দিয়েছিল।
         সরকারি পক্ষ অস্বীকার করলেও এই নিয়ে এক গণ ন্যায়াধীকরণ গঠিত হয়। মুম্বাই ন্যায়ালয়ের একজন অবসর প্রাপ্ত ন্যায়াধীশকে অধ্যক্ষ এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত চা-বাগান পরিচালক, বম্বে উচ্চন্যায়ালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ পরামর্শদাতা, একজন অবসরপ্রাপ্ত মুখ্যসচিব, উত্তর বাংলার অর্থনীতি এবং চা-বাগান সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ একজন এমেরিটাস প্রফেসর , একজন নেতৃস্থানীয় অধিবক্তা এবং বেশ ক’জন বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে সদস্য হিসেবে নিয়ে গঠিত এই ন্যায়াধীকরণ ছ’টি বন্ধ বাগান পরিদর্শন করে। সেগুলোতে বড় বড় প্রকাশ্য শুনানী হয়। যেখানে ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, চা-মালিক কর্তৃপক্ষ, বিধায়ক, এন জি ও, এবং সাক্ষ্য দিতে ইচ্ছুক জনতা সাক্ষ্য দেন। এমনকি জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনের উপর মহলও রুদ্ধদ্বার কক্ষে সাক্ষ্য দেয় ন্যায়াধীকরণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে ২০০৮ সনের ভেতরে ৮০০রো বেশি মানুষ অপুষ্টির ফলে মারা যায়।
           সর্বোচ্চ আদালতের ‘খাদ্যের অধিকার’ পীঠের নিযুক্ত একজন আধিকারিকের তৈরি একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অত্যন্ত কম মূল্যে খাদ্যশস্য যোগান, মাসের অন্তত ১৫ দিনের সার্বজনীন কাজ এবং বাগানে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা, বেকার শ্রমিকদের জন্যে ভাতা ইত্যাদির ব্যবস্থা করবার নির্দেশ দেয়। রাজ্যসরকার মাসের পর মাস জুড়ে এই নির্দেশ পালন না করে রেখে দেয়।পুরোতো দূরেই থাক মোটামোটি ভালো করে এই নির্দেশের  প্রয়োগ শুরু করতেই বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়। আমার নিজের হিসেব মতে এই নির্দেশের পরেও ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয় খিদের জ্বালায়। গণ ন্যায়াধীকরণের ৮০০র সঙ্গে একে যোগ করলে নাহার মৃত্যুর বলির সংখ্যা দাঁড়ায় ১২০০।
একটি রাজ্য সরকার যে আদালত নির্দেশ না দেয়া অব্দি কিছুই করলনা, যাও কিছু করল, ২০০৭ অব্দি ছাড়াভাঙ্গা করে করল, তার থেকেই রাজ্যসরকারের উগ্রজাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চরিত্র বড় করে ধরা পড়ে। এই নিয়ে আমরা আবার আসব পরে।
            এই দায়সারা সাহায্যের থেকেও বাজে কথাটি হচ্ছে এই যে রাজ্য এবং কেন্দ্রের সরকার এই দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতির জন্যে দায়ীদের প্রতি যা ব্যবহার করল সেটি। বন্ধ করে দেয়া ৩২টি বাগানকে অবৈধভাবে পরিত্যাগ করা হয়েছে।বাগানগুলোর মালিক পক্ষ শ্রমিক মজুরির বিশাল বকেয়া, নগদ এবং বস্তুর রূপে ( রেশন বলে ঢাকঢোল বাজিয়ে যে খাদ্যাদি দিয়ে থাকে সেগুলোতো আর সত্যি সত্যিই দান খয়রাত নয়, মজুরিরই অংশ) প্রাপ্য গ্র্যাচুইটি , ভবিষ্যনিধি ইত্যাদি হজম করে ফেলেছিল। তাঁরা সরকার এবং বেংকের থেকে নেয়া ঋণও হজম করে ফেলেছিল। কারণ তারা তাদের চা নিলাম বাজারে বিক্রি না করে সরাসরি বিক্রি করেছিল যাতে এরকম হিসাব বহির্ভূত বিক্রির মধ্যি দিয়ে নিজেকে দেউলিয়া এবং বাগানকে রুগ্ন বলে দাবি করতে পারে।
