ফেলানি
সকাল সকাল ড্রাইভারণী আর মিনতির মধ্যে বড় এক ঝগড়া লেগে গেলো। ওদের দু’জনের ঘর পাশাপাশি হলেও যাওয়া আসা নেই। মিনতি থাকে মিনতির মতো, ড্রাইভারণী থাকে নিজের মতো। মাঝে মধ্যে তর্কাতর্কি হলেও এমনতর হয় না। প্রায়ই যেমন হয় ঝগড়া হলে , বস্তির সবাই সেদিকে রওয়ানা দিয়েছে। তার উপরে এক সপ্তাহ ধরে টানা বন্ধ চলছে। লোকগুলো আধপেটা থেকে বা উপোস করে এখানে ওখানে গুলতানি মারছিল। ঝগড়াটা শুনে, দেখে বা খবর পেয়ে প্রায় সবাই গিয়ে সেখানে জড়ো হলো।
ড্রাইভারণী একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মিনতিও তাড়িয়ে যাচ্ছে। মাঝে ড্রাইভারণীর দেয়া কাঁটা তারের বেশ একখানা উঁচু বেড়া। আগেও একবার ড্রাইভারণী মিনতিকে বেশ করে খোঁচা দিয়েছিল। মিনতি বুঝি ওর বাগান থেকে লাউ চুরি করে নিয়ে গেছে। তারের উঁচু বেড়ার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সে প্রায়ই বকতে থাকে, চোর আছে বলেই এতো খরচ করে বেড়া দিতে হয়েছে। মিনতি কিছু বলে না। কে ওকে খুঁচিয়ে ক্ষেপাতে যাবে? এমনিতেও মিনতি এই ড্রাইভারণীর অসভ্যের মতো গালিগালাজ সব শুনতেই থাকে। সে সহ্য করে চুপচাপ থাকে। ড্রাইভারণীর টাকা-পয়সা আছে, পাকা ঘর আছে, মদ্যপ হলেও মাথার উপরে রোজগেরে বর আছে, আর...। বাকিটা তার ভাবতেই ভয় করে। কথায় কথায় সে আর্মির ভয় দেখায়। আর না দেখাবেই কেন! সব্বাই ওকে ভয় করে, মিনতি না করে থাকে কী করে? ড্রাইভারণী মিনতির সব জানে। কে আসে, কে আসে না। কী খায়, কখন শোয়। সবই মাছের উপরে বকের মতো নজর ফেলে দেখে রাখে। তাই ড্রাইভারণীর দাপট সহ্য করে মিনতি চুপটি মেরে থাকে। মুখে টু শব্দটিও করে না। আজ আর সহ্য করতে পারল না। সব নষ্টের গোড়া এই সপ্তাহ জোরা বন্ধ। এই সংগঠনের দেয়া বন্ধ এই শহরে সম্পূর্ণ সফল হয়। ওদের একটা কোনও লোক যদি রাস্তাতে দাঁড়িয়ে বলে যায় আজ বন্ধ, তো এক দিক থেকে সব বন্ধ হয়ে যাবে। মিনতির হাতে কানা কড়িও নেই। কার কাছেই বা চায়? সবারই একই দশা। ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে সে ড্রাইভারণীর কাছে গেছিল। বন্ধ খুললেই ঘুরিয়ে দেবে বলে টাকা কিছু চেয়েছিল গিয়ে। ড্রাইভারণী ওকে টাকা রোজগারের সহজ পথের কথা বলল। মিনতি থাকতে পারল না। সেই মিনতি ফণা তুলে তুলে বলছে,
“ সে আমাকে রেণ্ডীগিরি করতে বলছে!”
“তুই রেণ্ডী না তো কী রে?” ড্রাইভারণীর গলা বেশ টনটনে। কাঁসার বাসন একটাতে বাড়ি মারলে যেমন অনেক ক্ষণ ধরে অনুরণন বাজতে থাকে সেরকম অনেক ক্ষণ ধরে কানে বাজতে থাকে ওর গলা।
“বল, তুই আমাকে আরেকবার বল রেণ্ডী!”মিনতির গলা ভেঙ্গে গেছে।
“বলবই তো একশবার বলব, রেণ্ডী। তুই কী করে ভাতের জোগাড় করিস অন্যে না জানতে পারে, আমি জানি।”
“কী করে খাই আমি? সারা বস্তি কি দেখে না মাথাতে টুকরি নিয়ে বাজারে আমি কী করতে যাই? বাজারে আমি কি রেণ্ডীগিরি করতে যাই? বল, বলবি না কেন?”
“শহরের বাড়ি বাড়িতে চাকরানি কাজ করে পেকে আসা বেটি তুই, তোকে কে চিনতে পারবে?”
“ মা নেই, বাপ নেই। চাকরানি কাজ করে না মরে বেঁচে থাকলাম। ও বলে কিনা মানুষের বাড়ি বাড়ি রেণ্ডীগিরি করে ফিরেছি!” এবারে মিনতি কেঁদে ফেলল।
“দেখা ! মানুষকে কেঁদে দেখা। আমার মুখ ছুটাবি না!”