          চা আইন কেন্দ্রীয় সরকারকে চা মালিকদের এমন  অপরাধের জন্যে সাজা দেবার কর্তৃত্ব     দিয়েছে । সেরকম সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে ক্ষতিপূরণ না দিয়ে  তাদের বাগান বাজেয়াপ্ত করা। কিন্তু সেরকম কার্যব্যবস্থা সম্পর্কে কাউকে কোনো ভাবনা চিন্তা করতেও দেখা গেল না। রাজ্য সরকারও পারত এই বাগান মালিকগুলোকে বিশ্বাসভঙ্গ এবং অপব্যবহারের অভিযোগে শাস্তি দিতে। কারণ তারা শ্রমিকের মজুরির থেকে তাদের ভবিষ্যবনিধির জন্যে কেটে রাখা ধন যথাস্থানে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছে। কিন্তু সরকার নাড়াচাড়া করলই না। বকেয়া ধন আদায় দেবার প্রতিশ্রুতি মাত্র দেয়া হলো—পূরণ কিন্তু কখনোই করা হলো না। শ্রমিকেরাও এই পরিস্থিতিকেই মেনে নিয়ে চুপ থাকতে হলো, কারণ প্রতিবাদ করলেই যদি মালিক পক্ষ বাগান ছেড়ে চলে যায়। আর তেমন হলে রাজ্য বা কেন্দ্রের কোনো সরকারইতো তাদের দিকে ফিরেও তাকাবে না।
         এই জনজাতীয় শ্রমিকদের প্রতি যে ব্যবহার করা হয়েছিল সে এক কলঙ্কিত কাহিনি। আবাসন, চিকিৎসা, অনাময়, খাবার জল ইত্যাদি যেসব কল্যাণমূলক বিধির কথা ১৯৫১ সনের বাগিচা-শ্রম আইনে উল্লেখ করা ছিল সেসব মালিক পক্ষ অনেক আগেই ত্যাগ করেছিল। কিন্তু রাজ্য সরকার ভ্রুক্ষেপ মাত্রও করেনি। কিন্তু বৃহত্তম কেলেঙ্কারি হয়েছিল মজুরকে নিয়ে।
          এখনকার মজুরি হচ্ছে সমতলে ৮৫ টাকা এবং পাহাড়ে ৯০টাকা। আমরা প্রথমে তাকাই চলুন এই সংখ্যাগুলো কিসের ইঙ্গিত দেয় সেদিকে। কারণ মজুরির একটা অংশ নগদ একটা অংশ বস্তুতে দেয়া হয়। গোটা এক বছরের জন্যে বিস্তর লাকড়ি বাগান কর্তৃপক্ষ কিনে নেয় সরকারি বন বিভাগ থেকে একেবারেই জলের দামে, ৩০০ থেকে ৫০০টাকার মধ্যে। প্রত্যেক শ্রমিক মাসে ৪০০ গ্রাম চাপাতা পেয়ে থাকে। তারপর আছে ‘রেশন’। মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা মোট শ্রমিকের অর্দ্ধেকের থেকেও বেশি। অথচ তারা তাদের স্বামীর জন্যে রেশন পান না, স্বামী কাজ করলে কিন্তু স্ত্রীর জন্যে পেয়ে থাকেন। এটি দেখা দেখি ‘সমান কাজের জন্যে সমান পারিশ্রমিক’ নীতির বিরোধী। কিন্তু আমাদের নারী আন্দোলনের বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদী চরিত্র লাখ লাখ শ্রমিক নারীর প্রতি এমন বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলতেই দেয় না। বিবাহিত হলে পুরুষ বা মহিলা শ্রমিক তাদের