“ কী আর মুখ ছুটাবি? ছুটা না। আমার ছেলের কথা বলবি? জারজ বলবি। বল যত পারিস চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বল।”
“রেণ্ডীগিরি করে জারজ গোটায়, বলবই তো। হাজারবার বলব।”
“আমার ছেলের বাবা আছে, ভদ্র বাড়ির ছেলে। তোর ভাতারের মতো মাতাল নয়। আমার ছেলের বাবার দিকে তোরা তাকাতেও সাহস করবি না।”
ঝগড়াটা বেশ পেকে উঠেছে। সাতদিন বন্ধের উঠোনে, পিড়াতে লেগে গড়িয়ে পড়া মানুষগুলো বড় একটা রস পেয়েছে। রেণ্ডীর কথা, জারজের কথা, শহরে পাকা মেয়ে মানুষের কথা--- বড় রসের কথা সব। কাজিয়াটা কেউ বন্ধ করতে চাইল না।
“ভদ্র ঘরের ছেলে। জানি না বুঝি কে সে? আর্মিকে যদি বলে দিই, ওকে না পেলে তোকেই টেনে আনবে গিয়ে। তোকে ন্যাংটো করে শকুনে যেমন মরা গরু খায়, তেমনি করে খাবে।”
“ওই ! চুপ কর! কাকে ন্যাংটো করে শকুনের মতো খাবে বলছিস? গোটা বস্তি জানে আন্ধার হলে কার ঘরে কে ন্যাংটো হয়। কাকে শকুনের মতো খায়। সারা বস্তি জানে এসব কথা। ভয় করে বুঝলি, তোর ঐ শকুনদের ভয় করে।”
“কী বললি তুই? আমি তোর মতো জারজ জন্ম দেয়া মেয়ে মানুষ নই রে! আমার মাথার উপর রোজগেরে মরদ রয়েছে একটা।” ড্রাইভারণী উড়াল দিয়ে কাঁটা তারের বেড়া পার করে মিনতির কাছে চলে এলো। গিয়ে মিনতির চুল ধরে টানাটানি শুরু করল। মিনতি আর্তনাদ করে উঠল। কিন্তু ওর কথা বন্ধ হয় নি।
“ মেরে ফেলল রে! ও আমাকে মেরে ফেলল!” গলা ওর ভেঙ্গে ভেঙ্গে শোনা যাচ্ছে।
ড্রাইভারও বেরিয়ে এসেছে । মদ খেয়ে টং । লুঙিতে গাঁট দিতে দিতে ঢলতে ঢলতে এসে সে কাঁটা তারের বেড়ার পাশে দাঁড়ালো।
“ ওই হারামি বেটি! স্বামীর রক্ত খেয়ে তোর শান্তি হয় নি? অন্যের বৌকে ধরে মারছিস কেন?” ড্রাইভার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকালো, “ দেখছ কী? মেরে ফেলো না কেন এই বজ্জাত মেয়ে মানুষটিকে!”
ড্রাইভারণী এবারে মিনতিকে ছেড়ে স্বামীকে আক্রমণ করল, “ বৌ টাকাতে খায় , বেটার কথা শোন। আজ এক সপ্তাহ হলো, ঘরে ক’টাকা এনেছিস রে? কার পয়সাতে মদ খেয়েছিস? শালা, হারামজাদা! পুরুষ হয়েছিস? দুই ঠ্যাঙের মাঝে হাত দিলেই সব মেয়েরাই বুঝে যাবে তুই ক’টাকার পুরুষ।”
হুঙ্কার দিয়ে এগিয়ে এলো ড্রাইভার, “মুখ ভেঙ্গে দেব। চুপ কর! চিনিস না আমাকে! আমি দিল্লির থেকে গিয়ে গাড়ি নিয়ে এসেছিলাম। কত সস্তাতে ভালো গাড়ি এনেছি, দেখেছিস? তোর কোন ভাতার এনে দিতে পারবে?”
ড্রাইভারণী আবার সেই আগের মতো উড়ে যেন কাঁটা তারের বেড়া পার করে এলো।
“কার রোজগারের টাকাতে গাড়ি এনেছ? মরদ হয়েছো! মর্দানি দেখাচ্ছো?”
স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া। এই লাগবে, এই ভাঙবে। যারা জড়ো হয়েছিল, সবাই নিজের নিজের পথ ধরতে শুরু করল। মিনতি কাঁদছেই। ওর কান্না দেখে কারো কারো খেয়াল হলো, কেনই বা ও কাঁদছে। ড্রাইভারণী সঙ্গে ঝগড়াই বা লাগল কেন? দুই একজন কাছে চেপে এলো,
“যা উঠ, ছেলেটাকে ভাত দেগে’ যা।”
“কোত্থেকে ভাত দেবে?” জোনের মা দৌড়ে দৌড়ে এলো।
“ভাতের জন্যেই, ছেলেটাকে ভাত দেবে বলেই তো সে ড্রাইভারণী কাছে গিয়ে হাত পেতেছিল।” কেউ একজন বলল।
“কী বলল ও?”