প্রাপ্যের মাত্র চারভাগের একভাগই পায়। আর যদি একজন শ্রমিক বিবাহিত হয়, তবে তাদের সন্তান দুটো হওয়া দরকার যাতে রেশন আরেকভাগ বেশি পায়। কিন্তু আমরা যদি রেশনের হিসেব করি, তখন দেখব যে সেই রেশনের জিনিসগুলো মালিক পক্ষ গণ বণ্টণ ব্যবস্থার থেকেই অতি কম দামে সংগ্রহ করে শ্রমিককে দেবার বেলা সেই মূল্য বাড়িয়ে দেখায়। বাগান মেনেজার এবং রেশন দোকানীর মধ্যে এই নিয়ে এক দারুণ বোঝাপড়া থাকে। সেজন্যেই রেশনের নামে শ্রমিকদের দেয়া এই জিনিসগুলো দাম দৈনিক ২০টাকার থেকেও কম। তার অর্থ হলো পাহাড়ে ২০+৯০=১১০ টাকা, সমতলে ২০+৮৫=১০৫টাকা। এই দুটো মূল্যই কৃষিমজুরের ন্যূনতম মজুরি ১৩০টাকার থেকে কম।কেন্দ্র সরকারের দ্বারা যে কোনো কাজের জন্যে নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির (flour wage) থেকেও এর পরিমাণ কম।
           এই অন্ধকার ছবির পটভূমিতে নিম্নতম মজুরির প্রশ্নটি বিচার করুন। ১৯৪৮সনে ন্যূনতম মজুরি আইনের তালিকাতে চা উদ্যোগ ছিল । এটি সবার জানা কথা যে ১৯৫৬ সনের পঞ্চদশ সর্বভারতীয় শ্রম সম্মেলন অব্দি এই আইনটি প্রয়োগের জন্যে কিছুই করা হয় নি। পুঁজিবাদী শিবিরের হর্তাকর্তারা, একটি ইউনিয়ন এবং সরকারের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ঐ সম্মেলনে মজুরি নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিগুলো ঠিক করেছিল। ঠিক তার পর থেকেই সমস্ত তালিকাভুক্ত উদ্যোগের মজুরি নির্ধারণ সময়ে সময়ে হয়ে এসছে। তামিল নাড়ু, কেরালা এবং কর্ণাটকের মতো রাজ্য যেখানে বড় বড় চা-বাগান রয়েছে সেই সব রাজ্যও  বিধিবদ্ধভাবেই সময়ে সময়ে চা-শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করে এসছে। কিন্তু পশ্চিম বাংলা গেল পঞ্চাশ বছরে একবারো এই ঘোষণা করেনি। কারণটি বেশ আমোদজনক! ১৯৭৪ সনে ব্যবসায়িক স্বার্থজড়িত গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবাধীন পশ্চিম বাংলার চা-শ্রমিকদের ট্রেডইউনিয়নগুলো (প্রধানত কংগ্রেস) এবং বামপন্থী ইউনিয়নগুলোর বাঙালি নেতৃবৃন্দ একটা ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে সরকার চায়ের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে আইনত দায়বদ্ধ নয়। সময়ে  সময়ে যেসব মজুরি সংক্রান্ত আলোচনাগুলো হয় তাকেই ন্যূনতম মজুরি বলে ধরা হয়। তাই এখানে অবাক হবার কিছু নেই যে পশ্চিম বাংলার ডুয়ার্স এবং তরাইর শ্রমিকেদের থেকে আর সমস্ত বড় বাগানের রাজ্যগুলোর শ্রমিকেরা (অবশ্যি অসমের কথা এখানে বলছি না) বেশি মজুরি পেয়ে থাকেন। এভিপির বিস্ফোরণ এবং ন্যূনতম মজুরির জন্যে সংগঠনটির দাবি জানাবার পরেই রাজ্য সরকার এবং ইউনিয়নের নেতারা এর গুরুত্ব বুঝে উঠেছেন।
           চা-বাগানের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হচ্ছে এর সমাজ এবং অর্থনীতির বিচ্ছিন্ন (enclave) চরিত্র। চা শ্রমিকদের এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি এক দাসব্যবস্থার মতো ব্যবস্থার মধ্যি দিয়ে। একসময় তাদের ঔপনিবেশিক আইনের জোরে স্থানীয় মানুষ থেকে সরিয়ে রাখা হতো। সশস্ত্র বাহিনীর হাতে চাবুক পিটিয়ে ফাটকে বন্দি করে রাখা হতো। সেই সশস্ত্র বাহিনীটি চলাতো বাগানের মালিক পক্ষ এবং তাদের ব্রিটিশ অনুচরেরা।  বিগত কিছু সময় থেকে সেরকম আইন আর সশস্ত্র বাহিনী নেই যদিও চাবাগানের বিচ্ছিন্ন চরিত্র এখনো বহাল রয়েছে। শ্রমিকদের এই চারপাশের পরিবেশ থেকে সরিয়ে রাখার পেছনে বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদী বিদ্বেষ আর শত্রুতাতো রয়েইছে, আর রয়েছে তাদের নিজেদের শিক্ষার অভাব।
            চাবাগানে যে স্কুল নেই , তেমন নয়, আছে। যে স্কুলগুলোতে  দুপুরের খাবার দেয়া হয়, সেগুলোতে উপস্থিতিও ভালো। কিন্তু সেই স্কুলগুলোতে বাগানের ছেলেমেয়েরা কি কিছু শেখে আদৌ?  মেট্রিক পরীক্ষার আগেই তাদের বেশির ভাগ স্কুল ছেড়ে দেয়। অতি অল্পই  মেট্রিকও পাশ করে। কেন? কারণ, এই প্রাথমিক স্কুলগুলোতে চাবাগানের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে দুর্বোধ্য ভাষা বাংলা নতুবা হিন্দিতে পড়ানো হয়। এই সব ভাষা ওদের জগতে গিয়ে ঢুকতেই পারে না। পৃথিবীর অন্য সমস্ত শিশুর মতো ওদের জগতেটাকেও ছোঁয়া নিশ্চয় যেত, কিন্তু সে যেত ওদের নিজেদের ভাষা সাদ্রিতে বহু শিক্ষাবিদ এই নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন এবং বহু শ্রমিক এই নিয়ে লড়াইও করেছেন, মাতৃভাষাতে শিক্ষা দেবার জন্যে। এ মূলত কোঠারি আয়োগের পরামর্শ। এই পরামর্শ অনুযায়ী প্রথম তিন বছর মাতৃভাষাতে শেখার পর চতুর্থ বছর থেকেই রাজ্যের প্রশাসনিক ভাষা শিখে শিক্ষার অনুশাসন আয়ত্ব্ব করা উচিত। এমন শিক্ষার অভাবে অভাবে দক্ষ জীবিকা বা প্রশানের কাজে ওদের লাগাবার মতো যথেষ্ট সামাজিক মূলধন গড়ে উঠে না। চা মজদুরের ঘরে জন্ম নিয়ে তারা চিরদিন চাশ্রমিক হয়েই থেকে যায়। বিচ্ছিন্নতা চলতেই থাকে। উত্তর বাংলার কামতাপুরিরাও (যাদের নিয়ে আমরা এখন আলোচনা করব) সেই একই ভাষার প্রবঞ্চনার বলি। তাদের মধ্যেও একই রকম সামাজিক মূলধনের অভাব। ঠিক তাই এটা বুঝতে অসুবিধে হয় না যে আদিবাসিদের বিস্ফোরণ আড় অনেক আগেই দেখা দেয়া উচিত ছিল।

এবং কামতাপুরি আন্দোলন 
      
       উত্তর বাংলার জনগোষ্ঠীগত উত্তেজনার তৃতীয় প্রধান বিন্দুটি হলো কামতাপুরি প্রসঙ্গ। বাঙালি প্রশাসন এই সমস্ত মানুষ এবং তাদের ভাষাকে বোঝাতে ‘কামতাপুরি’ শব্দটি ব্যবহারে প্রবল আপত্তি করে। ‘মূলস্রোতে’র প্রচারমাধ্যম পৃথকতাবাদী আন্দোলন আর রাজনীতি বোঝাতেই শব্দটি ব্যবহার করে।