“ কী আর বলবে? শকুনগুলোর সামনে গিয়ে ন্যাংটো হতে বলল।” ফুলের গলায় ধার।
মুখে যার হাসি ফুরোয় না কখনো , সেই রাজপুত্রের মতো দেখতে মিনতির ছেলেটা এসে মায়ের শরীরে শরীর ঘেঁসে দাঁড়ালো।
“ভাত খাবি?” রত্নার মা জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ।” সে মাথা নাড়ালো।
“চল। মিনতি, তুইও চল।” রত্নার মায়ের মুখে হাসি। সবাই ওর দিকে তাকাচ্ছে। সে এক সপ্তাহ বন্ধের মধ্যেও মানুষকে বলতে পারছে, “আয়, ভাত খাবি!” রত্নার মায়ের এই হাসির আড়ালে আছে একটি জলে খেয়ে ফেলা হাত।
রত্নার মা মিনতি আর ওর ছেলেকে যখন ভাত খাবার জন্যে ডাকছে তখনি মণির মা গিয়ে সেখানে পৌঁছুলো। সাধারণত, সে ঝগড়া-বিবাদে ঢোকে না। আজ কেউ একজন গিয়ে বলল, মিনতিকে মেরে ড্রাইভারণী একেবারে মাটিতে ফেলে দিয়েছে, সে উঠতে পারছে না। পড়ি কি মরি সে এসে মিনতির কাছে পৌঁছুলো। মিনতি তখনো কাঁদছে। ওর চুলের মধ্যে আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে সে বলল, “ যা , ভাত-মুঠো ছেলেটাকে খাইয়ে আয় গে’।” কথাগুলো বলতে গিয়ে যেন ওর বুক ফেটে যাচ্ছিল। ওর কাছেই মিনতি প্রথমে গেছিল। নারকেল তেলের ডিবাতে দুই ডিবা চালই দিতে পেরেছিল। আজ রাতে যদি মণি সিঙের গ্যারেজ থেকে টাকা কিছু না নিয়ে আসে, তবে রাত থেকে উপোস দিতে হবে। রত্নার মা মিনতি আর ছেলেকে নিয়ে চলে গেল।
ঝগড়া দেখতে আসা মানুষগুলো জড় হয়ে বসল। কেউ কিছু বলল না। সবারই মুখ রাগে কালো হয়ে আছে। মিনতির কান্না, ড্রাইভারণী গালি, ড্রাইভারের মাতালের প্রলাপ—সব কিছুতে মিলে যেন একটা ঘূর্ণি বাতাসের মতো মানুষগুলোকে কাঁপিয়ে চলে গেল। কেউ একজন বলল,
“আরও বন্ধ হবে।”
“একশ ঘণ্টার বন্ধ হবে।”
“দুশো ঘণ্টার।”
“তিনশ ঘণ্টার।”
“ এক হাজার ঘণ্টার।”
“কেউ বেঁচে থাকবে না।”
লোকগুলো আবার একটু সময় চুপ করে রইল।
“মরবো না, বুঝলে। মরবার হলে অনেক আগেই মরে যেতাম।”
তৎক্ষণাৎ সবার মনে পড়ল, কত কি যে বিপদ পার করে এসেছে এরা। সবাই মনে মনে কথাটি সমর্থন করল,
“মরাটা এতো সহজ নয়।”
“ বন্ধগুলোতে আমাদের মতো গরীবদেরই মরণ।”
“ আমাদের বস্তিতেই লোকগুলো কুকুর মেকুরের মতো কান্না জুড়েছে। দেখগে' শহরের বাবুদের বাড়িতে।”
“টিভি দেখছে, ছুটি কাটাচ্ছে, মাংস-ভাত খাচ্ছে।”
“ অমন লোকে বস্তাতে ভরে চাল কেনে।”
“বন্ধের আগের দিন বাজারে মাছ –মাংস ফুরিয়ে গেছিল।”
“মাছের দাম শুনেই ভয় লাগছিল।”
আবার লোকগুলোর রাগ চড়ল। রাগে সবাই গুম মেরে বসে রইল।
“দেখে নেব, দেখে নেব, সব ক’টাকে দেখে নেব!” মদ খেয়ে কেউ একজন রাস্তা দিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে চলে গেল।
চিৎকারটা যেন লোকগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলো। বুকের ভেতরে পাক খেয়ে খেয়ে শব্দগুলো যেন তাদের উপোসী ঠোঁটে বারে বারে উঠে এলো,
“দেখে নেব, সব ক’টাকে দেখে নেব!দিন আসবে!”
গুম মেরে বসে থাকা লোকগুলোর হাতের মুঠি শক্ত হয়ে এলো। চোখগুলো পাকা অঙ্গার হয়ে এলো। উপোসী পেটে মদ পড়া লোকটা তখনো চেঁচাচ্ছে, “ দেখে নেব, সবাইকে দেখে নেব। দেখে নেব...সবাইকে...।”
সৌজন্য ছবিঃhttp://unspokenhenceunknown.com/wp-content/uploads/2014/01/lloyd-moylan-indian-women-original-size-21x27-watercolor-on-paper.jpg
No comments:
Post a Comment