       উত্তরবাংলার এই সম্প্রদায়টি বোধহয় নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ। তা নাহলেও তারা যে বৃহত্তম জনগোষ্ঠী সেটি নিশ্চিত। ওরা হচ্ছেন ঐতিহাসিকভাবে গঠিত এক সম্প্রদায়। এর ভেতরে হিন্দু মুসলমান দুইই রয়েছেন। মালহার মুসলমানেদের বাদ দিলে স্থানীয় মুসলমানেরা নস্য বলে পরিচিত। তাদের ভাষা আর সংস্কৃতিও তাদের হিন্দু প্রতিবেশিদের সঙ্গে এক। রাজবংশী আর পালিয়ারা মিলে এই সম্প্রদায়ের বৃহত্তম হিন্দু জাতি ( caste) গঠন করেছে। এই সম্প্রদায়ের ভেতরে ব্রাহ্মণদের নিয়ে একাধিক পেশাদার জাতিও রয়েছে।
এদের ভাষার স্বরূপ নিয়ে নানা অদরকারি তথ্যবিকৃত ( ill-informed) বিতর্ক শুরু হয়েছে। বাঙালি স্থিতাবস্থা, বিশেষ করে বামপন্থী স্থিতাবস্থা এই বলে নিরন্তর প্রচার করে যাচ্ছে যে এই ভাষাটি বাংলার এক উপভাষার বাইরে আর কিছুই নয়। কিন্তু সমস্যা এখানেই যে সম্প্রদায়টির ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এই উপভাষার মর্যাদা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। এই বিবাদের ফলে উদ্ভূত বিতর্কের কোনো দরকারই পড়ত না যদি মানুষের সমাজ-ভাষাতত্ব নিয়ে ন্যূনতম ধারণাটিও থাকত। সমস্ত মাতৃভাষাই সমান ভাষা। যেগুলো মাতৃভাষা রাষ্ট্র এবং ভৌগলিক কারণে প্রশাসনের ভাষা হয়ে পড়ে সেগুলোই আধুনিক মান ভাষা হয়ে পড়ে। কলকাতা এবং তার আসেপাশের ভাটি গঙ্গার ভাষাটিই যে আধুনিক মানভাষা হয়ে পড়ল তার কারণ এই যে এই মহানগর ব্রিটিশের রাজধানী ছিল। বাংলারা আর যেসব মাতৃভাষার কলকাতার ভাষার সঙ্গে পরস্পরবোধ্যতা ছিল, সেগুলো সার্বজনীন ক্ষেত্রে এই মান ভাষাকে গ্রহণ করেছিল। তখন সেই মান ভাষা গ্রহণকারী মাতৃভাষাগুলোর ব্যক্তিগত পরিসরেও প্রবেশ করতে শুরু করে। এই গ্রহণের ফলেই এই মাতৃভাষাগুলো ধীরে ধীরে মানভাষাটির উপভাষাতে পরিণত হয়েছিল।
            ঐতিহাসিক ভাবে জটিল কতকগুলো কারণে ( যা নিয়ে আমরা এখন আলোচনা করব না) আমরা ইতিমধ্যে যে মানুষদের কথা বলছি তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই সেরকম ‘গ্রহণে’র মধ্যি দিয়ে নিজের মাতৃভাষাকে বাংলার উপভাষাতে পরিণত হতে দিতে রাজি নয়। তারা প্রশাসনের ভাষা হিসেবেও বাংলাকে চাপিয়ে দেবার বিরোধীতা করেন এবং নিজের স্বায়ত্বশাসিত রাজনৈতিক স্থান চাইছেন, যেখানে তাদের নিজেদের ভাষা এক আধুনিক মানভাষাতে পরিণত হবে, যেভাবে একদিন ব্রিটিশের চাপিয়ে দেয়া বাংলাকে অতিক্রম করে এক আধুনিক মান ভাষা হিসেবে  অসমিয়া ভাষা গড়ে উঠেছিল অসমের মতোই এক স্বায়ত্ত্বশাসিত স্থানের দাবি আবশ্যিকভাবেই রাজনৈতিক। কামতাপুরি ভাষা এবং বাংলার মধ্যে শব্দগত এবং বাক্যের গঠনগত ( syntactical) মিল এই ক্ষেত্রে কোনো সবল যুক্তি নয়, ঠিক যেমন বাংলার সঙ্গে অসমিয়ার      মিলও কোনো সবল যুক্তি নয়।
            আধুনিক মান ভাষার জন্যে সংগ্রাম এবং তার বিকাশের প্রক্রিয়াতে অসমিয়া এক শক্তিশালী আধুনিক জাতিরূপে গড়ে উঠল। উত্তরবাংলাতে ভাষার জন্যে যারা লড়াই করছেন এই প্রাথমিক           ( nascent) জাতীয় প্রশ্নটিকে মনেপ্রাণে (implicitly) গ্রহণ করলেও প্রকাশ্যে (explicitly ) গ্রহণ করেন নি। ফলে ভাষাটির নাম নিয়েও বিতর্ক আছে। যেসব বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদী ভাষাটির  এই জাতীয় দিকটিকে ঘৃণা করেন, তাদের সঙ্গে এই ভাষাটির একাংশও একে ‘রাজবংশি ভাষা’ বলে নাম দিতে চান। এই দ্বিতীয় অংশটি নিরাপত্তাজনিত কারণে এটা করতে চায়, কারণ তাতে দাবিটার জাতীয় মাত্রাও নেই হয়ে যায়, আর (বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে) শত্রুতাও কমে। কেউ কেউ অবশ্য এটাও বলেন যে এর পেছনে রাজবংশি সাম্প্রদায়িকতাও লুকিয়ে আছে। সে নিয়ে আমাদের কিন্তু সন্দেহ আছে। এই নিয়ে সত্য অবস্থান এই যে এই ভাষিক সম্প্রদায়ের ভেতরে রাজবংশিরা বৃহত্তর গোষ্ঠী হলেও বাকিরা মিলেও একটা বড় অংশ তৈরি করেন।
            ভাষাটির বিকল্প নাম হচ্ছে ‘কামতাপুরি’। কোচবিহার জেলার দিনহাটার কাছে খনন করে এক বিশাল প্রাচীন রাজধানী প্রাঙ্গন পাওয়া গেছে। কামতাপুর নামের  সেই মধ্যযুগের  রাজ্যের থেকে ভাষাটির এই নাম হয়েছে। লক্ষ্য করবার মতো বিষয় যে কামতা রাজারা রাজবংশি ছিলেন না, ছিলেন খেন বংশীয়। এই খেনরা হলেন সংস্কৃতায়নে প্রভাবিত সমতলের  এক বড়ো জাতি। পূব ভূটানের খেনরা এখনো তাদের পুরোনো বড়ো-জনজাতীয় জীবন যাপন করেন এবং এক তীব্বত বর্মী ভাষাতে কথা বলেন। আগেকার গৃহভূমির নাম ব্যবহার করে ভাষার নাম দেয়ার মধ্যে যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি নিহিত রয়েছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
              কামতাপুর নামটি সবাইকে নিজের ভেতরে গ্রহণ করে । শুধু রাজবংশিই নয়, মুসলমানদের ধরে এই ভাষাভাষী সবার থেকে ব্যাপক সমর্থণ পায়। অনেক পন্ডিতও এই নামটি ব্যবহার করতে শুরু করেছেন, কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো এই যে লাখ লাখ মানুষ পায়ে পায়ে মাটি কাঁপিয়ে শত শত জনসভাতে নামটির প্রতি তাদের সমর্থণ জানিয়েছেন। তারা দাবি করছেন কামতাপুরি ভাষার স্বীকৃতি। ভাষাটির প্রতি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্ত আমাদের রাজনৈতিক শ্রেণিটির বাঙালি জাতীয়তাবাদী পারিপার্শিকতার এই স্বীকৃতিতে নারাজ। কামতাপুরি এবং আদিবাসিদের এই ঘরের ভাষার জন্যে দীর্ঘদিন ধরে নিরন্তর জানিয়ে আসা  দাবি কোঠারী আয়োগের পরামর্শের সঙ্গে মিলে গেলেও বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদের স্থিতি দেখাচ্ছে যে ভাষার প্রশ্নে তারা এই ইঞ্চি জমিও ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নয়।

অবদমিত জাতিসত্তাগুলোর সংগ্রাম  শ্রেণি সংগ্রামের  এক আবশ্যক রূপ।

        “বাংলা ভাগ হতে দেব না।” এই বাক্য এক সত্যিকার ভয়কেই প্রকাশ করে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে ভয়ের প্রয়োগ কোনো কাজেরই নয়। বাঙালি উচ্চবর্ণ মানসিকতার জন্যে যতই অপ্রিয় লাগুক, বিক্ষুব্ধ জনতাকে হিংসাত্মক মীমাংসার দিকে ঠেলে না দিতে হলে গোর্খা, আদিবাসি এবং কামতাপুরীদের জাতিরূপে স্বীকৃতি দেয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই সব মানুষ এবং সেই সঙ্গে পশ্চিম মেদিনীপুর, বাকুড়া আর পুরুলিয়া (পশ্চিমাঞ্চল)এর মানুষকে এক ফেডারেল রাজ্য কাঠামোতে স্থান দেয়াটাই হবে হিংসাত্মক সংঘাত এবং বাংলার প্রকৃত বিভাজন রোধ করবার একমাত্র উপায়। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রাণশক্তির প্রশংসা করবার সময় আমাদের এই কথা মনে রাখতেই হবে যে ১৯৪৭এ বাংলাকে যারা বিভাজনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল তাদের উচ্চবর্গীয় মানসিকতা আজও বিরাজ করে এবং তারা তার ঐতিহাসিক পরিণতি সম্পর্কে আগের মতোই এখনো সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
          কিছু মার্ক্সবাদী ভাবেন যে এমন জনগোষ্ঠীগত বা জাতীয় সংগ্রামগুলো হচ্ছে শ্রেণিসংগ্রাম থেকে একধরণের বিচ্যুতি। উত্তরবাংলার চা-বাগিচা এবং জঙ্গল মজদুর, গোর্খা এবং অন্যান্য আদিবাসিদের দিকে তাকানএখানে একটা চিন্তার সম্পরীক্ষাও করা যাক, চলুন। ধরুন, এই শ্রমিকরা সংখ্যালঘু জাতিসত্তার নাহয়ে নিজের সমাজের ভেতরের বাঙালি জাতিসত্তারই লোক। তখন কি তাদের বেলা এখনকার মতো আইন কানুনের এমন নগ্ন উল্লঙ্ঘন হতো? তারা যদি উপোসে মারা যেতেন রাষ্ট্র কি ঠিক এতোটাই উদাসীন হতে পারত? না, তখন আর উত্তরবাংলাতে একাবারেই প্রান্তিক অবস্থানের কামতাপুরি কৃষকদের এতোটা নিম্নমূল্যে মরাপাট বিক্রি করতে বাধ্য করা যেত না। পুঁজিবাদী হয়েও আমেরিকার দক্ষিণের কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে যেমন দাসব্যবস্থার মতো অবস্থা বহাল রয়েছে, আমাদের এখানেও নিম্নবর্গ এবং সংখ্যালঘুর মতো অবদমিত জাতিসত্তাগুলো সবসময় আরো বেশি বেশি মুনাফা এনে দেয়।বৈষম্য আর প্রভুত্বের  অর্থনীতি বহির্ভূত বলপ্রয়োগের এক ব্যবস্থার মধ্যি দিয়ে এমন অতি মুনাফা সম্ভব করে তোলা হয়। এই অবদমিত জাতিসত্তাগুলোর সংগ্রাম তাই শ্রেণি সংগ্রামের আংশিক ভাবে হলেও এক আবশ্যক রূপ।
          বিগত জমানার ক্ষমতার কেন্দ্র থেকেই উত্তর বাংলার উন্নয়ন বিষয়ে উচ্চবাচ্য  শুনা গেছিল। এখনকার জমানাতেও উন্নয়নের আরো অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি শোনা যাচ্ছে, তা আজকের উদারবাদী পরিস্থিতিতে  তেমন ‘উন্নয়নে’র অর্থ যাই হোক না কেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক এবং সবাইকে সামিল করে ফেলবার মতো কোনো সমাধানের বাইরে উন্নয়ন  হবেই না, আর হলেও তা শেষে গিয়ে আরো ভয়াবহ সংঘাত ডেকে নিয়ে আসবেই। আর সেই সংঘাত বাঙালি জাতিসত্তার জন্যেও অনিবার্যভাবেই বিপর্যয়ের সংবাদ সঙ্গে করে আনবে।